১৮ মার্চ ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পর থেকে গাজায় নতুন করে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বা বারবার ঘরছাড়া হতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে ইসরায়েল বুধবার ভোর থেকে গাজা উপত্যকায় নতুন করে ভয়াবহ হামলা শুরু করেছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এসব তথ্য জানিয়েছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৮ মার্চ হামাসের সঙ্গে স্বাক্ষরিত হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে গাজায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ গাজাবাসী নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্তজ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, তার দেশ এখন ‘সুষ্পষ্ট নীতি’ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সেটা হলো হামাসকে চাপে রাখার ‘হাতিয়ার’ হিসেবে গাজায় সব ধরনের মানবিক সহায়তাসামগ্রী প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ রাখা।
ছয় সপ্তাহ ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে কোনো মানবিক সহায়তাসামগ্রী ঢুকতে দিচ্ছে না ইসরায়েল। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ অবরোধ। সেই সঙ্গে গাজাবাসীর ওপর দমন-পীড়নও জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। ওই হামলায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন। সেই সঙ্গে ২৫১ জনকে বন্দী করে গাজায় নিয়ে যায় হামাস। ওই দিন রাত থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য, ১৮ মাস ধরে চলা যুদ্ধে গাজা উপত্যকায় নারী ও শিশু মিলিয়ে ৫১ হাজার ২৫ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
গাজায় রাতভর ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৩৫
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, ইসরায়েলি বিমান হামলার একটি ঢেউ গাজা অঞ্চলজুড়ে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের একাধিক শিবিরে আঘাত করেছে। ফলে কমপক্ষে ৩৫ জন নিহত হয়েছে।
সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিস শহরের আল-মাওয়াসি এলাকায় গত রাতভর চালানো এক হামলায় বেশ কয়েকটি তাঁবু ধ্বংস হয়। এর ফলে ১৬ জন নিহত হয়। তিনি এএফপিকে বলেন, খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুত পরিবারের আবাসস্থলে দুটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি হামলায় কমপক্ষে ১৬ জন শহীদ হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এই হামলায় ২৩ জন আহত হয়েছেন।
মুখপাত্র বাসালের মতে, বাস্তুচ্যুত মানুষের অন্যান্য শিবিরে আরও দুটি হামলায় ৮ জন নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন আহত হয়। বাসাল আরও বলেন, উত্তরাঞ্চলীয় শহর বেইত লাহিয়ায় তাঁবুতে হামলায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে আল-মাওয়াসি এলাকার কাছে আরেকটি হামলায় তাঁবুতে বসবাসকারী এক বাবা এবং তার সন্তান নিহত হয়।
গাজা সীমান্তে ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ
ফিলিস্তিনের গাজা সীমান্তে এবার নিজেদের বাসিন্দাদের ওপর বোমাবর্ষণ করল ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে গিয়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইহুদি বসতির ওপরেই বোমাবর্ষণ করে বসল! বুধবার সকালের ওই ঘটনার পরেই অবশ্য সাফাই দিয়েছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সেনাবাহিনী (আইডিএফ)।
তাদের যুক্তি, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেই গাজা সীমান্তের দু’কিলোমিটার দূরে ইতজাকের কাছে ইসরায়েলি ভূখণ্ডের ওপর যুদ্ধবিমান থেকে কয়েকটি বোমা পড়ে গিয়েছে!
ঘটনাচক্রে, নেতানিয়াহুর গাজা সফরের দিনেই ঘটেছে এই বিপত্তি। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কার্তজ জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনও আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হবে না। কার্তজ বলেন, হামাসের উপর চাপ বাড়াতেই আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে সেই সঙ্গেই গাজায় মোতায়েন সেনাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের বার্তা দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
এবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নিশানা গাজা ভূখণ্ডের একেবারে দক্ষিণ প্রান্ত রাফা। সেখান থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই। সেখানে সেনা অভিযান শুরু হলে বহু ফিলিস্তিনির হতাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চলতি সপ্তাহে গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য নতুন প্রস্তাব এসেছে ইসরায়েলের তরফে। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, হামাস যদি ১০ ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেয়, তবে বিনিময়ে কয়েকশো ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে তেলআবিব।
আল-আকসার ভাগাভাগি শুরু?
