রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগে ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়।
গত বুধবার সকাল ৬টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এসব অভিযান চালায় ডিএমপির বিভিন্ন অপরাধ ও গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
ডিএমপি গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার কে এন রায় নিয়তি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, ডিএমপির নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগে ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৫৮৯ পিস ইয়াবা, ৩৭ গ্রাম হেরোইন, ১৫ কেজি ৫০ গ্রাম গাঁজা ও ৬৫ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।
এ সব ঘটনায় গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২৩ টি মামলা করা হয়েছে।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আগামী ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিন সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই ছুটির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগামী ১৭ অক্টোবর শনিবার আদালতের দাপ্তরিক কার্যক্রম খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত এক অফিসিয়াল বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার সার্বজনীন আনন্দ ও ধর্মীয় আবহ বিবেচনা করে আগামী মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট উভয় বিভাগের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। তবে ছুটির সামঞ্জস্য রাখতে আগামী ১৭ অক্টোবর শনিবার আদালতের দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ যথারীতি পরিচালিত হবে।
উল্লেখ্য, সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী, আগামী ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে সাধারণ ছুটি রয়েছে। এর সঙ্গে বাড়তি ছুটি হিসেবে ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবারও আদালত বন্ধ রাখা হচ্ছে। এরপরের দুই দিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় বিচারপতির পাশাপাশি আইনজীবীরাও টানা পাঁচ দিনের ছুটি উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিচারিক প্রক্রিয়া এখন থেকে কারাগারেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে এবং তাকে সরাসরি আদালতে হাজির না করিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত করা হবে। আসামিপক্ষের জীবননাশের শঙ্কার দাবি আমলে নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আনা বিশেষ আবেদনটি ট্রাইব্যুনাল মঞ্জুর করায় এই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই বিষয়ে উভয় পক্ষের আইনি ত্তর্কতা শুনে রায় ঘোষণা করেন।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর আসামির আইনজীবী আদালতে দাঁড়িয়ে মক্কেলের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটিমাত্র প্রিজন ভ্যানে করে এই আসামিকে একা আদালতে আনা-নেয়া করলে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারে। বিপরীতে প্রসিকিউশন পক্ষ যুক্তি দেয় যে, তাকে অন্য সাধারণ আসামিদের সঙ্গে একই গাড়িতে পরিবহন করা হলে বাকি বন্দিদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই পরিস্থিতি এড়াতে তাকে কারাগারে রেখেই ভার্চুয়ালি বিচারকাজ চালানোর পক্ষে জোরালো আবেদন জানায় রাষ্ট্রপক্ষ।
অন্যদিকে জিয়াউল আহসান নিজেই আদালতে নিজের জীবনের ওপর সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে অন্য বন্দিদের সঙ্গে একই গাড়িতে যাতায়াতের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তার আইজীবী নাজনীন নাহার আদালতকে জানান যে, বিগত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে তাকে কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি গাড়িতে করে ট্রাইব্যুনালে আনা হচ্ছিল, যা গভীর কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে। তবে প্রসিকিউশনের আপত্তির মুখে আদালত ভিডিও কনফারেন্সে বিচারকাজ পরিচালনার সিদ্ধান্ত দেওয়ায় এখন থেকে তিনি কারাগারেই থাকবেন।
এদিকে এই মামলার বিচারকাজ প্রায় শেষের পথে রয়েছে বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম। গুম ও হত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলোর মধ্যে এটিই প্রথম যা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। এ পর্যন্ত মোট ১৫ জন সাক্ষী তাদের জবানবন্দি দিয়েছেন এবং রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে অপরাধের পর্যাপ্ত প্রমাণ তারা উপস্থাপন করতে পেরেছেন।
মামলার ১৫তম সাক্ষী ও তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামের জবানবন্দি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আগামী রোববার তার বাকি জবানবন্দি রেকর্ড শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করবেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। জবানবন্দিতে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন যে অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ফাঁস হয়ে গেলে সেগুলোকে আইনি বৈধতা দিতে লোক দেখানো প্রশাসনিক তদন্তের নাটক সাজানো হতো এবং ভুয়া ময়নাতদন্ত ও পুলিশ প্রতিবেদন তৈরি করে মূল অপরাধীদের আড়াল করা হতো।
উল্লেখ্য, শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেয় প্রসিকিউশন, যা একই দিনে ট্রাইব্যুনাল আমলে নেন। পরবর্তীতে গত ২৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পাঁচ করবর্ষের বিপরীতে ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি কর প্রদেয় সংক্রান্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবির বৈধতা নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা রিট খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। দুটি মামলায় একটি ১৫ পৃষ্ঠা এবং অপরটি ৩২টি পৃষ্ঠার রায় সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের দুটি রুল খারিজ করে রায় দেন।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট অপর একটি বেঞ্চ এ বিষয়ে করা রিট আবেদন খারিজ করে রায় দিয়েছিলেন। পরে ওই রায় প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। কারণ হিসেবে বলা হয়, বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারক একসময় এসব মামলায় সরকারের পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এ কারণে রায়টি প্রত্যাহার করে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। এরপর মামলাগুলো শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চে পাঠানো হয়।
গ্রামীণ কল্যাণের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে কর বাবদ প্রদেয় অর্থের দাবি জানানো হয়। এ দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে পৃথক রিট করে গ্রামীণ কল্যাণ।
২০২৪ সালে রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছিল, পাঁচটি করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণের কাছে কর বাবদ ৬৬৬ কোটি টাকার বেশি দাবি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গুলিতে নিহত মোহাম্মদ ইসমাইলের মা তাসলিমা আক্তার আদালতে তার মর্মস্পর্শী সাক্ষ্য ও জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি জানান, ছেলের নিথর দেহ বুঝে পেতে হাসপাতাল থেকে ‘মামলা করবেন না’ মর্মে তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছিল। সোমবার (১২ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনি এ জবানবন্দি দেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে দশম সাক্ষী হিসেবে তিনি এ জবানবন্দি প্রদান করেন।
এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ্। তিনি বলেন, এ মামলার ২৮ আসামির মধ্যে জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৪ জন পলাতক। চার আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। আজকে শহীদ ইসমাইলের মা তাসলিমা আক্তার মামলায় সাক্ষী দিয়েছেন। তিনি ট্রাইব্যুনালে দাড়িয়ে ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। আমরাও ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায় বিচার ও আসামিদের সবোচ্চ শাস্তি চাই। এ মামলায় গ্রেপ্তার ৪ আসামি হলেন- কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখার সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগকর্মী ফজলে রাব্বি।
জবানবন্দি প্রদানকালে নিহত ইসমাইলের মা তাসলিমা আক্তার (৩০) জানান, গত ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই (শুক্রবার) জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে আনুমানিক বিকেল ৩টার দিকে তার ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল বাসা থেকে বের হয়ে আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে আন্দোলনে যোগ দেয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইসমাইলের বন্ধু মনির এসে জানায় যে সে ইসমাইলকে আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে দেখে বাসায় ফিরে যেতে বলেছিল, কিন্তু ইসমাইল বাসায় না ফিরে আন্দোলনে অবস্থান করে। তাসলিমা আক্তারের ফোনে ব্যালেন্স না থাকায় তার বোন আকলিমা ইসমাইলের নম্বরে ফোন করেন। কয়েকবার চেষ্টার পর ইসমাইলের বন্ধু কালু ফোন ধরে জানায় যে ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খবর পেয়ে তিনি তার মা ও বোনকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকা উদ্যান থেকে রিকশায় ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশে রওনা হন। পথে রাস্তায় আগুন জ্বলতে দেখেন এবং কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তাপস ও বিপ্লবের হাতে অস্ত্র দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন। এমনকি তার চোখের সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলেও তিনি জানান।
রাত আনুমানিক ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান তারা। তাসলিমা আক্তার জানান, জরুরি বিভাগে বহু লোককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জীবিত ও মৃত পড়ে থাকতে দেখেন। বিভিন্ন তলায় ছেলেকে খোঁজার পর এক চিকিৎসককে অনুরোধ করলে তিনি মোবাইলে একটি ছবি দেখান, যা দেখে তিনি তার ছেলেকে শনাক্ত করেন। পরে মর্গে নিয়ে গেলে সেখানে তিনি ৩০০ থেকে ৪০০ লাশ স্তূপাকারে পড়ে থাকতে দেখেন। পরনের পোশাক দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে তার ছেলের মাথায় গুলি লেগেছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানার ওসির উপস্থিতি ছাড়া লাশ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। পরদিন শনিবার বেলা ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা থেকে সাইফুল দারোগা হাসপাতালে আসেন এবং শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইসমাইলের লাশ হস্তান্তর করা হয়। এ সময় হাসপাতাল থেকে ‘মামলা করবেন না’ মর্মে তার কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয়া হয় বলে তিনি জানান। পরবর্তীতে ছাতা মসজিদে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে ইসমাইলকে দাফন করা হয়।
জবানবন্দি দেয়ার সময় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে তাসলিমা আক্তার বলেন, তার ছেলেকে হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, রাসেল, মোল্লা রুবেল, কমিশনার আসিফের পিএস বিপ্লব, বিপ্লব কুমার, সৈকত, সাজ্জাদ পলাশ, সাত্তার, মোহাম্মদ ইসমাইল, রাষ্ট্রন, রওশনসহ আরো অনেকেই দায়ী। তার মেয়ে রশ্নি ইউটিউবে হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখিয়েছে এবং এলাকার লোকজনও ভিডিও দেখে এসব আসামির জড়িত থাকার কথা নিশ্চিত করেছে।
গ্রামীণ কল্যাণকে বকেয়া ৬৬৬ কোটি টাকার আয়কর পরিশোধ করতে হবে মর্মে দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। গ্রামীণ টেলিকমের নামে জমাকৃত উৎসে করের চালান দেখিয়ে গ্রামীণ কল্যাণ নিজেদের অপরিশোধিত করদায় সমন্বয়ের দাবি করতে পারে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির রিট আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের এই রাজস্ব আদায়ে অনতিবিলম্বে ডিমান্ড নোটিশ জারি করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং বিচারপতি মো. রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন এবং পূর্বে জারি করা রুল খারিজের পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন।
মামলার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, কর অঞ্চল-১৪-এর সার্কেল-২৮৭-এর করদাতা হিসেবে গ্রামীণ কল্যাণ ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষে আয়কর রিটার্ন দাখিল করে। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির বরাতে গ্রামীণফোন লিমিটেডের লভ্যাংশ দেখিয়ে ২০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে অতিরিক্ত কর কমিশনার পূর্বের কর মূল্যায়ন বাতিল করে একে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে কর আরোপের নির্দেশ দেন। এর বিরুদ্ধে রিভিশন করা হলে ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর কর কমিশনারের মূল আদেশে অসাবধানতাবশত ‘দাখিলকৃত রিটার্নের ভিত্তিতে প্রদেয় কর পরিশোধিত’ উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে কর বকেয়া থাকায় অধ্যাদেশের ১৭৩ ধারার ক্ষমতাবলে নোটিশ জারি করে একই বছরের ২৭ নভেম্বর আদেশটি সংশোধন করা হয়। সংশোধিত নথিতে ‘পরিশোধিত’ শব্দের স্থলে ‘অপরিশোধিত’ শব্দ প্রতিস্থাপন করা হয় এবং আইন অনুযায়ী অবিসংবাদিত কর জমা না দেওয়ায় আবেদনটি খারিজ করা হয়।
কর কমিশনারের এই সংশোধন আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালেই হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে প্রতিষ্ঠানটি। শুনানিতে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবীরা দাবি করেন, পূর্বের আদেশ সংশোধন বা পর্যালোচনা করার এখতিয়ার কর কমিশনারের নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আদালতে জানানো হয়, নিজস্ব নামে পে-অর্ডার বা চালান দাখিল করতে ব্যর্থ হয়ে গ্রামীণ কল্যাণ অন্য প্রতিষ্ঠানের উৎসে করের নথির মাধ্যমে দায় এড়ানোর অপচেষ্টা করেছে এবং কর কমিশনার যথাযথ নিয়ম মেনেই করণিক ভুল সংশোধন করেছেন।
উভয় পক্ষের শুনানি শেষে হাইকোর্ট জানান, আইন অনুযায়ী রিভিশন আবেদনের অন্যতম প্রাথমিক শর্ত হলো নির্ধারিত অবিসংবাদিত কর পরিশোধ করা, যা নিজস্ব নামে রিটার্ন দেওয়া গ্রামীণ কল্যাণ পূরণ করেনি। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামীণ টেলিকমের কর কর্তন দেখিয়ে নিজের বাধ্যবাধকতা এড়াতে পারে না। একই সাথে কর কমিশনারের আদেশ সংশোধনের পূর্ণ আইনি এখতিয়ার রয়েছে এবং এই প্রক্রিয়ায় কোনো বেআইনি উপাদান নেই। এসব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আদালত রিট খারিজ করে দিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে অপরিশোধিত ৬৬৬ কোটি টাকা আদায়ে অবিলম্বে ডিমান্ড নোটিশ জারির নির্দেশ প্রদান করেন।
সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলায় সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া এবং অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা। সোমবার সকালে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম তাঁদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রবিবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ওই দুই কর্মকর্তাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযুক্ত কাজী গুলশান আরার সঙ্গে অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার পর দেবাশীষ কুমার বড়ুয়াকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, দেশে কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে এই দুই সাবেক কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর উত্তরায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৪ নভেম্বর দিন রেখেছেন আদালত। রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ আদেশ দেন। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম লিটন আহমেদ। পলাতক আসামিদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন ও এম হাসান ইমাম।
এ মামলার ২৬ আসামির মধ্যে সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মির্জা সালাউদ্দিনসহ আট আসামি কারাগারে। সাবেক সংসদ সদস্য হাবিব হাসান, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, উত্তরা বিভাগের সাবেক ডিসি কাজী আশরাফুল আজীমসহ এ মামলার ১৮ আসামি পলাতক।
এ মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরে গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে সহযোগিতার পাশাপাশি আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। সে সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সতীর্থ আন্দোলনকারীরা তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। একইদিন উত্তরা এলাকায় জাহিদুজ্জামান তানভীন, শেখ ফাহমিন জাফর, মো. শাকিল হোসেন, মো. সাব্বির হোসেন ও সজিব সরকারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া সেদিন উত্তরায় এপিসির (সাঁজোয়া যান) পেছনের চাকায় পিষ্ট করে উবারচালক মোখলেসুর রহমান দুর্জয়কে হত্যা করা হয়।
দুই নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই উত্তরা এলাকায় রিদোয়ান শরীফ, মো. ছাব্বির ইসলাম, মো. আসাদুল্লাহ ও নাঈমা সুলতানাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গত ২৩ সেপ্টেম্বর মামলাটিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেওয়ার জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ অসুস্থ থাকায় তারিখ পিছিয়ে আজকের দিন ঠিক করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ফরমাল চার্জ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ৪ নভেম্বর দিন ধার্য করেন আদালত।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি সংলগ্ন সীমানাপ্রাচীরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি বা গ্রাফিতিতে চুনকালি লেপনের অভিযোগে আটক চারজনকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। রবিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠনের সদস্যসচিব আ ন ম আয়াস (২৯), মো. সাকিবুল হাসান (১৯), মো. সুজন মিয়া (১৮) এবং মারজিয়া খন্দকার রিমি (২৭)। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে অঙ্কিত রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে চুনকালি দিতে গেলে ঘটনাস্থল থেকেই আয়াসসহ সংশ্লিষ্টদের আটক করে শাহবাগ থানায় নিয়ে আসা হয়। উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নানা কর্মসূচি, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনা ও রাজনৈতিক বিরোধের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় আসেন আ ন ম আয়াস।
এর আগে গত ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচা এলাকার ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচলের উপযোগী করে তোলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ শিল্প-সাহিত্যে অবদান রাখা ১০ জন বরেণ্য গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়েছিল। সেই সাথে জনসাধারণের সুবিধার জন্য নতুন ডাস্টবিন স্থাপন ও বসার বেঞ্চ নির্মাণ করা হয়। এমন একটি উদ্যোগের পর গুণী ব্যক্তিত্বের গ্রাফিতি নষ্ট করার অপচেষ্টার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। মামলার বাদীপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে এবং তাঁর মুক্তিতে বাদীর কোনো আপত্তি নেই—আসামিপক্ষের এমন দাবির পরও শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদনটি নাকচ করে দেন।
বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে নজরুলের পক্ষে জামিনের আর্জি পেশ করেন তাঁর আইনজীবী মাহাবুবুর রহমান। শুনানিতে তিনি বলেন, ‘‘মামলার বাদী মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে আসামিদের সমঝোতা হয়েছে। বাদীপক্ষেরও জামিনে আপত্তি নেই।’’ তবে উভয় পক্ষের শুনানি পর্যালোচনা শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুরের আদেশ দিলে তাঁকে কারাগারেই অবস্থান করতে হচ্ছে। এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এই মামলায় প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর হলেও নজরুলের আবেদন খারিজ করা হয়েছিল।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনের বিপরীত পাশে অবস্থিত ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরবর্তীতে নিহতের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এতে গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়।
মামলা দায়েরের পর আদালত নজরুলের চার দিন এবং মাকছুদার এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং পরবর্তীতে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে মামলার অপর আসামি ওবায়দুর রহমানকেও গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত সোমবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ১ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আসামিপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এই আদেশ প্রদান করেন। এদিন সকালে মামলার ৪১ জন আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ১১ জনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
প্রসিকিউশনের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সমাবেশকে কেন্দ্র করে পরিচালিত অভিযান ও সহিংসতায় ঢাকাসহ চারটি জেলায় মোট ৫৮ জন নিহত হন। তদন্ত সংস্থা এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ৩২ জন, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহতের সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্ত করেছে।
আলোচিত এ মামলার প্রধান অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।
বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের মধ্য থেকে মামলায় আসামি করা হয়েছে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একটি গণমাধ্যমের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপাকে।
এ ছাড়া সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর তৎকালীন কর্মকর্তাদের মধ্যে অভিযুক্ত হিসেবে রয়েছেন সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, একেএম শহীদুল হক, ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও বেনজীর আহমেদ; তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন ও মনিরুল ইসলাম। তালিকায় আরও রয়েছেন তৎকালীন ডিএমপির কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন, আশরাফুজ্জামান, এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং মতিঝিল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিএম ফরমান আলী।
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদনের বিষয়ে আজ বুধবার সিদ্ধান্ত জানাবেন আদালত। বাদীপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে এবং তাঁর জামিন মঞ্জুরে বাদীর কোনো আপত্তি নেই—আসামিপক্ষের এমন বক্তব্যের ভিত্তিতে নতুন করে এই আবেদন দাখিল করা হয়েছে।
গত ৫ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে সংসদ সদস্যের পক্ষে জামিন চেয়ে আবেদন করেন তাঁর আইনজীবী মাহাবুবুর রহমান, যার শুনানির জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়। শুনানিতে আইনজীবী যুক্তি উপস্থাপন করে জানান, মরিয়মের পরিবারের সঙ্গে আসামিদের একটি পারস্পরিক সমঝোতা হয়েছে এবং বাদীপক্ষের জামিনে কোনো ধরনের আপত্তি নেই। এ অবস্থায় গাজী নজরুল ইসলামকে জামিন দিলে মামলার তদন্ত কিংবা বিচারিক কার্যক্রমে কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে না বলেও আদালতকে অবহিত করেন তিনি।
মামলার বিবরণ ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ ভবন এলাকার উল্টো দিকে অবস্থিত ন্যাম ভবনের একটি আবাসিক ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় নিহতের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলানগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে অভিযুক্ত করা হয়।
মামলার পর ডিবির তদন্তের অধীনে গাজী নজরুল ইসলামকে দুই দফায় মোট আট দিন ও মাকছুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। রিমান্ড শেষে ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁদের কারাগারে পাঠানো হলে ৩০ সেপ্টেম্বর শুনানিতে মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর হলেও আদালত নজরুলের জামিন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে রাখার নির্দেশ দেন। মামলার অন্য আসামি ওবায়দুর রহমানকেও গ্রেপ্তারের পর রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং তাঁর জামিনের শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় পরকীয়ার সম্পর্কের জেরে ভাবি ও শিশু ভাতিজাকে হত্যা মামলায় দেবর সোলাইমান হোসেনকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদানও করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে মানিকগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ বিচারিক আদালতের বিচারক এসকে.এম তোফায়েল হাসান আসামির উপস্থিতে এই দণ্ডাদেশ প্রদান করেন।
দণ্ডিত ৩৫ বছরের সোলাইমান হোসেন সাটুরিয়া সদর ইউনিয়নের কাউন্নারা এলাকার আব্দুল নুর কারীর ছেলে।
আর নিহত ৩০ বছরের পারভিন আক্তার সাটুরিয়া সদর ইউনিয়নের কাউন্নারা এলাকার মো. আশরাফ আলী ওরফে মজনুর স্ত্রী এবং তার নিহত ৯ বছরের শিশু ছেলে নূর মোহাম্মদ। দণ্ডিত সোলাইমান হোসেন নিহত পারভিন আক্তারের দেবর এবং শিশু আব্দুল নুরের চাচা।
জানা যায়, দীর্ঘ ৬ বছরের সম্পর্কে ভাবি পারভিন আক্তারের সাথে দেবর সোলাইমান হোসেনের পরকীয় সম্পর্ক চলছিল। এরপর দেবর সোলাইমান হোসেন বিদেশ থেকে ফেরার পর ভাবি পারভিন তাকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় তারা ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি এক সঙ্গে রাত কাটান এবং ওই রাতেই দেবরকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে সোলাইমান তাকে (ভাবি) অকথ্যভাষায় গালাগালি করে। কাটাকাটির একপর্যায়ে সোলাইমান ক্ষিপ্ত হয়ে ঘরের ভেতর থেকে চাকু বের করে প্রথমে সে ভাবিকে হত্যা করে এবং তারপর খাটের উপর শুয়ে থাকা ভাতিজা আব্দুল নুর চিনে ফেলায় তাকেও চাকু দিয়ে হত্যা করে সোলাইমান হোসেন। ঘটনার পরদিন নিহত পারভিনের মা জমিরন বেগম বাদি হয়ে অজ্ঞাতপরিচয়ে আসামি করে সাটুরিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার পর থানা-পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সাটুরিয়া থানার ওসি (তদন্ত) আবুল কালাম তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ১৪ মে সোলাইমানকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। তারপর মামলায় উভয়পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক শেষে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় জেলা ও দায়রা জজ বিচারিক আদালতের বিচারক তাদে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) আ.ফ.ম নূরতাজ আলম বাহার রায়ে অস্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে রায়ের কপি উচ্চ আদালতে গেলে উচ্চ আদালত রায়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তবে আসামি পক্ষের আইনজীবী মাহাবুবুল ইসলাম আসামিকে নির্দোষ দাবি করে উচ্চ আদালতের আপিলের কথা জানিয়েছেন।
আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে নজিরবিহীন দ্রুততায় বিচার শেষ হলেও উচ্চ আদালতে এসে থমকে আছে মামলার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া। বিচারিক আদালতে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ, যুক্তিতর্ক ও রায় হয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শেষে ২৫ অক্টোবর হাইকোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হলে চলতি বছরের মধ্যেই মামলাটির শুনানি শেষ করার আশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।
চলতি বছরের ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদ হয় বিভিন্ন স্থানে। সরকারের পক্ষ থেকেও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়। এরপর দ্রুতগতিতে এগোয় তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম।
ঘটনার পাঁচ দিনের মধ্যে, ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। ১ জুন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। পরদিন বাবা-মা, বোন, প্রত্যক্ষদর্শী, চিকিৎসক, ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ ১৬ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ৩ জুন আত্মপক্ষ সমর্থন এবং ৪ জুন যুক্তিতর্ক শেষ হয়। ৭ জুন রায় ঘোষণা করেন ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন।
রায়ে সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সোহেলকে পাঁচ লাখ এবং স্বপ্নাকে দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। এই অর্থ রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারীদের দেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
বিচারিক আদালতের রায়ের মাত্র দুই দিন পর, ৯ জুন পূর্ণাঙ্গ রায়সহ ৬৯ পৃষ্ঠার নথি এবং ডেথ রেফারেন্সের তিন পৃষ্ঠার নথিসহ মোট ৭২ পৃষ্ঠার কাগজপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুকও প্রস্তুত করা হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে সংবেদনশীল মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য জুনে হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা হয়। ওই বেঞ্চ ইতোমধ্যে ২৪টি আপিল ও ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তি করেছে। এর মধ্যে মাগুরার আছিয়া হত্যা ও ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলাও রয়েছে। রামিসা মামলাটিও ওই বেঞ্চের শুনানির তালিকায় রয়েছে।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২৮ ধারা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে ৬০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিলের সুযোগ রয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সেই আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতেই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনের দুটি জেল আপিলও মঞ্জুর হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর আদালত খোলার পর ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মামলাটি শুনানির জন্য আসতে পারে। শুনানি সম্পন্ন হলে ২০২৬ সালের মধ্যেই আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের প্রক্রিয়া শেষ করার আশা রয়েছে।
নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচারের পর এখন উচ্চ আদালতের শুনানির অপেক্ষায় রামিসার পরিবার। বহুল আলোচিত এই মামলার চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি কবে হয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার।