ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বর্বরতা অব্যাহত রয়েছে। ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যে চলা ১৩ মাসের যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৪৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা নিহত বেসামরিক এবং হামাস যোদ্ধাদের তালিকা পৃথকভাবে করেন না। তবে তারা বলেছে, নিহতদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা ১৭ হাজারের বেশি জঙ্গিকে হত্যা করেছে। তবে এর স্বপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই । স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৪৪,০৫৬ জন নিহত এবং ১০৪,২৬৮ জন আহত হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, ধ্বংসস্তূপের নিচে বা চিকিৎসকরা যেতে পারেননি এমন জায়গায় হাজার হাজার মৃতদেহ চাপা পড়েছে।
মূলত হামাস যোদ্ধারাই এ যুদ্ধ শুরু করে। তারা গত বছরের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালায়। তখন প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা করে। যাদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। এর চেয়ে জঘন্য কাজটি ছিল ২৫০ জন নিরপরাধ মানুষকে অপহরণ করে গাজায় নিয়ে আসা। প্রায় ১০০ জিম্মি এখনও গাজার ভেতরে রয়েছেন। তাদের মধ্যে কতজন বেঁচে আছেন তা নিশ্চিত নয়।
এদিকে লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেখানে নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৫৮০ জনে পৌঁছেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ১৫ হাজারের বেশি আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ লেবাননের বহু গ্রাম।
নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের ইঙ্গিত দিল যেসব দেশ
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধের’ অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। আইসিসির এ সিদ্ধান্তকে অনেক দেশ ও নেতা স্বাগত জানিয়েছে। নেতানিয়াহুসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্তরা সেসব দেশে গেলে তাদের গ্রেপ্তারের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
নেদারল্যান্ডস: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত মূলত নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে অবস্থিত। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরই এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু তাদের দেশের মাটিতে পা রাখলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। পার্লামেন্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাসপার ভেল্ডক্যাম্প বলেন, নেতানিয়াহু ছাড়াও ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ও হামাস নেতা মোহাম্মদ দেইফের সঙ্গেও নেদারল্যান্ডস কোনো অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ করবে না। নেদারল্যান্ডস রোম সংবিধির সঙ্গেই থাকবে।
অস্ট্রিয়া: দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার শ্যালেনবার্গ গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটিকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করলেও তার অফিস বলেছে, রোম সংবিধির একটি পক্ষ হিসাবে অস্ট্রিয়া আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য।
বেলজিয়াম: দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক্সে লিখেছে, যেখানেই অপরাধ সংঘটিত হোক না কেন দায়মুক্তির বিরুদ্ধে লড়াই বেলজিয়ামের জন্য একটি অগ্রাধিকার, যা আইসিসির কাজকে পুরোপুরি সমর্থন করে। এতে বলা হয়, ইসরায়েল ও গাজায় সংঘটিত অপরাধের জন্য দায়ীদের অবশ্যই সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিচার করতে হবে, তা সে যেই ঘটাক না কেন।
কানাডা: কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জানিয়েছেন, তিনি এই রায়কে সম্মান জানাবেন। টেলিভিশনের একটি সাক্ষাৎকারে ট্রুডোকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। ট্রুডো জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে তিনি সম্মান জানাবেন। কারণ কানাডা আন্তর্জাতিক আইন মানতে দায়বদ্ধ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল জানিয়েছেন, আইসিসির পরোয়ানা রাজনৈতিক নয়। এটিকে অবশ্যই সম্মান করা ও বাস্তবায়ন করা উচিত। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত একটি বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত এবং আদালতের সব রাষ্ট্রপক্ষ, যার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য রয়েছে, আদালতের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে বাধ্য।
ফ্রান্স: ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ক্রিস্টোফ লেমোইন বলেন, ফ্রান্স আইসিসির আইন অনুযায়ী কাজ করবে। তবে নেতানিয়াহু দেশে এলে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে কি না সে বিষয়ে কিছু না জানিয়ে তিনি বলেন, এটি ‘জটিল আইনগত বিষয়’।
আয়ারল্যান্ড: প্রধানমন্ত্রী সাইমন হ্যারিস বলেছেন, এই পরোয়ানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আয়ারল্যান্ড আইসিসির ভূমিকাকে সম্মান করে।
ইতালি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি বলেছেন, রোম মিত্রদের সঙ্গে বিবেচনা করবে কীভাবে এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা করা যায় এবং একসঙ্গে কাজ করা যায়। তারা আইসিসির পরোয়ানাকে সম্মান করেন বলে জানান।
জর্ডান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি বলেছেন, আইসিসির সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে হবে এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।
নরওয়ে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইডে বলেন, আইসিসির ম্যান্ডেট ন্যায়সঙ্গতভাবে পালন করা গুরুত্বপূর্ণ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আদালত সর্বোচ্চ ন্যায্যবিচারের মানদণ্ডের ভিত্তিতে মামলাটি এগিয়ে নেবে।
দক্ষিণ আফ্রিকা: এক বিবৃতিতে সরকার আইসিসির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং বলেছে, এটি ফিলিস্তিনে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে এবং সব রাষ্ট্রপক্ষকে রোম সংবিধিতে তাদের বাধ্যবাধকতা অনুসারে কাজ করার আহ্বান জানায়। আমরা বিশ্ব সম্প্রদায়কে আইনের শাসন সমুন্নত রাখার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছি।
সুইডেন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমার স্টেনারগার্ড বলেন, সুইডেন ও ইইউ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ কাজে সমর্থন করে এবং এর স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা রক্ষা করে। সুইডিশ আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
সুইজারল্যান্ড: সুইস ফেডারেল অফিস অফ জাস্টিস জানিয়েছে, রোম সংবিধির অধীনে আইসিসিকে সহযোগিতা করতে তারা বাধ্য। তাই নেতানিয়াহু, গ্যালান্ট বা মাসরি যদি সুইজারল্যান্ডে প্রবেশ করে এবং আদালতে প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেয় তবে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে।
তুর্কি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ পরিচালনাকারী ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে বিচারের আওতায় আনতে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা একটি আশাব্যঞ্জক ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
যুক্তরাজ্য: ব্রিটেন আইসিসির স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমারের এক মুখপাত্র। তবে নেতানিয়াহুর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা যুক্তরাজ্য গ্রহণ করছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি।
হিমালয়ের বুকের এক মুহূর্তের পরিবর্তন বদলে দিয়েছে হাজারো মানুষের জীবন। বরফ-পাথরের ধস, নদীতে প্রাকৃতিক বাঁধ ও বাঁধভাঙা পানির স্রোতে মুহূর্তেই বদলে গেল পরিচিত পৃথিবী। নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুয়া এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমি ধসে নেপালে ৩৮৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৯১০ জন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এ তথ্য পাওয়া গেছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (NDRRMA) সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, মোট ৮২৬ থেকে ৯১০ জন নিখোঁজ অথবা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। এদের মধ্যে নেপাল সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও রয়েছেন।
নেপালের পর্যটন বোর্ডের হিসাবমতে, ৩৩টি দেশের প্রায় ৬৪৪ জন (৫১৭ জন বিদেশি এবং ১২৭ জন নেপালি) পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক ভারতের (১৭৭-১৭৮ জন)। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, মালেয়শিয়া, ইউক্রেন, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ বহু দেশের নাগরিক ও তীর্থযাত্রী এই দুর্যোগে আটকা বা নিখোঁজ পড়েছেন। দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে নিখোঁজদের সঠিক সংখ্যা বের করা এবং উদ্ধার অভিযানে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। খবর বিবিসির।
মুহূর্তেই বদলে গেল পরিচিত পৃথিবী: বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়াগাধি সীমান্ত এলাকায় দিনটি অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল। কেউ কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কেউ পর্যটন বা তীর্থযাত্রার পথে ছিলেন, আবার কেউ স্থানীয় বাজার ও বসতিতে নিজেদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ ভোতেকোশি নদীর পানি অস্বাভাবিক দ্রুত বাড়তে শুরু করে। আতঙ্কিত মানুষ নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটতে থাকেন। কিন্তু পানির গতি এতটাই বেশি ছিল যে অনেক জায়গায় মানুষকে সরে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময়ই দেয়নি। প্রথমে রাসুয়াগাধি এলাকায় আঘাত হানলেও পরে বন্যার স্রোত রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংয়ের নদীতীরবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। নদীর সঙ্গে নেমে আসে কাদা, পাথর, বরফ ও বিপুল ধ্বংসাবশেষ।
বহু ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছু এলাকায় পুরো ভবন কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে যায়। গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার অভিযানও কঠিন হয়ে ওঠে।
ঠিক কী কারণে এই দুর্যোগ: এই প্রশ্নের উত্তর এখনো গবেষণাধীন হলেও ঘটনাটির সম্ভাব্য ধারাবাহিকতা অনেকটাই স্পষ্ট হচ্ছে।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে একটি বড় বরফ-পাথরের ধসের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আইসিমডের বিজ্ঞানীরাও ওই ধসকে বন্যার প্রধান সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখছেন।
ধসের বরফ, পাথর ও মাটির বিপুল ধ্বংসাবশেষ লেন্দে নদীর প্রবাহে গিয়ে জমা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। লেন্দে ভোতেকোশি নদীর একটি উপনদী। নদীর সরু অংশে ধ্বংসাবশেষ জমে পানি আটকে গেলে সাময়িক একটি প্রাকৃতিক বাঁধ বা ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম’ তৈরি হতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে জমে থাকা পানি একসঙ্গে নিচের দিকে ছুটে যায়। পানির সঙ্গে মিশে যায় বরফ, পাথর, কাদা ও পলিমাটি। ফলে এটি সাধারণ নদীবন্যা না থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী ধ্বংসপ্রবাহে পরিণত হয়।
আইসিমডের প্রাথমিক বিশ্লেষণে আক্রান্ত এলাকা থেকে পাওয়া ভিডিও ও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধ্বংসাবশেষ লেন্দে নদীতে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে পুরো ঘটনাক্রম নিশ্চিত করতে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ভূমিকম্প কি এই ধসের কারণ: বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। ঘটনাটি বন্যার সময়ের কাছাকাছি হওয়ায় প্রথমদিকে ভূমিকম্পকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে বলেননি যে ওই ভূমিকম্পই বরফ-পাথরের ধসের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল। বরং পরবর্তী বিশ্লেষণে ধস ও ধ্বংসপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত ভূকম্পনধর্মী সংকেতের বিষয়টি সামনে এসেছে। তাই ভূমিকম্পকে এই বিপর্যয়ের নিশ্চিত মূল কারণ বলা এখনই বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।
বিজ্ঞানীরা এখন খতিয়ে দেখছেন—ভূমিকম্পটি ধসের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল কি না, নাকি ধস ও ধ্বংসপ্রবাহের সময়ই ভূকম্পনধর্মী সংকেত তৈরি হয়েছিল। বন্যার ভয়াবহতার অন্যতম কারণ ছিল পানির অস্বাভাবিক দ্রুত বৃদ্ধি।
আইসিমডের তথ্য অনুযায়ী, গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। মালেখুতেও পানির উচ্চতা প্রায় ৭ মিটার বেড়েছিল।
কাঠমান্ডু পোস্টের সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী হয়ে বন্যার ঢেউ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বহু দূর পর্যন্ত নেমে যায়। দেবঘাটে সন্ধ্যার দিকে পানির উচ্চতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরে কমতে শুরু করে। এত দ্রুত পানি বাড়ায় নদীতীরবর্তী মানুষের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগ ছিল অত্যন্ত কম।
ধ্বংস হয়েছে সড়ক, সেতু ও সীমান্ত অবকাঠামো: বন্যার স্রোতে বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ভবনের নিচতলা কাদায় ডুবে গেছে, কোথাও পুরো স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে গেছে। রাস্তা ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নদীর ওপর থাকা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার কিছু অংশও বন্যার স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে গেছে।
