বিএনপিকর্মী মকবুলকে হত্যার অভিযোগে পল্টন মডেল থানার মামলায় সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মেহেরা মাহবুবের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্টন মডেল থানার এসআই নাজমুল হাচান আসামিকে আদালত হাজির করেন। এ সময় তার ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। আসামি পক্ষের আইনজীবী আবু সুফিয়ান রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে শুনানি করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করে জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে ৫ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী জামিনের বিরোধিতা করে বলেন, তিনি শেখ হাসিনা সরকারের সচিব ছিলেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে ক্ষমতায় থাকতে তিনি সহযোগিতা করেছেন। তার প্রতি খুশি হয়ে শেখ হাসিনা তাকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন। তিনি মন্ত্রী থাকাকালে রাম রাজত্ব কায়েম করেছেন। অবৈধভাবে প্লট বরাদ্দ দিয়ে তিনি হাজার হাজার কোটি আত্মসাৎ করে তা পাচার করেছেন।
এ সময় আসামিপক্ষে তার আইনজীবী বলেন, ‘মোকতাদির কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন। তিনি ফ্যাসিস্টের কোনো সহযোগিতা করেননি। তিনি অবৈধভাবে কাজে জড়িত না। এ হত্যার সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। অসুস্থ বিবেচনায় তার এ মামলায় জামিন প্রার্থনা করছি।’ পরে শুনানি শেষে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে পাঁচ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন।
এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিএনপি ২০২২ সালের ১০ ডিসেম্বর এক দফা দাবি আদায়ের কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর আগে ৭ ডিসেম্বর ডিবি পুলিশের হারুন অর রশীদ, মেহেদী হাসান ও বিপ্লব কুমার বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে অভিযান চালায়। কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। কার্যালয়ের পাশে থাকা হাজার হাজার নেতা-কর্মীর ওপর হামলা চালায়। এতে মকবুল হোসেন নামে এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
এ ঘটনায় মাহফুজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৫৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। উবায়দুল মোকতাদির এ মামলার ৩৫নং এজাহারনামীয় আসামি।
রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যাবতীয় সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত রিট আবেদন উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। রবিবার বিচারপতি জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে এ খারিজাদেশ প্রদান করেন ।
শুনানিতে আওয়ামীপন্থি আইনজীবী হিসেবে পরিচিত নূরনবী বুলবুল আদালতে দাবি করেন, রিটকারী মো. আল আমিনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা নেই, ফলে দলটির পক্ষ হয়ে এ ধরনের রিট আবেদন করার কোনো আইনগত অধিকার বা এখতিয়ার তাঁর থাকতে পারে না। শুনানিকালে রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ইউনূস আলী এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা মো. আল আমিনের পক্ষে এই রিট পিটিশনটি দায়ের করা হয়েছিল।
রিট আবেদনে ২০২৫ সালের ১২ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনটি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে আদালত থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত ওই আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার আবেদন করা হয়। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং এর সকল অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় সভা-সমাবেশ, মিছিল, প্রকাশনা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত ঘোষণা করে পূর্ববর্তী প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়েছিল।
কোনো শিক্ষকের কাছ থেকে জোরপূর্বক বা চাপের মুখে আদায় করা পদত্যাগপত্রের কোনো ধরনের আইনি ভিত্তি নেই বলে যুগান্তকারী এক রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষককে অনতিবিলম্বে সসম্মানে স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রায়ে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, আদালতের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কোনো প্রকার অনীহা দেখালে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া, পর্ষদের সভাপতিকে পদ থেকে অপসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করার মতো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ‘গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষক মো. আলকাছ উদ্দিন আহমেদকে বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে এই রায় দেন উচ্চ আদালত। বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল নিষ্পত্তি করে এ আদেশ দেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতির লিখিত রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। আদালতে রিটকারী শিক্ষকের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী মো. জহুরুল ইসলাম মুকুল ও মানবেন্দ্র রায়, অন্যদিকে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এস এম রেজাউল ইসলাম।
নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট একদল বহিরাগত গোলাম নবী মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলকাছ উদ্দিন আহমেদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোরপূর্বক তাঁর কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়। ঘটনার পরদিনই তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন এবং উপজেলা প্রশাসন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরবর্তীতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে শিক্ষা বোর্ড তাঁকে স্বপদে বহালের নির্দেশ দিলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়। বোর্ডের সেই আদেশ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখে ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করলে আদালত প্রাথমিক রুল জারির পাশাপাশি ওই পদত্যাগপত্রের কার্যকারিতা স্থগিত করেন।
রায়ের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, রিটকারীর দেওয়া পদত্যাগপত্রটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ছিল না এবং দেশের প্রচলিত আইন কোনো ধরনের জবরদস্তিমূলক পদত্যাগকে সমর্থন করে না। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা (এমপিও) পাওয়ায় তাঁকে দায়িত্ব পালনে বহাল রাখতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আইনিভাবে বাধ্য ছিল। আদালত আরও অভিমত দেন যে, ম্যানেজিং কমিটির যেকোনো শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা বা বাতিলের সংবিধিবদ্ধ ক্ষমতা শিক্ষা বোর্ডের রয়েছে এবং বোর্ডের বৈধ নির্দেশনা অমান্য করা চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। অতএব, অবিলম্বে এই শিক্ষককে পদে পুনর্বহাল করতে হবে; অন্যথায় শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও মাউশির মহাপরিচালককে নির্দেশনা লঙ্ঘনকারী পরিচালনা পর্ষদ বাতিল, সভাপতিকে বরখাস্ত এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমপিও বাতিলের আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হলো।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকার আয়কর পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী তিন বছরের মধ্যে এই সমুদয় অর্থ পরিশোধ সম্পন্ন করতে হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ সংক্রান্ত পূর্বে জারি করা রুল খারিজ করে এই রায় দেন। আদালতে ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আইনি শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম।
আদালতের এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা এর বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করবো।’
নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ৪ অক্টোবর বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ গ্রামীণ কল্যাণের কর পরিশোধসংক্রান্ত আগের রায় স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করেন। পরবর্তীতে মামলাটির নথি প্রধান বিচারপতির নিকট পাঠানো হলে তিনি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নতুন বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন। ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তিতে এনবিআরের কর দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে পৃথক দুটি রিট আবেদন করা হয়েছিল। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে তখন রুল জারি করা হলেও নতুন হাইকোর্ট বেঞ্চ তা খারিজ করে দেওয়ায় এনবিআরের এই অর্থ আদায়ে আর কোনো আইনি বাধা রইল না।
দেশের মহাসড়কগুলোতে স্লিপার বাস নামানোর অনুমতি চেয়ে পরিবহন মালিক সমিতির করা আবেদনে সাড়া দেননি উচ্চ আদালত। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া এই ধরনের বাস চলাচলের কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন আদালত। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. রাফিউল ইসলাম। আইনি যুক্তি ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরে পরবর্তীতে তিনি বলেন, "স্লিপার বাস মালিক অ্যাসোসিয়েশন একটি অ্যাপ্লিকেশন দিয়েছিল, তারা স্লিপার বাস সড়কে চালাতে চায়। আমি আদালতে বলেছি, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮—এর ধারা হলো ৪০-এ। ৪০-এ বলে দেওয়া আছে টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন। যদি টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন কেউ ভায়োলেশন করে, তাহলে সেটা ৮০-সেকশন ৮৪ দ্বারা এগুলো অফেন্স। এবং পানিশেবল অফেন্স, এর সর্বোচ্চ শাস্তি হলো ৩ বছর এবং ৩ লাখ টাকা জরিমানা। এছাড়া সেকশন ২৮, সড়ক পরিবহন আইন, সেখানে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া আছে—রুট পারমিট ছাড়া কোনো গাড়ি রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না।"
আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়ে আইনজীবী আরও বলেন, "আদালত বলেছেন, শুধুমাত্র বিআরটিএ যেসব বাস চলাচলে পারমিশন দিয়েছে সেগুলো রাস্তায় চলাচল করবে। আর স্লিপার বাস চালানোর তো পারমিশন নাই। হাইকোর্টও পারমিশন দেয়নি।"
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় শিক্ষার্থী নাইম হাওলাদার (১৭) হত্যা এবং অপর শিক্ষার্থী তারেক চৌকিদারকে হত্যাচেষ্টার মামলায় সাবেক চিফ হুইপ ও পটুয়াখালী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আ স ম ফিরোজকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছেন আদালত। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হকের আদালত এ নির্দেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ডেমরা জোনের সাব-ইনস্পেক্টর নাজিম উদ্দিন ফকির এই আসামিকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর আবেদন জানান। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ীর উত্তর কুতুবখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সম্মুখে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার ওপর দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়। সেই সময় প্রতিপক্ষের গুলিতে বাম কাঁধে মারাত্মকভাবে বিদ্ধ হন শিক্ষার্থী নাইম। সংকটজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
একই সময়ে যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিজ বাসার ছাদে গুলিবিদ্ধ হন তারেক চৌকিদার নামের আরেক শিক্ষার্থী। ওই সহিংসতা ও হামলার ঘটনায় সাবেক এই চিফ হুইপের প্রত্যক্ষ মদদ ও যোগসাজশ রয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। নাইম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উদঘাটন, অন্য অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে তাঁকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো আবশ্যক বলে আবেদনে যুক্তি তুলে ধরা হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে পুলিশ আ স ম ফিরোজকে আটক করার পর যাত্রাবাড়ী থানার একটি হত্যা মামলায় তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। আদালতের নতুন এই আদেশের মধ্য দিয়ে তাঁকে শিক্ষার্থী নাইম হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হলো।
ছবি বাদ দিয়ে কেবল বায়োমেট্রিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাওয়ার সুযোগ চেয়ে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এর ফলে ছবি সংযুক্ত করেই নাগরিকদের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে হবে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. ইকবাল কবির ও বিচারপতি এস এম সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন আইনজীবী শেখ ওমর শরীফ ও ইলিয়াছ আলী মণ্ডল। অপরদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী কামাল হোসেন মিয়াজী। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে কামাল হোসেন মিয়াজী বলেন, "এ বিষয়ে রুল খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। ফলে ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র হবে না।"
মামলার বিবরণে জানা যায়, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে কঠোরভাবে পর্দা করার কারণ দেখিয়ে ছবি তুলতে অপারগতার কথা জানিয়ে ২০২২ সালে হাইকোর্টে এই রিট দায়ের করেন রাজধানীর শাহজাহানপুরের শান্তিবাগের বাসিন্দা সুমাইয়া আহমাদ মুনা। রিট আবেদনে তাঁর স্বামী মুহম্মদ আরিফুর রহমানকে সার্বিক বিষয়ে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। এর আগে ওই বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন বরাবর একটি আবেদন পাঠিয়েছিলেন ওই নারী। সেখানে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ও পর্দানশিন মুসলিম নারী হিসেবে ছবি তোলা থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়ে উল্লেখ করেন, এনআইডি না থাকায় তিনি মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই ছবি ছাড়া বিকল্প পদ্ধতিতে পরিচয়পত্র পাওয়ার অনুরোধ জানালেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন।
উক্ত রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৬ মার্চ হাইকোর্ট রুল জারি করেছিলেন। রুলে বিকল্প পরিচয় হিসেবে ছবি ছাড়া বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বুধবার সেই রুলটি খারিজ করে দেন আদালত। ইতিপূর্বে শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি তুলে ধরেছিল যে, ছবি ছাড়া পরিচয়পত্র প্রদানের দাবি আইনি কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়; কারণ ব্যাংকিং লেনদেন কিংবা হজ পালনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব ক্ষেত্রেই ছবির ব্যবহার অপরিহার্য এবং বায়োমেট্রিক আইরিশ শনাক্তকরণেও মুখমণ্ডলের একাংশ উন্মুক্ত করতে হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত এক বিতর্কের জেরে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এজলাস ত্যাগ করেছেন। গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টার পর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে জানান যে, মামলার প্রকৃত কার্যধারার বাইরে গিয়ে কিছু অনভিপ্রেত মন্তব্য করায় প্রধান বিচারপতি ক্ষুব্ধ হয়ে আদালতের কার্যক্রম স্থগিত করেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় একজন নারী আইনজীবীকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে। ২০১৩ সালে একজন কাজী নিয়োগকে কেন্দ্র করে রিটকারী পক্ষ একই বিষয়ে পাঁচটি ভিন্ন রিট আবেদন করেন, যেখানে পূর্ববর্তী রিট খারিজ হওয়ার তথ্য গোপন করা হয়েছিল। আদালতের ভাষায় এটি ছিল একটি ‘সিরিয়াস ফ্রড’ বা গুরুতর জালিয়াতি। এই প্রতারণার দায়ে সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী ও রিট আবেদনকারী উভয়কেই ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন আপিল বিভাগ, যা ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সকালে এই আদেশ দেওয়ার সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন উপস্থিত না থাকলেও দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অন্য একটি মামলার শুনানিকালে তিনি বিষয়টি উত্থাপন করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, মাহবুব উদ্দিন খোকন যখন জরিমানার প্রসঙ্গটি সামনে আনেন, তখন প্রধান বিচারপতি সাফ জানিয়ে দেন যে আদালতের আদেশ পরিবর্তন হবে না। প্রধান বিচারপতির ভাষ্য ছিল, “দেখেন, আমরা সবকিছুতে দেখে–শুনে একটা আদেশ দিয়েছি, আমাদের আদেশ আমরা পরিবর্তন করব না। কারণ, ওনাদের বক্তব্য অনুযায়ী সিরিয়াস ফ্রড করা হয়েছে। আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এমনকি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ইতিপূর্বের আদেশও ফ্রড করা হয়েছে।” প্রধান বিচারপতি যখন তাকে এই বিষয়ে কথা না বলতে অনুরোধ করেন, তখনই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে।
ব্রিফিংয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আরও উল্লেখ করেন যে, এক পর্যায়ে মাহবুব উদ্দিন খোকন অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে বলে ফেলেন, “আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরে আইনজীবীদের ইনকাম কমে গেছে।” এই মন্তব্য শোনার পর প্রধান বিচারপতি বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি আদালত অবমাননার শামিল বলে উল্লেখ করেন। প্রধান বিচারপতি তখন বলেন, “আপনি (খোকন) যে কথাটা বলেছেন, সেটা অ্যাবসলিউটলি আদালত অবমাননার শামিল। যেহেতু আপনি এত বড় একটা কথা বলেছেন, আমি আজকে আর আদালতের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করব না।” এই কথা বলে তিনি অন্য বিচারপতিদের নিয়ে এজলাস ত্যাগ করেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল কাজল আরও জানান যে, প্রধান বিচারপতি সবসময় বিচারিক শৃঙ্খলা ও সততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন এবং আদালতের সঙ্গে কোনো ধরনের প্রতারণা সহ্য করেন না। মাহবুব উদ্দিন খোকন আইনজীবীদের কল্যাণের কথা বললেও আদালত মনে করে তার মন্তব্যটি ছিল অত্যন্ত মানহানিকর।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আবুল কালাম আজাদ আপিল করতে পারবেন—এই শর্তে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে আদেশ দিয়েছিল, সেটি বেআইনি ছিল।
গতকাল সোমবার নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আদেশটি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩) পরিপন্থি ছিল। এই আইন অনুযায়ী রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই বিধান সবার জন্য প্রযোজ্য—সেটি শেখ হাসিনা, আবুল কালাম আজাদ কিংবা অন্য কোনো পলাতক আসামি হোক, অথবা কারাগারে থাকা কেউ হোক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ছাপিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নির্বাহী আদেশের নেই। কাজেই, সরকারের আদেশের যে অংশে আপিল করার শর্তে আবুল কালাম আজাদকে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, সেটি অবৈধ ও বেআইনি ছিল।’
তবে আমিনুল জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারার আওতায় কোনো সাজা স্থগিত করার ক্ষমতা সরকারের রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তার সাজা স্থগিত করার বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। সেই ক্ষমতা সরকারের রয়েছে। সরকার এই ক্ষমতা প্রয়োগ করলে প্রসিকিউশনের কোনো আপত্তিও নেই।’
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবুল কালাম আজাদকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বিচার চলাকালে এবং বিচারের পরও তিনি পলাতক ছিলেন।
২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড এক বছরের জন্য স্থগিত করে। ওই প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগেই তার বাংলাদেশে ফেরার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
আমিনুল বলেন, ‘আবুল কালাম আজাদের আপিল ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ বা নথিভুক্ত করেননি। তাই তার মামলায় আপিল বিভাগে এমন কোনো বিচারাধীন কার্যক্রম নেই, যার ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হতে পারে। শুনানির সময় আপিল বিভাগের বিচারকরাও একই ধরনের মতামত দিয়েছিলেন।’
তিনি জানান, আজাদের আইনজীবীরা পরবর্তী সময়ে হয়তো আইনি অবস্থানটি বুঝতে পেরেছিলেন এবং সে কারণেই আপিলের বিষয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেননি।
আইসিটির প্রধান প্রসিকিউটর আরও বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ৩০ দিন পার হয়ে গেলে সেই রায় কার্যকর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প আমি দেখি না।’
সরকার আজাদের সাজা স্থগিত করতে বাধ্য কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল বলেন, ‘এটি বাধ্যবাধকতা বা নজিরের বিষয় নয়। ৪০১ ধারা সরকারকে একান্ত নিজস্ব বিবেচনামূলক ক্ষমতা দিয়েছে। সরকার যেকোনো সময় যেকোনো সাজা স্থগিত, মওকুফ এমনকি বাতিলও করতে পারে।’
বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে নতুন ‘গুম আইন’ এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি জানান যে, যে সকল গুমের ঘটনা অত্যন্ত বিস্তৃত এবং পদ্ধতিগতভাবে ঘটানো হয়েছে, সেগুলোর বিচার এখন থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেই সম্পন্ন হবে।
চিফ প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন যে, ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে গুম সংক্রান্ত মামলাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, যেসব গুমের ঘটনা ব্যাপক মাত্রায় বিস্তৃত বা পদ্ধতিগত নয়, সেই মামলাগুলোকে নিয়মিত বিচারিক আদালতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এর মাধ্যমে গুমের বিচারিক প্রক্রিয়া আরও সুসংহত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এছাড়া ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্পদ জব্দের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিকটি তুলে ধরে আমিনুল ইসলাম জানান যে, শেখ হাসিনাসহ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যে সকল আসামি রায়ের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল দায়ের করেননি, তাঁদের জন্য আইনি লড়াইয়ের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “শেখ হাসিনাসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যেসব আসামি রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করেননি, তাদের আর আপিলের সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যারা আপিল করেননি তারা পরবর্তীতে আর আপিলের সুযোগ পাবেন না।” আইনগতভাবে এই সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ায় দণ্ড কার্যকর করার পথে আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ভাঙচুর ও পুলিশের কাজে বাঁধা দেয়ার দুই মামলায় হাইকোর্টে জামিন পেয়েছেন বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী (চন্দন কুমার ধর)। রোববার বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দিয়েছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য। তবে তার বিরুদ্ধে অন্যান্য মামলা চলমান থাকায় তিনি মুক্ত হতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।
অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য জানান, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর পুলিশি কাজে বাধা ও ভাঙচুরের অভিযোগে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় এসব মামলা হয়। এ দুই মামলায় রুল মঞ্জুর করে জামিন দিয়েছেন। তবে আরও মামলা থাকায় তিনি মুক্তি পাচ্ছেন না।
প্রতারণার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিককে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি মো. খায়রুল আলম এবং বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ প্রদান করেন। বিদিশার আইনজীবী মাসুদ মিয়া জানিয়েছেন, এই জামিন আদেশের ফলে বিদিশা সিদ্দিকের কারামুক্তিতে আর কোনো আইনগত বাধা নেই।
আদালতে বিদিশার পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান খান ও অ্যাডভোকেট মাসুদ মিয়া। এর আগে গত ২৫ আগস্ট রাজধানীর গুলশানের একটি রেস্তোরাঁ থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগে দায়েরকৃত একটি মামলায় দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের রায় থাকায় পুলিশ সাজা পরোয়ানা মূলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন অর্থাৎ ২৬ আগস্ট তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ব্যবসায়ী মোশাররফ হোসেন বিদিশা সিদ্দিকের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন। মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গত ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ের সময় বিদিশা আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। বর্তমানে অন্য কোনো মামলা না থাকায় হাইকোর্টের এই জামিন আদেশের পর তাঁর মুক্তির পথ সুগম হলো বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিচারে গতি আনতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা এবং মহানগরে ২২টি ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করেছে সরকার। গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ কথা জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনটি বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৪(ক) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এসব ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সেগুলোর জন্য স্থানীয় এখতিয়ার ও সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নবগঠিত ট্রাইব্যুনাল ও অধিক্ষেত্র: প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা জেলার জন্য একটি এবং ঢাকা মহানগরের আওতাধীন থানাগুলোর জন্য চারটি পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে—ঢাকা মহানগর-১-এর অধীন পল্লবী, কাফরুল, মিরপুর, শাহআলী, দারুসসালাম, রূপনগর, ভাষানটেক, তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্প এলাকা, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর, রমনা ও শাহবাগ থানা।
ঢাকা মহানগর-২-এর অধীন কলাবাগান, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, নিউমার্কেট, আদাবর, কোতোয়ালি, বংশাল, চকবাজার, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর ও মোহাম্মদপুর থানা।
ঢাকা মহানগর-৩-এর আওতাধীন মতিঝিল, শাহজাহানপুর, পল্টন, সবুজবাগ, খিলগাঁও, মুগদা, রামপুরা, ডেমরা, শ্যামপুর, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী ও ওয়ারী থানা।
ঢাকা মহানগর-৪ আওতাধীন উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, উত্তরখান, দক্ষিণখান, বিমানবন্দর, তুরাগ, বাড্ডা, গুলশান, বনানী, ভাটারা, ক্যান্টনমেন্ট ও খিলক্ষেত থানা।
নারায়ণগঞ্জের জন্য ২টি (নারায়ণগঞ্জ-১ ও নারায়ণগঞ্জ-২), চট্টগ্রাম জেলার জন্য একটি এবং চট্টগ্রাম মহানগরের জন্য তিনটি (চট্টগ্রাম মহানগর-১, ২ ও ৩) ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।
মাদকপ্রবণ সীমান্ত এলাকা কক্সবাজারের জন্য তিনটি ট্রাইব্যুনাল নির্ধারণ করা হয়েছে। কক্সবাজার-১-এর অধীন টেকনাফ, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী থানা। কক্সবাজার-২-এর আওতাধীন উখিয়া, সদর ও ঈদগাঁও থানা। কক্সবাজার-৩-এর অধীন রামু, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী থানা। এ ছাড়া কুমিল্লার জন্য দুটি (কুমিল্লা-১ ও কুমিল্লা-২) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজশাহী জেলা, রাজশাহী মহানগর, বগুড়া, দিনাজপুর ও যশোর জেলার জন্য একটি করে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন আরও বলা হয়, প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর অধীন ন্যূনতম ৫ বছর বা ততোধিক শাস্তিযোগ্য অপরাধের চলমান মামলাগুলো বর্তমান আদালত থেকে নবগঠিত ট্রাইব্যুনালগুলো সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী স্থানান্তরিত হবে। কোনো মামলা যে পর্যায়ে স্থানান্তরিত হবে, ঠিক সে পর্যায় থেকেই বিচারকার্য পরিচালিত হবে। অবিলম্বে এটি কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে গণহত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) নিজ কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এ মামলায় ১১ জন আসামি কারাগারে রয়েছেন। আর পলাতক আছেন ৩০ জন। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। ওই পরোয়ানামূলে তাদের নিজ নিজ ঠিকানায় গিয়েও পাওয়া যায়নি। তাই পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এসব কার্যক্রমের পরই বিচারকার্য শুরু হবে।
শাপলা চত্বরের মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা বিচারকার্যে সব মামলাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি। তবে শাপলা চত্বর গণহত্যার মামলাটি আমরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুততার সঙ্গে শেষ করার চেষ্টা করব।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে সংঘটিত ঘটনাটিকে আওয়ামী লীগ বলেছিল রং মেখে অভিনয় করেছে। অথচ ৬১ জন আলেম-ওলামাদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে তারা। এ বিচার নিয়ে নানাভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষদের আকাঙ্ক্ষা ছিল শাপলা চত্বরের এ হত্যা মামলাটির যেন বিচার হয়। মানুষের গণদাবিও রয়েছে। আমরা জনগণের এমন দাবির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিচারটি দ্রুততার সঙ্গে শেষ করব ইনশাল্লাহ।