ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগাঁওয়ে বন্দুকধারীদের হামলায় প্রাণহানির ঘটনায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। ওই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে দেশটি। তবে ভারতের অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে পাকিস্তান।
ইতোমধ্যে কাশ্মীরে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (টিআরএফ) নামের একটি জঙ্গি সংগঠন। সংগঠনটি পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার একটি শাখা। ধারণা করা হয়, টিআরএফ এর পেছনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর সমর্থন আছে।
পাকিস্তানি নাগরিকদের ভিসা স্থগিত করল ভারত
পাহেলগাঁওয়ে হামলার ঘটনার পর চিরবৈরী প্রতিবেশী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একের পর এক পদক্ষেপ নিচ্ছে নয়াদিল্লি। এবার পাকিস্তানি নাগরিকদের সব ধরনের ভিসা স্থগিত করেছে ভারত। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতীয় মেডিকেল ভিসাসহ পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা পরিষেবা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে ভারত।
বিবৃতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইতোমধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য জারি করা সব ধরনের বৈধ ভারতীয় ভিসা আগামী রোববার (২৭ এপ্রিল) থেকে বাতিল হয়ে যাবে। এছাড়া ওই দেশের নাগরিকদের দেওয়া সকল মেডিকেল ভিসাও মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) পর্যন্ত বৈধ থাকবে।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলেছে, যেসব পাকিস্তানি নাগরিকের কাছে ভারতীয় ভিসা রয়েছে, তারা ভারত ত্যাগ করার জন্য ৭২ ঘণ্টার সময় পাবেন। ভিসা বাতিলের পাশাপাশি পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভিসা পরিষেবাও স্থগিত করেছে ভারত। এর ফলে পাকিস্তানি নাগরিকরা ভারত ভ্রমণের জন্য কোনো ধরনের নথি পাবেন না।
ভারতীয়দের অতি দ্রুত দেশে ফেরার পরামর্শ দিল্লির
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের নেওয়া পাঁচটি পদক্ষেপ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন শুরু করেছে দিল্লি। পাকিস্তানে অবস্থানরত ভারতীয়দের অতি দ্রুত দেশে ফেরার পরামর্শ দিয়েছে নয়াদিল্লি। গতকাল বৃহস্পতিবার এক জরুরি বৈঠকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঁচটি পদক্ষেপ নেয় ভারত।
গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের যেসব নাগরিক বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তাঁদের অবশ্যই ভারত ছাড়তে হবে। এছাড়া ভারতের নাগরিকদের পাকিস্তান ভ্রমণ না করতে কঠোরভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভারতের যেসব নাগরিক পাকিস্তানে অবস্থান করছেন, তাদের অতি দ্রুত ভারতে প্রত্যাবর্তন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভারত সীমান্তে সেনা বাড়াচ্ছে পাকিস্তান
ধীরে ধীরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে ভারত। অন্য দিকে যুদ্ধের আশঙ্কায় পাল্টা প্রস্তুতি চালাচ্ছে ইসলামাবাদ। সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই সীমান্ত লাগোয়া ঘাঁটিগুলিতে সেনা সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন পাকিস্তান।
সামাজিক মাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়লেও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর তরফে অবশ্য এই নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। খবর আনন্দবাজার পত্রিকার। সীমান্ত লাগোয়া এলাকায় ইসলামাবাদের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধির প্রমাণ মিলেছে বিমান ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ‘ফ্লাইটরাডার২৪’-এর স্ক্রিনশট থেকে। এক্স হ্যান্ডলে সেগুলিকে ছড়িয়ে দেন নেটাগরিকদের একাংশ। ওই স্ক্রিনশট অনুযায়ী, করাচি বিমানঘাঁটি থেকে একের পর এক বিমান লাহোর এবং রাওয়ালপিন্ডির কাছে মোতায়েন করেছে ইসলামাবাদ।
উল্লেখ্য, করাচির ‘সাউথ এয়ার কমান্ড’ থেকেই গোটা দক্ষিণাঞ্চলের যাবতীয় অপারেশন পরিচালনা করে পাকিস্তান বিমানবাহিনী। উত্তরাঞ্চলে ভারতের সীমান্তের কাছে ইসলামাবাদের মোট চারটি বিমানঘাঁটি রয়েছে। সেগুলি হল, লাহোর সংলগ্ন সারগোধা ও মুরিদ এবং রাওয়ালপিন্ডি সংলগ্ন চাকলালা ও নুর খান। এই ঘাঁটিগুলিকে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর শিরদাঁড়া বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
বিমানঘাঁটির পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় (লাইন অফ কন্ট্রোল বা এলওসি) উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। সেখানকার বাঙ্কারগুলিতেও সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি, ভারতের সঙ্গে সম্মুখসমরে যেতে যে ইসালামাবাদ প্রস্তুত, এই সব পদক্ষেপেই রয়েছে তার ইঙ্গিত।
পাকিস্তানের আকাশসীমায় ঢুকতে পারবে না ভারতীয় প্লেন
ভারতশাসিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিক্রিয়ায় সীমান্ত বন্ধ, কূটনীতিক বহিষ্কারসহ আরও বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে নয়াদিল্লি। তার প্রতিক্রিয়ায় এবার পাল্টা ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে পাকিস্তান। এখন থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমায় কোনো ভারতীয় প্লেন প্রবেশ করতে পারবে না। অর্থাৎ, ভারতের জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি (এনএসসি) ভারতের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত পানির প্রবাহ ভারতে যদি একতরফাভাবে বন্ধ বা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেটিকে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
পানি বন্ধ করলে যুদ্ধের ইঙ্গিত পাকিস্তানের
ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে ভারত। দেশটির এ পদক্ষেপকে ‘যুদ্ধের শামিল’ বলে উল্লেখ করেছে পাকিস্তান। এছাড়া তারা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পাকিস্তানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটি (এনএসসি) কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, পাকিস্তানের আইনি অধিকারভুক্ত পানি প্রবাহ বন্ধ বা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার যেকোনো পদক্ষেপ সরাসরি ‘যুদ্ধের উসকানি’ হিসেবে বিবেচিত হবে। এজন্য জাতির শক্তির ব্যবহার করে তার জবাব দেওয়া হবে।
ভারত সরকার এই পানিচুক্তি স্থগিত করার পাশাপাশি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরও নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ভিসা বাতিল, ভিসা সেবা স্থগিত এবং পাকিস্তানিদের ভারতে প্রবেশ নিষেধ। ভারতের দাবি, জম্মু-কাশ্মীরে মঙ্গলবারের হামলার পিছনে পাকিস্তান-প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা রয়েছে। যদিও পাকিস্তান এই অভিযোগকে ‘ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন’ বলে উল্লেখ করে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
চীনের তিব্বত অঞ্চলে আঘাত হানা ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। বৃহস্পতিবার রাতে আঘাত হানা এ বিপর্যয়ে তিন শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুর্গত এলাকায় জরুরি অবস্থা জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও চীনা বার্তাসংস্থা সিনহুয়ার বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
ভূমিকম্পের উপকেন্দ্র ছিল তিব্বতের নাগচু অঞ্চলের বাচেন কাউন্টিতে। ১৯৫০-এর দশকে তিব্বতকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার পর অঞ্চলটিকে বেইজিং ‘তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ হিসেবে অভিহিত করে। মূল ভূমিকম্প কবলিত বাচেন কাউন্টি রাজধানী লাসা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত।
স্থানীয় প্রশাসনের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, শক্তিশালী এই ভূকম্পনে এখন পর্যন্ত ৩৩৯টি বাড়িঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন বিশেষ সতর্কতা কার্যকর করে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জরুরি উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে।
তবে পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় ভূমিকম্পের ফলে উপর থেকে বড় বড় পাথর খসে পড়ে স্থানীয় বেশ কয়েকটি প্রধান সড়কের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পার্বত্য ও দুর্গম এলাকা হওয়ায় সড়ক অবরুদ্ধ থাকার কারণে উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্যদের যথাসময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে এবং ত্রাণ কার্যক্রমে চরম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হচ্ছে।
আইনের শাসন সূচকে দুই ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের (ডব্লিউজেপি) প্রকাশিত ‘আইনের শাসন সূচক ২০২৬’-এ ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৩তম। উন্নতি সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে দেশটি।
সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ০ দশমিক ৩৯, যেখানে বৈশ্বিক গড় ০ দশমিক ৫৫। তবে এ বছর আইনের শাসন সূচকে বিশ্বের ১৫তম শীর্ষ অগ্রগতি অর্জনকারী দেশ হয়েছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অগ্রগতির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে দেশটি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। এ অঞ্চলে শীর্ষে রয়েছে নেপাল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা ও ভারত। বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে শুধু পাকিস্তান ও আফগানিস্তান।
আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশও সূচকে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ঘানা ৬২তম, কেনিয়া ১০০তম, লাইবেরিয়া ১০৩তম, সিয়েরা লিওন ১১০তম, নাইজেরিয়া ১২০তম এবং জিম্বাবুয়ে ১২২তম স্থানে রয়েছে।
বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে আইনের শাসনে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। সূচকের শীর্ষ পাঁচে রয়েছে যথাক্রমে ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও লুক্সেমবার্গ।
সূচকে আটটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে দেশগুলোর আইনের শাসন মূল্যায়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো—সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি, মুক্ত সরকার, মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, বিধি-বিধানের প্রয়োগ, দেওয়ানি বিচার এবং ফৌজদারি বিচার।
আটটি মানদণ্ডের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে। এগুলো হলো সরকারি ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতির অনুপস্থিতি এবং বিধি-বিধানের প্রয়োগ। বাকি পাঁচটি মানদণ্ডে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে।
মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থা সবচেয়ে দুর্বল। এ খাতে ০ দশমিক ৩১ স্কোর নিয়ে ১৪৩টি দেশ ও বিচারব্যবস্থার মধ্যে ১৩৩তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। আর সবচেয়ে ভালো অবস্থান মুক্ত সরকার মানদণ্ডে। এ খাতে ০ দশমিক ৪২ স্কোর নিয়ে ১২৮তম স্থানে রয়েছে দেশটি।
ইউরোপের রাজপথে বাড়ছে বিক্ষোভ, আর রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্বল হচ্ছে প্রচলিত মধ্যপন্থী দলগুলোর অবস্থান। ফ্রান্সে শিক্ষা খাতে অর্থায়ন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ, ইতালিতে জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির চাপ, স্পেনে আবাসনসংকট এবং পর্তুগালে মজুরি ও পেনশন নিয়ে অসন্তোষ—ভিন্ন ভিন্ন দেশের এসব আন্দোলনে অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে গোটা ইউরোপ। ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণের চাপ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় ইউরোপের বহু দেশের সরকারকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তার উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ। ফলে সংকটটি শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই; প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তথ্যসূত্র: রয়টার্স, এপি ও এএফপি।
ধীর প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতিতে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ: ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ১ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ইউরোজোনে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে ইইউতে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
প্রবৃদ্ধির গতি কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং সরকারের রাজস্ব আয় চাপে পড়ে। অন্যদিকে ঋণের সুদ ও সরকারি ব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন এবং সামাজিক সুরক্ষায় অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের সুযোগ সংকুচিত হয়। সরকারকে তখন বাজেটের ভারসাম্য রক্ষা এবং নাগরিকদের চাহিদা পূরণের মধ্যে কঠিন সমন্বয় করতে হয়।
জ্বালানির দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে তার প্রভাব শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে কৃষি, খাদ্যপণ্য এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের বহু মানুষের কাছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক পরিসংখ্যানের চেয়ে বাজারে কেনাকাটা, বাড়িভাড়া পরিশোধ এবং মাস শেষে সঞ্চয় ধরে রাখাই এখন বড় বাস্তবতা।
ফ্রান্স থেকে ইতালি, বিক্ষোভের পেছনে জনআস্থার সংকট: ফ্রান্সে জ্বালানির মূল্য, সরকারি ঋণের সুদ, শিক্ষা খাতে অর্থায়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বিস্তৃত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্থসংকট ও শিক্ষকস্বল্পতা নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক ও পেনশনভোগীদের বিভিন্ন দাবি। কিছু এলাকায় বিক্ষোভ সংঘর্ষে রূপ নেওয়ায় সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকারের সামনে তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে সরকারি অর্থব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অন্যদিকে নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা ও জনসেবার প্রত্যাশা পূরণ করা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে অনাস্থা এই চ্যালেঞ্জকে বাড়িয়ে তুলছে।
ইতালির মিলান, তুরিন ও বোলোনিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানি এবং সরকারি নীতি নিয়ে অসন্তোষ দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারকে অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও সামলাতে হচ্ছে। দেশটিতে আরও কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির তৎপরতা প্রচলিত ডানপন্থী নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে এসব বিক্ষোভকে একক কোনো ইউরোপব্যাপী আন্দোলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রতিটি দেশের দাবি, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনের ধরন আলাদা। অভিন্ন বিষয় হলো—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থার ঘাটতি।
