তিন দিনের সফরে আগামী বুধবার (১৬ এপ্রিল) ঢাকায় আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন মিয়ানমারে নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও।
গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় বসেন ট্রাম্প। তার প্রশাসনের প্রথম প্রতিনিধিদলের এ সফরে বাংলাদেশে সংস্কার ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ, ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপ, রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তা এবং মায়ানমারের পরিস্থিতিসহ ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নানা বিষয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্র।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ওয়াশিংটনে নিয়োজিত বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানান, বুধবার প্রথমে ঢাকায় পৌঁছাবেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোল চুলিক। পরে আরেকটি ফ্লাইটে আসবেন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্ড্রু হেরাপ। বাংলাদেশে অ্যান্ড্রু হেরাপের সফরসঙ্গী হিসেবে মিয়ানমারে নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সুসান স্টিভেনসনের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফরের প্রথম দিনের শুরুতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবেন।
এরপর তারা পর্যায়ক্রমে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।
আগামী বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানসহ সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলবেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এটি হতে যাচ্ছে দেশটির উচ্চ পর্যায়ের কোনো প্রতিনিধিদলের প্রথম বাংলাদেশ সফর। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের নানা বিষয়ে আলোচনা হবে। প্রাসঙ্গিকভাবে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
বাংলাদেশ সফরের সময় নিকোল চুলিক অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংস্কারপ্রক্রিয়া বিশেষ করে গণতান্ত্রিক উত্তরণে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে আলোচনা করবেন। এ সময় তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে পারেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
এছাড়া অ্যান্ড্রু হেরাপের সফরে মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সৌদি আরব সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) কাছ থেকে হাজরামাউত ও আল-মাহরা গভর্নরেট পুনর্দখল করেছে। ইয়েমেনে উপসাগরীয় দুই আরব শক্তির মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটল। খবর আল–জাজিরার।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের শীর্ষ নির্বাহী সংস্থা প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) প্রধান রশাদ আল-আলিমি শনিবার (৩ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে জানান, সৌদি সমর্থিত হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী সৌদি আরব-সংলগ্ন এই প্রদেশে ‘সব সামরিক ও নিরাপত্তা অবস্থান পুনর্দখল’ করে ‘রেকর্ড সাফল্য’ অর্জন করেছে। এর এক দিন আগে এই অভিযান শুরু হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা হাজরামাউত প্রদেশের রাজধানী ও গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর শহর মুকাল্লা পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এই শহরটি গত মাসে এসটিসি দখল করেছিল এবং সম্প্রতি সেখানে সৌদি বাহিনী হামলা চালিয়েছিল।
ইয়েমেনি সরকারি সূত্র আল–জাজিরা আরবিকে জানিয়েছে, ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় গভর্নরেট হাজরামাউতের সব জেলা এখন সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়া আল-মাহরা গভর্নরেটের যুব দপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওমর সুয়াইলাম গত রোববার তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদোলুকে জানান, এসটিসি বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী গভর্নরেটটির ‘নয় জেলার সবগুলো’ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
গত সপ্তাহের মঙ্গলবার থেকে ইয়েমেনে নজিরবিহীন উত্তেজনা দেখা দেয়। কারণ, ডিসেম্বরে এসটিসি বাহিনী হাজরামাউত ও আল-মাহরা দখল করে নেয়। এই দুটি প্রদেশ ইয়েমেনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় অর্ধেকজুড়ে এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সীমান্ত আছে এই দুই প্রদেশের।
আল–জাজিরার ইয়েমেন বিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি বলেন, গত এক দিনে ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনি সেনাবাহিনী ও হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করে এবং মাটিতে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করে সংঘাতের সমাধান করেছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এরপর রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়—ইয়েমেন সরকার সৌদি আরবে সংলাপের জন্য সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে আমন্ত্রণ জানানোর মাধ্যমে।’
শুক্রবার থেকে সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৮০ জন এসটিসি যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে রোববার এক এসটিসি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন। ওই কর্মকর্তার মতে, ‘১৫২ জন এসটিসি সদস্য আহত হয়েছেন এবং ১৩০ জনকে বন্দি করা হয়েছে।’ শনিবার এসটিসির এক সামরিক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, সৌদি যুদ্ধবিমানগুলো ‘মুকাল্লার পশ্চিমে বারশিদ এলাকায়’ এসটিসির একটি ঘাঁটিতে ‘ব্যাপক’ বিমান হামলা চালায়। তবে এসবের মধ্যেও এসটিসি সৌদি আরবের সংলাপ প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা এটিকে ‘এক আন্তরিক সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা ‘দক্ষিণের জনগণের আকাঙ্ক্ষা রক্ষা করতে পারে।
