ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুমি শহরে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। সুমি শহরের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আরতেম কোবজার গতকাল রোববার এক টেলিগ্রাম বার্তায় এ তথ্য জানান। খবর রয়টার্সের।
কোবজার বলেন, ‘এই পবিত্র পাম সানডের দিনে আমাদের শহর এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছে। শত্রুরা সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দুঃখজনকভাবে এতে ইতোমধ্যেই ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে’। অন্যদিকে সুমি প্রদেশের গভর্নর ভলোদিমির আরতিউখ জানিয়েছেন, শহরের কেন্দ্রস্থলে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
এদিকে ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইহর ক্লাইমেঙ্কো জানান, রোববারের এই হামলায় স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত ৩০ জন নিহত ও ৮৩ জন আহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে সাতজনই শিশু। পরে এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে এবং সব ধরনের জরুরি পরিষেবা কাজ করছে’।
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বকে শক্তভাবে এর প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং যারা এই যুদ্ধ ও হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে চায়, সবার এখন দায়িত্ব রয়েছে’।
পাশাপাশি জেলেনস্কি আবারও দাবি করে বলেন, মস্কো ইচ্ছাকৃতভাবে এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে। তার ভাষায়, ‘রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানো ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়। আলোচনায় কখনোই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমা থেমে থাকে না’।
একইসঙ্গে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রিই সিবিহা এক এক্স বার্তায় বলেন, রাশিয়া টানা দ্বিতীয় মাসের মতো যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। যদিও ইউক্রেন গত ১১ মার্চ তা নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করেছিল। তিনি বলেন, ‘এর পরিবর্তে রাশিয়া তাদের সন্ত্রাস বাড়াচ্ছে। আমরা আমাদের মিত্রদের কাছে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সহায়তা ও মস্কোর ওপর আরও চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি’।
তবে রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই হামলা বা ইউক্রেনের অভিযোগ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য আসেনি।
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সমাপ্তি চায় ইউক্রেন
রাশিয়ার সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয় বরং ইউক্রেন চলতি বছরেই পুরোপুরি যুদ্ধের সমাপ্তি চায় বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা। শনিবার তুরস্কে আন্তালিয়া কূটনীতিক ফোরামে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমরা এ বছরই এই যুদ্ধের সমাপ্তি চাই। কিন্তু এতে যেন কোনো ধরনের কারসাজি না করা হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংঘাতের একটি শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই আমাদের লক্ষ্য। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের ফলাফলই ইউরোপের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলবে।
আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থায় ইউক্রেনের সম্ভাব্য সদস্যপদ রাখার ওপরও জোর দিয়েছেন ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইউক্রেনের ১১০টি যুদ্ধ করার মতো ব্রিগেড প্রস্তুত রয়েছে, যা ট্রান্সআটলান্টিকের নিরাপত্তায় অবদান রাখতে পারে।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে একটি ভারতীয় ওষুধ কোম্পানির গুদামে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আগুন ধরে গেছে। ইউক্রেনের দূতাবাস রোববার (১৩ এপ্রিল) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ভারতে অবস্থিত ইউক্রেনীয় দূতাবাস অভিযোগ করেছে যে, রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনে ভারতীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ইউক্রেনের দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রাশিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে কুসুম নামের একটি ভারতীয় ওষুধ কোম্পানির গুদামে আঘাত হেনেছে। ভারতের সঙ্গে ‘বিশেষ বন্ধুত্বের’ দাবি করেও মস্কো ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতীয় ব্যবসাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। শিশু এবং বয়স্কদের জন্য তৈরি ওষুধ ধ্বংস করা হচ্ছে।
ভারতীয় ব্যবসায়ী রাজীব গুপ্তের মালিকানাধীন কুসুম ইউক্রেনের বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি। বেশ কিছু সূত্র এনডিটিভিকে জানিয়েছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয় বরং একটি ড্রোন সরাসরি গুদামে আঘাত হেনেছে।
কিয়েভের বিবৃতির আগে ইউক্রেনে নিযুক্ত ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত মার্টিন হ্যারিস বলেছেন, রাশিয়ার হামলায় কিয়েভের একটি প্রধান ওষুধের গুদাম ধ্বংস হয়েছে। তবে মার্টিন আরও বলেছেন, রাশিয়ার ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নয়।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। এবার পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আম আদমি পার্টির কনভেনর অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে আটক করেছে ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউয়ের একটি বাসস্ট্যান্ডে দলের নেতাদের নিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখান থেকে তাকে আটক করে দিল্লি পুলিশ। আম আদমি পার্টির কনভেনর অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে লোধি এস্টেটে তার বাসভবনের বাইরে থেকে আটক করা হয়। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে যোগ দিতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। অপরদিকে দিল্লি হাট এলাকায় নির্ধারিত বিক্ষোভের আগে আইসার সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি ও কয়েকটি বামপন্থী সংগঠন শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেয়। তবে পুলিশ এ কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি। বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেওয়ার সময় দিল্লিতে এক ব্যক্তি মাথায় আঘাত পেয়ে গুরুতরভাবে রক্তাক্ত হয়েছেন। শনিবার (১০ অক্টোবর) সাফদারজং ফ্লাইওভারের কাছে একটি বাসস্ট্যান্ডের পাশে এ ঘটনা ঘটে। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহত ব্যক্তিকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য পুলিশের গাড়ি থামাতে অনুরোধ জানান সহ-বিক্ষোভকারীরা। তার মাথার ক্ষত থেকে প্রচুর রক্ত ঝরছিল।
