আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন নির্মূলে জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত ন্যায়বিচার করা হবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আজ রোববার একথা বলেন।
অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার প্রধান আসামি শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করা হবে। জুলাইয়ের গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত ন্যায়বিচার করা হবে। গণহত্যায় জড়িত কোনো তথ্য-প্রমাণ কারো কাছে থাকলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় জমা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
দ্রুত ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে বিচারিক কার্যক্রম শুরুর আহ্বান জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, সৎ দক্ষ ও সাহসী বিচারক নিয়োগ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। কোর্টের বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলে শেখ হাসিনাসহ যারা সম্ভাব্য আসামি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া হবে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সম্ভাব্য প্রধান অপরাধী দেশ থেকে পালিয়েছেন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া; সেটা আমরা শুরু করবো। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অপরাধী প্রত্যার্পণ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে ২০১৩ সালে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে এ চুক্তিটি হয়েছিলো। তিনি যেহেতু বাংলাদেশে গণহত্যার প্রধান আসামি হবেন মনে করি। বা অধিকাংশ মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। সতুরাং এ প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে তাকে আইনগতভাবে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করবো।
নিজের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এভিডেন্স কালেক্ট করা। অপরাধটা গোটা বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সব জায়গায় একইসেঙ্গ সংঘঠিত হয়েছে। প্রত্যেকটা জায়গায় একটা কমন ইনস্ট্রাকশন ছিলো গুলি করে সব মেরে ফেলা। এ অপরাধের যে আলামতগুলো সেগুলো সংগ্রহ করে কম্পাইল করা এটা একটা চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আসামিরা এখনো পলাতক প্রধান আসামি দেশত্যাগ করেছেন। অনেকে দেশত্যাগের চেষ্টায় আছেন। তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা।
গণহত্যার আলামতের বিষয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রথম প্রায়োরিটি হচ্ছে, যেহেতু ঘটনাগুলো তাজা, এ মামলায় যারা আসামি হবেন তারা এখনো বাংলাদেশে আছেন। অনেকে দায়িত্বেও আছেন। তারা এ আলামতগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবেন। তাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব এ আলমতগুলো দ্রুত সংরক্ষণ করা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এগুলো সংগ্রহ করা। প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার হাতে নিয়ে আসা। যেন এ আলামতগুলো আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে পারি। চিফ প্রসিকিউটর সব ধরণের আলামত তদন্ত সংস্থা বা প্রসিকিউশনের কাছে পৌঁছানোর জন্য ছাত্র-জনতাসহ ভুক্তভোগীদের প্রতি আহ্বান জানান।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম আরও বলেন, এটা এমন একটা বিচার হবে যে, বিচারের পরে শহীদ পরিবার, ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার, বাদীপক্ষসহ আসামিপক্ষও মনে করবে তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করা হয়েছে। আসামিদের প্রতি জুলুম করা হবে না আবার ছাড়ও দেয়া হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, এ অপরাধগুলোর মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে তদন্ত কালে আসামিদের গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন হবে। নিশ্চয়ই আমরা অপরাধীদের গ্রেপ্তার চাইবো। আমাদের প্রথম চেষ্টা থাকবে যরা সম্ভাব্য অপরাধী তারা যাতে আদালতের জুরিসডিকশনের বাইরে চলে যেতে না পারেন। সেটা ঠেকানোর চেষ্টা থাকবে।
আইন সংশোধনের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা মাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা সরকারের সঙ্গে বসে এগুলো নিয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিবো।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে সংঘটিত অভ্যুত্থানে পদত্যাগ করে গত ৫ আগস্ট দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এরপর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণ করে।
বৈষম্যবিরোধী টানা ৩৬ দিনের আন্দোলন নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলীয় ক্যাডারদের হামলায় সরকারি হিসেবেই ৮০০ লোক নিহত হয়েছে। এ সংখ্যা আরও বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। গুলিতে আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে বহু মানুষ। এখনো চিকিৎসাধীন কয়েক হাজার মানুষ। এ গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হবে। ইতোমধ্যে প্রসিকিউশন টিম নিয়োগ দেওয়া হয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় প্রধান সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী এবং উত্তরাঞ্চলের প্রধান সংগঠক সারজিস আলমসহ দলটির শীর্ষ ১০ নেতার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও মালামাল ছিনতাইয়ের অভিযোগে হবিগঞ্জে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন রুকন এই মামলার আবেদন করেন। মামলাটিতে ১০ জন নামীয় আসামির পাশাপাশি আরও ৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও শোকসভায় অংশ নিতে গত ২৮ জুলাই বিকেলে হবিগঞ্জ পৌরসভার কোর্ট মসজিদ এলাকায় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সমবেত হন। অভিযোগ করা হয়েছে যে, সেই সময় নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী ও সারজিস আলমের নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। হামলায় জেলা ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতা গুরুতর জখম হন এবং তাদের কাছ থেকে দামী পাঁচটি আইফোন, একটি স্যামসাং মোবাইল ও নগদ ৫০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
এদিকে, আলোচিত এই সংঘর্ষের ঘটনায় এনসিপি এর আগে ভিন্ন দাবি করেছিল। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাই ওইদিন তাদের মিছিলে হামলা করেছিল, যাতে সারজিস আলমসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। তাদের দাবি অনুযায়ী, হামলায় এক কর্মীর চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে এবং গণমাধ্যমের কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। ওই সময় নিরাপত্তার খাতিরে এনসিপি নেতারা পাশের একটি ভবনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল হক এই আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দিবাগত রাতে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। এ নিয়ে ছাত্রদলের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারাও মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও জীবদ্দশায় তা ভোগ-দখলের অধিকার বাবা-মায়ের হাতে রাখার বিধান যুক্ত করে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’ সংশোধনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এমন তথ্য জানান।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত এই আইনি পরিবর্তনের ফলে আদালতে দেওয়ানি বা সিভিল মামলার সংখ্যা অনেকটাই কমে আসবে, যার বড় অংশই মূলত সম্পত্তির বণ্টন ও হিসাব-নিকাশ নিয়ে তৈরি হয়।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের মুসলিম আইনে হেবা হয়, হিন্দু আইনে উইল হচ্ছে, আবার আমাদের মুসলিম আইনে ওয়াসিয়তনামা হচ্ছে।
বিদ্যমান হেবা ব্যবস্থার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বাবা-মা যদি হেবা করে দেন, সাথে সাথে তাদের হাত থেকে সম্পত্তি চলে যাচ্ছে। তারা নিজেদের সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং পরবর্তী সময়ে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ছেলে-মেয়ে যদি তাদের না দেখে, তাহলে কিন্তু বাবা-মার আর কিছু করার থাকে না, তারা অসহায় হয়ে পড়ছেন।
আইনমন্ত্রী উল্লেখ করেন, হেবার পাশাপাশি ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট’-এ (সম্পত্তি হস্তান্তর আইন) গিফটের একটা ধারা রয়েছে, যেখানে সাধারণভাবেই হেবার বাইরে গিয়ে যে কেউ গিফট করতে পারেন। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ১৯৬৩ সালের পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের আলোকে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ‘ইউসুফ্রাক্ট রাইট’ বা জীবনস্বত্বের বিধান যুক্ত করার চিন্তাভাবনা করছে সরকার।
প্রস্তাবিত এই নিয়ম অনুযায়ী, সন্তানকে সম্পত্তি গিফট করার পরও বাবা-মা তাদের জীবদ্দশায় সেটি ভোগদখল করার অধিকার নিজের কাছে রেখে দিতে পারবেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাবা-মায়ের জীবনদশায় দুই পক্ষের সম্মতি ছাড়া কেউই ওই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে না। সন্তান যেমন বিক্রি করতে পারবে না, তেমনি বাবা বা মা চাইলেও এককভাবে বিক্রি করতে পারবেন না।
তবে বিশেষ প্রয়োজনে ছাড়ের বিধান থাকছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে বাবার চিকিৎসার দরকার এবং এই সম্পত্তি বিক্রি ছাড়া চিকিৎসা সম্ভব নয়, কিন্তু সন্তান বিক্রিতে সম্মতি দিচ্ছে না, সেক্ষেত্রে জেলা জজকে একটা ক্ষমতা দেওয়া থাকছে। জেলা জজে আবেদন করা হলে তিনি বিষয়টি বিবেচনা করতে পারবেন।
এই সংশোধনের ফলে ভবিষ্যতে সিভিল মামলা ফাইলিং কমে আসবে এবং অনেক পারিবারিক সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, আমরা কাজ করতে চাই, আমরা পরিবর্তন করতে চাই জনগণের কল্যাণে। জনগণের কল্যাণে পরিবর্তন করতে আমাদের যেখানে যেভাবে সম্ভব আমরা করব।
প্রসঙ্গক্রমে আইনমন্ত্রী জানান, বাগেরহাটে কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে ওঠা গুমের (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে সরকার।
সুপ্রিম কোর্টে রাষ্ট্রের পক্ষে আইনগত বিষয় পরিচালনা করার জন্য নতুন করে মোট ২৬৫ জন আইনজীবীকে আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটার অনুবিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত এই আইন কর্মকর্তাদের মধ্যে ৮৬ জনকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১৭৯ জনকে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে জারি করা প্রজ্ঞাপনে পূর্বে দেওয়া সব ধরনের অ্যাটর্নি জেনারেলের নিয়োগ আদেশ বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তাঁর মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসানকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (২৯ জুলাই) জামালপুরের সরিষাবাড়ী আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান মামলার দুই আসামিকে আদালতে উপস্থিত হতে এই আদেশ জারি করেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, সংসদ সদস্য ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি ফেসবুক ও ইউটিউব টকশোতে তারেক রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন ডা. মুরাদ হাসান।
অসৎ উদ্দেশ্যে দেওয়া সেই বক্তব্যে তাঁদের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার মতো ভাবমূর্তি ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে—এমন দাবি করে জামালপুর জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সহসভাপতি লায়ন রুমেল সরকার বাদী হয়ে সরিষাবাড়ী আমলি আদালতে মামলাটি দায়ের করেন। এতে ডা. মুরাদ হাসানের পাশাপাশি ওই টকশোর উপস্থাপক মহি উদ্দিন হেলাল নাহিদকেও আসামি করা হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মনিরুজ্জামান জানান, মামলাটি আমলে নিয়ে আদালত পূর্বে আসামিদের বিরুদ্ধে সমন এবং পরবর্তীতে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। তবে আসামিরা আদালতে উপস্থিত না হয়ে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকায় এবার পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাঁদের হাজিরের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এই বিজ্ঞপ্তির পরও আসামিরা অনুপস্থিত থাকলে তাঁদের বিচারকাজ তাঁদের অবর্তমানেই সম্পন্ন করা হবে বলে জানান তিনি।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, দেওয়ানি মামলার জট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (জেএটিআই) ‘দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব নিরসন: বাংলাদেশ ও জাপানের যৌথ অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী আজ এসব কথা বলেন।
আইন ও বিচার বিভাগ এবং জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর যৌথ উদ্যোগে সেমিনারটির আয়োজন করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার জট নিরসনে সরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, দক্ষ ও জনবান্ধব করতে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মামলার জট কমানো এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এখনো এমন বহু দেওয়ানি মামলা রয়েছে, যেগুলো অনেক পুরনো। দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন এসব মামলা বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। এ বাস্তবতা থেকে উত্তরণে সরকার বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিনির্ভর বিচারসেবা চালু এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও গতিশীল করতে বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
তিনি বলেন, জাপানের বিচার মন্ত্রণালয় ও জাইকাসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিভাগের উপমহাপরিচালক কাজুনোরি নোসে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপানের সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আশ্বাস দেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইন ও বিচার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব সৈয়দ মো. শাফায়েত এবং জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়ের অধ্যাপক ওয়াকাযোনো রেই। তারা বাংলাদেশ ও জাপানের দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন এবং মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ, তা নিরসনের কৌশল, বিচারপ্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং দ্রুত নিষ্পত্তির বিভিন্ন কার্যকর উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. খাদেমউল কায়েস সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন। সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, সেমিনারে আলোচিত অভিজ্ঞতা, সুপারিশ ও মতামত পর্যালোচনা করে দেওয়ানি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
সেমিনারে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, আইন মন্ত্রণালয়, জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। তারা দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্বের কারণ, সম্ভাব্য সমাধান এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেন।
হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে রাজধানীর খিলগাঁও ও মুগদা থানার দুই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ পূর্বের রুল নিষ্পত্তি করে এই জামিন আদেশ দেন। আদালতে ব্যারিস্টার সুমনের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী এম লিটন আহমেদ। তিনি জানান, খিলগাঁও থানার হত্যা মামলা এবং মুগদা থানার হত্যাচেষ্টা মামলায় রুল অ্যাবসুলেট করে তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর রাতে রাজধানীর মিরপুর-৬ এলাকা থেকে ব্যারিস্টার সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের মাত্র কিছুক্ষণ আগে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি পুলিশের সঙ্গে যাচ্ছি। দেখা হবে আদালতে। দোয়া করবেন সবাই।
পরবর্তীতে রাজধানীর বিভিন্ন থানা ছাড়াও হবিগঞ্জে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়।
শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীকে।
বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, রাজধানীর গুলশান থেকে সাবেক বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে, বুধবার সকালে ঢাকার শাহবাগ থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আদালতে হাজিরা দেন সাবেক এই মন্ত্রী। পরে আদালত প্রাঙ্গণে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি ১০ নম্বর আসামি হিসেবে রয়েছেন। এ মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করলে আগামী সপ্তাহে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে আত্মসমর্পণ করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। গত সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।
আলোচিত এ মামলায় মোট ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন- শেখ হাসিনা, ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শামসুল হক টুকু, হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, মাহবুবউল আলম হানিফ, হাসান মাহমুদ চৌধুরী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মৃনাল কান্তি দাশ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডা. দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওমর ফারুক চৌধুরী, সালাউদ্দিন মাহমুদ ও ডা. ইমরান এইচ সরকার।
এছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন- শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা, হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ, মোখলেসুর রহমান, জেনারেল আজিজ আহমেদ, জিয়াউল আহসান, মজিবুর রহমান, আব্দুল জলিল মন্ডল, শেখ মো. মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মনিরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মুহা. আশরাফুজ্জামান, এস এম মেহেদী হাসান, হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এস এম শিবলী নোমান ও বি এম ফরমান আলী।
এ মামলায় বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন ৯ জন আসামি। তারা হলেন- সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহিদুল হক, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, সাংবাদিক ফারজানা রুপা এবং মোজাম্মেল বাবু।
রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির নামে এক ব্যক্তিকে হত্যাচেষ্টা মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছে পুলিশ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন সংঘটিত এই ঘটনার প্রেক্ষিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক মো. আবু সাঈদ গত ২৮ জুলাই এই আবেদনটি করেন। বুধবার দুপুরে ঢাকার মহানগর প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালত এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামীকাল বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতে জমা দেওয়া ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হাজতি আসামি কলিমউল্লাহ এই মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত আছে মর্মে যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে তিনি জেল হাজতে আটক থাকায় তাকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো প্রয়োজন। মামলাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে, তদন্তকার্য সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কলিমউল্লাহকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।’ উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলায় সে সময় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল এবং বর্তমানেও তিনি কারান্তরীণ রয়েছেন।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় গত ১৯ জুলাই বিকেলে উত্তরা পশ্চিম থানার রবীন্দ্র সরণি এলাকায় অবস্থানকালে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি ছাত্র-জনতার ওপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। সেই হামলায় মুস্তাঈন বিল্লাহ সাব্বির নামে এক যুবক বাম হাতের কনুইতে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে তাকে উত্তরা হাইকেয়ার জেনারেল হাসপাতাল এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ওই ঘটনার পর ভুক্তভোগী বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় এই হত্যাচেষ্টা মামলাটি দায়ের করেন। বর্তমানে এই মামলার অধিকতর তদন্তের স্বার্থেই সাবেক এই উপাচার্যকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেছে পুলিশ।
সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তিকে শ্যোন অ্যারেস্ট, গ্রেপ্তার বা অন্য কোনো উপায়ে হয়রানি না করার জন্য হাইকোর্টের দেওয়া আদেশটি স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে এই সংক্রান্ত হাইকোর্টের রুলটি আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বুধবার রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এই সিদ্ধান্ত জানান। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের জানান, হাইকোর্টের আদেশটি আপিল বিভাগ স্থগিত করেছেন। এর আইনগত অর্থ হলো, যদি কোনো ব্যক্তির নাম মামলার এজাহারে সরাসরি উল্লেখ নাও থাকে, তবুও তদন্ত চলাকালীন যদি তদন্তকারী কর্মকর্তা ওই ব্যক্তির কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পান, তবে আইনত তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করার সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ তদন্তের স্বার্থে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কাউকে গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষেত্রে এখন আর কোনো আইনি বাধা রইল না।
এর আগে হাইকোর্ট এক আদেশে জানিয়েছিল যে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা নেই, তাদের ক্ষেত্রে শ্যোন অ্যারেস্ট বা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে কোনো ধরনের হয়রানি করা যাবে না। কয়েকজন ব্যক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছিল কেন আবেদনকারীদের বারবার শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো এবং মিথ্যা মামলায় জড়ানোর পদক্ষেপকে বেআইনি ঘোষণা করা হবে না। হাইকোর্টের সেই আদেশগুলো চ্যালেঞ্জ করেই আপিল বিভাগে আবেদন করেছিল রাষ্ট্রপক্ষ, যার ফলশ্রুতিতে আজ এই স্থগিতাদেশ প্রদান করা হলো।
পুলিশের ওপর হামলার একটি মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদা চৌধুরীর আদালতে হাজিরা দেন আইভী। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন।
আদালতের কার্যক্রম শেষে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সংক্ষেপে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, নির্দোষ হয়েও আজ আমি অপরাধী। সারাজীবন অন্যায়, হত্যা, অত্যাচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে কথা বলেছি; অথচ আজ আমাকেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। তবে আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ আছেন এবং আমার নারায়ণগঞ্জবাসী আছে—একদিন সত্য প্রতিষ্ঠিত হবেই এবং বিচার অবশ্যই পাওয়া যাবে। এই বক্তব্য দিয়ে তিনি দ্রুত গাড়িতে উঠে দেওভোগে নিজ বাসভবনের উদ্দেশে রওনা হন।
আইভীর আদালতে আগমনকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে তার বিপুল সংখ্যক সমর্থক ও নেতাকর্মী উপস্থিত হন। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল এবং পুরো এলাকার নিরাপত্তা জোরদার রাখা হয়।
আইভীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন জানান, গত বছর আইভীকে গ্রেপ্তারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িবহরে হামলার অভিযোগে সদর মডেল থানায় দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের দিন ধার্য ছিল মঙ্গলবার। এ মামলায় তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজিরা দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ৯ মে একটি হত্যা মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগের নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটির’ থেকে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাকে হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসংক্রান্ত মোট ১২টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দীর্ঘ ৩৯১ দিন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের ৪ জুন উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
সম্পদ বিবরণী দাখিল না করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এস কে) সুরকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-২ এর বিচারক আয়েশা নাসরিন এই রায় ঘোষণা করেন। দুদকের প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ সাজার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়েছিল এবং পরে সাজা পরোয়ানাসহ তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, এস কে সুরের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকায় তার এবং তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও আয়ের উৎসের বিবরণী চেয়ে নোটিশ দিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি নিজ স্বাক্ষরে সম্পদ বিবরণী ফরম গ্রহণ করলেও নির্দিষ্ট ২১ কার্যদিবসের মধ্যে তা দাখিল করেননি। এই আইন লঙ্ঘনের দায়ে ওই বছরের ২৩ ডিসেম্বর দুদকের উপপরিচালক নাজমুল হুসাইন বাদী হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ২৬(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করেন।
পরবর্তীতে তদন্ত শেষে গত বছরের ২৫ আগস্ট তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় এবং ৬ নভেম্বর আদালত অভিযোগ গঠন করেন। বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন আদালত সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। গত ১৫ জুলাই উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেছিলেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং এরপর থেকে তিনি কারান্তরীণ রয়েছেন।
এনআরবি ব্যাংকের ঋণ খেলাপির পৃথক দুই মামলায় করোনা ভুয়া রিপোর্ট কেলেঙ্কারির রিজেন্ট হাসপাতালে চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন আদালত। সোমবার অর্থঋণ চতুর্থ আদালতের বিচারক মো. মোশাররফ হোসেন তাকে গ্রেপ্তারের এ আদেশ দিয়েছেন।
মামলা সূত্রে জানা গেছে, এনআরবি ব্যাংক থেকে সাহেদ পৃথকভাবে ৫ লাখ ৫৫ হাজার এবং ১ কোটি ৫১ লাখ ৮১ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করে খেলাপি হন সাহেদ।
সাহেদের আইনজীবী দবির উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘মামলা দু’টিতে জামিন আবেদন করি। তবে আসামি সাহেদ ঋণের টাকার ২৫ শতাংশ জমা দিতে না পারায় আদালত তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেন। আমরা এখন আপিল করব।’
শেয়ারবাজারে কারসাজি, অর্থ পাচার ও প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ক্রিকেটার এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। সোমবার এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত দিন থাকলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তা দাখিল করতে পারেনি। এর প্রেক্ষিতে ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবির প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন এই তারিখ ধার্য করেন।
আদালতের এই কার্যক্রমের বিষয়ে দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মামলায় সাকিব আল হাসান ছাড়াও সমবায় অধিদপ্তরের উপনিবন্ধক আবুল খায়ের, তার স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসান এবং আরও ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে নিজেদের বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সিরিজ ট্রানজেকশন ও প্রতারণামূলক ট্রেডিংয়ের আশ্রয় নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেন। এই কারসাজির ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হন এবং আসামিরা অবৈধভাবে ২৫৬ কোটি ৯৭ লাখ ৭০ হাজার ৩০৪ টাকা আত্মসাৎ করেন, যা আইনি ভাষায় ‘অপরাধলব্ধ অর্থ’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত। তদন্তে প্রধান আসামি আবুল খায়েরের ১৭টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৫৪২ কোটি ৩১ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০ কোটি টাকা তিনি তার স্ত্রীর সহায়তায় পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাকিব আল হাসানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বলা হয়েছে, আবুল খায়েরের মাধ্যমে কারসাজিকৃত প্যারামাউন্ট ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স ও সোনালী পেপারসের শেয়ারে তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সাকিব বাজার ম্যানিপুলেশনে সরাসরি সহায়তা প্রদান করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ২ কোটি ৯৫ লাখ ২ হাজার ৯১৫ টাকা রিয়ালাইজড ক্যাপিটাল গেইনের নামে শেয়ার বাজার থেকে আত্মসাৎ করেন। গত ১৭ মে দুদক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন।