আজ সন্ধ্যায় নতুন পোপ নির্বাচিত হতে পারেন বলে জানিয়েছেন কলেজ অব কার্ডিনালের ডিন গিওভান্নি বাতিস্তা রে।
বৃহস্পতিবার (৮ মে) ইতালীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, আজ সন্ধ্যায় যখন আমি রোমে ফিরব, ততক্ষণে সিস্টিন চ্যাপেলের চিমনি দিয়ে সাদা ধোঁয়া বের হওয়া শুরু হবে।’
সকালে একবার কার্ডিনালরা ভোট দিয়েছেন। কিন্তু তাতে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। দুপুরের আগে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে চিমনি দিয়ে।
গিওভান্নি বাতিস্তা রের বয়স এখন ৯১ বছর। পোপ হওয়ার জন্য আশি বছরের কম বয়স হতে হবে। যে কারণে তিনি কার্ডিনালের কনক্লেভে অংশ নিতে পারেননি। পোপ হওয়ার যোগ্য ১৩৩ কার্ডিনালকে নিয়ে গঠিত কলেজ অব কার্ডিনালস।
কোনো ধরনের মনোযোগ নষ্ট হওয়া ছাড়াই যাতে প্রার্থনা ও ধ্যান করতে পারেন, পাশাপাশি পোপ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন, সে কারণে ভ্যাটিকানের ভেতরে কার্ডিনালদের আলাদা করে রাখা হয়েছে।
নতুন পোপ নির্বাচিত হওয়ার জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে। পোপ নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সকাল ও বিকালে নিয়মিত ভোট হবে।
ভোট হওয়ার পর একটি বিশেষ স্টোভে ব্যালট পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কালো ধোঁয়া বের হওয়ার অর্থ হচ্ছে এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত আসেনি, অর্থা পোপ নির্বাচিত হননি। আর সাদা ধোঁয়া বের হলে বুঝতে হবে নতুন পোপ নির্বাচিত হয়েছেন।
পোপ নির্বাচনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রার্থী নেই। তবে বেশ কয়েকজন কার্ডিনাল আছেন, যারা পোপ হওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
তাদের মধ্যে আছেন, কনক্লেভের দেখভাল করা কার্ডিনাল পিয়াত্রিও প্যারোলিন, এশিয়ান ফ্রান্সিসখ্যাত কার্ডিনাল লুইস তাগলা, কঙ্গোর রক্ষণশীল কার্ডিনাল ফ্রিডোলিন এমবোঙ্গো বেসুঙ্গু ও ইতালীয় পিয়ারবাতিস্তা পিজ্জাবালা।
এদিকে নতুন পোপের নাম শোনার জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে অনেককেই। রোমের বাসিন্দা প্রিসিলা পার্লান্তি বলেন, ‘এই অপেক্ষা অসাধারণ।’
সামরিক সক্ষমতা আরও জোরদার করার ধারাবাহিকতায় এবার মাঝারি-পাল্লার স্থল-আক্রমণকারী টমাহক সাবসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের (এলআরএলএসিএম) সফল পরীক্ষা চালিয়েছে ভারত। সোমবার (১৫ জুন) রাতে দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য ওড়িশার চাঁদিপুরে অবস্থিত ইন্টিগ্রেটেড টেস্ট রেঞ্জ (আইটিআর) থেকে মার্কিন টমাহক সাবসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের ভারতীয় সংস্করণের প্রথম সফল পরীক্ষা চালানো হয়।
সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও) এই পরীক্ষাকে ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখনো আনুষ্ঠানিক নাম না পাওয়া এই ক্ষেপণাস্ত্রটি এক হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে থাকা লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। এটি ব্যর্থ ‘নির্ভয়’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রকল্পের উত্তরসূরি হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এতে পাল্লা, নেভিগেশন ও নির্ভুলতা বৃদ্ধিসহ একাধিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যুক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থল, সমুদ্র ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্রটি ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার আগে আরও দুটি উন্নয়নমূলক এবং দুটি ব্যবহারিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।
ডিআরডিওর প্রকাশিত তথ্য সীমিত হলেও জানা গেছে, সাবসনিক গতির এই ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ০.৮ ম্যাক গতিতে উড়তে সক্ষম। ভূমির খুব কাছাকাছি দিয়ে উড়তে পারায় শত্রুপক্ষের রাডারের পক্ষে এটি শনাক্ত করা কঠিন। এছাড়া এতে প্রায় ৫০০ কেজি ওজনের ওয়ারহেড বহনের সক্ষমতা রয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানতে কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম অস্ত্রের গুরুত্ব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন ক্ষেপণাস্ত্রটি ভারতের প্রচলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানের কাছে ২০১০ সাল থেকেই ‘বাবর’ নামে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পাল্লার একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। অন্যদিকে চীনের অস্ত্রভান্ডারে বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত ও পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পাকিস্তানের এই অস্ত্রটি আফগানিস্তানের খোস্তে আল-কায়েদা সন্ত্রাসী শিবিরে ১৯৯৮ সালে মার্কিন হামলায় উদ্ধার হওয়া একটি অবিস্ফোরিত টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। বাবর ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরির জন্য পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে পূর্ণ প্রযুক্তিগত সহায়তা পেয়েছে ও বিনিময়ে মার্কিন টমাহক প্রযুক্তি লাভ করেছে।
এর আগে, গত ২২ মে স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অগ্নি-১-এর সফল পরীক্ষা চালায় ভারত। ক্ষেপণাস্ত্রটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এ ছাড়া এই ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষ সুবিধা হলো ভ্রাম্যমাণ লঞ্চার থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়ার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে ক্ষেপণাস্ত্রটি।
ক্ষেপণাস্ত্রটির ওজন ১০০০ কেজি হওয়ায় পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনেও সক্ষম। অগ্নি-১ ক্ষেপণাস্ত্রে রয়েছে অত্যাধুনিক নেভিগেশন সিস্টেম, যা নির্ভুল লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে বলে এক বিবৃতিতে জানায় ডিআরডিও।
তারও আগে ৯ মে বঙ্গোপসাগরে নিজেদের জলসীমায় পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায় ভারত। ওই দিন সন্ধ্যায় ওড়িশা উপকূলের আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষা চালানো হয়।
পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণটি দেখতে অগ্নি-৬ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো না হলেও এটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) শ্রেণির। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষেপণাস্ত্রটির নাম ঘোষণা করেনি প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও)। তবে ডিআরওডি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কথা স্বীকার করেনি।
চীন স্নাতক পর্যায়ে ১২ হাজারের বেশি কোর্স বাতিল করেছে। দেশটি এমন এক সময়ে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রকে নতুনভাবে গড়ে দিচ্ছে। কর্মীরা ক্রমাগত নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ ভয় রয়েছে—এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ কর্মীদের কাছে তারা পিছিয়ে পড়তে পারেন।
চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটির উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ১২ হাজার ২০০টি স্নাতক ডিগ্রি প্রোগ্রাম বাতিল করেছে। তারা এসব ডিগ্রিকে অপ্রচলিত বা অকার্যকর বলে মনে করছে। এর বদলে ১০ হাজার ২০০টি নতুন কোর্স চালু করা হয়েছে, যা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে চীনের মোট ডিগ্রি প্রোগ্রামের ৩০ শতাংশেরও বেশি অংশে।
বাতিল হওয়া ডিগ্রিগুলোর বড় অংশই মানবিক বিদ্যা, শিল্পকলা, ব্যবস্থাপনা এবং বিদেশি ভাষা ক্ষেত্রের। এগুলোকে এখন অনেকটাই পুরোনো বা বাজার-অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন প্রোগ্রামগুলো চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি প্রোগ্রাম সরাসরি নতুন প্রজন্মের এআইকে বাস্তব অর্থনীতির সঙ্গে একীভূত করার ওপর কেন্দ্রীভূত।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কিছু কোর্স বন্ধ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে মূলত স্নাতকদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ার কারণে। চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর এপ্রিল মাসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সি তরুণদের (শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে) বেকারত্বের হার ফেব্রুয়ারির ১৬ দশমিক ১ শতাংশ থেকে মার্চে বেড়ে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
কিছু শিক্ষার্থী বলছেন, এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি তাদের ডিগ্রিগুলোকে প্রায় অকার্যকর করে তুলছে। সাংহাই ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এ বছর তাদের প্রোডাক্ট ডিজাইন প্রোগ্রাম বন্ধ করে দিয়েছে। একজন স্নাতক বলেন, ‘এআইয়ের দ্রুত উন্নতি প্রোডাক্ট ডিজাইনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। মডেলিং ও রেন্ডারিংয়ের মতো অনেক মূল কাজ এখন এআই-ই করতে পারছে।’
এ পরিবর্তনের ছাপ এবারের গাওকাও পরীক্ষাতেও (চীনের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা) স্পষ্ট ছিল। এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৫ লাখ কমে ১ কোটি ২৯ লাখে নেমে এসেছে। এটি টানা দ্বিতীয় বছর পতন, যেখানে ২০২৪ সালের তুলনায় নিবন্ধন ৭০ হাজার কমেছিল বলে জানায় চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনে বেকারত্ব পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কারণ, এ বছরই ১ কোটি ২৭ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এদিকে এখন অনেক শিক্ষার্থী ভোকেশনাল কোর্সের দিকে ঝুঁকছে, যেগুলো সরাসরি পূর্ণকালীন চাকরির সুযোগ দিতে পারে। মে মাসে বেইজিংয়ের একটি ভোকেশনাল স্কুলে মাত্র ৩০টি আসনের বিপরীতে শত শত শিক্ষার্থী নিবন্ধনের জন্য ভিড় করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে বিমানবাহিনীর একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বি-৫২ বোমারু বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। সোমবার এডওয়ার্ডস বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের মাত্র কিছুক্ষণ পরেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিধ্বস্ত হওয়ার সময় বিমানটি একটি নিয়মিত পরীক্ষামূলক উড্ডয়নে অংশ নিয়েছিল। নিহতদের মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্য ছাড়াও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বেসামরিক ঠিকাদার ছিলেন। দুর্ঘটনার সাথে সাথেই আকাশ জুড়ে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায় এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত ঘটনাস্থলে উদ্ধারকারী দল পাঠায়।
বি-৫২ বোমারু বিমান দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে এবং বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র বহনের সক্ষমতার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এটি মার্কিন বিমানবাহিনীর অন্যতম প্রধান রণকৌশলগত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক অভিযানেও যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের বোমারু বিমান মোতায়েন করেছিল। এই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ইতোমধ্যেই উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন বিমানবাহিনী।
অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তির পথে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হলে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমার পাশাপাশি বিশ্বেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছে। তার দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটবে এবং পরবর্তী সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে আরও আলোচনা এগিয়ে যাবে।
অন্যদিকে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড সদর দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানি জনগণের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই প্রতিপক্ষকে পিছু হটতে হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
বর্তমান সমঝোতা অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী আবারও খুলে দেওয়া হবে। এর আগে সেখানে পাতা মাইন অপসারণের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। প্রণালীটি স্বাভাবিক হলে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধও প্রত্যাহার করা হবে এবং তেল পরিবহন পুনরায় শুরু হবে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে যায়। ফলে এই পথ চালু হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব শর্তে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র
প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি, আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো প্রধান বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে।
ইরানের একটি দায়িত্বশীল কূটনৈতিক সূত্র আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছে যে আগামী ১৯ জুন দুই পক্ষ এই খসড়া সমঝোতায় আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মত হওয়ার পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাবে।
সামরিক ও ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে নেওয়া বড় পদক্ষেপ হিসেবে খসড়া চুক্তি অনুযায়ী ইরান অবিলম্বে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াতের জন্য কৌশলগত হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেবে। এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরের ওপর গত কয়েক মাস ধরে জারি রাখা তাদের নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়ে খসড়াটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নতুন করে আর কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে না। এর পাশাপাশি ওয়াশিংটন একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ইরানের ওপর থাকা তেল রপ্তানি সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, যার ফলে তেহরান আন্তর্জাতিক বাজারে অবাধে জ্বালানি তেল বিক্রি করার এবং তার উপার্জিত রাজস্ব সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ হয়ে থাকা ইরানের ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল সম্পদ ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে। এই আটকে থাকা অর্থ সরাসরি নগদ তহবিল স্থানান্তর, আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বিশেষ আর্থিক ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে ধাপে ধাপে ইরানকে ফেরত দেওয়া হবে।
সবচেয়ে সংবেদনশীল পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে তেহরান এই খসড়া চুক্তিতে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ইরান কখনো কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বা তা অর্জনের চেষ্টাও করবে না। চূড়ান্ত চুক্তি পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের পরমাণু কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে, যার অর্থ এই সময়ে নতুন করে কোনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করা যাবে না এবং পরমাণু স্থাপনাগুলোর বর্তমান পরিধিও আর সম্প্রসারণ করা যাবে না।
তেলের বাজারে স্বস্তি
সমঝোতার খবর প্রকাশের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৬৫ ডলার বা ৪ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৮৩ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৪ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ৭৫ ডলারে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী খুলে গেলে তেলের সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে চাপ কমবে। ফলে জ্বালানি মূল্য আরও স্থিতিশীল হতে পারে।
শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব
সমঝোতার খবর আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। তাইওয়ান, অস্ট্রেলিয়া এবং হংকংয়ের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। মার্কিন বাজারেও আশাবাদ তৈরি হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসদাক সূচকের ফিউচার লেনদেনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে।
মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তি
যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনায় মার্কিন ডলারও অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে দুর্বল হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমে আসা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা তেলের দাম ও ডলার—দুটোকেই নিচের দিকে নিয়ে গেছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগও কিছুটা কমেছে।
লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে ইসরায়েলি হামলার ক্ষোভ ঝেরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারণ তেল আবিবের এই আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চুক্তির সম্ভাবনা ভেস্তে যাওয়া ঝুঁকি তৈরি করেছে। উভয় দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি খুব কাছাকাছি বলে দাবি করা হচ্ছে।
গত রোববার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননের ওপর আর কোনো হামলা করা উচিত হবে না। একই সঙ্গে ইরান-সমর্থিত লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলে হামলা চালানোর ব্যাপারেও সতর্ক করেছেন তিনি।
ওই পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘বৈরুতের ওপর হামলা হওয়া উচিত হয়নি, বিশেষ করে এমন একটি বিশেষ দিনে যখন আমরা ইরানের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তির এত কাছাকাছি আছি।’
তিনি বলেন, ‘হুমকির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অধিকার ইসরায়েলের আছে, কিন্তু যে হামলার জবাব দেওয়া হচ্ছিল তা ছিল খুবই ছোট ও অর্থহীন, এতে কেউ আহত বা নিহত হয়নি এবং এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি ব্যাহত করা উচিত নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি আছি যা লেবাননসহ এই অঞ্চলে শান্তি আনবে এবং সব পক্ষেরই সরে আসা উচিত। লেবাননের কোথাও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আর কোনো হামলা হওয়া উচিত নয়, কিন্তু হিজবুল্লাহসহ অন্য কোনো পক্ষের পক্ষ থেকেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আর কোনো হামলা হওয়া উচিত নয়।’
সংঘাতে লিপ্ত থাকা পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি একটি দীর্ঘ ও সুন্দর শান্তির সূচনা হতে পারে—আসুন আমরা এটিকে নষ্ট না করি!’
বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার বিষয়ে অবগত ছিল মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। অ্যাক্সিওসের বিশ্ব পরিস্থিতিবিষয়ক সংবাদদাতা বারাক রাভিদের মতে, হামলার কিছুক্ষণ আগে আইডিএফ (ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী) বৈরুতের দাহিয়েহ জেলায় তাদের হামলার বিষয়ে সেন্টকমকে অবহিত করেছিল।
ইরানের মতে, বৈরুতের ওপর যে কোনো ইসরায়েলি হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন এবং এর ফলে চলমান শান্তি আলোচনা ব্যাহত হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে আলোচনা বানচাল করার চেষ্টা করছেন। লেবাননের ওপর হামলা বন্ধ করতে তিনি স্পষ্টতই অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছে।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, বৈরুতে ইসরায়েলি হামলা প্রমাণ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র হয় তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অনিচ্ছুক, নয়তো তা বাস্তবায়নে অক্ষম। একই সঙ্গে ইরানের সামরিক বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, লেবাননে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার জবাব দেওয়া হবে।
গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ বলেন, ‘লেবাননে চলমান ইসরায়েলি হামলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।’ তিনি বলেন, ‘বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে জায়নবাদী হামলা আবারও প্রমাণ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের হয় তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ইচ্ছা নেই, নয়তো তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই।’
এদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাফর আসাদি বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের হামলার জবাব দেওয়া হবে। ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে চালানো ইসরায়েলি হামলার ‘উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে’।”
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গত রোববার বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত তিনজন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলি বাহিনী চলতি বছরের ২ মার্চ থেকে লেবাননে ধারাবাহিক বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি শহরও দখলে রেখেছে তারা।
লেবাননের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ১১ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ১৫ লাখের বেশি মানুষ।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি হচ্ছে, তা গত রোববারই স্বাক্ষরিত হবে। তবে ইরান এই সময়সূচি নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছে এবং জানিয়েছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও বিবেচনাধীন।
বৈরুতে ইসরায়েলি হামলার পর ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যখন চুক্তির এত কাছাকাছি, তখন এই হামলা হওয়া উচিত ছিল না’। তিনি ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহকে সংযত থাকার আহ্বান জানান এবং ‘দীর্ঘস্থায়ী ও সুন্দর শান্তি’ প্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চুক্তিটি চূড়ান্ত হতে পারে।’
অবশ্য ইরান বলছে, সম্ভাব্য যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, দেশটির জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করতে হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নিতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায়, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করুক এবং হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিক।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তেহরান, ওয়াশিংটন এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি চুক্তির বর্তমান পরিস্থিতি ও সময়সীমা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। একদিকে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, এই চুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
কয়েক সপ্তাহের আলোচনা কি আসলেই বড় কোনো সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে, নাকি শেষ মুহূর্তে এসে এখনও রাজনৈতিক ও কৌশলগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি দেশটির আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানে চলমান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কিংবা ঘোষণা করেনি।
প্রতিবেদনে দেশটির কট্টরপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার বিষয়টিও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তারা বলেছেন, এই চুক্তি কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রভাবকে দুর্বল করে দিতে পারে।
কী বলছেন ট্রাম্প?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি শিগগিরই স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেছেন, চুক্তি সইয়ের পরপরই হরমুজ প্রণালী সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে আলোচনায় বারবার বিলম্ব হওয়া সত্ত্বেও ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, একটি বড় ধরনের সাফল্য খুব দ্রুতই আসছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই দ্রুত সাফল্য আসার সময়সীমা নিয়ে বিশ্লেষকরা এখন সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
যা বলছে ইরান
ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই চুক্তির বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কিংবা ঘোষণা করেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, চুক্তি সইয়ের তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি এবং এটি রোববার হচ্ছে না।
তবে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার কাছাকাছি রয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলছেন, আলোচনা এখনও চলছে এবং কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নিশ্চিত করা হয়নি।
একাধিক মধ্যস্থতাকারী দেশ আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চুক্তিটি সই হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। তাদের এই ইঙ্গিতের মাঝেই চুক্তি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে; যা কূটনৈতিক আশাবাদ এবং সরকারি সতর্কতার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান স্পষ্ট করছে।
চলমান মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছেছে বলে ইরানি গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে। কূটনীতিকরা এই সফরকে চুক্তির ‘চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করার’ লক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন।
চূড়ান্ত করার পর্যায়ে পৌঁছায়নি চুক্তিটি
ইরানি কর্মকর্তারা এই সময়সীমার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের জন্য ইরানি আলোচক দলের জেনেভা কিংবা অন্য কোথাও যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, ‘চুক্তিটি এর আগে কখনোই এত কাছাকাছি পৌঁছায়নি। যদিও এটি এখনো চূড়ান্ত করার পর্যায়ে আসেনি। কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমার কথা না জানিয়ে তিনি বলেছেন, আগামী দিনগুলোতে এই চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দেওয়া যায় না।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে জনসমক্ষে আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, চুক্তিটি আজই সই হওয়ার কথা রয়েছে এবং এর মাধ্যমে অবিলম্বে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। এই প্রণালী খুলে দেওয়া হলে তা বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল নৌপথে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করবে।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত এই রূপরেখায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা, সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আরও আলোচনা শুরু করার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে কোনো পক্ষই এখনো চুক্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করেনি।
কূটনীতিকরা বলছেন, এই উদীয়মান চুক্তিটি এখনও বেশ ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা, ইউরেনিয়ামের মজুত এবং লেবাননের চলমান উত্তেজনাসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো এই চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই পরস্পরবিরোধী বার্তা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকেও সামনে এনেছে। সেখানে রক্ষণশীল আইনপ্রণেতা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রস্তাবিত এই চুক্তির সমালোচনা করেছে। এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চুক্তিটি ওয়াশিংটনের কাছে অতিরিক্ত ছাড় দেওয়ার শামিল হতে পারে।
চুক্তির কোনো যৌথ খসড়া প্রকাশ না করা এবং চুক্তি সইয়ের নির্দিষ্ট কোনো স্থান নিশ্চিত না হওয়ায় সব পক্ষের কর্মকর্তারাই এখন বাস্তব আলোচনার চেয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতেই বেশি ব্যস্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকার পরও চুক্তির ভবিষ্যৎ এখনো অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের দাবি নাকচ আইআরজিসির
ইরানের সঙ্গে আলোচিত শান্তি চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি নাকচ করে দিয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। আইআরজিসি জানিয়েছে, সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত নয় এবং ওই দিন স্বাক্ষরের কোনো সম্ভাবনাও নেই।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য দিন নির্ধারিত হয়েছে।’ তার মতে, চুক্তি সম্পন্ন হলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী আবার উন্মুক্ত হবে। অন্যদিকে তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, দুই পক্ষ একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে স্বাক্ষরের সময়সূচি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
আইআরজিসি এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের ঘোষণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেছে, ইরানের আলোচকরা স্পষ্ট করেছেন যে, সমঝোতা স্মারক এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং রোববার স্বাক্ষরের প্রশ্নই ওঠে না। তাদের ভাষ্য, এই ঘোষণা ইরানের আলোচক দলের জন্য এক ধরনের ‘পরীক্ষা’।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিন ছিল রোববার। জীবনের গৌরবময় ৮০ বছর পূর্ণ করে রোববার তিনি পা রাখলেন নবম দশকে। তবে এই বিশেষ দিনটি নিয়ে মোটেও ‘খুশি নন’ ট্রাম্প। জীবনের এই বড় মাইলফলকটি তিনি পারলে একপ্রকার উপেক্ষা করতে চান।
জন্মদিনের তিন দিন আগে, গত বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে সেন্টারস ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেসের প্রশাসক ডক্টর মেহমেত ওজের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প নিজের এই অসন্তোষের কথা প্রকাশ্যে আনেন। কাকতালীয়ভাবে সেদিন ওজের ৬৬তম জন্মদিন ছিল।
ওজের শেয়ার করা একটি ভিডিওতে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, আপনাদের কাউকে আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে হবে না। কারণ, এই জন্মদিনটি নিয়ে আমি মোটেও খুশি নই। ৮০ সংখ্যাটি নিয়ে আমি আগে কখনও ভাবিনি, এটি আমার পছন্দের কোনো সংখ্যা নয়। তবে যাই হোক, আমি আজ এখানে আছি।
ভিডিওতে ওভাল অফিসের পেছনের সাউথ লনে রোববার অনুষ্ঠিতব্য ইউএফসি কেজ ম্যাচের বিশাল অষ্টভুজাকার স্টেডিয়ামের কাঠামোটিও দেখা যায়।
আশির কোঠায় পা রাখলেও নিজের শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্প বেশ আত্মবিশ্বাসী। গত ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি তৎকালীন ৮১ বছর বয়সি সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বয়স ও মানসিক সক্ষমতা নিয়ে কটাক্ষ ও উপহাস করেছিলেন। নিজের বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত মাসে মাতৃস্বাস্থ্যসংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, আমি আজ থেকে ৫০ বছর আগে যেমন অনুভব করতাম, এখনও ঠিক তেমনই আছি। কেন এমনটা হয় আমি জানি না। আমি যে খুব ভালো খাবার খাই তাও কিন্তু নয়।
ফাস্টফুডপ্রেমী হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প বার্গার, সোডা আর ভারী স্টেক খেতে ভালোবাসেন। নিজের এই খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কৌতুক করে তিনি বলেন, ‘হয়তো জাংক ফুডই শরীরের জন্য ভালো, আর বাকি খাবারগুলো খারাপ! আমি এমন অনেক মানুষকে চিনি যারা রেস্তোরাঁয় গিয়ে শুধু শাকসবজি খায় এবং ওজন কমানোর চিন্তায় মগ্ন থাকে, অথচ এক দিন হুট করেই মারা যায়।’
গত ২৬ মে হোয়াইট হাউসের চিকিৎসক ডা. শন বারবাবেলা প্রেসিডেন্টের বার্ষিক শারীরিক পরীক্ষা করেন। রিপোর্টে ট্রাম্পকে ‘চমৎকার স্বাস্থ্যের’ অধিকারী বলে ঘোষণা করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ইসিজি রিপোর্টের বরাতে জানানো হয়, ট্রাম্পের হৃদযন্ত্রের কর্মক্ষমতা তার চেয়ে ১৪ বছর কম বয়সি কোনো যুবকের মতো।
ট্রাম্প এই রিপোর্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, সবকিছু একদম পারফেক্ট এসেছে।
তবে এই মেডিকেল রিপোর্টটি এমন এক সময়ে প্রকাশ করা হয় যখন ট্রাম্পের গোড়ালি ফুলে যাওয়া এবং শরীরের কিছু ক্ষতচিহ্ন দেখা দেয়। গত মার্চ মাসে মেডেল অব অনার প্রদান অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের ডান কানের পেছনে ত্বকের বিবর্ণতা ধরা পড়েছিল। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস জানায়, কানের পেছনে একটি বিশেষ ক্রিম ব্যবহারের কারণে ওই বিবর্ণতা তৈরি হয়েছিল। এ ছাড়া, বারবার করমর্দন এবং অ্যাসপিরিন ওষুধ খাওয়ার কারণে তার হাতে কালশিটে দাগ পড়েছিল এবং পায়ের শিরায় রক্ত চলাচলের সমস্যার কারণে গোড়ালি কিছুটা ফুলে গিয়েছিল।
