সাত বছর পালিয়ে ছিলেন যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃতুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আ. খালেক তালুকদার (৭৩)। তবে শেষরক্ষা হয়নি। গত বুধবার রাতে তাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বৃহস্পতিবার বিকেলে পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ আসলাম খান জানান, ২০১৫ সালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ আব্দুল খালেক তালুকদারকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এরপর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন।
২০১৯ সালের ২৮ মার্চ রায় ঘোষণা করা হয়। ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার ৭টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। রায়ে আ. খালেক তালুকদারসহ চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়া হয়।
সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশব্যাপী ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা-অর্চনা চলছে বলে জানিয়েছেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেন, পূজা কমিটির সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এটি সম্ভব হয়েছে। পূজা কমিটির সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা দিচ্ছেন। প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পূজা উদযাপিত হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাপূজার নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
আইজিপি বলেন, পূজাকে কেন্দ্র করে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। জনগণকে গুজব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। দেবী দুর্গার মতোই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে লড়াই করে যেতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যে ধর্মের, যে মতের, যে বর্ণেরই হই না কেন, দেশটি আমাদেরই। সকল অপশক্তি নির্মূল করে একটি সুখী, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠন করা আমাদের লক্ষ্য।’
পুলিশপ্রধান বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পাঁচ-সাত দিন পুলিশের কোনো কার্যক্রম ছিল না। তখন কারও নিরাপত্তা ছিল না, সবাই আমরা উদ্বিগ্ন ছিলাম। ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতি—বহু রকমের অঘটন ঘটেছে। আপনাদের সহযোগিতায় সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশ পুলিশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সকল অপশক্তি, সকল অন্যায়, বৈষম্য দূর করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রেখে সবার জীবনমান উন্নয়নে সক্ষম হবে বাংলাদেশ।
এদিকে, পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ পুলিশ বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, পুলিশ সকল পূজামণ্ডপ নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দিয়েছে। ফলে নিরাপদে পূজা উদযাপিত হচ্ছে।
এ সময় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাগণ এবং পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে যুবসমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের স্বার্থকে সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে। দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিলেই প্রতিটি নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে। আর তখনই সবার জন্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬ ও অনুদান প্রদান’ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সবার লক্ষ্য হওয়া উচিত সবার আগে বাংলাদেশ এবং সবার জন্য বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে যুবকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।’
যুবসমাজের অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য তরুণ রয়েছেন, যারা কেউ শিক্ষার্থী, কেউবা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত। নিজেদের পড়াশোনা ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তারা মানুষের কল্যাণে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসছেন। মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তাদের এই উদ্যোগ ও অবদান দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত তরুণদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যারা আজ এই অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন, তাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে যুবসমাজের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অলিম্পিকের মতো প্রতিযোগিতায় যারা সাফল্য অর্জন করেন, তাদের অধিকাংশই তরুণ। একইভাবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনেও হয়তোবা প্রবীণরা তাদের মেধা, বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়েছেন, কিন্তু সরাসরি মাঠে থেকে তরুণসমাজই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।’
তিনি বলেন, দেশের যেকোনো বড় পরিবর্তন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে তরুণদের শক্তি, সাহস, মেধা ও উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই শক্তিকে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে।
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেগুলো এখন শুধু আমাদের নয়, দেশের মানুষেরও। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’
তরুণ উদ্যোক্তা ও প্রতিভাবান যুবকদের সহায়তায় সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার স্টার্টআপ ফান্ড বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। দেশের মেধাবী ও প্রতিভাবান তরুণদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। এ জন্য ৫০০ কোটি টাকার তহবিলের পরিমাণ প্রয়োজনে আরও বাড়ানো হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণদের মেধা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও কর্মস্পৃহাকে কাজে লাগাতে পারলে দেশ আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে। তরুণদের শুধু নিজেদের উন্নতির কথা ভাবলে চলবে না, দেশের প্রতিটি মানুষের কল্যাণের কথাও চিন্তা করতে হবে।
অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫ জন যুব স্বেচ্ছাসেবক ও যুব সংগঠনের প্রতিনিধির হাতে ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে এক লাখ টাকার চেক, সম্মাননা স্মারক ও সনদপত্র দেওয়া হয়।
এ ছাড়া যুব সংগঠনগুলোর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে দেশের ৪৩২টি যুব সংগঠনকে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। প্রতিটি সংগঠনকে দুই লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে তিনজন তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তারা নিজেদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এ ছাড়া তরুণ ও যুবকদের জন্য সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বক্তব্য দেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উপস্থিত ছিলেন। দেশের ৬৪টি জেলা থেকে যুব স্বেচ্ছাসেবকেরা অনলাইনে অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তরুণদের দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ এবং সবার জন্য বাংলাদেশ’ এই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে।
ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অনুষ্ঠিত ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের ৫২তম অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
‘শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের প্রসারে সংলাপ ও সংহতি— দুটি মৌলিক স্তম্ভ’ প্রতিপাদ্যে অধিবেশনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রতিমন্ত্রী আজ অধিবেশনে বাংলাদেশের জাতীয় বক্তব্য তুলে ধরবেন। এছাড়া, অধিবেশনের পাশাপাশি তিনি ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমপর্যায়ের মন্ত্রীদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামীকাল তিনি রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত একটি বিশেষ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সহ-সভাপতিত্ব করবেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্বাগতিক দেশ ইরাক তুরস্কের কাছ থেকে এক বছর মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিষদের সভাপতিত্ব গ্রহণ করেছে।
‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার তাদের ভাতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে আগামীতে এ ভাতা বাড়ানো হবে, যাতে তারা কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারেন।’
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো সরকার ও সমাজের দায়িত্ব উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও সমাজের অংশ। তাদের অধিকার, মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা দরকার। এ ক্ষেত্রে অতীতে যেসব ঘাটতি ছিল, তা পূরণে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করতে চায়।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও আদালতে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।’
তিনি এ বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যোগাযোগের অসুবিধা দূর করতে হাসপাতালগুলোতে সাংকেতিক ভাষা জানা ব্যক্তির ব্যবস্থা করার বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। একইভাবে প্রতিবন্ধী নারীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিতের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে সঠিক পরিসংখ্যান প্রয়োজন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে সরকারের কাছে উপস্থাপন করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।
প্রতিবন্ধী কৃষকদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সরকারি চাকরিতে তাদের প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করবে বলেও জানান তারেক রহমান।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘গণপরিবহনে তাদের যাতায়াতের সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীদের জন্য পিংক বাসসেবা আরও উপযোগী করার পাশাপাশি ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে প্রতিবন্ধীবান্ধব বাস চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশ ও চলাচলের উপযোগী ব্যবস্থা নিশ্চিতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এসব সুবিধা না থাকলে সংশ্লিষ্ট ভবনের নকশা অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
জাতীয় সংসদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের প্রস্তাব প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিষয়টি সাংবিধানিক বিবেচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ বিষয়ে দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সমাজকল্যাণ, আইন এবং নারী ও শিশুবিষয়ক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের আইনি সহায়তা নিশ্চিতে অগ্রগতি হবে।
সরকার সর্বাত্মকভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে থাকবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যা অনুধাবন করে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক মানুষেরই সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও যেন প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়ে স্বাবলম্বী ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সরকার কাজ করবে।’
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির (বিপিকেএস) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সাত্তার দুলালের সঞ্চালনায় ৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন। তারা নিজেদের বিভিন্ন দাবি ও সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।
এ সময় মো. মহসিন নামের এক প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ প্রধানমন্ত্রীর জন্য ক্যাপ উপহার এনেছেন জানালে মঞ্চ থেকে নেমে এসে তা গ্রহণ করেন তারেক রহমান। এ সময় বিদেশে খেলাধুলায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তার দলকে সহযোগিতা করারও আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।
আরও বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত বক্তাদের সঙ্গে গ্রুপ ছবিতে অংশ নেন।
রাষ্ট্রীয় তথ্য কমিশনের সর্বোচ্চ পদে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের বিশিষ্ট অধ্যাপক ড. নাহরিন ইসলাম খান দেশের নতুন প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। একই প্রক্রিয়ায় তথ্য কমিশনের অন্য দুটি শূন্য পদে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সাংবাদিক এস এ এম মাহফুজুর রহমান এবং খান মোহাম্মদ আবুল হোসেনকে।
গত শনিবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এই নিয়োগসংক্রান্ত পৃথক দুটি দাপ্তরিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রাসঙ্গিক আইনের নির্ধারিত ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি এই নিয়োগ প্রদান করেছেন বলে প্রজ্ঞাপনগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নবনিযুক্ত প্রধান তথ্য কমিশনার ও অন্যান্য কমিশনারদের দাপ্তরিক পদমর্যাদা, আর্থিক পারিশ্রমিক, নিয়মিত ভাতা এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি সরকারের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট করা হবে। জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে জারি করা এই আদেশের কার্যকারিতা অবিলম্বে শুরু হবে বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও সংলগ্ন এলাকার হকারমুক্ত ও দখলমুক্ত ফুটপাতগুলো সরেজমিনে ঘুরে দেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই আকস্মিক পরিদর্শনের সময় তিনি সাধারণ পথচারীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন, তাদের দৈনন্দিন যাতায়াতের নানা সুবিধা ও অসুবিধার কথা মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং জনসাধারণের নির্বিঘ্ন ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।
শনিবার প্রাতঃকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মিরপুর-১০ এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখতে সেখানে উপস্থিত হন বলে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন তাঁর সরকারি প্রেস সচিব এ কে এম নাজমুল হক।
পরিদর্শনকালে সরকারপ্রধান পথচারী ও সাধারণ মানুষের কাছে সরাসরি জানতে চান যে পূর্বে হকার ও অবৈধ দখলে থাকা ফুটপাতগুলো উচ্ছেদ করার ফলে তাদের দৈনন্দিন যাতায়াতে কতটা স্বস্তি এসেছে এবং বর্তমানে সেখানে হাঁটাচলার ক্ষেত্রে তারা কোনো ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কি না। এছাড়া রাজধানী ঢাকার সামগ্রিক ফুটপাত ও সড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো ধরনের দুর্ভোগ বা অভিযোগ রয়েছে কি না, সে বিষয়েও তিনি বিশদ খোঁজখবর নেন।
জনসাধারণের সঙ্গে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে সরাসরি মতবিনিময় করে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামত শোনেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যেন রাজধানী শহরের ফুটপাতগুলো কেবল পথচারীদের নিরাপদ ব্যবহারের উপযোগী হিসেবে বজায় রাখা হয়, সড়ক ও ফুটপাতের সুশৃঙ্খল পরিবেশ রক্ষা করা হয় এবং জনসাধারণের চলাচলের পথে তৈরি হওয়া যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা চিরতরে দূর করা হয়।
এ সময় তিনি মন্তব্য করেন যে নগরীর ফুটপাতগুলো মূলত সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচলের জন্যই নির্ধারিত, তাই যেকোনো মূল্যে ফুটপাত দখলমুক্ত রেখে নাগরিকদের স্বচ্ছন্দ যাতায়াত নিশ্চিত করা বর্তমান প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে নিজ কক্ষে ধূমপানরত এক চিকিৎসককে দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে চিকিৎসকের কক্ষ অপরিচ্ছন্ন থাকায় ক্ষোভ জানান তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে তাৎক্ষণিক বরখাস্তের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে হাসপাতালটির বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মপরিবেশের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের কক্ষে গিয়ে তাকে ধূমপান করতে দেখেন প্রধানমন্ত্রী। কক্ষটিও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে একজন চিকিৎসকের এমন আচরণ এবং কর্মস্থলের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
পরে হাসপাতালের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হককে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। নির্দেশনার পর চিকিৎসক রফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এ সময় হাসপাতালসহ সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেন তিনি।
ডেঙ্গু ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি দেখতে হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আকস্মিক পরিদর্শনে বের হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ সকাল ৯টা ২০ মিনিটে গুলশানের বাসা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবন আকস্মিক পরিদর্শনে বের হন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, দিনের শুরুতে তিনি রাজধানীর কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের চিকিৎসাসেবার খোঁজখবর নেন। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ), অস্ত্রোপচারকক্ষসহ (অপারেশন থিয়েটার) বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন তিনি।
পরিদর্শনকালে হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার পরিস্থিতি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। হাসপাতালের পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার উন্নয়নে কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় দেন তিনি।
উপ প্রেস সচিব জানান, এরপর প্রধানমন্ত্রী রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে যান। সেখানে তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বছরের এ সময়ে, বিশেষ করে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। প্রতিবছর ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হন, অনেকের মৃত্যুও হয়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এজন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করতে হলে সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এজন্য আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। এই কাজে আমি তোমাদের সাহায্য চাই।’
তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি নিজেদের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নেয়, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধসহ পরিবেশ রক্ষায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা একটি বিশাল শহর। এখানে দুই থেকে আড়াই কোটির বেশি মানুষের বসবাস। সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা নিয়মিত কাজ করলেও তাদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই শুধু সিটি কর্পোরেশন বা প্রশাসনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘তোমরা স্কাউট, গার্ল গাইড কিংবা রেড ক্রিসেন্টের সদস্য হও বা না হও, তোমরা সবাই এ দেশের নাগরিক। তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাই নিজের বাসা, স্কুল, পাড়া ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব তোমাদেরও নিতে হবে।’
যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা বন্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কেউ নির্ধারিত স্থানের বাইরে ময়লা ফেললে তাকে সচেতন করতে হবে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রী জানান, নগরীর বিভিন্ন স্থানে ময়লা ফেলার জন্য ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক জায়গা থেকে এসব ডাস্টবিন চুরি হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে লাগানো গাছের চারাও চুরি হচ্ছে।
এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে নাগরিকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জন্মদিনে একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ
পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের জন্মদিনে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘তোমার জন্মদিনে, ভাইবোনের জন্মদিনে কিংবা নানা-নানির জন্মদিনে একটি করে গাছ লাগানোর চেষ্টা করবে। সেটা তোমার বাসায় হতে পারে, স্কুলে হতে পারে কিংবা গ্রামের বাড়িতে হতে পারে। গাছগুলো যখন বড় হবে, তোমরাও তখন বড় হবে।’
রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও সবুজের ঘাটতি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, একসময় ঢাকায় অনেক বেশি গাছপালা ও খোলা জায়গা ছিল। এখন সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় শহরে গরমের অনুভূতিও বেড়েছে।
তিনি বলেন, ‘গাছ যত বাড়বে, আমরা তত বুক ভরে শ্বাস নিতে পারব। গাছের পাতার ঝিরঝির শব্দ আমার খুব ভালো লাগে। আমরা সবাই মিলে গাছ লাগালে শহরের তাপমাত্রাও কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়ন-এই তিনটি ক্ষেত্রে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, নাগরিকদের সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে।
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান, নিজেদের স্কুল, বাসা, পাড়া ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে তাদের সহযোগিতা পাওয়া যাবে কি না। এ সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পান তিনি।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও স্কাউট সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসের বিশেষ অভিযান উদ্বোধন করেন। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী এ বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি।
ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় আগামী তিন মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ সময় বিবেচনায় নিয়ে এ কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সূত্র: বাসস
রাজধানীর সামগ্রিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি এবং চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৯টা ১০ মিনিটে তিনি গুলশানের বাসভবন থেকে এ পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে বের হন বলে জানিয়েছেন তাঁর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু।
হাসান শিপলু বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও পরিচ্ছন্নতা অবস্থা কেমন তা দেখতে বাসা থেকে বেরিয়েছেন। তিনি ৯টা ১০ মিনিটে বাসা থেকে বের হন। প্রথমে যাচ্ছেন উত্তরার কুয়েত-মৈত্রী হসপাতালে। সেখানে তিনি সরেজমিন ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা দেখবেন।’ উপ-প্রেস সচিব আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাড়াও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করবেন। উল্লেখ্য, এর আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে তিন মাসব্যাপী বিশেষ অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সরকারপ্রধান, যেখানে এডিস মশার প্রকোপ মোকাবিলায় দেশবাসীকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
দিনের শুরুতে রাজধানীর কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার খোঁজ নেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে তিনি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র (আইসিইউ) ও অস্ত্রোপচারকক্ষসহ বিভিন্ন জরুরি বিভাগ ঘুরে দেখেন। তবে ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতার কাঙ্ক্ষিত মান না পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় বেঁধে দেন।
পরবর্তীতে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিতের পাশাপাশি মশক নিধনে শিক্ষার্থীদের কার্যকর ভূমিকা রাখার তাগিদ দেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বছরের এ সময়ে, বিশেষ করে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যায়। প্রতিবছর ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হন, অনেকের মৃত্যুও হয়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এ জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াইয়ের সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এ জন্য আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। এই কাজে আমি তোমাদের সাহায্য চাই।’ প্রধানমন্ত্রী যোগ করেন, ‘দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ যদি নিজেদের আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব নেয়, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধসহ পরিবেশ রক্ষায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।’
শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থাপিত ডাস্টবিন এবং সিটি করপোরেশনের রোপণ করা চারাগাছ চুরির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে নাগরিকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। পরিবেশ সংরক্ষণে শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর পারিবারিক উৎসব ও জন্মদিনে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘তোমার জন্মদিনে, ভাইবোনের জন্মদিনে কিংবা নানা-নানির জন্মদিনে একটি করে গাছ লাগানোর চেষ্টা করবে। সেটা তোমার বাসায় হতে পারে, স্কুলে হতে পারে কিংবা গ্রামের বাড়িতে হতে পারে। গাছগুলো যখন বড় হবে, তোমরাও তখন বড় হবে।’ শহরের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও গাছপালা কমে যাওয়ার বিষয়ে শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘একসময় ঢাকায় অনেক বেশি গাছপালা ও খোলা জায়গা ছিল। এখন সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। গাছপালা কমে যাওয়ায় শহরে গরমের অনুভূতিও বেড়েছে।’ নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চাইলে তারাও ইতিবাচক সাড়া প্রদান করে।
ডেঙ্গু রোগের বিস্তার রোধে কেবল রাষ্ট্রীয় বা সরকারি ব্যবস্থার ওপর এককভাবে ভরসা না করে দেশের আপামর জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে দেশের শিক্ষার্থী এবং তরুণ সমাজকে তাদের নিজ নিজ বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় এলাকা এবং চারপাশের পরিবেশ সর্বদা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার গুরুদায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার প্রাতঃকালে রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ প্রাঙ্গণে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচালিত বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সরাসরি পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর তথা বিএনসিসি ও স্কাউটস সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে এই আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। এ সময় তিনি স্বয়ং শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং তরুণ ক্যাডেটদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেন।
বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি, চিকিৎসাসেবার মান এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানের সার্বিক অবস্থা নিজ চোখে পর্যবেক্ষণ করতে এদিন রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনায় পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই আকস্মিক পরিদর্শনে বের হন প্রধানমন্ত্রী। দিনের শুরুতেই তিনি রাজধানীর কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে উপস্থিত হন। সেখানে চিকিৎসাধীন সাধারণ রোগীদের শয্যা পাশে গিয়ে তাদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং তাদের প্রদান করা চিকিৎসাসেবার মান সম্পর্কে সরাসরি কথা বলেন। এছাড়া তিনি ওই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র বা আইসিইউ এবং অস্ত্রোপচারকক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন।
হাসপাতাল চত্বর পরিদর্শনকালে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা এবং ভেতরের পরিচ্ছন্নতার বেহাল দশা দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ এবং পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার দ্রুত ও টেকসই উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মাত্র সাত দিনের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন তিনি।
হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে উপস্থিত হয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং বিএনসিসি ও স্কাউটস সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ে অংশ নেন। সে সময় তিনি ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান প্রকোপ, তা থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় এবং একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অগ্রণী ভূমিকার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন যে বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে, বিশেষ করে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণ হারান। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো রোগ প্রতিরোধ নিশ্চিত করা, আর সেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে নিজেদের চারপাশ সর্বদা পরিষ্কার রাখতে হবে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন যে ডেঙ্গুর সঙ্গে সফলভাবে লড়াই করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো প্রতিরোধ এবং সে কারণেই আমাদের চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যে কাজে তিনি তরুণদের সরাসরি সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে দেশের বিশাল যুবসমাজ যদি নিজেদের আশপাশ পরিষ্কার রাখার পবিত্র দায়িত্ব স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে, তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষায় একটি বিশাল ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্পূর্ণ সম্ভব। এই মহৎ উদ্দেশ্যে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
রাজধানী ঢাকার সার্বিক পরিচ্ছন্নতার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে ঢাকা অত্যন্ত জনবহুল ও বিশাল একটি নগরী, যেখানে আড়াই কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করেন। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা নিয়মিত কাজ করে গেলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও পরিধি সীমিত, ফলে কেবল প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে পুরো শহরের পরিচ্ছন্নতা ধরে রাখা কঠিন। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি সচেতন নাগরিককে নিজের অংশীদারত্ব ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে হবে।
অযত্রতত্র যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার বদঅভ্যাস ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন যে কেউ নির্দিষ্ট ভাগাড় বা স্থান ছাড়া যত্রতত্র ময়লা ফেললে তাকে নিবৃত্ত ও সচেতন করতে হবে, কারণ দেশের সব নাগরিক মিলে সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে এই মেগাসিটি ঢাকাকে সত্যিকারের একটি পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
পূজামণ্ডপগুলোতে ঢাক ও কাসরের বাদ্যের শব্দের পাশাপাশি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ফুল, ধূপ এবং আগরবাতির সুবাস। শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির আনন্দধারায় অবগাহন করছে দেশের প্রতিটি পূজামণ্ডপ। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হওয়ার পর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী। বিশুদ্ধ মন্ত্রোচ্চারণ এবং দেবীর রূপ দর্শনের জন্য সকাল থেকেই মণ্ডপগুলোতে ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে।
দেবীর চরণে ভক্তদের প্রধান প্রার্থনা হলো বিশ্বজুড়ে শান্তি, সংহতি, শক্তি এবং মানুষের কল্যাণ। তবে মহাসপ্তমীর গভীর তাৎপর্য কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মানবীয় শুভবোধের পুনর্জাগরণ, প্রকৃতির প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতাবোধ এবং একটি সাম্য ও সম্প্রীতিভিত্তিক সমাজ গঠন।
মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান এবং আকর্ষণীয় আনুষ্ঠানিকতা হলো ‘নবপত্রিকা’ স্থাপন, যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। একটি কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু এবং ধানগাছ একসঙ্গে বেঁধে পবিত্র জলে স্নান করানোর পর নতুন শাড়ি পরিয়ে তা মণ্ডপে স্থাপন করা হয়।
নবপত্রিকায় ব্যবহৃত এই নয়টি উদ্ভিদ মূলত দেবী দুর্গার নয়টি মহাশক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। পূজার মূল কেন্দ্রে প্রতিমা থাকলেও মহাসপ্তমীতে সরাসরি উদ্ভিদকে পূজার অংশ করার মাধ্যমে মূলত প্রকৃতির প্রতি মানুষের পরম কৃতজ্ঞতাই প্রকাশ করা হয়।
কারণ হিসেবে বলা যায়, এই গাছপালাগুলো মানুষের খাদ্য, চিকিৎসা, কৃষি এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সচেতন মহলের মতে, কেবল আনুষ্ঠানিক আচার পালনের মধ্যে প্রকৃতি পূজাকে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে গাছপালা সংরক্ষণ, জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা এবং সার্বিক পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগী হওয়াই নবপত্রিকার প্রকৃত শিক্ষা।
সপ্তমীর অপর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার হলো দেবীর ‘মহাস্নান’। আয়নার দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে গঙ্গার জল, দুধ, মধু ও নানা সুগন্ধি উপাচারে দেবীকে স্নান করানো হয়, যা বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি আত্মিক শুদ্ধতারও প্রতীক। এই স্নানের আচার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অন্যের অধিকার হরণ, অহংকার, বৈষম্য কিংবা হিংসা মনে পুষে রেখে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নীতি-নৈতিকতার পূর্ণতা অর্জন করা সম্ভব নয়। সমাজের দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মাধ্যমেই মূলত ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক সামাজিক বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
পৌরাণিক কাহিনীর বর্ণনায় মহিষাসুর বধের আখ্যানটি শুভ ও অশুভ শক্তির মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বকে নির্দেশ করে। দেবী দুর্গার দশটি হাত এবং বিভিন্ন অস্ত্র মূলত অন্যায়কে প্রতিহত করে সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তির প্রতীক। দেবীর দুই পাশে থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ যথাক্রমে সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও বুদ্ধিমত্তার প্রতিনিধিত্ব করেন।
রূপক অর্থে বিচার করলে দেখা যায়, জ্ঞান ছাড়া সমৃদ্ধি সম্পূর্ণ অন্ধ, সাহস ছাড়া ন্যায়বিচার অর্জন অসম্ভব এবং বুদ্ধি ছাড়া শক্তির সঠিক প্রয়োগ করা যায় না।
বাঙালির চিরায়ত ঘরোয়া সংস্কৃতিতে দেবীর এই আগমন কেবল ঈশ্বর আরাধনার বিষয় নয়, বরং পিতৃগৃহে কন্যাসন্তানের ফিরে আসার এক গভীর পারিবারিক অনুভূতির প্রকাশ। এর পাশাপাশি প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জাশিল্পী এবং নানা ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঘাম ঝরানো শ্রমে এই উৎসব রূপ নেয় এক বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক মেলবন্ধনে।
বাংলাদেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে মহাসপ্তমীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের যথাযথ মর্যাদা এবং নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা। উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই তার পূর্ণতা পায়, যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন।
ঢাকিদের বাদ্যের আওয়াজ একসময় থেমে যাবে, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সাহস, প্রকৃতির প্রতি সুকোমল যত্ন এবং মানুষের প্রতি নিঃশর্ত সহমর্মিতা যেন প্রতিটি নাগরিকের আচরণে চিরঞ্জীব থাকে, সেটাই এই মহান দিনের মূল অঙ্গীকার।
জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের এক বছর পরও রাষ্ট্রসংস্কারে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। ক্ষমতার রাজনীতি ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের কারণে সংস্কারের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা ও সাহসের ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধের সঙ্গে আপস এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দলীয় স্বার্থ রাষ্ট্রসংস্কারের পথ সংকুচিত করেছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনে জয়ী দলের সংসদ সদস্যরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। এতে রাষ্ট্রসংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বর্তমান সরকার বেশ কয়েকটি আইনে পরিণত করেছে। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বাড়ানো অধ্যাদেশগুলো পাস হলেও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক কিছু অধ্যাদেশ বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এতে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করে সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ থেকে সরে এসেছে। দুদক সংশোধন অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না করে ২০০৪ সালের পুরোনো আইনে ফিরে যাওয়ায় সংস্থাটির প্রতি আস্থা ফেরানোর সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নকে স্বাধীন ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিল করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত সংস্থাগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। র্যাব বিলুপ্তির পরিবর্তে নতুন নামে সংস্থাটিকে আরও ক্ষমতাশালী করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনে ঐকমত্য থাকলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ ও নিয়মিত হালনাগাদের বিষয়েও অগ্রগতি নেই। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে জবাবদিহিহীন ক্ষমতাকাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অতীতে বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের পরিণতি রাজনৈতিক দলগুলো দ্রুত ভুলে গেছে। ক্ষমতাসীন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চা করছে, অন্যদিকে বিরোধী জোটও দলীয় স্বার্থে ব্যস্ত।
বিবৃতিতে টিআইবি সব রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
সরকারি চাকরি পেতে বছরের পর বছর প্রস্তুতি, লাখো তরুণ-তরুণীর প্রতিযোগিতা আর পরিবারের আর্থিক ত্যাগ—এই বাস্তবতাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে প্রশ্নপত্র বাণিজ্যের চক্র। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তারের পর এমনই একটি চিত্র সামনে এসেছে। প্রাথমিক তদন্তে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশ্ন দেওয়ার চুক্তিতে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নেওয়ার তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পাঁচজনই সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারী। শুধু প্রশ্নপত্রের একটি সেট নয়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকের চেক, স্ট্যাম্প ও মুঠোফোন। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নের ছবি আদান-প্রদান, উত্তর তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীদের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার প্রমাণও মিলেছে। তবে প্রশ্নপত্রের মূল উৎস কে বা কারা, কীভাবে তা চক্রটির হাতে পৌঁছাল এবং এই বাণিজ্যে আর কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন। তিনি জানান, ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মুঠোফোনের কথোপকথন ও চ্যাট পর্যালোচনা করে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্ত এখনো চলছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০) এবং এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)।
ভোরের প্রশ্ন, কয়েক ঘণ্টায় ছড়িয়ে পড়ল উত্তর: তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কর্মরত নূর মোহাম্মদ একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে এনবিআরের আরেক কর্মচারী জাহাঙ্গীর তাকে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুল ইসলামকে পাঠান। পরে প্রশ্নপত্র ও উত্তর চক্রের সদস্য এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত পরীক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে এসআরবি।
এ কাজে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী আসাদুল ইসলাম, পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মচারী রুবেল ইসলাম এবং চাকরিপ্রত্যাশী মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারীদের দাবি, চক্রটি হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ করত।
তবে প্রশ্নপত্রের প্রথম ছবি কার কাছ থেকে এসেছিল, সেটিই এখন তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর ফেসবুকের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পাওয়ার কথা বললেও তাদের দেওয়া তথ্য এখনো নির্ভরযোগ্য বলে মনে করছে না তদন্ত দল। সংশ্লিষ্ট ফেসবুক গ্রুপ ও আইডি যাচাই করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, ছাপাখানা, পরিবহন কিংবা পরীক্ষার নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে অনিয়ম ঘটেছে কি না, তা জানতে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।
চেক-স্ট্যাম্পের ব্যবহার কী ছিল: গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি ও ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা ও একটি ব্যাংক চেক, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, সনদপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, আটটি মুঠোফোন এবং নগদ চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার করা সনদপত্রের সংখ্যা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
উদ্ধার করা এসব সামগ্রী প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা এখনো তদন্তের বিষয়। স্ট্যাম্প ও চেক অর্থ লেনদেনের নিশ্চয়তা, চুক্তি কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই প্রয়োজন। একইভাবে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র ও সনদপত্র কেন একসঙ্গে রাখা হয়েছিল, সেগুলোর মালিক কারা এবং অন্য নিয়োগ পরীক্ষার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, চক্রের একজন সদস্যের কাছে প্রতারিত হওয়ার পর মফিজুল ইসলাম বেশি অর্থ উপার্জনের আশায় এই কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের তথ্যও উঠে এসেছে। তবে এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট ভূমিকা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
২৪২ পদের বিপরীতে আবেদন ৩ লাখ ১৯ হাজার: সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। গত ১০ অক্টোবর সকাল ১১টায় তাদের বাছাই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ।
দূরদূরান্ত থেকে আসা অনেক প্রার্থী ততক্ষণে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে গিয়েছিলেন। শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তে তাদের যাতায়াত, থাকা ও খাবারের খরচসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ক্ষুব্ধ প্রার্থীদের কেউ কেউ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন।
একটি নিয়োগ পরীক্ষায় লাখো প্রার্থীর অংশগ্রহণের প্রস্তুতি, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, প্রশ্নপত্র মুদ্রণ ও বিতরণে বড় ধরনের আয়োজন থাকে। সেই ব্যবস্থার মধ্যে প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগেই বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে ঠিক কোন পর্যায়ে নিরাপত্তা ভেঙেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে এনবিআর, পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী রয়েছেন। তবে তাদের সরকারি পরিচয় থেকেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল উৎস নির্ধারণ করা যায় না। তদন্তে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা, যোগাযোগ, অর্থ লেনদেন এবং প্রশ্নপত্র সংগ্রহের পথ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এসআরবি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত চলমান থাকায় এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি।
এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানকে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা নির্ধারণে কমিটির তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে যেসব বিষয়ে নজর জরুরি: প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রতিরোধে শুধু গ্রেপ্তার অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে মুদ্রণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কারা দায়িত্বে ছিলেন, তার নির্ভুল নথি থাকা প্রয়োজন। সীমিত ও অনুমোদিত প্রবেশাধিকার, দায়িত্ব বিভাজন, নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং প্রশ্নপত্র খোলা ও বিতরণের প্রতিটি ধাপের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত যাচাই, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পরীক্ষার আগে কোনো প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়লে সেটি আসল, নাকি প্রতারণার উদ্দেশ্যে তৈরি—তা দ্রুত যাচাই করার সক্ষমতাও প্রয়োজন।
আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রেও অভিযোগ, গ্রেপ্তার ও অপরাধ প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ, অর্থ লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং বিচারিক প্রক্রিয়ায় দায় নির্ধারণ জরুরি।
এই ঘটনায় সাতজনের গ্রেপ্তার তদন্তে অগ্রগতি হলেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত—প্রশ্নপত্র প্রথমে কার হাতে ছিল এবং সেখান থেকে কীভাবে তা বাইরে গেল? এই উৎস শনাক্ত করা না গেলে চক্রের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলেও প্রশ্নফাঁসের পুরো নেটওয়ার্কের কার্যক্রম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হবে। লাখো চাকরিপ্রার্থীর আস্থা ফিরিয়ে আনতে তাই শুধু গ্রেপ্তার নয়, প্রশ্নপত্রের উৎস, অর্থের প্রবাহ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।