ইসরায়েল রেকর্ডসংখ্যক ১৮০ জন ইহুদি উপাসককে পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ চত্বরে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এটিই এখন পর্যন্ত চত্বরে ইহুদি প্রবেশের সর্বোচ্চ নজির। বুধবার নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় উপাসকরা প্রবেশ করে প্রার্থনা করে, যেখানে সাধারণত একসঙ্গে ৩০ জনের বেশি ইহুদিকে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না।
ঘটনাটিকে ‘ভীতিকর ও নজিরবিহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামিক ওয়াকফের আন্তর্জাতিক বিভাগের পরিচালক আওনি বাজবাজ। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছি যা আগে কখনো হয়নি।’
মুসলিম উপাসকদের ওই সময় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ওয়াকফ কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, এর মাধ্যমে আল-আকসার ‘স্থিতাবস্থা’ পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। ইসরায়েলি পুলিশ জানিয়েছে, সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই টেম্পল মাউন্টে (আল-আকসা চত্বর) প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আল-আকসা মসজিদ মুসলিমদের জন্য তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। এটি আন্তর্জাতিকভাবে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃত, যদিও ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল থেকে এলাকা দখল করে রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলি উগ্রপন্থি নেতারা আল-আকসায় ইহুদি উপাসনার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদের মতো বিভাজনের দিকেই পরিস্থিতি এগোচ্ছে।
এক শক্তিশালী বিমান হামলায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান মুখপাত্র জেনারেল আলী মোহাম্মদ নাঈনি নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (২০ মার্চ) এক মার্কিন-ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিনি প্রাণ হারান বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।
গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতভর চালানো এক শক্তিশালী বিমান হামলায় নাঈনি নিহত হন। গত দুই থেকে তিন বছর ধরে তিনি আইআরজিসি-র প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক—উভয় মাধ্যমের জনসংযোগ ও গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয়গুলো তিনি একাই সামলাতেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইল শুরু থেকেই ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে নির্মূল করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে তারা আইআরজিসি-র সেই নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যারা সরাসরি দেশটির সরকার ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সুরক্ষা দিতো।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বর্তমানে হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত কৌশলই ইরানের ওপর প্রয়োগ করছে। এই কৌশলের মূলে রয়েছে প্রতিপক্ষের একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডারকে খুঁজে বের করে সুনির্দিষ্টভাবে নির্মূল করা।
মূলত ইরানের শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শাসনব্যবস্থাকে সুরক্ষা দিতে আইআরজিসি একটি বিশেষ বাহিনী হিসেবে গঠিত হয়েছিল। তবে সম্প্রতি বাহিনীটির ঊর্ধ্বতন কমান্ডাররা ক্রমবর্ধমানভাবে ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় চলে এসেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃক আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে দায়ের করা গণহত্যার মামলায় জার্মানি আর ইসরাইলকে সমর্থন বা সহায়তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জিউইশ নিউজ সার্ভিস (জেএনএস) এমন তথ্য জানিয়েছে।
এর আগে গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডে গণহত্যার অভিযোগের বিপরীতে বার্লিন ইসরাইলের পক্ষে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করলেও, বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে দেশটি।
জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র জোসেফ হিন্টারসেহার সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরাইলের পক্ষে জার্মানির আর কোনো হস্তক্ষেপ বা মধ্যস্থতা থাকবে না।
বার্লিনের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল যখন জার্মানি নিজেই আইসিজে-তে নিকারাগুয়ার দায়ের করা একটি পৃথক মামলার মোকাবিলা করছে। নিকারাগুয়ার পক্ষ থেকে জার্মানির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে দেশটি ইসরাইলকে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে গণহত্যার কাজে সমর্থন জুগিয়েছে।
