দুই যুগ ধরে সিরিয়া শাসন করেছেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। বিদ্রোহীদের অভ্যুত্থানের মুখে অবশেষে পতন ঘটেছে তার। দেশটির রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে পালিয়েছেন তিনি। সিরিয়া থেকে পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন বাশার আল-আসাদ। তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যসহ তিনি মস্কোয় অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাস ও রিয়া নভস্তির বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ তার পরিবারের সদস্যরা মস্কোয় পৌঁছেছেন। মানবিক দিক বিবেচনা করে রাশিয়া তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে।
এর আগে সিরিয়ার বিদ্রোহী যোদ্ধাদের মাত্র ১২ দিনের অভিযানে রোববার বাশার সরকারের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে তার দুই যুগের শাসনের অবসান ঘটে। এর আগে বাশারের বাবা হাফিজ আল-আসাদ প্রায় ২৯ বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেন বাশার। শুরুতে সংস্কারের পথে হাঁটলেও পরে বাবার মতোই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন তিনিও। তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধীদের দমনে ব্যাপক নিপীড়ন চালনোর অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্রোহীদের অভিযানে বাশারের পতনের পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বাশার প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিয়ে দেশত্যাগে সম্মত হন। তবে তিনি কোন দেশে গেছেন বা কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে ওই বিবৃতিতে কিছু উল্লেখ ছিল না। তবে মস্কো এটাও বলেছিল, সিরিয়ার বাশারবিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছে।
রাশিয়ার বার্তা সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিয়েছে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা। সিরিয়ায় রাশিয়ার কূটনীতিক স্থাপনাগুলোরও নিরাপত্তা দেবে বিদ্রোহীরা। রুশ কূটনীতিকরা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
আসাদের আশ্রয়ের অনুমোদন দিলেন পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্যক্তিগতভাবে বাশার আল আসাদকে মস্কোয় আশ্রয় দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে দামেস্কের পতনের পর সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবার রাশিয়ায় পৌঁছেছেন বলে খবর প্রকাশের পর এ তথ্য প্রকাশ করা হলো।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, পুতিন ও আসাদের মধ্যে কোনো বৈঠক হওয়ার কথা নেই। আসাদ কোথায় আছেন, সে বিষয়েও কিছু বলার নেই। আসাদকে কীভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে পেসকভ বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এটা তার (ভ্লাদিমির পুতিন) সিদ্ধান্ত।
রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মিখাইল উলিয়ানভ গতকাল সোমবার সকালে নিশ্চিত করেছেন, আসাদ ও তার পরিবার মস্কোতে রয়েছেন। এটি চ্যালেঞ্জিং সময়ে তার মিত্রদের প্রতি রাশিয়ার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তিনি বলেন, রাশিয়া কঠিন পরিস্থিতিতে তার বন্ধুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়।
এর আগে রোববার রুশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ‘মানবিক কারণে’ আসাদ ও তার পরিবারকে রাশিয়ায় আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সশস্ত্রবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর আসাদ পদত্যাগে সম্মত হন এবং ‘শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর’ নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
মস্কোয় সিরীয় দূতাবাসে উড়ল বিরোধীদের পতাকা
দামেস্কে বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের এক দিন পর রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় সিরীয় দূতাবাসে বিরোধীদের পতাকা উত্তোলন করেছে একদল লোক। গতকাল সোমবার দূতাবাসের এক প্রতিনিধি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে বলেন, সিরিয়ার দূতাবাস খোলা হয়েছে এবং আজ নতুন পতাকার নিচে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা হচ্ছে।
মস্কো টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূতাবাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুষারপাতের মধ্যে কয়েকজন হাততালি দেয় এবং গান গান। তারা সিরিয়ার বিরোধীদের সবুজ, লাল, কালো এবং সাদা পতাকা উত্তোলন করেন।
বিদ্রোহীদের মাত্র ১২ দিনের অগ্রাভিযানের মুখে বাশার আল আসাদের অবিশ্বাস্য পরাজয় বিস্মিত করেছে আন্তর্জাতিক সব মহলকে। সরকারবিরোধী বিদ্রোহীরা রোববার (৮ ডিসেম্বর) রাজধানী দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নিলে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় উড়াল দেন। তার দেশত্যাগের পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ আল-জালালি জনগণের নির্বাচিত নেতৃত্বকে সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি সব পক্ষকে স্থিতিশীলতার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল–মানদেব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বলয়ে হুতিরা নিজেদের এক অপরিহার্য ও শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে জানান দিল।
একসময় হুতিদের একটি বিচ্ছিন্ন ধর্মীয় ও সামরিক গোষ্ঠী হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু এখন তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ ইয়েমেনের উত্তরের বিশাল এলাকা এবং লোহিত সাগরের পুরো উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছে।
হুতিরা মূলত জায়েদি সম্প্রদায়ের অনুসারী। এটি শিয়া ইসলামের একটি শাখা। এই শাখা সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ ইয়েমেনে সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচিত। নব্বইয়ের দশকে জায়েদিদের ওপর ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে হুতিরা আন্দোলন শুরু করে। জায়েদিরা মূলত দেশটির উত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাগুলোতে বসবাস করে।
হুতি আন্দোলন ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। এর নামকরণ করা হয়েছে গোষ্ঠীটির প্রয়াত আধ্যাত্মিক নেতা বদরুদ্দিন আল-হুতি ও তার ছেলে হোসেনের নামানুসারে। ২০০৪ সালে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর হাতে হোসেন নিহত হন।
পরে বদরুদ্দিনের আরেক ছেলে আব্দুল মালিক আন্দোলনের দায়িত্ব নেন। তিনি তার অগ্নিঝরা বক্তৃতার মাধ্যমে গোষ্ঠীটিকে উত্তর-পশ্চিমের একটি বিচ্ছিন্ন দল থেকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেন। বর্তমানে আব্দুল মালিকের অধীনে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা রয়েছেন। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আছে তাদের।
ইয়েমেনের অধিকাংশ মানুষ হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতেই বাস করে, যদিও দেশটির ভূখণ্ডের একটি বড় অংশ এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। হুতিদের কাছে থাকা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলো ইয়েমেনের প্রতিবেশী তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর পাশাপাশি ইসরায়েলের জন্যও বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা শুরু করার পর তারা বারবার দখলদার দেশটিকে লক্ষ্য বানিয়েছে।
