প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্বোধনের পর যেন তর সইছিল না সাধারণ মানুষের। অবশেষে আজ অবসান হচ্ছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার। আজ ১ ডিসেম্বর থেকে ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে জনসাধারণের জন্য চালু হচ্ছে কক্সবাজার এক্সপ্রেস। ঢাকা ও কক্সবাজার দুই জায়গা থেকেই কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনটি উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ চলাচলের উদ্বোধন করা হবে। কক্সবাজারে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবির।
একই দিন রাত পৌনে ১০টায় ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকেও উদ্বোধন হবে ট্রেনটির। এ সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কামরুল আহসান উপস্থিত থেকে কক্সবাজারগামী যাত্রীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার এক্সপ্রেসে ঢাকার কমলাপুর স্টেশন ছাড়বে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায়। চট্টগ্রামে এসে পৌঁছাবে রাত ৩টা ৪০ মিনিটে। ২০ মিনিট যাত্রাবিরতি দিয়ে রাত ৪টায় কক্সবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। কক্সবাজারে পৌঁছাবে সকাল ৬টা ৪০ মিনিটে। অর্থাৎ রাজধানী থেকে পর্যটন শহরে যেতে সময় লাগবে ৮ ঘণ্টা ১০ মিনিট।
অন্যদিকে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে ট্রেন ছাড়বে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে। এই ট্রেন চট্টগ্রামে আসবে বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে। আর ঢাকায় পৌঁছবে রাত ৯টা ১০ মিনিটে।
জানা গেছে, ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সাতকানিয়ায় নির্মিত চারটি সেতু ট্রেন ট্রায়ালের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে। কক্সবাজার স্টেশনে পদায়ন করা হয়েছে একজন ইনচার্জসহ মোট ৪ জন স্টেশন মাস্টারকে। এ ছাড়া বাড়ানো হয়েছে প্রয়োজনীয় লোকবল।
ট্রেনে যাত্রীদের নিরাপত্তায় ১০ জন রেলওয়ে পুলিশ নিয়োজিত থাকবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার পুলিশ ইনচার্জ এসএম শহিদুল ইসলাম।
রেলওয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল ইসলাম দৈনিক বাংলাকে বলেন, ১ ডিসেম্বর কক্সবাজার থেকে ঢাকা বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচলের জন্য আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। দফায় দফায় সভা করে সব পদক্ষেপ নিয়েছি।
যোগাযোগ করা হলে কক্সবাজার স্টেশন মাস্টার মো. গোলাম রাব্বানী বলেন, কক্সবাজার থেকে ঢাকায় প্রথম বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচলে আমরা প্রস্তুত। নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকার উদ্দেশে ট্রেন কক্সবাজার ছেড়ে যাবে। যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার চেষ্টা থাকবে।
ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৯৫ টাকা। এসি চেয়ারের ভাড়া ১ হাজার ৩২৫ টাকা, এসি সিটের ১ হাজার ৫৯০ টাকা এবং এসি বার্থের (ঘুমিয়ে যাওয়ার আসন) ভাড়া ২ হাজার ৩৮০ টাকা।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া ২০৫ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণির ৩৮৬ টাকা, এসি সিটের ৪৬৬ এবং এসি বার্থের ৬৯৬ টাকা।
গত ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
এ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে রেল নেটওয়ার্কে ৪৮তম জেলা হিসেবে যুক্ত হয় কক্সবাজার।
এ সময় তিনি বলেছিলেন, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার অথবা রাজশাহী থেকে কক্সবাজার, দক্ষিণাঞ্চল সুন্দরবন থেকে কক্সবাজার, এমনকি গোপালগঞ্জ-ফরিদপুর অর্থাৎ সমগ্র বাংলাদেশ থেকেই যাতে সহজে কক্সবাজার আসা যায় সেই পদক্ষেপও আমরা নেব। এই যোগাযোগগুলো সম্পন্ন হলে আমাদের পর্যটনের ক্ষেত্রে একটা বিরাট পরিবর্তন আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
কক্সবাজারে নির্মাণ করা হয়েছে আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেল প্রকল্পের পরিচালক মো. সুবক্তগীন বলেন, ছয়তলার এই স্টেশনে রয়েছে চলন্ত সিঁড়ি, মালামাল রাখার লকার, হোটেল, রেস্তোরাঁ, শপিংমলসহ আধুনিক সব সুবিধা। ৪৬ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতা সংবলিত স্টেশনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এতে আছে কনভেনশন হল, ট্যুরিস্ট ইনফরমেশন বুথ, এটিএম বুথ, এমনকি প্রার্থনার স্থানও। স্টেশনে ফুড কোর্ট, হোটেল ও শপিং কমপ্লেক্সের বিষয়টি বাইরের এজেন্সি দ্বারা টেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে।