অবশ্য জন্মদিনের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে হোয়াইট হাউস এখনও সম্পূর্ণ নীরব। সেখানে ৮০টি মোমবাতি জ্বালিয়ে কেক কাটা হবে কি না, তা এখনও জানা যায়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন নিউইয়র্কের কুইন্সে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফ্রেড ট্রাম্প ছিলেন একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী এবং মা মেরি অ্যান ম্যাকলিওড। কুইন্সের জ্যামাইকা এস্টেটসে এক বিত্তশালী পরিবারে তার শৈশব কাটে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ট্রাম্প ছিলেন চতুর্থ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন কিছু মানুষ। গত শনিবার রাতে মার্কিনিদের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে টেলিভিশনে একটি সাক্ষাৎকার দেন আরাগচি। এরপরই মাসহাদে ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবনের সামনে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়।
বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজের প্রচারিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, কালো চাদর পরা এক নারী স্লোগান দিচ্ছেন ‘অনুপ্রবেশকারী বেঈমান আরাগচির মৃত্যু হোক’। এ সময় তিনি কালো ও লাল পতাকা উড়াচ্ছিলেন।
এসব বিক্ষোভকারীর মতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে শর্তে চুক্তি হতে যাচ্ছে সেগুলো ইরানের স্বার্থ করবে না। এর সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য থাকা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণও ইরান হারাবে। তাদের অভিযোগ, চুক্তি করতে ইরানি আলোচকরা অনেক বেশি ছাড় দিয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিলেও তা নাকচ করেছে তেহরান। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছেন হাজার হাজার ইরানি।
গত শনিবার সামাজিকমাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি রোববারই স্বাক্ষরিত হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘চুক্তি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে সবধরনের বাধা-বিঘ্ন ছাড়াই চলাচল নিশ্চিত হবে।’ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আলোচনায় থাকা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও চুক্তি সইয়ের বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
তবে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা চুক্তির ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসমাঈল বাঘাই জানিয়েছেন, রোববার চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো পরিকল্পনা নেই, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে।
এর মধ্যেই ট্রাম্পের ঘোষণার বিরুদ্ধে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করছেন। রাজধানী তেহরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে জড়ো হয়ে তারা সরকারের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন।
বিক্ষোভকারীদের অনেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে উদ্দেশ্য করে স্লোগান দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধিতা করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত সমঝোতা স্মারকটি আজ রোববার (১৪ জুন) স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
এই চুক্তিতে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে। তারা জানিয়েছে যে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে এবং বর্তমানে উভয় দেশ ‘ইলেকট্রনিক স্বাক্ষরের’ জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ট্রাম্প তার বার্তায় আরও উল্লেখ করেছেন যে, পরিস্থিতি শান্ত হলে তারা ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তথা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ সংগ্রহ করবেন এবং পরবর্তীতে তা ধ্বংস করা হবে।
তবে ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাসী ঘোষণার বিপরীতে ইরানের পক্ষ থেকে কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা গেছে। শনিবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই চুক্তি স্বাক্ষরের সময়সূচি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সমঝোতা স্মারকটি রোববারই স্বাক্ষরিত হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং সুনির্দিষ্ট তারিখ জানতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তার মতে, রোববার এই চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বিবিসি-র বরাতে জানা গেছে, যদিও ট্রাম্প রোববারকেই চুক্তির দিন হিসেবে চূড়ান্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তবে ইরানের এমন দোদুল্যমান অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াটিকে শেষ মুহূর্তে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেয় কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যদি চুক্তিটি আজ স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা বৈশ্বিক রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারের জন্য এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। মূলত অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়গুলোই এই আলোচনার প্রধান আকর্ষণ।
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ বন্ধ এবং অর্থনীতি সচল করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজকালের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ শনিবার (১৩ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আর চুক্তি সই হতে পারে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, চুক্তিটি যদি সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা হবে বর্তমান দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সাফল্য। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটাতে এমন একটি চুক্তি সত্যিই ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে গণ্য হবে। এটি একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ সুগম করবে, অন্যদিকে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেল ও অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। দুই দেশের এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে নেপথ্যের নায়ক ও প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। ইতোমধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক সব চুক্তির দেশ হিসাবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের জেনেভা ভেন্যু হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করার প্রস্তাব দিয়েছে।
নেপথ্যের নায়ক পাকিস্তান: দুই চিরবৈরী দেশের এই যুদ্ধ থামানোর পেছনে প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরপরই বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে।