২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুতিরা ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে ছয়টি যুদ্ধে জড়ায়। এমনকি ২০০৯-১০ সালে তারা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবের সঙ্গেও যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ২০১২ সালে আরব বসন্তের সময় তারা বিক্ষোভে অংশ নেয়। এর ফলে তৎকালীন শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। পরে এই সালেহর সঙ্গেই হুতিরা জোট গড়েছিল। তবে সেই বন্ধুত্ব শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ২০১৭ সালে হুতিরাই তাকে হত্যা করে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করার মাধ্যমে হুতিরা তাদের শক্তির জানান দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরব তাদের ওপর হামলা শুরু করে। এতে যে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তাতে লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়। দেশটিতে নেমে আসে চরম মানবিক বিপর্যয়।
২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে হুতিদের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও দেশের উত্তরের বড় একটি অংশ এখনো তাদের দখলেই রয়েছে।
গত জুলাই মাসে নতুন করে সংকট শুরু হয়। ইয়েমেনের আকাশসীমায় সৌদি আরবের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তারা একটি ইরানি বিমানকে অবতরণ করতে দেয়। এর পাল্টা জবাব হিসেবে সরকারি বাহিনী হুতিদের বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
তেহরানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হলো হুতিরা। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে।
সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই হুতিদের ইরানের ‘হাতের পুতুল’ বলে মনে করে। তাদের অভিযোগ, ইরান এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে, যদিও ইরান বরাবরই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
তবে হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে নিজেদের চূড়ান্ত নেতা বলে মনে করে না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক গভীর হয়েছে। ২০২৪ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি, গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করতেই তাদের এই হামলা।
হামলার কারণে অনেক কোম্পানির জাহাজ বাধ্য হয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছে। গত মার্চ মাসে হুতিরা ইরানের সমর্থনে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তারা ইসরায়েলের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও হুতিরা নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখে। মূলত সামরিক সাহায্যের জন্যই তারা ইরানের ওপর নির্ভর করে।
ভারতের মাটিতে আয়োজিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়ে এক দিনের সফর শেষে নয়াদিল্লি ত্যাগ করেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গতকাল রোববার বিকালে সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার পরপরই তড়িঘড়ি করে তিনি সরাসরি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হন। ২০২০ সালের গালওয়ান সীমান্ত সংঘর্ষের দীর্ঘ অচলাবস্থা পেরিয়ে সাত বছরের মধ্যে এটিই ছিল চীনা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম ভারত সফর।
গত শনিবার ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা ও শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে ভারতের রাজধানীতে পৌঁছান শি জিনপিং। সফরকালে তিনি কেবলমাত্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেই একমাত্র আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। তবে সম্মেলনের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজিত নৈশভোজে চীনা প্রেসিডেন্ট অনুপস্থিত ছিলেন।
সফর চলাকালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নয়াদিল্লির অভিজাত হোটেল ‘তাজ প্যালেস’-এ অবস্থান করেন। তার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে হোটেলটিকে ‘নো-ফ্লাই জোন’ বা বিমান চলাচল নিষিদ্ধ অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি সেখানে মোতায়েন ছিল একাধিক সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট এবং বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড। কড়া তল্লাশি ও কঠোর নিরাপত্তার অংশ হিসেবে হোটেলের সব কক্ষ আগেই সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল।
চলতি বছর ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গত শনি ও গতকাল রোববারের এই ব্রিকস সম্মেলনটি বিশ্ব ভূরাজনীতিতে ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের জেরে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা জোটের অভ্যন্তরীণ ঐক্যে কিছুটা মতভেদের সৃষ্টি করেছিল। এর আগে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হলেও ভারত একটি ‘চেয়ারস স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করে। তবে দিল্লির মূল সম্মেলনে গভীর বিভেদ দূর করে সদস্য রাষ্ট্রগুলো একটি সামগ্রিক যৌথ বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে অন্য বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে মধ্যমণি করে যৌথ ছবি তোলার পর মূল অধিবেশনে অংশ নেন শি জিনপিং। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ নিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, এই সংঘাত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ স্বার্থের পক্ষে নয়। এই শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে ১১ সদস্যে সম্প্রসারিত ব্রিকস জোট বিশ্ব অর্থনীতি ও জনসংখ্যার একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। নয়াদিল্লি সম্মেলন থেকে অপ্রচলিত নিরাপত্তা ঝুঁকি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো নিয়ে বিশদ আলোচনার পাশাপাশি বৈশ্বিক লেনদেনে ‘সুইফট’-এর বিকল্প এবং সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর মধ্যে ভারতের আপত্তির কারণে জোটটিতে পাকিস্তানের সদস্যপদ পাওয়ার আবেদন স্থগিত রয়েছে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার পর গতকাল রোববার বিকালে নিজের কর্মসূচি সম্পন্ন করে চীন অভিমুখে রওনা হন শি জিনপিং, যা পরবর্তী বছর বেইজিংয়ের ব্রিকস প্রেসিডেন্সি গ্রহণের প্রস্তুতি ও ভারত-চীন কৌশলগত সম্পর্কে এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেছেন কাশ্মিরের তিন নেতা। তারা হলেন হুরিয়াত কনফারেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মীরওয়াইজ উমর ফারুক, আগা সৈয়দ হাসান মোসাভি আল সাফাভি ও ইমরান রেজা আনসারি। বৈঠকে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ দেশটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল দিল্লিতে এসেছে।
বৈঠকের পর ভারতের সংবাদ সংস্থাকে মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, কাশ্মীর থেকে একটি প্রতিনিধিদল দিল্লিতে এসেছে। তারা ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলা নিপীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে তারা সংহতি প্রকাশ করেছেন বলেও জানান তিনি।
মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, ‘এই অবিচার বন্ধ হওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ইরানের পাশাপাশি ফিলিস্তিন ও লেবাননে যা ঘটছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডকে তিনি অন্যায় বলে মন্তব্য করেন।
