রোজার প্রথমদিনেই বাজার চড়া। এই সময় নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে দামও। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকেও স্বস্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণ, আইএমএফের শর্ত মোকাবিলা, ঋণের বোঝা কমানো এবং কর ও ব্যাংক সংস্কার—এই পাঁচ চাপ সামলে সামনে এগিয়ে যাওয়াই নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সাফল্য পেতে হলে শুধু সঠিক নীতিই নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক দৃঢ়তা। সরকার যদি এই চাপ সামলাতে পারে, তবেই ভিত্তি মজবুত হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে, যা মূল্যস্ফীতি কমার সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করেছে। আরও উদ্বেগের বিষয়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি গত ডিসেম্বরের ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতি অর্থমন্ত্রীকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর জনআস্থা ওঠানামা করে মূলত খাদ্যপণ্যের দামের ওপর নির্ভর করেই। ফলে নতুন সরকারের সামনে দীর্ঘ অগ্রাধিকারের তালিকা—রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সঙ্গে দর-কষাকষি। তবে তার সামনে এখন সবচেয়ে বড় এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর চ্যালেঞ্জ—মূল্যস্ফীতি। কারণ, কোটি কোটি পরিবারের কাছে নতুন সরকারের সাফল্যের মাপকাঠি একটাই—খাদ্যপণ্যের দাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনা করে অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছে কঠোর বার্তা পৌঁছাতে হবে। এ জন্য অর্থ, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অতীতে সরকারগুলো এখানেই হোঁচট খেয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারের রাজনৈতিক ‘হানিমুন পিরিয়ড’ ছয় মাসের বেশি স্থায়ী নাও হতে পারে। এরপরই মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এমন এক অর্থনীতির দায়িত্ব নিয়েছে, যা ভঙ্গুর এবং এখনো বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে প্রবেশ করে। এরপর থেকে আইএমএফের সঙ্গে সম্পর্ক নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে।
আগের অন্তর্বর্তী সরকার আশা করেছিল, আন্তর্জাতিক সদিচ্ছায় হয়তো ঋণ আলোচনা সহজ হবে। কিন্তু ঋণদাতারা তাদের শর্তে অনড় ছিল। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ায় কিস্তি আটকে গিয়েছিল, আবার কঠোর শর্ত মানার পর তা ছাড় হয়েছে।
আগামী মাসে আইএমএফের আরেকটি মিশন ঢাকায় আসছে। সেখানে রাজনৈতিক কোনো অজুহাত টিকবে না। আইএমএফ মূলত রাজস্ব আদায়ে শৃঙ্খলা, মুদ্রানীতির সংকোচন এবং আর্থিক খাতের সংস্কারের অগ্রগতির ওপর জোর দেবে। আইএমএফের সমর্থন শুধু অর্থের জন্য নয়, অন্য দাতা সংস্থাগুলোর আস্থা অর্জনের জন্যও জরুরি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অর্থমন্ত্রীকে প্রথমেই সম্পদের সঠিক হিসাব-নিকাশ করতে হবে। আইএমএফ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বা সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিচ্ছে। সরকারের জন্য এভাবে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। সরকার কি কঠোর নীতি বজায় রেখে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করবে, নাকি প্রবৃদ্ধির সুযোগ বাড়াতে শর্ত শিথিলের জন্য দর-কষাকষি করবে?
রিজার্ভ স্থিতিশীল থাকলেও তা স্বস্তির কোনো কারণ নয়। বর্তমান রিজার্ভের স্থিতিশীলতা মূলত অর্থনীতির শ্লথগতির ফল। বিনিয়োগ কমেছে, আমদানি কমেছে এবং ব্যাংকিং খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে নিচে নেমেছে। ব্যবসায়ীরা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। সরকার যদি প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে সফল হয়, তবে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা আবারও বাড়বে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। অতীতে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ দ্রুত কমে যাওয়ার নজির রয়েছে।
রাজস্ব পরিস্থিতিও বেশ চ্যালেঞ্জিং। বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব বাজেটের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। বেতন বাড়াতে হলে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে, যা দেশের পুরো স্বাস্থ্য বাজেটের আড়াই গুণের সমান। মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুতি এখনই শুরু করতে হবে। প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশ রাজস্ব উদ্বৃত্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, ফলে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পরিচালন ব্যয় যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে, তবে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যখন বিনিয়োগ নয়, বরং দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেই সরকারকে ঋণ করতে হবে।
সরকারি ঋণের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে মোট সরকারি ঋণ প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঋণের উৎসেও পরিবর্তন এসেছে। সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমেছে, কিন্তু ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ২০২২ সাল থেকে ব্যাংক খাতের ঋণ ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে তারল্য তুলে নেওয়ায় সরকার বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত করে ফেলছে।
প্রবৃদ্ধি ঠিক রেখে সরকারি অর্থের জোগান দিতে হলে সরকারকে কর আদায় বাড়াতে হবে। অর্থনীতিবিদেরা প্রায়ই ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের লিকেজ বা ফাঁকির কথা বলেন। কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, ফাঁকি কমানো এবং আদায় ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করলে করহার না বাড়িয়েও রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব।
অবশ্য কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন দেওয়া এবং এনবিআরকে ঢেলে সাজানোর কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও বাস্তবায়নে গতি কম।
এদিকে ব্যাংকিং খাতেও গভীর সংস্কার প্রয়োজন। ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, বিশেষ করে ব্যাংক পর্ষদে পারিবারিক প্রতিনিধিত্বের নিয়ম পরিবর্তন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। আর্থিক খাতের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি, যাতে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহী হন।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বাইরে ভূ-রাজনীতির একটি সময়সীমাও ঘনিয়ে আসছে। নভেম্বরে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হওয়ার কথা। এটি অগ্রগতির মাইলফলক হলেও এর সঙ্গে কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে বাণিজ্য সুবিধা কমবে, যা রপ্তানিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন সরকার এলডিসি উত্তরণ অন্তত তিন বছর পেছানোর চেষ্টা করবে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ পেছানো বিএনপির নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।