সিরিয়ায় অবশেষে আসাদ পরিবারের শাসনের অবসান হয়েছে। ২০০০ সালের জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন বাশার আল-আসাদ। একই সময়ে তিনি বাথ পার্টির নেতা ও সামরিক বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বও নেন। তবে তার শাসনের এক দশক পর অর্থাৎ ২০১১ সালে সিরিয়ার জনগণ গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনে মাঠে নামলে তিনি কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেন।
২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধকে ঘিরে বাশার আল-আসাদের সঙ্গে পশ্চিমাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। তিনি ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছিলেন। সম্ভবত তার আশঙ্কা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর পরবর্তী টার্গেট সিরিয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র সে সময় ইরাকে তাদের বিরোধীদের কাছে অস্ত্র চোরাচালানে সহায়তার জন্য দামেস্ককে দায়ী করছিল। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর ২০০৫ সালে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি বৈরুতে বিস্ফোরণে নিহত হলে এ ঘটনার জন্য অনেকে সিরিয়া ও তার সহযোগীদেরই দায়ী করে।
ফলে লেবাননের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ হয় ও দামেস্কের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে লেবাননে থাকা সিরিয়ার ৩০ বছরের সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করতে হয়। তবে আসাদ এবং হিজবুল্লাহ ওই হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। যদিও পরে বিচারে বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে হিজবুল্লাহর কয়েকজন সদস্যকে শাস্তি দেওয়া হয়।
আরব বসন্ত
বাশার আল-আসাদের শাসনের প্রথম দশকে ইরান, কাতার এবং তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হয়। সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। যদিও শুরুতে রিয়াদ তরুণ প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল।
মূলত পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাশার তার বাবাকে অনুসরণ করেছেন। কিন্তু শাসন শুরুর এক দশক পর কর্তৃত্ববাদের দিকে হাঁটতে শুরু করেন তিনি। শুরু হয় বিরোধীদের ওপর দমন পীড়ন। সিরিয়ায় শাসক হিসেবে আসাদ পরিবারের আধিপত্য স্থায়ী হয়েছে টানা পাঁচ দশকেরও বেশি।
২০১০ সালে আসাদের স্ত্রী ভোগ ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তার দেশে গণতন্ত্র বিরাজ করছে। ওই একই সময়ে তিউনিশিয়ায় একজন সবজি বিক্রেতা পুলিশের চড় খেয়ে ক্ষোভে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়। সেটাই পরে আরব বসন্তে রূপ নেয় ও একপর্যায়ে বিদায় নিতে বাধ্য হন তিউনিশিয়ার তখনকার প্রেসিডেন্ট বেন আলি।
এটাই তখন পুরো আরব অঞ্চলে বিশেষ করে মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন এবং সিরিয়ায় বিপ্লবী আন্দোলনগুলোকে উৎসাহী করে তোলে। একপর্যায়ে ২০১১ সালের মার্চে দামেস্কে বিক্ষোভ দেখা যায় এবং পরে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দারারাতে দেয়ালে আসাদবিরোধী স্লোগান লেখার দায়ে শিশুদের আটক করা হলে সেখানেও আন্দোলন শুরু হয়।
দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করে আসাদ পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে সিরিয়াকে টার্গেট করে ‘ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে বলে একে মোকাবিলার কথা বলেছিলেন। তবে অনেক মানুষের যে মৌলিক চাহিদা পূরণ হচ্ছে না তাও স্বীকার করেন তিনি। এরপর নিরাপত্তা বাহিনী দারারাতে শক্তি প্রয়োগ করলে বিক্ষোভ আরও জোরদার হয়। অনেক শহরে আসাদের পদত্যাগের দাবি ওঠে। কর্তৃপক্ষ সহিংস পন্থায় তা দমনের চেষ্টা করে।
আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ
সংঘাত বেড়ে যাওয়ার পর জাতিসংঘ জানায়, লাখ লাখ মানুষ হতাহত হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোও এতে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে। আন্দোলন বাড়তে থাকলে আসাদ তার বিরোধীদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করেন এবং দমননীতি জোরদার করেন। এর ফলে দেশটি গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। এই যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ নিহত হন। আসাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক জনগণের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
যুদ্ধ চলাকালীন সরকার-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নির্বাচন আয়োজন করেন বাশার আল-আসাদ। তবে এই নির্বাচন অনেকের কাছে অগণতান্ত্রিক বলে বিবেচিত হয়েছে। যদিও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার আল-আসাদ কখনোই বিজয় নিশ্চিত করতে পারেননি, কিন্তু তারপরও তিনি তার সমর্থকদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু আলাওয়াইট সম্প্রদায়ের ওপর নির্ভর করে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন।