বৈঠকের মূল বার্তা সম্পর্কে মীরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন, ‘সব ধর্মই সত্য ও ন্যায়কে সমর্থন করে। আর সেই কারণেই আমাদের দেখা উচিত কে সঠিক পথে আছে। এই মুহূর্তে ইরান সঠিক পক্ষে রয়েছে; তারা নিজেদের রক্ষা করছে এবং তাদের ওপর একটি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
মীরওয়াইজ উমর ফারুক ও ইমরান রেজা আনসারি দিল্লিতে ইরান দূতাবাস আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতেও অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের মিনাবে নিহত শিশুদের স্মরণে প্রদর্শনীটি আয়োজন করা হয়।
মীরওয়াইজ উমর ফারুকের এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যমকে জানান, ভারতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মহম্মদ ফাতহালির আমন্ত্রণে কাশ্মিরের নেতারা প্রদর্শনীতে যোগ দেন।
২০১৯ সালে ভারত জম্মু ও কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে। এরপর কাশ্মিরের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে বড় পরিবর্তন আসে। একই সময়ে কাশ্মির নিয়ে ভারত ও ইরানের মধ্যে মতপার্থক্যও দেখা দেয়।
ভারত বরাবরই বলে আসছে, পুরো কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাকিস্তান-সংক্রান্ত কাশ্মিরের বিষয়টি ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই সমাধানযোগ্য বলে দিল্লির অবস্থান।
অন্যদিকে, ২০১৯ সালে বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পর ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কাশ্মিরের মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ভারত তখন এর প্রতিবাদ জানায়।
খামেনি ২০২০ সালের দিল্লির দাঙ্গা নিয়েও মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালে গাজার পাশাপাশি ভারতের মুসলমানদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের মুসলিম বলতে পারি না যদি আমরা মিয়ানমার, গাজা, ভারত বা অন্য যেকোনো স্থানে একজন মুসলিমের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে উদাসীন থাকি।’ তবে এসব মতপার্থক্যের মধ্যেও ভারত ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
চলতি বছরের গোড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর কাশ্মির ইস্যুতে তেহরানের অবস্থান নিয়ে ভারতে প্রতিক্রিয়া হয়। ইরানের দূতাবাসকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্ট মুছে ফেলতে হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দিল্লিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কাশ্মিরি নেতাদের বৈঠক তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একই সময়ে ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে পেজেশকিয়ানের সাক্ষাৎও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম খতিয়ে দেখার পর ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি প্রথম ধাপের এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় আরও ১০০টি মাদ্রাসাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। রোববার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বন্ধের মুখোমুখি হওয়া ২৫২টি মাদ্রাসার অধিকাংশই কওমি ধারার। এর মধ্যে ৪৪টি মালদহ, ৩৭টি উত্তর দিনাজপুর, ৩২টি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং নদীয়া ও মুর্শিদাবাদে ২৫টি করে মাদ্রাসা অবস্থিত।
রাজ্যের সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, শোকজ করা মাদ্রাসাগুলোকে বৈধ অনুমোদনের কাগজপত্র দেখাতে হবে। কাগজ দেখাতে ব্যর্থ হলে সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এর আগে, গত জুনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অনুমোদিত ও অননুমোদিত মাদ্রাসার সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে রাজ্যজুড়ে সমীক্ষা চালানোর নির্দেশ দেন।
সেই নির্দেশনার পর সংখ্যালঘুবিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তর কলকাতা এবং বাকি ২২টি জেলাজুড়ে এক বিশেষ সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে মাদ্রাসাগুলোর পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষার্থী ভর্তি, আয়ের উৎস এবং নিবন্ধনের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়।
মন্ত্রী টুডু বলেন, ‘প্রথম ধাপে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেসব মাদ্রাসায় অপেক্ষাকৃত গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে, এমন আরও ১০০টি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্র বা বৈধ অনুমোদন দেখাতে না পারলে সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
‘বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ২ হাজার ১৩২টি মাদ্রাসা সরকারি অনুমোদন নিয়ে চালু রয়েছে। অন্যদিকে অনুমোদনহীন মাদ্রাসার সংখ্যা ২ হাজার ৩৯৬টি।’
মাদ্রাসাগুলোর বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তীব্র তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় কট্টরপন্থী তৎপরতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত করে সরকারের এই পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘মাদ্রাসা শিক্ষার সুযোগ নিয়ে যেকোনো দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড থামানো সরকারের দায়িত্ব। সরকার সেই কাজটিই করেছে।’
বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেত্রী ও রাজ্য সরকারের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পলও এই প্রশাসনিক পদক্ষেপকে যৌক্তিক বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত দেশবিরোধী শিক্ষা উসকে দিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্যরা এসব অনুমোদনহীন মাদ্রাসায় আশ্রয় নিত। আমরা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি শৃঙ্খলায় নিয়ে আসতে চাই।
তবে এর বিরোধিতা করে তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, মাদ্রাসা একটি শিক্ষাব্যবস্থা মাত্র এবং মাদ্রাসা শিক্ষার ওপর ঢালাওভাবে জঙ্গি তকমা দেওয়া একেবারেই অনুচিত।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলে ইরানের বিধিনিষেধের কারণে সৌদি আরবসহ অন্যান্য তেল উৎপাদক দেশকে এরই মধ্যে বিকল্প পথের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে, বিশেষ করে লোহিত সাগরমুখী পথের ওপর। কিন্তু ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। এই সরু জলপথটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ পরিস্থিতিতে হুমকিতে পড়েছে লোহিত সাগর।
হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে। ইয়েমেন সরকারের সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, তারা পেরিম দ্বীপও দখল করেছে। দ্বীপটি সরাসরি বাব আল-মান্দেব প্রণালীর মধ্যে অবস্থিত। এসব ঘটনা এমন একটি নৌপথে জাহাজ চলাচলে হুমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে গোষ্ঠীটির সক্ষমতা বাড়াতে পারে, যে পথটি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর ফলে জ্বালানি বাজারের সামনে ক্রমেই কঠিন একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—হরমুজ প্রণালী যদি কঠোরভাবে সীমিত থাকে এবং লোহিত সাগরের পথ আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তাহলে এই অঞ্চলের তেল কীভাবে বিশ্ববাজারে পৌঁছাবে?
