কয়লার দহন মান বা ক্যালরিফিক মান ৪৬০০ হলে বিশ্ববাজারে প্রতি টনের দাম ১৫০ ডলার। জাহাজ ভাড়া ৫০ ডলার যোগ হলে প্রতি টনের দাম বড়জোর ২০০ ডলার হওয়ার কথা। কিন্তু এই মানের কয়লা আদানি গ্রুপ ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কিনছে ৩৪৭ ডলারে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ছে ২৪ টাকা ২৮ পয়সা।
অথচ বাংলাদেশের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫০৪০ ক্যালরিফিক মানের কয়লা কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছাতে খরচ পড়ছে ২৪৭ ডলার এবং কেন্দ্রটির ইউনিটপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৩ টাকার কিছু বেশি।
পায়রা ও গোড্ডার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এই খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী ২৫ বছর আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ কিনতে গিয়ে বড় অর্থঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
শুধু আদানি গ্রুপের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের দামই বেশি পড়বে, এমন নয়। আমদানি করা কয়লাচালিত পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও অনেক বেশি। এর মধ্যে আদানি ও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়াও দেয়া হয়েছে বেশি। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দেয়া হয়েছে ৪.২৫ ইউএস সেন্ট যা বর্তমান দেশি মুদ্রায় ৪.৫৪৫৪ টাকা, আর রামপালকে দেয়া হয়েছে ৪.৮৫ ইউএস সেন্ট বা দেশি মুদ্রায় ৫.১৮৭০ টাকা। আদানি ভারতের বৃহৎ গ্রুপ আর রামপালে ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান এনটিপিসির মালিকানা রয়েছে।
পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের বিরোধিতার মুখে বাগেরহাটের সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের জন্য কিছুটা ক্ষতিকর হলেও এটি কম মূল্যে বিদ্যুৎ দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় অনেক চড়া।
এমনকি সৌরবিদ্যুৎ থেকেও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। তা ছাড়া রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৩২০ মেগাওয়াটের মধ্যে ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট চালু হয় গত ডিসেম্বরে। কিন্তু ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না কারিগরি ত্রুটির কারণে। আদৌ কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চলবে কি না, তা নিয়ে এখনই প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশ্ন উঠেছে, পরিবেশের ওপর ঝুঁকি বাড়িয়ে অর্থনীতিতে নাজুক অবস্থায় ফেলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে কতটা লাভবান হবে বাংলাদেশ।
এ রকম পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা আদানি গ্রুপের কর্তাব্যক্তির সঙ্গে কয়লার দাম কমানোর বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। এ ছাড়া রামপাল কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ নতুন করে কীভাবে নির্ধারণ করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘কয়লার দাম কেন বেশি পড়ছে সেটি আমরা আলোচনা করেছি। আনুষ্ঠানিকভাবে ওদের কাছে জানতে চাইব।’ তিনি বলেন, ‘ওরা নিউ ক্যাসেল ইনডেক্সে কয়লা কিনছে। নিউ ক্যাসেল ইনডেক্সে কয়লার দাম একটু বেশি। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এই ইনডেক্স করা হয়েছে কয়লার বাজারে চীন যেন ঢুকতে না পারে।’
২০১৬ সালে আদানি গ্রুপের সঙ্গে পিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি হয়। ওই চুক্তি অনুসারে আদানি ভারতের ঝাড়খন্ডে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে, সেখানকার বিদ্যুৎ আসবে বাংলাদেশে। তখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছিল ৮.২৫ ইউএস সেন্ট। এই বিদ্যুৎ আগামী ২৫ বছর কিনবে বাংলাদেশ। ৭৫০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটে মোট ১৫০০ মেগাওয়াট স্থাপিত ক্ষমতা হবে কেন্দ্রটির।
কয়লায় কি আদানির কারসাজি?
দেশের যেকোনো বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানির যে আন্তর্জাতিক দাম সেই অর্থ পরিশোধ করে থাকে পিডিবি। বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করার সময় জ্বালানির দাম, কেন্দ্রভাড়া, কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণের অর্থ-সব মিলিয়ে বিল করা হয়। জ্বালানির দাম ছাড়া অন্য অর্থ নির্দিষ্ট থাকে, এটি বাড়ে না। ফলে কোনো বেসরকারি কেন্দ্র যদি জ্বালানির দাম বাড়তি দেখাতে পারে তাহলে ওই কেন্দ্রের বিদ্যুতের দামও বেড়ে যায়।
ভারতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা কমদামে কয়লা কিনে বেশি দাম (ওভার ইনভয়েসিং) দেখায়। বিষয়টি নিয়ে ভারতের শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ (ডিরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্ট বা ডিআরআই) ২০১৬-এর জুলাইয়ে ভারত সরকারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে বলা হয়, কয়লা আমদানিকারকরা আমদানির ক্ষেত্রে প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ বেশি দাম দেখিয়েছে। এ অর্থ তারা পাচার করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ তালিকায় আদানি ও রিলায়েন্সের নাম রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দুজন কর্মকর্তা পরিচয় গোপন রাখার শর্তে দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, ‘আদানি ৪৬০০ ক্যালরিফিক মানের কয়লার দাম দেখাচ্ছে ৩৪৬ ডলার প্রতি টন। অথচ পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র ৫০৪০ ক্যালরিফিক মানের কয়লা কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর পর খরচ পড়ছে ২৪৭ ডলার। পায়রা কয়লা কেনে অস্ট্রেলিয়ার নিউক্যাসেল ইনডেক্স অনুযায়ী, আদানিও কয়লার দাম দেখাচ্ছে নিউ ক্যাসেল ইনডেক্স অনুযায়ী। অথচ টনপ্রতি ১৫০ ডলারের বেশি দাম দেখাচ্ছে আদানি।’
তারা বলেন, ‘সম্প্রতি বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী, সচিব ও পিডিবির চেয়ারম্যান ভারতে গিয়ে আদানির কর্তাব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করেছেন। কয়লার দাম বেশি পড়ছে সেটি তারা বলে এসেছেন। এখন কীভাবে কয়লার দাম কমানো যায়, সেটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে।’
কয়লা বিদ্যুতের দাম কম পড়ছে না
আদানি গ্রুপের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে পড়বে ২৪ টাকা ২৮ পয়সা। এর মধ্যে কেন্দ্রভাড়া ধরা হয়েছে ৪.২৫ ইউএস সেন্ট যা বর্তমান দেশি মুদ্রায় ৪.৫৪৫৪ টাকা। বছরে কেন্দ্রটির ১৫০০ মেগাওয়াটের স্থাপিত ক্ষমতা বাবদ কেন্দ্রভাড়া দিতে হবে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।
রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হয়েছে ৪.৮৫ ইউএস সেন্ট বা দেশি মুদ্রায় ৫.১৮৭০ টাকা। দেশে সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রভাড়া পেয়েছে রামপাল। কেন্দ্রটি বছরে শুধু কেন্দ্রভাড়াই পাবে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।
চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে এস আলম গ্রুপের ১২২৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হয়েছে প্রতি ইউনিটে ৪.৪১ ইউএস সেন্টস বা ৪.৭১ টাকা। কেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত করা হবে ৪৬০০ ক্যালরিফিক মানের কয়লা, যার প্রতি টনের দাম ধরা হয়েছে ২৫৪.৩৮ ডলার। কেন্দ্রটি বছরে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জই পাবে ৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা। কেন্দ্রটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ১৮.৩৯ টাকা।
বরগুনায় অবস্থিত বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ার লিমিটেডের ৩০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটিতে ব্যবহৃত হচ্ছে ৪৬০০ ক্যালরিফিক মানের কয়লা। এই মানের কয়লার দাম উদ্যোক্তারা দেখিয়েছেন ২৭০ ডলার। কেন্দ্রটিকে ক্যাপাসিটি চার্জ ইউনিটপ্রতি দেয়া হয়েছে ৩.৩৯ ইউএস সেন্টস আর দেশি মুদ্রায় ৩.৯৪ পয়সা। বছরে কেন্দ্রটি ক্যাপাসিটি চার্জ পাবে ১ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম পড়ছে ১৮.৮৪ টাকা।
পটুয়াখালীর পায়রায় চীনা সরকারি প্রতিষ্ঠান সিএমসি ও সরকারের নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশনের সমান মালিকানায় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হয় ইউনিটপ্রতি ২.৬৫ ইউএস সেন্টস বা দেশি মুদ্রায় ২.৮৩ টাকা। ১২৪৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি সারা বছরে কেন্দ্রভাড়া পাবে ৩ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। এই কেন্দ্রটির বর্তমানে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি ব্যয় হচ্ছে ১৩.৩৭ টাকা। কেন্দ্রটিতে ৫০৪০ ক্যালরিফিক মানের কয়লার দাম পড়ছে ২৪৫ ডলার।
এই পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের গড় উৎপাদন ব্যয় ১৩.৩৭ থেকে ২৪.২৮ টাকা পড়ছে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সরকার সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে গড়ে ১১ ইউএস সেন্টসে বা ১১.৭৬ টাকা প্রতি ইউনিটের বিদ্যুতের দাম দিয়ে অনুমতি দিয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানির প্রয়োজন পড়ে না, ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়ে বিদেশি মুদ্রার রির্জাভের ওপর টান পড়ে না। অন্যদিকে কয়লা, গ্যাস ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি আমদানি করতে হয় ডলার দিয়ে। এতে বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর বড় টান পড়ছে।
রামপাল কি পূর্ণ সক্ষমতায় চলবে?
গত ডিসেম্বর থেকে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩২০ মেগাওয়াটের ৬৬০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। এই কেন্দ্রটির স্থাপিত ক্ষমতা ধরা হয়েছে ৬১৭ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কেন্দ্রটি একাধিকবার যান্ত্রিক কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।
নাম-পরিচয় গোপন রাখার শর্তে পিডিবির এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাকে বলেছেন, ‘কেন্দ্রটি চালু হওয়ার পর কখনোই ৬১৭ মেগাওয়াট ক্ষমতায় চালু করতে পারেনি। কেন্দ্রটি ৫৪০ মেগাওয়াটের ওপর উৎপাদন করতে গেলেই বয়লারের মধ্যে থাকা টিউব ফেটে যায়। এই কেন্দ্রটির উৎপাদনে থাকা প্রথম ইউনিটটি তার পূর্ণসক্ষমতা বা কেন্দ্রভাড়া পাবে যে স্থাপিত ক্ষমতার ভিত্তিতে, সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে না। রামপালের ক্যাপাসিটি ৬১৭ মেগাওয়াট ধরা হয়েছে, আর উৎপাদন করতে পারে সর্বোচ্চ ৫৪০। কেন্দ্রটি ঘোষিত স্থাপিত ক্ষমতার অন্তত ৭০ মেগাওয়াট কম করে থাকে। এই ৭০ মেগাওয়াট ক্যাপাসিটি চার্জ তৃতীয় পক্ষ দিয়ে নিরীক্ষা না হলে রামপাল বছরে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা বেশি নেবে।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভাগ এখন কেন্দ্রটির ক্যাপাসিটি চার্জ নতুন করে নির্ধারণ করতে চায়। বিদ্যুৎ বিভাগ বিদেশি প্রতিষ্ঠান দিয়ে কেন্দ্রটির স্থাপিত ক্ষমতা নিরীক্ষা করবে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি অধ্যাপক এম শামসুল আলম দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো আমাদের ডলারের মজুতের ওপর টান বসিয়েছে, আগামীতে আরও বসাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রির্জাভে বড় সংকট তৈরি করবে। আর কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ, কয়লার দাম অনেক বেশি। আদানির কেন্দ্রতো রীতিমতো ভয়াবহ। এ রকম পরিস্থিতিতে এসব কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ও জ্বালানির দামের বিষয়ে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তৃতীয় পক্ষকে যুক্ত করে বোঝা দরকার।’
তিনি বলেন, ‘কয়লা সস্তা বলে সরকার ব্যাপক আকারে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করল। এখন দেখা যাচ্ছে কয়লার চেয়ে সৌরবিদ্যুতের দাম কম। আমাদের কম দামে দেশীয় জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ বড় সহায় হতে পারে।’
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী (ভিডিপি) সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাহিনীটির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। সোমবার সকালে গাজীপুরের সফিপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি একাডেমিতে ভিডিপির ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি জানান যে, দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আনসার বাহিনীর কঠোর নজরদারি বজায় রয়েছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা প্রশাসনের অন্যান্য সকল বিভাগের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করছেন। বিশেষ করে নির্বাচনী ডিউটির জন্য আনসার সদস্যদের উন্নত ও দক্ষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে যাতে তাঁরা যেকোনো পরিস্থিতি সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারেন।
মহাপরিচালক তাঁর বক্তব্যে আনসার বাহিনীর ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, দেশ ও জাতির প্রতিটি সংকটে এই বাহিনী সবসময় সম্মুখসারিতে থেকে দায়িত্ব পালন করেছে। মহামারি থেকে শুরু করে ভয়াবহ বন্যা কিংবা অন্যান্য জাতীয় দুর্যোগ—সব ক্ষেত্রেই আনসার সদস্যরা তাঁদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। এমনকি সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল, তখন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও কেপিআই স্থাপনার নিরাপত্তা রক্ষায় আনসার বাহিনী অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছে। দেশপ্রেম ও নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই এই বাহিনী সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে মেজর জেনারেল সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, বর্তমান সরকার এই বাহিনীর সদস্যদের মানোন্নয়নে অত্যন্ত আন্তরিক। আনসার ও ভিডিপির সদস্যদের আরও বেশি দক্ষ ও আধুনিক শক্তিতে পরিণত করার লক্ষ্যে দেশে এবং বিদেশের মাটিতে উন্নত প্রশিক্ষণের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক রণকৌশল আয়ত্ত করার মাধ্যমে আনসার বাহিনীকে একটি যুগোপযোগী পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। সরকারি সহায়তায় বাহিনীর সকল সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কাজও চলমান রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে এবং কেক কাটার মাধ্যমে কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তীতে একটি সুসজ্জিত র্যালি একাডেমির ইয়াদ আলী প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে বের হয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক প্রদক্ষিণ করে। অনুষ্ঠানে বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আনন্দঘন পরিবেশে উৎসবের আমেজ লক্ষ্য করা যায় এবং বাহিনীর সদস্যরা নতুন করে দেশসেবার শপথ গ্রহণ করেন।
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ‘মব’ বা গণপিটুনির আড়ালে আইনজীবী নাঈম কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি জোবায়ের হোসেন পাপ্পুকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১। গতকাল রবিবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজধানীর বারিধারা এলাকায় এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। র্যাব প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত জোবায়ের হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। গত ৩১ ডিসেম্বর বর্ষবরণের রাতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে, যা পরবর্তীতে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, আইনজীবী নাঈম কিবরিয়া গত ১৭ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তাঁর এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। ইংরেজি নববর্ষের আগের রাতে অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর রাত ৯টার দিকে তিনি তাঁর আত্মীয়ের ব্যবসায়িক অংশীদারের একটি প্রাইভেটকার নিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ঘুরতে বের হন। পথিমধ্যে একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কিছু যুবকের সঙ্গে তাঁর বাদানুবাদ হয়। একপর্যায়ে ওই মোটরসাইকেলের সঙ্গীরা ও অন্যান্য কিছু যুবক একত্রিত হয়ে গাড়ি থেকে নাঈমকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এই মর্মান্তিক ঘটনায় পরবর্তীতে রাজধানীর ভাটারা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
এদিকে, সহকর্মী নাঈম কিবরিয়ার এমন নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হয়েছেন রাজধানী ঢাকার আইনজীবীরা। গতকাল পুরান ঢাকার ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ের সামনে ‘সচেতন আইনজীবী সমাজ’-এর ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা বর্তমান সমাজে ‘মব কালচার’ বা বিচারহীনতার এক ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশ। আইনজীবীরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে সকল আসামির ফাঁসি নিশ্চিত করার দাবি জানান। বর্তমানে গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং বাকি জড়িতদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন আগামী ১১ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছাবেন। মার্কিন সিনেট কর্তৃক তাঁর নিয়োগ চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হওয়ার পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশে আসছেন। এই পদের জন্য মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে এক প্রতিক্রিয়ায় ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন নিজেকে সম্মানিত বোধ করছেন বলে জানান এবং তাঁকে এই সুযোগ দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এর আগে গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য মনোনীত করেছিলেন, যা পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।
একজন পেশাদার ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক হিসেবে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের জন্য বাংলাদেশ কোনো নতুন কর্মস্থল নয়। ইতিপূর্বে তিনি ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলর হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা রয়েছে। তিনি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অষ্টাদশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন এবং পিটার হাসের স্থলাভিষিক্ত হবেন। উল্লেখ্য যে, পিটার হাস ২০২৪ সালের এপ্রিলে তাঁর দায়িত্বকাল শেষ করে ফিরে যাওয়ার পর থেকে ঢাকার মার্কিন মিশনে দীর্ঘ সময় কোনো পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত ছিলেন না।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে তাঁর এই আগমন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে একটি নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিয়ে যখন দেশি-বিদেশি নানা মহলের পর্যবেক্ষণ রয়েছে, তখন তাঁর এই নিয়োগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওয়াশিংটনের সাথে ঢাকার বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে তাঁর এই অভিজ্ঞ মিশন বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। আগামী ১১ জানুয়ারি থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করবেন।
রাজধানীতে লাইনের গ্যাসের চাপ একেবারে কমে গেছে। চাপ কম থাকায় দুই চুলা একসঙ্গে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। যে এক চুলা জ্বালানো যাচ্ছে, তাতে রান্না তো দূরের কথা, দিনের বেলা পানিও ঠিকমতো গরম করা যাচ্ছে না। ফলে বাসাবাড়িতে রান্নার একমাত্র ভরসা এলপিজি সিলিন্ডার; কিন্তু তাতেও দেখা দিয়েছে তীব্র সংকট। গ্রাহক পর্যায়ে চাহিদা থাকলেও এলাকার খুচরা দোকানগুলোয় মিলছে না বাসাবাড়িতে বেশি ব্যবহৃত এ গ্যাসের সিলিন্ডার। ফলে দোকানে দোকানে ঘুরছেন গ্রাহকরা। আবার কোথাও কোথাও পাওয়া গেলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অনেককেই হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। এই অবস্থায় নতুন বছরের শুরুতেই সাধারণ গ্রাহকদের জন্য দুঃসংবাদ নিয়ে এল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। জানুয়ারি মাসের জন্য ভোক্তাপর্যায়ে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) বিইআরসি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই নতুন দাম ঘোষণা করেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিইআরসির সদস্য (গ্যাস) মিজানুর রহমান, সদস্য মো. আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ।
বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা যে দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছি, ভোক্তা একদম সেই দামেই যে পণ্যটা কিনতে পারবে, সে নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারছি না। যে কোম্পানিগুলো এলপিজি ইমপোর্ট করে থাকে, তাদের যাবতীয় খরচ হিসাব করেই আমরা দামটা নির্ধারণ করে দিই। অ্যাসোসিয়েশন আমাদের বলছে, নির্ধারিত দামেই তারা পণ্যটা সরবরাহ করছে।এছাড়া আমরা ভোক্তা অধিকারেও কথা বলেছি, যাতে তারা উচ্চমূল্য প্রতিরোধে অভিযান পরিচালনা করে। আর উচ্চমূল্যের বিষয়ে যদি কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেব।
জালাল আহমেদ বলেন, পণ্যবাহী জাহাজের সমস্যাটা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে হচ্ছে। আমি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিদের বলেছি, তারা যেন সিঙ্গাপুর থেকে আমদানিটা বাড়ায়। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে জাহাজের ঘাটতি আছে। এছাড়া এলসি ইস্যু নিয়েও সমস্যাটা হচ্ছে যে, কোম্পানিগুলো এলসি খুলতে পারছে, কিন্তু পণ্য আনতে পারছে না। এরপরেও যদি কেউ এলসি খোলা নিয়ে জটিলতায় পড়ে, সেক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
কমিশন জানিয়েছে, রোববার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা থেকেই এই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এর আগে গত ডিসেম্বর মাসেও এলপিজির দাম ৩৮ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ২৫৩ টাকা এবং অটোগ্যাসের দাম ১.৭৪ টাকা বাড়িয়ে ৫৭.৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ, পর পর দুই মাস রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।
জানা যায়, গ্যাসের চাপ কম রয়েছে পুরো রাজধানী জুড়েই। কোথাও কম, কোথায় বেশি। রাজধানীর মতিঝিল, গোপীবাগ, টিকাটুলী, হাটখোলা, ওয়ারিসহ পুরান ঢাকার প্রায় সব এলাকায় গ্যাসের স্বল্প চাপ রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি সংকটের তথ্য পাওয়া গেছে, বনশ্রী, মিরপুরের কিছু এলাকা, শেওড়াপাড়া, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাসাবো, মুগধা, মান্ডা, মানিকনগর, বাড্ডা, বিশ্বরোপ, মৌচাক, মগবাজার, ইস্কাটন, আজিমপুর এলাকায়।
আজিমপুরের বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা সাঈদা আনোয়ার বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে সারাদিন গ্যাস একেবারেই ছিল না। শনিবার সকাল থেকে নিভু নিভু জ্বলছে চুলা। তবে তা রান্নার মতো না।
ভাষানটেক এলাকার বাসিন্দা নাজিম উদ্দীন বলেন, গত শুক্রবার সারাদিন গ্যাস ছিল না। সন্ধ্যার পর পাওয়া গেলেও গ্যাসের চাপ কম ছিল। আবার শনিবার সকাল থেকেও ছিল না।
কলাবাগান এলাকার মাসউদুর রহমান বলেন, গ্যাসের চাপ একেবারেই কম গত তিনদিন ধরে। যে গ্যাস চুলায় আসছে, এতে দুই চুলা একসঙ্গে জ্বালিয়ে রান্না করা মুশকিল।
গ্যাস সংকটের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও শেয়ার করেছেন অনেকে।
আনিসুর রহমান লিখেছেন, ‘ঢাকায় মোটামুটি সবার, সব অঞ্চলেই গ্যাস নেই।’
নাসরিন সুলতানা পিংকি লিখেছেন, ‘আমার ঘরে আছে খুব আস্তে আস্তে খিচুরি রান্না হয়েছে দেড় ঘন্টায়।’
মোরসালিন বাবলা লিখেছেন, ‘বনশ্রীতে গ্যাসের সংকট।’
অনু হকের বাসা পূর্ব তেজতুরি বাজার। তিনি লিখেছেন, ‘আমার বাসায় তো একদমই আসে না, আগে রাতে যা-ও একটু আসত, এখন সেটাও আসে না।’
রেজিনা লিনু লিখেছেন, ‘আমি পল্লবি থাকি, সকাল সাতটায় উঠে দেড় ঘন্টা ধরে গ্যাসের চুলায় চা করেছেন।
তাপসী রাবেয়া আঁখি লিখেছেন, তার বাসায় গ্যাস নেই।
অরণ্য অশ্রু নামের একজন লিখেছেন, তিনি শ্যামলী থাকেন, সারাদিন তার বাসায় গ্যাস থাকে না।
বনানী-১ নম্বর থেকে মাহমুদুল হাসান নিবিড় লিখেছেন, ‘গ্যাসের চাপ একেবারেই কম।’
হাজারিবাগ থেকে শামীম আহমেদ লিখেছেন, ‘সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত গ্যাস থাকে না, রাতে রান্না করতে হচ্ছে।’
রুদ্র নামের একজন ধানমন্ডি ১৯ থেকে লিখেছেন, গত তিন মাস ধরে তার বাসায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের চাপ একেবারে কম থাকে।
রাব্বী সিদ্দিকী শেওড়াপাড়া থেকে লিখেছেন, তার বাসায় গ্যাসের চাপ কম।
ওয়ারি থেকে রাজিব লিখেছেন, পুরান ঢাকার প্রায় বাসাতেই নেই।
কিশোর রায় মালিবাগ থেকে লিখেছেন, তার বাসায় গ্যাস নেই বললেই চলে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ‘তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন’ এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক (সিস্টেম অপারেশন বিভাগ-ঢাকা-মেট্রো) মো. মনজুর আজিজ মোহন বলেন, ‘তিতাসের সকল গ্রাহকরাই সাময়িক এই ভোগান্তিতে রয়েছে। শিগগিরই সংকট কেটে যাবে। রোববার (৪ জানুয়ারি) থেকে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে।
গ্যাসের এই স্বল্প চাপ শুধু রাজধানীতেই নয়, এ পরিস্থিতি গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জেও। গত দুইদিন ধরে এ সকল এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট। কিছু কিছু এলাকায় চুলা জ্বলছেই না।
এ প্রসঙ্গে তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও অপারেশন ডিরেক্টর আঞ্চলিক বিক্রয় ডিভিশন নারায়ণগঞ্জ প্রকৌশলী মো. সেলিম মিঞা বলেন, এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য গত দুই দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তার নিজের বাসাতেও গ্যাস সংকট উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিন দিনের কথা বলা হয়েছিল। সে হিসাবে ৫ জানুয়ারি আজ থেকে স্বাভাবিক হওয়ার কথা।’
তিতাস সূত্রে জানা যায়, তিতাসের বিতরণ এলাকায় ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রতিদিন সরবরাহ করা হয়। এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের কারণে তা ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ কম হচ্ছে। সে কারণে কিছু এলাকায় গ্যাস সংকট তীব্র হয়েছে। আবার কিছু এলাকায় লাইনে সমস্যা থাকায় আগে থেকেই সেসব এলাকায় গ্যাসের চাপ কম, কোথাও কোথাও সরবরাহও ঠিক মতো করা যাচ্ছে না।
তিতাসের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এমনিতেই গ্যাসের সংকট রয়েছে। শীত মৌসুমে গ্যাসের সংকট বেশি দেখা দেয়। এরমধ্যে এলএনজি টার্মিনালের কাজ চলছে, সে কারণে সরবরাহ বন্ধ। সব মিলিয়ে সরবরাহের জন্য আমাদের যে চাহিদা তার চেয়ে অনেক কম পাচ্ছি। যে কারণে আবাসিকে বেশি চাপ দেখা দিয়েছে।’
কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এলএনজি সরবরাহ শুরু করলে হয়তো গ্যাসের চাপ বাড়বে। তার জন্যও আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।’
এদিকে, জানুয়ারি মাসের জন্য অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৫৭ টাকা ৩২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৮ পয়সা বাড়িয়ে ৫৯ টাকা ৮০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দামও রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
এলপিজির দাম বাড়ায় বাসাবাড়িতে রান্নার খরচ যেমন বাড়বে, তেমনি অটোগ্যাস ব্যবহারকারী যানবাহনের পরিচালন ব্যয়ও কিছুটা বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি। এলপিজি তৈরির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়।
প্রতি মাসে এলপিজির এই দুই উপাদানের মূল্য প্রকাশ করে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরামকো। এটি সৌদি কার্গো মূল্য (সিপি) নামে পরিচিত। এই সৌদি সিপিকে ভিত্তিমূল্য ধরে দেশে এলপিজির দাম সমন্বয় করে বিইআরসি। আমদানিকারক কোম্পানির চালান (ইনভয়েস) মূল্য থেকে গড় করে পুরো মাসের জন্য ডলারের দাম হিসাব করে বিইআরসি।
রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাসভবন এলাকা থেকে দুই ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ ও চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)। রোববার সকালে পৃথক দুটি ঘটনায় তাঁদের আটক করা হয়। পুলিশ সূত্র জানায়, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে গুলশানের ১৯৬ নম্বর রোডে অবস্থিত তারেক রহমানের বাসভবনের সামনে থেকে মো. রুহুল আমিন নামের ৪৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। আটক রুহুল আমিন নিজেকে চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার বাসিন্দা বলে পরিচয় দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি ওই বাসভবন ও সামনে থাকা গাড়িগুলোর বিভিন্ন দিক থেকে সন্দেহজনকভাবে ছবি তুলছিলেন। বিষয়টি সিএসএফ এবং দায়িত্বরত পুলিশের নজরে এলে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আটক করা হয়।
প্রথম ব্যক্তিকে আটকের কিছুক্ষণ পরেই বেলা ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে একই বাসভবনের সামনে থেকে মো. ওমর ফারুক নামের দ্বিতীয় এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। যদিও তাঁর বিস্তারিত পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে সন্দেহভাজন হিসেবে তাঁর দেহ তল্লাশি করে দুই পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। গুলশান থানা সূত্রে জানা গেছে, আটক হওয়া দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তারেক রহমান দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফেরার পর থেকে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাসভবন ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সিএসএফ কড়া নজরদারি বজায় রাখছে। বাসভবন এলাকায় অপরিচিত ব্যক্তিদের আনাগোনা এবং সন্দেহজনক আচরণের বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে জাতীয় পার্টির (জাপা) সাবেক মহাসচিব এবং বর্তমান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মুজিবুল হক চুন্নুর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। রবিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা এই সিদ্ধান্ত জানান। চুন্নুর মনোনয়নপত্র বাতিলের পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে; তাঁর সমর্থিত জাপার একাংশের মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদারের স্বাক্ষর সংক্রান্ত জটিলতা এবং ব্যাংক ঋণখেলাপি হওয়া। একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লার মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে, কারণ তাঁর জমা দেওয়া ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের তথ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে।
কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে চুন্নু ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে এম আলমগীরের ১ শতাংশ ভোটারের তথ্যে গরমিল এবং গণতন্ত্রী পার্টির দিলোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার দলীয় প্রধানের স্বাক্ষর জটিলতায় তাঁদের প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে এই আসন থেকে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, জামায়াতে ইসলামীর জেহাদ খান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আলমগীর হোসাইনসহ ছয়জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ বলে গৃহীত হয়েছে। ফলে এই আসনে জাতীয় পার্টির হেভিওয়েট প্রার্থীর অনুপস্থিতিতে নির্বাচনী সমীকরণ নতুন দিকে মোড় নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই দিনে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনেও বড় ধরনের রদবদল ঘটেছে। এই আসনে জেলা বিএনপির সাবেক স্পেশাল জজ মো. রেজাউল করিম খান, সাবেক সহসভাপতি রুহুল হোসাইন এবং সাবেক জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলসহ ছয়জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই ১ শতাংশ সমর্থকের তথ্যে ত্রুটি পাওয়া গেছে। তবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর মোছাদ্দেক ভূঞাসহ সাতজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ-২ (পাকুন্দিয়া-কটিয়াদী) আসনে বিএনপির আইনজীবী জালাল উদ্দীন ও জামায়াতের শফিকুল ইসলামের মনোনয়ন বৈধ হলেও গণ অধিকার পরিষদের শফিকুল ইসলামসহ পাঁচজনের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, শনি ও রবিবার মিলিয়ে কিশোরগঞ্জের মোট ছয়টি সংসদীয় আসনের ৬১ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে তথ্যে ভুল, স্বাক্ষর না থাকা, ঋণখেলাপি এবং ভোটার তালিকায় অসংগতির মতো নানা কারণে ২৫ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়া এই প্রার্থীরা এখন নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ পাবেন। গত দুই দিনে এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের ঘটনায় কিশোরগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে হেভিওয়েট প্রার্থীদের ছিটকে পড়া নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। বর্তমানে বৈধ প্রার্থীরা তাঁদের প্রচারণার পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন।
প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন যে, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) পদ্ধতি কোনোভাবেই বন্ধ করা হবে না। রবিবার দুপুরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবন পরিদর্শন শেষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি সরকারের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির কথা বিবেচনা করে ইতিমধ্যে মোবাইল আমদানিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুল্ক কমানো হয়েছে। ফলে এখন আর এনইআইআর বন্ধ করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। গ্রাহকের ব্যবহৃত হ্যান্ডসেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশের যোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই পদ্ধতি সচল রাখা অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব তাঁর বক্তব্যে দেশের মোবাইল বাজারের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে, বর্তমানে প্রতিবছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ মোবাইল সেট আমদানি করা হয়, তার প্রায় অর্ধেকই কোনো না কোনোভাবে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে দেশে আসছে। এই অবৈধ সেটগুলোর একটি বড় অংশই নকল, কপি অথবা পুরনো সেট, যা পরবর্তীতে নতুন বডি বা কেসিং লাগিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের কাছে নতুন হিসেবে প্রতারণামূলকভাবে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে সাধারণ ক্রেতারা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এই ধরনের জালিয়াতি এবং অসাধু ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড আর চলতে দেওয়া হবে না বলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এনইআইআর পদ্ধতি এই অরাজকতা বন্ধে একটি ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
সম্প্রতি বিটিআরসি ভবনে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার ঘটনা নিয়েও কথা বলেন বিশেষ সহকারী। তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, যারা বিটিআরসি ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে, তাদের শনাক্ত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা হবে। সরকারি সম্পদ নষ্ট করা এবং রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেওয়াকে কোনোভাবেই ক্ষমা করা হবে না। তিনি আরও যোগ করেন যে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একটি উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। গ্রাহকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার যেকোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হবে না। ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের শুল্ক হ্রাসের সুযোগ গ্রহণ করে বৈধ পথে ব্যবসা করার আহ্বান জানান তিনি। মূলত রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বাজারে মানসম্মত মোবাইল হ্যান্ডসেট নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
রাজধানীর কারওয়ানবাজার এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের পূর্বনির্ধারিত সড়ক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আজ রবিবার সকাল ১১টার দিকে ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ’ (এমবিসিবি)-এর ব্যানারে কয়েকশ ব্যবসায়ী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সার্ক ফোয়ারা মোড়ে অবস্থান নিলে আশপাশের সড়কগুলোতে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীদের এই কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড এবং লাঠিচার্জ ব্যবহার করে তাঁদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। পুলিশের এই অ্যাকশনের ফলে পুরো এলাকায় মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যবসায়ীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। দুপুর পর্যন্ত ওই এলাকায় তীব্র যানজট ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করতে দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি নিয়ে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা, মোবাইল ফোন আমদানির প্রক্রিয়া সহজতর করা এবং আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমান করের হার কমিয়ে আনা। এছাড়া বিটিআরসি কার্যালয়ে সাম্প্রতিক ভাংচুরের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিও জানান তাঁরা। আন্দোলনরত ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বর্তমানে এনইআইআর কার্যক্রম এবং আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্কের ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা পথে বসার উপক্রম হয়েছেন, যার ফলে তাঁরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
এর আগে গত শনিবার এমবিসিবির পক্ষ থেকে এই অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের সব মোবাইল ফোনের দোকান বন্ধ রাখার ডাক দেওয়া হয়। সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের যৌক্তিক দাবিদাওয়া পূরণ না হবে এবং আটক ব্যবসায়ীদের মুক্তি দেওয়া না হবে, ততক্ষণ এই ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ব্যস্ততম সড়কে অবস্থান নিয়ে জনভোগান্তি সৃষ্টি করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধ করতেই তাঁরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে কারওয়ানবাজার ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দেশজুড়ে মোবাইল ফোনের দোকান বন্ধ থাকায় সাধারণ ক্রেতারা প্রয়োজনীয় সেবা ও হ্যান্ডসেট কিনতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসান রানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত মূল আসামিকে গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. জুয়েল রানা। রোববার সকালে রাজধানীর ফার্মগেট মোড়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই তথ্য জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই স্পর্শকাতর মামলাটিতে ইতিমধ্যে দুইজনকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একজনকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং অন্যজনকে থানা পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রধান আসামির প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর অভিযোগ আনা হলেও এডিসি তা নাকচ করে দিয়ে বলেন, আসামিকে আইনের আওতায় আনতে ডিবি ও থানা পুলিশের একাধিক ইউনিট নিরলসভাবে কাজ করছে এবং আশপাশের সব থানাকে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
মামলার আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে এডিসি জুয়েল রানা জানান, ঘটনার শুরুতে মামলাটি দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় গুরুতর আঘাতের অভিযোগ হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে আহত শিক্ষার্থীর মৃত্যু হওয়ায় মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়েছে এবং এখন এটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, দেশের উন্নয়নে শিক্ষার্থীদের বড় অবদান রয়েছে এবং তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি পুলিশের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন এবং মূল অপরাধীকে গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এবং অপরাধী যেন পালিয়ে যেতে না পারে সে লক্ষ্যে কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, সতীর্থ হত্যার বিচারের দাবিতে রোববার সকাল সোয়া দশটা থেকে তেজগাঁও কলেজসহ আশপাশের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ফার্মগেট মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। এই অবরোধের ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে প্রায় তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। শিক্ষার্থীদের শান্ত করতে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক করতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আসামিদের দ্রুত গ্রেফতারের প্রতিশ্রুতি দেন। বর্তমানে মামলার তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং পুলিশ আশাবাদী যে খুব শীঘ্রই প্রধান আসামিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব মাহদী হাসানকে আটকের প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর জামিন দিয়েছেন আদালত। আজ রবিবার সকালে হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-৩ আব্দুল মান্নানের আদালতে তাঁর জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আদালত উভয় পক্ষের শুনানি শেষে মাহদী হাসানের জামিন মঞ্জুর করেন। মাহদীর আইনজীবী এমএ মজিদ বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। এর আগে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। মাহদী হাসানের জামিনের খবর ছড়িয়ে পড়লে আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছাত্র-জনতার মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে এবং তারা উল্লাস প্রকাশ করেন।
এর আগে শনিবার রাতে হবিগঞ্জ শহরের শাস্তোনগর এলাকা থেকে মাহদী হাসানকে আটক করে শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশ। আটকের পর তাঁকে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানায় নেওয়া হলে তাঁর মুক্তির দাবিতে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা থানার সামনে জড়ো হয়ে রাতভর বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। কেবল হবিগঞ্জেই নয়, মাহদী হাসানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ঢাকার শাহবাগেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। রবিবার সকালে মাহদীকে আদালতে হাজির করার সময় আদালত প্রাঙ্গণে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় এবং সকাল থেকেই সেখানে আন্দোলনের কর্মীরা ভিড় জমাতে শুরু করেন।
পুরো ঘটনার সূত্রপাত গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে শায়েস্তাগঞ্জ থানা পুলিশ কর্তৃক স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতাকে আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই ছাত্রলীগ নেতাকে মুক্ত করার দাবিতে গত শুক্রবার মাহদী হাসানের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসির কক্ষে অবস্থান নেন। সে সময় ওসির সঙ্গে মাহদী হাসানের উত্তপ্ত বাদানুবাদের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে মাহদী হাসানকে জুলাই আন্দোলনের দোহাই দিয়ে ওসির ওপর চাপ প্রয়োগ করতে দেখা যায়। তিনি আন্দোলনের সময় বানিয়াচং থানা পুড়িয়ে দেওয়া এবং এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পুড়িয়ে মারার কথা উল্লেখ করে ওসিকে প্রচ্ছন্ন হুমকি প্রদান করেন। ওই ভিডিওটি দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আজ তিনি আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেলেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন যে, ওসমান হাদি হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। শনিবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই কথা বলেন। উপদেষ্টা উল্লেখ করেন যে, আসামিদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে এবং এ ক্ষেত্রে আইনি সব পথ খোলা রাখা হয়েছে। যদিও আসামিদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে এখনো শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে প্রাথমিক তথ্যে ধারণা করা হচ্ছে যে তারা সীমান্ত পার হয়ে পালিয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, বিচার প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো করার কোনো সুযোগ নেই, বরং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
এর আগে শনিবার সকালে মুন্সীগঞ্জ সফরের শুরুতে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা শহরের দক্ষিণ কোটগাঁওয়ে অবস্থিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এই সময় তিনি শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তাঁদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি উত্তর ইসলামপুর এলাকায় গিয়ে জুলাই আন্দোলনে শহীদ তিনজনের কবর জিয়ারত করেন এবং শহীদদের পরিবারের খোঁজখবর নেন। শহীদ পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন যে, তাঁদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া হবে না এবং সরকার তাঁদের সব সময় পাশে থাকবে। উপদেষ্টার এই সফর স্থানীয় মানুষের মাঝে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করে।
সফরের শেষ অংশে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানদের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। সভায় জেলার সার্বিক প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতিশীলতা এবং জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী এবং পুলিশ সুপার মো. মেনহাজুল আলম পিপিএমসহ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন যেন তাঁরা অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করেন। এই সফরের মাধ্যমে তিনি যেমন শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তেমনি স্থানীয় প্রশাসনের কাজেও নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলার অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সদস্য সচিব মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হবিগঞ্জ সদর থানা পুলিশ এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে হেফাজতে নেয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার ইয়াছমিন খাতুন জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই গ্রেপ্তারের পর হবিগঞ্জ জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং সদর থানা এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, গত শুক্রবার দুপুরে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সামনে অত্যন্ত উসকানিমূলক এবং বিতর্কিত মন্তব্য করেন মাহদী হাসান। তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, বিগত সময়ে তাঁরা থানা পুড়িয়ে দিয়েছেন এবং এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন। ওসির সঙ্গে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে তিনি তাকে সরাসরি হুমকি প্রদান করেন এবং এই পুরো ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে মাহদী হাসানকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
মাহদী হাসানের এমন দম্ভোক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় গত দুই দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। ছাত্র আন্দোলনের একজন দায়িত্বশীল নেতার মুখে এমন সহিংস বক্তব্য আন্দোলনের মূল চেতনার পরিপন্থী হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে গণ্য হয়। এই বিতর্কিত ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে এল। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দায়ের করা হবে এবং উসকানিমূলক বক্তব্য বা অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মহিউদ্দিন রনির মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। শনিবার বিকেলে সেগুনবাগিচায় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ঢাকা মহানগরীর আওতাধীন আসনগুলোর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা এই ঘোষণা দেন। রনি রেলওয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছিলেন, তবে নির্বাচনী লড়াইয়ের প্রাথমিক ধাপে আইনি জটিলতার কারণে তাঁর প্রার্থিতা বর্তমানে সংকটের মুখে পড়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত নিয়মনীতি সঠিকভাবে প্রতিফলিত না হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মনোনয়নপত্র বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে মহিউদ্দিন রনি সাংবাদিকদের জানান যে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তিনি প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর জমা দিলেও নির্বাচন কমিশন যখন দৈবচয়ন ভিত্তিতে ১০ জন ভোটারের তথ্য যাচাই করতে যায়, তখন সেখানে বিপত্তি ঘটে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ওই ১০ জনের মধ্যে ২ জন স্থানীয় ভোটারকে তাদের নির্ধারিত ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই অসংগতির ওপর ভিত্তি করেই রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর দাখিলকৃত মনোনয়নপত্রটি অবৈধ বলে গণ্য করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মহিউদ্দিন রনি। তিনি অভিযোগ করে বলেন যে, যদিও ফ্যাসিস্ট সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, কিন্তু তাদের দোসররা এখনো প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে লুকিয়ে আছে এবং তাদের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। রনি মনে করেন, তাঁর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্যই এমন ঠুনকো অজুহাতে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি চুপ করে থাকবেন না বরং ন্যায়বিচারের আশায় উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। ইতিমধেই তিনি আইনি পরামর্শ গ্রহণ করে আপিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন এবং তিনি আত্মবিশ্বাসী যে উচ্চতর কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেবে। বর্তমানে ঢাকা-১৮ আসনে তাঁর এই প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা চলছে।