এদিকে, স্থানীয় সূত্র আল–জাজিরাকে জানিয়েছে—হাজরামাউতের সাইয়ুন শহরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরছে। সেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনরায় সক্রিয় করা এবং নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে কাজকর্ম আবার শুরু হয়েছে। আল–জাজিরা আরবি জানিয়েছে, হোমল্যান্ড শিল্ড বাহিনী অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর হাজরামাউতের গভর্নর সালেম আহমেদ সাইদ আল-খানবাশি ওয়াদি হাজরামাউতের সাইয়ুন বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন।
তবে দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্যান্য এলাকায় এখনো উত্তেজনা ও বিরোধ অব্যাহত রয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণ ইয়েমেনের বন্দর শহর এডেনে এসটিসির আরোপিত চলাচল সীমাবদ্ধতার অভিযোগ এনে একটি বিবৃতি দিয়েছে। সরকারের অভিযোগ, এসটিসি কিছু যাত্রীকে এডেনে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে এবং শহরে ঢোকার চেষ্টা করা লোকজনকে আটক করছে—যাদের মধ্যে চিকিৎসার জন্য আসা অসুস্থ মানুষ ও পরিবারও রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আদেনে নাগরিকদের চলাচলে এসটিসির এই নিষেধাজ্ঞা সংবিধানের গুরুতর লঙ্ঘন এবং রিয়াদ চুক্তির সরাসরি ভঙ্গ। আমরা সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে সব ধরনের চলাচল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা নিশ্চিত করছি যে রাষ্ট্র বেসামরিকদের সুরক্ষা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’
ইয়েমেনের এক সরকারি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হাজরামাউত থেকে এগিয়ে এডেনের দিকে অভিযান চালাবে, যা এসটিসির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বৃহস্পতিবার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কিছু ফ্লাইট পুনরায় চালু হয়েছে। বিমানবন্দর বন্ধের জন্য সরকার ও সৌদি আরব একদিকে এবং এসটিসি অন্যদিকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপ করছে।
তবে অন্যান্য এলাকায় এখনো বিধিনিষেধ রয়েছে। ইয়েমেনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জানিয়েছে, তারা সোকোত্রা দ্বীপ (ভারত মহাসাগরে অবস্থিত একটি ইয়েমেনি দ্বীপ) থেকে ও সেখানে যাওয়ার ফ্লাইট বন্ধ ও ঘুরিয়ে দেওয়ার খবর পেয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড দখল করা নিয়ে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রীর কড়া সতর্কবার্তার পরপরই দ্বীপটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার (৫ জানুয়ারি) তিনি ফের দাবি করেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ড আমাদের লাগবে।
এর আগেও একাধিকবার ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার সম্ভাবনার কথা তুলেছেন ট্রাম্প। তিনি বারবার (৪ জানুয়ারি) গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান, প্রতিরক্ষা গুরুত্ব ও বিপুল খনিজ সম্পদের কথা উল্লেখ করে এই দাবি করে আসছেন। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগ দিয়েছে, যা ডেনমার্কে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে, গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডেরিক নিলসেন ট্রাম্পের মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন যথেষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে গ্রিনল্যান্ড যাওয়ার ধারণাকে তিনি ‘একটি কল্পনা’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর কোনো চাপ নয়, আর কোনো ইঙ্গিত নয়। সংযুক্তির কোনো কল্পনাও নয়। আমরা সংলাপের জন্য উন্মুক্ত, আমরা আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু তা অবশ্যই সঠিক চ্যানেলের মাধ্যমে ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান রেখে হতে হবে।
এর আগে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেছিলেন, ড্যানিশ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত তিনটি দেশের কোনো একটিকেও যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্ত করার অধিকার নেই। তিনি আরও বলেন, ডেনমার্কের সূত্রেই গ্রিনল্যান্ড ন্যাটো সদস্য ও জোটের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার আওতায় রয়েছে। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রবেশাধিকার দেওয়া একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি আগেই কার্যকর রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্য দেন ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগী স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলারের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের পর। ওই পোস্টে কেটি মিলার গ্রিনল্যান্ডের একটি মানচিত্র যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার রঙে রাঙিয়ে ‘শিগগিরই’ শব্দটি লিখেছিলেন।
এই পোস্টের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত দুই দেশের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ স্মরণ করিয়ে একটি বার্তা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক মিত্র দেশ এবং ডেনমার্ক তার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করে। কেটি মিলার একজন ডানপন্থি পডকাস্টার ও ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তার সহকারী হিসেবেও কাজ করেছিলেন।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এমন এক সময় সামনে এলো, যখন শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে একটি বড় সামরিক অভিযান চালিয়েছে। ওই অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা ‘চালাবে’ ও মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।
এই পরিস্থিতি নতুন করে আশঙ্কা তৈরি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে শক্তি প্রয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে। এর আগে ট্রাম্প এমন সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
ট্রাম্পের দাবি, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হলে দেশটির নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা পাবে, কারণ আর্কটিক অঞ্চলের এই বিশাল দ্বীপটির কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে উচ্চপ্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে।
