গণমাধ্যমের ওপর ভিসানীতি প্রয়োগের বিষয়ে ঢাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বক্তব্যে হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ১৯০ জন বিশিষ্ট নাগরিক।
শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘গণমাধ্যমে ভিসানীতি প্রয়োগের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নীতির পরিপন্থী। বাংলাদেশের গণমাধ্যম উগ্রবাদী শক্তি, জঙ্গি, জামায়াত ইসলামীর মতো যুদ্ধাপরাধীর দল, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যারা প্রগতিশীল ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোকে নির্মূল করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে সোচ্চার ভূমিকা রাখছে। এর ফলে বাংলাদেশ তালেবানের মতো একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি।’
বিবৃতিতে বিশিষ্ট নাগরিকরা বলেন, ‘গণমাধ্যমের ওপর ভিসানীতি নিয়ে হাসের বক্তব্যটিকে কট্টরপন্থী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা স্বাগত জানিয়েছে। এই পক্ষটি অন্যান্য নীতিতে পশ্চিমাদের নিন্দা করে, মুক্তচিন্তকদের শত্রু মনে করে এবং তারা ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধীদের দায়মুক্তির পক্ষে।’
“হাসের বক্তব্যকে জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র হিসেবে পরিচিত ‘বাঁশের কেল্লা’ নামের ফেসবুক পেজ থেকে স্বাগত জানিয়ে পোস্ট করা হয়েছে। যেখানে হাসকে ‘একজন সত্যিকারের বন্ধু’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতে এই পেজে ব্লগার ও মুক্তচিন্তকদের হত্যার পক্ষে নানা বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। ফলে, এই পেজে হাসের বিবৃতি নিয়ে উল্লাস আসলে ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদের জন্য নিগূঢ় বার্তা দেয়।”
বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা দেখেছি, জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধ, ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদের কণ্ঠরোধ ও সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য নিয়ে ‘বাঁশের কেল্লা’ পেজে আস্ফালন চলছে।”
এতে বলা হয়, ‘আমরা দেখেছি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ভিসানীতিতে গণমাধ্যমের কথা উল্লেখ করা থেকে বিরত ছিলেন। কিন্তু হাস তার বক্তব্য প্রত্যাহার না করায় ধারণা করা যায়, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়তো চূড়ান্ত। এরই মধ্যে সম্পাদক ও সাংবাদিকেরা এটির নিন্দা করেছেন। হাসের এই বক্তব্যের কারণে সংবাদমাধ্যমগুলো সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশে বাধাপ্রাপ্ত হবে বলে অনেকেই মত দিয়েছেন।’
হাসের দ্বৈতনীতির বিষয়টি তার বক্তব্যে উঠে এসেছে উল্লেখ করে বিশিষ্ট নাগরিকরা বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশে আসার পর থেকে তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু তার এখনকার অবস্থান গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মৌলিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
‘মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা ছিল, গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দিলে তারাও ভিসানীতির আওতায় আসবে। কিন্তু হাসের বিবৃতিতে দেখা যায়, বাংলাদেশের সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রতিশ্রুতি, আর সেখানে গণমাধ্যমের ভূমিকার যে সুযোগ ছিল, সেটিকে মারাত্মক বাধাগ্রস্ত করবে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক প্রচেষ্টা দেখেছি, যা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে বিপন্ন করার সম্ভাবনা রাখে। র্যাবের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের নিষেধাজ্ঞার দাবি উত্থাপনে বড় ভূমিকা রেখেছেন দেশটির বিতর্কিত মার্কিন সিনেটর বব মেনেন্ডেজ। এ ছাড়া ছয় মার্কিন কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষরে একটি বিবৃতি প্রদান করা, যেখানে দাবি করা হয়েছে, বর্তমান সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেছে, যা একেবারে বাস্তবতাবিবর্জিত এবং ন্যায়সঙ্গত নয়। ফলে, এই বিষয়গুলো আমাদের চিন্তা করতে বাধ্য করে যে এ ধরনের কার্যক্রমের পেছনে ভিন্ন কোনো ইচ্ছা রয়েছে কি না।’
বিশিষ্টজনদের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অতীতে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালে জামায়াত এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা থেকে শুরু করে হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের হামলা আমরা দেখেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা ব্যতীত এসব সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অসম্ভব। বিএনপি-জামায়াত সর্বশেষ যেই জোট সরকার গঠন করেছিল, সে সময়ও ২৮ হাজারের বেশি হামলা চালানো হয় সংখ্যালঘুদের ওপর, যেখানে তাদের সম্পত্তি, বাড়িঘর দখলসহ মন্দিরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়, জীবন্ত মানুষকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এ বিষয়ে তৎকালীন সরকারকে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। কিন্তু বর্তমান সরকার নির্বাচিত হয়ে আসার পর রাষ্ট্রের সহায়তায় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়েছে। আর সাম্প্রদায়িক এই সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা দেখতে পেলাম, ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখার প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ঘটেনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দণ্ডপ্রাপ্ত এবং আত্মস্বীকৃত খুনিদের ক্ষেত্রে, যাদের যুক্তরাষ্ট্র আশ্রয় প্রদান করছে। এটি বাংলাদেশের জন্য এমন এক জঘন্য হত্যাকাণ্ড, যা মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটায়। সুতরাং আমরা মনে করি যে ভিসানীতিটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যৌক্তিক। কারা এর অনুমোদন দেবে এবং এই ধরনের পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা বোঝাটাও জরুরি। কারণ, আমরা রাষ্ট্রদূতের কার্যকলাপ দেখেছি এবং অন্যান্য কার্যাবলিও দেখেছি, যা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাওয়া মৌলবাদী শক্তিগুলোর জন্য বারুদ হিসেবে কাজে এসেছে।’
বিবৃতিতে লেখক, অধিকারকর্মী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য, যুদ্ধাপরাধবিরোধী প্রচারক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ মোট ১৯০ জন বিশিষ্ট নাগরিক স্বাক্ষর করেছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদজায়া শিক্ষাবিদ শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, কথাশিল্পী অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, শহীদজায়া সালমা হক, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, আইনজীবী ও বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত, চলচ্চিত্রনির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন (অব.) আলমগীর সাত্তার, চিকিৎসক আমজাদ হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক নূরন নবী, অধ্যাপক শিল্পী আবুল বারক আলভী, অধ্যাপক মেজবাহ কামাল, চিকিৎসক শেখ বাহারুল আলম, চিকিৎসক ইকবাল কবীর, বীর মুক্তিযোদ্ধা সমাজকর্মী সুব্রত চক্রবর্ত্তী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ভূতত্ত্ববিদ মকবুল-ই এলাহী চৌধুরী, অধ্যাপক আবদুল গাফ্ফার, কবি জয়দুল হোসেন, সমাজকর্মী কাজী লুৎফর রহমান, সমাজকর্মী কামরুননেসা মান্নান, আইনজীবী আজাহার উল্লাহ্ ভূঁইয়া, বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্মল রোজারিও, বুড্ডিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয়।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীর বনানী আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশেষ কুচকাওয়াজে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার সকালে বর্ণাঢ্য এ আয়োজনে অংশ নেন তিনি।
