দুই যুগ ধরে সিরিয়া শাসন করেছেন প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ। বিদ্রোহীদের অভ্যুত্থানের মুখে অবশেষে পতন ঘটেছে তার। দেশটির রাজধানী দামেস্ক ছেড়ে পালিয়েছেন তিনি। সিরিয়া থেকে পালিয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন বাশার আল-আসাদ। তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যসহ তিনি মস্কোয় অবস্থান করছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রাশিয়ার বার্তা সংস্থা তাস ও রিয়া নভস্তির বরাত দিয়ে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ তার পরিবারের সদস্যরা মস্কোয় পৌঁছেছেন। মানবিক দিক বিবেচনা করে রাশিয়া তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছে।
এর আগে সিরিয়ার বিদ্রোহী যোদ্ধাদের মাত্র ১২ দিনের অভিযানে রোববার বাশার সরকারের পতন ঘটে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে তার দুই যুগের শাসনের অবসান ঘটে। এর আগে বাশারের বাবা হাফিজ আল-আসাদ প্রায় ২৯ বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় বসেন বাশার। শুরুতে সংস্কারের পথে হাঁটলেও পরে বাবার মতোই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠেন তিনিও। তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধীদের দমনে ব্যাপক নিপীড়ন চালনোর অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্রোহীদের অভিযানে বাশারের পতনের পর রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বাশার প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিয়ে দেশত্যাগে সম্মত হন। তবে তিনি কোন দেশে গেছেন বা কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে ওই বিবৃতিতে কিছু উল্লেখ ছিল না। তবে মস্কো এটাও বলেছিল, সিরিয়ার বাশারবিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছে।
রাশিয়ার বার্তা সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে এএফপি জানিয়েছে, সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিয়েছে সিরিয়ার বিদ্রোহীরা। সিরিয়ায় রাশিয়ার কূটনীতিক স্থাপনাগুলোরও নিরাপত্তা দেবে বিদ্রোহীরা। রুশ কূটনীতিকরা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
আসাদের আশ্রয়ের অনুমোদন দিলেন পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্যক্তিগতভাবে বাশার আল আসাদকে মস্কোয় আশ্রয় দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছেন। সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে দামেস্কের পতনের পর সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবার রাশিয়ায় পৌঁছেছেন বলে খবর প্রকাশের পর এ তথ্য প্রকাশ করা হলো।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, পুতিন ও আসাদের মধ্যে কোনো বৈঠক হওয়ার কথা নেই। আসাদ কোথায় আছেন, সে বিষয়েও কিছু বলার নেই। আসাদকে কীভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে পেসকভ বলেন, রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এটা তার (ভ্লাদিমির পুতিন) সিদ্ধান্ত।
রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মিখাইল উলিয়ানভ গতকাল সোমবার সকালে নিশ্চিত করেছেন, আসাদ ও তার পরিবার মস্কোতে রয়েছেন। এটি চ্যালেঞ্জিং সময়ে তার মিত্রদের প্রতি রাশিয়ার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তিনি বলেন, রাশিয়া কঠিন পরিস্থিতিতে তার বন্ধুদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়।
এর আগে রোববার রুশ গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ‘মানবিক কারণে’ আসাদ ও তার পরিবারকে রাশিয়ায় আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সশস্ত্রবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনার পর আসাদ পদত্যাগে সম্মত হন এবং ‘শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর’ নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
মস্কোয় সিরীয় দূতাবাসে উড়ল বিরোধীদের পতাকা
দামেস্কে বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের এক দিন পর রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় সিরীয় দূতাবাসে বিরোধীদের পতাকা উত্তোলন করেছে একদল লোক। গতকাল সোমবার দূতাবাসের এক প্রতিনিধি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসকে বলেন, সিরিয়ার দূতাবাস খোলা হয়েছে এবং আজ নতুন পতাকার নিচে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা হচ্ছে।
মস্কো টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূতাবাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুষারপাতের মধ্যে কয়েকজন হাততালি দেয় এবং গান গান। তারা সিরিয়ার বিরোধীদের সবুজ, লাল, কালো এবং সাদা পতাকা উত্তোলন করেন।
বিদ্রোহীদের মাত্র ১২ দিনের অগ্রাভিযানের মুখে বাশার আল আসাদের অবিশ্বাস্য পরাজয় বিস্মিত করেছে আন্তর্জাতিক সব মহলকে। সরকারবিরোধী বিদ্রোহীরা রোববার (৮ ডিসেম্বর) রাজধানী দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নিলে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় উড়াল দেন। তার দেশত্যাগের পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ আল-জালালি জনগণের নির্বাচিত নেতৃত্বকে সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি সব পক্ষকে স্থিতিশীলতার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে ভারতের সম্পর্ক। গাজায় যুদ্ধের মধ্যেই এই সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই পরিবর্তন নতুন নয়। তবে গাজা যুদ্ধের সময় এই ঘনিষ্ঠতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি ইসরায়েলের ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের ভারত সফর। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ভারত সফরে গিয়ে দিল্লি, মুম্বাই ও গুজরাটে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। তখন গাজায় ইসরায়েলের অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা চলছিল।
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ভারত ফিলিস্তিনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ভারত আপত্তি জানিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইহুদিবাদ বা জায়নবাদকে বর্ণবাদের একটি রূপ হিসেবে বর্ণনা করা প্রস্তাবের পক্ষেও ভারত ভোট দিয়েছিল। ভারত ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকে আরব বিশ্বের বাইরের প্রথম দিকের সমর্থনকারী দেশগুলোর একটি ছিল। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকেও প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে ভারত স্বীকৃতি দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের ধরন বদলেছে। ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০১৬ সালে মোদি হন প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি ইসরায়েল সফর করেন। এর আগে, দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা থাকলেও তা অনেকটাই আড়ালে ছিল বলে মন্তব্য করেন সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক নভদীপ সুরি। তার মতে, মোদি সরকারের সময়ে এই সম্পর্ক আরও প্রকাশ্য হয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর ভারতের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নরেন্দ্র মোদি একে ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে নিন্দা করেন। ইসরায়েলের প্রতি ভারতের এই সমর্থনকে বিশ্লেষকরা দেশটির নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন।
দিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক রশিদ কিদওয়াইয়ের মতে, ইসরায়েলকে হামলার শিকার দেশ হিসেবে তুলে ধরার বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে এটি ভারত সরকারের ঘোষিত অবস্থান নয়।
ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হলো প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা। ভারত ইসরায়েলের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম কিনে থাকে। গাজা যুদ্ধের সময়ও ভারত থেকে ইসরায়েলে অস্ত্র রপ্তানির বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে ভারত সরকারের অবস্থান ও রপ্তানি সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সাবেক কূটনীতিক নভদীপ সুরি বলেন, ‘নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বাস্তব স্বার্থের মিল রয়েছে।’
ইউরোপ দূরে ঠেললেও কাছে টেনেছে ভারত
গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইউরোপের কয়েকটি দেশও সাম্প্রতিক সময়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ অবৈধ বসতি থেকে আসা পণ্যের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিয়েছে। কিছু দেশ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও তাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। ইসরায়েলের দুই ডানপন্থি নেতা স্মোটরিচ ও ইতামার বেন-গভিরের বিরুদ্ধেও কয়েকটি দেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যে ভারত তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান ধরে রেখেছে। দিল্লি এখনো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে। পাশাপাশি গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং শান্তির আহ্বানও জানিয়ে আসছে ভারত। তবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে ভারতের সমালোচনা তুলনামূলকভাবে সীমিত— এমন মত রয়েছে বিশ্লেষকদের।
মোদির হিসাব কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ভারত-ইসরায়েল সম্পর্কের পরিবর্তন শুধু গাজা যুদ্ধ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। মোদি সরকারের আগে থেকেই প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক বাড়ছিল।
তবে গত বুধবারের হামলার পর ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির তুলনাও করেন কিছু বিশ্লেষক। তাদের মতে, ইসরায়েলকে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী নীতির উদাহরণ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে ভারতের ডানপন্থি মহলে। তবে এই ব্যাখ্যাকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা যায় না।
ফিলিস্তিন নীতিতে কি বড় পরিবর্তন?
ভারত এখনো ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিকে সমর্থন করে। দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষেও দিল্লির আনুষ্ঠানিক অবস্থান রয়েছে। তবে একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কও দ্রুত বেড়েছে। ফলে গাজা যুদ্ধের সময় ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান আগের তুলনায় বেশি ইসরায়েলঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখছেন কিছু বিশ্লেষক।
অর্থাৎ, ভারতের নীতিতে ফিলিস্তিনের সমর্থন পুরোপুরি বিলীন হয়নি। কিন্তু মোদি সরকারের সময়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক যে আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ্য ও কৌশলগত হয়েছে, তা দুই দেশের সম্পর্কের সাম্প্রতিক গতিপথে স্পষ্ট।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও মতাদর্শের প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই পরিবর্তন কেবল পররাষ্ট্রনীতির নমনীয়তা নয়, বরং বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বয়ানেরই প্রতিফলন। সন্ত্রাসবাদবিরোধী যৌথ সুর: গত বুধবারের হামলার পরপরই মোদি দ্রুত নিন্দা জানান এবং পরবর্তীকালে এটিকে ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও মুম্বাই হামলার মতো প্রেক্ষাপটের সাথে তুলনা করে ব্যাখ্যা করেন।
আদর্শগত মিল
হিন্দুত্ববাদী আদর্শে বিশ্বাসী ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের ‘জায়নিজম’ এবং তাদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত কঠোর কাঠামোর প্রতি বিশেষ সহানুভূতি দেখা যায়। বিশ্লেষক রশীদ কিদওয়াইয়ের মতে, ভারতে উগ্র ইসলামভীতি ও মুসলিমবিরোধী মনোভাব ইসরায়েলের নীতি সমর্থন করতে মোদি সরকারকে নীতিগত জায়গা করে দেয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সম্পূর্ণ যোগ্য, তবে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি শেষ পর্যন্ত তাঁকে এই সম্মাননা দেবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় সময় বুধবার (৭ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ দাবি করেন। আগামী শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের অসলো থেকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এই ঘোষণার প্রাক্কালে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, কমিটি কী সিদ্ধান্ত নেবে তা তাঁর জানা নেই; তবে তাঁর মতো মানুষদের এই পুরস্কার না দেওয়ার ব্যাপারে নোবেল কমিটির একটি ঐতিহ্য বা খ্যাতি রয়েছে।
পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জনের বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওভাল অফিসের বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন যে ‘এখন সেই সময়টি এসেছে’ এবং নিজের বৈশ্বিক কূটনৈতিক তৎপরতার খতিয়ান তুলে ধরে দাবি করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্তত আটটি সংঘাত নিরসনে বা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে তিনি কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। তবে বিশ্বমঞ্চের এসব সংঘাতের প্রকৃত চরিত্র এবং সেগুলো সামাল দিতে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে যথেষ্ট দ্বিমত ও বিতর্ক রয়েছে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোর প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প জানান, মাচাদোর কাছ থেকে পরোক্ষভাবে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করেছেন। ২০২৫ সালের শান্তিতে নোবেলজয়ী মাচাদো চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসে এক বৈঠকের সময় ট্রাম্পের প্রতি কৃতজ্ঞতার স্মারক হিসেবে নিজের নোবেল পদকটি উপহার হিসেবে তুলে দিয়েছিলেন। যদিও নোবেল কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পুরস্কার একবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পর তা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর, ভাগাভাগি কিংবা বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে কম্বোডিয়া, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের নেতারা চলতি বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য ট্রাম্পকে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি করেছেন। তবে নোবেল কমিটি সংশ্লিষ্ট মনোনয়ন ও মনোনয়নদাতাদের সব ধরনের তথ্য দীর্ঘ সময়ের জন্য অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সংরক্ষণ করায় এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করার কোনো উপায় নেই। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য বিশ্বজুড়ে মোট ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করা হয়েছে, যাদের মধ্য থেকে চূড়ান্ত বিজয়ীর নাম শুক্রবার প্রকাশ করা হবে।
অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিসে যুগান্তকারী উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন প্রখ্যাত রসায়নবিদ অঁরি বি. কাগান এবং কেনসো সোয়াই। রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নন-লিনিয়ার ইফেক্টস ও অটো ক্যাটালিসিস আবিষ্কারের মাধ্যমে ওষুধ, সুগন্ধি ও নতুন সামগ্রী তৈরির শিল্পে অভূতপূর্ব দুয়ার খুলে দেওয়ার সম্মানার্থে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস তাদের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে মনোনীত করে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে তাদের নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস। নোবলে পুরষ্কারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিসে নন-লিনিয়ার ইফেক্টস এবং অটো ক্যাটালিসিস আবিষ্কারের জন্য’ অঁরি বি. কাগান এবং কেনসো সোয়াইকে ২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
অঁরি বি কাগান ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি প্যারিস-সুদে কর্মরত এবং কেনসো সোয়াই টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সাইন্সে কর্মরত।
অঁরি কাগান রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন উপায় আবিষ্কার করেছিলেন, যা পূর্বের ধারণার চেয়েও একটি নির্দিষ্ট মিরর ইমেজের (আণবিক প্রতিচ্ছবি) বৃহত্তর আধিক্য তৈরির সুযোগ করে দেয়। রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে যারা ওষুধ, সুবাস, সুগন্ধি এবং নতুন সামগ্রী তৈরি করেন, সেই রসায়নবিদদের জন্য তাঁর এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে।
কেনসো সোয়াই এমন প্রথম রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা করেছিলেন, যেখানে সম্ভাব্য অনুমিত মিরর ইমেজগুলোর মধ্যে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রতিচ্ছবি তৈরি হতো। জীবনপ্রক্রিয়া বা প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম ব্যতিরেকে এর আগে কেউ এই কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেনি। সোয়াই বিক্রিয়াটি এযাবতকাল পরিচালিত সবচেয়ে চোখধাঁধানো রাসায়নিক পরীক্ষাগুলোর একটি।
নোবেল পুরষ্কারের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, কিছু অণু, যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড, দুটি ভিন্ন রূপে অবস্থান করে যা একে অপরের আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিরূপ (মিরর ইমেজ)। তবে জীবদেহে এই প্রতিরূপগুলোর মধ্যে কেবল একটিমাত্র রূপই বিদ্যমান থাকে। রাসায়নিক ব্যবস্থার এই ধরনের অসমতা কীভাবে উদ্ভূত হতে পারে, তা রসায়নবিদদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে এক বড় রহস্য ছিল। এই ধাঁধার সমাধানই আবিষ্কার করেছে অঁরি বি. কাগান এবং কেনসো সোয়াইকে ২০২৬ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।
অ্যাসিমেট্রিক অর্গানিক সিন্থেসিস বিষয়টি খুব সহজ করে বোঝার জন্য আমাদের ডান হাত আর বাম হাতের উদাহরণ দেওয়া যায়। আপনার ডান হাত আর বাম হাত দেখতে প্রায় একই রকম, আঙুলগুলোর সাজানো রূপও এক। কিন্তু আপনি যদি ডান হাতের ওপর বাম হাত এনে রাখার চেষ্টা করেন, দেখবেন একটার ওপর অন্যটা একদম নিখুঁতভাবে মিলবে না। তবে আয়নায় যদি ডান হাতটি ধরেন, তবে আয়নার প্রতিচ্ছবিটিকে দেখতে ঠিক বাম হাতের মতোই লাগবে।
রসায়নের ভাষায় কিছু অণুর গঠনও ঠিক এমনই। এরা দেখতে একই রকম হলেও এদের ‘ডানহাতি’ (ডি–ফর্ম) ও ‘বামহাতি’ (এল–ফর্ম) দুটি রূপ থাকে, যেগুলোকে বলা হয় এনানশিওমার। সাধারণত গবেষণাগারে যখন কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো হয়, তখন আপনা-আপনি ৫০ শতাংশ ডানহাতি এবং ৫০ শতাংশ বামহাতি অণু তৈরি হয়ে যায়।
দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ ‘ইন্ডিয়া’ জোটের একাধিক নেতাকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার (৭ অক্টোবর) ভোটার তালিকা সংশোধন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের সময় এ ঘটনা ঘটে। পরে আটক নেতাদের বাসে তোলা হলে তারা সেখান থেকে নেমে রাস্তায় অবস্থান নেন।
কংগ্রেসের দাবি, টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাসহ বিরোধী নেতাদের আটক করা হয়। তারা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি জানিয়ে আসছেন।
পুলিশের ভাষ্য, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করতে পূর্বানুমতি প্রয়োজন। এ ধরনের কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আগাম অনুমতি নেওয়ার কথা রয়েছে। বুধবার বিরোধী সাংসদেরা মধ্য দিল্লির একটি রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজের পর বাসে করে যন্তর মন্তরের দিকে রওনা হলে পুলিশ তাদের পথ আটকে দেয়।
প্রাথমিকভাবে রাহুল গান্ধীসহ কয়েকজন নেতাকে একটি বাসে তোলা হয়। পুলিশ অন্য নেতাদের আটক করতে গেলে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের কয়েকজন নেতা বাস থেকে নেমে রাস্তায় বসে পড়েন। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
এর আগে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের আমন্ত্রণে দিল্লির জনপথের একটি রেস্তোরাঁয় বিরোধী জোটের নেতারা মধ্যাহ্নভোজে মিলিত হন। সেখান থেকে তারা যন্তর মন্তরে গিয়ে আবারও বিক্ষোভ করার সিদ্ধান্ত নেন। খাড়গে অভিযোগ করেন, গণতন্ত্র ধ্বংস করা হচ্ছে এবং ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ জনগণের কাছে তুলে ধরবে বিরোধীরা।
