বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ১৯৮১ সালের ৮ ডিসেম্বর মাত্র ২৬ বছর বয়সে মুনসেফ (সহকারী জজ) হিসেবে বিচারিক জীবন শুরু করেন। তারপর চার দশকের বিচারিক কর্মজীবন পার করে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর ওই বছরের ৯ অক্টোবর তিনি আনুষ্ঠানিক বিচারিক কাজ থেকে অবসরে যান। সম্প্রতি তিনি দৈনিক বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আব্দুল জাব্বার খানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শোনালেন তার ৪১ বছরের বিচারিক জীবনের কথা।
দৈনিক বাংলা: অবসরকালীন জীবন কেমন কাটছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: ভালোই কাটছে। তবে ব্যস্ততা কমেনি। মনে হয় আরও বাড়ছে। অবসরে অবসর কোথায়? হা হা…
দৈনিক বাংলা: স্বাধীন বাংলাদেশের তৃতীয় কোনো নারী বিচারক হিসেবে বিচার বিভাগে যাত্রা শুরুর পর সর্বোচ্চ আদালত থেকে অবসরে গেলেন। সব মিলিয়ে একজন নারীর বিচারক হিসেবে দীর্ঘ এই পথচলা কতটা সহজ ছিল?
কৃষ্ণা দেবনাথ: দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালে যখন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যাত্রা শুরু হয়, তখনই কিন্তু বাংলাদেশে মেয়েরা জুডিশিয়াল সার্ভিসে আসতে পারেনি। নারীদের জন্য জুডিশিয়াল সার্ভিসে যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথমেই আমরা পুরুষদের থেকে তিন বছর পিছিয়ে যাই। দেশের বিচার বিভাগের যাত্রা শুরুর তিন বছর পরে নারীদের যাত্রার পরও আজকে নারীদের অবস্থান কোথায় সেটা দেখতে হবে। আমি নারী বিচারক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছি ১৯৮১ সালে। প্রথম এসেছিলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, দ্বিতীয় যাত্রা শুরু করেছিলেন বিচারপতি জিনাত আরা। আর তৃতীয় হিসেবে যুক্ত হই আমি। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, আমরা তিনজনই আপিল বিভাগ থেকে অবসরে গিয়েছি। এটা ভাবতে ভালো লাগে।
নারী হিসেবে বিচারিক জীবনের তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। তবে নারী বিচারকদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়, তাদের সাংসারিক জীবন নিয়ে। কেননা, এটা বদলির চাকরি। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বদলির কারণে সংসারটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটা অনেক কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা তো ছিলই।
দৈনিক বাংলা: সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক হবেন এমন স্বপ্ন কি বিচারিক জীবনের শুরুতে কখনো দেখেছিলেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: না, এমনটি কখনোই ভাবিনি। এমনকি হাইকোর্টেও থাকাকালীন ভাবিনি যে আমি আপিল বিভাগে যাব। স্বপ্নও ছিল না। তবে আমার স্বপ্ন ছিল আমি জজ হব।
দৈনিক বাংলা: অনেক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীরাই এখন প্রায় বেঁচে নেই, আপনি কি মনে করেন এখন নতুন যারা আসছেন, তারা সেই খ্যাতিম্যান আইনজীবীদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে উঠছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: দেখেন এটা শুধু আইনজীবীদের মধ্যে নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। সবখানেই অবক্ষয়। ধরেন আমার বাবা যে পরিমাণ লেখাপড়া করে জ্ঞান অর্জন করেছেন আমি তো মনি করি না, আমার সেটুকু আছে। কিন্তু আমি আশাবাদী নতুন প্রজন্ম থেকে অনেক ট্যালেন্ট উঠে আসছে, আসবে। একসময় নামকরা আইনজীবীরা ছিলেন। তারপর তাদের উত্তরসূরিরা এসেছেন। ঠিক এমনি করেই নতুনরা আইনজীবী হয়ে উঠবেন। এখন যারা নবীন আইনজীবী তাদের জন্য একজন ভালো আইনজীবী হিসেবে গড়ে ওঠার এটা মোক্ষম সময়। তার কারণ জায়গাটা এখন অনেক খালি, সবকিছু প্রস্তুত হয়ে আছে, এখন দরকার শুধু অধ্যবসায়ের।
দৈনিক বাংলা: আপনার অবসর জীবনের শেষ দিনে বলেছিলেন, বিচারক নিজেকে স্বাধীন মনে না করলে সুবিচার সম্ভব না। এর মানে আপনি কী বুঝিয়েছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এই বাক্যটি আমি শুধু কথার কথা হিসেবে বলিনি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেই বলেছি। এখনো বিশ্বাস করি, একজন বিচারক নিজেকে যদি স্বাধীন মনে না করেন, তাহলে কাগজে-কলমে স্বাধীনতা দিয়েই কী লাভ। একজন বিচারক নিজের বিবেককে প্রশ্ন করবেন তিনি নিজে স্বাধীন কি না। কাগজে-কলমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে মাত্র কিছু বছর আগে। তার আগে আমরা বিচারকরা তো নিজেদের পরাধীন মনে করিনি, বিচারের কাজটি কিন্তু স্বাধীনভাবেই করেছি।
আমি মনে করি, একজন বিচারক মনেপ্রাণে নিজেকে স্বাধীন মনে করেন কি না, সেটাই বড় কথা। আমি জোর গলায়, দ্ব্যর্থহীনভাবে বলি ৪১ বছরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন পদে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এই সময়ে তো আমার কাছে কোনো তদবির আসেনি। নিজেকেই সেই জায়গা তৈরি করে নিতে হবে। আমি যখন বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি, তখন অনেক জুনিয়র বিচারক বলতেন তদবির আসে। আমি তখন তাদের বলেছি, কই আমার কাছে তো কোনো তদবির আসে না। তদবির যাতে না আসে সেই পরিবেশ আপনার নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে। বিচারকের স্বাধীনতার বিষয়টি নিজের সততা দিয়ে তৈরি করে নিতে হয়।
তদবির না শুনে একবার এক ব্যক্তিকে জামিন দিইনি বলে সেই সময় আমাকে মেহেরপুরের জেলা জজ থেকেও বদলি করা হয়েছিল। জেলা জজ থেকে সাড়ে চার বছর আমাকে কর্নার করে রাখা হয়েছিল। দুটি জেলার জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর স্পেশাল জজ করে রাখা হয়েছিল। আমি তো তখনো ভয় পাইনি। আমার কথা হলো, নিজেকে স্বাধীন রাখতে হলে বদলির ভয় করলে চলবে না। কী আর করবে বাংলাদেশের ভেতরেই তো বদলি করবে, আর তো কিছু না। বিচারক যদি বদলির ভয় বা নিজের লাভ-ক্ষতির চিন্তা করেন তাহলে তিনি স্বাধীন বিচারক হিসেবে কীভাবে কাজ করবেন। করতে পারবেন না। বিচারককে তার নিজের সততার ওপর শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। এখন কিন্তু দেওয়ানি মামলায় আপস করার সুযোগ আছে। লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলা আপসের সুযোগ আছে। এখন যদি এটা ভালোভাবে কার্যকর হয়, তাহলে ৫০ শতাংশ মামলাই আসবে না। এটা যদি সফল করা যায়, তাহলে মামলার জট অনেক কমে আসবে।
দৈনিক বাংলা: একটি মামলা শেষ করতে বছরের পর বছর লাগে কেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: মামলা শেষ করতে পক্ষগণেরই জোরালো পদক্ষেপের প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক সময় কোনো না কোনো পক্ষই চায় না, দ্রুত মামলা শেষ হোক। মামলার জট সৃষ্টির পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর জন্য শুধু বিচারকরা দায়ী তা বলা যাবে না বরং বাদী-বিবাদী, দুই পক্ষের আইনজীবীদেরও দায় রয়েছে। একটি মামলার নিষ্পত্তির জন্য কম করে হলেও পাঁচটি পক্ষের সমন্বয় দরকার পড়ে, তবেই মামলার নিষ্পত্তি ঘটে।
এ ছাড়া বিচারকসংকট রয়েছে বড় আকারে। এত বিশাল মামলার জট দ্রুত কমাতে হলে বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। যেটা সরকারের পক্ষে সম্ভব না।
দৈনিক বাংলা: বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ছোটখাটো যেকোনো বিষয়েই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, কেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এখন কিন্তু পত্রিকা খুললেই দেখা যায় হাইকোর্টের বিভিন্ন সংবাদ বা নির্দেশনা নিয়ে খবর ছাপানো হয়েছে। চোখ মেললেই কোর্ট-কাচারির খবর পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ায় ভুক্তভোগীকে হাইকোর্টে আসতে হচ্ছে। এটার একটা ভালো দিক আছে, মানুষ আদালতে এলে প্রতিকার পায়। আবার কিছু সময় দেখি একটা সাধারণ বিষয় নিয়েও মানুষকে হাইকোর্টে আসতে হয়। স্থানীয় প্রশাসন যদি সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করে তাহলে কিন্তু আদালতের ওপর এই চাপ আসে না। তারা সেটি করছে না। অনেক সময় আদালতের নির্দেশের পরও অনেক কিছু বাস্তবায়ন করা হয় না। এটা ভালো দিক না।
দৈনিক বাংলা: বিচার বিভাগকে কি আরও শক্তিশালী হতে হবে, নাকি শক্তিশালীই আছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: বিচার বিভাগকে কেউ শক্তিশালী করে দেবে না। বিচার বিভাগকে নিজেকেই শক্তিশালী হতে হবে। একটা আদেশ হওয়ার পর ঝড়ঝাপটা আসতে পারে। সেটা বহন করার মতো বিচারক যদি আমরা হতে পারি তাহলে বিচার বিভাগ শক্তিশালী হবে। বিচারক যদি সেই ঝড়ঝাপটা সইবার ক্ষমতা না রাখেন তাহলে সেটা হবে না।
দৈনিক বাংলা: বার ও বেঞ্চের সম্পর্ককে বলা হয় একটি পাখির দুটি ডানা। সম্প্রতি বিভিন্ন বারে আইনজীবী ও বিচারকদের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে, এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: সর্বজনীনভাবে আমি বলব, সাবলীল সম্পর্ক হ্রাস পেয়েছে। অনেক আগে থেকেই এই সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। অনেক সময় বিচারকের দরজায় লাথি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সার্বিকভাবে বলব আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে সম্পর্ক অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। আমার বক্তব্য হলো, একজন বিচারক যেহেতু একটু ওপরে বসেন, আইনজীবীরা একটু নিচে দাঁড়ান, এই যে বিচারকরা একটু অগ্রাধিকার স্থানে থাকেন সে জন্য বিচারকদের অনেক কিছু করা যায়, অনেক কিছু করা যায় না। সেটি তাদের মাথায় থাকতে হবে। এ ছাড়া আইনজীবীদেরও সহিষ্ণু হতে হবে। দুপক্ষই যদি সহিষ্ণু হয় তাহলে কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরবে না।
আদালতের মর্যাদা কমলে কিন্তু আইনজীবীদেরই মর্যাদা কমবে। এটা তাদের বুঝতে হবে। কোনো বিচারকের ভুল হলে আইনজীবীরা তার ওপরের বিচারককে বলতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট আছে, আইন মন্ত্রণালয় আছে। সেখানে বলার সুযোগ আছে। কিন্তু তাই বলে স্লোগান দেয়া উচিত না। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
দৈনিক বাংলা: দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক জীবনে পূরণীয় ঘটনা বা অপ্রাপ্তি বলে কিছু আছে কি না?
কৃষ্ণা দেবনাথ: মানিকগঞ্জে একটি অ্যাসিড নিক্ষেপ মামলায় আসামিকে সাজা দিতে পারিনি, এই একটি বিষয় আমার মনে এখনো গেঁথে আছে। আইনজীবীর ভুলের কারণে সেই আসামিকে সাজা দিতে পারিনি। যে কারণে খুব কষ্ট লেগেছিল। কারণ মামলায় আসামি শনাক্ত একটা বড় ব্যাপার। মামলায় বলা হয়েছে, চাঁদের আলোতে আসামিকে দেখা গেছে। কিন্তু পঞ্জিকাতে দেখা গেল সেদিন অমাবস্যা ছিল। তার ওপর আবার সেদিন ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। আইনজীবী মামলা শক্ত করতে গিয়ে চাঁদের আলোতে দেখেছে বলে বিবরণ দিয়েছেন কিন্তু সেদিন সেটা ছিল না। যে কারণে আসামি শনাক্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরঞ্জিত বিবরণ মূল ঘটনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ ছেলেটি মেয়েটিকে স্কুলে যাওয়ার সময় উত্ত্যক্ত করত, সেটি উল্লেখ থাকলেও হতো। অতিরঞ্জিত করার কারণে আসামি বেঁচে যায়। এই ঘটনা আমাকে পীড়া দেয়। তার কারণ চোখের সামনে দেখেছিলাম মেয়েটির ঝলসানো মুখ। কিন্তু তার ন্যায়বিচার আমি দিতে পারিনি।
দৈনিক বাংলা: দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক জীবনে আপনি কতজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এটা বলতে পারব না। তার কারণ, আমি গুনে রাখিনি। তবে সর্বোচ্চ সাজা দেয়ার ব্যাপারে আমি অনেক সতর্ক ছিলাম। আমি দুইয়ে দুইয়ে চার না হওয়া পর্যন্ত কাউকে সাজা দিইনি। অনেক আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েও আমি স্বস্তি পেয়েছি। তার কারণ অকাট্য দলিল-প্রমাণ ছিল। সব থেকে বড় স্বস্তি পেয়েছি, যখন আমি ঢাকার জেলা জজ ছিলাম। বঙ্গবন্ধু হত্যার ফাঁসির আসামিদের সাজা কার্যকর হবে। তখন ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার জন্য শেষ যে স্বাক্ষর দিতে হয়, জেলা জজ হিসেবে সেটা আমি দিয়েছিলাম। ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমার কাছে লাল নথি এল, আমি তাতে স্বাক্ষর করলাম। এরপরই টিভিতে দেখলাম কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকর শুরু করেছে। ঐতিহাসিক সেই মামলাটিতে শেষ স্বাক্ষর করেছিলাম। এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
দৈনিক বাংলা: অবসরে কেমন কাটছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: অবসরে একদমই অবসর নেই। আমি রুট (প্রান্তিক) লেভেলের ভিকটিমদের নিয়ে কাজ করতে চাই। সেটাই শুরু করেছি। দেখা যাক কতটা করতে পারি।
দৈনিক বাংলা: ধন্যবাদ আপনাকে।
কৃষ্ণা দেবনাথ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
দেশের পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের জোরালো গুঞ্জনের মধ্যেই সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ও ইঙ্গিতপূর্ণ খুদে বার্তা পাঠিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। আজ বুধবার রাতে তাঁর সরকারি মোবাইল নম্বর থেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এই বার্তায় তিনি বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের অমর পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে নিজের দায়িত্বকালের মূল্যায়ন করেছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সংস্কার ও রদবদলের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, আইজিপির এই বার্তাটি সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর সম্ভাব্য বিদায়ের এক স্পষ্ট সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো সেই খুদে বার্তায় বাহারুল আলম ইংরেজিতে চার্লস ডিকেন্সের ‘এ টেল অব টু সিটিজ’ উপন্যাসের সেই বিখ্যাত শুরুর অংশটি তুলে ধরেন। যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায়— "এটি ছিল শ্রেষ্ঠ সময়, এটি ছিল সবচেয়ে খারাপ সময়; এটি ছিল প্রজ্ঞার যুগ, এটি ছিল নির্বুদ্ধিতার যুগ; এটি ছিল বিশ্বাসের সময়, এটি ছিল অবিশ্বাসের সময়; এটি ছিল আলোর ঋতু, এটি ছিল অন্ধকারের ঋতু; এটি ছিল আশার বসন্ত, এটি ছিল হতাশার শীত।" বার্তার শেষ অংশে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উল্লেখ করেন যে, গত ১৫ মাসে পুলিশ বাহিনীর অর্জিত সকল সাফল্যের কৃতিত্ব তাঁর সহকর্মীদের, আর এই সময়ের সকল ব্যর্থতার দায়ভার তিনি একান্তই নিজের কাঁধে নিচ্ছেন। সবশেষে তিনি সকলের মঙ্গল কামনা করে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা জানিয়েছেন।
আইজিপির এই বার্তাটি পাওয়ার পর থেকেই পুলিশ সদর দপ্তরসহ পুরো বাহিনীর ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েকদিন ধরে প্রশাসনিক অলিন্দে আলোচনা চলছিল যে বাহারুল আলমকে খুব শীঘ্রই তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। বিডিআর হত্যাযজ্ঞ নিয়ে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ওই নৃশংস ঘটনার সময়কার কিছু বিষয়ে বাহারুল আলমের নাম ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এই বিতর্ক এবং নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রশাসনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তাঁর প্রস্থান অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
যদিও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বাহারুল আলমকে অব্যাহতি প্রদান বা নতুন আইজিপি নিয়োগের বিষয়ে সরকার থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি, তবে তাঁর এই ‘বিদায়ি সুরের’ বার্তাটি গুঞ্জনের পালে নতুন করে হাওয়া দিয়েছে। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব ছাড়ার আগেই তিনি নৈতিক অবস্থান থেকে সহকর্মীদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা ও দায়বদ্ধতা প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে এমন পরিবর্তন আগামী দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সংস্কারে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আপাতত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ প্রশাসনের সকলে সরকারের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক আদেশের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বাংলাদেশে চলমান ‘মব কালচার’ বা বিশৃঙ্খল জনরোষের সংস্কৃতি আর কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, দেশে এই ধরনের অরাজকতাকে আর উৎসাহিত করা হবে না এবং যেকোনো দাবি-দাওয়া বা অভিযোগ কেবল যথাযথ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই উত্থাপন করতে হবে। আজ বুধবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত প্রথম পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা ও শৃঙ্খলা ফেরানোর বিষয়ে তাঁর এই কঠোর অবস্থান বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মিছিল, সমাবেশ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার সবার রয়েছে। বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও বাকস্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাবে। তবে দাবি আদায়ের অজুহাতে যত্রতত্র সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করা কিংবা ‘মব’ তৈরি করে জনজীবন বিপর্যস্ত করার প্রবণতা কঠোরভাবে বন্ধ করা হবে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তাই যারা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি সকলকে ধৈর্য ধারণ করে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে যেকোনো সমস্যার সমাধান খোঁজার পরামর্শ দেন।
পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মানেই মূলত পুলিশ বাহিনী। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে এই বাহিনীর সুনাম ও পেশাদারিত্ব চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর লক্ষ্য হলো পুলিশের হারানো ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা এবং এই বাহিনীকে প্রকৃত অর্থেই ‘জনগণের বন্ধু’ হিসেবে গড়ে তোলা। সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে থানায় গিয়ে আইনি সহায়তা পেতে পারে, তা নিশ্চিত করা হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা অবৈধ তদবির বরদাশত করা হবে না। পুলিশের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন অন্যান্য সংস্থাকেও জনগণের সেবায় আরও বেশি সক্রিয় ও জনমুখী করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার করে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পুরো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করা হবে। প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখা তাঁর মেয়াদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বাহিনীর সদস্যদের কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য কোনো প্রকার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন, তবে মুহূর্তেই তাঁর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করা হবে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাহিনীর ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও আদর্শিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দীর্ঘ দেড় দশক পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন সাহসী বক্তব্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে হলে সবার আগে সাংবাদিকদের পেশাগত ও জীবনযাত্রার সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন নবনিযুক্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, সংবাদকর্মীদের নানা প্রতিকূলতা ও দাবিগুলো অমীমাংসিত রেখে গণমাধ্যমের প্রকৃত উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আজ বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আয়োজিত এক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। নতুন সরকারের তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবার প্রেস ক্লাবে এসে তিনি সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
মতবিনিময়কালে জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন সাংবাদিকতা অপরিহার্য এবং বর্তমান সরকার গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার পরিবর্তে একে আরও আধুনিক ও শক্তিশালী করতে কাজ করবে। তিনি বিশ্বাস করেন, সাংবাদিকরা যদি নির্ভয়ে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবেই রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। প্রেস ক্লাব পরিদর্শন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে এই আলাপচারিতার সময় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীও তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ তথ্যমন্ত্রীর কাছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবাদপত্রের সংকট, ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো তুলে ধরেন। মন্ত্রী অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে তাঁদের বক্তব্য শোনেন এবং পর্যায়ক্রমে সকল সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। তিনি জানান, সরকার গণমাধ্যমবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে একটি সুস্থ ধারার সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরি করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাংবাদিকদের সাথে সরকারের এই সরাসরি যোগাযোগ আগামীর পথচলায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি মনে করেন।
সৌজন্য সাক্ষাতের এই আয়োজনে সাংবাদিক সমাজের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি শহিদুল ইসলাম। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশেষ করে বিএনপি বিটের সংবাদকর্মীরা এই সময় উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ নতুন তথ্যমন্ত্রীর এই ত্বরিত উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে, তাঁর মেয়াদে গণমাধ্যম এক নতুন প্রাণশক্তি পাবে। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম দিনেই তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাংবাদিকবান্ধব এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
নবগঠিত সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের প্রথম কার্যদিবসেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বুধবার বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দেশের ইউনিয়ন পরিষদ, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের শূন্য পদগুলোতে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে শুরু করা হবে। তিনি জানান, সরকার এই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিকভাবে সক্রিয় করতে বদ্ধপরিকর এবং যত দ্রুত সম্ভব এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
বর্তমানে দেশের স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের পদগুলো খালি থাকায় প্রশাসনিক কাজে যে স্থবিরতা বিরাজ করছে, তা নিরসনেই এই দ্রুত নির্বাচনের পরিকল্পনা করছে নতুন সরকার। মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে তৃণমূল পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি মনে করেন, জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দায়িত্ব নিলে স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি আসবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব হবে।
দেশের চলমান আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ওঠা 'ভঙ্গুর অবস্থার' অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, দেশের পরিস্থিতি যতটা নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, আদতে বাস্তবতা ততটা খারাপ নয়। তাঁর মতে, গত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে এবং ব্যষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে শুরু করেছে। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন যে, বিগত সময়ে ধ্বংসের মুখে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করা হচ্ছে এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির আরও দ্রুত উন্নতি ঘটানো সম্ভব হবে।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অবস্থান কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে জানান, এটি একটি রাজনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং সরকারের সামগ্রিক অবস্থানের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে তা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীকে জানানো হবে।
সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। সেখানে তিনি স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশনা দেন। শিক্ষা ও আইন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনিও জানান যে, বর্তমান সরকার জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে কোনো আপস করবে না। দীর্ঘ দেড় দশক পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপির এই হেভিওয়েট নেতার স্থানীয় সরকার নিয়ে এমন তড়িৎ সিদ্ধান্ত আগামীর প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন সরকারের প্রথম দিনেই শাসনতান্ত্রিক শৃঙ্খলা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফেরার স্পষ্ট আভাস মিলল তাঁর বক্তব্যে।
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে শেখ বশিরউদ্দীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি দিয়েছে সরকার। আজ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বিমান-১ উপশাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। শেখ বশিরউদ্দীন বিমান বাংলাদেশের চেয়ারম্যানের পাশাপাশি বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বও পালন করছিলেন। নতুন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে তাঁর এই পদত্যাগ ও অব্যাহতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা. শাকিলা পারভীন স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে যে, সরকার 'বাংলাদেশ বিমান (রহিত বাংলাদেশ বিমান অর্ডার, ১৯৭২ পুনর্বহাল এবং সংশোধন আইন, ২০২৩)'-এর ৩০ (সি) ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রজ্ঞাপনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেখ বশিরউদ্দীনকে তাঁর ব্যক্তিগত অভিপ্রায় বা ইচ্ছার ভিত্তিতেই এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে। মূলত তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই সরকার এই আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করেছে।
এর আগে গত সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) শেখ বশিরউদ্দীন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন। ওই দিনই তাঁর পদত্যাগপত্রটি অনুমোদনের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। শেখ বশিরউদ্দীন গত বছরের ২৬ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় এই বিমান সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি সাবেক চেয়ারম্যান মুয়ীদ চৌধুরীর স্থলাভিষিক্ত হয়ে দীর্ঘ কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
উল্লেখ্য যে, দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শেখ বশিরউদ্দীনের এই অব্যাহতি সেই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খুব শীঘ্রই বিমানের নতুন চেয়ারম্যানের নাম ঘোষণা করা হতে পারে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে। বর্তমানে সংস্থাটির দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চললেও শীর্ষ পদের এই পরিবর্তন বিমানের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণে নতুন কোনো মোড় আনে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। আজ সন্ধ্যা ৭টায় এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণটি অনুষ্ঠিত হবে বলে সরকারি এক বার্তায় নিশ্চিত করেছে তথ্য মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর দেশবাসীর প্রতি তাঁর এটিই হবে প্রথম আনুষ্ঠানিক ও সরাসরি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সৌজন্যে প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণটি একযোগে দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে সম্প্রচার করা হবে। তথ্য মন্ত্রণালয় দেশের সকল সম্প্রচার মাধ্যমকে নির্ধারিত সময়ে ভাষণটি প্রচারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর এই ভাষণে নতুন সরকারের কর্মপরিকল্পনা, রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা, অর্থনীতির সংকট মোকাবিলা এবং জাতীয় ঐক্যের ডাক সংবলিত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা থাকবে।
এর আগে, গতকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক রাজকীয় ও আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁকে পদের গোপনীয়তা ও শপথ বাক্য পাঠ করান। একই দিন বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরাও শপথ গ্রহণ করেন। দীর্ঘ দেড় দশক পর দেশে একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর প্রধানমন্ত্রীর প্রথম এই ভাষণটি নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যাত্রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। আজ সকাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছেন এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর এই ভাষণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
নবগঠিত সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কর্মদিবসেই দেশে প্রচলিত ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনির মতো বিশৃঙ্খলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বুধবার সকালে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, বিগত দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছিল, তা উন্নয়ন করা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আইনশৃঙ্খলা যতটুকু খারাপ ছিল, তা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে উন্নয়নের চেষ্টা করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
নতুন সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী—এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘টু বিল্ড দ্য নেশন’ অর্থাৎ দেশ পুনর্গঠন করা। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন এবং সেই ‘মাস্টার প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতেই বর্তমান মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্য জনগণের সমস্যা সমাধানে এবং দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিতে দায়বদ্ধ থাকবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখা হবে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সরাসরি তৃণমূল মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় এর গুরুত্ব অনেক বেশি। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, অতীতে নিজে স্থানীয় সরকারের সাথে জড়িত থাকায় মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো সম্পর্কে তাঁর ভালো ধারণা রয়েছে। এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মন্ত্রণালয়কে আরও গতিশীল ও জনমুখী করার মাধ্যমে গ্রাসরুট পর্যায়ে পরিবর্তন আনার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
দেশের অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘ভঙ্গুর দশা’ সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যতটা খারাপ ভাবা হচ্ছে, বাস্তবে এখন আর তেমন নেই। তাঁর দাবি অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে এবং ব্যাষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করেছে। ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলাও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতির আরও উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, একটি বড় গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর মুহূর্তের মধ্যেই সব কিছু স্বাভাবিক হওয়া কঠিন, তবে সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
বিগত নির্বাচনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং সবাই একে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আওয়ামী লীগের বিষয়ে ভবিষ্যতে সরকারের অবস্থান কী হবে, তা মন্ত্রিসভায় আলোচনার পর রাজনৈতিকভাবে জানানো হবে বলে তিনি জানান। তবে বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম নিয়ে কোনো শ্বেতপত্র প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা তিনি নাকচ করে দেন। তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি বিশেষ মুহূর্তে দায়িত্ব নিয়েছিল এবং সফলভাবে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ তৈরি করে দিয়েছে। এই কৃতিত্বের জন্য তাদের প্রশংসা প্রাপ্য বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সার্বিকভাবে, নতুন সরকারের শুরুতেই তিনি শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছেন।
নতুন চাকরি পেয়েছেন বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার। আজ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে এ কথা জানান তারা।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নতুন চাকরির কথা জানিয়ে লিখেছেন, আমি একটি নতুন ইংরেজি সংবাদপত্র, দ্য ডেইলি ওয়াদা-এর সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেছি। আপনাদের দোয়া এবং আশীর্বাদ কামনা করছি।
অপরদিকে উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে জানান- তিনিও সংবাদপত্র, ডেইলি ওয়াদা’র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেছেন।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। পরে ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠন করা হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে শপথ নেন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর গতকাল মঙ্গলবার বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ দেড় দশক পর দেশের শাসনভার গ্রহণ করা নতুন এই প্রধানমন্ত্রীর বেতন, সরকারি ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিদ্যমান ‘দ্য প্রাইম মিনিস্টারস (রেমুনারেশন অ্যান্ড প্রিভিলেজ) (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০১৬’ অনুযায়ী নির্ধারিত আইনি কাঠামোর অধীনেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর যাবতীয় আর্থিক সুবিধা ও বিশেষ অধিকার ভোগ করবেন।
আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মাসিক ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল বেতন পাবেন। এর বাইরেও বাড়িভাড়া বাবদ প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা ভাতার বিধান রয়েছে, যদিও প্রধানমন্ত্রী সাধারণত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নির্ধারিত বাসভবনেই অবস্থান করেন। সে ক্ষেত্রে বাসভবনের যাবতীয় সাজসজ্জা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সরকার বহন করে। দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী যখন বিভিন্ন জেলায় বা দেশের অভ্যন্তরে সফরে থাকেন, তখন তিনি প্রতিদিন ৩ হাজার টাকা হারে দৈনিক ভাতা পাওয়ার অধিকারী হন। এই ভাতা মূলত তাঁর দাপ্তরিক ভ্রমণের খরচ মেটাতে প্রদান করা হয়।
আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর জন্য রয়েছে বিশাল অঙ্কের একটি স্বেচ্ছাধীন তহবিল। আইন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর অধীনে প্রতি বছর দেড় কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল বরাদ্দ থাকে, যা তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে তাঁর পছন্দ অনুযায়ী ব্যয় করতে পারেন। এছাড়া রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে বিমান ভ্রমণের সময় তাঁর জন্য ২৫ লাখ টাকার একটি বিমা কভারেজ নিশ্চিত করা থাকে। প্রধানমন্ত্রীর বিনোদন সংশ্লিষ্ট যাবতীয় ব্যয় এবং তাঁর কার্যালয় ও সরকারি বাসভবনের যাবতীয় ইউটিলিটি বিল যেমন—বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও টেলিফোন খরচ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মেটানো হয়।
পরিবহন সুবিধার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেয়ে থাকেন। তাঁর সরকারি বাসভবন থেকে সচিবালয় বা অন্য যেকোনো দাপ্তরিক গন্তব্যে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত যানবাহনের জ্বালানি ও চালকের বেতনসহ সকল ব্যয় সরকার বহন করে। কেবল প্রধানমন্ত্রী নন, তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্যও নির্দিষ্ট কিছু ব্যয় ভাতা হিসেবে পাওয়ার আইনি সংস্থান রয়েছে। গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেওয়ার পর থেকেই তারেক রহমান এই সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রটোকলের অধীনে চলে এসেছেন। আজ সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় তাঁর এই রাজকীয় রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের আনুষ্ঠানিক সূচনা দেখা গেছে। নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এখন থেকে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদের এই মর্যাদা ও দায়িত্ব পালন করবেন।
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশ্বখ্যাত দর্শন হলো ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো’। তবে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ১৮ মাস দায়িত্ব পালন শেষে তিনি যখন বিদায় নিচ্ছেন, তখন দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাঁর এই দর্শনের ঠিক বিপরীত চিত্র ফুটিয়ে তুলছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর এক বিশাল জনসমর্থন ও সংস্কারের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এলেও, ড. ইউনূসের শাসনামলে দেশে নতুন করে ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের যে সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন, তা কাজে লাগাতে তিনি চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিকে তিনি তাঁর সাফল্যের স্মারক হিসেবে তুলে ধরলেও এর নেপথ্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও উৎপাদন খাতকে সংকুচিত করার এক নেতিবাচক কৌশল ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনামলে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচকই ছিল নিম্নমুখী। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল বায়েসের মতে, একজন অর্থনীতিবিদ সরকার প্রধান হওয়ার পর প্রত্যাশা ছিল বিপর্যস্ত অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়িক আস্থায় ধস নেমেছে এবং শিল্প উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর আমলে নতুন করে বিপুল সংখ্যক মানুষ দরিদ্র হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৪ শতাংশ, যা এক বছর পর ২০২৫ সালে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে আসে—যা গত চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সাথে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ড. ইউনূসের সরকার নির্বাচিত সরকারের জন্য ২৩ লাখ কোটি টাকার এক বিশাল ঋণের বোঝা রেখে গেছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা ড. ইউনূসের আমলের অন্যতম কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের এই হার বর্তমানে বিশ্বে সর্বোচ্চ। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের চিত্রটিও বেশ করুণ। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার যখন সাড়ে ৮ শতাংশ, তখন মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ, মানুষের আয় যে হারে বেড়েছে, খরচ বেড়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। অথচ বিদায়ী ভাষণে ড. ইউনূস ৩৪ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভের পরিসংখ্যান দিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। গবেষকদের মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে এবং আমদানি কঠোরভাবে সংকুচিত করে সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলে এই রিজার্ভ বাড়ানো হয়েছে, যা কোনো টেকসই সমাধান নয়।
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে প্রধান উপদেষ্টা পদের প্রভাব খাটিয়ে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাঁর শাসনামলে গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ এবং ব্যাংকে সরকারি শেয়ারের পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ ইউনির্ভাসিটির অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসের জন্য জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স এবং গ্রামীণ টেলিকমের ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি দ্রুততার সাথে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থ পাচারের মামলাগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে খারিজ হয়ে যাওয়ায় বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্বরত অবস্থায় তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সরাসরি কোনো সংবাদ সম্মেলন করেননি, যা তাঁর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অঙ্গীকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল তাঁর আমলে দেশে সৃজিত ‘মব কালচার’ বা বিশৃঙ্খল জনরোষ। বিভিন্ন গণমাধ্যম অফিসে আগুন দেওয়া, সংবাদকর্মীদের অবরুদ্ধ করা এবং ভিন্নমতের কারণে সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করার ঘটনা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হয়েছে। তাঁর সরকারের অধীনে মাজার, মন্দির ও ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙচুর এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে পিটিয়ে হত্যার মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি দেশের দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের অমূল্য নথিপত্র এবং ভাস্কর্য বিনষ্টের সময়ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনি নীরব ভূমিকা পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিশ্বব্যাপী যে ‘তিন শূন্য’ (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ) তত্ত্ব প্রচার করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় এসে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি। বরং দারিদ্র্য ও বেকারত্ব উভয়ই বৃদ্ধি পাওয়ায় সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ড. ইউনূস তাঁর এই তত্ত্বের নৈতিক ভিত্তি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কতটা ধরে রাখতে পারবেন। বিদায়লগ্নে এই বিশাল ব্যর্থতা ও ঋণের বোঝা তাঁর ১৮ মাসের শাসনের এক ধূসর অধ্যায় হিসেবেই ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হয়েছে। দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মহানগরী—ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের আয়োজন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এর মাধ্যমে রাজধানী ও বাণিজ্যিক নগরীর অভিভাবক নির্বাচনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো পৃথক চিঠিতে এই তিন সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়াদের বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ২ জুন, ফলে আইন অনুযায়ী গত বছরের ১ জুন এই সিটির পাঁচ বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২০ সালের ৩ জুন, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত বছরের ২ জুন। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এবং বর্তমান হিসাব অনুযায়ী আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি এই সিটির মেয়াদ পূর্ণ হতে যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, কোনো সিটি করপোরেশনের প্রথম সভার তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর সেটির মেয়াদ গণনা করা হয় এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম—উভয় মহানগরের ক্ষেত্রেই মেয়াদের সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত বা সন্নিকটে হওয়ায় দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, সরকারের এই চিঠিটি ইতোমধ্যেই কমিশনের হস্তগত হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে দ্রুতই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিক সভা আয়োজন করা হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সংসদ নির্বাচনের পর এখন তাদের মূল মনোযোগ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। সে হিসেবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাসিন্দারা বছরের মাঝমাঝি সময়ে নতুন জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং তৎকালীন মেয়র ও চেয়ারম্যানদের একটি বড় অংশ আত্মগোপনে চলে যান অথবা পদত্যাগ করেন। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১২টি সিটি করপোরেশনসহ দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল। বর্তমানে শুধুমাত্র ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অন্য সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে আদালতের এক বিশেষ আদেশে বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিএনপি নেতা ডা. শাহadat হোসেন। দীর্ঘ বিরতির পর এই তিনটি মেগাসিটিতে ভোটের ঘোষণা আসায় সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার কাঠামোতে গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত নেতৃত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটবে।
বাংলাদেশের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। আজ বুধবার বেলা ১১টার দিকে তিনি স্মৃতিসৌধের মূল বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে এই শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার শপথ গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি।
সাভারে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এক বিশেষ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এরপর তিনি মন্ত্রিসভার নবনিযুক্ত সদস্যদের সাথে নিয়ে জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে প্রধানমন্ত্রী শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল তাঁকে রাষ্ট্রীয় সালাম বা ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করে এবং বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই প্রথম সফরকে কেন্দ্র করে স্মৃতিসৌধ ও এর আশপাশের এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। তাঁর সাথে এ সময় নবনিযুক্ত পূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য যে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গতকাল বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নেন তারেক রহমান। আজ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর প্রশাসনিক মেয়াদের প্রথম কার্যদিবসের সূচনা করলেন।
সাভারের কর্মসূচি শেষ করে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আজ দিনভর তাঁর আরও বেশ কিছু শ্রদ্ধা নিবেদন ও দাপ্তরিক কর্মসূচি রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখে একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে অঙ্গীকার তিনি শপথের পর করেছিলেন, জাতীয় স্মৃতিসৌধে এই শ্রদ্ধা নিবেদন তারই এক আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেলেও নিরাপত্তা বজায় রাখতে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার এই সফরের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন নির্বাচিত সরকার গঠিত হওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রাষ্ট্রীয় বাসভবন ত্যাগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের সাথে সাথেই ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন প্রধান উপদেষ্টার পদটি বিলুপ্ত হয়। এর ফলে দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অবস্থানের পর এখন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই তিনি যমুনা ছেড়ে গুলশানে অবস্থিত তাঁর নিজস্ব বাসভবনে স্থায়ীভাবে ফিরে যাবেন।
গতকাল শপথ অনুষ্ঠানের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছাড়াই সাধারণ নাগরিক হিসেবে যমুনা ভবনে ফিরে যান, যা ক্ষমতা হস্তান্তরের এক বিরল ও মার্জিত উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট এক কঠিন পরিস্থিতিতে দেশের হাল ধরেছিলেন এই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। টানা ৫৫৯ দিন দায়িত্ব পালন শেষে তিনি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। এখন থেকে তিনি তাঁর পূর্বের শিক্ষা ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে পুনরায় মনোনিবেশ করবেন বলে জানা গেছে।
এদিকে সরকারি একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানিয়েছে, নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন আবাসের জন্য রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাকেই প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর স্থায়ী বসবাসের জন্য ভবনটিতে বেশ কিছু অবকাঠামোগত সংস্কার ও নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। এই সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে। সংস্কার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বর্তমান আবাসস্থল থেকেই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পর ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক ও তাঁর বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসার প্রকল্পের কাজে যুক্ত হবেন। বিশেষ করে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ বা গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি দেখভালের কাজে তিনি সরাসরি সময় দেবেন বলে ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, দেশের ১১৬তম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গত বছর মার্চ মাসে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছিল। দেড় বছরের এই শাসনকাল শেষে ড. ইউনূসের প্রস্থান এবং নতুন সরকারের আগমন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন গণতান্ত্রিক ধারার সূচনা করল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।