বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ১৯৮১ সালের ৮ ডিসেম্বর মাত্র ২৬ বছর বয়সে মুনসেফ (সহকারী জজ) হিসেবে বিচারিক জীবন শুরু করেন। তারপর চার দশকের বিচারিক কর্মজীবন পার করে ২০২২ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর ওই বছরের ৯ অক্টোবর তিনি আনুষ্ঠানিক বিচারিক কাজ থেকে অবসরে যান। সম্প্রতি তিনি দৈনিক বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আব্দুল জাব্বার খানকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শোনালেন তার ৪১ বছরের বিচারিক জীবনের কথা।
দৈনিক বাংলা: অবসরকালীন জীবন কেমন কাটছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: ভালোই কাটছে। তবে ব্যস্ততা কমেনি। মনে হয় আরও বাড়ছে। অবসরে অবসর কোথায়? হা হা…
দৈনিক বাংলা: স্বাধীন বাংলাদেশের তৃতীয় কোনো নারী বিচারক হিসেবে বিচার বিভাগে যাত্রা শুরুর পর সর্বোচ্চ আদালত থেকে অবসরে গেলেন। সব মিলিয়ে একজন নারীর বিচারক হিসেবে দীর্ঘ এই পথচলা কতটা সহজ ছিল?
কৃষ্ণা দেবনাথ: দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭২ সালে যখন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যাত্রা শুরু হয়, তখনই কিন্তু বাংলাদেশে মেয়েরা জুডিশিয়াল সার্ভিসে আসতে পারেনি। নারীদের জন্য জুডিশিয়াল সার্ভিসে যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। প্রথমেই আমরা পুরুষদের থেকে তিন বছর পিছিয়ে যাই। দেশের বিচার বিভাগের যাত্রা শুরুর তিন বছর পরে নারীদের যাত্রার পরও আজকে নারীদের অবস্থান কোথায় সেটা দেখতে হবে। আমি নারী বিচারক হিসেবে যাত্রা শুরু করেছি ১৯৮১ সালে। প্রথম এসেছিলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, দ্বিতীয় যাত্রা শুরু করেছিলেন বিচারপতি জিনাত আরা। আর তৃতীয় হিসেবে যুক্ত হই আমি। সৌভাগ্যের ব্যাপার হলো, আমরা তিনজনই আপিল বিভাগ থেকে অবসরে গিয়েছি। এটা ভাবতে ভালো লাগে।
নারী হিসেবে বিচারিক জীবনের তেমন কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। তবে নারী বিচারকদের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়, তাদের সাংসারিক জীবন নিয়ে। কেননা, এটা বদলির চাকরি। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় বদলির কারণে সংসারটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটা অনেক কষ্টসাধ্য। এ ছাড়া বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা তো ছিলই।
দৈনিক বাংলা: সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক হবেন এমন স্বপ্ন কি বিচারিক জীবনের শুরুতে কখনো দেখেছিলেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: না, এমনটি কখনোই ভাবিনি। এমনকি হাইকোর্টেও থাকাকালীন ভাবিনি যে আমি আপিল বিভাগে যাব। স্বপ্নও ছিল না। তবে আমার স্বপ্ন ছিল আমি জজ হব।
দৈনিক বাংলা: অনেক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীরাই এখন প্রায় বেঁচে নেই, আপনি কি মনে করেন এখন নতুন যারা আসছেন, তারা সেই খ্যাতিম্যান আইনজীবীদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে উঠছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: দেখেন এটা শুধু আইনজীবীদের মধ্যে নয়, শিক্ষা, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই একই অবস্থা। সবখানেই অবক্ষয়। ধরেন আমার বাবা যে পরিমাণ লেখাপড়া করে জ্ঞান অর্জন করেছেন আমি তো মনি করি না, আমার সেটুকু আছে। কিন্তু আমি আশাবাদী নতুন প্রজন্ম থেকে অনেক ট্যালেন্ট উঠে আসছে, আসবে। একসময় নামকরা আইনজীবীরা ছিলেন। তারপর তাদের উত্তরসূরিরা এসেছেন। ঠিক এমনি করেই নতুনরা আইনজীবী হয়ে উঠবেন। এখন যারা নবীন আইনজীবী তাদের জন্য একজন ভালো আইনজীবী হিসেবে গড়ে ওঠার এটা মোক্ষম সময়। তার কারণ জায়গাটা এখন অনেক খালি, সবকিছু প্রস্তুত হয়ে আছে, এখন দরকার শুধু অধ্যবসায়ের।
