আজ ঐতিহাসিক ১৯ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গাজীপুরের (সেই সময়ের জয়দেবপুর) বীর জনতা গর্জে উঠেছিল এবং সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। মনে পড়ে মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাঙালি জাতির এক অবিস্মরণীয় গণ-অভ্যুত্থানের কথা। ১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ দুপুরে হঠাৎ এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন। এ কথা শোনামাত্র সারা দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে এ ঘোষণার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসেন। দেশের সর্বত্রই স্লোগান ওঠে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘পিন্ডি না ঢাকা, ঢাকা-ঢাকা’, ‘পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা-বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘তুমি কে আমি কে, বাঙালি-বাঙালি’।
বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পূর্বাণী হোটেলে এক সভায় ইয়াহিয়ার ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ঢাকায় ২ মার্চ এবং সারা বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন এবং ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা আহ্বান করেন।
জয়দেবপুরে (আজকের গাজীপুর) আমার পরামর্শে ২ মার্চ রাতে তৎকালীন থানা পশুপালন কর্মকর্তা আহম্মেদ ফজলুর রহমানের সরকারি বাসায় তৎকালীন মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিব উল্ল্যাহ এক সর্বদলীয় সভা আহ্বান করেন। সভায় আমাকে (আ ক ম মোজাম্মেল হক) আহ্বায়ক করে এবং মেশিন টুলস্ ফ্যাক্টরির শ্রমিক নেতা নজরুল ইসলাম খানকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্যের এক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। সদস্য হন আয়েশ উদ্দিন, মো. নুরুল ইসলাম (ভাওয়াল রত্ন), মো. আ. ছাত্তার মিয়া (চৌরাস্তা), থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম হজরত আলী মাস্টার (চৌরাস্তা), মো. শহীদ উল্ল্যাহ বাচ্চু (মরহুম), হারুন-অর-রশিদ ভূঁইয়া (মরহুম), শহিদুল ইসলাম পাঠান জিন্নাহ (মরহুম), শেখ আবুল হোসেন (শ্রমিক লীগ), থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. সাঈদ বকস্ ভূঁইয়া (মরহুম)। কমিটির হাইকমান্ড (উপদেষ্টা) হন মো. হাবিব উল্ল্যাহ (মরহুম), শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এম এ মুত্তালিব এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নেতা বাবু মনীন্দ্রনাথ গোস্বামী (প্রয়াত)।
৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার আগেই আমরা এ কমিটি গঠন করেছিলাম। পেছনের ইতিহাস এই যে, আমি ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ‘স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। নিউক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করা, যা মূলত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৬২ সালেই ছাত্রলীগের মধ্যে গঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যেই সশস্ত্র যুদ্ধ করে পাকিস্তানিদের বিতাড়িত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে বাঙালি সৈন্যদের মধ্যেও নিউক্লিয়াস গঠিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। এ সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যাবে পাকিস্তানিদের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের দায়ের করা ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’ মামলায় যা বিখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াসের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণেই বুঝতে পেরেছিলাম যে, সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়ার এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। জয়দেবপুরে (গাজীপুরে) সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ গাজীপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিমসংলগ্ন বটতলায় এক সমাবেশ করে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে দেয়া হয়। স্লোগান ওঠে ‘ইয়াহিয়ার মুখে লাথি মার- বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। পতাকা ধরেছিলেন হারুন ভূঁইয়া এবং অগ্নিসংযোগ করেছিলেন শহীদউল্যাহ বাচ্চু। আর স্লোগান, মাস্টার আ. ছাত্তার মিয়া পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে স্লোগান দিতেন।
আমরা ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী (তৎকালীন রেসকোর্স) উদ্যানের মহাসমাবেশে যোগ দিলাম। সে সময় জয়দেবপুর (গাজীপুর) থেকে হাজার হাজার বীর জনতা ট্রেনে করে এবং শতাধিক ট্রাক ও বাসে করে মাথায় লাল ফিতা বেঁধে ওই জনসভায় যোগ দিয়েছিল। সে এক অপূর্ব দৃশ্য। আজকে ভাবতেও অবাক লাগে কীভাবে এ জনস্রোত এসে মিশে গিয়েছিল ৭ মার্চের মহাসমুদ্রে। ৭ মার্চে উজ্জীবিত হয়ে আমরা সম্ভবত ১১ মার্চ গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা (অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি) আক্রমণ করি। গেটে বাধা পাওয়ার পর আমি হাজার হাজার মানুষের সামনে টেবিলে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেছি মাইকে। পাকিস্তানিরা যাতে বুঝতে পারে, সে জন্য ইংরেজিতে বলি, ‘I do hereby dismiss Brigadier Karimullah from the directorship of Pakistan Ordnance Factory and do hereby appoint Administrative officer Mr Abudul Qader (বাঙালি) as the director of the ordnance Factory’। এই গর্জনে সত্যিই কাজ হয়েছিল। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার বক্তৃতা চলাকালীন পেছনের গেট দিয়ে সালনা হয়ে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার আর পরবর্তীতে ১৫ এপ্রিলের পূর্বে গাজীপুরে যাননি। ওই সমরাস্ত্র কারখানা ২৭ মার্চ পর্যন্ত আমাদের দখলেই ছিল। সম্ভবত ১৩ মার্চ তৎকালীন জিওসি ইয়াকুব আলী জয়দেবপুর রাজবাড়ী মাঠে হেলিকপ্টারে অবতরণ করতে চেষ্টা করলে শত শত বীর জনতা হেলিকপ্টারের প্রতি ইট-পাটকেল ও জুতা ছুড়তে শুরু করলে হেলিকপ্টারটি না নামতে পেরে ফেরত চলে যায়।
সে দিন ১৭ মার্চ বুধবার, মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে লাখো জনতার ঢল নেমেছিল ৩২ নম্বরের বাড়িতে। সবাই বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিল। তৎকালীন আমাদের নির্বাচনী এলাকার এমএলএ সামসুল হক (পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য), হাবিব উল্ল্যাহসহ আমি গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে জয়দেবপুরে ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার সংবাদ দিতে। সন্ধ্যায় আমরা পেছনে দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেয়ে কিছু বলতে চাই কি না বঙ্গবন্ধু জানতে চান। কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রের মজুত কমে গেছে অজুহাতে ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে রক্ষিত অস্ত্র আনার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংবাদ জানাই। সামসুল হকের ইশারায় আমি তরুণ হিসেবে এ অবস্থায় আমাদের কী করণীয় জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু ব্যাঘ্রের ন্যায় গর্জে উঠে বললেন, ‘তুই একটা আহাম্মক, কী শিখেছিস যে আমাকে বলে দিতে হবে!’ একটু পায়চারি করে বললেন, ‘বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে দেয়া যাবে না। ‘Resist at the cost of anything’। নেতার হুকুম পেয়ে গেলাম। ১৯ মার্চ শুক্রবার আকস্মিকভাবে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহান জেবের নেতৃত্বে পাকিস্তানি রেজিমেন্ট জয়দেবপুরস্থ (গাজীপুর) ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য পৌঁছে যায়। একজন জেসিও (নায়েব সুবেদার) জয়দেবপুর হাইস্কুলের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে (জকি স্মৃতির প্রাইমারি স্কুলের সামনে) গোসল করার সময় জানান যে, ঢাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চলে এসেছেন। খবর পেয়ে দ্রুত আমাদের তখনকার আবাসস্থান মুসলিম হোস্টেলে ফিরে গিয়ে উপস্থিত হাবিব উল্ল্যা ও শহীদুল্ল্যাহ বাচ্চুকে এ সংবাদ জানাই। শহীদউল্ল্যাহ বাচ্চু তখনই রিকশায় চড়ে শিমুলতলীতে, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্লান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসার খবর দিলে ১ ঘণ্টার মধ্যে মাঠেই হাজার শ্রমিক-জনতা চারদিক থেকে লাঠিসোঁটা, দা, কাতরা, ছেন, দোনলাবন্দুকসহ জয়দেবপুর উপস্থিত হয়। সেদিন জয়দেবপুর হাটের দিন ছিল। জয়দেবপুর রেল গেটে মালগাড়ির বগি, অকেজো রেললাইন, স্লিপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি, কাঠ, বাঁশ, ইট ইত্যাদি যে-যেভাবে আনতে পেরেছিল তা দিয়ে এক বিশাল ব্যারিকেড দেয়। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরও ৫টি ব্যারিকেড দেয়া হয় যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ফেরত যেতে না পারে। ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন মেজর কে এম শফিউল্লাহ (পরবর্তীকালে সেনাপ্রধান)। আমরা যখন ব্যারিকেড দিচ্ছিলাম তখন টাঙ্গাইল থেকে রেশন নিয়ে একটি কনভয় জয়দেবপুর আসছিল। সে রেশনের গাড়িকে জনতা আটকে দেয়। সেই কনভয়ে থাকা ৫ জন সৈন্যের চায়নিজ রাইফেল তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়।
এ দিকে রেল গেটের ব্যারিকেড সরানোর জন্য ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আদেশ দেন। কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্যদের অবস্থান রেখে মেজর শফিউল্লাহকে জনতার ওপর গুলিবর্ষণের আদেশ দেয়া হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা আমাদের জনতার ওপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ে অগ্রসর হতে থাকলে আমরা বর্তমান গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওপর অবস্থান নিয়ে বন্দুক ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করি।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে জয়দেবপুরে শহীদ হন নেয়ামত ও মনুখলিফা, আহত হন চতরের সন্তোষ, ডা. ইউসুফসহ শত শত বীর জনতা। পাকিস্তানি বাহিনী কারফিউ জারি করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে আমাদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। আমরা পিছু হটলে দীর্ঘসময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিষ্কার করে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চান্দনা চৌরাস্তায় এসে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হন। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সেনাসদস্যকে পেছন থেকে আক্রমণ করে। আমরা সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নিই। কিন্তু পেছনে আর এক পাঞ্জাবি সেনা হুরমতের মাথায় গুলি করলে হুরমত সেখানেই শাহাদতবরণ করেন। বর্তমানে সেই স্থানে চৌরাস্তার মোড়ে ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নামে ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।
পরদিন বঙ্গবন্ধু আলোচনা চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে ১৯ মার্চ নিহতদের কথা উল্লেখ করলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান বলেন যে, ‘জয়দেবপুরে জনতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর আধুনিক অস্ত্র ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে আক্রমণ করেছে এবং এতে পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক সেনা আহত হয়েছে।’
১৯ মার্চের পর সারা বাংলাদেশে স্লোগান ওঠে, ‘জয়দেবপুরের পথ ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘জয়দেবপুরের পথ ধর-সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু কর’।
১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ প্রথম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গাজীপুরবাসীর উদ্দেশে এক পত্রে ১৯ মার্চের সশস্ত্র প্রতিরোধের সময় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং জয়দেবপুরবাসীকে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তীতে ১৯ মার্চের শহীদসহ অংশগ্রহণকারী সবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। এ সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ পাওয়ায় নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি।
১৯ মার্চের সশস্ত্র যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক মাইলফলক। জয়দেবপুরের গৌরবগাথা উনিশে মার্চ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস হিসেবে জাতীয়ভাবে উদযাপন করার দাবিতে গাজীপুরের সর্বস্তরের জনতা আবেদন জানিয়ে আসছে। উনিশে মার্চ প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ দিবস হিসেবে দেশব্যাপী জাতীয়ভাবে পালিত হলে মুক্তিযুদ্ধের সূচনার ইতিহাস যথাযথভাবে সংরক্ষিত হবে বলে আমি মনে করি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আনা নারী চিকিৎসক ডা. সায়মা আক্তার এখন প্রাণনাশের হুমকির মুখে পড়েছেন। এই গাইনি বিশেষজ্ঞকে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও হোয়াটসঅ্যাপে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজসহ গণধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নিজের এবং পরিবারের চরম নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মদন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।
জিডিতে ডা. সায়মা আক্তার উল্লেখ করেন, উপজেলার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখার সময় গত ৩০ এপ্রিল এক শিশুর শারীরিক পরীক্ষা করে তিনি জানতে পারেন যে সে ২৭ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। ওই সময় ভুক্তভোগী শিশুটি তাঁর কাছে স্বীকার করে যে মাদ্রাসার হুজুর তার সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর এই পর্যবেক্ষণ ও বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তিনি একদল দুর্বৃত্তের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ডা. সায়মা জানান, বর্তমানে তিনি ও তাঁর পরিবার চরম আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।
চিকিৎসকের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগের সাথে জানিয়েছেন যে, তাঁরা বর্তমানে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মদন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম সাধারণ ডায়েরি করার বিষয়টি নিশ্চিত করে এক গণমাধ্যমকে বলেন, “ওই নারী চিকিৎসক দুপুরের দিকে আমাদের থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। আমরা তার নিরাপত্তা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। তবে মামলা তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।”
এদিকে, মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগরের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোসসিনা ইসলাম পুলিশি আবেদনের প্রেক্ষিতে আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ড শেষে আগামী ১০ মে তাকে পুনরায় আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ, অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে বিশ্বনেতাদের ঐকান্তিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে অভিবাসীদের জন্য ন্যায্য পারিশ্রমিক ও ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল মাইগ্রেশন রিভিউ ফোরামের (আইএমআরএফ) সাধারণ বিতর্কে এই আহ্বান জানান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে অভিবাসীদের সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে। নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মাইগ্রেশন কমপ্যাক্ট টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত মেয়াদী একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। মন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী অঙ্গীকারসমূহের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং নতুন করে আরও ছয়টি নতুন অঙ্গীকার দাখিল করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবকে অভিবাসনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে মন্ত্রী এই সংকটের শিকার ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের দাবি জানান। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিরাপদ অভিবাসন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে বদ্ধপরিকর।
পবিত্র হজ পালনের জন্য বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৬০৫ জন হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। মোট ১২৪টি হজ ফ্লাইটের মাধ্যমে তাঁরা জেদ্দা ও মদিনার বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছান। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গিয়েছেন ৪ হাজার ৭১ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গিয়েছেন ৪৪ হাজার ৫৩৪ জন। হজ সম্পর্কিত সর্বশেষ বুলেটিন সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শুক্রবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হজে গিয়ে এ পর্যন্ত ১০ জন বাংলাদেশি নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন। এর মধ্যে মক্কায় ৮ জন এবং মদিনায় ২ জন মারা যান। মৃতদের মধ্যে দুই জন নারী রয়েছেন বলে হজ বুলেটিনে জানানো হয়েছে। প্রবাসীদের হজ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ নিশ্চিত করেছে।
হজ ফ্লাইটের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তাদের ৫৭টি ফ্লাইটে ২২ হাজার ৮১৯ জন যাত্রীকে বহন করেছে। সৌদি এয়ারলাইনস ৪৬টি ফ্লাইটে ১৭ হাজার ২৯২ জন এবং ফ্লাইনাস এয়ারলাইনস ২১টি ফ্লাইটে ৮ হাজার ৪৯৪ জন যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে সর্বমোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন পবিত্র হজ পালনের সুযোগ পেয়েছেন এবং ৬৬০টি অনুমোদিত এজেন্সি এই বিশাল কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
গত ১৭ এপ্রিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বছরের প্রথম হজ ফ্লাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট হজযাত্রীর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন হজের সুযোগ পাচ্ছেন।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৬ মে সৌদি আরবে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ৩০ মে থেকে ফিরতি ফ্লাইট শুরু হবে এবং আগামী ৩০ জুন শেষ ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবে। বর্তমানে হজযাত্রীরা মক্কা ও মদিনায় অবস্থান করছেন এবং নিয়মিতভাবে হজ ও উমরার আহকামসমূহ পালন করছেন।
জ্বালানি সংকটের কারণে টানা ২৩ দিন বন্ধ থাকার পর পুনরায় চালু হয়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। শুক্রবার (৮ মে) ভোর ৬টা থেকে চট্টগ্রামের এই শোধনাগারে আবারও উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়।
রিফাইনারি সূত্র জানায়, সৌদি আরব থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত জ্বালানির নতুন চালান দেশে পৌঁছানোর পর শোধন কার্যক্রম পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে। শুক্রবার সকালে ফায়ার্ড হিটারে ক্রুড অয়েল প্রসেসিং শুরু হয় এবং কিছু সময়ের মধ্যেই পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন কার্যক্রম চালু করা হয়।
বর্তমানে শোধনাগারে ক্রুড অয়েল পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনসহ বিভিন্ন জ্বালানি উৎপাদন করে নির্ধারিত ট্যাঙ্ক ফার্মে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে রিফাইনারির জেটিতে থাকা লাইটারেজ জাহাজ থেকেও অপরিশোধিত তেল খালাসের কাজ চলছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) মামুনুর রশীদ খান জানান, ‘এমটি নাইনেমিয়া’ নামের একটি জাহাজ প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার টন ক্রুড অয়েল নিয়ে কুতুবদিয়া উপকূলে পৌঁছেছে। সেখান থেকে সরবরাহ শুরু হওয়ায় আবারও উৎপাদন সচল করা সম্ভব হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কারিগরি সমন্বয়ের কাজ শেষ হলে উৎপাদন আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে গত ১৪ এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে মজুত ফুরিয়ে গেলে পুরো উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে নতুন চালান আনা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে যে পরিমাণ ক্রুড অয়েল মজুত রয়েছে, তা দিয়ে আগামী ২০ থেকে ২৫ দিন উৎপাদন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন চালান আনার প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে। আগামী ২০ মে’র দিকে আরও একটি জ্বালানি চালান দেশে পৌঁছাতে পারে বলেও জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইস্টার্ন রিফাইনারিকে সচল রাখতে নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ক্রুড অয়েল আমদানির বিকল্প নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চালান না এলে আবারও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে রিফাইনারিটির দুটি ইউনিটে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার টন জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়ায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া উদ্বেগ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আজ শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬ ইং এবং ২৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। দিনের শুরুতেই বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি কিংবা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে সারাদেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবহাওয়া অফিসের সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চাঁদপুর ও যশোরে, ৩৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল রাজারহাটে, ১৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানী ঢাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়ার সিনপটিক অবস্থায় বলা হয়েছে, বিরাজমান লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। তবে সমুদ্রবন্দর কিংবা দেশের অভ্যন্তরীণ নদীবন্দরগুলোর জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সতর্কবার্তা বা সংকেত দেখানো হয়নি।
আজ ঢাকায় সূর্যোদয় হয়েছে ভোর ৫টা ১৯ মিনিটে এবং সূর্যাস্ত হবে সন্ধ্যা ৬টা ৩১ মিনিটে।
ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অপারেশনাল স্টেজে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে। যদিও পরমাণু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। তার ওপর বাংলাদেশ এ খাতে একেবারেই নতুন। তাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা জল্পনা ও শঙ্কা রয়েছে। তবে পরমাণু বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের দাবি, থ্রি-প্লাস জেনারেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করায় রূপপুরে রয়েছে বিশ্বের আধুনিকতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো দুর্ঘটনার ঝুঁকি এখানে নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুরে যে থ্রি-প্লাস জেনারেশন প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর বসানো হয়েছে, সেটি অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকটাই কম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, এখন আর ফুকুশিমা বা চেরনোবিলের মতো উদ্বেগ নেই। কারণ প্রযুক্তির অনেক উন্নয়ন হয়েছে। ওই কেন্দ্রগুলোর ডিজাইন ছিল ১৯৭০-এর দশকের, আর রূপপুরের ডিজাইন ২০১৫ সালের। এমনকি চরম বিপর্যয়ের পরিস্থিতিতেও যাতে দুর্ঘটনা না ঘটে, সেই ধরনের প্রযুক্তি এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে কোর ক্যাচার ও ডাবল কন্টেইনমেন্ট স্ট্রাকচার থাকায় রিঅ্যাক্টরের কোর বিপর্যয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের রিঅ্যাক্টর ভবনে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করেই দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ।
রুশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটম বলছে, পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সুরক্ষিত রূপপুরের পারমাণবিক চুল্লি থেকে বাইরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার কোনো ঝুঁকি নেই। এমনকি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ৮ মাত্রার ভূমিকম্প, বন্যা কিংবা বিমান হামলার মতো পরিস্থিতিতেও কেন্দ্রটি নিরাপদ থাকবে।
টারবাইন শপ অপারেশনের ডেপুটি ম্যানেজার সেগেই অ্যানোসিয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে অত্যাধুনিক সুরক্ষা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে মানুষ ও প্রকৃতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
নীতিনির্ধারকরাও বলছেন, সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই অন্তত ৬০ বছর রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, থ্রি-প্লাস জেনারেশনের এই প্রকল্পে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও আশপাশের মানুষের ক্ষতি না হয়, সেই ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, নিরাপত্তা নিশ্চিতে দক্ষ পরিচালন ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, যন্ত্র ও প্রযুক্তি উন্নত হলেও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে কেন্দ্র পরিচালনা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এমনকি অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
আগস্টে জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ধাপে ধাপে আগামী বছরের শেষ নাগাদ ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পুরো কেন্দ্রটি পূর্ণ উৎপাদনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে রাষ্ট্র এখন আর গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না এবং বর্তমান সরকারের জবাবদিহিতার বাইরে থাকার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, বিগত সরকারের মুক্ত গণমাধ্যম তৈরির প্রতিশ্রুতি ছিলো কেবলই গালভরা বুলি, তবে বর্তমান সরকার একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম কমিশনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীর একটি মিলনায়তনে ‘ইন্টারন্যাশনাল কেবল টিভি, ব্রডকাস্টিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন এক্সপো ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। কেবল অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব) দ্বিতীয়বারের মতো এই মেলার আয়োজন করেছে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, কমিউনিকেশন পাওয়ার, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শুধু রাজনীতিকেই নয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকেও পরিবর্তন করেছে। এই মাধ্যম এখন এতোই শক্তিশালী যে রাষ্ট্র কখনও একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে না। আমি এটি বুঝি বলেই প্রথম দিন থেকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান যুগে জনগণ অনেক সচেতন। বড়ো কোনো অসন্তোষ তৈরি হলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা দ্রুত ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেতে পারে। সরকার ও প্রধানমন্ত্রী এই বাস্তবতা বুঝেন বলেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দিচ্ছেন।
জহির উদ্দিন স্বপন জানান, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম কমিশন ছাড়া এই খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা এমন একটি মেধাভিত্তিক নীতিমালা তৈরি করতে চাই যেখানে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তবে তথ্য সরবরাহে সরকার সবসময় দায়িত্বশীল থাকবে। সঠিক সাংবাদিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, যেকোনো তথ্যই সংবাদ নয়। সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের জন্য ‘ফ্যাক্ট চেক’ বা তথ্য যাচাই করা এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড়ো দাবি।
জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, এবারের নির্বাচন ছিল বিগত ১৩টি নির্বাচনের মধ্যে সবচেয়ে কম বিতর্কের এবং সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন নির্বাচন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোয়াব নেতারা অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রতি সরকারের কঠোর পদক্ষেপ এবং ডিজিটাল প্রাইভেসি সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান।
দেশের ব্রডকাস্ট, কেবল অপারেটর, টেলিভিশন চ্যানেল ও আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে আয়োজিত এই প্রযুক্তি প্রদর্শনী চলবে আগামী ৯ মে পর্যন্ত।
হাম প্রতিরোধে টিকার জোগান বাড়ছে। এ ছাড়া দেশব্যাপী চলছে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি। তবু হামে শিশুমৃত্যু থামছে না। ৫৩ দিনে হাম ও এর উপসর্গে ৩৩৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের পাশাপাশি হাম প্রতিরোধে আন্ত মন্ত্রণালয় সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে।
মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় গত ৫ এপ্রিল থেকে সরকার দেশব্যাপী ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের এমআর-১ বুস্টার ডোজ টিকা প্রদান শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, সরকারের নেওয়া টিকা কার্যক্রমে ইতোমধ্যে ১ কোটি ৬১ লাখ শিশু টিকা পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৮৯ শতাংশ। কিন্তু টিকা কার্যক্রম শুরুর এক মাসের মাথায় হামে একদিনে সর্বোচ্চ ১৭ মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে চিন্তার কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রধানত টিকা কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে, যা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ সতর্কতা বাস্তবে এক ধরনের মহামারিরই ইঙ্গিত দেয়। এ পরিস্থিতিতে আরও আগেই ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা করা দরকার ছিল, কিন্তু সরকার সেটি করেনি। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা এবং শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এছাড়া, আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে কঠোর আইসোলেশন ব্যবস্থা করা উচিত ছিল, কিন্তু সরকার সেটিও করেনি।
এদিকে, হাম ও হামের উপসর্গে বুধবার (৬ মে) সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকাল ৮টা দেশে আরও ১২ শিশু মারা গেছে। এর মধ্যে এক শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল ১১ শিশুর। এ সময়ে সারাদেশে আরও ১ হাজার ২৩৮ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
হাম শনাক্ত হয়ে শিশুটি ঢাকায় মারা গেছে। আর হামের উপসর্গে বরিশালে ১ জন, ঢাকায় ৫, খুলনায় ১, ময়মনসিংহে ১, রাজশাহীতে ২ জন ও সিলেটে ১ জন মারা গেছে। এর আগে ৪ মে হাম ও হামের উপসর্গে সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে মৃত্যু দাঁড়াল ৩৩৬ জনে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্যগুলো জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৫ হাজার ৪৯৮ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩১ হাজার ৯১২ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ২৮ হাজার ২৩৮ শিশু বাড়ি ফিরেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র টিকাদান কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করা পর্যাপ্ত নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ সতর্কবার্তা মহামারির ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতিতে আরও আগেই ‘জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা’ ঘোষণা এবং আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে কঠোর আইসোলেশন ব্যবস্থা করা প্রয়োজন ছিল, যা সরকার করেনি।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা, জনস্বাস্থ্য ও মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হাম সারা বিশ্বেই বেড়েছে। কিন্তু আমাদের মতো এত শিশু মৃত্যু কোথাও হয়নি, এমনকি আফ্রিকাতেও না। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সমন্বিত এবং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ না থাকার কারণেই এতগুলো শিশুকে আমাদের হারাতে হলো।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, বর্তমানে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা প্রদান করা হচ্ছে। এতে ৬ থেকে ৯ মাস বয়সি শিশুদের শরীরে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ৫০ শতাংশ এবং ৯ থেকে ১২ মাস বয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ। তবে, কার্যকারিতা পেতে ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সময় লাগে। এছাড়া ক্যাম্পেইনে ৫ বছরের পরিবর্তে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা গেলে, যেমনটি ২০১৪ সালের ক্যাম্পেইনে করা হয়েছিল, আক্রান্তের হার কিছুটা কমতে পারত। কারণ, শিশুদের পাশাপাশি হামে বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছে। শরীরে র্যাশ আসুক আর না আসুক জ্বর ও পাতলাপায়খানা দেখার সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে পারলে হামে আক্রান্তের হার হ্রাস পাবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, টিকাদান কার্যক্রম সফল করতে মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি বাসা-বাড়িতে প্রচারণা জোরদার করা হচ্ছে। মোবাইল এসএমএস ও পুশ নোটিফিকেশনের মাধ্যমে অভিভাবকদের কাছে টিকার তথ্য পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। সমন্বিত এ উদ্যোগের ফলে কোনো শিশুই টিকার বাইরে থাকবে না।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে ডিএনসিসির মিলনায়তনে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই), ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে ‘বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোশনের অংশীজনদের সমন্বিত কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় এবং ২০২৬ সালের হামের প্রকোপ মোকাবিলা শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রশাসক এসব কথা বলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএনসিসি প্রশাসক আরো বলেন, নগরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও সিটি করপোরেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে সরকারি-বেসরকারি সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
সভায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি ড. মালালাই আহমেদজাই বলেন, ‘শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।’
সরকারের টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে ইতোমধ্যে পোলিও ও ধনুষ্টঙ্কার নির্মূল, হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ এবং সম্প্রতি ৯৩ শতাংশ এইচপিভি (HPV) ও ৯৭ শতাংশ টিসিভি (TCV) টিকার কভারেজ অর্জিত হয়েছে। বর্তমানে ইপিআই কার্যক্রমের আওতায় ৯টি অ্যান্টিজেনের মাধ্যমে ১২টি রোগের বিরুদ্ধে টিকা প্রদান করা হচ্ছে।
ইপিআই কাভারেজ ইভালুয়েশন সার্ভে ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের নগর এলাকায় টিকাদান কভারেজ ৭৯ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কভারেজ ৭৫ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
সভায় ২০২৬ সালের চলমান হাম-রুবেলা প্রাদুর্ভাবের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬ মে ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ৪৪ হাজার ২৬০ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী, ৬ হাজার ৯৯ জন ল্যাব-নিশ্চিত হাম রোগী এবং ২৬৮ জন সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হাম সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতিকে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু, বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সভায় আরও জানানো হয়, গত ৫ এপ্রিল থেকে ৬-৫৯ মাস বয়সি শিশুদের লক্ষ্য করে জরুরি এমআর (MR) টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। এছাড়া ২০ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকাতেও এমআর ক্যাম্পেইন পরিচালিত হচ্ছে।
সভায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ সরকার টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে টিকাদান কার্যক্রমে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমে শিশু ও নারীদের মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব প্রতিরোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম, ইউনিসেফের ইমিউনাইজেশন ম্যানেজার ড. রিয়াদ মাহমুদ এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. নিজাম উদ্দীন আহমেদ।
সভা সঞ্চালনা করেন ডা. মাহমুদা আলী এবং সভাপতিত্ব করেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, নাগরিক তখনই কর দিতে আগ্রহী হবে, যখন সে বুঝতে পারবে করের বিনিময়ে রাষ্ট্র তাকে সেবা দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সামাজিক আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হলে কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি কমবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে করদাতাকে এমন রসিদ দেওয়া হবে, যেখানে উল্লেখ থাকবে, তার দেওয়া করের কত অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে। আগামী বাজেট থেকেই এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর আশা করছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনে আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ড. তিতুমীর। ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিবি) ও দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে।
ড. তিতুমীর বলেন, দেশে কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি বাড়ার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি বড় কারণ। তার ভাষায়, ‘গোষ্ঠীতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় রাখবে, আর বিনিময়ে কর খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। কর ফাঁকি ও জালিয়াতির মূল শেকড় এখানেই।’
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার। ‘উন্নয়নের বড় বড় বুলি আওড়ানো হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে করব্যবস্থার ভিত্তি দুর্বলই থেকে গেছে’-বলেন তিনি।
কর ব্যবস্থায় ‘সংযুক্তি’ ও ‘বিযুক্তি’ দুই ধরনের সংস্কারের কথাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘বিযুক্তি’ মানে করদাতা ও কর্মকর্তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ কমিয়ে আনা, আর ‘সংযুক্তি’ মানে নাগরিককে জানানো-তার করের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার করের হার বাড়াতে চায় না; বরং অর্থনীতির আকার বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে চায়। প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।
ড. তিতুমীর জানান, সরকার ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতকে মূল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে প্রণোদনা এবং এসএমই নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগের মাধ্যমে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতি বা অরেঞ্জ ইকোনমিকে গুরুত্ব দিয়ে শিল্পী, ডিজাইনার, গেম নির্মাতা ও ফ্যাশন উদ্যোক্তাদেরও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক রিফাইন্যান্সিং স্কিম ও বিশেষ ঋণ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ, আইসিএবি সভাপতি এন কে এ মবিন এবং দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ বক্তব্য দেন।
ওয়াকফ সম্পত্তির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, এসব সম্পদের আয় থেকে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের পরিধি আরও বাড়াতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকালে সচিবালয়ে বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওয়াকফ সম্পত্তি কোনোভাবেই অনৈতিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সাক্ষাৎকালে ওয়াকফ প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশের ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার বর্তমান চিত্র ও চলমান কার্যক্রম তুলে ধরেন।
এ সময় ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, শামীম কায়সাল লিংকন এমপি এবং ধর্ম সচিব মুন্সি আলাউদ্দিন আল আজাদ উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকার উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার ঘটনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে এই আবেদন করেন নিহত শিক্ষার্থী উক্য ছাইং মারমার বাবা উসাইমং মারমা।
মামলায় অভিযুক্ত অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন- সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান, শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং সাবেক শিক্ষা সচিব সিদ্দিক জুবায়ের। এছাড়া প্রতিরক্ষা সচিব, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন, এয়ার ভাইস মার্শাল মোরশেদ মোহাম্মদ খায়ের উল আফসার ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন রিফাত আক্তার জিকুসহ রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও আসামি করা হয়েছে।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের মধ্যে গভর্নিং বডির উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরনবী, অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিয়াউল আলম, প্রিন্সিপাল (প্রশাসন) মাসুদ আলম এবং স্কুল শাখার প্রিন্সিপাল রিফাত নবীর নামও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর আইনজীবী এ কে এম শরীফ উদ্দিন জানান, মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চরম অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চাওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, বিচারক ইতোমধ্যে বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করেছেন এবং মামলাটি আমলে নেওয়ার বিষয়ে আদেশ অপেক্ষমাণ রেখেছেন।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। এসব অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে শঙ্কার কথাও বলেছে সংস্থাটি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে- পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও খাদ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছে। এ যুদ্ধের সংকটে উদ্ভুত বেশি বেকায়দায় পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো, যারা জ্বালানি তেলের প্রায় পুরোটাই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে।
এরই প্রভাব পড়ছে আমাদের অর্থনীতিতে। দেশে মূল্যস্ফীতি আবারও বেড়ে ৯ শতাংশ অতিক্রম করেছে। সর্বশেষ এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এতে পড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর নতুন করে চাপ বেড়েছে।
বুধবার (৬ মে) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এপ্রিল মাসের মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে। এর আগে মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। টানা চার মাস মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পর মার্চে কিছুটা কমলেও এপ্রিল মাসে আবার তা বেড়েছে। ফলে গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।
গত ১৯ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। সে অনুযায়ী, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়।
আইএমএফ ও জাতিসংঘের তথ্যে জানা যায়- ইরান-ইসরাইল ও মার্কিন যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে সারের আকাশচুম্বী দাম এবং তীব্র ঘাটতি দেখা দেবে, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ফসলের উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এই উৎপাদন ঘাটতি খুব দ্রুতই কৃষিপণ্যের মূল্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। যতদিন এই সংকটের সমাধান না হবে, সময়ের সাথে সাথে খাদ্য সংকটের এই ঝুঁকি আরও ঘনীভূত ও তীব্রতর হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং এর প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়ে। এতে ভোক্তাদের আগের তুলনায় বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। গ্রাম ও শহর—উভয় এলাকাতেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সীমিত ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়। আয় না বাড়লে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
গত দুই সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর শাকসবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাছ ও মাংসের দামও বেড়েছে, তবে চালের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
এদিকে এপ্রিল মাসে জাতীয় গড় মজুরি হার বেড়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে ভোগান্তি বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে মানুষকে ধারদেনা করতে হয় কিংবা খাবার, পোশাক, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হতে হয়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) হিসাব বলছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আর্থিক ক্ষতির কারণ হিসেবে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও খাদ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ইউএনডিপি পূর্বাভাস দিয়েছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বের প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যার ৮৮ লাখই এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের।
ইউএনডিপি সতর্ক করে বলেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়া এবং সরকারি ব্যয় ধরে রাখার চাপ দিন দিন বাড়বে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আলাদা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় খাদ্য সংকট বিপর্যয়কর পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সবশেষ পূর্বাভাস বলেছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি চলতি ও আগামী বছরে হ্রাস পাবে নামতে পারে। এছাড়া আঞ্চলিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।