প্রায় ৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সাল থেকে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছে। তবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের হাতে রয়েছে। যদিও গ্রিনল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চান, তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে- যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার বিষয়ে গ্রিনল্যান্ডবাসীদের মধ্যে ব্যাপক ও দৃঢ় বিরোধিতা রয়েছে।
মাদক পাচার সংক্রান্ত মামলায় নিউইয়র্কের একটি আদালতে তোলা হচ্ছে ভেনেজুয়েলার বন্দি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। একই সঙ্গে তাকে গ্রেফতারে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো অভিযানের বৈধতা খতিয়ে দেখতে জাতিসংঘে আলোচনা শুরু হচ্ছে। খবর রয়টার্সের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৯ সালে পানামায় চালানো আগ্রাসনের পর লাতিন আমেরিকায় এটিই যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক হস্তক্ষেপ। এই সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী হেলিকপ্টারে করে রাজধানী কারাকাসে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে আটক করে।
মাদুরো গ্রেপ্তার হলেও ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতা এখনো তার অনুগতদের হাতেই রয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন ডেলসি রদ্রিগেজ।
প্রথমে মাদুরোকে আটক করাকে ‘উপনিবেশিক তেল দখল’ ও ‘অপহরণ’ বলে নিন্দা করলেও রোববার (৪ জানুয়ারি) সুর বদলান ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ও তেলমন্ত্রী ডেলসি রদ্রিগেজ। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখন অগ্রাধিকার।
এর আগে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ভেনিজুয়েলা যদি তেল খাত উন্মুক্ত করা ও মাদক পাচার বন্ধে সহযোগিতা না করে, তবে তিনি আরও সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন। একই সঙ্গে কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর বিরুদ্ধেও পদক্ষেপের হুমকি দেন এবং কিউবার কমিউনিস্ট সরকার ‘নিজ থেকেই পতনের পথে’ বলেও মন্তব্য করেন।
ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় কেন বিদেশি রক্ষী রেখেছিলেন মাদুরো?
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ ও বন্দি করতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সময় ৩২ জন কিউবান নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কিউবা সরকার। নিহতদের সম্মানে ৫ ও ৬ জানুয়ারি কিউবায় রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রোববার হাভানা জানায়, নিহতদের শেষকৃত্য সংক্রান্ত কর্মসূচি পরে ঘোষণা করা হবে। কিউবার রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা প্রেনসা লাতিনা জানিয়েছে, নিহত কিউবানরা দেশটির সামরিক বাহিনীর পক্ষে দায়িত্ব পালন করছিলেন, যা ভেনিজুয়েলা সরকারের অনুরোধেই করা হয়েছিল।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কিউবান যোদ্ধা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘর্ষে কিংবা সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলায় নিহত হন। তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বলেও দাবি করা হয়।
কিউবা-ভেনিজুয়েলা সম্পর্ক
ভেনিজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র কিউবা দীর্ঘদিন ধরেই দেশটিতে সামরিক ও পুলিশ সদস্য পাঠিয়ে নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন অভিযানে সহায়তা করে আসছে। মাদুরো নিজ দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতেন না বলেই তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় কিউবান দেহরক্ষীদের বড় একটি অংশ মোতায়েন ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানের পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মাদক পাচারসংক্রান্ত একাধিক মামলায় তাদের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ৬৩ বছর বয়সি মাদুরোকে সোমবারই মার্কিন আদালতে হাজির করার কথা। তবে তিনি আগে থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করছেন।
ভেনিজুয়েলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরানো মাদুরোর ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ভেনিজুয়েলায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ভ্লাদিমির পাদ্রিনো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সেনাসদস্য, বেসামরিক নাগরিক এবং মাদুরোর নিরাপত্তা বহরের বড় একটি অংশ ‘ঠান্ডা মাথায়’ নিহত হয়েছেন। তবে তিনি মোট হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি।
নিউইয়র্ক টাইমস ভেনিজুয়েলার এক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, হামলায় অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন, অভিযানে অন্যপক্ষে অনেক প্রাণহানি হয়েছে, বিশেষ করে বহু কিউবান নিহত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
গ্রিনল্যান্ড দখল বা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করে নেওয়ার বিষয়ে হুমকি দেওয়া বন্ধ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কড়া বার্তা দিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা একেবারেই অর্থহীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো অধিকার নেই।
মেটে ফ্রেডেরিকসেন আরও বলেন, ড্যানিশ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত তিনটি দেশের কোনো একটিকেও যুক্তরাষ্ট্রের সংযুক্ত করার অধিকার নেই।
ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য এসেছে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলারের একটি টুইটের পর। ওই টুইটে তিনি গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্রকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার রঙে রাঙিয়ে ‘শিগগিরই’ শব্দটি লিখে পোস্ট করেন।
এর আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার সম্ভাবনার কথা তুলেছেন। তিনি গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এবং খনিজ সম্পদের প্রাচুর্যের কথা উল্লেখ করে এমন দাবি করেন। ফ্রেডেরিকসেনের বক্তব্যের পরও ট্রাম্প তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি; বরং আরও জোর দিয়ে একই দাবি পুনরাবৃত্তি করেন।
