গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার দুদকের ঢাকার সমন্বিত জেলা কার্যালয় ১-এ চার্জশিট দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। সেখান থেকে আদালতে চার্জশিট দাখিল করবেন দুদক কর্মকর্তারা।
অভিযোগপত্রে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের কথা বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামিরা ২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়াও অবৈধভাবে রূপান্তর-স্থানান্তর করায় মানি লন্ডারিং ধারাও দেখানো হয়েছে অভিযোগপত্রে। মামলায় দুদক ১৩ জনকে আসামি করলেও অভিযোগপত্রে আরও একজনের নাম যুক্ত করা হয়।
ড. ইউনূস ছাড়াও আসামিরা হলেন গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল ইসলাম, সাবেক এমডি আশরাফুল হাসান, ৫ পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, শাহজাহান, নূরজাহান বেগম ও এস এম হাজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, আইনজীবী ইউসুফ আলী ও জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান এবং গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের প্রতিনিধি মাইনুল ইসলাম। অ্যাডভোকেট মো. ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান ও প্রতিনিধি মো. মাইনুল ইসলামকেও আসামি করা হয়েছে।
দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন গতকাল বিকেলে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান, ‘তদন্ত শেষে দণ্ডবিধি ও মানি লন্ডারিং আইনে ২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে স্থানান্তর ও হস্তান্তরের অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে এই চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।’
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল ইসলামসহ বোর্ডের সদস্যদের উপস্থিতিতে ২০২২ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় হিসাব খোলা হয়। গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পাওনা লভ্যাংশ বিতরণের জন্য গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন এবং গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট চুক্তি হয় ওই বছরের ২৭ এপ্রিল।
গ্রামীণ টেলিকমের বোর্ড সভার হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত ৯ মে হলেও হিসাব খোলা হয় এক দিন আগে ৮ মে। সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্টেও ৮ মে ব্যাংক হিসাব দেখানো আছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। এ রকম ভুয়া সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্টের শর্ত অনুযায়ী ও ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ২০২২ সালের ১০ মে গ্রামীণ টেলিকমের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর শাখা থেকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় ৪৩৭ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার ৬২১ টাকা স্থানান্তর করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২২ জুন অনুষ্ঠিত গ্রামীণ টেলিকমের ১০৯তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অ্যাডভোকেট ফি হিসেবে অতিরিক্ত ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৯ টাকা প্রদানের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাব থেকে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন নামীয় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের লোকাল অফিসের হিসাব থেকে তিন দফায় মোট ২৬ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা স্থানান্তর করা হয়।
কিন্তু কর্মচারীদের লভ্যাংশ বিতরণের আগেই তাদের প্রাপ্য অর্থ তাদের না জানিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে ২০২২ সালের মে ও জুন মাসের বিভিন্ন সময়ে সিবিএ নেতা মো. কামরুজ্জামানের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মিরপুর শাখার হিসাবে মোট ৩ কোটি টাকা, সিবিএ নেতা মাইনুল ইসলামের হিসাবে ৩ কোটি ও সিবিএ নেতা ফিরোজ মাহমুদ হাসানের ডাচ্-বাংলা ব্যাংক মিরপুর শাখার হিসাবে ৩ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়।
