বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ১৯৮১ সালের ৮ ডিসেম্বর মাত্র ২৬ বছর বয়সে মুনসেফ (সহকারী জজ) হিসেবে বিচারিক জীবন শুরু করেন। তারপর চার দশকের বিচারিক কর্মজীবন পার করে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর ওই বছরের ৯ অক্টোবর তিনি আনুষ্ঠানিক বিচারিক কাজ থেকে অবসরে যান। সম্প্রতি তিনি দৈনিক বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আব্দুল জাব্বার খানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শোনালেন তার ৪১ বছরের বিচারিক জীবনের কথা।
দৈনিক বাংলা: অবসরকালীন জীবন কেমন কাটছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: ভালোই কাটছে। তবে ব্যস্ততা কমেনি। মনে হয় আরও বাড়ছে। অবসরে অবসর কোথায়? হা হা…
দৈনিক বাংলা: স্বাধীন বাংলাদেশের তৃতীয় কোনো নারী বিচারক হিসেবে বিচার বিভাগে যাত্রা শুরুর পর সর্বোচ্চ আদালত থেকে অবসরে গেলেন। সব মিলিয়ে একজন নারীর বিচারক হিসেবে দীর্ঘ এই পথচলা কতটা সহজ ছিল?
কৃষ্ণা দেবনাথ: দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালে যখন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যাত্রা শুরু হয়, তখনই কিন্তু বাংলাদেশে মেয়েরা জুডিশিয়াল সার্ভিসে আসতে পারেনি। নারীদের জন্য জুডিশিয়াল সার্ভিসে যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথমেই আমরা পুরুষদের থেকে তিন বছর পিছিয়ে যাই। দেশের বিচার বিভাগের যাত্রা শুরুর তিন বছর পরে নারীদের যাত্রার পরও আজকে নারীদের অবস্থান কোথায় সেটা দেখতে হবে। আমি নারী বিচারক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছি ১৯৮১ সালে। প্রথম এসেছিলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, দ্বিতীয় যাত্রা শুরু করেছিলেন বিচারপতি জিনাত আরা। আর তৃতীয় হিসেবে যুক্ত হই আমি। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, আমরা তিনজনই আপিল বিভাগ থেকে অবসরে গিয়েছি। এটা ভাবতে ভালো লাগে।
নারী হিসেবে বিচারিক জীবনের তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। তবে নারী বিচারকদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়, তাদের সাংসারিক জীবন নিয়ে। কেননা, এটা বদলির চাকরি। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বদলির কারণে সংসারটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটা অনেক কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা তো ছিলই।
দৈনিক বাংলা: সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক হবেন এমন স্বপ্ন কি বিচারিক জীবনের শুরুতে কখনো দেখেছিলেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: না, এমনটি কখনোই ভাবিনি। এমনকি হাইকোর্টেও থাকাকালীন ভাবিনি যে আমি আপিল বিভাগে যাব। স্বপ্নও ছিল না। তবে আমার স্বপ্ন ছিল আমি জজ হব।
দৈনিক বাংলা: অনেক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীরাই এখন প্রায় বেঁচে নেই, আপনি কি মনে করেন এখন নতুন যারা আসছেন, তারা সেই খ্যাতিম্যান আইনজীবীদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে উঠছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: দেখেন এটা শুধু আইনজীবীদের মধ্যে নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। সবখানেই অবক্ষয়। ধরেন আমার বাবা যে পরিমাণ লেখাপড়া করে জ্ঞান অর্জন করেছেন আমি তো মনি করি না, আমার সেটুকু আছে। কিন্তু আমি আশাবাদী নতুন প্রজন্ম থেকে অনেক ট্যালেন্ট উঠে আসছে, আসবে। একসময় নামকরা আইনজীবীরা ছিলেন। তারপর তাদের উত্তরসূরিরা এসেছেন। ঠিক এমনি করেই নতুনরা আইনজীবী হয়ে উঠবেন। এখন যারা নবীন আইনজীবী তাদের জন্য একজন ভালো আইনজীবী হিসেবে গড়ে ওঠার এটা মোক্ষম সময়। তার কারণ জায়গাটা এখন অনেক খালি, সবকিছু প্রস্তুত হয়ে আছে, এখন দরকার শুধু অধ্যবসায়ের।
দৈনিক বাংলা: আপনার অবসর জীবনের শেষ দিনে বলেছিলেন, বিচারক নিজেকে স্বাধীন মনে না করলে সুবিচার সম্ভব না। এর মানে আপনি কী বুঝিয়েছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এই বাক্যটি আমি শুধু কথার কথা হিসেবে বলিনি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেই বলেছি। এখনো বিশ্বাস করি, একজন বিচারক নিজেকে যদি স্বাধীন মনে না করেন, তাহলে কাগজে-কলমে স্বাধীনতা দিয়েই কী লাভ। একজন বিচারক নিজের বিবেককে প্রশ্ন করবেন তিনি নিজে স্বাধীন কি না। কাগজে-কলমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে মাত্র কিছু বছর আগে। তার আগে আমরা বিচারকরা তো নিজেদের পরাধীন মনে করিনি, বিচারের কাজটি কিন্তু স্বাধীনভাবেই করেছি।
আমি মনে করি, একজন বিচারক মনেপ্রাণে নিজেকে স্বাধীন মনে করেন কি না, সেটাই বড় কথা। আমি জোর গলায়, দ্ব্যর্থহীনভাবে বলি ৪১ বছরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন পদে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এই সময়ে তো আমার কাছে কোনো তদবির আসেনি। নিজেকেই সেই জায়গা তৈরি করে নিতে হবে। আমি যখন বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি, তখন অনেক জুনিয়র বিচারক বলতেন তদবির আসে। আমি তখন তাদের বলেছি, কই আমার কাছে তো কোনো তদবির আসে না। তদবির যাতে না আসে সেই পরিবেশ আপনার নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে। বিচারকের স্বাধীনতার বিষয়টি নিজের সততা দিয়ে তৈরি করে নিতে হয়।