ডেনিশ সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মেটে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ‘খুব স্পষ্ট’ ভাষায় কথা বলছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ডেনমার্ক ও সেই সূত্রে গ্রিনল্যান্ড ন্যাটো সদস্য ও জোটের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার আওতায় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডেনমার্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশাধিকার পায়। পাশাপাশি আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারে ডেনমার্ক এরই মধ্যে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জোরালোভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করছি, একটি ঐতিহাসিকভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশের বিরুদ্ধে এবং আরেকটি দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ করতে, যারা খুব স্পষ্টভাবেই জানিয়েছে যে তারা বিক্রির জন্য নয়।
এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নিজের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার, আর ডেনমার্ক সেটা করতে পারবে না।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত কেটি মিলারের পোস্টের জবাবে একটি বন্ধুসুলভ বার্তা দেন। সেখানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক মিত্র দেশ এবং ডেনমার্ক তার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করে।
এই কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট আরও জটিল হয়ে ওঠে, কারণ এর আগের দিন শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালায়। ওই অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা চালাবে ও মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।
ভেনিজুয়েলায় হামলা করার আগ থেকেই গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছিলে ট্রাম্প। এমনকি এ জন্য তিনি শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হলে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে, কারণ দ্বীপটির কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে উচ্চপ্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিপুল মজুত রয়েছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনল্যান্ডের জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগ দিয়েছে, যা ডেনমার্কে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
আর্কটিক অঞ্চলের বিশাল দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে বসবাস করেন প্রায় ৫৭ হাজার মানুষ। ১৯৭৯ সাল থেকে অঞ্চলটি ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে, যদিও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের বেশিরভাগ মানুষ ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা চান। তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার বিষয়ে গ্রিনল্যান্ডবাসীদের মধ্যে প্রবল বিরোধিতা রয়েছে।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র অপহরণ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের প্রতি কড়া বার্তা দেন ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ইয়াইর লাপিদ। তিনি বলেন, ভেনিজুয়েলায় যা ঘটছে, তা তেহরানের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে জোরপূর্বক সরানোর ঘটনা এমন সময় ঘটলো, যার মাত্র কয়েকদিন আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার হুমকি দেন।
তিনি বলেন, এখন আমি শুনছি যে ইরান আবারও তাদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। যদি তারা তা করে, তাহলে আমাদের তাদের ধ্বংস করতে হবে। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমরা তাদের ধ্বংস করবো। আমরা তাদের ধ্বংস করে দেবো।’
যুদ্ধের শঙ্কা জোরদার
যদিও কারাকাস ও তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বিরোধের পটভূমি আলাদা, তবু বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পদক্ষেপ ইরানের ক্ষেত্রে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা জোরদার করছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি বলেন, নতুন এক ধরনের আইনহীনতা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করছে এবং যুদ্ধকে আরও সম্ভাব্য করে তুলছে। তার মতে, হয় ট্রাম্প সীমিত পরিসরে সরকার পরিবর্তনের ধারণায় আকৃষ্ট হচ্ছেন, অথবা ইসরায়েলকে একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে—দুটি ক্ষেত্রেই ইরান যুদ্ধের পক্ষে চাপ সৃষ্টিকারী শক্তিগুলো গতি পাচ্ছে।
আবদি আরও বলেন, মাদুরোর অপহরণ ইরানকে এমন পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করতে পারে, যা সরাসরি সামরিক সংঘাতের সূচনা ঘটাবে। এর মধ্যে সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করা বা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার আগেই পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
আত্মসমর্পণ করবে না ইরান
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মরতাজাভি বলেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ চাপের নীতি স্পষ্ট করেছে, যা কূটনীতির পথকে আরও সংকুচিত করছে।
তিনি বলেন, তেহরান থেকে যা শোনা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায়—এই প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তারা আগ্রহী নয়। কারণ যুক্তরাষ্ট্র কার্যত পূর্ণ আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার মতে, এতে সংঘাতের পথই প্রশস্ত হচ্ছে এবং ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে।
ইরান–ভেনিজুয়েলার ঘনিষ্ঠতা
ইরান–ভেনিজুয়েলা জোট প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, মাদুরো সরকার মাদক পাচার নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং তেহরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলা মধ্যপ্রাচ্যের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে পশ্চিম গোলার্ধে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিচ্ছে।