একইভাবে অ্যাডভোকেট মো. ইউসুফ আলীর কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের ধানমন্ডি শাখার হিসাবে ৪ কোটি টাকা ও দ্য সিটি ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাবে ৫ কোটি টাকা এবং অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ ও অ্যাডভোকেট মো. ইউসুফ আলীর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গুলশান নর্থ শাখায় যৌথ হিসেবে ৬ কোটি স্থানান্তর করা হয়, যা তাদের প্রাপ্য ছিল না।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থানার আতর আলী বাজারে গ্রাম্য চিকিৎসক রেজাউল করিম ওরফে আবু ডাক্তারকে হত্যার অভিযোগে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক এক চেয়ারম্যানসহ ছয় জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মো. রহিবুল ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। এ ছাড়া ১২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তারা খালাস পেয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তিন আসামি হলেন বাবলু সরদার, টেকন সরদার ও গাজীয়ার সরকার। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন দেবগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আতর আলী, রায়হান সরদার, হাবিবুর রহমান ওরফে হবি সরদার, হেলাল খান, জিল্লুর রহমান ও জিয়া মণ্ডল।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী শামসুদ্দিন জুম্মন সাজার তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, রায়ের সময় আসামিদের মধ্যে ১২ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ১০ জন খালাস পেয়েছেন। তবে, আসামি জিল্লুর রহমান ও জিয়া মন্ডলের সাজা হওয়ায় তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর গোয়ালন্দ থানাধীন ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সম্মেলন চলাকালে সাবেক চেয়ারম্যান আতর আলীর ছেলে যুবলীগ নেতা বাবলু সরদারের সঙ্গে দেবগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বাবলু সরদারের কথা কাটাকাটি হয়। এর জেরে আতর আলীর নেতৃত্বে বাবলু সরদার, টোকন সরদার, রায়হান সরদার, গাজীর সরদারসহ বেশ কয়েকজন আতর আলী বাজারের তিন রাস্তার মোড়ে অবস্থান নেয়। হাফিজুল চেয়ারম্যান সমর্থকরা সেই পথ দিয়ে ফেরার পথে তাদের আটকে মারধর করা হয়। সেই সময় সেখান দিয়ে ফিরছিলেন রেজাউল করিম ওরফে আবু ডাক্তার। তাকেও আটক করে মারধর করা হয়। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে তাকে উদ্ধার করে রক্তাক্ত অবস্থায় গোয়ালন্দ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই মারা যান আবু ডাক্তার। এ ঘটনায় মো. মোবারক মোল্লা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন।
মামলার পরে ২০২২ সালের ৫ অক্টোবর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ।
আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অবসরপ্রাপ্ত গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামের অভিযোগ গঠনের জন্য আগামী ১৭ জুন নির্ধারণ করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (১২ মে) ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ বেগম শামীমা আফরোজ এই তারিখ নির্ধারণ করেন। এদিন মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ধার্য ছিল।
দুদকের আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। গত ৫ জানুয়ারি আবেদ আলী, তার স্ত্রী শাহরিন আক্তার শিল্পী ও ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা করে দুদক।
মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের ১২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২০ কোটি ৮৮ লাখ ১৬ হাজার ৯৭১ টাকা জমা ও ২০ কোটি ৪১ লাখ তিন হাজার ৭৪১ কোটি টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মোট ৪১ কোটি ২৯ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া আবেদ আলীর বিরুদ্ধে তিন কোটি ৭২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৭ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।
অপর মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, এক কোটি ২৬ লাখ ৬৩ হাজার আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে আবেদ আলীর স্ত্রী শাহরিন আক্তার শিল্পীর বিরুদ্ধে। তার দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এক কোটি ৭৮ লাখ ৭৬ হাজার ৬৩৬ টাকা জমা ও এক কোটি ৭৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৫ টাকা উত্তোলনসহ মোট তিন কোটি ৫৬ লাখ ৪০ হাজার ৭৩১ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ আনা হয়।
এছাড়া আবেদ আলীর ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামের বিরুদ্ধে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন ৩ জন প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন- মাগফুর রহমান শেখ, ড. মোহাম্মদ অলি মিয়া, ব্যারিস্টার রাফিউল ইসলাম। মঙ্গলবার (১২ মে) আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ নতুন ৩ জন প্রসিকিউটরকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
তাতে বলা হয়েছে, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ অনুসারে ট্রাইব্যুনালের মামলা পরিচালনার জন্য এই তিন জনকে পুনরাদেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাদের নিয়োগ প্রদান করা হলো। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।’
প্রজ্ঞাপনে, মাগফুর রহমান শেখকে ডেপুটি অ্যাটর্নি নারেল পদমর্যাদায়, ড. মোহাম্মদ অলি মিয়া এবং ব্যারিস্টার রাফিউল ইসলামকে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপাকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত ফারজানা রুপাকে ছয়টি মামলায় এবং শাকিল আহমেদকে পাঁচটি মামলায় জামিন দিয়েছেন। তবে তাদের প্রত্যেকের একটি করে মামলায় জামিন না দিয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। ফলে সব মামলায় জামিন না হওয়ায় তারা এখনই মুক্তি পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
গতকাল সোমবার বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছেন।
আদালতে জামিনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
কোনো হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবরেটরি বা অন্য কোনো মাধ্যমে অনাগত শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না বলে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হয়েছে। সোমবার (১১ মে) রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নাইমা হায়দার ও কাজী জিনাত হক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দিয়েছেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী তীর্থ সলিল রায়।
রায়ের পর আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, কোনো হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ল্যাবরেটরি কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। অর্থাৎ, গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে— তা আজকের পর থেকে জানার কোনো সুযোগ নেই। রিটটি চলমান থাকবে এবং রায় অমান্য করলে পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলেও জানান তিনি।
এর আগে ২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি এ রিট আবেদন দায়ের করা হয়। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও মো. মোস্তাফিজুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারি করেন।
রুলে বলা হয়, গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ রোধে নীতিমালা বা নির্দেশনা প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না এবং এ বিষয়ে নীতিমালা তৈরির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়।
স্বাস্থ্য সচিব, মহিলা ও শিশুবিষয়ক সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সাত বিবাদীকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
রিট আবেদনের সময় ইশরাত হাসান জানিয়েছিলেন, ভারতে আইন করে গর্ভজাত সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গর্ভের শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণের কারণে অনেক সময় প্রসূতি মা মানসিক চাপে পড়েন। এমনকি পারিবারিক চাপে গর্ভপাতের ঘটনাও ঘটে।
পরে ইউএনএফপিএ, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর প্রিভেনশন অব সন প্রিফারেন্স অ্যান্ড দ্য রিস্ক অব জেন্ডার বায়াসড সেক্স সিলেকশন’ শীর্ষক নীতিমালা প্রণয়ন করে।
নীতিমালাটি বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর। এ ছাড়া বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে রাখা হয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। পরে নীতিমালাটি হলফনামার মাধ্যমে হাইকোর্টে দাখিল করা হয়।
ইশরাত হাসান বলেন, গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ না করার বিষয়টি সরকার কোনো আপত্তি ছাড়াই গ্রহণ করেছে। কারণ, এ ধরনের তথ্য জানার ফলে মা মানসিক চাপে পড়তে পারেন, যা মা ও অনাগত সন্তান—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও সন্তান জন্মের আগে ছেলে না মেয়ে—তা জানানো বন্ধ হবে। এর ফলে সুস্থ সন্তান জন্ম নিশ্চিত করার পাশাপাশি কন্যাসন্তানকে কেন্দ্র করে মায়েদের ওপর নির্যাতন ও গর্ভপাতের ঝুঁকিও কমে আসবে।
ফেনী ও পঞ্চগড় জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া দুই কর্মকর্তাকে সম্প্রতি প্রত্যাহার করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। দুজন হলেন ফেনীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুব আলম খান ও পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান।
সোমবার (১১ মে) পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত পৃথক দুই আদেশে তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আদেশে বলা হয়, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার (পুলিশ সুপার ফেনী হিসেবে বদলির আদেশপ্রাপ্ত) মাহবুব আলম খান ১০ মে-এর মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরে রিপোর্ট করবেন। আরেক আদেশে বলা হয়, পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে ১০ মে-এর মধ্যে সদরদপ্তরে রিপোর্ট করবেন।
গত ৫ মে দেশের ১২ জেলার পুলিশ সুপার পদে রদবদল করা হয়। সিএমপির উপকমিশনার মাহবুব আলম খান ফেনীর এসপি হিসেবে পদায়ন হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