রাশিয়া, ইরান এবং ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও আসাদ বাহিনীকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে তুরস্কসহ কিছু উপসাগরীয় দেশ সশস্ত্রবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেয়। শুরুতে আসাদবিরোধীরা গণতন্ত্র ও মুক্তির কথা বললেও দ্রুতই সাম্প্রদায়িকতার বিষয়টিও উঠে আসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিদের বদলে আসাদ নিজের অ্যালাউইটস গোত্রের লোকজনকে সুবিধা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সূত্র ধরে অ্যালাউইটসদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় ইসলামপন্থি কিছু গ্রুপ। আবার ইরান সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা আসাদ সরকারকে সমর্থন দেয়।
প্রতিবেশী ইরাকে ইসলামিক স্টেট বা আইএসের উত্থান ঘটলে তারা সিরিয়ার কিছু জায়গাও দখল করে নেয়। সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর রাক্কাকে রাজধানী ঘোষণা করা হয়।
২০১৩ সালে দামেস্কের কাছে বিরোধী অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলীয় ঘৌতায় রাসায়নিক হামলা হলে শত শত মানুষ মারা যায়। পশ্চিমারা এবং সিরিয়ার বিরোধীগোষ্ঠীগুলো এই হামলার জন্য আসাদ সরকারকে দায়ী করে। তবে দামেস্ক এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। পরে আন্তর্জাতিক চাপে তারা রাসায়নিক অস্ত্রের মজুত ধ্বংস করতে রাজী হয়।
কিন্তু তাতে করে সিরিয়া যুদ্ধের নৃশংসতা কমেনি। আরও রাসায়নিক হামলা হয়েছে পরবর্তীতে। জাতিসংঘের একটি কমিশন সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের বিরুদ্ধেই হত্যা, নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনেছে।
২০১৫ সালে প্রায় পতনের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় আসাদ সরকার। দেশের বড় অংশের ওপরই তখন বাশার আল-আসাদে কর্তৃত্ব ছিল না। তবে পরে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো আবার পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন বাশার আল-আসাদ।
গৃহযুদ্ধের অবসান
২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক সমঝোতার আলোকে সরকারি বাহিনী সিরিয়ার বেশির ভাগ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। যদিও ইসলামপন্থি বিরোধী গ্রুপগুলো এবং কুর্দি মিলিশিয়ারা দেশটির উত্তর এবং উত্তরপূর্ব এলাকায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছিল।
ওই সমঝোতা আসাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে এবং তিনি আরব কূটনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসেন। ২০২৩ সালে আরব লীগের সদস্যপদ ফিরে পায় সিরিয়া। বেশ কিছু আরব দেশ আবার দামেস্কে দূতাবাস চালু করে। নিজের শাসনের তৃতীয় দশকে দেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও মনে হচ্ছিল যে প্রেসিডেন্ট তার বড় চ্যালেঞ্জগুলো উতরে গেছেন।
তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাস ইসরায়েলে হামলা করলে গাজা যুদ্ধের সূচনা হয় যা লেবাননেও ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে আসাদের সহযোগী হিজবুল্লাহর ওপর। হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহও নিহত হন। লেবাননে যেদিন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় সেদিনই বিস্ময়করভাবে হামলা করে দ্রুত আলেপ্পো দখল করে নেয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) নেতৃত্বাধীন বিরোধী গোষ্ঠী।
তারা দ্রুত গতিতে এগিয়ে হামা ও অন্যান্য শহরগুলো দখল করে নেয়। দক্ষিণাঞ্চলে তখনো সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ছিল। কিন্তু আসাদের অবস্থান দ্রুতই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। কারণ গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ইরান ও রাশিয়া তার সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীরা দামেস্কে ঢুকে পড়ে এবং বিদ্রোহীদের সশস্ত্র অভিযানের মুখে বাশার আল-আসাদ ব্যক্তিগত বিমানে করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
পাকিস্তান যদি অনতিবিলম্বে তাদের মাটিতে সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় দেওয়া এবং ভারতের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন অপতৎপরতা চালানো বন্ধ না করে, তবে তারা ভবিষ্যতে বিশ্বের মানচিত্রে থাকবে নাকি ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে তা তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শনিবার (১৬ মে) নয়াদিল্লির মানেকশ সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রতি এমনই নজিরবিহীন ও কঠোর সামরিক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী।
‘ইউনিফর্ম আনভেইল্ড’ নামক একটি প্ল্যাটফর্মের উদ্যোগে আয়োজিত ‘সেনা সংবাদ’ শীর্ষক এক ইন্টারেক্টিভ অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় তিনি ইসলামাবাদের উদ্দেশে এই কড়া বার্তা দেন। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে দেওয়া তার এই সংক্ষিপ্ত অথচ তীক্ষ্ণ মন্তব্য দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