হিন্টারসেহার এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় বলেন, জার্মানি এখন নিকারাগুয়া কর্তৃক শুরু হওয়া আইসিজে-র আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশটি বর্তমানে ইসরাইলের মামলায় মনোযোগ না দিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং সেই আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গাজা ইস্যুতে ইসরাইলের অন্যতম কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল জার্মানি, তবে সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে দেশটির অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা।
শুক্রবার এক ফেসবুক বার্তার মাধ্যমে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বজুড়ে এবং নিজ দেশে বসবাসরত সকল মুসলিম ধর্মাবলম্বীকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জানিয়েছে।
ইংরেজি ও আরবিতে ‘ঈদ মোবারক’ লেখা একটি বিশেষ কার্ডসহ প্রকাশিত সেই পোস্টের ক্যাপশনে মন্ত্রণালয় লিখেছে, ‘আমাদের ইসরায়েলি ও বিশ্বের সব মুসলিম বন্ধুদের ঈদুল ফিতর মোবারক।’
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ঈদ উদযাপনের এই ক্ষণে ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আরও বলা হয়েছে, ‘এই উৎসব শান্তি, আনন্দ এবং আরও উজ্জ্বল দিনের জন্য যৌথ আশা নিয়ে আসুক।’ সাধারণত প্রতি বছর রমজান ও ঈদের সময় ইসরায়েলের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে এমন বার্তা দেওয়া হলেও বর্তমান সময়ের চরম আঞ্চলিক উত্তেজনা ও সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে এবারের এই শুভেচ্ছাবার্তাটি বিশেষভাবে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
আলজাজিরার শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পশ্চিম জেরুজালেমে অবস্থিত ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর দাবি অনুযায়ী, শীর্ষ কর্মকর্তাদের এবং কয়েক ডজন নাবিককে হত্যার প্রতিশোধ নিতেই এই আক্রমণ পরিচালনা করা হয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় যে, যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’র ‘বীরদের রক্তের বদলা’ এবং দেশটির গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব হত্যার প্রতিশোধ নিতে তারা এই হামলা চালিয়েছে। তবে এই ড্রোন হামলায় কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি ঘটেছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে জানা যায়, গত ৪ মার্চ ভারত থেকে মহড়া শেষে দেশে ফেরার পথে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ লক্ষ্য করে টর্পেডো হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যাতে ৮০ জনের বেশি নৌ-সেনা নিহত হন। এর পরপরই চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব নিহত হওয়ার ঘটনাটি উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়। মূলত এই দুই ঘটনার পালটা জবাব হিসেবেই ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ ওই দপ্তরে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান।
সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আজ উদযাপন হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। বৃহস্পতিবার এসব দেশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় শুক্রবার ঈদুল ফিতর উদযাপনের ঘোষণা দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রয়টার্স জানিয়েছে এ খবর।
ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে সৌদি আরবের মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারাম ও মদিনার মসজিদে নববীতে। একইসাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের বিভিন্ন মসজিদেও আজ ঈদের বিশেষ জামাতের আয়োজন করা হয়েছে। তবে ইরান যুদ্ধের কারণে বেশকিছু দেশে এবার ঈদগাহে নামাজ বাতিল করা হয়েছে।
এছাড়া সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর পাশাপাশি আজ ঈদুল ফিতর উদযাপিত হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশেও।
অন্যদিকে, এশিয়ার অনেক দেশ বৃহস্পতিবার শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় শনিবার ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে। এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ইরান, লিবিয়া, মরক্কোসহ এশিয়া ও আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশ।
সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে আজ শুক্রবার (২০ মার্চ) পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপন হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার এসব দেশে রমজানের ৩০তম রোজা পালন করা হয় এবং আজ শাওয়াল মাসের প্রথম দিন গণনা করা হচ্ছে।