দুই হত্যা মামলার এ আসামির নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে ৭ মে হাইকোর্টে রিট করা হয়। রিটে তার নিয়োগ বাতিল, সাময়িক বরখাস্ত ও নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ও ন্যাশনাল ল’ ইয়ার্স কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এস এম জুলফিকার আলী জুনু জনস্বার্থে এ রিট করেন।
দেশে ঘোড়ার মাংসের বাণিজ্য নিষিদ্ধকরণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন অভিনেত্রী ও প্রাণী কল্যাণকর্মী জয়া আহসানসহ তিনজন।
সোমবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, এ কে খান হেলথকেয়ার ট্রাস্ট এবং অভিনেত্রী ও প্রাণী কল্যাণকর্মী জয়া আহসান জনস্বার্থে এ রিট দায়ের করেন।
রিটকারী ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব, ড. সিনথিয়া ফরিদ ও অ্যাডভোকেট সাজিদ হাসান।
রিটে অসুস্থ প্রাণী মানুষের খাদ্য হিসেবে প্রতারণামূলকভাবে বাজারজাত করার অভিযোগে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
পূর্ববর্তী অনুরোধের পরও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়ায় পিটিশনকারীরা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পূর্ববর্তী অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শুরু এবং গাজীপুরে উন্মোচিত অবৈধ ঘোড়ার মাংসের বাণিজ্যের বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সময়সীমাবদ্ধ তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিলের নির্দেশনাও চাওয়া হয়।
পিটিশনকারীরা আরও অনুরোধ করেছেন, এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে ৬০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্দেশিকা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, বাজেয়াপ্ত ও অসুস্থ ঘোড়ার নিলাম অবিলম্বে বন্ধ এবং উদ্ধারকৃত প্রাণীর পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ সুবিধা বা অভয়ারণ্য—বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হোক।
পিটিশনকারীদের ভাষ্য, তাৎক্ষণিক বিচারিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অবৈধ কার্যক্রম জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে থাকতে পারে এবং প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা অব্যাহত থাকতে পারে।
পৃথক দুটি হত্যা মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে দেয়া জামিনের বিরুদ্ধে চেম্বার আদালতে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
সোমবার (১১ মে) মামলা দুটি শুনানির জন্য কার্য তালিকায় থাকলেও শুনানি সম্পন্ন হয়নি। আজ শুনানি হতে পারে। বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ও আইভীকে আইনী সহায়তাকারী মোতাহের হোসেন সাজু। তিনি বলেন, আজকে চেম্বার আদালতের কার্যতালিকায় ২৭৪ ও ২৭৫ নাম্বার সিরিয়ালে মামলা দুটি শুনানির জন্য থাকলেও তা হয়নি। আমরা আগামীকাল শুনানি করতে পারব বলে আশাবাদী।
এর আগে, ১০ মামলায় হাইকোর্টে জামিন মঞ্জুরের পর সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি হত্যা মামলায় আইভীকে গ্রেপ্তার দেখাতে আবেদন করে পুলিশ। এর মধ্যে গত ২ মার্চ একটি মামলায় এবং ১২ এপ্রিল অপর মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।
এ দুই মামলায়ও অধস্তন আদালত জামিন না দেয়ায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেন আইভী। গত ৩০ এপ্রিল হাইকোর্ট এই ২ মামলায় তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। এই জামিনও স্থগিত চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় মিরপুর থানায় দায়ের করা একটি মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের জামিন বহাল রাখার আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। সোমবার আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই সিদ্ধান্ত জানান এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রুলটি দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ প্রদান করেন।
আদালতে ব্যারিস্টার সুমনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী এম লিটন আহমেদ। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর দিবাগত রাত দেড়টায় মিরপুর-৬ এলাকা থেকে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বার্তায় লিখেছিলেন, ‘আমি পুলিশের সঙ্গে যাচ্ছি। দেখা হবে আদালতে। দোয়া করবেন সবাই।’
সাবেক এই স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ঢাকা ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। মিরপুর থানার মামলায় এর আগে হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দিয়ে রুল জারি করেছিলেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষ ওই জামিনাদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করলেও আদালত তা নাকচ করে দিয়ে জামিন বহাল রাখেন।
স্মার্টফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে আঙুলের ডগায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে মায়াবী হাতছানি। কখনো তা রঙের খেলা; কখনো বা ঘূর্ণায়মান চাকা। এক মুহূর্তের লোভে আর একটি ক্লিকের অদম্য নেশা খুঁজে ফেরে স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ। কিন্তু সেই রঙিন পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে নিঃশব্দ হাহাকার। তিলে তিলে গড়া সঞ্চয়, এক চিলতে সুখ আর সোনালি ভবিষ্যৎ—সবই যেন ডিজিটাল মরীচিকার গ্রাসে হারিয়ে যায়। নিছক বিনোদনের মোড়কে আসা এই নেশা শেষমেশ সাজানো স্বপ্নগুলোকে ছাই করে দিয়ে রেখে যায় কেবেই এক রিক্ত পাণ্ডুলিপি-এটি কোনো গল্প বা উপন্যাস নয়; ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজ লভ্যতায় ‘অনলাইন জুয়া’ নামক মরণনেশার বাস্তবতা; যা বর্তমানে সারাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, দোকানকর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর কিংবা গার্মেন্টকর্মী- জীবনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছেন এই জুয়ার দিকে। রাতারাতি ধনী হওয়ার মরণনেশায় বুঁদ হয়ে শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে শিক্ষাজীবন, চাকরিজীবীরা কর্মসংস্থান। এতে অনেক পরিবারে নেমে এসেছে হতাশার কালো মেঘ। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভাগ্য পরীক্ষার নামে চলছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন।
ফেসবুক আইডি, পেজ, গ্রুপ, ওয়েবসাইট ও মুঠোফোনভিত্তিক এনক্রিপ্টেড অ্যাপ দিয়ে চলছে এই জুয়ার সাইটগুলো। এতদিন বিদেশি আয়োজনে এসব জুয়ার সাইট চললেও এখন দেশিয় অনেক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা এসব জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। খোয়াচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। অনেকে ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে জাড়াচ্ছেন নানা অপরাধে। বাড়ছে খুনোখুনিও।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্মার্টফোনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই জুয়ার অ্যাপগুলো প্রচার করা হয়। শুরুতে ব্যবহারকারীকে সামান্য কিছু টাকা (যেমন: ১,০০০ টাকা) বোনাস বা জয়ের লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করা হয়। এই সামান্য টাকার মোহে পড়ে সাধারণ মানুষ নিজের পকেটের টাকা ঢালতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে ১ হাজার টাকা জেতার আশায় মানুষ কখন ১ লক্ষ টাকা হারিয়ে ফেলছে, তা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
জুয়া এমন এক সর্বনাশা নেশা, যা মানুষকে মুহূর্তেই পথে বসিয়ে দেয়। ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বড় অংকের টাকা জেতার আশায় তারা জমানো টাকা খরচ করে, এমনকি ঋণ বা সম্পদ বিক্রি করেও জুয়ায় ঢালছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জুয়া খেলে কেউ কখনো স্থায়ীভাবে ধনী হতে পারেনি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জুয়া খেলে ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই সর্বস্বান্ত হয়, আর লাভবান হয় কেবল ওই অ্যাপের আড়ালে থাকা চক্রগুলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘অল্প পুঁজিতে লাখপতি’ কিংবা ‘দ্রুত আয়’-এর মতো বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে ফাঁদে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ ঝুঁকছে অনলাইন জুয়ার দিকে। অল্প আয়ের টাকা কয়েকগুণ বাড়ানোর আশায় তারা জড়িয়ে পড়ছেন এমন এক খেলায়, যেখানে জেতার চেয়ে হারার শঙ্কাই বেশি। ফলে অনেকেই হারাচ্ছেন শেষ সম্বলটুকুও; ভেঙে পড়ছে পরিবার, তৈরি হচ্ছে নতুন এক সামাজিক সংকট। শুধু পুরুষই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আসক্ত হয়ে পড়ছেন অনলাইন জুয়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুয়া শুধু আর্থিক ক্ষতিই করে না, এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। জুয়ার নেশায় পড়ে তরুণরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নষ্ট করছে। ঋণের বোঝা সইতে না পেরে অনেক তরুণ আত্মহত্যার মতো কঠিন পথ বেছে নিচ্ছে অথবা জড়িয়ে পড়ছে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে।
ঘটনা-১ : রাজধানীর হাজারীবাগ: ২৭ বছর বয়সী গার্মেন্টকর্মী সুমাইয়া রংপুর থেকে ভাগ্যবদলের আশায় একা ঢাকায় আসেন। মাসে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন গার্মেন্টে; ওভারটাইমসহ আয় দাঁড়ায় ১৫-১৬ হাজার টাকা। ৭ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে বাকি দিয়ে নিজের খরচ ভালোভাবেই চলছিল। একদিন ফেসবুকে চোখে পড়ে একটি বিজ্ঞাপন ‘ঘরে বসে আয় করুন, দিনে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা গ্যারান্টি।’ কৌতূহলবশত ক্লিক করতেই সেটি তাকে নিয়ে যায় একটি গেমিং সাইটে। শুরুতে বিনামূল্যে খেলার সুযোগ, এরপর অল্প বিনিয়োগে বড় জয়ের প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন সুমাইয়া। প্রথমদিকে কিছু লাভও করেন। সেই টাকা দিয়ে ভালো একটি মোবাইল ফোনও কিনেছিলেন। জীবন যেন নতুন ছন্দে এগোচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে বেশি সময় লাগেনি। আস্তে আস্তে হারতে থাকেন জুয়ায়। এরপর মাসের মাঝামাঝিতেই বেতনের বড় অংশ শেষ হয়ে যেতে থাকে। একসময় বাড়িতে টাকা পাঠানোও বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসাও। সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নেন, কিন্তু সেই টাকাও হারেন। পরে মোবাইল ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঋণ নেন। চলতি মাস থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার পর তার হাতে থাকবে মাত্র দুই হাজার টাকা। মাত্র দুই হাজার টাকা কীভাবে তিনি মাস চালাবেন জানেন না।
ঘটনা -২: জিগাতলার বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে ছোট্ট একটি চায়ের দোকানই ছিল ৩৪ বছর বয়সী মুইন মিয়ার পরিবারের একমাত্র সম্বল। দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করে মোটামুটি চলছিল তার সংসার। একদিন দোকানে চা খেতে আসা এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ তাকে দেখায় কীভাবে ক্রিকেট ম্যাচে বাজি ধরে অল্প সময়েই হাজার টাকা আয় করা যায়। চোখের সামনে ওই তরুণকে কয়েকবার জিততে দেখে শেষ পর্যন্ত লোভ সামলাতে পারেননি। এরপর ছোট-ছোট বাজিতে কয়েকবার জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়লে বড় বাজি ধরা শুরু করলে পতনের শুরু হয়। হারার পর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবার আরও বড় বাজিতে হারতে থাকেন। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দোকানের পুরো পুঁজি শেষ হয়ে যায়। এখন দোকান বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
ঘটনা-৩: কারওয়ানবাজার থেকে ভোরে মালামাল নিয়ে মোহাম্মদপুরের কাঁচাবাজারের বিক্রি করেন তরুণ ব্যবসায়ী আলিফ। মাস কয়েক আগে বাজারেরই এক পরিচিত ব্যক্তি মোবাইলের একটি অ্যাপ দেখিয়ে বলল, ‘ক্রিকেট ম্যাচে ১০০ টাকা লাগাও, জিতলে ২৫০ পাবা।’ প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিলেও কৌতূহল আর প্রলোভনে সেদিন সন্ধ্যায় ১০০ টাকা বাজি ধরে ২২০ টাকা পান। তার কাছে মনে হয়, সারাদিন রোদে পুড়ে যা আয় হয়, এখানে তা মিনিটেই সম্ভব। এরপর কৌতূহল আর লোভ থেকে রূপ নেয় অনলাইন জুয়ার নেশায়। কয়েক মাসের নেশায় আলিফ ব্যবসা হারিয়েছে, সেই সঙ্গে হারিয়েছে স্বপ্ন। এভাবে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এইবার ফেরত পাব- এই চিন্তাটাই জুয়ার সবচেয়ে বড় ফাঁদ। একে বলা হয় ‘গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি’। এই মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে সর্বস্ব হারানো শুধু সময়ের ব্যাপার। তবে শুধু নিংস্ব হওয়াই নয়; এই অনলাইন জুয়া কেন্দ্র করে বাড়ছে খুনোখুনি আত্মহত্যাও।
# অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে শিক্ষার্থীকে গলাকেটে হত্যা:
ধামরাই: অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে ঢাকার ধামরাইয়ে ঘরে ঢুকে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে গলাকেটে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ধামরাই থানার ওসি নাজমুল হুদা খান।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে পৌরসভার লাকুড়িয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাসায় নাহিদা আক্তার (১৬) নামের ওই পরীক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিবেশী শামীম ওরফে স্বপনকে (৩৫) আটক করি। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।
ওসি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে স্বপন জানান, তিনি অনলাইন জুয়ায় আসক্ত এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। নাহিদার নানী যখন বাসায় ছিলেন না, তখন পেঁয়াজ-রসুন লাগবে জানিয়ে স্বপন তার কক্ষে প্রবেশ করেন এবং টাকা চান। নাহিদা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে প্রথমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে ফ্লোরে ফেলে দেন। পরে সঙ্গে থাকা কাটার দিয়ে তার গলা কেটে ফেলেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে শীল দিয়ে মাথায় আঘাত করেন এবং নাহিদার গলায় ও কানে থাকা সোনার গহনা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যান।
অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে স্বপন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে জানিয়ে পুলিশ বলছে, তারা ইতোমধ্যে নাহিদার কানের দুল ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত শীল উদ্ধার করেছে।
# অনলাইন জুয়ার ভাগ-বণ্টন নিয়ে সরকারি কর্মচারীর গোপালপুর(টাঙ্গাইল): অনলাইন জুয়ার দেড় কোটি টাকার ভাগ-বণ্টন নিয়ে রাজস্ব বিভাগের কর্মচারী আমিনুল ইসলাম গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি গোপালপুর উপজেলার সৈয়দপুর তহসিল অফিসের অফিস সহকারী। তার বাড়ি পাশের চাতুটিয়া গ্রামে।
আমিনুলের বাবা ভোলা মিয়া বলেন, অনলাইনে বাজি খেলতে গিয়ে তার ছেলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ব্যাংক কর্মকর্তা ধার নেওয়া দেড় কোটি টাকাও তাকে ফেরত দিচ্ছিলেন না। পাওনাদারেরা তাকে প্রতিদিন টাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন। এতে আমিনুল হতাশ হয়ে পড়েন। গত বুধবার রাতে রান্নাঘরের ধরনার সঙ্গে ফাঁসি দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন।
ভোলা মিয়া আরও বলেন, আমিনুলের তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে এবং তার স্ত্রী তিন মাসের গর্ভবতী। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন আমিনুল।
মুক্তাগাছা(ময়মনসিংহ) : বাবার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বে আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে লুকিয়ে রাখার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুলিশ নূর মুহাম্মদ খোকন (২০) নামের একজনকে আটক করেছে। পরে খোকনের বাড়ির একটি ল্যাট্রিনের ভেতর থেকে শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটি উপজেলার বাঁশাটি ইউনিয়নের জমিনপুর গ্রামের জহিরুল ইসলামের ছেলে। সে মুক্তাগাছা শহরের রেসিডেন্সিয়াল মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক খোকন জানান, তিনি অনলাইনে জুয়ায় আসক্ত। শিশুটির বাবা জহিরুল ইসলাম জুয়া খেলায় বিভিন্ন সময় বাধা দেওয়াসহ জুয়ার বিষয়ে তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। তার বাবার প্রতি ক্ষোভ থেকে খোকন শিশুটিকে প্রথমে অপহরণ ও পরে হত্যা করে লাশ গুম করে রাখেন।
তাড়াশ(সিরাজগঞ্জ) : উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকাতেই অনলাইন জুয়ায় মেতে উঠেছে যুবসমাজ। মোবাইল ফোনে নানা ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে ক্রিকেট, ফুটবল, তিন পাত্তি, রামি, রঙের খেলা, এভিয়েটর গেম, আইপিএল বেটিং এমনকি জনপ্রিয় লুডু খেলাটিও অনলাইন জুয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই অনলাইন জুয়ার আসর বসছে গ্রামের চায়ের দোকান, চালের দোকান কিংবা সুতার দোকানের ভেতর। বাইরে থেকে সাধারণ ব্যবসা মনে হলেও ভেতরে চলছে মোবাইলের পর্দায় হাজার হাজার টাকার বাজি। দুপুরে চা খাওয়ার অজুহাতে, রাতে দোকান বন্ধের পরেও একে একে হাজির হয় নির্দিষ্ট কয়েকজন। বসে যায় আড্ডা, হাতে হাতে মোবাইল, চোখ পর্দায়, আর দেদারসে চলতে থাকে জুয়া খেলা।
কাউরাইল এলাকার এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি প্রথমে বন্ধুদের দেখাদেখি খেলতে শুরু করি। লুডুতে ৫০ টাকা দিয়ে শুরু, পরে একসময় হাজার টাকার ওপরে চলে যায়। জিতলে মজা লাগত, কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই হারতাম। পরে ঋণ করতে করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো দেনা হয়। এখন চাকরি নেই, ঋণের চাপে ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বিপদে পড়ছে পরিবারগুলো। ঘরে শান্তি নেই, বাবা-মা সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, স্ত্রী স্বামীর ওপর আস্থা হারাচ্ছেন, ভাই ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছে। সন্তানরা পড়াশোনার বদলে সারাদিন মোবাইলে চোখ রেখে বাজির জন্য অপেক্ষা করছে। যুবকরা কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, মনোযোগ ভেঙে যাচ্ছে পড়ালেখা বা পেশাজীবনে। একদিকে আসক্তি, অন্যদিকে টাকা হারানোর চাপ, সব মিলিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন অনেকে।
এ বিষয়ে তাড়াশ থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান জানান, ‘আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি। অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত অভিযোগ এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, ‘অনলাইন জুয়া একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের উপজেলাতেও বিষয়টি নজরে এসেছে। আমরা আইসিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছি। জনসচেতনতাও জরুরি, তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মিটিং করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উদ্যাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, জুয়া, অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আরও যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্য ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা হবে।