তদবির না শুনে একবার এক ব্যক্তিকে জামিন দিইনি বলে সেই সময় আমাকে মেহেরপুরের জেলা জজ থেকেও বদলি করা হয়েছিল। জেলা জজ থেকে সাড়ে চার বছর আমাকে কর্নার করে রাখা হয়েছিল। দুটি জেলার জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর স্পেশাল জজ করে রাখা হয়েছিল। আমি তো তখনো ভয় পাইনি। আমার কথা হলো, নিজেকে স্বাধীন রাখতে হলে বদলির ভয় করলে চলবে না। কী আর করবে বাংলাদেশের ভেতরেই তো বদলি করবে, আর তো কিছু না। বিচারক যদি বদলির ভয় বা নিজের লাভ-ক্ষতির চিন্তা করেন তাহলে তিনি স্বাধীন বিচারক হিসেবে কীভাবে কাজ করবেন। করতে পারবেন না। বিচারককে তার নিজের সততার ওপর শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। এখন কিন্তু দেওয়ানি মামলায় আপস করার সুযোগ আছে। লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলা আপসের সুযোগ আছে। এখন যদি এটা ভালোভাবে কার্যকর হয়, তাহলে ৫০ শতাংশ মামলাই আসবে না। এটা যদি সফল করা যায়, তাহলে মামলার জট অনেক কমে আসবে।
দৈনিক বাংলা: একটি মামলা শেষ করতে বছরের পর বছর লাগে কেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: মামলা শেষ করতে পক্ষগণেরই জোরালো পদক্ষেপের প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক সময় কোনো না কোনো পক্ষই চায় না, দ্রুত মামলা শেষ হোক। মামলার জট সৃষ্টির পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর জন্য শুধু বিচারকরা দায়ী তা বলা যাবে না বরং বাদী-বিবাদী, দুই পক্ষের আইনজীবীদেরও দায় রয়েছে। একটি মামলার নিষ্পত্তির জন্য কম করে হলেও পাঁচটি পক্ষের সমন্বয় দরকার পড়ে, তবেই মামলার নিষ্পত্তি ঘটে।
এ ছাড়া বিচারকসংকট রয়েছে বড় আকারে। এত বিশাল মামলার জট দ্রুত কমাতে হলে বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। যেটা সরকারের পক্ষে সম্ভব না।
দৈনিক বাংলা: বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ছোটখাটো যেকোনো বিষয়েই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, কেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এখন কিন্তু পত্রিকা খুললেই দেখা যায় হাইকোর্টের বিভিন্ন সংবাদ বা নির্দেশনা নিয়ে খবর ছাপানো হয়েছে। চোখ মেললেই কোর্ট-কাচারির খবর পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ায় ভুক্তভোগীকে হাইকোর্টে আসতে হচ্ছে। এটার একটা ভালো দিক আছে, মানুষ আদালতে এলে প্রতিকার পায়। আবার কিছু সময় দেখি একটা সাধারণ বিষয় নিয়েও মানুষকে হাইকোর্টে আসতে হয়। স্থানীয় প্রশাসন যদি সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করে তাহলে কিন্তু আদালতের ওপর এই চাপ আসে না। তারা সেটি করছে না। অনেক সময় আদালতের নির্দেশের পরও অনেক কিছু বাস্তবায়ন করা হয় না। এটা ভালো দিক না।
দৈনিক বাংলা: বিচার বিভাগকে কি আরও শক্তিশালী হতে হবে, নাকি শক্তিশালীই আছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: বিচার বিভাগকে কেউ শক্তিশালী করে দেবে না। বিচার বিভাগকে নিজেকেই শক্তিশালী হতে হবে। একটা আদেশ হওয়ার পর ঝড়ঝাপটা আসতে পারে। সেটা বহন করার মতো বিচারক যদি আমরা হতে পারি তাহলে বিচার বিভাগ শক্তিশালী হবে। বিচারক যদি সেই ঝড়ঝাপটা সইবার ক্ষমতা না রাখেন তাহলে সেটা হবে না।
দৈনিক বাংলা: বার ও বেঞ্চের সম্পর্ককে বলা হয় একটি পাখির দুটি ডানা। সম্প্রতি বিভিন্ন বারে আইনজীবী ও বিচারকদের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে, এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: সর্বজনীনভাবে আমি বলব, সাবলীল সম্পর্ক হ্রাস পেয়েছে। অনেক আগে থেকেই এই সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। অনেক সময় বিচারকের দরজায় লাথি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সার্বিকভাবে বলব আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে সম্পর্ক অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। আমার বক্তব্য হলো, একজন বিচারক যেহেতু একটু ওপরে বসেন, আইনজীবীরা একটু নিচে দাঁড়ান, এই যে বিচারকরা একটু অগ্রাধিকার স্থানে থাকেন সে জন্য বিচারকদের অনেক কিছু করা যায়, অনেক কিছু করা যায় না। সেটি তাদের মাথায় থাকতে হবে। এ ছাড়া আইনজীবীদেরও সহিষ্ণু হতে হবে। দুপক্ষই যদি সহিষ্ণু হয় তাহলে কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরবে না।
আদালতের মর্যাদা কমলে কিন্তু আইনজীবীদেরই মর্যাদা কমবে। এটা তাদের বুঝতে হবে। কোনো বিচারকের ভুল হলে আইনজীবীরা তার ওপরের বিচারককে বলতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট আছে, আইন মন্ত্রণালয় আছে। সেখানে বলার সুযোগ আছে। কিন্তু তাই বলে স্লোগান দেয়া উচিত না। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
দৈনিক বাংলা: দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক জীবনে পূরণীয় ঘটনা বা অপ্রাপ্তি বলে কিছু আছে কি না?