মধ্যাহ্নভোজের পর রাহুল গান্ধী বলেন, বিরোধী সাংসদেরা যন্তর মন্তরে গিয়ে একসঙ্গে অবস্থান করবেন। তিনি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তাঁর এসব অভিযোগ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে এসেছে; নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন বিজেপি নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রাহুল আরও বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআর নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। তাঁর দাবি, ইতিমধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে ৪৫টি এফআইআর রয়েছে এবং তিনি ১০০টি এফআইআর হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
মঙ্গলবারও একই ইস্যুতে দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ করেন বিরোধী সাংসদেরা। নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে পদযাত্রায় বাধা দেওয়ার পর রাহুল, প্রিয়াঙ্কাসহ কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছিল। পরে রাতে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার বিরুদ্ধে বিনা অনুমতিতে আকাশবাণী ভবনে প্রবেশ ও সেখানে অবস্থানের অভিযোগে মামলা হওয়ার কথাও জানিয়েছে কংগ্রেস।
বুধবারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় আবারও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরোধীরা বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
গত মাসে চীন-নেপাল সীমান্তে ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ স্বজনদের স্মরণসভা আয়োজিত হয়েছিল কাঠমান্ডুর বাগমতী নদীর তীরে পশুপতিনাথ মন্দিরে। অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন বেত্রাবতী গ্রামের মদন লাল লাওয়াত। লাওয়াতের ভাইসহ পাঁচ আত্মীয় সেদিন ভয়াবহ স্রোতে ভেসে গিয়েছিলেন। এখনো তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বন্যার সময় গ্রামের বাইরে থাকায় বেঁচে যান লাওয়াত।
এখনো ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ। সরকার উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, কারও মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব না হলে পবিত্র ‘কুশ’ ঘাস দিয়ে মৃত ব্যক্তির প্রতীকী প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়। এর মাধ্যমে স্বজনরা মৃত ব্যক্তির শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারেন। মদন লাল লাওয়াতের মতো মানুষদের কাছে মৃত স্বজনদের সম্মান জানানোর এখন এটাই একমাত্র উপায়।
বন্যার পর ফিরে এসে লাওয়াত অন্যদের কাছ থেকে শোনেন, তার ভাই মঙ্গল এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে গিয়ে সবাইকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সতর্কবার্তা দিতে গিয়ে নিজেই প্রাণ হারান। লাওয়াত বলেন, ‘কীভাবে নতুন করে জীবন শুরু করব, আমি জানি না। পুলিশ বলছে, তারা এখনো মরদেহের সন্ধান করছে। কিন্তু আমার মনে হয় না, তারা কখনো মরদেহগুলো খুঁজে পাবে।’
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মৃত্যু হয়েছে এ নিয়ে লাওয়াতের মনে সন্দেহ নেই। কিন্তু আইনগতভাবে তাদের পরিণতি অনেক বেশি জটিল। নেপালে কোনো নিখোঁজ ব্যক্তিকে ১২ বছর পর মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়।
নেপালের দেওয়ানি আইনের ৪০ ধারায় কিছু ব্যতিক্রমের সুযোগ রয়েছে। তবে গত মাসে দেখা দেওয়া ভয়াবহ বন্যার মতো দুর্যোগের ক্ষেত্রে কী করা হবে, সে বিষয়ে আইনে কোনো বিধান নেই। নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা মৃত্যুসনদ পেতে সমস্যায় পড়ছেন। এর প্রভাব পড়ছে বন্যার ক্ষতিপূরণ পাওয়া থেকে শুরু করে সম্পত্তি হস্তান্তর, এমনকি উত্তরাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও।
স্বজনরা শেষকৃত্যের খরচ হিসেবে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার রুপি (১২২ পাউন্ড বা ১৬২ ডলার) পেতে পারেন। এর পাশাপাশি প্রথম যে স্বজন মারা গেছেন, তার জন্য প্রায় ২ লাখ রুপি (৯৮১ পাউন্ড বা ১ হাজার ৩০২ ডলার) এবং পরবর্তী প্রতিটি মৃত্যুর জন্য ১ লাখ রুপি (৪৯১ পাউন্ড বা ৬৫১ ডলার) করে শোকজনিত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু এসব অর্থ পেতে হলে প্রথমে মৃত্যুসনদ জমা দিতে হয়। ফলে পরিবারগুলো প্রশাসনিক জটিলতার এক দুঃস্বপ্নে আটকে পড়েছেন।
বিদেশে চলে যাওয়া এবং বছরের পর বছর কোনো খোঁজ না পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই মূলত এই আইন করা হয়েছিল বলে জানান সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ বিপিন অধিকারী। তিনি বলেন, ‘বর্তমান দুর্যোগের বিষয়টি বিবেচনা করলে আইনটি এখন সেকেলে। এখন প্রযুক্তি অনেক এগিয়েছে। তথ্য পাঠানো বা গ্রহণ করা আর এতটা কঠিন নয়।’
লাওয়াতের জন্য এই আইনগত জটিলতা ইতোমধ্যে ভয়াবহ হয়ে ওঠা স্বজন হারানোর শোককে আরও কঠিন করে তুলেছে। গত সপ্তাহে ভাই ও আত্মীয়দের মৃত্যুসনদ নিতে গেলে স্থানীয় পৌরসভা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘তারা বলেছেন, মৃত্যুসনদের বিষয়টি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। এখন কী করতে হবে, আমরা বুঝতে পারছি না। সবকিছুই খুব অনিশ্চিত।’
এমনকি মরদেহ উদ্ধার হলেও সেগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা ধীরগতির ও কঠিন কাজ। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এত বড় পরিসরে ডিএনএ পরীক্ষা করার অভিজ্ঞতা নেপালের খুব বেশি নেই। কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর সেগুলো মাটিতে চিহ্ন রেখে দাফন করেছে, যাতে পরে কোনো পরিবার দাবি করলে মরদেহ শনাক্ত করা যায়।
নেপাল সরকারের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, ৭ হাজার ৫৭০টি ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। আদমশুমারির তথ্যানুযায়ী, এসব ভবনে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষ বসবাস করতেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বলছে, তাদের জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন।
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া ও নুওয়াকোট জেলার মধ্যে অবস্থিত বেত্রাবতী। বেত্রাবতী বিদুর পৌরসভার অংশ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই পৌরসভায় ৩ হাজারের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। দেশটির অন্য যেকোনো পৌরসভার তুলনায় এ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
