সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন ইস্যুতে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণ। মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া, হাতাহাতি, ধাক্কাধাক্কি, হট্টগোল এবং সমিতির সম্পাদকের কক্ষের দরজা-জানালার কাচ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
দুপুর দেড়টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সম্পাদকের কক্ষের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের দাবি, বিএনপির আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন, রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে ওই দলের আইনজীবীরা সমিতির সম্পাদকের দরজা ও জানালার গ্লাস ভেঙে অনেককেই আহত করেছেন।
অন্যদিকে বিএনপির দাবি, তাদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ বাহিনী অতর্কিত হামলা করে তাদের অনেককেই আহত করেছে। এজন্য তারা নতুন করে বৃহস্পতিবার ফের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা মিছিল করতে করতে মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসেন। তখন দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এক পর্যায়ে বিএনপির মিছিলের মধ্য থেকে কয়েকজন সমিতির সম্পাদকের কক্ষের দরজা ও জানালার গ্লাস ভাঙচুর করেন। তখন সমিতির সম্পাদক আবদুন নূর দুলাল তার কক্ষে অবস্থান করছিলেন।
এক পর্যায়ে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় দুইপক্ষের অনেক আইনজীবী আহত হন। বেলা সোয়া ১টা থেকে সোয়া ২টা পর্যন্ত কয়েক শ আইনজীবী ধাক্কাধাক্কি এবং স্লোগান পাল্টা স্লোগান দিতে থাকে।
পরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে এলে বিএনপির আইনজীবীরা দ্বিতীয় তলা থেকে নেমে নিচতলায় চলে যান। সেখানে তারা বিক্ষোভ মিছিল করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন আইনজীবী আহত হয়েছেন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক আবদুন নূর দুলাল বলেন, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের আইনজীবীরা চড়াও হয়ে আমাদের ওপর হামলা করেছে। তারা পায়ে পাড়া দিয়ে আমাদের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধানোর চেষ্টা করছে। আমরা সব সময় সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছি। অথচ প্রতিদিন তারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করছে। আমাদের নারী আইনজীবীসহ অনেকেই আহত হয়েছেন। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে যা যা আইনি পদক্ষেপ নেয়া দরকার, তার সবই করব গণতান্ত্রিক পন্থায়।
বিএনপির মাহবুব উদ্দিন খোকন ও রুহুল কুদ্দুস কাজলের নেতৃত্বে এ হামলা হয়েছে বলেও দাবি করেন আবদুন নূর দুলাল।
অন্যদিকে বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের নির্দেশে পোশাকধারী পুলিশ বাহিনী আমাদের আইনজীবীদের ওপর হামলা করেছিল। আজকেও পোশাকধারী পুলিশ বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের যৌথ হামলায় আমার ভাই কাইয়ুম আহত হয়েছেন। আরও অনেক আইনজীবী আহত হয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে কার অনুমতি নিয়ে পুলিশ বাহিনী ঢুকেছে, প্রধান বিচারপতির কাছে সেই প্রশ্ন রেখে বিএনপির এ আইনজীবী বলেন, যারা আইনজীবীদের কালো কোট রক্তাক্ত করেছে, তারা আওয়ামী সন্ত্রাসী আইনজীবী ও পুলিশ বাহিনী।
আগামী বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় আবারও বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা দেন তিনি।
আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের দাবি, এ ঘটনায় তাদের আইনজীবী রিনা বেগম, নজরুল ইসলাম প্রামাণিক, আকলিমা বেগমসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। আর বিএনপির দাবি, তাদের আইনজীবী কাইয়ুম, নুরে আলম সোহাগ, ফয়সাল সিদ্দিকীসহ অনেকেই আহত হয়েছেন।
গত ১৫ ও ১৬ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে এর প্রতিবাদে এবং নতুন নির্বাচনের দাবিতে বেশ কিছু দিন থেকে বিক্ষোভ করে আসছে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরাও সমিতির সভাপতি ও সম্পাদকের কক্ষের সামনে অবস্থান নিয়ে পাল্টা বিক্ষোভ করছেন।
এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ডিম ছোড়াছুড়ি এবং হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটেছে। মাঝে রোজা ও ঈদের ছুটি যাওয়ার পর আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল সমিতি প্রাঙ্গণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের অর্জন নয়। এই অর্জন দেশের প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী ও শান্তিপ্রিয় মানুষের। যে কারণে এত মানুষ জীবন দিয়েছে, সেই জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে সরকার। আইন অনুযায়ী, অন্যায়কারী এবং হত্যাকারীদের বিচার করা হবে। বিচারের নামে যেন কারও প্রতি অবিচার না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পুনর্বাসন করা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে আগারগাঁওয়ে ‘বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে’ জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কথা বলেন।
শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে তিনি বলেন, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের পরিবার ও যোদ্ধাদের সর্বোচ্চ সম্মান, স্বীকৃতি ও জীবনমান নিশ্চিতকরণ, পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও সহায়তা প্রদানে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, সবার উদ্দেশে বলতে চাই, আপনাদের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে শুধু আমার দলেরই নয় অন্যান্য আরো রাজনৈতিক দল এবং একই সাথে যে সকল অরাজনৈতিক ব্যক্তি যারা ৫ আগস্ট (ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন আন্দোলন) সফল করেছিলেন, তাদের সবার কাছে বলতে চাই যে, আসুন আমাদের প্রতি, বাংলাদেশের লক্ষ-কোটি মানুষের প্রতি স্বৈরাচার যেমন অবিচার করেছিল, বিচারের নামে কারো প্রতি যেন অবিচার না হয় সে বিষয়টিতেও সচেতন থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান চলাকালে আমি বারবার ভাবছিলাম এই মুহূর্তে যদি আমি আমার মা’কে জিজ্ঞেস করতে পারতাম, আপনার ওপর যে অবিচার ও অন্যায় হয়েছে আপনি কি চান আমি এসবের প্রতিশোধ নিই? আমার বিশ্বাস মা বলতেন, এই মুহূর্তে তোমার কাজ সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমি জানি, আমার ভাইকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও আমাকে একই উত্তর দিতেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি, এখানে মা উপস্থিত আছেন। উনি দেখেছেন কীভাবে সন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এখানে ভাই উপস্থিত আছেন, সে দেখেছে কীভাবে তার ভাইকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আপনাদের এই কষ্টের বিপরীতে শুধু একটি কথাই আমি বলতে চাই, আপনাদের যে কষ্ট, সেই কষ্টটি আমিও বুঝি, অনুভব করতে পারি।
তিনি আরো বলেন, স্বৈরাচারের সময় থেকে শুরু করে ৫ আগস্ট জুলাই আন্দোলনে অনেকেই, বহু, হাজারো লক্ষ মানুষ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সেই নির্যাতনের যে কষ্ট আপনাদের এখনো ভোগ করে বেড়াতে হচ্ছে। সেরকম শারীরিক কষ্ট, মানসিক কষ্ট প্রত্যেকটি কষ্ট আমাকেও ভোগ করতে, বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ কারণে আপনাদের সেই কষ্ট- সেটি মানসিক হোক, সেটি শারীরিক হোক, আমি কিছুটা হলেও অনুভব করতে সক্ষম।
তিনি বলেন, আপনাদের ডান দিকে একটি ব্যানারের লেখা আছে জুলাইয়ের শহীদ হওয়া সর্বকনিষ্ঠ ফুলগুলোর নাম। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৬৫ জন শিশু শহীদ হয়েছিল। তাদের কি কোনো অপরাধ ছিল? তাদের অপরাধ ছিল না। কিন্তু দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করতে গিয়ে যেভাবেই হোক এই শিশুগুলো জীবন দিয়েছে।
সেই উত্তাল দিনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করে গেছেন যে, জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১৪শ মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। সেই উত্তাল দিনগুলোতে যতটুকু সম্ভব হয়েছে আমার পক্ষে, আমি যতটুকু বিভিন্নভাবে শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও খোঁজ করছিলাম আমার নেতাকর্মীদের মাধ্যমে। অনেকে অনেক হিসাব দিয়েছে। কিন্তু আমার হিসাবের মতে শুধু জুলাই আন্দোলনে শহীদ হয়েছে ২ হাজারের মতো মানুষ, ৩০ হাজারের মতো মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সার্বিকভাবে।
ফ্যাসিস্ট শাসনামলে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন, মামলা-হামলার ঘটনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আপনাদের সকলের কাছে একটু সহযোগিতা চাই আমি। যে আপনজনকে আপনারা হারিয়েছেন তারও তো লক্ষ্য ছিল এই দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন, তারও তো লক্ষ্য ছিল এই দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন।
জাতিকে বিভক্ত করে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে উপস্থিত জুলাই পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই মানুষই ত্যাগ করতে পারে যার সাহস আছে। আপনজনকে আপনারা হারিয়েছেন, যে অঙ্গ হারিয়েছেন তা ঠিক হয়ে যাবে? না... ঠিক হয়ে যাবে না। তবে, সবাই মিলে আমরা যদি এ দেশকে এগিয়ে নিতে পারি, তবে একদিন গর্ব করে বলতে পারবেন আপনার আপনজনের ত্যাগের বিনিময়ে দেশের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়েছে। এখন একমাত্র কাজ শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই দিনে জুলাই অভ্যুত্থানে, জুলাই শহীদ, জুলাই যোদ্ধা এবং বিগত ১৭ বছরের যতজন শহীদ হয়েছেÑ তাদের প্রতি যদি সম্পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করতে হয়, তাহলে যার জন্য তারা ত্যাগ করেছেন সেই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা। এটি হোক আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের গৃহীত শপথ, এটি হোক আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের গৃহীত প্রতিজ্ঞা।
জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি ও আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজনে এই জাতীয় সম্মেলনে আগত শত জুলাই যোদ্ধা পরিবারের সদস্য সরকার প্রধানের সামনে নিজেদের যন্ত্রণা, মনের ভাব তুলে ধরেন।
সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে শহীদদের স্মরণে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এরপর জাতীয় সংগীত এবং জুলাই আন্দোলনের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদ পরিবারের হাতে জুলাই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ সময় শহীদ মিরাজের বাবা রব মিয়া, শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, জুলাই আহত আল মিরাজ, জুলাই যোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ঈমন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্মারক গ্রহণ করেন। পরে উপস্থিত সবার জন্য রাখা স্মৃতি স্মারক তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেও স্মৃতি স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সভাপতি আবু হুরায়রা, কওমী ছাত্র ফোরামের সভাপতি মাওলানা জামিল সিদ্দিকী, আয়োজক সংগঠন ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইমন, সাধারণ সম্পাদক আল মিরাজ, জুলাই-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটির সভাপতি গোলাম রহমান ও সাধারণ সম্পাদক রবিউল আওয়াল বক্তব্য রাখেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ সন্তানদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেইন, শহীদ শাহরিয়ার হোসেন আলভীর বাবা আবুল হোসেন, শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম এবং যাত্রাবাড়ীতে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব মিয়া। জুলাই অভ্যুত্থানে আহত শাহিন মালু, সুজন মোল্লা, মিল্লাত হোসেন, আল-আমীন, মেহেদি হাসান মিরাজ তাদের কথা জানান।
জুলাই জাতীয় সম্মেলনে রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊধর্তন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে যে জুলাই এসেছিল তা ছিল রক্তাক্ত জুলাই। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল ও সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুতই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানীর রাজপথ থেকে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে গড়ে ওঠে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন। পরবর্তীতে এই আন্দোলন সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের যে তালিকা সরকার গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে, সেখানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪ জন। তবে অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘ যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ যেভাবে আকৃষ্ট করা হচ্ছে, তাতে ১ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে দেশ। বিদেশি বিনিয়োগ, সরাসরি বিনিয়োগ, ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগ এবং ফান্ড ম্যানেজারদের বিনিয়োগ— সবই বাংলাদেশে আসছে। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলের যে সম্ভাবনা আছে, সেটিকে মাথায় রেখে বাজেট করা হয়েছে এবং সেই সম্ভাবনাগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
চট্টগ্রামকে লজিস্টিক্যাল হাব গড়তে বড় পরিকল্পনা রয়েছে, এজন্য বিদেশি বিনিয়োগও আসছে জানিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রামে সম্ভাবনার খাত অনেক বেশি। কারণ, এখানে বন্দর আছে। শুধু সমুদ্রবন্দর নয়, চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানও রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে চট্টগ্রামের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে সরকারের পরিকল্পনায় অনেক কিছু আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, নদীর ওপারে আনোয়ারায় ৬০০ একর জমিতে একটি ফ্রি জোন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামে একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দর নির্মাণ করা হবে। চট্টগ্রামকে একটি লজিস্টিক্যাল হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার প্রতিফলন এবারের বাজেটে রয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে কার্গো হাব ও প্যাসেঞ্জার হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামে একটি চাইনিজ ইকোনমিক জোন হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে লাকসাম অংশের উন্নয়নের মাধ্যমে ট্রেনে যাতায়াতের সময় দুই ঘণ্টা কমিয়ে আনার পরিকল্পনাও বাজেটে রয়েছে। এসব বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক করিডর একটি লজিস্টিক্যাল হাবে পরিণত হবে। বন্দরগুলো আরও বেশি পরিমাণে কাজ করতে পারবে। অন্যদিকে মাতারবাড়ীকেও ঘিরে বড় ধরনের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক্যাল সম্ভাবনাকে বিবেচনায় রেখেই বাজেটে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগবে। তবে যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করার চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন একটি কঠিন কাজ। বর্তমান সরকার বিগত সরকারের কাছ থেকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। আগে এই ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। এরপর সম্ভাবনার জায়গাগুলো কাজে লাগানো হবে। সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ বছর থেকে সমৃদ্ধির ধারা শুরু হবে এবং অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ তার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, সিডিএ চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, মহানগর বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক এম এ আজিজ প্রমুখ।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা বিদ্যমান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হবে এবং উভয় দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শনিবার (৪ জুলাই) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পার্লামেন্টারি ককাস অন বাংলাদেশ-ইউএসএ রিলেশনশিপ এবং বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘A Freedom 250 Musical Performance’ অনুষ্ঠানে চিফ হুইপ এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বক্তব্য রাখেন।
