অবশেষে ২০ শর্তে নয়াপল্টনে বিএনপি এবং বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে আওয়ামী লীগকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। তবে জামায়াতে ইসলামীকে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি।
গতকাল সন্ধ্যায় ডিএমপির পক্ষ থেকে দুই দলকেই তাদের নিজ নিজ পছন্দের স্থানেই সমাবেশের অনুমতির কথা জানানো হয়।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে আওয়ামী লীগ ও নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের অনুমতি পেয়েছে বিএনপি। তবে সমাবেশ করার জন্য উভয় দলকেই ২০টি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে।
এদিকে আজ রাজধানী ঢাকা হতে যাচ্ছে সমাবেশের নগরী। দেশের দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ঘিরে মহানগরে বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মনে ভীতি ও আতঙ্ক কাজ করছে। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারা শহরজুড়ে টহল জোরদার করেছে। রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসেছে চেকপোস্ট (নিরাপত্তা চৌকি)।
ইতোপূর্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নয়াপল্টনে তাদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ আহ্বান করেছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) জানিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমাবেশের অনুমতি পেলেও জামায়াতের সমাবেশ করার অনুমতি মেলেনি। সমাবেশ সফল করতে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীরা ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।
এর আগে শুক্রবার বিকেলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ জানিয়েছেন, শনিবার আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মহাসমাবেশের অনুমতি পাবে। স্থান নির্ধারণ হয়নি। স্থানের বিষয়টিও খুব দ্রুতই তাদের জানিয়ে দেয়া হবে বলে জানান তিনি। তবে জামায়াতের সমাবেশের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স (শূন্য সহনশীলতা) অবস্থানে রয়েছে ডিএমপি। তাদের সমাবেশের অনুমতি দেয়া হবে না। এ বিষয়ে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশিদ বলেন, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন যদি না থাকে, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সমাবেশের কথা বললেই তাদেরকে সমাবেশ করতে দেয়া হবে না।
এদিকে পুলিশের অনুমতি পাওয়ার আগেই বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটের সামনে আওয়ামী লীগের মঞ্চ নির্মাণ বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। গতকাল বেলা সাড়ে ৩টার দিকে মঞ্চের কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়।
বিএনপির ডাকা মহাসমাবেশের একই দিনে রাজধানী ঢাকায় আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লাঠিসোঁটা নিয়ে মিছিল করেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। রাজপথ দখলের এই মহড়া শুরু হয় গত বৃহস্পতিবার। সতর্ক অবস্থানে থেকে রাজধানীর বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটে সমাবেশের জন্য তৈরি হওয়ার প্রস্তুতি নেয়ার খবর পাওয়া গেছে।
পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, শনিবার দুপুর দুইটায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে শুরু হবে আওয়ামী লীগের শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের ঢাকার দুই মহানগরের অন্তর্গত সব থানা ও ওয়ার্ড থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দেবেন। একই সঙ্গে গাজীপুর, কেরানীগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, নারায়ণগঞ্জ ও রূপগঞ্জসহ আশপাশের জেলা এবং উপজেলা থেকে নেতা-কর্মীরা যোগ দেবেন এই সমাবেশে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সমাবেশের মঞ্চ প্রায় প্রস্তুত।
গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতা-কর্মীদের বলেছেন, দলের ডাকা শান্তি ও উন্নয়ন সমাবেশ শেষ হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে মনে না করতে। তিনি বলেছেন, সতর্ক পাহারায় থাকতে হবে। এদের দুরভিসন্ধি আছে। সাম্প্রদায়িক আরও দু-একটি শক্তিকে নিয়ে তাদের অশুভ খেলার পরিকল্পনা রয়েছে। সার্বক্ষণিক সতর্ক পাহারায় থাকতে হবে। মিটিং শেষ, চলে গেলেই হবে না। কালকে একটু দেখেশুনে যাবেন। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে গতকাল শুক্রবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে ওবায়দুল কাদের বলেন, সবাই নিজে নিজে দায়িত্ব নেবেন, সবার দায়িত্ব আছে। এই যুদ্ধ আমাদের সবার। এটা বাংলাদেশের আরেক মুক্তিযুদ্ধ। এটা মনে করেই মাঠে থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, শেখ হাসিনার হাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারব, যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখতে হবে। এটা মাথায় রেখেই নৌকা বিজয়ের বন্দরে পৌঁছাতে হবে।
সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে থাকার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বারবার অপশক্তিকে মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগ দেয়া উচিত না। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা গণতন্ত্র ব্যাহত হতে দেবে না, এটা তাদের প্রতিজ্ঞা।
এদিকে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো অভিযোগ করছে, সমাবেশ সামনে রেখে নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছে।
আওয়ামী লীগ নেতারা উসকানিমূলক কথা বলছেন জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে, শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের পতন ঘটাতে চাই।’ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এতকিছুর পরেও ইতোপূর্বে আমরা অনেক কর্মসূচি পালন করেছি। এর আগেও রেইড দিয়েছে, গ্রেপ্তার করেছে, মারপিট করেছে, মেরেও ফেলেছে গুলি করে। তারপরও আমরা আমাদের জায়গা থেকে সরিনি। আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে শান্তিপূর্ণভাবে সরকারের পতন ঘটাতে চাই। তবে ক্ষমতাসীন দল কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করলে তার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে।’
লগি-বৈঠা আওয়ামী লীগের কালচার মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আর লাঠির কথা বলছে‑ এগুলো উসকানিমূলক ৷ একদিকে তাদের প্রধান একরকম কথা বলছেন, আরেকদিকে তারা পুরো জনগণকে জিম্মি করে ফেলেছে- তাদের এই দমননীতি দিয়ে। আমরা কোনো উসকানি দিচ্ছি না।’
অপরদিকে গোয়েন্দা নজরদারির জন্য নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও আশপাশের এলাকায় ৬০টির বেশি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সিসি ক্যামেরা বসাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। শুক্রবার বিকেলে থেকে এসব ক্যামেরা বসানো শুরু হয়েছে। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সমাবেশ ঘিরে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি। ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্যামেরাগুলো থেকে পাওয়া ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হবে। সকাল থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও প্রবেশমুখ গাবতলী, আব্দুল্লাহপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে ঢাকায় আসা যাত্রী ও গাড়িতে তল্লাশি করা হচ্ছে।
সকালে ঢাকার প্রবেশপথ গাবতলী সেতুর মুখে নিরাপত্তা চৌকি বসিয়েছে দারুস সালাম থানা পুলিশ। এ বিষয়ে দারুস সালাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জামাল হোসেন জানান, সকাল থেকেই নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে যানবাহন ও সন্দেহভাজনদের তল্লাশি করা হচ্ছে।
এদিকে, উত্তরার আব্দুল্লাহপুরে চেকপোস্ট বসিয়ে যানবাহন ও যাত্রীদের তল্লাশির বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) জ্যোতির্ময় সাহা জানান, পুলিশের নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবেই চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে।
অপরদিকে পোস্তগোলা সেতুর মুখে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম চালাচ্ছে শ্যামপুর থানা পুলিশ। এ বিষয়ে শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, সমাবেশ সামনে রেখে নিরাপত্তার স্বার্থে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। দুষ্কৃতকারীরা যেন কোনো বোমা বা অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় ঢুকতে না পারে, সে জন্যই চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
সম্প্রতি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী কোনো মহল নাশকতার চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল বিকেলে র্যাব সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়, রাজধানীতে জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ও যেকোনো ধরনের নাশকতা প্রতিরোধে দেড় হাজারের অধিক র্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। র্যাব সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট পরিচালনা, টহল কার্যক্রম, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি পরিচালনা করছে। র্যাব-১ রাজধানীর আব্দুল্লাহপুর, রামপুরা, পূর্বাচল ৩০০ ফিট ও আমতলীতে চেকপোস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। র্যাব-২ রাজধানীর বসিলা, আগারগাঁও ও শিশুমেলার সামনে চেকপোস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। র্যাব-৩ রাজধানীর কমলাপুর, সচিবালয় ও নটর ডেম কলেজের সামনে চেকপোস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। র্যাব-৪ রাজধানীর কচুক্ষেত, টেকনিক্যাল, মিরপুর কাজীপাড়া, সাভার ও মানিকগঞ্জে চেকপোস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। র্যাব-১০ রাজধানীর ডেমরা, পোস্তগোলা ও সায়েদাবাদে চেকপোস্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে তাদের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, এটি মিথ্যা কথা। কোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ ঘিরে ডিএমপি কাউকে গ্রেপ্তার করে না। আমাদের ক্রাইম ডিভিশনের প্রত্যেক থানার ওসি ও ডিসিকে বলা আছে, যারা ওয়ারেন্টের আসামি, সন্দেহজনক আসামি, মামলা বা তদন্তভুক্ত আসামি, নাশকতা হতে পারে এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য বলা হয়েছে। এর বাইরে অন্য সাধারণকে হয়রানি বা গ্রেপ্তার করার সুযোগ নেই।
এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীসহ দেশব্যাপী চলছে জল্পনা-কল্পনা। সময় যতই ঘনিয়ে আসছে জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। এ ছাড়া, গত কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিকদলগুলোর পাল্টাপাল্টি আক্রমণাত্মক বক্তব্যে জনমনে বাড়ছে শঙ্কা।
দেশের কৃষি ও জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পাঁচ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং ৭৫ হাজার মেট্রিক টন সার আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়। এই ক্রয়ের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৪০ হাজার টন ইউরিয়া এবং রাশিয়া থেকে ৩৫ হাজার টন এমওপি সার সংগ্রহ করা হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফার্টিগ্লোব ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড থেকে রাষ্ট্রীয় চুক্তির মাধ্যমে ৪০ হাজার মেট্রিক টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ফার্টিগ্লোব থেকে জিটুজি (সরকার টু সরকার) চুক্তির আওতায় ২০০৭ সাল থেকেই ইউরিয়া সার আমদানি করা হচ্ছে। আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদন নিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি মেট্রিক টন সারের দাম ৪১০ মার্কিন ডলার হিসেবে মোট ১ কোটি ৬৪ লাখ ডলারে এই ৪০ হাজার টন সার কেনা হবে, যার দেশীয় অর্থমূল্য ২০১ কোটি ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
একই সভায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে রাশিয়ার জেএসসি ‘ফরেন ইকোনমিক করপোরেশন (প্রোডিনটর্গ)’ ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চুক্তির আওতায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন এমওপি সার আমদানির অনুমোদন প্রদান করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতি মেট্রিক টন সারের মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫২.৯৩ মার্কিন ডলার এবং এতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ১৫১ কোটি ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৫ টাকা। এছাড়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ২০২৬ সালে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় সিঙ্গাপুরের আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর পিটিই লিমিটেড থেকে পাঁচ কার্গো এলএনজি সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি এই চুক্তির মাধ্যমে দেশের বিদ্যমান জ্বালানি সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
নির্বাচনকালীন শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন এবং এর আগে-পরে নির্দিষ্ট কিছু যানবাহন চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই সিদ্ধান্তের আলোকে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) নির্বাচন পরিচালনা অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনের সই করা এক চিঠিতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নের অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভোটগ্রহণের দিন ট্রাক, মাইক্রোবাস ও ট্যাক্সি ক্যাবসহ চার ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে এবং মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর তিন দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
চিঠিতে উল্লিখিত সময়সূচি অনুযায়ী, ১১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ২৪ ঘণ্টা ট্যাক্সিক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে, মোটরসাইকেল চলাচলের ক্ষেত্রে ১০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা বা তিনদিন এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। জনজীবন সচল রাখা ও জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসি কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ব্যবস্থা রেখেছে। এই ছাড়ের আওতায় থাকবে— "আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রশাসন। অনুমতিপ্রাপ্ত পর্যবেক্ষক ও সংবাদপত্রের গাড়ি। জরুরি সেবার মধ্যে যেমন— ওষুধ, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা ও অনুরূপ কাজে ব্যবহৃত যানবাহন। বিমানবন্দরে যাওয়া-আসা করার যাত্রী বা আত্মীয়স্বজনের গাড়ি (টিকিট প্রদর্শন সাপেক্ষে)। দূরপাল্লার যাত্রী বহনকারী যানবাহন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনি এজেন্টের জন্য রিটার্নিং অফিসারের অনুমোদন সাপেক্ষে একটি গাড়ি (জিপ/কার/মাইক্রোবাস)। টেলিযোগাযোগ সেবায় নিয়োজিত বিটিআরসি ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের যানবাহন।"
এছাড়া জাতীয় মহাসড়ক, বন্দর এবং আন্তঃজেলা বা মহানগরীর প্রধান প্রবেশ ও বহির্গমন পথগুলো এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে বলে কমিশন জানিয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তব প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারদের নিজ নিজ এলাকায় অতিরিক্ত কোনো যানবাহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা বিদ্যমান বিধি শিথিল করার বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মূলত ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই ইসির পক্ষ থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে এই ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়।
রাজধানীর যানজটপূর্ণ এলাকাগুলোতে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ট্রাফিক বিভাগ। এই জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে গুলশান-২ চত্বরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান ট্রাফিক বিভাগ ‘নো হর্ন, নো ডাস্ট’ শীর্ষক এক মিনিটের প্রতীকী নীরবতা কর্মসূচি পালন করে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সহযোগিতায় আয়োজিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে চালক ও পথচারীদের মধ্যে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
কর্মসূচি চলাকালীন গুলশান-২ ক্রসিংয়ের চারদিকের ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং চালকদের গাড়ি থেকে নেমে নির্ধারিত এক মিনিট নীরবতা পালনের আহ্বান জানানো হয়। সাধারণ চালকরা এই আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে ‘নো হর্ন, নো ডাস্ট’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে রাজপথে অবস্থান করেন। গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকায় সমন্বিতভাবে এই সচেতনতা কার্যক্রমের প্রসার ঘটানো হচ্ছে।
ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মিজানুর রহমান শেলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই আয়োজনে প্রায় ১৫০ জন ট্রাফিক সহায়তাকারী সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এই প্রতীকী নীরবতা পালনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হর্ন বাজানোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে চালকদের সচেতন করা এবং রাস্তাঘাট ধূলিমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিকট ১০ দফা সুপারিশ পেশ করেছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ৭১টি নারী, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত এই প্ল্যাটফর্মটি এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের স্মারকলিপির বিষয়বস্তু গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় সুপারিশসমূহ পাঠ করেন অ্যাকশন এইডের মরিয়ম নেছা।
নির্বাচন কমিশনের কাছে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির ১০ দফা সুপারিশ
১. দেশের সব প্রান্তের সব নাগরিক যাতে নির্বিঘ্নে, স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন পূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নারীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক নারী-পুরুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
২. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের প্রতি হয়রানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংস আচরণ প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
৩. নির্বাচনি ব্যয় সংকোচ করে ন্যূনতম নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারণ করতে হবে এবং এ বিষয়ে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।
৪. স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. নারী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেদিকে দৃষ্টি রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক স্থানে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
৬. জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য নিরপেক্ষভাবে সব ধরনের সহায়তা করতে হবে। এক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৭. নির্বাচনি প্রচারণায় ধর্মের ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
৮. সব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৯. যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
১০. নির্বাচনি প্রচারণায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে মডারেটর ডা. ফওজিয়া মোসলেম জানান, "ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্রে করে আমরা নির্বাচন কমিশন বরাবর যে স্মারকলিপি দিয়েছিলাম, আজ সংবাদ সম্মেলনে সেই স্মারকলিপিই উপস্থাপন করা হচ্ছে।" দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারী প্রার্থী বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হলেও বর্তমানে মাত্র ৪.০৮ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে যা প্রত্যাশিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে প্রতিবন্ধী ভোটারদের সুবিধার্থে তাদের দেওয়া প্রস্তাব নির্বাচন কমিশন আমলে নেওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে আলোচকরা বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পেশিশক্তি ও অর্থের প্রভাবের সমালোচনা করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রতিশ্রুত ৫ শতাংশ আসনে নারী মনোনয়ন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। সংবাদ সম্মেলনে ব্র্যাক, অ্যাকশন এইড, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দিল্লিতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, দেশে তাদের সমর্থক নেই বলেই দিল্লিতে প্রেস শো (সংবাদ সম্মেলন) করছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ৬৩তম ব্যাচ মহিলা কারারক্ষীদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, দিল্লিতে শেখ হাসিনার খবরের বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনো প্রভাব পড়বে না। এতে দেশের নির্বাচন ভণ্ডুল বা দেশে অস্থিরতা তৈরিরও কোনো আশঙ্কা নেই। দেশে তাদের সমর্থক নেই বলেই দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
এ সময় দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী নেতাকর্মীদের দেশে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান তিনি।
কারাগারে পর্যাপ্ত জায়গা নেই জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, শিগগিরই নতুন কারাগার তৈরির পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে হওয়া নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
প্রধান অতিথি হিসেবে প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনসহ অন্য কর্মকর্তারা। প্রধান অতিথি নবীন প্রশিক্ষণার্থীদের সশস্ত্র সালাম ও অভিবাদন গ্রহণ করেন।
পরে নবীন কারারক্ষীদের বিভিন্ন শারীরিক কসরত, অস্ত্রবিহীন আত্মরক্ষার কৌশলের চমকপ্রদ পরিবেশনা উপভোগ করেন অতিথিরা।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তাফা কামাল, কর্নেল মো. তানভীর হোসেন, কর্নেল মেছবাহুল আলম সেলি মো. জাহাঙ্গীর কবির এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কমান্ড্যান্ট টিপু সুলতানসহ গাজীপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে মোট ৮৬৬ জন কারারক্ষী ও মহিলা কারারক্ষী অংশগ্রহণ করেন।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কারাগার পরিচালনায় নিরাপত্তা ও মানবাধিকার একে অপরের পরিপূরক বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, বন্দিদের প্রতি মানবিক আচরণ, ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। মঙ্গলবার সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কারা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ৬৩তম ব্যাচ মহিলা কারারক্ষী বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী কুচকাওয়াজে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তার বক্তব্যে কারাগারকে ‘ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের’ অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কারাগারের কাজ শুধু অপরাধীদের আটকে রাখা নয়, বরং তাদের সংশোধন করে সুনাগরিক হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নবীন কারারক্ষীদের সততা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দেশপ্রেমের মহান দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক কারা প্রশাসন গঠনে প্রশিক্ষিত ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন কারারক্ষীরা কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে উপদেষ্টা বলেন, দুর্নীতি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু, যা প্রতিষ্ঠানকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে এবং জনগণের বিশ্বাস ভেঙে দেয়। তিনি নবীন সদস্যদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, তারা কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক স্বার্থের রক্ষক নন, বরং জনগণের করের টাকায় বেতনভুক্ত সরকারি কর্মচারী। তাই ব্যক্তিস্বার্থ ও লোভের ঊর্ধ্বে উঠে জনকল্যাণকেই একমাত্র ব্রত হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন এবং প্রশিক্ষণে কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য সেরা প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। ৬৩তম ব্যাচের এই প্রশিক্ষণে সর্ববিষয়ে ও পিটিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন মোছা. রায়হানা আক্তার সুবর্ণা। এছাড়া ড্রিলে লিজা খাতুন, ফায়ারিংয়ে মানসুরা এবং আন-আর্মড কম্ব্যাটে জুথি পারভীন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। অনুষ্ঠানের শেষ অংশে মহিলা কারারক্ষীরা বিভিন্ন শারীরিক কসরত ও ডিসপ্লে প্রদর্শন করেন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি জানিয়েছেন, পে-কমিশনের প্রতিবেদনটি কেবল জমা দেওয়া হয়েছে, তবে এর বাস্তবায়নের ভার পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। উপদেষ্টা স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকারের ম্যান্ডেট বা পরিকল্পনার মধ্যে পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টি নেই। পে-কমিশনের কাজ ছিল সুপারিশমালা তৈরি করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া, যা এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
ভবিষ্যতে এই পে-স্কেলের ভাগ্য কী হবে, তা ব্যাখ্যা করে ফাওজুল কবির খান বলেন, পরবর্তীতে নির্বাচিত হয়ে যে সরকার ক্ষমতায় আসবে, তারাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তারা চাইলে এই পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে পারে অথবা বাতিলও করতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, প্রস্তাবিত এই পে-স্কেল পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য কোনো বাড়তি চাপ বা বোঝা হিসেবে দেখা দেবে না।
দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই বাড়াতে এবার প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বড় সুখবর দিয়েছে সরকার। এখন থেকে কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি যদি দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে সহায়তা করেন, তবে তাকে পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থ দেওয়া হবে। সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভায় এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানান, নতুন এই কাঠামোর আওতায় কোনো প্রবাসী যদি দেশে ইকুইটি বিনিয়োগ আনতে ভূমিকা রাখেন, তবে সেই মোট বিনিয়োগের ওপর ১ দশমিক ২৫ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা পাবেন। বিষয়টি পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো প্রবাসী যদি ১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ আনতে পারেন, তবে সরকার তাকে ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার প্রণোদনা হিসেবে দেবে। রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে যেমন নগদ সুবিধা পাওয়া যায়, এটিও অনেকটা সেভাবেই কাজ করবে। তবে এর মূল লক্ষ্য হলো কেবল ব্যক্তিগত ভোগের জন্য অর্থ না পাঠিয়ে, প্রবাসীদের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসায়িক খাতে বড় পুঁজি নিয়ে আসা।
সরকারের এই উদ্যোগের পেছনের যুক্তি হলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের বিশাল নেটওয়ার্ক ও প্রভাবকে কাজে লাগানো। প্রবাসীরা তাদের অবস্থানরত দেশগুলোর সমাজ ও বিনিয়োগকারী মহলের সঙ্গে যে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন, তা ব্যবহার করে বাংলাদেশকে একটি লাভজনক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরাই এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য। নীতিগতভাবে অনুমোদন পাওয়া এই প্রস্তাবটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিদেশের মাটিতে বিডার নিজস্ব অফিস খোলার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে চীনে এবং পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশে অফিস স্থাপন করা হবে। তবে সরকারের খরচ কমাতে এসব অফিসে স্থায়ী বেতনের পরিবর্তে কমিশন বা সাফল্যের ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের অভিনব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যিনি যত বেশি বিনিয়োগ আনতে পারবেন, তার পারিশ্রমিকও সেভাবেই নির্ধারিত হবে। বিশেষ করে চীনে অফিস খোলার ক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষা ও বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিডা।
আগামী অর্থবছর থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ বাড়িয়ে ৬২ লাখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ প্রবীণ ব্যক্তি আগের ৬৫০ টাকার পরিবর্তে মাসে ৭০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। পাশাপাশি, ৯০ বছরের বেশি বয়সি ২ দশমিক ৫ লাখ ব্যক্তি মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের ভাতা কর্মসূচিতে ২৯ লাখ উপকারভোগীর মধ্যে ২৮ দশমিক ৭৫ লাখ নারী আগের ৬৫০ টাকার পরিবর্তে মাসে ৭০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। এছাড়া, ৯০ বছরের বেশি বয়সী ২৫ হাজার বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারী মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
প্রতিবন্ধী ভাতা ও শিক্ষা উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় ৩৬ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে ৩৫ লাখ ৮১ হাজার ৯০০ জন মাসে ৯০০ টাকা করে ভাতা পাবেন। বাকি ১৮ হাজার ১০০ জন মাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক উপবৃত্তি ও মেধা উপবৃত্তির পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে ৯৫০ টাকা, মাধ্যমিকে ১ হাজার টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকে ১ হাজার ১০০ টাকা এবং উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের তুলনায় ৫০ টাকা বেশি।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ৭ হাজার বাড়িয়ে মোট ২ লাখ ২৮ হাজার ৩৮৯ জন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের মাসিক ভাতা ৬৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০০ টাকা করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় উপবৃত্তি ও মেধা উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ হাজার ১৯৮ জন বাড়িয়ে মোট ৪৫ হাজার ৩৩৮ জন করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক পর্যায়ে মাসে ৭০০ টাকা, মাধ্যমিকে ৮০০ টাকা, উচ্চ মাধ্যমিকে ১ হাজার টাকা এবং উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ১ হাজার ২০০ টাকা করে উপবৃত্তি বা মেধা উপবৃত্তি পাবেন।
পাশাপাশি, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ৫ হাজার ৪৯০ জনকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ক্যানসার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকজনিত পক্ষাঘাত, জন্মগত হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ৫ হাজার বাড়িয়ে মোট ৬৫ হাজার করা হয়েছে। একইসঙ্গে এককালীন চিকিৎসা সহায়তার পরিমাণ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ ২৪ হাজার বাড়িয়ে মোট ১৮ লাখ ৯৫ হাজার ২০০ জন করা হয়েছে। এই কর্মসূচিতে প্রত্যেক মা মাসে ৮৫০ টাকা করে ভাতা পান।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী পরিবারের সংখ্যা ৫ লাখ বাড়িয়ে মোট ৬০ লাখ পরিবার করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি পরিবার ছয় মাস ধরে খাদ্য সহায়তা পায়, যেখানে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল ১৫ টাকা কেজি দরে সরবরাহ করা হয়।
গত রোববার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি–সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ৩২তম বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের মাসিক ভাতা ৫ হাজার টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে আরও সুপারিশ করা হয়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য মাসিক সম্মানী চালু করা এবং তাদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভিজিএফ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার।
এ ছাড়া ২০২৬–২৭ অর্থবছরে নতুন করে আরও ২ লাখ ৭৩ হাজার ৫১৪ জন জেলেকে অন্তর্ভুক্ত করে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় মোট জেলের সংখ্যা ১৫ লাখে উন্নীত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সামরিক শিল্পাঞ্চল গড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বাতিল হওয়া ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জায়গায় এই শিল্পাঞ্চল স্থাপন করা হবে। সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
সভা শেষে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও উপস্থিত ছিলেন।
সভায় আনোয়ারায় ফ্রি ট্রেড জোন, কুষ্টিয়া সুগারমিলে হবে ইকোনোমিক জোন, পৌর সভার ভেতরেও হবে ইকোনোমিক জোনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয় হয়েছে। এছাড়াও জাপানের সঙ্গে এফটিএ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বেজা ছাড়াও একই এইদিন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) গভর্নিং বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিডার গভর্নিং বোর্ডের সভায় প্রকৃত বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে (এফডিআই) রেমিট্যান্সের মতই প্রবাসিদের পাবে ১.২৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চীনসব অন্যান্য দেশে বিডার এজেন্সি অফিস করা এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত দেশের ছয় প্রতিষ্ঠানকে একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলন আশিক চৌধুরী জানান, মিরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (এনএসইজেড) প্রায় ৮৫০ একর জমিকে ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ হিসেবে বেজার মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আশিক চৌধুরী বলেন, ‘ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলকে জি-টু-জি কাঠামো থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গাটিই এখন প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিজের আদলে একাধিক রাষ্ট্রীয় কারখানা গড়ে তোলা নয়। বরং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে প্রযুক্তি বিনিময় ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পে সক্ষমতা তৈরি করাই মূল লক্ষ্য। ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণের সুযোগও রাখা হবে।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাতের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে উচ্চপ্রযুক্তির অস্ত্রের চেয়ে গোলাবারুদ ও মৌলিক সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতিই বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এতে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আশিক চৌধুরী জানান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ধাপে ধাপে এই শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে। একসঙ্গে পুরো ৮৫০ একর জমিতে কার্যক্রম শুরু করা হবে না। আগামী পাঁচ বছরে সীমিত পরিসরে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
সম্ভাব্য অংশীদার দেশ বা নির্দিষ্ট পণ্যের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি কূটনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় হওয়ায় এখনই বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও প্রকল্পটি চলমান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আশিক চৌধুরী আরও জানান, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) গঠনের নীতিগত অনুমোদনও দিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমিতে এ জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ফ্রি ট্রেড জোন কার্যত ‘ওভারসিজ টেরিটরি’ হিসেবে পরিচালিত হবে, যেখানে কাস্টমস বাধ্যবাধকতা ছাড়াই পণ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন ও পুনঃরপ্তানি করা যাবে। এতে বাংলাদেশের ‘টাইম টু মার্কেট’ সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
দুবাইয়ের জেবেল আলি ফ্রি জোনের মডেল অনুসরণ করে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হলে এটি দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা সংশোধনের জন্য শিগগিরই বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই সংবেদনশীল সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সোমবার সেনা সদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে— এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী।’
প্রধান উপদেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার বঞ্চিত একটি জাতি ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিজের দেশের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে এই নির্বাচনে ভোটদান হবে তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমে মানুষ যেমন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে তার মতামত ব্যক্ত করবে, তেমনি সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। তাই এই নির্বাচনের গুরুত্ব অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে যে তরুণদের একটি বিরাট অংশ এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছে। এ ছাড়া বড়দের মধ্যেও অনেকে দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত ছিলেন। এরকম একটি পরিস্থিতিতে সকল ভোটারদের জন্য একটি শংকামুক্ত ও উৎসবমুখর ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের সকলের দায়িত্ব রয়েছে। দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় আমি মনে করি এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সক্ষম, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এই গুরুদায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে সর্বোচ্চ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি আশাবাদী।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে, কোনো প্রভাব ব্যতীত নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চভাবে সহায়তা প্রদান করতে হবে।’
নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে সকল সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল। সামান্য বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তরুণ ও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত নাগরিকদের অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তাই ভয়মুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।’
প্রধান উপদেষ্টা একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনকালে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। আমরা অত্যন্ত অল্প সময়ে এই পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন সূচনা করেছি। দায়িত্বভার গ্রহণের পর থেকে বর্তমান সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার উন্নয়ন এবং যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি প্রধান অগ্রাধিকার।’
প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি তৈরির কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলমান আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নেদারল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ইতালি, জাপান, থাইল্যান্ডসহ আরো কয়েকটি দেশের সঙ্গে অনুরূপ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব সমঝোতা স্মারক সম্পাদিত হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।’
সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
সেনা সদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণের মতবিনিময় সভার অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টাকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস এম কামরুল হাসান, অভ্যর্থনা জানান।
মতবিনিময় সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাগণ এবং সংশ্লিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্যে রাজধানীর চাঁনখারপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সর্বোচ্চ সাজার আদেশ পাওয়া বাকি দুজন হলেন- ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
এ মামলার আট আসামির মধ্যে রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ৬ বছরের কারাদণ্ড; শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আরশাদ হোসেনকে ৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ওই থানার তিন পুলিশ কনস্টেবল মো. সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলামকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ এ সোমবার এ রায় ঘোষণা করে।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
গ্রেপ্তার চার আসামি আরশাদ, সুজন, ইমন ও নাসিরুলকে রায়ের সময় আদালতে হাজির করা হয়। বাকি চার আসামিকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচার কাজ চলে।
বেলা ১১টা ২৭ মিনিটে গ্রেপ্তার চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়। ১১টা ৪৭ মিনিটে বিচারকরা এজলাসে ওঠেন এবং ১১টা ৫০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায় পড়া শুরু করেন।
রায় ঘোষণার সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিমসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। আসামিদের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মো. আবুল হোসেন, সিফাত হোসেন ও সাদ্দাম হোসেন অভি।
প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগরীর চানখাঁরপুল এলাকায় বাংলাদেশের মুক্তিকামী ছাত্রজনতা যখন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য অগ্রসর হচ্ছিল, সেই সময়ে পুলিশ সেই জায়গায় নির্বিচার গুলি করে ৬ জনকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে শাহরিয়ার খান আনাস, জুনায়েদসহ ৬ জন রয়েছেন। এ ঘটনার মামলা হয়েছিল। কমান্ড রেসপন্সিবিলিটিতে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুনের শাস্তি হয়েছে আগে। বাকি অংশে যারা গ্রাউন্ডে কাজ করেছিল তাদের বিচারের জন্য আজকে এই মামলাটি ছিল। সেই মামলাতে আদালত বলেছেন, এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হয়েছে। তারা ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি করেছেন, সেটা প্রমাণিত হয়েছে।
তাজুল বলেন, এসি ইমরুল, ইন্সপেক্টর আরশাদ এবং বাকি তিনজন কনস্টেবল, যারা সরাসরি ফিল্ডে থেকে গুলিবর্ষণ করেছিল, যাদের গুলি বর্ষণ করতে ভিডিওতে দেখা গেছে, যাদের নামে অস্ত্র ইস্যু ছিল না, অথচ তারা অন্যদের রাইফেল নিয়ে গুলি করেছে—তাদেরকে কম সাজা দেওয়া হয়েছে। একজনকে ৬ বছর, একজন ৪ বছর, বাকি তিনজন কনস্টেবলকে ৩ বছর করে সাজা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আদালতে যখন তাদের অফেন্স প্রমাণিত হয়েছে, ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি প্রমাণিত হয়েছে, ওয়াইড স্প্রেড এবং সিস্টেমেটিক অ্যাটাক প্রমাণিত হয়েছে এবং এই আসামিরা তারা প্রকাশ্যে গুলি করেছিল সেটা প্রমাণিত হয়েছে। তাদেরকে যে সাজা দেওয়া হয়েছে, আমরা মনে করি এটা ন্যায়সঙ্গত হয়নি। যদিও আদালতের আদেশ সকলের ওপরেই শিরোধার্য, আমাদেরকে মানতে হবে। যেহেতু একটা আপিলেট ফোরাম আছে, সুপ্রিম কোর্টে এটার বিরুদ্ধে, এই সাজার বিরুদ্ধে, কম সাজা যেটা দেওয়া হয়েছে, সেই অংশটুকুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আমরা আপিল করব। পুরো রায় পাওয়ার পরে আরও পর্যালোচনা করে প্রসিকিউশন সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।
প্রধান প্রসিকিউটর বলেন, যারা সরাসরি গুলিবর্ষণ করেছে, তাদের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরে সাজা অল্প হওয়াটা, এটা ন্যায়বিচারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে আমরা মনে করছি। সে কারণে আমরা মনে করছি যে এটা আপিল করা প্রয়োজন। কিন্তু বাকি তিনজনকে যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেটা যথার্থ হয়েছে বলে মনে করি এবং আগেও শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেটাও যথার্থ বলে আমরা মনে করেছি।
যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়নি তাদের মৃত্যুদণ্ড চাইবেন কিনা প্রশ্ন করা হলে তাজুল বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকে মৃত্যুদণ্ডই চাইব। কারণ হচ্ছে যে, এই অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত ছিল, এটা কোনো সাধারণ মার্ডার নয়। আমরা বারবার যেটা বলার চেষ্টা করছি যে, মার্ডারের ক্ষেত্রে প্রমাণ করতে হবে কার গুলিতে কে মারা গেছে। কিন্তু ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটিতে হাজার হাজার রাউন্ড বুলেট নিক্ষিপ্ত হয়েছে। শত শত হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। হাজারও মানুষ শহীদ হয়েছে, ১৪০০ শহীদ হয়েছে।
‘সেখানে কার গুলিতে কে মারা গিয়েছে সেটা প্রমাণ করা ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটির ক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই। এবং সেটা প্রমাণিত না হওয়ার কারণে কেউ সাজার থেকে রেহাই পেতে পারে না—এটা হচ্ছে আইনের বিধান, ইন্টারন্যাশনালি রিকগনাইজড প্রিন্সিপাল। সুতরাং সেই জায়গায় সেন্টেন্সিংয়ের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, সেটাকে আমরা মনে করছি এটা ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের সাথে যাচ্ছে না। সে কারণেই আমরা আপিল করব।
সুজন হোসেনের গুলি করার দৃশ্য দেখা যাওয়ার বিষয়ে তাজুল বলেন, আদালত বলেছেন, সে গুলি করেছে, সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে, উল্লাস করেছে—সবকিছুই কিন্তু আদালত বলেছেন যেটা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে পেরেছে। এই ব্যাপারে কিন্তু অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি নেই।
প্রসিকিউশন সাকসেসফুলি এই আসামিদের ইনভলভমেন্ট, তারা কে কী করেছে সবকিছু প্রমাণ করতে পেরেছে। কিন্তু আদালত যেটা বলেছেন, এরা কনস্টেবল ছিল, তাদের সুপিরিয়ররা তাদেরকে কমান্ড করেছে, তারা করতে বাধ্য হয়েছে এবং সুজনের ব্যাপারে বলেছে সে অল্প কিছুদিন আগে এসেছে—এইসব বিবেচনায় তাকে কম শাস্তি দিয়েছে।
তাজুল বলেন, আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছে, অনেকেই সেখানে গুলি চালিয়েছে, অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয় নাই। এটি পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ওইদিন চানখাঁরপুলে ৪০ জন পুলিশ মোতায়েন ছিল।
অবজারভেশন যেটা আছে আমরা দেখে বলব। কারণ হাজার হাজার পুলিশ ছিল, সবার বিরুদ্ধেই তো আর মামলা করা যাবে না। ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটিতে আমরা দেখেছি যে সবচেয়ে যারা বেশি এট্রোসাস কাজ করেছে, যারা কমান্ড দিয়েছে, অনেকে নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে ছিল। তারা হয়ত এই গ্রুপের মেম্বার ছিল, কিন্তু সবাইকে মামলায় আসামি করাটা হয়তো যুক্তিসঙ্গত না, এটা মনে করেছে প্রসিকিউশন। শুধুমাত্র যারা সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধেই ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছিল, তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছিল।
এ ট্রাইব্যুনালেই গত ২০ জানুয়ারি মামলার রায় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রায় প্রস্তুত না হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান রায়ের জন্য ২৬ জানুয়ারি নতুন তারিখ ঠিক করে দেন।
পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় রায় এটি। রায়ের পুরো কর্যক্রম বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
গত বছরের ১৭ নভেম্বর প্রথম রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের দিন, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট চাঁনখারপুল এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ। তাতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন; আহত হন অনেকে।
ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে তা দাখিল করেন।
অভিযোগ আমলে নিয়ে সেদিন ট্রাইব্যুনাল হাবিবুর রহমানসহ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, চানখাঁরপুল এলাকায় আসামিরা নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করে।
তদন্ত সংস্থা এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তদন্ত প্রতিবেদনটি ৯০ পৃষ্ঠার। প্রতিবেদনে ৭৯ সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। এছাড়া ১৯টি ভিডিও, পত্রিকার ১১টি রিপোর্ট, ২টি অডিও, বই ও রিপোর্ট ১১টি এবং ৬টি ডেথ সার্টিফিকেট সংযুক্ত করা হয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে নির্বাচন করার পর ধরা পড়লে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানের মাছউদ। দেশীয় পর্যায়ে পোস্টাল ব্যালটের পরিবর্তন কোনো দলের চাপে আনা হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি আগামীতে ঋণখেলাপিদের গ্যারান্টাররা নির্বাচনে যাতে অংশ নিতে না পারে সে সুপারিশও জানানো হবে বলে জানান তিনি।
সোমবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি তথ্য জানান।
ইসি মাছউদ বলেন, ভোটের স্বচ্ছতার প্রশ্নে ইসি আপস করবে না। এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশ বজায় আছে। রাজনৈতিক কোনো চাপ অনুভব করছে না ইসি।
সুষ্ঠু এবং সুন্দর পরিবেশে ভালো ভোট হবে আশা প্রকাশ করে ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহবান জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে কোনো চাপ নেই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এসেছে।
জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখার কোনো সুযোগ নেই। কারণ তাদের নিবন্ধন বহাল রয়েছে। আইন অনুযায়ী তারা ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারবে। সব প্রার্থীর জন্য আমরা সমান সুযোগ তৈরি করছি।
ঋণখেলাপিদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরাসরি ঋণ খেলাপিদের প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে গ্যারান্টারদের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী বৈধতা দেওয়া হয়েছে। আদালত যাদের বৈধ ঘোষণা করেছে, নির্বাচন কমিশন আপাতত তাদের বৈধ হিসেবেই গ্রহণ করছে। তবে নির্বাচনের পর কারও অযোগ্যতা প্রমাণিত হলে নির্বাচন কমিশন স্বপ্রণোদিতভাবে বা অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এদিকে, এদিন ইসিতে নারী কর্মীদের প্রচারের সময় হামলার অভিযোগ জানিয়েছে জামায়াতের একটি প্রতিনিধি দল। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসান মাহবুব জুবায়ের জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নিয়েও তার অভিযোগ জানিয়েছেন।