বিক্ষোভ ঘিরে এর আগে দিল্লির বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকা থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তরুণদের চলমান বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে অবস্থান ধর্মঘটে বসার পর রাজধানী দিল্লিতে আটক হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পাশাপাশি তৃণমূলের সংসদ সদস্য ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, সামিরুল ইসলাম এবং সাকেত গোখলেকেও পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে শনিবার সকাল থেকেই দিল্লির বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। এই গণআন্দোলনে সংহতি জানাতে দিল্লির ১৮৩ সাউথ অ্যাভিনিউয়ে দলীয় সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাইরে যাওয়ার পথ অবরুদ্ধ থাকায় তিনি দলের অন্যান্য সাংসদদের সাথে নিয়ে সাউথ অ্যাভিনিউয়ের পার্শ্ববর্তী একটি বাসস্ট্যান্ডেই অবস্থান নিয়ে তাৎক্ষণিক ধরনায় বসে পড়েন।
তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, পুলিশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বাভাবিকভাবে বের হতে বাধা দেওয়ায় কোনো ধরনের সমাবেশ করতে না পেরে তিনি বাসভবনের সামনের সড়কেই প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেই তাদের আটক করা হয়। আটকের আগমুহূর্তে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা কর্মসূচিতে যোগ দিতে বের হয়েছিলাম। জেন-জি আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু সিজেপির ছেলেদেরও আটক করা হয়েছে, বহু নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কাউকে যন্তর মন্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আমরা সবসময় ছাত্র ও যুব সমাজের পাশে আছি।’
যন্তর মন্তরে গমনে বাধা দেওয়া হলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বাসস্ট্যান্ডের সড়কেই অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন এই নেত্রী। পুলিশের প্রশাসনিক আচরণের তীব্র সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ তোলেন, আটক আন্দোলনকারীদের গাড়িতে তুলে দীর্ঘ সময় ধরে উদ্দেশ্যহীনভাবে শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘোরানো হচ্ছে। এমনকি অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও পিনারাই বিজয়নের প্রতি একই আচরণ করে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে রাস্তায় ঘুরিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
চলতি বছরের শান্তিতে নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাইকে ‘রহস্যময় ব্যক্তি’ বলে কটাক্ষ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে এবারও নোবেল শান্তি পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নোবেল কমিটির নেওয়া সিদ্ধান্তকে ‘লজ্জাজনক ও বিব্রতকর’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এক প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীর নাম ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচনী প্রচারণায় এই ক্ষোভ উগরে দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। নিউইয়র্কের সিরাকিউজে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি দাবি করেন, তিনি কিংবা সাধারণ মানুষ কখনোই এই বিজয়ীর নাম শোনেনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই ইতিপূর্বে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যে তদন্তে গাজায় ইসরায়েলের মানবতাবিরোধী পদক্ষেপের তথ্য উঠে এসেছিল।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে কার্যভার গ্রহণের পর থেকেই নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার ব্যাপারে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছেন ট্রাম্প। সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের পক্ষপাতমূলক পদক্ষেপ নরওয়ে রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকদের জন্য একটি অমোচনীয় কলঙ্ক হয়ে থাকবে। এ সময় তিনি দাবি করেন, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং চীন-তাইওয়ান সংঘাত এড়াতে তাঁর নেওয়া উদ্যোগ যুদ্ধ প্রতিহত করেছে; যদিও এই দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ তিনি তুলে ধরেননি।
নোবেল কমিটির তীব্র সমালোচনা করে ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেন, গুটিকয়েক উগ্র ভাবাদর্শের ব্যক্তির কারণে এই আন্তর্জাতিক পুরস্কারের সার্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে বিনষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর মতে, সভ্যতার শত্রুরাই এখন এ ধরনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নরওয়েকে উদ্দেশ করে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন যে এই সিদ্ধান্ত তারা সহজে ভুলে যাবেন না।
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নিতে এসে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (আইজিআই) থেকে আটক হয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। শনিবার সকালে তাঁর সঙ্গে দলটির অপর দুই শীর্ষ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও হেফাজতে নেয় পুলিশ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
রাজধানীতে পৌঁছানোর পূর্বেই যেকোনো আইনি পদক্ষেপ মোকাবিলার প্রস্তুতি রয়েছে জানিয়ে দীপকে অভিযোগ করেছিলেন যে, সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করতেই এই দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের প্রশাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া তরুণ ও সাধারণ নাগরিকদের ভয়ে সরকার নিরাপত্তা বিধিনিষেধের আড়ালে বিক্ষোভ বানচালের চেষ্টা চালাচ্ছে।
যন্তর মন্তরে সিজেপির পূর্বঘোষিত এই কর্মসূচি ঘিরে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে দিল্লিজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযান চালিয়ে দিল্লি পুলিশ আইনের ৬৫ নম্বর ধারার অধীনে অন্তত ৬০০ জনকে আটক করা হয়েছে। সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়া সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক পাহারা ও নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার ভোর ৬টা থেকে রাজধানীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কঠোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে এবং বিভিন্ন রুটে যান চলাচলের পথ পরিবর্তন করা হয়েছে। মোড়ে মোড়ে ব্যারিকেড ও তল্লাশিচৌকি বসিয়ে জনসাধারণের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি মেট্রো রেলে বিশেষ বিধিনিষেধ, একাধিক ট্রেন বাতিল এবং রাজধানীর কিছু অঞ্চলে মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
