দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর নানামুখী রাজনৈতিক সমীকরণের অবসান ঘটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সারাদেশে একযোগে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় সনদ বিষয়ক ঐতিহাসিক গণভোট। সাতসকালেই দেশের প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। রাজধানীর বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলোতেও ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। বিশেষ করে অনেক ভোটারকে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই কেন্দ্রের সামনে উপস্থিত হতে দেখা যায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগের ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনারই প্রতিফলন। এবারের নির্বাচনে ভোটাররা দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট পেপারে তাঁদের রায় প্রদান করছেন—সাদা ব্যালটটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য এবং গোলাপি ব্যালটটি ব্যবহৃত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ‘জুলাই সনদ’ বিষয়ক গণভোটের জন্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন মোড়। বিশেষ করে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় পর দেশে একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়াই করছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট। এই শ্বাসরুদ্ধকর লড়াইয়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশের মূল নেতৃত্ব এবং প্রস্তাবিত রাষ্ট্রীয় সংস্কারগুলোর ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি। আওয়ামী লীগের গত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর একটি অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য দেশবাসীর যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল, আজ তার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট সম্পন্ন করতে দেশজুড়ে সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ ১৯ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যারা মাঠ পর্যায়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, দেশের মোট ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর একজন প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট ২৯৯টি আসনে আজ সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। এবারের নির্বাচনি ময়দানে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী লড়াই করছেন, যার মধ্যে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। ভোটার তালিকায় নিবন্ধিত ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজারের বেশি ভোটার আজ তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, যার মধ্যে নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান। সারাদেশে স্থাপিত ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নজরদারি ও অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে এবার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রায় সাড়ে পাঁচশ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক এই ঐতিহাসিক ভোট প্রত্যক্ষ করতে বাংলাদেশে এসেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ছাড়াও তুরস্ক, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশের নির্বাচন কমিশনার ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করছেন। এ ছাড়া আলজাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স এবং এপির মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো সরাসরি নির্বাচনি সংবাদ কভার করছে। নির্বাচন কমিশনও স্বচ্ছতার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ৯ মাস ধরে লজিস্টিক ও কারিগরি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে এবং প্রায় ৮ লাখ নির্বাচনি কর্মকর্তাকে আধুনিক ভোট ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ভোটগ্রহণের আগের দিন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে কমিশন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি জয়-পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। ভোটগ্রহণ শেষে আজ সন্ধ্যায় কেন্দ্রেই বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে রিটার্নিং কর্মকর্তারা চূড়ান্ত ফলাফল সংকলন করবেন। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুক্রবার সকালের মধ্যে জাতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ও পূর্ণাঙ্গ ফলাফল জানতে পারবে। সব মিলিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক গন্তব্যের পথে দেশ আজ ব্যালট যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।