পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে এখনো বাকি সপ্তাহতিনেক। এর মধ্যেই গরুর মাংসের বাজার যেন ‘গা গরম’ করতে শুরু করেছে। কোনো কোনো বাজারে এমন অবস্থাই দেখা গেছে শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি)। এত দিন যারা ৭০০ টাকা কেজিতে গরুর মাংস বিক্রি করতেন এদিন তাদের সাড়ে সাতশ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। যারা ৭৫০ টাকায় বিক্রি করতেন তারা ৭৮০ টাকা পর্যন্ত নেন। কোথাও কোথাও আবার ৮০০ টাকা কেজি পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। কিন্তু বিক্রেতাদের দাবি, এই দাম আগে থেকেই ছিল। এদিকে, বাজারে পেঁয়াজের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০ টাকা কমেছে। সেই সঙ্গে দাম কমেছে আমদানি করা নাজিরশাইল চালের। তবে দাম বেড়েছে ছোট দানার মসুর ডাল, লেবু ও পোলাওয়ের চালের। বিক্রেতারা জানিয়েছেন, বাজারে নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে। আর বিদেশ থেকে নাজিরশাইল চাল আমদানি বেড়েছে। ফলে এ ধরনের চালের দামও কমেছে।
রাজধানীর সেগুনবাগিচা, শান্তিনগর, মালিবাগ, মানিকনগর ও মুগদাসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, গরুর মাংস ও পোলাওয়ের চালসহ কয়েকটি উৎসবকেন্দ্রিক পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে নিত্যদিনের প্রয়োজনের সবজি, পেঁয়াজ, মাছ, ডিম, মুরগি ও বিভিন্ন মুদিপণ্য বিক্রি হচ্ছে গত সপ্তাহের দামেই।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) সেগুনবাগিচা বাজারের গরুর মাংস বিক্রেতা মো. খোকন ৮০০ টাকা দাম চাইছিলেন। তবে দামাদামি করে ৭৮০ টাকায় কিনতে দেখা যায় কয়েকজন ক্রেতাকে। এ ছাড়া পরিচিত ক্রেতাদের কাছ থেকে ৭৫০ টাকা পর্যন্ত রাখেন খোকন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খোকন বলেন, ‘হাটে এখন গরু কিনতে ৩-৪ হাজার টাকা বেশি লাগছে। তাই কেজিপ্রতির দামও কিছুটা বেশি রাখতে হয়।’
রাজধানীর মুগদা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, গরুর মাংস সেখানে বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ টাকা কেজিতে। এই বাজারের বিক্রেতা আব্দুস সালাম সপ্তাহখানেক আগেও ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। তিনি বললেন, ‘এখন আর পোষাতে পারছি না। এখন দাম কম রাখলে মাংসের মান ঠিক রাখা যাবে না। মান ঠিক রাখতে দাম কিছুটা বাড়িয়েছি। আমি ছাড়া সবাই আগে থেকেই ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছি।’
মাংস বিক্রেতারা বলছেন, রোজার মাসে মাংসের চাহিদা বাড়ে। এ ছাড়া রোজার আড়াই মাস পর কোরবানির জন্য অনেক খামারি গরু সংরক্ষণ করেন। এতে বাজারে গরুর সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যায়।
মানিকনগর বাজারে আসা মাংসের ক্রেতা মো. আলী বলেন, ‘একটা সময় ছিল শবে বরাতের কিছু আগে বাজার গরম হয়ে উঠত। তখন মাংসের বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিটি করপোরেশন দাম বেঁধে দিত। তবে শবে বরাতের বাজার নিয়ে আগ্রহ আগের মতো নেই। দামও বেঁধে দেওয়া হয় না। তবে হুজুগ একেবারে শেষ হয়েও যায়নি। তাই চাহিদা বাড়তে থাকায় মাংসের দাম বাড়ছে।’
সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, রাজধানীর খুচরা বাজারে গড়ে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকা কেজি দরে। টিসিবির ভাষ্য, গত বছরও এ সময় গরুর মাংসের একই দাম ছিল।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-১৮৫ টাকা কেজির মধ্যে। গতকালও এ দামেই বিক্রি হয়। ফার্মের ডিমের দাম প্রতি ডজন বাজারভেদে ছিল ১১০-১২০ টাকা।
শীতের সবজির সরবরাহ ভালো থাকায় স্থির রয়েছে গত সপ্তাহের দামেই। সপ্তাহখানেক ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়ার পর আলুর দাম আবার কমে ২০-২৫ টাকায় নেমেছে। বাজারে আকারভেদে ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতিটি ৩০-৩৫, শিম প্রতি কেজি ৩০-৪০ টাকার মধ্যে কেনা যাচ্ছে। তবে শসা ও খিরার বাজার এখনো চড়া, দাম প্রতি কেজি ৭০-৮০ টাকা। প্রতি কেজি বেগুন মান ও জাতভেদে ৫৫-৮০ টাকার মধ্যে। প্রতিটি লাউ কিনতে ৭০-৮০ টাকা গুনতে হচ্ছে।
পেঁয়াজের বাজার স্থির রয়েছে গত সপ্তাহের দামেই। ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা কেজি। এ ছাড়া মানভেদে ৫০ টাকা কেজিতেও পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।
দাম কিছুটা বেড়েছে প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ টাকা দামে, যা সপ্তাহখানেক আগেও ছিল ১৬০ টাকার মধ্যে।
বেড়েছে খোলা সুগন্ধি চালের দামও। প্রতি কেজি খোলা চালের দাম দেখা গেল ১৫০-১৬০ টাকা। এত দিন ছিল ১৪০-১৫০ টাকা।
সেগুনবাগিচা বাজারের মুদি দোকানি মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, মুদিসামগ্রীর মধ্যে ছোলা, চিনি, ডালসহ অনেক কিছুর দাম আগেই বেড়েছে। নতুন করে আর তেমন বাড়েনি। রোজার আগে হয়তো আর বাড়বে না।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অর্থাৎ, সপ্তাহের ব্যবধানে দাম কমেছে ১০ টাকা।
বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কিছুটা কমেছে। মুদি পণ্যের বিক্রেতারা জানিয়েছেন, কয়েক দিন ধরে সরবরাহকারীদের (ডিলার) কাছ থেকে চাহিদামতো সয়াবিন তেল পাচ্ছেন না খুচরা বিক্রেতারা। তবে দাম বাড়েনি। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বাজারে ছোট দানার মসুর ডাল ১৬০–১৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তিন সপ্তাহ আগে এ দাম কেজিতে ২০ টাকা কম ছিল। অবশ্য মোটা দানার মসুরের দাম কেজিতে ৫ টাকা কমে ৮৫–৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নাজিরশাইলের দাম কমেছে: বাজারে দেশি ও আমদানি করা—দুই ধরনের নাজিরশাইল চাল বিক্রি হয়। এর মধ্যে আমদানি করা নাজির চালের দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা কমেছে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) এ চাল বিক্রি হয়েছে ৭৫–৮০ টাকা দরে। এক সপ্তাহ আগে যার দাম ছিল ৮০–৮৫ টাকা। তবে দেশি নাজিরশাইলের দাম ৮৫ টাকার আশপাশে। বিক্রেতারা জানান, বাজারে দেশি নতুন নাজিরশাইল চাল এলে দাম আরও কমবে।
অবশ্য মিনিকেট চালের দাম কমেনি। অর্থাৎ আগের দামেই তা স্থিতিশীল রয়েছে। মিনিকেট চালের মধ্যে প্রতি কেজি রশিদ ৭২–৭৩ টাকা, সাগর ও মঞ্জুর ৮০–৮২ টাকা, ডায়মন্ড ৮৫ টাকা এবং মোজাম্মেল চাল ৮৫–৮৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে এক মাসের ব্যবধানে পোলাওয়ের চালের দাম কেজিতে প্রায় ২৫ টাকা বেড়েছে।