ভারতের রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে ককোরোচ জনতা পার্টির (সিজিপি) পূর্বঘোষিত এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার চেষ্টাকালে জার্মানি প্রবাসী জনপ্রিয় ইউটিউবার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ধ্রুব রাঠিকে আটক করেছে পুলিশ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি দেশে ফেরা ধ্রুব রাঠিকে দিল্লি যাত্রা থেকে নিবৃত্ত করার লক্ষ্যে দিল্লি ও গুরগাঁও পুলিশের একটি যৌথ দল গুরগাঁওয়ের সেক্টর-৫৬ এলাকার কেন্দ্রীয় বিহার সোসাইটিতে তাঁর বাসভবনে যায়। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও তিনি রাজধানীতে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে তাঁকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর বাসভবনের চারপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতি দিয়ে ধ্রুব রাঠিকে আটকের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ককোরোচ জনতা পার্টি (সিজিপি)। দলটির অভিযোগ, নির্বাচনি ব্যবস্থার নানা ত্রুটি ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ স্তব্ধ করতেই সরকার এই ধরনের দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে তারা ধ্রুব রাঠিসহ আটক ব্যক্তিদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানিয়েছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজিপির আয়োজিত গণজমায়েতে উপস্থিত হওয়ার জন্য সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ধ্রুব রাঠি।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আর আঞ্চলিক সীমান্তের মধ্যে আটকে নেই। জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, লোহিত সাগর ঘিরে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা—সব মিলিয়ে সংকটের অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। একদিকে সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা, অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কার পাশাপাশি জ্বালানি, খাদ্য, পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে। খবর রয়টার্স ও বিশ্বব্যাংকের।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে বিশ্ববাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও তেলের দাম উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। একই সময়ে পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচল এবং লোহিত সাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ কূটনৈতিক উদ্যোগ বাজারকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারলেও সংঘাতের মূল ঝুঁকি এখনো কাটেনি।
এদিকে, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে ইরানপন্থি হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে সৌদির আকাশসীমার আরও কিছু অংশ এড়িয়ে চলার জন্য বিমান সংস্থাগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান চলাচল নিরাপত্তা সংস্থা (ইএএসএ)। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এ সতর্কতা জারি করেছে। এতে সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
মার্কিন দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিও ঘটেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে এ অঞ্চলে যাতায়াতের পরিকল্পনা থাকলে তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সৌদির আকাশসীমা নিয়ে আগের সতর্কবার্তা হালনাগাদ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান চলাচল নিরাপত্তা সংস্থা। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথম জারি করা ওই নির্দেশনায় নতুন করে সৌদির আরও কিছু আকাশসীমায় বিমান চলাচল না করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
সংস্থাটি বলেছে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে সৌদির অভ্যন্তরে আরও গভীরে, এমনকি রাজধানী রিয়াদেও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা ও অভিপ্রায় রয়েছে হুতিদের।
সৌদির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি হামলার ঘটনায় তিন সৌদি নাগরিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন। ইয়েমেনের নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা গৃহযুদ্ধে দেশটির সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দেয়ায় সৌদিকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা জানিয়েছে হুতি বিদ্রোহীরা।
অন্যদিকে, সৌদি বলছে, জাতিসংঘের স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে তারা। হুতিদের দখলে থাকা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে সরকারি বাহিনীর সামরিক অভিযানকে সমর্থন করছে রিয়াদ।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে সৌদির বিমানবন্দরে হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নতুন ভ্রমণ ও বিমান চলাচল সতর্কতা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
পরাশক্তিগুলোর অবস্থান ঘিরে নতুন মেরুকরণ: মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পাশাপাশি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামরিক অবস্থান, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজন—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং সৌদি আরবকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিও সংকটের পরিধি বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কোনো একটি সংঘাতের সঙ্গে অন্য সংঘাত যুক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বাড়লে ভুল হিসাব, পাল্টা হামলা কিংবা জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। তবে উত্তেজনা বাড়লেই যে অনিবার্যভাবে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পরাশক্তিগুলোর সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক মূল্য অত্যন্ত বেশি। তাই সামরিক চাপের পাশাপাশি মধ্যস্থতা, আলোচনা এবং সংঘাত সীমিত রাখার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যোগাযোগের সম্ভাবনা এ ক্ষেত্রে কূটনীতির সুযোগ এখনো রয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়।
জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক বাজারে বাড়ছে অনিশ্চয়তা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রভাব পড়ছে জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে তেলবাহী জাহাজের বিমা, পরিবহন ও নিরাপত্তা ব্যয় বেড়ে যায়। বিকল্প পথে পণ্য পরিবহনের প্রয়োজন হলে সময় ও খরচ—দুটিই বাড়তে পারে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৬ ডলারে নেমে এলেও সপ্তাহজুড়ে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা ছিল। এর আগে ৮ অক্টোবর হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলা ও সরবরাহ কমে যাওয়ার উদ্বেগে ব্রেন্টের দাম ১০৫ ডলারের ওপরে উঠেছিল। এই ওঠানামা দেখায়, বাজার এখন শুধু উৎপাদন ও চাহিদার হিসাবের ওপর নির্ভর করছে না; সামরিক পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক বক্তব্যও দামের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতির প্রায় সব খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পকারখানা ও কৃষির ব্যয় বাড়ে। পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহে অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হলে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বেশি দাম দিতে হয়। জ্বালানির পাশাপাশি সার ও কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে খাদ্য উৎপাদনেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত পণ্যবাজারবিষয়ক পূর্বাভাসে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সামগ্রিক পণ্যমূল্যে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির ঝুঁকির কথা জানিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও সংকটের প্রভাব বহুমুখী। জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হয়, বাড়ে কনটেইনার ও বিমা ব্যয়। ইউরোপ ও এশিয়ার আমদানিনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল এবং জ্বালানি সংগ্রহে বেশি ব্যয়ের মুখে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চললে উৎপাদন কমে যাওয়া, বিনিয়োগ পিছিয়ে দেওয়া এবং কর্মসংস্থানে চাপ তৈরির আশঙ্কা থাকে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত সব দেশে সমান নয়। জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও আর্থিক সুরক্ষা কম—এমন দেশগুলো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের। ৫ অক্টোবর রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে যাওয়া এবং বাজারে আস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়তে পারে।’ তার মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, সংঘাত দ্রুত থামলেও জ্বালানি উৎপাদন, পরিশোধন ও সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও বাড়তি সতর্কতার সময়: বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে জ্বালানি আমদানির জন্য বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ভাড়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। তবে প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক দামের পরিবর্তন, আমদানির চুক্তি, মজুত, বিনিময় হার এবং সরকারের নীতিগত পদক্ষেপের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে বিমান চলাচল, কর্মস্থলের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘ্নিত হতে পারে। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ হলে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকি—ইতোমধ্যে সব ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়েছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
সমাধানের পথ কূটনীতি ও স্থিতিশীলতায়: মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন এক পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি মজুত, বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা এবং মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন আইএমএফের তৎকালীন প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ে গুরিঞ্চাস। ২৬ জুন রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নাজুক যুদ্ধবিরতি টেকসই না হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কৌশলগত জ্বালানি মজুত থেকে সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে সহায়তা করেছিল। তবে মজুত কমে যাওয়ায় নতুন করে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশগুলোর সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য এই সতর্কতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
মহাযুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত নয়। সংঘাতের পক্ষগুলো সংযম দেখাবে, নাকি সামরিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হবে—তার ওপরই নির্ভর করছে পরবর্তী গতিপথ। মধ্যপ্রাচ্যের বারুদের স্তূপে নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তার ধাক্কা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পৌঁছে যাবে বিশ্বের বাজার, শিল্প, বন্দর এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উত্তেজনা প্রশমন, কূটনৈতিক সমাধান এবং বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতি।
ভারতে ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধন প্রক্রিয়া ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তালিকা যাচাইয়ের উদ্যোগে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার তথ্য সামনে আসার পর নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো। তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। কর্মসূচির অনুমতি না দিলেও বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। সম্ভাব্য জনসমাগম ও বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় রাজধানীতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। দিল্লি পুলিশকে সহায়তা করতে প্রায় ২৩ হাজার কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে ৫৭টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ। বাতিল করা হয়েছে একাধিক ট্রেনও।
৫৭ মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ, বাতিল একাধিক ট্রেন: ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত ৯টা থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মেট্রো স্টেশনগুলোতে এই বিধিনিষেধ কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মধ্য দিল্লির যন্তর মন্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সম্ভাব্য বিক্ষোভকারীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন স্থানে তল্লাশিচৌকি বসানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
দিল্লি মেট্রোরেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) জানিয়েছে, পুলিশের অনুরোধে ৫৭টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখা হবে। কিছু স্টেশনে ট্রেন বদলের সুবিধা চালু রাখার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া শনিবার (১০ অক্টোবর) নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশনে আসা-যাওয়া করা একাধিক ট্রেনের চলাচল প্রায় ১০ ঘণ্টার জন্য বাতিল করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে রাজধানীতে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে।
ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ: ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তালিকা যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য উদ্ধৃত করে বিজেপি জানিয়েছে, বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার মৃত, ৬ কোটি ৩০ লাখ অন্যত্র স্থানান্তরিত, ১ কোটি ভোটারের নাম একাধিকবার রয়েছে এবং প্রায় ৩ কোটি ভোটারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
বিরোধীদের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়ার ফলে মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা অসমানুপাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা নির্বাচনের ফলাফলকেও প্রভাবিত করতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির জয়ের সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো।
তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন কারসাজি কিংবা পক্ষপাতের অভিযোগ নাকচ করেছে। কমিশনের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈতভাবে নিবন্ধিত কিংবা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না—এমন ভোটারদের শনাক্ত করতেই তালিকা যাচাই করা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, খসড়া তালিকায় নাম না থাকলে সংশ্লিষ্ট ভোটাররা নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করতে পারেন। আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের সুযোগও রয়েছে। তবে বিরোধীদের দাবি, দীর্ঘ ও জটিল আপিল প্রক্রিয়ার কারণে প্রকৃত ভোটারদের একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