আর্মি স্টেডিয়ামে পৌঁছানোর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় তিনি ফাতেহা পাঠ ও দোয়া শেষে মরহুম নেতৃবৃন্দের রুহের মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত বিশেষ মোনাজাতে শরিক হন।
বনানীর এই অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান, বিমানবাহিনী প্রধান, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ এবং জাতীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিদেশি কূটনীতিকরা এ কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এবং সশস্ত্র বাহিনীর ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিশেষ প্রদর্শনী পরিবেশন করা হয়। এতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) তিন হাজার সদস্য এবং বাংলাদেশ স্কাউটসের পাঁচ শত সদস্য সুশৃঙ্খল কুচকাওয়াজ ও নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজধানীর জিয়া উদ্যানে যান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে দুই নেতার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ একা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
এ সময় তারা ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। মোনাজাতে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনা করা হয়। পরে সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এ্যাড. রুহুল কবির রিজভী, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম (নূরুল ইসলাম মনি) সহ অন্যান্য নেতারা।
এদিকে, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে বিএনপি। শনিবার বিকেল ৩টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এতে হেঁটে অংশ নেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, শোভাযাত্রাটি নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি কাকরাইলে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে দিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় অতিক্রম করবে। এরপর বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হবে।
তারেক রহমানের শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। শোভাযাত্রা সফল করতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপিসহ দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। সূত্র: বাসস
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর আজ, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র টানাপোড়েনের মধ্যে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের কাঠামোয় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
এর তিন দিন আগে, ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর তৎকালীন চিফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়।
৭ নভেম্বর সৈনিকদের বিদ্রোহ ও সাধারণ জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান মুক্ত হন।
পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনা, জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা-
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সূচনালগ্নে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে জেড ফোর্সের অধিনায়কত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। সামরিক নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা ও যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রশাসনিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যাভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য নবীন রাষ্ট্রকে চাপে ফেলে। একের পর এক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে দেখা দেয় গভীর অনিশ্চয়তা।
৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করা হয়। ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর একাংশের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্ত হন। সৈনিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ঘটনাটি রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে।
জাতীয়তাবাদ ও ঐক্যের নতুন দর্শন-
রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তার প্রবর্তিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণায় দেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের পরিচয়, অধিকার ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যকে ধারণ করে রাষ্ট্রীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সম্প্রদায় ও অঞ্চলের মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে তিনি জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি তার রাজনৈতিক দর্শনকে সাংগঠনিক রূপ দেন। দলটির ঘোষিত আদর্শে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় রাজনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও জাতীয় স্বাধীনতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও ধারার মানুষকে একটি রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগও ছিল তার দল গঠনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তার শাসনামলে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ পর্যায়ক্রমে শিথিল করা হয়। বিভিন্ন দল নিজস্ব পরিচয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়।
কৃষি, সেচ ও গ্রামীণ উন্নয়নে কর্মসূচি-
জিয়াউর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল গ্রামবাংলা। কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের কর্মসংস্থান এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তার ১৯ দফা কর্মসূচিতে কৃষি উন্নয়ন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, গ্রামীণ অবকাঠামো, শিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি তার উন্নয়ন উদ্যোগের একটি পরিচিত অধ্যায়। সেচের পানি সংরক্ষণ, কৃষিজমিতে পানির প্রবাহ বাড়ানো, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং মাছ চাষের সুযোগ সম্প্রসারণ ছিল এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য। কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি কৃষির পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগকে উৎসাহিত করেন। গ্রাম সরকার, গ্রাম প্রতিরক্ষা দল এবং গণশিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম বিস্তারের চেষ্টা চলে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল গ্রামের মানুষকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশীদার করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো।
খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষি খাতের সম্প্রসারণে তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনায় স্থান পায়।