স্পেন ও পর্তুগালে আবাসন, মজুরি ও পেনশন নিয়ে উদ্বেগ: স্পেনে আবাসনসংকট তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বড় শহরগুলোতে বাড়িভাড়া ও বাড়ি কেনার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকের পক্ষে স্বতন্ত্রভাবে বসবাস শুরু করা কঠিন হচ্ছে। ফলে আবাসনকে শুধু বাজারের বিষয় হিসেবে না দেখে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনার দাবি জোরালো হয়েছে।
পর্তুগালেও বাড়িভাড়া, মজুরি, পেনশন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে। আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়লে কর্মজীবী মানুষের সঞ্চয় কমে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থাকলেও তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
বেলজিয়ামে সরকারি নীতি, শিক্ষা ও বাজেটসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঘিরে বিক্ষোভ দেখা গেছে। আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থী ও নাগরিকদের আন্দোলনে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং জনসেবার মান উন্নয়নের দাবি উঠে এসেছে। গ্রিসসহ অন্যান্য দেশেও জীবনযাত্রার ব্যয়, শ্রমিকদের অধিকার ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসে কৃষিনীতি এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ নিয়েও কৃষকদের উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।
এসব আন্দোলনের ধরন এক নয়। কোথাও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কোথাও সরকারি নীতি, আবার কোথাও রাজনৈতিক জবাবদিহি প্রধান দাবি। কিন্তু এসব ইস্যু একত্রে ইউরোপের সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরে।
মধ্যপন্থিদের দুর্বলতা, উগ্র ডান ও বামপন্থার উত্থান: ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রচলিত মধ্য-বাম ও মধ্য-ডানপন্থি দলগুলোর প্রতি আস্থা কমে যাওয়া। অনেক ভোটারের ধারণা, এসব দল সাধারণ শ্রমিক, নিম্ন আয়ের মানুষ ও তরুণদের সমস্যার যথাযথ সমাধান দিতে পারছে না। এই অসন্তোষের সুযোগে উগ্র ডানপন্থি, উগ্র বামপন্থি ও জনতাবাদী দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।
জার্মানিতে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ), ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন (সিএসইউ) ও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসপিডি) মতো প্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হচ্ছে। অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) ডানপন্থি রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বামপন্থী দল দি লিঙ্কেও নির্দিষ্ট ভোটারগোষ্ঠীর সমর্থন ধরে রেখেছে।
ফ্রান্সে মেরিন লু পেনের ন্যাশনাল র্যালি এবং জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর নেতৃত্বাধীন বামপন্থী রাজনৈতিক শিবির প্রচলিত মধ্যপন্থী শক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ইতালিতেও মেলোনির সরকারের পাশাপাশি আরও কট্টর ডানপন্থি অবস্থানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের তৎপরতা আলোচনায় এসেছে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশে কট্টর ডানপন্থি দল সরকারে অংশীদার হয়েছে বা সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। এর ফলে জোট সরকার গঠন, অভিবাসননীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং ইউরোপীয় সহযোগিতা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও জটিল হতে পারে। তবে এসব দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলেই যে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে, তার নিশ্চয়তা নেই।
গণতন্ত্র নিয়ে অসন্তোষ ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন: পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জনমত জরিপের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তোষের হার ফ্রান্সে ৬৯ শতাংশ, স্পেনে ৬৮ শতাংশ এবং ইতালিতে ৬২ শতাংশ। এসব হার নির্দিষ্ট জরিপের সময় ও প্রশ্নের ওপর নির্ভরশীল। তবু বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে অসন্তোষ যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়, তা স্পষ্ট।
অর্থনৈতিক বৈষম্য, আবাসনসংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই পরিস্থিতিতে উগ্র ডানপন্থি দলগুলো অভিবাসন, জাতীয় পরিচয় ও আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন সামনে আনছে। বামপন্থি শক্তিগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, বৈষম্য কমানো এবং সরকারি সেবার প্রসারে।
সামনে বিভিন্ন দেশে নির্বাচন ও রাজনৈতিক জোট পুনর্গঠনের সম্ভাবনা থাকায় এসব প্রবণতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ছোট কট্টরপন্থি দলগুলো জোটের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে, আবার রাজনৈতিক বিভাজন দীর্ঘায়িত হলে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারও বিলম্বিত হতে পারে।
ভূরাজনৈতিক সংঘাত ও ইউরোপীয় ঐক্যের পরীক্ষা: ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বৈশ্বিক ভূরাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন ইউরোপের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ব্যয়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সরকারগুলোর জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারও এক নয়। কোনো দেশ বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচনকে গুরুত্ব দেয়, আবার কোথাও জনসেবা ও সামাজিক সুবিধা বাড়ানোর দাবি প্রবল। এসব পার্থক্য অভিন্ন নীতি গ্রহণে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও ইউরোপের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের বড় রপ্তানি বাজার। সেখানে প্রবৃদ্ধি কমে গেলে ভোক্তাদের ব্যয় ও আমদানির চাহিদা প্রভাবিত হতে পারে। জ্বালানির আন্তর্জাতিক মূল্য বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিতেও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এসব প্রভাব নির্ভর করবে সংকটের স্থায়িত্ব, আন্তর্জাতিক বাজার এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
সব মিলিয়ে, ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল মূল্যস্ফীতি বা বিক্ষোভের সংকট নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সম্মিলিত পরীক্ষা। নাগরিকদের দৈনন্দিন সমস্যার কার্যকর সমাধান, সাশ্রয়ী আবাসন, মানসম্মত জনসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যথায় অর্থনৈতিক অসন্তোষ আরও রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করতে পারে এবং ইউরোপের ঐক্য ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। মার্কিন কর্মকর্তারা এবং পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে এ তথ্য জানিয়েছে।
স্বল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক ও তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী তাদের সামরিক মহড়াও বাড়িয়েছে। হামলার কৌশল অনুশীলনের জন্য তারা ইরাকের আকাশসীমার ওপর দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়িয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন হামলার বিষয়ে আলোচনা করতেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে ইসরায়েলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন।
সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে থাকতে পারে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, পারমাণবিক স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ভান্ডার। কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, আরও এক দফা বড় ধরনের হামলা ইরানের অর্থনীতিকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে প্রায় আট মাস ধরে চলা সংঘাতের পর তেহরান কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে।
তবে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তা ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম দফার তীব্র হামলার চেয়ে বেশি সফল হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ওই সময়ের সংঘাত বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল করেছিল এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের মজুতের ওপর পেন্টাগনের চাপ মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে হামলার অনুমোদন দেবেন কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। চলতি বছর তিনি একাধিকবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরুর পরিকল্পনায় ভেটো দিয়েছেন। চলতি মাসেও এমনটি ঘটেছে, যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী হামলা চালানোর জন্য প্রায় পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল।
ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল হামলা চালালে এবার পাল্টা হামলার পরিধি আরও বাড়ানো হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর বাইরে গিয়ে তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেব্লও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তাঁদের বক্তব্য, এবারের লড়াই দ্রুত শেষ হবে না, আবার তা সীমিত পরিসরেও আটকে থাকবে না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম জড়ো করছে, যা নভেম্বরের শুরুর দিকে পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় থাকবে। পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নিজেদের দাবিতে অগ্রগতি অর্জনের জন্য মার্কিন আলোচকেরা সম্ভাব্য নতুন যুদ্ধের হুমকিকে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।
তবে এখন পর্যন্ত ইরানের আলোচকেরা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি হননি। তাদের অবস্থান হলো, আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে। মার্কিন পরিকল্পনাকারীদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, টানা তিন দিনের একটি তীব্র সামরিক অভিযান ইরানের অর্থনীতির এতটাই ক্ষতি করতে পারে যে দেশটি আলোচনায় নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগেও বারবার ইরানের পতনের পূর্বাভাস দিয়েছেন। অন্যদিকে পশ্চিমা কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক চাপের মুখেও ইরান সরকার এখন পর্যন্ত টিকে রয়েছে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় পেন্টাগনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতির শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডানা স্ট্রুল বলেন, ‘যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে বিষয়টি স্পষ্ট যে, এখন পর্যন্ত পরিচালিত প্রচলিত সামরিক অভিযান, বর্তমানের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ কোনোটিই ইরানি সরকারকে অর্থবহভাবে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পারেনি।’
বর্তমানে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসিতে কর্মরত স্ট্রুল বলেন, ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহু কেউই এখনো ‘এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি তুলে ধরতে পারেননি, যা ব্যাখ্যা করে যে—আরও যুদ্ধ কীভাবে এই কৌশলগত সংকটের সমাধান করবে, বিশেষ করে এমন এক অঞ্চলে যেখানে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত ক্রমেই বাড়ছে।’
ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আগামী মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এ আলোচনা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। গত বুধবার (২১ অক্টোবর) মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে পুতিনের বৈঠকের পর এ তথ্য জানানো হয়।
সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি রাজকীয় প্রাসাদে পুতিন ও উইটকফের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক হয়। এটি ছিল তাদের নবম সরাসরি বৈঠক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনা কারিগরি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে। এর মূল লক্ষ্য হবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউক্রেন ও রাশিয়ার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা। আলোচনা আগামী ১০ নভেম্বর বা এর পরবর্তী কোনো সময়ে শুরু হতে পারে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সর্বশেষ শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে আলোচনার শর্ত নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। পুতিনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের সম্ভাবনা নাকচ করা এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি করা।
বৈঠকের আগে নরওয়ের রাজধানী ওসলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ও ন্যাটো প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন উইটকফ। ওই আলোচনায় ইউক্রেন নতুন কিছু ধারণা ও প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা। উইটকফ পুতিনকে জানান, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। তবে ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ বলেন, ‘এসব বিষয়ে রাশিয়া পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়।’
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে যুদ্ধ অবসানের মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার আশা করছেন। তবে ক্রেমলিনের মতে, দুই নেতার মধ্যে বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের সহযোগীদের মাধ্যমে সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
গত বুধবারের (২১ অক্টোবর) বৈঠকে পুতিন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে সহায়তার প্রস্তাবও দেন। তিনি বলেন, ‘তেহরানের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে এবং সেই সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব।’ যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের সহায়তায় রাশিয়া বিপুল পরিমাণ সার সরবরাহ করতে পারে। এ ছাড়া আগামী মাসে চীনে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়েও আলোচনা হয়। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বেইজিং ইতোমধ্যে বৈঠকের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
পুতিনের বিশেষ বিনিয়োগ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। ক্রেমলিন বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যার কয়েকটি বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।’ উইটকফ জানান, সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে বিভিন্ন ধারণাসংবলিত নথি তিনি পুতিনের পর্যালোচনার জন্য নিয়ে এসেছেন। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও পুতিনের কাছে কিছু প্রস্তাব পাঠাতে চেয়েছিলেন এবং পরে ফোনে দূর থেকে বৈঠকে যুক্ত হন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে অবনতি হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল রপ্তানি-সংক্রান্ত একটি চুক্তির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ইরানে সামরিক হামলার পর জ্বালানির উচ্চমূল্য আগামী নভেম্বরের আইনসভা নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের জন্য চাপ তৈরি করেছে।