অনুষ্ঠানে ভারতীয় সেনাপ্রধানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, গত বছর সংঘটিত ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর মতো পরিস্থিতি যদি সীমান্তে আবার তৈরি হয়, তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী তার কেমন জবাব দেবে। এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে গিয়ে জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী তার পূর্ববর্তী বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আপনারা যদি আগে আমার বক্তব্য শুনে থাকেন, তবে জানেন আমি কী বলেছিলাম... পাকিস্তান যদি ক্রমাগত সন্ত্রাসবাদীদের লালন-পালন করতে থাকে এবং ভারতের ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যায়, তবে তাদেরই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা নিজেদের ভূগোলের অংশ হিসেবে টিকিয়ে রাখবে নাকি ইতিহাসের পাতায় বিলীন করে দেবে।’
ভারতীয় সেনাপ্রধানের এই বিস্ফোরক মন্তব্যটি এমন একটি সময়ে এল, যার মাত্র কয়েক দিন আগেই দেশটির সরকার ও সশস্ত্র বাহিনী অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর প্রথম বার্ষিকী পালন করেছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের মে মাসের শুরুতে কাশ্মীরের পাহালগামে একটি ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা চালায় পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিরা। সেই কাপুরুষোচিত হামলার প্রতিশোধ নিতে এবং সন্ত্রাসবাদের সমূলে উৎপাটন করতে গত বছরের ৭ মে ভোরে ভারতীয় সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড এবং পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মিরে (পিওকে) অবস্থিত একাধিক সন্ত্রাসী আস্তানা ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে একযোগে নিখুঁত বিমান ও সামরিক হামলা বা প্রিসিশন স্ট্রাইক চালায়, যা সামরিক ইতিহাসে ‘অপারেশন সিন্দুর’ নামে পরিচিত।
ভারতের সেই আকস্মিক হামলার পর পাকিস্তানও পাল্টা সামরিক আক্রমণ চালানোর চেষ্টা করেছিল এবং তার জবাবে ভারতের পরবর্তী সমস্ত কাউন্টার-অফেনসিভ বা প্রতিরোধমূলক সামরিক অভিযানগুলোও এই অপারেশন সিন্দুরের অধীনেই পরিচালিত হয়েছিল। দুই দেশের এই ভয়াবহ সামরিক সংঘাত ও আকাশ যুদ্ধ টানা ৮৮ ঘণ্টা ধরে চলেছিল, যা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করে।
পরবর্তীতে দুই দেশের শীর্ষ কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে তীব্র আলোচনার পর ১০ মে সন্ধ্যায় একটি গোপন ও পারস্পরিক যুদ্ধবিরতি সমঝোতায় পৌঁছালে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তবে প্রথম বার্ষিকীতে ভারতীয় সেনাপ্রধানের এই নতুন হুমকি প্রমাণ করে, দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা এখনো বিন্দুমাত্র কমেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঐতিহাসিক চীন সফর শেষ হওয়ার মাত্র এক দিনের ব্যবধানে এবার বেইজিং সফরে যাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ১৯ ও ২০ মে তিনি চীনে অবস্থান করবেন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হবেন। বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো মস্কো ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সার্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও সুদৃঢ় করা। এই সফরে দুই দেশের শীর্ষ নেতারা বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবেন।
রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ট্যাস জানিয়েছে, এই সফরের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে বিশেষ একটি উপলক্ষকে কেন্দ্র করে। ২০০১ সালে রাশিয়া ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি’-এর ২৫ বছর পূর্তি উদযাপনের অংশ হিসেবে পুতিন এই সফরে যাচ্ছেন। ঐতিহাসিক এই চুক্তিটি গত আড়াই দশকে দুই দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। পুতিনের এই সফরের মাধ্যমে সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সফরের ঠিক পরপরই পুতিনের বেইজিং যাত্রা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ অর্থ বহন করে। সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকে বাণিজ্য নিয়ে কিছু ইতিবাচক আলোচনা হলেও তাইওয়ান ও ইরান ইস্যুর মতো বড় বিরোধগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। ঠিক এমন একটি সময়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে বেইজিংয়ে স্বাগত জানানো ইঙ্গিত দেয় যে, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও রাশিয়া ও চীনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ক্রমাগত বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে চীন এখন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত অংশীদার হয়ে উঠেছে।
রাশিয়া ও চীনের মধ্যে বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট না থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে ২০২২ সাল থেকে বৈশ্বিক পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মস্কো ও বেইজিং এখন একে অপরের ওপর আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল। জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি এবং উন্নত প্রযুক্তির আদান-প্রদান দুই দেশের অর্থনীতিকে একীভূত করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। পুতিনের এই সফর সেই বন্ধনকেই বিশ্ব দরবারে নতুন করে তুলে ধরবে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের পর পুতিনের এই চীন সফর বিশ্ব রাজনীতির তিন প্রধান শক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বেইজিংয়ের এই ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ভবিষ্যতে নতুন কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে। পুতিন ও শি জিনপিংয়ের এই বৈঠক থেকে আসা সিদ্ধান্তগুলো কেবল এশিয়ায় নয়, বরং ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। ফলে পুরো বিশ্বের দৃষ্টি এখন ১৯ মে শুরু হতে যাওয়া পুতিনের এই বেইজিং সফরের দিকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা আরও ৪৫ দিন বাড়ানোর ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছে দুই পক্ষ। গত ১৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধবিরতির প্রথম দফার মেয়াদ আগামী ১৭ মে, রবিবার শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর শুক্রবার এই মেয়াদ বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।
মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র টমি পিগট এক এক্স বার্তায় বলেছেন, ‘আরও অগ্রগতির লক্ষ্যে গত ১৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি আরও ৪৫ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে।’ দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশকের পুরনো সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে আয়োজিত এই আলোচনা ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
এদিকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে লেবানন সরকার। লেবাননের প্রতিনিধিদল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘যুদ্ধবিরতির এই মেয়াদ বৃদ্ধি তাদের নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা স্থায়ী স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করবে।’ উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থল অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার চালানো ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত ও আরও ৪৫ জন আহত হয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার হামলায় এ ঘটনা ঘটে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির। ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা সংস্থা শুক্রবার (১৫ মে) জানায়, মস্কোর অব্যাহত আগ্রাসন থামার যে সামান্য আশা ছিল, এই হামলার ফলে তা আরও ক্ষীণ হয়ে গেছে।
রাজধানীতে থাকা এএফপির সাংবাদিকরা জানান, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) কিয়েভজুড়ে বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে আকাশে বিস্ফোরণের তীব্র শব্দ ও আলোর ঝলকানি দেখা যায়। এতে নগরবাসী মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানায়, কিয়েভকে লক্ষ্য করে রাশিয়া ৬৭৫টি ড্রোন ও ৫৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৬৫২টি ড্রোন ও ৪১টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
কিয়েভের বাসিন্দা আন্দ্রিই বলেন, ‘চারপাশে সবকিছু আগুনে পুড়ছিল। মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে দৌড়াচ্ছিল।’
তিনি একটি ধসে পড়া সোভিয়েত আমলের আবাসিক ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে এ বর্ণনা দেন। তার শার্টে রক্তের দাগ দেখা যায়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, রাজধানীর অন্তত ২০টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক ভবন, একটি স্কুল, একটি ভেটেরিনারি ক্লিনিক এবং অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামো রয়েছে।
সন্ধ্যায় দেওয়া ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, ‘কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত ভবনটির স্থানে এখনো উদ্ধার অভিযান চলছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি আবাসিক ভবনের প্রথমতলা থেকে নবম তলা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।’
ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ শুক্রবার ভোরে জানায়, হামলায় তিন শিশুসহ অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। এর আগে নিহতের সংখ্যা ১৬ জন বলা হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, ধ্বংসস্তূপ থেকে সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন পুরুষ, তিনজন নারী এবং একজন কিশোরী রয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষ করে চীন ত্যাগ করার সময় বেশ কিছু বাণিজ্যিক চুক্তির বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও পুঁজিবাজার ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তা তেমন কোনো উদ্দীপনা তৈরি করতে পারেনি। উল্টো এই সফরকালে বেইজিং তাইওয়ান ইস্যুতে ওয়াশিংটনকে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি ইরান সংকটে মার্কিন সমরনীতির সমালোচনাও করেছে। প্রায় এক দশকের বিরতি শেষে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পই প্রথম চীনের মাটিতে পা রাখলেন, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজ দেশে জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প এই এশিয়া সফরে বের হয়েছিলেন। বেইজিংয়ে তাঁকে দেওয়া রাজকীয় অভ্যর্থনা, বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও বিলাসবহুল ভোজসভার মাধ্যমে আতিথেয়তার কোনো কমতি রাখেনি চীন। এমনকি বিরল সুযোগ হিসেবে তাঁকে ঝোংনানহাই কমপ্লেক্সের গোপন বাগানও ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনা শেষে ট্রাম্প এক বিশেষ বৈঠকে বলেন, “এটা এক অসাধারণ সফর। এটা থেকে ভালো কিছু বেরিয়ে এসেছে বলে আমি মনে করি।”
বৈঠকের আগে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, “কখনোই হওয়া উচিত ছিল না যে সংঘাত, তা অব্যাহত রাখার কোনো কারণ থাকতে পারে না।” শান্তি চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধ বন্ধে বেইজিং সহায়তার আশ্বাসও দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে ট্রাম্প ফক্স নিউজ-এর শন হ্যানিটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে, চীন ইরানে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ও শি উভয়ই কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করার বিষয়ে ‘যৌথ আকাঙ্ক্ষা’ প্রকাশ করেছেন। এদিকে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো প্যাট্রিসিয়া কিম মনে করেন যে, “উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, ইরান বিষয়ে কিছু করার বিষয়ে চীনের কাছ থেকে সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি।”
বাণিজ্যিক চুক্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘোষণার আশা করা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে। তবে প্রত্যাশা ছিল ৫০০টির, ফলে ঘোষণার পর বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশ পড়ে যায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে। একই সঙ্গে এনভিডিয়া’র প্রধান নির্বাহী উপস্থিত থাকলেও উন্নত এআই চিপ বিক্রির বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি। মূলত বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষ দুই দেশের মধ্যে কোনো জুতসই বাণিজ্যিক চুক্তি না হওয়ায় শুক্রবার চীনের শেয়ার বাজারেও দরপতন লক্ষ করা গেছে। ব্লুমবার্গ টিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন বাণিজ্য দূত জেমিসন গ্রির জানিয়েছেন যে, বর্তমানে বিদ্যমান ভঙ্গুর বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার কথা বলা হলেও তাইওয়ান নিয়ে বেইজিংয়ের সুর ছিল অত্যন্ত কঠোর। শি জিনপিং স্পষ্ট করে তাইওয়ান নিয়ে ‘ভুলভাল কিছু করার’ বিষয়ে ট্রাম্পকে সাবধান করে দিয়েছেন। এই বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এনবিসি নিউজ-কে বলেন, “এখন অবধি তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। চীনারা সবসময় এ প্রসঙ্গটি তোলে, আমরাও সবসময় আমাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে বলি, এরপর অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই।” এছাড়া হংকংয়ের কারাবন্দি মিডিয়া টাইকুন জিমি লাইয়ের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে বলে রুবিও জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে শি জিনপিং এই সম্পর্ককে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে ভোজসভায় মন্তব্য করেন যে, “আমাদের অবশ্যই একে কাজে লাগাতে হবে এবং কখনোই ভণ্ডুল করা যাবে না।”
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের চীন সফর প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম ফল দিয়েছে। সফরের আগে যে ধরনের বড় অর্থনৈতিক সমঝোতা, বাজার উন্মুক্তকরণ বা কৌশলগত পুনর্মিলনের আলোচনা চলছিল, বাস্তবে তার খুব অল্পই দৃশ্যমান হয়েছে।
বরং এই সফর দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বড় করপোরেট প্রতিনিধিদল, জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় আয়োজন কিংবা ব্যক্তিগত কূটনৈতিক রসায়ন—কোনোটিই সহজে কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দূর করতে পারছে না।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিকতম ও অত্যন্ত শক্তিশালী আকাশপথের হামলায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২১ জনে দাঁড়িয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার চালানো এই ভয়াবহ অভিযানে আরও অন্তত ৪৫ জন আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা বিভাগ শুক্রবার ভোরে জানিয়েছে যে, মস্কোর অব্যাহত আগ্রাসন নিরসনের যে ক্ষীণ সম্ভাবনা ছিল, এই নৃশংস হামলার ফলে তা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার কিয়েভজুড়ে বারবার বিমান হামলার সাইরেন বেজে উঠলে জনমনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টা ধরে আকাশে তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ ও আলোর ঝলকানি দেখা যায়, যার ফলে নগরবাসী নিরাপত্তার খোঁজে মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর তথ্যমতে, কিয়েভকে লক্ষ্য করে রাশিয়া ৬৭৫টি ড্রোন এবং ৫৬টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। এর মধ্যে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৬৫২টি ড্রোন এবং ৪১টি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও কিছু আঘাত লক্ষ্যভেদ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