ইউক্রেনে রাতভর ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। গতকাল বুধবারের এই হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ। হামলায় আবাসিক ভবন, শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, রাজধানী কিয়েভে দুজন, উত্তরাঞ্চলের চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকিতে চারজন এবং মধ্যাঞ্চলের পোলতাভা অঞ্চলে আরও দুজন নিহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেতস বলেন, ‘সারা রাত দেশজুড়ে রুশ হামলা চলেছে।’ তিনি রাতটিকে ‘আরেকটি নিদ্রাহীন রাত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘হামলার পরও সাধারণ মানুষকে প্রতিদিনের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, হামলায় রাশিয়া ১৩০টি ড্রোন, ৪৮টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ইউক্রেনের দাবি, তাদের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোট ১৬১টি আকাশপথের লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করেছে।
কিয়েভ, পোলতাভা, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দনিপ্রোপেত্রোভস্ক এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খারকিভ ছিল হামলার প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক-শিল্প স্থাপনা লক্ষ্য করে ‘ব্যাপক হামলা’ চালিয়েছে। রাশিয়ার দাবি, স্থল, সমুদ্র ও আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য নির্ভুল অস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্টের স্থাপনা। প্রতিষ্ঠানটিতে ‘ফ্লেমিংগো’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি ও দীর্ঘপাল্লার ড্রোন তৈরি ও সংরক্ষণ করা হয় বলে রাশিয়ার দাবি।
চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকিতে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র পাঁচতলা আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এতে অন্তত চারজন নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছে। এ সংক্রান্ত ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে।
এদিকে বিমান হামলার সতর্কতা জারির পর কিয়েভের বহু বাসিন্দা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শহরের গভীর ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনগুলোতে চলে যান। রাতভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
কিয়েভের ৪৯ বছর বয়সি বাসিন্দা লেসিয়া জানান, উঁচু ভবনের নবম তলায় বসবাস করায় হামলার সময় আতঙ্ক তৈরি হয়। এ কারণে তিনি মেট্রো স্টেশনকে তুলনামূলক নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেন।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, ড্রোনের পাশাপাশি কিয়েভ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও নিক্ষেপ করা হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দনিপ্রো শহরে রাতভর বিমান হামলায় একটি শিল্প স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জাপোরিঝঝিয়ায় পরিবহন অবকাঠামো এবং ক্রেমেনচুকে আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবরও জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।
এদিকে রাশিয়া বলছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের সামরিক ও প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা। দুপক্ষের দেওয়া এসব দাবি ও ক্ষয়ক্ষতির সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ তিন বছর পেরিয়ে চতুর্থ বছরে প্রবেশ করেছে। তবে এই ধ্বংসযজ্ঞকে এখনই অতীত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষ দূত ফ্রানচেস্কা আলবানিজে। তার ভাষায়, ‘গণহত্যা এখনো শেষ হয়নি।’
যুদ্ধের তৃতীয় বর্ষপূর্তির আগে আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলবানিজে বলেন, “গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত থাকায় ফিলিস্তিনিদের কেবল ‘গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ’ হিসেবে বর্ণনা করাও যথাযথ নয়। কারণ, তাদের ওপর হুমকি এখনো কাটেনি।”
গতকাল বুধবার আনাদোলু সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে। তাতে তিনি আরও বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বিপর্যয়কর। এটি সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করার মতো অবস্থারও বাইরে।’
২০২২ সাল থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূতের দায়িত্ব পালন করছেন ইতালীয় মানবাধিকার আইনজীবী আলবানিজে। তার মতে, গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ক্রমেই অবনতিশীল পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে ইসরায়েলকে সমর্থনকারী দেশগুলোর নীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও সামরিক তৎপরতা পুরোপুরি থামেনি। ফিলিস্তিনি হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে আরও ১ হাজার ৪৫৪ জন নিহত এবং ৫ হাজার ৯০ জন আহত হয়েছেন।
আলবানিজে সতর্ক করে বলেন, “ফিলিস্তিনিদের ‘গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া’ হিসেবে বর্ণনা করলে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, তাদের ওপর চলমান ধ্বংসযজ্ঞের অবসান হয়েছে।” তিনি বলেন, ‘গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ এখনো চলছে।’ তার দাবি, উপত্যকার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ অব্যাহত রয়েছে।
ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বুধবার গ্রীসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও জানান, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ইরানকে বারবার সুযোগ দেওয়া হলেও দেশটি তা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কর্তৃক বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে।
সংঘাত নিরসনে নমনীয়তার ইঙ্গিত যুক্তরাষ্ট্রেরদীর্ঘ আট মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাতে নতুন শর্ত সামনে এনেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানকে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ কমাতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের মতো ইরানকে সম্পূর্ণভাবে সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধ করার কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে হোয়াইট হাউস।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘ইরান যদি সত্যিই পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে না চায়, তবে তাদের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ জ্বালানির প্রয়োজন কোথায়? এটি চুক্তির জন্য অত্যন্ত মৌলিক একটি শর্ত।’ বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যা পরমাণু অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি।
