আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩২টি দল। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ৭৪৭ জন। সে হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যয়নপত্র নিয়ে নির্বাচনে উপস্থিত ১৯৬৬ জন প্রার্থী। আর স্বতন্ত্রদের মধ্যে অন্তত ৪০০ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নির্বাচনে আসা বড় দল আওয়ামী লীগের মূল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাইরে অন্যদলগুলোর বেশির ভাগ প্রার্থীই আসনগুলোর মানুষের কাছে অচেনা। প্রায় প্রতিটি আসনেই নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন এমন অনেক অচেনা মুখ যাদের প্রার্থিতা পেতে সমস্যা না হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরিচিত হতেই পার হয়ে যাবে প্রচারণার বেশির ভাগ সময়। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নির্বাচনে প্রার্থী আছে অনেক বেশি, কিন্তু, প্রতিদ্বন্দ্বী কম।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ৩০০ আসনের বিপরীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (নৌকা) ৩০৩ জন, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ৩০৪ জন, জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল) ২১৮ জন, তৃণমূল বিএনপি (সোনালী আঁশ) ১৫১ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি (আম) ১৪২ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) ১১৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (মশাল) ৯১ জন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) ৪৭ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ) ১৩ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি (হাতঘড়ি) ১৮ জন, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) ৩৯ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল) ১৩ জন, গণফ্রন্ট (মাছ) ২৫ জন, গণফোরাম (উদীয়মান সূর্য) ৯ জন, ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার) ৪৫ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি) ৩৭ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি (বাইসাইকেল) ২০ জন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা) ৩৪ জন, গণতন্ত্রী পার্টি (কবুতর) ১২ জন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ি) ৩৩ জন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (কুলা) ১৪ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা) ৮২ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (নোঙর) ৪৯ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট- বিএনএফ (টেলিভিশন) ৫৫ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (ছড়ি) ৭৪ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল (হাত-পাঞ্জা) ৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (কুঁড়েঘর) ৬ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মই) একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা) একজন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (খেজুর গাছ) একজন এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (হারিকেন) দুইজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
এদিকে মনোনয়ন জমার শেষ দিনেই ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে বিএনপিসহ যে দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে তাদের আর মত পাল্টে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসার দৃশ্যমান কোনো সুযোগ নেই। আন্দোলনরত দলগুলোও অবশ্য আগেই এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছে।
ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে যেসব প্রার্থী টিকে যাবেন তারাই থাকবেন নির্বাচনী দৌড়ে। তবে প্রতিটি আসনে ভোটের লড়াইয়ে যারা যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগেরই দলের নাম সাধারণ মানুষ জানে না। আর দল অচেনা বলে প্রার্থীরাও অচেনা। ফলে তাদের ধারণা নির্বাচনী লড়াইয়ে আসলে টিকে থাকবেন বড় দলের পরিচিত মুখগুলো। এর মধ্যে শাসক দলের মার্কা নিয়ে লড়াই করা প্রার্থীরা যেমন আলোচনায় থাকবেন, তেমনই অনেক আসনেই তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমাতে পারেন নির্বাচনে আসা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। কেননা, দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশির ভাগই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং তাদের মোটামুটি ভোট ব্যাংক অথবা এলাকাবাসীকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রয়েছে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ৪০০ জনই আওয়ামী লীগের।
যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত কয়েক দিনের মতো গতকালও বলেছেন, দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ঢালাওভাবে নির্বাচন করতে পারবেন না। এ ছাড়া ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সম্ভাবনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন জোটের এমন প্রার্থীরাই কেবল থাকবেন বিবেচনায়। আর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এর ফলে এটা স্পষ্ট যে, জোটের সঙ্গে সমঝোতা হলে কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাদেরও রণে ভঙ্গ দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এবার দলীয় মার্কার বাইরে দলীয় প্রার্থীদের স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়ায় নির্বাচনে আসা প্রার্থীদের কতজন আবার দল চাইলে নির্দেশ মেনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন সেটাও আছে দেখার বিষয়।
তবে এই আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ প্রার্থী যারা বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে এলেও জনগণের কাছে নিজের দল, দলীয় প্রতীক এবং নিজের পরিচয় প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন। তবে প্রতিটি আসনে স্থানীয় ভোটারদের কাছে তারা এখনো অচেনা এবং নতুন মুখ হিসেবে বিবেচিত।
যেমন দল হিসেবে এবারই প্রথম নির্বাচন করছে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। এসব দলের বেশির ভাগ প্রার্থী নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের কাছে নতুন পরিচয়ে উপস্থিত হবেন। অনেকে আবার খুব বেশি পরিচিত নন। একইভাবে তাদের নির্বাচনী প্রতীক যথাক্রমে সোনালী আঁশ, নোঙর ও একতারা চেনাতেও এবার তাদের বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনএমের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৬ জন এবং তৃণমূলের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৫ জন।