মাদুরো অপসারিত হওয়ায় ইরানের আগে থেকেই সীমিত মিত্রের সংখ্যা আরও কমতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর শক্তি ক্ষয়ের পর এই ধাক্কা তেহরানের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান সরকার দ্রুতই ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, জাতিসংঘের সদস্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার মারাত্মক লঙ্ঘন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রুবিও ইঙ্গিত দেন, মাদুরোকে অপহরণ ওয়াশিংটনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শত্রুর কাছে তারা নতি স্বীকার করবেন না।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ভেনিজুয়েলার ভেতরেও মাদুরো অপসারণে এখনো সরকার ভেঙে পড়েনি। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এতে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত রয়েছে। ট্রাম্প পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেন, তার দাবি না মানলে রদ্রিগেজকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ইরান নীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সম্পৃক্ততা ওয়াশিংটনকে অন্যত্র, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ থেকে সাময়িকভাবে হলেও বিরত রাখতে পারে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
ইরানে ‘কঠিন হামলার’ হুমকি ট্রাম্পের
ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযানের পর এবার ইরানকে সরাসরি হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিতে চলমান বিক্ষোভে যদি আবারও বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘খুব শক্ত আঘাত’ হানবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
রোববার গভীর রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরিস্থিতি তারা খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তার কথায়, অতীতের মতো যদি ইরানে মানুষ হত্যা শুরু হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে খুব কঠোর প্রতিক্রিয়া আসবে।
ট্রাম্প এর আগেও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ইরানে বিক্ষোভকারীদের প্রাণহানি হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে।
এদিকে, ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে। সোমবার সকালে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থি কর্মকর্তাদের বক্তব্য সন্ত্রাস ও সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ইহুদবাদী সত্তা’ ইরানের জাতীয় ঐক্যে আঘাত হানার যেকোনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
এদিকে, ভেনিজুয়েলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অবস্থান ও বক্তব্যকে ‘ঔপনিবেশিক যুগের চিন্তাধারা’ বলে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেছেন, ওয়াশিংটনের মন্তব্যগুলো আসলে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যই প্রকাশ করছে।
সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এসমাইল বাঘাই বলেন, ইরান ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যৌথ স্বার্থের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতেও তেহরানের পররাষ্ট্রনীতিতে এই নীতিই অনুসরণ করা হবে।
ভেনেজুয়েলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দেশটির শাসনভার নেওয়ার কথা ভাবছেন—এমন খবরের প্রতিক্রিয়ায় বাঘাই বলেন, অতীতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার স্লোগান তুলে বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হতো। কিন্তু এখন তারা খোলাখুলিভাবেই বলছে, আসল বিষয় ভেনিজুয়েলার তেল।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নাটকীয়ভাবে আটকের রেশ কাটতে না কাটতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য হিসেবে কলম্বিয়া ও কিউবার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। গত রোববার গভীর রাতে প্রেসিডেন্টর বিশেষ বিমান এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি কলম্বিয়ার বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর কড়া সমালোচনা করেন। ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, পেত্রোর শাসনামলে কলম্বিয়া বর্তমানে চরম অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন উৎপাদন ও সরবরাহের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তিনি পেত্রোকে একজন ‘অসুস্থ মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করে সাফ জানিয়ে দেন যে, কলম্বিয়ার বর্তমান শাসন ব্যবস্থা এভাবে বেশিদিন চলতে দেওয়া হবে না।
কলম্বিয়ায় সরাসরি কোনো সামরিক অভিযান চালানো হবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, এ ধরনের একটি পরিকল্পনা তাঁর কাছে বেশ ‘ভালো’ বা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে, যা দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের নতুন সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে। কলম্বিয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প কিউবা নিয়েও তাঁর কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তবে তাঁর মতে, কিউবার বর্তমান সরকারের পতনের জন্য হয়তো সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন পড়বে না। কারণ হিসেবে তিনি দেশটির চলমান চরম অর্থনৈতিক সংকটের কথা উল্লেখ করেন। ভেনেজুয়েলা থেকে আসা জ্বালানি তেল ও আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিউবা বর্তমানে কার্যত দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে এবং যে কোনো সময় দেশটির অভ্যন্তরীণ কাঠামো ভেঙে পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ট্রাম্পের দাবি, কিউবান-আমেরিকানরা এই সম্ভাব্য পরিবর্তনে অত্যন্ত আনন্দিত হবেন। ট্রাম্পের এমন আক্রমণাত্মক অবস্থান ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে ব্যাপক উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
বাংলাদেশের সাবেক পলাতক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অল ইন্ডিয়া মজলিশে ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান ও ভারতের লোকসভার সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়াইসি।
সম্প্রতি এক জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে ওয়াইসি বলেন, দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির ‘এক বোন’ বসে আছেন—তাকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়া হোক। তিনি বলেন, মহারাষ্ট্রের বিজেপি সরকার রাজ্যের জনগণকে বলছে যে তারা বাংলাদেশিদের তাড়িয়ে দিয়েছে। তাহলে দিল্লিতে থাকা ওই ব্যক্তিকেও বাংলাদেশে পাঠানো হোক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস-এর খবরে বলা হয়েছে, ওয়াইসি বলেন, ‘মহারাষ্ট্র সরকার বলছে তারা বাংলাদেশিদের বের করে দিয়েছে। তাহলে মোদি জির বোন হিসেবে দিল্লিতে যে বসে আছেন, তাকেও বাংলাদেশে পাঠান।’ এ সময় সমাবেশে উপস্থিত জনতা হর্ষধ্বনিতে তার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানায়।