গালফ নিউজ ও খালিজ টাইমস জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দুবাইয়ে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হবে স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে এবং সেখানে ৯০০টিরও বেশি মসজিদে একযোগে জামাতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এই আয়োজন সমন্বয় করছে দুবাই রেজিলিয়েন্স সেন্টার। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মুসল্লিদের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খলভাবে নামাজ আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ বছরও চালু থাকছে বিভিন্ন উদ্যোগ, যার আওতায় শহরের বিভিন্ন মসজিদে একযোগে তাকবির ও আজানের ধ্বনি শোনা যাবে, যা ঈদের আনন্দঘন পরিবেশকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
এর আগে বুধবার আরব আমিরাতের ফতোয়া বিভাগের অধীন শাওয়াল চাঁদ দেখা কমিটি আবুধাবিতে বৈঠক করে জানায়, দেশে কোথাও শাওয়ালের চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) রমজানের শেষ দিন এবং শুক্রবার (২০ মার্চ) ঈদুল ফিতরের প্রথম দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান ঈদ উপলক্ষে আরব ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজা, আমির ও রাষ্ট্রপ্রধানদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জনগণের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
সৌদি আরবেও ঈদ জামাতের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ইরানের চলমান হামলার বিষয়টি মাথায় রেখে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে কর্তৃপক্ষ। তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ঈদের আনন্দে যুদ্ধের আঁচ খুব একটা পড়েনি।
মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশেও আজ ঈদ উদ্যাপন হচ্ছে এবং প্রতিটি দেশে স্থানীয় ও মুসলিম সংস্কৃতির আবহে পালিত হচ্ছে পবিত্র দিনটি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান জরুরি অবতরণ করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের বিমানবিধ্বংসী হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরই বিমানটি নিকটবর্তী একটি ঘাঁটিতে অবতরণ করে। এ ঘটনার বিষয়ে অবগত দুটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, রাডার এড়িয়ে চলতে সক্ষম পঞ্চম প্রজন্মের এই যুদ্ধবিমানটি ইরানের বিরুদ্ধে একটি অভিযানে অংশ নেওয়ার সময় সমস্যায় পড়ে।
তবে বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করেছে এবং পাইলটের অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া চলমান সংঘাতে এটিই প্রথমবার, যখন ইরান কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমানকে আঘাত করতে পেরেছে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয় দেশই এফ-৩৫ ব্যবহার করছে, যার প্রতিটির নির্মাণব্যয় ১০ কোটি ডলারের বেশি।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকটাই ধ্বংস করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এর আগে ইরাকে একটি মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন ক্রু নিহত হন। সেন্টকম জানিয়েছে, ওই দুর্ঘটনা শত্রুপক্ষ বা মিত্রপক্ষের হামলার কারণে ঘটেনি। যদিও ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ নামের একটি গোষ্ঠী উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন বাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে সেগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়নি এবং বর্তমানে মেরামত কাজ চলছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই তিনজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে ইরান। যুদ্ধ শুরুর আগে এই বছরের শুরুতে বিক্ষোভের সময় পুলিশ হত্যার দায়ে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হয়ে কাজ করার অভিযোগও আনা হয়েছিল।
শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে গত জানুয়ারি মাসে উত্তাল হয়ে উঠেছিল ইরান। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সংঘটিত সেই বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করেছিল সরকার।
বিক্ষোভ দমনে বলপ্রয়োগ বন্ধ করতে তখন ইরান সরকারকে হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর দুই মাসের মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সরাসরি আক্রমণ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তাতে এ পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন।
