ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অবাধ, নিরপেক্ষ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশব্যাপী সুপরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর সদস্য মোতায়েন সম্পন্ন করেছে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাহিনীটি জানায় যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ আয়োজনের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। জাতির এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সারাদেশে সুপরিকল্পিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সদস্য মোতায়েন সম্পন্ন করেছে। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাহিনী ধারাবাহিক ও কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে; বিশেষত দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও প্রথাগত দুর্বলতাগুলো দূর করে একটি জবাবদিহিতামূলক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গৃহীত প্রশাসনিক সংস্কার, প্রশিক্ষণ কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার বাস্তব প্রয়োগের ফলেই সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ সম্ভব হয়েছে। অতীতে বিশেষ করে ভিডিপি/টিডিপি দলনেতা ও দলনেত্রীদের নির্বাচনী দায়িত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আত্মসাতের যে অনভিপ্রেত প্রথা বিদ্যমান ছিল, বর্তমান ডিজিটাল ডাটাবেজভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয় যাচাই পদ্ধতির মাধ্যমে সেই অপসংস্কৃতির কার্যকর অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ ডিজিটাল ডাটাবেজভিত্তিক পদ্ধতিতে ভোটকেন্দ্রে সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক ডিজিটাল তালিকা প্রণয়ন, স্বয়ংক্রিয় যাচাই-বাছাই এবং কেবলমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য নির্বাচন—পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ডে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো প্রকার প্রভাব, সুপারিশ বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ রাখা হয়নি।
চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৩ জন সদস্যের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত ডেটা যাচাই ও ডিজিটাল রেকর্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণবিহীন থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়। AVMIS সফটওয়্যারের তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের ফলাফল হিসেবে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। এ ঘটনা বাহিনীর পূর্বপ্রস্তুত তদারকি ও প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত।
রাজধানীর গুলশান থানাধীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং ভাটারা থানাধীন ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুইজন দলনেত্রীর বিষয়ে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা যাচাই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। পূর্বনির্ধারিত নীতিমালার আলোকে উভয়কেই তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে—যা বাহিনীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রয়োগের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ভিডিপি সদস্য পরিচয়ে নির্বাচনী ডিউটির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ গ্রহণের অভিযোগটি স্থানীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত হয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নজরে আসার পর তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ৩৬টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল সদস্যকে পূর্বেই বহুমাত্রিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়েছে, ফলে অনিয়মটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় আনসার সদস্য পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনাটিও ডিজিটাল পরিচয় যাচাই ব্যবস্থার ফলেই দ্রুত উদ্ঘাটিত হয় এবং তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি বাহিনীর কোনো সদস্য নন।
উল্লেখ্য, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্বলতার প্রতিফলন নয়; বরং প্রশিক্ষণ নীতিমালার সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকির প্রত্যক্ষ ফলাফল। AVMIS সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রকৃত সনদধারীদের শনাক্তকরণ, কিউআর কোডসংযুক্ত পরিচয়পত্রের প্রবর্তন এবং STDMS সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্বাচনী ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা সরাসরি বিতরণের ব্যবস্থা নেয়ার ফলে ভুয়া পরিচয়, দায়িত্ব প্রদানের নামে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কার্যত রুদ্ধ হয়েছে। মূল ডিউটি শুরুর আগেই খাবার বাবদ অর্থ প্রদান সদস্যদের পেশাগত স্বচ্ছতা ও নৈতিক দৃঢ়তা আরও সুসংহত করেছে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে—স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, ধারাবাহিক সংস্কার এবং প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূরীকরণ ও ডিজিটাল স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার এই পদক্ষেপ কেবল তাৎক্ষণিক নির্বাচনী পরিবেশকে সুরক্ষিত করবে না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে তা কাঠামোগত ভূমিকা রাখবে। এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে একটি টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে বলে বাহিনী আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।