অর্থনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনীতি ছিল যুদ্ধের ক্ষতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, খাদ্যসংকট ও সীমিত বিনিয়োগের চাপে। শিল্প উৎপাদন, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করা ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোগের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্প ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়। বেসরকারি খাতকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় করার মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
কৃষির পাশাপাশি শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণের ফলে পরবর্তী সময়ে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশের জন্য একটি নতুন পরিবেশ তৈরি হয়। একই সময়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং বৈদেশিক সহায়তা কাজে লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম বিস্তারের ক্ষেত্রেও তার শাসনামলে সুযোগ তৈরি হয়। গ্রামীণ উন্নয়ন, ক্ষুদ্রঋণ, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মসূচিতে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃত হয়। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে আঞ্চলিক সহযোগিতা
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও সহযোগিতা ছাড়া এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা কঠিন। এই চিন্তা থেকেই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি। ১৯৮০ সালের মে মাসে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ, আলোচনা ও ধারাবাহিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবটি বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা—সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের অংশগ্রহণে প্রথম শীর্ষ সম্মেলন ছিল আঞ্চলিক সহযোগিতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সার্ক প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র তৈরি হয়। যদিও সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক বিরোধ ও পারস্পরিক অবিশ্বাস সংস্থাটির কার্যক্রমকে বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত করেছে, তবু আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণাটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছে। সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক উদ্যোগে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
গণতন্ত্রের পথে প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস
সামরিক পটভূমি থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আলোচিত দিক ছিল বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা ও একদলীয় শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যখন নতুন রাজনৈতিক কাঠামো খুঁজছিল, তখন তার শাসনামলে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমের পরিসর সম্প্রসারিত হয়।
১৯৭৮ সালের জুনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ৩০০ আসনের সংসদে বিএনপি ২০৭টি আসন লাভ করে । নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংসদীয় কার্যক্রম আবারও সক্রিয় হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়।
জাতীয় স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য-
জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুদৃঢ় করা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি, উন্নয়ন সহযোগিতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জাতিসংঘ, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিসরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রচেষ্টা ছিল তার পররাষ্ট্রনীতির অংশ।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার যে ধারণা তিনি সামনে এনেছিলেন, তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিচিতি ও আঞ্চলিক ভূমিকা বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করে।
অকালপ্রয়াণ ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার-
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানচেষ্টার সময় জিয়াউর রহমান নিহত হন। তার আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তার জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একজন সামরিক অধিনায়ক থেকে রাষ্ট্রপতি হয়ে ওঠার ঘটনাপ্রবাহ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ী আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
তার মৃত্যুর পরও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ১৯ দফা কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন, বেসরকারি উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ধারণা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রাখে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দলটির রাজনীতিতেও তার আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাব অব্যাহত রয়েছে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা তাই একাধিক মাত্রায় মূল্যায়নের দাবি রাখে। মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ, রাষ্ট্র পরিচালনায় কৃষি ও অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া, বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর বিকাশ এবং সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ—সব মিলিয়ে তিনি দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত।
বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মূল তাৎপর্যও এখানেই—জাতীয় ঐক্য, মানুষের অধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন করে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করা। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হতে পারে ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।
গত ১৬ বছরের বেশি সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সাড়ে চার হাজারের বেশি সহযোদ্ধাকে ক্রসফায়ারে এবং সাত শতাধিক সহযোদ্ধাকে গুমের শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা এ দেশের সমস্ত খুনের বিচার করতে চাই। জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, বাংলাদেশের মাটিতে সব অন্যায়-অবিচারের বিচার করতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা বদ্ধপরিকর।’ শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা আইনজীবী সমিতি আয়োজিত নবীন আইনজীবীদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যে রক্তাক্ত পথ ধরে তারা এসেছেন, সেই পথ ছিল অনেক পিচ্ছিল।’
গত ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তারা বহু সহযোদ্ধাকে হারিয়েছেন। তাদের স্বজনরা এখনো নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে কাঁদেন, কখন তাদের স্বজনরা ফিরে আসবেন, সেই অপেক্ষায় থাকেন।
তিনি বলেন, ‘৬০ লাখের বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা করা হয়েছিল। তাদের অনেকেই মামলার ঘটনার ২০ বছর আগেই মারা গেছেন। এসব অন্যায়-অবিচারের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকার।’
আইনজীবীদের উদ্দেশে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘একটি সোনার বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি তৈরি করে যেতে চান তারা। এমন একটি পথ তৈরি করতে চান, যে পথে বাংলাদেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। এ যাত্রায় আইনজীবীদেরও পাশে চান তারা।’
আইনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটি কোম্পানিতে হিসাব নিরীক্ষার জন্য বাধ্যতামূলক অডিটর থাকেন।’
একইভাবে প্রতিটি কোম্পানিতে একজন করে আইনজীবী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এ জন্য কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়টি বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আইনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি তাদের নিজেদের জ্ঞান, মেধা ও প্রজ্ঞা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে।’ এ জন্য দেশের ৮০ হাজার আইনজীবীর প্রশিক্ষণে চলতি বছর ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আইনজীবীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ছোট বারান্দার আইনজীবী হওয়ার চেষ্টা করা যাবে না, সব সময় বড় বারান্দার আইনজীবী হতে হবে।’ ছোট বারান্দা বলতে তিনি বিচারকদের সঙ্গে অনৈতিক লেনদেনের প্রবণতাকে বুঝিয়েছেন। বিচারকদের সঙ্গে কোনো ধরনের অনৈতিক লেনদেনে না জড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
আসাদুজ্জামান বলেন, ‘সরকার আইনজীবীদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার সব অন্ধগলি বন্ধ করতে চায়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত বিচারব্যবস্থা গঠন এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য।’
নবীন আইনজীবীদের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ‘মেধা, শ্রম, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই তারা আইনজীবী হয়েছেন। তাদের উত্তীর্ণ হওয়ার পেছনে কোনো তদবির কাজ করেনি। নিজেদের পরিশ্রম ও যোগ্যতায় তারা এ পর্যায়ে এসেছেন।’ আগামী প্রজন্মের জন্য তারা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
দেশে আইনজীবীর সংখ্যা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮০ হাজার আইনজীবী রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা আইনজীবী সমিতিতেই আছেন প্রায় ৩৫ হাজার। ২০ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে আইন পেশার মর্যাদা ও অবস্থান আরও উন্নত করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আইনজীবী হওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন। বিসিএস পরীক্ষার চেয়েও কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনেকে আইনজীবী হচ্ছেন। অথচ সামাজিকভাবে, বিশেষ করে বিয়ের ক্ষেত্রে আইনজীবীরা সেনা কর্মকর্তা, বিসিএস কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীদের তুলনায় পিছিয়ে থাকেন। এই অবস্থার পরিবর্তন চান তারা।’
আদালত অঙ্গনে দলীয় প্রভাব বিস্তারের সমালোচনা করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এখনো কিছু আইনজীবী আদালতে গিয়ে দলীয় আধিপত্য ও ক্ষমতার দম্ভ দেখান। তারা চান, এই পরিস্থিতির অবসান হোক। প্রত্যেক আইনজীবী যেন আদালতে গিয়ে ক্ষমতার নয়, আইনের কথা তুলে ধরেন।’
অনুষ্ঠানে আইনজীবীরা আইনজীবী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি জানালে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আইনজীবীদের সুরক্ষা আইন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে এর আগে বার কাউন্সিলের আইনজীবীদের পেশাগত অসদাচরণসংক্রান্ত ট্রাইব্যুনালগুলো আরও গতিশীল করতে হবে। কয়েকজন আইনজীবীর অসদাচরণের কারণে পুরো আইনজীবী সমাজ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এ বিষয়ে আগে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, ঢাকার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. শাহজাহান কবির, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন, ভারপ্রাপ্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুর রহমান, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. ইকবাল হোসেন, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি মো. ওমর ফারুক ফারুকী এবং ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কালাম খান।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমিতির সিনিয়র সহসাধারণ সম্পাদক মো. ইলতুৎমিশ সওদাগর (এ্যানী)। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন অফিস সেক্রেটারি মো. আবজাল হোসাইন মৃধা।
দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে রাশিয়ার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ইথেনসমৃদ্ধ গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্সের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সাখালিন-২ প্রকল্প ও পোর্টোভায়া এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্যিক লেনদেন সহজ করতে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা করেছে দুই দেশ। গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তসরকার কমিশনের (আইজিসি) বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাবিষয়ক পঞ্চম সভায় এ বিষয় উঠে আসে।
বাংলাদেশের পক্ষে সভায় অংশ নেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ইউরোপ উইংয়ের কর্মকর্তারা। রাশিয়ার ফেডারেল এজেন্সি ফর ফিশারিজের প্রধান ও কমিশনের রুশ অংশের চেয়ারম্যান ইলিয়া শেস্তাকভের নেতৃত্বে দেশটির প্রতিনিধিদল সভায় অংশ নেয়।
দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহে আগ্রহ: সভায় রাশিয়ার জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রম জানায়, বাংলাদেশ আগ্রহী হলে সাখালিন-২ প্রকল্প থেকে এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে পেট্রোবাংলা ও সাখালিন এনার্জির মধ্যে সরাসরি আলোচনা সহজতর করতে প্রস্তুত তারা।
এ ছাড়া উস্ট-লুগা প্ল্যান্ট থেকে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনা এবং পোর্টোভায়া এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ইথেনসমৃদ্ধ গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করেছে দুই পক্ষ।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের জ্বালানি খাতের সহযোগিতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থায় গুরুত্ব: জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে রাশিয়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সভায় রুশ ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো, ডিজিটাল আর্থিক উপকরণ ব্যবহার এবং বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।
ইআরডির কার্যপত্র অনুযায়ী, রুশ এক্সপোর্ট সেন্টার গ্রুপের আওতাধীন এক্সিম ব্যাংক অব রাশিয়া বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। তবে প্রতিষ্ঠানটি ও এর মূল সংস্থা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় সরাসরি সহযোগিতার ক্ষেত্রে আইনি ও আর্থিক জটিলতা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের জন্য রাখা অর্থ নিষেধাজ্ঞার কারণে সংশ্লিষ্ট রুশ ব্যাংকে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের কিস্তি পরিশোধ নির্বিঘ্ন করাও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম কারণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি পরিশোধের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাশিয়া থেকে পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে।
জ্বালানি, সার ও বিনিয়োগে সহযোগিতা: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার অন্যতম বড় প্রকল্প। ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি কেন্দ্রটি নির্মাণে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার জন্য স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট চুক্তি সই হয়। এ ছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করছে। ভোলায় একাধিক কূপ খননের পাশাপাশি ২০২৩ সালে আরও পাঁচটি কূপ অনুসন্ধানের জন্য চিহ্নিত করে প্রতিষ্ঠানটি।
কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায়ও রাশিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিশেষ করে গম ও পটাশ সার আমদানিতে দেশটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। এবারের সভায় সার সরবরাহ বাড়ানো, কৃষি গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ এবং শিল্প ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে নতুন উদ্যোগ: বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন করপোরেশন ভিইবি.আরএফ এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়বিষয়ক সমঝোতা স্মারক সইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক এবং জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া শুল্কবিষয়ক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি, রাশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা বরাদ্দ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ইআরডির একজন কর্মকর্তা জানান, সভায় ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন, জ্বালানি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যালোচনা করেছেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন ‘৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনাই হোক বাংলাদেশের আগামী নির্মাণের প্রেরণা ও পাথেয়।’তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের পথ নির্ণয়ের তারিখ।
বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর)‘ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিবসটি উপলক্ষে একগুচ্ছ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষ থেকেও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।’
আগামীকাল ‘ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বাণীতে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে জাতীয়ভাবে গৃহীত সব কর্মসূচির সাফল্য কামনা করেন।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। দেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক দিনটি ছিল বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্ম ও মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনায় একটি প্রবাদবাক্য প্রণিধানযোগ্য—‘অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, অতীতকে ভুলে গেলে দু’চোখই অন্ধ’। তাই সারাবেলা ইতিহাসচর্চায় মশগুল থাকা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি ভবিষ্যতের পথ রচনায় ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করাও একটি ঐতিহাসিক ভুল।
তারেক রহমান বলেন, ইতিহাস সাক্ষী, দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের পথ ধরে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর পরাজিত সেই অপশক্তি মহাজোটের নামে একজোট হয়ে দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বিডিআর পিলখানায় পরিকল্পিত সেনা হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করেছিল। জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিল। হাজারো শহিদের আত্মত্যাগ এবং বীর ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর অবশেষে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সাল ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। ২০২৪ সালে যেভাবে সর্বস্তরের মানুষ দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় রাজপথে নেমে এসেছিল, একইভাবে ১৯৭৫ সালেও সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নেমে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়েছিল।
ভবিষ্যতে যাতে কেউ দেশ ও জনগণের অধিকার হরণ করতে কিংবা দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, সেটিই এবারের ৭ নভেম্বরের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে হলে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেতনা মনে-প্রাণে ধারণ করতে হবে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তাঁবেদার অপশক্তির বিরুদ্ধে সিপাহি-জনতার বিপ্লব, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০২৪ সালের ফ্যাসিবাদ বিরোধী গণঅভ্যুত্থান—ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে প্রতিটি বিপ্লব ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটাই। তা হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি স্বনির্ভর ও নিরাপদ কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী চক্রান্ত নস্যাৎ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সংঘটিত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের এই ঐতিহাসিক দিনে দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রকামী জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হোক—‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।
৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে প্রেরণা ও পাথেয় হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
সিলেট সফরকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ, বৈদেশিক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) তিনি সিলেট সফরে এসে কোম্পানীগঞ্জ সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি বুকে ব্যথা অনুভব করলে দ্রুত তাকে নগরের আখালিয়াস্থ একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সফর সূচি অনুযায়ী শুক্রবার সকালে তিনি সিলেটে এসে কোম্পানীগঞ্জে যাওয়ার পর হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী।
এ অবস্থায় পূর্বনির্ধারিত সফরসূচি বাতিল করে দ্রুত তাকে সিলেট নগরের আখালিয়ায় অবস্থিত মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকা জুরেজ আব্দুল্লাহ জুলজার এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, ‘শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেওয়ায় মন্ত্রীকে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বর্তমানে তিনি অনেকটা সুস্থতাবোধ করলেও চিকিৎসকরা হাসপাতাল ত্যাগ না করার পরামর্শ দিয়েছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলা সফর বাতিল করেছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী।’
শিক্ষানবিশ লাইসেন্সধারীদের (শিক্ষানবিশ চালক) জন্য নতুন নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে বিআরটিএ’র ফেসবুক পেজে এ নির্দেশনা তুলে ধরা হয়। সেখানে উল্লেখ্য ছিল, মূল লাইসেন্স ছাড়া রাস্তায় মোটরযান চালানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শিক্ষানবিশ লাইসেন্সধারী কেবল বৈধ প্রশিক্ষকের সঙ্গে প্রশিক্ষণের সময় চালাতে পারবেন এবং গাড়ির দৃশ্যমান স্থানে লাল রঙের বড় ‘খ’ চিহ্ন থাকতে হবে। বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার আগে যখন কেউ গাড়ি চালানো শেখেন, তখন গাড়ি চালনাকারীকে শিক্ষানবিশ চালক বা লার্নার বলা হয়।
মোটরযান অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একজন শিক্ষানবিশ চালক যখন রাস্তায় গাড়ি নিয়ে বের হবেন, তখন গাড়ির সামনে এবং পেছনে দৃশ্যমান স্থানে লাল রঙের একটি বড় ‘খ’ চিহ্ন লিখে বা বোর্ড ঝুলিয়ে রাখতে হয়।
রাস্তায় চলাচলকারী অন্যান্য গাড়ির চালকরা যেন দূর থেকে ‘খ’ চিহ্ন দেখে বুঝতে পারেন যে, এই গাড়িটি একজন নতুন চালক চালাচ্ছেন এবং তারা যেন পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালান।