যুদ্ধ তিন সপ্তাহে গড়ানোর মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার ইরানের বিচার বিভাগ তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর দেয়। দেশটির বিচার বিভাগের ওয়েবসাইট মিজান অনলাইন জানায়, গত জানুয়ারি মাসের অস্থিরতার সময় হত্যা এবং জায়নবাদী গোষ্ঠী ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত তিন ব্যক্তিকে আজ সকালে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুই সদস্যকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে জানানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। নিহত হওয়ার এই ঘটনার বেশির ভাগ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে সংঘটিত হয়েছে বলে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি। তবে ইরান সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্ট নিউজ এজেন্সি দাবি করেছিল, তারা ইরানে ৬ হাজার ৮৭২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও ১১ হাজারের বেশি ঘটনার তদন্ত করছে। জাতিসংঘের একজন বিশেষ দূত জানিয়েছিলেন, ইন্টারনেটে কঠোর কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিহত মানুষের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরান একজন সুইডিশ নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে বলে সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন। এর আগে ইরানি কর্তৃপক্ষ একজন কথিত ইসরায়েলি গুপ্তচরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছিল।
গতকাল বুধবার ইরানি কর্তৃপক্ষ সারা দেশে আরও শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার এবং মার্কিন-ইসরায়েলিদের পক্ষে কাজ করে যাওয়া ‘বিশ্বাসঘাতকদের’ বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়।
দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৬টিতে ১১১টি ‘রাজতন্ত্রপন্থী সেল’–কে গতকাল রাতভর অভিযানের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে।
গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধের পর কথিত গুপ্তচরদের বিরুদ্ধে তেহরান কঠোর অভিযানে নেমেছিল। তখন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর হাইফা শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে আগুন লেগেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উত্তর ও মধ্য ইসরায়েলসহ জেরুজালেম এলাকায় বিমান হামলার সতর্ক সংকেত (সাইরেন) বাজানোর পরপরই এই হামলার খবর পাওয়া যায়।
তাৎক্ষণিকভাবে হামলায় ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, সে বিষয়েও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গত বছর ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও হাইফার এই তেল শোধনাগারটি আক্রান্ত হয়েছিল।
এর আগে বুধবার ভোরে ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে বিমান হামলা চালায়, যা বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এই গ্যাসক্ষেত্রটির একটি অংশ কাতারের অধীন।
সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার জবাবে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের রাস লাফান এলএনজি কমপ্লেক্সের কিছু অংশে আগুন লেগেছে, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গ্যাসকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এই তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স ও আল-জাজিরা।
কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী এই কেন্দ্রটি থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির সিংহভাগ সরবরাহ করা হয়। বর্তমানে কাতারের প্রায় সব প্রাকৃতিক গ্যাস এই রাস লাফান কেন্দ্রেই প্রক্রিয়াজাত ও রপ্তানি করা হয়।
বার্তাসংস্থা কেপলারের মতে পাকিস্তান তাদের মোট এলএনজি আমদানির ৯৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ৭০ শতাংশই কাতার থেকে সংগ্রহ করে। অন্যদিকে ভারত তাদের প্রয়োজনীয় এলএনজির ৪০ শতাংশেরও বেশি পায় এই উপসাগরীয় দেশটি থেকে।
ইরান যুদ্ধ তিন সপ্তাহে গড়ানোর ফলে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই এলএনজি স্থাপনাটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতার এনার্জি চলতি মাসের শুরুর দিকেই উৎপাদন স্থগিত করেছিল তবে সাম্প্রতিক হামলার কারণে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেপলারের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নিজস্ব এলএনজি মজুত অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় দেশ দুটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে দেশগুলোতে ব্যাপক লোডশেডিং এবং শিল্প কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান তাদের এলএনজি চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ কাতার থেকে মেটানোয় তারাও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যদিও তাইপে জানিয়েছে তারা মার্চ ও এপ্রিল মাসের জন্য পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