ওয়াইসি উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ করে বলেন, যদি তারা চান হাসিনাকে বাংলাদেশে পাঠানো হোক, তাহলে স্লোগান দিতে। তার আহ্বানে জনতা ‘নারায়ে তকবির’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দেয়। পরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোদিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, মোদি জি, এই আওয়াজ শুনুন। তাকে নিয়ে যান, তাকে বের করে দিন, তাকে বাংলাদেশে পৌঁছে দিন।
এর আগেও ওয়াইসি বাংলাদেশের ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে বিহারের পূর্ণিয়ায় এক নির্বাচনী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস ও রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) বিহারে তথাকথিত বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ আশ্রয় দিচ্ছে।
এ অভিযোগের জবাবে ওয়াইসি বলেন, বিহারে কোনো বাংলাদেশি নেই, বিশেষ করে সীমাঞ্চল এলাকাগুলোতে—যেখানে আগের নির্বাচনে তার দল ভালো ফল করেছিল। তিনি বলেন, মোদিজি বলছেন বিহারে বাংলাদেশি আছে। কিন্তু বিহারে বা সীমাঞ্চল অঞ্চলে কোনো বাংলাদেশি নেই। তবে আপনার দিল্লিতে বাংলাদেশ থেকে আসা এক বোন বসে আছেন। তাকে সীমাঞ্চলে আনুন, আমরাই তাকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেব।
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করতে চালানো যুক্তরাষ্ট্রের নজিরবিহীন সামরিক অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি সেনাসদস্যও রয়েছেন বলে জানিয়েছে নিউইয়র্ক টাইমস।
নিউইয়র্ক টাইমস এক জ্যেষ্ঠ ভেনিজুয়েলান কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় অন্তত ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘মার্কিন হামলায় নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসদস্য উভয়ই রয়েছেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভেনিজুয়েলার মাটিতে সেনা নামানোর আগে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে বড় পরিসরে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করতে ১৫০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়। ফলে সামরিক হেলিকপ্টারগুলো নিরাপদে সেনা নামাতে সক্ষম হয়। পরে সেই সেনারাই মাদুরোর অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালায়।
হতাহতের সংখ্যা কিংবা অভিযানের বিস্তারিত তথ্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সময় গত শনিবার ভোরে মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযানোকে ‘শক্তিশালী চমকপ্রদ প্রদর্শন’ হিসেবে আখ্যা দেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘নিরাপদ, সঠিক ও বিচক্ষণ রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করবে।’
এদিকে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের ফেডারেল কৌঁসুলিরা গত শনিবার একটি অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছেন। এতে মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন পাচারের অভিযোগসহ একাধিক অপরাধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাদের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই অভিযান চালানো হয়েছে, যা লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান চীনের
যুক্তরাষ্ট্রকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে চীন। পাশাপাশি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের জোরপূর্বক আটককে ‘আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীকে জোরপূর্বক আটক এবং দেশ থেকে বের করার ঘটনাকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতি এবং জাতিসংঘ সংস্থার উদ্দেশ্য ও নীতির পরিপন্থি।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘চীন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে, ভেনিজুয়েলার সরকার উৎখাতের চেষ্টা বন্ধ করতে এবং সকল বিষয় আলোচনা ও সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করার আহ্বান জানাচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ভেনিজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী, ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক’ করেছে। মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে এবং তাদের ‘আমেরিকান বিচারের মুখোমুখি’ করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও জাতীয় নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আদালত জানিয়েছে।
গতকাল রোববার বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র পরিচালনার শূন্যতা এড়াতে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আদালতের রায়ে বলা হয়, প্রশাসনিক কাজকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এই ব্যবস্থা জরুরি। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র পরিচালনা, সরকার পরিচালনার বৈধতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কোনো আইনগত কাঠামো প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণে আদালত আরও আলোচনা ও পর্যালোচনা করবে বলেও জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আপাতত ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতায় অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের ব্যবস্থা কার্যকর হলো।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ভেনিজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ী কাজ করলে দেশটিতে সরাসরি সেনা মোতায়েন করা হবে না।’ নিউইয়র্ক পোস্টের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তার সঙ্গে বহুবার কথা বলেছি, তিনি বিষয়টি বুঝতে পারছেন।’
ট্রাম্প আরও জানান, ডেলসি রদ্রিগেজ ইতোমধ্যে ভেনিজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন।
নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর ভেনিজুয়েলার ক্ষমতা কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনা শুরু হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প বলেন, ‘ডেলসি রদ্রিগেজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন, তাহলে সেখানে সরাসরি মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রয়োজন হবে না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। পাল্টা হুমকিতে তিনি বলেছেন, ইরান শত্রুদের কাছে মাথা নত করবে না, বরং শত্রুরা ইরানের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসতে বাধ্য হবে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভের মধ্যেই দুদেশের শীর্ষ নেতার এমন কথার লড়াই চলেছে। খামেনি জানিয়েছেন, তার দেশে চলা অর্থনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জীবন প্রভাবিত হচ্ছে। মুদ্রার ওঠানামা ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।
তবে এসব সমস্যার জন্য তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেন। একই সঙ্গে জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ কাজ করে যাচ্ছে। খামেনি বলেছেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গ্রহণযোগ্য হলেও সহিংসতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
খামেনি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংলাপে বসেন এবং দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের সঠিক পথে ফেরানোরও নির্দেশ দেন।
ট্রাম্পের হুমকি অবশ্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও ভালোভাবে নেননি। তিনি ট্রাম্পের হুমকিকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আরাঘচির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও বক্তব্য এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে এবং তা সরাসরি বিদেশি হস্তক্ষেপের শামিল।
তিনি বলেন, জনসম্পদের ওপর অপরাধমূলক হামলা ইরান কোনোভাবেই সহ্য করবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানি সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ইরানে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ ষষ্ঠ দিনে এসেছে। এ পর্যন্ত সহিংসতায় ৯ জন নিহত এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও তুলে নেওয়ার ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, কলম্বিয়ার অনুরোধে সোমবার (৫ জানুয়ারি) এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে যেখানে সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া ও চীন। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের আলোচনায় বর্তমান সংকটের বিভিন্ন দিক উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি একে আন্তর্জাতিক আইনের জন্য এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রে এ ধরনের হস্তক্ষেপ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এর আগে অক্টোবর ও ডিসেম্বর মাসেও ভেনেজুয়েলা পরিস্থিতি নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ দুই দফা বৈঠক করলেও সাম্প্রতিক এই অভিযানের ফলে পরিস্থিতি এখন আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় একটি সুশৃঙ্খল ও সঠিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটনই দেশটি পরিচালনা করবে। তবে এই পরিচালনা প্রক্রিয়ার কাঠামো বা পদ্ধতি ঠিক কেমন হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনার কথা জানানো হয়নি। এই পদক্ষেপকে 'ঔপনিবেশিক যুদ্ধ' হিসেবে আখ্যা দিয়ে জাতিসংঘে নিযুক্ত ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রদূত স্যামুয়েল মোনকাদা একটি প্রতিবাদলিপি জমা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এটি ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বাধীনভাবে নির্বাচিত সরকারকে ধ্বংস করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র।
অন্যদিকে, জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এই অভিযানের পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন যে, এটি কোনো শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা নয় বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পদক্ষেপ। তিনি মাদুরোকে একজন অবৈধ স্বৈরশাসক ও মাদক-সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তাঁর কর্মকাণ্ডের ফলে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানি ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে সোমবারের বৈঠকে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের বৈধতা নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের লোকসভার সদস্য এবং অল ইন্ডিয়া মজলিশ-এ-ইত্তেহাদুল মুসলেমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন। সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে ওয়াইসির এই কড়া রাজনৈতিক অবস্থানের বিষয়টি উঠে এসেছে।
জনসভায় ওয়াইসি বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, মহারাষ্ট্র ও মুম্বাইয়ের জনগণের কাছে সরকার দাবি করছে যে তারা বাংলাদেশিদের বিতাড়িত করেছে। এই প্রসঙ্গ টেনে তিনি মোদিকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ করেন যে, সরকার যদি সত্যিই অনুপ্রবেশকারীদের সরাতে চায়, তবে দিল্লিতে বসে থাকা ‘বোনকে’ কেন বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে না। তাঁর এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে জনসভায় উপস্থিত সমর্থকরা ব্যাপক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।
ওয়াইসি সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জনগণের এই দাবি শুনুন এবং দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে বের করে বাংলাদেশে পৌঁছে দিন। এটিই প্রথম নয়, এর আগেও তিনি বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত এই নেত্রীকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিহারে এক নির্বাচনী সমাবেশে নরেন্দ্র মোদি যখন বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন, তখনও ওয়াইসি পাল্টা জবাবে শেখ হাসিনাকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।