হামলার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে কিয়েভের বাসিন্দা আন্দ্রিই এএফপিকে বলেন, ‘চারপাশে সবকিছু আগুনে পুড়ছিল। মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে দৌড়াচ্ছিল।’ রক্তের দাগ মাখা শার্ট পরে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত আবাসিক ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি এই লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাজধানীর অন্তত ২০টি স্থাপনা এই হামলার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে সাধারণ মানুষের আবাসন ছাড়াও স্কুল এবং ভেটেরিনারি ক্লিনিক রয়েছে।
সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, ‘কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিধ্বস্ত ভবনটির স্থানে এখনও উদ্ধার অভিযান চলছে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি আবাসিক ভবনের প্রথম তলা থেকে নবম তলা পর্যন্ত সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।’ পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন, যার মধ্যে তিনজন নারী, তিনজন পুরুষ এবং একজন কিশোরী রয়েছেন। জরুরি পরিষেবা বিভাগ পরবর্তীতে নিশ্চিত করেছে যে, নিহতের সংখ্যা ২১ জনে পৌঁছেছে, যাদের মধ্যে অন্তত তিনটি শিশু রয়েছে।
ভারতের নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত হয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান কূটনৈতিক জটিলতা নিয়ে তেহরানের কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। রয়টার্সের বরাত দিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনে তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় ওয়াশিংটনের ওপর ইরানের বিন্দুমাত্র ‘বিশ্বাস নেই’। দীর্ঘস্থায়ী কূটনৈতিক তিক্ততা ও আস্থার চরম সংকটের কারণেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
আলোচনায় ফেরার বিষয়টি স্পষ্ট করে আরাগচি ওয়াশিংটনকে একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুনরায় সংলাপে বসতে তখনই আগ্রহী হবে, যখন মার্কিন প্রশাসন এই প্রক্রিয়ার প্রতি সম্পূর্ণ আন্তরিক ও ‘সিরিয়াস’ হবে। কেবল লোকদেখানো কোনো কূটনৈতিক তৎপরতায় তেহরান অংশ নেবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। আল-জাজিরা পরিবেশিত খবরের মাধ্যমে জানা যায়, বর্তমানে সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে ইরান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে দাবি করেছেন এই শীর্ষ কূটনীতিক। মূলত কূটনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ উন্মুক্ত রাখাই এখন তেহরানের প্রধান লক্ষ্য।
তবে তিনি একই সঙ্গে এই শঙ্কার কথা জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার এই তীব্র অভাব যেকোনো ইতিবাচক আলোচনার অগ্রগতিতে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। ওয়াশিংটনের প্রতি বিশ্বাসের এই ঘাটতি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। শুক্রবার আবুধাবিতে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দেশীয় সফরের প্রারম্ভিক এই যাত্রায় ভারতের জন্য ৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যা মূলত ভারতের অবকাঠামো খাত এবং আরবিএল ব্যাংক ও সাম্মান ক্যাপিটালের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যয় করা হবে।
স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোর মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের একটি কাঠামোগত সমঝোতা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, যার মাধ্যমে দুই দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ এবং কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত নিয়ে পৃথক দুটি চুক্তি সই হয়েছে। একই সঙ্গে গুজরাটের ভাদিনারে একটি জাহাজ মেরামত ক্লাস্টার গড়ে তোলার বিষয়েও ঐকমত্যে পৌঁছেছে দুই দেশ। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং গত দুই দশকে অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
প্রতিনিধিদলের উপস্থিতিতে আয়োজিত বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি আমিরাতের প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে ফোনে কথা বলতাম, তবে সরাসরি সাক্ষাৎ করার জন্য খুবই আগ্রহী ছিলাম।’ পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আঞ্চলিক সংকট নিরসনে ‘সংলাপ ও কূটনীতি’র মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন। এ সময় তিনি কঠিন পরিস্থিতিতে আমিরাতের ধৈর্যের প্রশংসা করার পাশাপাশি দেশটির ওপর হওয়া হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘ভারত সবসময় আমিরাতের পাশে রয়েছে।’
