বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

স্বপ্ন বন্দি অনলাইন জুয়ায়

# ধ্বংসের মুখে হাজারো তরুণ, নিঃস্ব পরিবার # বাড়ছে নানা অপরাধ, আত্মহত্যা, খুনোখুনি
ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড
১১ মে, ২০২৬ ০১:৪৮
কাইয়ুম আহমেদ
প্রকাশিত
কাইয়ুম আহমেদ
প্রকাশিত : ১১ মে, ২০২৬ ০১:৪৭

স্মার্টফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে আঙুলের ডগায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে মায়াবী হাতছানি। কখনো তা রঙের খেলা; কখনো বা ঘূর্ণায়মান চাকা। এক মুহূর্তের লোভে আর একটি ক্লিকের অদম্য নেশা খুঁজে ফেরে স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ। কিন্তু সেই রঙিন পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে নিঃশব্দ হাহাকার। তিলে তিলে গড়া সঞ্চয়, এক চিলতে সুখ আর সোনালি ভবিষ্যৎ—সবই যেন ডিজিটাল মরীচিকার গ্রাসে হারিয়ে যায়। নিছক বিনোদনের মোড়কে আসা এই নেশা শেষমেশ সাজানো স্বপ্নগুলোকে ছাই করে দিয়ে রেখে যায় কেবেই এক রিক্ত পাণ্ডুলিপি-এটি কোনো গল্প বা উপন্যাস নয়; ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজ লভ্যতায় ‘অনলাইন জুয়া’ নামক মরণনেশার বাস্তবতা; যা বর্তমানে সারাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, দোকানকর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর কিংবা গার্মেন্টকর্মী- জীবনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছেন এই জুয়ার দিকে। রাতারাতি ধনী হওয়ার মরণনেশায় বুঁদ হয়ে শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে শিক্ষাজীবন, চাকরিজীবীরা কর্মসংস্থান। এতে অনেক পরিবারে নেমে এসেছে হতাশার কালো মেঘ। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভাগ্য পরীক্ষার নামে চলছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন।
ফেসবুক আইডি, পেজ, গ্রুপ, ওয়েবসাইট ও মুঠোফোনভিত্তিক এনক্রিপ্টেড অ্যাপ দিয়ে চলছে এই জুয়ার সাইটগুলো। এতদিন বিদেশি আয়োজনে এসব জুয়ার সাইট চললেও এখন দেশিয় অনেক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা এসব জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। খোয়াচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। অনেকে ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে জাড়াচ্ছেন নানা অপরাধে। বাড়ছে খুনোখুনিও।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্মার্টফোনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই জুয়ার অ্যাপগুলো প্রচার করা হয়। শুরুতে ব্যবহারকারীকে সামান্য কিছু টাকা (যেমন: ১,০০০ টাকা) বোনাস বা জয়ের লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করা হয়। এই সামান্য টাকার মোহে পড়ে সাধারণ মানুষ নিজের পকেটের টাকা ঢালতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে ১ হাজার টাকা জেতার আশায় মানুষ কখন ১ লক্ষ টাকা হারিয়ে ফেলছে, তা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
জুয়া এমন এক সর্বনাশা নেশা, যা মানুষকে মুহূর্তেই পথে বসিয়ে দেয়। ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বড় অংকের টাকা জেতার আশায় তারা জমানো টাকা খরচ করে, এমনকি ঋণ বা সম্পদ বিক্রি করেও জুয়ায় ঢালছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জুয়া খেলে কেউ কখনো স্থায়ীভাবে ধনী হতে পারেনি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জুয়া খেলে ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই সর্বস্বান্ত হয়, আর লাভবান হয় কেবল ওই অ্যাপের আড়ালে থাকা চক্রগুলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘অল্প পুঁজিতে লাখপতি’ কিংবা ‘দ্রুত আয়’-এর মতো বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে ফাঁদে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ ঝুঁকছে অনলাইন জুয়ার দিকে। অল্প আয়ের টাকা কয়েকগুণ বাড়ানোর আশায় তারা জড়িয়ে পড়ছেন এমন এক খেলায়, যেখানে জেতার চেয়ে হারার শঙ্কাই বেশি। ফলে অনেকেই হারাচ্ছেন শেষ সম্বলটুকুও; ভেঙে পড়ছে পরিবার, তৈরি হচ্ছে নতুন এক সামাজিক সংকট। শুধু পুরুষই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আসক্ত হয়ে পড়ছেন অনলাইন জুয়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুয়া শুধু আর্থিক ক্ষতিই করে না, এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। জুয়ার নেশায় পড়ে তরুণরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নষ্ট করছে। ঋণের বোঝা সইতে না পেরে অনেক তরুণ আত্মহত্যার মতো কঠিন পথ বেছে নিচ্ছে অথবা জড়িয়ে পড়ছে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে।
ঘটনা-১ : রাজধানীর হাজারীবাগ: ২৭ বছর বয়সী গার্মেন্টকর্মী সুমাইয়া রংপুর থেকে ভাগ্যবদলের আশায় একা ঢাকায় আসেন। মাসে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন গার্মেন্টে; ওভারটাইমসহ আয় দাঁড়ায় ১৫-১৬ হাজার টাকা। ৭ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে বাকি দিয়ে নিজের খরচ ভালোভাবেই চলছিল। একদিন ফেসবুকে চোখে পড়ে একটি বিজ্ঞাপন ‘ঘরে বসে আয় করুন, দিনে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা গ্যারান্টি।’ কৌতূহলবশত ক্লিক করতেই সেটি তাকে নিয়ে যায় একটি গেমিং সাইটে। শুরুতে বিনামূল্যে খেলার সুযোগ, এরপর অল্প বিনিয়োগে বড় জয়ের প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন সুমাইয়া। প্রথমদিকে কিছু লাভও করেন। সেই টাকা দিয়ে ভালো একটি মোবাইল ফোনও কিনেছিলেন। জীবন যেন নতুন ছন্দে এগোচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে বেশি সময় লাগেনি। আস্তে আস্তে হারতে থাকেন জুয়ায়। এরপর মাসের মাঝামাঝিতেই বেতনের বড় অংশ শেষ হয়ে যেতে থাকে। একসময় বাড়িতে টাকা পাঠানোও বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসাও। সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নেন, কিন্তু সেই টাকাও হারেন। পরে মোবাইল ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঋণ নেন। চলতি মাস থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার পর তার হাতে থাকবে মাত্র দুই হাজার টাকা। মাত্র দুই হাজার টাকা কীভাবে তিনি মাস চালাবেন জানেন না।
ঘটনা -২: জিগাতলার বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে ছোট্ট একটি চায়ের দোকানই ছিল ৩৪ বছর বয়সী মুইন মিয়ার পরিবারের একমাত্র সম্বল। দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করে মোটামুটি চলছিল তার সংসার। একদিন দোকানে চা খেতে আসা এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ তাকে দেখায় কীভাবে ক্রিকেট ম্যাচে বাজি ধরে অল্প সময়েই হাজার টাকা আয় করা যায়। চোখের সামনে ওই তরুণকে কয়েকবার জিততে দেখে শেষ পর্যন্ত লোভ সামলাতে পারেননি। এরপর ছোট-ছোট বাজিতে কয়েকবার জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়লে বড় বাজি ধরা শুরু করলে পতনের শুরু হয়। হারার পর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবার আরও বড় বাজিতে হারতে থাকেন। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দোকানের পুরো পুঁজি শেষ হয়ে যায়। এখন দোকান বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
ঘটনা-৩: কারওয়ানবাজার থেকে ভোরে মালামাল নিয়ে মোহাম্মদপুরের কাঁচাবাজারের বিক্রি করেন তরুণ ব্যবসায়ী আলিফ। মাস কয়েক আগে বাজারেরই এক পরিচিত ব্যক্তি মোবাইলের একটি অ্যাপ দেখিয়ে বলল, ‘ক্রিকেট ম্যাচে ১০০ টাকা লাগাও, জিতলে ২৫০ পাবা।’ প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিলেও কৌতূহল আর প্রলোভনে সেদিন সন্ধ্যায় ১০০ টাকা বাজি ধরে ২২০ টাকা পান। তার কাছে মনে হয়, সারাদিন রোদে পুড়ে যা আয় হয়, এখানে তা মিনিটেই সম্ভব। এরপর কৌতূহল আর লোভ থেকে রূপ নেয় অনলাইন জুয়ার নেশায়। কয়েক মাসের নেশায় আলিফ ব্যবসা হারিয়েছে, সেই সঙ্গে হারিয়েছে স্বপ্ন। এভাবে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এইবার ফেরত পাব- এই চিন্তাটাই জুয়ার সবচেয়ে বড় ফাঁদ। একে বলা হয় ‘গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি’। এই মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে সর্বস্ব হারানো শুধু সময়ের ব্যাপার। তবে শুধু নিংস্ব হওয়াই নয়; এই অনলাইন জুয়া কেন্দ্র করে বাড়ছে খুনোখুনি আত্মহত্যাও।
# অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে শিক্ষার্থীকে গলাকেটে হত্যা:
ধামরাই: অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে ঢাকার ধামরাইয়ে ঘরে ঢুকে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে গলাকেটে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ধামরাই থানার ওসি নাজমুল হুদা খান।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে পৌরসভার লাকুড়িয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাসায় নাহিদা আক্তার (১৬) নামের ওই পরীক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিবেশী শামীম ওরফে স্বপনকে (৩৫) আটক করি। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।
ওসি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে স্বপন জানান, তিনি অনলাইন জুয়ায় আসক্ত এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। নাহিদার নানী যখন বাসায় ছিলেন না, তখন পেঁয়াজ-রসুন লাগবে জানিয়ে স্বপন তার কক্ষে প্রবেশ করেন এবং টাকা চান। নাহিদা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে প্রথমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে ফ্লোরে ফেলে দেন। পরে সঙ্গে থাকা কাটার দিয়ে তার গলা কেটে ফেলেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে শীল দিয়ে মাথায় আঘাত করেন এবং নাহিদার গলায় ও কানে থাকা সোনার গহনা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যান।
অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে স্বপন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে জানিয়ে পুলিশ বলছে, তারা ইতোমধ্যে নাহিদার কানের দুল ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত শীল উদ্ধার করেছে।
# অনলাইন জুয়ার ভাগ-বণ্টন নিয়ে সরকারি কর্মচারীর গোপালপুর(টাঙ্গাইল): অনলাইন জুয়ার দেড় কোটি টাকার ভাগ-বণ্টন নিয়ে রাজস্ব বিভাগের কর্মচারী আমিনুল ইসলাম গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি গোপালপুর উপজেলার সৈয়দপুর তহসিল অফিসের অফিস সহকারী। তার বাড়ি পাশের চাতুটিয়া গ্রামে।
আমিনুলের বাবা ভোলা মিয়া বলেন, অনলাইনে বাজি খেলতে গিয়ে তার ছেলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ব্যাংক কর্মকর্তা ধার নেওয়া দেড় কোটি টাকাও তাকে ফেরত দিচ্ছিলেন না। পাওনাদারেরা তাকে প্রতিদিন টাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন। এতে আমিনুল হতাশ হয়ে পড়েন। গত বুধবার রাতে রান্নাঘরের ধরনার সঙ্গে ফাঁসি দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন।
ভোলা মিয়া আরও বলেন, আমিনুলের তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে এবং তার স্ত্রী তিন মাসের গর্ভবতী। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন আমিনুল।
মুক্তাগাছা(ময়মনসিংহ) : বাবার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বে আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে লুকিয়ে রাখার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুলিশ নূর মুহাম্মদ খোকন (২০) নামের একজনকে আটক করেছে। পরে খোকনের বাড়ির একটি ল্যাট্রিনের ভেতর থেকে শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটি উপজেলার বাঁশাটি ইউনিয়নের জমিনপুর গ্রামের জহিরুল ইসলামের ছেলে। সে মুক্তাগাছা শহরের রেসিডেন্সিয়াল মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক খোকন জানান, তিনি অনলাইনে জুয়ায় আসক্ত। শিশুটির বাবা জহিরুল ইসলাম জুয়া খেলায় বিভিন্ন সময় বাধা দেওয়াসহ জুয়ার বিষয়ে তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। তার বাবার প্রতি ক্ষোভ থেকে খোকন শিশুটিকে প্রথমে অপহরণ ও পরে হত্যা করে লাশ গুম করে রাখেন।
তাড়াশ(সিরাজগঞ্জ) : উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকাতেই অনলাইন জুয়ায় মেতে উঠেছে যুবসমাজ। মোবাইল ফোনে নানা ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে ক্রিকেট, ফুটবল, তিন পাত্তি, রামি, রঙের খেলা, এভিয়েটর গেম, আইপিএল বেটিং এমনকি জনপ্রিয় লুডু খেলাটিও অনলাইন জুয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই অনলাইন জুয়ার আসর বসছে গ্রামের চায়ের দোকান, চালের দোকান কিংবা সুতার দোকানের ভেতর। বাইরে থেকে সাধারণ ব্যবসা মনে হলেও ভেতরে চলছে মোবাইলের পর্দায় হাজার হাজার টাকার বাজি। দুপুরে চা খাওয়ার অজুহাতে, রাতে দোকান বন্ধের পরেও একে একে হাজির হয় নির্দিষ্ট কয়েকজন। বসে যায় আড্ডা, হাতে হাতে মোবাইল, চোখ পর্দায়, আর দেদারসে চলতে থাকে জুয়া খেলা।
কাউরাইল এলাকার এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি প্রথমে বন্ধুদের দেখাদেখি খেলতে শুরু করি। লুডুতে ৫০ টাকা দিয়ে শুরু, পরে একসময় হাজার টাকার ওপরে চলে যায়। জিতলে মজা লাগত, কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই হারতাম। পরে ঋণ করতে করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো দেনা হয়। এখন চাকরি নেই, ঋণের চাপে ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বিপদে পড়ছে পরিবারগুলো। ঘরে শান্তি নেই, বাবা-মা সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, স্ত্রী স্বামীর ওপর আস্থা হারাচ্ছেন, ভাই ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছে। সন্তানরা পড়াশোনার বদলে সারাদিন মোবাইলে চোখ রেখে বাজির জন্য অপেক্ষা করছে। যুবকরা কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, মনোযোগ ভেঙে যাচ্ছে পড়ালেখা বা পেশাজীবনে। একদিকে আসক্তি, অন্যদিকে টাকা হারানোর চাপ, সব মিলিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন অনেকে।
এ বিষয়ে তাড়াশ থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান জানান, ‘আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি। অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত অভিযোগ এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, ‘অনলাইন জুয়া একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের উপজেলাতেও বিষয়টি নজরে এসেছে। আমরা আইসিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছি। জনসচেতনতাও জরুরি, তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মিটিং করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উদ্‌যাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, জুয়া, অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আরও যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্য ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা হবে।


ইউনূসের বিচারের দাবিতে ৬১ আইনজীবীর মানববন্ধন

ড. ইউনুসের বিচার চেয়ে আইনজীবীদের মানববন্ধন। ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ৯ জুন, ২০২৬ ১৭:৩২
নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিচারের দাবিতে আজ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন একদল আইনজীবী। মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কারাগারে থাকা ৬১ জন আইনজীবীর কারামুক্তি দিবস উপলক্ষে এই প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। এসময় আইনজীবীরা বিভিন্ন দাবি সংবলিত ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে অবস্থান নেন এবং ‘ইউনূসের বিচার চাই’ বলে স্লোগান দেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় আওয়ামীপন্থী ৬১ জন আইনজীবী একসাথে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ ও নিজেদের ওপর হওয়া কথিত অবিচারের প্রতিবাদ জানাতেই আইনজীবীরা এই কর্মসূচির ডাক দেন।

মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কারামুক্ত আইনজীবী মাহফুজুর রহমান লিখন আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া এবং বিভিন্ন আদালতে মামলা পরিচালনা করতে না দেওয়ার অভিযোগ তুলে এর তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানান। কর্মসূচিতে ওবায়দুল ইসলাম, লিটন মিয়া, তৌহিদ, শামীম আল সোহাগ ও সাইফুলসহ কারামুক্ত অন্যান্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন। পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করা এবং হয়রানিমূলক মামলা বন্ধের দাবিতেই মূলত আইনজীবীরা এই প্রতিবাদ জানিয়েছেন।


সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে স্থগিত

ফাইল ছবি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

সুপ্রিম কোর্টের জন্য তিন মাসের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার যে নির্দেশনা হাইকোর্ট প্রদান করেছিল, তা স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ এই আদেশ দেন। একইসঙ্গে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল শুনানির জন্য আগামী ১৬ জুন দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। এই আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের রায়টি স্থগিত থাকবে।

হাইকোর্টের পূর্ববর্তী রায়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সেই বিধানটি বাতিল করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত ছিল। ওই রায়ের ফলে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের ওপর অর্পিত হয়েছিল। এছাড়া আদালত ২০১৭ সালে প্রণীত জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালাটিও অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন।

মামলার নথিপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতেই ছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়। রিটকারীদের দাবি ছিল, বর্তমান বিধানের কারণে বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি হয়, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খর্ব করে।

২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সুপ্রিম কোর্টের সাতজন আইনজীবী এই রিটটি দায়ের করেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট রুল জারি করে শুনানি শেষে গত ২ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করেন এবং ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত ৭ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। এরপর গত ২১ মে রাষ্ট্রপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে।

আজকের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অপরপক্ষে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত ছিলেন। আগামী ১৬ জুন আপিল বিভাগে এই বিষয়ে বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় এবং ১১৬ অনুচ্ছেদের ভবিষ্যৎ।


ইউনূসসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন খারিজ

আপডেটেড ৮ জুন, ২০২৬ ১৩:৩২
নিজস্ব প্রতিবেদক

হাম ও রুবেলার ভ্যাকসিন (টিকা) যথাসময়ে আমদানি না করে শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা এবং টিকার অভাবে দেশব্যাপী মহামারি সৃষ্টি করে শিশু মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত।

আবেদন-পরবর্তী শুনানি শেষে আদালত এ বিষয় আদেশ দেন।

সোমবার (৮ জুন) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বাদী হয়ে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় এই মামলার আবেদন করেন।

মামলা খারিজের বিষয়টি নিশ্চিত করে বাদীপক্ষের এক আইনজীবী সালাউদ্দিন লস্কর বলেন, ‘আমরা আজ মামলাটি দায়েরের আবেদন করেছিলাম। বিজ্ঞ আদালত ৪০৯ ধারাটি দুদক সম্পর্কিত ধারা বিবেচনায় রেকে খারিজ করেছেন। আমরা অন্য ধারার অধীনে মামলাটি নিতে আবেদন জানিয়েছিলাম।

আদালত বলেছেন, আদেশে বিস্তারিত উল্লেখ করা হবে। আদেশটি হাতে পেলে আমরা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেব যে উচ্চ আদালতে যাবো কি-না।’

মামলার যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছিল তারা হলেন— সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম, সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. সাইদুর রহমান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ সায়েদুর রহমান এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর।

এসময় মামলার বাদী কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবুর রহমান ইকবাল উপস্থিত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘বিগত সরকার বর্তমান সরকারকে বিপদে ফেলতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে গেছেন। যার কারনে হামের টিকা না পেয়ে দেশে অনেক শিশু মারা গেছে। আমার এলাকায় ও অনেক শিশু মারা গেছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকে আমি আজকে আদালতে মামলার আবেদন করি।’

মামলার অভিযোগে বাদী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে শিশু জন্মের পর সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে হাম ও রুবেলার টিকা নিয়মিত ও বাধ্যতামূলকভাবে প্রদান করা হয়।

তবে ১নং আসামি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর, ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়মিত টিকা আমদানির যে প্রচলিত প্রক্রিয়া ছিল, তা আসামিদের নির্দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওপেন টেন্ডার বা উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় টিকা আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দীর্ঘ দেড় বছর সময়ক্ষেপণ করা হয়, যার ফলে দেশে টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয়।

অভিযোগে আরো বলা হয়, ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স (যিনি মামলার ২নং সাক্ষী) গত ২০ মে তারিখে গণমাধ্যমে জানান যে, হাম-রুবেলা টিকার সম্ভাব্য সংকটের বিষয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে ১ থেকে ৫ নং আসামির দপ্তরের ৫/৬টি চিঠির মাধ্যমে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে আমদানি প্রক্রিয়া বন্ধ না করার অনুরোধও জানানো হয়েছিল। কিন্তু আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহার ও চরম অবহেলা প্রদর্শন করে সেই সতর্কবার্তায় কর্ণপাত করেননি। টিকা না পাওয়ার কারণে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করে।

মামলার আরজিতে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি হিসাব মতেই গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ জুন তারিখ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৭৫,৭০৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়। টিকার অভাবে সরকারি তথ্যমতেই দেশে প্রায় ৬১০ জন কোমলমতি শিশুর নির্মম মৃত্যু ঘটেছে এবং প্রায় ৭৫,৭০০ শিশু শারীরিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অভিযোগে নির্দিষ্ট করে কতিপয় শিশুর মৃত্যুর বিবরণ দিয়ে বলা হয়, বিগত ২ জুন চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের হারুনুর রশিদ ও ইশরাত জাহান দম্পতির সন্তান আবদুল্লাহ আল ফাহিম এবং ২২ মে আবদুল্লাহ আল নোমান নামে আরেক শিশু ঢাকার হাসপাতালে মারা যায়। এছাড়া ২২ এপ্রিল জাফরজান ইসলাম ও হেলাল ভূঁইয়া দম্পতির একমাত্র সন্তান ফাইয়াজ হাসান তাজিম ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে।

বাদী অভিযোগে উল্লেখ করেন, আসামিরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ভিআইপি ব্যক্তি হওয়ায় স্থানীয় বনানী থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে থানা কর্তৃপক্ষ মামলা গ্রহণ না করে আদালত বরাবর দায়ের করার পরামর্শ প্রদান করে। এরই প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালতে এই মামলার আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে জেলহাজতে আটকে রাখার এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের প্রার্থনা করা হয়েছে।


হামে শিশুমৃত্যু: ইউনূস-নুরজাহানসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

আপডেটেড ৮ জুন, ২০২৬ ১২:৫২
নিজস্ব প্রতিবেদক

হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘দায়িত্বে অবহেলা, প্রতারণা ও বিশ্বাস ভঙ্গের’ অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের আবেদন করা হয়েছে।

সোমবার (৮ জুন) সকালে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল এই মামলার আবেদন করেন। এসময় আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদেশ অপেক্ষমাণ রেখেছেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আশুতোষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আবেদনে অপর আসামিরা হলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. সাইদুর রহমান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যপক ডা. মুহাম্মদ সায়েদুর রহমান ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাফর।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা উচ্চশিক্ষিত ও নোবেল বিজয়ী হলেও তার দায়িত্বে চরম অবহেলা ও উদ্দেশ্যমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এ দেশের শত শত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাজার হাজার শিশুর জীবন বিপন্ন হয়েছে।

অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ ঘটনা হত্যাকাণ্ডের শামিল। মামলার অন্যান্য আসামিরা তৎকালীন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দায়িত্বে অবহেলা করে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে হামের ভ্যাকসিন যথাসময়ে আমদানি না করে শাস্তিযোগ্য ও অমানবিক অপরাধ করেছেন। এতে রাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা এবং তাদের মৌলিক অধিকার হরণের মতো ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই শিশুদের বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে হাম-রুবেলা টিকা অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত এই টিকা প্রদানের ফলে বিশ্বব্যাপী হাম ও রুবেলায় মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার শুরু থেকেই ইউনিসেফের মাধ্যমে হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন টিকা আমদানি করে আসছিল। কিন্তু ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ইউনিসেফের মাধ্যমে হাম-রুবেলা টিকা আমদানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় টিকা সংকট তৈরি হয়।

ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স ২০ মে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে জানান, হাম-রুবেলা টিকার সম্ভাব্য সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। এছাড়া টিকা আমদানির বিদ্যমান ব্যবস্থা বন্ধ না করার অনুরোধও জানানো হয়েছিল। এ তথ্য উল্লেখ করে আবেদনে দাবি করা হয়, বিষয়টি নিয়ে একাধিক বৈঠকেও সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্টরা তা আমলে নেননি বলে অভিযোগ করা হয়। এর ফলে দেশে বিপুলসংখ্যক শিশু নির্ধারিত সময়ে হাম-রুবেলা টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৭৫ হাজার ৭০৮ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। সরকারি হিসাবে এ সময় প্রায় ৬১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

আবেদনে আরও বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও বহু শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এতে আক্রান্ত শিশুদের পরিবারকে চিকিৎসার জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে এবং রাষ্ট্রকেও বিপুল ব্যয় বহন করতে হয়েছে।

আবেদনে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়, টিকা সংকট ও হামের প্রাদুর্ভাবের কারণে এসব মৃত্যু ঘটেছে। অভিযোগকারীর দাবি, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে অবহেলা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং কু-উদ্দেশ্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।


শিশু রামিসা হত্যায় ঘাতক সোহেল-স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড

*দুজনকে ৭ লাখ টাকা অর্থদণ্ড *মাত্র পাঁচ শুনানিতে ইতিহাস *বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে আলোর দিশারী *দ্রুত বিচারে ঐতিহাসিক মাইলফলক
ছবি: সংগৃহীত
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
বিশেষ প্রতিবেদক

দেশের বিচারিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব, ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হলো। যে দেশে একটি সাধারণ ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর, এমনকি যুগের পর যুগ কেটে যায়, বছরের পর বছর ধরে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আদালতের বারান্দায় চোখের জল ফেলতে হয়; সেখানে মাত্র ১৯ দিনের মাথায় একটি লোমহর্ষক শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষিত হয়েছে। রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে প্রধান আসামি ঘাতক সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী ও সহযোগী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
২০০৬ সালের শিশু আইনের অধীনে গঠিত ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন গতকাল রোববার বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন।
এই রায়ের মাধ্যমে দেশের বিচার বিভাগ প্রমাণ করল যে, রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থা যদি সদিচ্ছা পোষণ করে, তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে দ্রুততম সময়ে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। এটি কেবল একটি রায় নয়, বরং দেশের অপরাধী চক্রের জন্য একটি কঠোরতম বার্তা এবং সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে। রাজধানীর পল্লবী এলাকার একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে পরিবারের সাথে বাস করত শিশু রামিসা আক্তার। সে স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। অত্যন্ত শান্ত ও মেধাবী শিশু হিসেবে পরিচিত রামিসা ঘটনার দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাদের নিজস্ব ফ্ল্যাট থেকে সামান্য সময়ের জন্য বের হয়েছিল। অন্যদিকে, একই ফ্ল্যাটের একটি কক্ষ সাবলেট নিয়ে বাস করত পেশাদার মাদকাসক্ত সোহেল রানা (৩১) এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন (২৬)।
তদন্ত প্রতিবেদন ও আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, সাবলেটের অন্য সদস্যরা প্রতিদিনের মতো সকালে যার যার কর্মস্থলে বেরিয়ে যাওয়ার পর ফ্ল্যাটটি অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়ে। এই সুযোগে নিয়মিত মাদক সেবনকারী সোহেল রানা বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ করার পরিকল্পনা করে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসাকে করিডোরে একা দেখতে পেয়ে কৌশলে মিষ্টি বা অন্য কোনো প্রলোভন দেখিয়ে নিজের কক্ষে ডেকে নেয় সোহেল। অবুঝ শিশুটি প্রতিবেশীর এই পৈশাচিক উদ্দেশ্য বুঝতে পারেনি।
কক্ষে নেওয়ার পরপরই সোহেল রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে যায় এবং তার ওপর পাশবিক নির্যাতন শুরু করে। রামিসা আত্মরক্ষার্থে চিৎকার করতে থাকলে সোহেল তার মুখ চেপে ধরে এবং শ্বাসনালী অবরুদ্ধ করতে মুখে কাপড় গুঁজে দেয়। তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার একপর্যায়ে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। বিকৃত মানসিকতার সোহেল এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। সে ধরে নেয় রামিসা মারা গেছে এবং নিজের পৈশাচিক অপরাধের আলামত চিরতরে মুছে ফেলার জন্য ঘর থেকে একটি ধারালো অস্ত্র সংগ্রহ করে। সেই অস্ত্র দিয়ে সে নিষ্পাপ শিশুটির গলা কেটে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং অপরাধের ভয়াবহতা ধামাচাপা দিতে লাশ টুকরো টুকরো করার চেষ্টা চালায়।
নিখোঁজ সংবাদ ও গা শিউরে ওঠা উদ্ধার অভিযান: সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার মা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পুরো ভবনে এবং আশপাশের এলাকায় রামিসাকে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে রামিসার মা ভবনের করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিবেশী সোহেলের বন্ধ কক্ষের দরজার সামনে রামিসার চটি জুতো জোড়া পড়ে থাকতে দেখেন। এই দৃশ্য দেখে তার মনে সন্দেহের দানা বাঁধে। তিনি দরজায় অবিরাম ধাক্কা দিতে থাকেন এবং রামিসার নাম ধরে ডাকতে থাকেন।

ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি চিৎকার করে প্রতিবেশীদের জড়ো করেন। রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লাসহ ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা ছুটে আসেন। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে ঘরের ভেতরে থাকা সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন স্বামীর অপরাধ ঢাকতে ও তাকে বাঁচানোর চেষ্টা শুরু করে। ঘরের বাইরে যখন উত্তেজিত জনতা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল, তখন স্বপ্না ভেতর থেকে দরজাটি শক্ত করে আটকে রাখে, যাতে সোহেল পালানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়। স্বপ্নার পরামর্শ ও সহযোগিতায় সোহেল একটি ভারী রেঞ্চ ব্যবহার করে তাদের ঘরের জানালার লোহার গ্রিল ভেঙে ফেলে এবং পেছনের অংশ দিয়ে পালিয়ে যায়।
সোহেল সফলভাবে পালিয়ে যাওয়ার পর স্বপ্না আক্তার ঘরের দরজা খুলে দেয়। দরজা খোলার সাথে সাথে রামিসার বাবা-মা এবং প্রতিবেশীরা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু সেখানে যে দৃশ্য তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল, তা দেখার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়ে ছিল রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাপ্লুত দেহ এবং ঘরের এক কোণে রাখা একটি বড় প্লাস্টিকের বালতির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি। এই পৈশাচিক দৃশ্য দেখে রামিসার মা তাৎক্ষণিকভাবে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে আসে।

উপস্থিত জনতার একজন তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ কল করে বিষয়টি অবহিত করেন। খবর পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তারা ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা অস্ত্র, রেঞ্চ এবং অন্যান্য আলামত জব্দ করে এবং সহ-আসামি স্বপ্না আক্তারকে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের হেফাজতে নেয়।
দ্রুততম সময়ে তদন্ত ও প্রযুক্তির ব্যবহার: হত্যাকাণ্ডের পরপরই অপরাধী সোহেল রানা রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের একটি চৌকস দল তার অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ঘটনার পরদিনই, অর্থাৎ ২০ মে, নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানা এলাকার একটি বাস স্ট্যান্ডের সামনে থেকে ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
একই দিন (২০ মে) নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় সোহেল রানা, স্বপ্না খাতুন এবং অজ্ঞাতনামা আরও একজনকে আসামি করে একটি হত্যা ও ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার অর্পণ করা হয় পল্লবী থানার দক্ষ উপপরিদর্শক (এসআই) ওহিদুজ্জামানের ওপর।

এই মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া ছিল এক কথায় নজিরবিহীন। দেশব্যাপী তীব্র জনরোষ এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার কঠোর নির্দেশনার পর পুলিশ প্রশাসন দিনরাত এক করে কাজ করে। সাধারণত একটি হত্যা মামলার চার্জশিট বা অভিযোগপত্র তৈরি করতে পুলিশ কয়েক মাস সময় নিয়ে থাকে। কিন্তু এই মামলায় ফরেনসিক ল্যাব, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক এবং তদন্ত কর্মকর্তার সমন্বিত প্রচেষ্টায় ঘটনার মাত্র ৫ দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২৪ মে ২০২৬ তারিখে ঢাকা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে অত্যন্ত নিখুঁত ও নিশ্ছিদ্র চার্জশিট দাখিল করা হয়।
চার্জশিটে প্রধান আসামি সোহেল রানার বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণ, ঠাণ্ডা মাথায় খুন এবং আলামত ধ্বংসের অভিযোগ আনা হয়। অন্যদিকে, তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে স্বামীকে অপরাধে সরাসরি প্ররোচনা ও সহায়তা প্রদান, আলামত নষ্টের চেষ্টা এবং পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ আনা হয়। চার্জশিটে মোট ১৭ জনকে ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিএমএম আদালত চার্জশিটটি গ্রহণ করে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের আদেশ দেন।
আদালতে চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি: গ্রেপ্তারের পর প্রধান আসামি সোহেল রানা বিজ্ঞ আদালতের সামনে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করতে সম্মত হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দিতে সে ঘটনার সম্পূর্ণ বিবরণ দেয়।
সোহেল জানায়, ভুক্তভোগী রামিসার পরিবারের সাথে তাদের কোনো পূর্বশত্রুতা বা পারিবারিক বিরোধ ছিল না। সে সম্পূর্ণভাবে মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে এই বিকৃত ও পাশবিক কর্মটি ঘটিয়েছে। সে স্বীকার করে যে, মাদক গ্রহণের পর তার মানসিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না এবং শিশুটির চিৎকারে ভয় পেয়ে সে তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। জবানবন্দিতে সে তার স্ত্রী স্বপ্নার ভূমিকার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে। সে জানায়, স্বপ্না যদি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবেশীদের বাধা না দিত এবং জানালার গ্রিল ভাঙতে সাহায্য না করত, তবে সে কোনোভাবেই ঘটনাস্থল থেকে পালাতে পারত না। এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মাত্র পাঁচ শুনানিতে ইতিহাস: ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল মামলাটি পাওয়ার পর কোনো ধরনের বিলম্ব না করে দৈনিক ভিত্তিতে শুনানির সিদ্ধান্ত নেন। বিচারক মাসরুর সালেকীনের কঠোর তদারকিতে বিচার প্রক্রিয়া গতি লাভ করে।

১ জুন, ২০২৬: ট্রাইব্যুনাল আসামিদের উপস্থিতিতে তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করেন এবং বিচার শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন।
২ জুন, ২০২৬: অভিযোগ গঠনের পরদিনই ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে চার্জশিটভুক্ত ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন সাক্ষীকে আদালতে হাজির করেন। আদালত বিরতিহীনভাবে এই ১৬ জনের জবানবন্দি রেকর্ড করেন এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের জেরা সম্পন্ন করেন। একজন সাক্ষী অনিবার্য কারণে উপস্থিত হতে পারেননি।
৪ জুন, ২০২৬: রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষের মধ্যে চূড়ান্ত আইনগত যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) অনুষ্ঠিত হয়। প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেখান যে, মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক ও ডিএনএ টেস্টের ফলাফল, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং আসামির ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, এই অপরাধটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং বিরল প্রকৃতির। রাষ্ট্রপক্ষ উভয়েরই সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। অন্যদিকে, রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন যে, মামলার পুরো চার্জশিট শুধুমাত্র আসামির স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং হত্যার কাজে ব্যবহৃত অস্ত্রের ফরেনসিক পরীক্ষা সুনির্দিষ্টভাবে সম্পন্ন হয়নি। তিনি সোহেলের যাবজ্জীবন এবং স্বপ্নার মাত্র ২ বছরের কারাদণ্ডের আর্জি জানান। উভয়পক্ষের যুক্তি খণ্ডন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেন।
ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা: গতকাল সকাল থেকেই ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত ও ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেশজুড়ে আলোচিত এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী এবং সাধারণ উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কঠোর পুলিশি পাহারায় সোহেল ও স্বপ্নাকে বিশেষ প্রিজন ভ্যানে করে আদালত ভবনে নিয়ে আসা হয়। প্রথমে তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়।
এরপর বেলা ১০টা ৪৬ মিনিটে তাদের ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় তোলা হয়। বেলা ১১টার ঠিকাদারি সময়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর ও পিনপতন নীরবতার মধ্যে মামলার রায়ের সংক্ষিপ্ত বিবরণী ও পর্যবেক্ষণ পড়া শুরু করেন। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, শিশুরা একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। রামিসার সাথে যে আচরণ করা হয়েছে, তা মানবতাকে ক্ষুণ্ন করেছে। এই ধরনের অপরাধ সমাজ থেকে উপড়ে ফেলতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।

ঠিক বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে বিচারক তার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তিনি প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন উভয়কেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার আদেশ দেন।
ফাঁসির আদেশের পাশাপাশি আদালত আর্থিক জরিমানারও বিধান করেন। প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এই জরিমানার টাকা আদায় সাপেক্ষে ভুক্তভোগী শিশু রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারী অর্থাৎ তার পিতা-মাতা পাবেন। রায় শোনার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্না খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়েন, অন্যদিকে সোহেল রানাকে নিস্পৃহ ও নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
রায়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং বিচারিক মাইলফলক: আইনজীবী ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করল। অতীতে দেখা গেছে, অনেক স্পর্শকাতর ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার শেষ হতে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে, যার ফলে অনেক সময় সাক্ষীরা আদালতে আসতে ভয় পেতেন বা আলামত নষ্ট হয়ে যেত। কিন্তু মাত্র ১৯ দিনে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

আদালতের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ রায় পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আমি আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে এত দ্রুত, সুশৃঙ্খল এবং নিখুঁতভাবে কোনো জটিল ফৌজদারি মামলার রায় ঘোষণা হতে দেখিনি। এটি একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।
আইনজ্ঞদের মতে, এই দ্রুত রায়ের পেছনে তিনটি মূল উপাদান কাজ করেছে: ১. প্রশাসনের সদিচ্ছা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ প্রশাসনের বিশেষ তদারকি।

২. ত্রুটিহীন ও দ্রুত তদন্ত: মাত্র ৫ দিনে ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণসহ চার্জশিট দাখিল।

৩. বিরতিহীন আদালত পরিচালনা: ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রচলিত দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করে প্রতিদিন মামলার শুনানি গ্রহণ


নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় হাইকোর্টে চালু হচ্ছে বিশেষ বেঞ্চ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার আপিল দ্রুত নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল। রোববার আপিল বিভাগের এজলাসে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের একটি প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এ সিদ্ধান্ত দেন। এ উদ্যোগের ফলে আপিল নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর ধরে চলা বিলম্বের অবসান ঘটবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

গতকাল রোববার নিজ কার্যালয়ে রুহুল কুদ্দুস কাজল শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘অতিসম্প্রতি সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর যে নির্মম হত্যাকাণ্ড-শিশু রামিসা হত্যা ও ধর্ষণের যে মামলা, তার রায় ৭ জুন প্রকাশিত হয়েছে, যা ঘোষিত হয়েছে নিম্ন আদালত কর্তৃক এবং দুজন আসামির মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’

হাইকোর্টের অনুমোদন ছাড়া এ রায় যে চূড়ান্ত নয় তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এমন অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার রায় হয় কিন্তু মানুষ এই রায় কার্যকর হতে দেখতে পায় না বিলম্বের কারণে।’

রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘আমরা যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা সবসময় বলে থাকি, যতক্ষণ না সেই শাস্তি কার্যকর হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত রায়ের ব্যাপারে মানুষের শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমি উন্মুক্ত আদালতে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টিতে এটি এনেছি।’ এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি নারী এবং শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে এই জাতীয় মামলা, অর্থাৎ শিশু রামিসা, আছিয়া এবং রসু খাঁ মামলাগুলো শুনানির জন্য হাইকোর্টে একটি সুনির্দিষ্ট বেঞ্চ গঠন করবেন, যেটি আগামী রোববার থেকে কার্যকর হবে।’

এই বেঞ্চটি কেবল এ ধরনের মামলার জন্য নির্ধারিত থাকবে জানিয়ে কাজল বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের পক্ষ থেকে আমাদের নিয়োজিত আইন কর্মকর্তারা কোনো মামলায় কোনো রকম অ্যাডজর্নমেন্ট চাইবেন না। কোনো অ্যাডজর্নমেন্ট ছাড়াই এই মামলাগুলো শুনানির জন্য আমি আমাদের আইন কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছি।’

ছুটির মধ্যেও বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখায় বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রের এই আইন কর্মকর্তা।

রুহুল কুদ্দুস কাজল আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের বিচারিক আদালতগুলোতে ছুটি চলছে। এই ছুটির মধ্যেও নারী এবং শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং আদালতের কার্যক্রম প্রধান বিচারপতি অব্যাহত রেখেছেন।’

প্রধান বিচারপতির এই উদ্যোগকে ‘মাইলফলক’ বর্ণনা করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বিচারকে ত্বরান্বিত করার জন্যে, মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্য, বিশেষ করে আদালতের প্রতি মানুষের যে আস্থা সে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যে তিনি আজকে যে উদ্যোগটি গ্রহণ করেছেন, সেটিও একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’

রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করায় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান রুহুল কুদ্দুস কাজল।

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই যে, তিনি রামিসার পরিবারের কাছে গিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করার জন্যে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যা করণীয় করবেন বলেছিলেন।’

কেবল আলোচিত মামলা নয়, প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে সমানভাবে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে কাজল বলেন, ‘কোনো একটা মামলা আলোচিত হলেই আমরা সেটার পেছনে ছুটি, এটাও সত্য বাস্তবতা আমাদের মতো দেশে। কিন্তু প্রত্যেকটি অপরাধ দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেই অপরাধের বিচার, অপরাধীদেরকে আইনের আওতায় আনা এবং তাদের শাস্তির মুখোমুখি করা, এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’


মা-বাবার ভরণপোষণ না করলে ১ লাখ টাকা জরিমানা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মিরপুরে সম্প্রতি দুই মায়ের একাকী মৃত্যু এবং তাঁদের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। প্রতিষ্ঠিত ও বিত্তবান পরিবারের সন্তানদের অবহেলায় প্রবীণদের এমন করুণ পরিণতি নিয়ে বর্তমানে তীব্র সমালোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে আবারও সামনে এসেছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’। যদিও আইনটি এক দশকের বেশি সময় ধরে কার্যকর রয়েছে, তবে এর যথাযথ প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবে এখনো অনেক প্রবীণ বাবা-মা নিজ ঘরেই চরম অবজ্ঞার শিকার হচ্ছেন। মিরপুরের ঘটনায় ইতোমধ্যে এক যুগ্ম-সচিবকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা আইন ও নৈতিকতার প্রশ্নে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও কড়াকড়ির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক সন্তানকে তার পিতা-মাতার ভরণপোষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সন্তান একাধিক হলে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে দায়িত্ব বণ্টন করবেন। আইন অনুযায়ী, বাবা-মা সন্তানদের থেকে আলাদা বসবাস করলেও তাঁদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং নিয়মিত সাক্ষাৎ করা বাধ্যতামূলক। এছাড়া বাবা-মার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের বৃদ্ধ নিবাসে কিংবা অন্য কোথাও পাঠাতে বাধ্য করা আইনত নিষিদ্ধ। এমনকি সন্তানদের নিজস্ব আয় থেকে বাবা-মার জীবনধারণের জন্য নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করার বাধ্যবাধকতাও এই আইনে রাখা হয়েছে।

আইনের ৪ ও ৫ ধারায় শাস্তির বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট করা হয়েছে। পিতা-মাতা বেঁচে না থাকলে দাদা-দাদি ও নানা-নানির ভরণপোষণের দায়িত্বও সন্তানদের ওপর বর্তাবে। যদি কোনো সন্তান এই আইন লঙ্ঘন করে বা বাবা-মার প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে, তবে তাকে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে। কেবল সন্তানই নয়, যদি পুত্রবধূ, জামাতা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় ভরণপোষণে বাধা সৃষ্টি করেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তাঁরাও একই শাস্তির আওতায় আসবেন। তবে এই আইনের অধীনে ব্যবস্থা নিতে হলে ভুক্তভোগী পিতা বা মাতাকে প্রথম শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে লিখিত অভিযোগ করতে হয়।

আইন ও শাস্তির বিধান থাকলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ এখনো অত্যন্ত সীমিত। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই আইনের অধীনে একটি বিশেষ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে মামলা দায়ের ও অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াটি আরও সহজ হয়। তা সত্ত্বেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রবীণরা সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে সংকোচবোধ করেন। সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয় এবং সন্তানদের প্রতি অন্ধ আবেগের কারণে অনেক মা-বাবাই আমৃত্যু অবহেলা ও কষ্ট সহ্য করে যান। ফলে এই কঠোর আইনটি বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, যা সন্তানদের দায়িত্বহীন হয়ে ওঠার পেছনে একটি পরোক্ষ কারণ হিসেবে কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিরপুরে নুরজাহান বেগম ও সেলিনা আফরোজের মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল আইনি প্রশ্ন নয়, বরং এটি পারিবারিক বন্ধন ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের প্রতিফলন। আধুনিক জীবনযাত্রার ভিড়ে প্রবীণদের একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতা রুখতে হলে কেবল আইনের শাসনই যথেষ্ট নয়। মা-বাবার প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং তাঁদের সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অন্যথায় আইনের বিধান থাকলেও সামাজিক এই গভীর সংকট ও নৈতিক অবক্ষয় দূর করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।


সাংবাদিক দম্পতি ফারজানা রুপা ও শাকিলের জামিন স্থগিত

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই আন্দোলন চলাকালে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলাসহ মোট ১০টি মামলায় সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ এবং তার স্ত্রী ফারজানা রুপাকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। আজ রবিবার (৭ জুন) রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক এই আদেশ দেন।

এর আগে গত ১১ মে সাংবাদিক শাকিল আহমেদকে ৫টি মামলায় এবং তার স্ত্রী ফারজানা রুপাকে ৬টি মামলায় জামিন দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কে এম জাহিদ সরওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই আদেশ দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষ এই ১০ মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে।

শাকিল আহমেদ বার্তা পরিচালক এবং ফারজানা রুপা প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে 'একাত্তর টেলিভিশন'-এ কর্মরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয় 'একাত্তর টেলিভিশন' কর্তৃপক্ষ।

এরপর ২১ আগস্ট ঢাকার 'হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর' থেকে তাদের আটক করে পুলিশ। সেদিন তারা 'টার্কিশ এয়ারলাইনস'-এর একটি ফ্লাইটে প্যারিসে যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন।


শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় বিচারিক প্রক্রিয়ায় মাইলফলক : অ্যাটর্নি জেনারেল

সংগৃহীত ছবি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন বিজ্ঞ আদালত। আজ রবিবার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় প্রদান করেন। রাষ্ট্রপক্ষের মতে, এই রায় দেশের বিদ্যমান বিচারিক ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় আনীত অভিযোগসমূহ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় অপরাধীদের সর্বোচ্চ এই সাজা দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালতের নির্দেশনায় মূল আসামি সোহেলকে ৫ লাখ টাকা এবং সহযোগী হিসেবে তার স্ত্রী স্বপ্নাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিচারিক আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জরিমানার এই অর্থ প্রয়াত শিশু রামিসার বৈধ উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এছাড়া অপরাধীরা এই অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের মালিকানাধীন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে সেই অর্থ নিহতের পরিবারকে প্রদানের সুনির্দিষ্ট আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আলোচিত এই রায়ের পর সুপ্রিম কোর্টে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদু্স কাজল গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। দ্রুততম সময়ে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার নেপথ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রের সব যন্ত্র অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে ও সমন্বিত উপায়ে কাজ করেছে। আর সে কারণেই এত দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।”

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও উল্লেখ করেন যে, মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই বিচারিক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, “এত কম সময়ের মধ্যে এই মামলার বিচার সম্পন্ন করার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেছে।” এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে অপরাধের প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং অপরাধীদের কাছে একটি জোরালো সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে। মূলত রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগের কারণেই এই নজিরবিহীন দ্রুত বিচার সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


রামিসা হত্যা মামলার রায় কার্যকর নিয়ে যা জানালেন আইনমন্ত্রী

ফাইল ছবি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মিরপুরের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে প্রদান করাকে দেশের বিচারিক ইতিহাসের এক অনন্য ও দ্রুততম দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। এই রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আশা জানিয়েছেন যে, উচ্চ আদালতেও সাজার এই আদেশ বহাল থাকবে এবং আগামী তিন মাসের মধ্যেই দণ্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হবে।

রোববার (৭ জুন) দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে আইনমন্ত্রী এই ঐতিহাসিক বিচার প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, গত ১৯ মে হত্যাকাণ্ডের পর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৪ মে পুলিশ অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরবর্তীতে ঈদের ছুটি শেষে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজ ৭ জুন রায় ঘোষণা করা হলো। সব মিলিয়ে মাত্র ছয়টি কার্যদিবসে একটি স্পর্শকাতর মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়াকে তিনি বড় ধরনের সাফল্য হিসেবে দেখছেন।

অতীতে বিভিন্ন আলোচিত মামলার রায় উচ্চ আদালতে দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকার নজির থাকলেও রামিসা হত্যা মামলার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি দৃঢ়তার সাথে জানান যে, এই মামলার রায় যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয় সেজন্য সরকার বিশেষভাবে তদারকি করবে। এক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে যে, বিচার কার্যকরের ক্ষেত্রে আইনের সকল ধাপ অনুসরণের ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।

দেশে এই ধরণের নৃশংস অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতাকে একটি অন্যতম কারণ হিসেবে স্বীকার করেছেন আইনমন্ত্রী। তবে তিনি মনে করেন এটিই একমাত্র কারণ নয়। জনমনে থাকা দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিচার কার্যকরের দীর্ঘসূত্রতা এই ধরনের অপরাধ ঘটার একটা কারণ হতে পারে, তবে এটাই সামগ্রিক বিষয় নয়।’

তিনি আরও যোগ করেন যে, ‘আইনের নির্ধারিত স্তরগুলো অতিক্রম না করে কোনো রায় কার্যকর করতে গেলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গেলে আইনি সব ধাপ অতিক্রম করেই আসতে হয়।’ তবে সকল আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে মেনে চলেও আগামী তিন মাসের মধ্যে রায় কার্যকর করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। এর আগে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল এই মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদান করেন।


রামিসা হত্যা: সোহেল ও স্বপ্নার মৃত্যুদণ্ড

ফাইল ছবি
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আজ রোববার এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিই আদালতের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য আজকের দিনটি নির্ধারিত ছিল।


গত ১৯ মে পল্লবীর স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে কৌশলে নিজেদের ঘরে নিয়ে যান স্বপ্না আক্তার। সেখানে শিশুটিকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। দীর্ঘক্ষণ মেয়ের সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা খুঁজতে শুরু করলে একপর্যায়ে আসামিদের ঘরের সামনে রামিসার জুতা পাওয়া যায়। পরবর্তীতে প্রতিবেশীদের সহায়তায় ঘরের দরজা ভেঙে ভেতর থেকে রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরপরই স্বপ্না আক্তারকে আটক করা হয় এবং পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।


হৃদয়বিদারক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রামিসার বাবা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন। পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এরপর ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন এবং পরবর্তী কয়েক দিনে মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। মামলার দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া ও জোরালো সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত দুই আসামিকে এই সর্বোচ্চ সাজার নির্দেশ দেন। দেশের বিচারিক ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এমন কোনো স্পর্শকাতর মামলার রায় প্রদান একটি অনন্য নজির স্থাপন করেছে।


রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় আজ: ১৭ দিনে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন

আদালতে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। ছবি : সংগৃহীত
আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার রায় আজ রোববার (৭ জুন) ঘোষণা করা হবে। এই রায়কে কেন্দ্র করে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ইতিমধ্যে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়েছে। দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করা এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ায় আজ পুরো জাতির দৃষ্টি আদালতের এই রায়ের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে।

গত ১৯ মে পল্লবীর একটি বাসায় শিশু রামিসাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ রাজপথে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ঘটনার দিনই প্রধান আসামি সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ এবং পরবর্তীতে রামিসার বাবার দায়ের করা মামলায় সোহেল ও তার স্ত্রীকে অভিযুক্ত করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ডিএনএ ও ফরেনসিক আলামত এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সংগ্রহ করে ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে সোহেল রানাকে মূল অপরাধী এবং তার স্ত্রীকে অপরাধে সহযোগিতার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর ১ জুন অভিযোগ গঠন এবং ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষের ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে সাক্ষ্যদান পর্ব শেষ হয়। ৩ জুন আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি এবং ৪ জুন উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিনটি নির্ধারণ করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ফরেনসিক আলামতের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, তাই তারা দুই আসামিরই সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষ প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে দাবি করে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানালেও বিকল্প হিসেবে সাজা কমানোর প্রার্থনা করেছে। এক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে যে, দেশের বিচারিক ইতিহাসে এত দ্রুত কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার শেষ হওয়া একটি বিরল দৃষ্টান্ত। ভুক্তভোগী পরিবার এবং নাগরিক সমাজ এই রায়ের মাধ্যমে একটি কঠোর বার্তা প্রত্যাশা করছে যাতে ভবিষ্যতে এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।


পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় কাল

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায় আগামীকাল রোববার (৬ জুন) ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন আসামিদের উপস্থিতিতে এই দিন ঠিক করেন। ঘটনার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এই চাঞ্চল্যকর মামলাটির রায় হতে যাচ্ছে, যা বিচারিক ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।

রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পিপি আজিজুর রহমান দুলু গণমাধ্যমকে বলেছেন, শক্তিশালী সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে শিশু হত্যার অভিযোগ তারা শতভাগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই ট্রাইব্যুনাল আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেবেন বলেই তিনি প্রত্যাশা করছেন। তবে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্ল্যাহ ভিন্নমত পোষণ করে বলেছেন, বাদীপক্ষ তাদের আনা অভিযোগ পুরোপুরি প্রমাণ করতে পারেনি, তাই তিনি আদালত থেকে আসামিদের জন্য ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন।

ঘটনার বিবরণীতে জানা যায়, গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে স্কুলপড়ুয়া শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, ওই দিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে এবং গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।

এ সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই অবস্থান করায় পুলিশ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করলে পরবর্তীতে প্রধান আসামি সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর সোহেল রানা হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।

মামলাটির দ্রুত বিচার নিশ্চিতে পুলিশ প্রশাসন ও আদালত অনন্য গতিতে কাজ করেছে। মাত্র পাঁচ দিন তদন্ত করে গত ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান।

আলোচিত এ মামলার বিচার দ্রুত করতে অভিযোগপত্র জমার দিনই মামলাটি শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। এরপর গত ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন বিচারক এবং মাত্র এক দিনে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ করা হয়। পরবর্তীতে বুধবার (৩ জুন) আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং বৃহস্পতিবার (৪ জুন) যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে মামলাটি চূড়ান্ত রায়ের পর্যায়ে পৌঁছায়।


banner close