মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের জবানবন্দি শেখ হাসিনার দুঃশাসনের এক অকাট্য দলিল।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বুধাবার বাসস’কে বলেন, ‘চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন যে জবানবন্দি দিয়েছেন, তা অবশ্যই শেখ হাসিনার দুঃশাসনের অকাট্য দলিল।’
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মঙ্গলবার জবানবন্দি দেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
সেসময় তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তাকে ফোন করে জানান যে আন্দোলন দমনে সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তখন তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে ছিলেন এবং তার সামনে ছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার। পরে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের এই নির্দেশনা তৎকালীন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ সারাদেশে পৌঁছে দেন প্রলয় কুমার। সেদিন থেকেই মারণাস্ত্র ব্যবহার শুরু হয়।
চৌধুরী মামুন আরও জানান, এই মারণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে অতি উৎসাহী ছিলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর ও ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। এ ক্ষেত্রে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের নির্দেশ ছিল, যেকোনো মূল্যে আন্দোলন দমন করতে হবে।
সাবেক আইজিপি তার জবানবন্দিতে বলেন, শেখ হাসিনাকে মারণাস্ত্র ব্যবহারে প্ররোচিত করতেন ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান, আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, ফজলে নূর তাপস ও মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমাতে হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার বিষয়ে জবানবন্দিতে তিনি বলেন, হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। যার পরামর্শ দিয়েছিলেন র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক হারুন অর রশীদ। আন্দোলনপ্রবণ এলাকাগুলো ভাগ করে ব্লক রেইড দিয়ে হেলিকপ্টার, ড্রোন ও মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনরত অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও আহত করা হয়। আন্দোলন দমনে সরকারকে উৎসাহিত করেন আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও ব্যবসায়ীরা।
জবানবন্দিতে ‘কোর কমিটি’র মিটিং বিষয়ে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে প্রায় প্রতি রাতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ধানমন্ডির বাসায় ‘কোর কমিটি’র বৈঠক হত। সব বৈঠকেই আন্দোলন দমনসহ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হত। একটি বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটক করার সিদ্ধান্ত হয়।
ডিজিএফআই এই প্রস্তাব দেয় উল্লেখ করে মামুন বলেন, তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে পরে রাজি হন। আর সমন্বয়কদের আটকের দায়িত্ব তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুনকে দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত মোতাবেক ডিজিএফআই ও ডিবি তাদের আটক করে ডিবি হেফাজতে নিয়ে আসে। সমন্বয়কদের ডিবি হেফাজতে এনে আন্দোলনের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আপস করার জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং তাদের আত্মীয়স্বজনদের ডিবিতে এনে চাপ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে সমন্বয়কদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে টেলিভিশনে বিবৃতি দিতে বাধ্য করা হয়। এ ব্যাপারে তৎকালীন ডিবি প্রধান হারুন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন সাবেক এই আইজিপি। তিনি জানান, ডিবির তৎকালীন প্রধান হারুনকে ‘জিন’ বলে ডাকতেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বেলা ১১টায় গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির বৈঠক সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছেন আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি জানান, ওই বৈঠকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, এসবির প্রধান, ডিজিএফআইয়ের প্রধান, এনএসআইয়ের প্রধানের সঙ্গে তিনিসহ মোট ২৭ জন উপস্থিত ছিলেন। জুলাই আন্দোলন দমন এবং নিয়ন্ত্রণ করা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। সেখানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন তুলে ধরছিল। কিন্তু চারদিকে পরিবেশ-পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় বৈঠকটি মুলতবি করা হয়।
তবে ওইদিন রাতে গণভবনে আবারও বৈঠক ডাকা হয় বলেও জবানবন্দিতে জানান সাবেক আইজিপি মামুন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে শেখ রেহানা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, র্যাবের মহাপরিচালক ও সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমানসহ তিনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান ও এসবির প্রধান বাইরে অপেক্ষমাণ ছিলেন।
ওই বৈঠকে ৫ আগস্ট আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, পুলিশ ও সেনাবাহিনী সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবে। ওই বৈঠক থেকে সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে যান বলে জবানবন্দিতে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, সেখানে (কন্ট্রোল রুম) তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, র্যাবের মহাপরিচালক, ডিজিএফআইয়ের প্রধান, এসবির প্রধান ও মজিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ঢাকা শহরের প্রবেশমুখে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় এবং ৪ আগস্ট রাত সাড়ে ১২টায় সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুম থেকে তারা সবাই চলে যান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের বিষয়ে জবানবন্দিতে তিনি জানান, সেদিন সকালে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে আমার দপ্তরে যাই। এর মধ্যে উত্তরা-যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন পথ দিয়ে ছাত্র-জনতা স্রোতের মত প্রবেশ করতে থাকে। দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে জানতে পারি ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে তিনি কোথায় যাবেন তা জানতাম না। এরপর বিকেলে আর্মির হেলিকপ্টার এসে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে আমাকে প্রথমে তেজগাঁও বিমানবন্দরের হেলিপ্যাডে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ক্যান্টনমেন্টের অফিসার্স মেসে নিয়ে যাওয়া হয়। হেলিকপ্টারে আমার সঙ্গে এসবি প্রধান মনিরুল, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিব ও ডিআইজি আমেনা ছিলেন।
পরে হেলিকপ্টারে এডিশনাল ডিআইজি প্রলয়, এডিশনাল আইজি লুৎফুল কবিরসহ অন্যদেরও সেখানে নেওয়া হয়। পরদিন ৬ অগাস্ট আইজিপি হিসেবে তার নিয়োগ চুক্তি বাতিল করা হয় এবং ক্যান্টনমেন্টে থাকাকালে ৩ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলেও জানান মামুন।
আন্দোলনের দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ২৭ জুলাই আন্দোলন চলাকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ আমরা নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনের পরিস্থিতি দেখতে যাই। পথে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে আমরা কিছুক্ষণ অবস্থান করি।
ওই সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মোবাইলে একটি ভিডিও দেখান ওয়ারি জোনের ডিসি ইকবাল। ভিডিও দেখিয়ে ইকবাল বলেন যে, ‘গুলি করি, একজন মরে। সেই যায়। বাকিরা যায় না।’ পরবর্তীতে এই ভিডিও সারাদেশে ভাইরাল হয়।
২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজির দায়িত্বে ছিলেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে আল-মামুন বলেন, তখন পুলিশের আইজিপি ছিলেন জাবেদ পাটোয়ারী। নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট বাক্সে ৫০ শতাংশ ব্যালট ভর্তি করে রাখার পরামশর্ও শেখ হাসিনাকে এই জাবেদ পাটোয়ারী দিয়েছিলেন বলেও দাবী করেন।
পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে ডিসি, এসপি, ইউএনও, এসি ল্যান্ড, ওসি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সেই নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং তারা সেটা বাস্তবায়ন করেন। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা এই নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করেছেন, তাদের পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়।
২০২০ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, র্যাব সদর দপ্তর পরিচালিত উত্তরাসহ র্যাব-১ এর কার্যালয়ের ভেতরে টিএফআই সেল (টাস্কফোর্স ইন্টারোগেশন সেল) নামে একটি বন্দিশালা ছিল। র্যাবের অন্যান্য ইউনিটের অধীনেও অনেক বন্দিশালা ছিল। এসব বন্দিশালায় রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী এবং সরকারের জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের আটকে রাখা হত, যা একটা কালচারে (সংস্কৃতি) পরিণত হয়েছিল।
তার ভাষ্যমতে, অপহরণ, গোপন বন্দিশালায় আটক, নির্যাতন এবং ক্রসফায়ারের মাধ্যমে হত্যার মত কাজগুলো র্যাবের এডিজি (অপারেশন) এবং র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকেরা সমন্বয় করতেন। আর র্যাবের মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে উঠিয়ে আনা, আটক রাখা কিংবা হত্যা করার নির্দেশনাগুলো সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে আসত এবং এই নির্দেশনাগুলো সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকের মাধ্যমে আসত বলে জানতে পারেন বলেও জবানবন্দি দেন সাবেক আইজিপি।
সেসব নির্দেশনা চেইন অব কমান্ড ভঙ্গ করে সরাসরি এডিজি (অপারেশন) ও র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকদের কাছে পাঠানো হতো বলে উল্লেখ করেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।
ব্যারিস্টার আরমান আটক থাকার বিষয়টি তিনি আইজিপি’র দায়িত্ব গ্রহণের সময় জানানো হয় বলেও উল্লেখ করেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি বলেন, র্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদ বিষয়টি আমাকে অবহিত করেন। তাকে তুলে আনা এবং গোপনে আটক রাখার সিদ্ধান্ত সরকারের ছিল।
বিষয়টি জানার পর আমি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি আমাকে বলেন, ‘ঠিক আছে, রাখেন। পরে বলব।’ কিন্তু পরে আর কিছু তিনি জানাননি। এরপর আমি কয়েকবার বিষয়টি তুলেছিলাম, কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে সরকারের আদেশে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে উল্লেখ করে জবানবন্দিতে সাবেক আইজিপি বলেন, আমি পুলিশ প্রধান হিসেবে লজ্জিত, অনুতপ্ত ও ক্ষমাপ্রার্থী। জুলাই আন্দোলনে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তার জন্য আমি অপরাধবোধ ও বিবেকের তাড়নায় রাজসাক্ষী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পরবর্তী সময়ে আমি ট্রাইব্যুনালে স্বজন হারানোদের কান্না, আকুতি ও আহাজারি দেখেছি। ভিডিওতে নৃশংসতা দেখে অ্যাপ্রুভার হওয়ার সিদ্ধান্ত আমি যৌক্তিক মনে করছি।
তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের পর আগুন দিয়ে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মত বিভৎসতা আমাকে ভীষণভাবে মর্মাহত করেছে। আমি সাড়ে ৩৬ বছর পুলিশে চাকরি করেছি। পুলিশের চাকরি খুবই ট্রিকি। সব সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে আমার দায়িত্বশীল সময়ে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এর দায় আমি স্বীকার করছি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নির্দেশে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। আমি প্রত্যেক নিহতদের পরিবার, আহত ব্যক্তি, দেশবাসী ও ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা চাইছি। আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দিবেন। আমার এই সত্য ও পূর্ণ বর্ণনার মাধ্যমে সত্য উদঘাটন হলে আল্লাহ যদি আমাকে আরও হায়াত (বাঁচিয়ে রাখেন) দান করেন, বাকি জীবনে কিছুটা হলেও অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাব।
এদিকে, সাবেক আইজিপি’র জবানবন্দি দেওয়ার পর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, রাজসাক্ষী হওয়া চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন ক্ষমা পাবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত ট্রাইব্যুনাল নেবেন। তিনি নিজের বিবেকের তাড়নায় অপরাধ স্বীকার করেছেন। নিজের পক্ষ থেকে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেছিলেন।
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, সাবেক আইজিপি ট্রাইব্যুনালে যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, বিশ্বের কোন আদালতেই এ সাক্ষ্যকে দুর্বল প্রমাণ করার সুযোগ নেই। এটি একটি অকাট্য অপ্রতিরোধ্য সাক্ষ্য। এটি শুধু জুলাই-আগস্টের ঘটনা নয়, বাংলাদেশে গত ১৫ বছরে যত গুম-খুন হয়েছে তার বিরুদ্ধে অকাট্য দলিল হিসেবেও কাজ করবে।
ট্রাইব্যুনালে এই মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। সঙ্গে ছিলেন বিএম সুলতান মাহমুদ, প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটররা।
এই মামলায় পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। আর সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর বাড্ডাতে ২৩ জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ আজ বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষে সূচনা বক্তব্যের জন্য আগামী ৯ মে দিন ধার্য করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হলো।
গত ২ মার্চ দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন জানিয়ে শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে বিভিন্ন উসকানি দিয়েছেন কামরুল ও মেনন। তারা আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পদে থেকে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার এবং কারফিউ জারির প্ররোচনা দেন। তাদের ধারাবাহিক ষড়যন্ত্রে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়।
রাজধানীর বাড্ডাসহ আশপাশ এলাকায় ২৩ জনকে হত্যাসহ এ মামলায় তাদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
২০২৪ সালের ২২ আগস্ট রাশেদ খান মেননকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই বছরের ১৮ নভেম্বর রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার হন সাবেক মন্ত্রী কামরুল ইসলাম। এরপর থেকেই বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন এই দুই নেতা।
বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আজ (বৃহস্পতিবার) বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে ইমির পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু।
চলতি বছরের ৭ মার্চ রাত সাড়ে ৯টার দিকে শাহবাগ থানার সামনে অবস্থান নিয়ে ভাষণ বাজানো কর্মসূচি ঘোষণা করেন শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ কয়েকজন। রিকশায় করে মাইকে ভাষণ বাজানোর সময় ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের, মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ, এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্র শক্তির আহ্বায়ক তাহমিদ আল মোদাসসিরসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি দল তাতে বাধা দেয়।
এক পর্যায়ে এ বি জুবায়ের ও মোসাদ্দেক আলী রিকশাসহ শেখ তাসনিম আফরোজসহ আরেকজনকে জোর করে ধরে শাহবাগ থানার ভেতরে নিয়ে যান। পরে পুলিশ তাদের আটক করে রাখে। পরদিন রোববার আটক তিনজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে শাহবাগ থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারগারে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় করা দুটি মামলায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে আইভীর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু, অ্যাডভোকেট এস এম হৃদয়।
গত বছরের ৯ মে রাত ৩টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত চুনকা কুটির থেকে আইভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তাকে হাইকোর্ট ৫ মামলায় জামিন দেন। এরপর আপিল বিভাগে তা স্থগিত হয়ে যায়।
পরে ১৮ নভেম্বর তাকে আরও ৫ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি সেই সব মামলায় জামিন দেন। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে সেগুলো স্থগিত হয়ে যায়।
এ অবস্থায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ও ২০২৫ সালের ৩০ জুন করা দুটি (হত্যার অভিযোগ) মামলায় আইভীকে গ্রেপ্তার দেখাতে সংশ্লিষ্ট থানা–পুলিশ আবেদন করে। একটি মামলায় ২ মার্চ ও অপর মামলায় ১২ এপ্রিল গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।
সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামে থাকা ১০৫টি হিসাব অবরুদ্ধ ও আয়কর নথি জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যাংক হিসাব, ১৩টি ওয়েজ আর্নারস বন্ড ও ৮৭টি এফডিআর রয়েছে।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপসহকারী পরিচালক সাবিকুন নাহারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর দুদকের পৃথক দুটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন।
দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, মামলায় এজাহার নামীয় আসামি খন্দকার মোশাররফ হোসেন কর্তৃক ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ ৩৫ কোটি ১৮ লাখ টাকা মূল্যের সম্পত্তি অর্জনপূর্বক নিজ দখলে রেখে এবং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৯৯ কোটি ২১ লাখ টাকা ও ১১ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৬ ডলার অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেন করায় দুদক ২০২৫ সালের ২ জুন মামলা করেছে।
আসামি খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নামীয় ব্যাংক হিসাব, ওয়েজ আর্নারস বন্ড ও এফডিআরসমূহ জরুরি ভিত্তিতে অবরুদ্ধ করা প্রয়োজন। এছাড়া তার নামীয় মূল আয়কর নথির শুরু থেকে ২০২৪-২০২৫ করবর্ষ পর্যন্ত আয়কর নথির স্থায়ী অংশ ও বিবিধ অংশসহ সংশ্লিষ্ট যাবতীয় রেকর্ডপত্র/তথ্যাদি জব্দ করা একান্ত প্রয়োজন।
জুলাই আন্দোলনের সময় যুবদলকর্মী হত্যা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রায় জালিয়াতি এবং দুদকের করা পাঁচ মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এই আদেশ দেন। হাইকোর্টের জামিন আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন খারিজ করে আদালত এ আদেশ দেন।
আদালতে খায়রুল হকের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কামরুল হক সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু।
পরে অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, খায়রুল হকের বিরুদ্ধে আরো দুই মামলায় থাকায় তিনি এখনই কারামুক্তি পাচ্ছেন না।
গত ৮ মার্চ বিচারপতি মো. খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো. সগীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল মঞ্জুর করে তাকে চার মামলায় জামিন দেন। পরে ১১ মার্চ দুদকের মামলায়ও জামিন পান। এ জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করে। তবে এর মধ্যে নিম্ন আদালতে আরও দুই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদলকর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বিরুদ্ধে এ মামলা ছাড়াও আরও চারটি মামলা হয়। একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত রায় জালিয়াতির অভিযোগে গত ২৭ আগস্ট শাহবাগ থানায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীনের মামলা। ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় আরেকটি মামলা করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী ভূঁইয়া।
একই অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় ২৫ আগস্ট আরেকটি মামলা করেন নুরুল ইসলাম মোল্লা। এর আগে ৪ আগস্ট প্লট জালিয়াতিতে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকও একটি মামলা করেছে।
এসব মামলায় নিম্ন আদালতে জামিন নামঞ্জুরের পর তিনি হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন। পরে হাইকোর্ট ৫ মামলায় জামিন প্রশ্নে রুল জারি করেন।
২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান খায়রুল হক। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে তার নিয়োগ কার্যকর হয়।
২০১১ সালের ১৭ মে তিনি অবসরে যান। এরপর তিনবার তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হন।
নিপীড়িত মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি মিথ্যা মামলা দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে মানুষকে বের হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাজধানীর বনানীতে ভ্রাম্যমাণ লিগ্যাল এইড ক্যাম্প উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেছেন তিনি।
লিগ্যাল এইড সেবা থেকে কেউ বঞ্চিত হলে আইন মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আদালতে যাওয়ার আগে কোনো সমস্যার সমাধানে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে মিমাংসা করার চেষ্টা করুন। যারা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন কিন্তু আদালতে যেতে পারছেন না। তারা লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি সহায়তা পাবেন।
মামলার জট ইস্যুতে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মামলা জট কমাতে চাই। তাই লিগ্যাল এইড কর্মসূচির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবার কেউ মামলার মাঝামাঝিতে সমঝোতা করতে চাইলে তারও ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।’
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা ফিরে পেতে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী নুসরাত তাবাসসুম। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সোমবার (২৭ এপ্রিল) তিনি হাইকোর্টে এই রিট আবেদনটি দায়ের করেন। মূলত আসন্ন নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় পুনরায় অংশগ্রহণের সুযোগ ফিরে পাওয়াই এই আইনি পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য।
নুসরাত তাবাসসুমের করা এই রিট আবেদনের ওপর আজ সোমবার বিকেলেই শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে সংশ্লিষ্ট আইনি সূত্র নিশ্চিত করেছে। আদালতের সিদ্ধান্তের ওপরই এখন নির্ভর করছে তিনি আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বৈধতা পাবেন কি না।
এর আগে গত ২২ এপ্রিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা লঙ্ঘনের দায়ে নুসরাত তাবাসসুমের প্রার্থিতা বাতিল করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সেদিন মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল বিকেল ৪টা পর্যন্ত, কিন্তু এনসিপি নেত্রী তাঁর আবেদনপত্রটি দাখিল করেন ৪টা ১৯ মিনিটে। মাত্র ১৯ মিনিটের এই বিলম্বের কারণে আইনি বাধ্যবাধকতায় তাঁর মনোনয়নপত্রটি গ্রহণ করেনি কমিশন।
উল্লেখ্য যে, নুসরাত তাবাসসুমের পাশাপাশি একই দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের প্রার্থিতাও আগে স্থগিত করেছিল নির্বাচন কমিশন। ফলে দলগতভাবে এনসিপির নির্বাচনি অংশগ্রহণ নিয়ে বর্তমানে এক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১২ মে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নুসরাত তাবাসসুমের এই রিট আবেদনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি নির্ধারিত সময়ের সামান্য বিলম্বের ক্ষেত্রে আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি করতে পারে। যদি আদালত তাঁর পক্ষে রায় প্রদান করেন, তবে তিনি নির্বাচনি লড়াইয়ে ফেরার সুযোগ পাবেন। অন্যথায়, এনসিপির জন্য এই সংরক্ষিত আসনে প্রতিনিধি পাঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। নির্বাচন কমিশন বর্তমানে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।
মানহানির মামলায় আগাম জামিন চেয়েছেন কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে তার আবেদনের ওপর শুনানি হবে।
এর আগে, ২৬ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানিয়ে একটি বক্তব্য দেন। সেই বক্তব্যকে ঘিরে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় জামে মসজিদে জুমার নামাজের খুতবার আগে আলোচনায় তাকে মানহানির মন্তব্যের অভিযোগ আসে আমির হামজার বিরুদ্ধে।
পরে ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জে মামলাটি করেন জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির।
আমির হামজাকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য সমন জারি করা হয়েছিল। তবে তিনি নির্ধারিত তারিখে আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন বিচারক।
আজ ২৭ এপ্রিল, ২০১৪ সালের সালের এই দিনে ঘটে বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের সাত খুন। সেদিন প্রত্যেককে হত্যার পর পেট ফুটো করে ইট বেঁধে নদীতে ফেলে দেয়া হয় যাতে লাশও ভেসে উঠতে না পারে। একসঙ্গে এতোজনকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা ও লাশ গুমের নৃশংসতায় শিউরে ওঠে মানুষ। সেই ভয়াবহ ৭ খুনের ১২ বছর পূর্ণ হলো আজ। তবে এমন পৈশাচিকতার সুষ্ঠু বিচারের রায় কার্যকরের অপেক্ষার অবসান হয়নি এখনো। নিম্ন আদালত ৯ বছর আগে ও উচ্চ আদালত ৮ বছর আগে রায় ঘোষণা করলেও আপিল বিভাগে ঝুলে রয়েছে মামলাটি।
অভিযোগ উঠেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার রায় কার্যকর করতে বিলম্ব করে। এ নিয়ে স্বজনদের মনে ক্ষোভ ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহরণ করা হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, বন্ধু সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিমসহ সাতজনকে। তিন দিন পর বন্দর উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ের জামাই বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় আলাদা দুটি মামলা করেন।
সেই মামলায় ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাব-১১ এর চাকরিচ্যুত সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম মাসুদ রানাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদানের আদেশ দেন।
পরে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়। ২০১৮ সালে ২২ আগস্ট ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রেখে অন্য আসামির বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন উচ্চ আদালত। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে সাড়ে সাত বছর ধরে শুনানির অপেক্ষায় আটকে রয়েছে।
এ দিকে বিচারের আশায় এখনো অপেক্ষার প্রহর গুণছেন নিহতের স্বজনরা। তাদের দিন কাটছে ভয়ে, শঙ্কায়।
নিহত তাজুল ইসলামের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম রাজু বলেন, আসামিরা আওয়ামী লীগের সরকারি কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগ নেতা হওয়ায় মামলার রায় কার্যকর করতে এতো টালবাহানা করেছে। এ কারণে দীর্ঘ ১২ বছরেও মামলার রায় কার্যকর হয়নি।
নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও মামলার বাদি সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, 'আমাদের মামলার রায় নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত- সব পর্যায়েই হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম, রায়টি খুব দ্রুত কার্যকর হবে। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে আজ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও এর কোনো বাস্তব অগ্রগতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এতে আমরা চরম অনিশ্চয়তা, ভয় এবং আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।'
'অনেকেই বলেন, আসামিপক্ষ অত্যন্ত শক্তিশালী- তারা হয়তো বের হয়ে আসবে। আমি এই মামলার একজন বাদি হিসেবে প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে থাকি। আমার স্বামীকে নির্মম ভাবে হারিয়েছি, নিজের জীবন নিয়েও ঝুঁকির মধ্যে থেকে ন্যায় বিচারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছি। একসময় আমাদের ওপর হত্যার হুমকি ছিল, এমনকি আমাদের পাহারা দিয়েও রাখতে হয়েছে। এত প্রতিকূলতা পেরিয়ে আজ আমরা এই পর্যায়ে এসেছি- শুধু একটি ন্যায় বিচারের আশায়।'
বিউটি বলেন, 'যেভাবে আমাদের স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে, তা সত্যিই অকল্পনীয় ও নিষ্ঠুর। এমন নির্মম মৃত্যু আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। সারাদেশের মানুষ তখন কেঁদেছে, এখনো সেই কষ্ট ভুলে যায়নি। আমরা যারা স্বামী, বাবা বা ভাই হারিয়েছি- শুধু তারাই এই শোকের গভীরতা বুঝতে পারি। এই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের বড় করছি, সংগ্রাম করে বেঁচে আছি।'
তিনি বলেন, 'আজ আমাদের আর কোনো চাওয়া নেই- শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, যেন আমরা ন্যায় বিচার দেখতে পারি। সেই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের বাসায় এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আশ্বাস দিয়েছিলেন- যদি তাদের দল ক্ষমতায় আসে, তাহলে সর্বপ্রথম এই সাত হত্যার বিচার নিশ্চিত করবেন। তাঁর সেই কথা আজও আমাদের মনে আছে। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমরা এখনো তাঁর দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে আছি।'
তিনি আরও বলেন, 'বর্তমানে আমরা আশাবাদী, তাঁর ছেলে তারেক রহমানের প্রতি। আমরা বিশ্বাস করি, তিনি তাঁর মায়ের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন এবং আমাদের এই সাতটি পরিবারের দুর্ভোগের প্রতি দৃষ্টি দেবেন। আমরা অনুরোধ জানাই- মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আইন মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই যেন আমাদের এই মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেন। আমরা শুধু চাই- যারা এত নির্মম ভাবে আমাদের স্বজনদের হত্যা করেছে, তাদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর হোক। এটাই আমাদের শেষ আশা।'
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ফলে শেখ হাসিনা সরকার এ রায়কে বিলম্বিত করার চেষ্টা করেছে। অ্যাপিলেট ডিভিশনে যাতে শুনানি না হয় তা নিশ্চিত করেছে। তবে বর্তমান সরকার এ মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করলে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর রাজিব মণ্ডল দৈনিক বাংলাকে বলেন, সাত খুনের ঘটনায় স্বজনরা এখনো বিচার পায়নি। নিম্ন ও উচ্চ আদালতে আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হলেও রায় এখনো কার্যকর হয়নি। আশা করি, বর্তমান সরকারের অধীনে শিগগিরই রায় কার্যকর হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ রোববার ২৮ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এই শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, শুনানির শুরুতে প্রসিকিউশন পক্ষ অভিযোগ গঠনের পক্ষে তাদের যুক্তি ও দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করবেন এবং পরবর্তীতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আসামিদের অব্যাহতি বা ডিসচার্জ চেয়ে পালটা শুনানি করবেন।
এর আগে গত ১৫ এপ্রিল এই মামলার শুনানির তারিখ নির্ধারিত থাকলেও প্রসিকিউশন পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা দ্বিতীয় দফায় পিছিয়ে আজকের দিনটি চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তখন ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় প্রার্থনা করেছিলেন। এরও আগে গত ৮ এপ্রিল একবার শুনানির কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল এই ২৮ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।
এই মামলায় সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ মোট আসামির সংখ্যা ২৮ জন। বর্তমানে এই মামলায় চারজন আসামি গ্রেফতার রয়েছেন, যারা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানার বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। গ্রেফতারকৃতরা হলেন নাঈমুল হাসান রাসেল, সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। অন্যদিকে, সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদারসহ অধিকাংশ আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিদের আইনি সহায়তা দিতে ট্রাইব্যুনাল থেকে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের দায়ের করা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালীন মোহাম্মদপুর এলাকায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে ব্যাপক নৃশংসতা চালানো হয়। আসামিদের সরাসরি উসকানি, পরিকল্পনা এবং প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণ করা হয়। এই গুলিবর্ষণে মাহমুদুর রহমান সৈকত ও ফারহান ফাইয়াজসহ মোট ৯ জন নিরীহ শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন। ট্রাইব্যুনাল এই ঘটনাগুলোকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
চলমান এসএসসি পরীক্ষা-২০২৬ ঘিরে প্রশ্ন ফাঁসের যে খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ গুজব বলে জানিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা। একই সঙ্গে এ ধরনের অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে পুলিশের সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগ (সিটিটিসি) অভিযানে মূল হোতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলমান এসএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়, একটি অসাধু চক্র শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ও নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যেও এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, গত ২০ এপ্রিল পুলিশের সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগ (সিটিটিসি) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ‘এসএসসি-২০২৬ প্রশ্নপত্র ফাঁস গ্রুপ’ নামে একটি ফেসবুক পেজ শনাক্ত করে। প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিটিটিসির একটি বিশেষ দল ২৩ এপ্রিল ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানার জিরাবো টাঙ্গুর এলাকায় অভিযান চালায়।
অভিযানে প্রশ্ন ফাঁস গুজবের মূল হোতাসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা অবৈধ আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ফাঁসের মিথ্যা প্রচার চালিয়ে চলমান পরীক্ষা কার্যক্রমকে ব্যাহত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল বলে জানানো হয়েছে।
বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত গুজব, অপপ্রচার ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য বিশ্বাস না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুসরণ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধও জানানো হয়েছে।
কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য ও আলোচিত ইসলামী বক্তা আমির হামজাকে আবারও লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এবার কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য করার জেরে এ উকিল নোটিশ দেয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ছাত্রশক্তি কুষ্টিয়া জেলা শাখার সদস্য সচিব আই-ইয়াশ ইমনের পক্ষে কুষ্টিয়া জর্জকোটের আইনজীবী নুরুল ইসলাম নুরুল এ নোটিশ পাঠান।
উকিল নোটিশে বলা হয়েছে, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত ব্যক্তি। মুফতি আমির হামজা সম্প্রতি এক বক্তব্যে ফজলুর রহমানকে ফজু পাগলা নামে আখ্যায়িত করেন। তাকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলেন আমির হামজা।
এ ছাড়া ফজলুর রহমানকে কুকুর মারার ইনজেকশন দেয়ার কথাও উল্লেখ করেন জামায়াত দলীয় এই সংসদ সদস্য। উকিল নোটিশে দাবি করা হয়েছে, ফজলুর রহমানকে দেশ ও জাতির কাছে হেও প্রতিপন্ন করার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে এমন বক্তব্য দেয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ফজলুর রহমানের সম্মানহানি করা হয়েছে। এর ফলে তিনি সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নোটিশ প্রাপ্তির দশ দিনের মধ্যে আমির হামজা যদি তার বক্তব্যের ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হন তাহলে সমস্ত দায়-দায়িত্ব তাকে নিতে হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও অশালীন বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে মুফতি আমির হামজাকে দুটি উকিল নোটিশ দেয়া হয়। এছাড়া জ্বালানি মন্ত্রীকে নিয়ে দেয়া বক্তব্যের জেরে আমির হামজার বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জের আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই মামলায় নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে এরই মধ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।
প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ‘ছাগলকাণ্ডে’ আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এনবিআরের সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে চার্জগঠন বিষয়ে শুনানি আগামী ১১ মে নির্ধারণ করেছেন আদালত।
সোমবার (২০ এপ্রিল) ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ শারমিন আফরোজের আদালতে মামলাটির চার্জগঠন বিষয়ে শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ ছিল। তবে এদিন আসামি পক্ষের আইনজীবী চার্জগঠন বিষয়ে শুনানির তারিখ পেছানোর জন্য আবেদন করেন। আদালত সময়ের আবেদন মঞ্জুর করেন আগামী ১১ মে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন।
মতিউর রহমানের আইনজীবী মো.ওয়াহিদুজ্জামান লিটন ঢালি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর মতিউর রহমান ও তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুটি মামলা হয়।
মামলায় মতিউরের বিরুদ্ধে পাঁচ কোটি ২৮ লাখ ৭৫ হাজার ৯৩৯ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং এক কোটি ২৭ লাখ ৬৬ হাজার ২১৬ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ করা হয়। এই মামলারই অভিযোগপত্রের অনুমোদন দেন দুদক।
২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি মতিউরকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন।
২০২৪ সালে কোরবানির জন্য ঢাকার মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রো থেকে ইফাত নামের এক তরুণের ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগল কেনার ফেসবুক পোস্ট ঘিরে মতিউর রহমানকে নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়।