নেপাল-চীন সীমান্তের গিরং বন্দর এলাকার সড়ক ও স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সীমান্তপথ পর্যটন ও বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফলে মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য ও যোগাযোগও বড় ধাক্কা খেয়েছে। বন্যায় রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলার ২০টি স্কুলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাদা, বালি ও পলিমাটিতে শ্রেণিকক্ষ ভরে গেছে।
উদ্ধারকারীদের জীবনও ঝুঁকিতে: দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা উদ্ধারকারীদের কাজ কঠিন করে তুলেছে। নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। আহত ও আটকে পড়া মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য, পানি, তাঁবু ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ৫,০০০-এর বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চীনও তিব্বতের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে। তবে উদ্ধারকারীদের সামনেও ঝুঁকি রয়েছে। পাহাড়ে নতুন ধস নামতে পারে, নদীর পানি আবার বাড়তে পারে কিংবা জমে থাকা ধ্বংসাবশেষ নতুন করে পানির প্রবাহ আটকে দিতে পারে।
সামনে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা: একটি ভয়াবহ বন্যার ধাক্কা সামলানোর মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকার ভাটিতে একটি বড় প্রতিবন্ধক হ্রদ বা ‘ব্যারিয়ার লেক’ তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল।
চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরবর্তী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি সেখানে প্রবেশ করতে পারে। ফলে প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে আবারও বড় ধরনের আকস্মিক বন্যা হতে পারে। চীন হ্রদটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য বাঁধভাঙা বন্যার পরিণতি বোঝার জন্য বন্যার সিমুলেশন চালাচ্ছে। জরুরি উদ্ধার ও সহায়তার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বুধবারের ভয়াবহ বন্যার পরও বিপদ পুরোপুরি কেটে যায়নি।
আগে কি এমন ঝুঁকি ছিল: ভোতেকোশি নদী অববাহিকায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আগে থেকেই ছিল। ২০২৫ সালের ৮ জুলাই একই নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। ওই ঘটনায় অন্তত নয়জন মারা যান এবং অনেকে নিখোঁজ হন। নেপাল-চীন সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সেতুও ভেসে যায়। পরে ওই বন্যার সঙ্গে তিব্বতের একটি হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদ থেকে পানি বেরিয়ে আসার সম্পর্ক পাওয়া যায়।
বিজ্ঞানীরা বৃহত্তর হিমালয় অঞ্চলের বিপজ্জনক হিমবাহের হ্রদ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন।
আইসিমড ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির গবেষণায় নেপাল, ভারত ও তিব্বতে ৩ হাজার ৬২৪টি হিমবাহের হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৭টিকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়; এর ২১টি নেপালে। তবে এবারের মতো নির্দিষ্ট একটি বরফ-পাথরের ধস কখন এবং কোথায় ঘটবে, তা আগাম নির্ভুলভাবে বলা সম্ভব হয়নি। তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, বরফ গলার ধরন বদলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতার পরিবর্তন ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।
সীমান্ত পেরিয়ে বিপদের বিস্তার: হিমালয়ের নদী কোনো দেশের সীমান্ত মানে না। উজানে পাহাড়ে সৃষ্ট পানি ও ধ্বংসাবশেষ নদীর গতিপথ ধরে নিচের দিকে নেমে আসে। এই দুর্যোগেও প্রথমে সীমান্তবর্তী এলাকায় আঘাত হেনে পরে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর প্রবাহ ধরে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বন্যার প্রভাব।
নদীর পানির সঙ্গে বিপুল কাদা, পাথর ও বরফ নেমে আসায় এটি শুধু পানিবন্যা ছিল না; এটি ছিল একটি শক্তিশালী ধ্বংসপ্রবাহ, যা পথে থাকা বাড়িঘর, সেতু, রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।
ভারত ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের সহায়তা: দুর্যোগের পর ভারত জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়ে নেপালের উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে। জাতিসংঘও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য সহায়তা সংগঠিত করছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসসহ বিভিন্ন মানবিক সংস্থাও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় দুর্গত এলাকাগুলোতে সহায়তা পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ নিয়ে কী বলছে এই দুর্যোগ: হিমালয়ের নদীগুলো দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তৃত নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাই উজানে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে তার প্রভাব নিয়ে নিচের দেশগুলোতেও প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এই দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে অবধারিতভাবে বড় বন্যা হবে—এমন কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার কারণ নেই। নদীর পানি, বৃষ্টিপাত, উজানের পরিস্থিতি এবং সরকারি পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাই যুক্তিসংগত।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান এবং চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের অংশ এবং এ জলপথ থেকে অর্জিত রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত না মানলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাহিনীটি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌ চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইরান ও ওমান কয়েক সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে আসছে। প্রায় এক মাসের আলোচনার পর উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ফল পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস- এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে বেশির ভাগ নৌচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দাম বেড়ে যায়। একই সময়ে তেহরান ও ওয়াশিংটন পৃথক অবরোধ আরোপ করে এই কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মোহেব্বি বলেন, হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের। আমরা প্রায় এক মাস ধরে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করেছি ও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ফলাফলে পৌঁছেছি। তিনি আরও বলেন, আলোচনায় প্রণালীর জলসীমায় প্রতিটি দেশের অংশ এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত রাজস্বে ইরান ও ওমানের অংশীদারত্ব নিয়েও সমঝোতা হয়েছে।
তবে এই সমঝোতা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রকে শর্ত মেনে চলতে হবে বলে স্পষ্ট করে দিয়েছে আইআরজিসি। ইরানি বাহিনীটির অভিযোগ, ইরান ও ওমানের মধ্যকার আলোচনায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার কারণে চূড়ান্ত সমঝোতা বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়েছে।
