ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে শুরু করেছে। এ ঘটনায় সামনে এসেছে সিলিস্তি রহমান নামে এক নারীর নাম।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমপিকে হত্যার জন্য কলকাতার নিউটাউনে অভিজাত ‘সঞ্জীবা গার্ডেন্সে’ যে ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া হয়, সেখানে অবস্থান করেছিলেন ওই নারী। হত্যা মিশন ঘটিয়ে মূল ঘাতক আমানউল্লাহ আমানের সঙ্গে তিনি গত ১৫ মে দেশে ফেরেন।
ওই নারীকে এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তাদের হেফাজতে নিয়েছে। ঘটনার বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি। তদন্ত কর্মকর্তারা বলেন, এমপি আনার খুনের মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীনের বান্ধবী সিলিস্তি রহমান। তার বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে।
কলকাতা পুলিশও ফ্ল্যাট কম্পাউন্ডের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখেছে, ১৩ মে ওই ফ্ল্যাটে তিনজন একসঙ্গে প্রবেশ করেন। তাদের মধ্যে দুজন পুরুষ ও একজন নারী। এক দিন ফ্ল্যাটে অবস্থানের পর বের হয়ে আসেন এক পুরুষ ও এক নারী।
ধারণা করা হচ্ছে, ওই নারীই সিলিস্তি। ১৩ মে তিনি আমানউল্লাহ ও এমপি আনারের সঙ্গে ফ্ল্যাটে ঢুকে থাকতে পারেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র বলছে, তাদেরও ধারণা ওই নারীই সিলিস্তি। কারণ তিনি ১৫ মে বিমানযোগে দেশে ফেরেন। তার সঙ্গে দেশে ফেরেন মূল ঘাতক আমানউল্লাহ।
ধারণা করা হচ্ছে এমপি আনারকে কলকাতা নিতে এ নারীকেই ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীন। কারণ সব পরিকল্পনা করে শাহীন ১০ মে দেশে ফিরে এলেও সিলিস্তি থেকে যান কলকাতায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, হত্যার সময় সিলিস্তি তিনতলা ফ্ল্যাটের একটি তলায় অবস্থান করছিলেন। তবে সামনে ছিলেন না। হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পর তিনি নিচে নেমে আসেন। ওই নারী সিলিস্তি কি না, তদন্ত চলছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী তারই ছোটবেলার বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদার আক্তারুজ্জামান শাহীন। তিনি ঝিনাইদহের বাসিন্দা ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। শাহীনের ভাই ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর পৌর মেয়র। এ হত্যার পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আরেক বন্ধু ও চরমপন্থি নেতা আমানউল্লাহ আমানকে।
কলকাতায় বসে হত্যার চূড়ান্ত ছক এঁকে বাংলাদেশে চলে আসেন শাহীন। পরে আমানসহ ছয়জন মিলে এমপি আজীমকে সঞ্জীবা গার্ডেন নামের একটি ফ্ল্যাটে ট্র্যাপে ফেলে ডেকে আনেন। এরপর তাকে জিম্মি করে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ কেটে টুকরো টুকরো করে ট্রলিব্যাগে ভরে ফেলা হয় অজ্ঞাত স্থানে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কলকাতা পুলিশ ওই ফ্ল্যাট ও আশপাশের ভবনের সব সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আমান ও তার সহযোগীদের ট্রলিব্যাগ আনা-নেওয়া, এমপি আনারের বাইরে রাখা জুতা ভেতরে নেওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। এ ছাড়া সিলিস্তি রহমান নামে শাহীনের বান্ধবীর বাইরে থেকে পলিথিন ও ব্লিচিং পাউডার নিয়ে আসার দৃশ্যও সিসি ক্যামেরার ফুটেজে আছে।
এমপি আনারকে হত্যার জন্য পাঁচ কোটি টাকা দিতে চেয়েছিলেন আক্তারুজ্জামান শাহীন। হত্যাকাণ্ডের আগে তাকে কিছু টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি টাকা দেওয়ার কথা ছিল হত্যার পর। তাদের মিশন সফল হওয়ার পর আনারের মরদেহের টুকরাগুলো গুম করতে সিয়াম ও জিহাদ নামের দুজনকে দায়িত্ব দিয়ে ঢাকায় চলে আসেন আমান। ঢাকায় এসে দেখা করেন আক্তারুজ্জামান শাহীনের সঙ্গে। তবে শাহীন পরবর্তী সময়ে তাকে কত টাকা দিয়েছেন সেটা জানা যায়নি।
এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ওয়ারী বিভাগ। তারা হলেন- হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া চরমপন্থি দল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আমানউল্লাহ আমান, মোস্তাফিজ ও ফয়সাল।
এদিকে আনোয়ারুল আজীম আনার ভারতে খুন হওয়ার ঘটনায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা হয়েছে। মামলা নম্বর ৪২। গত বুধবার সন্ধ্যায় মামলার এজাহার দায়ের করেন তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন।
শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মু. আহাদ আলী বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এমপি আনোয়ারুল আজীম আনারের মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় কোনো আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। সবাইকে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এখন তদন্ত করে আসামিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
‘এই ফোনটি যার, সে পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যান, অন্যথায় লাশও পাবেন না’—ফোনের ওপার থেকে আসা একটি কথাই স্তব্ধ করে দিয়েছিল পুরো পরিবারকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান মোহাম্মদপুরের তরুণ শিক্ষার্থী মাহামুদুর রহমান সৈকত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন শহীদ সৈকতের বোন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনি এই জবানবন্দি দেন। এদিন প্রসিকিউশনের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আব্দুল্লাহ্। তিনি বলেন, এ মামলার ২৮ আসামির মধ্যে জাহাঙ্গীর কবির নানক, শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৪ জন পলাতক। চার আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। সাক্ষী সাবরিনা সেবন্তী মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চেয়েছে। আমরাও ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায় বিচার ও আসামিদের সবোচ্চ শাস্তি চাই ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ আসামির বিরুদ্ধে করা মামলায় সাবরিনা আক্তার সেবন্তী ৯ নাম্বার সাক্ষী হিসেবে এ জবানবন্দি দেন। সাক্ষ্যগ্রহনের এক পর্যায়ে ভাই হত্যার বিচার চেয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সেবন্তী বলেন, আমার ভাই শহীদ মাহামুদুর রহমান সৈকতসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনি ও নির্দেশদাতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।
জবানবন্দিতে সেবন্তী জানান, ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তন্নীর ওপর ছাত্রলীগের নৃশংস হামলার ছবি ফেসবুকে দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন সৈকত। ছাত্রদের যৌক্তিক দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে মায়ের বারণ সত্ত্বেও তিনি আন্দোলনে যোগ দেন। সেদিন বিকেলে মোহাম্মদপুর এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডারদের দফায় দফায় গুলির মুখে পড়ে মাকে ফোন করে ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ রাখতে বলেন তিনি। রাতে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সৈকত আরও আবেগাপ্লুত ও সংকল্পবদ্ধ হয়ে পড়েন।
পরের দিন ১৯ জুলাই জুমার নামাজ শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে নূরজাহান রোডের দক্ষিণ মাথায় আন্দোলনে যোগ দিতে যান সৈকত। বিকেল ৩টা ২৬ মিনিটে বোনের সঙ্গে শেষবার কথা হয় তার। সৈকত জানিয়েছিলেন, তিনি দ্রুতই বাসায় ফিরবেন। কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরই তার নম্বরে বাবার ফোন রিসিভ করেন এক সহযোদ্ধা এবং সৈকতের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর দেন।
পরবর্তীতে স্বজনরা শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে মর্গের সামনে স্ট্রেচারে সৈকতের নিথর, রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। ঘাতকের বুলেট তার মাথার বাম কানের ওপর দিয়ে ঢুকে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিল।
সেবন্তী জানান, পরবর্তীতে বিষয়টি আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শুনে দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা করি। আমি হাসপাতালে যাওয়ার পথে অনেক জায়গায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে পুলিশকে গুলি করতে দেখি। হাসপাতালে গিয়ে আমি মর্গের ভেতরে আমার ভাইয়ের লাশ দেখতে পাই এবং তার পাশেই শহীদ রাজুর মরদেহসহ আরো ৫টি লাশ দেখতে পাই। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন দেখতে পাই। শহীদ রাজু ছিলো মোহাম্মদপুরের একজন আন্দোনলকারী। রাত ৯টার দিকে মোহাম্মদপুরের মারকাজুল ইসলামে লাশ গোসল করিয়ে লাশ সেখানেই রেখে দেই। আমার ফুফাত ভাই জানায় আমার বাসার নিচে পুলিশ ও ছাত্রলীগ, যুবলীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা অবস্থান করছিলো। রাতে কারফিউ জারী হয়। পরের দিন বেলা ১১ টায় কারফিউ শিথিল থাকায় লাশ বাসায় নিয়ে আসি। অতপর মোহাম্মদপুর জামে মসজিদ কবরস্থানে দাফন করি। তৎকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো ডেথ সার্টিফিকেট না দিলেও গণঅভ্যুত্থানের পর স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর প্রাপ্ত মৃত্যু সনদে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘গানশট’ (গুলির আঘাত) উল্লেখ করা হয়।
জবানবন্দিতে সেবন্তী এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সরাসরি দায়ী করেন। তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়াদ্দার, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশানুল হক সৈকত, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ বজলুর রহমান, জাহাঙ্গীর কবির নানকের এপিএস বিপ্লবসহ হামলায় জড়িত ক্যাডারদের নাম উল্লেখ করেন।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের দাবি প্রসিকিউশনের: গত দেড় দশকের শতাধিক গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনীত প্রতিটি অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ মামলার ১৫তম তথা সর্বশেষ সাক্ষী হিসেবে আংশিক সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। আগামী রোববার তার সাক্ষ্যের বাকি অংশ গ্রহণ করা হবে। তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য শেষ হলে প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম সমাপ্ত হবে। এরপর আসামি পক্ষ সাফাই সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ পাবে এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হবে।
আদালতের কার্যক্রম শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রসিকিউটর তামিম জানান, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়াসহ মোট ১৫ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাবেক সেনাপ্রধান তার জবানবন্দিতে তুলে ধরেন—কীভাবে একজন সেনা কর্মকর্তা থেকে জিয়াউল আহসান তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতায় রাখার উদ্দেশ্যে একটি অপরাধী চক্র গড়ে তুলেছিলেন এবং র্যাব কীভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল।
তিনি আরও জানান, র্যাবে কর্মরত থাকাকালে সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে কীভাবে তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো, সে বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, প্রত্যক্ষদর্শী ও র্যাবের সাবেক কর্মকর্তারা আদালতে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। এমনকি সুন্দরবনে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহৃত ট্রলারের মাঝিরাও ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিয়েছেন। এসব সাক্ষ্য ও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে প্রসিকিউশন তাদের প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছে বলে দাবি করেন তিনি।
আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের পর এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত তাদের ফেসবুক আইডি ও ইমেইল অ্যাকাউন্ট বিভিন্ন আইপি থেকে সক্রিয় (লগইন) ছিল বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ডার্ক ওয়েবের ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (ওএসআইএনটি) বিশ্লেষণে এ ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট নিশ্চিত করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে নিহতদের ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংরক্ষিত তথ্য এবং লগইন হিস্ট্রি পেতে গুগল ও ইয়াহু কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউটর ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা।
তানভীর হাসান জোহা জানান, তদন্ত প্রক্রিয়ায় সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির ব্যবহৃত দুটি ইমেইল অ্যাড্রেস শনাক্ত করা হয়েছে। ডার্ক ওয়েব ও ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গেছে, মৃত্যুর পরও এক থেকে দেড় মাস তাদের আইডিগুলোতে একাধিকবার লগইন করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে মেহেরুন রুনির ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললে তিনিও নিশ্চিত করেন যে, তাদের মৃত্যুর পরও আইডিগুলো অনলাইনে সক্রিয় (লাইভ) দেখা যেত।
মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান (গোলাম নওশের রোমান) সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পর শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেছিলেন। তিনি বলেন, সাগর-রুনির হত্যার পরেও তিনি তাদের ফেসবুক আইডি সক্রিয় থাকতে দেখেছেন। এমনকি তার নিকটস্থ আরও লোকেরাও ফেসবুক এ্যাকাউন্ট অ্যাক্টিভ দেখেছেন। বিষয়টি নওশের মামলার তখনকার তদন্ত কর্মকর্ত ও আইনশৃক্ষলা বাহিনীকে জানালেও তারা কোনো কিছুই বলেনি। তিনি আরও বলেন, তখন তো এতো কিছু বুঝতাম না। কিন্তু এখন প্রসিকিউটর জোহা এটি দেখভাল করছে। আশাকরি শিগগিরই সব রহস্য বের হয়ে আসবে।
এ বিষয়ে প্রসিকিউটর তানভীর জোহা আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডকে নিছক চুরি বলে যে বয়ান দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কোনো ডিভাইস চুরি হলে সাধারণত তা বিক্রি করে দেওয়া হয় বা ফ্ল্যাশ করা হয়। কিন্তু পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত ডিভাইসের নিরাপত্তা ভেঙে হত্যাকাণ্ডের পর কারও আইডিতে লগইন করে বসে থাকা কোনো সাধারণ চুরির ঘটনা হতে পারে না।
তিনি জানান, আইনি কাঠামোর আওতায় ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা, গুগল ও ইয়াহুর কাছে লগইন হিস্ট্রি, ব্যবহৃত আইপি ঠিকানা এবং মুছে ফেলা বার্তা সংরক্ষণের তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের পুরোনো তথ্য হওয়ায় গুগল ও ইয়াহুর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট মামলার রেফারেন্স ও আদালতের আনুষ্ঠানিক আদেশ (কোর্ট অর্ডার) চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমাদের তদন্ত চলমান রয়েছে।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের ছেলে সৈয়দ সোহানুর রহমান সিয়ামের রায়ের তারিখ আগামী ১৫ অক্টোবর নির্ধারণ করেছেন আদালত।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক বি. এম. তারিকুল কবীর দুদক ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের এ তারিখ নির্ধারণ করেন।
দুদকের প্রসিকিউটর দেলোয়ার জাহান রুমী বলেন, সিয়ামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তিনি আশা করেন, আদালত আসামিকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সাজা দেবেন।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, দুদক সিয়ামের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। মামলায় সিয়ামের নামে যেসব সম্পদের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটি দুদক প্রমাণ করতে পারেনি বলেও দাবি করেন তিনি। আদালতের কাছে সিয়ামের খালাস প্রত্যাশা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।
দুদক সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি সিয়ামের বিরুদ্ধে মামলা করেন সংস্থাটির উপসহকারী পরিচালক জাকির হোসেন। মামলায় ২০২১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়।
মামলাটির তদন্ত শেষে একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর সিয়ামকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন দুদকের উপসহকারী পরিচালক জাকির হোসেন। তদন্তে সিয়ামের জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৩১ লাখ ৮১ হাজার টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা জানায় দুদক।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মামলায় দুদকের ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। এর আগে গত ১৭ জুন সিয়ামের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আলোচিত সাবেক পিএসসি চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী জীবনের ছেলে সিয়ামকে গত ২০ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে দুদক। এখন দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আগামী ১৫ অক্টোবর এ মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন আদালত।
নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলা পরিষদ চত্বরে কোরবানির পশুর হাটের ইজারা (ডাক) কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও মোটরসাইকেল ভাঙচুরের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর ২৫ নেতাকর্মীকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে আসামিরা নেত্রকোণার সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে হাইকোর্ট থেকে পাওয়া তাদের অন্তর্বর্তীকালীন জামিনও বাতিল করা হয়। কারাগারে পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে পূর্বধলা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির জয়নাল আবেদীন রয়েছেন।
মামলার নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ মে পূর্বধলা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে কোরবানির পশুর হাট ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। ইজারার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ওইদিন স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রথমে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষের সময় উপজেলা পরিষদ চত্বরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়।
ঘটনার জেরে ২৫ মে আগিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সহসভাপতি ওমর শরীফ বাদী হয়ে পূর্বধলা থানায় মামলা করেন। মামলায় পূর্বধলা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির জয়নাল আবেদীনসহ ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে আসামি করা হয়।
মামলার পর অভিযুক্ত জামায়াত নেতাকর্মীরা উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নেন। ওই জামিনের আওতায় তারা এতদিন গ্রেপ্তার এড়িয়ে ছিলেন। পরে জামিনের মেয়াদ শেষ হলে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বুধবার তারা নেত্রকোণার সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে হাজির হন।
এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আবেদন নাকচ করে দেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন জামিন বাতিল করে ২৫ নেতাকর্মীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
মামলায় মোট ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও বুধবার আদালতের আদেশে ২৫ জন নেতাকর্মী কারাগারে গেলেন। মামলার পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম আদালতের নিয়ম অনুযায়ী চলবে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন বাদীপক্ষ। এই মামলায় তার প্রথম স্ত্রীকে জামিন দেওয়া হয়েছে।
এ সময় আদালতে বাদী উল্লেখ করেন, ‘আমরা আপস করে নিয়েছি আসামি জামিন পেলে কোনো আপত্তি নাই।’এর আগে এ মামলায় দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) গাজী নজরুল ইসলামের জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) সেফাতুল্লাহর আদালতে মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ঢাকা মহানগর পিপি ফারুক হোসেন ফারুকী।
এর আগে দুই দফা রিমান্ড শেষে গাজী নজরুল কারাগারে যাওয়ার দুই দিনের মাথায় বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করলেন বাদীপক্ষ। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেফাতুল্লাহর আদালতে এ আবেদন করা হয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের আবেদনের বিষয়ে আদালতের আদেশ ও পরবর্তী কার্যক্রমের ওপরই এখন নির্ভর করছে মামলাটির পরবর্তী গতিপথ।
চিত্রনায়ক সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। ফলে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য আগামী ৫ নভেম্বর নতুন দিন ধার্য করেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল না করায়, বিচারক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন।
রমনা থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন শাখার কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক শাহ আলম বাসসকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে, গত বছরের ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করেন সালমানশাহের মামা মোহাম্মদ আলমগীর। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন সালমানশাহের স্ত্রী সামীরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ (১৭)। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাত আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমানশাহের মৃত্যুর পর, রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়।
তবে গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর সালমান শাহের মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বোনের স্বামী কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরানশাহনিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন যে সালমান ঘুমাচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে জানান, সালমানের কিছু হয়েছে। তখন দ্রুত তারা বাসায় ফিরে দেখেন যে সালমান শয়নকক্ষে নিথর পড়ে আছেন এবং কয়েকজন বহিরাগত নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।
সালমানের মা চিৎকার করে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করেন। পথে তারা সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখতে পান।
তারা সালমানশাহকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, সালমানশাহ অনেক আগেই মারা গেছেন।
মোহাম্মদ আলমগীর এজাহারে আরও জানান, সালমানের পিতা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী তার মৃত্যুর আগে ছেলের মৃত্যুকে হত্যা বলে সন্দেহ করে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি দরখাস্ত দাখিল করেন। এতে তিনি রমনা থানার অপমৃত্যু মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানান।
সালমানের পিতার মৃত্যুর পর তিনি তার বোনের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন।
মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ মৃত্যুবরণ করে থাকলে, প্রমাণ সাপেক্ষে তারা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন। এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত পলাতক আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে সালমানশাহকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার মামলায় সাবেক ডিআইজি হুমায়ুন কবিরের জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক নির্দেশ ও প্রভাবেই তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ ওই হত্যাকাণ্ড ঘটান। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত সংস্থায় দেওয়া হুমায়ুন কবিরের জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। একই দিন মামলায় ২৩তম সাক্ষী হিসেবে তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়।
মামলার চার আসামি হলেন সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, তৎকালীন এসপি এ কে এম এহসানউল্লাহ এবং উজিরপুর থানার সাবেক দুই সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন। হাসানাত আবদুল্লাহ ও এহসানউল্লাহ পলাতক। গ্রেপ্তার দুই পুলিশ সদস্যকে মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়ায় ফলবাহী একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় ঢাকা ও কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং উপজেলা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে। গ্রেপ্তার কার্যক্রম তৎকালীন এসপি এহসানউল্লাহর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক ২টা ১৫ মিনিটে আগৈলঝাড়া এলাকায় তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়।
সাবেক ডিআইজি হুমায়ুন কবির জানান, ঘটনার পর আগৈলঝাড়া থানার তৎকালীন ওসি মনিরুল ইসলামকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তিনি। ওসি তাকে বলেন, আটক দুই ব্যক্তিকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন এসপি এহসানউল্লাহ। আগৈলঝাড়া থানার পুলিশ সদস্যরা তাতে রাজি না হওয়ায় উজিরপুর থানা থেকে পুলিশ সদস্য এনে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়। পরে এসপি থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) নোট দেওয়ার নির্দেশ দেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জবানবন্দিতে হুমায়ুন কবির বলেন, হত্যাকাণ্ড ও এহসানউল্লাহর আচরণের বিষয়ে ২০১৫ সালে তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে (এসিআর) বিরূপ মন্তব্য লিখে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠান তিনি। পরে এহসানউল্লাহকে বরিশাল থেকে মাগুরায় বদলি করা হয়।
তবে হাসানাত আবদুল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে এহসানউল্লাহ ওই বিরূপ মন্তব্য সত্ত্বেও অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান এবং পরে আবার বরিশাল রেঞ্জে পদায়ন পান বলে দাবি করেন হুমায়ুন কবির। তার অভিযোগ, হাসানাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক প্রভাবই এহসানউল্লাহকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সাহস জুগিয়েছিল।
মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লাকে দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেন হাসানাত আবদুল্লাহ। তার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রে ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে গৌরনদী–গোপালগঞ্জ মহাসড়কের আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের বড় সেতুর পশ্চিম পাশে পুলিশ সদস্যদের দিয়ে ওই দুই নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
রাজধানীর একটি মন্দিরে গত ১০ জুলাই অনুষ্ঠিত কথিত ‘ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে’কে কেন্দ্র করে অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার ও মিথ্যা পরিচয়ের অভিযোগে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে অভিযোগগুলো তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আহসান ও অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল।
রিটে বলা হয়, গত ১০ জুলাই ওই মন্দিরে তাসনুভা আনান শিশিরকে ‘কনে’ হিসেবে উপস্থাপন করে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনাটি বাংলাদেশের প্রথম ‘ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে’ হিসেবে প্রচারিত হয়।
রিট আবেদনকারীর অভিযোগ, অনুষ্ঠানে ‘শিশির বিশ্বাস’ নামে যে জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, সেটির প্রকৃত মালিক মো. জাহিদুল ইসলাম নামে একজন ব্যক্তি। অন্যের এনআইডি নম্বর ব্যবহার করে নাম, ছবি, বাবা-মায়ের নাম ও জন্ম তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘শিশির বিশ্বাস’ নামে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে বলেও রিটে দাবি করা হয়েছে।
রিটে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠিতে বাংলাদেশে লিঙ্গ পরিবর্তনের বৈধতা দেওয়ার মতো কোনো আইন বা বিধান নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এ সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এবং চকবাজার থানার ওসিকে বিবাদী করা হয়েছে।
গত ৩০ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান রিটটি করেন। এর আগে ২৪ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ‘ডিমান্ড অব জাস্টিস’ নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার অভিযোগে পরে হাইকোর্টে রিট করা হয়।
রিটে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০২৩-এর ২৩ ও ২৭ ধারা, দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৯৬ ধারাসহ সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধানের উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প থেকে ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক সামরিক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান শুভ্র তাঁর নামে এ নোটিশ জারি করেন। আগামী ৭ অক্টোবর সকাল ১০টায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে মামলার বিষয়ে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ এ তথ্য জানিয়েছেন।
দুদক সূত্র জানায়, তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ঠিকানায় গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। সেখানে তাঁর অধীনস্থ কাউকেও পাওয়া যায়নি। পরে সাইদুল ইসলাম নামের এক নিরাপত্তাকর্মীর উপস্থিতিতে সোমবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে তাঁর ঠিকানায় নোটিশটি সাঁটিয়ে দেওয়া হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ১৯ ধারা এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬০ ধারায় মামলার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য ‘শ্রবণ ও গ্রহণের’ জন্য নোটিশটি দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল সম্প্রসারণ প্রকল্প থেকে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। দুদকের করা মামলায় এ অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২১ হাজার কোটি টাকা করা হয়। প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে ক্রয়সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া এবং স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানকে সাব-কন্ট্রাক্টর হিসেবে যুক্ত করার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি তিনটি বিমানবন্দরের চারটি উন্নয়ন প্রকল্পে মোট ৮১২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তারিক আহমেদ সিদ্দিকসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে চারটি পৃথক মামলা করে দুদক। এর মধ্যে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প থেকে ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের মামলাটিও রয়েছে।
দুদকের মামলার তথ্য অনুযায়ী, শাহজালাল বিমানবন্দরের যোগাযোগ, নেভিগেশন ও নজরদারি ব্যবস্থাপনা এবং রাডার স্থাপন প্রকল্পে প্রায় ২০০ কোটি টাকা, তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে ২৫০ কোটি টাকা, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ প্রকল্পে ২১২ কোটি টাকা এবং কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ও রানওয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের মামলায় তারিক আহমেদ সিদ্দিক ছাড়াও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মহিবুল হক, বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট আরও কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।
তারিক আহমেদ সিদ্দিক ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিরুদ্ধে করা এসব মামলার অভিযোগ আদালতে এখনো প্রমাণিত হয়নি; দুদকের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান।
গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়া রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’কে (৩০) দুই দিনেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় সোমবার রাতে গাজীপুর মহানগরের কোনাবাড়ী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। মামলায় একমাত্র আসামি করা হয়েছে রাজাকে।
কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইফতেখার হোসেন মঙ্গলবার মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, পলাতক রাজাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ ও কারাগার সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিতে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ৩০ আসামিকে ঢাকার মেট্রোপলিটন আদালতে নেওয়া হয়। আদালতের কার্যক্রম শেষে বিকেলে তাঁদের প্রিজন ভ্যানে করে কাশিমপুর কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল।
রাত সাড়ে আটটার দিকে প্রিজন ভ্যানটি গাজীপুর মহানগরের বাইমাইল এলাকায় পৌঁছালে রাজা শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। একপর্যায়ে দায়িত্বে থাকা একজন উপপরিদর্শক (এসআই) তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে শৌচাগারে যাওয়ার সুযোগ দেন। তখন দৌড়ে পালিয়ে যান তিনি। পরে বাকি ২৯ আসামিকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর রাজাকে ধরতে অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে দুই দিন পার হলেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এদিকে পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে কমিটির সদস্যসংখ্যা তিন ও পাঁচ বলা হয়েছে; পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা ঢাকার মোহাম্মদপুরের মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে পুলিশের কাছে পরিচিত। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার কথা বলা হয়েছে। গত ১৯ মে তাঁকে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, রাজা, তাঁর স্ত্রী ও শ্যালক নেপাল থেকে দেশে ফেরার খবর পেয়ে বিমানবন্দরে অবস্থান নেয় পুলিশ। পরে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাঁদের হেফাজতে নেওয়া হয়।
এরপর তাঁকে একটি বিস্ফোরক মামলায় কারাগারে রাখা হয়েছিল বলে কারা ও পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের হেফাজত থেকে আসামি পালানোর ঘটনায় কোনাবাড়ী থানায় দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ। পলাতক রাজাকে গ্রেপ্তারে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে থানা পুলিশ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সংবাদ সম্মেলনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার করা রিট আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি এস কে তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই নির্দেশ প্রদান করেন। আদালত জানান, বিষয়টি বিস্তারিত শুনানির দাবি রাখে, তাই চলমান বার্ষিক অবকাশ শেষে নিয়মিত বেঞ্চে এর শুনানি হতে পারে।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী জহিরুল ইসলাম মুসা জানান, সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান অবকাশকালীন ছুটি শেষ হলে তারা আবেদনটি নিয়মিত বেঞ্চে পুনরায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া সুপ্রিম কোর্টের এই ছুটি শেষ হবে আগামী ২৫ অক্টোবর।
এর আগে শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসাইন তারেক রিট আবেদনটির সরাসরি বিরোধিতা করে বলেন, দুদকের সংবাদ সম্মেলন চ্যালেঞ্জ করে এমন আবেদন আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দায়ের করা এই রিট আবেদনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দাবি জানান, চলমান কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত ঘিরে দুদক যেন ভবিষ্যতে আর কোনো সংবাদ সম্মেলন না করে। আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এ ধরনের সংবাদ প্রকাশ সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা ব্যক্তির সুনাম ও মর্যাদার সুরক্ষা ব্যাহত করে এবং প্রচলিত ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এতে দুদকের উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়।
আইনজীবী জানান, গত ২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দুদক থেকে দুটি সংবাদ সম্মেলন করে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানানো হয়। তার দাবি, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আসিফ মাহমুদ এর ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলেই রিটটি করা হয়েছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে মানুষের জীবন যেমন সহজ ও গতিশীল হয়েছে, তেমনি বেড়েছে সাইবার অপরাধের ঝুঁকিও। ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং, পরিচয় জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইল, ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডারে অননুমোদিত প্রবেশ—নানা ধরনের অপরাধ এখন ডিজিটাল পরিসরে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। একই সঙ্গে অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স, মোবাইল আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারের কারণে নিরাপদ সাইবার পরিবেশের প্রয়োজনও আগের চেয়ে অনেক বেশি।
এসব অপরাধ প্রতিরোধ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে একটি কার্যকর ও যুগোপযোগী আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই প্রয়োজন থেকেই প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে কাজ চলছে। তবে সাইবার অপরাধ দমনের পাশাপাশি সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আইনটি কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক হবে না। অংশীজনদের মতামত ও সুপারিশ নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পরই খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। ফলে নতুন আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় শুধু অপরাধ দমন নয়, নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ এবং নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
অপরাধ দমনে প্রস্তাবিত বিধান: প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ডিজিটাল মানহানির জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। নারী বা শিশুর ক্ষেত্রে শাস্তি দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে। ‘অপমান’, বুলিং, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল ও অশ্লীল কনটেন্টকেও শাস্তির আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া গুজব ও ফেক নিউজ ছড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়ায় গুজবকে ভিত্তিহীন বা যাচাই না করা এমন তথ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার কথা বলা হয়েছে, যা বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। ভুয়া খবর বলতে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি বা প্রচার করা মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্যকে বোঝানোর কথা বলা হয়েছে।
কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লকের ক্ষেত্রেও সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়সহ অনুমোদিত সংস্থা বা বাহিনীকে কনটেন্ট ব্লকের অনুরোধ করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কোনো অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা থাকলেও কনটেন্ট ব্লকের সুযোগ রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
অংশীজনের মতামতকে গুরুত্ব: খসড়ার বিভিন্ন বিধান নিয়ে নাগরিক সমাজ, অধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞরা মতামত দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ ও ‘মানহানিকর’সহ বিভিন্ন শব্দের সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথা এসেছে। কনটেন্ট অপসারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, স্বাধীন নজরদারি, নোটিশ ও আপিলের সুযোগ রাখার বিষয়েও মতামত দিয়েছেন অংশীজনরা।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর টিআইবি, ARTICLE 19, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সংগঠন এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বাধীন নজরদারি, নোটিশ ও আপিলের কার্যকর সুযোগ এবং অর্থবহ অংশীজন পরামর্শের ওপর গুরুত্ব দেয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা এবং মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার—এই তিনটি জটিল বিষয়কে একই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার মতে, গুজব, অপতথ্য, হেয়প্রতিপন্ন ও মানহানিকরসহ কয়েকটি ধারণার সংজ্ঞা এমনভাবে দেওয়া হয়েছে, যাতে অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ থাকে।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের গঠন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত কাঠামোতে সরকারের প্রভাব বেশি থাকলে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক নজরদারি দুর্বল হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে খসড়াটি নতুন করে সাজানোর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
আইন প্রণয়নে তাড়াহুড়ো নয়: ARTICLE 19-এর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম সাইবার আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিষয়গুলো আলাদাভাবে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর টিআইবি ও ARTICLE 19-সহ ১৯টি সংগঠনের যৌথ বিবৃতিতেও বলা হয়, মানহানি, ‘ম্যালাইনিং’, গুজব ও অপতথ্যের মতো অপরাধের সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট না হলে প্রয়োগে অসঙ্গতি তৈরি হতে পারে। এসব বিষয়ে স্বাধীন বিচারিক যাচাই এবং কার্যকর প্রক্রিয়াগত সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা বলেছে।
গণমাধ্যমের সুরক্ষায় নতুন প্রস্তাব: সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে গণমাধ্যমের অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের দ্বিতীয় দফা পরামর্শ সভায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।
দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘সংশোধনী ছাড়া আইনটি পাস হলে বাংলাদেশ ‘‘বৃহৎ কারাগারে’’ পরিণত হতে পারে। তিনি গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে অপপ্রয়োগ ঠেকাতে সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয় দেখার জন্য কমিশনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।’
দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘প্রস্তাবিত খসড়ায় বর্তমান গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের যথাযথ প্রতিফলন নেই। তার মতে, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর বাস্তব প্রয়োগের দিকটিও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে।’ তিনি সাংবাদিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পর্যালোচনা কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যা সরকার গ্রহণ করেছে।
মাহফুজ আনাম গণমাধ্যমের জন্য পৃথক সাইবার আইন অথবা অন্তত এমন পৃথক বিধিমালা ও নির্দেশিকার কথাও বলেছেন, যা সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ করবে; কিন্তু সাংবাদিকতা, বাকস্বাধীনতা ও প্রকাশনার স্বাধীনতায় বাধা তৈরি করবে না। তার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে দুটি বিশেষজ্ঞ দলের সমন্বয়—একটি সাইবার অপরাধ নিয়ে এবং অন্যটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কাজ করবে।
সাংবাদিক গ্রেপ্তারে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব: গণমাধ্যমের সুরক্ষায় সভায় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রস্তাব এসেছে—কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া বা তাকে গ্রেপ্তারের আগে আদালতের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সরকার এ প্রস্তাবকে যুক্তিযুক্ত মনে করছে। অংশীজনদের আনুষ্ঠানিক সুপারিশ পাওয়ার পর বিষয়টি বিলে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে মামলা ও আপিল নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের কথাও জানানো হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, ‘গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে না এবং কোনো সাংবাদিক যেন আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হন, সেটিই সরকারের লক্ষ্য। অংশীজনদের মতামত নিয়েই আইনটি চূড়ান্ত করা হবে’ বলেও জানান তিনি।
মোবাইল কোর্ট নিয়েও আলোচনা: গণমাধ্যমের অংশীজনদের সাম্প্রতিক সভায় সাইবার আইনের কিছু অপরাধ মোবাইল কোর্টে বিচারের সুযোগ রাখার প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে মতপ্রকাশ বা কনটেন্টসংক্রান্ত অভিযোগে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ন্যায্যবিচার ও বিচারিক সুরক্ষার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এদিকে সাইবার অপরাধের প্রকৃতি এবং সংবাদমাধ্যমের পেশাগত স্বাধীনতা—দুটি বিষয় একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ কাঠামোয় দেখলে আইনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ কারণেই খসড়া চূড়ান্ত করার আগে বিভিন্ন পক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
সামনে সংশোধিত খসড়া: সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাংবাদিক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এ প্রক্রিয়ার ফোকাল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সম্পাদক পরিষদ, অ্যাটকো এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কমিটি গঠন ও বৈঠকের ব্যবস্থা করা হবে।
অংশীজনদের কাছ থেকে সুপারিশ নেওয়ার পর খসড়াটি আবারও জনসাধারণের মতামতের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশের কথা জানিয়েছে সরকার। এরপর প্রয়োজনীয় সংশোধন, আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যালোচনা ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর বিলটি সংসদে উত্থাপনের প্রক্রিয়া এগোবে।
সাইবার অপরাধের বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর আইন প্রয়োজন—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বড় ধরনের মতভেদ নেই। অনলাইন প্রতারণা, পরিচয় চুরি, সাইবার হয়রানি, শিশু যৌন নির্যাতন, সেক্সটর্শন, ব্ল্যাকমেইল, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সাইবার হামলা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আইনটির আওতা যেন জনস্বার্থের সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সরকারের সমালোচনা, তথ্য যাচাই, মতামত বা বৈধ অনলাইন বক্তব্যকে অযথা অপরাধের ঝুঁকিতে না ফেলে, সে বিষয়েও বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যমসংশ্লিষ্টরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
আলোচিত ইসলামিক বক্তা ও ‘৩১৩ প্রোপার্টিজ’-এর চেয়ারম্যান মাওলানা হাবিবুর রহমান মিসবাহ যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় দায়ের করা মামলায় শর্তসাপেক্ষে জামিন পেয়েছেন। তাঁর পঞ্চম স্ত্রী মোসা. হুমায়রা জান্নাতের দায়ের করা মামলায় আদালতের সমন পেয়ে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করলে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আগামী ধার্য তারিখ পর্যন্ত আপসের শর্তে তাঁর জামিন মঞ্জুর করা হয়। বিষয়টি সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) নিশ্চিত করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট এবিএম ইবরাহিম খলিল।
আইনজীবী ইবরাহিম খলিল বলেন, যৌতুক মামলায় সোমবার সমনের জন্য দিন ধার্য ছিল। এদিন আসামি হাবিবুর রহমান মিসবাহ আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিন আবেদন করেন। শুনানিতে বাদীপক্ষের পক্ষ থেকে মিসবাহ একাধিক বিয়ে করেছেন বলে আদালতকে জানানো হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবীর দাবি, শুনানিতে তারা মিসবাহর ১০টি বিয়ের তথ্য পেয়েছেন বলে আদালতকে জানিয়েছেন। এসব বিয়ের মধ্যে কয়েকটির কাবিননামা বা অন্যান্য প্রমাণ তাঁদের কাছে রয়েছে। তবে কাবিননামা, পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র মিসবাহ নিজের কাছে রেখেছেন বলে বাদীপক্ষ অভিযোগ করেছে।
আইনজীবীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিসবাহর স্ত্রীদের মধ্যে মরিয়ম, গাজীপুরের কাপাসিয়ার এক নারী, আসমা, তানিয়া, নায়মা জান্নাত, মেহের আফরিন, আদিবা, বুশরা, আয়েশা আক্তার ও সাবিফুন্নাহারের নাম রয়েছে। তবে এসব তথ্যের বিষয়ে আদালতে কী প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তা পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়ার বিষয়।
ইবরাহিম খলিলের দাবি, শুনানির সময় মিসবাহ আদালতে দুটি বিয়ের কথা স্বীকার করেছেন। এর মধ্যে প্রথম স্ত্রী মরিয়ম এবং বর্তমান বাদী নায়মা জান্নাতের কথা তিনি স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, আদালত বাদীপক্ষের বক্তব্য রেকর্ড করেছেন। স্বীকৃত দুই বিয়ের বাইরে অন্য কোনো বিয়ের কাবিননামা বা প্রাসঙ্গিক নথি পরবর্তীতে আদালতে দাখিল করা সম্ভব হলে, সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব শর্তের পাশাপাশি আপসের সুযোগ রেখে মিসবাহকে আগামী ধার্য তারিখ পর্যন্ত জামিন দেওয়া হয়েছে।
অন্য বিয়ের কাবিননামা পাওয়া না গেলে কীভাবে তা প্রমাণ করা হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবী বলেন, প্রয়োজনে আদালতের কাছে তদন্তের আবেদন করা হবে। নাম-ঠিকানা দিয়ে তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নারী মিসবাহর স্ত্রী কি না, তা যাচাইয়ের আবেদন করা যেতে পারে।
বিদেশি নাগরিককে বিয়ের বিষয়ে ইবরাহিম খলিল বলেন, বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করার ক্ষেত্রে আইনগত বিষয় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিয়ে বৈধভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটি প্রমাণের বিষয়। কাবিন ও নিবন্ধন ছাড়া বিয়ের দাবি করা হলে তা আইনগতভাবে যাচাই প্রয়োজন।
বাদীর নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতকে জানানো হয়েছে। বাদীর নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া হলে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ফেসবুকে পরিচয়ের পর ২০২০ সালে হুমায়রা জান্নাতকে বিয়ে করেন হাবিবুর রহমান মিসবাহ। পরে ২০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি, নির্যাতন এবং একাধিক বিয়ের তথ্য গোপনের অভিযোগ এনে তিনি যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারায় আদালতে সি.আর. মামলা করেন।
গত ২০ আগস্ট আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে মিসবাহর বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। মামলার নালিশি অভিযোগে হুমায়রা জান্নাত দাবি করেন, বিয়ের সময় মিসবাহ তাঁর আগের বিয়ের তথ্য গোপন করেছিলেন। বাদীপক্ষের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তীতে মিসবাহর একাধিক বিয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তারা আদালতে দাবি করেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।