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের ঘটনায় জিয়াউর রহমান নেতৃত্ব না দিলে বাংলাদেশ তার বর্তমান অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকতে পারত না বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে ঘিরেই জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন একজন স্বাভাবিক নেতা। তার সততা, সাহসিকতা, নেতৃত্বগুণ ও জাতীয়তাবোধ তাকে সবার কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ‘জাতীয় ঐক্য: ৭ নভেম্বরের চেতনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ভিশন পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি স্টাডিজ সেন্টার (ভিপিএসএসসি) এ সেমিনারের আয়োজন করে। সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৭ নভেম্বর নিয়ে অনেক ধরনের বর্ণনা রয়েছে। তবে ইতিহাসের প্রকৃত ঘটনা জানতে হলে সংশ্লিষ্টদের বইপত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে গবেষণা করা প্রয়োজন।
তিনি নিজের লেখা দুটি বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে সময় তিনি ৪৬ ব্রিগেডে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করেছিলেন টু ফিল্ড আর্টিলারির সৈনিকরা। এ সময় ফোর বেঙ্গলের সৈনিকরাও তাদের সঙ্গে ছিলেন। তাকে মুক্ত করে টু ফিল্ড আর্টিলারির সিইওর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কর্নেল তাহেরের ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত বর্ণনাকে তিনি ভুল বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরো বলেন, ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করেই সেনাবাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়েছিল। তিনি নিজেকে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেননি; পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই নেতৃত্বের জায়গায় চলে এসেছিলেন। কর্নেল তাহের ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ভূমিকা প্রসঙ্গে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, কর্নেল তাহের সেনাবাহিনী থেকে বের হওয়ার পর জাসদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী গড়ে তোলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন সরকারকে উৎখাত করা। ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে জিয়াউর রহমানকে শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, সেখানে গেলে জিয়াউর রহমানের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধাদের বিভাজন দূর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তখন সেনাবাহিনীর সদস্যদের পোশাক, জুতা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট ছিল। তিনি সেনাবাহিনীর কাঠামো ও সক্ষমতা পরিবর্তনের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এমনকি জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে আওয়ামী লীগকেও আলোচনায় ডেকেছিলেন।
সেমিনারে অধ্যাপক শাফিউল হক বলেন, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিজয়ের পর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলেও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক বন্দোবস্ত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ১৪০০ শহীদের আত্মত্যাগ এবং ২০ হাজার মানুষের আহত, পঙগুত্ব ও নির্যাতনের বিনিময়ে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি হতে হবে জুলাই বিপ্লব ও জুলাই সনদ। শাফিউল হক বলেন, সংবিধান সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এটি দেশের মানুষের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যেকোনো মূল্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও তা রক্ষা করতে হবে।
উপজেলা হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, রোগনির্ণয় সুবিধার আধুনিকায়ন ও ক্যান্সার চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে সমন্বিত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার।
আমূল পরিবর্তনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার, যা জাতীয় বাজেটের মোট বরাদ্দের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের দুর্নীতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অব্যবস্থাপনার কারণে আমরা একটি ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা পেয়েছি। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর পর্যাপ্ত সংস্কার হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, এ কারণে দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এটি এক বা দু’টি প্রকল্পের বিষয় নয়, একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।
উপজেলা হাসপাতালের ব্যাপক উন্নয়ন :
জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন এবং সেখানে বিশেষায়িত ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকার ৪৪ হাজার ৭৫৭ কোটি ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করেছে।
২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর আওতায় ১৮টি হাসপাতালকে ৫১ শয্যায়, ৩০৫টি হাসপাতালকে ১০১ শয্যায়, ৮৩টি হাসপাতালকে ১৩২ শয্যায়, ১৩টি হাসপাতালকে ১২০ শয্যায়, ৯টি হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় এবং আরও ১৫টি হাসপাতালকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এতে ৪৪৩টি উপজেলায় সমন্বিত বহুতল সেবাভবন নির্মাণ এবং ১৫টি উপজেলায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মীদের জন্য আবাসন সুবিধা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ড. মুহিত বলেন, ‘জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক এলাকার বিদ্যমান ৩০ ও ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো আর পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে কিছু উপজেলা ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে।’
এ সময় তিনি আরও বলেন, এ কারণে সরকার দেশের সবমিলিয়ে ৫০৩টি উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পূর্ণাঙ্গ ১৫১ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরের একটি ‘ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত’ নিয়েছে।
উন্নীত এসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিবিড় পরিচর্যা ও করোনারি কেয়ার, ওয়ান-স্টপ জরুরি সেবা, মেডিসিন, সার্জারি, নাক-কান-গলা, চক্ষু, শিশু, মাতৃস্বাস্থ্য, কিডনি ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং ফিজিওথেরাপি সেবা দেওয়া হবে। পাশাপাশি স্ট্রোক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের জন্য সেবার পাশাপাশি প্যাথলজিক্যাল ও অন্যান্য রোগনির্ণয় সুবিধাও থাকবে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাবে মানুষের আরও কাছে :
সরকার ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৪ হাজার ৬৩৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হাব এবং ১ হাজার ৬৩১টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় ১১ হাজার ৯৯৩ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার টাকার আরেকটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে।
২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত এ প্রকল্পটিও বর্তমানে চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে রয়েছে। এর আওতায় হাবের জন্য ৫ হাজার ৯৩৬টি স্থাপনা পুনর্নির্মাণ, ৮ হাজার ৩৪৮টি স্থাপনা মেরামত বা পুনর্বিন্যাস এবং ৩৫০টি নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রে ৪২৮টি স্থাপনা পুনর্নির্মাণ, ৬০৫টি স্থাপনা মেরামত বা পুনর্বিন্যাস ও ৫৯৮টি নতুন স্থাপনা নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ প্রকল্পে ৬ হাজার ২৮৬টি নতুন বা পুনর্নির্মিত হাব ও ১ হাজার ২৬টি নতুন বা পুনর্নির্মিত কেন্দ্রের জন্য আসবাবপত্র সরবরাহের পাশাপাশি ১ হাজার ২৬টি কেন্দ্রের জন্য চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সহায়ক অবকাঠামোর মধ্যে নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ বা সৌরবিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনিরাপত্তা ও সহজে প্রবেশযোগ্য প্রবেশপথ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ড. মুহিত বলেন, সরকার তার সংস্কার পরিকল্পনার কেন্দ্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে রেখে এ প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রশিক্ষিত ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসমৃদ্ধ প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন।
তারা নিয়মিতভাবে অন্তত প্রতি দুই মাসে একবার মানুষের বাড়ি বাড়ি যাবেন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত পরামর্শ ও সেবা দেবেন। তারা রক্তচাপ ও রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে পারবেন, যাতে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা যায়। পাশাপাশি উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন এমন রোগীদের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন।
ড. মুহিত বলেন, ‘আমরা শুধু মানুষের দোরগোড়ায় নয়, বরং তাদের ঘরের ভেতরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চাই।’
চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ নিয়োগ :
দেশে স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের তীব্র সংকট থাকায় সরকার চিকিৎসক, প্যারামেডিকস, নার্স, মিডওয়াইফ ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নিয়োগে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
ড. মুহিতের তথ্যমতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ করা সংখ্যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নার্স রয়েছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীরও সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন, এ কারণে সরকার বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ইতোমধ্যেই ৫ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এ ছাড়া সরকারের প্রথম আট মাসে কয়েক হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে পদায়ন করা হয়েছে।
আরও ২ হাজার ৫০০ নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা জোরদার ও নিরাপদ সন্তান প্রসব নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ করা হবে।
এছাড়া বিদ্যমান ৪০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি আরও ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে মোট স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে। তারা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করবেন।
ড. মুহিত বলেন, প্রথম পর্যায়ে ৩০ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
ক্যান্সার চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণ :
আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও চালুর পরিকল্পনা নিয়ে ক্যানসার চিকিৎসার বিকেন্দ্রীকরণে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
এছাড়া সুনামগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, পটুয়াখালী ও কিশোরগঞ্জের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পাঁচটি ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (আইএনএমএএস) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।
কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে।
এছাড়া দেশব্যাপী ক্যান্সার চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ১৭টি লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর কেনার পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি প্রথমবারের মতো পাঁচটি অত্যাধুনিক রোবোটিক সার্জারি মেশিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ড. মুহিত বলেন, বিশেষায়িত ক্যান্সার চিকিৎসা ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরে কেন্দ্রীভূত থাকায় ক্যান্সার রোগী ও তাদের পরিবারগুলো চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে। এতে অনেককে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে এবং যাতায়াতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে রোগীদের বাড়ির কাছাকাছি ক্যান্সার চিকিৎসা পৌঁছে দিতে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।
নতুন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ :
সরকার সাভারে একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করছে, যেটিকে বাংলাদেশে এ ধরনের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছেন ড. মুহিত।
তিনি বলেন, চিকিৎসকদের সাধারণত ক্লিনিক্যাল সেবা প্রদানের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়ন বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা দেওয়া হয় না। অথচ পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অথবা সিভিল সার্জন হিসেবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এ কারণে ইনস্টিটিউটটি আগামী ১ জানুয়ারি উদ্বোধনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেখানে সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ পাবেন।
এছাড়া চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি ও অকেজো যন্ত্রপাতি শনাক্ত করতে সরকার দেশব্যাপী চিকিৎসা সরঞ্জামের নিরীক্ষা সম্পন্ন করেছে।
ড. মুহিত বলেন, অনেক উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে কার্যকর এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিনসহ প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় সরঞ্জামও নেই।
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নে শিগগিরই ১৬ হাজার কোটি টাকার একটি দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ কর্মসূচির আওতায় উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নির্মাণ ও উন্নয়ন, ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হবে।
জরুরি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, বিশেষ করে সচল এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে উপজেলা পর্যায়েই রোগীরা বিলম্ব ছাড়াই প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয় সেবা পেতে পারেন।
স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী ও গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগকে এ দেশের মানুষ আর রাজনীতি করার কোনো সুযোগ দেবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দুপুরে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদরাসার ১০৪তম বার্ষিক মাহফিলের সমাপনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, যারা সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, ইতিহাসের বর্বরোচিত গণহত্যা ও জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে এবং পরবর্তীতে সে জন্য কোনো ক্ষমা প্রার্থনা বা অনুশোচনা প্রকাশ করেনি, সেই রাজনৈতিক দলকে আর এ দেশে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।
বিগত দেড় দশকের শাসন এবং সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের বিবরণ তুলে ধরে তিনি জানান, জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন। এর আগে বিগত ১৬-১৭ বছরে প্রায় ৩ হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং প্রায় ৭ হাজার মানুষকে বিভিন্নভাবে হত্যা ও নির্যাতন করা হয়েছে। নিজেও দীর্ঘ সময় গুমের শিকার হয়েছিলেন উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মহান আল্লাহর রহমত ও সাধারণ মানুষের দোয়ায় তিনি বেঁচে ফিরেছেন। দেশের লাখ লাখ মানুষ গায়েবি মামলা ও হামলায় নিষ্পেষিত হয়েছে জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সেই পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তির পুনরাগমনের ক্ষেত্র কারা তৈরি করছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তৈরি পোশাক খাতে সম্প্রতি যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে, তার পেছনেও এই ফ্যাসিবাদী শক্তির হাত রয়েছে।
বক্তব্যে ইসলামের নাম ব্যবহার করে রাজনীতি করা কিছু মহলের কড়া সমালোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, কিছু গোষ্ঠী মুখে ইসলামের কথা বললেও তাদের দলীয় ইশতেহারে ইসলামের মৌলিক নীতি ‘আকিমুদ্দিন’ বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তারা শরিয়াহভিত্তিক আইনের স্পষ্ট বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ সংযোজন এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয় সৃষ্টির মাধ্যমে এ দেশে বিভেদহীন সমাজ গঠনের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আন্দোলনের দিনগুলোতে আলেম-ওলামাদের অবদানের কথা স্মরণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও আমিরে হেফাজত আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম ইসলামবিদ্বেষী ও ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। বাবুনগর মাদরাসার পরিচালক আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মাহফিলে আরও উপস্থিত ছিলেন ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকন, সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুমাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া, জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামারা।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের সব শ্রেণির শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ প্রণয়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে আগামী ৯ নভেম্বর দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক সভায় বসছে নিম্নতম মজুরি বোর্ড। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের শিল্প শাখা থেকে জারি করা এক নোটিশে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সচিব রাইসা আফরোজ স্বাক্ষরিত নোটিশ অনুযায়ী, আগামী সোমবার (৯ নভেম্বর) বেলা ১১টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত ৪০ নম্বর ভবনে বোর্ডের নিজস্ব সভাকক্ষে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই নীতি-নির্ধারণী সভায় সভাপতিত্ব করবেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আজাদ সুবহানী।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ১৩৯ ধারার আলোকে এই সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভার মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা পৃথকভাবে নতুন নিম্নতম মজুরি হারের লিখিত প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেবেন। প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি দেশের প্রধান এই রপ্তানিমুখী খাতের সব স্তরের শ্রমিক ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান এবং শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি হারের সুপারিশ চূড়ান্ত করার প্রাথমিক দিকগুলো নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হবে।
উক্ত সভায় উপস্থিত থাকার জন্য বোর্ডের নিরপেক্ষ সদস্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলে উদ্দিন আহমদ, মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া মালিকপক্ষের অন্যতম প্রতিনিধি ও বোর্ডের সদস্য বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিনকে পোশাকশিল্পের মালিকদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মজুরি হারের লিখিত প্রস্তাব জমা দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে।
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, জুমার দিনে জোহরের পরিবর্তে প্রাপ্তবয়স্ক, মানসিকভাবে সুস্থ, স্বাধীন ও স্থায়ীভাবে বসবাসকারী সুস্থ মুসলিম পুরুষদের ওপর জামাতে জুমার নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। যাঁদের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো গ্রহণযোগ্য শারীরিক বাধা, গুরুতর অসুস্থতা কিংবা বার্ধক্যজনিত অক্ষমতা নেই, তাঁদের জন্য এই নামাজ পরিত্যাগ করার সুযোগ নেই। সুনান আবু দাউদের ১০৬৭ নম্বর হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা অপরিহার্য কর্তব্য; তবে ক্রীতদাস, নারী, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু এবং অসুস্থ ব্যক্তি—এই চার শ্রেণির মানুষের ওপর জুমার নামাজ ওয়াজিব নয়।
যাঁদের ওপর জুমার নামাজ ফরজ বা ওয়াজিব করা হয়েছে, কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া তাঁদের এই নামাজ আদায়ে অবহেলা করার ব্যাপারে বিভিন্ন হাদিসে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। অলসতা বা অবহেলার কারণে ধারাবাহিকভাবে তিনটি জুমার জামাতে অনুপস্থিত থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অন্তরে স্থায়ী মোহর পড়ে যায় বলে সতর্ক করেছেন মহানবী (সা.)। সুনানে নাসাঈর ১৩৭২ নম্বর হাদিসে হজরত আবুল জা’দ জুমায়রি (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অলসতা করে ধারাবাহিকভাবে তিনটি জুমার নামাজে অনুপস্থিত থাকে, আল্লাহ তাআলা তার অন্তরে মোহর মেরে দেন; যার ফলে সেই অন্তর হেদায়াত লাভের যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।
অহেতুক ও ইচ্ছাকৃতভাবে জুমার নামাজ বর্জনকারীকে মুনাফিকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়েও হাদিসে স্পষ্ট সতর্কবার্তা রয়েছে। তাবারানি গ্রন্থে হজরত উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, কোনো শরিয়তসম্মত ওজর বা কারণ ছাড়া যে ব্যক্তি তিনটি জুমার নামাজ ছেড়ে দেয়, তার নাম মুনাফিকদের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে যায়। জুমার মতো বরকতময় দিনে সামান্য অবহেলার কারণে নিজের অন্তরে মোহর লেগে যাওয়া কিংবা আল্লাহর দরবারে মুনাফিক হিসেবে লিপিবদ্ধ হওয়ার এই মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে প্রতিটি মুমিনের সতর্ক থাকা আবশ্যক।
শুধু নামাজ আদায়ই নয়, জুমার দিন খুতবা শুরুর আগেই মসজিদে উপস্থিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। নামাজের আহ্বান বা আজান শোনার পর যাবতীয় পার্থিব কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সুরা জুমার ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, যখন জুমার দিনে সালাতের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন পার্থিব বেচাকেনা বর্জন করে আল্লাহর স্মরণের দিকে দ্রুত ধাবিত হতে হবে এবং এটিই মানুষের জন্য সর্বোত্তম। ফলে জুমার আজান হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুনিয়াবি সব ধরনের ব্যস্ততা স্থগিত রেখে অবিলম্বে মসজিদের উদ্দেশে যাত্রা করা কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বা ওয়াজিব।