সে সময় বিহারের পূর্ণিয়ায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে ওয়াইসি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি বাংলাদেশিদের উপস্থিতির বিষয়ে চিন্তিত হন, তবে যেন দিল্লি থেকে তাঁর সেই ‘বোনকেও’ ফেরত পাঠান। তিনি আরও যোগ করেছিলেন যে, বিতর্কিত ওই ব্যক্তিকে যদি সীমাঞ্চল অঞ্চলে আনা হয়, তবে তাঁরা নিজেরাই তাঁকে বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। ওয়াইসির এসব বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক অনড় অবস্থান ও ভারত সরকারের নীতির প্রতি তীব্র সমালোচনা পুনরায় সামনে এলো।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে একটি সফল সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার পর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন যে, এখন থেকে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতার পাশাপাশি দেশটির বিশাল জ্বালানি তেলের মজুতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর ওয়াশিংটনের এত গভীর আগ্রহের নেপথ্যে আসলে কী কাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই আগ্রহের মূল কারণ লুকিয়ে আছে দুই দেশের জ্বালানি তেলের গুণগত মানের ভিন্নতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পদক্ষেপ মূলত তাদের নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও মজবুত করার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য বিষয়ক সংস্থা ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জ্বালানি তেলের মজুত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হলেও সেই তেল মূলত হালকা প্রকৃতির, যাকে প্রচলিত ভাষায় ‘সুইট ক্রুড’ বলা হয়। এই ধরনের তেল গ্যাসোলিন বা পেট্রোল তৈরির জন্য অত্যন্ত উপযোগী হলেও শিল্পকারখানা বা ভারী যানবাহনের জ্বালানি তৈরির ক্ষেত্রে এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার খনিগুলোতে যে অপরিশোধিত তেল পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত ভারী ও ঘন। এই ‘হেভি ক্রুড’ বা ভারী তেল পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, অ্যাসফল্ট এবং শিল্পকারখানার ভারি যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের উপযোগী জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্পায়নের জন্য অপরিহার্য। ফলে নিজেদের হালকা তেলের পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি বিষয়।
তেলের গুণগত মানের পাশাপাশি ভৌগোলিক অবস্থানও যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহের একটি বড় কারণ। ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এটি ভৌগোলিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কাছাকাছি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল আমদানি করতে যে পরিমাণ পরিবহন ব্যয় ও সময় প্রয়োজন হয়, ভেনেজুয়েলা থেকে তা সংগ্রহ করতে তার চেয়ে অনেক কম খরচ হবে। ইআইএ-এর হিসেব অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার খনিগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার ৩০০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল মজুত রয়েছে, যা বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এত বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশটি বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে সক্ষম, যা বৈশ্বিক সরবরাহের মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র এখন এই বিশাল অব্যবহৃত মজুতকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
ইরানে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির জেরে চলমান বিক্ষোভের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর হুমকির মুখে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। শনিবার প্রচারিত এক বিশেষ বক্তব্যে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই কোনো বহিঃশত্রুর চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ও বাজারের অস্থিতিশীলতা নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও বিক্ষোভকারীদের অভিযোগকে তিনি যৌক্তিক বলে অভিহিত করলেও, যারা সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছেন বা দাঙ্গায় লিপ্ত হয়েছেন, তাদের কঠোরভাবে দমনের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। খামেনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বৈধ দাবি নিয়ে আসা বিক্ষোভকারীদের কথা শোনা হবে, তবে দাঙ্গাকারীদের সাথে আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।
ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে পড়েছেন এবং তাঁদের এই দুর্দশার কথা খামেনি নিজেও স্বীকার করেছেন। তবে এই বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ১০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন, যদিও সরকারিভাবে মাত্র তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করা হয়েছে। কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা ‘হেংগাও’ জানিয়েছে, গত কয়েক দিনে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সশস্ত্র চড়াও হয় এবং তাঁদের হত্যা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের উদ্ধারে সরাসরি এগিয়ে আসতে প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্পের এমন সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে। যদিও ট্রাম্প তাঁর সম্ভাব্য পদক্ষেপের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেননি, তবে তাঁর এই অবস্থান তেহরানকে আরও রক্ষণাত্মক ও কঠোর হতে বাধ্য করছে।
নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বন্দি ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে প্রচণ্ড সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মুদ্রার দরপতন ও আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক অঞ্চলে সরকার সাধারণ মানুষের জন্য পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীরা একে অপরকে রাজপথে নামার আহ্বান জানাচ্ছেন। এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই খামেনি নতি স্বীকার না করার এই বার্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, ইরান সরকার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় চাপকেই মোকাবিলার পরিকল্পনা করছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, সরকারের এই কঠোর অবস্থান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি ইরানকে এক নতুন সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।