এদিকে, গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর কাদের বলেছেন, বিএনপির ১৫ কেন্দ্রীয় নেতাসহ সাবেক ৩০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো নেতাও আছেন। আবার আগে বিএনপিতে প্রভাব ছিল দলটির এমন সাবেক নেতারাও আছেন নির্বাচনে। এদের মধ্যে তৈমূর আলম, সমশের মবিন চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।
তবে এদের বাইরে নির্বাচনের মাঠে থাকা বেশির ভাগ প্রার্থীই অচেনা। এ বিষয়ে গাজীপুর-৪ আসনের একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার দল এলাকায় তেমন পরিচিত নয়। দলের প্রচার চালাতে ও এলাকার মানুষের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে এবার ভোট করতে আসা। আমিও জানি নির্বাচনে জয়লাভ করার অবস্থান এখনো আমার বা আমার দলের তৈরি হয়নি। তবে এক দিনে তো কিছুই হয় না। আমাদের দলের আদর্শ ও কর্মসূচি দেশের মানুষ ও এলাকার মানুষকে জানাতে আমরা নির্বাচনে এসেছি।’
অন্যদিকে লালমনিরহাট-৩ আসনে মনোনয়ন জমা দেয়া প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সদর আসনে ৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদ্য পদত্যাগকারী সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জাবেদ হোসেন বক্কর, জাতীয় পার্টি থেকে জাহিদ হাসান, তৃণমূল বিএনপি থেকে শামীম আহম্মেদ চৌধুরী, জাকের পার্টি থেকে সকিউজ্জামান মিয়া, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল থেকে আশরাফুল আলম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে আবু তৈয়ব মো. আজমুল হক পাটোয়ারী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) থেকে শ্রী হরিশ চন্দ্র রায় মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তবে এবার তিনি এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। ফলে এ আসনে নির্বাচনে অংশ নেয়া সব প্রার্থীই নতুন এবং নতুন একজন সংসদ সদস্য পাবে লালমনিরহাট সদরবাসী। তবে নতুন হলেও জেলা ও শহরের রাজনীতিতে পুরনো মুখ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। ছাত্ররাজনীতি করায় জাবেদ হোসেন বক্করও সেখানে পরিচিত মুখ। জাকের পার্টি ও জাসদের প্রার্থীকেও অনেকে চেনেন। তবে সাম্যবাদী দল, এনপিপির প্রার্থীর মতো জাতীয় পার্টির প্রার্থীও এলাকার সবার চেনা মুখ নন। ফলে যে আসন থেকে জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে সেখানে নতুন মুখ দেয়ায় মাঠের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন এলাকার অনেক বাসিন্দা।
বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ৬টি আসন বিশ্লেষণ করলে। দৈনিক বাংলার খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনার এই ৬টি আসনের জন্য সেখানে ৫৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করবেন, তাদের অধিকাংশেরই রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিচিতি নেই। হঠাৎ করেই তারা কেন সংসদ নির্বাচনে আগ্রহী হলেন, এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তরও দেননি অধিকাংশ প্রার্থী।
খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের মনোনীত ৬ জন প্রার্থী, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র ২ জন এবং জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বাকি ৪৪ জন প্রার্থী কখনো রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় ছিলেন না।
খুলনা প্রতিনিধির বিশ্লেষণ অনুযায়ী খুলনা-১ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৬ জন। তারা হলেন, জাকের পার্টির মো. আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল, জাতীয় পার্টির কাজী হাসানুর রশিদ, তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় ও আবেদ আলী শেখ।
এদের মধ্যে ননী গোপাল মণ্ডল ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তার পরিচিতি রয়েছে। তবে বাকি চারজন রাজনীতিতে একেবারেই অপরিচিত। তারা প্রত্যেকেই এবার প্রথম সংসদ নির্বাচন করছেন। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সাবেক সচিব।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচন করছি। আমাকে ডামি প্রার্থীও বলা যাবে। এটা দলীয় নির্দেশেই হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, ‘দল আমাকে আবারও সুযোগ দিয়েছে। আমি দলের সম্মান রাখব বলে আশাবাদী।’
তবে বাকি চার প্রার্থীর তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। জাতীয় পার্টীর কাজী হাসানুর রশিদ ও তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিকের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
আর জাকের পার্টি মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলেছে, তাই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’
অন্যদিকে খুলনা-২ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৯ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, গণতন্ত্র পার্টির মো. মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার, জাকের পার্টির ফরিদা পারভিন, ইসলামী ঐক্যজোটের হিদায়েতুল্লাহ, জাতীয় পার্টির মো. গাউসুল আজম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের বাবু কুমার রায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাঈদুর রহমান।
এদের মধ্যে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তবে বাকিদের আগে কখনো রাজনৈতিক মাঠে দেখা যায়নি।
কেন প্রার্থী হয়েছেন- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার বলেন, ‘অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন জমা দেয়া হচ্ছে, তাই আমরাও দিচ্ছি।’
খুলনা-৩ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের এস এম কামাল হোসেন, জাকের পার্টির এস এম সাব্বির হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাইজার আহমেদ ও ফাতেমা জামান সাথী।
এদের মধ্যেও শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। তিনি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তিন বারের সংসদ সদস্য ও দুই বারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানকে সরিয়ে তাকেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে। তবে ওই আসনেরও বাকি চারজনের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই।
খুলনা-৪ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন ১৪ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী, জাকের পার্টির শেখ আনছার আলী, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম আজমল হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. ফরহাদ আহমেদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মোস্তাফিজুর রহমান, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনিরা সুলতানা, ইসলামী ঐক্যজোটের রিয়াজ উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জুয়েল রানা, এম ডি এহসানুল হক, মো. রেজভী আলম, এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারা, আতিকুর রহমান ও এইচ এম রওশান জমির।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী বর্তমান সংসদ সদস্য। ২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি জয়ী হয়েছিলেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। তিনি ওই আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার আপন ভাই।