কৃষ্ণা দেবনাথ: মানিকগঞ্জে একটি অ্যাসিড নিক্ষেপ মামলায় আসামিকে সাজা দিতে পারিনি, এই একটি বিষয় আমার মনে এখনো গেঁথে আছে। আইনজীবীর ভুলের কারণে সেই আসামিকে সাজা দিতে পারিনি। যে কারণে খুব কষ্ট লেগেছিল। কারণ মামলায় আসামি শনাক্ত একটা বড় ব্যাপার। মামলায় বলা হয়েছে, চাঁদের আলোতে আসামিকে দেখা গেছে। কিন্তু পঞ্জিকাতে দেখা গেল সেদিন অমাবস্যা ছিল। তার ওপর আবার সেদিন ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। আইনজীবী মামলা শক্ত করতে গিয়ে চাঁদের আলোতে দেখেছে বলে বিবরণ দিয়েছেন কিন্তু সেদিন সেটা ছিল না। যে কারণে আসামি শনাক্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরঞ্জিত বিবরণ মূল ঘটনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ ছেলেটি মেয়েটিকে স্কুলে যাওয়ার সময় উত্ত্যক্ত করত, সেটি উল্লেখ থাকলেও হতো। অতিরঞ্জিত করার কারণে আসামি বেঁচে যায়। এই ঘটনা আমাকে পীড়া দেয়। তার কারণ চোখের সামনে দেখেছিলাম মেয়েটির ঝলসানো মুখ। কিন্তু তার ন্যায়বিচার আমি দিতে পারিনি।
দৈনিক বাংলা: দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক জীবনে আপনি কতজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এটা বলতে পারব না। তার কারণ, আমি গুনে রাখিনি। তবে সর্বোচ্চ সাজা দেয়ার ব্যাপারে আমি অনেক সতর্ক ছিলাম। আমি দুইয়ে দুইয়ে চার না হওয়া পর্যন্ত কাউকে সাজা দিইনি। অনেক আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েও আমি স্বস্তি পেয়েছি। তার কারণ অকাট্য দলিল-প্রমাণ ছিল। সব থেকে বড় স্বস্তি পেয়েছি, যখন আমি ঢাকার জেলা জজ ছিলাম। বঙ্গবন্ধু হত্যার ফাঁসির আসামিদের সাজা কার্যকর হবে। তখন ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার জন্য শেষ যে স্বাক্ষর দিতে হয়, জেলা জজ হিসেবে সেটা আমি দিয়েছিলাম। ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমার কাছে লাল নথি এল, আমি তাতে স্বাক্ষর করলাম। এরপরই টিভিতে দেখলাম কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকর শুরু করেছে। ঐতিহাসিক সেই মামলাটিতে শেষ স্বাক্ষর করেছিলাম। এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
দৈনিক বাংলা: অবসরে কেমন কাটছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: অবসরে একদমই অবসর নেই। আমি রুট (প্রান্তিক) লেভেলের ভিকটিমদের নিয়ে কাজ করতে চাই। সেটাই শুরু করেছি। দেখা যাক কতটা করতে পারি।
দৈনিক বাংলা: ধন্যবাদ আপনাকে।
কৃষ্ণা দেবনাথ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রচারের মাধ্যম হিসেবে পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করাসহ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও কোনো পোস্টার থাকবে না। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য হলো, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসছে এরমধ্যে একটি হলো এই নির্বাচনে পোস্টার থাকবে না। আমরা নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন পোস্টার না রাখার পক্ষে।’ এই সিদ্ধান্তের ফলে নির্বাচনি প্রচারের ধরনে একটি বড় পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশোধিত বিধিমালার কারিগরি ও কৌশলগত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে এই নির্বাচন কমিশনার জানান, আসন্ন ভোটগুলোতে ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের ব্যবহার থাকবে না এবং অনলাইনে মনোনয়নপত্র দাখিলের বর্তমান বিধানটিও বাতিল করার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচনটি সম্পূর্ণ নির্দলীয়ভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ থাকছে না। এছাড়া নির্দলীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনমূলক স্বাক্ষরের যে আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল, সেটিও সহজ করার লক্ষ্যে বাতিল করা হচ্ছে। তবে উপজেলা নির্বাচন ব্যতীত অন্যান্য স্তরে প্রার্থীর জামানতের অঙ্ক বৃদ্ধি করা হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। আইনি কড়াকড়ির বিষয়ে তিনি বলেন যে, প্রবাসী বা পোস্টাল ভোটের কোনো ব্যবস্থা থাকছে না এবং আইসিটি আইনের মামলায় চার্জশিটভুক্ত কোনো ব্যক্তি বা পলাতক আসামি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পাবেন না।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, ঈদের ছুটির পরপরই সংশোধিত এই বিধিমালাটি চূড়ান্ত করার কাজ শুরু হবে এবং আগামী জুন মাসের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনি ডামাডোল শুরু হতে পারে। একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য তিনি মূলত চারটি স্তম্ভের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন—সরকারের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ও সংঘাতমুক্ত আচরণ, নির্বাচন কমিশনের আপসহীন ভূমিকা এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সততা ও সক্ষমতা। তিনি বিশ্বাস করেন, সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার জন্য ইসিকে নীতিগত জায়গা থেকে ‘হুংকার’ দিতে হবে।
নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রিসাইডিং অফিসার যদি আন্তরিকভাবে বলেন- জাল ভোট আমি করতে দেব না, বা দুই নম্বর কাজ হবে না-তাহলে তা তার সততা, ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গুণাবলির ওপর নির্ভর করে।’ তাঁর মতে, কেবল ব্যক্তিগত সততা থাকলেই চলবে না, বরং মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতাও একজন কর্মকর্তার জন্য অপরিহার্য। এই সকল নিয়ামকের যথাযথ সমন্বয় ঘটলে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত জাকির হোসেন ওরফে সোহেল রানা আদালতে লোমহর্ষক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে পাশবিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা এবং পরবর্তীতে তার নিথর দেহ থেকে মাথা ও হাত বিচ্ছিন্ন করার কথা তিনি স্বীকার করেছেন। শুক্রবার (২২ মে) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা দীর্ঘকাল ধরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল এবং ‘তার অতীত কর্মকাণ্ড ভালো ছিল না’। ঘাতকের চারিত্রিক স্খলন ও মাদকাসক্তিই এই বর্বরোচিত ঘটনার নেপথ্যে কাজ করেছে বলে পুলিশ মনে করছে।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, একই ভবনের পাশাপাশি কক্ষে থাকা রামিসাকে দেখে ঘটনার দিন সকালে ইয়াবাসক্ত সোহেলের মধ্যে ‘বিকৃত যৌন লালসা জেগে ওঠে’। সে শিশুটিকে কৌশলে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে বাথরুমে ধর্ষণ করে। একপর্যায়ে শিশুটি তার বাবা-মাকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়ার কথা বললে সোহেল আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং ‘গোটা ঘটনা ফাঁস হওয়ার আতঙ্কে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে’। হত্যাকাণ্ডের পর সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার বিষয়টি জানতে পেরে স্বামীকে বাঁচাতে লাশ গুম করার অমানবিক পরিকল্পনায় যোগ দেন। তাঁরা একটি ধারালো চাকুর সাহায্যে শিশুটির মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন এবং তার দুই হাত ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করেন। রামিসার মা যখন তাঁর মেয়ের সন্ধানে দরজায় নক করছিলেন, তখন সোহেলকে জানালা দিয়ে পালানোর সুযোগ করে দিতে স্বপ্না দীর্ঘক্ষণ দরজা বন্ধ করে রেখেছিলেন।
এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে রামিসার পল্লবীর বাসভবনে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানান যে, পুলিশ দ্রুততম সময়ে আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে এবং ‘আসামি ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এখন চার্জশিট দেওয়ার পালা।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার কাজ সিআইডি ল্যাবে চলমান রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, ‘ডিএনএ টেস্টের নিয়ম হচ্ছে যে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে, যেহেতু এটা বৈজ্ঞানিক বিষয়। সেটা শেষ হবে রোববারের দুপুরের মধ্যে। রোববারের মধ্যে ইনশাআল্লাহ আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারবো এবং তারপর অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে যাতে বিচার কার্য নিষ্পন্ন হয় সে চেষ্টা করবো। যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা যায় সেজন্য আমাদের পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকবে।’
উল্লেখ্য, গত ১৯ মে সকালে পল্লবীর একটি কক্ষের খাটের নিচ থেকে রামিসার মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জ থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই পাশবিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার ও ঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী দমকা হাওয়া ও বজ্রবৃষ্টির আশঙ্কায় নদীবন্দরগুলোকে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। শুক্রবার (২২ মে) দুপুর ১টা পর্যন্ত দেওয়া এক বিশেষ সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে যে, দেশের অন্তত ১০টি অঞ্চলের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, ঢাকা, কুমিল্লা এবং সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে এই ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঝোড়ো হাওয়ার পাশাপাশি এসব এলাকায় বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ভোর ৪টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নৌযানগুলোকে সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মূলত বর্ষা পূর্ববর্তী আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাবে এই ধরণের আকস্মিক ঝড়ের সৃষ্টি হচ্ছে।
যে বাতাস একটু আগেও স্নিগ্ধতার চাদরে জড়িয়ে রাখছিল চারপাশ; তা আচমকাই ভারি হয়ে উঠল এক আদিম, পৈশাচিক উন্মাদনায়। নিষ্প্রাণ বাতাস যেন সহসা জীবন্ত হয়ে কেঁদে উঠল এক মরণোন্মুখ লাশের শেষ আকুতিতে। অথচ ঘাতকের পাথুরে চোখে তখনো কেবলই বিকৃত উল্লাসের নাচ। তার হাতের ধারালো অস্ত্রের ডগা বেয়ে টপটপ করে ঝরছিল তাজা, উষ্ণ রক্ত। ঠিক তখনই, দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসছিল মায়ের ডাক—মেয়েকে ডাকছেন স্কুলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মা জানেন না, ভেতরে তখন মেয়ের রক্ত দিয়ে পৈশাচিকতার এক নতুন ইশতেহার লিখছে নরপিশাচ। চারদিকের আলোও যেন এই চরম নির্মমতার সাক্ষী হতে না পেরে বারবার শিউরে উঠছিল, ম্লান হয়ে আসছিল ভয়ে। আছিয়া, লামিয়া এবং সবশেষ রামিসা—একের পর এক নিষ্পাপ ফুলকে ছিঁড়ে ফেলছে এই নরপিশাচরা। যে সকাল শিশুর হাসিতে আলোকিত হওয়ার কথা ছিল; আজ সেই সকালই যেন হয়ে উঠছে বেদনার কালরাত, লাশের মিছিল। চারদিকে নিষ্পাপ শিশুদের আর্তচিৎকার। ফেটে যাচ্ছে আকাশ, নিষ্প্রাণ বাতাস। তবু গলছে না ঘাতকের হৃদয়ের পাথর।
আট বছরের রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা: রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতরে নিয়ে যান। এরপর বাথরুমে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে সোহেল। এতে ছোট্ট রামিসা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। ঠিক ওই সময়ে রামিসার মা সোহেলের বাসার দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেন। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সোহেল তাৎক্ষণিক রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করে।
এরপর মরদেহ গুম করার উদ্দেশে ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার মাথা কেটে শরীর থেকে আলাদা করা হয়। নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়, ছুরি দিয়ে শিশুটির যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করা হয় এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। আর খণ্ডিত মাথাটি রেখে দেওয়া হয় একটি বালতির ভেতর। এই পুরো ঘটনার সময় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না একই রুমে উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য রামিসাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। একপর্যায়ে অভিযুক্তদের ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তারা। অনেক ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন স্বজনরা। তখন ফ্ল্যাটের কক্ষে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত দেহ ও বালতিতে মাথা দেখতে পান তারা।
জনগণের উপস্থিতি টের পেয়ে কক্ষের জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় মূল ঘাতক সোহেল রানা। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ প্রথমে স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করে। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে মূল অভিযুক্ত সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।
৩ বছরের শিশুকে ধর্ষণে উত্তাল চট্টগ্রাম, ঘটনাস্থল ঘেরাও: চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়ায় তিন বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটকের দাবিতে কয়েক হাজার বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি ঘটনাস্থল ঘেরাও করে বিক্ষোভ করছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশও অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে বাকলিয়া থানার চেয়ারম্যানঘাটায় একটি ভবনে এই ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা ভবনটি ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন।
ঢাকার পল্লবীর এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও দিনভর বিক্ষোভ হয়। এর মধ্যে নতুন এই ঘটনায় নগরজুড়ে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ভুক্তভোগী শিশুটিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত যুবককে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপকমিশনার হোসেইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া বলেন, ‘শিশুটিকে উদ্ধার করে ওসিসিতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ অবস্থান করছে।’
কবির ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘বিক্ষুব্ধ জনতা যে ভবনে অভিযুক্ত অবস্থান করছেন বলে ধারণা করছে, সেটি ঘেরাও করে রেখেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ভবন থেকে বের হতে দিচ্ছে না। তাকে উদ্ধার করে আইনের আওতায় আনা হবে।’
বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ কাজ করছে। শিশুটিকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে।
আট বছরের শিশু আছিয়াকেও ধর্ষণের পর হত্যা : মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রাম। দুপুরে রোদের তীব্রতা থাকলেও, আয়েশা খাতুনের জীর্ণ টিনের ঘরে যেন এক জমাট অন্ধকার। এই ঘরেই থাকত আট বছরের আছিয়া। ২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বোনের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সে লালসার শিকার হয়। হাসপাতালে প্রায় আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে সে মারা যায়। তার মা আজও প্রতি রাতে চমকে ওঠেন। আয়েশা খাতুনের বিলাপ, ‘সবাই কথা দিছিল। এক বছর আগে আসামির ফাঁসি হইছে, কিন্তু কার্যকর হয় না। আমি কার কাছে বিচার চাইব?’
