বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ১৯৮১ সালের ৮ ডিসেম্বর মাত্র ২৬ বছর বয়সে মুনসেফ (সহকারী জজ) হিসেবে বিচারিক জীবন শুরু করেন। তারপর চার দশকের বিচারিক কর্মজীবন পার করে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর ওই বছরের ৯ অক্টোবর তিনি আনুষ্ঠানিক বিচারিক কাজ থেকে অবসরে যান। সম্প্রতি তিনি দৈনিক বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আব্দুল জাব্বার খানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শোনালেন তার ৪১ বছরের বিচারিক জীবনের কথা।
দৈনিক বাংলা: অবসরকালীন জীবন কেমন কাটছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: ভালোই কাটছে। তবে ব্যস্ততা কমেনি। মনে হয় আরও বাড়ছে। অবসরে অবসর কোথায়? হা হা…
দৈনিক বাংলা: স্বাধীন বাংলাদেশের তৃতীয় কোনো নারী বিচারক হিসেবে বিচার বিভাগে যাত্রা শুরুর পর সর্বোচ্চ আদালত থেকে অবসরে গেলেন। সব মিলিয়ে একজন নারীর বিচারক হিসেবে দীর্ঘ এই পথচলা কতটা সহজ ছিল?
কৃষ্ণা দেবনাথ: দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালে যখন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যাত্রা শুরু হয়, তখনই কিন্তু বাংলাদেশে মেয়েরা জুডিশিয়াল সার্ভিসে আসতে পারেনি। নারীদের জন্য জুডিশিয়াল সার্ভিসে যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথমেই আমরা পুরুষদের থেকে তিন বছর পিছিয়ে যাই। দেশের বিচার বিভাগের যাত্রা শুরুর তিন বছর পরে নারীদের যাত্রার পরও আজকে নারীদের অবস্থান কোথায় সেটা দেখতে হবে। আমি নারী বিচারক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছি ১৯৮১ সালে। প্রথম এসেছিলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, দ্বিতীয় যাত্রা শুরু করেছিলেন বিচারপতি জিনাত আরা। আর তৃতীয় হিসেবে যুক্ত হই আমি। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, আমরা তিনজনই আপিল বিভাগ থেকে অবসরে গিয়েছি। এটা ভাবতে ভালো লাগে।
নারী হিসেবে বিচারিক জীবনের তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। তবে নারী বিচারকদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়, তাদের সাংসারিক জীবন নিয়ে। কেননা, এটা বদলির চাকরি। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বদলির কারণে সংসারটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটা অনেক কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা তো ছিলই।
দৈনিক বাংলা: সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক হবেন এমন স্বপ্ন কি বিচারিক জীবনের শুরুতে কখনো দেখেছিলেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: না, এমনটি কখনোই ভাবিনি। এমনকি হাইকোর্টেও থাকাকালীন ভাবিনি যে আমি আপিল বিভাগে যাব। স্বপ্নও ছিল না। তবে আমার স্বপ্ন ছিল আমি জজ হব।
দৈনিক বাংলা: অনেক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীরাই এখন প্রায় বেঁচে নেই, আপনি কি মনে করেন এখন নতুন যারা আসছেন, তারা সেই খ্যাতিম্যান আইনজীবীদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে উঠছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: দেখেন এটা শুধু আইনজীবীদের মধ্যে নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। সবখানেই অবক্ষয়। ধরেন আমার বাবা যে পরিমাণ লেখাপড়া করে জ্ঞান অর্জন করেছেন আমি তো মনি করি না, আমার সেটুকু আছে। কিন্তু আমি আশাবাদী নতুন প্রজন্ম থেকে অনেক ট্যালেন্ট উঠে আসছে, আসবে। একসময় নামকরা আইনজীবীরা ছিলেন। তারপর তাদের উত্তরসূরিরা এসেছেন। ঠিক এমনি করেই নতুনরা আইনজীবী হয়ে উঠবেন। এখন যারা নবীন আইনজীবী তাদের জন্য একজন ভালো আইনজীবী হিসেবে গড়ে ওঠার এটা মোক্ষম সময়। তার কারণ জায়গাটা এখন অনেক খালি, সবকিছু প্রস্তুত হয়ে আছে, এখন দরকার শুধু অধ্যবসায়ের।
দৈনিক বাংলা: আপনার অবসর জীবনের শেষ দিনে বলেছিলেন, বিচারক নিজেকে স্বাধীন মনে না করলে সুবিচার সম্ভব না। এর মানে আপনি কী বুঝিয়েছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এই বাক্যটি আমি শুধু কথার কথা হিসেবে বলিনি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেই বলেছি। এখনো বিশ্বাস করি, একজন বিচারক নিজেকে যদি স্বাধীন মনে না করেন, তাহলে কাগজে-কলমে স্বাধীনতা দিয়েই কী লাভ। একজন বিচারক নিজের বিবেককে প্রশ্ন করবেন তিনি নিজে স্বাধীন কি না। কাগজে-কলমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে মাত্র কিছু বছর আগে। তার আগে আমরা বিচারকরা তো নিজেদের পরাধীন মনে করিনি, বিচারের কাজটি কিন্তু স্বাধীনভাবেই করেছি।
আমি মনে করি, একজন বিচারক মনেপ্রাণে নিজেকে স্বাধীন মনে করেন কি না, সেটাই বড় কথা। আমি জোর গলায়, দ্ব্যর্থহীনভাবে বলি ৪১ বছরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন পদে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এই সময়ে তো আমার কাছে কোনো তদবির আসেনি। নিজেকেই সেই জায়গা তৈরি করে নিতে হবে। আমি যখন বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি, তখন অনেক জুনিয়র বিচারক বলতেন তদবির আসে। আমি তখন তাদের বলেছি, কই আমার কাছে তো কোনো তদবির আসে না। তদবির যাতে না আসে সেই পরিবেশ আপনার নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে। বিচারকের স্বাধীনতার বিষয়টি নিজের সততা দিয়ে তৈরি করে নিতে হয়।
তদবির না শুনে একবার এক ব্যক্তিকে জামিন দিইনি বলে সেই সময় আমাকে মেহেরপুরের জেলা জজ থেকেও বদলি করা হয়েছিল। জেলা জজ থেকে সাড়ে চার বছর আমাকে কর্নার করে রাখা হয়েছিল। দুটি জেলার জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর স্পেশাল জজ করে রাখা হয়েছিল। আমি তো তখনো ভয় পাইনি। আমার কথা হলো, নিজেকে স্বাধীন রাখতে হলে বদলির ভয় করলে চলবে না। কী আর করবে বাংলাদেশের ভেতরেই তো বদলি করবে, আর তো কিছু না। বিচারক যদি বদলির ভয় বা নিজের লাভ-ক্ষতির চিন্তা করেন তাহলে তিনি স্বাধীন বিচারক হিসেবে কীভাবে কাজ করবেন। করতে পারবেন না। বিচারককে তার নিজের সততার ওপর শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। এখন কিন্তু দেওয়ানি মামলায় আপস করার সুযোগ আছে। লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলা আপসের সুযোগ আছে। এখন যদি এটা ভালোভাবে কার্যকর হয়, তাহলে ৫০ শতাংশ মামলাই আসবে না। এটা যদি সফল করা যায়, তাহলে মামলার জট অনেক কমে আসবে।
দৈনিক বাংলা: একটি মামলা শেষ করতে বছরের পর বছর লাগে কেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: মামলা শেষ করতে পক্ষগণেরই জোরালো পদক্ষেপের প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক সময় কোনো না কোনো পক্ষই চায় না, দ্রুত মামলা শেষ হোক। মামলার জট সৃষ্টির পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর জন্য শুধু বিচারকরা দায়ী তা বলা যাবে না বরং বাদী-বিবাদী, দুই পক্ষের আইনজীবীদেরও দায় রয়েছে। একটি মামলার নিষ্পত্তির জন্য কম করে হলেও পাঁচটি পক্ষের সমন্বয় দরকার পড়ে, তবেই মামলার নিষ্পত্তি ঘটে।
এ ছাড়া বিচারকসংকট রয়েছে বড় আকারে। এত বিশাল মামলার জট দ্রুত কমাতে হলে বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। যেটা সরকারের পক্ষে সম্ভব না।
দৈনিক বাংলা: বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ছোটখাটো যেকোনো বিষয়েই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, কেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এখন কিন্তু পত্রিকা খুললেই দেখা যায় হাইকোর্টের বিভিন্ন সংবাদ বা নির্দেশনা নিয়ে খবর ছাপানো হয়েছে। চোখ মেললেই কোর্ট-কাচারির খবর পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ায় ভুক্তভোগীকে হাইকোর্টে আসতে হচ্ছে। এটার একটা ভালো দিক আছে, মানুষ আদালতে এলে প্রতিকার পায়। আবার কিছু সময় দেখি একটা সাধারণ বিষয় নিয়েও মানুষকে হাইকোর্টে আসতে হয়। স্থানীয় প্রশাসন যদি সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করে তাহলে কিন্তু আদালতের ওপর এই চাপ আসে না। তারা সেটি করছে না। অনেক সময় আদালতের নির্দেশের পরও অনেক কিছু বাস্তবায়ন করা হয় না। এটা ভালো দিক না।
দৈনিক বাংলা: বিচার বিভাগকে কি আরও শক্তিশালী হতে হবে, নাকি শক্তিশালীই আছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: বিচার বিভাগকে কেউ শক্তিশালী করে দেবে না। বিচার বিভাগকে নিজেকেই শক্তিশালী হতে হবে। একটা আদেশ হওয়ার পর ঝড়ঝাপটা আসতে পারে। সেটা বহন করার মতো বিচারক যদি আমরা হতে পারি তাহলে বিচার বিভাগ শক্তিশালী হবে। বিচারক যদি সেই ঝড়ঝাপটা সইবার ক্ষমতা না রাখেন তাহলে সেটা হবে না।
দৈনিক বাংলা: বার ও বেঞ্চের সম্পর্ককে বলা হয় একটি পাখির দুটি ডানা। সম্প্রতি বিভিন্ন বারে আইনজীবী ও বিচারকদের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে, এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: সর্বজনীনভাবে আমি বলব, সাবলীল সম্পর্ক হ্রাস পেয়েছে। অনেক আগে থেকেই এই সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। অনেক সময় বিচারকের দরজায় লাথি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সার্বিকভাবে বলব আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে সম্পর্ক অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। আমার বক্তব্য হলো, একজন বিচারক যেহেতু একটু ওপরে বসেন, আইনজীবীরা একটু নিচে দাঁড়ান, এই যে বিচারকরা একটু অগ্রাধিকার স্থানে থাকেন সে জন্য বিচারকদের অনেক কিছু করা যায়, অনেক কিছু করা যায় না। সেটি তাদের মাথায় থাকতে হবে। এ ছাড়া আইনজীবীদেরও সহিষ্ণু হতে হবে। দুপক্ষই যদি সহিষ্ণু হয় তাহলে কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরবে না।
আদালতের মর্যাদা কমলে কিন্তু আইনজীবীদেরই মর্যাদা কমবে। এটা তাদের বুঝতে হবে। কোনো বিচারকের ভুল হলে আইনজীবীরা তার ওপরের বিচারককে বলতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট আছে, আইন মন্ত্রণালয় আছে। সেখানে বলার সুযোগ আছে। কিন্তু তাই বলে স্লোগান দেয়া উচিত না। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
দৈনিক বাংলা: দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক জীবনে পূরণীয় ঘটনা বা অপ্রাপ্তি বলে কিছু আছে কি না?
কৃষ্ণা দেবনাথ: মানিকগঞ্জে একটি অ্যাসিড নিক্ষেপ মামলায় আসামিকে সাজা দিতে পারিনি, এই একটি বিষয় আমার মনে এখনো গেঁথে আছে। আইনজীবীর ভুলের কারণে সেই আসামিকে সাজা দিতে পারিনি। যে কারণে খুব কষ্ট লেগেছিল। কারণ মামলায় আসামি শনাক্ত একটা বড় ব্যাপার। মামলায় বলা হয়েছে, চাঁদের আলোতে আসামিকে দেখা গেছে। কিন্তু পঞ্জিকাতে দেখা গেল সেদিন অমাবস্যা ছিল। তার ওপর আবার সেদিন ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। আইনজীবী মামলা শক্ত করতে গিয়ে চাঁদের আলোতে দেখেছে বলে বিবরণ দিয়েছেন কিন্তু সেদিন সেটা ছিল না। যে কারণে আসামি শনাক্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরঞ্জিত বিবরণ মূল ঘটনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ ছেলেটি মেয়েটিকে স্কুলে যাওয়ার সময় উত্ত্যক্ত করত, সেটি উল্লেখ থাকলেও হতো। অতিরঞ্জিত করার কারণে আসামি বেঁচে যায়। এই ঘটনা আমাকে পীড়া দেয়। তার কারণ চোখের সামনে দেখেছিলাম মেয়েটির ঝলসানো মুখ। কিন্তু তার ন্যায়বিচার আমি দিতে পারিনি।
দৈনিক বাংলা: দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক জীবনে আপনি কতজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এটা বলতে পারব না। তার কারণ, আমি গুনে রাখিনি। তবে সর্বোচ্চ সাজা দেয়ার ব্যাপারে আমি অনেক সতর্ক ছিলাম। আমি দুইয়ে দুইয়ে চার না হওয়া পর্যন্ত কাউকে সাজা দিইনি। অনেক আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েও আমি স্বস্তি পেয়েছি। তার কারণ অকাট্য দলিল-প্রমাণ ছিল। সব থেকে বড় স্বস্তি পেয়েছি, যখন আমি ঢাকার জেলা জজ ছিলাম। বঙ্গবন্ধু হত্যার ফাঁসির আসামিদের সাজা কার্যকর হবে। তখন ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার জন্য শেষ যে স্বাক্ষর দিতে হয়, জেলা জজ হিসেবে সেটা আমি দিয়েছিলাম। ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমার কাছে লাল নথি এল, আমি তাতে স্বাক্ষর করলাম। এরপরই টিভিতে দেখলাম কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকর শুরু করেছে। ঐতিহাসিক সেই মামলাটিতে শেষ স্বাক্ষর করেছিলাম। এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
দৈনিক বাংলা: অবসরে কেমন কাটছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: অবসরে একদমই অবসর নেই। আমি রুট (প্রান্তিক) লেভেলের ভিকটিমদের নিয়ে কাজ করতে চাই। সেটাই শুরু করেছি। দেখা যাক কতটা করতে পারি।
দৈনিক বাংলা: ধন্যবাদ আপনাকে।
কৃষ্ণা দেবনাথ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
আগামী অর্থবছর থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ বাড়িয়ে ৬২ লাখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ প্রবীণ ব্যক্তি আগের ৬৫০ টাকার পরিবর্তে মাসে ৭০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। পাশাপাশি, ৯০ বছরের বেশি বয়সি ২ দশমিক ৫ লাখ ব্যক্তি মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের ভাতা কর্মসূচিতে ২৯ লাখ উপকারভোগীর মধ্যে ২৮ দশমিক ৭৫ লাখ নারী আগের ৬৫০ টাকার পরিবর্তে মাসে ৭০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। এছাড়া, ৯০ বছরের বেশি বয়সী ২৫ হাজার বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারী মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় ৩৬ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ জন মাসে ৯০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। বাকি ১৮ হাজার ১০০ জন মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক উপবৃত্তি ও মেধা উপবৃত্তির পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে ৯৫০ টাকা, মাধ্যমিকে ১ হাজার টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকে ১ হাজার ১০০ টাকা এবং উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ৫০ টাকা বেশি।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৭ হাজার বাড়িয়ে মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৯ জন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় উপবৃত্তি ও মেধা উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ হাজার ১৯৮ জন বাড়িয়ে মোট ৪৫ হাজার ৩৩৮ জন করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক পর্যায়ে মাসে ৭০০ টাকা, মাধ্যমিকে ৮০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকে ১ হাজার টাকা এবং উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ১ হাজার ২০০ টাকা করে উপবৃত্তি বা মেধা উপবৃত্তি পাবেন।
পাশাপাশি, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ৫ হাজার ৪৯০ জনকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকজনিত পক্ষাঘাত, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ৫ হাজার বাড়িয়ে মোট ৬৫ হাজার করা হয়েছে। একইসঙ্গে এককালীন চিকিৎসা সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার বাড়িয়ে মোট ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ জন করা হয়েছে। এই কর্মসূচিতে প্রত্যেক মা মাসে ৮৫০ টাকা করে ভাতা পান।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা ৫ লাখ বাড়িয়ে মোট ৬০ লাখ পরিবার করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবার ছয় মাস ধরে খাদ্য সহায়তা পায়, যেখানে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল ১৫ টাকা কেজি দরে সরবরাহ করা হয়।
গত রোববার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি–সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৩২তম বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে আরও সুপারিশ করা হয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য মাসিক সম্মানী চালু করা এবং তাদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভিজিএফ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার।
এ ছাড়া ২০২৬–২৭ অর্থবছরে নতুন করে আরও ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন জেলেকে অন্তর্ভুক্ত করে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় মোট জেলের সংখ্যা ১৫ লাখে উন্নীত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সামরিক শিল্পাঞ্চল গড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাতিল হওয়া ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জায়গায় এই শিল্পাঞ্চল স্থাপন করা হবে। সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
সভা শেষে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় আনোয়ারায় ফ্রি ট্রেড জোন, কুষ্টিয়া সুগারমিলে হবে ইকোনোমিক জোন, পৌর সভার ভেতরেও হবে ইকোনোমিক জোনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয় হয়েছে। এছাড়াও জাপানের সঙ্গে এফটিএ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বেজা ছাড়াও একই এইদিন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিডার গভর্নিং বোর্ডের সভায় প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে (এফডিআই) রেমিট্যান্সের মতই প্রবাসিদের পাবে ১.২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চীনসব অন্যান্য দেশে বিডার এজেন্সি অফিস করা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত দেশের ছয় প্রতিষ্ঠানকে একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলন আশিক চৌধুরী জানান, মিরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এনএসইজেড) প্রায় ৮৫০ একর জমিকে ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ হিসেবে বেজার মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আশিক চৌধুরী বলেন, ‘ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলকে জি-টু-জি কাঠামো থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গাটিই এখন প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিজের আদলে একাধিক রাষ্ট্রীয় কারখানা গড়ে তোলা নয়। বরং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে প্রযুক্তি বিনিময় ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পে সক্ষমতা তৈরি করাই মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সুযোগও রাখা হবে।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্রের চেয়ে গোলাবারুদ ও মৌলিক সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতিই বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এতে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আশিক চৌধুরী জানান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। একসঙ্গে পুরো ৮৫০ একর জমিতে কার্যক্রম শুরু করা হবে না। আগামী পাঁচ বছরে সীমিত পরিসরে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
সম্ভাব্য অংশীদার দেশ বা নির্দিষ্ট পণ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি কূটনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় হওয়ায় এখনই বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও প্রকল্পটি চলমান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আশিক চৌধুরী আরও জানান, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) গঠনের নীতিগত অনুমোদনও দিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমিতে এ জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্রি ট্রেড জোন কার্যত ‘ওভারসিজ টেরিটরি’ হিসেবে পরিচালিত হবে, যেখানে কাস্টমস বাধ্যবাধকতা ছাড়াই পণ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন ও পুনঃরপ্তানি করা যাবে। এতে বাংলাদেশের ‘টাইম টু মার্কেট’ সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
দুবাইয়ের জেবেল আলি ফ্রি জোনের মডেল অনুসরণ করে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে এটি দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা সংশোধনের জন্য শিগগিরই বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সংবেদনশীল সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সোমবার সেনা সদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে— এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী।’
প্রধান উপদেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার বঞ্চিত একটি জাতি ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিজের দেশের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে এই নির্বাচনে ভোটদান হবে তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমে মানুষ যেমন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে তার মতামত ব্যক্ত করবে, তেমনি সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। তাই এই নির্বাচনের গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে যে তরুণদের একটি বিরাট অংশ এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছে। এ ছাড়া বড়দের মধ্যেও অনেকে দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত ছিলেন। এরকম একটি পরিস্থিতিতে সকল ভোটারদের জন্য একটি শংকামুক্ত ও উৎসবমুখর ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের সকলের দায়িত্ব রয়েছে। দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় আমি মনে করি এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সক্ষম, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এই গুরুদায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে সর্বোচ্চ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি আশাবাদী।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে, কোনো প্রভাব ব্যতীত নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চভাবে সহায়তা প্রদান করতে হবে।’
নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে সকল সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল। সামান্য বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তরুণ ও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত নাগরিকদের অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তাই ভয়মুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।’
প্রধান উপদেষ্টা একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনকালে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। আমরা অত্যন্ত অল্প সময়ে এই পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন সূচনা করেছি। দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে বর্তমান সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার উন্নয়ন এবং যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি প্রধান অগ্রাধিকার।’
প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি তৈরির কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলমান আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নেদারল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ইতালি, জাপান, থাইল্যান্ডসহ আরো কয়েকটি দেশের সঙ্গে অনুরূপ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব সমঝোতা স্মারক সম্পাদিত হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।’
সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
সেনা সদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণের মতবিনিময় সভার অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টাকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস এম কামরুল হাসান, অভ্যর্থনা জানান।
মতবিনিময় সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাগণ এবং সংশ্লিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যে রাজধানীর চাঁনখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সর্বোচ্চ সাজার আদেশ পাওয়া বাকি দুজন হলেন- ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
এ মামলার আট আসামির মধ্যে রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ৬ বছরের কারাদণ্ড; শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আরশাদ হোসেনকে ৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ওই থানার তিন পুলিশ কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলামকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ সোমবার এ রায় ঘোষণা করে।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
গ্রেপ্তার চার আসামি আরশাদ, সুজন, ইমন ও নাসিরুলকে রায়ের সময় আদালতে হাজির করা হয়। বাকি চার আসামিকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচার কাজ চলে।
বেলা ১১টা ২৭ মিনিটে গ্রেপ্তার চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। ১১টা ৪৭ মিনিটে বিচারকরা এজলাসে ওঠেন এবং ১১টা ৫০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায় পড়া শুরু করেন।
রায় ঘোষণার সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিমসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। আসামিদের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. আবুল হোসেন, সিফাত হোসেন ও সাদ্দাম হোসেন অভি।
প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরীর চানখাঁরপুল এলাকায় বাংলাদেশের মুক্তিকামী ছাত্রজনতা যখন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল, সেই সময়ে পুলিশ সেই জায়গায় নির্বিচার গুলি করে ৬ জনকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে শাহরিয়ার খান আনাস, জুনায়েদসহ ৬ জন রয়েছেন। এ ঘটনার মামলা হয়েছিল। কমান্ড রেসপন্সিবিলিটিতে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনের শাস্তি হয়েছে আগে। বাকি অংশে যারা গ্রাউন্ডে কাজ করেছিল তাদের বিচারের জন্য আজকে এই মামলাটি ছিল। সেই মামলাতে আদালত বলেছেন, এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হয়েছে। তারা ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি করেছেন, সেটা প্রমাণিত হয়েছে।
তাজুল বলেন, এসি ইমরুল, ইন্সপেক্টর আরশাদ এবং বাকি তিনজন কনস্টেবল, যারা সরাসরি ফিল্ডে থেকে গুলিবর্ষণ করেছিল, যাদের গুলি বর্ষণ করতে ভিডিওতে দেখা গেছে, যাদের নামে অস্ত্র ইস্যু ছিল না, অথচ তারা অন্যদের রাইফেল নিয়ে গুলি করেছে—তাদেরকে কম সাজা দেওয়া হয়েছে। একজনকে ৬ বছর, একজন ৪ বছর, বাকি তিনজন কনস্টেবলকে ৩ বছর করে সাজা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আদালতে যখন তাদের অফেন্স প্রমাণিত হয়েছে, ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি প্রমাণিত হয়েছে, ওয়াইড স্প্রেড এবং সিস্টেমেটিক অ্যাটাক প্রমাণিত হয়েছে এবং এই আসামিরা তারা প্রকাশ্যে গুলি করেছিল সেটা প্রমাণিত হয়েছে। তাদেরকে যে সাজা দেওয়া হয়েছে, আমরা মনে করি এটা ন্যায়সঙ্গত হয়নি। যদিও আদালতের আদেশ সকলের ওপরেই শিরোধার্য, আমাদেরকে মানতে হবে। যেহেতু একটা আপিলেট ফোরাম আছে, সুপ্রিম কোর্টে এটার বিরুদ্ধে, এই সাজার বিরুদ্ধে, কম সাজা যেটা দেওয়া হয়েছে, সেই অংশটুকুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমরা আপিল করব। পুরো রায় পাওয়ার পরে আরও পর্যালোচনা করে প্রসিকিউশন সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।
প্রধান প্রসিকিউটর বলেন, যারা সরাসরি গুলিবর্ষণ করেছে, তাদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরে সাজা অল্প হওয়াটা, এটা ন্যায়বিচারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে আমরা মনে করছি। সে কারণে আমরা মনে করছি যে এটা আপিল করা প্রয়োজন। কিন্তু বাকি তিনজনকে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেটা যথার্থ হয়েছে বলে মনে করি এবং আগেও শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেটাও যথার্থ বলে আমরা মনে করেছি।
যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়নি তাদের মৃত্যুদণ্ড চাইবেন কিনা প্রশ্ন করা হলে তাজুল বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকে মৃত্যুদণ্ডই চাইব। কারণ হচ্ছে যে, এই অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত ছিল, এটা কোনো সাধারণ মার্ডার নয়। আমরা বারবার যেটা বলার চেষ্টা করছি যে, মার্ডারের ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হবে কার গুলিতে কে মারা গেছে। কিন্তু ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটিতে হাজার হাজার রাউন্ড বুলেট নিক্ষিপ্ত হয়েছে। শত শত হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। হাজারও মানুষ শহীদ হয়েছে, ১৪০০ শহীদ হয়েছে।
‘সেখানে কার গুলিতে কে মারা গিয়েছে সেটা প্রমাণ করা ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটির ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই। এবং সেটা প্রমাণিত না হওয়ার কারণে কেউ সাজার থেকে রেহাই পেতে পারে না—এটা হচ্ছে আইনের বিধান, ইন্টারন্যাশনালি রিকগনাইজড প্রিন্সিপাল। সুতরাং সেই জায়গায় সেন্টেন্সিংয়ের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, সেটাকে আমরা মনে করছি এটা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের সাথে যাচ্ছে না। সে কারণেই আমরা আপিল করব।
সুজন হোসেনের গুলি করার দৃশ্য দেখা যাওয়ার বিষয়ে তাজুল বলেন, আদালত বলেছেন, সে গুলি করেছে, সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে, উল্লাস করেছে—সবকিছুই কিন্তু আদালত বলেছেন যেটা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পেরেছে। এই ব্যাপারে কিন্তু অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি নেই।
প্রসিকিউশন সাকসেসফুলি এই আসামিদের ইনভলভমেন্ট, তারা কে কী করেছে সবকিছু প্রমাণ করতে পেরেছে। কিন্তু আদালত যেটা বলেছেন, এরা কনস্টেবল ছিল, তাদের সুপিরিয়ররা তাদেরকে কমান্ড করেছে, তারা করতে বাধ্য হয়েছে এবং সুজনের ব্যাপারে বলেছে সে অল্প কিছুদিন আগে এসেছে—এইসব বিবেচনায় তাকে কম শাস্তি দিয়েছে।
তাজুল বলেন, আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, অনেকেই সেখানে গুলি চালিয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয় নাই। এটি পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ওইদিন চানখাঁরপুলে ৪০ জন পুলিশ মোতায়েন ছিল।
অবজারভেশন যেটা আছে আমরা দেখে বলব। কারণ হাজার হাজার পুলিশ ছিল, সবার বিরুদ্ধেই তো আর মামলা করা যাবে না। ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটিতে আমরা দেখেছি যে সবচেয়ে যারা বেশি এট্রোসাস কাজ করেছে, যারা কমান্ড দিয়েছে, অনেকে নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে ছিল। তারা হয়ত এই গ্রুপের মেম্বার ছিল, কিন্তু সবাইকে মামলায় আসামি করাটা হয়তো যুক্তিসঙ্গত না, এটা মনে করেছে প্রসিকিউশন। শুধুমাত্র যারা সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধেই ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছিল, তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছিল।
এ ট্রাইব্যুনালেই গত ২০ জানুয়ারি মামলার রায় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রায় প্রস্তুত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান রায়ের জন্য ২৬ জানুয়ারি নতুন তারিখ ঠিক করে দেন।
পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় রায় এটি। রায়ের পুরো কর্যক্রম বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর প্রথম রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের দিন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট চাঁনখারপুল এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। তাতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন; আহত হন অনেকে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে তা দাখিল করেন।
অভিযোগ আমলে নিয়ে সেদিন ট্রাইব্যুনাল হাবিবুর রহমানসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চানখাঁরপুল এলাকায় আসামিরা নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করে।
তদন্ত সংস্থা এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তদন্ত প্রতিবেদনটি ৯০ পৃষ্ঠার। প্রতিবেদনে ৭৯ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া ১৯টি ভিডিও, পত্রিকার ১১টি রিপোর্ট, ২টি অডিও, বই ও রিপোর্ট ১১টি এবং ৬টি ডেথ সার্টিফিকেট সংযুক্ত করা হয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচন করার পর ধরা পড়লে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানের মাছউদ। দেশীয় পর্যায়ে পোস্টাল ব্যালটের পরিবর্তন কোনো দলের চাপে আনা হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি আগামীতে ঋণখেলাপিদের গ্যারান্টাররা নির্বাচনে যাতে অংশ নিতে না পারে সে সুপারিশও জানানো হবে বলে জানান তিনি।
সোমবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি তথ্য জানান।
ইসি মাছউদ বলেন, ভোটের স্বচ্ছতার প্রশ্নে ইসি আপস করবে না। এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশ বজায় আছে। রাজনৈতিক কোনো চাপ অনুভব করছে না ইসি।
সুষ্ঠু এবং সুন্দর পরিবেশে ভালো ভোট হবে আশা প্রকাশ করে ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহবান জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এসেছে।
জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তাদের নিবন্ধন বহাল রয়েছে। আইন অনুযায়ী তারা ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারবে। সব প্রার্থীর জন্য আমরা সমান সুযোগ তৈরি করছি।
ঋণখেলাপিদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরাসরি ঋণ খেলাপিদের প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে গ্যারান্টারদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী বৈধতা দেওয়া হয়েছে। আদালত যাদের বৈধ ঘোষণা করেছে, নির্বাচন কমিশন আপাতত তাদের বৈধ হিসেবেই গ্রহণ করছে। তবে নির্বাচনের পর কারও অযোগ্যতা প্রমাণিত হলে নির্বাচন কমিশন স্বপ্রণোদিতভাবে বা অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এদিকে, এদিন ইসিতে নারী কর্মীদের প্রচারের সময় হামলার অভিযোগ জানিয়েছে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসান মাহবুব জুবায়ের জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নিয়েও তার অভিযোগ জানিয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হলে সড়ক পরিবহন আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিধান রয়েছে। এত দিন এই ক্ষতিপূরণের জন্য দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে ম্যানুয়ালি আবেদন করতে হতো। সোমবার থেকে সেই আবেদনপ্রক্রিয়া চালু হয়েছে অনলাইনে। বিআরটিএর সার্ভিস পোর্টাল (বিএসপি) ব্যবহার করে এখন থেকে অনলাইনে ক্ষতিপূরণের আবেদন করা যাবে। তবে আগের মতোই আবেদন করতে হবে দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে।
বনানীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রধান কার্যালয়ে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আবেদনপ্রক্রিয়া অনলাইনে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমদ।
বিআরটিএ জানিয়েছে, অনলাইনে আবেদন করতে হলে প্রথমে বিআরটিএ’র সার্ভিস পোর্টাল (বিএসপি)-এ লগইন করতে হবে। এরপর ‘আর্থিক সহায়তা তহবিল’ অপশনে গিয়ে নির্ধারিত আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। ফরম পূরণ শেষে আবেদনকারী একটি একনলেজমেন্ট স্লিপ পাবেন। পরে আবেদনটি যাচাইবাছাইয়ের জন্য পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠানো হবে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিআরটিএ’র পরিচালক (অডিট ও আইন) ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যসচিব রুবাইয়াৎ-ই-আশিক বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের জন্য যেসব আবেদন আসে, সেসবের বড় একটি অংশে ফরম সঠিকভাবে পূরণ করা হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন করা হয় না। ফলে অনেকেই আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। আজ থেকে অনলাইনে আবেদনপ্রক্রিয়া চালু হলো। যেহেতু নতুন উদ্যোগ, শুরুতে কিছু ত্রুটি থাকতে পারে, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো ঠিক হয়ে যাবে।’
সড়ক পরিবহন আইনের আওতায় দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবার পায় ৫ লাখ টাকা এবং আহত ব্যক্তি পান ৩ লাখ টাকা। তবে এই ক্ষতিপূরণ পেতে দুর্ঘটনার এক মাসের (৩০ দিনের) মধ্যে আবেদন করা বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময় পার হলে আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে আইনে উল্লেখ রয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ আবেদনপ্রক্রিয়া সহজ করতেই অনলাইনে আবেদন চালু করা হয়েছে। এই কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলবে। ক্ষতিগ্রস্তরা যেন বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যেই প্রক্রিয়াটি সহজ করা হচ্ছে। বর্তমানে আবেদন করার সময়সীমা ৩০ দিন রয়েছে। এটি বাড়ানোর জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিধিমালা সংশোধন হলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া আরও সহজ হবে।’
উল্লেখ্য, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৩ সালের ১৯ অক্টোবর। বিআরটিএ’র তথ্যমতে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১১৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে ২ হাজার ৬৪১টি চেক বিতরণ করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে। এর মধ্যে নিহত ২ হাজার ১৯৫ জন, আহত ৩১৬ জন এবং গুরুতর আহত ১৩০ জনের পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিআরটিএ’র পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. জাকির হোসেন, পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং ও রোড সেফটি) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, পরিচালক (অপারেশন) মীর আহমেদ তারিকুলসহ সংস্থাটির অন্য কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশিদের জন্য মার্কিন ভিসা নিয়ে নতুন তথ্য জানিয়েছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস। অভিবাসন ভিসা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার পর যুক্তরাষ্ট্র এবার জানিয়েছে, ‘ভিসা বন্ড’ পাইলট প্রোগ্রামের আওতায় সর্বোচ্চ তিন মাস মেয়াদি সিঙ্গেল এন্ট্রি (একবার প্রবেশযোগ্য) ভিসা দেওয়া হবে।
সোমবার ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এক বার্তায় ‘ভিসা বন্ড’ পাইলট প্রোগ্রাম কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে।
এর আগে বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন ভিসা স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। পরে গত ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভিসা বন্ড’ তালিকায় যুক্ত করা হয়। বাংলাদেশিদের জন্য এই ভিসা বন্ড কার্যকর হয়েছে ২১ জানুয়ারি থেকে।
ঢাকার মার্কিন দূতাবাস জানায়, ভিসা বন্ড প্রোগ্রামের আওতায় আবেদনকারীদের জন্য যেসব শর্ত প্রযোজ্য হবে, সেগুলো হলো—
ভিসার জন্য অনুমোদন পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে ভিসা বন্ড পরিশোধ করতে হবে
ভিসা ইন্টারভিউয়ের পর যোগ্য বিবেচিত হলে কনসুলার কর্মকর্তা pay.gov–এর সরাসরি লিংকসহ পরিশোধের নির্দেশনা দেবেন
সর্বোচ্চ ৩ মাস মেয়াদি সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা দেওয়া হবে
নির্ধারিত কিছু পোর্ট অব এন্ট্রি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে
যুক্তরাষ্ট্রে কাজ না করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে এলে বন্ডের অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দেওয়া হবে
ভিসা বন্ড তালিকায় বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ায়, বাংলাদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জামানত (ভিসা বন্ড) জমা দিতে হতে পারে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, এই পাইলট প্রোগ্রামের মূল উদ্দেশ্য হলো ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যারা অবৈধভাবে থেকে যান (ওভারস্টে), তাদের নিরুৎসাহিত করা। যেসব দেশের নাগরিকদের ওভারস্টের হার বেশি, মূলত সেসব দেশকেই এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভিসা বন্ড প্রদানকারী বাংলাদেশি যাত্রীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে তিনটি নির্দিষ্ট বিমানবন্দর নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো—
বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (BOS)
জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (JFK)
ওয়াশিংটন ডুলস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (IAD)
নির্ধারিত এসব বিমানবন্দর ছাড়া অন্য কোনো পথে প্রবেশ বা প্রস্থান করলে ভিসা বন্ডের শর্ত ভঙ্গ হয়েছে বলে গণ্য হতে পারে, যা অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করবে।
বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড তালিকায় রয়েছে— আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ভুটান, কিউবা, জিবুতি, ফিজি, নাইজেরিয়া, নেপাল ও উগান্ডা। দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন তারিখ থেকে এই নিয়ম কার্যকর হচ্ছে।
ভিসা বন্ড হলো একটি ফেরতযোগ্য আর্থিক জামানত, যা কিছু দেশ নির্দিষ্ট বিদেশি নাগরিকদের সাময়িক ভিসা দেওয়ার আগে গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে ভিসার শর্ত, বিশেষ করে থাকার সময়সীমা মেনে চলা নিশ্চিত করা হয়।
প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র হাজারো বিদেশি শিক্ষার্থী, পর্যটক ও কর্মীকে নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দেয়। অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় অবস্থান করলে সেটিকে ভিসা ওভারস্টে বলা হয়।
উল্লেখ্য, অতীতে নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যও ওভারস্টে নিয়ন্ত্রণে ভিসা বন্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল, তবে পরে তা বাতিল করা হয়।
ভারতের আদানি পাওয়ারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশকে বাজারমূল্যের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি দাম দিতে হচ্ছে বলে সরকারের গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে, ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে সরবরাহ করা এই বিদ্যুতের দাম নিকটতম বেসরকারি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি ধরা হয়েছে। ন্যাশনাল রিভিউ কমিটি (এনআরসি) তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে যে, এই প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির হার ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির অন্যান্য চুক্তির তুলনায় সর্বোচ্চ। কমিটির মতে, এ ধরনের চরম মূল্য বৈষম্য মূলত ‘চুক্তির নির্দিষ্ট কিছু শর্তের ফল’ এবং পুরো চুক্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে ‘গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ’ পাওয়া গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ যে হারে মূল্য পরিশোধ করছে, তা বাস্তবসম্মত দামের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ আমদানির এই চুক্তিতে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি লঙ্ঘনের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে এনআরসি। সাধারণত স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ দেশের করপোরেট কর নিজেরাই বহন করার নিয়ম থাকলেও আদানির ক্ষেত্রে সেই দায় বাংলাদেশের ওপর চাপানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানি পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্টে প্রচলিত এই রীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভারতীয় করপোরেট করের উপাদানটি বাংলাদেশে চার্জ করা হয়েছে, যা এই চুক্তির অত্যন্ত বিতর্কিত একটি দিক। এছাড়া বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের ১০ শতাংশের বেশি জোগান দেওয়া এই কেন্দ্রটি ‘অতিরিক্ত দামে’ কয়লা ব্যবহার করছে বলেও কমিটি তাদের পর্যালোচনায় জানিয়েছে।
বিদ্যমান এই সংকট নিরসনে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো পুনরায় পর্যালোচনার সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে ‘সবচেয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিকর শর্তগুলো পুনরায় আলোচনার সুযোগ’ খুঁজে বের করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, আদানি পাওয়ার এই প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দাবি করেছে যে, কমিটি তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করেনি কিংবা প্রতিবেদনের কোনো অনুলিপিও প্রদান করেনি। তবে বড় অংকের বকেয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কোম্পানিটি জানিয়েছে যে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে। বকেয়া পরিশোধের তাগিদ দিয়ে তারা বলেছে, ‘আমাদের কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে। তাই আমরা বাংলাদেশ সরকারকে দ্রুত আমাদের বকেয়া পরিশোধের আহ্বান জানাচ্ছি।’ গত ২০ জানুয়ারি প্রস্তুতকৃত এনআরসি-র এই শ্বেতপত্রটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি।
দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধার এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনসাফ মঞ্চ’। সোমবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই নতুন মঞ্চের ঘোষণা দেন এই প্লাটফর্মের আহ্বায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল।
সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশ এক গভীর ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে, যেখানে জনগণের সার্বভৌমত্ব, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও মৌলিক অধিকার নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এমতাবস্থায় হারানো অধিকার ফিরিয়ে আনা ও জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যেই মূলত ইনসাফ মঞ্চ গঠিত হয়েছে।
এই প্ল্যাটফর্মের প্রধান লক্ষ্য হলো— ‘ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, মৌলিক মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সম্মানজনক কর্মসংস্থান এবং ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তোলা।’ ইনসাফ মঞ্চ স্পষ্ট করেছে যে তারা কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক জোটের বিকল্প হতে চায় না, বরং বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এবং নৈতিক রাজনীতি ও ভোটাধিকার রক্ষায় এটি একটি স্বতন্ত্র ও নির্বাচনকালীন ঐক্য হিসেবে সক্রিয় থাকবে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটকে সামনে রেখে নিবন্ধিত দল, স্বতন্ত্র প্রার্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তির সমন্বয়ে এই মঞ্চের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। মঞ্চের নেতৃবৃন্দের মতে, ‘নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি সাংবিধানিক মাধ্যম।’
একটি সুশৃঙ্খল ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত এই মঞ্চের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও নৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকবেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শামীম কামাল। সৎ ও দেশপ্রেমিক প্রার্থী উপস্থাপন, ডিজিটাল ও প্রথাগত মাধ্যমে সমান সুযোগভিত্তিক নির্বাচনী সহায়তা প্রদান এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ অনুসরণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে এই নতুন জোটের পক্ষ থেকে। একইসঙ্গে বাজার সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও বেকারত্বের মতো জনদুর্ভোগের কারণগুলোর পাশাপাশি যেকোনো আধিপত্যবাদী প্রভাবের বিরুদ্ধে জনগণের স্বার্থে সোচ্চার হওয়ার ঘোষণাও এসেছে।
মঞ্চের প্রতিটি প্রার্থীর ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে যে, ইনসাফ মঞ্চ কোনো সহিংসতা, অনৈতিক আচরণ বা অবৈধ রাজনীতির দায়ভার গ্রহণ করবে না। বিভাজনের বদলে ঐক্যের রাজনীতি এবং ব্যক্তিপূজা পরিহার করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল দর্শন। মঞ্চের ভাষায়, ‘শুধু ভোটাধিকার নয়, মানুষের সার্বিক অধিকারের ইনসাফ নিশ্চিত করাই মঞ্চের লক্ষ্য।’
জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এই আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে শামীম কামালের পাশাপাশি সম্মিলিত গণতান্ত্রিক জোটের চেয়ারম্যান গাজী মুস্তাফিজ, গণমুক্তি জোটের চেয়ারম্যান ড. শাহরিয়ার ইফতেখার, শিক্ষাবিদ মোমেনা খাতুন এবং গণ আজাদী লীগের চেয়ারম্যান আতাউল্লাহ খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের ঘোষিত ‘থ্রি জিরো’ অর্থাৎ শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ উদ্যোগের অগ্রগতি ও জাতীয় পর্যায়ে এর বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের মাধ্যমে জনগণকে স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সরকারের এই দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের যে মজবুত ভিত্তি বর্তমান সরকারের গড়ার সুযোগ ছিল, তাতে তারা ব্যর্থ হয়েছে, যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি পথরেখা হতে পারত। সরকারের এই ব্যর্থতা ও উদাসীনতার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উত্তরণের ভিত্তি তৈরিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যর্থ হয়েছে। যা পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতো। কেন তা হলো না, এই প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে জাতীয় নিরাপত্তার সংকটের সঙ্গে তুলনা করে ড. ইফতেখারুজ্জামান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে এমন অবহেলা আশা করা যায় না, কারণ এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের বিষয়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন তারা আদৌ কার্বন-দূষণজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এদেশের জনগণের অস্তিত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে ভেবেছেন কী-না?’ টিআইবির অভিযোগ, অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করেই জ্বালানি খাতের যে মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে, তাতে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং দুর্নীতির মতো সুশাসনের ঘাটতিগুলো আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি-সহায়ক এই নীতিগুলো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এ বাস্তবতায় টিআইবি এবং মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী সমমনা নাগরিক সংগঠনগুলো আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি একটি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছে। তারা মনে করেন, নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে খসড়া “এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (ইপিএসএমপি) ২০২৫” সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। বক্তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জ্বালানি নীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করেন। এই মানববন্ধনে ধারণাপত্র পাঠ করেন টিআইবির এনার্জি গভর্নেন্স বিভাগের সহসমন্বয়ক আশনা ইসলাম এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সমন্বয়ক নেওয়াজুল মওলা।
পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের এই দাবিতে ওয়াটার কিপার্স বাংলাদেশ, বাপা, সিপিডি, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও বেলাসহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সংহতি প্রকাশ করে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে গত বছর থেকে টিআইবি আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস উদযাপন শুরু করে। এ বছরও দিবসটি উপলক্ষে দেশব্যাপী ৪৫টি জেলায় সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ও ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস) গ্রুপের মাধ্যমে মানববন্ধন, পথসভা ও প্রচারণাসহ নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নীতি বাস্তবায়ন করা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে ক্রমবর্ধনশীল তাপপ্রবাহের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের সবকটি নগর কেন্দ্রকে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত অভিযোজন কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের হলিডে ইন হোটেলে আয়োজিত ‘হিট-হেলথ অ্যাডাপটেশন প্ল্যান’ প্রণয়ন সংক্রান্ত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার সচিব মো. রেজাউল মাকসুদ জাহেদী এই মহাপরিকল্পনার কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা এবং উপজেলা ও জেলা সদরসহ মোট ৫৩২টি নগর এলাকায় জলবায়ু ও হিটওয়েভ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একাডেমিক গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলগুলোকে সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলেও তিনি সভায় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উচ্চমাত্রার ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে সচিব বলেন যে, ‘গ্লোবাল ক্লাইমেট ইনডেক্স ২০২৩’ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ নবম স্থানে রয়েছে। অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ। তিনি গুরুত্বারোপ করেন যে, বাংলাদেশ কোনো বৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশ না হয়েও জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ভুক্তভোগী হওয়ায় নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সুদূরপ্রসারী অভিযোজন পরিকল্পনা গ্রহণ করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
৫৩২টি নগর কেন্দ্র ও বাজেট বরাদ্দ
সচিব জানান, দেশে বর্তমানে ১২টি সিটি কর্পোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা এবং উপজেলা ও জেলা সদর মিলিয়ে মোট ৫৩২টি নগর কেন্দ্র রয়েছে। আগে স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যক্রমে জলবায়ু পরিবর্তন বা হিট অ্যাডাপ্টেশন সরাসরি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এখন সেটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে মূল পরিকল্পনায় যুক্ত করা হচ্ছে।
তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে সরকার একটি ‘ভালনারেবিলিটি ইনডেক্স’ তৈরি করেছে। ফিজিক্যাল এক্সপোজার, সামাজিক সংবেদনশীলতা এবং অভিযোজন সক্ষমতা— এই তিন সূচকের ভিত্তিতে কোন অঞ্চল বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। সেই অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দও বাড়ানো হচ্ছে।
গবেষণাকে নীতিমালায় রূপান্তরের তাগিদ
গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে স্থানীয় সরকার সচিব বলেন, গবেষণার ফল এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে তা সহজেই সরকারি নীতিমালায় রূপান্তর করা যায়। তিনি বলেন, জাতীয় নগর নীতি ২০২৫ এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নগর স্বাস্থ্য সুরক্ষা পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। তিনি জানান, ২০৫০ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে, যেখানে হিট অ্যাডাপ্টেশনের জন্য প্রায় ২৩ কোটি ডলারের একটি নীতিগত ডকুমেন্ট প্রস্তুত করা হয়েছে।
উপকূলীয় ও বরেন্দ্র অঞ্চলের সংকট
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিশেষ ঝুঁকির দিকগুলো তুলে ধরে সচিব বলেন, সাতক্ষীরাসহ ১৯টি উপকূলীয় জেলার ১৭২টি পৌরসভায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারীদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে, বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। এসব সংকট মোকাবিলায় বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাকে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
নারী উদ্যোক্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি
নারী ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে সরকারের একটি নতুন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন সচিব। তিনি জানান, দেশে প্রথমবারের মতো স্যানিটেশন খাতে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর আওতায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় ভেন্ডিং মেশিনের মাধ্যমে স্যানিটারি পণ্য উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ নারীরাই পরিচালনা করবেন।
এছাড়া জলবায়ু প্রশমনে সরকারি অফিসগুলোতে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এসময় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে স্থানীয় সরকার সচিব বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কেবল পাঠ্যজ্ঞান নয়, উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও স্টার্টআপ গড়ে তোলাও জরুরি। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ভেঞ্চার তৈরিতে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে, যাতে দেশীয় প্রযুক্তিতে টেকসই ও সাশ্রয়ী সমাধান বের করা যায়।
তিনি আরও বলেন, একাডেমিয়া, এনজিও ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি জনবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় সংঘটিত পৃথক দুটি হত্যা মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৪১ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম জুলাই আন্দোলনের সময় মালবাহী ট্রাকচালক মো. হোসেন ও সিএনজি অটোরিকশাচালক সবুজ হত্যার ঘটনায় দাখিলকৃত দুটি পৃথক অভিযোগপত্র গ্রহণ করে এই আদেশ প্রদান করেন। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, এই দুই ঘটনায় সর্বমোট ৬৪ জন আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট আমলে নিয়েছে আদালত।
ট্রাকচালক হোসেন হত্যার ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় মোহাম্মদপুরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে। এই মৃত্যুর ঘটনায় তার মা রীনা বেগম বাদী হয়ে গত ৩১ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। পরবর্তী সময়ে তদন্ত শেষে গত ২৩ নভেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এই মামলায় বর্তমানে ২০ জন আসামি পলাতক রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ চারজন কারাগারে রয়েছেন এবং আরও ১০ জন জামিনে মুক্ত আছেন।
আদালত যাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করেছেন, তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা ছাড়াও রয়েছেন সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনানসহ আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা।
অন্যদিকে, সিএনজি চালক সবুজ হত্যার সূত্র ধরে জানা গেছে, ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুরের ময়ূর ভিলার সামনে তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই ঘটনায় সবুজের ভাই মনির হোসেন ১ সেপ্টেম্বর মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক মো. মাজহারুল ইসলাম শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এই মামলায় শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ২১ জন আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বর্তমানে এই মামলার তিন আসামি কারাগারে রয়েছেন এবং ছয়জন জামিনে আছেন। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সংঘটিত এই দুই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পলাতক ব্যক্তিদের আইনি প্রক্রিয়ায় আনতে আদালত এই কঠোর আদেশ প্রদান করেছেন।
বিগত ২০২৫ সালে দেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান রোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। বছরের প্রথম দিন থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকাসহ অন্যান্য স্থানে পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানে সংস্থাটি সর্বমোট ১,৯০৮ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা মূল্যের বিপুল পরিমাণ চোরাচালান পণ্যসামগ্রী জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, উদ্ধারকৃত এই বিশাল অংকের মালামালের মধ্যে মূল্যবান ধাতু থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও মাদকদ্রব্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জব্দকৃত পণ্যের তালিকায় রয়েছে ৬০ কেজি ৫৫৬ গ্রাম স্বর্ণ, ১৬৮ কেজি ২৪১ গ্রাম রৌপ্য, ১,৭১,১৯০টি শাড়ি, ১,২৬,৭৭৯টি থ্রিপিস বা কম্বল জাতীয় পোশাক এবং ১,৩৩,৩৩৮টি তৈরী পোশাক। এছাড়া ৬৮,৭৬,৬১১টি কসমেটিক্স সামগ্রী, ২,০৭,৪৬,১৪৪টি আতশবাজী, ১১,৬৫,৪৮৯ কেজি চিনি এবং ৩,০৫,৪৩৮ কেজি পিঁয়াজসহ বিপুল পরিমাণ জিরা, রসুন ও কয়লা উদ্ধার করা হয়েছে। বনজ সম্পদ রক্ষায় অভিযানে ১,৪০,২৭৪ ঘনফুট কাঠ এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে ১,৭০৮টি বিভিন্ন প্রকার যানবাহনও বিজিবির হাতে ধরা পড়েছে।
দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি গত বছর মারণাস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারেও বিশেষ তৎপরতা দেখিয়েছে। বছরব্যাপী অভিযানে ৬৪টি পিস্তল, ২টি এসএমজি, ১৯টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১০টি রাইফেল এবং ৩টি রিভলভার উদ্ধার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ১,৫০৯টি গোলাবারুদ, ৫৭টি ম্যাগাজিন, ৮টি মর্টার শেল, ৭৩,১০০টি সীসার গুলি এবং ২০.০৫ কেজি গান পাউডার জব্দ করা হয়। বিস্ফোরক দ্রব্যের মধ্যে ৪টি মাইন, ৭৯টি হাত বোমা, ৪০টি পেট্রাল বোম এবং ১৭৮টি ককটেল উদ্ধার করার মাধ্যমে বড় ধরনের নাশকতার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানেও বিজিবির অর্জন উল্লেখযোগ্য। গত এক বছরে ১,৪৭,১৪,২৯৮ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ১০ কেজি ৪০৮ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইস, ১,৩৩,৩৯৬ বোতল ফেনসিডিল এবং ১,৩০,৫৪৬ বোতল বিদেশী মদ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ২২,১৩৭ কেজি গাঁজা, ৫৫ কেজি ৬৩৬ গ্রাম হেরোইন এবং ১৩ কেজি ৬৪৭ গ্রাম কোকেন জব্দ করা হয়। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় ১,১৪,৫৮,৬৯৩টি বিভিন্ন প্রকার ঔষধ এবং ৬,৯৪,০৮২টি নেশা জাতীয় ও উত্তেজক ইনজেকশন উদ্ধার করেছে বিজিবি।
অভিযানের অংশ হিসেবে কেবল মালামাল জব্দ নয়, বরং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতেও বিজিবি ছিল আপসহীন। মাদক পাচার ও চোরাচালানে জড়িত থাকার দায়ে ২০২৫ সালে ২,৩৩৪ জনকে আটক করা হয়েছে। একই সময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ৪,২৩৮ জন বাংলাদেশী নাগরিক, ১২৪ জন ভারতীয় নাগরিক এবং ৭,৩৬৮ জন মায়ানমার নাগরিককে আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তিতে সীমান্ত সুরক্ষায় বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন অঙ্গীকারের বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।