ডিজেল চুক্তির পর ইউক্রেন অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ব্যাহত হয়েছে এবং ‘স্টারশিল্ড’ সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, গত মঙ্গলবার ওসলোর বৈঠকে এসব সমস্যা সমাধানে একটি সমঝোতা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তা ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে গত বুধবার ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানায়, গত সপ্তাহে ইলন মাস্ক স্পেসএক্সের ‘স্টারলিংক’ স্যাটেলাইট পরিষেবার সামরিক সংস্করণটির গতি কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইউক্রেন রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শনাক্ত করতে এই পরিষেবার ওপর নির্ভর করে। তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
ইলন মাস্ক বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী অথবা প্রেসিডেন্ট নিয়ে থাকেন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ ঘটনায় আমি দায়ী নয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত বুধবার আবারও বলেছেন, ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করতে ওয়াশিংটন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
‘ইউক্রেন যুদ্ধ খুব দ্রুত অবসান হতে যাচ্ছে’
ইউক্রেন সংঘাত বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আশা প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বিশ্ব। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্তমানে যুদ্ধ বন্ধের পরিস্থিতি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুকূল।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ইউক্রেন সংকটের সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করার কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। আমার মনে হয়, আমরা সমাধানের পথ খোঁজার ব্যাপারে অনেকখানি এগিয়েছি—সম্ভবত এ যাবৎকালের সবচেয়ে কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছি।’
এদিকে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একটি সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের ইঙ্গিত দেন। তবে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, প্রস্তাবিত এই বৈঠক কেবল ইউক্রেন সংকটের সমাধানের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর মূল অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হবে পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পৌঁছেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। উপসাগরীয় দেশগুলোতে সফরের শেষ পর্যায়ে পূর্বনির্ধারিত সূচির বাইরে আকস্মিকভাবে সৌদি আরব সফরে গেলেন তিনি।
সৌদি ভূখণ্ডে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলা জোরদার হওয়ার পর দেশটিতে কোনো পশ্চিমা রাষ্ট্রপ্রধানের এটিই প্রথম সফর বলে জানিয়েছে মাখোঁর দপ্তর। মাখোঁর দপ্তরের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্ধারিত সূচির বাইরে কাতার থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। এর মধ্য দিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন সফরসহ তার আঞ্চলিক উপসাগরীয় সফর শেষ হচ্ছে।
সফরে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মাখোঁ। পাশাপাশি, এসব দেশের কাছ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সৌদি সফরে দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে ফরাসি প্রেসিডেন্টের।
মাখোঁর দপ্তর জানিয়েছে, সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হুতিদের চালানো হামলার মুখে দেশটির প্রতি ফ্রান্সের সংহতি প্রকাশ এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত ও উৎসের বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেই এই সফর।
এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে ট্রাম্প ফ্রান্সের দাঙ্গাকে কাজে লাগাচ্ছেন বলে মাখোঁ ইঙ্গিত করেন।
প্যারিসে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বিক্ষোভ ইস্যুতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। ফরাসি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিসি প্রাসাদ, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ ও পর্যটকদের আকর্ষণীয় স্থান লুভর জাদুঘর ও শঁজেলিজে সড়ক।
এ ছাড়া বাস্তিল ও রিপাবলিক চত্বর এবং শাতলে-লে আল শপিং এলাকাসহ আরও কয়েকটি স্থানে সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত সপ্তাহের শেষে এসব এলাকায় ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়। গত সপ্তাহের শেষে মুখোশধারী তরুণদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও সরকারি ভবনে ভাঙচুরের ঘটনায় সৃষ্ট সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার কথা স্বীকার করেছে ফ্রান্স।
ইরানের রাজনীতিতে একসময় যা ছিল চরম গোপনীয় এবং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, আজ তা প্রকাশ্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে দীর্ঘ আট মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর তেহরানের নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা এখন আর রাখঢাক না করে প্রকাশ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরির দাবি তুলছেন।
অথচ এই দেশেই একদিন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল আইন, যেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি বা সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে তেহরান বিশ্ববাসীকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক কাজের জন্য। কিন্তু যুদ্ধের কালো মেঘ সেই পুরোনো ধারণাকে এক নিমিষে উড়িয়ে দিয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের প্রথম দফার আকস্মিক আঘাতেই কেঁপে উঠেছিল ইরান। সেই হামলায় শুধু সামরিক বা পারমাণবিক স্থাপনাই ধ্বংস হয়নি, প্রাণ হারিয়েছেন খেসারত দেওয়া বহু সাধারণ নাগরিক এবং খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব। যদিও পরবর্তী সময়ে সরাসরি বড় ধরনের সামরিক তৎপরতা কমিয়ে এনে নৌ-অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের পথ বেছে নিয়েছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে উল্টো নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন। ওয়াশিংটনের সাফ কথা, চুক্তি করতে হলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে।
আর ঠিক এ অনিশ্চিত ও চরম অস্তিত্বের সংকটের মাঝেই তেহরানের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র দন্তনখ লড়াই। একপক্ষ বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য ইরান এরই মধ্যে অনেক চড়া মূল্য চুকিয়ে ফেলেছে। পার্লামেন্ট সদস্য আহমাদ বাখশায়্যাশ আরদেস্তানি কিংবা মহসেন রেজাইয়ের মতো শীর্ষ নিরাপত্তা কর্তারা মনে করেন, এখন আর পিছু হটার সময় নেই; বরং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পরমাণু অস্ত্র অর্জনের পথেই হাঁটা উচিত।