দোহাজারী-কক্সবাজার ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১০ সালে শুরু হয়ে ২০১৩ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল একনেকে অনুমোদিত হয় এবং এ লাইনে ১২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৮৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু জমি অধিগ্রহণসহ অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালে সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকায়। এই বাজেটে এডিবি ঋণ দেয় ১৩ হাজার ১১৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা আর বাকি ৪ হাজার ৯১৯ কোটি ৭ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।
একনেক অনুমোদনের পর, প্রকল্পের মেয়াদকাল ২০১০ সালের ১ জুলাই ২০২২ সালের ৩০ জুন ধরা হয়। এ রেলপথ নির্মাণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ১ হাজার ৩৬৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দিতে বিলম্ব হয়। প্রকল্পের ১৬৫ একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ডি-রিজার্ভকরণসহ প্রকল্পে ব্যবহারে অনুমতি পেতে কালক্ষেপণ হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সব কাজ শেষ হতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
কক্সবাজারের সঙ্গে শুধু ঢাকা নয়, পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরবঙ্গের সঙ্গেও এ রেলপথ যুক্ত হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন কবির।
সারাদেশে গত এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৭৭ জন, যাদের মধ্যে ৫১ জনের শরীরে এই রোগের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত বিগত দুই মাসে দেশে হাম ও এর আনুষঙ্গিক উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৭৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যুর মধ্যে ৮৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে সুনির্দিষ্টভাবে হামে আক্রান্ত হওয়ার কারণে। এছাড়া একই সময়কালে পরীক্ষাগারে হাম শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৮৮৫ জনের দেহে এবং আরও ৬৭ হাজার ৯০৫ জন অসুস্থতার বিভিন্ন লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ভৌগোলিক বিচারে ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের হার ও মৃত্যুর সংখ্যা সর্বাধিক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে এ পর্যন্ত ২৪১টি শিশু মারা গেছে এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ২৩৭ জনে। গত ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে আজ ২৮ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ের প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার (২৮ মে) ঢাকা সেনানিবাসে অফিসার, জেসিও ও সৈনিকদের সঙ্গে ঈদ প্রীতিভোজে অংশ নিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ভাগাভাগি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সেনা সদস্যদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় রাষ্ট্রের আস্থার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে।
অনুষ্ঠানস্থলে আগমন করলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান, ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ আশিকুর রহমান এবং ২৫ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম।
প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সেনা সদস্যদের উদ্দেশে এ সময় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে জানান, বহু বছর পর নিজের পুরনো ও স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাস এলাকায় এসে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও আবেগতাড়িত। তিনি উল্লেখ করেন, সেনানিবাসের এই পরিবেশ, শৃঙ্খলা, সহযোদ্ধাসুলভ বন্ধন এবং সেনাসদস্যদের আন্তরিকতা তার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উন্নত পেশাদার মান, দায়িত্ববোধ এবং দুর্যোগ মোকাবেলাসহ দেশের যেকোনো প্রয়োজনে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ঐতিহ্য তাকে গভীরভাবে গর্বিত করে বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় রাষ্ট্রের আস্থার প্রতীক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছে। জাতীয় সংকট এবং দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সেনাবাহিনীর অবদান জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য ভবিষ্যতেও একই নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেম নিয়ে জাতির সেবায় নিয়োজিত থাকবে।
প্রীতিভোজ শেষে প্রধানমন্ত্রী ইউনিটের সৈনিক লাইন পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে ইউনিট প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন এবং পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন। পরে তিনি অফিসার, জেসিও ও অন্যান্য পদবির সৈনিকদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন। কর্মসূচির শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী সেনাসদস্যদের সঙ্গে জোহরের নামাজ আদায় করেন।
পবিত্র ঈদুল আজহার সকালে ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহে নিহত শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে তিনি রাজধানীর বনানী সামরিক কবরস্থানে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা উভয়ে পিলখানা ট্র্যাজেডিতে শাহাদাতবরণকারী বীর সন্তানদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন। দেশের তরে জীবন বিলিয়ে দেওয়া এই সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
মূল প্রাঙ্গণে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহধর্মিণীকে নিয়ে নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কবর জিয়ারত করেন। সম্পর্কে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শ্বশুর। সেখানে তাঁরা কিছুক্ষণ অবস্থান করেন এবং মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করেন। পারিবারিক এই শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত স্মারক চত্বরের দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।
বিডিআর বিদ্রোহে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান গভীর শোক প্রকাশ করেন। তাঁরা সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাফন করা শহীদদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন। উল্লেখ্য যে, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত সেই বর্বরোচিত বিদ্রোহে তৎকালীন বিডিআর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারান। সর্বমোট ৭৪ জনের শাহাদাতবরণের সেই ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল, যাঁদের অধিকাংশকেই এই সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই শ্রদ্ধা নিবেদনকালে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উল্লেখযোগ্য। তাঁরাও প্রধানমন্ত্রীর সাথে শহীদদের স্মরণে আয়োজিত দোয়া ও মোনাজাতে শরিক হন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী সেখানে উপস্থিত অন্যান্য শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে সংক্ষেপে কুশল বিনিময় করেন।
ঈদের উৎসবের দিনে শহীদদের স্মরণ করার এই উদ্যোগটি সাধারণ মানুষ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ যেন জাতি কখনো ভুলে না যায়—সেই লক্ষ্যেই প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগতভাবে এই শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। নামাজ পরবর্তী এই জিয়ারত কর্মসূচির মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের বীর সন্তানদের প্রতি জাতির চিরস্থায়ী কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন।
পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ যখন সারা দেশের মানুষের মনে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিয়েছে, তখন পারস্য উপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে বিষাদময় সময় পার করছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ৩১ জন নাবিক। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ঈদুল ফিতরের পর এবার কোরবানির ঈদও তাদের কাটল বিদেশের মাটিতে লোনা জলে ভাসমান অবস্থায়। বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় জাহাজের নেভিগেশন ব্রিজে যখন ঈদের জামাত শুরু হয়, তখন সবার মনেই ছিল পরিবারের কাছে ফিরতে না পারার এক চাপা হাহাকার। জাহাজের মাস্টার ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম খানের পেছনে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন এই অকুতোভয় নাবিকেরা।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতার থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকেই এই সংকটের শুরু। এর পরদিন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে ত্রিমুখী যুদ্ধ শুরু হলে ভূ-রাজনৈতিক বেড়াজালে আটকা পড়ে জাহাজটি। গত ৮ এপ্রিল থেকে বড় পরিসরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এখনো অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ ইরানের অনুমতি নিয়ে পার হয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে ছাড়পত্র পাচ্ছে না বাংলাদেশি এই জাহাজটি।
নাবিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নিরলস কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়ার কোনো সবুজ সংকেত মেলেনি। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ কাটানোর প্রবল ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত জাহাজের ভেতরেই তাদের ত্যাগের এই উৎসব পালন করতে হয়েছে। যদিও জাহাজে ঈদের বিশেষ খাবার ও একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলির আয়োজন ছিল, কিন্তু প্রিয়জনদের সান্নিধ্য না পাওয়ার শূন্যতা সবকিছুকে ম্লান করে দিয়েছে। জাহাজের প্রতিটি কোণ এখন নাবিকদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে আছে, যারা প্রতিটি মুহূর্ত কেবল ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকিয়ে দিন গুনছেন।
ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকার হয়ে টানা তিন মাস ধরে তারা এক অনিশ্চিত গন্তব্যে সাগরে ভাসছেন। কবে নাগাদ তারা হরমুজ প্রণালি পার হতে পারবেন, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নিশ্চিত তথ্য তাদের কাছে নেই। প্রতিটি দিন পার করা তাদের কাছে এখন একেকটি যুগের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজনদের কাছে ফেরার আকুল আকুতি নিয়ে মোনাজাতে তারা কেবল মুক্তির প্রার্থনা করেছেন। তাদের আশা, সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে দ্রুত তাদের এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনবে।
পরিশেষে বলা যায়, এই ৩১ জন নাবিকের ঈদ কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে ছিল না কোনো প্রকৃত আনন্দ। ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত ঈদুল আজহা তাদের কাছে ত্যাগের চেয়েও বড় এক পরীক্ষার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশের সাগরে অবরুদ্ধ এই মানুষগুলোর জন্য এখন দেশবাসীর প্রার্থনা আর কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপই হতে পারে ঘরে ফেরার একমাত্র পথ। যতদিন না সেই ছাড়পত্র মিলছে, ততদিন পারস্য উপসাগরের দিগন্তহীন জলরাশিই হবে তাদের অস্থায়ী ঠিকানা।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের ৭৪টি কারাগারে অবস্থানরত প্রায় ৮২ হাজার বন্দির জন্য বিশেষ খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় প্রতিটি কারাগারে যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে বন্দিরা একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময় করেন। উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিতে সকালের শুরুতেই বন্দিদের আপ্যায়ন করা হয় ঐতিহ্যবাহী পায়েস ও মুড়ি দিয়ে। কারা অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্দিদের মানসিক প্রশান্তি ও উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেই এই বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।
দুপুরের খাবারে বন্দিদের জন্য রাখা হয়েছে অত্যন্ত উন্নত মানের রাজকীয় মেন্যু। এদিন দুপুরে তাদের পাতে পরিবেশন করা হচ্ছে সুগন্ধি পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরু ও খাসির মাংস। এর পাশাপাশি ডেজার্ট হিসেবে থাকছে মিষ্টি ও চমচম। খাবারের পূর্ণতা দিতে দেওয়া হচ্ছে কোমল পানীয়, সালাদ এবং খাবার শেষে পান-সুপারির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। রাতের খাবারের আয়োজনেও রয়েছে ভিন্নতা। রাতে বন্দিরা পাবেন সাদা ভাত, মচমচে রুই মাছ ভাজা ও সুস্বাদু আলুর দম। প্রতিটি পদ যেন মানসম্মত হয়, সে বিষয়ে জেল সুপারদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে বন্দিদের সঙ্গে তাদের স্বজনদের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিশেষ শিথিলতা আনা হয়েছে। দর্শনার্থীদের জন্য কারাগারের বাইরে স্থাপন করা হয়েছে ফ্রি জুস কর্নার। এছাড়া বন্দিদের সঙ্গে আসা শিশুদের জন্য চকলেট ও চিপস বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্বজনদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কথা বলা এবং বিশেষ সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বন্দিদের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন কারাগারে বন্দিরা তাদের পরিবারের পাঠানো নতুন পোশাক ও পাঞ্জাবি গ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন। এছাড়া অসুস্থ ও বয়স্ক বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধের সরবরাহও নিশ্চিত করা হয়েছে।
উৎসবের আনন্দ কেবল খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নানা সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনও করা হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে প্রতিটি কারাগারে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। বিনোদনের অংশ হিসেবে ঈদের দ্বিতীয় দিনে বন্দিদের জন্য প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং তৃতীয় দিনে প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচের সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কারাবিধি অনুযায়ী, ঈদের তিন দিনের মধ্যে যেকোনো একদিন বন্দিরা তাদের পরিবারের পাঠানো খাবার গ্রহণের সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষের এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন ও মিডিয়া) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানিয়েছেন, বন্দিরা যেন নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করেন, সেই লক্ষ্যেই এমন উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পরিবারের সঙ্গে অতিরিক্ত যোগাযোগ এবং মানসম্মত খাবারের এই সমন্বয় বন্দিদের সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। কড়া নিরাপত্তার পাশাপাশি মানবিক এই উদ্যোগগুলো দেশের প্রতিটি কারাগারে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাতে অংশগ্রহণ ও নামাজ আদায় শেষে তাঁর প্রয়াত বাবা-মা ও ছোট ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করার পরপরই তিনি সরাসরি শেরেবাংলানগরের জিয়া উদ্যানে যান। সেখানে তিনি তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও জিয়ারত করেন। এ সময় তাঁর সাথে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য ও দলীয় শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রয়াত মা-বাবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে সেখানে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন।
জিয়া উদ্যান থেকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বনানী কবরস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সেখানে তিনি তাঁর ছোট ভাই মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ ও জিয়ারত করেন। পরিবারের সদস্যদের স্মরণে এবং তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় তিনি সেখানে দীর্ঘক্ষণ প্রার্থনা করেন। পবিত্র ঈদের দিনে ত্যাগের মহিমার পাশাপাশি পারিবারিক ও ধর্মীয় এই রীতি পালনের মাধ্যমে তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রতিবছরই ঈদের সকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের কবর জিয়ারত করে থাকেন।
এর আগে সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল আজহার দেশের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দিষ্ট সময়েই সেখানে উপস্থিত হয়ে সাধারণ মুসল্লিদের সাথে ঈদের নামাজ আদায় করেন। জামাতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ছাড়াও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, প্রতিমন্ত্রীগণ, জাতীয় সংসদের সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা অংশগ্রহণ করেন। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক এই প্রধান জামাতে ইমামতি করেন। দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ শেষে বিশেষ খুতবা পাঠ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় দোয়া করা হয়।
ঈদের এই প্রধান জামাতে সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ অংশ নেন। নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লিরা একে অপরের সাথে কোলাকুলি ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রী নামাজ পরবর্তী সময়ে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষের সাথে কুশল বিনিময় করেন। যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই ঈদের জামাত ও জিয়ারত কর্মসূচি সম্পন্ন হয়। শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ঈদ উদযাপনের আহ্বান জানান।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বাংলাদেশের জনগণকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে চিঠিটির বার্তা প্রকাশ করা হয়।
চিঠিতে নরেন্দ্র মোদি লিখেছেন, এই পবিত্র উৎসব ভারতের সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। সারা ভারতের কোটি কোটি মুসলিম অত্যন্ত আনন্দ ও উদ্দীপনার সঙ্গে এই উৎসব উদযাপন করছেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঈদুল আজহা ত্যাগ, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্বের শাশ্বত আদর্শকে সমুন্নত রাখে; যা একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, যৌথ আত্মত্যাগ, সাংস্কৃতিক মিল এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পারস্পরিক আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে ভারত ও বাংলাদেশের মথ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
চিঠিতে মোদি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনমুখী পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে ভারত সরকার বাংলাদেশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
তিনি আরও যোগ করেন, দুই দেশের জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে যে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা মূলত দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক কল্যাণের উদ্দেশ্যেই পরিচালিত।
চিঠির শেষ অংশে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
জাতীয় ঈদগাহে পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাত শেষে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় ঈদগাহে ঈদের প্রধান জামাতে ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। নামাজের আগে বিশেষ বয়ান রাখেন তিনি। পরে ঈদের খুতবাহ দেন। এসময় তিনি পবিত্র ঈদুল আজহার তাৎপর্য তুলে ধরেন।
ভোর থেকেই হাজার হাজার মুসল্লি ঈদগাহে আসতে শুরু করেন। ভেতরে স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেকে সামনের সড়কে নামাজ আদায় করেন। একপর্যায়ে মুসল্লিদের উপস্থিতি কদম ফোয়ারা, শিক্ষাভবন ও শিক্ষা ভবন মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণ মুসল্লিদের পাশাপাশি এই জামাতে অংশ নেন প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, ঢাকায় নিযুক্ত মুসলিম দেশের কূটনীতিক এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ হাজারও ধর্মপ্রাণ মুসল্লি।
নামাজ উপলক্ষে ঈদগাহ ও আশপাশের সড়কে বর্ণিল সাজসজ্জা করা হয়। বিভিন্ন মোড়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে সুপেয় পানির ব্যবস্থা রাখা হয়।
এদিকে ঈদের জামাতকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। তল্লাশির মাধ্যমে মুসল্লিদের ঈদগাহে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ত্যাগের মহিমায় সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ঈদের জামাতে মুসল্লিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দিনটির আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় জামাত শেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানির প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। এর ফলে সকাল থেকেই পাড়া-মহল্লার অলিগলি ও নির্ধারিত স্থানগুলোতে কোরবানি দাতা ও শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পশু জবাইয়ের পর মাংস প্রস্তুত এবং তা বণ্টনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন মানুষ। কেবল ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও গ্রাম ও মফস্বল শহরগুলোতে উৎসবের একই চিত্র ফুটে উঠেছে। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের পাশাপাশি সমাজের দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে কোরবানির মাংস পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন সকলে। এই ত্যাগের উৎসবকে কেন্দ্র করে সারা দেশেই এক ধরনের আনন্দঘন ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ বিরাজ করছে।
পবিত্র এই উৎসব উপলক্ষে দেশবাসী ও সারা বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এক বিশেষ বাণীতে তিনি কোরবানির প্রকৃত মর্মার্থ অনুধাবন করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সামর্থ্যবানদের উচিত কোরবানির আনন্দ দরিদ্র, বঞ্চিত ও অভাবগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া। মানবিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতার মাধ্যমে সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করাই এই পবিত্র দিনের অন্যতম শিক্ষা বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেশবাসী ও বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে কোরবানির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, কোরবানি মানে কেবল পশু জবাই করা নয়; বরং নিজের মনের কুপ্রবৃত্তি, লোভ-লালসা ও হিংসা-বিদ্বেষকে বিসর্জন দেওয়া। পশুর কোরবানির মাধ্যমে মানুষের মনের পশুত্বকে পরাভূত করে মহানুভবতার দীক্ষা গ্রহণ করাই ঈদুল আজহার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পরিশেষে বলা যায়, ত্যাগের এই উৎসবকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এক অভূতপূর্ব সম্প্রীতির আবহ তৈরি হয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি এই কোরবানি সামাজিক সংহতি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বর্জ্য অপসারণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে উৎসবের আনন্দ নিরবচ্ছিন্ন থাকে। সামগ্রিকভাবে, ধর্মপ্রাণ মানুষ যথাযথ মর্যাদার সঙ্গেই তাঁদের পবিত্র এই ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করছেন।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে অবস্থিত জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ঈদের প্রধান জামাত সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই জামাতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এবং বিদেশি কূটনীতিকরা অংশ নেবেন। প্রধান জামাতের আগে ও পরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য জামাত আয়োজনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদে ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে দিনের প্রথম জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে সকাল সাড়ে ৭টায় জামাত অনুষ্ঠিত হবে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে বরাবরের মতো পাঁচটি পর্যায়ক্রমিক জামাত আয়োজিত হবে, যার প্রথমটি শুরু হবে সকাল ৭টায় এবং পরবর্তী জামাতগুলো যথাক্রমে ৮টা, ৯টা, ১০টা ও পৌনে ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে।
জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে প্রবেশের জন্য পাঁচটি ফটক নির্ধারিত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে একটি শুধুমাত্র নারী মুসল্লিদের জন্য। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে চার থেকে ছয় স্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পুরো এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড ও মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আকাশপথ থেকে নজরদারির জন্য ড্রোন এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে সোয়াট ও বোম ডিসপোজাল ইউনিটের মতো বিশেষায়িত দলগুলো সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। নারী মুসল্লিদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও পৃথক ইবাদতের স্থান নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে মুসল্লিদের কেবল জায়নামাজ এবং প্রয়োজনে ছাতা সঙ্গে নিয়ে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের ব্যাগ, দাহ্য পদার্থ বা ধাতব বস্তু নিয়ে ঈদগাহে প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া মৎস্য ভবন, প্রেসক্লাব ও হাইকোর্ট মোড়ে ট্রাফিক ডাইভারশন ও ব্যারিকেডের মাধ্যমে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অন্যদিকে, রামপুরা, মিরপুর এবং রাজধানীর বিভিন্ন স্থানীয় ঈদগাহ ও মসজিদে অধিকাংশ জামাত সকাল ৭টায় শুরু হবে। গুলশান সোসাইটি জামে মসজিদে সকাল ৮টায় জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ আদায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সকল সমন্বয় সম্পন্ন হয়েছে।
একদা ক্ষমতার দাপটে নেতাকর্মীদের বিশাল বহর নিয়ে ঈদগাহে নামাজ আদায় কিংবা গণভবনে আড়ম্বরপূর্ণ মিলনমেলায় অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগের ১৬১ জন হেভিওয়েট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এবারের পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করবেন কারাগারের প্রকোষ্ঠে।
অতীতে ঈদের দিনে তাঁদের যে রাজসিক ব্যস্ততা দেখা যেত, কারাবন্দি জীবনে তার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র ফুটে উঠছে। ঈদের দিনের বিশেষ কারামেনু সম্পর্কে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) জান্নাত-উল ফরহাদ জানিয়েছেন, "অন্যবারের মতো এবার ঈদের দিনও সকালের নাশতায় আসামিদের জন্য থাকবে পায়েস বা সেমাইয়ের সঙ্গে মুড়ি।" দুপুরের ভোজে বন্দিদের পাতে থাকবে পোলাও, গরুর মাংস (অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য খাসি), মুরগির রোস্ট, মিষ্টান্ন, ডিম এবং পান-সুপারিসহ শীতল পানীয়। রাতের আহারে সাদা ভাতের সঙ্গে পরিবেশিত হবে মাছ ভাজা ও আলুর দম। দেশের সকল কারাগারেই বন্দিদের জন্য এই অভিন্ন খাদ্য তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
এ কারা কর্মকর্তা আরো বলেন, "প্রতিটি কারাগার নিজেদের সাধ্যমতো বন্দীদের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। দর্শনার্থীদের গ্রহণের জন্য বিশেষ আয়োজন ও বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।" ঈদের দিন এবং পরবর্তী দুই দিন স্বজনদের পাঠানো ঘরোয়া খাবার গ্রহণের সুযোগ পাবেন কারাবন্দিরা।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, দুই শতাধিক বিশিষ্ট আসামির মধ্যে ১৬১ জন প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে ‘ডিভিশন’ সুবিধা পাচ্ছেন। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় এর মধ্যে প্রায় ৬০ জন উচ্চপর্যায়ের আসামিকে কেরানীগঞ্জের বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছে। সেখানে তাঁরা একত্রে ঈদের নামাজ আদায় ও পরস্পরের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি নিয়ম অনুযায়ী আগে থেকে জমা দেওয়া নির্ধারিত মোবাইল নম্বরে স্বজনদের সাথে কথা বলা ও সরাসরি সাক্ষাতের সুবিধাও বহাল থাকবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। ক্ষমতার বলয় থেকে বিচ্যুত হয়ে কারাগারের চার দেয়ালের মাঝে পোলাও-রোস্টের আয়োজন থাকলেও বন্দিদের মনে এক ধরনের বিষণ্নতা বিরাজ করছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের আপামর জনসাধারণসহ বিশ্বের সকল প্রান্তের মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বুধবার (২৭ মে) এক বাণীতে এই শুভেচ্ছা বার্তা প্রদান করে তিনি উৎসবের আনন্দ সমাজের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য সচ্ছল ব্যক্তিদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। আর্তমানবতার সেবায় বিত্তবানদের সক্রিয় ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘মানবকল্যাণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে ঈদুল আজহার গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে উল্লেখ করেন যে, এই উৎসব মূলত মানুষের ভেতরের পাশবিকতা ও হিংসা বিসর্জন দেওয়ার এক মহান মাধ্যম। তাঁর ভাষায়, ‘ঈদুল আজহা শুধু মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবই নয়; এটি আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও মনের পশুত্বকে কোরবানি করার এক মহিমান্বিত ও সর্বজনীন আহ্বান। মহান আল্লাহ তাআলার প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ, অবিচল আনুগত্য এবং সামাজিক সাম্যের অনুপম মহিমায় সমুজ্জ্বল পবিত্র ঈদুল আজহা আবারও সমাগত।’ ইসলামের ইতিহাসে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্রকে উৎসর্গ করার যে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তাকে মানবজাতির জন্য পরম শিক্ষা হিসেবে অভিহিত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তার প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়ে যে আত্মসমর্পণ, ধৈর্য, বিশ্বাস ও আনুগত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা মানবজাতির জন্য চিরন্তন আদর্শ। এই মহান ঘটনা আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়।’
সামাজিক সংহতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে কোরবানির প্রভাব অত্যন্ত ইতিবাচক বলে রাষ্ট্রপতি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘কোরবানির মাংস আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে অংশীদারি, বৈষম্য হ্রাস, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হয়। একই সঙ্গে কোরবানির ঈদ গরিব মানুষের সারা বছরের আমিষের জোগান দিতে সাহায্য করে এবং সার্বিক অর্থে দেশের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে চাঙ্গা করে।’ এই উৎসবের মূল শিক্ষাকে ধারণ করে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয় জীবনে উন্নত মানবিক গুণাবলি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সততা, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে।’ এছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষায় নির্ধারিত স্থানে পশু কোরবানি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণের মাধ্যমে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানান। পরিশেষে দেশ ও জাতির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করে তিনি প্রার্থনা করেন, ‘মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার কোরবানি কবুল করুন, দেশ ও জাতির ওপর তার অশেষ রহমত বর্ষণ করুন। ঈদুল আজহা সমগ্র বিশ্বে বয়ে আনুক শান্তি, স্থিতি, সম্প্রীতি ও অশেষ কল্যাণ।’
পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপনে নাড়ির টানে ঘরমুখো মানুষের স্রোত যখন গ্রামমুখী, তখন প্রকৃতিতে গত কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টির আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই বৃষ্টি একদিকে তীব্র দাবদাহ থেকে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে দিলেও যাতায়াতের পথে কিছুটা বিড়ম্বনা তৈরি করেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঈদের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার (২৮ মে) রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত লঘুচাপের বর্ধিতাংশ সক্রিয় থাকায় এমন বৈরী আবহাওয়ার সৃষ্টি হতে পারে বলে একটি গণমাধ্যম জানিয়েছে। বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে এবং কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ঈদের দিনের তাপমাত্রা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সারা দেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও রাতের তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ ১০৩ মিলিমিটার এবং ফেনীতে ৭৮ মিলিমিটার বর্ষণ হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মোংলায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে জানিয়ে আবহাওয়া অফিস আরও উল্লেখ করেছে যে, ঈদের আমেজ কাটলেও বৃষ্টির এই প্রবণতা এখনই থামছে না।
আগামী ২৯ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এই বর্ষণ অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ফলে উৎসবের আনন্দ ও কোরবানির আনুষ্ঠানিকতায় বৃষ্টির প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।