দৈনিক বাংলা: আপনার অবসর জীবনের শেষ দিনে বলেছিলেন, বিচারক নিজেকে স্বাধীন মনে না করলে সুবিচার সম্ভব না। এর মানে আপনি কী বুঝিয়েছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এই বাক্যটি আমি শুধু কথার কথা হিসেবে বলিনি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেই বলেছি। এখনো বিশ্বাস করি, একজন বিচারক নিজেকে যদি স্বাধীন মনে না করেন, তাহলে কাগজে-কলমে স্বাধীনতা দিয়েই কী লাভ। একজন বিচারক নিজের বিবেককে প্রশ্ন করবেন তিনি নিজে স্বাধীন কি না। কাগজে-কলমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে মাত্র কিছু বছর আগে। তার আগে আমরা বিচারকরা তো নিজেদের পরাধীন মনে করিনি, বিচারের কাজটি কিন্তু স্বাধীনভাবেই করেছি।
আমি মনে করি, একজন বিচারক মনেপ্রাণে নিজেকে স্বাধীন মনে করেন কি না, সেটাই বড় কথা। আমি জোর গলায়, দ্ব্যর্থহীনভাবে বলি ৪১ বছরে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন পদে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এই সময়ে তো আমার কাছে কোনো তদবির আসেনি। নিজেকেই সেই জায়গা তৈরি করে নিতে হবে। আমি যখন বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি, তখন অনেক জুনিয়র বিচারক বলতেন তদবির আসে। আমি তখন তাদের বলেছি, কই আমার কাছে তো কোনো তদবির আসে না। তদবির যাতে না আসে সেই পরিবেশ আপনার নিজেকেই তৈরি করে নিতে হবে। বিচারকের স্বাধীনতার বিষয়টি নিজের সততা দিয়ে তৈরি করে নিতে হয়।
তদবির না শুনে একবার এক ব্যক্তিকে জামিন দিইনি বলে সেই সময় আমাকে মেহেরপুরের জেলা জজ থেকেও বদলি করা হয়েছিল। জেলা জজ থেকে সাড়ে চার বছর আমাকে কর্নার করে রাখা হয়েছিল। দুটি জেলার জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর স্পেশাল জজ করে রাখা হয়েছিল। আমি তো তখনো ভয় পাইনি। আমার কথা হলো, নিজেকে স্বাধীন রাখতে হলে বদলির ভয় করলে চলবে না। কী আর করবে বাংলাদেশের ভেতরেই তো বদলি করবে, আর তো কিছু না। বিচারক যদি বদলির ভয় বা নিজের লাভ-ক্ষতির চিন্তা করেন তাহলে তিনি স্বাধীন বিচারক হিসেবে কীভাবে কাজ করবেন। করতে পারবেন না। বিচারককে তার নিজের সততার ওপর শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। এখন কিন্তু দেওয়ানি মামলায় আপস করার সুযোগ আছে। লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে মামলা আপসের সুযোগ আছে। এখন যদি এটা ভালোভাবে কার্যকর হয়, তাহলে ৫০ শতাংশ মামলাই আসবে না। এটা যদি সফল করা যায়, তাহলে মামলার জট অনেক কমে আসবে।
দৈনিক বাংলা: একটি মামলা শেষ করতে বছরের পর বছর লাগে কেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: মামলা শেষ করতে পক্ষগণেরই জোরালো পদক্ষেপের প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেক সময় কোনো না কোনো পক্ষই চায় না, দ্রুত মামলা শেষ হোক। মামলার জট সৃষ্টির পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর জন্য শুধু বিচারকরা দায়ী তা বলা যাবে না বরং বাদী-বিবাদী, দুই পক্ষের আইনজীবীদেরও দায় রয়েছে। একটি মামলার নিষ্পত্তির জন্য কম করে হলেও পাঁচটি পক্ষের সমন্বয় দরকার পড়ে, তবেই মামলার নিষ্পত্তি ঘটে।
এ ছাড়া বিচারকসংকট রয়েছে বড় আকারে। এত বিশাল মামলার জট দ্রুত কমাতে হলে বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। যেটা সরকারের পক্ষে সম্ভব না।
দৈনিক বাংলা: বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ছোটখাটো যেকোনো বিষয়েই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, কেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এখন কিন্তু পত্রিকা খুললেই দেখা যায় হাইকোর্টের বিভিন্ন সংবাদ বা নির্দেশনা নিয়ে খবর ছাপানো হয়েছে। চোখ মেললেই কোর্ট-কাচারির খবর পাওয়া যায়। এর কারণ হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ায় ভুক্তভোগীকে হাইকোর্টে আসতে হচ্ছে। এটার একটা ভালো দিক আছে, মানুষ আদালতে এলে প্রতিকার পায়। আবার কিছু সময় দেখি একটা সাধারণ বিষয় নিয়েও মানুষকে হাইকোর্টে আসতে হয়। স্থানীয় প্রশাসন যদি সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করে তাহলে কিন্তু আদালতের ওপর এই চাপ আসে না। তারা সেটি করছে না। অনেক সময় আদালতের নির্দেশের পরও অনেক কিছু বাস্তবায়ন করা হয় না। এটা ভালো দিক না।
দৈনিক বাংলা: বিচার বিভাগকে কি আরও শক্তিশালী হতে হবে, নাকি শক্তিশালীই আছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: বিচার বিভাগকে কেউ শক্তিশালী করে দেবে না। বিচার বিভাগকে নিজেকেই শক্তিশালী হতে হবে। একটা আদেশ হওয়ার পর ঝড়ঝাপটা আসতে পারে। সেটা বহন করার মতো বিচারক যদি আমরা হতে পারি তাহলে বিচার বিভাগ শক্তিশালী হবে। বিচারক যদি সেই ঝড়ঝাপটা সইবার ক্ষমতা না রাখেন তাহলে সেটা হবে না।
দৈনিক বাংলা: বার ও বেঞ্চের সম্পর্ককে বলা হয় একটি পাখির দুটি ডানা। সম্প্রতি বিভিন্ন বারে আইনজীবী ও বিচারকদের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে, এটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: সর্বজনীনভাবে আমি বলব, সাবলীল সম্পর্ক হ্রাস পেয়েছে। অনেক আগে থেকেই এই সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। অনেক সময় বিচারকের দরজায় লাথি দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সার্বিকভাবে বলব আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যে সম্পর্ক অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। আমার বক্তব্য হলো, একজন বিচারক যেহেতু একটু ওপরে বসেন, আইনজীবীরা একটু নিচে দাঁড়ান, এই যে বিচারকরা একটু অগ্রাধিকার স্থানে থাকেন সে জন্য বিচারকদের অনেক কিছু করা যায়, অনেক কিছু করা যায় না। সেটি তাদের মাথায় থাকতে হবে। এ ছাড়া আইনজীবীদেরও সহিষ্ণু হতে হবে। দুপক্ষই যদি সহিষ্ণু হয় তাহলে কিন্তু সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরবে না।
আদালতের মর্যাদা কমলে কিন্তু আইনজীবীদেরই মর্যাদা কমবে। এটা তাদের বুঝতে হবে। কোনো বিচারকের ভুল হলে আইনজীবীরা তার ওপরের বিচারককে বলতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট আছে, আইন মন্ত্রণালয় আছে। সেখানে বলার সুযোগ আছে। কিন্তু তাই বলে স্লোগান দেয়া উচিত না। এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার সময় এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
দৈনিক বাংলা: দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক জীবনে পূরণীয় ঘটনা বা অপ্রাপ্তি বলে কিছু আছে কি না?
কৃষ্ণা দেবনাথ: মানিকগঞ্জে একটি অ্যাসিড নিক্ষেপ মামলায় আসামিকে সাজা দিতে পারিনি, এই একটি বিষয় আমার মনে এখনো গেঁথে আছে। আইনজীবীর ভুলের কারণে সেই আসামিকে সাজা দিতে পারিনি। যে কারণে খুব কষ্ট লেগেছিল। কারণ মামলায় আসামি শনাক্ত একটা বড় ব্যাপার। মামলায় বলা হয়েছে, চাঁদের আলোতে আসামিকে দেখা গেছে। কিন্তু পঞ্জিকাতে দেখা গেল সেদিন অমাবস্যা ছিল। তার ওপর আবার সেদিন ওই এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। আইনজীবী মামলা শক্ত করতে গিয়ে চাঁদের আলোতে দেখেছে বলে বিবরণ দিয়েছেন কিন্তু সেদিন সেটা ছিল না। যে কারণে আসামি শনাক্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরঞ্জিত বিবরণ মূল ঘটনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ ছেলেটি মেয়েটিকে স্কুলে যাওয়ার সময় উত্ত্যক্ত করত, সেটি উল্লেখ থাকলেও হতো। অতিরঞ্জিত করার কারণে আসামি বেঁচে যায়। এই ঘটনা আমাকে পীড়া দেয়। তার কারণ চোখের সামনে দেখেছিলাম মেয়েটির ঝলসানো মুখ। কিন্তু তার ন্যায়বিচার আমি দিতে পারিনি।
দৈনিক বাংলা: দীর্ঘ ৪১ বছরের বিচারিক জীবনে আপনি কতজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছেন?
কৃষ্ণা দেবনাথ: এটা বলতে পারব না। তার কারণ, আমি গুনে রাখিনি। তবে সর্বোচ্চ সাজা দেয়ার ব্যাপারে আমি অনেক সতর্ক ছিলাম। আমি দুইয়ে দুইয়ে চার না হওয়া পর্যন্ত কাউকে সাজা দিইনি। অনেক আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েও আমি স্বস্তি পেয়েছি। তার কারণ অকাট্য দলিল-প্রমাণ ছিল। সব থেকে বড় স্বস্তি পেয়েছি, যখন আমি ঢাকার জেলা জজ ছিলাম। বঙ্গবন্ধু হত্যার ফাঁসির আসামিদের সাজা কার্যকর হবে। তখন ফাঁসির আদেশ কার্যকর করার জন্য শেষ যে স্বাক্ষর দিতে হয়, জেলা জজ হিসেবে সেটা আমি দিয়েছিলাম। ওই দিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমার কাছে লাল নথি এল, আমি তাতে স্বাক্ষর করলাম। এরপরই টিভিতে দেখলাম কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকর শুরু করেছে। ঐতিহাসিক সেই মামলাটিতে শেষ স্বাক্ষর করেছিলাম। এটা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
দৈনিক বাংলা: অবসরে কেমন কাটছে?
কৃষ্ণা দেবনাথ: অবসরে একদমই অবসর নেই। আমি রুট (প্রান্তিক) লেভেলের ভিকটিমদের নিয়ে কাজ করতে চাই। সেটাই শুরু করেছি। দেখা যাক কতটা করতে পারি।
দৈনিক বাংলা: ধন্যবাদ আপনাকে।
কৃষ্ণা দেবনাথ: আপনাকেও ধন্যবাদ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দূরদর্শী, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আজ এক অভিনন্দনবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে দেশের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ ভাষণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা ও অবস্থানকে আরও সমুন্নত করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর গণতন্ত্রের পথে অগ্রযাত্রা এবং একই সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের পাশাপাশি একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় উঠে এসেছে। দেশের পুনর্গঠনে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ এই ‘থ্রি আর’ কৌশলের কথাও তিনি তুলে ধরেছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, বিশ্বশান্তি, বহুপাক্ষিকতা, ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, নারী ও যুবসমাজের ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন।
অভিনন্দনবার্তায় তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে সৃষ্ট তীব্র চাপ, জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টি এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির সঠিক চিত্র ফুটে উঠেছে।
জাতিসংঘকে ‘একটি সমঝোতামূলক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু’ হিসেবে দেখার প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সংঘাতময় বিশ্বে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার এ আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’ প্রত্যয়ের উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ বক্তব্যে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়াকে রাষ্ট্রপতি একটি জাতির জন্য গৌরবময় ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য এবং তাঁর নিরাপদ ও সফল সফর কামনা করেন। সূত্র: বাসস
কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত টার্মিনাল আগামী সপ্তাহে অভ্যন্তরীণ যাত্রী পরিবহনের জন্য চালু হবে। অক্টোবরে পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর আগে এই পদক্ষেপ পর্যটনের প্রবেশদ্বারটিকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করার পথে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, আগামী সপ্তাহ থেকে নতুন টার্মিনালটি অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমনের উভয় কাজে ব্যবহার করা হবে।
গত বুধবার কক্সবাজারে চূড়ান্ত প্রস্তুতি পরিদর্শন করা বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, বিমানবন্দরে পরিচালনাকারী সব অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনস তাদের যাত্রী ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নতুন টার্মিনালে স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, প্রাথমিকভাবে বিমান ও টার্মিনাল ভবনের মধ্যে যাত্রী পরিবহনে এয়ারলাইনসগুলো গলফ কার্ট ব্যবহার করবে।
তিনি আরো বলেন, অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনার পর আগামী মাসে এই বিমানবন্দর থেকে আমরা আন্তর্জাতিক কার্যক্রম উদ্বোধন করব।
নভোএয়ারের মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস বিভাগের পরিচালক সোহেল মজিদ জানান, নতুন টার্মিনালটি যাত্রীদের জন্য পরিচালনার লক্ষ্যে তারা সব প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং সফলভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
তিনি বলেন, নতুন টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য গলফ কার্ট মোতায়েনসহ আমাদের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নতুন টার্মিনাল নির্মাণ এবং রানওয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে সম্প্রসারণসহ বিমানবন্দরটির উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগের পর সরকার অক্টোবরে কক্সবাজারকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এর আগে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, শেষ পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পাশাপাশি বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোও এই সমুদ্রশহর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করবে।
বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মাহবুব খান বলেন, আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু হলে টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা একটি হাইব্রিড ব্যবস্থায় পরিবর্তিত হবে।
পরিকল্পিত ব্যবস্থার আওতায় আন্তর্জাতিক আগমন ও বহির্গমন উভয় ধরনের যাত্রীই নতুন টার্মিনাল ব্যবহার করবেন।
এরপর অভ্যন্তরীণ আগমনকারী যাত্রীরা বিদ্যমান টার্মিনাল ব্যবহার করবেন এবং অভ্যন্তরীণ বহির্গমনকারী যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর বোর্ডিংয়ের অপেক্ষায় পুরোনো টার্মিনালে যাবেন।
নতুন টার্মিনালটি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেবিচক কর্তৃক বাস্তবায়িত বৃহত্তর একটি কর্মসূচির অংশ, যার লক্ষ্য কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনায় সক্ষম করে তোলা।
বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যস্ততম অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর একটি কক্সবাজার। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামা করে।
বিমানবন্দরটির সক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে বিমানবন্দরে দু’টি উন্নয়ন প্রকল্প ও একটি কারিগরি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বেবিচক।
প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের আন্তর্জাতিক টার্মিনালটি প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা অনুমোদিত ব্যয়ে একটি প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয়েছে।
টার্মিনালে ৪৫০ জন আন্তর্জাতিক যাত্রী ধারণক্ষমতার একটি ডিপার্চার লাউঞ্জ, একটি শুল্কমুক্ত দোকান, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এসকেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন ডেস্ক, বহির্গমন ও আগমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং একটি অ্যারাইভাল লাউঞ্জ রয়েছে।
বহির্গমনকারী যাত্রীদের জন্য চারটি এবং আগমনকারী যাত্রীদের জন্য ছয়টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আগমনকারীদের জন্য দু'টি লাগেজ ডেলিভারি বেল্ট সরবরাহ করা হয়েছে।
টার্মিনালে পাবলিক অ্যাড্রেস (পিএ) এবং ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম (এফআইডিএস), সাইনেজ, সিসিটিভি এবং ভারী হাতব্যাগ স্ক্যানিংয়ের সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে।
সম্প্রসারণের পর বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দু'টি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ এবং তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের একটি অ্যাপ্রন দু'টি ট্যাক্সিওয়ের পাশাপাশি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৩৫টি ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ যানবাহনের জন্য পার্কিং সুবিধা, অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় মান যাচাইয়ের পর বিমানবন্দরটি আইসিএও সনদ পেয়েছে।
রূপান্তরের আরেকটি বড় অংশ হলো রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা, যা এটিকে বাংলাদেশের দীর্ঘতম রানওয়েতে পরিণত করেছে। রানওয়ে ১ হাজার ৭০০ ফুট সম্প্রসারণের জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
সম্প্রসারিত রানওয়েটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর এবং বোয়িং ৭৪৭-৪০০ উড়োজাহাজসহ সম্পূর্ণ বোঝাই ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। চীনা যৌথ উদ্যোগ সিওয়াইডব্লিউইবি-সিসিইসিসি জেভি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে।
প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রের দিকে সম্প্রসারিত প্রায় ২ হাজার ২০০ ফুট প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং এবং নিরাপদ উড়োজাহাজ পরিচালনার সুবিধার্থে একটি ক্যাট-টু এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রানওয়েকে সুরক্ষিত রাখতে ১ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া নিরাপত্তা বেড়া, টহল সড়ক এবং ৮ হাজার ১৪৯ মিটার দীর্ঘ ড্রেনেজ ব্যবস্থাও প্রকল্পের অংশ।
সরকরের প্রত্যাশা, সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ কক্সবাজারে আরো বেশি বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে এবং হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে। সূত্র: বাসস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় ভাষণ দেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, তরুণদের সম্ভাবনা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগের কথাও তুলে ধরেন। একইসঙ্গে একটি শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও সমতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নিচে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা হলো:
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
মাননীয় সভাপতি,
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমরা আপনাকে পূর্ণ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। একইসঙ্গে আমি বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবক-কেও তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
শুরুতেই আমি বাংলাদেশের সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন তাদের অবদানকে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র-জনতার গণঅভুত্থানে সকল শহীদ এবং আহতদের প্রতিও আমি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই।
ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ।
এই বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। আমি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে অভিনন্দন জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
মাননীয় সভাপতি,
জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ এবং জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।
গ্লোবালাইজেশনের এই সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তে যা কিছুই ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানব সৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপাক্ষিক কিংবা বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্ব সমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তির অন্তরায়। শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্ব মানবতা এবং বিশ্ব শান্তির প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন আমি আজ আবারো পুনর্ব্যক্ত করছি। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।
মাননীয় সভাপতি,
চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে, জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য-‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল। ‘পিসবিল্ডিং কমিশনে’র ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ এ বছর ‘উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে।
অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিবাসীগণ তাদের জন্মভূমি এবং অভিবাসিত দেশ, উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে।
মাননীয় সভাপতি,
বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।
এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে।
পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্যও আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
মাননীয় সভাপতি,
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবেলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। সুতরাং, ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কপ-৩১-এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করছে।
বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্মসূচি জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে। ক্লিন এনার্জি এবং সোলার এনার্জি ব্যাবহারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। দেশকে বন্যা-খরার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছে।
বাংলাদেশে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ‘সুন্দরবনে’ মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু করেছে। একইসঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদার করার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে সরকার ১৯৯২ সালের ‘ওয়াটার কনভেনশন’ স্বাক্ষর করেছে।
মাননীয় সভাপতি,
দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণের অবসান ঘটিয়ে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে। ফ্যাসিবাদী শাসন শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার রিকভারি, রেস্টারেশন ও রিকনস্ট্রাকশন অর্থাৎ ৩-আর কৌশল অনুসরণ করছে।
বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তাঁর উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থ বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।
মাননীয় সভাপতি,
দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।
শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয় সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছে। সেই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ড এর মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে।
প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে।
প্রতিটি সেক্টরে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
মাননীয় সভাপতি,
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি’র ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে।
সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর এবং গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে এবং একইসঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্পোর্টসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপি বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি এবং ব্যাবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ এবং পোশাক অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেয়া হচ্ছে। সরকার আশা করে, এর ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর হার এবং স্কুলে শিক্ষার মান বাড়বে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে প্রথমবারের মতো ‘স্পোর্টস’কেও একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত জুন মাসে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারাদেশে মাসব্যাপী আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে ২ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।
মাননীয় সভাপতি
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই গড়বে আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়ো- টেকনোলোজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।
আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক। বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায় এ ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
মাননীয় সভাপতি,
বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে এই উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা ও সম্প্রসারণ কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি।
কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে, বিশ্ব সমাজকে টিকে থাকতে হলে অবশ্যই একের প্রতি অন্যের সহায়তা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসা-সামগ্রী ও রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি। যাতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়।
মাননীয় সভাপতি,
রাষ্ট্রের নাগরিকদেরকে ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ স্বনির্ভর কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই যে রাষ্ট্রে দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে।
মাননীয় সভাপতি,
গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরকার ব্যাবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশবান্ধব একটি নিরাপদ এবং স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে চলছে।
বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অংশীদারিত্ব উদ্ভাবন এবং দেশি বিদেশী বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে, নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সকল সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে, সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সকল নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি পুনরায় বাংলাদেশের অকুন্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে আমার বক্তব্য শেষ করছি।
মাননীয় সভাপতি আপনাকে ধন্যবাদ,
আল্লাহ হাফেজ
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার রিকভারি, রেস্টারেশন ও রিকনস্ট্রাকশন অর্থাৎ থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের (ইউএনজিএ) সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তাঁর ভাষণে প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানব সম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।’
তারেক রহমান বলেন, ‘ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তাঁর উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়।’
তিনি জানান, ‘দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্ট আপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থ বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশন ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের একটি যৌথ প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
ব্রিটিশ হাইকমিশনের গভর্নেন্স অ্যাডভাইজার লুইস বেননের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধিদলে ছিলেন ঢাকায় অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকমিশনের পলিটিক্যাল কাউন্সিলর রায়ান ডানকানসন, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চিফ অব পার্টি আমিনুল এহসান এবং সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর লিপিকা বিশ্বাস।
বৈঠকে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গঠন ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা সংশোধন আইন ২০২৬ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রাজনৈতিক ও বহিরাগমন ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে আরও ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কিনবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এ বিষয়ে বোয়িংয়ের সঙ্গে একটি চুক্তি সই হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলের লবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
মাহদী আমিন বলেন, ‘বোয়িংয়ের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে চুক্তি করেছে।’
চুক্তি সই অনুষ্ঠানে মার্কিন সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লান্ডাউ, আন্ডার সেক্রেটারি অব কমার্স উইলিয়াম কিমিট এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর।
মাহদী আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। নতুন নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। এ চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে।
তিনি আরও জানান, বোয়িংয়ের একটি প্রতিনিধিদল পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে।
রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান: সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্যও তুলে ধরেন মাহদী আমিন। এদিন স্বাস্থ্য, কৃষি, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে একাধিক বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গেটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে বৈঠকে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে সহযোগিতা বাড়ানো, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘের সাইডলাইনে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মাহদী আমিন বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় তাদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিতে বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে।’
ক্রোয়েশিয়া ও ইরানের সঙ্গে বৈঠক: মাহদী আমিন জানান, ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অভিবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে বলে জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে। প্রয়োজনে বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে সংলাপের সুযোগ তৈরিতে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে।’
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি, বাণিজ্য ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা বিবেচনায় নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি আলোচনায় তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জলবায়ু অর্থায়নে জোর: জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন।’
কার্বন নিঃসরণ কমাতে নদী-খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, নবায়নযোগ্য ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চীন ও ভারতের ভূমিকা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়—দুই পর্যায়েই সংশ্লিষ্ট দেশ ও অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার এবং রোহিঙ্গাসংকট সমাধানে দেশটির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনার পথ খোলা রাখা হচ্ছে। ‘‘কূটনীতিতে সব দরজা এবং সব বিকল্প খোলা রাখতে হয়। আলোচনার পথ কখনো বন্ধ করা যায় না’’,’ বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘সমুদ্রের উচ্চতার সঙ্গে আমাদের সংকল্পও আরও দৃঢ় হোক, আর আমাদের পদক্ষেপ হোক তার চেয়েও দ্রুত।’
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি মোকাবিলা করা বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একার পক্ষে সম্ভব না। এ জন্য বৈশ্বিক সহায়তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ব যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, সাগর তার প্রতিটি টনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। শুধু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে এর প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপ। দেশের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে শত শত নদী প্রবাহিত হয়ে সাগরে মিশেছে। তাই দেশের মানুষের জীবন, সমৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ উপকূলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা হুমকির মুখে পড়বে।
সীমিত সম্পদ নিয়েও বাংলাদেশ এমন একটি বিপর্যয়কর ভবিষ্যৎ ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর অংশ হিসেবে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার এবং উপকূল সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু সহনশীলতা আরও শক্তিশালী করতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পানি সংরক্ষণ ও মজুতের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ।’
বাংলাদেশ সবুজ প্রবৃদ্ধির পথেও এগিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
একই সঙ্গে সবুজ শিল্প ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রসার, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থার সুরক্ষা জোরদারে কাজ চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলায় চারটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রথমত, বৈশ্বিক নিঃসরণ আরও দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায়সংগতভাবে কমাতে হবে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার মধ্যে রাখার লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে হবে।’
‘দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
‘তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, তথ্য-উপাত্ত ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ করতে হবে।’
‘চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সমুদ্র দ্রুত উচ্চতর হচ্ছে। আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও তার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। ভবিষ্যৎ ও আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে, ঘোষণাপত্রে দেওয়া অঙ্গীকারগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেবে এবং কোনো দেশকে যেন একা ‘রাইজিং টাইড’- এর মুখোমুখি হতে না হয়, তা নিশ্চিত করবে।’
বৈঠক আয়োজন এবং ঘোষণাপত্র প্রণয়নে সহায়তা ও প্রচেষ্টার জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমান।
খলিলুর রহমানের কার্যালয়ের বিভিন্ন পদে রয়েছেন মোট ৪০ জন। তাদের মধ্যে জাইমা রহমানসহ ছয়জন বাংলাদেশি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ৮ সেপ্টেম্বর। তার সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার ভাষণ দেবেন তারেক রহমান।
জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাইমা রহমান খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে আইন কর্মকর্তা হিসেবে আইনি বিষয়গুলো দেখাশোনা করবেন।
জাইমা রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের একমাত্র মেয়ে। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি।
জাইমা রহমান আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে যুক্তরাজ্যে বার-অ্যাট-ল করেন। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের আইনজীবী তালিকাভুক্তির প্রথম ধাপের পরীক্ষাতেও তিনি উত্তীর্ণ হন।
রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় আদালত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওকে কেন্দ্র করে রাকিবুল হাসানকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। ওই অডিওতে সরকার, প্রশাসন, পুলিশ ও বিভিন্ন বাহিনী নিয়ে বক্তব্য শোনা যায়।
অডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করে ডিএমপি সদর দপ্তরের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। ডিএমপির অফিস আদেশে প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে ‘প্রশাসনিক কারণ’ উল্লেখ করা হয়েছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিওতে এক ব্যক্তিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ এবং পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে কথা বলতে শোনা যায়। পাশাপাশি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথাও অডিওতে ছিল।
অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ডিএমপি তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে ডিএমপির উপকমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ছিলেন এবং কমিটি তদন্ত শুরু করেছিল।
পরে ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে রাকিবুল হাসানকে মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। ডিবির পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, ছড়িয়ে পড়া অডিও নিয়ে চলমান অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
রাকিবুল হাসান অবশ্য ওই অডিওর বক্তব্য অস্বীকার করেছিলেন। তার দাবি ছিল, অডিওটি তার নয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পুলিশের একাধিক সূত্র অডিওটির কণ্ঠ রাকিবুল হাসানের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছিল। তবে অডিওটির সত্যতা বা কণ্ঠের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ফরেনসিক প্রতিবেদন প্রকাশের তথ্য আগে পাওয়া যায়নি।
অডিওকাণ্ডের এক সপ্তাহের মধ্যে বৃহস্পতিবার রাকিবুল হাসানকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করা হলো। আদালত সূত্র জানিয়েছে, মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হচ্ছে।
তবে মামলাটি কে করেছেন, কখন মামলা হয়েছে এবং মামলায় তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী অভিযোগ আনা হয়েছে—এসব বিষয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
আদালতে হাজির করার পর তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হবে কি না, সে বিষয়েও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটির পর ভাইরাল অডিও, এর উৎস ও সত্যতা এবং সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া এখন কোন দিকে যায়, সেটিই দেখার বিষয়।
নারীরা যত দিন রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হতে না পারবেন, তত দিন তাদের প্রতি অবজ্ঞা দূর হবে না বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজের প্রধান আহ্বায়ক ড. দিলারা চৌধুরী। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে ‘জুলাই আন্দোলন ও নারী অধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এ কথা বলেন। আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজ এ সেমিনারের আয়োজন করে।
দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অসংখ্য নারীর সাহসী অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ আন্দোলনকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ওই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আইনের শাসন, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য নতুন ভবিষ্যৎ তৈরির প্রত্যাশা করেছিলেন নারীরা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে সেই প্রত্যাশার প্রতিদানে আজ অসংখ্য নারী অবহেলা, নিরাপত্তাহীনতা ও হতাশার শিকার হচ্ছেন।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নারীর ওপর সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের একের পর এক ঘটনা গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। নারী নির্যাতন, নারীর মর্যাদাহানি, প্রকাশ্য দিবালোকে মারধর, অপমান ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের মতো ঘটনা ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু নারীর মৌলিক অধিকার ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করছে না, একই সঙ্গে আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।’
সেমিনারে বক্তারা গত কয়েক মাসে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে নারী নির্যাতন বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সেমিনারে আলোচনায় অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘নারীর অধিকারের বিষয়ে সব নাগরিকের ইতিবাচক ভূমিকা জরুরি। পুরুষের সঙ্গে নারীর অধিকার সাংঘর্ষিক নয়।’ দেশের বেশির ভাগ মসজিদে নারীদের প্রবেশাধিকার না থাকার বিষয়টি দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতাদের নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক উপস্থিতির বিষয়ে সম্মান দেখানোর আহ্বান জানান তাজুল ইসলাম।
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, ‘দেশের ২ শতাংশ মানুষ বাদে বাকি ৯৮ শতাংশ মানুষের ওপর জুলুম করা হচ্ছে। কেউ জুলুমের শিকার হয়ে জুলুমবাজ হয় না; অথচ আমরা এমন একটি সমাজ তৈরি করছি, যেখানে সবাই জুলুমবাজ হতে চায়।’
অল্টারনেটিভসের সংগঠক ডা. তাজনূভা জাবীন বলেন, ‘জুলাইয়ের নারীরা প্রতি মুহূর্তে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন।’ নারীদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, ‘রাজনীতি ও নির্বাচনে শুধু নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি করলেই হবে না। নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত না করতে পারলে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব হবে না।’
সংগঠনের সহআহ্বায়ক ফাহিম মাসরুরের সঞ্চালনায় সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের আরেক সহআহ্বায়ক রুবি আমাতুল্লাহ।
‘রুপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বঙ্গভবনের সিংহ পুকুরে ৪০০ কেজি রুই জাতীয় মাছের পোনা অবমুক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ কর্মসূচিতে তিনি এসব পোনা অবমুক্ত করেন।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাষ্ট্রপতি ১৬০ কেজি রুই, ১২০ কেজি কাতলা, ৮০ কেজি মৃগেল এবং ৪০ কেজি কালিবাউশ মাছের পোনা পুকুরে ছাড়েন। পোনা অবমুক্তকরণ শেষে দেশ ও জাতির কল্যাণ, সমৃদ্ধি এবং উত্তরোত্তর অগ্রগতি কামনা করে বঙ্গভবন জামে মসজিদের পেশ ইমামের পরিচালনায় এক বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, জন বিভাগের সচিব, প্রেস সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বঙ্গভবন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট কেটে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে দেশের বাজারেও দ্রুত মূল্য সমন্বয়ের চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের দামের পাশাপাশি পরিবহন ও বীমা ব্যয়ের পরিবর্তনের প্রভাবও দেশের বাজারে পড়ে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে মেহেরপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং সরকারি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বাংলাদেশ জ্বালানি তেলের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে যেসব উৎস থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, সেসব অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও বীমা খরচও বেড়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও সরকার দীর্ঘ ছয় মাস দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দ্রুত কেটে যাবে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামও স্থিতিশীল বা কমতে পারে। তখন দেশের বাজারেও দ্রুত মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, জ্বালানি তেলের দাম নতুন করে বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই; আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুকূলে এলে দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের পাশাপাশি আমদানি-সংশ্লিষ্ট ব্যয় বেড়েছে বলে তিনি জানান। ফলে দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে শুধু আন্তর্জাতিক তেলের দাম নয়, পরিবহন ও বীমা ব্যয়ের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের যোগান বাড়াতে বাসাবাড়ি এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে মানসম্মত সরঞ্জাম আমদানির জন্য নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে বলে তিনি জানান।
মেহেরপুরের সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল সংকটের বিষয়েও কথা বলেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদ থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল নেই। এসব শূন্য পদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে জেলার নাগরিক সেবার মান বাড়ানো যায়।
মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়ের সভাপতিত্বে জেলা পরিষদের প্রশাসক জাভেদ মাসুদ মিল্টন, বিজিবি-৬-এর পরিচালক নাজমুল হাসান, পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
এক দিনের সফরে বৃহস্পতিবার সকালে সড়কপথে কুষ্টিয়া থেকে মেহেরপুরে যান প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। পরে তিনি জেলার বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
টাঙ্গাইলের বাসাইলে ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব ঢালাইয়ে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনায় উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান প্রকৌশলী (গ্রেড-১) মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে তাকে বাসাইল উপজেলা থেকে বান্দরবন জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অফিস আদেশ বলা হয়েছে-“স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিম্নবর্ণিত কর্মকর্তা-কে তাঁহার নামের পার্শ্বে বর্ণিত পদবি ও কর্মস্থলে স্ব-বেতন স্কেলে বদলি করা হইল। বর্ণিত কর্মকর্তা আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল হইতে অবমুক্ত হয়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করিবেন; অন্যথায় আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর অপরাহ্ণে তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) বলে গণ্য হইবেন। একই সাথে আর্থিক ক্ষমতাসহ উপজেলা প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব (৬ষ্ঠ গ্রেডভুক্ত উপজেলা প্রকৌশলী পদায়ন না করা পর্যন্ত) প্রদান করা হইল।” বাসাইল উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান তার স্ট্যান্ড রিলিজের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এদিকে, সেতুতে বাঁশ কান্ডের ঘটনাটি এখন সারাদেশে বেশ আলোচনার কেন্দুবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দফায় দফায় চলছে তদন্ত। এ ঘটনায় মামলার পর সাব-ঠিকাদার শাহ আলমকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এখন পর্যন্ত একজন উপ-সহকারীকে বরখাস্ত ও একই সঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ দুই প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যেই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে অভিযানে নেমেছে দুদক। গত বুধবার দুদক টাঙ্গাইলের কার্যালয় থেকে সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন।
দুদক টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বিপ্লব হোসেন বলেন, ‘দুদকের পক্ষ থেকে সেতুটিতে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এখানে দুর্নীতি হয়েছে। আমরা ফুটপাত স্ল্যাব ও রেলিংয়ের পিলার ভেঙে দেখেছি। এখানে রডের পরিমাণটা কম রয়েছে। রড ততটুকু থাকা দরকার, সেটুকু নেই। একই ঘটনায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।