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত আসামির করা আপিল বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত শুনানি শেষ করে রায় বহাল রেখে চূড়ান্ত কার্যকরের পথে অগ্রগতি হবে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এমন স্পর্শকাতর মামলার বিচার দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে। তারা দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি করে রায় কার্যকরের জোর দাবি জানিয়েছেন।
আছিয়ার বিচার থমকে আছে হাইকোর্টের আপিলের টেবিলে। অন্যদিকে, দেশের মানচিত্রজুড়ে গত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক শিশুর নিথর দেহ মিলছে। সিরাজদিখান, রানীশংকৈল, রাজশাহী থেকে রাজধানীর পল্লবী—সর্বত্রই যেন এক পৈশাচিক উৎসব চলছে।
নিখোঁজ হুমায়রা জান্নাতের লাশ: গত শুক্রবার সন্ধ্যার আগে আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হয় চার বছরের শিশু হুমায়রা জান্নাত। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামে। বাড়িতে না ফেরায় মেয়ের খোঁজ করেন মা তোষী খাতুন। খবর দেওয়া হয় বাবা হাসিবুল ইসলাম শান্তকে।
শান্ত কানপাড়া বাজারে একটি ওষুধের দোকান চালান। খবর পেয়ে ছুটে যান বাড়িতে। সারারাত এখানে সেখানে খোঁজাখুঁজি করেও শিশু হুমায়রার সন্ধান না পেয়ে অজানা আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে পড়ে পরিবার। জানানো হয় পুলিশকে। এদিকে নিখোঁজের ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুর ২টার দিকে বাড়ির নিকটবর্তী একটি খেজুরগাছের নিচ থেকে শিশু হুমায়রার লাশ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার হাটকানপাড়া বাজার এলাকায়। চার বছরের ফুটফুটে সন্তান হুমায়রাকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মা। শিশু হুমায়রার হত্যাকাণ্ডে পাড়া-প্রতিবেশীসহ এলাকাবাসীর মাঝে শোকের সঙ্গে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর রোববার বিকেলে শিশু হুমায়রাকে সমাহিত করা হয়।
শিশু হুমায়রার মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী শিশুটির শরীরে ছোটখাটো আঘাতের চিহ্ন ছিল। পেট ফোলা ছিল এবং বাম হাতে ছোট কয়েকটি আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে।
১০ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা: মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ১০ বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শিশুটির সৎ মামাকে আটক করেছে পুলিশ।
গত শনিবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের খাসকান্দি মদিনাপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত শিশু ওই এলাকার কাতারপ্রবাসী আনোয়ার হোসেনের মেয়ে। আটক সৎ মামা রাজা মিয়া (৪৫) খুলনার মোড়লগঞ্জের মৃত আকবর হাওলাদারের ছেলে। তিনি প্রায় ৬ বছর ধরে নিহত শিশুর পরিবারের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করে আসছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে নিজ ঘরের খাটের ওপর ওই শিশুর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে পরিবারের সদস্যরা পুলিশে খবর দেন। এরপর বিকেল ৪টার দিকে সিরাজদিখান থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সৎ মামা রাজা মিয়াকে আটক করে।
সিরাজদিখান থানার ওসি আব্দুল হান্নান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মেয়েটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত সৎ মামাকে আটক করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ভুট্টাক্ষেতে পড়ে ছিল চার বছরের লামিয়ার মরদেহ: ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলে নিখোঁজের প্রায় ২১ ঘণ্টা পর লামিয়া আক্তার নামে চার বছরের এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে একই গ্রামের এক কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। গত ১৪ মে সকাল ৮টার দিকে উপজেলার ধর্মগড় ইউনিয়নের আনসারডাঙ্গী গ্রামের একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। নিহত লামিয়া ওই গ্রামের শফিকুল ইসলামের মেয়ে।
রাণীশংকৈল থানার ওসি আমানুল্লাহ আল বারী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ মে বেলা ১১টার দিকে লামিয়া বাড়ির পাশে খেলছিল। একপর্যায়ে সে সেখান থেকে নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের পর মেয়েটির পরিবারের লোকজন বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। এমন কি লামিয়ার সন্ধান চেয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়। তাতেও ওইদিন তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নি। পরদিন সকালে গ্রামবাসী গ্রামের পাশে একটি ভুট্টাক্ষেতে লামিয়ার মরদেহ দেখতে পায়। থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ভুট্টাক্ষেত থেকে লামিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে।
পরে স্থানীয় এলাকাবাসী অভিযুক্ত কিশোরকে তার বাড়িতে আটকে রাখে।
ওসি আমানুল্লাহ আল বারী বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠানো হয়েছে। আটক কিশোরের স্বীকারোক্তি অনুসারে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এনিয়ে নিহতের বাবা থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।
১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা: চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে গত মার্চ মাসে ১১ বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। একটি গুদামে তার লাশ ফেলে রাখে ঘাতক। এ ঘটনার প্রায় তিন মাস পর মূল অভিযুক্ত ও হত্যা মামলার আসামি মো. ফয়সালকে (১৯) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী অঞ্চল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে খবর পেয়ে নরসিংদী থেকে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতে হাজির করা হলে আসামি ফয়সাল স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পুলিশ জানায়, গত ২৪ মার্চ ১১ বছর বয়সী ওই কন্যাশিশু নিখোঁজ হয়। এর দুই দিন পর ২৬ মার্চ ওই শিশুর বাড়ির পাশের একটি তুলার গুদাম থেকে দুর্গন্ধ বের হলে গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে লাশ দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ গুদামের ভেতরে ফেলে রাখা হয় বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে। ওই ভবনের পাশের সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা গেছে, অভিযুক্ত ফয়সাল শিশুটিকে নিয়ে গুদামের ভেতর ঢোকেন। পরে তিনি একা বেরিয়ে যান। এ ঘটনায় ২৬ মার্চ ফয়সালকে আসামি করে হাটহাজারী থানায় মামলা করেন ওই শিশুর মা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুটির বাবা প্রতিবন্ধী। মা স্থানীয় একটি কারখানার শ্রমিক। অভিযুক্ত ফয়সাল শিশুটির সঙ্গে একই কলোনিতে বসবাস করতেন। ফয়সালের বাড়ি বরিশালে। তিনি পেশায় দিনমজুর।
তিন বছরের ফুটফুটে হাবিবকে গলাটিপে হত্যা: রাজধানীর বাড্ডার এই শিশু জন্মদাতার চরম নিষ্ঠুরতায় পৃথিবী ছেড়েছে। যে হাত তাকে পরম নির্ভরতায় আগলে রাখার কথা, সেই হাত তাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। গত ২৭ এপ্রিল স্ত্রী শিল্পী খাতুনের কাছে মাদক কেনার টাকা চেয়ে না পেয়ে তার সামনে সন্তানকে গলাটিপে হত্যা করেন শাহিন মিয়া। একইদিন গাজীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে গলা কেটে ও পানিতে ফেলে হত্যা করা হয়েছে পাঁচ শিশুকে। তবে শুধু শিশু রামিসা, ইরা কিংবা তিন বছরের হাবিবই শুধু নয়, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৬ মাসে (২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল) হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৫২২ শিশুকে। গড়ে মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। এ সময়ে ধর্ষণসহ চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ২২৩ শিশু। গড়ে মাসে ৭৬ জনের বেশি শিশু ধর্ষণসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
মাদকাসক্তের বলি শিশুরা: মাদকাসক্তি শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না, এটি পুরো পরিবার ও সমাজের জন্য হুমকি তৈরি করছে। বিশেষ করে অবাধ বিস্তারে শিশুদের নিরাপত্তা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সম্প্রতি মাদকাসক্ত বাবার হাতে সন্তান হত্যা, প্রতিবেশীর শিশুসন্তানকে নির্যাতনের পর হত্যা এবং মাদক কেনার টাকার জন্য অপহরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। মাদকের প্রভাবে চেনা মানুষ হয়ে উঠছে অচেনা। নির্ভরতা হাত হয়ে উঠছে ঘাতকের হাত।
গত ১৮ মার্চ ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে মাদকের অর্থ সংগ্রহে মরিয়ম আক্তার (৪) নামে এক কন্যাশিশুর গলায় থাকা রুপার একটি চেইন ছিনতাই করে মাদকাসক্ত ইয়াছিন মিয়া (১৬) ও আকাশ (১৫)। ছিনতাইকালে ইয়াছিন ও আকাশকে চিনে ফেলায় শ্বাসরোধে শিশু মরিয়মকে হত্যা করে বাড়ির পাশের একটি মাটির চুলার ভেতর লাশ ভরে রাখে। শিশু মরিয়ম আক্তার একই গ্রামের মিজানুর রহমান ও রিমা আক্তার দম্পতির একমাত্র কন্যা।