রক্ষণশীল বিশ্লেষক দাউদ মোদাররেসিয়ানের ভাষায়, একটি পরমাণু বোমা অর্জন করা আজকের দিনে রুটি-রুজির চেয়েও বড় ও জরুরি প্রয়োজন, যা দেশের টিকে থাকার একমাত্র নিশ্চয়তা। তারা ট্রাম্পের সেই পুরোনো কথারই প্রতিধ্বনি করেন, যেখানে উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের উদাহরণ টেনে ট্রাম্প বলেছিলেন, কারও হাতে ১১টি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠেও রয়েছে শক্ত যুক্তি। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবের এই চিন্তার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে আছে, তাদের পরমাণু বোমার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, একটি বোমা বড়জোর ৫০ থেকে ১ লাখ মানুষের প্রাণ নিতে পারে, কিন্তু হরমুজ প্রণালী আটকে দিলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবন জিম্মি করা সম্ভব।’ সাংবাদিক সিনা জাহানি কিংবা বিশ্লেষক আমির আলী আবুলফাতদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর এ উন্মাদনা সরাসরি ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেওয়ার শামিল। বোমা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকান বোমায় দেশের বাকি অবকাঠটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, এমন আত্মঘাতী পথ কোনো সুরক্ষাই দিতে পারে না।
কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, ইরান কি চাইলেও এখন বোমা বানাতে পারবে? যুদ্ধের আগুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মূল অবকাঠামো আজ প্রায় পঙ্গু। নাতানজ ও ফরদোর মতো প্রধান ভূগর্ভস্থ প্লান্টগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তবে সবচেয়ে বড় রহস্য লুকিয়ে আছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা প্রায় ৪৪০ দশমিক ১৯ কেজি ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে এই বিশাল মজুতের সঠিক হদিস তাদের জানা নেই।
মার্কিন ও ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, গ্রানাইট পাথরের ৮০ থেকে ১০০ মিটার গভীরে অবস্থিত গোপন ও সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ সুড়ঙ্গে হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ ও এই ইউরেনিয়াম লুকিয়ে ফেলেছে তেহরান। আর এ কারণেই ট্রাম্প সম্প্রতি হুংকার ছেড়েছেন, আমাদের হয়তো সেখানেই গিয়ে অভিযান চালাতে হতে পারে!
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সৌদি আরবে তাদের মিশন থেকে কিছু কূটনীতিক ও পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ওই অঞ্চলের অন্যান্য বেশ কয়েকটি মার্কিন মিশন থেকেও পরিবারের সদস্যদের প্রত্যাহার করার পরিকল্পনা করছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
সৌদি আরবের দাম্মামে একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং আটজন আহত হওয়ার পাশাপাশি একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হওয়ার পর এই নির্দেশ আসে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি পোস্টে বলেন, ‘ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের দ্বারা দেশটির বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার প্রেক্ষাপটে দপ্তরটি শুধুমাত্র সৌদি আরবে অবস্থানরত জরুরি কাজ করেন না এমন মার্কিন সরকারি কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।’
গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরান যখন মার্কিন স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়, তখন অনেককে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়াশিংটন কিছু কূটনৈতিক কর্মীকে ওই অঞ্চলে ফিরিয়ে এনেছিল।
পিগট বলেন, ‘ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে শত্রুতায় লিপ্ত হয়েছে, যার মধ্যে বেসামরিক বিমানবন্দর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর হামলা অন্তর্ভুক্ত। এসব ঘটনায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে।’
চারজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অন্যান্য গালফ দেশগুলোতে থাকা মার্কিন মিশনগুলোও তাদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেবে। পিগট সৌদি আরবের বাইরের অন্যান্য মিশনগুলোতে কোনো পরিবর্তনের বিষয়ে কিছু বলেননি।
ইয়েমেনে লড়াই তীব্রতর হওয়ার পর সাম্প্রতিক এই প্রত্যাহারের ঘটনাটি ঘটল। এই বৃহত্তর সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাণিজ্যকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং উপসাগরীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
চলে যাওয়ার ওই নির্দেশের পর সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি হামলার কথা জানিয়েছে, যেখানে একজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর আগে ওই দিন সৌদি অ্যারামকোর শায়বাহ তেলক্ষেত্রের একটি স্থাপনায় আঘাত হানার চেষ্টাকারী একটি ড্রোনকে সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আটকে দেওয়ার পর দুজন নিহত হন।
রিয়াদ বিমানবন্দরসহ সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলাগুলোর পর রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস গত বুধবার সৌদি আরবের ওপর হুতিদের দ্বারা সম্ভাব্য আরও হামলার বিষয়ে একটি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে। ইরান অঞ্চলজুড়ে হামলা শুরু করার প্রেক্ষাপটে মার্চের শুরুতে ওই দূতাবাস এবং সেখানে অবস্থিত সিআইএ’র একটি স্টেশনে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল।
দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তজুড়ে আবারও বিশালাকার লাউডস্পিকার চালু করার ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং জানান, অক্টোবরের শেষ নাগাদ পুরো সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী লাউডস্পিকার সক্রিয় করা হবে। এর আগে বুধবার রাতে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের সেনা দুর্গ ও প্রতিরোধব্যবস্থা পরিদর্শন করেন তিনি। খবর জাপান টাইমসের।
কিম ইয়ো জংয়ের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত সামরিক ইউনিটগুলো সীমান্তে নতুন অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত এলাকায় উসকানিমূলক বার্তা প্রচার এবং একাধিক স্থানে ফাঁকা গুলি ছুড়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সতর্কতামূলক গুলিতে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা কোনো সেনাসদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে দক্ষিণ কোরীয় বাহিনীকে ‘বিনা দ্বিধায় ও নির্মমভাবে নির্মূল’ করা হবে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পদক্ষেপকে ‘আইনসম্মত ও আত্মরক্ষামূলক’ বলে দাবি করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা ও একীভূতকরণ মন্ত্রণালয় উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ কমান্ডের সহায়তায় অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোনে (ডিএমজেড) নিয়ন্ত্রণ জোরদারে সিউলের নেওয়া পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে বলেই কিম ইয়ো জং ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। উত্তর কোরিয়া হুমকি বাস্তবায়ন করলে দক্ষিণ কোরিয়াও ‘সমানুপাতিক ও উপযুক্ত জবাব’ দেবে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