মোহেব্বি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাধা দেওয়া বন্ধ করে এবং চুক্তিতে ফিরে আসে, তাহলে অর্জিত সমঝোতার কাঠামোর মধ্যে আমরা হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে পারি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি আমাদের শর্ত না মানে, তাহলে কোনো অবস্থাতেই হরমুজ প্রণালী খোলা হবে না।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত অনেকটাই কমে এলেও শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে জাহাজে হামলা অব্যাহত থাকায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
রোববার ইরান ৪৫টি জাহাজের একটি কালো তালিকা প্রকাশ করে। উপসাগরীয় জ্বালানি উৎপাদকদের ব্যবহৃত জাহাজ-থেকে-জাহাজে পণ্য স্থানান্তরের কার্যক্রম ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানি অবরোধ এড়িয়ে জ্বালানি পরিবহনের জন্য এ ধরনের স্থানান্তর পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কালো তালিকাভুক্ত কিছু জাহাজের ব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা করছে কয়েকটি কোম্পানি।
এদিকে, ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়াতে চলতি সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র হুমকি দেয়, তেহরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে না বলেও জানানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত এই নতুন চাপের আওতায় ইরানের তেল রপ্তানিতে সহায়তার অভিযোগ থাকা চীনের কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার এই উদ্যোগকে ‘চরম আইনহীনতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরান আশাবাদ ব্যক্ত করেছে যে, অনেক দেশ ওয়াশিংটনের এই চাপ প্রয়োগের অভিযানে যোগ দেবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ২০০১ সালের ভয়াবহ ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী খালিদ শেখ মোহাম্মদের বিচার শুরুর চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করেছেন মার্কিন সামরিক আদালত। হামলার প্রায় আড়াই দশক (২৫ বছর) পর, আগামী ২০২৮ সালের জুন মাসে সামরিক আদালতে তার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে। খবর বিবিসি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বিমান বাহিনীর বিচারক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাইকেল এ শরামা গত বুধবার (২৬ আগস্ট) এক আদেশে নিশ্চিত করেছেন যে, খালিদ শেখ মোহাম্মদ এবং তার তিন সহ-অভিযুক্তের বিচার ২০২৮ সালের ৫ জুন থেকে শুরু হবে। প্রসিকিউটররা ২০২৭ সালে বিচার শুরুর আবেদন জানালেও সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন ও আইনি জটিলতা নিরসনে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন উল্লেখ করে বিচারক এই সিদ্ধান্ত দেন।
প্রতিবেদন বলছে, এর আগে খালিদ শেখ মোহাম্মদ প্রাণদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড এড়াতে দোষ স্বীকার করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের এক আপস প্রস্তাব বা ‘প্লিয়া ডিল’-এ সম্মত হয়েছিলেন। তবে সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিনের আপত্তির মুখে এবং গত গ্রীষ্মে একটি ফেডারেল আপিল আদালত সেই চুক্তি বাতিল করে দেওয়ায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েই বিচারে যেতে হচ্ছে তাকে।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা প্রকৌশলী খালিদ শেখ মোহাম্মদ নিজেই ইতোপূর্বে দাবি করেছিলেন যে, ২০০১ সালের ৯/১১ অপারেশনের ‘এ-টু-জেড’ পরিকল্পনা তার তৈরি, তিনিই ছিলেন এই হামলার মাস্টারমাইন্ড। তিনি বিমান ছিনতাই করে নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে বিমান হামলার মূল পরিকল্পনা আল-কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তিনি কিউবার গুয়ান্তানামো বে-র মার্কিন সামরিক কারাগারে বন্দি রয়েছেন।
জানা গেছে, খালিদ শেখের সাথে যৌথভাবে যে তিনজনের বিচার হবে তারা হলেন— ওয়ালিদ বিন আত্তাশ, আলী আব্দুল আজিজ আলী এবং মুস্তফা আল-হাউসাবি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই সিরিজ সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।
সামরিক কারাগার গুয়ান্তানামো বে চালুর প্রায় ২৪ বছর পর এখনো সেখানে ১৫ জন বন্দি রয়েছেন, যাদের মধ্যে খালিদ শেখ ও তার সহযোগীরা অন্যতম।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে কমিয়ে দেওয়া বা সরিয়ে নেওয়া মার্কিন কূটনীতিকদের আবার দূতাবাস ও কনস্যুলেটে পাঠানো শুরু করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। এই সিদ্ধান্ত থেকে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনই ইরানের সঙ্গে আবার বড় ধরনের যুদ্ধ বা তীব্র সামরিক সংঘাত শুরু হবে বলে মনে করছে না। চলতি বছরের শুরুর দিকে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিপুলসংখ্যক মার্কিন কূটনীতিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিদেশি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, ‘এই মুহূর্তে’ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো হামলা শুরু করবে না। এর পরিবর্তে ওয়াশিংটন ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর হুমকি দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনীতিকদের ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তাদের ও তাদের পরিবারের কয়েক মাসের অনিশ্চয়তারও অবসান হচ্ছে। এতদিন মার্কিন প্রশাসন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে আবার পূর্ণমাত্রায় জনবল নিয়োগ করবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ছিল।
অনেক মার্কিন কূটনীতিককে তাদের স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগে তাদের সামনে সন্তানদের কোথায় স্কুলে ভর্তি করানো হবে এবং পরিবার নিয়ে আবার মধ্যপ্রাচ্যে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
অপর মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যেসব দেশে মার্কিন দূতাবাসে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক কূটনীতিক ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইসরায়েল, লেবানন, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, ইরাক ও কুয়েত। প্রথম দফায় মার্কিন কূটনীতিকদের লেবাননে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ফেরত পাঠানো হবে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও লেবাননে মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত জনবল রাখা হবে। অন্যদিকে ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে জনবল সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত রাখা হবে। তবে নিরাপত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। এরই একটি লক্ষণ হলো, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যদের যাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে বিধিনিষেধ কার্যকর করবে। লেবানন ও ইরাকে কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের ভ্রমণের ওপর ইতোমধ্যেই বিধিনিষেধ রয়েছে।