অনুমতি না দিলেও কর্মসূচি চালানোর ঘোষণা সিজেপির: ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সিজেপির পাশাপাশি কংগ্রেস, বামপন্থি দল, ছাত্রসংগঠন ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। ২ অক্টোবর থেকে দিল্লিতে বিভিন্ন কর্মসূচিতে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে সিজেপির ঘোষিত সমাবেশের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমতিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়াকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দলটির নেতারা জানিয়েছেন, অনুমতি না পেলেও তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন। যন্তর মন্তরে সমাবেশ করতে দেওয়া না হলে অন্যত্রও প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
দলটির সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, নাগরিকরা বিক্ষোভে অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে পুলিশ কীভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে? তার বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিজেপির নেতা অভিজিৎ দীপও কয়েকজন সমর্থককে আটকের খবরের মধ্যেও শনিবারের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
আগের বিক্ষোভের অভিজ্ঞতায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা: আগের বিক্ষোভের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগেভাগেই নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে দিল্লি পুলিশ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ৮ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লি পুলিশকে সহায়তা করতে প্রায় ২৩ হাজার কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ সদস্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ জন্য ২২১ কোম্পানি বাহিনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এ বাহিনীতে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ), ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ (আইটিবিপি), সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি) এবং সেন্ট্রাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিকিউরিটি ফোর্সের (সিআইএসএফ) সদস্যরা রয়েছেন। জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে পাঁচটি নারী আধাসামরিক কোম্পানিকেও দায়িত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
গত জুলাইয়ে সিজেপির প্রথম দফার যন্তর মন্তর বিক্ষোভ সামাল দিতে গিয়ে পুলিশের ভূমিকা ও পেলেট গান ব্যবহারের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এবার একই ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে মধ্য দিল্লির সরকারি স্থাপনা, যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশের পরিকল্পনায় রয়েছে বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তাচৌকি বসানো, বিক্ষোভকারীদের চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে আটক ব্যক্তিদের রাখার জন্য অস্থায়ী আটককেন্দ্রের ব্যবস্থা করা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হোটেলের নতুন বুকিং ও অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সি চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপের খবর পাওয়া গেছে।
কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ‘নৈরাজ্য’ সৃষ্টির অভিযোগ বিজেপির: বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু করেছে বিজেপি। দলটির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতায় আসার লক্ষ্যে রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস বাংলাদেশ ও নেপালের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে ভারতে অস্থিরতা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
বুধবারের বিক্ষোভের ভিডিও দেখিয়ে ভান্ডারি দাবি করেন, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র ও কংগ্রেসের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাক্কাধাক্কির ঘটনা তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রকাশ করেছে। তার অভিযোগ, বিক্ষোভের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।
এক ভিডিও বার্তায় ভান্ডারি বলেন, ‘কংগ্রেসের কৌশল হলো ভারতে বাংলাদেশ ও নেপালের মতো নৈরাজ্য ছড়িয়ে দেওয়া।’ তার দাবি, বিক্ষোভের সময় কংগ্রেসের কয়েকজন কর্মী পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। তবে ভিডিওতে দেখানো ঘটনাগুলোর বিষয়ে কংগ্রেসের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ভান্ডারি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনসংক্রান্ত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন থাকায় রাস্তায় বিক্ষোভ করে আদালতের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।’ তার অভিযোগ, রাহুল গান্ধী বিক্ষোভের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি ভারতের অস্থিরতা সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো বিরোধীদের সহায়তা করছে বলেও দাবি করেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক: ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত আরও আগে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের দুই সহকর্মী ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারের কাছে একাধিকবার উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে তাদের ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার উদ্বেগ জানানোর কথা উল্লেখ করা হয়। তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং তাদের সব সিদ্ধান্ত আইনসম্মত।
কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপে বিজেপি সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, বৈধ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
এদিকে আম আদমি পার্টির (আপ) দিল্লি শাখার সভাপতি সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ করেছেন, তার দলের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবককে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
আগামী বছরের শুরুতে উত্তর প্রদেশসহ অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক বিজেপি ও বিরোধীদের রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও তীব্র করেছে।
সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে নির্বাচন কমিশন সংশোধন প্রক্রিয়াকে নিয়মিত প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধীরা এর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। শনিবারের বিক্ষোভে জনসমাগম কতটা হয় এবং প্রশাসন পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দেয়, এখন সেদিকেই নজর।