প্রবাসীদের অবদান স্বীকার করে মোদি বলেন, আমিরাতে বসবাসরত ভারতীয়দের দেশটির সরকার ‘পরিবারের সদস্যের মতো’ দেখভাল করছে। বর্তমানে দেশটিতে ৪৫ লাখেরও বেশি ভারতীয় প্রবাসী কর্মরত রয়েছেন, যারা দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছেন। আবুধাবিতে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রীকে দেশটির এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের পাহারায় বিশেষ নিরাপত্তা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়, যা এই সফরের কূটনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্বকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
আরজি কর মেডিকেল কলেজে ঘটে যাওয়া চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগে তিনজন আইপিএস কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। শুক্রবার নবান্নে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই কঠোর পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, এই ঘটনার প্রতিটি দিক পুনরায় পর্যালোচনা করা হবে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হচ্ছে। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকায় রয়েছেন কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন কমিশনার বিনীত গোয়েল, তৎকালীন ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং ডিসি (নর্থ) অভিষেক গুপ্ত।
ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আরজি কর কাণ্ড এবং পরবর্তী পরিস্থিতি পুলিশ কীভাবে পরিচালনা করেছিল, সে বিষয়ে মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছিল। তথ্য যাচাইয়ের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে তিন কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে পুলিশের প্রাথমিক পদক্ষেপের সমালোচনা করে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, হোম মিনিস্টার হিসেবে আমি মনে করছি, ঘটনাটি যথাযথভাবে পরিচালিত হয়নি। এফআইআর দায়ের থেকে শুরু করে প্রাথমিক তদন্ত সব ক্ষেত্রেই গুরুতর ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। এর বাইরেও গণমাধ্যমের বরাতে তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্যাতিতার পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে অর্থ প্রদানের চেষ্টা করা হয়েছিল, যা নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গত বছরের আগস্টে আরজি কর হাসপাতালে ওই নৃশংস ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হলে প্রশাসনিকভাবে বেশ কিছু রদবদল করা হয়েছিল। সেই সময় বিনীত গোয়েলকে কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে এসটিএফের দায়িত্ব দেওয়া হলেও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ কমেনি। একইভাবে ঘটনার সময় ডিসি পদে দায়িত্ব পালন করা অভিষেক গুপ্ত ও ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকাও শুরু থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল।
কিউবার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে অভিযোগ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা শুক্রবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ৯৪ বছর বয়সী এই নেতার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাথমিক ধাপগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। মূলত ১৯৯৬ সালে কিউবান বাহিনীর হাতে ‘ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ’ নামক একটি মানবিক সংস্থার বিমান ভূপাতিত করার ঘটনার জেরে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ওই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়া শুরুর আগে এখন কেবল গ্র্যান্ড জুরির চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে বলে মার্কিন বিচার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়েছে।
ফ্লোরিডার সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ইউএস অ্যাটর্নি অফিস দীর্ঘ সময় ধরে কিউবার শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিউবার ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে দ্বীপরাষ্ট্রটিতে বর্তমানে তীব্র বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ সম্প্রতি হাভানায় কিউবান কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিনিময়ে কিউবার শাসনব্যবস্থায় অর্থবহ সংস্কার আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিল করা হলে তা দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা নিরসনের বদলে এই আইনি পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার মধ্যকার বিদ্যমান উত্তেজনাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কানাডার টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ থেকে আগত তিন যাত্রীর ব্যাগ তল্লাশি করে বিপুল পরিমাণ মাংস, দুগ্ধজাত সামগ্রী এবং উদ্ভিজ্জ পণ্য উদ্ধার করেছে দেশটির সীমান্ত কর্তৃপক্ষ। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (সিবিএসএ) জানিয়েছে, তাদের বিশেষ প্রশিক্ষিত তিনটি ল্যাব্রাডর কুকুরের সহায়তায় ওই যাত্রীদের লাগেজে থাকা এসব নিষিদ্ধ পণ্যের সন্ধান পাওয়া যায়। বিদেশি সংবাদমাধ্যম টরন্টো সান-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইন লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের ১ হাজার ৩০০ কানাডিয়ান ডলার জরিমানা করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় দেড় লাখ টাকার সমান।
সীমান্ত সংস্থাটির পক্ষ থেকে একটি আলোকচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে জব্দকৃত পণ্যগুলোর পাশে চিহ্নিতকারী কুকুরগুলোকে বসে থাকতে দেখা যায়। উল্লেখ্য যে, মাস দুয়েক আগে মিসর থেকে আসা এক যাত্রীর ব্যাগ থেকে ২২ কেজি কাঁচা মাংস শনাক্ত করে আলোচনায় এসেছিল গোয়েন্দা কুকুর ‘ধারলা’। সেই সময় উদ্ধার হওয়া পণ্যের তালিকায় ছিল কাঁচা হাঁস, কবুতর, মুরগি ও খরগোশের মাংস। সিবিএসএ সতর্ক করে জানিয়েছে, কাঁচা মাংসে প্রায়ই ক্ষতিকর সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা মানুষের শরীরে ডায়রিয়া, জ্বর ও পেটে ব্যথার মতো গুরুতর সংক্রমণ তৈরি করতে পারে।
কানাডার কঠোর আইন অনুযায়ী, দেশটিতে প্রবেশের সময় নাগরিক কিংবা বিদেশি—সব যাত্রীকে তাদের সঙ্গে থাকা যে কোনো খাদ্য, উদ্ভিদ ও প্রাণিজ পণ্যের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে ঘোষণা করতে হয়। এর আওতায় কাঁচা বা রান্না করা মাংস, দুধ, পনির, ডিম, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য ছাড়াও বিভিন্ন ফলমূল, সবজি, বীজ, কাঠ, চারাগাছ, মাটি এবং ভেষজ উপাদানের তথ্য কর্তৃপক্ষকে জানানো আবশ্যক বলে জানিয়েছে। মূলত জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও পরিবেশগত ঝুঁকি এড়াতেই দেশটি এই কড়াকড়ি বজায় রাখে।
হাওয়াইয়ের কেলুয়েয়া আগ্নেয়গিরিতে বৃহস্পতিবার আবারও অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়েছে, যা রেকর্ড বইয়ে ৪৭তম বারের মতো লিপিবদ্ধ হলো। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স ওয়েদার জানিয়েছে, অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাবে জ্বালামুখ থেকে প্রচণ্ড বেগে লাভা উদগিরণের পাশাপাশি আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হচ্ছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর দেওয়া তথ্যমতে, স্থানীয় সময় বিকেল ৪টার দিকে আগ্নেয়গিরিটির উত্তর দিকের ফাটল দিয়ে তীব্র বেগে লাভা বের হতে শুরু করে, যার উচ্চতা একপর্যায়ে ২০০ ফুট পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। এর আগে চলতি বছরের ৫ মে এই আগ্নেয়গিরি থেকে সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাতের খবর পাওয়া গিয়েছিল।
ভূবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ দিকের হ্যালেমাউমাউ নামক ফাটলে প্রবল আলো ও নিয়মিত অগ্নিশিখা দেখা দেওয়ার পরপরই লাভা উপচে পড়া শুরু হয়। বর্তমানে উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় ফাটল দিয়েই লাভা নির্গত হচ্ছে। তবে দক্ষিণ ফাটলের তুলনায় উত্তর অংশে লাভার তীব্রতা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং সেখানে লাভার ফোয়ারা প্রায় ৬৫ ফুট উচ্চতায় আছড়ে পড়ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে আগ্নেয় গ্যাস ও টেফ্রা তথা আগ্নেয়গিরির ছাই ও শিলাখণ্ড থেকে সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে। আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত সালফার ডাই অক্সাইড ও কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো উচ্চমাত্রার বিষাক্ত গ্যাস 'ভগ' বা বিশেষ ধরনের বায়ুদূষণ সৃষ্টি করছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ এবং মানুষের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের আফগান সীমান্ত সংলগ্ন বাজাউর জেলায় এক ভয়ংকর আত্মঘাতী বোমা হামলায় অন্তত আটজন সেনা সদস্যের প্রাণহানি ঘটেছে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সেনাসদস্যদের একটি সমাবেশের ওপর এই নৃশংস আক্রমণ চালানো হয়। দেশটির নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে।
মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, আত্মঘাতী হামলাকারী সেনা সদস্যদের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে বিস্ফোরণ ঘটালে ঘটনাস্থলেই ৮ জনের মৃত্যু হয়। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী বাজাউর জেলাটি দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। হামলার পরপরই টিটিপি এক বিবৃতির মাধ্যমে এই ঘটনার দায় স্বীকার করে নিজেদের অবস্থান জানায়।
তবে এই সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তান সরকার বা সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ধরনের নিরাপত্তা অভিযান বা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। বর্তমানে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।