ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পিকআপের দখল থেকে রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড-সংলগ্ন মেয়র আনিসুল হক সড়ক মুক্ত করতে পারছে না ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
বারবার অভিযান চালিয়ে সফল না হয়ে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলছেন, সড়কটি নিয়ে টম অ্যান্ড জেরি খেলা হচ্ছে।
বুধবার মেয়র আনিসুল হক সড়কে অভিযান শেষে এ কথা বলেন মেয়র আতিক।
মেয়র বলেন, ‘আমি আসার কারণে ট্রাকগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলেছে। যদিও অনেকে রাস্তা ওপর ট্রাক রেখে দিব্বি চলে গেছে। সত্যি কথা বলতে হয়, এ সড়কটি নিয়ে টম অ্যান্ড জেরি খেলা হচ্ছে। আমি আসলে চলে যাচ্ছে, পুলিশ আসলে চলে যাচ্ছে; পরে আবারও এসে রাস্তা দখল করছে, আবার চলে আসছে। এটা বাস্তব সত্য চিত্র।’
সড়কটি দখলমুক্ত করতে প্রায়ই অভিযান চালানো হয় উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘এখানে আমরা প্রায়ই অভিযান চালাই। কিন্তু দুদিন পরই দখল হয়ে যায়। ট্রাকের মালিকরা বলছেন, জায়গা দেই না কেন? আমি বলেছি, আমি যেটা চাই, আগে সেটা করবেন। আমি চাই জনগণের যেন কোনো ভোগান্তি না থাকে। এর জন্য রাস্তার দুই পাশে কোনো ধরনের ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না।
সাতরাস্তা থেকে লেভেল ক্রসিং হয়ে কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট ও তেজগাঁও রেলস্টেশনের সংযোগকারী সড়কটি দীর্ঘদিন ট্রাকস্ট্যান্ড হিসেবে দখল হয়েছিল। আনিসুল হক মেয়র হওয়ার পর সড়কটি দখলমুক্ত করেন। সে সময় ট্রাক শ্রমিকরা সিটি করপোরেশন কর্মীদের সঙ্গে সংঘাতেও জড়িয়েছিল। আনিসুল হক মারা যাওয়ার পরে ধীরে ধীরে পুরোনো চেহারাতে ফিরতে থাকে রাস্তাটি।
সড়কটি দখলমুক্ত রাখতে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হবে বলেও জানান আতিকুল ইসলাম। মেয়র বলেন, পুলিশের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করতে চাচ্ছি। এখানে মালিক সমিতির প্রতিনিধি থাকবে, ট্রাক শ্রমিক প্রতিনিধি থাকবে, পুলিশ থাকবে, কাউন্সিলর থাকবে ও আরেকজন প্রতিনিধি থাকবে।
এক প্রশ্নের জবাবে আতিক বলেন, রাস্তাটা সব সময় পরিষ্কার রাখতে হবে। এ জন্য যা যা দরকার সব করতে হবে। আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমাদের একটা সল্যুশন করতে হবে।
মেয়র আনিসুল সড়কে অযান্ত্রিক যানে গতি ফেরাতে আলাদা লেন উদ্বোধন করেন মেয়র আতিকুল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা আলাদা একটা লেন করেছি। যে লাইনটি শুধু রিকশার জন্য। আগে আমরা দেখতাম সড়কের ওপরে রাখা ট্রাকগুলো উত্তর-দক্ষিণে রাখা হতো। ফলে ট্রাকের পেছনটা ফুটপাত দখল করে রাখত। এখন আমরা যে পদ্ধতি করেছি ফুটপাতে ট্রাক রাখতে পারবে না। ফুটপাত দিয়ে জনগণ হাঁটতে পারবেন। জনগণ যেন নিরাপদে হাঁটতে পারেন তার জন্য আমরা এ পদ্ধতি নিয়েছি।
সড়কটি দখল না হওয়ার পেছনে কাউন্সিলরদের চাঁদাবাজির অভিযোগ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র বলেন, জনপ্রতিনিধি যদি কোনো চাঁদাবাজি করে তাহলে এর থেকে দুঃখজনক আর কিছু নেই। তারা যদি করে থাকে এটার প্রমাণ দিতে হবে। আপনি বলবেন, আরেকজন বলবে, পুলিশ চাঁদা খায়, আরেকজন বলবে মেয়র চাঁদা খান, সবাই চাঁদা খায়; এ রকম বললে হবে না, প্রমাণ দিতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপনে তাঁর এই নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে জানানো হয় যে, প্রধান উপদেষ্টা ডা. সায়েদুর রহমানকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় এই দায়িত্ব প্রদান করেছেন। এই নিয়োগের ফলে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষ ভূমিকা রাখার সুযোগ পাবেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নে কাজ করবেন।
প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, প্রধান উপদেষ্টা 'রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬'-এর ৩বি (১) ধারা অনুযায়ী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমানকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থলাভিষিক্ত করেছেন। একই সঙ্গে রুলস অব বিজনেসের ৩বি (২) ধারা মোতাবেক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী ক্ষমতাও তাঁর ওপর অর্পণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক ও পরিচালনাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। বিশেষ সহকারী পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে তিনি একজন প্রতিমন্ত্রীর সমান বেতন-ভাতা এবং যাবতীয় আনুষঙ্গিক রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হবেন।
রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এই প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ। প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। ডা. সায়েদুর রহমানের এই নিয়োগকে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার ও গতিশীলতা আনয়নের ক্ষেত্রে সরকারের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, একজন দক্ষ চিকিৎসককে মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী ক্ষমতায় নিয়ে আসায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বিদ্যমান সংকটগুলো নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সহজতর হবে। মূলত চিকিৎসা সেবার উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে তাঁর প্রধান দায়িত্ব।
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের বহর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিমানের পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই মেগা প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন এবং আর্থিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেই বোয়িংয়ের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। নতুন এই উড়োজাহাজগুলো বহরে যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিমানের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, কেনার জন্য নির্ধারিত ১৪টি উড়োজাহাজের মধ্যে রয়েছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮ মডেলের বিমান। এই ক্রয়ের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর, যখন বোয়িং আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিক্রয় প্রস্তাব পাঠায়। পরবর্তীতে ২০ ডিসেম্বর তারা একটি সংশোধিত খসড়া চুক্তি পাঠালে তা পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। বৈঠকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাত্রী চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা করে বোয়িংয়ের প্রস্তাবিত মূল্য ও শর্তাবলিতে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিমানের অপারেশনাল কার্যক্রম যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি বহরে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটবে।
উল্লেখ্য যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার আগে থেকেই বোয়িং থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছিল। যদিও এই বিশাল কার্যাদেশ পেতে ইউরোপীয় নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস এবং তাদের পক্ষে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত কারিগরি ও বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় বোয়িংকেই বেছে নিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। সরকারি সকল আনুষ্ঠানিকতা এবং অর্থায়নের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ বাংলাদেশে আসতে শুরু করবে। এই পদক্ষেপটি দেশের এভিয়েশন খাতে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা বিশ্ব দরবারে বিমানের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আজ বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে দ্বিতীয় দিনের মতো রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, গত বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। শোক পালনের অংশ হিসেবে আজ দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি ভবনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। এছাড়া বিদেশের মাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোতেও একই গুরুত্বের সাথে শোক পালন করা হচ্ছে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করে এই গভীর শোক প্রকাশ করা হয়।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর রুহের মাগফিরাত কামনায় আগামীকাল শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর দেশের সকল মসজিদে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হবে। একই সাথে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও তাঁর আত্মার শান্তির জন্য বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ফুসফুসের সংক্রমণসহ দীর্ঘদিনের বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং মৃত্যুর আগে টানা ৩৭ দিন হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সারা দেশে এক শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় জানাজা শেষে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে বেগম খালেদা জিয়াকে সমাহিত করা হয়। সেখানেও হাজারো মানুষের ঢল নেমেছিল এবং এক আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে তাঁকে শেষ বিদায় জানানো হয়। বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যরাও এই শোকের সময় জাতীয় ঐক্য ও শ্রদ্ধার সাথে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং দেশের জন্য তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেই তিন দিনের এই রাষ্ট্রীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সাধারণ মানুষ এবং দলীয় নেতাকর্মীরা সেখানে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। এর আগে বুধবার বিকেলে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর স্বামীর কবরের পাশেই দাফন করা হয়। দাফন পরবর্তী কিছু জরুরি সংস্কার ও ব্যবস্থাপনা কাজের জন্য উদ্যানটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল, যা বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে পুনরায় খুলে দেওয়া হয়।
সকাল থেকেই প্রিয় নেত্রীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় ভিড় জমাতে শুরু করেন সর্বস্তরের মানুষ। উদ্যানের প্রবেশপথগুলো বন্ধ থাকায় অনেক নেতাকর্মী এবং সাধারণ সমর্থককে দীর্ঘক্ষণ বিজয় সরণি মোড়সহ আশপাশের ব্যারিকেডের সামনে অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। সমাধিস্থলে সরাসরি প্রবেশ করতে না পেরে অনেককেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে মোনাজাত ও দোয়া করতে দেখা গেছে। বর্তমানে উদ্যানটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার পর সেখানে মানুষের ঢল নেমেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুরো এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মোতায়েন রয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ফুসফুসের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া এবং কিডনিসহ নানা শারীরিক জটিলতায় দীর্ঘ দিন ভোগার পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বুধবার বিকেলে বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আবদুল মালেকের ইমামতিতে জানাজা সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁকে জিয়া উদ্যানে সমাহিত করা হয়। এখন থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সাধারণ মানুষ এই দুই জাতীয় নেতার কবরে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন।
দেশের অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং পেশাগত আচরণের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ অভিভাষণে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, আদালতের নির্ধারিত কর্মঘণ্টার মধ্যে ফেসবুকসহ কোনো ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। যদি কোনো বিচারক কর্মঘণ্টার মধ্যে এসব মাধ্যম ব্যবহার করেন এবং তার সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে সেদিনই সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিচারিক জীবনের শেষ দিন হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। এই কঠোর বার্তার মাধ্যমে তিনি বিচার বিভাগে পূর্ণ শৃঙ্খলা এবং সময়ের সঠিক সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করে প্রধান বিচারপতি বলেন যে, বিচার আসনে বসে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের অবশ্যই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিচ্যুতি ঘটলে তাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। পাশাপাশি বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি কমাতে তিনি প্রতিটি মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি হওয়ার তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে রায় প্রদানের নির্দেশ দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, রায় দিতে দেরি করলে নতুন করে নথি পর্যালোচনা করতে হয়, যা সময়ের অপচয় ঘটায় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত আদালতের কর্মঘণ্টাকে পুরোপুরি বিচারিক কাজে ব্যয় করার জন্য তিনি সকল বিচারককে নির্দেশ প্রদান করেন।
আদালতের পরিবেশ রক্ষা এবং বহিরাগতমুক্ত রাখার বিষয়েও প্রধান বিচারপতি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি জানান যে, আইনজীবী ও মামলার সংশ্লিষ্ট পক্ষ ছাড়া অন্য কারো এজলাস কক্ষে প্রবেশ করা উচিত নয়। আদালত প্রাঙ্গণে হকার বা অপ্রয়োজনীয় লোকজনের আনাগোনা বন্ধ করার পাশাপাশি আইনজীবীগণ যেন যথাযথ ড্রেসকোড মেনে চলেন সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। উল্লেখ্য যে, গত ২৩ ডিসেম্বর দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর এবং শপথ গ্রহণের পরপরই তিনি নিম্ন আদালতের বিচারকদের এই কঠোর ও দিকনির্দেশনামূলক বার্তা দিলেন। বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও মর্যাদা সমুন্নত রাখাই তাঁর এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া অত্যন্ত মর্যাদা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে সম্পন্ন হওয়ায় দায়িত্বরত সকলকে বিশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে তিনি নিজের এবং পরিবারের পক্ষ থেকে এই ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, তাঁর মায়ের এই অন্তিম বিদায় ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যা সংশ্লিষ্ট সকলের গভীর যত্ন, দায়িত্ববোধ এবং পেশাদারিত্বের কারণে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
তারেক রহমান তাঁর বার্তায় বিশেষভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তারা কেবল শৃঙ্খলা বজায় রাখেননি বরং শোকময় পরিবেশে মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। এছাড়াও তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা থেকে শুরু করে পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, আনসার এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ধৈর্যের প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, কয়েক বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত লাখ লাখ মানুষের এই বিশাল জনসমুদ্রের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রেখে সবাইকে নিরাপদে শোক প্রকাশের সুযোগ করে দেওয়া ছিল এক অসাধারণ প্রশাসনিক সাফল্য।
পোস্টে তিনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রচেষ্টায় বিদেশি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি খালেদা জিয়ার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্মানের বহিঃপ্রকাশ বলে তিনি মনে করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীরা যেভাবে এই শোকাবহ অনুষ্ঠানের সংবাদ ও ছবি সারা বিশ্বে পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের সেই নিষ্ঠার প্রতিও তিনি গভীর শ্রদ্ধা জানান। পরিশেষে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের ব্যক্তিগত উপস্থিতি ও সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই সম্মিলিত শক্তির কারণেই তাঁর পরিবার ও পুরো জাতি মর্যাদার সঙ্গে দেশনেত্রীর স্মৃতিকে সম্মান জানাতে পেরেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধরনের রদবদল ও অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ডা. তাসনিম জারার পদত্যাগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ পদত্যাগ করেছেন। গত বুধবার তিনি দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বরাবর তার আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন। এনসিপির মিডিয়া সেল থেকে এই পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। খালেদ সাইফুল্লাহ তার পদত্যাগপত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না করলেও পদত্যাগের অনুলিপি দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেনকেও পাঠানো হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির সাম্প্রতিক নির্বাচনী আসন সমঝোতার সিদ্ধান্তের পরই দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে এই সরে দাঁড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
খালেদ সাইফুল্লাহর এই পদত্যাগ দলটির জন্য বড় একটি সাংগঠনিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তিনি দলের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্বশীল ব্যক্তি ছিলেন। এর আগে ঢাকা-৯ আসনের মনোনীত প্রার্থী তাসনিম জারা দল ত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং খালেদ সাইফুল্লাহ শুরু থেকেই তার স্ত্রীর নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা খালেদ সাইফুল্লাহর মতো পেশাদার ব্যক্তির বিদায় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এনসিপির রাজনৈতিক ও গবেষণামূলক কার্যক্রমে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে তিনি তার স্ত্রীর স্বতন্ত্র প্রার্থিতার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। তাদের মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনের পর মারা যান। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বার্ষিক প্রতিবেদন এ তথ্য জানানো হয়।
একই সময়ে ৩৮ জন গুলিবিদ্ধ বা শারীরিকভাবে আহত এবং ১৪ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন; যাদের মধ্যে চারজনকে পরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালজুড়ে ‘মব সন্ত্রাস’ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো ধরনের প্রমাণ, তদন্ত বা আইনিপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, সন্দেহ, গুজব সৃষ্টি করে মানুষকে মারধর ও হত্যা করা হয়েছে। ‘তওহীদি জনতার’ নামে বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, এমনকি কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরুদ্ধ মতের মানুষকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে উদাসীনতার প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে, যা দেশে আইনের শাসনের জন্য চূড়ান্ত হুমকিস্বরূপ এবং সমাজে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
মানবাধিকার সংস্থা আসক জানায়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন মানবাধিকারের বাস্তব পরিস্থিতিতে কাঙ্খিত পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং পুরোনো নিপীড়ন-পদ্ধতির ধারাবাহিকতা নতুন রূপে বহমান রয়েছে।
দমনমূলক শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহিহীন এবং বৈষম্যমূলক আচরণকে নিষ্কণ্টকভাবে টিকিয়ে রেখেছে; যা মানবাধিকার পরিস্থিতিকে সার্বিকভাবে অস্থির ও উদ্বেগজনক বলে বিবেচিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত মানবাধিকার সম্পর্কিত সংবাদ এবং আসকের পর্যবেক্ষণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গেল বছর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনের প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও জননিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধানগুলোকে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ ছিল সারা বছর।
আসক জানায় জানায়, গত ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে সংঘটিত পরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং এর ফলে সেখানে কর্মরত সাংবাদিক, প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়ার ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
আসকের প্রতিবেদনে জানানো হয়, সদ্য গেল বছর দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হন।
আসকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে, যা ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও সহিংসতর হয়ে উঠেছে।
এদিকে আসক জানায়, ২০২৫ সালে সারাদেশে কারা হেফাজতে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এর মধ্যে ৬৯ জন হাজতি এবং কয়েদি ৩৮ জন। সারাদেশের কারাগারগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা গেছেন ৩৮ জন এবং এরপর রয়েছে গাজীপুরে ৭ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া বাকি মৃত্যুগুলো হয়েছে দেশের অন্যান্য কারাগার সমূহে। এর আগে ২০২৪ সালে দেশের কারাগার সমূহে ৬৫ জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল।
জীবদ্দশায় জনসমক্ষে মাত্র তিনবার কেঁদেছিলেন তিনি। প্রথমবার, যেদিন চট্টগ্রাম থেকে স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ আনা হয়েছিল ঢাকায়। দ্বিতীয়বার, সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর। সেদিন দেশবাসী দেখেছিল তার অশ্রুসিক্ত চোখ। এরপর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে অশ্রুসজল হয়েছিলেন তিনি। এরপর আর কোনো দিন কেউ তাকে কাঁদতে দেখেনি। জেল-জুলুম, নির্যাতন, হিংসা-বিদ্বেষ, শত লাঞ্ছনাতেও তিনি ছিলেন অটল, অবিচল। সেই আপসহীন নেত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবনের পরম সত্যের কাছে সঁপে দিলেন নিজেকে। এবার আর তিনি নিজে কাঁদলেন না; কোটি কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন অসীমশূন্যে; রেখে গেলেন আপসহীন নেতৃত্বের জলন্ত উদাহরণ। তিনি মিশে থাকবেন সবুজ-শ্যামল বাংলার ধানের শীষে।
দীর্ঘদিনের বন্দিদশায় মনে ও শরীরে ভেঙে পড়েছিলেন আপসহীন নেত্রী। কারাগারে থাকার সময় বিগত সরকার তাকে চিকিৎসার ন্যূনতম সুযোগও দেয়নি। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারের বিদায়ের পর সেই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তিনি। এরপর চিকিৎসা নিতে লন্ডনে যান চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি। লন্ডনে চিকিৎসায় তার অনেকটা শারীরিক উন্নতি হয়। সেখানে বড় ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেন। দেশে ফিরে আসেন ৬ মে। সেদিন লাখো মানুষ তাদের প্রিয় নেত্রীর প্রত্যাবর্তন উদযাপন করছিলেন। বিমানবন্দর থেকে গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় তাকে পৌঁছতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। তবে ফিরে আসার পর থেকে প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন তিনি। বয়সও ছিল অনেকটা প্রতিকূল। সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর, রোববার, শেষবারের মতো এভারকেয়ার হাসপাতালে যান চিকিৎসা নিতে। এরপর ৩৮ দিন লড়াই করে গত মঙ্গলবার ভোরে মেনে নিলেন পরম সত্য। দেশবাসীর কাছ থেকে চিরবিদায় নিলেন আপসহীন নেত্রী। আর গতকাল বুধবার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পাশে নিলেন চিরআশ্রয়।
এত দিন ধরে খালেদা জিয়াকে বাঁচিয়ে রাখতে পরিবার, দল ও সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো প্রচেষ্টা ছিল না, যা করা হয়নি। তাকে ঘিরে চলছিল উন্নত চিকিৎসা, নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ আর দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বিত পরামর্শ। এর বাইরে পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিন চোখ ভিজিয়েছেন প্রার্থনায়।
সমর্থকরা হাসপাতালের বাইরে অশ্রুসিক্ত হয়ে অপেক্ষায় থেকেছেন তার সুস্থতা কামনায়। সারাদেশে সাধারণ মানুষ প্রিয় নেত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন মসজিদ-মন্দির-গির্জায়। দেশীয় চিকিৎসকদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনের চিকিৎসকরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, যেন সংকটের এই গভীর অন্ধকার ভেদ করে তিনি ফিরতে পারেন জীবনের আলোয়। সবার আকুতি ছিল একটাই- খালেদা জিয়া বেঁচে থাকুক, সুস্থ হয়ে আবার উঠে দাঁড়ান।
হাসপাতালে ভর্তির পর খালেদা জিয়াকে অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছিল সরকার। তার নিরাপত্তায় নিয়োগ করা হয়েছিল এসএসএফ। কিন্তু পৃথিবীর কোনো পাহারার কি সাধ্য আছে মৃত্যুদূতকে ঠেকানোর? হয়তো রোগশয্যায় শুয়ে তিনিও লড়াই করে যাচ্ছিলেন মৃত্যুর সঙ্গে। যে লড়াইয়ে মানুষের হারই হয় অনিবার্য।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে পুরো দেশ। শোক জানায় খালেদা জিয়ার নিজের দল বিএনপিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও শোক জানান।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক এবং গতকাল বুধবার খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফনের দিনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন।
মায়ের মৃত্যুর পর বড় ছেলে তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমার কাছে খালেদা জিয়া একজন মমতাময়ী মা, যিনি নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশ ও মানুষের জন্য।’
রাজনীতিবিদদের দীর্ঘ যাত্রাপথে উত্থান-পতন ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকে। মামলা-মোকদ্দমা, কারাবাস, জিঘাংসা কিংবা অন্ধ বিদ্বেষের সবই রাজনীতিকদের জীবনে বারবার ফিরে আসে। খালেদা জিয়ার জীবন এসব ঝড়ঝাপটার মাঝে কঠিন এক পথরেখা এঁকে দিয়েছিল। ব্যক্তিগত জীবনে স্বামী-সন্তান হারানোর অসহনীয় শোক, অকারণ অপবাদ, দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা—এসবের ভারও তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে নিঃশব্দ দৃঢ়তায়।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে খালেদা জিয়ার জীবনে নেমে এসেছিল এক গভীর অন্ধকার। মেজর জিয়াউর রহমান যুদ্ধের অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্তে প্রায় ৩০০ সৈনিক নিয়ে বাসভবনের পাশ দিয়ে চলে যান। স্ত্রী-সন্তানের মুখ দেখার সুযোগটুকুও পাননি। ছোট দুই ছেলেকে বুকে নিয়ে বিপন্ন সময়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নিঃসীম অপেক্ষায় থেকেছেন খালেদা জিয়া। এরপর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পালিয়ে আসা, ঠিকানা বদলে আত্মগোপন করা আর অদৃশ্য আতঙ্কের সঙ্গে ছিল তার প্রতিদিনের লড়াই। সবই তার পিছু নিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২ জুলাই ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাড়ি থেকে পাকিস্তানি সেনারা তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। এরপর বন্দি অবস্থায় একাকী কাটাতে হয় যুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলো। সময় স্বয়ং যেন তার সহনশীলতার পরীক্ষা নিচ্ছিল।
স্বাধীনতার পরও খালেদা জিয়ার পথ ছিল অনাবৃত কণ্টকময়। মতাদর্শের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, অসংখ্য দুর্বিনীত মন্তব্য—সবই তাকে বারবার আহত করেছে অন্তরে-বাইরে।
বহু স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাড়ি থেকে ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর উচ্ছেদের মুহূর্তে সংবাদমাধ্যমের সামনে তাকে দেখা গিয়েছিল অশ্রুসিক্ত চোখে, অবিচলচিত্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক দৃঢ়মানবী হিসেবে। এমন অজস্র ক্ষত-বিক্ষত ঘটনার ভিড়েও তিনি কখনো ভেঙে পড়েননি। সময়ের নির্মম আঘাত ও মানবিক নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে তার নীরব প্রতিরোধ ছিল ধৈর্যের, মর্যাদার এবং নিজের ওপর অনিঃশেষ আস্থার। অনমনীয় দৃঢ়তায় তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, মানুষ যখন অন্তর্দীপ জ্বালিয়ে রাখে, তখন বাইরের ঝড় তাকে নত করতে পারে না।
খালেদা জিয়ার বাবা এস্কান্দার মজুমদারের আদিবাস ছিল ফেনী জেলার পরশুরাম থানার শ্রীপুর গ্রামে। পেশায় চা ব্যবসায়ী। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে চায়ের ব্যবসা বন্ধ করে তিনি স্থায়ীভাবে চলে আসেন বাংলাদেশের দিনাজপুরে। তার আগে জলপাইগুড়িতেই ১৯৪৬ সালে জন্ম হয় খালেদার। মা ছিলেন তৈয়বা বেগম।
১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ার পৈতৃক বাড়িতে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি ‘বেগম খালেদা জিয়া’ নামে পরিচিতি পান।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া দম্পতির দুই ছেলে—জ্যেষ্ঠ তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর এবং কনিষ্ঠ আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মালয়েশিয়ায় মারা যান। সেদিন কান্না ভুলে শোকে পাথর হয়ে ছিলেন খালেদা জিয়া।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে খালেদা জিয়াকে দৃঢ় সংকল্প ও বিশ্বাসের বিরল এক নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
চিঠিতে তিনি খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ফেসবুকে চিঠিটি প্রকাশ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ‘তারেক রহমানের নেতৃত্ব দুই দেশের গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্বের নতুন সূচনা ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে বলে প্রত্যাশা করেন নরেন্দ্র মোদি।’
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে জাতীয় সংসদ ভবনে সাক্ষাতের সময় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওই চিঠি তুলে দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে ৩০ ডিসেম্বর লিখা চিঠিতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বৈঠকের স্মৃতিচারণ করেছেন।
চিঠিতে নরেন্দ্র মোদি লেখেন, ‘আপনার মা, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে আমি গভীর শোক প্রকাশ করছি। আপনার ব্যক্তিগত এই গভীর ক্ষতির জন্য আমার আন্তরিক সমবেদনা গ্রহণ করুন। তার আত্মা চিরশান্তিতে শান্তি লাভ করুক।’
তারেক রহমানকে দেওয়া চিঠিতে শোক প্রকাশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বৈঠকের স্মৃতিচারণ করেছেন।
তিনি লেখেন, ‘২০১৫ সালের জুনে ঢাকায় বেগম সাহেবার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ এবং আলোচনার কথা আমি আন্তরিকভাবে স্মরণ করছি। তিনি ছিলেন দৃঢ় সংকল্প ও বিশ্বাসের বিরল এক নেত্রী এবং বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে, সেই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। তার মৃত্যুতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হলেও তার দৃষ্টিভঙ্গি এবং উত্তরাধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে। আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আপনার দক্ষ নেতৃত্বে তার আদর্শ এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্বের একটি নতুন সূচনা এবং সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য একটি পথপ্রদর্শক আলো হিসেবে কাজ করবে।’
চিঠিতে তিনি আরও লেখেন, ‘জাতীয় শোকের এই মুহূর্তে আমার ভাবনাও বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আছে, যারা তাদের ইতিহাসে অসাধারণ শক্তি ও মর্যাদা প্রদর্শন করেছেন। আমি নিশ্চিত, তারা তাদের যৌথ মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য এবং গভীর জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে এগিয়ে যাবে। আবারও আমার আন্তরিক সমবেদনা গ্রহণ করুন। আমি সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে এই কঠিন সময় অতিক্রম করার শক্তি ও সহিষ্ণুতা দিন। আমি আপনার ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডের জন্যও শুভকামনা জানাই।’
একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক মহাকাব্যের শেষ পাতাটি উল্টে গেল। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বাদ জোহর রাজধানী মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে হয়েছে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা। এরপর জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশেই চিরঘুমে শায়িত হন তিনি। তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে। জীবনের দীর্ঘ লড়াই, কারাবাস, একাকিত্ব আর অসুস্থতার সব গ্লানি মুছে দিয়ে তিনি ফিরে গেলেন তার জীবনসঙ্গীর পাশে।
দাফনের প্রতিটি ধাপে নিশ্চিত করা হয় পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। দেশনেত্রীর শেষ বিদায় যেন সুশৃঙ্খল হয়, সে জন্য মোতায়েন ছিল ১০ হাজারেরও বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। সেনাবাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে। তবে এই কঠোর নিরাপত্তার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দেয় মানুষের আবেগ। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষও বিশেষ সার্ভিস চালু করেছে, যেন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে জানাজায় শরিক হতে পারেন।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু কেবল একটি দলের নেত্রীর বিদায় নয়, এটি একটি আপসহীন সংগ্রামের সমাপ্তি। যিনি কখনো মাথা নত করেননি, যিনি কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠেও গণতন্ত্রের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখতেন, আজ তিনি সব পিছুটান ছিঁড়ে চলে গেলেন অন্য আলোকে।
দল-মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ স্বীকার করছেন, বাংলার রাজনীতিতে খালেদা জিয়া ছিলেন এমন এক স্তম্ভ, যার অভাব পূরণ হওয়ার নয়। তার মায়াভরা সেই চিরচেনা হাসি আর জনসভায় ‘খোদা হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে বিদায় নেওয়া সেই দৃশ্য এখন কেবলই স্মৃতি।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) যখন জিয়া উদ্যানের মাটি তার গায়ে দেওয়া হয়, তখন একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে ঠিকই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া আদর্শ আর সাহসিকতার গল্পগুলো কোটি মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে। বাংলার আকাশ-বাতাস যেন এক করুণ সুরে গাইছে- ‘বিদায় দেশনেত্রী, বিদায় মা’।
এর আগে, জাতীয় সংসদ ভবন ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে তার জানাজা হয়। এ সময় ঢাকার বিভিন্ন রাস্তা লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। পরে সংসদ ভবন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় পতাকায় মোড়া লাশবাহী গাড়িতে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়া উদ্যানে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিশেষ একটি বাহনে করে খালেদা জিয়ার মরদেহ জিয়াউর রহমানের সমাধির কাছে নেওয়া হয়।
সমাধির কাছাকাছি নেওয়ার পর খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী কফিন কাঁধে নিয়ে যান সেনা ও নৌবাহিনীর সদস্যরা।
দাফনের প্রক্রিয়া চলার সময় তারেক রহমান, স্ত্রী জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, ছোট ভাই আরাফাত রহমানের স্ত্রী শামিলা রহমান, তার ছোট মেয়ে জাফিরা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা, বিএনপির নেতা-কর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা দাঁড়িয়ে শোক ও শ্রদ্ধা জানান।
বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সন্ধ্যার আগে ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি ঢাকা ছাড়েন।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফরে তিনি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ বার্তা পৌঁছে দেন।
ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিকেল ৫টায় ঢাকা ত্যাগ করেছেন।
খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে কয়েক ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফরে আজ দুপুরেই তিনি ঢাকায় আসেন।
সফরকালে জয়শঙ্কর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এ সময় তিনি খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সমবেদনা জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ব্যক্তিগত চিঠি হস্তান্তর করেন। ভারত সরকার এবং জনগণের পক্ষ থেকেও গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন তিনি।
উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক ও কুশল বিনিময় সংক্ষিপ্ত এই সফরে জয়শঙ্কর অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এ ছাড়া খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকায় আসা পাকিস্তানের পার্লামেন্টের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিকসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গেও তিনি কুশল বিনিময় করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এস জয়শঙ্করই প্রথম ভারতীয় মন্ত্রী, যিনি ঢাকা সফরে এলেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে এসে আজ বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) ঢাকায় এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাতে মিলিত হয়েছেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম জিও টিভির বরাতে জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় এই দুই শীর্ষ নেতার দেখা হয়। সাক্ষাতকালে তাঁরা একে অপরের সাথে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে করমর্দন করেন এবং সংক্ষিপ্ত কুশল বিনিময় করেন। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের মাঝে দুই প্রতিবেশী দেশের এমন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে আজ রাজধানী জুড়ে এক গভীর শোকাতুর পরিবেশ বিরাজ করছে। ৮০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমানো এই বরেণ্য নেত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসা ভারত ও পাকিস্তানের এই দুই প্রতিনিধির অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর নেতৃত্বের গুরুত্বকেই পুনরায় ফুটিয়ে তুলেছে। জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে পুরো ঢাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি শোকের প্রতীক হিসেবে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। জয়শঙ্কর ও সাদিক ছাড়াও আরও অনেক দেশের প্রতিনিধিরা এই ঐতিহাসিক শোকাবহ অনুষ্ঠানে শরিক হতে বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পাকিস্তানের স্পিকারের এই আকস্মিক কুশল বিনিময় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে কারণ ২০২৫ সালের মে মাসে দুই দেশের মধ্যে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত তীব্র সামরিক সংঘাত সংঘটিত হয়েছিল। ওই সংঘাতের পর এই প্রথম নেতৃত্ব পর্যায়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে এমন কোনো সরাসরি ও প্রকাশ্যে সৌজন্যমূলক মোলাকাত ঘটল। বেগম খালেদা জিয়ার চিরবিদায়ের লগ্নটি যেন এক মুহূর্তের জন্য হলেও দুই বৈরী দেশের প্রতিনিধিদের একই কাতারে নিয়ে এল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এক শোকাবহ প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক শিষ্টাচার আগামীর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ সংকেত হতে পারে। মূলত এক মহান নেত্রীর বিদায়বেলাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় আজ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক অনন্য মিলনমেলা পরিলক্ষিত হয়েছে।