তবে ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগের বিপরীতে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান। ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার আহ্বায়ককে ‘অপ্রয়োজনীয় ও নিরর্থক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমরা যখনই আলোচনার টেবিলে বসি, তখনই আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ নয়, বরং ইরানের ইসলামি সরকার ব্যবস্থার পতন চায়।’
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কেবল ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে আলোচনা হলেই সংঘাতের অবসান ঘটা সম্ভব। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানের পেশ করা সমঝোতা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছিল। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল—যুদ্ধবিরতি, অবরোধ প্রত্যাহার ও অর্থ ফ্রিজ মুক্ত করার এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার তিন বছর পূর্ণ হয়েছে গতকাল ৭ অক্টোবর। গত বছরের ১০ অক্টোবর ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হলেও, সেখানে ইসরায়েলি বর্বর হামলা ও নিরীহ মানুষদের হত্যা অব্যাহত রয়েছে। এমন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতেও নীরব থাকতে দেখা যাচ্ছে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোকে।
ইসরায়েলের টানা তিন বছর ধরে চালানো গণহত্যায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ২১ হাজার শিশু। এটি গাজার যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি ৩০ জনের মধ্যে একজন।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এই পরিসংখ্যানে কেবল হাসপাতাল বা সরকারিভাবে নিবন্ধিত মৃত্যুর সংখ্যাই গণনা করা হয়েছে। প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি, কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া বা নিখোঁজ থাকা হাজার হাজার মানুষের হিসাব এই তালিকায় নেই।
মানবিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি শুধু নিহতের সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গাজায় এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। অর্থাৎ সেখানে প্রতি ১৩ জনের মধ্যে একজন ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী—আহতদের প্রায় ২৪ শতাংশই এমন গুরুতর যে তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন প্রয়োজন। এর মধ্যে এক-চতুর্থাংশই শিশু।
ইসরায়েলি হামলার পরও গাজায় বর্তমানে যে কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র টিকে আছে, সেগুলো অনেক বেশি রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকটের মধ্যে সেগুলো চালাতে হচ্ছে।
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই তা লঙ্ঘন করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ৩৬১ দিনের মধ্যে ৩২৫ দিনই ইসরায়েল গাজায় হামলা চালিয়েছে। অর্থাৎ, এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৩৬ দিনে কোনো হামলা, মৃত্যু বা আহতের খবর পাওয়া যায়নি। এতকিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছে যে, গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর রয়েছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য বলছে—২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর দুপুর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৪৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ১১৬ জন আহত হয়েছেন।
গাজার প্রায় সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছর যুদ্ধের পর গাজার ৯৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র পুরোপুরি বা আংশিকভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে। রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
গাজায় আগে ৬৬৬টি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র থাকলেও বর্তমানে মাত্র ৪২টি চালু রয়েছে। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুসারে—কোনো হাসপাতালে হামলা চালানো নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী চিকিৎসক দল ও স্বাস্থ্যকর্মীরা বিশেষ সুরক্ষার অধিকারী। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে হাসপাতালে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল গাজার নাজুক পানি অবকাঠামোর ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। তারা সেখানকার কূপ, পাইপলাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার অধিকাংশ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার বড় অংশই ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, পাইপলাইনগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এবং পানির কূপগুলো হয় পয়ঃবর্জ্যের কারণে দূষিত হয়ে পড়েছে, অথবা যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে সেগুলো অকেজো হয়ে আছে।
বর্তমানে গাজার প্রায় অর্ধেক মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন গড়ে ছয় লিটারেরও কম পানি পাচ্ছেন। এ দিয়ে তাদের পান করা ও রান্নার কাজ চালাতে হচ্ছে। অথচ জরুরি প্রয়োজনে বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম ২০ লিটার পানির প্রয়োজন।
ইসরায়েল ও মিসর সীমান্তে প্রায় ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের গাজা উপত্যকায় ধ্বংসযজ্ঞ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেখানকার মোট স্থাপনার ৮২ শতাংশই বিধ্বস্ত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, পুরো এলাকা বা মহল্লাগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ফলে ১৯ লাখ ৮০ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এটি গাজার মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ।
গাজার শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয়ের তথ্য মতে, গাজার ৯৩ শতাংশ স্কুলই নতুন করে তৈরি করতে হবে। এর ফলে ৭ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গাজায় অন্তত ৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। যেসব ভবন এখনো টিকে আছে, সেগুলোকে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
শিরিন আবু আকলেহ অবজারভেটরির তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আল জাজিরার ১২ সাংবাদিক রয়েছেন।
ইসরায়েল গাজায় বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। তবে হাতেগোনা কয়েকজন সাংবাদিককে ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তারা কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন।
