বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই মন্তব্য বলে করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কোনো সংস্থা, সেটা র্যাব হোক, পুলিশ হোক বা অন্য যেকোনো সংস্থা হোক—তারা অন্যায় করলে আমাদের দেশে সেটার বিচার হয়। কেউ যদি কোনো অন্যায় করে, আমাদের দেশে তার বিচার হয়। এই বিচারে কেউ রেহাই পায় না। অনেক সময় তারা কোনো কাজ অতিরিক্ত করে, করতে পারে। কিন্তু করলে আমাদের দেশের আইনেই সেটার বিচার হচ্ছে। যেখানে এমন বিচার হচ্ছে, এমন ব্যবস্থা আছে, সেখানে এই স্যাংশন কী কারণে?’
যুক্তরাষ্ট্র সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াশিংটন ডিসিতে ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। শনিবার সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়।
সাক্ষাৎকারে ভয়েস অব আমেরিকার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার এটাই প্রশ্ন— কথা নেই, বার্তা নেই; হঠাৎ ভিসা স্যাংশন দিতে চাচ্ছে কী কারণে? আর মানবাধিকারের কথা যদি বলে বা ভোটের অধিকারের কথা যদি বলে... আমরা, আওয়ামী লীগ; আমরাই তো এদেশের মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করেছি। আমাদের কত মানুষ রক্ত দিয়েছে, এই ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য।’
‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন যেন হয়, তার জন্য যতরকম সংস্কার দরকার, সেটা আওয়ামী লীগ করেছে’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজ ছবিসহ ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, মানুষকে ভোটের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা...। ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দিবো’— এই স্লোগানও আমার দেয়া। আমি এভাবে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছি। কারণ আমাদের দেশে বেশিরভাগ সময় স্বৈরশাসকরা দেশ শাসন করেছে। তাদের সময় সাধারণ মানুষের ভোট দিতে হয়নি। তারা ভোটের বাক্স ভরে নিয়ে ফলাফল ঘোষণা করে দিয়েছেন। এরই প্রতিবাদে আমরা আন্দোলন, সংগ্রাম করে আজ আমরা নির্বাচন সুষ্ঠু পরিবেশে নিয়ে আসতে পেরেছি। এখন মানুষ তার ভোটের অধিকার সম্পর্কে অনেক সচেতন। সেটা আমরা করেছি।”
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর যতগুলো নির্বাচন হয়েছে, জাতীয় কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচন; প্রত্যেকটা সুষ্ঠুভাবে হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব নির্বাচনে মানুষ তার ভোট দিয়েছে স্বতস্ফূর্তভাবে। এই নির্বাচনগুলো নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলার চেষ্টা করেছে, কিন্তু বাস্তবতাটা কী, বাংলাদেশের মানুষ তার ভোটের অধিকার নিয়ে সবসময় সচেতন। কেউ ভোট চুরি করলে তাদের ক্ষমতায় থাকতে দেয় না।’
উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া ভোট চুরি করেছিলেন। সে কিন্তু দেড় মাসও টিকতে পারেনি। ওই বছরের ৩০ মার্চ তাকে জনগণের রুদ্র রোষে পড়ে পদত্যাগ বাধ্য হয়েছেন তিনি। আবার ২০০৬ সালে ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে ভোটার তালিকা করেছিল। সেই ভোটার তালিকা দিয়ে নির্বাচন করে সে যখন সরকার গঠনের ঘোষণা দিলো... এরপর জরুরি অবস্থা জারি করা হলো। সেই নির্বাচন বাতিল হয়ে গেল। কাজেই আমাদের দেশের মানুষ কিন্তু এখন ভোট সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কাজেই একটা নির্বাচন অবস্থা, সুষ্ঠু হবে— এটা তো আমাদেরই দাবি ছিল। এবং আন্দোলন করে আমরাই সেটা প্রতিষ্ঠিত করেছি। তো আজ তারা স্যাংশন দিচ্ছে, আরও দেবে; দিতে পারে। এটা তাদের ইচ্ছা। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের যে অধিকার; তাদের ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার, তাদের বেঁচে থাকার অধিকার, তাদের শিক্ষা-দীক্ষার অধিকারসহ সব মৌলিক অধিকার আমরা নিশ্চিত করেছি।’
বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর অনুমোদন দেয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ জন্য তাকে তার সাজা বর্তমানে স্থগিত করে বাড়িতে থাকার ও দেশে চিকিৎসা নেয়ার অনুমোদন যে এক সরকারি আদেশে বর্তমানে কার্যকর রয়েছে তা বাতিল করে, জেলে গিয়ে আদালতের কাছে আবেদন করতে হবে।’
‘২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল, বাংলাদেশ কিন্তু বদলে যাওয়া বাংলাদেশ’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আর বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ নেই, এখন মানুষের সেরকম হাহাকার নেই, এমনকি আমাদের যে বেকারত্ব সেটাও কিন্তু কমিয়ে এখন মাত্র তিন শতাংশ। সেটাও তারা কাজ করে খেতে পারেন।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশেই এখন অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাই ভিসা স্যাংশন এর ফলে যদি (বাংলাদেশিরা) আমেরিকায় আসতে না পারে, আসবে না। তাতে কিছু যায় আসে না।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের অফিস, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ দেশি বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে গুমের ব্যপারে যে অভিযোগগুলো করেছে, সে ব্যাপারে তার সরকারের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারে তিনি সদ্য পাস হওয়া সাইবার নিরাপত্তা আইনের যে ধারাগুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তারও জবাব দেন।
আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শান্তিরক্ষীদের অসামান্য কৃতিত্বের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, “বিশ্বমঞ্চে আমাদের শান্তিরক্ষীরা যে কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, তা শত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই সম্ভব হয়েছে। দেশের এই গৌরব যেন কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সেটি রক্ষা করা সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কর্তব্য।” অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের এই সুনাম বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