চিফ হুইপ বলেন, জাতীয় সংসদ ভবনের আইকনিক স্থাপনার সামনে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের আয়োজন দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক। এই আয়োজন বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের গভীরতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র, শান্তি এবং উন্নয়ন সহযোগিতায় একসঙ্গে কাজ করে আসছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির কঠিন সময়ে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ ভ্যাকসিন সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যে সহযোগিতা করেছে, তা বাংলাদেশের জনগণ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।
চিফ হুইপ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করেছে এবং বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করতে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতেও সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখবে এবং দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
বক্তব্যের শেষে চিফ হুইপ বলেন, জাতীয় সংসদ ভবনের এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণ থেকে আজ যে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা ও গণতন্ত্রের বার্তা উচ্চারিত হলো, তা দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় করবে।
অনুষ্ঠানে পার্লামেন্টারি ককাস অন বাংলাদেশ-ইউএসএ রিলেশনশিপ-এর চেয়ারম্যান ড. মো. ওসমান ফারুক, এমপি, কো-চেয়ারম্যান ড. মো. মাহবুবুর রহমান, এমপি, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমান সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে সারাদেশের সব হাসপাতাল সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ১৭ আগস্টের মধ্যে দেশের সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বায়োমেট্রিক হাজিরা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
অধিদপ্তরের চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ১৭ আগস্ট বর্তমান সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে হাসপাতালগুলোর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাজিরা নিয়মিত করতে ছয়টি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনাগুলো হলো— এক. সব প্রতিষ্ঠান প্রধান স্ব-স্ব হাসপাতাল নিজ দায়িত্বে সার্বক্ষণিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবেন। দুই. ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অধীনস্থ হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা মনিটর করবেন। তিন. পরিচালক, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতি শনিবার হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করবেন। চার. প্রত্যেক বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) উল্লিখিত তারিখসমূহে সংযুক্ত তালিকা (সংযুক্ত-০১) অনুযায়ী জেলা সদর হাসপাতাল পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শন শেষে সচিত্র পরিদর্শন প্রতিবেদন মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সচিব, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিচালক (প্রশাসন), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবর প্রেরণ করবেন। পাঁচ. প্রত্যেক সিভিল সার্জন মাসের প্রত্যেক শনিবার সংযুক্ত তালিকা (সংযুক্ত-০২) অনুযায়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করবেন। এরপর সচিত্র পরিদর্শন প্রতিবেদন মন্ত্রী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, সচিব, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিচালক (প্রশাসন), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বরাবর প্রেরণ করবেন। ছয়. ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখের মধ্যে সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বায়োমেট্রিক মেশিন সচল করে নিয়মিত বায়োমেট্রিক হাজিরা নিশ্চিত করবেন। ব্যর্থতায় প্রতিষ্ঠান প্রধান দায়ী থাকবেন।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অলাভজনক ও বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (৪ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক সভায় তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অলাভজনক ও বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা বিনিয়োগে অনেক বেসরকারি কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কোম্পানিগুলো যে ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলোর সম্ভাব্যতা এখন যাচাই করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু গণমাধ্যমকে এ কথা জানান। তিনি জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বাণিজ্য, শিল্প এবং পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সচিব ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ১০৭টি কারখানার মধ্যে ২৮টি লোকসানে রয়েছে। একই সঙ্গে বন্ধ রয়েছে ৬৮টি কারখানা। বন্ধ ও লোকসানি মিলিয়ে ৪৪টি কারখানা নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে চালু করতে, সরকারের কাছ থেকে নীতি সহায়তার পাশাপাশি কম সুদের ঋণ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার সহায়তা চেয়েছেন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) যৌথভাবে এই কর্মসূচির আয়োজন করে।
সভায় সরকারি কর্মকর্তারা এই কারখানাগুলোতে বিনিয়োগের সুযোগের কথা তুলে ধরেন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), যৌথ উদ্যোগ, দীর্ঘমেয়াদি ইজারা এবং সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে এগুলো চালুর পরিকল্পনা পেশ করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, চীন, ভারত, রাশিয়াসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্ক জাতীয় স্বার্থ ও পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। কোনো দেশের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নয়, বরং ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ বজায় রেখেই বর্তমান সরকার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে।
শনিবার (৪ জুলাই) গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেন) আয়োজিত ‘পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘প্রত্যেকটা দেশের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত সম্পর্ক নির্ধারণ করবে পারস্পরিকভাবে আমরা কী পাচ্ছি, বাংলাদেশের মানুষ কী পাচ্ছে—সম্পূর্ণ ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।’
তিনি বলেন, ‘প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অন্ধভাবে কোনো দেশের পক্ষে বা বিপক্ষে না গিয়ে সম্পূর্ণ কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রেখেই পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রথমবারের মতো সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং সৃজনশীল অর্থনীতিকে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘স্পোর্টস অ্যান্ড কালচার’, ‘মাইগ্রেশন’ এবং ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স’ নামে তিনটি নতুন অনুবিভাগ চালু করা হয়েছে।’
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি ও পানিবণ্টনসহ বিদ্যমান সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করতে বাংলাদেশ বিশ্বাসী। এজন্য প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা জরুরি।’
গোলটেবিল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় বিশ্বাসী।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মাল্টিল্যাটারালিজমকে ধারণ করি। সে কারণেই ব্রিকস, আসিয়ান, এসসিও ও আরসিইপির সদস্য হতে চাই। ক্ষয়প্রাপ্ত বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করাই আমাদের লক্ষ্য।’
শিক্ষক ও গবেষক আসিফ বিন আলীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান), চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ জামান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক এবং ব্রেনের নির্বাহী পরিচালক সফিকুর রহমান।
বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে মার্কিন উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার সমান সুযোগ নিশ্চিত, নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে।
শনিবার (৪ জুলাই) ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) এবং ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে সরকার বেসরকারি খাতকে গুরুত্ব দেয়। বিনিয়োগ সহজ করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নীতিগত সহায়তা দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসন ও আইনের শাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ কর্মশক্তি ও ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে মুনাফা দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ সহজ করা, উদার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক ও হাইটেক পার্কে কর–সুবিধাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অতীতে অসম প্রতিযোগিতা নিয়ে যে উদ্বেগ ছিল, তা দূর করে দেশি-বিদেশি সব বিনিয়োগকারীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রতি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নে তারা আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘উড়োজাহাজ, জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), বস্ত্র, ওষুধ, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে দুই দেশের সহযোগিতা ও বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।’
মাহদী আমিন আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীদের দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে ‘ব্রেইন ড্রেইন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপান্তর করা প্রয়োজন।’
তিনি বাংলাদেশে বিনিয়োগসংক্রান্ত রোডশো আয়োজন এবং নতুন ব্যবসায়িক সম্ভাবনা খুঁজে বের করতে সরকারি নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে মাহদী আমিন বলেন, ‘বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগের সফলতা বিশ্বের অন্যান্য বিনিয়োগকারীদেরও এ দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে।’
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে ভূমিকা রাখায় অ্যামচেম ও ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের নয়, বরং এটি দেশের গণতন্ত্রকামী ও শান্তিকামী সাধারণ মানুষের সম্মিলিত বিজয়। জুলাই বিপ্লবের বীর শহীদদের আত্মত্যাগকে সরকার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে এবং এই অর্জনকে বৃথা যেতে দেওয়া হবে না।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র) আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঐতিহাসিক ‘৩৬ জুলাই’ অর্থাৎ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ ও ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ যৌথভাবে এই স্মরণসভার আয়োজন করে।
বিচারের নামে যেন অবিচার না হয়
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “যারা জুলাই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত, আইন অনুযায়ী তাদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন বিচারের নামে কারও প্রতি কোনো অবিচার না হয়। সময় নিয়ে হলেও প্রকৃত হত্যাকারীদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করা হবে।” তিনি আরও বলেন, “জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে আমি দেশ এগিয়ে নিতে চাই না। আমাদের মূল লক্ষ্য দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন করা। আর কোনো অপশক্তি যেন এই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।”
প্রতিহিংসা বর্জনের আহ্বান
বিগত ১৭ বছরের জুলুম-নির্যাতনের কথা স্মরণ করে তারেক রহমান এক আবেগঘন স্মৃতিচারণা করেন। তিনি বলেন, “বিগত ১৭ বছর আমার ওপর, আমার পরিবারের ওপর এবং দেশের মানুষের ওপর যে ভয়াবহ অবিচার করা হয়েছে—আল্লাহ আমাকে এখন তার প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন। কিন্তু আমি প্রতিহিংসায় বিশ্বাসী নই। যদি আজ আমার মাকে (বেগম খালেদা জিয়া) জিজ্ঞেস করতাম— মা, আপনার ওপর যে অন্যায়-জুলুম হয়েছে, সেগুলোর প্রতিশোধ কি নেব? মা বলতেন, প্রতিহিংসা নয়, তোমার দায়িত্ব সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমার ছাত্রদলের ও দলের অনেক সহকর্মীকে আমি হারিয়েছি, যারা আমার সাথে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখত। তাদের অভাব আমি প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করি।”
শহীদ জননীর স্মৃতিচারণ ও অশ্রুসিক্ত প্রধানমন্ত্রী
অনুষ্ঠানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদদের পরিবারের সদস্যরা মঞ্চে এসে স্মৃতিচারণ শুরু করেন। একজন শহীদ জননী তার সন্তানকে হারানোর লড়াকু দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লে মিলনায়তনের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় দর্শক সারিতে বসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেকে সামলাতে পারেননি। শহীদ জননীর সেই আকুতি শুনে প্রধানমন্ত্রীর দুই চোখ অশ্রুতে টলমল করতে দেখা যায় এবং তিনি জনসমক্ষেই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে শহীদ ও আহতদের পরিবারের সদস্য ছাড়াও মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। সভার শুরুতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। শহীদদের রক্তে ভেজা এই ইতিহাসকে আগামীর বাংলাদেশের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেন।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং আন্দোলন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ও অপপ্রচারের অভিযোগে অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি এবং শান্তা ফারজানা নামের এক নারীর বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ নামের একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে এই অভিযোগ দাখিল করা হয়, যা পুলিশ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করেছে।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, অভিযোগটি সাইবার সংক্রান্ত হওয়ায় এটি অধিকতর তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগপত্রে যা বলা হয়েছে:
রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের পক্ষ থেকে দেওয়া অভিযোগপত্রে তিনজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ আনা হয়েছে:
১. শান্তা ফারজানা: তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে জুতা নিক্ষেপ বা আঘাত করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন, যা শহীদদের স্মৃতির প্রতি চরম অবমাননাকর।
২. মেহের আফরোজ শাওন: অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, শাওন বিভিন্ন ভিডিও বার্তায় জুলাই আন্দোলনকে ‘পরিকল্পিত’ বা ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন এবং রাষ্ট্র ও আন্দোলন সম্পর্কে নেতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন।
৩. মাহিয়া মাহি: মাহির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতা ও বিভিন্ন সংগঠনকে কটাক্ষ করেছেন এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে ‘অভিনয়’ বলে তুলনা করে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন।
সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আনম আয়াস ও তুহিন ফরাজী এবং কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক মুহাম্মদ শাহ্ আলম বাদশা স্বাক্ষরিত এই আবেদনে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৪০০-এর বেশি শহীদ ও ৩০ হাজারের অধিক আহত মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বিপ্লবকে নিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ড জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, অভিযোগের বিষয়টি তারা জেনেছেন। সাইবার ইউনিটের কাছে নথি পৌঁছানোর পর তদন্ত শুরু হবে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারের মতো কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
উল্লেখ্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে এ ধরনের অবমাননাকর প্রচারণার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্র ও সামাজিক সংগঠন। পুলিশের সাইবার বিভাগ এখন ভিডিও ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে খতিয়ে দেখছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব এক গভীর ও জটিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই একক কোনো আদর্শ, দর্শন বা চিন্তার আধিপত্য মানব সভ্যতার জন্য স্থায়ী সমাধান আনতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘জগতের সব ধরনের বৈচিত্র্য, ভিন্নমত ও আদর্শের অবাধ আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমেই কেবল শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব; আর সেজন্য প্রয়োজন মুক্ত ও দায়িত্বশীল বুদ্ধিচর্চা।’
শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি অভিজাত হোটেলে বৈশ্বিক গবেষণা, সংলাপ ও জ্ঞানচর্চার আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইট’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ এফ এম খালিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্বখ্যাত তুর্কি লেখক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই।
স্বাগত বক্তব্য দেন আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও জার্নালের সম্পাদক ইন চিফ মোহাম্মদ জাকির হোসেন।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যখন বিভ্রান্তি, বিভাজন ও ভাসাভাসা আলোচনা দ্রুত বাড়ছে, তখন জ্ঞান, নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিশ্বাসযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। আল-উম্মাহ জার্নাল ও ওয়েবসাইট জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা ও গবেষণামূলক অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বস্ত মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি বলেন, ভাষা, ‘জাতিসত্তা, ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য হল প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম। কোনো সুনির্দিষ্ট পরিচয় বা গোষ্ঠী এককভাবে বিশ্বকে শাসন বা আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না। সব মতাদর্শের স্কলার বা গবেষকদের এমন এক সাধারণ সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, যা সভ্যতার কল্যাণ বয়ে আনবে। অতীতের কোনো একক বীর কিংবা সমাজ একা বিশ্ব সংকটের স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি।’
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সমাদৃত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের সরকার গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন আমাদের এই সরকার সব ধরনের বৈচিত্র্য এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতিতে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। আমাদের নীতি হলো- যে যার অবস্থান থেকে নিজের কথা বলবেন এবং সুস্থভাবে সেই মতাদর্শের আদান-প্রদান হবে। এটিই প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আল-উম্মাহ জার্নালের ঘোষিত উদ্দেশ্য আমাদের এই রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
তিনি আরও বাংলা, ইংরেজি, আরবি ও তুর্কি- এই চারটি ভাষায় জার্নালটি প্রকাশের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, পারস্পরিক সংস্কৃতির গভীর বোঝাপড়া আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ পর্যায়ের সকল ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে সাহায্য করে।
অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই বলেন, ‘মুসলিম বিশ্বের একটি সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য রয়েছে। সমসাময়িক বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সেই জ্ঞানচর্চার সংযোগ ঘটানো এখন সময়ের দাবি। আল-উম্মাহ বিশ্বজুড়ে চিন্তাবিদদের সংযুক্ত করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হবে।’
ড. এ এফ এম খালিদ হোসেন বলেন, এই প্ল্যাটফর্মটি ওআইসি সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত সংযোগ ও সহযোগিতা গড়ে তুলতে এবং মুসলিম উম্মাহর সমসাময়িক চ্যালেঞ্জগুলোর জ্ঞানভিত্তিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সূত্র: বাসস
কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করার সুযোগ পাবে না বলে কঠোর মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ তিনি এই কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, “আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু হয়েছে, তাদের দাফন হয়েছে দিল্লিতে। তারা আর বাংলাদেশে রাজনীতি করতে পারবে না। শিগগিরই দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার হবে।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে নিয়মিত আলাপ-আলোচনা এবং নির্ঘুম রাত কাটিয়ে অরাজনৈতিক ব্যানারে আন্দোলনকে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল। তিনি এটিকে ‘পর্দার অন্তরালের সত্য’ হিসেবে অভিহিত করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও সতর্ক করে দেন যে, আওয়ামী লীগের পলাতক নেতারা বিদেশ থেকে বর্তমানে দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের দায়ে খুব শীঘ্রই এই দলটিকে আইনি বিচারের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জনসমক্ষে প্রতিশ্রুতি দেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে কিছুটা ধৈর্যের প্রয়োজন এবং সরকার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “জুলাই চেতনা নিয়ে কেউ যেন ব্যবসা না করি, চেতনা বিক্রি ভালো নয়। যারা চেতনা ব্যবসা করবে তাদের পরিণতিও দেশের মানুষ দেখবে।” তিনি মনে করেন, জুলাইয়ের চেতনাকে পুঁজি করে ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করা শহীদদের অপমানের শামিল।
‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার’ ও ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজিত এই বিশাল সম্মেলনে জুলাই আন্দোলনে আহত যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে সরকারের অন্যান্য উর্ধ্বতন মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতারা উপস্থিত থেকে শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক বিজয় ও ত্যাগের বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ শহীদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধাদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে এই স্মৃতি স্মারক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গণঅভ্যুত্থানের সেই অকুতোভয় বীরদের অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই সরকারের এই বিশেষ উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি হিসেবে শহীদ মিরাজের পিতা আব্দুর রব মিয়া প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে প্রথম স্মৃতি স্মারকটি গ্রহণ করেন। এরপর পর্যায়ক্রমে শহীদ সেলিমের ভাই উজ্জ্বল হোসেন, আন্দোলনে গুরুতর আহত আল মিরাজ এবং লড়াকু যোদ্ধা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম ইমনের হাতেও এই বিশেষ স্মারক তুলে দেওয়া হয়। স্মৃতি স্মারক হস্তান্তরের সময় মিলনায়তনে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় এবং উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা করতালি দিয়ে বীরদের সম্মান জানান।
সম্মেলনে ঘোষণা করা হয় যে, উপস্থিত কয়েকজনকে প্রতীকীভাবে স্মারক প্রদান করা হলেও প্রতিটি শহীদ পরিবার এবং আন্দোলনে আহত সকল যোদ্ধার জন্য এই জুলাই স্মৃতি স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই স্মারকগুলো দেশের প্রতিটি প্রান্তে থাকা সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম। শনিবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে আয়োজিত অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে স্পিকার মরহুম আয়াতুল্লাহ খামেনির বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। পরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির উচ্চপদস্থ নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে শোকসন্তপ্ত ইরানি জাতির প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্পিকার সেখানে রক্ষিত শোক বইতেও স্বাক্ষর করেন।
এর আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ইরানের ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে স্পিকার ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সম্প্রতি ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তি সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে স্পিকার গালিবাফের ভূমিকার প্রশংসা করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এই চুক্তি সমগ্র অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে বলে আমরা আশাবাদী। বাংলাদেশ সবসময়ই সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পক্ষে।” এ সময় তিনি ইরানি স্পিকারকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
একই দিনে স্পিকার ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দুনিয়ামালীর সাথেও বৈঠক করেন। বৈঠকে ইরানি মন্ত্রী নিজ দেশে ক্রিকেট খেলার প্রসারে বাংলাদেশের কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা কামনা করেন। দুই দেশের মধ্যে ক্রীড়া ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। স্পিকার এই বার্তা বাংলাদেশের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
সফরের শেষ পর্যায়ে স্পিকার ইরান রেডিও’র বাংলা বিভাগের সাথে এক সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। সেখানে তিনি দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক নানা বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি ইরানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দূতাবাসের সেবা আরও উন্নত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানাবেন বলে উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে যোগ দিতে শুক্রবার তেহরান পৌঁছালে স্পিকারকে বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান দেশটির ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজি বাবাই।