ইরান ও ইসরায়েলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল। এর ফলে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে তুলনামূলক ছোট দেশ কুয়েত ও বাহরাইন ইরানের হামলায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের পর ট্রাম্প প্রশাসন পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করছে। পেন্টাগন বিশেষভাবে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে থাকা বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে চিন্তা করছে।
ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের দীর্ঘদিনের কৌশল নতুন করে পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে বলে এর আগেও খবর প্রকাশিত হয়েছিল। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই গত জুনে বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রাখার কৌশল নিয়ে ওয়াশিংটনে বড় ধরনের পুনর্মূল্যায়ন প্রত্যাশিত ছিল।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনীতিকদের ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন ওয়াশিংটনের সামরিক উত্তেজনা আপাতত কমার প্রত্যাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে কুয়েত, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা ও কূটনৈতিক উপস্থিতির নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ যে এখনও গভীর, সেটিও স্পষ্ট করছে।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর এক বছর পর সেই সংঘাত নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধ চলাকালীন ইসলামাবাদকে ‘খোলাখুলি সমর্থন’ সাহায্য করেছিল ইরান।
ইরানকে নিয়ে ইসহাক দারের এমন বিস্ফোরক মন্তব্যে বিশ্বজুড়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। তার দাবি, এ কারণেই গত বছর চার দিনের ‘যুদ্ধ’ থামতে না থামতেই ধন্যবাদ জানাতে তেহরান সফর করেন তিনি। অন্যদিকে, এ ব্যাপারে ইরান ‘মুখ বন্ধ’ করে থাকায় দানা বেঁধেছে সন্দেহ।
পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলো বলছে, দেশটির পার্লামেন্টে একটি লিখিত প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ইরান প্রসঙ্গ টানেন ইসহাক দার। তিনি বলেন, ‘২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ব্যাপক ভাবে ইসলামাবাদকে সাহায্য করে তেহরান।’ যদিও সেটা সামরিক, গোয়েন্দা তথ্য না অন্য কোনো ধরনের সহযোগিতা, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের ‘যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়ে ইরান। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফের তেহরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানে নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদি সেনারা।
তারপর থেকে গত ছয় মাসে ইরানে লাগাতার বোমাবর্ষণ করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। ইসহাক দার জানিয়েছেন, এই যুদ্ধে তাই তেহরানের পাশে দাঁড়াতে দেরি করেনি পাকিস্তান। ফলে বেশ মজবুত হয়েছে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক।
পাক উপপ্রধানমন্ত্রী তথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের এই দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার নয়। কারণ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ চলাকালীন প্রকাশ্যে আসে বেশ কিছু উপগ্রহচিত্র। সেগুলো থেকে জানা যায়, মার্কিন আক্রমণ চলাকালীন ইসলামাবাদের ঘাঁটিতে বেশ কিছু সামরিক বিমান লুকিয়ে ফেলে ইরান। এর জেরে লড়াকু জেট ধ্বংসের ঝুঁকি এড়াতে সক্ষম হয় তেহরান।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ব্যাপারে আংশিক সত্য বলছেন ইসহাক দার। কারণ, গত বছরের এপ্রিলে জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট জঙ্গি হামলায় পর্যটকসহ ২৬ জন নিরীহ নাগরিকের মৃত্যু হলে ইসলামাবাদ সফর করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সেখান থেকে তড়িঘড়ি নয়াদিল্লি ছুটে আসেন তিনি। বৈঠক করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে।
নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদ, দুই জায়গাতেই একই সুরে বাঁধা ছিল আরাঘচির বক্তব্যে। সন্ত্রাসবাদের কড়া সমালোচনা করেন তিনি। পাশাপাশি, সামরিক সংঘাতে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা মেটানোর পরামর্শ দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। মে মাসে পহেলগাঁও হামলার বদলা নিতে পাকিস্তান এবং পাকিস্তানের জম্মু-কাশ্মীরের (পিওজেকে) নয়টি জঙ্গি ক্যাম্প ধ্বংস করে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
সেই অভিযানের সাংকেতিক নাম ‘অপারেশন সিঁদুর’ রাখে দিল্লি। জঙ্গি ক্যাম্পে হামলা হতেই পাল্টা প্রত্যাঘাতের চেষ্টা করে ইসলামাবাদ। লড়াকু জেট, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে হামলা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। সেগুলোকে মাঝ-আকাশে ধ্বংস করে পাকিস্তানের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটি উড়িয়ে দেয় ভারত। এর জন্য রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে এ দেশের বাহিনী।
ভারত রুদ্রমূর্তি ধরতেই সংঘর্ষবিরতির অনুরোধ জানায় পাকিস্তান সেনা। দিল্লি তাতে সাড়া দিলে বন্ধ হয় ‘যুদ্ধ’। লড়াই থামতেই ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়ানো শুরু করে ইসলামাবাদ। এর মধ্যে অন্যতম হল রাওয়ালপিন্ডির প্রত্যাঘাতে তিনটি রাফালসহ মোট ছয়টি যুদ্ধ বিমান হারিয়েছে ভারত। যদিও সেই মিথ্যা ধরা পড়তে বেশি সময় লাগেনি।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা স্থাপনা এবং নজরদারি যন্ত্রপাতির ওপর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নজিরবিহীন ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এই বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারজন সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হামলায় সিআইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহৃত ভবন, রাডার ব্যবস্থা এবং তথ্য সংগ্রহের যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞের এই ব্যাপকতাকে মার্কিন গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের ইতিহাসে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর যৌথভাবে ব্যবহৃত বেশ কিছু স্থাপনা ও সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুনর্গঠনে এবং অকেজো হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনে মার্কিন কংগ্রেস জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ জরুরি তহবিল বরাদ্দ করেছে।
মার্কিন ও উপসাগরীয় কর্মকর্তাদের মতে, সংঘাতের সময় আক্রান্ত গোয়েন্দা স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে রিয়াদের একটি সিআইএ স্টেশন, পূর্ব ইরাকের একটি কেন্দ্র এবং পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থা। সংঘাতের শুরুর দিকে ইরানের হামলাগুলো ছিল সুপরিকল্পিত। তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা রাডার নেটওয়ার্কগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে।