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করত। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসের উদ্ধৃত জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১৯টি জাহাজ এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করেছে। বৃহস্পতিবার কেপলার মাত্র ৯টি জাহাজকে এই প্রণালী অতিক্রম করতে দেখেছে।
মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের উপকূল থেকে দূরে, ওমানের কাছাকাছি জলসীমা দিয়ে কিছু জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই তৎপরতা ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। জুলাই ও আগস্ট মাসে ওমানের কাছাকাছি জলসীমায় অন্তত ২৩টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
এমনকি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে চলাচলে অভ্যস্ত জাহাজের মালিকেরাও হামলা বাড়তে থাকায় ওই এলাকায় জাহাজ পাঠাতে ক্রমেই অনিচ্ছুক হয়ে পড়ছেন। রপ্তানির পরিসংখ্যানেও এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল উইজ বকম্যানের তথ্য অনুযায়ী, ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আগস্টে যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
সৌদি আরবের ঐতিহ্যগতভাবে কিছু অন্যান্য উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে। দেশটি পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন দিয়ে নিজ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পশ্চিম দিকে অপরিশোধিত তেল পাঠিয়ে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের টার্মিনাল থেকে তা রপ্তানি করতে পারে। ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশাধিকার সীমিত করে দিলে এই বিকল্পটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেখান থেকে জাহাজগুলো বাব আল-মান্দেব দিয়ে দক্ষিণ দিকে এশিয়ার দিকে যেতে পারে। আবার উত্তর দিকে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকেও যেতে পারে।
হরমুজ প্রণালী উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানির প্রচলিত পথ। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করত। সেপ্টেম্বরে তা কমে গড়ে ১৯টিতে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী এড়িয়ে সৌদি আরবের ভেতর দিয়ে লোহিত সাগরে তেল পৌঁছানো হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইপলাইনটি একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং এশিয়ার দিকে যাওয়ার নৌপথের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। মোখা ও পেরিমে হুথিদের দখল এই গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সুয়েজ-ভূমধ্যসাগরীয় পথ পথ সৌদি আরবের তেল লোহিত সাগর থেকে বের করে আনার আরেকটি সুযোগ দেয়। তবে এশিয়ার ক্রেতাদের কাছে এ পথে তেল পাঠাতে বেশি সময় ও বেশি খরচ হয়।
হরমুজ প্রণালী মারাত্মকভাবে সীমিত, বাব আল-মান্দেব হুথিদের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে এবং বিকল্প পথগুলোয় সময় ও খরচ দুটোই বাড়তে পারে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। কিন্তু এখন সেই পথও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েছে।
হুতিদের মোখা ও পেরিম দখলের ফলে বাব আল-মান্দেবের আশপাশে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি আরও শক্তিশালী অবস্থান পেয়েছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে লোহিত সাগর থেকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে মাত্র দুটি সৌদি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করেছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন একাধিকবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবের হাতে এখনো আরেকটি বিকল্প রয়েছে। লোহিত সাগরে পৌঁছানো তেল দক্ষিণ দিকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে না পাঠিয়ে উত্তরে সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগরের দিকে পাঠানো যেতে পারে।
তবে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় ক্রেতাদের অনেকেই এশিয়ায় অবস্থিত। ফলে এশিয়ার উদ্দেশে তেলবাহী জাহাজ পাঠাতে এই পথে যাত্রা করলে সময় ও খরচ দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অর্থাৎ, যে ভৌগোলিক অবস্থান একসময় সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সুবিধা দিয়েছিল, এখন সেই বিকল্প পথের দুই প্রান্তেই জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডকে একীভূত করার পক্ষে মন্তব্য করেছেন। শনিবার আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, আয়ারল্যান্ড যদি এক হয়ে যায়, সেটা হবে চমৎকার একটা বিষয়।
ট্রাম্প বলেন, আমি কোনো ঝামেলা তৈরি করতে চাই না। কিন্তু আপনাদের বলছি, আমি আয়ারল্যান্ডকে একীভূত দেখতে চাই। একদিন না একদিন এটা হবেই... আমার মনে হয়, এটা খুবই সুন্দর একটা ব্যাপার হবে।
প্রধানমন্ত্রী মার্টিন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ট্রাম্পের কথা শুনেও তিনি নীরব থাকেন। লন্ডনে অবশ্য এ মন্তব্য ভালো লাগেনি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আয়ারল্যান্ড একীভূত হওয়ার প্রশ্নে বার্নহামের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এর আগে বুধবার পার্লামেন্টে উত্তর আয়ারল্যান্ডে গণভোটের সম্ভাবনা নিয়ে বার্নহাম বলেছিলেন, এমন কোনো তথ্য তার কাছে নেই যেখানে দেখা যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আরও একটা গণভোট চায়। পরিস্থিতি না বদলালে কোনো গণভোট হবে না।
১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তি অনুযায়ী উত্তর আয়ারল্যান্ড যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে যাবে কি না, সেই সিদ্ধান্তের গণভোট ডাকার ক্ষমতা ব্রিটিশ সরকারের হাতেই রয়েছে। ওই চুক্তির মাধ্যমেই ‘দ্য ট্রাবলস’ নামের প্রায় তিন দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটেছিল।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রধান ইউনিয়নিস্ট দল ডিইউপির নেতা গ্যাভিন রবিনসন স্পষ্ট করে বলেছেন, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ ট্রাম্প ঠিক করবেন না। সেখানকার জনগণই ঠিক করবে। তিনি যোগ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও জানেন নির্বাচন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। লন্ডন, ডাবলিন বা ওয়াশিংটনের কোনো কথার ওপর নির্ভর করে এ সিদ্ধান্ত হবে না।
জনমত জরিপগুলোতে এখনো অধিকাংশ মানুষ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে থাকলেও ব্যবধান কমছে। বিশেষ করে ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগের পর একীভূত আয়ারল্যান্ডের আলোচনা আবার জোরালো হয়েছে।
সফরে ট্রাম্প আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনলির সঙ্গেও দেখা করেন। ২০১৯ সালে ট্রাম্প যখন আয়ারল্যান্ডে এসেছিলেন, তখন শ্যানন বিমানবন্দরে কনলি তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিলেন। এবারও ট্রাম্পের সফরকে ঘিরে ডাবলিনে যুদ্ধবিরোধী ও ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। অনেকে মার্কিন সামরিক নীতি, আয়ারল্যান্ডের নিরপেক্ষতা এবং গাজায় ইসরায়েলের
প্রতি ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সফরের নিরাপত্তায় বিপুল অর্থ ব্যয় নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
রাজনৈতিক সম্মেলন মানেই মূলত গুরুগম্ভীর আয়োজন। তবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে এসে ব্যাতিক্রম ঘটালেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। শনিবার সন্ধ্যার এক অনুষ্ঠানে বলিউডের জনপ্রিয় গান গেয়ে উপস্থিত অতিথিদের আনন্দে মাতান তিনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজনে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে রয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। সম্মেলনের নৈশভোজে তিনি কিংবদন্তি শিল্পী কিশোর কুমারের ১৯৬৫ সালের জনপ্রিয় গান ‘খোয়াব হো তুম ইয়া কোই হকিকত’ পরিবেশন করেন। এস ডি বর্মনের সুরে ও মাজরুহ সুলতানপুরীর কথায় গানটি ‘তিন দেবিয়াঁ’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছিল।
লাইভ পিয়ানোর সঙ্গতে আনোয়ারের গান দ্রুতই অনুষ্ঠানের সবার নজর কাড়েন। কূটনীতি ও রাজনীতির আনুষ্ঠানিকতার বাইরে মুহূর্তটি পরিণত হয় উষ্ণ সাংস্কৃতিক বিনিময়ে।
পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গাওয়ার একটি ভিডিও শেয়ার করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। ক্যাপশনে তিনি লেখেন, গুরু, একটু গান গাওয়ার অনুমতি দেবেন? ভিডিওটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই তার গায়কির প্রশংসা করেন।
ভারতীয় গান ও সিনেমার প্রতি আনোয়ারের ভালোবাসা অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও তিনি কিশোর কুমারের একই গান পরিবেশন করেছেন। ২০২৪ সালে দিল্লির একটি অনুষ্ঠানে তিনি মুকেশের জনপ্রিয় গান ‘দোস্ত দোস্ত না রাহা’ও গেয়েছিলেন।
হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রতিও আনোয়ারের আগ্রহ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি এর আগে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তি এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) ও পুরোনো তামিল চলচ্চিত্রের গানের প্রতি আনোয়ারের আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া যাত্রীবাহী জাহাজ ‘ভিরগো ট্রান্সপোর্ট-৮’-এর ১০৩ জন আরোহীকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। এ ছাড়া উদ্ধার তৎপরতা চলাকালে একজনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নৌযানটিতে থাকা অবশিষ্ট নিখোঁজ যাত্রী ও ক্রুদের সন্ধানে সমুদ্রজুড়ে এখনও ব্যাপক তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চলছে।
রবিবার সকালে পূর্ব জাভা প্রদেশের সুরাবায়া বন্দর থেকে কালিমানথান প্রদেশের বানজারমাসিনের উদ্দেশে যাওয়ার পথে জাহাজটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজ হওয়ার মুহূর্তে নৌযানটিতে সর্বমোট ২৪৩ জন যাত্রী ও ক্রু সদস্য অবস্থান করছিলেন। বানজারমাসিন উপকূল থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থানকালে নৌযানটি বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ার তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর দেশটির জাতীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে সেটির সর্বশেষ চিহ্নিত অবস্থানের দিকে হেলিকপ্টার ও বিশেষ উদ্ধারকারী জাহাজ পাঠায়।
উদ্ধারকাজ চলাকালে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ অনুসন্ধানকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সুদায়ানা জানান, আড়াই মিটার পর্যন্ত উঁচু ঢেউ অতিক্রম করে উদ্ধারকর্মীদের ওই অঞ্চলে কাজ করতে হচ্ছে। বৈরী পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘জাহাজগুলোর জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি আমাদের ৪০ মিটার দীর্ঘ বাসারনাসের জাহাজটিও বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’
উল্লেখ্য, প্রায় ১৭ হাজার দ্বীপ নিয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভ্যন্তরীণ যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য নৌযানই অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তবে প্রায়ই আকস্মিক দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং দুর্বল নিরাপত্তা বিধিমালার কারণে দেশটিতে বড় ধরনের নৌ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী জিজান প্রদেশে একটি মসজিদসহ একাধিক বসতবাড়ি ও যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, জিজানের আল-তুয়াল এলাকায় সংঘটিত এই আকস্মিক হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছেন। সৌদি আরবের বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোকে নিশানা করে পরিচালিত এ ধরনের আক্রমণ আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। এই হামলার পর সৌদি-ইয়েমেন সীমান্ত রেখায় পুনরায় সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
হামলার দায় স্বীকারের ক্ষেত্রে হুথি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে, তারা সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশের শারুরাহ এলাকার একটি সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে আঘাত হেনেছে। এর আগে গত মঙ্গলবারও দেশটির আভা, খামিস মুশাইত, জিজান এবং নাজরান অঞ্চলে একযোগে বড় ধরনের হামলা চালায় হুথিরা, যাতে নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়েছিলেন।
সীমান্তবর্তী হামলার পাশাপাশি সম্প্রতি ইয়েমেনের লোহিত সাগর তীরবর্তী কৌশলগত অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সরকারি বাহিনীর ওপর জোরালো স্থল অভিযান শুরু করেছে হুথি গোষ্ঠী। কয়েক দিনের ব্যবধানে সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে কয়েকশ কিলোমিটার এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশেই হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং স্থানীয় দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে পাঁচ শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ৫০ সহস্রাধিক সাধারণ মানুষ নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর দীর্ঘ সময় সীমান্ত অঞ্চলে আপেক্ষিক শান্তি বজায় থাকলেও সাম্প্রতিক এসব ধারাবাহিক হামলায় সেখানে পুনরায় বড় ধরনের যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাভা সাগরে দুই শতাধিক আরোহী নিয়ে চলাচলকারী একটি বড় যাত্রীবাহী জাহাজের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ আকস্মিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পূর্ব জাভা প্রদেশ থেকে বোর্নিও দ্বীপের দক্ষিণ কালিম্যানতানে যাওয়ার পথে নৌযানটি নিখোঁজ হওয়ার পর রবিবার ভোর থেকেই সমুদ্রজুড়ে ব্যাপক তল্লাশি ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছে দেশটির নৌ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারী কার্যালয়ের তথ্যমতে, ইন্দোনেশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবায়া বন্দর থেকে দক্ষিণ কালিম্যানতানের বানজারমাসিনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল 'ভার্গো ট্রান্সপোর্ট ৮' নামের ওই যাত্রীবাহী জাহাজটি। রবিবার ভোররাত আনুমানিক ২টার দিকে যানটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে বানজারমাসিন অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যালয়ের প্রধান আই পুতু সুদায়ানা জানান, 'জাহাজটি বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ার তথ্য পাওয়ার পরপরই এর পরিচালনাকারী সংস্থা বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানায়।'
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বানজারমাসিনের একটি জেটি থেকে প্রায় ১৪৮ কিলোমিটার (৯২ মাইল) দূরে জাভা সাগরে অবস্থানকালে জাহাজটির সর্বশেষ সংকেত পাওয়া গিয়েছিল। নৌযানটির আনুষ্ঠানিক তালিকা বা ম্যানিফেস্ট অনুসারে এতে মোট ২৪১ জন যাত্রী অবস্থান করছিলেন। জাহাজটির পরিচালনাকারী সংস্থা পিটি ভার্গো ইয়োয়েল রিহি জানিয়েছে, শনিবার সকাল ১০টা ১৩ মিনিটে সুরাবায়া বন্দর থেকে জাহাজটি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঘটনা জানার পরপরই বানজারমাসিনের বাচিরিহ সার্চ জেটি থেকে আধুনিক উদ্ধারকারী দল ও নৌযান সম্ভাব্য শেষ অবস্থানের দিকে পাঠানো হয়েছে। সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়া সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে নিখোঁজ যাত্রী ও ক্রুদের সন্ধানে সব ধরনের লজিস্টিক সক্ষমতা নিয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে কর্তৃপক্ষ।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর সর্বসম্মতিক্রমে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ গৃহীত হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে ‘সব ধরনের যুদ্ধ পদক্ষেপের’ কঠোর সমালোচনা তথা সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দা করার পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদসহ (ইউএনএসসি) বিশ্বের বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ‘কাঠামোগত সংস্কারের’ দাবি এবং সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনায় জোর দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে জোটের এই যৌথ ঘোষণাপত্র উন্মোচন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে এবারের ব্রিকস সম্মেলনকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিশ্বনেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্রিকসের প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকায় এবারের সম্মেলনের দিকে বিশেষ নজর রাখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
ব্রিকস কী?
ব্রিকস হলো ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার নামের আদ্যক্ষর নিয়ে গঠিত একটি জোট। এ অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক জোটটি ২০০৬ সালে গঠিত হয়েছিল এবং ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন ২০০৯ সালে প্রথম ব্রিক শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়। এর এক বছর পর দক্ষিণ আফ্রিকা এই জোটে যোগ দেয়।
২০২৩ সালে সদস্যপদের আবেদন জানানোর পর মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ব্রিকসে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। একই সময়ে আর্জেন্টিনাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু ডিসেম্বরে নির্বাচিত দেশটির প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার মিলেই বিশ্ব পরাশক্তি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালানোর কারণে শেষ পর্যন্ত এই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটি আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করে।
ইন্দোনেশিয়া ২০২৫ সালে এই জোটে যোগদান করে। বর্তমানে ব্রিকস বিশ্বের ১১টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪০ শতাংশ দখল করে রয়েছে।
যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে যৌথ ঘোষণায় সম্মত ব্রিকস
টানা সাত মাস ধরে যুদ্ধের দাবানলে পুড়ছে মধ্যপ্রাচ্য। আঞ্চলিক এই সংঘাতের প্রভাবে ভুগছে পুরো বিশ্ব। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন।
শনিবার প্রথম দিনের সম্মেলনেই যে কোনো প্রকার একতরফা যুদ্ধের কড়া নিন্দা জানিয়ে যৌথ ঘোষণাপত্রে একমত হয়েছে ব্রিকস জোটভুক্ত দেশগুলো। তবে এই ঘোষণাপত্রে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম সরাসরি উল্লেখ থাকছে না। শীর্ষ সম্মেলনে জোটের শীর্ষ নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণাপত্র অনুমোদন করবেন।
এসব তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সূত্রমতে, মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরীয় সংঘাতকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা দুই সদস্য রাষ্ট্র ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্য নিরসনে নিবিড় আলোচনার পর চূড়ান্ত এই সমঝোতায় পৌঁছায় সদস্য দেশগুলো।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস নেতাদের উচ্চপর্যায়ের শীর্ষ সম্মেলন শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে কূটনৈতিক এই বড় অগ্রগতির খবর আসে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ পুনরায় ছড়িয়ে পড়া এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের লোহিত সাগরে প্রভাব বিস্তারের ফলে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সৃষ্টি হওয়া অচলাবস্থার আবহেই এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
গত মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে তেহরান ও আবুধাবির তীব্র মতপার্থক্য কোনো যৌথ ইশতেহার প্রকাশে মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরে আগস্টে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাত তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিত করলে সংঘাত নতুন মাত্রা পায়।
তবে কূটনীতিকদের ধারাবাহিক মধ্যস্থতায় অবশেষে দুই পক্ষই গৃহীত যৌথ ভাষার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে। আয়োজক দেশ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথ ইশতেহারের বিষয়বস্তু নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য না করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও একতরফা আগ্রাসনের বিপরীতে গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান দেশগুলোর সুদৃঢ় ঐক্যের বার্তা বহন করে।
এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিঅ) মতো পশ্চিমা-প্রভাবিত বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ভারসাম্য আনায় জোর দিচ্ছে জোটটি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে আয়োজিত এই হাই-প্রোফাইল সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা এবং আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতারা।
নিষেধাজ্ঞার মুখে অর্থনৈতিক সংহতি
এ বছরের শীর্ষ সম্মেলনে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফরাসি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাটিক্সিস’র এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, ব্রিকসের সদস্য দেশ রাশিয়া ও ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্বনেতারা আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের মাধ্যম ও নতুন উপায় নিয়েও আলোচনা করবেন।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, তবে তারা কিন্তু মার্কিন ডলারকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করার চেষ্টা করবে না। ক্রেমলিন বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, নতুন দিল্লিতে চলতি সপ্তাহের শীর্ষ সম্মেলনে ডিজিটাল মুদ্রায় বাণিজ্যের নিষ্পত্তির বিষয়ে ব্রিকস অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে রাশিয়া।
বেঙ্গালুরুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘তক্ষশীলা ইনস্টিটিউট’র জিওস্ট্রেটেজি প্রোগ্রামের চেয়ারম্যান মনোজ কেওয়ালরামানি বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের মধ্যে ব্রিকস নেতারা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন, তা মূলত সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সেগুলোর ঝুঁকি দূর করার প্রাথমিক পদক্ষেপ।’
এ বছরের শীর্ষ সম্মেলনটির গুরুত্ব যেখানে
‘জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’র বিশিষ্ট ফেলো ইয়ান লেসার আল জাজিরাকে জানান, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েনের পটভূমিতে এই ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনটি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনকে গ্লোবাল সাউথের (দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নশীল বিশ্ব) শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর সাথে তার শক্তিশালী সম্পর্কের বিষয়টি প্রদর্শনের একটি সুযোগ করে দেবে।
তিনি বলেন, এটি রাশিয়া ও চীনের জন্য ওয়াশিংটনের অনিশ্চিত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নীতি থেকে মুক্ত থাকতে চাওয়া এবং নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে চাওয়া অনেক দেশের মনোভাবকে কাজে লাগানোরও একটি সুযোগ প্রদান করছে।
এই শীর্ষ সম্মেলনটি তার সময়ের দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। চলতি বছরের দ্বিতীয় চীন-মার্কিন শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক পরপরই এটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এক রাষ্ট্রীয় সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পিপলস লিবারেশন আর্মির অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কর্নেল ঝো বো আল জাজিরাকে বলেন, ব্রিকস নেতাদের একত্রিত হওয়া নতুন কিছু নয় এবং এটি তাদের বার্ষিক সম্মেলনেরই অংশ। তবে এ বছর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছর পর ভারতে যাচ্ছেন—এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বেইজিং ও নতুন দিল্লির সম্পর্ক বেশ শীতল ও তিক্ত ছিল। তাই এই শীর্ষ সম্মেলনটি প্রেসিডেন্ট শি এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য তাদের বিদ্যমান মতপার্থক্য নিরসনের একটি উপযুক্ত সুযোগ।
ইসরায়েলি-দখলকৃত সিরিয়ার ভূখণ্ডে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সফরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেতানিয়াহুর এই সফরকে ‘অবৈধ প্রবেশ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) প্রকাশিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বুধবার সিরিয়ার ইসরায়েল-অধিকৃত এলাকায় নেতানিয়াহুর সফর দেশটির ‘সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য অবমাননা।
বিবৃতিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলের ‘লঙ্ঘন ও আগ্রাসন’ বন্ধ করার ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে ১৯৭৪ সালের ইসরায়েল-সিরিয়া বিচ্ছিন্নতা চুক্তি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদ, যাতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
বুধবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজকে সঙ্গে নিয়ে সিরিয়ার ইসরায়েল-অধিকৃত জাবাল আল-শেখ এলাকায় সফর করেন নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি দাবি করেন, জাবাল আল-শেখ থেকে ইয়ারমুক নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ইসরায়েল নজিরবিহীন ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠা করেছে।
নেতানিয়াহুর এই সফরকে সিরিয়ার সার্বভৌমত্বের অবৈধ লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীদের চুল-মেকআপে খরচ ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার
২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীদের দেশ-বিদেশের সরকারি কার্যক্রমে চুল সাজানো, মেকআপ এবং আনুষঙ্গিক প্রতিনিধিত্ব ব্যয় বাবদ প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার খরচ করেছে দেশটির সরকার। তথ্য অধিকার আইনে করা এক আবেদনের পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এসব তথ্য প্রকাশ করেছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আইনজীবী ইয়ারা উইঙ্কলার-শালিত তথ্য অধিকার আইনে আবেদনটি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মোট চুল ও মেকআপ ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশই হয়েছে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী সারার সময়ে।
প্রকাশিত নথির একাধিক জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হেয়ারস্টাইলিস্ট ও মেকআপ শিল্পীদের নাম মুছে দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্য গোপন রাখার কারণ হিসেবে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে মাসভিত্তিক ব্যয়ের হিসাবও দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর সময়ের আশপাশের সময়ের ব্যয়ও এতে উঠে এসেছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর চুল সাজাতে প্রায় ২ হাজার ৬০০ ডলার এবং মেকআপের জন্য ১ হাজার ৫৮০ ডলার খরচ করেছে রাষ্ট্র।