রাশিয়ার কৃষ্ণসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাঙ্কারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। জাহাজটিতে কর্মরত নাবিকদলের সবাই ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। রাশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, আগুনের তীব্রতা অত্যধিক হওয়ায় তা তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি, তবে জাহাজে থাকা ২৩ জন ভারতীয় নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ জানায়, জাহাজটির ওপর মূলত "নৌ-ড্রোন" দিয়ে এই আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং বিস্ফোরণের ফলে "কৃষ্ণসাগরের পানিতে অপরিশোধিত তেল খোলা অবস্থায় জ্বলছে"। পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর আগুনের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেলে দমকলকর্মীরা নতুন করে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম শুরু করবেন। ঘটনাটি ঘটেছে দেশটির প্রায় পাঁচ লাখ বাসিন্দার জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র সোচি শহরের উপকূলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে সমুদ্রপৃষ্ঠে সুবিশাল অগ্নিকুণ্ড এবং সোচি শহরের আকাশে কালো ধোঁয়ার ঘন মেঘ উড়তে দেখা গেছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় সোচি শহরের মেয়র উপকূলবর্তী সৈকত এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের চলাচল সাময়িকভাবে সীমিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাত্র একদিন আগেই রোমানিয়া উপকূলে আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজে অগ্নিকাণ্ডে ডুবে যাওয়ার এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। ইউক্রেনীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চলমান এই ড্রোন হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক আহত হয়েছেন।
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যিক নৌপথ উভয় পক্ষের সংঘাতের অন্যতম ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। কিয়েভের দাবি, ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রাশিয়ার চালানো ধারাবাহিক নৈশ বিমান হামলার পাল্টাজবাব হিসেবেই তারা রুশ জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে উভয় পক্ষই সংঘাত আরও জোরদার করেছে; যার অংশ হিসেবে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের প্রধান সেতু ও কেন্দ্রস্থলে রাশিয়া যেমন আক্রমণ চালাচ্ছে, তেমনি দক্ষিণ রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ইউক্রেনীয় হামলার ফলে জ্বালানি ছড়িয়ে পড়া ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের মতো সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শোচনীয় পরিবেশের উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ এবং মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। রাজধানী প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, লিওঁ, নান্তেস ও রেনের মতো প্রধান প্রধান শহরগুলোতে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছেন। মঙ্গলবার দেশব্যাপী আয়োজিত এই কর্মসূচির বেশ কিছু স্থানে রায়ট পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জের ঘটনা ঘটে। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মঙ্গলবার দেশজুড়ে প্রায় দুই লাখ মানুষ সমাবেশে অংশ নেন, যার মধ্যে এককভাবে প্যারিসের রাজপথেই ছিলেন প্রায় ৫৬ হাজার আন্দোলনকারী। তবে আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যা সাড়ে চার লাখে পৌঁছেছিল। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে মঙ্গলবার প্রায় ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্তত ৪৩ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনে মোট আটকের সংখ্যা ৬ হাজার ১০০ ছাড়িয়েছে, যাদের একটি বড় অংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং দেড় সহস্রাধিক কিশোরের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
শিক্ষাঙ্গন ঘিরে ছড়িয়ে পড়া এই অস্থিরতায় উদ্বেগ জানিয়ে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকরনু উল্লেখ করেন, দুই সপ্তাহের এই অচলাবস্থায় অন্তত ২১৫ জন শিক্ষার্থী ও ৮৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী আহত হয়েছেন, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতি। সংকট নিরসনে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এলিসি প্রাসাদে শীর্ষ মন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ দাবি করেছেন, অনেক জায়গায় বিক্ষোভ দাঙ্গার রূপ নেওয়ায় জননিরাপত্তা রক্ষার্থে পুলিশ আনুপাতিক শক্তি প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়েছে।
এদিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগের অভিযোগ তুলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তরুণ বিক্ষোভকারীদের ওপর ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ পুলিশি দমন’ অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ তদন্ত বিভাগ ইতিমধ্যে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অন্তত ১০টি ঘটনা তদন্ত করছে। আন্দোলনে পুলিশের গ্রেনেড ও অস্ত্রের আঘাতে উত্তর ফ্রান্সে এক কিশোরের হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, টুর্স শহরে এক শিক্ষার্থীর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং প্যারিসে এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরের চোয়াল ও মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো একাধিক গুরুতর আহতের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে শিক্ষক সংকট এবং শ্রেণিকক্ষের বেহাল দশার অবসানে কোনো কার্যকর সমাধান না পেয়েই তারা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। আগামী বছর ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র সাত মাস আগে ছড়িয়ে পড়া এই ছাত্র-গণবিক্ষোভ ক্ষমতাসীন সরকারকে গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ফেলেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য সরকার বামপন্থি বিরোধী দল 'লা ফ্রান্স ইনসোমিজ'-এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উসকানির অভিযোগ তুললেও দলটি শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও ন্যায্য দাবির প্রতি সংহতি অব্যাহত রেখেছে।
পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম ও মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) উপনির্বাচনের ভোট নিয়ে বিরোধীরা মারধর, বাধাদান, গ্রেফতার ও ভয় দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন। এদিন সকাল থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। বিকেল পর্যন্ত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। শাসকদলের দাবি, দুই বিধানসভায় উপনির্বাচন অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভোটদানের পর বলেন, উপনির্বাচনে সাধারণত কম ভোট পড়ে। তবে নন্দীগ্রামে শান্তিপূর্ণ ভোট হচ্ছে। তিনি বলেন, নন্দীগ্রামের ভোটার হিসেবে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। আমি নন্দীগ্রামের প্রার্থী হিসেবে রেকর্ড ভোটে জিতেছিলাম। আমার বিশ্বাস এবারও রেকর্ড ভোটে জিতবে বিজেপি।
তবে নন্দীগ্রামে কারচুপির অভিযোগ করেছেন কংগ্রেস প্রার্থী। রেজিনগরে ভোট লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ বিরোধীদের। দুই আসনেই পুনর্নির্বাচনের দাবি করেছেন তারা।
পুনর্নির্বাচনের দাবিতে সরব হয়েছেন মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের রেজিনগরের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী। রেজিনগর থানার সামনে অবস্থানে বসেছেন কংগ্রেস প্রার্থী। উপনির্বাচন বাতিল করে পুনর্র্নিবাচনের দাবি জানিয়েছেন তিনিও।
বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটের নামে প্রহসন হচ্ছে। নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের অভিযোগ, কোথাও তাদের এজেন্ট নেই, সকলকে তাড়িয়ে অবাধে ছাপ্পা চলেছে নন্দীগ্রামে। অভিযোগ, পুরো বিধানসভায় রিগিং করে ভোট করেছে বিজেপি। একই অভিযোগে রেজিনগরে সরব হয়েছেন বিরোধীরাও। যদিও দুই জায়গাতেই সেই অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়েছে বিজেপি।
এদিন সকালেই রেজিনগরে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জেলা পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, হুমায়ুন প্রার্থী নন, তিনি এজেন্টও নন। তাই বুথে বুথে ঘুরতে পারেন না। সেই কারণেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদিকে, নন্দীগ্রাম ১ নম্বর ব্লকের কংগ্রেস সভাপতিকে আটক করেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে ভোটে অশান্তি করার অভিযোগ।
এর আগে সকালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে হুমায়ুন কবীর যে অভিযোগ করেছিলেন, বেলা গড়াতে সেই অভিযোগে একসঙ্গে সরব মমতা তৃণমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস এবং সিপিআইএম। একত্রে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে মমতা তৃণমূল এবং কংগ্রেস।
পদার্থবিজ্ঞানে এ বছর নোবেল পেয়েছেন বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন (৮২)। তিনি আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। একই সঙ্গে মহাবিশ্বের দূরবর্তী স্থান থেকে পৃথিবীতে আসা উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কার করেছেন। এই নিউট্রিনো অনেকের কাছে ‘ভূতুড়ে কণা’নামেও পরিচিত।
বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে সুইডেনের স্টকহোমে রয়াল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। হালজেনের জন্ম বেলজিয়ামে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।
নিউট্রিনো হলো একটি মৌলিক উপ-পারমাণবিক কণা। এর কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই। ভর অত্যন্ত সামান্য, প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নোবেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই কণা চারপাশের সব জায়গাতেই আছে। কিন্তু সেগুলো দেখা যায় না। কোনো উপস্থিতি জানান না দিয়েই এগুলো পৃথিবী ও মানুষের শরীর ভেদ করে চলে যেতে পারে।
একেবারে ব্যতিক্রম কিছু ক্ষেত্রে একটি নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে উপযুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নিউট্রিনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়। হালজেন বুঝতে পেরেছিলেন, দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনোর গতিবিধি শনাক্ত করা সম্ভব। পরে তিনি আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি বা মানমন্দির হলো এক ঘন কিলোমিটার আয়তনের বরফে স্থাপিত একটি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। সেখানে আলো শনাক্ত করার সেন্সর আছে। এটি ব্যবহার করে গবেষকেরা মহাবিশ্বের দূরবর্তী অঞ্চলের অত্যন্ত উচ্চশক্তির প্রক্রিয়া থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করতে পারেন।
বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই মহাবিশ্বে প্রাকৃতিক কণা ত্বরক থাকার বিষয়ে ধারণা করছিলেন। এসব ত্বরকগুলো মানুষ নির্মিত যেকোনো কণা ত্বরকের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। কিন্তু ত্বরকগুলোর উৎস এখনো রহস্যময়। এগুলো কী, কোথায় আছে এবং এর ভেতরে প্রধানত কী ধরনের প্রক্রিয়া ঘটে- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে এই কণাকে শনাক্ত করার জন্য ফ্রান্সিস হালজেন ১৯৮৮ সালে একটি রূপকল্প তুলে ধরেন। সেটি অনুযায়ী, যখন একটি নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন একটি আলোর ঝলকানি তৈরি হয়। হিমবাহের স্বচ্ছ বরফে থাকা সেন্সরের মাধ্যমে সেই আলোর ঝলকানি শনাক্ত করা যায়।
বরফের সুবিধাজনক কিছু বৈশিষ্ট্য থাকার কারণে দক্ষিণ মেরু অঞ্চলকে গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এখানকার বরফগুলো অন্য কিছুর উপস্থিতিতে প্রভাবিত হয় না বললেই চলে। এলাকাটি ভূতাত্ত্বিকভাবে স্থিতিশীল হওয়ায় ভূমিকম্পও হয় না।
হালজেন তার রূপকল্প প্রকাশের পরপরই তা দ্রুত অন্য গবেষকদের মধ্যে সাড়া ফেলে। কয়েক বছর পরই বরফের মধ্যে সেন্সর বসিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা চালানো হয়।
নোবেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো খুবই বিরল। তাই পর্যাপ্ত সংখ্যক সংঘর্ষ পর্যবেক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ বরফ প্রয়োজন। এজন্য দক্ষিণ মেরুতে এক ঘন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘আইসকিউব’ মানমন্দির তৈরি করা হয়।
মানমন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১১ সালে। এরপর গবেষকরা অল্প সময়ের মধ্যে প্রথম উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কার করেন। কয়েক বছর পর তারা সৌরজগতের অনেক বাইরে থেকে আসা নিউট্রিনো আবিষ্কারের তথ্যও প্রকাশ করেন। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বে নিউট্রিনোর উৎস সন্ধানের কাজ পুরোদমে শুরু হয়।
পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল কমিটির প্রধান মার্ক পিয়ার্স বলেন, ফ্রান্সিস হালজেন গবেষক ও প্রকৌশলীদের একটি আন্তর্জাতিক দলে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তারা একটি চমৎকার যন্ত্র উপহার দিয়েছেন। এটি নতুন ধরনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের পথ প্রশস্ত করেছে। দক্ষিণ মেরুর আইসকিউবের মাধ্যমে ক্রমাগত নিউট্রিনোর মিথস্ক্রিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গবেষকরা মহাকাশের অজানা অনেক রহস্য উন্মোচন করতে পারবেন।