তিনি বলেন, এলাকার মানুষের দোয়া নিয়ে মাঠে নেমেছি। জয়-পরাজয় এলাকার মানুষই নির্ধারণ করবেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই আসনে আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এলাকার ভোটাররা বলছেন, বাকি ১২ জন প্রার্থীদের নাম খুব একটা শোনেননি তারা। কেউ কেউ একেবারেই অপরিচিত।
খুলনা-৫ আসনের জন্য মনোনয় জমা দিয়েছেন ৭ জন। তারা হলেন- জাতীয় পার্টির মো. শহীদ আলম, জাকের পার্টির সামাদ সেখ, আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ সেলিম আকতার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের এস এম এ জলিল, ইসলামী ঐক্যজোটের তরিকুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন।
এদের মধ্যে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ একাধিক বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। এ ছাড়া আকরাম হোসেন ফুলতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এই আসনেও আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। বাকি যারা প্রার্থী হয়েছেন এলাকার রাজনীতিতে তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই বলে জানা গেছে।
খুলনা-৬ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১২ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মো. রশীদুজ্জামান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. আবু সুফিয়ান, জাকের পার্টির শেখ মর্তুজা আল মামুন, জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধু, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মির্জা গোলাম আজম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম নেওয়াজ মোরশেদ, তৃণমূল বিএনপির গাজী নাদীর উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম রাজু, গাজী মোস্তফা কামাল, জি এম মাহবুবুল আলম, মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর ও মো. অহিদুজ্জামান মোড়ল।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মো. রশীদুজ্জামানের কোনো দলীয় পদ নেই। তিনি একসময় পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জামানত হারিয়েছিলেন। তবে তাকেই মনোনয়ন দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে ক্ষমতাসীন দল। ওই আসনে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত রয়েছে জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধুর। তিনি আগেও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। বাকি প্রার্থীদের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। এলাকার সবার কাছে পরিচিত মুখও নন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ আসনেই ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের স্থানীয়রা তেমন একটা চেনেন না। তবে বিরোধীদের এক অংশ নির্বাচন বর্জন করায় রাজনীতির নতুন সমীকরণ মেলাতে ছোট দলগুলোই নির্বাচনে হতে যাচ্ছে বড় দলগুলোর সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনীযুদ্ধ পার হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।
জাসদের মাঠপর্যায়ের এক রাজনীতিবিদ জসিম মণ্ডল বলেন, ‘নির্বাচন একটা বড় খেলা। এখানে সবাই নামে নিজ নিজ সমীকরণ মেলানোর জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সমীকরণ হয় এক ধরনের, আবার প্রার্থীর সমীকরণ হয় আরেক ধরনের। সবাই নির্বাচনে জয়ী হতে যেমন অংশ নেয় না তেমনই কেউ কেউ নির্বাচনে যায় অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে। আবার অনেকের কাছে ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণই বড় কথা।’ জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয় এ সময় পোস্টারিং করে নিজের ছবি ও পরিচিতি পুরো এলাকার মানুষকে দেখানো যায়। এটাও বা কম কিসে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই আছে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার। তাই কটা টাকা খরচ করে অনেকেই পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ নেয়। এর ফল তো অসীম-সারাজীবন নানাভাবে এর সুফল মেলে। যারা রাজনীতিতে আছেন, কেবল তারাই বোঝেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারার গুরুত্ব।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে আনসার বাহিনীর ১ হাজার ১৯১টি স্ট্রাইকিং টিম। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে জানানো হয় যে, গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন করতে সারাদেশব্যাপী সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে আনসার বাহিনীর ১,১৯১টি স্ট্রাইকিং টিম, যা নির্বাচনী নিরাপত্তা জোরদারে একটি সুদৃঢ় কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ উপলক্ষে সারাদেশের মোট ৪২,৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে জরুরি মুহূর্তে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ১,১৯১টি সশস্ত্র টিম স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরবচ্ছিন্ন ও সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ভোটকেন্দ্রসমূহের নিরাপত্তাকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় দেশের প্রতিটি উপজেলায় ২টি করে এবং প্রতিটি জেলায় ১টি করে আনসার ব্যাটালিয়ন স্ট্রাইকিং টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এসব টিমের কার্যক্রম আনসার ভিডিপি জেলা কার্যালয়, রেঞ্জ কার্যালয় এবং সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিকভাবে নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। এই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ‘নির্বাচনী সুরক্ষা অ্যাপ’-এ প্রতিটি আনসার ব্যাটালিয়ন স্ট্রাইকিং টিমের একজন করে সদস্য রেসপন্ডার (Responder) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া, তথ্য আদান-প্রদান এবং কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করছে।
আনসার ভিডিপি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী দায়িত্বের তিনটি ধাপ—নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে—আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আনসার ব্যাটালিয়ন স্ট্রাইকিং টিমের সদস্যরা মাঠে সক্রিয় থাকবেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা, বিশৃঙ্খলা কিংবা অপশক্তির অপচেষ্টা প্রতিহত করতে তারা সর্বদা প্রস্তুত থাকবে।
সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আনসার ব্যাটালিয়ন স্ট্রাইকিং টিম জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাব এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছে।
সার্বিকভাবে, সুপরিকল্পিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি এবং বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হওয়ার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ে আনসার বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি শুধু নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নয়, বরং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন, ভোটার অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও সুদৃঢ় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অবাধ, নিরপেক্ষ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দেশব্যাপী সুপরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর সদস্য মোতায়েন সম্পন্ন করেছে।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাহিনীটি জানায় যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট–২০২৬ আয়োজনের আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। জাতির এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সারাদেশে সুপরিকল্পিত, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে সদস্য মোতায়েন সম্পন্ন করেছে। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাহিনী ধারাবাহিক ও কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে; বিশেষত দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও প্রথাগত দুর্বলতাগুলো দূর করে একটি জবাবদিহিতামূলক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গৃহীত প্রশাসনিক সংস্কার, প্রশিক্ষণ কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার বাস্তব প্রয়োগের ফলেই সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ সম্ভব হয়েছে। অতীতে বিশেষ করে ভিডিপি/টিডিপি দলনেতা ও দলনেত্রীদের নির্বাচনী দায়িত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আত্মসাতের যে অনভিপ্রেত প্রথা বিদ্যমান ছিল, বর্তমান ডিজিটাল ডাটাবেজভিত্তিক ও স্বয়ংক্রিয় যাচাই পদ্ধতির মাধ্যমে সেই অপসংস্কৃতির কার্যকর অবসান ঘটানো সম্ভব হয়েছে। এবার প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ ডিজিটাল ডাটাবেজভিত্তিক পদ্ধতিতে ভোটকেন্দ্রে সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক ডিজিটাল তালিকা প্রণয়ন, স্বয়ংক্রিয় যাচাই-বাছাই এবং কেবলমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য নির্বাচন—পুরো প্রক্রিয়াটি কঠোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানদণ্ডে সম্পন্ন হয়েছে। কোনো প্রকার প্রভাব, সুপারিশ বা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ রাখা হয়নি।
চট্টগ্রামের কোতোয়ালী থানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ১৩ জন সদস্যের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত ডেটা যাচাই ও ডিজিটাল রেকর্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণবিহীন থাকার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হয়। AVMIS সফটওয়্যারের তথ্যভিত্তিক যাচাইয়ের ফলাফল হিসেবে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। এ ঘটনা বাহিনীর পূর্বপ্রস্তুত তদারকি ও প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতার একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত।
রাজধানীর গুলশান থানাধীন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড এবং ভাটারা থানাধীন ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুইজন দলনেত্রীর বিষয়ে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা যাচাই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়। পূর্বনির্ধারিত নীতিমালার আলোকে উভয়কেই তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়েছে—যা বাহিনীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তব প্রয়োগের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলায় ভিডিপি সদস্য পরিচয়ে নির্বাচনী ডিউটির প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ গ্রহণের অভিযোগটি স্থানীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত হয়। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে নজরে আসার পর তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ৩৬টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল সদস্যকে পূর্বেই বহুমাত্রিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়েছে, ফলে অনিয়মটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলায় আনসার সদস্য পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনাটিও ডিজিটাল পরিচয় যাচাই ব্যবস্থার ফলেই দ্রুত উদ্ঘাটিত হয় এবং তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি বাহিনীর কোনো সদস্য নন।
উল্লেখ্য, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্বলতার প্রতিফলন নয়; বরং প্রশিক্ষণ নীতিমালার সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকির প্রত্যক্ষ ফলাফল। AVMIS সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রকৃত সনদধারীদের শনাক্তকরণ, কিউআর কোডসংযুক্ত পরিচয়পত্রের প্রবর্তন এবং STDMS সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্বাচনী ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুবিধা সরাসরি বিতরণের ব্যবস্থা নেয়ার ফলে ভুয়া পরিচয়, দায়িত্ব প্রদানের নামে অর্থ আত্মসাৎ কিংবা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কার্যত রুদ্ধ হয়েছে। মূল ডিউটি শুরুর আগেই খাবার বাবদ অর্থ প্রদান সদস্যদের পেশাগত স্বচ্ছতা ও নৈতিক দৃঢ়তা আরও সুসংহত করেছে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে—স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, ধারাবাহিক সংস্কার এবং প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমেই একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূরীকরণ ও ডিজিটাল স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার এই পদক্ষেপ কেবল তাৎক্ষণিক নির্বাচনী পরিবেশকে সুরক্ষিত করবে না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, সুশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি জনআস্থা পুনর্গঠনে তা কাঠামোগত ভূমিকা রাখবে। এই পদক্ষেপগুলো ভবিষ্যতে একটি টেকসই ও দুর্নীতিমুক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে বলে বাহিনী আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৭৪ লাখ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির বেলাল উদ্দিন প্রধানের আটকের ঘটনায় পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আটককারী সংস্থাগুলোই নির্ধারণ করবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। আটককৃত নেতার বিষয়ে কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “যারা আটক করেছে, তারা এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দেবেন। আপনারা (সাংবাদিক) যদি আমার কাছে আইনি ব্যাখ্যা চান, তাহলে তো এটা আমার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে।” ভোটের মাত্র ১৩ ঘণ্টা বাকি থাকা অবস্থায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “দয়া করে এই অপতথ্য সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। আমাকে মিসকোট করার আগে যাচাই-বাছাই করে নেবেন। নির্বাচনের আর ১৩ ঘণ্টা বাকি, একটা ভালো দিকে আমরা এগোচ্ছি। সবাই সচেষ্ট থাকি, যেন নির্বাচন সুন্দরভাবে আয়োজন করতে পারি।”
নির্বাচনী সময়ে টাকা বহনের সীমা নিয়ে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি বিভ্রান্তিকর তথ্যের কড়া সমালোচনা করে ইসি সচিব দাবি করেন যে, তাঁকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ৫ কোটি টাকা বহন সংক্রান্ত ভাইরাল হওয়া খবরটি মিথ্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি নাকি বলেছি, ৫ কোটি টাকা নিয়ে গেলেও কোনো অসুবিধা নেই, এটা বলার এখতিয়ার, অধিকার, ক্ষমতা আমার নেই। এটা বলিনি। এটা আমাকে মিসকোট করা হয়েছে। আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক এবং আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।” তিনি গণমাধ্যমকে যেকোনো তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা নাশকতার চেষ্টা করা হলে সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সংলগ্ন রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান যে, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর তা মেনে না নিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যারা ভোটকেন্দ্রে নাশকতার চেষ্টা করবে, জালভোট, ব্যালট বক্স ছিনতাই বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে ঝুঁকি তাদেরই।” তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ঝুঁকি নেই, কারণ তারা আইন অনুযায়ী কাজ করবেন। আমরা কোনো ধরনের হেজিটেশন করবো না। ঝুঁকি যদি কারও থাকে, তা আইন ভঙ্গকারীদেরই।” নির্বাচনী পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে তিনি আরও বলেন, “এবার নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কোন ঝুঁকি নেই। তবে নির্বাচনে যারা বিশৃংখলার চেষ্টা করবে, যারা আইন অমান্য করবে, ভোট চুরি, ব্যালট ছিনতাইয়ের চেষ্টা করবে তারা এবার ঝুঁকিতে পড়বেন। আমরা এবার শক্ত অবস্থানে আছি। আমরা প্রতিটি বাহিনী সমন্বয়ের সঙ্গে কাজ করছি। আশা করছি দেশবাসীকে আমরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারব।”
র্যাব মহাপরিচালক জানান যে, নির্বাচনী তফশিল ঘোষণার আগে থেকেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের দমনে তারা জোরালো অভিযান পরিচালনা করে আসছেন এবং এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। নির্বাচনকে তিনটি স্তরে ভাগ করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে যার প্রথম ধাপ তথা নির্বাচন-পূর্ব সময়টি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন ভোটের দিন এবং ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে র্যাব স্ট্রাইকিং ও মোবাইল ফোর্স হিসেবে ৬৪টি জেলাতেই সক্রিয় থাকবে। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সাথে সমন্বিতভাবে র্যাব দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রতিটি রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও পুলিশের প্রায় ২৫ হাজার ৭০০ বডি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হবে এবং আকাশপথে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের পাশাপাশি ডগ স্কোয়াড ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটও সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে। বহিরাগতদের উপস্থিতি ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে সতর্ক নজরদারির পাশাপাশি অবৈধ অর্থ লেনদেনের অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি জানান যে, বর্তমানে জঙ্গি হামলার কোনো সুনির্দিষ্ট হুমকি না থাকলেও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ-২ (সিরাজগঞ্জ-কামারখন্দ) আসনের কামারখন্দ উপজেলায় ভোট কেনার উদ্দেশ্যে টাকা বিলি করার সময় স্থানীয় জনতার ধাওয়া খেয়ে এক জামায়াত নেতার দৌড়ে পালানোর ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকালে উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের ময়নাকান্দি গ্রামে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত ওই নেতার নাম মোস্তাক সরকার, যিনি কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর আমিরের দায়িত্বে রয়েছেন। ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওতে দেখা যায়, জামায়াত নেতা মোস্তাক সরকার গ্রামের এক ব্যক্তির হাতে নগদ টাকা তুলে দিচ্ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই স্থানীয় কয়েকজন যুবক সেখানে উপস্থিত হয়ে মোবাইলে ভিডিও ধারণ শুরু করেন এবং তাঁকে টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। ক্যামেরার সামনে ধরা পড়ে যাওয়ায় এবং পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মোস্তাক সরকার কোনো উত্তর না দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালাতে শুরু করেন। এ সময় উপস্থিত জনতাও তাঁকে ধরার জন্য পিছু ধাওয়া করে। দীর্ঘ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত ওই জামায়াত নেতা এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করতে সক্ষম হন। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন এমন প্রকাশ্য অর্থ বিতরণের ঘটনায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
এই ঘটনার বিষয়ে সিরাজগঞ্জ-২ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলামের প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ও জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে প্রতিটি কেন্দ্রের নির্বাচনি খরচ এবং কর্মীদের নাস্তার জন্য কিছু টাকা বরাদ্দ থাকে। মোস্তাক সরকারের কাছে থাকা অর্থটি হয়তো সেই কেন্দ্র খরচের টাকা ছিল। তবে জনসমাগম দেখে এবং ভিডিও করতে আসায় হয়তো ভয় পেয়ে তিনি সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়েছেন। এটি কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিরাজগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। তিনি বলেন, টাকা দিয়ে ভোট কিনতে গিয়ে জামায়াত নেতার প্রাণভয়ে দৌড়ে পালানোর দৃশ্যটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। তিনি অভিযোগ করেন যে, শুধু কামারখন্দেই নয়, জেলার বিভিন্ন স্থানে জামায়াত চক্র একইভাবে ভোটারদের অর্থ দিয়ে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ছাড়া তাঁরা সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে কেন্দ্রে যেতে বাধা দিচ্ছে বলেও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তিনি অবিলম্বে এই ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে প্রশাসনের কাছে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
নির্বাচনি এলাকার এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় ভোটাররা অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনি এলাকায় যেকোনো ধরণের অনৈতিক অর্থ লেনদেন বা ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে নির্বাচনি আচরণবিধি মেনে চলার জন্য পুনরায় সতর্ক করা হয়েছে।
নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বেলাল উদ্দিন প্রধানের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ গণনা শেষে ৭৪ লাখ টাকা বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুরে তাঁকে আটকের সময় প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ টাকা উদ্ধারের কথা জানানো হলেও বিকেলে চূড়ান্ত গণনা শেষে টাকার সঠিক অংক প্রকাশ করা হয়। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন বিপুল পরিমাণ এই নগদ অর্থ বহনের ঘটনাটি কেন্দ্র করে বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বাদানুবাদ শুরু হয়েছে।
সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম রেজা আজ বিকেলে গণমাধ্যমকে জানান, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরকে আটক করা হয়েছে এবং গণনা শেষে সেখানে মোট ৭৪ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। তবে অভ্যন্তরীণ রুটে বিমানে ভ্রমণের সময় নগদ অর্থ বহনের আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ। তিনি জানান, দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে আকাশপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যেকোনো পরিমাণ নগদ অর্থ বহনে কোনো আইনি সীমাবদ্ধতা নেই। সৈয়দপুরে আটক জামায়াত নেতার সঙ্গে থাকা অর্থের বিষয়ে তিনি ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার আগে শাহজালাল বিমানবন্দর কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘অনাপত্তিপত্র’ প্রদান করেছিল।
এদিকে, ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমিরের এই আটকের ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত নাটক’ এবং ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে দাবি করেন, মাওলানা বেলাল উদ্দিন প্রধান তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার টাকা বহন করছিলেন এবং তাঁর কাছে ঢাকার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া বৈধ অনাপত্তিপত্র ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তাঁকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। টাকার সঠিক উৎস সম্পর্কে যথা সময়ে যাবতীয় প্রমাণসহ বিস্তারিত তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরা হবে বলেও তিনি জানান।
বর্তমানে মাওলানা বেলাল উদ্দিন প্রধান সৈয়দপুর থানা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, নির্বাচনি পরিস্থিতির সংবেদনশীলতা এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে অধিকতর নিশ্চিত হতে তারা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বিমানবন্দরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে নগদ অর্থ বহনে কোনো আইনি বাধা নেই বলে জানানোর ফলে এই আটকের বিষয়টি এখন আইনি ও প্রশাসনিক তর্কের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উদ্ধারকৃত অর্থের বৈধতা এবং নির্বাচনি আচরণবিধির কোনো লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনার পরেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সব বাধা কাটিয়ে নির্বাচনের আগের এই ঘটনাটি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশব্যাপী গণভোটকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও পুলিশ সদর দপ্তর পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, যদি কোনো কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জাল ভোট প্রদান কিংবা অন্য কোনো নির্বাচনি অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে শুধুমাত্র জড়িত ব্যক্তিরাই নয়, বরং ওই কেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভোটকেন্দ্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে তিনি এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বুধবার সকালে পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন কন্ট্রোল রুম পরিদর্শনকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সারাদেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশের নেওয়া আধুনিক বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং কৌশল সম্পর্কে তাকে বিস্তারিত অবহিত করা হয়। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরার কার্যক্রম তিনি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে নির্বাচনি ডিউটিতে থাকা কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। পরিদর্শনকালে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপদেষ্টাকে নিরাপত্তা পরিকল্পনার বিভিন্ন কারিগরি দিক বুঝিয়ে দেন।
এরপর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাজধানীর নিউমার্কেট এবং মোহাম্মদপুর থানা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সেখানে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের শৈথিল্য না দেখানোর নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে পুলিশ বাহিনীকে তাদের সততা, পেশাদারিত্ব এবং দেশপ্রেমের মাধ্যমে জনগণের আস্থা জয় করতে হবে। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে যাতায়াত করতে পারেন এবং কোনো ধরনের ভয়ভীতির মুখে না পড়েন, সেটি নিশ্চিত করাই পুলিশের প্রধান কাজ। যেকোনো উসকানিমূলক পরিস্থিতি মোকাবিলায় শান্ত থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদস্যদের পরামর্শ দেন।
বিকেলের দিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা রাজধানীর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন, যেখান থেকে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন সংসদীয় আসনের নির্বাচনি সরঞ্জাম ও সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। সেখানে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স ও অন্যান্য নির্বাচনি সামগ্রী বিতরণের সুশৃঙ্খল পরিবেশ দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন যে, নির্বাচনের দিন সারা দেশে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বজায় থাকবে এবং ভোটারদের পূর্ণ অধিকার রক্ষায় সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। সব বাধা কাটিয়ে একটি সফল নির্বাচন সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে বদ্ধপরিকর বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার বিভিন্ন নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনকালে তিনি রাজধানীর মুগদা আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, উত্তরা হাজী ক্যাম্প এবং গাজীপুরের টঙ্গীতে স্থাপিত ক্যাম্পগুলোতে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং যেকোনো প্রকার নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা দৃঢ়তার সাথে প্রতিহত করার নির্দেশ দেন। নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যালোচনা করে তিনি বিজিবির অপারেশনাল সক্ষমতা যাচাই করেন এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিয়ে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন যে, “আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরনের শৈথিল্য বা গাফিলতি গ্রহণযোগ্য হবে না।” তিনি বিজিবি সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি নির্বাচনকালীন যেকোনো সংঘাত মোকাবিলায় দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। ভোটারগণ যাতে নির্বিঘ্নে ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সংখ্যক টহল পরিচালনা এবং চেকপোস্টের মাধ্যমে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। একই সাথে জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুরক্ষায় বিজিবি সদস্যদের সাধারণ মানুষের সাথে ভদ্র, মানবিক ও দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, প্রতিটি সদস্য সততা ও নিষ্ঠার সাথে তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে।
আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হলেও নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে বলে সরকারের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন। আইন অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠিত হওয়ার আগপর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন ও অপরিহার্য কাজগুলো বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদই তদারকি করবে।
বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করবে এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নামে গেজেট প্রকাশ করা হবে। এরপর নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা স্পিকারের কাছে শপথ গ্রহণ করবেন, যার মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠিত হবে। সংসদে নিরঙ্কুশ বা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল বা জোট তাদের সংসদ নেতা নির্বাচন করার পর রাষ্ট্রপতি তাঁকে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাবেন। বঙ্গভবনে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন। এই শপথ গ্রহণের মুহূর্ত থেকেই নতুন সরকার দায়িত্বভার গ্রহণ করবে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা তাঁদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবেন।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, মন্ত্রিসভা যেদিন গঠিত হবে, সেদিনই উপদেষ্টাদের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটবে। তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে জানিয়েছেন, নতুন সংসদ সদস্যদের গেজেট আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি নাগাদ প্রকাশিত হতে পারে। সেই সময় পর্যন্ত উপদেষ্টারা দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যাবেন কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক শূন্যতা এড়াতে তাঁরা দপ্তরে উপস্থিত থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাক-নির্দেশনা না থাকলেও প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী সরকার গঠন পর্যন্ত উপদেষ্টারা স্বপদেই বহাল থাকেন।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন এক ভিন্নধর্মী নৈতিক অবস্থানের কথা। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, গত মঙ্গলবার তিনি উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর শেষ নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যদিবস অতিবাহিত করেছেন। আইনত নতুন মন্ত্রিসভার শপথ পর্যন্ত তিনি পদে থাকলেও নির্বাচনের পর নৈতিক বিবেচনায় তিনি আর কোনো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করবেন না। তাঁর মতে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পর নতুন সরকারের আগমনের পথ প্রশস্ত করাই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, যে দল বা জোটই বিজয়ী হোক না কেন, জাতি হিসেবে সবাই তাঁদের পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির হাত ধরে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের আগপর্যন্ত আগের প্রশাসন দায়িত্ব পালন করে থাকে। যেহেতু এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, তাই নির্বাচনের পর ফল ঘোষণা থেকে শুরু করে শপথ গ্রহণ পর্যন্ত কয়েক দিনের এই অন্তর্বর্তী সময়ে প্রশাসনিক স্থবিরতা রোধে উপদেষ্টাদের পদে থাকা অপরিহার্য। বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ নতুন সরকারের জন্য লজিস্টিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে, যার মধ্যে হবু মন্ত্রীদের ব্যবহারের জন্য পরিবহন পুলের ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশ এক নতুন রাজনৈতিক গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশব্যাপী গণভোটের আগের দিন কুমিল্লার মুরাদনগরে বড় অংকের নগদ টাকাসহ মাওলানা হাবীবুর রহমান হেলালী নামের এক জামায়াত নেতাকে আটক করা হয়েছে। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে উপজেলার ছালিয়াকান্দি এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়িতে করে টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় জনতা তাকে হাতেনাতে আটক করে। পরবর্তীতে খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। আটক মাওলানা হাবীবুর রহমান হেলালী কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ইউসুফ হাকিমের ছালিয়াকান্দি ভোটকেন্দ্রের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার দুপুরে মাওলানা হেলালী ব্যক্তিগত একটি গাড়িতে চড়ে উপজেলার ধামগড় থেকে ছালিয়াকান্দি এলাকায় যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তাঁর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে স্থানীয়রা গাড়িটি গতিরোধ করে তল্লাশি চালায়। এ সময় গাড়ির পেছনে রাখা একটি বাজারের ব্যাগের ভেতর পাতলা কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখা অবস্থায় ১ হাজার টাকা নোটের দুটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়। ব্যাগে মোট ২ লাখ টাকা পাওয়া যায়। নির্বাচনের আগমুহূর্তে ভোটারদের প্রভাবিত করতে এই অর্থ ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন। এই ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে ভিড় জমায়।
ঘটনার বিষয়ে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুর রহমান জানান, স্থানীয়দের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। যেহেতু টাকা বিলি করার সময় তিনি সরাসরি হাতেনাতে ধরা পড়েননি, তাই বিষয়টি আরও গভীরভাবে তদন্তের প্রয়োজন। তবে নির্বাচনি এলাকায় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বহনের বিষয়টি আচরণবিধির পরিপন্থী হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পুলিশ বর্তমানে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং এই অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে কুমিল্লা উত্তর জেলা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং প্রকৃত ঘটনা কী তা জানার জন্য স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নির্বাচনের মাত্র এক দিন আগে এমন ঘটনায় নির্বাচনি এলাকায় টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ছালিয়াকান্দি ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের অর্থ লেনদেন বা অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে নিশ্চিত করেছে উপজেলা প্রশাসন।
সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বেলাল উদ্দিনকে আটক করেছে পুলিশ। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ এলাকা থেকে তাকে হেফাজতে নেয় সৈয়দপুর বিমানবন্দর থানা পুলিশ। তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে উদ্ধার করা এই বিপুল অর্থের কোনো বৈধ উৎস তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দেখাতে পারেননি বলে পুলিশ দাবি করেছে।
সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল আলম আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বজায় রাখতে এই তল্লাশি চালানো হয়। প্রাথমিক হিসেবে মাওলানা বেলাল উদ্দিনের কাছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। তবে উদ্ধারকৃত অর্থের সঠিক পরিমাণ নিশ্চিত করতে বর্তমানে গণনা প্রক্রিয়া চলছে। নির্বাচনি পরিস্থিতির এই স্পর্শকাতর সময়ে এত বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা এক জেলা থেকে অন্য জেলায় কেন বহন করা হচ্ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে পুলিশ।
আটকের পর মাওলানা বেলাল উদ্দিন দাবি করেছেন যে, উদ্ধারকৃত এই অর্থ তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসার লেনদেনের টাকা। তবে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এই বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বহনের সপক্ষে তিনি কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ বা বৈধ কাগজপত্র প্রদর্শন করতে পারেননি। বর্তমানে তাকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে এবং এই ঘটনায় যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সারা দেশে লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হলেও ২০ হাজারের বেশি অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বারবার কড়াকড়ি আরোপ করা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র সংশ্লিষ্ট থানায় জমা না হওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী যারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা দেননি, তাদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে মোট ৪৮ হাজার ২৮৩টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার ৯৯৫টি অস্ত্র সরকারি কোষাগার বা সংশ্লিষ্ট থানায় জমা পড়েছে। অর্থাৎ, এখনো ২০ হাজার ২৮৮টি লাইসেন্স করা অস্ত্র সাধারণ মানুষের হাতে রয়ে গেছে। গত ১৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে সব বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ওই আদেশে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অস্ত্র জমা না দিলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং অস্ত্র আইন ১৮৭৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, যেসব অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি সেগুলোর অধিকাংশেরই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল বিগত সরকারের আমলে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকের বিরুদ্ধেই বর্তমানে ফৌজদারি মামলা রয়েছে অথবা তারা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে আছেন। অনেক অস্ত্রের মালিক ইতিমধ্যে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যার ফলে এসব অস্ত্র সংগ্রহে বড় ধরনের প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া নাশকতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, উদ্ধার না হওয়া প্রতিটি অস্ত্রই নির্বাচনের জন্য এক একটি বড় ঝুঁকি বা ‘থ্রেট’। শুধু বৈধ অস্ত্রই নয়, বিভিন্ন উপায়ে দেশে প্রবেশ করা অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের বিষয়েও পুলিশ বিভাগ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনের দিন এবং পরবর্তী সময়ে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তিন স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। যারা সরকারি নির্দেশ অমান্য করে এখনো অস্ত্র নিজেদের কাছে রেখেছেন, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সব বাধা কাটিয়ে একটি নিরাপদ নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে প্রশাসন।
নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুদিন আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট বিষয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না, এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে— এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনোদিন হারাতে দেবে না।
তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা লক্ষ্য করছি—একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা, জনগণের আস্থাকে দুর্বল করা।
জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি আপনাদের অনুরোধ করছি—সতর্ক থাকুন, দায়িত্বশীল থাকুন। যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করবেন না। গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা ও সত্য। নির্বাচন নিয়ে যারা বিগত মাসগুলিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, তারা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আপনারা সকল প্রকার অপপ্রচার থেকে নিজেদের মুক্ত রাখুন। তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখুন। নির্বাচনবন্ধু হটলাইন—৩৩৩-এতে ফোন করে সঠিক খবর জেনে নিন। এখন নতুন করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নাকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।