স্যাটেলাইট চিত্র এবং দৃশ্যমান তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, জর্ডানে অবস্থিত একটি ‘এএন/টিপিওয়াই-২’ রাডার সিস্টেম এবং কাতারের একটি ‘এএন/এফপিএস-১২ ফেজড-অ্যারে’ রাডারসহ বেশ কিছু উন্নত প্রযুক্তি ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনাও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে।
এই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা নিজেদের কৌশলগত সম্পদগুলো রক্ষা করার সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা মহলে জরুরি প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র মজুতেও বড় চাপ পড়েছে।
জুলাইয়ে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় ৬৫ শতাংশ ব্যবহার করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও অন্তত ৩৮ শতাংশ কমেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও গোয়েন্দা স্থাপনায় হামলা চালায় ইরান।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত জুনের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করলেও তা বাস্তবায়ন থমকে আছে। চুক্তির বিভিন্ন শর্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌচলাচল নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ এখনো চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু করার নতুন পরিকল্পনা চালু করার পর ওয়াশিংটন ও বিশ্বকে বড় ধরনের মূল্য দিতে বাধ্য করার হুমকি দিয়েছে তেহরান। ইসলামী প্রজাতন্ত্রটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের জবাব তারা শুধু নিজেদের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না; প্রয়োজনে এর প্রতিক্রিয়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব পরিকল্পনার বিপরীতে ‘ভূমিকম্পের’ মতো বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে।
এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র এবার ইরানের তৈরি সেই জটিল নেটওয়ার্ককে নিশানা করবে, যার মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে দেশটি ওয়াশিংটনের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য ও আর্থিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ছয় মাসের যুদ্ধ এখন কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। কূটনৈতিক সমাধানের কোনো পথ এখনো স্পষ্ট হয়নি। এমন পরিস্থিতিতেই ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ওয়াশিংটন।
বেসেন্ট ঘোষিত ব্যাপক গৌণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদেরও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে, ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি ও জাহাজ চলাচলসহ যেসব খাত ইরান তার অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবহার করে, সেগুলোকে লক্ষ্য করা হচ্ছে।
তবে ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ বা অর্থনৈতিক যুদ্ধের ঘোষণার পর অনেকেই হতাশ হয়েছেন। কারণ, ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে মূলত বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার পরিধি ও প্রয়োগ আরও কঠোর করার পথ বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না, তাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির কাছে নতি স্বীকারের বদলে ইরান পাল্টা আঘাতের সক্ষমতার কথাই জোর দিয়ে বলছে। তেহরান আঞ্চলিক তেল উৎপাদক দেশ, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এমনকি, নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দিচ্ছে।
সাংবাদিকদের ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘আমরা অনেক দিন ধরেই দাবা খেলছি। পাশাপাশি আমরা পোকার খেলাও শিখেছি। আর কিছুদিন ধরে আমরা দুটির সমন্বয়েই খেলছি।’
বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাণিজ্যিকভাবে নির্ভরশীল হয়েও পাল্টা লড়াইয়ের কৌশল নিচ্ছে কানাডা। শুল্ক যুদ্ধের জবাবে ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য ও ইলেকট্রনিক্সসহ বেশ কিছু মার্কিন পণ্যে ‘ডলারের বিনিময়ে ডলার’ হিসেবে পাল্টা শুল্ক আরোপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে কার্নি সরকার। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৪৫টির প্রধান তিনটি ক্রেতার তালিকায় থাকা কানাডা এখন সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ খুঁজছে।
বাণিজ্য লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে কানাডার সবচেয়ে বড় কার্ড হতে পারে তাদের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সিংহভাগ এবং অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৬০ শতাংশই যায় কানাডা থেকে। কার্নির মতে, আমেরিকা কখনোই চাইবে না যে কানাডা এই জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিক।
যদিও জ্বালানি খাতকে এখনো সরাসরি পাল্টা শুল্কের তালিকায় রাখা হয়নি, তবে কানাডার প্রাদেশিক নেতারা এই পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড (ডাগ ফোর্ড হলেন কানাডার অন্টারিও প্রদেশের সরকারপ্রধান) এই ইস্যুতে বেশ আক্রমণাত্মক। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ সারচার্জ বসানোর প্রস্তাব এনেছিলেন। এটি বাস্তবায়ন হলে এর প্রভাব পড়ত আমেরিকার মিশিগান, মিনেসোটা ও নিউইয়র্কের প্রায় ১৫ লাখ বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে।
ডাগ ফোর্ড জানিয়েছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তেল ছাড়া গাড়ি চালাক আর পটাশ ছাড়া কিভাবে শাকসবজি উৎপাদন করে—আমরা তা দেখতে চাই। আমাদের অবমূল্যায়ন করাই তার সবচেয়ে বড় ভুল।’
বিশ্বজুড়ে সারের মূল উপাদান ‘পটাশ’ সরবরাহে কানাডা শীর্ষে রয়েছে। পাশাপাশি, ইলেকট্রিক গাড়ি ও আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অত্যাবশ্যকীয় লিথিয়াম, নিকেল ও গ্রাফাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় মজুত রয়েছে দেশটিতে। আর এই খনিজ পণ্যের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র।
ফলে জ্বালানি ও খনিজ খাতে কড়াকড়ি আরোপ করলে মার্কিন শিল্প ও কৃষি খাত যে বড় ধরনের সংকটে পড়বে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক চাপ বাড়াতে কানাডার ১৩টি প্রদেশের মধ্যে ১১টিই সরকারি মদের দোকান থেকে মার্কিন মদ ও স্পিরিট বিক্রি বন্ধ করে দেয়। এতে আমেরিকান ওয়াইন শিল্প বড় ধাক্কা খায়, যাকে ওয়াইন ইনস্টিটিউট ‘কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় মার্কিন ওয়াইন রপ্তানি ৭৮ শতাংশ এবং আমেরিকান স্পিরিট রপ্তানি ৭০ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যার ফলে মার্কিন পানীয় শিল্পের ক্ষতি হয়েছে ৩৫৭ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৪৯৪ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার) বেশি।
এমনকি কানাডার সাধারণ নাগরিকরা নিজ উদ্যোগেই যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ এড়িয়ে চলছেন। জাতীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসেই প্রায় ৮ লাখ কম কানাডীয় যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করেছেন। কানাডীয়দের এই ভ্রমণ বয়কটের কারণে মার্কিন পর্যটন খাত গত এক বছরে প্রায় ২.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (৩.৩ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার) রাজস্ব হারিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু মার্কিন শহর ও অঙ্গরাজ্য কানাডীয় পর্যটকদের ফেরাতে বিশেষ ছাড় ও বিজ্ঞাপন প্রচার করতে বাধ্য হচ্ছে।
বাণিজ্য লড়াই দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে সময় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে কানাডা। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫০ শতাংশ মার্কিন শুল্কের কারণে কানাডার জিডিপি স্বল্পমেয়াদে ০.৩শতাংশ থেকে ০.৬শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তা সত্ত্বেও, দেশের সিংহভাগ মানুষ অটোয়ার শক্ত অবস্থানকে সমর্থন করছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৬ শতাংশ কানাডীয় নিজেদের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকা সত্ত্বেও সরকারের এই শক্ত দর-কষাকষির নীতিকে সমর্থন জানাচ্ছেন।
অন্যদিকে, এই বাণিজ্য যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ইয়েল বাজেট ল্যাবের হিসাব অনুযায়ী, এই শুল্কের কারণে প্রতিটি আমেরিকান পরিবারকে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১,১ ১০০ ডলার খরচ করতে হবে। পাশাপাশি অটোয়া মনে করিয়ে দিয়েছে যে, কানাডা ইইউর চেয়েও বেশি আমেরিকান গাড়ি কেনে, ফলে শুল্ক বাড়লে আমেরিকার মিশিগান, ওহাইও, কেন্টাকি ও আলাবামার গাড়ি নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
নেপালে থাকা বাংলাদেশি পর্যটকেরা নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছে কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস। দেশটিতে এই আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন দেড় হাজারের বেশি মানুষ, যাদের মধ্যে ৮০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক।
দূতাবাস জানিয়েছে, রাজধানী কাঠমান্ডু, পোখারা ও নাগরকোটসহ প্রধান পর্যটনকেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
নেপালে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের পরিস্থিতি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর শোয়েব আব্দুল্লাহ।
তিনি জানান, বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা মূলত কৈলাস ও মানস সরোবর যাওয়ার পথে ঘটেছে। সাধারণত বাংলাদেশি পর্যটকেরা ওই পথে যান না।
শোয়েব আব্দুল্লাহ বলেন, ‘নেপালের কর্তৃপক্ষ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, হতাহতদের মধ্যে কোনো বাংলাদেশি নেই। যে জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে সাধারণত বাংলাদেশি পর্যটকেরা যান না।’
তবে দুর্যোগের কারণে পোখারা থেকে কাঠমান্ডু আসার পথে কয়েকজন বাংলাদেশি পর্যটক সাময়িকভাবে আটকা পড়েছিলেন বলে জানান তিনি।
কাউন্সেলর বলেন, ‘পোখারা থেকে কাঠমান্ডু আসার পথে কয়েকজন বাংলাদেশি পর্যটক দূতাবাসে ফোন করেছিলেন। মহাসড়ক বন্ধ থাকায় তারা প্রায় ছয়-সাত ঘণ্টা আটকা পড়েছিলেন। সেখানে বাংলাদেশিসহ কয়েক হাজার যাত্রী আটকে ছিলেন। পরে সড়ক খুলে দেওয়া হলে আজ সকালে তারা নিরাপদে কাঠমান্ডু পৌঁছেছেন।’
আকস্মিক বন্যায় বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে ওই রাস্তাটি বন্ধ রাখা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
ঘটনাটি ঘটেছে ত্রিশূলী নদীর উজানে। শোয়েব আব্দুল্লাহ বলেন, ওই এলাকা থেকে নেমে আসা বিপুল পানি প্রায় ৪০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ে। নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, এতে ওই এলাকার একটি মহাসড়ক অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে কাঠমান্ডু-পোখারা মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ত্রিশূলী নদী পোখারা-কাঠমান্ডু মহাসড়কের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। উজান থেকে বিপুল পানি ধেয়ে আসায় এবং বিহারেও সতর্কতা জারি হওয়ায় সবার মধ্যে একধরনের আতঙ্ক ছিল। নদীর পানি বেড়ে মহাসড়কের ক্ষতি হতে পারে—এমন আশঙ্কায় গতকাল সাময়িকভাবে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। এখন সড়কটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত।’
নেপালে ঘুরতে যাওয়া বাংলাদেশিদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে জানান কাউন্সেলর। তিনি বলেন, ‘এখন কাঠমান্ডুতে সবকিছু স্বাভাবিক। পোখারা থেকে কাঠমান্ডু যাতায়াতে যে বিঘ্ন ঘটেছিল, তা পুরোপুরি কেটে গেছে। বাংলাদেশিরা যেভাবে যাতায়াত করছেন, তা একদম স্বাভাবিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাঠমান্ডু, পোখারা ও নাগরকোটের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের পূর্বনির্ধারিত ভ্রমণসূচি পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই।’
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দূতাবাস কোনো ট্রাভেল অ্যালার্ট বা ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেনি। এ বিষয়ে শোয়েব আব্দুল্লাহ বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, কোনো দেশই এখনো ট্রাভেল অ্যালার্ট জারি করেনি।’
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৯৫ জনে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে দেশটির পর্যটন মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) ভোরে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উত্তরাঞ্চলীয় রাসুয়া জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানির প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে মাত্রাতিরিক্ত তুষার গলে যাওয়ার ফলেই নদীর অববাহিকায় এই আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে।
নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পানির তীব্র স্রোতে নদীর আশপাশের একাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে ভেসে গেছে এবং সড়কযোগাযোগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে পড়েছে। উপদ্রুত এলাকাগুলোতে নিখোঁজদের সন্ধানে ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটির উদ্ধারকারী দল ও সশস্ত্র বাহিনী।
নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬ জনে দাঁড়িয়েছে। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে হঠাৎ নেমে আসা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে গ্রাম ও একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প এলাকা প্লাবিত হওয়ায় এখনও কয়েক শ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। খবর এপি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে তিব্বতের দিক থেকে আসা পানির প্রবল স্রোতে হঠাৎ ভোতে কোশি নদীর পানির উচ্চতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। মুহূর্তের মধ্যে এই পানি রাসুয়া জেলার তিমুরে এবং নিকটবর্তী স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
নেপাল সেনাবাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, পানির তোড়ে অসংখ্য যানবাহন, ঘরবাড়ি ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ ভেসে গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত দ্রুতার সাথে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে নেপাল সেনাবাহিনীর ১৪টি হেলিকপ্টার এবং দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর বিশেষ দল সার্বক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত ৩১ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আকস্মিক বন্যার পর ৩৮৪ জন পর্যটকের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে ভারতীয়, নেপালি, ব্রিটিশ ও মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, ১২ জন ব্রিটিশ এবং ৩ জন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। এ তথ্য জানিয়েছে নেপালের পর্যটন বোর্ড।
বন্যা ও ভূমিধসের সূত্রপাত কীভাবে, তা নিয়ে প্রাথমিকভাবে বেশ কিছু তথ্য সামনে এসেছে। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের চীনা অংশে ধারণ করা নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, পাথর, কাদা ও পানির বিশাল স্রোত ধেয়ে আসার কয়েক মুহূর্ত আগে বহু মানুষ প্রাণভয়ে পালানোর চেষ্টা করছেন। পরে ওই প্রবল স্রোত বিভিন্ন ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
তবে এই ভয়াবহ কাদাধসের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস (GFZ) জানিয়েছে, নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে থাকা টাইমস্ট্যাম্পের সময়ের প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।
এদিকে কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিষয়ক প্রধান কিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, নেপালের লেন্দে খোলা নদীতে বরফ ও পাথরের ধস থেকেই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। তবে এর মূল কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায়নি।
মিত্র রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে আলাপকালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন যে, তেহরানের বিরুদ্ধে এই মুহূর্তে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরাসরি যুদ্ধের বদলে এখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামুদ্রিক চাপ জোরালো করার দিকে বিশেষ নজর দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিক কিছু ফোনালাপে রুবিও মিত্র দেশগুলোকে বর্তমান মার্কিন কৌশল সম্পর্কে অবহিত করেছেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে জানান, “আপাতত নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা নেই।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার পাশাপাশি নৌ-অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখার পথ বেছে নিয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ঘোষিত নতুন নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচিও এই কৌশলেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য হলো ইরানের উৎপাদিত জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বের করে বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করা। মার্কিন এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, “রুবিও স্পষ্ট করেছেন যে ওয়াশিংটন এখন বড় ধরনের সামরিক অভিযানে ফেরার পরিকল্পনা করছে না।” তবে ইরান যদি আগে হামলা চালায়, তবে সেক্ষেত্রে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করেননি।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনীর মাইন অপসারণ কার্যক্রমকে ওয়াশিংটন চলমান উত্তেজনার মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে দাবি করছে। তবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। মঙ্গলবার তিনি সাফ জানান, “মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির মাইন সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করেছে বা সেখানে মাইন অপসারণকারী জাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে; এমন কোনো খবর সত্য নয়।” তিনি উল্টো প্রশ্ন তুলে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি দাবি করে যে মাইনগুলো পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তাহলে তারা নিজেরা কেন একটি মার্কিন জাহাজ দিয়ে প্রণালিটি অতিক্রম করছে না?”
ইরানি এই কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, “মাইনগুলোর অবস্থান সম্পর্কে ইরান ছাড়া আর কেউ জানে না।” তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও বলেন, “মার্কিন মাইন অপসারণকারী জাহাজগুলো যদি এই অঞ্চলে প্রবেশ করে, তাহলে তারা আমাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।” এছাড়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাইন অপসারণ সংক্রান্ত বক্তব্যকে কেবল আন্তর্জাতিক বাজারকে শান্ত রাখার কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ নীতি ইরানের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও কঠোরভাবে প্রয়োগ হতে পারে। অ্যাক্সিওস-এর সূত্রমতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত এই চাপ প্রয়োগের কৌশল অব্যাহত থাকতে পারে এবং পরবর্তীতে পরিস্থিতির নিরিখে সামরিক অভিযানের বিষয়টি পুনরায় বিবেচনায় আসতে পারে।
তিব্বত সীমান্ত থেকে ধেয়ে আসা আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে নেপালের নুয়াকোট ও ধাদিং জেলা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। আকস্মিক এই বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই দুর্যোগে ২৯১ জন বিদেশিসহ কয়েক শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। বন্যার প্রবল তোড়ে বেশ কিছু গ্রাম প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি ওই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে।
নেপালি গণমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে এনডিটিভি জানিয়েছে, বুধবার ভোরে সীমান্তের তিব্বত অংশ থেকে নেমে আসা পানির প্রবল স্রোতে ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। নেপাল পুলিশের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র উপ-মহাপরিদর্শক অবি নারায়ণ কাফলের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলা থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত আটটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এলাকাগুলো থেকে ২৯১ জন বিদেশি ও ৯৩ জন নেপালি নাগরিকসহ অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয় নাগরিক থাকলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি সেখানে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এছাড়া রাসুয়া জেলায় দায়িত্ব পালনরত নেপাল পুলিশের অন্তত ২৬ জন সদস্য এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর আরও সাতজন সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে।