সাহিদা যেদিন চাকরিচ্যুত হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন, তার গর্ভের শিশুর বয়স তখন চার মাস। গর্ভধারণ করলেও অন্য কর্মীদের মতোই কাজ করে যাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু তার পোশাক কারখানার কর্তৃপক্ষ মনে করতে শুরু করে, অন্য কর্মীদের তুলনায় তার কাজের পরিমাণ কমেছে। তাই এক দিনের নোটিশে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয় তাকে। পরের দিন সাহিদা যখন ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাস ধরছিলেন, তখন তার কাছে মাত্র ৭০০ টাকা।
সাহিদা ভেবেছিলেন গর্ভবতী অবস্থায় আরও কয়েক মাস চাকরি করে যেতে পারবেন। সেই টাকা সঞ্চয় করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখাবেন। কিন্তু তা হয়নি। চাকরি টিকিয়ে রাখতে গর্ভপাতের কথাও একবার তার মাথায় এসেছিল। উত্তরবঙ্গের জেলা সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকার উত্তরখানে মালেক নামের এক পোশাক কারখানায় কাজ করতে আসা সাহিদা এই প্রতিবেদককে বলেন, তার কাছে এই গর্ভধারণ অভিশাপ হয়ে এসেছিল।
রপ্তানিমুখী হলেও বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশেই গড়ে উঠেছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম জেলায় ৩ হাজার ২০০-এর বেশি কারখানায় কর্মরত আছেন ২৫ লাখের বেশি শ্রমিক। এর ১৫ লাখই নারী। তাদের সবাই প্রায় বয়সে তরুণী। প্রথম সন্তান জন্মের আগেই পোশাক কারখানায় কাজ করতে আসেন তারা।
‘শ্রম আইন-২০০৬’-এ মাতৃত্বকালীন ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কথা বলা থাকলেও পোশাক কারখানাগুলোর হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র তা মানে। উল্টো গর্ভধারণ করলে চাকরিচ্যুত করে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো, যদিও প্রতিষ্ঠানের মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করতে চান না।
চাকরি হারানোর ভয়ে অনেক কর্মীই গর্ভধারণ পিছিয়ে দেন। অনেকে আবার বিলম্বিত বয়সে গর্ভধারণ করতে গিয়ে শারীরিক জটিলতার মধ্যে পড়েন বলে অভিযোগ করেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নেত্রী জলি তালুকদার বলেন, ‘কয়েকটা গার্মেন্টস ছাড়া অধিকাংশ কারখানাই মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা দিতে চায় না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে এমন দাবি করতে গেলে হয়রানিসহ চাকরি হারাতে হয়। তাদের বিরুদ্ধে আবার অভিযোগ দিতে গেলে সেখানেও মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। সুবিধা পাওয়ার আশ্বাস মেলে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পোশাকশিল্পে গর্ভধারণ করা নারী কর্মীর চাকরি হারানোর সংখ্যা মোটেও কম নয়। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা পড়া অভিযোগের বাইরে এ রকম ঘটনার সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে পোশাককর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। আবার যারা অভিযোগ করেন, তাদের ক্ষুদ্র একটি অংশই প্রতিকার পেয়েছেন।
গত এক মাসে ঢাকা, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) নথিভুক্ত পোশাক কারখানার ও সাব-কন্ট্রাক্ট প্রতিষ্ঠান মিলে ১০টি কারখানা থেকে চাকরি হারানো ১০ জন ও গর্ভধারণ অবস্থায় কাজ করা চারজনসহ মোট ১৪ জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদক কথা বলেছেন। চাকরি হারানোদের মধ্যে আটজন বেকার হয়ে গ্রামে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তিন বছর বেকার থাকার পর আবার কাজে যোগ দিয়েছেন দুজন। আর কাজ চালিয়ে যাওয়া চারজন জানিয়েছেন তারা সহকর্মীদের কাছ থেকে উপহাস ছাড়া কোনো সহযোগিতা পাননি এবং আরও নানান ঝুঁকির মুখে পড়েছেন।
জুলেখা আক্তার (২৪) নামে এক পোশাককর্মী জানান, আশুলিয়ায় মোতালেব গার্মেন্টস নামে একটি পোশাক কারখানায় অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। বেতন পেতেন মাসে ৯ হাজার ৭০০ টাকা। তার গর্ভের শিশুর বয়স যখন পাঁচ মাস, তখন হাত থেকে এক টুকরা কাপড় মেঝেতে পড়ে যাওয়ায় তিনি অন্যের সাহায্য নিয়েছিলেন। বিষয়টি ম্যানেজারের চোখে পড়ে। পরের দিন থেকে তিনি জুলেখাকে কাজে আসতে নিষেধ করে দেন।
ছাঁটাইয়ের শিকার হওয়ার পর অন্য পোশাক কারখানায় চাকরির চেষ্টা করেছিলেন জুলেখা। কিন্তু গর্ভবতী অবস্থায় তাকে কেউ চাকরিতে নিতে চায়নি। মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা তো দূরের কথা, সে মাসের বেতন বা অন্য সুযোগ-সুবিধা কিছুই জোটেনি জুলেখার। দেড় বছর পর কর্মস্থলে ফেরার চেষ্টা করেও মেলেনি ফেলে আসা চাকরি।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থানার একটি গ্রাম থেকে আসা জুলেখা এখন চাকরি করেন মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন আতিয়া গার্মেন্টস নামক একটি পোশাক কারখানায়। তিনি দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘মনে হয়, গার্মেন্টসে চাকরি করা শুধু অভিশাপ না, পাপও। আমার সন্তানের বয়স এখন দুই বছর। যতদিন এ চাকরি করে যাব, আর বাচ্চা নেব না। কারণ চোখের সামনেই তো দেখেছি কতজন গর্ভধারণ করে চাকরি হারাচ্ছে।’
‘শ্রম আইন-২০০৬’-এ বলা আছে, কর্মজীবী নারী যিনি তার চাকরির প্রথম ছয় মাস পূর্ণ করেছেন, তিনি গর্ভবতী হলে গর্ভাবস্থায় এবং সন্তান জন্মের পরে সর্বমোট ১৬ সপ্তাহ ছুটি পাবেন এবং তা বৈতনিক ছুটি হবে।
গর্ভবতী মায়েদের মামলা, অধিদপ্তরে অভিযোগ
১৮ জানুয়ারি বোনকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে বিজয়নগর কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে আসেন আশফুল আক্তার (২৩)। আশফুলের গর্ভে তখন সাত মাসের বাচ্চা। তিনি রূপগঞ্জের আক্তার স্পিনিং মিলে কাজ করতেন। এক মাস আগে কোনো প্রকার ছুটি ও সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে কারখানা থেকে তাকে ছাঁটাই করা হয়। অন্য নারীদের সহযোগিতায় অধিদপ্তরে চালু হওয়া জরুরি হেল্পলাইন ১৬৩৫৭ নম্বরে ফোন করেন তিনি। সেখান থেকে জানানো হয় শ্রম ভবনের এই অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে।
শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয় দেখভাল করার দায়িত্ব পালন করে থাকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এই কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের অভিযোগ শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাতৃত্বকালীন ছুটি চাওয়ার আগেই চাকরিচ্যুত করা হয় অনেক নারী শ্রমিককে।
অধিদপ্তরে প্রতি মাসে ঢাকা ও আশপাশের এলাকার কারখানাগুলো থেকে গড়ে ১৫-২০টি অভিযোগ জমা পড়ে। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গত দুই বছরে ১১২টি অভিযোগ জমা পড়েছে। অবশ্য তাদের দাবি, কয়েক বছর আগে এই অভিযোগ আরও কয়েক গুণ বেশি ছিল।
জানতে চাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের যুগ্ম মহাপরিদর্শক (সাধারণ শাখা) মো. হাসিবুজ্জামান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এমন ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। আমাদের কাছে যারা অভিযোগ করতে আসেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে মালিকপক্ষকে ডেকে থাকি। শ্রম আইন-২০০৬ অনুসারে শুনানির পর সমঝোতা করে দিই। বৈতনিক মাতৃকালীন ছুটির ব্যবস্থা করি শ্রমিকদের।’
অবশ্য আশফুল সেদিন অভিযোগ দিয়ে ফেরার সময় এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ‘গরিবের বিচার কোথাও নাই। মনে হচ্ছে না এখানে কোনো প্রতিকার হবে। এত বছর পার করলাম। এখন বিপদের সময় কিছুই হাতে পেলাম না।’
অধিদপ্তরের অভিযোগে কাজ না হলে কেউ কেউ শ্রম আদালতেও মামলা করেন। মূলত চাকরিতে পুনর্বহাল, পাওনা আদায়, মালিক-শ্রমিক চুক্তির লঙ্ঘন, বেতন-ভাতার দাবি, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং ট্রেড ইউনিয়নসংক্রান্ত মামলা নেয় শ্রম আদালত। আদালত সূত্র বলছে, শুধু মাতৃত্বকালীন ছুটি আর পাওনা আদায় নিয়ে মামলা ঝুলে আছে ৩৫০টির বেশি। রায় হতে সময় নিচ্ছে বছরের পর বছর।
শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. ফারুক (এম ফারুক) বলেন, ‘শ্রম আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আদালতে লোকবলও বাড়াতে হবে। আরেকটি বিষয় জরুরি। শ্রম আদালতের রায় কার্যকর করার জন্য মালিকপক্ষের সদিচ্ছা থাকতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমীন দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘মাতৃত্বকালীন আইন ভঙ্গের জন্য আলাদা কোনো শাস্তির বিধান নেই, তবে শ্রম আইন ভঙ্গের একটি সার্বিক শাস্তি রয়েছে। আইন ভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া গেলে চাকরিদাতাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে চাকরিদাতার অবহেলার জন্য কেউ যদি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হন তাহলেও শাস্তির বিধান রয়েছে।’
নথিভুক্ত কারখানা যেমন-তেমন, ধার ধারে না সাব-কন্ট্রাক্ট
তৈরি পোশাকশিল্পের কারখানাগুলো বিজিএমইএর সদস্যভুক্ত। তবে এ সমিতির সদস্যভুক্ত নয়, এমন কারখানাও আছে। এগুলো মূলত বড় কারখানাগুলোর পাওয়া রপ্তানি আদেশের বিপরীতে সাব-কন্ট্রাক্টের কাজ করে থাকে। এসব ছোট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও কম।
সারা দেশে এমন কতগুলো সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানা রয়েছে, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। তবে সংশ্লিষ্ট কেনো কোনো সংগঠনের মতে ১৫-২০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মের মধ্যে আনতে ‘সাব-কন্ট্রাক্টিং নীতিমালা-২০১৪’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু সেটার বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। নারী শ্রমিক ও তাদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে এ নীতিমালায় কিছু বলা নেই।
গাজীপুরে চৌরাস্তায় শাকিল ফেবিক্স নামের একটি কারখানায় কাজ করেন আকলিমা। আকলিমার গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুরে। তার স্বামী রিকশা চালান। আকলিমা দৈনিক বাংলাকে জানান, তার গর্ভধারণের এখন পাঁচ মাস চলছে। তিন মাস থেকে যখন তার কারখানা কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে, তখন থেকে তার বেতন ২ হাজার টাকা কমিয়ে ৬ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়। অভিযোগ, তিনি এখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কাজ কম করতে পারেন।
কারখানাটির ব্যবস্থাপক আতিকুল ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অন্য কারখানাগুলো তো চাকরি থেকে বের করে দেয়। আমরা তো বেতন কমিয়ে দিয়েছি।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই কারখানাটি নথিভুক্ত কারখানা গাজীপুরে আল হামরার পোশাক তৈরির কাজ করে। আল হামরার পোশাক যায় যুক্তরাজ্যে।
মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা পান ৩ শতাংশ নারী শ্রমিক
ছয় মাসের গর্ভধারণ অবস্থায় মিরপুরে স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপ ২২তলা গার্মেন্টসের অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন আয়েশা খাতুন (২৫)। আগামী মাসে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে যাবেন তিনি। মালিকপক্ষ ৩০ হাজার টাকা দেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে তাকে। দুই বছর আগে বিয়ে হলেও প্রায় চার বছর ধরে এই পোশাক কারখানায় কাজ করেন হবিগঞ্জের এই মেয়ে। আয়েশার স্বামী জাকিরও এই কারখানায় কাজ করেন।
আয়েশা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘মাতৃত্বকালীন ছুটির সঙ্গে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এখানে পাওয়া যায়। আমার আগেও অনেকে পেয়েছেন। তবে আমার পরিচিত অন্যরা, যারা অন্য কারখানায় কাজ করেন, তারা সবাই এই সুবিধা পান না।’
আয়েশার বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায় পোশাক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের নিয়ে এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের (এসিডি) সাম্প্রতিক গবেষণা। তারা বলছে, পোশাক খাতে কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রতিবছর মা হন ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু তাদের মধ্যে মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা পান মাত্র ৩ দশমিক ১ শতাংশ নারী শ্রমিক।
ভাতাসহ মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যাপারে আরও মানবিক হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে এসিডির গবেষণাপত্রে। বলা হয়েছে, এটি নারী শ্রমিকদের অধিকার। এ ব্যাপারে গার্মেন্টস মালিকরা আরও যত্নবান হলে শ্রমিক-মালিক দুই পক্ষই লাভবান হবে।
ছুটির জন্য যে কাজের ক্ষতি হয় না, তার যৌক্তিকতা দেখিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন শ্রমিক বছরে ৪ দশমিক ৭ দিন ছুটি পান। ৯৮ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমিক এ সাধারণ ছুটি ভোগ করেন। কিন্তু সপ্তাহের বাকি ছয় দিন তারা দৈনিক ৯ ঘণ্টার মতো কাজ করেন। এতে দেখা যায়, প্রতি সপ্তাহে তারা ৮ ঘণ্টা ৩০ মিনিট অতিরিক্ত কাজ করেন, যা ছুটি ভোগের এক দিনের চেয়েও ৩০ মিনিট বেশি। এর মানে দাঁড়ায় বছর শেষে ৭৩ শতাংশ শ্রমিক অতিরিক্ত সময় কাজ করেন।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি ফারুক হাসান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধা নানা বিষয়ে কারখানা মালিকদের সঙ্গে তারা নিয়মিত বসেন। সেখানে শ্রমিকদের যার যা প্রাপ্য সেটা নিশ্চিত করা হয়।
বিদ্রূপ সইতে হয় সহকর্মীদের কাছে
কারখানাগুলোতে অনুসন্ধানে জানা যায়, কেউ মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সুযোগ-সুবিধা আইন অনুযায়ী দেয় না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান দুই-একটা মানলেও আবার কেউ কেউ কোনো পাত্তাই দেয় না। মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইলে চাকরি থেকে বের করে দেয়ার নজিরই বেশি। তবে সব প্রতিষ্ঠানেই যেটা হয়, গর্ভাবস্থা্য় কাজ করার সময় সহকর্মীদের বিদ্রূপ সইতে হয়। এ সময় কাজ করতে নানাভাবে হয়রানি হতে হয় নতুন মায়েদের। সেসব বিষয়ে প্রতিকার চাওয়ার কোনো সুযোগও থাকে না।
কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিদর্শক সবুজ মাহমুদ দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘এমন অভিযোগ অনেক। আমাদের কাছে অভিযোগগুলো এলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। তা ছাড়া গর্ভবতী মায়েদের সুস্বাস্থ্যের জন্য কারখানার পরিবেশ ঠিক রাখার চেষ্টা করি। অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সব সময় নানাভাবে তাগিদ দেয়া হয়।’
ছয় মাস আগে চাকরি হারিয়ে সিরাজগঞ্জ ফিরে যাওয়া সেই সাহিদা বলেন, গ্রামে ফিরে তিনি ভালো নেই। বড় স্বপ্ন নিয়ে ঢাকা গিয়ে তার মতো কেউ যেন খালি হাতে না ফেরেন। যাদের ঘামে তিল তিল করে গড়া হচ্ছে দেশের পোশাকশিল্প। সেই শিল্পের শ্রমিকদের দায়িত্ব তিনি সরকারকে নিতে অনুরোধ করেন।
মশার বংশ বিস্তার ও ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে চলতি মাসের ১৪ তারিখ থেকে সারদেশে প্রতি সপ্তাহে একবার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১১ মার্চ) দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক বিশেষ ভিডিও বার্তায় এই ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে তিনি এই মহামারি মোকাবিলায় সকলকে সচেতন হওয়ার এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদাত্ত আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, এডিস মশার কামড় থেকে মানুষ ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়। সুতরাং ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে আগে থেকেই সকল প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী। বর্ষা মৌসুম অর্থাৎ জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তবে জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞান বলছে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্দ নেই। সুতরাং যেকোনো সময় মানুষ ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।
ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্ষাকালে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা জন্মায়। ৩ দিন জমে থাকা পানিতে মশা জন্মাতে ভপারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণের জন্য ড্রেন, নর্দমার মতো যেসব জায়গায় পানি জমে থাকার সুযোগ রয়েছে সেসব জায়গা পরিষ্কার করে রাখাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সুতরাং ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, ডোবা, বাড়ি বা বাসার ছাদে পানি জমতে দিবেন না। পানির ট্যাংক্ক ঢেকে রাখা অত্যন্ত জরুরী। প্রতি সপ্তাহে একবার বাড়ি বা বাসার ভেতর এবং বাহির পরিষ্কার রাখতে হবে
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৪ মার্চ থেকে প্রতি সপ্তাহে একবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রতিটা এলাকায় সংসদ সদস্য ও সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমার আহ্বান জনগনকে সাথে নিয়ে প্রতি সপ্তাহের শনিবার যার যার এলাকা পরিষ্কার এবং আশে আশে এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করুন।
বেআইনিভাবে রাজউকের প্লট নেওয়ার অভিযোগে দুদকের করা মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ আদেশ দেন।
খাইরুল হকের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, মোতাহার হোসেন সাজু ও ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান। আপাতত কারা মুক্তিতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।
গত বছরের আগস্টে বেআইনিভাবে রাজউকের প্লট গ্রহণের অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক।
এর আগে গত ৪ মার্চ যুবদলকর্মী হত্যা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রায় জালিয়াতির চার মামলায় খায়রুল হককে জামিন দেন হাইকোর্ট।
গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে খায়রুল হককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাকে জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
মন্ত্রী এবং দলের সংসদ সদস্যদের চলনে–বলনে মার্জিত ও সতর্ক থাকতে বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার (১১ মার্চ) সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভায় তিনি এ পরামর্শ দেন। সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্য গণমাধ্যমকে জানান, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে যার যে দায়িত্ব, তার বাইরে যেন কেউ মন্তব্য না করেন—এ বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছে। কিন্তু ভোটের আঙুলের কালির দাগ মোছার আগেই আমরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি। এটাই হচ্ছে বিএনপি। এই বিএনপিকেই মানুষ দেখতে চায়।’
বেলা সোয়া ১১টায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। সভা শেষ হয় বেলা ১টায়। সভায় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্বাগত বক্তব্য দেন। এরপর বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভার মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর এক পাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সালাহউদ্দিন আহমদ এবং অন্য পাশে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বসেন। সভায় বিএনপির ২০৯ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন।
সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিএনপির নেওয়া জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন কর্মসূচি এবং সামনের দিনগুলোতে করণীয় বিষয়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের দিকনির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হবে। সামনে ডেঙ্গুর মৌসুমকে সামনে রেখে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সবাইকে সতর্ক করেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সনদের কিছু বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। সরকার যেসব বিষয় বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে বিএনপি যতটুকুতে সম্মত হয়েছে, সরকার ততটুকুই বাস্তবায়ন করবে।
সভায় মন্ত্রিসভার তরুণ সদস্যদের নিয়মিত ও সময়মতো অফিস করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা আছেন। বিশেষ করে তরুণদের সকাল নয়টার মধ্যে অফিসে যেতে হবে। অফিসে যাওয়া–আসার ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন মেনে চলারও পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ট্রাফিক আইন মেনে চলেন বলে সভায় উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি—বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
সংসদীয় দলের সভায় জাতীয় সংসদের নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের দায়িত্ব সংসদ নেতা তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল সংসদ অধিবেশন শুরুর পর দুই দিন (শুক্র ও শনিবার) বিরতি হবে। এরপর ১৫ মার্চ আবার সংসদ বসবে। ওই দিন মুলতবি হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের পর ২৯ মার্চ আবার অধিবেশন শুরু হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ করেছেন নবনির্বাচিত চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং আগামী দিনের সংসদীয় কার্যক্রম নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এসময় তিনি সংসদকে দেশের মানুষের অধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বৈঠক পরবর্তী ব্রিফিংয়ে চিফ হুইপ বলেন, মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন হচ্ছে আজকের এই জাতীয় সংসদ। তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় সংসদ কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আস্থার প্রতিফলন ঘটিয়ে আগামীকাল থেকেই সংসদের নতুন অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে।
নুরুল ইসলাম মনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল সংসদ পরিচালনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সরকার চায় সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে গঠনমূলক আলোচনা, যুক্তিপূর্ণ তর্ক ও সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ বজায় থাকুক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। সেই লক্ষ্যেই সংসদকে একটি অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চিফ হুইপ জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন এবং বিরোধী দলের গঠনমূলক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের সমাধান সম্ভব এবং এই পথ ধরেই বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
পরিশেষে তিনি সরকারের মূল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই এই সংসদের প্রধান লক্ষ্য। একটি কার্যকর সংসদের মাধ্যমে জনগণের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাবে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিমান চলাচলে নজিরবিহীন সংকট দেখা দিয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশের আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একের পর এক ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ আজ বুধবার (১১ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত নতুন করে আরও ২৪টি ফ্লাইটের যাত্রা স্থগিত করা হয়েছে। এই নিয়ে গত ১২ দিনে মোট ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হলো কর্তৃপক্ষ, যা আন্তর্জাতিক আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরণের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) জনসংযোগ কর্মকর্তা কাওছার মাহমুদ বর্তমান পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে জানান, মূলত নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বেসামরিক বিমান চলাচলের জন্য নিষিদ্ধ করেছে। দেশগুলো এখনও তাঁদের আকাশসীমা খুলে না দেওয়ায় ঢাকার বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত ফ্লাইটগুলো পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক, যাঁদের বড় একটি অংশের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে চলেছে।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথম দিনে ২৩টি ফ্লাইট বাতিলের মধ্য দিয়ে এই সংকটের শুরু হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ঘটে এবং গত ২ মার্চ একদিনেই সর্বোচ্চ ৪৬টি ফ্লাইট বাতিল হয়। প্রতিদিনের গড় হিসাব অনুযায়ী, এখন দিনে ২৮ থেকে ৩৫টি নিয়মিত ফ্লাইটের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আজকের হিসাব অনুযায়ীও অন্তত ২৮টি ফ্লাইট বাতিল হওয়ার তালিকা দীর্ঘতর হয়েছে, যার ফলে বিমানবন্দরের সামগ্রিক সময়সূচি এবং যাত্রীদের পরিকল্পনায় বড় ধরণের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
আজ বুধবার বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে কুয়েত ও গালফ এয়ারলাইন্সের দু’টি করে এবং এয়ার অ্যারাবিয়া, কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস এয়ারলাইন্স, জাজিরা এয়ার ও ফ্লাই দুবাইয়ের চারটি করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সগুলো জানিয়েছে, আকাশপথ নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত পুনরায় স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যগামী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ভোগান্তি নিরসনে এবং আকাশসীমা চালুর খবরাখবর নিতে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর। সংঘাত দ্রুত না কমলে এভিয়েশন খাতের এই ধকল আরও দীর্ঘায়িত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানকে দায়িত্ব দিয়েছে সরকারি সংসদীয় দল।
বুধবার (১১ মার্চ) জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
এর আগে জাতীয় সংসদের সরকারি দলের সভাকক্ষে বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সভাপতিত্ব করেন সংসদ নেতা।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের জন্য আমরা সংসদ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনিই সিদ্ধান্ত দেবেন, আগামীকালকে আমরা জানতে পারব। সংসদ উপনেতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, সংসদে আমরা (এমপি) কেমন আচরণ করব এবং কার্যক্রম কী হবে, সে বিষয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদে যেহেতু স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নেই, প্রথমে খালি চেয়ার দিয়ে শুরু করব। সংসদ নেতা সভার সভাপতিত্ব করার জন্য জ্যেষ্ঠ কোনো নেতার প্রস্তাব করবেন। এরপর কোনো একজন সমর্থন করবেন এবং তিনিই সভার সভাপতিত্ব করবেন। সেখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করব।
এর আগে জামায়াতকে ডেপুটি স্পিকার পদ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিল বিএনপি। দলটি সরকারি দলের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী উদারতা দেখিয়ে এ প্রস্তাবটি দিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে আমরা এখনো ইতিবাচক সাড়া পাইনি। সাড়া পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ আগামীকাল সংসদে আইনমন্ত্রী উত্থাপন করবেন বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ। এগুলো যাচাই বাছাইয়ের জন্য সব দলের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হবে। এ কমিটি নির্ধারণ করবে কোন অধ্যাদেশগুলো বহাল থাকবে, আর কোনগুলো ল্যাপস (বাতিল) হয়ে যাবে। এরপর প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশগুলো আমরা পাস করার চেষ্টা করব।
প্রথম দিনের বৈঠকে কার্য উপদেষ্টা, প্রিভিলেজ কমিটি এবং হাউস কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান চিফ হুইপ। রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হলেই কালকের অধিবেশন মুলতবি করা হবে। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর পাঁচ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনীত করা হবে। এরপর শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে আলোচনা হবে। জুলাই যোদ্ধাদের সম্পর্কে আলোচনা হবে। এরপর দেশবরেণ্য মানুষ ও বিদেশি বরেণ্য মানুষের বিষয়ে শোকপ্রস্তাব থাকবে।
জুলাই জাতীয় সনদে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা বলা হয়েছিল, সেটার ভবিষ্যৎ কী— এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তারা সেই শপথ নেননি। ভবিষ্যতে এটি সংবিধানে যুক্ত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
লিখিত বক্তব্যে চিফ হুইপ বলেন, মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভাতের অধিকার নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করার লক্ষ্যে আমাদের প্রধানমন্ত্রী যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তারই ধারাবাহিক প্রতিফলন হচ্ছে আজকের এই জাতীয় সংসদ। জাতীয় সংসদ কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে আগামীকাল থেকে জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আমরা দেশবাসীর কাছে দোয়া ও সমর্থন কামনা করছি।
তিনি বলেন, আগামীকাল যে সংসদ অধিবেশন শুরু হবে, সেটি হবে জনগণের সংসদ-দেশের মানুষের অধিকার, আশা এবং স্বপ্নের প্রতিনিধিত্বকারী একটি সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে— একটি কার্যকর, প্রাণবন্ত ও দায়িত্বশীল সংসদ পরিচালনা করা। আমরা চাই, সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা, যুক্তিপূর্ণ তর্ক ও সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি হোক।
নূরুল ইসলাম বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো— মতের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। সেই লক্ষ্যেই আমরা সংসদকে একটি কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই প্রেক্ষাপটে আমরা দেশের জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন কামনা করছি। একই সঙ্গে আমরা বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকা ও সহযোগিতাও প্রত্যাশা করি। আমরা বিশ্বাস করি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের সমাধান করা সম্ভব এবং সেই পথ ধরেই আমরা জাতিকে আরও শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারব।
তিনি বলেন, আমাদের অঙ্গীকার হচ্ছে— সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা, দারিদ্র্য দূর করা এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করে তোলা। একটি কার্যকর সংসদের মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। পরিশেষে দেশবাসীর কাছে আবারও দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি, যাতে আমরা সবাই মিলে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারি।
সংসদের আচরণ কী হবে তাঁর দিক নিদর্শনা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম। আজ বুধবার প্রধানমনাত্রীর সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
এ সময় তিনি বলেন, ‘সংসদের সভাপতিত্ব করার জন্য একজন সিনিয়র নেতাকে আহবান জানাবেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া জরুরি কয়েকটি সংসদীয় কমিটি হবে।’
চিফ হুইপ বলেন, ‘সংসদ উপনেতা কে হবেন তার সিদ্ধান্ত হয়নি এখনো। তবে সংসদ নেতা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন।’ অর্ডিনেন্স পাসে কমিটি হবে বলেও জানান চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, একটি কার্যকর প্রাণবন্ত সংসদ গড়তে চাই। আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করতে চাই। বিরোধী দলের গঠনমুলক সহযোগিতা কামনা করি।
এ ছাড়া বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকারের বিষযে কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি বলেও জানান চিফ হুইপ।
ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তাদের শরিক দলগুলোর সংসদীয় বৈঠক চলছে।
বুধবার (১১ মার্চ) সকাল ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের সরকার দলীয় সভাকক্ষে এই বৈঠক শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।
জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসছে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ)। অধিবেশনকে সামনে রেখে সংসদে সরকারের কৌশল নির্ধারণসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে এই সংসদীয় দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্ধারণসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে। ক্ষমতাসীন দলের সব সংসদ সদস্য এতে অংশ নিয়েছেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯টি আসনে জয় পায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। সেই সময় সংসদ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন তারেক রহমান। একই দিন বিকেলে তার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ গ্রহণ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি কমাতে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এতে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে জ্বালানি তেলের (অকটেন ও পেট্রোল) গড় বিক্রি ২৫ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১১ মার্চ) বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তি বলা হয়, চলমান বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জনগণের চাহিদা মোতাবেক জ্বালানি তেল সরবরাহ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল সরবরাহ/গ্রহণ সম্পর্কিত বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করে।
সে পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভাগীয় শহরে জ্বালানি তেলের (অকটেন ও পেট্রোল) গড় বিক্রয় হতে ২৫ শতাংশ হ্রাসের পরিবর্তে বর্তমানে ১৫ শতাংশ হ্রাস করে ফিলিং স্টেশন প্রতি বরাদ্দ চার্ট অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হবে।
এতে আরও বলা হয়, হ্রাসকৃত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিপিসির অধীনস্থ বিপণন কম্পানি সমূহের ডিপো সুপার, বিক্রয় কর্মকর্তা এবং ডিলার/এজেন্টগণকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় পেয়েছেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজ শুনানি শেষে তার জামিন মঞ্জুর করেন।
এ নিয়ে তার বিরুদ্ধে থাকা দুটি মামলায় জামিন পেলেন। সেক্ষেত্রে তার কারামুক্তিতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী তাসলিমা জাহান পপি।
গত ১৫ জানুয়ারি জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। পরে গত ২৫ জানুয়ারি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দুদকের সহকারী পরিচালক আখতারুজ্জামান তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ জানুয়ারি এই মামলায় আনিস আলমগীরকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আনিস আলমগীরের নামে ২৫ লাখ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ এবং ৩ কোটি ৮৪ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮৯ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদসহ মোট ৪ কোটি ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮৯ টাকার সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় হিসেবে তার ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা। ফলে মোট অর্জিত সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ কোটি ২৫ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৯ টাকা। আনিস আলমগীরের বৈধ আয়ের উৎস থেকে মোট আয় পাওয়া গেছে ৯৯ লাখ ৯ হাজার ৮৫১ টাকা।
এর মধ্যে অতীত সঞ্চয় ৫৪ লাখ ৪৫ হাজার ৮২১ টাকা, টক শো ও কনসালটেন্সি থেকে আয় ১৯ লাখ ৩৯ হাজার ৯৭৭ টাকা, প্লট বিক্রি থেকে ২২ লাখ টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক সুদ বাবদ ৩ লাখ ২৪ হাজার ৫৩ টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ হিসাবে তার ঘোষিত ও গ্রহণযোগ্য আয়ের তুলনায় ৩ কোটি ২৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯৩৮ টাকার সম্পদ বেশি পাওয়া যায়, যা মোট অর্জিত সম্পদের প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং তা জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ হিসেবে করা হয়।
এর আগে গত ১৪ ডিসেম্বর জুলাই রেভুলেশনারী এলায়েন্সের সংগঠক আরিয়ান আহমেদ বাদী হয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দায়ের করেন।
এই মামলায় সাংবাদিক আনিস আলমগীর গত ১৫ ডিসেম্বর পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শেষে গত ২০ ডিসেম্বর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তীতে গত ৫ মার্চ এই মামলায় তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন।
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিতে আগামী ১৬ মার্চ থেকে ‘ঈদ স্পেশাল বাস সার্ভিস’ চালু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) থেকে বিআরটিসির এই ঈদ স্পেশাল বাস সার্ভিসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে।
বিআরটিসি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আসন্ন পবিত্র ঈদুর ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো যাত্রীদের নিরাপদ, আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী ভাড়ায় যাতায়াত নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ সেবার মাধ্যমে যাত্রীরা সাশ্রয়ী ভাড়ায় দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।
জনসাধারণকে বিআরটিসির এই বাস সেবা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ)। নিজেদের কৌশল নির্ধারণসহ সার্বিক বিষয়ে আজ বুধবার (১১ মার্চ) সংসদীয় দলের বৈঠকে বসছে ক্ষমতাসীন দল। এ বৈঠকেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্ধারসহ চূড়ান্ত কিছু সিদ্ধান্ত হতে পারে।
বুধবার (১১ মার্চ) সংসদ ভবনের সরকার দলীয় সভাকক্ষে এ সভায় সভাপতিত্ব করবেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ৯ মার্চ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, সভায় ক্ষমতাসীন দলের সব সংসদ সদস্যকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
এ বৈঠক থেকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কে হবেন তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে। এছাড়াও সংসদীয় কমিটি গঠনে এবং সংসদের অন্যান্য কার্যপ্রণালি নিয়েও নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবেন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা।
এর আগে গত ৯ মার্চ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ঐকমত্য গঠনে সরকার ও বিরোধী দলীয় হুইপদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংসদ ভবনের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনির অফিস কক্ষে বৈঠকটি হয়। এতে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেন। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন, মো. রফিকুল ইসলাম খান, মো. আবুল হাসনাত ও মো. নূরুল ইসলাম।
কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এই দেশ আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। দেশের মানুষের প্রত্যাশা বর্তমান সরকারের কাছে অনেক। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করব না। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হয়তো কিছুটা সময় লাগতে পারে। সে জন্য সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুরোধ করছি।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজধানীর মহাখালীর কড়াইলে বনানী টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে সরকারের নতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী সেখানে পৌঁছান। তবে, মঞ্চে ওঠার আগেই তিনি সোজা চলে যান মাঠে অপেক্ষমাণ নারীদের কাছে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন নারীরা। নানা স্লোগান দেন তারা। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এতো কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন নারী ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। শুরুতে পবিত্র কোরআন, বেদ, ত্রিপিটক, বাইবেল পাঠের পর বিএনপি দলীয় সংগীত পরিবেশ করা হয়। এরপর পরিবেশন করা হয় জাতীয় সংগীত। অনুষ্ঠানে ফ্যামিলি কার্ডের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি উদ্বোধনী বোতাম চেপে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জনের কাছে ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পৌঁছে দেন। প্রতিজনের অ্যাকাউন্টে আড়াই হাজার টাকা করে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় ১৭ জন নারীর হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। এরা হলেন বেগম পারভিন, বেগম সমলা, বকুলা বেগম, বেগম জ্যোৎস্না, তসলিমা আখতার, বেগম রাশেদা আখতার, বেগম হোসনা আখতার, রিনা বেগম, বেগম শামসুন্নাহার, রোখসানা আখতার, মোসাম্মাৎ মাহফুজা, বেগম লিনা আখতার, মোসাম্মাৎ সুমি খাতুন, আকলিমা বেগম, মিনারা বেগম। এ সময় করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে এদিন সারা দেশের ১৪টি স্থানে একযোগে এই কার্ড বিতরণ শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হলো। নির্বাচনে আমরা ফ্যামিলি কার্ডের ওয়াদা দিয়েছিলাম। এক মাস পূরণের আগেই আমরা তা পূরণ করতে পেরেছি। সেই জন্য শুকরিয়া আদায় করছি। প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারায় আজ আমার জন্য যেমন একটি আবেগের দিন, তেমনি সরকার ও বিএনপির জন্যও একটি ঐতিহাসিক ও আবেগের দিন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন সরকারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন তিনি উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত নারীদের শিক্ষাকে বিনা মূল্যে করেছিলেন। সেই শিক্ষিত নারীসমাজকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতেই এখন ফ্যামিলি কার্ডের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। কড়াইল, সাত তলা ও ভাষানটেক এলাকার ১৫ হাজার নারীকে কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। আগামী চার বছরের মধ্যে বাংলাদেশের চার কোটি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই।
তারেক রহমান বলেন, এই কর্মসূচির বিষয়টি নিয়ে বিএনপি বহু বছর ধরে পরিকল্পনা করেছে। নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের এক মাসের কম সময়ের মধ্যে আমরা সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করলাম তাই আজ একটি স্মরণীয় দিন। ঐতিহাসিক দিন। এখন ১৪ জায়গায় কার্যক্রম শুরু হলো। পর্যায়ক্রমে সবার কাছে এই কার্ড নিয়ে যেতে পারব বলে আশাবাদী।
দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া দেশ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে এই কার্ড চালু করা হলো।
বক্তব্যের শেষে তিনি তার নির্বাচনী স্লোগান মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, প্রত্যেকটি নির্বাচনী জনসভায় একটি কথা আমার বক্তব্যের শেষে আমি তুলে ধরতাম। সেই কথাটি ছোট্ট একটি স্লোগানের মাধ্যমে আপনাদের সকলের কমবেশি জানা আছে, সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্লোগানটি পৌঁছে গেছে। আজকে সেই স্লোগানটি দিয়েই আমি আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই, সেই স্লোগানটি ছিল: করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ! সবার আগে বাংলাদেশ!
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি আজ বাস্তবায়িত হলো। এই কার্ড নিয়ে রাজনীতি, দুর্নীতি করার কোনো সুযোগ নেই।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড আজ স্বপ্ন নয়। ফ্যামিলি কার্ড আজ সবার দোরগোড়ায়। ফ্যামিলি কার্ড একটি ভরসার নাম, আস্থার নাম।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে উপকারভোগী পরিবারগুলো ভাতা পাবে। ভাতার টাকা যাবে উপকারভোগীর পছন্দ অনুযায়ী মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে। তারা ঘরে বসেই ভাতা পাবেন। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আগামী জুন পর্যন্ত চার মাসের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত নারী গৃহপ্রধান অন্য কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পেলে সেগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা চলমান ভাতা নিতে পারবেন।
কোনো পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন-ভাতা, অনুদান, পেনশন পেয়ে থাকলে, নারী পরিবারপ্রধান এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্মচারী হিসেবে চাকরিরত থাকলে ওই পরিবার ভাতা পাওয়ার জন্য যোগ্য হবে না।
এ ছাড়া কোনো পরিবারের নামে বাণিজ্যিক লাইসেন্স বা বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থাকলে বা বিলাসবহুল সম্পদ, যেমন গাড়ি, এসি থাকলে বা ৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলেও ওই পরিবার ভাতা পাবে না।