প্রস্তুত জেনেভা: সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন ঐতিহাসিক চুক্তির শহর হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডের জেনেভাকে ভেন্যু হিসেবে প্রস্তুত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন সমীকরণ: এই চুক্তির ফলে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ‘লেবানন’ নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
ইসরায়েলে তোলপাড়: ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য চুক্তির খবরে ইসরায়েলি শিবিরে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ডিজিটাল স্বাক্ষর ও দুই ধাপের শান্তি প্রক্রিয়া: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ জানিয়েছেন, চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এতে ‘ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর’ বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে সই করবেন। এরপর আগামী সপ্তাহ থেকেই শুরু হবে কারিগরি ও কৌশলগত পর্যায়ের দীর্ঘ আলোচনা। এই শান্তি আলোচনা সফল করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আন্তরিকতার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে শাহবাজ শরিফ বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এই সম্ভাব্য চুক্তির পুরো কাঠামো ও ব্লুপ্রিন্ট বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন।
আরাগচি জানান, পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটি মূলত দুটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যে ১৪ দফার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। এই প্রাথমিক চুক্তি সই হওয়ার সাথে সাথেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা ইরানের সমস্ত আর্থিক সম্পদ একযোগে মুক্তি দেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে দ্বিতীয় ধাপ, যা প্রায় ৬০ দিন স্থায়ী হবে এবং এই সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উভয় পক্ষ টেবিলে বসবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং সামগ্রিক পারমাণবিক ইস্যুটিকে কৌশলেই প্রথম ধাপ থেকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের আলোচনার জন্য তোলা রাখা হয়েছে। আমেরিকা চেয়েছিল ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিক, কিন্তু ইরান তাদের অবস্থানে অনড়। আরাগচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অতি-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই দেশের বাইরে পাঠানো হবে না, বরং তা ইরানের ভেতরেই তরল করা হবে এবং এটাই একমাত্র উপায়। দ্বিতীয় ধাপের ৬০ দিনের আলোচনায় আমেরিকার আরোপিত সব অবৈধ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চিরতরে প্রত্যাহারের বিষয়টি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে থাকবে। যদি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি সম্ভব না হয়, তবে পুরো পরিস্থিতি আবার আগের যুদ্ধকালীন অবস্থায় ফিরে যাবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান।
রণাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে আরাগচি বলেন, আমেরিকা-ইসরায়েলের অত্যাধুনিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও এই অন্যায় যুদ্ধে ইরানই বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমাদের কূটনীতি মূলত রণাঙ্গনের এই বিজয়কে চুক্তির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে মাত্র। এই চুক্তির প্রথম শর্তই হচ্ছে ইরানের ওপর আমেরিকার দেওয়া অবৈধ নৌঅবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা। এছাড়া যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একটি বিশাল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্যাকেজ এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত, যার মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতিতে বিপুল আন্তর্জাতিক তহবিলের জোগান আসবে। ইতিহাসের এই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাপ্তরিকভাবে ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান জানাতে বাধ্য হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী ও লেবানন নিয়ে নতুন সমীকরণ: চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত ফ্রন্টে একযোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং কোনো পক্ষই আর শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। ওমানের সাথে যৌথভাবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী ব্যবস্থাপনার জন্য আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি নতুন আইনি ও পরিচালন কাঠামো ঘোষণা করবে ইরান। তবে মার্কিন ব্লক বা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সেখানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে।
ইসরায়েলি শিবিরে চরম উদ্বেগ, নেতানিয়াহুর ক্ষোভ: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই আসন্ন শান্তি চুক্তিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেল আবিব কোনোভাবেই এই যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের জনগণের সামনে যে রণকৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তা ছিল ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলা।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বর্তমান ব্যবস্থার সাথেই চুক্তি করে ফেলায় ইসরাইলি প্রশাসন ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের শর্ত নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে, কারণ লেবানন সীমান্ত সুরক্ষিত না হলে উত্তর ইসরায়েলের বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ নাগরিক ঘরে ফিরতে পারবে না, যা আগামী ইসরায়েলি নির্বাচনে নেতানিয়াহুর পরাজয় নিশ্চিত করতে পারে। তাই চুক্তি সইয়ের আগের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মাঠের লড়াইয়ে যতটা সম্ভব সুবিধা আদায়ের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরাইল। তথ্যসূত্র: আল জাজিরা-রয়টার্স
রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে যাত্রা শুরুর পরপরই বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ বা লাখ কোটিপতি হওয়ার ঐতিহাসিক গৌরব অর্জন করেছেন ইলন মাস্ক। গত শুক্রবারের আগপর্যন্ত ‘ট্রিলিয়ন’ সংখ্যাটি কেবল গুটিকয় বড় অর্থনীতির জিডিপি কিংবা বিশাল ঋণের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতে দেখা যেত, তবে এখন তা একজন ব্যক্তির একক সম্পদে পরিণত হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের এই মহাতারকার সম্পদ যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছে, তা আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, স্পেসএক্সের দুর্দান্ত অভিষেকের পর মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ১ লাখ ১০ হাজার কোটি (১.১ ট্রিলিয়ন) ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের জুনের বিনিময় হার অনুযায়ী, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১২৩ লাখ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায়, প্রথম কোনো ব্যক্তির ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার এই ঘটনাকে অনেকে বৈষম্যের চরম উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
