স্মার্টফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে আঙুলের ডগায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে মায়াবী হাতছানি। কখনো তা রঙের খেলা; কখনো বা ঘূর্ণায়মান চাকা। এক মুহূর্তের লোভে আর একটি ক্লিকের অদম্য নেশা খুঁজে ফেরে স্বপ্নের রাজপ্রাসাদ। কিন্তু সেই রঙিন পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে নিঃশব্দ হাহাকার। তিলে তিলে গড়া সঞ্চয়, এক চিলতে সুখ আর সোনালি ভবিষ্যৎ—সবই যেন ডিজিটাল মরীচিকার গ্রাসে হারিয়ে যায়। নিছক বিনোদনের মোড়কে আসা এই নেশা শেষমেশ সাজানো স্বপ্নগুলোকে ছাই করে দিয়ে রেখে যায় কেবেই এক রিক্ত পাণ্ডুলিপি-এটি কোনো গল্প বা উপন্যাস নয়; ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের সহজ লভ্যতায় ‘অনলাইন জুয়া’ নামক মরণনেশার বাস্তবতা; যা বর্তমানে সারাদেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী, রিকশাচালক, দোকানকর্মচারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর কিংবা গার্মেন্টকর্মী- জীবনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করা মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকছেন এই জুয়ার দিকে। রাতারাতি ধনী হওয়ার মরণনেশায় বুঁদ হয়ে শিক্ষার্থীরা হারাচ্ছে শিক্ষাজীবন, চাকরিজীবীরা কর্মসংস্থান। এতে অনেক পরিবারে নেমে এসেছে হতাশার কালো মেঘ। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই মুঠোফোনের স্ক্রিনে ভাগ্য পরীক্ষার নামে চলছে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন।
ফেসবুক আইডি, পেজ, গ্রুপ, ওয়েবসাইট ও মুঠোফোনভিত্তিক এনক্রিপ্টেড অ্যাপ দিয়ে চলছে এই জুয়ার সাইটগুলো। এতদিন বিদেশি আয়োজনে এসব জুয়ার সাইট চললেও এখন দেশিয় অনেক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা এসব জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। খোয়াচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। অনেকে ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে জাড়াচ্ছেন নানা অপরাধে। বাড়ছে খুনোখুনিও।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্মার্টফোনে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই জুয়ার অ্যাপগুলো প্রচার করা হয়। শুরুতে ব্যবহারকারীকে সামান্য কিছু টাকা (যেমন: ১,০০০ টাকা) বোনাস বা জয়ের লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করা হয়। এই সামান্য টাকার মোহে পড়ে সাধারণ মানুষ নিজের পকেটের টাকা ঢালতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে ১ হাজার টাকা জেতার আশায় মানুষ কখন ১ লক্ষ টাকা হারিয়ে ফেলছে, তা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
জুয়া এমন এক সর্বনাশা নেশা, যা মানুষকে মুহূর্তেই পথে বসিয়ে দেয়। ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বড় অংকের টাকা জেতার আশায় তারা জমানো টাকা খরচ করে, এমনকি ঋণ বা সম্পদ বিক্রি করেও জুয়ায় ঢালছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জুয়া খেলে কেউ কখনো স্থায়ীভাবে ধনী হতে পারেনি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জুয়া খেলে ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জনই সর্বস্বান্ত হয়, আর লাভবান হয় কেবল ওই অ্যাপের আড়ালে থাকা চক্রগুলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘অল্প পুঁজিতে লাখপতি’ কিংবা ‘দ্রুত আয়’-এর মতো বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে ফাঁদে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ ঝুঁকছে অনলাইন জুয়ার দিকে। অল্প আয়ের টাকা কয়েকগুণ বাড়ানোর আশায় তারা জড়িয়ে পড়ছেন এমন এক খেলায়, যেখানে জেতার চেয়ে হারার শঙ্কাই বেশি। ফলে অনেকেই হারাচ্ছেন শেষ সম্বলটুকুও; ভেঙে পড়ছে পরিবার, তৈরি হচ্ছে নতুন এক সামাজিক সংকট। শুধু পুরুষই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও আসক্ত হয়ে পড়ছেন অনলাইন জুয়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুয়া শুধু আর্থিক ক্ষতিই করে না, এটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকেও ধ্বংস করে দিচ্ছে। জুয়ার নেশায় পড়ে তরুণরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নষ্ট করছে। ঋণের বোঝা সইতে না পেরে অনেক তরুণ আত্মহত্যার মতো কঠিন পথ বেছে নিচ্ছে অথবা জড়িয়ে পড়ছে চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে।
ঘটনা-১ : রাজধানীর হাজারীবাগ: ২৭ বছর বয়সী গার্মেন্টকর্মী সুমাইয়া রংপুর থেকে ভাগ্যবদলের আশায় একা ঢাকায় আসেন। মাসে সাড়ে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন গার্মেন্টে; ওভারটাইমসহ আয় দাঁড়ায় ১৫-১৬ হাজার টাকা। ৭ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠিয়ে বাকি দিয়ে নিজের খরচ ভালোভাবেই চলছিল। একদিন ফেসবুকে চোখে পড়ে একটি বিজ্ঞাপন ‘ঘরে বসে আয় করুন, দিনে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা গ্যারান্টি।’ কৌতূহলবশত ক্লিক করতেই সেটি তাকে নিয়ে যায় একটি গেমিং সাইটে। শুরুতে বিনামূল্যে খেলার সুযোগ, এরপর অল্প বিনিয়োগে বড় জয়ের প্রলোভনে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন সুমাইয়া। প্রথমদিকে কিছু লাভও করেন। সেই টাকা দিয়ে ভালো একটি মোবাইল ফোনও কিনেছিলেন। জীবন যেন নতুন ছন্দে এগোচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে বেশি সময় লাগেনি। আস্তে আস্তে হারতে থাকেন জুয়ায়। এরপর মাসের মাঝামাঝিতেই বেতনের বড় অংশ শেষ হয়ে যেতে থাকে। একসময় বাড়িতে টাকা পাঠানোও বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় বৃদ্ধ বাবার চিকিৎসাও। সহকর্মীদের কাছ থেকে ধার নেন, কিন্তু সেই টাকাও হারেন। পরে মোবাইল ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ঋণ নেন। চলতি মাস থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার পর তার হাতে থাকবে মাত্র দুই হাজার টাকা। মাত্র দুই হাজার টাকা কীভাবে তিনি মাস চালাবেন জানেন না।
ঘটনা -২: জিগাতলার বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে ছোট্ট একটি চায়ের দোকানই ছিল ৩৪ বছর বয়সী মুইন মিয়ার পরিবারের একমাত্র সম্বল। দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করে মোটামুটি চলছিল তার সংসার। একদিন দোকানে চা খেতে আসা এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ তাকে দেখায় কীভাবে ক্রিকেট ম্যাচে বাজি ধরে অল্প সময়েই হাজার টাকা আয় করা যায়। চোখের সামনে ওই তরুণকে কয়েকবার জিততে দেখে শেষ পর্যন্ত লোভ সামলাতে পারেননি। এরপর ছোট-ছোট বাজিতে কয়েকবার জিতে আত্মবিশ্বাস বাড়লে বড় বাজি ধরা শুরু করলে পতনের শুরু হয়। হারার পর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আবার আরও বড় বাজিতে হারতে থাকেন। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দোকানের পুরো পুঁজি শেষ হয়ে যায়। এখন দোকান বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
ঘটনা-৩: কারওয়ানবাজার থেকে ভোরে মালামাল নিয়ে মোহাম্মদপুরের কাঁচাবাজারের বিক্রি করেন তরুণ ব্যবসায়ী আলিফ। মাস কয়েক আগে বাজারেরই এক পরিচিত ব্যক্তি মোবাইলের একটি অ্যাপ দেখিয়ে বলল, ‘ক্রিকেট ম্যাচে ১০০ টাকা লাগাও, জিতলে ২৫০ পাবা।’ প্রথমে হেসে উড়িয়ে দিলেও কৌতূহল আর প্রলোভনে সেদিন সন্ধ্যায় ১০০ টাকা বাজি ধরে ২২০ টাকা পান। তার কাছে মনে হয়, সারাদিন রোদে পুড়ে যা আয় হয়, এখানে তা মিনিটেই সম্ভব। এরপর কৌতূহল আর লোভ থেকে রূপ নেয় অনলাইন জুয়ার নেশায়। কয়েক মাসের নেশায় আলিফ ব্যবসা হারিয়েছে, সেই সঙ্গে হারিয়েছে স্বপ্ন। এভাবে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এইবার ফেরত পাব- এই চিন্তাটাই জুয়ার সবচেয়ে বড় ফাঁদ। একে বলা হয় ‘গ্যাম্বলার্স ফ্যালাসি’। এই মানসিকতা থেকে বের হতে না পারলে সর্বস্ব হারানো শুধু সময়ের ব্যাপার। তবে শুধু নিংস্ব হওয়াই নয়; এই অনলাইন জুয়া কেন্দ্র করে বাড়ছে খুনোখুনি আত্মহত্যাও।
# অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে শিক্ষার্থীকে গলাকেটে হত্যা:
ধামরাই: অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে ঢাকার ধামরাইয়ে ঘরে ঢুকে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে গলাকেটে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ধামরাই থানার ওসি নাজমুল হুদা খান।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে পৌরসভার লাকুড়িয়াপাড়া এলাকায় নিজ বাসায় নাহিদা আক্তার (১৬) নামের ওই পরীক্ষার্থীকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিবেশী শামীম ওরফে স্বপনকে (৩৫) আটক করি। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন।
ওসি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে স্বপন জানান, তিনি অনলাইন জুয়ায় আসক্ত এবং ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। নাহিদার নানী যখন বাসায় ছিলেন না, তখন পেঁয়াজ-রসুন লাগবে জানিয়ে স্বপন তার কক্ষে প্রবেশ করেন এবং টাকা চান। নাহিদা টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে প্রথমে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে ফ্লোরে ফেলে দেন। পরে সঙ্গে থাকা কাটার দিয়ে তার গলা কেটে ফেলেন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে শীল দিয়ে মাথায় আঘাত করেন এবং নাহিদার গলায় ও কানে থাকা সোনার গহনা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যান।
অনলাইন জুয়ার টাকা জোগাতে স্বপন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে জানিয়ে পুলিশ বলছে, তারা ইতোমধ্যে নাহিদার কানের দুল ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত শীল উদ্ধার করেছে।
# অনলাইন জুয়ার ভাগ-বণ্টন নিয়ে সরকারি কর্মচারীর গোপালপুর(টাঙ্গাইল): অনলাইন জুয়ার দেড় কোটি টাকার ভাগ-বণ্টন নিয়ে রাজস্ব বিভাগের কর্মচারী আমিনুল ইসলাম গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি গোপালপুর উপজেলার সৈয়দপুর তহসিল অফিসের অফিস সহকারী। তার বাড়ি পাশের চাতুটিয়া গ্রামে।
আমিনুলের বাবা ভোলা মিয়া বলেন, অনলাইনে বাজি খেলতে গিয়ে তার ছেলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ব্যাংক কর্মকর্তা ধার নেওয়া দেড় কোটি টাকাও তাকে ফেরত দিচ্ছিলেন না। পাওনাদারেরা তাকে প্রতিদিন টাকার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন। এতে আমিনুল হতাশ হয়ে পড়েন। গত বুধবার রাতে রান্নাঘরের ধরনার সঙ্গে ফাঁসি দিয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন।
ভোলা মিয়া আরও বলেন, আমিনুলের তিন বছরের একটি ছেলে রয়েছে এবং তার স্ত্রী তিন মাসের গর্ভবতী। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন আমিনুল।
মুক্তাগাছা(ময়মনসিংহ) : বাবার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বে আন্দালিব সাদমান রাফি (৯) নামের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ বস্তায় ভরে লুকিয়ে রাখার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুলিশ নূর মুহাম্মদ খোকন (২০) নামের একজনকে আটক করেছে। পরে খোকনের বাড়ির একটি ল্যাট্রিনের ভেতর থেকে শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটি উপজেলার বাঁশাটি ইউনিয়নের জমিনপুর গ্রামের জহিরুল ইসলামের ছেলে। সে মুক্তাগাছা শহরের রেসিডেন্সিয়াল মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আটক খোকন জানান, তিনি অনলাইনে জুয়ায় আসক্ত। শিশুটির বাবা জহিরুল ইসলাম জুয়া খেলায় বিভিন্ন সময় বাধা দেওয়াসহ জুয়ার বিষয়ে তার সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। তার বাবার প্রতি ক্ষোভ থেকে খোকন শিশুটিকে প্রথমে অপহরণ ও পরে হত্যা করে লাশ গুম করে রাখেন।
তাড়াশ(সিরাজগঞ্জ) : উপজেলার একটি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের প্রতিটি এলাকাতেই অনলাইন জুয়ায় মেতে উঠেছে যুবসমাজ। মোবাইল ফোনে নানা ধরনের অ্যাপ ব্যবহার করে ক্রিকেট, ফুটবল, তিন পাত্তি, রামি, রঙের খেলা, এভিয়েটর গেম, আইপিএল বেটিং এমনকি জনপ্রিয় লুডু খেলাটিও অনলাইন জুয়ার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই অনলাইন জুয়ার আসর বসছে গ্রামের চায়ের দোকান, চালের দোকান কিংবা সুতার দোকানের ভেতর। বাইরে থেকে সাধারণ ব্যবসা মনে হলেও ভেতরে চলছে মোবাইলের পর্দায় হাজার হাজার টাকার বাজি। দুপুরে চা খাওয়ার অজুহাতে, রাতে দোকান বন্ধের পরেও একে একে হাজির হয় নির্দিষ্ট কয়েকজন। বসে যায় আড্ডা, হাতে হাতে মোবাইল, চোখ পর্দায়, আর দেদারসে চলতে থাকে জুয়া খেলা।
কাউরাইল এলাকার এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমি প্রথমে বন্ধুদের দেখাদেখি খেলতে শুরু করি। লুডুতে ৫০ টাকা দিয়ে শুরু, পরে একসময় হাজার টাকার ওপরে চলে যায়। জিতলে মজা লাগত, কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই হারতাম। পরে ঋণ করতে করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো দেনা হয়। এখন চাকরি নেই, ঋণের চাপে ঘুম হারাম হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বিপদে পড়ছে পরিবারগুলো। ঘরে শান্তি নেই, বাবা-মা সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, স্ত্রী স্বামীর ওপর আস্থা হারাচ্ছেন, ভাই ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিচ্ছে। সন্তানরা পড়াশোনার বদলে সারাদিন মোবাইলে চোখ রেখে বাজির জন্য অপেক্ষা করছে। যুবকরা কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, মনোযোগ ভেঙে যাচ্ছে পড়ালেখা বা পেশাজীবনে। একদিকে আসক্তি, অন্যদিকে টাকা হারানোর চাপ, সব মিলিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছেন অনেকে।
এ বিষয়ে তাড়াশ থানার ওসি মো. হাবিবুর রহমান জানান, ‘আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি। অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত অভিযোগ এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।
উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, ‘অনলাইন জুয়া একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের উপজেলাতেও বিষয়টি নজরে এসেছে। আমরা আইসিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছি। জনসচেতনতাও জরুরি, তাই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে মিটিং করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশে অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উদ্যাপন উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, জুয়া, অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আরও যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্য ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা হবে।
হামের প্রাদুর্ভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুর জাহান বেগমসহ চারজনের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। আজ রবিবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত মামলাটি গ্রহণ করার মতো পর্যাপ্ত উপাদানের অভাব থাকায় এই আদেশ প্রদান করেন।
এর আগে গত ৫ জুলাই সিরাজুল ইসলাম নামের এক ভুক্তভোগী পিতা এই মামলার আবেদন করেছিলেন। আবেদনের অন্য দুই বিবাদী ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ডা. মো. আবু জাফর এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। মামলার আরজিতে বাদী উল্লেখ করেন, তাঁর ৯ মাস বয়সী কন্যা সাউদা মুসকান জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শয্যা সংকট, অক্সিজেনের অভাব এবং চিকিৎসক ও নার্সদের চরম অবহেলার শিকার হয়। তিনি দাবি করেন, সঠিক সময়ে হামের টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তাঁর সন্তান টিকা নিতে পারেনি এবং এর ফলেই সে মৃত্যুবরণ করে।
বাদী আরও অভিযোগ করেন যে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা টিকা সংগ্রহ এবং দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, যা সংবিধান প্রদত্ত জনস্বাস্থ্য রক্ষার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাঁর মতে, এই প্রশাসনিক অবহেলার কারণে দেশে শত শত শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং কয়েক হাজার শিশু বর্তমানে হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তবে আদালত প্রাথমিক শুনানি ও বাদীর জবানবন্দি পর্যালোচনার পর এই অভিযোগগুলোকে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার মতো ভিত্তি নেই বলে সিদ্ধান্ত দেন।
জামালপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদকে বিস্ফোরক মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেলে জামালপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বকশীগঞ্জ আমলি আদালতের বিচারক তানজিনা আক্তার এ আদেশ দেন। বকশীগঞ্জ থানায় বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আনিসুজ্জামান গামা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বকশীগঞ্জ থানায় নূর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরে ঢাকায় দায়ের হওয়া অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে যান। কারাগারে থাকা অবস্থায় বকশীগঞ্জ থানায় দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছিল। বিচারক তদন্ত কর্মকর্তার আবেদন মঞ্জুর করে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোর অনুমতি দিয়েছেন। আগামী ১৪ জুলাই তার জামিন শুনানি রয়েছে।
গত ২৭ জুন রাতে রাজধানীর গুলশানের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তাকে আদালতে হাজিরা শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে পাঁচজন বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেছেন।
এর আগে, গত বুধবার (৮ জুলাই) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়। টানা তিন দিন শুনানি শেষে রায়ের জন্য আজ দিন ধার্য করা হয়।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে রায় ঘোষণা করেছেন আপিল বিভাগ। ফলে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকছে।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। রিটের পক্ষে ছিলেন ড. শরীফ ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
এর আগে, বুধবার (৮ জুলাই) তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানি শেষ হয়। টানা তিন দিন শুনানি শুনানি শেষে রায়ের জন্য ৯ জুলাই দিন ধার্য করা হয়।
গত বছরের ১৩ নভেম্বর বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।
গত ৩ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করা হয়। আপিলে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চাওয়া হয়েছে। রিটকারী সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এ আপিল দায়ের করেন।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনেন উচ্চ আদালত। তবে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল করা হয়নি সেই রায়ে।
সেই রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, গণতন্ত্র হচ্ছে আমাদের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ। এই গণতন্ত্র বিকশিত হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপক্ষে এবং প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন হয়নি। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়নি। যার ফলশ্রুতিতে হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
হাইকোর্ট বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করে এ রায় দেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে, যেটি হচ্ছে গণতন্ত্র। পঞ্চদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেছেন আদালত। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল।
রায়ে আদালত বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে। এর মধ্যে জাতির পিতার স্বীকৃতির বিষয়, ২৬ মার্চের ভাষণের বিষয়গুলো রয়েছে।
গণভোটের বিষয়ে রায়ে হাইকোর্ট বলেন, গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়, যেটি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ ছিল। এ বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হলো। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হলো।
হাইকোর্টের রায়ে ৭ ক, ৭ খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও বাতিল করা হয়েছে। ৭ ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি অপরাধ এবং ৭ খ সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। এদিকে ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ বিষয়ে বলা আছে। এই অনুচ্ছেদের ২ ধারা বলছে, এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটিয়ে সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ওইসব বা এর যে কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করতে পারবেন। এই অনুচ্ছেদটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে রায়ে।
গত বছরের ১৯ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেছিলেন। সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্যদের রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত এ রুল জারি করেন।
পরে রুলে পক্ষভুক্ত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া, ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণফোরাম ও চার আবেদনকারী রুলে ইন্টারভেনর হিসেবে পক্ষভুক্ত হন।
২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এছাড়া, জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বিদ্যমান ৪৫-এর স্থলে ৫০ করা হয়। এছাড়া, বেশকিছু বিষয়ে সংশোধনী আনা হয়।
ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় পাঁচ বছরের শিশু নিছামনিকে ধর্ষণ ও হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় মাত্র ১২ কর্মদিবসের মধ্যে রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে তিন আসামিকে ফাঁসির আদেশ এবং একজনকে সাড়ে ১২ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ময়মনসিংহ জেলা জজ আদালত চত্বরে ভিন্ন ভিন্ন ট্রাইব্যুনালে এই রায় ঘোষণা করা হয়। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত সকল আসামি আদালতে উপস্থিত ছিল।
ময়মনসিংহের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সুদীপ্তা সরকার তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একই সাথে জনপ্রতি ২ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- আরিফ (১৯), রাকিব (১৯) ও সাইফ (২১)।
আসামিদের মধ্যে মারুফ (১৬) অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক তনয় সাহা তাকে সাড়ে ১২ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ১৪ জুন সন্ধ্যায় ১৬ বছর বয়সি আসামি মারুফ ফুসলিয়ে শিশু নিছামনিকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। পরবর্তীতে অপর তিন আসামি আরিফ, রাকিব ও সাইফও এই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে যুক্ত হয়। পরে তারা শিশুটির মরদেহ কংস নদীতে ফেলে দেয়। ১৫ জুন নদীতে শিশুটির মরদেহ ভেসে উঠলে তা উদ্ধার করা হয়।
ওই দিনই নিছামনির বাবা রাজু মিয়া বাদী হয়ে ধোবাউড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর আসামিরা আদালতে বিচারক তনয় সাহার কাছে অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত শেষে মামলার মাত্র ৯ দিনের মাথায় গত ২৩ জুন ৪ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন ধোবাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম। ২৪ জুন বিজ্ঞ আদালত মামলাটি আমলে নেন। এরপর মাত্র ১২ কর্মদিবসের মধ্যে সাক্ষ্যগ্রহণ ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হলো।
রাষ্ট্রপক্ষে এই মামলা পরিচালনা করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বজলুল করিম চৌধুরী। আসামি পক্ষে মামলা লড়েন অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন সরকার।
ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, জনদুর্ভোগ ও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বসাধারণের জন্য বিশ্বকাপ প্রদর্শনী ও উদযাপনের সময় নির্ধারণ, আতশবাজি ও লাউড স্পিকারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন এবং রাত ১১টার পর অবৈধ উচ্চশব্দ ও আতশবাজি বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এই রিট আবেদন করেন। তিনি বলেন, পত্রিকার খবর অনুসারে এ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ১১ জন মারা গেছেন। এছাড়া রাতে উচ্চ শব্দে আতশবাজি ফুটিয়ে উদযাপন করায় শিশু ও বৃদ্ধসহ জনসাধরণের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। তাই এ রিট আবেদন করা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে দুনিয়াজুড়ে বইছে উন্মাদনার ঝড়। ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসরে বাংলাদেশ খেলার সুযোগ না পেলেও এখানে উত্তেজনার কমতি নেই। জনপ্রিয় দলগুলোর সমর্থকরা বাগ্যুদ্ধেই মাঠ গরম করে রাখছেন। এই বিরোধিতা মাঝেমধ্যে প্রাণঘাতী সংঘাতেও রূপ নিচ্ছে।
তথ্য বলছে, এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে নানা ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জনের প্রাণ গেছে। তাদের মধ্যে ৩ জনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ সময়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। ১০ জনের বাইরে কুমিল্লায় আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হামলায় মো. শরিফুল ইসলাম (৩২) নামের এক ব্রাজিল সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ধনপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, যেখানে বড়পর্দায় খেলা দেখানো হবে, সেখানে ডিবি নজরদারি করবে।
অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে করা ওয়ারি থানার মামলায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়াকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দণ্ডের পাশাপাশি তাদের ৬৪ কোটি ৬২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও ৬ মাসের কারাভোগ করতে হবে বলে বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন।
বুধবার (৮ জুলাই) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ এর বিচারক নূরে আলম ভূঞা এ রায় ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের আট সহযোগীকে খালাস দিয়েছেন আদালত। সংশ্লিষ্ট আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর পি. পি. মো. সেলিম খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনে করা মামলায় এনামুল হক এনু ও তার ভাই রুপন ভূঁইয়াকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৬ এর বিচারক মাসুদ পারভেজ। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাদের ৩৪ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
আদালত সূত্রে জানা যায়, অবৈধ উপায়ে অর্জিত ২৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকা আড়াল করার জন্য গোপনে হেফাজতে রাখার অভিযোগে রাজধানীর ওয়ারি থানায় ২০২০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি র্যাব-৩ এর নায়েব সুবেদার রমজান আলী বাদী হয়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ২০২১ সালের ৮ আগস্ট এনু-রুপন ও তাদের ৮ সহযোগীকে আসামি করে অভিযোগপত্র জমা দেন। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। মামলার বিচার চলাকালে ১৩ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত।
অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনসংক্রান্ত শুনানি পিছিয়ে আগামী ১০ আগস্ট নির্ধারণ করেছেন আদালত। বুধবার (৮ জুলাই) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০ এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আব্দুস সালামের আদালত এই তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন আসাদুজ্জামানের স্ত্রী লুৎফুল তাহমিনা খান, তার ছেলে শাফি মোদ্দাছির খান জ্যোতি ও মেয়ে শাফিয়া তাসনিম খান।
এদিন মামলার অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০ এর বিচারক ছুটিতে থাকায় শুনানি হয়নি। এজন্য সংশ্লিষ্ট আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক শুনানির জন্য নতুন করে দিন ধার্য করেন। শুনানিকালে কারাগারে থাকা শাফি মোদ্দাছির খান জ্যোতিকে আদালতে হাজির করা হয়।
২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর তদন্ত শেষে আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে দুদক।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আসাদুজ্জামান খান একজন পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে অসাধু উপায়ে অপরাধমূলক অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ২২ কোটি ৫৮ লাখ ৪০ হাজার ১৬২ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন।
এ ছাড়াও আসামির বিরুদ্ধে ৯টি ব্যাংক হিসাবে ৮৭ কোটি ৪৬ লাখ ২৬ হাজার ৯৩৩ টাকা লেনেদেন করে মানিলন্ডারিংয়ের সম্পৃক্ত অপরাধ ‘দুর্নীতি ও ঘুষ’ সংঘটনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পত্তির অবৈধ উৎস গোপন বা আড়াল করার উদ্দেশ্যে উহার রূপান্তর বা স্থানান্তর বা হস্তান্তর করার অভিযোগ আনা হয়।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে বনানী থানায় রুজুকৃত একটি হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমানের আদালত পুলিশের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ প্রদান করেন। আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে সশরীরে এজলাসে হাজির না করে ভার্চুয়ালি উপস্থিত দেখিয়ে এই শুনানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
এর আগে গত ২ জুলাই সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আদালতে আবেদন দাখিল করেছিলেন। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানির জন্য ৬ জুলাই দিন নির্ধারিত থাকলেও মামলার মূল নথি না থাকায় তা পিছিয়ে যায়। গত বছরের ২৪ জুলাই ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তারের পর থেকে সাবেক এই প্রধান বিচারপতি বর্তমানে কারাগারেই অবস্থান করছেন।
আইনি প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট মামলা ব্যতীত তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার বা কোনো ধরণের হয়রানি না করতে উচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে বিশেষ নির্দেশনা ছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় তিনি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেলেও রাষ্ট্রপক্ষ সেই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে। সর্বশেষ ৩০ জুন একটি মামলায় তাকে জামিন দেওয়া হলেও নতুন এই মামলার কারণে তার কারামুক্তি পুনরায় বিলম্বিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত রায় জালিয়াতি, যুবদলকর্মী হত্যা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়েরকৃত আরও বেশ কয়েকটি মামলায় তিনি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছেন।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানায় ১৫ বছর আগে আট বছরের শিশু মাহফুজকে অপহরণের পর হত্যা মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক ফারজানা ইয়াসমিন এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জামাল শেখ, শামীম শেখ ও রঞ্জু শেখ। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মাহমুদা খানম উষা ও বিল্লাল শেখ। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গিয়াস উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রায়ে আদালত বলেন, এটি কেবল একটি হত্যা মামলা নয়; বরং মানুষের রূপধারী কিছু অপরাধীর হিংস্রতার শিকার এক নিষ্পাপ শিশুর মর্মান্তিক পরিণতির দলিল।
আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, শবে বরাতের পবিত্র রাতে নামাজ পড়তে বের হওয়া আট বছরের মাহফুজকে অপহরণ করে মুক্তিপণের লোভে প্রায় দেড় মাস আটকে রাখা হয়। পরে অর্থ না পেয়ে নির্মমভাবে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ মেহগনি বাগানে ফেলে দেওয়া হয়।
আদালত আরও বলেন, এ ধরনের নৃশংস ও পাশবিক অপরাধ সমাজে আর কেউ যাতে করার সাহস না পায়, সেজন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যায় গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বরাশুর গ্রামের বাড়ি থেকে ভাটিয়াপাড়া রেলওয়ে জামে মসজিদে যাওয়ার পথে আট বছরের শিশু মাহফুজকে অপহরণ করে আসামিরা। পরে তারা মুক্তিপণ দাবি করে। দাবি অনুযায়ী অর্থ না পেয়ে প্রায় দেড় মাস আটকে রাখার পর ২০১২ সালের ২০ আগস্ট রাতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মাহমুদা খানম উষার বাড়িতে শিশুটিকে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে লাশ ভুক্তভোগী পরিবারের বাড়ির পাশের একটি মেহগনি বাগানে ফেলে রাখা হয়।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা ইতালি প্রবাসী ছিলেন এবং আসামিদের সঙ্গে তাদের পূর্বশত্রুতা ছিল। ঘটনার পর ২০১২ সালের ৬ জুলাই মাহফুজের মা স্বপ্না বেগম কাশিয়ানী থানায় মামলা করেন। একই বছরের ২০ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. নিজাম শিকদার আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার সিদ্ধান্তে মামলাটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ এ স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়।
বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষে ২৫ জনের মধ্যে ২৩ জন সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষে আটজন সাফাই সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আদালত মঙ্গলবার (৭ জুলাই) তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
এর আগে একই মামলায় দুই নাবালক আসামি মেহেদী ও সাদ্দামকে ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর ১০ বছর করে আটকাদেশ দেওয়া হয়েছিল।
সাভারে এনসিপির সমাবেশে ককটেল হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবলীগ নেতাকে দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) গ্রেপ্তারের পর তাদের আদালতে তোলা হলে এই রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
এর আগে দুপুরে এনসিপির সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে যুবলীগের দুই নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন- মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম (৫২) এবং সাভারের আনন্দপুর মহল্লার যুবলীগকর্মী সজীব (৩২)। তারা দুজনই সাভারের আনন্দপুর মহল্লায় বসবাস করতেন।
গ্রেপ্তার ও আদালতে প্রেরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার এসআই শাখাওয়াত ইমতিয়াজ।
এর আগে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সাভারে এনসিপি জুলাই পদযাত্রা-পরবর্তী সমাবেশে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে সোমবার (৬ জুলাই) রাতে এনসিপির ঢাকা জেলা উত্তরের সদস্য সচিব মো. সালামত উল্লাহ বাদী হয়ে সাভার মডেল থানায় অজ্ঞাত পরিচয়ে ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাতে সাভারের তারাপুর ঈদগাহ মাঠে জুলাই আন্দোলনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এনসিপির মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে পদযাত্রা ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যার পর সমাবেশ শুরু হয়। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে দলের আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা সমাবেশ স্থলে পৌঁছান।
সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা জেলা এনসিপির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার নাবিলা তাসনীম বক্তব্য দেওয়ার সময় এ বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
সমাবেশ স্থলে ককটেল হামলার পর এনসিপির নেতারা সাভার মডেল থানার সামনে অবস্থান নেন। সেখানে সমাবেশে ককটেল হামলার ঘটনায় বিক্ষোভ করছেন তারা।
রাজধানীর গুলশান-২ এলাকায় ২৭ কাঠা সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আব্দুস সালাম মুর্শেদীসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯ এর বিচারক মো. আব্দুস সালামের আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নামঞ্জুর করে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ১৯ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
এদিন সকালে কারাগারে থাকা সালাম মুর্শেদীসহ অন্যান্য আসামিদের আদালতে হাজির করা হয়। জামিনে থাকা অন্যান্য আসামিরা আদালতে হাজিরা দেন।
আসামিদের পক্ষের আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, বোরহান উদ্দীন, শাহীনুর ইসলাম খাদেমুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন আইনজীবী এই মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি চেয়ে শুনানি করেন।
শুনানি শেষে আদালত আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নামঞ্জুর করে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন।
মামলার বাকি আসামিরা হলেন রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন খাদেম, প্রকৌশলী এম আজিজুল হক, সাবেক সদস্য (এস্টেট) লে. কর্নেল (অব.) এম নুরুল হক ও সাবেক পরিচালক আবদুর রহমান ভূঁঞা।
এছাড়া সাবেক উপপরিচালক (এস্টেট) মো. আজহারুল ইসলাম, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিব উল্লাহ ও গৃহায়ন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক সহকারী সচিব আবদুস সোবহান, সাবেক শাখা সহকারী মো. মাহবুবুল হক এবং কক্সবাজারের রামুর বাসিন্দা মীর মোহাম্মদ হাসান ও তার ভাই মীর মো. নুরুল আফছার।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সরকারি কর্মচারী হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং অসৎ উদ্দেশে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত গেজেটে ‘খ’ তালিকাভুক্ত গুলশান আবাসিক এলাকার সিইএন (ডি) ২৭ নং, হোল্ডিং নং-২৯, রোড নং-১০৪ প্লটটি পরিত্যক্ত ২৭ কাঠা সম্পত্তির তালিকাভুক্ত থাকা সত্ত্বেও অবমুক্তকরণ ছাড়াই জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মিথ্যা রেকর্ড তৈরি করেন।
পরে হস্তান্তর অনুমতি ও নামজারি অনুমোদন করার মাধ্যমে সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করায় তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর সালাম মুর্শেদীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রাজনৈতিক দল হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে আওয়ামী লীগের বিচার দলটির করা আইনেই করা সম্ভব বলে জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেছেন, টানা শাসনামলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নানান অপরাধ সংঘটন করেছে। সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির দায় থেকেও দলটির শীর্ষ নেতারা বহু কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছেন এবং আইন অনুযায়ী এসবের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে। রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে নিজ কার্যালয়ের কনফারেন্স রুমে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এসব কথা বলেন।
মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছিল। আর এই দুটি আইনেই এ ধরনের অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা রয়েছে।
জামায়াতকে নিষিদ্ধের উদাহরণ টেনে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০২৪ সালের ১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ এর ১৮ ধারা ব্যবহার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। এসব কিছুই দলটি প্রণয়ন করে রেখেছিল। অন্য কোনো সরকার এমন আইন প্রণয়ন করেনি। অর্থাৎ দল নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াসহ সব ধরনের আইনই বিভিন্ন সময় শাসনব্যবস্থায় এসে সংশোধন বা প্রণয়ন করেছিল আওয়ামী লীগ। সংবিধানও সংযোজন করেছে দলটি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী বর্তমানে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। তাদের আইনটিই ব্যবহার করা হচ্ছে। অতএব দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারও এসব আইনে হবে।
জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে। নির্বিচারে ছাত্র-জনতার ওপর তাদের সরকারের বিভিন্ন বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগটি যথাযথভাবে তদন্ত করছে আমাদের তদন্ত সংস্থা। পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপরাধও আলাদাভাবে তদন্ত করার সুযোগ রয়েছে। এসব তদন্তের পর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগের প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।
হামের টিকা প্রদানে ব্যর্থতায় ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে আদেশ দিতে ১২ জুলাই দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। রোববার (৫ জুলাই) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই আদেশ দিয়েছেন।
এদিন আদালতে হামে মারা যাওয়া ৯ মাস বয়সি সাউদা মুসকানের বাবা সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলার আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে আদেশ অপেক্ষমাণ রাখেন। পরে বিকেলে মামলার বিষয়ে আদেশের জন্য ১২ জুলাই দিন নির্ধারণ করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী তাছলিমা জাহান পপি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলার আবেদনে আরও যাদের আসামি করার আবেদন করা হয়েছে তারা হলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
নথি থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিক ও মার্চের শুরুর সময়ে শরীয়তপুর সদরের নয় মাস বয়সি সাউদা মুসকান হঠাৎ মারাত্মক জ্বরে আক্রান্ত হয়। স্থানীয় চিকিৎসায় ফল না দেওয়ায় মার্চের প্রথম সপ্তাহে শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে হামের চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেয়ে শিশুটিকে মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ২২ মার্চ স্থানান্তর করা হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অসহযোগিতা ও অবহেলার অভিযোগ তুলে আবেদনে বলা হয়, বাদীর স্ত্রীর হাতে ২৬ মার্চ অক্সিজেন সিলিন্ডার ধরিয়ে দিয়ে বাচ্চার মুখে লাগাতে বলা হয়। তবে শিশুর মা ব্যর্থ হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সুইপারকে দিয়ে শিশুর মুখে তা লাগিয়ে দেয়। এর ঘণ্টা দুয়েক পরে শিশুটি মারা যায়।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, শিশুদের টিকার যোগান সময়মতো না থাকা, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া এবং টিকা কেনা ও তা দেওয়া নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মারাত্মক খামখেয়ালিপনা এবং অবহেলাজনিত কারণে দেশে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে সাউদা মুসকান অন্যতম।