শিক্ষার উন্নত পরিবেশের দাবিতে কয়েক দিনের টানা বিক্ষোভের পর শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা তাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরতে শুরু করেছে। তবে শিক্ষার্থীরা আগামী সপ্তাহে আরও ব্যাপক আকারে বিক্ষোভের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, মাঝেমধ্যে ঘটে যাওয়া সহিংস সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে শিক্ষার্থীরা হাইস্কুলের প্রবেশপথগুলো অবরুদ্ধ করা শুরু করলে ফ্রান্সজুড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে, যা নিয়ন্ত্রণে দাঙ্গা-পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছিল।
বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা—যাদের অধিকাংশের বয়স ১৫ থেকে ১৮ বছর—শিক্ষকদের অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং ক্রমশ বাড়তে থাকা তাপমাত্রা সহ্য করতে না পারা ভবনের অবস্থা নিয়ে অভিযোগ তোলে।
ফ্রান্সের বিচার মন্ত্রণালয় শুক্রবার (৯ অক্টোবর) জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে ৬ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
অন্যদিকে, জাতিসংঘ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) জানায়, তারা ‘উদ্বেগের সাথে’ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার মুখপাত্র শাবিয়া মান্টু বলেন, ‘ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং হাইস্কুল অবরোধ সংক্রান্ত যেসব ঘটনা সহিংস রূপ নিয়েছে, আমরা তা উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি।’
বেশিরভাগ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হলেও কিছু আন্দোলনকারী রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেয় এবং বাস স্টপ ভাঙচুর করে।
এর জবাবে পুলিশ টিয়ার গ্যাস, লাঠি এবং ব্লাস্ট বল (বিশেষ ধরনের গ্রেনেড) ব্যবহার করে। এর ফলে মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং শিক্ষার্থীরা পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ আনে। এসব অপকর্মের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের নিজেদের ১৮টি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে।
গত সোমবার পুলিশের একটি স্টান গ্রেনেড বিস্ফোরণে ১৫ বছর বয়সি এক কিশোর তার হাত হারায়। এরপর সরকার এই অস্ত্রের ব্যবহার স্থগিত ঘোষণা করে।
রাজধানী প্যারিসে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পুলিশ জানায়, কিছু ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি ছত্রভঙ্গ করতে তারা বাস্তিল স্কোয়ারে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করেছে।
অসন্তোষ শান্ত করার প্রচেষ্টায় শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জফ্রে গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) গভীর রাতে ঘোষণা করেন যে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ১১৪টি হাইস্কুলে অনুপস্থিত কর্মীদের স্থলাভিষিক্ত করতে আগামী দিনগুলোতে প্রায় ৩ হাজার বিকল্প শিক্ষক নিয়োজিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকর্নু চলতি অক্টোবরের শেষের মধ্যে সংকট সমাধানের জন্য একটি পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী রোল্যান্ড লেসকিউর বলেছেন, অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রিত ২০২৭ সালের বাজেটের মধ্যেও স্কুলের সম্পদ বৃদ্ধির দাবিগুলো পূরণ করার সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান খসড়া বাজেটে প্রতিরক্ষার পর শিক্ষা খাতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে—যার পরিমাণ ১.৪ শতাংশ বেড়ে ৯০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফ্রান্সের মোট ৩,৭০টি হাইস্কুলের (যাকে ‘লিসি’ বলা হয়) মধ্যে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) মাত্র ১৪১টি স্কুল বন্ধ ছিল। গত ২ অক্টোবর বিক্ষোভের কারণে প্রায় ৮০০টি স্কুল বন্ধ ছিল।
তবে অনেক শিক্ষার্থী এএফপিকে জানিয়েছে, তারা পিছিয়ে আসছে না; আগামী সপ্তাহে আরও বড় ধরনের আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন আয়োজকরা।
তুলুস শহরের ১৬ বছর বয়সি এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা আগামী সপ্তাহের জন্য আমাদের শক্তি বাঁচিয়ে রাখছি।’
মার্সেই শহরের অ্যালিস নামের এক হাইস্কুল শিক্ষার্থী বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণাগুলো একটি প্রথম পদক্ষেপ, কিন্তু এগুলোই যথেষ্ট নয়।’
আগামী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আন্দোলনের নতুন কর্মসূচির ডাক দিয়ে শিক্ষার্থী ইউনিয়নের প্রতিনিধি মারিয়াস মেসনিল বলেন, ‘আমাদের কেবল কিছু ছিটেফোঁটা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।’
চলতি বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক নাভেনথাম নাভি পিল্লাই। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নরওয়ের নোবেল কমিটি তার নাম বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে। তবে তাকে এই পুরস্কার দেওয়ার সমালোচনা করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শেয়ার করা একটি পোস্টে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে একসময়কার মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটিকে অপমান করা হয়েছে।
গত দুই বছর ধরে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশা করে আসছিলেন ট্রাম্প। এ বছর পুরস্কার ঘোষণার আগেও তিনি বলেছিলেন, এই সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য তিনি। তবে তাকে পুরস্কার দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নাভি পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণার পর ট্রাম্প সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে মার্কিন আইনজীবী ডেভিড স্কলনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন তিনি। ওই পোস্টে পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সমালোচনা করা হয়।
পোস্টে ডেভিড স্কলন লিখেছেন, ‘আজ নোবেল কমিটি জাতিসংঘের নাভি পিল্লাইকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দিয়ে নিজেদের মান-সম্মান পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে এবং একসময়কার মহান পুরস্কারটিকে অপমান করেছে। পিল্লাই প্রকাশ্যে আমেরিকা ও ইসরায়েলবিদ্বেষী একজন মানুষ। নিজের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি সন্ত্রাসীদের তোষামোদ করেছেন এবং হামাসকে পুরস্কৃত করেছেন।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে—এমন ভুয়া দাবি তুলে আদালতের কাছে বিচার চেয়ে তিনি একটি সাজানো তদন্ত চালিয়েছিলেন। স্বাভাবিক কোনো সমাজে তার বিন্দুমাত্র গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং শান্তির পক্ষে তিনি কোনোদিন একটি কাজও করেননি; বরং যা করার, তার উল্টোটাই করেছেন। তবে যে কমিটি এর আগেও ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের মতো মানুষকে এই সম্মানজনক নোবেল শান্তি পুরস্কার দিয়েছিল, তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা আশা করা যায়?’
পোস্টে ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য বলেও দাবি করেছেন স্কলন। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের ঐতিহাসিক আব্রাহাম চুক্তি উপহার দিয়েছেন—গোটা বিশ্ব যা অসম্ভব ভেবেছিল, অথচ তিনি তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন এবং এখন সেটির পরিধি আরও বাড়াচ্ছেন! সব আশা যখন শেষ হয়ে গিয়েছিল, ঠিক তখন তিনি জিম্মিদের ঘরে ফিরিয়ে এনেছেন!’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামানো, আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের এক নম্বর পৃষ্ঠপোষক ইরানকে দমন করা এবং সন্ত্রাসীদের সব ধরনের বাধার পরও গাজাকে পুনর্গঠন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার অর্জনের এই তালিকা আরও অনেক দীর্ঘ। ঠিক এই ধরনের অর্জনগুলোকেই স্বীকৃতি দেওয়া ও পুরস্কৃত করার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছিল!’
উল্লেখ্য, আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে কয়েকটি আরব দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া চলমান সংঘাত নিরসনে যেকোনো ধরনের মধ্যস্থতা ও সহযোগিতা দিতে রাশিয়া প্রস্তুত বলে প্রস্তাব দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) তুর্কমেনিস্তানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি এই সহায়তার বার্তা দেন। কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের বরাতে জানা যায়, সংকটময় এ পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধানে নিজেদের সাধ্যের মধ্যে সবকিছু করতে মস্কো প্রস্তুত বলে জানান পুতিন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান তীব্র যুদ্ধাবস্থা নিরসনে তেহরানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
সংঘাত বন্ধে যেকোনো পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের এক বিবৃতিতে পেজেশকিয়ানের বক্তব্য তুলে ধরে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলা সত্ত্বেও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বারবার আক্রমণ চালানো হচ্ছে, তবে এরপরও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থেকে পিছু হটবে না তেহরান। এ প্রসঙ্গে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা সংলাপে যুক্ত আছি। কিন্তু প্রতিবারই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথা বলার পর তারা নতুন করে হামলা চালায়। তা সত্ত্বেও আমরা আলোচনার টেবিল ছেড়ে যাব না।’
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) থেকে তুর্কমেনিস্তানে শুরু হয়ে যাওয়া স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর কমনওয়েলথের (সিআইএস) শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্ববৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
পারস্য উপসাগরে দীর্ঘ ১০ মাসের এক রেকর্ড সৃষ্টিকারী মিশন সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার নৌঘাঁটিতে ফিরে এসেছে বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ স্ট্রাইক গ্রুপ। গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) পরিবারের সদস্যদের উল্লাস ও পতাকা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধজাহাজটি বন্দরে নোঙর করে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিমানবাহী এই রণতরিটি সর্বমোট ৩২১ দিন সামরিক মোতায়েনে নিয়োজিত ছিল, যা স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় দীর্ঘতম অভিযান। এর মধ্যে ‘লিংকন’ কোনো বন্দরে নোঙর না ফেলে টানা ২৬৫ দিন সমুদ্রে অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করেছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে দীর্ঘতম বিরতিহীন অবস্থানের নতুন রেকর্ড। এর আগে ইউরোপ, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে ৩২৬ দিনের মিশন শেষে ফিরেছিল ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’, যা সামগ্রিক মেয়াদের দিক থেকে দীর্ঘতম মোতায়েন হিসেবে বিবেচিত।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই রণতরির ফ্লাইট ডেক থেকে কয়েক হাজার সফল যুদ্ধবিমান অভিযান পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘ এই দায়িত্ব পালন শেষে জাহাজের প্রায় ৬০ জন ক্রু সদস্য প্রথমবারের মতো নিজেদের নবজাতক সন্তানদের কোলে নেওয়ার সুযোগ পান। সান ডিয়েগোতে পৌঁছানোর প্রাক্কালে বুধবার রণতরিটিতে উপস্থিত হয়ে নাবিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি উল্লেখ করেন, ক্রুদের অসাধারণ সামরিক কার্যকারিতা, কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আস্থার কারণেই তাদের মোতায়েনের মেয়াদ দুই দফায় বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের এই অভিযানে রসদসংকট কিংবা মনোবল হ্রাসের গুঞ্জন প্রতিরক্ষামন্ত্রী নাকচ করলেও চরম মানসিক চাপের তথ্যও সামনে এসেছে। এবিসি নিউজের সংগ্রহ করা মার্কিন কংগ্রেসের কাছে পাঠানো অ্যাক্টিং নেভি সেক্রেটারি হাং কাওয়ের একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বর্ধিত এই অভিযানের সময় ‘লিংকন’ স্ট্রাইক গ্রুপে অন্তত আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছিল। তবে প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সফল অভিযান শেষে পরিবারের সান্নিধ্যে ফিরতে পেরে ক্রুরা উচ্ছ্বসিত বলে জানিয়েছেন জাহাজের কমান্ডিং অফিসার ক্যাপ্টেন ড্যান কেলার।
ইন্দোনেশিয়ার বিস্তৃত বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল থেকে সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়া ও কুয়াশা পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইনে এই ধোঁয়া প্রবেশ করায় জনজীবন মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। মারাত্মক বায়ুদূষণের কারণে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরসহ কয়েকটি বড় অঙ্গরাজ্যে শত শত বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে সিঙ্গাপুরে বার্ষিক ফর্মুলা ওয়ান (এফ-১) রেস শুরুর প্রাক্কালে বায়ুমান সূচক চলতি বছরের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও বিপজ্জনক স্তরে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে শুধু ধোঁয়া এবং দাবানলজনিত বিষাক্ত বাষ্পের কারণে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারাত্মক শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হয়েছেন। মূলত বাণিজ্যিক পাম তেল চাষের এলাকা বৃদ্ধি ও নতুন কৃষিজমি তৈরির উদ্দেশে অসাধু চক্র ও স্থানীয় কৃষকদের বনাঞ্চলে দেওয়া আগুনে প্রতিব ছরই এই প্রাকৃতিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। তবে আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে সৃষ্ট তীব্র খরার কারণে ২০১৫ সালের পর এবারই দেশটিতে সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্রিনপিস ইন্দোনেশিয়ার কালিমান্তান (বোর্নিও) ও সুমাত্রার পাশাপাশি দূরবর্তী পাপুয়া অঞ্চলেও বিপুলসংখ্যক সক্রিয় আগুনের হটস্পট শনাক্ত করেছে, যা দ্রুত পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে দূষিত করছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে মালয়েশিয়ার জোহর, মেলাকা, নেগেরি সেমবিলান ও সেলাঙ্গর অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ফাধলিনা সিদেক স্পষ্ট করেছেন, বায়ুদূষণ সূচক (এপিআই) ১৮০ অতিক্রম করলেই সংশ্লিষ্ট এলাকার সব স্কুল তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ রাখতে হবে। এ ছাড়া পরিবেশের এই আঞ্চলিক বিপর্যয় নিরসনে আসিয়ানভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর মন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি যৌথ বৈঠক আহ্বান করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার পরিমাণ বেড়ে মধ্য অঞ্চলে দূষণ সূচক (পিএসআই) ১৭০-এ গিয়ে পৌঁছেছে, যা বায়ুমানের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে গণ্য। তীব্র ধোঁয়াশায় দ্বীপরাষ্ট্রটির আকাশচুম্বী বহুতল ভবনগুলো আড়াল হয়ে পড়ায় জনসাধারণকে মাস্ক পরে রাস্তায় নামতে দেখা গেছে।
সিঙ্গাপুর পর্যটন বোর্ডের বরাতে জানা গেছে, ফর্মুলা ওয়ান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সুরক্ষার স্বার্থে সার্বক্ষণিক স্বাস্থ্য পরামর্শ এবং মাস্ক বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো বনাঞ্চলে বেআইনিভাবে আগুন দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনিব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সনদ বাতিল করেছেন। তবে অনুকূল বৃষ্টিপাতের অভাবে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত এই দমবন্ধ পরিস্থিতি ও ধোঁয়ার প্রভাব বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দরে পৃথক দুটি হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং দেশটির জাতীয় বিমান সংস্থা ‘সৌদিয়া’র একটি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (জিএসিএ)-এর এক বিবৃতির সূত্রে জানা গেছে, প্রথম হামলায় বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং পরবর্তী হামলায় আঘাত হানা হয় সেখানে থাকা সৌদিয়ার একটি বিমানে। এসব হামলায় আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং বিমানবন্দরের বিভিন্ন সম্পদ ও অবকাঠামোর ক্ষয়সাধন হয়েছে।
জিএসিএ উল্লেখ করেছে, হামলার পরপরই তাদের জরুরি উদ্ধারকারী দল ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। তবে আকস্মিক এই হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতা শুরু হলেও ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট ও সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এই বিবৃতিতে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে সৌদি আরবের নিজস্ব মূল প্রতিবেদনে এই বর্বরোচিত হামলার জন্য ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দায়ী করা হলেও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে আক্রমণকারীদের নির্দিষ্ট পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।