এক লাখ কোটি বা এক ট্রিলিয়ন সংখ্যাটি কল্পনা করাও সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন। ১ ট্রিলিয়ন লিখতে ১-এর পর ১২টি শূন্য দিতে হয়। যদি এক ট্রিলিয়ন ডলারের কাগজের নোট একটার পর একটা লম্বালম্বিভাবে সাজানো হয়, তবে তা প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এটি পৃথিবী থেকে চাঁদে ২০০ বারের বেশি যাতায়াতের সমান দূরত্ব এবং পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী দূরত্বকেও ছাড়িয়ে যাবে।
ইউএস সেনসাস ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৮২০ কোটি মানুষ বাস করছে। এই এক ট্রিলিয়ন ডলার যদি বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে প্রত্যেকে প্রায় ১২২ ডলার বা ১৫ হাজার টাকা করে পাবেন। এছাড়া এই বিশাল সম্পদ মাস্কের জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকার বার্ষিক জিডিপির দ্বিগুণেরও বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ২১টি দেশ এক ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপির গণ্ডি পার করতে পেরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন বাজারের চিত্র অনুযায়ী, মাস্কের এই সম্পদ দিয়ে বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ২৫ লাখ মাঝারি মানের বাড়ি একবারে কেনা সম্ভব। জ্বালানি তেলের বাজারেও এর প্রভাব ব্যাপক। বর্তমান চড়া দামেও এক ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ২৪ হাজার ৩০০ কোটি গ্যালন তেল কেনা যাবে, যা দিয়ে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সব গাড়ি প্রায় দুই বছর চালানো সম্ভব। উল্লেখ্য, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ছাড়িয়েছে।
সম্পদের দৌড়ে মাস্ক তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে গেছেন। ফোর্বসের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজের চেয়ে মাস্ক এখন প্রায় ৭০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার এগিয়ে। এমনকি তালিকার পরবর্তী চারজন শীর্ষ ধনীর—ল্যারি পেজ, সের্গেই ব্রিন, জেফ বেজোস ও ল্যারি এলিসন—মোট সম্পদ একত্রে যোগ করলেও তা মাস্কের একক সম্পদের কাছাকাছি পৌঁছাবে।
শেয়ারবাজারের ওঠানামার কারণে এই সম্পদের পরিমাণ যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। ২০২৪ সালে মাস্কের সম্পত্তি যেখানে ছিল মাত্র ১৯ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, স্পেসএক্সের আইপিও আসার সুবাদে তা এখন রকেটের গতিতে বেড়ে এক ট্রিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যক্তিগত এই বিশাল প্রাচুর্য একদিকে যেমন প্রযুক্তির জয়জয়কার ঘোষণা করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিরাপত্তা এখন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ক্রাউডস্ট্রাইকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত রাষ্ট্র-সমর্থিত সাইবার অনুপ্রবেশের প্রায় অর্ধেক ঘটনার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা জড়িত। পিয়ংইয়ং-সমর্থিত এই সাইবার গোষ্ঠীগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ক্রাউডস্ট্রাইকের বার্ষিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, উত্তর কোরিয়ার ‘ফেমাস চোল্লিমা’ নামক একটি হ্যাকার গোষ্ঠী ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রযুক্তি খাতের ওপর পরিচালিত রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত সাইবার তৎপরতার ৪৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। এই গোষ্ঠীটি বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অন্যতম প্রধান সাইবার হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তারা ভুয়া দূরবর্তী কর্মী বা রিমোট ওয়ার্কার সেজে চাকরি নেওয়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ডিপফেক ছবি ব্যবহার এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির মতো অভিনব সব পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছে।
ক্রাউডস্ট্রাইক জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার সাইবার অপারেটিভরা প্রায়ই নিজেদের সফটওয়্যার ডেভেলপার, প্রোগ্রামার বা আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে দূরবর্তী চাকরি লাভের চেষ্টা করে। তাদের এই জালিয়াতিকে বিশ্বাসযোগ্য করতে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর ডিপফেক ছবি এবং চুরি করা পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সের মতো ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে তারা বৈধ চাকরিপ্রার্থীর ছদ্মবেশে প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ও অত্যন্ত সংবেদনশীল অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে প্রবেশের সুযোগ পায়।
এই কৌশলী অনুপ্রবেশের মাধ্যমে উত্তর কোরিয়া মূলত দ্বিমুখী সুবিধা লাভ করছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছদ্মবেশী এসব কর্মীরা যে বেতন পায়, তা সরাসরি দেশটির সরকারের তহবিলে জমা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তারা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ মেধাস্বত্ব, গোপন ব্যবসায়িক তথ্য এবং অভ্যন্তরীণ সিস্টেমে স্থায়ী প্রবেশাধিকার লাভ করে। অনেক ক্ষেত্রে হ্যাকাররা এই সংবেদনশীল তথ্য ফাঁসের হুমকি দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বড় অঙ্কের মুক্তিপণও দাবি করে থাকে।
প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের বিশেষ নজর রয়েছে ব্লকচেইন ডেভেলপার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানিগুলোর ওপর। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে যেতে দেশটি এখন সাইবার চুরির মাধ্যমে ডিজিটাল সম্পদ অর্জনের ওপর ক্রমবর্ধমান হারে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই উত্তর কোরিয়া-সংশ্লিষ্ট সাইবার অপরাধীরা প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি হাতিয়ে নিয়েছে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সাইবার অপরাধের মাধ্যমে তারা আরও কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে বলে ধারণা করা হয়।
ক্রাউডস্ট্রাইকের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে যে, এই হ্যাকাররা সাধারণত ‘হ্যান্ডস-অন-কিবোর্ড’ পদ্ধতিতে হামলা চালায়। এসব হামলায় স্বয়ংক্রিয় ম্যালওয়্যারের পরিবর্তে প্রকৃত ব্যক্তিরা সরাসরি ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে কাজ করে। সাধারণত চুরি করা লগইন তথ্য ব্যবহার করে হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বৈধ সফটওয়্যার ও টুলসের অপব্যবহার করে। ফলে তারা দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে অবস্থান করতে পারে এবং প্রচলিত নিরাপত্তা সফটওয়্যারের নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়।