সম্প্রতি ঢাকার সাভারে মাদকের টাকা জোগাতে ১২ বছরের এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করে একটি চক্র। এ ঘটনায় রাব্বানী মোল্লা নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ২৪ এপ্রিল ফরিদপুর বাখুন্ডা আশ্রয়ণ প্রকল্পে সাত বছরের শিশু আইরিন আক্তার কবিতাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করে মাদকাসক্ত যুবক ইসরাফিল মৃধা। হত্যার পর শিশুটিকে পাশের বাড়ির শৌচাগারের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে ফেলে দেয়। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে মাদকের টাকার জন্য তিন বছর শিশু ফাতেমাকে কুপিয়ে হত্যা করে তারই আপন চাচা নরুল হাকিম।
বড়দের দ্বন্দ্বে প্রাণ যাচ্ছে শিশুর: গত ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বাবার সঙ্গে অনলাইন জুয়ার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যা করে মরদেহ বস্তায় ভরে সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়। নিহত শিশুটির নাম আন্দালিব সাদমান ওরফে রাফি (৯)। হত্যার অভিযোগে প্রতিবেশী নূর মুহাম্মদ খোকনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, শিশুটির পিতা জহিরুল ইসলামের সঙ্গে অনলাইন জুয়া খেলা নিয়ে প্রতিবেশী খোকনের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এর জেরে জহিরুলের ছেলেকে প্রথমে অপহরণ ও পরে হত্যা করে লাশ গুম করে রাখে খোকন। একই দিন চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু (৩২) নামে এক যুবককে। একই ঘটনায় ১১ বছরের রেশমি আক্তার চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
নরপিশাসদের নখের আঁচড়ে রচিত হচ্ছে মানবতার নির্মম ও কলঙ্কিত অধ্যায়—এই রক্তাক্ত উপাখ্যানের শেষ কোথায়?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি (টিইসি) খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ১ টাকা ২৫ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
কারিগরি কমিটির এই সুপারিশ অনুযায়ী দাম বাড়ানো হলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকি প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কমবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দ্বিতীয় দিনের গণশুনানিতে এই প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
কমিটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৯৫ হাজার ৬১২ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহের বিপরীতে বিতরণ সংস্থাগুলোর মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা নিট রাজস্ব প্রয়োজন হবে বলে হিসাব করা হয়েছে।
কারিগরি মূল্যায়ন কমিটির পর্যালোচনা অনুযায়ী, দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ বিতরণ সিস্টেম লস বা বিতরণ লোকসান ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৭.৩৮ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭.৩৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
গ্রাহক পর্যায়ের ট্যারিফ কাঠামো নিয়ে টিইসি জানিয়েছে, লাইফলাইন গ্রাহকদের (০-৫০ ইউনিট) পরবর্তী ধাপগুলোর বিদ্যমান ‘স্ল্যাব’ বা বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্তরে কোনো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বর্তমানে যেভাবে বিভিন্ন ধাপে বিদ্যুতের দাম হিসাব করা হয়, তা অপরিবর্তিত থাকবে।
কমিটির সদস্যরা জানান, বিদ্যুতের বর্তমান স্ল্যাব কাঠামোতে কোনো অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হবে না। এর আগে ০-৭৫ ইউনিটের প্রথম স্ল্যাবটি বাতিল করে তার পরিবর্তে ০-২০০ ইউনিটের একটি নতুন স্ল্যাব করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
তবে কারিগরি কমিটি মনে করে, হঠাৎ স্ল্যাব পরিবর্তন করলে প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ গ্রাহকরা বিপাকে পড়বেন। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় বিদ্যমান স্ল্যাব কাঠামোই বহাল রাখার সুপারিশ করেছে কমিটি।
নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির ডাকা গুরুত্বপূর্ণ সভা শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) সচিবালয়ে এই বৈঠক শুরু হয়ে দুপুরে শেষ হয়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের অতিরিক্ত ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতো। তবে একটু কাটছাঁট করে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমিয়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কমিটির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনা করে নিচের দুই স্তরের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বেশি বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ওপরের স্তরের কর্মকর্তারা তুলনামূলক কম সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে সরকারি পেনশনভোগীদের পেনশনের হার শতভাগের কাছাকাছি বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ অনুযায়ী একবারে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের অতিরিক্ত ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতো। তবে বর্তমানে চাকরিজীবীরা যে ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা পাচ্ছেন, তা নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে দেওয়ায় সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এই হিসাব মাথায় রেখেই আগামী
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার (২১ মে) বাজেট নিয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নতুন এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। নবম পে-স্কেলের আওতায় শুধু প্রশাসন ক্যাডার নয়, বরং এর সঙ্গে শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন ও বিচার বিভাগীয় কর্মচারীসহ সরকারি সব খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অন্তর্ভুক্ত থাকছেন।
এর আগে গত সোমবার (১৮ মে) অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে জানান, আগামী অর্থবছরের শুরুতে অর্থাৎ ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরু হবে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জিডিপির তুলনায় রাজস্ব সংগ্রহের অবস্থাও বেশ দুর্বল। ফলে অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে এবং কাটছাঁট করতে হচ্ছে। তবে এর মধ্যেও নতুন বেতনকাঠামোর দিকটি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখতে হচ্ছে।’
জানা গেছে, মূল কমিশনের সুপারিশ কিছুটা কাটছাঁট করে মোট তিন ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হতে পারে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এটি তিন অর্থবছরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কমিটির তেমন সুপারিশ ছিল। তবে আমাদের তো বাজেটের সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশনপ্রাপ্তদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যাদের মাসিক পেনশন ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে, তাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া প্রবীণ পেনশনভোগীদের জন্য চিকিৎসা ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৭৫ বছরের বেশি বয়সি পেনশনভোগীদের চিকিৎসা ভাতা ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য ৫ হাজার টাকা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নতুন পে স্কেলে সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখার সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার চূড়ান্ত সুপারিশ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, হামের টিকাদান কর্মসূচি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি সাফল্য অর্জন করেছে এবং এটি বন্ধ না হয়ে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সঙ্গে নিয়মিতভাবে চলবে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) জাতীয় প্রেসক্লাবে হামের প্রাদুর্ভাবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করণীয় ও জনসচেতনতা শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের সিভিল সার্জন, পরিচালক এবং হাসপাতাল সুপারদের টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঈদের ছুটি ছাড়া অন্য সব দিন টিকাদান কার্যক্রম চলবে এবং ছুটির দিনেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে থাকার আশঙ্কা থাকায় সেখানে বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে মাইকিং করা হচ্ছে এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমে শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনা হচ্ছে।’
মন্ত্রী আরও জানান, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল আগেভাগেই সংগ্রহ করা হয়েছে এবং টিকা সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। টিউবারকিউলোসিস (টিবি) টিকার সিরিঞ্জ সংকট নিয়ে ছড়ানো গুজবের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি যাচাই করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং ১১ লাখ ৫ হাজার সিরিঞ্জ জেলা পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে টেন্ডার ও আউটসোর্সিং খাতে অনিয়মের কারণে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে, যারা চিকিৎসা খাতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।’ তবে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিতে সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ডাক্তারদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিতে ঈদের পরপরই প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রসহ ১০ জন আনসার এবং একজন কমান্ডার মোতায়ন করা হবে। জেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে কোরবানিযোগ্য পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দেশীয় উৎপাদন দেশের চাহিদা পূরণে সক্ষম। দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা ও জাতীয় স্বার্থে অবৈধভাবে পাচার বা চোরাই পথে আসা পশু ক্রয়ের বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। দেশের খামারিদের স্বার্থরক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’
বৃহস্পতিবার (২১ মে) কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ‘কোরবানিবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা-২০২৬ (মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী, চামড়া সংরক্ষণকারী এবং ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম)’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেছেন। কর্মশালার আয়োজন করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম, প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ‘কোরবানির পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রশংসনীয়।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘কোরবানির পশুর মাংসের পাশাপাশি চামড়া ও অন্যান্য উপজাত সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘কোরবানিকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষ পশু জবাই, চামড়া ছাড়ানো, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বণ্টনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। এ বাস্তবতায় দক্ষ জনবল তৈরির বিকল্প নেই। বিশেষ করে চামড়া ছাড়ানোর মতো সংবেদনশীল কাজে প্রশিক্ষিত জনবল না থাকলে চামড়ার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এর বাজারমূল্য কমে যায়।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘অবৈধভাবে আসা পশু ক্রয় করে কোরবানি দেওয়া কতটা সমীচীন- এ বিষয়ে ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে সচেতনতা তৈরি প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘কোরবানির পশু ক্রয় ও ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বৃদ্ধি, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা এবং চামড়া সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন, অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. মো. বয়জার রহমান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিচালক ডা. বেগম শামছুননাহার আহম্মদ, পরিচালক ড. এ. বি. এম. খালেদুজ্জামান।
রাজধানী মীরপুরে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসাকে হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি স্বল্পসময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিকেলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক ব্রিফিংয়ে একথা বলেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, বাকি বিচারের দায়িত্ব আইন বিভাগের। আমরা আশা করি স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেইসঙ্গে আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল করা হবে। সংক্ষিপ্ত সময়ে বিচারিক প্রক্রিয়াও শেষ হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক সময় বিচার বিলম্ব হয়, এটা আদালতের বিষয়। তনু হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। রামিসা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংক্ষিপ্ত সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হবে। আইনশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখার জন্য যা যা করার, সবই চেষ্টা করছেন বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বাংলাদেশি পাসপোর্টে আবারও যুক্ত হচ্ছে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ (Except Israel) শব্দবন্ধ। ছয় বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাদ দেওয়া হয়। এখন এই শব্দবন্ধ পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি, জনমত এবং ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রতি সংহতি রেখেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশ সংবাদ বিশ্লেষণ
এর আগে গত বছরের ৭ এপ্রিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দেওয়া এক চিঠিতে আগের মতো বাংলাদেশি পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি পুনর্বহালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। তবে সে সময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছাড়া সাধারণ পাসপোর্টে এটি বড় পরিসরে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। এবার বর্তমান সরকার সব ধরনের পাসপোর্টের ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পাসপোর্টের বেশ কিছু বিষয় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এপ্রিল এবং চলতি মে মাসের শুরুতে একাধিক বৈঠক করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের শীর্ষ মহল থেকে এই পরিবর্তনের বিষয়ে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে প্রিন্ট হওয়া নতুন পাসপোর্টে এই শব্দবন্ধ যুক্ত করা হবে। তবে পুরোনো পাসপোর্টধারীদের জন্য আপাতত কোনো জটিলতা তৈরি হবে না। বিদ্যমান পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবায়নের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই নতুন সংস্করণের পাসপোর্ট পাওয়া যাবে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্ট পরিষেবা চালু করার সময় পাসপোর্ট থেকে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর আগে বাংলাদেশের প্রচলিত পাসপোর্টে লেখা থাকত, ‘এই পাসপোর্ট বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ, ইসরাইল ছাড়া’। ই-পাসপোর্ট থেকে এটি বাদ পড়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন মহল থেকে লেখাটি পুনর্বহালের দাবি উঠে আসছিল।
অঞ্চলভিত্তিক দুর্যোগ প্রান্তিকের মানুষকে আরও বেশি প্রান্তিকে ঠেলে দেয়। কর্মহীন করে চাপ বাড়িয়ে ঠেলে দেয় শহরের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। এ অবস্থায় সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছে সাড়ে তিন কোটিরও বেশি মানুষ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষা দিতে ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো সরকারের ‘ফ্ল্যাগশিপ’ উদ্যোগ।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। তারই ইচ্ছায় অর্থমন্ত্রীকে নিয়ে সম্প্রতি এক জরুরি বৈঠক হয়। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী এই বৈঠকে দেশের দরিদ্র, প্রান্তিক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য সামাজিক সুরক্ষা জালকে আরও শক্তিশালী করার কৌশলগত দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে আসন্ন বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দের (১ লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা) চেয়ে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা বেশি। এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য হতে যাচ্ছে গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
বৈঠকে জানানো হয়, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বিশেষ সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা হিসাবে আলাদাভাবে ১৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে।
এই অর্থ মূলত তৃণমূল পর্যায়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যবহৃত হবে। বৈঠকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি এর কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আসন্ন বাজেটে দুটি বড় ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি দেশব্যাপী বড় পরিসরে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হচ্ছে-ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড। এ ছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্মানী-দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় এবং তৃণমূলের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জন্য সম্মানী কাঠামোর বরাদ্দও এই বিশেষ তহবিল থেকে দেওয়া হবে।
এ ছাড়া খাল খনন কর্মসূচি ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতের একটি টাকাও যেন অপচয় বা অনিয়মের কবলে না পড়ে। ফ্ল্যাগ কর্মসূচির বাইরে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং আহতদের মাসিক কার্যক্রম ভাতার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, বিগত বছরের তুলনায় এবার বাজেটে খাতটির ১৮টি ক্যাটাগরিতে উপকারভোগী ১ কোটি বাড়িয়ে ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ। বরাদ্দ বাড়ছে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী, বয়স্কভাতা। প্রধান কর্মসূচিতে ফ্ল্যাগশিপ ছাড়াও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, দারিদ্রতার সীমানায় থাকা মানুষকে কর্মসংস্থানে জড়িত রাখা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি ছাড়াও উচ্চশিক্ষায় সুযোগ সৃষ্টি, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্থাৎ মানবসম্পদ তৈরির পরিকল্পনা থাকছে মোটাদাগে।
ঢাবির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ‘যে মানুষগুলো সত্যিকার অর্থে সমস্যায় জর্জরিত, তাদের চিহ্নিতকরণ করা হচ্ছে না ভালোভাবে। যে কারণে সামাজিক নিরাপত্তায় যে পরিমাণ অর্থ বণ্টন হচ্ছে, তার অর্ধেক বণ্টনই ভুলভাবে করা হচ্ছে।’
বিশালাকার ঋণ আর স্থবির অর্থনীতি নিয়ে শুরু করা বছরে অবকাঠামো থেকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদ কাজে লাগানোর ওপর জোর বিশ্লেষকদের।
অর্থনীতিবিদ ও বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘৬০ থেকে ৭০ শতাংশের বেশি খরচ করা যায় না। সরকার বড় করে যদি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য, তাদের বাড়ি, গাড়ি কেনার জন্য ব্যয় করে তাহলে তো হবে না। প্রোডাক্টিভ পারপাসে এটাকে ব্যয় করতে হবে।’
দেশে গত বছর দীর্ঘদিন ধরে হামের রুটিন টিকার সংকট ছিল বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সাল থেকে তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকার সংকট নিয়ে অন্তত ১০ বার সতর্ক করেছিল; কিন্তু পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর ইউনিসেফ বাংলাদেশ কার্যালয়ের জেপিজি কনফারেন্স রুমে আয়োজিত হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ও চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রমবিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৭৮ লাখ হামের টিকা আসে, যা মোট চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। দেশে বছরে প্রায় ৭ কোটি হামের টিকার প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত রুটিন টিকা পাওয়া যায়নি।
ইউনিসেফ জানায়, টিকার ঘাটতি নিয়ে ২০২৪ সাল থেকে অন্তত ১০টি বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেওয়া হয়। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত থাকায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। ফলে দেশে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে চলতি বছরের মে মাসে দেশে আবার হামের রুটিন টিকা আসতে শুরু করেছে। এখন দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আওতায় আনা এবং আক্রান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা।
ইউনিসেফের ভাষ্য, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘ্ন হওয়া উচিত নয়। সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘কোনো মহামারি রাতারাতি ঘটে না। কিছু বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, বিশেষ করে টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক সায়েদুর রহমানের দাবি—ইউনিসেফ তৎকালীন সরকারকে হামের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সতর্ক করেনি—এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রানা বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ নেই। তবে তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হবে। আমরা ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ-ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি, যার মধ্যে শেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে পৌঁছেছিল।’
রানা আরও বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের জন্য বারবার চাপ দিয়েছি। আমি ও আমার সহকর্মীরা অন্তত ১০ বার বৈঠকে বলেছি যে—আমরা টিকার সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। দেশে টিকা আনতে না পারলে সমস্যা তৈরি হবে, এটি স্পষ্ট ছিল।’
গত দুই বছরে বাংলাদেশে টিকার সংকট ছিল কি না—এমন প্রশ্নে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘আমরা ২০২৪ সালেই টিকার সংকটের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। এটি পরবর্তী দুই বছরে বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করেছিলাম।’
ইউনিসেফের প্রতিনিধি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষণীয় অনেক বিষয় রয়েছে। এখন কাউকে দোষারোপ করার কিছু নেই। এখন এমনভাবে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এই দেশের কোনো শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা না যায়।’
টিকা কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে রানা বলেন, ‘আমরা যা যা কিনি, তার জন্য জনসম্মুখে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান সবচেয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতি। তবে টিকার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন, কারণ, এটি একটি অত্যন্ত বিশেষায়িত পণ্য। এখানে আপনি শুধু এক লাখ মানুষের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক কিনছেন না, আপনার লক্ষ্য অনেক বড়সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে, আপনার কাছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত টিকা আছে। তাই আপনি সবচেয়ে সস্তা টিকার পেছনে ছুটবেন না। আপনি সেই টিকাই নেবেন, যেটার কার্যকারিতা প্রমাণিত এবং যার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তাই ইউনিসেফ বহু বছর আগে বিশ্বের জন্য টিকা সংগ্রহ ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’
ইউনিসেফ প্রতিনিধি বলেন, ‘আমরা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের পক্ষ থেকে টিকা সংগ্রহ করি। টিকা প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের মান নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। যেহেতু আমরা অনেক বেশি পরিমাণে কিনি, তাই আমরা দামে সাশ্রয় করতে পারি। ইউনিসেফ যে দামে টিকা পায়, তারচেয়ে কম দামে দরপত্র পাওয়া সম্ভব নয়, আমরা তা জানি।’
অস্থিরতা ও নানা সংকটে চলছে রাজস্ব আহরণ। এর ফলে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ হচ্ছে না। দিন দিন বাড়ছে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ। ইতোমধ্যে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ছাড়াল এক লাখ চার হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। বুধবার (২০ মে) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আয়কর, মূসক (ভ্যাট) ও শুল্ক মিলিয়ে আদায় হয়েছে তিন লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম আহরণ হয়েছে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা।
অপরদিকে, রাজস্ব ঘাটতি থাকলে রাজস্ব আহরণ প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল দুই লাখ ৯৫ হাজার ৬০০ কোটি ৭৩ টাকার। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে শুল্ক, মূসক ও আয়করে খাতগুলোতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে শুল্কে ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ, মূসক বা ভ্যাটে ১১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ ও আয়করে ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের এপ্রিলে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হাজার ৬০৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, আহরণ হয়েছে ৩৯ হাজার ৬০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে ৩৬ হাজার ৬০৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার রাজস্ব আহরণ হয়েছিল। সে হিসাবে এপ্রিলে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। এপ্রিলে শুল্কে ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ, আয়করে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তবে ভ্যাটে প্রবৃদ্ধি হয়নি। এতে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে তিন দশমিক ১৭ শতাংশ।