আজ ঐতিহাসিক ১৯ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গাজীপুরের (সেই সময়ের জয়দেবপুর) বীর জনতা গর্জে উঠেছিল এবং সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। মনে পড়ে মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালি জাতির এক অবিস্মরণীয় গণ-অভ্যুত্থানের কথা। ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ দুপুরে হঠাৎ এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন। এ কথা শোনামাত্র সারা দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে এ ঘোষণার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসেন। দেশের সর্বত্রই স্লোগান ওঠে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা’, ‘পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা-বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি-বাঙালি’।
বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পূর্বাণী হোটেলে এক সভায় ইয়াহিয়ার ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ঢাকায় ২ মার্চ এবং সারা বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন এবং ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা আহ্বান করেন।
জয়দেবপুরে (আজকের গাজীপুর) আমার পরামর্শে ২ মার্চ রাতে তৎকালীন থানা পশুপালন কর্মকর্তা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের সরকারি বাসায় তৎকালীন মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিব উল্ল্যাহ এক সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। সভায় আমাকে (আ ক ম মোজাম্মেল হক) আহ্বায়ক করে এবং মেশিন টুলস্ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খানকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্যের এক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সদস্য হন আয়েশ উদ্দিন, মো. নুরুল ইসলাম (ভাওয়াল রত্ন), মো. আ. ছাত্তার মিয়া (চৌরাস্তা), থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম হজরত আলী মাস্টার (চৌরাস্তা), মো. শহীদ উল্ল্যাহ বাচ্চু (মরহুম), হারুন-অর-রশিদ ভূঁইয়া (মরহুম), শহিদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ (মরহুম), শেখ আবুল হোসেন (শ্রমিক লীগ), থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. সাঈদ বকস্ ভূঁইয়া (মরহুম)। কমিটির হাইকমান্ড (উপদেষ্টা) হন মো. হাবিব উল্ল্যাহ (মরহুম), শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এম এ মুত্তালিব এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নেতা বাবু মনীন্দ্রনাথ গোস্বামী (প্রয়াত)।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার আগেই আমরা এ কমিটি গঠন করেছিলাম। পেছনের ইতিহাস এই যে, আমি ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। নিউক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা, যা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৬২ সালেই ছাত্রলীগের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যেই সশস্ত্র যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে বাঙালি সৈন্যদের মধ্যেও নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। এ সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যাবে পাকিস্তানিদের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের দায়ের করা ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ মামলায় যা বিখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই বুঝতে পেরেছিলাম যে, সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। জয়দেবপুরে (গাজীপুরে) সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ গাজীপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিমসংলগ্ন বটতলায় এক সমাবেশ করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়। স্লোগান ওঠে ‘ইয়াহিয়ার মুখে লাথি মার- বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। পতাকা ধরেছিলেন হারুন ভূঁইয়া এবং অগ্নিসংযোগ করেছিলেন শহীদউল্যাহ বাচ্চু। আর স্লোগান, মাস্টার আ. ছাত্তার মিয়া পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে স্লোগান দিতেন।
আমরা ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী (তৎকালীন রেসকোর্স) উদ্যানের মহাসমাবেশে যোগ দিলাম। সে সময় জয়দেবপুর (গাজীপুর) থেকে হাজার হাজার বীর জনতা ট্রেনে করে এবং শতাধিক ট্রাক ও বাসে করে মাথায় লাল ফিতা বেঁধে ওই জনসভায় যোগ দিয়েছিল। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। আজকে ভাবতেও অবাক লাগে কীভাবে এ জনস্রোত এসে মিশে গিয়েছিল ৭ মার্চের মহাসমুদ্রে। ৭ মার্চে উজ্জীবিত হয়ে আমরা সম্ভবত ১১ মার্চ গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা (অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) আক্রমণ করি। গেটে বাধা পাওয়ার পর আমি হাজার হাজার মানুষের সামনে টেবিলে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছি মাইকে। পাকিস্তানিরা যাতে বুঝতে পারে, সে জন্য ইংরেজিতে বলি, ‘I do hereby dismiss Brigadier Karimullah from the directorship of Pakistan Ordnance Factory and do hereby appoint Administrative officer Mr Abudul Qader (বাঙালি) as the director of the ordnance Factory’। এই গর্জনে সত্যিই কাজ হয়েছিল। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার বক্তৃতা চলাকালীন পেছনের গেট দিয়ে সালনা হয়ে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আর পরবর্তীতে ১৫ এপ্রিলের পূর্বে গাজীপুরে যাননি। ওই সমরাস্ত্র কারখানা ২৭ মার্চ পর্যন্ত আমাদের দখলেই ছিল। সম্ভবত ১৩ মার্চ তৎকালীন জিওসি ইয়াকুব আলী জয়দেবপুর রাজবাড়ী মাঠে হেলিকপ্টারে অবতরণ করতে চেষ্টা করলে শত শত বীর জনতা হেলিকপ্টারের প্রতি ইট-পাটকেল ও জুতা ছুড়তে শুরু করলে হেলিকপ্টারটি না নামতে পেরে ফেরত চলে যায়।
সে দিন ১৭ মার্চ বুধবার, মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে লাখো জনতার ঢল নেমেছিল ৩২ নম্বরের বাড়িতে। সবাই বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিল। তৎকালীন আমাদের নির্বাচনী এলাকার এমএলএ সামসুল হক (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য), হাবিব উল্ল্যাহসহ আমি গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে জয়দেবপুরে ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার সংবাদ দিতে। সন্ধ্যায় আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেয়ে কিছু বলতে চাই কি না বঙ্গবন্ধু জানতে চান। কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রের মজুত কমে গেছে অজুহাতে ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে রক্ষিত অস্ত্র আনার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংবাদ জানাই। সামসুল হকের ইশারায় আমি তরুণ হিসেবে এ অবস্থায় আমাদের কী করণীয় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু ব্যাঘ্রের ন্যায় গর্জে উঠে বললেন, ‘তুই একটা আহাম্মক, কী শিখেছিস যে আমাকে বলে দিতে হবে!’ একটু পায়চারি করে বললেন, ‘বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে দেয়া যাবে না। ‘Resist at the cost of anything’। নেতার হুকুম পেয়ে গেলাম। ১৯ মার্চ শুক্রবার আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহান জেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি রেজিমেন্ট জয়দেবপুরস্থ (গাজীপুর) ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য পৌঁছে যায়। একজন জেসিও (নায়েব সুবেদার) জয়দেবপুর হাইস্কুলের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে (জকি স্মৃতির প্রাইমারি স্কুলের সামনে) গোসল করার সময় জানান যে, ঢাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চলে এসেছেন। খবর পেয়ে দ্রুত আমাদের তখনকার আবাসস্থান মুসলিম হোস্টেলে ফিরে গিয়ে উপস্থিত হাবিব উল্ল্যা ও শহীদুল্ল্যাহ বাচ্চুকে এ সংবাদ জানাই। শহীদউল্ল্যাহ বাচ্চু তখনই রিকশায় চড়ে শিমুলতলীতে, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্লান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসার খবর দিলে ১ ঘণ্টার মধ্যে মাঠেই হাজার শ্রমিক-জনতা চারদিক থেকে লাঠিসোঁটা, দা, কাতরা, ছেন, দোনলাবন্দুকসহ জয়দেবপুর উপস্থিত হয়। সেদিন জয়দেবপুর হাটের দিন ছিল। জয়দেবপুর রেল গেটে মালগাড়ির বগি, অকেজো রেললাইন, স্লিপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি, কাঠ, বাঁশ, ইট ইত্যাদি যে-যেভাবে আনতে পেরেছিল তা দিয়ে এক বিশাল ব্যারিকেড দেয়। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরও ৫টি ব্যারিকেড দেয়া হয় যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ফেরত যেতে না পারে। ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন মেজর কে এম শফিউল্লাহ (পরবর্তীকালে সেনাপ্রধান)। আমরা যখন ব্যারিকেড দিচ্ছিলাম তখন টাঙ্গাইল থেকে রেশন নিয়ে একটি কনভয় জয়দেবপুর আসছিল। সে রেশনের গাড়িকে জনতা আটকে দেয়। সেই কনভয়ে থাকা ৫ জন সৈন্যের চায়নিজ রাইফেল তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়।
এ দিকে রেল গেটের ব্যারিকেড সরানোর জন্য ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আদেশ দেন। কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্যদের অবস্থান রেখে মেজর শফিউল্লাহকে জনতার ওপর গুলিবর্ষণের আদেশ দেয়া হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা আমাদের জনতার ওপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে অগ্রসর হতে থাকলে আমরা বর্তমান গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওপর অবস্থান নিয়ে বন্দুক ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করি।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে জয়দেবপুরে শহীদ হন নেয়ামত ও মনুখলিফা, আহত হন চতরের সন্তোষ, ডা. ইউসুফসহ শত শত বীর জনতা। পাকিস্তানি বাহিনী কারফিউ জারি করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে আমাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। আমরা পিছু হটলে দীর্ঘসময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিষ্কার করে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চান্দনা চৌরাস্তায় এসে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হন। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সেনাসদস্যকে পেছন থেকে আক্রমণ করে। আমরা সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নিই। কিন্তু পেছনে আর এক পাঞ্জাবি সেনা হুরমতের মাথায় গুলি করলে হুরমত সেখানেই শাহাদতবরণ করেন। বর্তমানে সেই স্থানে চৌরাস্তার মোড়ে ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নামে ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।
পরদিন বঙ্গবন্ধু আলোচনা চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে ১৯ মার্চ নিহতদের কথা উল্লেখ করলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান বলেন যে, ‘জয়দেবপুরে জনতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর আধুনিক অস্ত্র ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে আক্রমণ করেছে এবং এতে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক সেনা আহত হয়েছে।’
১৯ মার্চের পর সারা বাংলাদেশে স্লোগান ওঠে, ‘জয়দেবপুরের পথ ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘জয়দেবপুরের পথ ধর-সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু কর’।
১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ প্রথম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গাজীপুরবাসীর উদ্দেশে এক পত্রে ১৯ মার্চের সশস্ত্র প্রতিরোধের সময় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং জয়দেবপুরবাসীকে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তীতে ১৯ মার্চের শহীদসহ অংশগ্রহণকারী সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। এ সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পাওয়ায় নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি।
১৯ মার্চের সশস্ত্র যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক মাইলফলক। জয়দেবপুরের গৌরবগাথা উনিশে মার্চ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস হিসেবে জাতীয়ভাবে উদযাপন করার দাবিতে গাজীপুরের সর্বস্তরের জনতা আবেদন জানিয়ে আসছে। উনিশে মার্চ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস হিসেবে দেশব্যাপী জাতীয়ভাবে পালিত হলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনার ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষিত হবে বলে আমি মনে করি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ওপর কোনো নির্দিষ্ট আক্রমণ বা দমনের ঘটনা দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল।
শনিবার ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের চেয়ার ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা আকুফো-আডো।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পর্যবেক্ষক দলের কাছে কোনো সরাসরি রিপোর্ট পাওয়া যায়নি যে, কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠী নির্বাচনের সময় আক্রান্ত হয়েছে। তবে আমরা লক্ষ্য করেছি, কিছু অঞ্চলে সংখ্যালঘু ভোটার উপস্থিতির হার কম ছিল এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটাররা তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এটি আমাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং স্বচ্ছভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এটি একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত।’
আকুফো-আডো আরো বলেন, ‘নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যবেক্ষকরা দেখেছেন, যদিও দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল (আওয়ামী লীগ) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, তবু প্রায় সব প্রার্থীর জন্য ভোটাধিকার, প্রার্থী নিবন্ধন এবং ফল গণনা প্রক্রিয়া উন্মুক্ত ছিল। প্রায় ২ হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। ফলে নতুন সরকারে কারা মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী হচ্ছেন তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তবে এবার প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর নবীনদের উদ্যম-এই দুইয়ের সমন্বয়ে গঠন করা হবে নতুন মন্ত্রিসভা।
সংসদ-সদস্য নন এমন কয়েকজন মেধাবী ও দলের জন্য নিবেদিত হেভিওয়েট নেতাকেও টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হবে। তবে মন্ত্রিসভার আকার বেশি বড় হবে না বলে জানিয়েছেন বিএনপির নীতিনির্ধারক কয়েকজন নেতা। তারা জানিয়েছেন, ৩২ থেকে ৪২ সদস্যের মধ্যে থাকতে পারে মন্ত্রিসভা। এ নিয়ে ইতোমধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। তবে কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন জানা যাবে তা শপথের পর।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর মতে, নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার সন্ধ্যার পর সিনিয়র নেতারা দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন এবং ফুল দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান। পরে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন দলীয় প্রধান। বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক বলেন, বৈঠকে তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ নেন। বিশেষ করে মন্ত্রিসভায় কারা থাকতে পারেন তা নিয়ে পরামর্শ করেন তিনি। এছাড়া সংসদ-সদস্যেদের শপথ, মন্ত্রিসভা গঠনসহ নির্বাচনের সার্বিক বিষয় নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হয়।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কেমন মন্ত্রিসভা হতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য দেশবাসীকে আর অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারক আরেকজন নেতা বলেন, মন্ত্রিসভায় কারা থাকবেন সেটি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করছেন। এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি ওই নীতিনির্ধারক।
দলটির একটি সূত্র জানায়, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে তাকে রাষ্ট্রপতি করা হতে পারে এমন গুঞ্জনও রয়েছে। স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, বেগম সেলিমা রহমান ও অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন, নূরুল ইসলাম মনি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হতে পারেন। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম খান ও বেগম সেলিমা রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হতে পারে।
টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় আরও স্থান পেতে পারেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, হুমায়ুন কবীর, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক। এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দারও। তবে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত না হলে এদের কাউকে কাউকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গুরুত্ব পদে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
জাতীয় সংসদে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি বা সংসদ-সদস্য না হয়ে যারা মন্ত্রিসভায় স্থান পান বা মন্ত্রী হন তাদের বলা হয় টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী। এ বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫৬-এর ২ ধারায় বলা রয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগদান করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, তাহাদের সংখ্যার অন্যূন নয়-দশমাংশ সংসদ-সদস্যগণের মধ্য হতে নিযুক্ত হবেন এবং অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হবার যোগ্য ব্যক্তিগণের মধ্য হতে মনোনীত হতে পারবেন।’ মন্ত্রিসভা ৪০ জনের হলে সে হিসাবে টেকনোক্র্যাট কোটায় চারজনকে মন্ত্রী করা যাবে।
অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া শহীদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নওশাদ জমির, আমানউল্লাহ আমান, হাবিবুর রশীদ, শেখ রবিউল আলম, আসাদুল হাবিব দুলু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, রকিবুল ইসলাম বকুল, মোহাম্মদ আলী আসগর লবি মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। এছাড়া মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন নুরুল ইসলাম মনি, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মজিবর রহমান সরওয়ার, এবিএম মোশাররফ হোসেন, জহির উদ্দিন স্বপন, আব্দুস সালাম পিন্টু, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান, কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, শরীফুল আলম, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, আফরোজা খান রিতা। এছাড়াও ফজলুল হক মিলন, খায়রুল কবির খোকন, শামা ওবায়েদ, শহীদুল ইসলাম বাবুল, মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, খন্দকার আব্দুল মোক্তাদির চৌধুরী, আ ন ম এহছানুল হক মিলন, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বরকতউল্লা বুলু, মো. শাজাহান, মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, ড. রেজা কিবরিয়া, মো. মোশাররফ হোসেন ও সাঈদ আল নোমানও মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
মিত্র দলগুলোর নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের মধ্যে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জোনায়েদ সাকি ও নুরুল হক নুরকেও মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে। বগুড়া-২ আসনে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন মাহমুদুর রহমান মান্না। তবে শেষ পর্যন্ত টেকনোক্র্যাট কোটায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে ২৯৭ আসনের বিজয়ীদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে, সেই সব নির্বাচিতদের গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন।
এ এম এম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন কমিশন ফল অনুমোদন দেওয়ার পর ইসি সচিব আখতার আহমেদ গত শুক্রবার রাতে এ গেজেট জারি করেন।
নির্বাচিতদের নাম, মা-বাবার নাম ও ঠিকানা গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে। এখন নির্বাচিতদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের আয়োজন করা হবে।
দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯ আসনে ভোট হয় বৃহস্পতিবার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফল গোনা হলেও আদালতের নির্দেশনা থাকায় ফল ঘোষণা করা হয়নি।
আর শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে সেখানে নতুন তফসিলে ভোট হবে।
নতুন সাংসদদের শপথ অনুষ্ঠান সামনে রেখে জাতীয় সংসদ ভবনে পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামোগত সংস্কারের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোর মেরামতও করা হয়েছে।
সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, শপথের আনুষ্ঠানিকতা, প্রটোকল, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দপ্তর কাজ করছে। স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির অফিসকক্ষ, সরকারি ও বিরোধীদলের সভাকক্ষ, অধিবেশন কক্ষ ও শপথ কক্ষ ব্যবহারের উপযোগী করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে দেশে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদের সম্ভাবনা তৈরি হলেও শঙ্কা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশের বাজেট এবং অর্থ সংক্রান্ত সব বিল পাশের একচ্ছত্র ক্ষমতা নিম্নকক্ষের হাতেই থাকবে। তবে অর্থবিল ছাড়া অন্য যেকোনো বিল পাশের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের সমন্বয় প্রয়োজন হবে। তবে এ ব্যবস্থায় সংসদ কাঠামোগতভাবে কতটা প্রস্তুত- বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে এমনটা প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, উচ্চকক্ষ-নিম্নকক্ষে কিছু চ্যালেঞ্জও তুলে রয়েছে। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের জন্য নতুন ভবন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ১০৫ জন নতুন সদস্যের বেতন-ভাতা বাবদ রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
দুই কক্ষের পর্যালোচনার কারণে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত আইন পাস করার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। উচ্চকক্ষ বা সিনেট শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে পরাজিত বা দলের অনুগত ব্যক্তিদের ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
তবে সংস্কার কমিশনের মতে, এ ব্যবস্থা জাতীয় রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে এবং কোনো একক দলের স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ বন্ধ করবে। উভয় কক্ষের মেয়াদকাল হবে চার বছর। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জনগণের রায় পেলে এ রূপরেখাটি চূড়ান্তভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। কমিশন মনে করছে, এটি দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি গুণগত পরিবর্তন আনবে।
এবারের সংসদ অবশ্য কিছুটা আলাদা হবে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এক কক্ষবিশিষ্ট সংসদ দেখা গেলেও এবারই প্রথম দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ দেখা যাবে- নিম্নকক্ষ এবং উচ্চকক্ষ। নির্বাচনে যারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের নিয়ে হবে সংসদের নিম্নকক্ষ। নির্বাচিত ৩০০ জনের সঙ্গে সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য যুক্ত হবেন ৫০ জন।
উচ্চকক্ষে মোট সদস্য হবেন ১০০ জন। সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই আনুপাতিক হারে (পিআর পদ্ধতি) সদস্য মনোনীত হবে। অর্থাৎ কোনো দল যদি ৪০ শতাংশ ভোট পায়, তাহলে তারা ৪০টি আসন পাবে। আবার কেউ ১ শতাংশ ভোট পেলে তাদের ১ জন প্রতিনিধি থাকবে উচ্চকক্ষে।
উচ্চকক্ষ গঠিত হবে প্রথম সংসদ অধিবেশন হওয়ার ২১০ দিনের মধ্যে। প্রথম ১৮০ দিন নিম্নকক্ষের সদস্যরা সংবিধান সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করবেন। পরের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যার মেয়াদ থাকবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি সংশোধিত সংবিধান ও প্রণীত আইনের ওপর নির্ভর করবে। সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতে পারেন, আবার পরোক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মনোনয়ন ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে।
সার্বভৌম জনগণের অভিপ্রায়ের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গণভোটে বলে মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ বলেছেন, এটি কেবল সংখ্যার বিচার নয়, বরং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তাই আইনি বিবেচনার চেয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এই রায় বাস্তবায়নের একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থাকে।
আজ শনিবার সকালে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে গণভোটে উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে যে রায় এসেছে, সেটি আইনগতভাবে মানতে রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেছেন তিনি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংবিধান সংস্কার আদেশ ২০২৫-এ স্পষ্টভাবে বলা আছে যে জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। তারা দুটি শপথ গ্রহণ করবেন, একটি জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং
অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। এই পরিষদের মেয়াদ ১৮০ দিন। ‘নোট অব ডিসেন্ট’ এখন একটি জনরায়ে পরিণত হয়েছে এবং জনগণ চায় এগুলো বাস্তবায়ন হোক। আমরা আশা করি, সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এবং অন্যান্য সব দল জনরায়ের এই আকাঙ্ক্ষা বিবেচনা করবে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলোর ওপর ভিত্তি করেই জনরায় এসেছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে সব দলেরই একটি প্রাজ্ঞতা আছে এবং তারা জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি দায়বদ্ধ। শুধু আক্ষরিক অর্থে বিবেচনার চেয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এবং জন-আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং জাতীয় সংসদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই এগুলোর সমাধান হবে।
গণভোটের প্রশ্নে উচ্চকক্ষ ছিল ‘সংখ্যানুপাতিক’, কিন্তু বিজয়ী রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে আছে ‘আসনানুপাতিক’। এ ক্ষেত্রে তারা ইশতেহার অনুযায়ী চলবে কি না—এই প্রশ্নের জবাবে আলী রীয়াজ বলেন, বিএনপি তাদের ইশতেহারে আসনানুপাতিক ব্যবস্থার কথা বলেছে, এটি তাদের দলীয় অবস্থান। তবে গণভোটে যে রায় এসেছে, সেটি ভিন্ন রকম।
আলী রীয়াজ আরও বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, বিএনপি অতীতেও বড় বড় সংস্কারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯১ সালে তারা সংসদীয় ব্যবস্থার কথা না বললেও জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংবিধানে সংসদীয় ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করেছিল। তাই এবারও তারা জনরায় এবং আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেবে বলে আমরা আশা করি।’
‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরতে চায় না: আলী রীয়াজ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরতে চায় না: আলী রীয়াজ
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেকেই এমন ছিলেন, যারা শুধু গণভোট দিয়েছেন। সংসদ নির্বাচনে ভোট দেননি।’ গণভোটে ভোট দিয়েছেন ৭ কোটি ৭৬ লাখ ১৫ হাজার ২৩ জন। ভোটারদের ৬০ শতাংশ গণভোট দিয়েছেন। যা সংসদ নির্বাচনের চেয়েও এক শতাংশ বেশি।
সে প্রসঙ্গে আলী রীয়াজ বলেন, ‘না, আমাদের কাছে মোটেও গোলমেলে মনে হচ্ছে না। এর পেছনে ইসি (ইলেকশন কমিশন) থেকে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে তা হলো—জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে হার দেখানো হচ্ছে, সেটি সব আসনের নয়। এখন পর্যন্ত তিনটি আসনের ফলাফল যুক্ত করা হয়েছে। তাই তিনশ আসনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল আসলে দেখা যাবে যে ভোটের হার জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বাড়বে, যা সম্ভবত গণভোটের হারের প্রায় সমান বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, আমরা দেখেছি অনেকে শুধুমাত্র গণভোটে ভোট দিয়েছেন কিন্তু অন্য নির্বাচনে দেননি। ব্যবধান মাত্র ২ শতাংশের মতো, যা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়।’
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার ও প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ডা. শেখ আব্দুর রশীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে, নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব (চুক্তিভিত্তিক) হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব (চুক্তিভিত্তিক) এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক জরুরি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়েছে। সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মামুন শিবলী স্বাক্ষরিত এই আদেশে স্পষ্টভাবে জানানো হয় যে, “মন্ত্রিপরিষদ সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকৃত ড. শেখ আব্দুর রশীদের নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ এতদ্বারা বাতিল করা হলো।” জনস্বার্থে জারিকৃত এই নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই দিনে পৃথক এক প্রজ্ঞাপনে প্রধান উপদেষ্টার বর্তমান মুখ্য সচিব এম সিরাজ উদ্দিন মিয়াকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করেছে সরকার। নবনিযুক্ত এই কর্মকর্তা বিসিএস-৮২ ব্যাচের সদস্য এবং ইতিপূর্বে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
ড. শেখ আব্দুর রশীদের নিয়োগ বাতিলের আগে তিনি ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর দুই বছরের জন্য এই পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ লাভ করেছিলেন। সে সময় জারি করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, সরকারি চাকরি আইনের ৪৯ ধারা মোতাবেক তাঁকে “১৪ অক্টোবর অথবা যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী দুই বছরের মেয়াদে” এই পদে নিয়োগ দেওয়া হলো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর তিনি পর্যায়ক্রমে পিকেএসএফের চেয়ারম্যান এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া পরিচিত মহলে ‘সিরাজ উদ্দিন সাথী’ নামে সুপরিচিত এবং আমলাতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর ৩২টি গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে “বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র” ও “আমলাতন্ত্রের অন্দরমহলে বত্রিশ বছর”। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তাঁর প্রথম গ্রন্থ “বেলতৈল গ্রামের জরিমন ও অন্যান্য” সম্পাদনা করেছিলেন বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপনে শেখ আব্দুর রশীদের চুক্তির মেয়াদ অবসান ঘটিয়ে অবিলম্বে নতুন দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হয়েছে।
আগামী সোমবার নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতে যাচ্ছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। নির্ধারিত ওই দিন সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন এবং একই দিন বিকেলে বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। বর্ণাঢ্য এই শপথ অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি গণ্যমান্য অতিথিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ইতিমধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এবং বঙ্গভবনে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোট সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছে জাতিসংঘ। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের পক্ষে তাঁর মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক ব্রিফিংয়ে এই আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন বার্তা প্রদান করেন। সংস্থাটি বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন ও সমৃদ্ধি অর্জনে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক ব্রিফিংয়ে বলেন, নির্বাচন পরবর্তী এই সময়ে জাতিসংঘ বাংলাদেশে জাতীয় সংহতি জোরদার এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি দেশের সকল রাজনৈতিক পক্ষ ও অংশীজনদের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে আইনের শাসন সমুন্নত রাখা হয় এবং প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করা হয়। বিশেষ করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং তাদের অধিকার রক্ষার বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ডুজারিক তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পর জনগণের পক্ষ থেকে সরকারের ওপর যে প্রত্যাশা থাকে, জাতিসংঘও ঠিক তেমনই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা দেখতে চায়। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন নয়, বরং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সরকারের কাছ থেকে যে সুশাসন ও ন্যায়বিচার আশা করে, তার প্রতি বিশ্বসংস্থার সমর্থন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব।
সবশেষে জাতিসংঘ বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রচেষ্টায় অংশীদার হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। সংস্থাটি বিশ্বাস করে, একটি স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার মাধ্যমেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। নতুন এই যাত্রায় বাংলাদেশের পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সকল কারিগরি ও কূটনৈতিক সহায়তা প্রদানে জাতিসংঘ সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে বলেও ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে এখন নতুন সংসদ গঠনের প্রস্তুতি চলছে। গত শুক্রবার রাতে নির্বাচন কমিশন থেকে ২৯৭ জন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যের নামের গেজেট প্রকাশের পর দেশজুড়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত মাসিক বেতনের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক ভাতা, আবাসন ও যাতায়াত সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। ১৯৭৩ সালের ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট (রিমিউনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) অর্ডার’ এবং পরবর্তী বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে এই সুযোগ-সুবিধাগুলো আইনি কাঠামোয় নির্ধারণ করা হয়েছে।
একজন সংসদ সদস্যের মাসিক মূল বেতন নির্ধারিত আছে ৫৫ হাজার টাকা। তবে এই মূল বেতনের বাইরেও নির্বাচনী এলাকার কাজের জন্য তাঁরা প্রতি মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা পান। আপ্যায়ন ভাতা হিসেবে তাঁদের মাসিক বরাদ্দ ৫ হাজার টাকা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ হলো পরিবহন ভাতা, যার পরিমাণ প্রতি মাসে ৭০ হাজার টাকা। এই অর্থ দিয়ে মূলত গাড়ির জ্বালানি খরচ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং চালকের বেতন মেটানো হয়। এর বাইরেও ব্যক্তিগত অফিস পরিচালনার জন্য মাসে ১৫ হাজার টাকা, লন্ড্রি বা কাপড় ধোলাইয়ের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং বিবিধ খরচ বাবদ আরও ৬ হাজার টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রদান করা হয়।
পরিবহন সুবিধার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুযোগ। নির্বাচিত হওয়ার পর একজন সদস্য তাঁর মেয়াদে একবার একটি লাক্সারি গাড়ি, জিপ বা মাইক্রোবাস সম্পূর্ণ কর ও ভ্যাটমুক্তভাবে বিদেশ থেকে আনতে পারেন। দায়িত্ব পালনের পাঁচ বছর পূর্ণ হলে তিনি পুনরায় এই সুবিধা ব্যবহার করে নতুন একটি গাড়ি আমদানির সুযোগ পান, যা সংসদ সদস্যদের জন্য একটি বিশেষ বিশেষাধিকার হিসেবে বিবেচিত হয়। যাতায়াত সুবিধার অংশ হিসেবে তাঁরা বিমান, রেল বা নৌপথে ভ্রমণের সময় সর্বোচ্চ শ্রেণির ভাড়ার দেড় গুণ পর্যন্ত ভাতা পেয়ে থাকেন। এছাড়া বার্ষিক ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ভ্রমণ ভাতা অথবা বিকল্প হিসেবে বিনামূল্যে ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাসের সুবিধা রয়েছে।
সংসদ অধিবেশন বা বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য সদস্যদের আলাদা দৈনিক ভাতার ব্যবস্থা আছে। দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মস্থলে অবস্থান করলে তাঁরা দৈনিক ৭৫০ টাকা ভাতা পান। তবে সংসদ অধিবেশন চলাকালে অথবা কমিটির বৈঠকে অংশ নিলে এই ভাতার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৮০০ টাকা। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যরা বিশেষ অগ্রাধিকার পান। তাঁরা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সরকারি প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সমমানের পূর্ণ চিকিৎসা সুবিধা ভোগ করেন এবং মাসিক ৭০০ টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পান। এছাড়া দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কোনো সংসদ সদস্য স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করলে বা মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পরিবার ১০ লাখ টাকার সরকারি বিমা সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন।
টেলিযোগাযোগ সুবিধার আওতায় সংসদ সদস্যদের বাসভবনে সরকারি খরচে টেলিফোন সংযোগ দেওয়া হয় এবং মাসিক বিল বাবদ ৭ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ থাকে। এছাড়া এলাকার উন্নয়নে ব্যয় করার জন্য সংসদ সদস্যদের হাতে বছরে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত একটি ঐচ্ছিক অনুদান তহবিল ব্যবহারের ক্ষমতা থাকে। এই সুযোগ-সুবিধার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, সংসদ সদস্যরা বেতন ছাড়া যে অন্যান্য ভাতাগুলো পান, সেগুলো সম্পূর্ণ আয়করমুক্ত। ফলে মাসিক বেতন ও ভাতার বাইরে রাষ্ট্রীয় এই সুযোগ-সুবিধাগুলো একজন সংসদ সদস্যকে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় কাজ করা এবং জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণের পর থেকেই এসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে শুরু করবেন।
আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করাবেন এবং এই রাজকীয় অনুষ্ঠানে প্রায় এক হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের গেজেট প্রকাশের পর জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রথমে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের আয়োজন করবে। সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পরই নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংসদীয় দলনেতা নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি তাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন এবং দলনেতার দেওয়া নামের তালিকা অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্টদের শপথের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। সচিব সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান নিশ্চিতভাবেই সম্পন্ন হবে।
উল্লেখ্য যে, গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর পরদিন শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ২৯৭টি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকায় চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসনের ফলাফল সম্বলিত গেজেট বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে। সংসদীয় বিধিমালা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় এখন দেশ নতুন সরকার গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ায় তারেক রহমান ও তার দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন কমনওয়েলথ মহাসচিব শার্লি বোচওয়ে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক বার্তার মাধ্যমে তিনি এই অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে শার্লি বোচওয়ে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং গণভোটে অবদান রাখা সব নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানকে আমি প্রশংসা করি এবং বাংলাদেশ ও এর গণতন্ত্রকে সমর্থন করার জন্য কমনওয়েলথের অঙ্গীকার পুনর্নিশ্চিত করছি।’
উল্লেখ্য যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯টিতে জয়লাভ করেছে। এছাড়া ফল ঘোষণা স্থগিত থাকা আরও দুটি আসনেও দলটির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন এবং তাদের শরিকেরা পেয়েছে তিনটি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যান্য শরিকেরা লাভ করেছে ৯টি আসন। প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির এমন ফলাফলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ স্পষ্ট হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আমেজ কাটিয়ে আবারও চিরচেনা কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। নির্বাচনের বিশেষ ছুটি শেষে আগামীকাল রোববার থেকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি অফিস-আদালত খুলে যাচ্ছে। ফলে নাড়ির টানে গ্রামে যাওয়া মানুষ আজ শনিবার ছুটির শেষ দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় পরিসরে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছেন। আজ সকাল থেকেই রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে ঢাকামুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে রেলপথ ও সড়কপথে যাত্রীদের চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি।
রাজধানীর প্রধান রেলওয়ে স্টেশন কমলাপুরে আজ ভোর থেকেই দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল থেকে আসা প্রতিটি ট্রেনই ছিল যাত্রীতে ঠাসা। স্টেশন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সূচি মেনে অধিকাংশ ট্রেন ঢাকায় পৌঁছালেও প্রতিটি কোচে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী দেখা গেছে। কমলাপুর রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ফিরতে পারেন সেজন্য রেলওয়ে বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দুপুরের পর থেকে যাত্রীদের এই ভিড় আরও বেড়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে এই প্রবাহ আগামীকাল রোববার সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
সড়কপথের প্রধান টার্মিনাল গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালীতেও সকাল থেকে ঢাকামুখী বাসের চাপ বেড়েছে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলোতে সিট না পেয়ে অনেককে বিকল্প উপায়ে ফিরতে দেখা গেছে। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তঃজেলা রুটের বাসের অধিকাংশ টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে যারা ফিরছেন তাদের কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের ছুটিতে যাওয়ার সময় যাত্রীরা দীর্ঘ যানজটের সম্মুখীন হলেও ফেরার পথে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ভোগান্তির খবর পাওয়া যায়নি। তবে আজ রাতের দিকে মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে নৌপথেও। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আজ সকাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বড় বড় লঞ্চগুলো যাত্রীদের নিয়ে ভিড়তে শুরু করেছে। লঞ্চের ডেক থেকে শুরু করে কেবিন—সবখানেই ছিল মানুষের সরব উপস্থিতি। কর্মস্থলে ফেরার তাগিদে মানুষ ভিড় ঠেলে লঞ্চে করে ঢাকায় আসছেন। অন্যদিকে, আজ শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলোতে যানজট ও মানুষের চলাচল তুলনামূলক কম থাকলেও শহরের প্রবেশপথগুলোতে ছিল ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোট উপলক্ষে যানবাহনের ওপর যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তা আজ থেকে পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন রাজপথে বাস, মিনিবাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে। এমনকি মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও আজ থেকে আর কার্যকর নেই। এর ফলে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সহজতর হয়েছে। আগামীকাল রোববার অফিস খুললে ঢাকা শহর আবারও তার নিয়মিত ব্যস্ততা ও যানজটের চিরচেনা রূপে ফিরবে বলে মনে করা হচ্ছে। মানুষের এই ফিরে আসার মধ্য দিয়ে প্রাণহীন ঢাকা আবারও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব সফলভাবে পালন শেষে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পুনরায় তাঁর আগের পেশায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আজ শনিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি জানান যে, দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পথ সুগম হওয়ার পর ড. ইউনূস তাঁর শিক্ষকতা, গবেষণা ও সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত পূর্বের কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে আলী রীয়াজ সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলেন, গণভোটের এই ঐতিহাসিক রায় থেকে এটি স্পষ্ট যে, দেশের সাধারণ মানুষ আর কোনোভাবেই পুরোনো শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে ফিরে যেতে চায় না। সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও গণভোটে ভোটারদের অংশগ্রহণের হার বেশি হওয়াকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ। জনগণের এই স্পষ্ট রায়কে ধারণ করে রাজনৈতিক দলগুলো আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে যেসব অঙ্গীকার করেছে, তারা তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবে বলেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বাস করে। বিশেষ করে বিএনপির প্রশংসা করে তিনি বলেন, দলটি অতীতেও দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে বিশেষ বিশেষ সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই পথটি বেশ কঠিন হলেও যদি সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকে, তবে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব হবে। তিনি দলগুলোর প্রতি জনগণের রায়কে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করারও আহ্বান জানান।
একই সাথে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আলী রীয়াজ সংস্কার কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপগুলো নিয়েও আলোকপাত করেন। তিনি জানান, দেশের শাসনব্যবস্থাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক করতে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা তথা সংসদের উচ্চ কক্ষ প্রবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় যাবতীয় আইনি ও প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের শেষ মুহূর্তের কাজগুলো গুছিয়ে আনছে বলে তিনি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন। প্রধান উপদেষ্টার এই প্রস্থানের ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন উদাহরণ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।