হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার প্রাচীন লোকজ উৎসব—মেলা। আগের মতো সেই জমজমাট আয়োজন, লোকসংস্কৃতির প্রাণচাঞ্চল্য আর মানুষের ঢল এখন আর চোখে পড়ে না। তবুও ঐতিহ্যের আলো নিভে যায়নি পুরোপুরি। তারই উজ্জ্বল উদাহরণ বোয়ালখালীর প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী সূর্যব্রত মেলা, যা স্থানীয়দের কাছে ‘সূর্যখোলা’ নামে পরিচিত।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাচীন এই মেলা চলবে তিন দিনব্যাপী। প্রতি বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শেষ গত রোববার সূর্যদেবের পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ আয়োজন। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বোয়ালখালীর জ্যৈষ্ঠ্যপুরা কানুরদিঘীর পাড়ে সূর্যমন্দির সংলগ্ন মাঠ সাজানো হয়েছে নান্দনিক সাজে।
মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে বসেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দোকান। শীতের শেষে বসন্তের আগমনের প্রাক্কালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষ ভিড় জমিয়েছেন এ মেলায়। সরেজমিনে দেখা যায়, গৃহস্থালী সামগ্রী থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা পণ্য নিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। ফুলের ঝাড়ু, পোড়া আলু, বাঁশ-বেতের আসবাব, শীতল পাটি, তালপাতার হাতপাখা, মাটির তৈজসপত্র—সব মিলিয়ে এক অনন্য গ্রামীণ আবহ। ছোটদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নাগরদোলা। বেচাকেনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিক্রেতারাও।
স্থানীয়রা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোকজ উৎসবের জৌলুশ কমছে, নতুন প্রজন্মের আগ্রহও কমে যাচ্ছে। তবুও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনই এ মেলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
জ্যৈষ্ঠ্যপুরা সূর্যমন্দির মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বসুতোষ দাশ বলেন, “২২০ বছরের পুরোনো এই মেলা আমাদের বাপ-দাদার আমলের। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই এখানে আসে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
মেলা কমিটির উপদেষ্টা দয়াল হরি দে জানান, “রবি, সোম ও মঙ্গলবার তিন দিনব্যাপী এ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন। সঠিকভাবে কেউ জানেন না, কবে থেকে এ মেলার সূচনা। তবে ১৮০৫ সাল থেকে এটি চলমান বলে জানা যায়।”
ইতিহাস বলছে, প্রায় দুইশ বছর আগে কোনো এক মাঘ মাসের তীব্র শীতে গ্রামবাসী যখন দুর্ভোগে পড়েন, তখন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সূর্যদেবের আরাধনা করেন। উপবাস ও নানা উপাচারের মধ্য দিয়ে মনোবাসনা পূরণের সেই আয়োজন থেকেই ‘সূর্যখোলা’ নামের উৎপত্তি। কালক্রমে ধর্মীয় আচার উৎসবে রূপ নেয়, আর জন্ম হয় সূর্যব্রত মেলার।
মেলায় আসা দর্শনার্থী রতন ভট্টাচার্য বলেন, “৪০ বছর পর মেলায় এলাম। আগের মতো সেই জৌলুশ আর নেই। একসময় কাপ্তাই হিলটেক্স থেকে বড় বড় চিতল, রুই, কাতলা, কালিগাইন্না, কোরাল মাছ আসত। পোড়া আলুও অনেক থাকত। এখন তেমন নেই। তবে পরিবার নিয়ে এসে ভালো লাগছে।”
পোড়া আলু বিক্রেতা মৃদুল বলেন, “সূর্যব্রত মেলার পোড়া আলু এই মেলার ঐতিহ্য। এ বছর ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বিক্রি করতে আসতাম, এখন নিজেই প্রায় ১২ বছর ধরে বিক্রি করছি।”
সূর্যব্রত মেলা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়—এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। এই ঐতিহ্য যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু গল্প হয়ে না থাকে, সে জন্য প্রয়োজন সচেতন উদ্যোগ ও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।