গত জুলাই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলে নূর তাপসসহ মোট ২৮ জন আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। আজ রোববার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন।
আদালত এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে আগামী ৮ জুন প্রারম্ভিক বক্তব্য উপস্থাপন এবং সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছেন। অভিযুক্তদের তালিকায় নানক ও তাপস ছাড়াও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। পলাতক এসব আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ডিবির সাবেক প্রধান হারুন-অর-রশিদ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার।
অন্যদিকে, এই মামলায় বর্তমানে চারজন আসামি কারাবন্দি রয়েছেন, যাদের মধ্যে ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সাবেক সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল অন্যতম। এছাড়া ট্রাইব্যুনাল জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হওয়া অন্যান্য ঘটনার তদন্তেও সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে উত্তরার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৩০ জুন এবং ফেনীর ঘটনার প্রতিবেদন ২১ জুলাইয়ের মধ্যে দাখিল করার জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর ও রমনা থানায় ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর দায়ের করা পৃথক দুটি হত্যা মামলায় সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরকে জামিন প্রদান করেছেন হাইকোর্ট। আজ রোববার বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজল এবং বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই জামিন আদেশ দেন। আদালতে আসাদুজ্জামান নূরের পক্ষে আইনি লড়াই চালান জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না ও ব্যারিস্টার রেহান।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে এই জামিন আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শায়লা শারমিন এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আলামিন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর বেইলি রোড এলাকা থেকে আসাদুজ্জামান নূরকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পরবর্তীতে ১৬ সেপ্টেম্বর মিরপুর থানার একটি হত্যা মামলায় তাঁকে এবং সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে উত্তরা এলাকায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় দায়ীদের বিচারে কোনো পক্ষপাত বা আপস করা হবে না বলে জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা কোনো পুলিশ বা আমলার বিচার করছি না, অপরাধের বিচার করছি। খুনির বিচার করছি।’
শনিবার (৯ মে) রাজধানীর উত্তরা শহীদ মীর মুগ্ধ মঞ্চে শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে আয়োজিত গণশুনানিতে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ, মার্জিনা রহমানসহ তদন্তসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিজেদের দায়বদ্ধতা ও বিবেকের তাড়না থেকেই শহীদ পরিবারের কাছে এসেছি। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য শুনে তদন্তে কোনো গাফিলতি আছে কিনা, তা যাচাই করতে এসেছি। এরই মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে সেটি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে। এরপর বিচার কার্যক্রম শুরু হবে।’
উত্তরা এলাকায় শহীদের প্রকৃত সংখ্যা ৭৭, ৮৭ কিংবা শতাধিক হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যতজন শহীদ থাকুক না কেন, প্রত্যেক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে। আমরা কোনো দলীয় বা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত করছি না। আমরা শুধু প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছি। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে আসামি করতে চাই না। আবার কোনো অপরাধীকেও ছাড় দিতে চাই না। এ বিষয়ে আমরা নজর রাখছি।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘শহীদদের সঙ্গে কখনো বেইমানি করা হবে না। আমরা প্রকৃত আসামিদের বিচারের মুখোমুখি করব। সবার সহযোগিতা পেলে খুব দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে। তবে, আমরা কোনো পুলিশের বিচার করছি না। আমলারও বিচার করছি না। আমরা অপরাধীর ও খুনির বিচার করছি। এ ছাড়া এ বিচারের তদন্ত পুলিশই করছে। অতএব তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো বৈরিতা নেই।’
এদিন সকাল ১০টা থেকে উত্তরা শহীদ মীর মুগ্ধ মঞ্চে শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে তদন্তের অগ্রগতি, ভুক্তভোগীদের সমস্যা এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এছাড়া উত্তরা এলাকার বিভিন্ন ‘জুলাই-আগস্ট হটস্পট’ পরিদর্শন করেন চিফ প্রসিকিউটরসহ অন্যান্যরা।