শুধু ২০২৩ সালের অক্টোবরেই প্রধানমন্ত্রীর চুল সাজানোর জন্য ৮১০ ডলার ব্যয় করা হয়। বিভিন্ন সরকারের সময়ে এই ব্যয়ের পরিমাণে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। ২০২৩ সালে মোট ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ডলার। এর আগের বছর ২০২২ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের সময়ে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ২৭ হাজার ৬০০ ডলার।
২০২৫ সালে এ ধরনের ব্যয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার ডলারে দাঁড়ায়। এর বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটন সফরের সময় মেকআপ ও চুল সাজাতে ১৩ হাজার ৫০০ ডলার খরচ হয়। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ওয়াশিংটন সফরেও একই খাতে ব্যয় হয়েছিল ১১ হাজার ৫০০ ডলার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এর হাতে আসা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ভারতের অরুণাচল প্রদেশের বিতর্কিত সীমান্ত বরাবর এবং এর কাছাকাছি একাধিক স্থানে অবকাঠামোর দ্রুত বিস্তার ঘটিয়েছে চীন। যার মধ্যে রয়েছে নতুন নতুন ভবন, পাকা সড়ক এবং একাধিক হেলিপ্যাডসহ নানা স্থাপনা। এ কারণে চীনের সঙ্গে ভারতের প্রত্যন্ত সীমান্ত গ্রামগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী জানিয়েছে, চীনা সেনাবাহিনীর দ্রুত অগ্রযাত্রার কারণে তারা তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যবাহী চারণভূমি ও শিকারের জমি ছেড়ে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।
হিমালয়ের দুর্গম এই অংশের সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক দাবি-পাল্টা দাবি রয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে ভারতীয় বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখা কঠিন। স্যাটেলাইট চিত্রে ফুটে ওঠা এই রূপান্তর সীমান্তবর্তী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অরুণাচল প্রদেশে সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দা তাকোক ম্রা। পুরো অরুণাচল প্রদেশকেই চীন নিজেদের অংশ দাবি করে একে ‘জাংনান’ বা ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বলে ডাকে। ম্রা জানান, পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে তিনি চীনা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত।
ম্রা বলেন, ‘চীনারা এখন আমাদের পূর্বপুরুষের জমি দখল করছে। এই ভূখণ্ড থেকেই আমরা খাবার সংগ্রহ করি, বেঁচে থাকি এবং জীবিকা নির্বাহ করি; এটা আমাদেরই জমি। তারা ইতোমধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তারা ঠিক কত কিলোমিটার জায়গা দখল করেছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারব না, তবে তারা অনেক বড় এলাকা দখল করে নিয়েছে।’
ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ভারত সফর করছেন।শনিবার তিনি নয়াদিল্লী পৌঁছান। সেখানে তার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার বৃহত্তম চীনা প্রতিনিধি দলের এই সফরকে কেন্দ্র করে উভয় সরকারই সীমান্ত উত্তেজনাকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। তারা দাবি করছে, ২০২০ সালে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার প্রাণহানি ঘটানো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মতো কোনো অচলাবস্থা সীমান্তে নেই।
তবে স্যাটেলাইট চিত্র এবং সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দাদের সাক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। চিত্রগুলোতে বিতর্কিত ভূখণ্ডে চীনাদের ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং অবকাঠামো নির্মাণের স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে, যা এখনো দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে আছে।
ভ্যান্টর-এর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট চিত্রে বিশ্লেষকরা আপার সুবনসিরি উপত্যকায় একাধিক স্থানে সাম্প্রতিক নির্মাণ ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। তাকোক ম্রার গ্রাম ‘গেলেমো’ এই অঞ্চলেই অবস্থিত।
আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য সংস্থা ‘জেনস’-এর তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের লহুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের কাছাকাছি দুটি এলাকায় সবচেয়ে স্পষ্ট নির্মাণযজ্ঞ দেখা গেছে। এই এলাকাটি বর্তমানে চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জেনসের বিশ্লেষকরা বলেন, ‘স্যাটেলাইট চিত্র নিশ্চিত করছে যে সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় সম্প্রতি নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে।’ তারা আরও যোগ করেন, স্যাটেলাইট চিত্রের ওপর ভারত ও চীন উভয়ের দাবি করা সীমান্তরেখা বসালে দেখা যায়—এই অবকাঠামোগুলোর কিছু অংশ দুই দেশেরই দাবি করা বিতর্কিত অঞ্চলের একেবারে ভেতরে পড়েছে।
ঝারি শহরের দক্ষিণে একটি স্থানে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল—যার প্রথম কাঠামো চোখে পড়ে ওই বছরের আগস্টে—যা এখনো চলমান রয়েছে। স্থানটিতে জমি সমান করা, প্রকৌশল যানের উপস্থিতি এবং সিমেন্ট তৈরির প্ল্যান্ট বসানোর প্রমাণ মিলেছে। বিশ্লেষকরা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছেন, এটি সামরিক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শহরের ভেতরে অপর একটি নির্মাণস্থল সামরিক স্থাপনা হওয়ার সম্ভাবনাও সমানভাবে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কাছাকাছি একটি সড়কের প্রশস্ততা বাড়ানো হয়েছে এবং খাড়া ঢাল কমানো হয়েছে—এমন উন্নয়ন সাধারণত ভারী সামরিক সরঞ্জাম আনা-নেওয়া সহজ করে এবং বছরজুড়ে সড়ক ব্যবহারের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে গণ্য হয়।
লহুনজের দক্ষিণে দুটি ছোট হেলিপ্যাডের বদলে একটি নতুন বড় হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়েছে এবং এর আরও দক্ষিণে আরেকটি নতুন হেলিপ্যাড গড়ে তোলা হয়েছে।
২০২৬ সালের আগস্টের সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, অন্তত একটি ভবনের ছাদ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রমাণ করে নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। ভবনের নকশা, সামরিক যানের সাথে মিল থাকা গাড়ির উপস্থিতি এবং সংলগ্ন প্রশিক্ষণ এলাকা দেখে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে এটি সম্ভবত একটি সামরিক ঘাঁটি। এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে শহরের সঙ্গে সংযোগকারী একটি নতুন সড়কও তৈরি করা হয়েছে।
এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এই অভিযোগগুলো সামনে এলো যখন চীন-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকার সীমান্ত সংঘর্ষের পর—যা দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল—শি জিনপিংয়ের এটিই প্রথম দিল্লি সফর। এই সফরে তার সঙ্গে প্রায় ৪০০ কর্মকর্তার একটি বিশাল প্রতিনিধি দল রয়েছে।