মেট্রোরেলে রাজধানী ঘুরে দেখলেন জাপানের অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়াসোতুশি নিশিমুরা। তার সঙ্গী হয়েছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। সোমবার বিকেলে জাপান-বাংলাদেশের অন্যতম মৈত্রী স্মারক জাইকার সহায়তায় নির্মিত দেশের প্রথম মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬ দেখতে যান জাপানের বাণিজ্যমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তাকে নিয়ে উত্তরা উত্তর থেকে মেট্রোরেলে করে আসেন পল্লবী। পরে আবারও সেখান থেকে আসেন উত্তরায়। পরে জাপানের সহযোগিতায় নির্মাণাধীন বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিদর্শনে যান সফরত জাপানের অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী।
উত্তরার মেট্রো স্টেশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা হলে জাপানের বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রায় ১৩ বছর আগে এ দেশে একবার এসেছিলাম। তবে এই সময়ে এসে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে দেখে আমি বিস্মিত। গত এক যুগে বাংলাদেশের বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে। এ দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সব সময় জাপান পাশে থাকবে।’
এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আগামীতেও জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।’
গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর মেট্রোরেলের লাইন-৬-এর উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ২১ কিলোমিটারে উড়াল রেলপথের মধ্যে উত্তরার (দিয়াবাড়ি) অংশ থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত অংশের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে মেট্রোরেলের আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশ আগামী অক্টোবরে চালু হবে।
রাজধানীতে মেট্রোরেলের কাজ শুরু হয় ২০১২ সালে। প্রকল্পটি ২০১২ সালে ১৮ ডিসেম্বরে একনেকে অনুমোদন পায়। এরপর ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে জাইকার সঙ্গে চুক্তি হয় ডিএমটিসিএলের। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় ২০১৩ সালে মেট্রো রেল স্থান পায়। প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালের ২৬ জুন। প্রথমে প্রকল্প নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা দিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও ৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার। বর্তমানে মেট্রোরল নির্মাণ খরচ বেড়েছে। এখন মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
এ ছাড়া সোমবার পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন জাপানের অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ইয়াসোতুশি নিশিমুরা। বৈঠকে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য বাংলাদেশকে পূর্ণ সহযোগিতা করবে জাপান। নিশিমুরা ২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথভাবে ঘোষিত কূটনৈতিক সম্পর্কের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি বাংলাদেশের তরুণ ও উদ্যমী জনসংখ্যার পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে কৌশলগত অবস্থানের প্রশংসা করেন।
প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বাংলাদেশ-জাপান সহযোগিতার চলমান মেগা প্রকল্পের উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের একটি স্মার্ট ও উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে এ ধরনের যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আইসিটি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আরও জাপানি বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানান।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো দুই দিনের বাংলাদেশ সফরে এসেছেন নিশিমুরা। গত রোববার সকালে বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় শাখার মহাপরিচালক তৌফিক হাসান। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি উপস্থিত ছিলেন।
ওই দিন রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক রিলেশনস ফর দ্য নেক্সট ফিফটি ইয়ার্স: ফর দ্য ইন্ডাস্ট্রি আপগ্রেডেশন অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে অংশ নেন ইয়াসোতুশি নিশিমুরা। অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্যে তিনি বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ অকল্পনীয় উন্নতি করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
ইয়াসোতুশি নিশিমুরা বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভিত অনেক গভীর। যমুনা সেতু থেকে শুরু করে মেট্রোরেল, থার্ড টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত প্রতিটি অবকাঠামোগত মাইলফলক জাপান-বাংলাদেশ পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অর্জন করেছে।’
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিশ্বের বহু দেশে এত বড় তরুণ জনগোষ্ঠী নেই। তাদের দক্ষতা, নৈতিকতা ও চিন্তাশক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। জনসংখ্যাকে সমস্যা না ভেবে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
শনিবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের এফডিসিতে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি আয়োজিত নির্বাচনি বিতর্ক প্রতিযোগিতা ২০২৬-এর পুরস্কার বিতরণী ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ভালো চাওয়া স্বাভাবিক, তবে বাস্তবতা বিবেচনায় যা সম্ভব তা অর্জনে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, দলীয়করণ ও দুর্নীতির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, আমরা খুব ভালো চাই, আরও ভালো চাই। এটি প্রয়োজন, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা করেই যা সম্ভব, সেটাই অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। বাস্তবায়নের দায় কারও একার নয়, সহযোগিতা ছাড়া কিছুই সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, দুর্নীতি, অনাচার এবং অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।
যুবসমাজের হতাশা প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম খান বলেন, অনেকের মনে কষ্ট আছে। তরুণদের আক্ষেপ দূর করতে হবে। একা কিছু সম্ভব নয়, সবাইকে মিলেই কাজ করতে হবে। নইলে তাদের ন্যায্য আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ থেকে যাবে।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। কষ্ট করেছেন এবং অপেক্ষা করতে প্রস্তুত। যদি দেশ, সহকর্মী ও সন্তানরা সফল হয়, সেটাই তাঁর বড় প্রাপ্তি। এটি একদিনের কাজ নয়, তবে এটি অনিবার্য কাজ।
তিনি বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের দক্ষতা ও চিন্তাকে সংগঠিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাবে। জনসংখ্যাকে সমস্যা না ভেবে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
পানি ব্যবস্থাপনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোথাও পানির অভাব, কোথাও অতিরিক্ত। পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। একইভাবে সঠিক পরিকল্পনা নিলেই জাতীয় সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা যাবে।
তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না, বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। খালি আক্ষেপ নয়, প্রাপ্য অর্জনে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা দরকার। বিতর্ক ও আলোচনার মাধ্যমে সেই পথ তৈরি করতে হবে।
জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য প্রধানমন্ত্রীর গোল্ড কাপ ঘোষণা করেছিলেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে পুরস্কার বিতরণ করেছিলেন। এই টুর্নামেন্ট পুনরায় চালুর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টিতে আনার বিষয়টি ভালো উদ্যোগ বলে মন্তব্য করেন তিনি এবং বিষয়টি জানাবেন বলে আশ্বাস দেন।
পাঠ্যপুস্তকে কো-কারিকুলাম কার্যক্রম হিসেবে বিতর্ক অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, এটি সম্ভব এবং জাতীয় ভিত্তিতে বিতর্ক আয়োজন হওয়া উচিত।
সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি বলেছেন, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মোংলা বন্দর পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি জানান, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মোংলা বন্দরকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে চায় সরকার। বিগত সরকারের সময়ে বন্দরে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি বাতিল হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সেসব চুক্তি পর্যালোচনা করা হবে। দেশের স্বার্থে সহায়ক হলে সেগুলো সংশোধন করে বহাল রাখা হতে পারে।
জাতীয় অর্থনীতিতে মোংলা বন্দরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, যথাযথ উদ্যোগ নিলে এটিকে একটি শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক বন্দরে পরিণত করা সম্ভব। বর্তমানে রেল ও নৌ যোগাযোগ ভালো থাকলেও সেগুলোকে আরও আধুনিক ও গতিশীল করার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও জানান, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে মোংলা বন্দরকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে রূপান্তর করা হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা গেলে বন্দরের কার্যক্ষমতা আরও বাড়বে।
নৌপরিবহন মন্ত্রী বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই বন্দরের ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইটে অত্যাধুনিক গ্যাসচালিত স্বয়ংক্রিয় এয়ার রাইফেলসহ নূর হোসেন নামে এক যাত্রীকে আটক করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। পরে তাকে বিমানবন্দর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিমানবন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোবারক হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। পুলিশ জানায়, নূর হোসেনের বাড়ি ফেনীর ছাগলনাইয়ায়।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ফিটস এয়ারের একটি ফ্লাইটে দুবাই থেকে শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে অত্যাধুনিক অস্ত্র আসছে এমন গোয়েন্দা সংবাদে শাহজালাল বিমানবন্দরে নজরদারি বাড়ানো হয়। রাত ৮টার দিকে ফ্লাইটটি অবতরণ করে। পরে ফ্লাইটটিতে থাকা যাত্রী নূর হোসেনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে তিনি জানান, সাইকেলের পার্টসের ভেতরে এয়ার রাইফেলটির পার্ট বাই পার্ট রয়েছে। পরে কাস্টমস ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তল্লাশি করে তা জব্দ করে।
বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা জানান, অস্ত্রটি অত্যাধুনিক। এটি গ্যাসচালিত। নূর হোসেনের কাছ থেকে অস্ত্র ছাড়াও ১০০ গ্রাম স্বর্ণালঙ্কার, ৩টি মোবাইল, একটি ল্যাপটপ, ১০ কার্টন সিগারেট, পাঁচ কেজি ফুড আইটেম, দুই লিটার পারফিউম ও একটি বাইসাইকেলের অংশ বিশেষও পাওয়া যায়।
বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে নবনির্বাচিত সরকার। নিয়ম অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি বিষয়ক কমিটি (সিডিপি)-এর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রমগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘নীতিগত সুযোগ’ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এই চিঠিতে এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার পেছনে বেশ কিছু যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট কারণ তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য যে সময় পাওয়া গিয়েছিল, তা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক একের পর এক সংকটের কারণে গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে। দেশীয় সংকটের মধ্যে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম এবং বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক পর্যায়ে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের উন্নয়ন গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। এসব বহুমুখী অভিঘাতের ফলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাণিজ্যিক নিরাপত্তার বিষয়টি এই চিঠিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে তার পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এলডিসি হিসেবে যে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পায়, তা ২০২৬ সালে শেষ হয়ে গেলে তৈরি পোশাক খাতসহ সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সরকার মনে করছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তিতে সম্ভাব্য জটিলতা, যুক্তরাষ্ট্রের পালটা শুল্ক আরোপের ঝুঁকি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর নতুন নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) ফলে বাংলাদেশের সক্ষমতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এখনো অতিমাত্রায় তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের প্রক্রিয়াটি সংকটের কারণে ধীর হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইআরডি-র চিঠিতে আরও জানানো হয়েছে যে, শুল্ক ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং শিল্পকারখানার কমপ্লায়েন্স অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলমান থাকলেও সংকটের কারণে সেগুলো নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের কার্যালয় কর্তৃক পরিচালিত ‘গ্র্যাজুয়েশন রেডিনেস অ্যাসেসমেন্ট’-এর ফলাফলকে বিবেচনায় নিয়ে উত্তরণ প্রক্রিয়াটি ২০২৯ সাল পর্যন্ত স্থগিত রাখার দাবি জানানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারও নেপাল ও লাওসের মতো একই সারির দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর একটি প্রাথমিক সুপারিশ করেছিল, যার ধারাবাহিকতায় বর্তমান নির্বাচিত সরকার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। এর ফলে সরকার আশা করছে, অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়া গেলে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড় করানো এবং টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দেশের নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ভবন নির্মাণে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। শনিবার বিকেলে কুমিল্লা সার্কিট হাউজে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ সংক্রান্ত কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আইন অমান্য করে এবং নকশা বহির্ভূতভাবে উঁচু ভবন নির্মাণের সংস্কৃতি আর বরদাশত করা হবে না। ভবিষ্যতে কেউ নিয়ম লঙ্ঘন করে দালান নির্মাণ করলে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে বলে তিনি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দেন।
মতবিনিময় সভায় অপরিকল্পিত ও অবৈধ স্থাপনা নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন গণপূর্তমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে যারা আইন অমান্য করে অবৈধভাবে উঁচু দালান নির্মাণ করেছেন, জনস্বার্থ ও বর্তমান বাস্তবতায় সেসব ভবন এই মুহূর্তে ভেঙে ফেলা হয়তো পুরোপুরি সমীচীন হবে না। তবে এ ধরনের অন্যায়ের বিপরীতে মালিকপক্ষকে মোটা অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি করার বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। অবৈধ স্থাপনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার পাশাপাশি নতুন কোনো প্রকল্প শুরুর আগে যেন শতভাগ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, সে বিষয়ে তিনি তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দেন।
কুমিল্লা শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও স্থানীয় সমস্যা সমাধান নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন জাকারিয়া তাহের সুমন। কুমিল্লার সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে তিনি জানান, কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারটি বর্তমান অবস্থান থেকে শহরের বাইরে স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ে সরকার ইতিবাচক চিন্তা করছে। কারাগার সরিয়ে নিলে শহরের মূল ভূখণ্ডের ওপর চাপ কমবে এবং আধুনিক নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া কুমিল্লা শহরকে ক্রমবর্ধমান যানজট থেকে মুক্ত করতে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সুশৃঙ্খল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী কর্মকর্তাদের নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, উন্নয়নের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সততা বজায় রাখতে হবে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে নগর জীবনে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন। কুমিল্লার সার্বিক উন্নয়নে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিবসহ বিভিন্ন ধর্মগুরুদের জন্য সম্মানি ভাতা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। তবে ভাতার পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে তেজগাঁও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গেটে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপির অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন-খতিবসহ বিভিন্ন ধর্মগুরুদের সম্মানি ভাতা প্রদান করা। ক্ষমতায় এসে সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকার ঈদুল ফিতরের আগেই প্রাথমিকভাবে এই কার্যক্রম শুরু করবে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে তা চালু হবে।
সম্মানির পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আন্ত মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে তা চূড়ান্ত করা হবে।’
এ সময় স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রেসসচিব সালেহ শিবলী জানান, আজ ছিল তারেক রহমানের তৃতীয় কর্মদিবস। নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আজ তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো অফিস করেছেন তারেক রহমান। অফিসে প্রবেশের আগে ব্রিফ করেছেন। অনেক পুরোনো কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা নীতিগত কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করেছেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রভাতে গাজীপুরের সফিপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর একাডেমিতে নবনির্মিত ফ্ল্যাগপোল উদ্বোধন করা হয়েছে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা স্তম্ভটির উদ্বোধন করেন। একাডেমি প্রাঙ্গণে স্থাপিত এই সুউচ্চ স্তম্ভে উত্তোলিত পতাকার নাম দেওয়া হয়েছে ‘চির উন্নত বিজয় নিশান’।
পতাকা স্তম্ভটির উচ্চতা ১২০ ফুট, যা দেশের সর্বোচ্চ হিসেবে বিবেচিত। এতে উত্তোলিত জাতীয় পতাকার দৈর্ঘ্য ২৮ ফুট এবং প্রস্থ ১৬ দশমিক ৮ ফুট। ‘চির উন্নত বিজয় নিশান’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে জাতির গৌরবগাথা বহন করছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মহাপরিচালক বলেন, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি দেশের সর্ববৃহৎ জনসম্পৃক্ত বাহিনী হিসেবে জাতীয় অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাহিনীর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার সদস্য-সদস্যা দায়িত্ব পালন করেছেন, যা সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মধ্যে সর্বাধিক।
তিনি আরও বলেন, আজ মহান ভাষা শহীদদের স্মরণের দিন। ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার এ বাহিনীর একজন গর্বিত প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন। ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তার আত্মত্যাগ বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের জন্য দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধে অনুপ্রাণিত হওয়ার উৎস।
মহাপরিচালক উল্লেখ করেন, ‘চির উন্নত বিজয় নিশান’ আমাদের গৌরবময় ইতিহাস ও দায়িত্বশীল ভবিষ্যতের প্রতীক। এই পতাকা সদস্যদের শপথ করাবে— দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বদা প্রস্তুত থাকার।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই পতাকা উদ্বোধন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা আত্মমর্যাদা ও অধিকার রক্ষার সংগ্রামের শিক্ষা দেয়। আনসার-ভিডিপি সদস্যদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, এই চেতনাকে ধারণ করে পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে স্থাপিত ‘চির উন্নত বিজয় নিশান’ কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি জাতির অগ্রযাত্রা, আত্মত্যাগ ও শৌর্যের দৃশ্যমান স্মারক। একাডেমির চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, শৃঙ্খলা সুদৃঢ়করণ এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাহিনীকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তুলবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ এবং জাতীয় পতাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্তের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এক অনুষ্ঠানে দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ. ন. ম. এহছানুল হক মিলন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, যেসব শিক্ষা পদ্ধতি ও কারিকুলাম দেশে কেবল শিক্ষিত বেকারত্বের হার বাড়াচ্ছে, সেগুলো দ্রুত বর্জন করে একটি কার্যকরী ও বাস্তবমুখী কাঠামো গড়ে তোলা হবে। শনিবার সকালে রাজধানীর মিরপুরে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শিক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, কেবল ডিগ্রি অর্জন নয়, বরং শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেন তারা কর্মক্ষেত্রে সরাসরি অবদান রাখতে পারে।
শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে রাষ্ট্রীয় ও দাপ্তরিক কাজে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি একে বিশ্ব দরবারে একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই পাঠদান পদ্ধতিকে আরও সময়োপযোগী ও যুক্তিযুক্ত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। শিশুদের জন্য কেবল তাত্ত্বিক বা মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা নয়, বরং হাতে-কলমে এবং ব্যবহারিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে মন্ত্রণালয় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। যে শিক্ষা ব্যবস্থা তরুণ প্রজন্মকে কর্মহীন করে রাখে, সেই পুরনো পদ্ধতি পরিবর্তনের মাধ্যমেই একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
একই অনুষ্ঠানে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শিক্ষা খাতের গুণগত মানোন্নয়ন এবং বিশ্বমানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, একটি সুশিক্ষিত ও দক্ষ জাতি ছাড়া দেশ গঠন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সারাদেশে পর্যায়ক্রমে বিশ্বমানের শিক্ষা পদ্ধতি চালুর লক্ষ্য নিয়ে নতুন সরকার কাজ শুরু করেছে। একইসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সকল দপ্তর ও সংস্থাকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করার কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসা এই দুই প্রতিনিধিই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, শিক্ষা প্রশাসনে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দলীয়করণ বরদাশত করা হবে না এবং জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের এই ঘোষণাকে দেশের তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিশ্চিত এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা তৈরির পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী উল্লেখ করেন, একুশের চেতনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, আর সেই লক্ষ্য অর্জনে একটি আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
দেশের সাধারণ মানুষের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চলতি ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। আজ শনিবার মহান একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বরিশালে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন শপন এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা প্রদান করেন। সরকারের এই বিশাল উদ্যোগটি দেশের একটি বড় অংশকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার আওতায় নিয়ে আসবে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী ভাষা আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে দেশ গড়ার সংগ্রামের যোগসূত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কেবল রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত মুক্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত ও দূরদর্শী পরিকল্পনা। সেই লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার আগে জনগণের সামনে '৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামত' রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, সরকারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে স্পষ্ট এবং তাঁরা সবসময় জনগণের অত্যন্ত কাছাকাছি থেকে দেশ পরিচালনার নীতিতে বিশ্বাসী। এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম সেই জনবান্ধব নীতিরই একটি অংশ।
প্রশাসনিক সংস্কার এবং কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে তথ্যমন্ত্রী সভায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি প্রশাসনের স্বকীয়তা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক যদি স্বচ্ছ না থাকে, তবে অহেতুক ভুল বোঝাবুঝি ও দূরত্ব তৈরি হয়। মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনকে একটি নির্দিষ্ট দলের বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা কাম্য ছিল না। তিনি বর্তমান কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, যারা বিগত সময়ে পরিস্থিতির শিকার হয়ে কেবল অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান ও সুরক্ষা দেওয়া হবে। তবে যারা ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে স্বেচ্ছায় অন্যায় করেছেন, তাঁদের অবশ্যই চিহ্নিত করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
জহির উদ্দিন শপন আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে প্রশাসনের পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান যেন তাঁরা কোনো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করেন। একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে দুর্নীতিমুক্ত ও বৈষম্যহীন একটি দেশ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের এই সুবিধার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কাছে সরকারের সেবা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সভায় বরিশালের স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আজ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একাংশ। তবে এই শ্রদ্ধা নিবেদনকে কেন্দ্র করে ডাকসুর ভেতরেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির কয়েকজন সদস্য। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এবং জিএস এস এম ফরহাদের নেতৃত্বে একটি দল শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানালেও সেখানে ডাকসুর অনেক কার্যনির্বাহী সদস্যকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে সরব হয়েছেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা।
শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৪৮ মিনিটে বিটিভির সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করে সর্ব মিত্র চাকমা তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ডাকসু যে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে গেছে, সেটি তিনিসহ আরও কয়েকজন সদস্য কেবল টেলিভিশনের মাধ্যমেই জানতে পেরেছেন। তাঁর এই পোস্টে ফাতেমা তাসনিম জুমা, হেমা চাকমা, উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া এবং উম্মে সালমাসহ ডাকসুর অন্য সদস্যদের নাম উল্লেখ করে বিষয়টি নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, ভিপি ও জিএসের সাথে মূলত ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নেতারাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন, আর বাকি সদস্যদের পরিকল্পিতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডাকসুর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে একুশের প্রথম প্রহরে প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাষ্ট্রীয় এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বর্তমান সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান শ্রদ্ধা জানান। তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর কিছু সময় পর অর্থাৎ রাত ১টার দিকে ডাকসু নেতাদের একাংশকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে দেখা যায়। শহীদ মিনারের মতো পবিত্র স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের ক্ষেত্রেও এমন বিভাজন ও দূরত্ব তৈরি হওয়াকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন ক্ষুব্ধ সদস্যরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্ব মিত্র চাকমার সেই পোস্টটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়, যেখানে তিনি অত্যন্ত বিদ্রূপাত্মক ভাষায় লিখেছেন, ‘আমরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের বদৌলতে জানলাম ডাকসু শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে গেছে, হাহা!’ এই ঘটনার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে একুশের চেতনায় যেখানে ঐক্য ও বৈষম্যহীনতার কথা বলা হয়, সেখানে ডাকসুর মতো একটি প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনের ভেতর এমন সমন্বয়হীনতা ও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি কাম্য নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে ভিপি সাদিক কায়েম বা জিএস এস এম ফরহাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে মহান শহীদ দিবসের প্রথম প্রহরেই ডাকসুর অভ্যন্তরীণ এই ফাটল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে সংহতি প্রকাশ করে এবং বাংলা ভাষায় কথা বলে বিশেষ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। শনিবার সকালে ‘মার্কিন দূতাবাস, ঢাকা’-র অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই আন্তরিক অভিবাদন জানান। রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন তাঁর বার্তায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন যে, ভাষা প্রতিটি মানুষের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য পরিচয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্ববাসীকে নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার এবং নিজস্ব ইতিহাসকে ধারণ করার শিক্ষা দেয়। আমেরিকার পক্ষ থেকে বাংলাদেশের মানুষের এই মহান আত্মত্যাগের দিনে তিনি গভীর একাত্মতা প্রকাশ করেন।
এদিকে, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আজ যথাযোগ্য মর্যাদায় ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ এবং বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে শহীদদের স্মৃতি স্মরণ করেন এবং তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর পর্যায়ক্রমে বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ, সংসদ সদস্য এবং সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানগণ ভাষাশহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করে সম্মান প্রদর্শন করেন। উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও এই রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সর্বস্তরের মানুষ খালি পায়ে এবং হাতে ফুল নিয়ে শহীদ মিনারের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের কালজয়ী সুরের মূর্ছনায় চারপাশ এক আবেগঘন পরিবেশে রূপ নেয়। নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সুশৃঙ্খলভাবে ভাষা শহীদদের বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। কেবল ঢাকাতেই নয়, দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এবং বিদেশের মাটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও আজ যথাযথ মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে বাংলায় শুভেচ্ছা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক মহলের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ একুশের গুরুত্বকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ধারণ করার বিষয়ে রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য একুশের বিশ্বজনীন চেতনারই প্রতিফলন। আজ সারা বিশ্বে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতীক হিসেবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে, যা ১৯৫২ সালের সেই অদম্য সাহসিকতা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এক অনন্য বৈশ্বিক দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে এক বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজধানীর তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে নিজের প্রথম আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার সকালে তেজগাঁও কার্যালয়ে পৌঁছে তিনি ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন। নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই কার্যালয়ে এটিই তাঁর প্রথম সরকারি স্বাক্ষর ও আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি, যার মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পর সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে এই দপ্তরের প্রশাসনিক কার্যক্রম পুনরায় পূর্ণোদ্যমে সচল হলো। ২১শে ফেব্রুয়ারির মতো একটি জাতীয় ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিনে এই যাত্রাকে নতুন সরকারের পথচলায় এক বিশেষ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী আজ সকাল ১০টা ১০ মিনিটে তেজগাঁও কার্যালয়ে পৌঁছালে সেখানে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। কার্যালয়ের মূল ভবনে প্রবেশের সময় এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন পরিস্থিতির অবতারণা হয়। প্রধানমন্ত্রী সেখানে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সময় দায়িত্ব পালনকারী অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে কাছে পেয়ে তিনি তাঁদের নাম ধরে সম্বোধন করেন এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক খোঁজখবর নেন। সরকারপ্রধানের এমন সহমর্মিতা ও ব্যক্তিগত ছোঁয়ায় উপস্থিত দীর্ঘদিনের কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়।
দাপ্তরিক কাজ শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি গভীর মমতা প্রদর্শন করে কার্যালয় চত্বরে একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ ফুলের চারা রোপণ করেন। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শেষে তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন এবং দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও সর্বস্তরের জনগণের কল্যাণ কামনায় আয়োজিত বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। এই সময় প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতির সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তেজগাঁও কার্যালয়ের পুনরুজ্জীবিত এই কর্মতৎপরতাকে সংশ্লিষ্টরা প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হিসেবে অভিহিত করছেন।
স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় মিলিত হন এবং দেশের বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামসহ উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা এবং জাতীয় চেতনার আলোকে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করার এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। এর ফলে তেজগাঁও কার্যালয়ে পুনরায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
২১শে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে অমর ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ)। শনিবার দিবসের প্রথম প্রহরে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য এবং প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে বিএমইউ প্রশাসনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ শেষে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনায় কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করা হয়।
শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের পাশাপাশি সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার কর্মসূচি পালন করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদনকালে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের সাথে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার এবং শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মোঃ আতিয়ার রহমান। এছাড়াও ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম এবং প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ ফরহাদসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ এই জাতীয় কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও চিকিৎসা সেবা বিভাগের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পরিচালক এবং বিএমইউ ড্যাবের সভাপতি সহযোগী অধ্যাপক ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী, অর্থ ও হিসাব পরিচালক খন্দকার শফিকুল হাসান রতন এবং সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. মোঃ শাহিদুল হাসান বাবুল উল্লেখযোগ্য। একুশের চেতনাকে ধারণ করে চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সেবামূলক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন উপস্থিত নেতৃবৃন্দ।
বিএমইউ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও উপস্থিত ছিলেন উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মোহাম্মদ আবু নাছের, উপ-রেজিস্ট্রার (আইন) ডা. আবু হেনা হেলাল উদ্দিন আহমেদ, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক লুৎফর রহমান ও মোঃ হুমায়ুন কবীর এবং উপ-রেজিস্ট্রার সাবিনা ইয়াসমিন ও এটিএম আমিনুল ইসলাম। বিএমইউ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইয়াহিয়া খাঁন এবং প্রচার সম্পাদক শামীম আহম্মদসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পুরো অনুষ্ঠানটি ভাবগাম্ভীর্যের সাথে সম্পন্ন হয়। ভাষা আন্দোলনের এই অদম্য স্পৃহা যেন আগামী দিনে দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।