কিম ইয়ো জংয়ের এই হুঁশিয়ারিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের দুই দেশের বৈরিতা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বছরের জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধ যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হওয়ার পর থেকেই ডিএমজেড দুই দেশকে পৃথক করে রেখেছে। ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশই সীমান্তে প্রচারণার জন্য শক্তিশালী লাউডস্পিকার ব্যবহার করে আসছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মাইকে জনপ্রিয় কে-পপ গান ও জাতীয় সংবাদ প্রচার করা হতো, যা উত্তর কোরিয়ার অসন্তোষের কারণ ছিল।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর লি জে-মিয়ং আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে গত বছর সীমান্তে লাউডস্পিকারে প্রচার বন্ধ করেন এবং স্পিকারগুলো সরিয়ে ফেলেন। এর জবাবে উত্তর কোরিয়াও প্রচার বন্ধ রেখেছিল। তবে পিয়ংইয়ং আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ২০২৪ সাল থেকেই সীমান্তে স্থায়ী দেয়াল নির্মাণ, মাইন স্থাপন ও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় সিউল উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করলেও পিয়ংইয়ং তা অস্বীকার করে ঘটনাটিকে ‘বানানো গল্প’ বলে দাবি করেছে।
সিউলের কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম উল-চুলের মতে, কিম ইয়ো জংয়ের হুমকির অর্থ এই নয় যে লাউডস্পিকারগুলো অবিলম্বে চালু হবে। তবে এই হুমকি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের প্রশাসনের সামনে বড় রাজনৈতিক ও সামরিক দ্বিধা তৈরি করেছে।
সূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক আকস্মিক হামলায় অন্তত একজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হামলার পরপরই জরুরি উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করেছে। চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
বিমানবন্দরে হামলার একই দিনে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শায়বাহ তেলক্ষেত্রেও নাশকতার চেষ্টা চালায় ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেলক্ষেত্রের একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতিদের ছোড়া একটি ড্রোন আকাশেই শনাক্ত করে সফলভাবে প্রতিহত ও ভূপাতিত করে সামরিক বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে মাঝপথে ড্রোনটি ধ্বংস করা সত্ত্বেও সেটির জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ নিচে আছড়ে পড়ায় এবং বিস্ফোরণের তীব্রতায় অন্তত দুজন নিহত হয়েছেন।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যকার চলমান সংঘাতের জেরে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সৌদি আরবের বিভিন্ন বেসামরিক বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাত্র এক সপ্তাহ আগেই রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় প্রাণহানি ও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ঘটেছিল। ফলে নতুন করে বিমানবন্দর ও জ্বালানি খাতে এই আঘাত রিয়াদের সামগ্রিক আকাশপথ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সৌদি আরবের কৌশলগত স্থাপনাগুলোতে হুতিদের এমন লাগাতার হামলা এবং ক্রমবর্ধমান চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইতোমধ্যে সৌদি আরবে অবস্থিত তাদের কূটনৈতিক মিশনের জরুরি নন এমন সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অবিলম্বে দেশটি ত্যাগ করার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প পাইপলাইন, বন্দর ও পরিবহন করিডর গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার করছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ইরানকে ঘিরে সংঘাত এই উদ্যোগকে নতুন গতি দিয়েছে। এই পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব নয়, এশিয়ার জ্বালানি বাজার এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এইচএসবিসি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী জর্জেস এলহেদারি গত মঙ্গলবার দুবাইয়ে এক অনুষ্ঠানে পূর্বাভাস দিয়েছেন, বিকল্প পরিবহনব্যবস্থার সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরে হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক কমে যেতে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে পূর্বাভাস, নিশ্চিত পরিণতি নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে প্রতিদিন গড়ে ২ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাতীয় তরল পদার্থ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশের বেশি এই পথ অতিক্রম করেছে। অর্থাৎ, বিকল্প পথ তৈরি হলেও হরমুজের গুরুত্ব রাতারাতি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পরিবহন ও সার উৎপাদনের বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, সরকারি ভর্তুকি, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে।
হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত তেলের বড় অংশ এশিয়ার বাজারে যায়। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এ প্রবাহের প্রধান গন্তব্যগুলোর মধ্যে রয়েছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর বিকল্প রপ্তানি অবকাঠামো শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার হিসাবও বদলে দিতে পারে। বিকল্প পথের মাধ্যমে সরবরাহ অব্যাহত রাখা সহজ হলে আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য তা ইতিবাচক হতে পারে। তবে নতুন পাইপলাইন তৈরি হলেই তেলের দাম কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উৎপাদন, আন্তর্জাতিক চাহিদা, যুদ্ধের ঝুঁকি, জাহাজের বিমা, পরিবহন ব্যয় ও প্রধান রপ্তানিকারকদের সিদ্ধান্তও দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
এ পরিস্থিতিতে বড় অর্থনীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তি, কৌশলগত মজুত এবং সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করার দিকে আরও মনোযোগ দিতে পারে। বাংলাদেশও এই প্রতিযোগিতার বাইরে নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ে। অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল, এলএনজি এবং অন্যান্য জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম বেড়ে গেলে আমদানি বিলও বাড়ে। এতে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং সরকারের জ্বালানি ভর্তুকির ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
২০২৬ সালের মে মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে।
বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। তবে বাংলাদেশের লাভ নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি এবং আমদানির প্রকৃত উৎসের ওপর। শুধু হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহন সম্ভব হওয়াই বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় কমার নিশ্চয়তা নয়।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায় প্রাকৃতিক গ্যাস এবং আমদানিকৃত জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এলএনজি সরবরাহ কমে গেলে বা স্পট মার্কেটে দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। গ্যাসের ঘাটতি শিল্পকারখানার উৎপাদনেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার এক জরিপে দেখা যায়, ৭৮ শতাংশ কারখানা আংশিকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে এবং ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে বা কমেছে বলে জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল হলে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা রক্ষায় সুবিধা হতে পারে। বিপরীতে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাড়তি জ্বালানি ব্যয় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা দুর্বল করতে পারে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের ব্যয়ও বাড়তে পারে। ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি পেলে কৃষিপণ্য বাজারে আনার খরচ থেকে শুরু করে গণপরিবহন ও শিল্পপণ্যের দাম পর্যন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে এই প্রভাব সব সময় একই গতিতে বা একই মাত্রায় দেখা দেয় না। সরকার জ্বালানির দাম সমন্বয়, ভর্তুকি, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং আমদানির সময় নির্ধারণের মাধ্যমে কিছু চাপ সামাল দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হলে সরকারি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার ও প্রবাসী আয়ের উৎস। উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি দীর্ঘদিন জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল থাকলেও এখন তারা পরিবহন, শিল্প, পর্যটন ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বিকল্প বাণিজ্য করিডর গড়ে ওঠার ফলে এসব খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, প্রকল্প পিছিয়ে যাওয়া কিংবা শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার প্রভাব রেমিট্যান্স প্রবাহেও পড়তে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে তার প্রশাসন। গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে। দেশটিতে অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকার মধ্যেই ভিসা বাতিলের এ তথ্য সামনে এলো।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভিসা বাতিলের সংখ্যা আরও দ্রুত বেড়েছে। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে তখন পর্যন্ত ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের দাবি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা এবং অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) অভিযানের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করা। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, এসব পদক্ষেপ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও বাকস্বাধীনতার অধিকার ক্ষুণ্ণ করেছে এবং অনিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জাতিগত সংখ্যালঘুরা নিজেদের জাতিগত পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন ইতিহাসের অন্য যেকোনো প্রশাসনের তুলনায় অনেক দ্রুত বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিল করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত যেসব বিদেশি নাগরিক আইন ভঙ্গ করেন, জালিয়াতি করেন অথবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ান, তাদের বিষয়ে প্রশাসন ‘‘জিরো টলারেন্স’’ বা বিন্দুমাত্র ছাড় না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে।’
অধিকারকর্মীরা যেসব ভিসা বাতিলের ঘটনার সমালোচনা করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে গাজায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদকারী ফিলিস্তিনপন্থি বিদেশি বিক্ষোভকারীদের ভিসা বাতিল। এ ছাড়া রক্ষণশীল ভাষ্যকার চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করার কারণে বিদেশিদের ভিসা বাতিলের ঘটনাও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বিদেশি বিক্ষোভকারীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসী ও ভিসা আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করেছে। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সরকার জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে সমালোচকদের লক্ষ্যবস্তু করছে। এ ছাড়া জালিয়াতির বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিনেসোটায় বসবাসরত সোমালি-আমেরিকান সম্প্রদায়ের মতো বিভিন্ন অভিবাসী জনগোষ্ঠীকেও নিশানা করা হচ্ছে বলে তাদের দাবি।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে তার প্রশাসন বৈধ অভিবাসনের প্রক্রিয়াও কঠিন করেছে। এর উদাহরণ হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু কাজের ভিসার ক্ষেত্রে উচ্চ ফি আরোপের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৭ সালে ডাইভারসিটি গ্রিন কার্ড লটারি বা ডিভি লটারি কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে ট্রাম্প প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন আদালত। যেসব দেশ থেকে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে খুব বেশি অভিবাসী আসার সুযোগ পান না, সেসব দেশের নাগরিকদের জন্য এটি বড় সুখবর। খবর ফোর্বসের।
আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধনের সময়সূচি ঘোষণা করে ১ নভেম্বরের মধ্যে আবেদন গ্রহণ শুরু করার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গত ১৪ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতের বিচারক জিনসুক ওহতা এ আদেশ দেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নিবন্ধন কার্যক্রম ৩০ দিন চালু থাকতে পারে। তবে আবেদনকারীদের চূড়ান্ত সময়সূচি, যোগ্যতার শর্ত ও আবেদন পদ্ধতি সম্পর্কে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।
মামলাটি করেছিল রেড ঈগল ল নামের একটি আইন প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ ছিল, নির্ধারিত সময়ে আবেদন গ্রহণ শুরু না করে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কার্যত কর্মসূচিটি আটকে রেখেছে। এতে আবেদনকারীদের পাশাপাশি লটারিসংক্রান্ত আইনি সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটিরও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে আদালতে দাবি করা হয়।
ডিভি লটারি সাধারণভাবে গ্রিন কার্ড লটারি নামে পরিচিত। এ কর্মসূচির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে তুলনামূলকভাবে কম অভিবাসী পাঠায়—এমন দেশগুলোর যোগ্য নাগরিকদের জন্য প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার অভিবাসী ভিসা দেওয়া হয়। নির্বাচিত হলে আবেদনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পেতে পারেন।
অন্যান্য অনেক কর্মভিত্তিক অভিবাসন প্রক্রিয়ার মতো এ লটারিতে অংশ নিতে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরির প্রস্তাব বা নিয়োগকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন হয় না। তবে লটারিতে নাম উঠলেই গ্রিন কার্ড নিশ্চিত হয় না। নির্বাচিত আবেদনকারীদের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং অভিবাসন ও নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন করতে হয়।
আবেদনের জন্য সাধারণত উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বা সমমানের যোগ্যতা থাকতে হয়। বিকল্প হিসেবে নির্ধারিত শর্ত পূরণকারী পেশায় কাজের অভিজ্ঞতাও দরকার হতে পারে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯০ সালের ‘ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট’-এ স্বাক্ষর করার মাধ্যমে এই কর্মসূচির সূচনা করেন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ। ১৯৬৫ পরবর্তী অভিবাসন ব্যবস্থার অধীনে নির্দিষ্ট কিছু দেশের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে যে চরম বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, মূলত তা দূর করতেই এটি চালু করা হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল পরিবার কিংবা পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে প্রাপ্ত অভিবাসন সুবিধার বাইরে গিয়ে অনগ্রসর ও কম প্রতিনিধিত্বশীল জনগোষ্ঠীর যুক্তরাষ্ট্রে আসার সুযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এই কর্মসূচির আওতায় বরাদ্দকৃত ভিসার সংখ্যায় মূল আবেদনকারীর স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত থাকে।