প্রধানমন্ত্রী বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গকারী বীর শান্তিরক্ষীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। বিশেষ করে ২০২৫ সালে সুদান মিশনে শাহাদাতবরণকারী ৬ জন সেনা সদস্যের পরিবারের হাতে তিনি সম্মাননা পদক তুলে দেন এবং বিভিন্ন মিশনে আহত সদস্যদের খোঁজখবর নেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কর্মরত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাথে তিনি মতবিনিময় করেন। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের অবদানের পরিসংখ্যান তুলে ধরে সরকারপ্রধান জানান, এ পর্যন্ত ৪৩টি দেশের ৬৩টি মিশনে ২ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি সদস্য কাজ করেছেন। বর্তমানে ৯টি মিশনে ৪ হাজার ২১২ জন সদস্য কর্মরত রয়েছেন এবং হাইতির নতুন মিশনে যোগদানের প্রক্রিয়া চলমান আছে। বিশেষ করে বাহিনীগুলোতে নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ ১১ শতাংশে উন্নীত হওয়াকে তিনি আধুনিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এক অনন্য সংযোজন হিসেবে অভিহিত করেন।
সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক এবং সেনাবাহিনীর একজন মেজরই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও সংহতির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেন, অতীতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তেমনি ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আসা সর্বগ্রাসী আঘাতসহ সব ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে এই বাহিনীকে এগিয়ে যেতে হবে। ইউনিফর্মধারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রফেশনালিজম, ইউনিটি, ডিসিপ্লিন এবং চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা অপরিহার্য বলে তিনি সকলকে সতর্ক করেন।
বর্তমান সময়ের জটিল চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের ফলে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের চ্যালেঞ্জগুলো এখন অনেক বেশি বহুমুখী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রথাগত যুদ্ধ কৌশলের বাইরে বর্তমানে সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নিরাপত্তা সংকট বিশ্বশান্তির নতুন অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসকল আধুনিক ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীকে আরও আধুনিক ও দক্ষ করে তুলতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ সবসময় সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় মর্যাদার নীতিতে বিশ্বাসী। সংবিধানে উল্লেখিত বিশ্বশান্তি ও আন্তর্জাতিক সহ-অবস্থানের প্রতি দেশ সবসময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। সেনাকুঞ্জের এই বিশেষ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। দেশের এই আন্তর্জাতিক সাফল্যে প্রধানমন্ত্রী সকল শান্তিরক্ষী সদস্য ও তাদের পরিবারকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান।
ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ রেলক্রসিং এলাকায় দেওয়ানগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী ‘ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস’ ট্রেনের একটি পাওয়ার কার লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১০ জুন) সকাল ৯টা ১২ মিনিটের দিকে সংঘটিত এই দুর্ঘটনার ফলে জামালপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকাগামী সকল ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। তবে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো যাত্রী হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আকতার হোসেন দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি উদ্ধার তৎপরতার তথ্য জানিয়ে বলেন, “ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ট্রেনটির সামনের ৯টি বগি চলে এসেছে। একটি বগি আটকা পড়ে আছে। সেটি উদ্ধারে কাজ চলছে।” বর্তমানে ঘটনাস্থলে রেলওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্যরা মোতায়েন থেকে উদ্ধারকার্যে সহায়তা করছেন।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ট্রেনটির সামনের দিকের ৯টি বগি নিরাপদে লাইন অতিক্রম করতে পারলেও মাঝখানের পাওয়ার কারটি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ায় পথটি অবরুদ্ধ হয়ে আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্রুততম সময়ের মধ্যে ট্রেন চলাচল সচল করতে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্ধার কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।
‘ভাই, আমার সন্তানের জন্য একটু পানি দেন, আমি টাকা দিচ্ছি!’— পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তের শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে এক বাবার এই আকুল আর্তনাদ শুধু উপস্থিত সীমান্তরক্ষীদের নয়, কাঁপিয়ে দিয়েছে দুই দেশের সীমান্ত লাগোয়া মানুষের বিবেককে। কিন্তু আইনি জটিলতা আর কূটনীতির কাঁটাতারের বেড়াজালে আটকে পড়া সেই বাবার ডাকে সাড়া দেওয়ার উপায় ছিল না কারও।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক যখন নতুন করে ইতিবাচক ধারায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করানোর এক অনাকাঙ্ক্ষিত তৎপরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে শুরু করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত—সবখানেই এখন এক চরম ‘পুশইন’ আতঙ্ক। রাষ্ট্রহীনতার তকমা গায়ে মেখে, পরিচয়-সংকটে পড়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে আটকে আছেন বহু মানুষ। তীব্র দাবদাহ আর প্রবল বর্ষণের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের এই মানবেতর জীবনযাপন শুধু কোনো সীমান্ত সমস্যা নয়, বরং এক গভীর মানবিক ও কূটনৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
এক রাতে আট পয়েন্ট: জামালপুর-কুড়িগ্রামের সেই বিনিদ্র রজনী: এক রাতেই জামালপুর ও কুড়িগ্রামের আটটি পৃথক পয়েন্ট দিয়ে একযোগে শতাধিক মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেই রাতের পয়েন্টভিত্তিক সুনির্দিষ্ট বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
খেয়ারচর বিওপি: ১০৬৯ নম্বর পিলারের বিপরীতে ভারতের সদরটিলা এলাকা দিয়ে সবচেয়ে বড় দলটি অর্থাৎ প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়।
পাথরেরচর বিওপি: ১০৭৫ নম্বর পিলারের বিপরীতে ভারতের লুকায়েরচর এলাকা দিয়ে ১৮ থেকে ২০ জনের একটি দলকে পুশ-ইন করার চেষ্টা চলে।
ইজলামারি বিওপি: ১০৬৭ নম্বর পিলারের বিপরীতে ভারতের মানকারচর এলাকা দিয়ে ১২ থেকে ১৩ জন।
মোল্লারচর সীমান্ত: ১০৬২ নম্বর পিলারের বিপরীতে ভারতের কুচুনিমারা এলাকা দিয়ে আরও ১০ থেকে ১২ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালানো হয়।
দাঁতভাঙা বিওপি: ১০৫৪ নম্বর সীমান্ত পিলারের বিপরীতে ভারতের দীপচর এলাকা দিয়ে ৮ থেকে ১০ জন।
ঝাউডাঙা বিওপি: ১০৭৮ নম্বর পিলারের বিপরীতে ভারতের দুর্গাপাড়া এলাকা দিয়ে ৮ থেকে ১০ জন।
বাঘারচর বিওপি: ১০৭৩ নম্বর পিলারের বিপরীতে ভারতের বালুরঘাট ও কুমারেরচর এলাকা দিয়ে ৭ থেকে ৮ জন।
সাতানীপাড়া বিওপি: ১০৮৭ নম্বর পিলারের বিপরীতে ভারতের বিলডুবা এলাকা দিয়ে ৭ থেকে ৮ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়।
আঁধারের কৌশল বনাম ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ: সোমবার মধ্যরাতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের বাঘারচর সীমান্তের কুমারেরচর এলাকায়।
বিজিবি জানায়, মধ্যরাতে হঠাৎ করেই সীমান্তসংলগ্ন কুমারেরচর এলাকায় বিএসএফ তাদের সব সার্চলাইট ও সীমান্ত এলাকার আলো বন্ধ (লাইট অফ) করে দেয়। রাতের আঁধারে আচমকা আলো নিভিয়ে দেওয়ার এই কৌশলেই বিজিবি কর্মকর্তাদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। এর পরপরই বিএসএফ ১৮ জন মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা চালায়। তবে জামালপুর ৩৫ বিজিবি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ইস্পাতকঠিন প্রতিরোধ ও অতন্দ্র প্রহরার মুখে বিএসএফের সেই রাতের মিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
এর আগে গত রোববার রাতেও এই ব্যাটালিয়নের আওতাধীন বড়াইবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ৮ জনকে বাংলাদেশে পুশ-ইনের চেষ্টা চালিয়েছিল বিএসএফ। বিজিবি ও স্থানীয়দের কঠোর অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টাও নস্যাৎ হয়ে যায়।
জামালপুর ব্যাটালিয়ন ৩৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আমাদের আওতাধীন ৭২ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে ১৫টি বিওপির (সীমান্ত ফাঁড়ি) সদস্যরা দিনরাত টহল জোরদার করেছেন। অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে বাড়তি সতর্কতার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও বৃদ্ধি করা হয়েছে।’
লাঠিসোটা হাতে বিজিবির পাশে সাধারণ জনতা: বিএসএফের এই আকস্মিক ও দফায় দফায় পুশ-ইন চেষ্টার পর সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ও নিজেদের মাতৃভূমির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এখন বিজিবির পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাধারণ গ্রামবাসী। সোমবার রাতে দেওয়ানগঞ্জ সীমান্তে পুশ-ইনের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নেন এবং রাতভর সতর্ক পাহারায় অংশ নেন।
সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দা জহুরুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়েকদিন থেকে ভারত থেকে আমাদের দেশে মানুষ ঢুকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা বিজিবির সঙ্গে আছি, যাতে ভারতের কোনো লোক আমাদের বাংলাদেশে না ঢুকতে পারে।’
আমিনুর ইসলাম নামে আরেকজন গ্রামবাসী বলেন, ‘বিজিবির সঙ্গে এলাকাবাসীও রাতদিন সতর্ক অবস্থানে আছি। গ্রামের সবাই বিজিবিকে সহায়তা করছি। আমরা কোনোভাবেই ভারতের মানুষকে বাংলাদেশে ঢুকতে দেব না।’
তৃষ্ণায় কাঁদছে শৈশব: পঞ্চগড়ের হাড়কাঁপানো বাস্তবতা: জামালপুরের উত্তেজনা যখন লাঠিসোটা হাতে পাহারায় রূপ নিয়েছে, তখন পঞ্চগড়ের হাড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্তে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং হৃদয়বিদারক। সেখানে প্রায় ৩৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে শূন্যরেখায় আটকে আছে ১০ জন নারী, পুরুষ ও শিশু। এদের মধ্যে ৬ থেকে ৯ বছর বয়সি তিনটি নিষ্পাপ শিশু রয়েছে।
গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে খোলা আকাশের নিচে সম্পূর্ণ ভিজেছে এই পরিবারগুলো। মাথার ওপর নেই কোনো ছাদ, পায়ের নিচে কর্দমাক্ত মাটি। বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাবে তৃষ্ণার্ত শিশুরা বৃষ্টির পানি ও ডোবার নোংরা পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে, যা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই শিশুদের কান্না আর তৃষ্ণার্ত চোখ দুটি দেশের সীমান্ত আইন কিংবা কূটনীতির কোনো ব্যাকরণ বোঝে না; তারা বোঝে শুধু এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির আকুতি, যা দেওয়ার মতো কেউ নেই।
নওগাঁ: বছরজুড়েই নানা কারণে আলোচনায় থাকে সীমান্ত এলাকা। কখনও সীমান্ত হত্যা, কখনও কৃষকের ওপর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হয়রানি। কাঁটাতারের পাশের মানুষের জীবন যেন প্রতিদিনই অনিশ্চয়তা আর শঙ্কায় ভরা।
সবশেষ পুশইন ইস্যুতে আবারও নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে নওগাঁর সীমান্ত এলাকায়। এ নিয়ে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মাঝে দুঃচিন্তা বাড়ছে। এদিকে সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সীমান্তে টহল ও নিরাপত্তা জোরদার করেছে।
নওগাঁ জেলার সঙ্গে ভারতের নয়টি সীমান্ত অবস্থিত। এগুলো হচ্ছে- সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা সীমান্ত, পোরশা উপজেলার নীতপুর সীমান্ত এবং ধামইরহাট উপজেলার কালুপাড়া, চকিলাম, চকচণ্ডি, বস্তাবর, শিমুলতলী ও তালান্দার সীমান্ত। তবে সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যা বা কৃষকের ওপর বিএসএফের হয়রানি হয় সাপাহার উপজেলার হাঁপানিয়া ও করমুডাঙ্গা সীমান্ত এবং পোরশা উপজেলার নীতপুর সীমান্তে।
এসব সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারের কৃষি আর গবাদি পশুপালন একমাত্র উপার্জনের পথ। মাঠের ফসল সীমান্ত পাড়ের মানুষের সারাবছরের সঞ্চয়। তবে মাঠে ফসল ফলাতে গিয়ে বিএসএফের হাতে হয়রানির শিকার হতে হয় চাষিদের।
সাপাহার উপজেলার করমুডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা সুলতান বলেন, ‘জমিতে চাষাবাদ ছাড়া আমাদের করার আর কোনো কাজ নেই। জমিতে কাজ করতে গেলেই বিএসএফ প্রায়ই আমাদের ধাওয়া দেয়। অনেক সময় সীমানা পেরিয়ে এসে ভয়ও দেখায়। এছাড়া বিভিন্নভাবে হয়রানি করে। তারপরও বেঁচে থাকার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়।’
আক্কাস নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বেশিরভাগ সময় পুশ ইন আতঙ্ক চলছে। অবৈধভাবে মানুষ পাঠানোর চেষ্টা করছে বিএসএফ। বিজিবিও কঠোর অবস্থানে আছে। তারপরও নিরাপত্তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় থাকতে হয়। আমরা বিজিবিকে সহযোগিতা করছি।’
পোরশা উপজেলার নিতপুর গ্রামের বাসিন্দা ফরহাদ জানান, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সোমবার রাত ১০টার দিকে স্থানীয়রা দেখতে পায় বিএসএফ কিছু মানুষকে বাংলাদেশে পুশ ইন করার জন্য সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে। বিষয়টি জানাজানির পর প্রায় ২০০ জনের মতো মানুষ লাঠি হাতে এবং টর্চলাইট নিয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় পাহারা দেয়।
নওগাঁ-১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে বিজিবির সদস্যরা। সীমান্তে সার্বক্ষণিক নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারণের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এছাড়া জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। যেকোনো ধরনের মানবপাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও পুশ ইনের অপচেষ্টা প্রতিরোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।’
এই সংকট নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত পুশ-ইনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ নীরব থাকবে না। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছি দিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। বিজিবি সজাগ আছে এবং কোনোভাবেই এটা আমরা গ্রহণ করছি না। সম্প্রতি আমরা চেন্নাই থেকে ৩৪ জনকে ফেরত এনেছি। অবৈধ নাগরিকদের আদান-প্রদানে দুই দেশেরই একটি মেকানিজম বিদ্যমান আছে। সেই বিদ্যমান মেকানিজমটা, ডিপ্লোমেসিটা অবলম্বন করেই ভারতকে আমাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রতিটি ঘটনা আলাদা এবং ভারতের সরকার যদি এটাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা না করে, তবে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া কঠিন হবে।
অপরদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছেন। তার মতে, তারা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং আইন মেনেই অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছেন। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কাছে একটি তালিকাও দেওয়া হয়েছে এবং পরিচয় শনাক্তের বিষয়টি ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় একশ মানুষ বাংলাদেশে ফেরার আশায় জড়ো হচ্ছেন এবং ঢাকা ও দিল্লির যৌথ সম্মতিতে নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পরই কেবল ধাপে ধাপে হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে বলে ভারতের দাবি।
ভূ-রাজনীতি নাকি মানবিকতার অবক্ষয়? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সীমান্তের এই পুশ-ইনের ধারাবাহিক অপচেষ্টাকে শুধু সাধারণ সীমান্ত অপরাধ হিসেবে দেখতে নারাজ বিশেষজ্ঞরা। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ দেখছেন তারা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ইশফাক ইলাহী চৌধুরী মনে করেন, পুশ-ইনকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তার অংশ। বৈধ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ও দুই দেশের সুনির্দিষ্ট চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক পরামর্শ দিয়েছেন যে, ভারত যদি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন না করে একতরফা পুশ-ইন জারি রাখে, তবে বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর আশ্রয় নেওয়া। এই ইস্যুতে প্রয়োজনে জাতিসংঘের মানবাধিকার বা শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (UNHCR) শরণাপন্ন হতে পারে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে, তার সরাসরি প্রভাব ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর পড়ছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নাগরিক পরিচয় যাচাইয়ের প্রশ্নে অনড় অবস্থান এই সংকটকে আরও উসকে দিচ্ছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন, যশোর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, গঞ্চগড় ও নওগাঁ প্রতিনিধি।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৯ জুন) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- নতুন ৫টি, সংশোধিত ৩টি এবং মেয়াদ বৃদ্ধির ২টি প্রকল্প। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
জানা গেছে, অনুমোদিত ১০ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৯০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় হবে ৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো চট্টগ্রামের আনোয়ারা থেকে কক্সবাজারের ঈদ মনি পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রকল্পটির মাধ্যমে আনোয়ারা-বাঁশখালী-টইটং-পেকুয়া-বদরখালী-চকরিয়া (ঈদ মনি) আঞ্চলিক মহাসড়ককে যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীত করা হবে।
এছাড়া পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় নেয়া হয়েছে ‘সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্প। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন নির্মাণ প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশের ৩৩টি জেলার সার্কিট হাউস এবং ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিফট সংযোজনের প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে অনুমোদন পেয়েছে ‘বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ প্রকল্প-২’।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘ঢাকা সিএমএইচে ক্যানসার সেন্টার নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় দুটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এগুলো হলো—‘মাদরাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম (এমইএমআইএস) সাপোর্ট’ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন এবং দেশের ৬৫৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন।
এছাড়া বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ‘বিদ্যমান গ্রিড উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতাবর্ধন’ প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে।
দেশে বেকারত্ব দূরীকরণ ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে বর্তমানে বিনা সুদে কোনো ঋণ প্রকল্প না থাকলেও সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আওতায় নতুন উদ্যোক্তারা বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং স্টার্টআপ উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। পাশাপাশি দেয়া হচ্ছে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও ৫ হাজার টাকা ভাতা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য জনাব মোহাম্মদ আব্দুল মালিকের এক প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এদিন সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
সংসদকে অর্থমন্ত্রী বলেন, যুব সমাজকে আত্মনির্ভরশীল করতে এবং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে যুব ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের আওতায় ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড’ এবং অর্থ বিভাগের বিভিন্ন তহবিলের মাধ্যমে দেশব্যাপী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বাজেট বরাদ্দের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ‘স্টার্টআপ তহবিল’ খাতে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্টার্টআপ, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য এই বরাদ্দ দ্বিগুণ বাড়িয়ে মোট ৪০০ কোটি টাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার সারাদেশে ক্রমান্বয়ে সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে। নিম্ন ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতাসহ চলমান সকল সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও বরাদ্দ আগামী অর্থবছরে আরও সম্প্রসারণের বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ও রাশিয়া জনশক্তিখাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে রাশিয়ায় বর্তমানে কর্মরত প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা আগামী এক বছরের মধ্যে এক লাখে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাশিয়ায় চলমান তিন দিনের সরকারি সফরে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এ প্রস্তাব দিয়েছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, রুশ কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাবের ওপর দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে এবং উভয় পক্ষই শিগগিরই প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দুই দেশের আলোচনায় বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি দশগুণ বাড়ানোর বিষয়টি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উঠে এসেছে।
জনশক্তি খাতে সহযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ও রাশিয়া একমত হয়েছে যে বর্তমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম এবং তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো উচিত।
রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও ওষুধ সামগ্রীর বাজার বাড়ানোর সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন ড. খলিলুর রহমান।
বাণিজ্যের নতুন সুযোগ সন্ধান ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি বাংলাদেশি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল রাশিয়ায় পাঠানোর প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে রুশ পক্ষ।
এছাড়া দুই দেশের আলোচনায় প্রযুক্তি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংক্রান্ত সহযোগিতা বেশ গুরুত্ব পেয়েছে।
কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য একটি রুশ প্রতিনিধিদলকে বাংলাদেশ সফরের প্রস্তাব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই প্রস্তাবেও তাৎক্ষণিকভাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে রাশিয়া। পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালা প্রণয়ন এবং এই খাতে ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ বা উৎকর্ষ কেন্দ্র স্থাপনে সহায়তা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে মস্কো।
ড. খলিলুর রহমান ৭ জুন থেকে রাশিয়া সফরে রয়েছেন। এই সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
দেশের বৃহত্তম ভূ-উপরিস্থ সেচ ব্যবস্থা গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের পাম্পিং ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার ও নকশা পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উজানে পানি প্রবাহের দিক পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা (বাংলাদেশে পদ্মা) নদীর পানি মারাত্মকভাবে কমে গেলেও নিরবচ্ছিন্ন পানি উত্তোলন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রকৌশলগত নকশা অনুযায়ী, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ইনটেক চ্যানেলে পানি উত্তোলনের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় স্তর বর্তমান ৩.৯ মিটার থেকে কমিয়ে ২.৫ মিটারে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে। এই কৌশলগত সমন্বয়ের ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেলেও বিশাল পাম্পগুলো সচল রাখা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় জিকে প্রকল্প পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান এই উন্নয়ন সম্পর্কে জানান।
১৯৬২ সালে চালু হওয়া জিকে প্রকল্পটি বাংলাদেশের কৃষি অবকাঠামোয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখতে অতীব প্রয়োজনীয়। এই প্রকল্পের বিশাল কমান্ড এরিয়া প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং সেচযোগ্য এলাকা প্রায় ৯৫ হাজার ৫০০ হেক্টর।
তবে পুরোনো অবকাঠামো, অচল পাম্প এবং পলি জমে ভরাট হওয়া খালগুলোর কারণে কয়েক দশক ধরে এর কার্যকর পরিধি (সেচ এলাকা) কমে ৫৫ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, গঙ্গার পানির স্তর ৪.৫ মিটারের নিচে নেমে গেলেই পাম্পের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ১৯৭৫ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে এই সংকট আরো প্রকট হয়েছে, যা শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানিবিন্যাসকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালে এই দুর্বলতাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। সে বছরের শুষ্ক মৌসুমে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টের কাছে পানির স্তর চার মিটারের নিচে নেমে যায়, যার ফলে পাম্পগুলো পানি উত্তোলনে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়ে এবং সকল সেচ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘পাম্পগুলো একেবারেই চালানো যাচ্ছিল না, ফলে পুরো প্রকল্প এলাকাটি অত্যাবশ্যকীয় সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।’ বারবার ফিরে আসা এই হুমকি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার নকশা পুনর্গঠন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যা ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
নদীর পানির নিম্নস্তর থেকে পানি উত্তোলনের সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে এই উদ্যোগটি জলবায়ু পরিবর্তন এবং মৌসুমি পানি সংকটের মুখে প্রকল্পের সহনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
তবে জিকে প্রকল্পের কর্মকর্তারা আশাবাদের পাশাপাশি সতর্ক করে বলেন, নদীর মূল প্রবাহ ক্রমাগত কমতে থাকলে কেবল কাঠামোগত পরিবর্তনই যথেষ্ট নাও হতে পারে।
এ বিষয়ে প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা যদি পানি উত্তোলনের ন্যূনতম স্তর ১.৫ মিটার কমাতেও সফল হই, তবুও এর চূড়ান্ত সুফল নির্ভর করবে উজানের পর্যাপ্ত ও স্থিতিশীল পানি প্রবাহ পাওয়ার ওপর।’
উল্লেখ্য, দেশের কৃষি ইতিহাসে জিকে প্রকল্প এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৫১ সালে প্রাথমিক সমীক্ষা এবং ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়। একটি ‘লিফট-কাম-গ্র্যাভিটি’ সেচ ব্যবস্থা হিসেবে পরিকল্পিত এই প্রকল্পটি পদ্মা থেকে পানি উত্তোলন করে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং মাগুরা জেলার মধ্য দিয়ে বয়ে চলা বিশাল খাল নেটওয়ার্কে পানি সরবরাহ করে।
বছরের পর বছর ধরে উজানে পানির প্রাপ্যতা হ্রাস, ইনটেক চ্যানেলে অতিরিক্ত পলি জমা এবং পুরোনো যন্ত্রপাতির কারণে এর সর্বোচ্চ কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং ঐতিহাসিক নথিপত্র থেকে জানা যায়, পাম্পগুলোর মূল নকশার মানদণ্ড নদীর তৎকালীন যে অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়েছিল, শুষ্ক মাসগুলোতে নদীর সেই অবস্থা এখন আর বিরাজমান নেই।
এদিকে, আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটির চেয়ারম্যান সৈয়দ টিপু সুলতান সম্প্রতি গণমাধ্যমকর্মীদের একটি দলের নেতৃত্বে কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীতে পদ্মার পানিনির্ভর অঞ্চলগুলো পরিদর্শন করেন।
চলমান সংকট নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি একটি ন্যায্য ও পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় সমাধান অধরাই থেকে যায়, তবে গঙ্গার পানি বণ্টন সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধটি জাতিসংঘের টেবিলে উত্থাপন করা উচিত।
শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ও শাখা খাল নিয়ে গঠিত জিকে নেটওয়ার্ক গ্রামীণ জীবনযাত্রা ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আজও অপরিহার্য।
চলতি বছরের জুন মাসের প্রথম ৮ দিনে দেশে প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এসেছে ৯৭ কোটি ৯০ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ১২ হাজার ১৮ কোটি ৩২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা হিসাবে)। মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আরিফ হোসেনের দেওয়া তথ্য মতে, গত সোমবার (৮ জুন) প্রবাসী আয় এসেছে এক হাজার ৩২৪ কোটি ৯৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। গত বছরের জুন মাসের প্রথম ৮ দিনে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯০ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলার। সেই তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে সাত দশমিক ৯২ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের (১ জুলাই থেকে ৮ জুন পর্যন্ত) সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ পর্যন্ত দেশে তিন হাজার ৩৭৩ কোটি ৫৮ লাখ ৯০ হাজার ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয়ের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৮৪১ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ গত অর্থবছরের তুলনায় এ বছর একই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
সরকারের বেঁধে দেওয়া হার্টের (হৃদরোগ) ২৯ ধরনের রিংয়ের (স্টেন্ট) দাম বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। হৃদরোগের চিকিৎসা দেওয়া হাসপাতালগুলোকে নতুন দামে রিং বিক্রির বিষয়ে চিঠি দিয়েছে নিয়ন্ত্রণক সংস্থাটি।
মঙ্গলবার ডিজিডিএ’র মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত হওয়া নতুন দামে এক হাজার থেকে শুরু করে ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে স্টেন্টের (রিং) দাম।
চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বিশেষজ্ঞ কমিটির পঞ্চম ও ষষ্ঠ সভায় সুপারিশের আলোকে স্টেন্টের (রিং) দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর গত ১৩ মে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় কিছু প্রতিষ্ঠানের মূল্য পুনর্বিবেচনার আবেদন পর্যালোচনা করে নতুন দাম চূড়ান্ত করা হয়।
নির্দেশনা বলা হয়েছে, স্টেন্টসমূহের (রিং) হালনাগাদ মূল্য তালিকা সর্বসাধারণের অবগতির জন্য সংশ্লিষ্ট সকল হাসপাতালের নোটিশ বোর্ডে উম্মুক্ত স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য অনুসরণ করে ক্রয় ও বিক্রয় করতে হবে। তবে কোনোভাবেই চিকিৎসা প্যাকেজের মধ্যে এই মূল্য অন্তভু©ক্ত করা যাবে না।
পাশাপাশি স্টেন্টের (রিং) নাম, সর্বোচ্চ মূল্য ও উৎপাদনকারীর নাম উল্লেখসহ পৃথক ক্যাশমেমো প্রদান করতে হবে। এছাড়াও ব্যবহৃত স্টেন্টের প্যাকেটটি রোগীকে সরবরাহের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং ধারাবাহিক উচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের ব্যাপারে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত বোরিস ভ্যান বোমেল-এর সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
এ সময় বাংলাদেশে সফররত ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও ওশেনিয়াবিষয়ক পরিচালক ডমিনিক কুলিং উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায়, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিল্প খাতের টেকসই উন্নয়ন, কৃষি এবং পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার প্রশংসা করেন।
উভয় পক্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অভিবাসন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং শিক্ষা, ক্রীড়া ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এ ছাড়াও, তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন। উভয় পক্ষই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি নেদারল্যান্ডসের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
এর আগে, সফররত ডাচ প্রতিনিধিদল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মু. নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের যে ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন মাত্রায় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যু প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, ভারত বাংলাদেশকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন না। তার মতে, বিষয়টি মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রভাবও এর পেছনে থাকতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া প্রচারণা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেক সময় কোনো ব্যক্তির নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়, এমনকি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ডও ছড়ানো হয়। এসব অপতৎপরতা মোকাবিলায় সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে এবং এ লক্ষ্যে আইনজীবীদের একটি প্যানেল গঠনের কাজ চলছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি দলীয় নয়, নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ায় ব্যক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের কেউ অংশ নিলে সরকারের কোনো আপত্তি নেই। কারণ নির্বাচনে দলীয় পরিচয় বা পদ-পদবি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
শিক্ষা খাতে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ অনার্স পর্যায় থেকে তুলে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিকেও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এসব বিভাগ অনার্স পর্যায়ে বহাল থাকবে। তবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একইভাবে চালু রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে। এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় কলেজগুলোতে পর্যায়ক্রমে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
আসন্ন ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার অত্যন্ত নামমাত্র খরচে এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্টটি সাধারণ মানুষের জন্য প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এখন নির্বিঘ্নে বড় পর্দায় খেলা উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচারের আর্থিক দিকটি বিশ্লেষণ করে তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় ফিফার সাথে ৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ভ্যাট ও আয়করসহ এর মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। তবে জনগণের জন্য স্বস্তির খবর হলো, এই বিশাল অংকের টাকা বিটিভিকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দিতে হবে না। সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন টেলিকম অপারেটর, স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাছে বিজ্ঞাপন ও উপ-স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমে প্রায় সব অর্থ তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। ফলে সরকারি খরচের বোঝা কমিয়ে নামমাত্র ব্যয়ে এই বিশ্ব আসর প্রচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী পূর্বের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, অতীতে ফুটবল বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে নানাবিধ গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়েছিল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে বিটিভি প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল, যা নিয়ে স্বচ্ছতার বড় প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি এবারও একটি মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠান ফিফার কাছ থেকে স্বত্ব কিনে নিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা দাবি করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশে জনগণের অর্থের অপচয় রোধে সরকার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে তথ্য মন্ত্রণালয় সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়ালকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে সফলভাবে চুক্তিটি সম্পন্ন করে।
সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ফিফার কাছ থেকে এই স্বত্ব কেনার প্রস্তাবটি গত রোববার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয়। তথ্য প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, এই ম্যারাথন মিটিং ও দীর্ঘ দরকষাকষির মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করা এবং জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কুচক্রী মহলের প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে বিটিভি এখন এককভাবে এই সম্প্রচার অধিকার অর্জন করেছে, যা দেশের সরকারি প্রচারমাধ্যমের সক্ষমতার একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আগামী ১১ জুন থেকে উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরে শুরু হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলা এই ফুটবল মহাযজ্ঞে অংশ নেবে বিশ্বের সেরা সব ফুটবল দল। দীর্ঘ ৩৯ দিনের এই আসরটি বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্মাদনা ছড়িয়ে দেবে। দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের দোরগোড়ায় এই আনন্দ পৌঁছে দিতে বিটিভি এখন কারিগরি ও প্রশাসনিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত। ১১ জুন উদ্বোধনী ম্যাচ থেকেই সরাসরি সম্প্রচার শুরু হবে বলে তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে তৈরি হওয়া সব ধূম্রজাল ও সংশয় কেটে গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি এবং স্বত্বাধিকারী অন্যান্য মাধ্যমে দেশের ফুটবলপ্রেমী মানুষ এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে দর্শকদের সুবিধার্থে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্পটে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচার বিষয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।
ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা ও পাগলামি সর্বজনবিদিত। বেশ কিছুদিন ধরে খেলা সম্প্রচার নিয়ে একটি ধূম্রজাল তৈরি হয়েছিল, যা আজ পুরোপুরি নিরসন করা হলো। বিটিভির মাধ্যমে এবং যারা স্বত্ব নিয়েছে, তাদের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে পারবেন।’
বিশ্বকাপের খেলাগুলোর সময়সূচি মধ্যরাত কিংবা ভোরে হওয়ার কারণে দর্শকদের জন্য বড় পর্দায় খেলা দেখানোর বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘বেশ কিছু বেসরকারি কোম্পানি ইতোমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। খেলা দেখানোর টাইমটা এবার মধ্যরাতে কিংবা ভোরে হয়ে গেছে। তাই প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে আমরা উৎসাহিত করেছি, পাশাপাশি আমাদের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্পটে তারা বড় বড় মনিটর ও ডিজিটাল বিলবোর্ড দিয়ে খেলাগুলো সরাসরি দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করবে।’
সম্প্রচার প্রক্রিয়ার অভাবনীয় স্বচ্ছতা ও সরকারের সাশ্রয়ী নীতির কথা উল্লেখ করে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের আমলে যেখানে ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কেনা হয়েছিল, সেখানে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে মাত্র ৪৭ কোটি টাকায় এই স্বত্ব কিনেছে।
আমিনুল হক বলেন, এই ৪৭ কোটি টাকাও আবার বিভিন্ন বিজ্ঞাপন স্বত্ব (এডভারটাইজমেন্ট রাইটস) বিক্রির মাধ্যমে উঠে আসবে, যার ফলে সরকারি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অবস্থান বজায় রেখে এই সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
দেশের সব ফুটবলপ্রেমীকে এই আনন্দের অংশীদার করতে এবং সরকারের এই যুগান্তকারী ও স্বচ্ছ উদ্যোগটি জনগণের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন প্রতিমন্ত্রী।