এছাড়া চীন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপান কাতার থেকে বড় পরিমাণে এলএনজি আমদানি করলেও তাদের পর্যাপ্ত মজুত থাকায় তারা আপাতত সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে চীনের আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় হওয়ায় তারা এই সংকট মোকাবিলায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
রাশিয়ার সহায়তায় নির্মিত ইরানের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা না চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। দেশটির রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎ সংস্থা রোসাটম-এর প্রধান আলেক্সেই লিখাচেভ এক বিবৃতিতে এই সতর্কতা জারি করেছেন।
লিখাচেভ স্পষ্ট করে বলেছেন, যদি কোনও গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটে, তবে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব থেকে এই সংঘাতের কোনও পক্ষই রেহাই পাবে না।
এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন যে, গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সচল রিঅ্যাক্টরের খুব কাছে একটি হামলা হয়েছে। তবে সেই ঘটনায় কোনও ক্ষয়ক্ষতি বা কেউ হতাহত হয়নি।
বিদ্যমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে রোসাটম ইতোমধ্যে বুশেহর থেকে তাদের বেশ কিছু কর্মীকে সরিয়ে নিয়েছে।
লিখাচেভ জানান, সেখানে বর্তমানে অবস্থানরত ৪৮০ জন কর্মীর মধ্যে সিংহভাগকেই সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রটি সচল রাখার জন্য মাত্র কয়েক ডজন কর্মী সেখানে রাখা হবে।
সূত্র: এপি
ইরান যুদ্ধ পরিচালনার জন্য হোয়াইট হাউজের কাছে ২০০ বিলিয়ন (২০ হাজার কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি জরুরি তহবিল চেয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন। প্রশাসনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এই বিশাল অঙ্কের আর্থিক চাহিদার কথা জানিয়েছে। এই বরাদ্দ মার্কিন কংগ্রেসে তীব্র বাধার মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত এই তহবিলের পরিমাণ বর্তমান বিমান হামলার খরচকেও ছাড়িয়ে গেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রশস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানো। গত তিন সপ্তাহে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর ফলে ফুরিয়ে আসা নিখুঁত নিশানার গোলাবারুদ নতুন করে সংগ্রহ করতে এই বড় অঙ্কের প্যাকেজ চেয়েছে প্রতিরক্ষা বিভাগ।
তবে হোয়াইট হাউজ শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের কাছে কতটুকু অনুমোদনের জন্য চাইবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কিছু কর্মকর্তা পেন্টাগনের এই অনুরোধ পাসের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অভ্যন্তরীণ আলোচনায় গত কয়েক সপ্তাহে প্রতিরক্ষা বিভাগ বেশ কিছু প্রস্তাবনা পেশ করেছে।
এই তহবিল নিয়ে কংগ্রেসে একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন যেমন সীমিত, তেমনি ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই এর কঠোর সমালোচনা করে আসছেন। রিপাবলিকানরা অতিরিক্ত অর্থায়নের পক্ষে ইঙ্গিত দিলেও সিনেটের ৬০ ভোটের সীমাবদ্ধতার কারণে এখনও কোনও স্পষ্ট আইনি পথ দেখাতে পারেননি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদেশি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধের পেছনে কংগ্রেসের অনুমোদিত ১৮৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয়েরও সমালোচনা করেছিলেন তিনি। অথচ ইরান যুদ্ধের খরচ দ্রুত বাড়ছে; কর্মকর্তাদের মতে, প্রথম সপ্তাহেই এই খরচ ১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পরপরই সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখতে এই অতিরিক্ত তহবিলের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে প্রশাসন। পেন্টাগনের ভেতরে এই প্রচেষ্টার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডেপুটি ডিফেন্স সেক্রেটারি স্টিভেন ফেইনবার্গ। তিনি মূলত মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি সম্প্রসারণ এবং মূল অস্ত্র ব্যবস্থার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছেন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো গোলাবারুদের ঘাটতি মেটানো এবং উৎপাদন ত্বরান্বিত করা। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, শ্রমিক, স্থাপনা এবং উপকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন বাড়ানো সময়সাপেক্ষ হবে।
যুদ্ধ শুরুর আগেই ট্রাম্প ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের আহ্বান জানিয়েছিলেন। হোয়াইট হাউজের অফিস অব ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড বাজেট তখন এটিকে অত্যন্ত বড় বলে মনে করায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এদিকে, আইনপ্রণেতারা এই চূড়ান্ত প্যাকেজে গোয়েন্দা কার্যক্রমের জন্য অতিরিক্ত অর্থ অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলেছেন।
সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভয়াবহ সংঘাত অবিলম্বে বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কেন্দ্র ভ্যাটিকান। বুধবার (১৮ মার্চ) ভ্যাটিকানের স্টেট সেক্রেটারি কার্ডিনাল পিয়েত্রো পারোলিন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই আহ্বান জানান।
পারোলিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে বলেন, এই যুদ্ধ যত দ্রুত সম্ভব শেষ করা উচিত, কারণ এর ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জোরালোভাবে বলেন, ‘লেবাননকে একা থাকতে দিন।’ ভ্যাটিকান নিউজ এই প্রভাবশালী কার্ডিনালের বক্তব্যের বরাত দিয়ে সংবাদটি প্রকাশ করেছে।
কার্ডিনাল পারোলিন একই ধরনের বার্তা ইসরায়েলের প্রতিও প্রদান করেছেন। তিনি দেশটিকে সংঘাতের পথ পরিহার করে কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে যে কোনো বিদ্যমান সমস্যার সমাধানের পরামর্শ দেন। তার মতে, সামরিক অভিযানের চেয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলাপ-আলোচনাই দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এই অঞ্চলে মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ওই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ প্রায় ১,৩০০ মানুষ নিহত হওয়ার পর থেকেই সংঘাতের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
উল্লেখ্য যে, গত কয়েক সপ্তাহে ইরান এই আক্রমণের পাল্টা জবাব হিসেবে ইসরায়েল, জর্ডান, ইরাক এবং পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
এসব হামলায় ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বিশ্ববাজার ও বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যাটিকানের এই উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো যখন সংঘাতটি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলে এখন পোপের এই প্রতিনিধির বক্তব্যের প্রভাব কতটুকু পড়ে, সেটিই দেখার বিষয়।
বর্তমানে লেবানন ও ইরানের ওপর অব্যাহত সামরিক চাপের ফলে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং আঞ্চলিক শান্তি পুরোপুরি হুমকির মুখে পড়েছে। ভ্যাটিকান বরাবরই বিশ্বজুড়ে শান্তি বজায় রাখার পক্ষে সোচ্চার এবং কার্ডিনাল পারোলিনের এই সাম্প্রতিক মন্তব্য মূলত যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষার একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইসরায়েলি সরকার এই ধর্মীয় আহ্বানে সাড়া দিয়ে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসে কি না, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে জল্পনা চলছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
ইরানের পক্ষ থেকে সৌদি আরব ও পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর হামলা আর সহ্য করা হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ। প্রয়োজনে তাদের বিপক্ষে সম্মিলিত বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। একইসঙ্গে তেহরানকে অবিলম্বে তাদের আঞ্চলিক কৌশল পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
রিয়াদে আরব রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে পরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছে, যদিও ইরানি কূটনীতিকরা তা অস্বীকার করছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলতা দেখা যায়, এটি আগে থেকেই পরিকল্পিত, সাজানো ও চিন্তাভাবনা করে করা হয়েছে।
সৌদি আরব কখন এর প্রতিক্রিয়া জানাবে তা প্রকাশ করা ‘বুদ্ধিমানের কাজ হবে না’ বলেও জানান তিনি। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, আমাদের ধৈর্যের সীমা আছে, কিন্তু তা অসীম নয়।
এর আগে, গতকাল ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়। এর মধ্যে কাতারের রাস লাফান গ্যাস ফ্যাসিলিটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের হাবশান গ্যাস ফ্যাসিলিটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর আসে। কাতার সরকার এই হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) আগেই হুমকি দিয়েছিল যে, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
আজ সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া চারটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, তারা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সংঘাত শেষ হলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ হবে, কারণ আস্থা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে পারস্পরিক আস্থা পুনরুদ্ধার ‘প্রায় অসম্ভব’ হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা