পৃথক দুই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সাবেক সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ চার দিন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীনকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন (সিএমএম) আদালত শুক্রবার বিকেলে এ আদেশ দেন।
পুলিশ ও আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ও মকবুল নামের বিএনপির এক কর্মীকে হত্যার মামলায় সাবেক সচিব হেলালুদ্দীনকে ১০ দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। অন্যদিকে আসামিপক্ষ থেকে রিমান্ডের আবেদন বাতিল করে জামিন চেয়ে আবেদন করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত হেলালুদ্দীনকে চার দিন রিমান্ড মঞ্জুর করে। এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের খুলশী তুলাতুলী এলাকার একটি বাসা থেকে হেলালুদ্দীন আহমদকে আটক করে পুলিশ। তিনি ২০২২ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ থেকে অবসরে যান। এর আগে তিনি ইসির সচিব ছিলেন। সর্বশেষ তিনি সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য ছিলেন।
এদিকে নয়াপল্টনে যুবদল নেতা শামীম মোল্লা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীনকে। তাকে আদালতে হাজির করে এই মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে পুলিশ। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গত বছরের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির মহাসমাবেশের দিন সংঘর্ষে যুবদল নেতা শামীম মোল্লা নিহত হন। তাকে হত্যার অভিযোগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৭০৪ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন ছাত্রদলের সাবেক এক নেতা। এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে করা জরুরি।
আসামিপক্ষ থেকে রিমান্ডের আবেদন নাকচ করে জামিন আবেদন করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মোস্তফা কামাল উদ্দীনকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। মোস্তফা কামাল উদ্দীন ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম শহর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায় পুলিশ।
আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিভিন্ন মামলায় আওয়ামী লীগ আমলের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি বেশ কিছু সাবেক সরকারি কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও উপদেষ্টা কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সাবেক সচিব মো. জাহাংগীর আলম, সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব আমিনুল ইসলাম খান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব শাহ কামাল এবং সাবেক যুব ও ক্রীড়া সচিব মেজবাহ উদ্দীন আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের তিন দিনের রিমান্ড
এদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শামীম হাওলাদার নামে এক ইলেকট্রিশিয়ানকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের বিচারক এই আদেশ দেন। এর আগে দুপুরে তাকে আদালতে হাজির করে হত্যা মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত ২০ জুলাই মোহাম্মদপুর থানার বেড়িবাঁধ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শামীম হাওলাদার। তাকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামীম মারা যান। এ ঘটনায় শামীমের ফুফাতো ভাই জাকির হোসেন মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।
চাঁদা দাবি ও মানহানির অভিযোগে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ফেস দ্য পিপলের সম্পাদক ও প্রকাশক সাইফুর সাগর এবং ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টার মোহাম্মদ ইউসুফের বিরুদ্ধে ঢাকার একটি আদালতে মামলা করা হয়েছে। রোববার (৫ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবুজ্জামানের আদালতে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের পক্ষে আবু মো. কামরুজ্জামান মামলার আবেদন করেন।
বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে এ বিষয়ে আদেশ অপেক্ষমাণ রেখেছেন আদালত। পরে মামলার অভিযোগ আমলে নিয়ে পিবিআইকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে আগামী ১০ আগস্ট মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. ইমদাদুল হক লাল ও আজাদ রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন
মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, ফেস দ্য পিপলে মাস্তুল ফাউন্ডেশনসংক্রান্ত কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর আসামিরা প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে যান। সেখানে তারা ফাউন্ডেশনের পক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জন্য ১৫ হাজার টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, পরবর্তীতে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশের বিনিময়ে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করেন আসামিরা। ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ ওই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার আবেদনে আরও বলা হয়, গত ২৮ জুন ফেস দ্য পিপল অনলাইন পোর্টালে মাস্তুল ফাউন্ডেশনকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যা প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুণ্ণ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের কারণে ফাউন্ডেশনের ২০ কোটি টাকার মানহানি হয়েছে বলেও মামলার আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
জুলাই আন্দোলন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে সাংবাদিক আনিস আলমগীর ও মডেল জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহবাগ থানায় একটি আইনি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। শনিবার (৪ জুলাই) রাতে ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম’ নামক একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। শাহবাগ থানা পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, অভিযোগটি ইতিমধ্যে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিবদ্ধ করা হয়েছে এবং তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এসআই আশরাফ আলীকে। অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছেন উপস্থাপক সোমা ইসলাম, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোমিন মেহেদী, মডেল মারিয়া কিসপট্টা এবং মডেল ও অভিনেত্রী তুষ্টি।
অভিযোগকারী মিল্লাত হোসেনের দাখিলকৃত বিবরণী অনুযায়ী, সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যোগসাজশ করে "জুলাই আন্দোলনকে ব্যাহত করতে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন"। একইভাবে উপস্থাপক সোমা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, তিনি বিভিন্ন টকশোতে জুলাই আন্দোলনকে "তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা" চালিয়েছেন। অন্যদিকে, মডেল ও আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সুমনের সহযোগী হিসেবে আন্দোলনকারী ও বিপ্লবে আহতদের "কটাক্ষ করার" দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন।
মডেল ও অভিনেত্রী তুষ্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই গণঅভ্যুত্থানকে "প্রতারণার মাস" আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার চালিয়েছেন। এছাড়া মডেল মারিয়া কিসপট্টা জুলাই আন্দোলনকে "সন্ত্রাসী আন্দোলন" হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোমিন মেহেদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ঢাকা প্রেস ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনের স্মৃতিস্তম্ভে "জুতা নিক্ষেপ ও আবু সাঈদকে নিয়ে" কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। জিডি দায়ের করার সময় সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থানায় উপস্থিত ছিলেন এবং তারা এই ঘৃণ্য অপপ্রচারের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়বস্তু খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
হামের টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ তুলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলার আবেদন করা হয়েছে। রবিবার (৫ জুলাই) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে এই আবেদনটি দাখিল করেন হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারানো ৯ মাস বয়সী শিশু সাউদা নুসকানের বাবা সিরাজুল ইসলাম। মামলার আরজিতে তিনি তাঁর শিশুসন্তানের মৃত্যুকে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ হিসেবে অভিহিত করে যথাযথ আইনি প্রতিকার দাবি করেছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী তাছলিমা জাহান পপি জানিয়েছেন যে, "আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদেশ অপেক্ষমান রেখেছেন।" মামলার আবেদনপত্রে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সরকারি পর্যায়ে হামের টিকা সংগ্রহে চরম ব্যর্থতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে দেশজুড়ে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে সাউদা নুসকানসহ কয়েকশ শিশুর অকাল মৃত্যু ঘটেছে। এই ঘটনার জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরাসরি দায়ী করে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় বিচার প্রার্থনা করা হয়েছে।
মামলার আবেদনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পাশাপাশি সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগমের বিরুদ্ধেও সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ আনা হয়েছে। সিরাজুল ইসলাম তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, সময়মতো টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে তাঁর ৯ মাস বয়সী মেয়েসহ অন্য শিশুদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করলেও এই বিষয়ে পরবর্তী কোনো নির্দেশনা বা আদেশ এখনও প্রদান করেনি।
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর প্রাথমিক সম্পৃক্তকতা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) (সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন তিনি।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ওই ঘটনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ করেছিলেন হেফাজতে ইসলামের নেতা আজিজুল হক। হেফাজত নেতা জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হকের পক্ষে করা এই অভিযোগে মোট ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
এই মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, একাত্তর মিডিয়া লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রুপা।
এদিকে গত ১০ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৪ দলীয় জোটের শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রাজধানীর মহাখালীতে স্বামীকে ৬ টুকরা করে হত্যার দায়ে স্ত্রী শিল্পীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ঢাকার ১৬তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ নাজমুন নাহার নিপু এ রায় ঘোষণা করেন।
বিচারক আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি লাশ গুমের অপরাধে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন। সে অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে আরও তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামরার নথি থেকে জানা গেছে, ২০২১ সালের ৩০ মে রাত সাড়ে ১০টায় রাজধানীর মহাখালীর আমতলী এলাকায় একটি ড্রাম থেকে এক ব্যক্তির মাথাবিহীন দেহ উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। একইদিন রাত ১১টার পর মহাখালী বাস টার্মিনালের এনা কাউন্টারের কাছ থেকে একটি ব্যাগের মধ্যে উরু থেকে খণ্ডিত দুইটি পা এবং কাঁধ থেকে খণ্ডিত দুটি হাতের অংশ উদ্ধার করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশ। দুই দিনে ছয় টুকরা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নথি থেকে আরও জানা গেছে, রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগ। প্রায় ১২ ঘণ্টার অভিযান শেষে গ্রেপ্তার করা হয় ফাতেমা বেগম ওরফে শিল্পীকে। জিজ্ঞাসাবাদে শিল্পী পুলিশকে জানায়, পারিবারিক কলহ, টাকা-পয়সা বণ্টন ও একাধিক বিয়েকে কেন্দ্র করে স্বামী ময়না মিয়া ওরফে শাকিলের সঙ্গে তার মনোমালিন্য হয়। পরে শিল্পী পরিকল্পনা মাফিক তার অটোরিকশা চালক স্বামীকে ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে নিস্তেজ করেন। এক পর্যায়ে গলাকেটে হত্যা করে লাশ ছয় টুকরা করেন। লাশ টুকরার পরে একটি লাল রঙের কাপড়ের ব্যাগে মাথা, শরীরের মূল অংশকে একটি নীল রঙের পানির ড্রামে এবং খণ্ডিত দুই পা ও দুই হাতকে একটি বড় কাপড়ের ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখেন আসামি শিল্পী। এরপরে ১৩০০ টাকায় রিকশা ভাড়া করে প্রথমে আমতলী এলাকায় শরীরের মূল অংশ ফেলে দেন, পরবর্তীতে মহাখালী এনা বাস কাউন্টারের সামনে খণ্ডিত দুই হাত, দুই পা ভর্তি ব্যাগ রেখে দিয়ে চলে আসেন বাসায়। এরপর খণ্ডিত মাথা রাখা ব্যাগ নিয়ে গুলশান লেকে ফেলে দিয়ে বাসায় চলে আসেন।
এজাহারে বলা আছে, ময়না মিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রী নাসরিন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় ১ জুন এ মামলাটি করেন। গ্রেপ্তারের পর আসামি শিল্পী ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা মতে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশ পরিদর্শক কাজী শরীফুল ইসলাম ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর ফাতেমা বেগম ওরফে শিল্পীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০২৩ সালের ১২ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। মামলার বিচার চলাকালে আদালত ১৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে এ রায় ঘোষণা করেন।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় নীলফামারী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আশিকা সুলতানাকে (৪৬) কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) তিন দিনের রিমান্ড শেষে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করে পুলিশ।
এরপর মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এর আগে, গত ২৫ জুন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম এ মামলায় তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গত সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক দ্বিতীয় দফায় তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, গত ১৯ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠনের কতিপয় সদস্য পূর্বঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মিরপুর মডেল থানার মিরপুর-১ অ্যাপেক্স ভবনসংলগ্ন বাটা শো-রুমের সামনের পাকা রাস্তার ওপর জমায়েত হয়ে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করার উদ্দেশ্যে মিছিল করছিলেন। যার ফলে উপস্থিত জনগণের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়।
ঘটনার দিন মিরপুর মডেল থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও অর্থ পাচারের মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আরও ছয়জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। বুধবার (১ জুলাই) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এ তারা সাক্ষ্য দেন।
যারা সাক্ষ্য দিলেন: নারায়ণগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল হাফিজ, চাঁদপুর হাজীগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার এস এম মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁ মহাদেবপুরের সাব-রেজিস্টার মো. রফিকুল ইসলাম, ভোলা চরফ্যাশনের সাব-রেজিস্ট্রার কাওসার খান, বন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুস সালাম ও বাড্ডার সাব রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মীর আহমেদ আলী সালাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, এ মামলায় মোট ১৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলো।
বেনজীর আহমেদ পলাতক থাকায় তার পক্ষে জেরা করা হয়নি। পরে বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুন আগামী ১৬ জুলাই পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেন।
গত ১৩ মে মামলার বাদী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক হাফিজুল ইসলামের সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচারিক কাজ শুরু হয়।
এর আগে গত ৩ মে বেনজীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর এ মামলা করেন। তদন্ত শেষে একই কর্মকর্তা গত বছরের ৩০ নভেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর সম্পদ এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দেন। কিন্তু তদন্তে তার নামে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ হাজার ৯৮৭ টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার ২৬৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এতে মোট ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার সম্পদের প্রমাণ মিলেছে।
এর মধ্যে বৈধ আয়ের উৎস হিসেবে পাওয়া গেছে ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। ব্যয় বাদে নিট সঞ্চয় দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। ফলে বেনজীর আহমেদ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, এসব অর্থের অবৈধ উৎস, প্রকৃতি ও মালিকানা গোপন করে বেনজীর আহমেদ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও যৌথ মূলধনী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ, স্থানান্তর ও রূপান্তর করেছেন।
উল্লেখ্য, বেনজির আহমেদ বর্তমানে গ্রেপ্তার হয়ে দুবাইয়ের একটি কারাগারে রয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে যাত্রাবাড়ীতে খোবাইব নামে একজন নিহতের ঘটনায় করা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি কেএম জাহিদ সরওয়ার কাজল ও শেখ আবু তাহেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দিয়েছেন।
আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, মোতাহার হোসেন সাজু ও সাঈদ আহমেদ রাজা।
আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, এ মামলায় জামিন হওয়ায় সাবেক এই বিচারপতির মুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই।
এর আগে এ মামলায় গত ২১ জুন জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন বিচারিক আদালত। পরে তিনি হাইকোর্টে আবেদন করেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলন চলাকালে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গুলিতে খোবাইব (২০) নিহত হন। এ ঘটনায় তার ভাই জোবায়ের আহম্মেদ ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর যাত্রাবাড়ী থানায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮০ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে গত বছরের ২৪ জুলাই তার বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরামসহ ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আমলে নিয়ে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রথম অভিযোগ, ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও মো. ফারুককে হত্যার দায়। দ্বিতীয় অভিযোগ- তানভীর সিদ্দিকী, সায়মন ওরফে মাহিম ও হৃদয় চন্দ্রকে হত্যা। তৃতীয় অভিযোগ- জাহিদ হাসান, আবদুল কাদের, আছিয়া খাতুন, সানজিদা সুলতানা, আবদুল্লাহসহ শতাধিক ছাত্র-জনতাকে গুরুতর আহত ও পঙ্গু করার দায়।
এই মামলায় অভিযুক্ত ২২ জনের মধ্যে বর্তমানে ৫ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন চট্টগ্রাম-৬ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী, যুবলীগ নেতা আজিজুর রহমান, তৌহিদুল ইসলাম, মো. ফিরোজ ও দেবাশীষ পাল দেবু।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নওফেলসহ বাকি ১৭ আসামি পলাতক রয়েছেন। পলাতক অন্য আসামিরা হলেন—চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দীন, রেজাউল করিম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, হেলাল আকবর, নুরুল আজিম রনি, শৈবাল দাশ সুমন, আবু ছালেক, এসবারুল হক, এইচএম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, জমির উদ্দিন, ইমরান হাসান মাহমুদ, জাকারিয়া দস্তগীর, মহিউদ্দিন ফরহাদ ও সুমন দে।
এর আগে, টানা তিন কার্যদিবস শুনানি শেষে সোমবার আসামিপক্ষ তাদের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের ওপর বক্তব্য শেষ করে। আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুর রহমান দাবি করেন, এই মামলায় কারও বিরুদ্ধেই অভিযোগ গঠনের মতো কোনো উপাদান বা তথ্য-প্রমাণ নেই। একই সাথে পলাতক আসামিদেরও মামলা থেকে অব্যাহতি (ডিসচার্জ) দেওয়ার আবেদন জানান রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন, আবুল হাসান, ইশরাত জাহান ও মোহাম্মদ এনাম।
তবে প্রসিকিউশন পক্ষ গত ২২ জুন আসামিদের প্রাথমিক অপরাধ ও দায় বিবেচনা করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পক্ষে জোরালো আবেদন জানায়। তারও আগে, গত ৫ এপ্রিল প্রসিকিউশন ফরমাল চার্জ দাখিল করলে ৭ এপ্রিল ট্রাইব্যুনাল ২২ জনের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ আমলে নিয়েছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাসানুল হক ইনু আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। প্রায় ২১১ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ রায়ের বিবরণীতে আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগসমূহের সত্যতা ও সাক্ষীদের জবানবন্দি বিশদভাবে তুলে ধরা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে এই রায় প্রদান করা হলো। মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাউ’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের "বিএনপি-জামায়াত ও সন্ত্রাসী-জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের উসকানি দেন"। এছাড়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪ দলীয় জোটের সভায় অংশ নিয়ে তিনি "নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে দমনে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা কার্যকরেও ভূমিকা রাখেন"। কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে ফোনে নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সেখানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। তাঁর নির্দেশনার ফলে পুলিশ ও জোটের সশস্ত্র কর্মীদের গুলিতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জুলাই আন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ, মারণাস্ত্রের ব্যবহার এবং কারফিউ জারির মাধ্যমে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রতিটি ক্ষেত্রে হাসানুল হক ইনু উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি কেবল হত্যাযজ্ঞের উসকানিই দেননি, বরং ২৯ জুলাইয়ের এক সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের প্রস্তাব দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নৃশংসতাকে কৌশলে বৈধতা প্রদানের চেষ্টা করেন। এমনকি সরকার পতনের পূর্বদিন ৪ আগস্টেও তিনি শেখ হাসিনার গৃহীত দমনমূলক পদক্ষেপসমূহ অনুমোদন করেছিলেন। ট্রাইব্যুনালের এই পুরো বিচারিক কার্যক্রম রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
এই মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষী ইনুর বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন এবং আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। গত ১৪ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছিলেন। অবশেষে মঙ্গলবার চূড়ান্ত এই দণ্ডাদেশের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার সম্পন্ন হলো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৪ আসন থেকে বেসরকারিভাবে জয়ী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার (৩০ জুন) এই আদেশ প্রদান করেন। আদালতের এই রায়ের ফলে উক্ত আসনের নির্বাচনী ফলাফল আর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা যাবে না।
এর আগে গত ১৫ জুন দীর্ঘ শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৩০ জুন দিন ধার্য করেছিলেন আপিল বিভাগ। ঋণখেলাপির গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানির শেষ দিনে আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষিত হয়েছিল। কমিশনের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে তা খারিজ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আনোয়ার সিদ্দিকী হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বহালের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। আদালতের ওই আদেশের ফলে আসলাম চৌধুরী নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও শর্ত দেওয়া হয় যে, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত থাকবে এবং তা প্রকাশ করা যাবে না। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসলাম চৌধুরী জয়লাভ করলেও আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ফলাফল ঝুলে ছিল।
আদালতে আসলাম চৌধুরীর পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে আইনি লড়াইয়ে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির, যাদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী।
সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান ও তার স্ত্রী সৈয়দা রোকেয়া বেগমের আয়কর নথি জব্দের আদেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত। সোমবার (২৯ জুন) দুদকের পৃথক দু’টি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক শাহজাহান কবির এ আদেশ দিয়েছেন।
শাজাহান খানের ব্যাপারে আবেদনে বলা হয়েছে, আসামি শাজাহান খান পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসৎ উদ্দেশ্যে অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ১১ কোটি ৩৬ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিকানা অর্জনপূর্বক ভোগদখলে রেখে অপরাধমূলক অসদাচরণ এবং ৯টি ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক ৮৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা লেনদেন করে মানিলন্ডারিং করেছেন। সংশ্লিষ্ট অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। শাজাহান খান একজন আয়করদাতা।
আবেদনে আরো বলা হয়, আয়কর আইন, ২০২৩ (২০২৩ সালের ১২ নম্বর আইন) এর ৩০৯(৩)ক ধারায় আয়কর রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করতে আদালতের আদেশ প্রয়োজন মর্মে উল্লেখ রয়েছে। উক্ত আইনের নির্দেশনা মোতাবেক আসামি শাজাহান খানের আয়কর রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্রের মূলকপি জব্দ এবং মামলার তদন্তকালে পর্যালোচনার নিমিত্ত সত্যায়িত ছায়ালিপি সরবরাহের আদেশ একান্ত প্রয়োজন।
সৈয়দা রোকেয়া বেগমের ব্যাপারে আবেদনে বলা হয়েছে, আসামি সৈয়দা রোকেয়া বেগম এবং তার স্বামী সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে অসৎ উদ্দেশ্যে নিজ স্বার্থে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য তার স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ উপায়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জনপূর্বক ভোগদখলে রাখার দায়ে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা দায়ের করেন।
তদন্তকালে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র ও তথ্যাদি পর্যালোচনায় দেখা যায়, আসামি সৈয়দা রোকেয়া বেগম একজন আয়করদাতা। আয়কর আইন, ২০২৩ (২০২৩ সালের ১২ নম্বর আইন) এর ৩০৯(৩)ক ধারায় আয়কর রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করতে আদালতের আদেশ প্রয়োজন মর্মে উল্লেখ রয়েছে। উক্ত আইনের নির্দেশনা মোতাবেক সৈয়দা রোকেয়া বেগমের আয়কর রিটার্ন ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্রের মূলকপি জব্দ ও মামলার তদন্তকালে পর্যালোচনার নিমিত্ত সত্যায়িত ছায়ালিপি সরবরাহের আদেশ একান্ত প্রয়োজন।
মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা সীমিত করা সংক্রান্ত শ্রম আইনের দুটি ধারা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না-জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
রুলে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা সীমিত করাসংক্রান্ত শ্রম আইনের ৪৬(১) ও ৪৬(২) ধারা এবং তৃতীয় অথবা পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা সীমিত করাসংক্রান্ত বাংলাদেশ সার্ভিস রুলসের (বিএসআর) ১৯৭(১) ও (১এ) বিধি কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।
এ সংক্রান্ত রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সোমবার (২৯ জুন) পৃথক এ রুল জারি করেন। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন সচিব, জনপ্রশাসন সচিব, নারী ও শিশুবিষয়ক সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব, স্বাস্থ্যসচিবসহ ১৩ জন বিবাদীকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন তানজিলা রহমান, মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান ও ইফাত হাসান শাম্মি।
এর আগে গত ১৫ জুন কর্মজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনস্বার্থমূলক এ রিটটি দায়ের করা হয়। রিট আবেদনকারীর তথ্য অনুসারে, ১৯৭ বিধি অনুযায়ী প্রসূতি ছুটি একজন নারী কর্মচারী পুরো চাকরিজীবনে দুবারের বেশি পাবেন না। আর শ্রম আইনের ৪৬(১) ধারা অনুযায়ী কোনো নারী কর্মী কোনো প্রতিষ্ঠানে অন্যূন ছয় মাস চাকরি না করলে তিনি প্রসূতি ছুটি পাবেন না। ৪৬(২) ধারা অনুসারে, প্রসবের সময় দুই বা ততোধিক সন্তান জীবিত থাকলে ছয় মাসের বেশি চাকরি করলেও নারী কর্মী প্রসূতি ছুটি পাবেন না। এসব বিধি ও ধারা চ্যালেঞ্জ করেই রিটটি করা হয়।
রিট আবেদনে আরও বলা হয়, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুবিধা কোনো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নয়; এটি মা ও নবজাতকের মৌলিক স্বাস্থ্য, মর্যাদা, সমতা এবং সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত।
তৃতীয় বা পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে এই অধিকার থেকে একজন কর্মজীবী নারীকে বঞ্চিত করা বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানপরিপন্থি। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন নীতিমালা বিদ্যমান থাকায় কর্মজীবী নারীদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে, যা সমতা ও আইনের সমান সুরক্ষার নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।