আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩২টি দল। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ৭৪৭ জন। সে হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যয়নপত্র নিয়ে নির্বাচনে উপস্থিত ১৯৬৬ জন প্রার্থী। আর স্বতন্ত্রদের মধ্যে অন্তত ৪০০ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নির্বাচনে আসা বড় দল আওয়ামী লীগের মূল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাইরে অন্যদলগুলোর বেশির ভাগ প্রার্থীই আসনগুলোর মানুষের কাছে অচেনা। প্রায় প্রতিটি আসনেই নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন এমন অনেক অচেনা মুখ যাদের প্রার্থিতা পেতে সমস্যা না হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরিচিত হতেই পার হয়ে যাবে প্রচারণার বেশির ভাগ সময়। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নির্বাচনে প্রার্থী আছে অনেক বেশি, কিন্তু, প্রতিদ্বন্দ্বী কম।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ৩০০ আসনের বিপরীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (নৌকা) ৩০৩ জন, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ৩০৪ জন, জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল) ২১৮ জন, তৃণমূল বিএনপি (সোনালী আঁশ) ১৫১ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি (আম) ১৪২ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) ১১৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (মশাল) ৯১ জন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) ৪৭ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ) ১৩ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি (হাতঘড়ি) ১৮ জন, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) ৩৯ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল) ১৩ জন, গণফ্রন্ট (মাছ) ২৫ জন, গণফোরাম (উদীয়মান সূর্য) ৯ জন, ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার) ৪৫ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি) ৩৭ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি (বাইসাইকেল) ২০ জন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা) ৩৪ জন, গণতন্ত্রী পার্টি (কবুতর) ১২ জন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ি) ৩৩ জন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (কুলা) ১৪ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা) ৮২ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (নোঙর) ৪৯ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট- বিএনএফ (টেলিভিশন) ৫৫ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (ছড়ি) ৭৪ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল (হাত-পাঞ্জা) ৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (কুঁড়েঘর) ৬ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মই) একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা) একজন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (খেজুর গাছ) একজন এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (হারিকেন) দুইজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
এদিকে মনোনয়ন জমার শেষ দিনেই ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে বিএনপিসহ যে দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে তাদের আর মত পাল্টে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসার দৃশ্যমান কোনো সুযোগ নেই। আন্দোলনরত দলগুলোও অবশ্য আগেই এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছে।
ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে যেসব প্রার্থী টিকে যাবেন তারাই থাকবেন নির্বাচনী দৌড়ে। তবে প্রতিটি আসনে ভোটের লড়াইয়ে যারা যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগেরই দলের নাম সাধারণ মানুষ জানে না। আর দল অচেনা বলে প্রার্থীরাও অচেনা। ফলে তাদের ধারণা নির্বাচনী লড়াইয়ে আসলে টিকে থাকবেন বড় দলের পরিচিত মুখগুলো। এর মধ্যে শাসক দলের মার্কা নিয়ে লড়াই করা প্রার্থীরা যেমন আলোচনায় থাকবেন, তেমনই অনেক আসনেই তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমাতে পারেন নির্বাচনে আসা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। কেননা, দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশির ভাগই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং তাদের মোটামুটি ভোট ব্যাংক অথবা এলাকাবাসীকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রয়েছে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ৪০০ জনই আওয়ামী লীগের।
যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত কয়েক দিনের মতো গতকালও বলেছেন, দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ঢালাওভাবে নির্বাচন করতে পারবেন না। এ ছাড়া ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সম্ভাবনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন জোটের এমন প্রার্থীরাই কেবল থাকবেন বিবেচনায়। আর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এর ফলে এটা স্পষ্ট যে, জোটের সঙ্গে সমঝোতা হলে কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাদেরও রণে ভঙ্গ দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এবার দলীয় মার্কার বাইরে দলীয় প্রার্থীদের স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়ায় নির্বাচনে আসা প্রার্থীদের কতজন আবার দল চাইলে নির্দেশ মেনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন সেটাও আছে দেখার বিষয়।
তবে এই আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ প্রার্থী যারা বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে এলেও জনগণের কাছে নিজের দল, দলীয় প্রতীক এবং নিজের পরিচয় প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন। তবে প্রতিটি আসনে স্থানীয় ভোটারদের কাছে তারা এখনো অচেনা এবং নতুন মুখ হিসেবে বিবেচিত।
যেমন দল হিসেবে এবারই প্রথম নির্বাচন করছে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। এসব দলের বেশির ভাগ প্রার্থী নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের কাছে নতুন পরিচয়ে উপস্থিত হবেন। অনেকে আবার খুব বেশি পরিচিত নন। একইভাবে তাদের নির্বাচনী প্রতীক যথাক্রমে সোনালী আঁশ, নোঙর ও একতারা চেনাতেও এবার তাদের বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনএমের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৬ জন এবং তৃণমূলের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৫ জন।
এদিকে, গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর কাদের বলেছেন, বিএনপির ১৫ কেন্দ্রীয় নেতাসহ সাবেক ৩০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো নেতাও আছেন। আবার আগে বিএনপিতে প্রভাব ছিল দলটির এমন সাবেক নেতারাও আছেন নির্বাচনে। এদের মধ্যে তৈমূর আলম, সমশের মবিন চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।
তবে এদের বাইরে নির্বাচনের মাঠে থাকা বেশির ভাগ প্রার্থীই অচেনা। এ বিষয়ে গাজীপুর-৪ আসনের একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার দল এলাকায় তেমন পরিচিত নয়। দলের প্রচার চালাতে ও এলাকার মানুষের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে এবার ভোট করতে আসা। আমিও জানি নির্বাচনে জয়লাভ করার অবস্থান এখনো আমার বা আমার দলের তৈরি হয়নি। তবে এক দিনে তো কিছুই হয় না। আমাদের দলের আদর্শ ও কর্মসূচি দেশের মানুষ ও এলাকার মানুষকে জানাতে আমরা নির্বাচনে এসেছি।’
অন্যদিকে লালমনিরহাট-৩ আসনে মনোনয়ন জমা দেয়া প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সদর আসনে ৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদ্য পদত্যাগকারী সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জাবেদ হোসেন বক্কর, জাতীয় পার্টি থেকে জাহিদ হাসান, তৃণমূল বিএনপি থেকে শামীম আহম্মেদ চৌধুরী, জাকের পার্টি থেকে সকিউজ্জামান মিয়া, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল থেকে আশরাফুল আলম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে আবু তৈয়ব মো. আজমুল হক পাটোয়ারী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) থেকে শ্রী হরিশ চন্দ্র রায় মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তবে এবার তিনি এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। ফলে এ আসনে নির্বাচনে অংশ নেয়া সব প্রার্থীই নতুন এবং নতুন একজন সংসদ সদস্য পাবে লালমনিরহাট সদরবাসী। তবে নতুন হলেও জেলা ও শহরের রাজনীতিতে পুরনো মুখ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। ছাত্ররাজনীতি করায় জাবেদ হোসেন বক্করও সেখানে পরিচিত মুখ। জাকের পার্টি ও জাসদের প্রার্থীকেও অনেকে চেনেন। তবে সাম্যবাদী দল, এনপিপির প্রার্থীর মতো জাতীয় পার্টির প্রার্থীও এলাকার সবার চেনা মুখ নন। ফলে যে আসন থেকে জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে সেখানে নতুন মুখ দেয়ায় মাঠের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন এলাকার অনেক বাসিন্দা।
বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ৬টি আসন বিশ্লেষণ করলে। দৈনিক বাংলার খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনার এই ৬টি আসনের জন্য সেখানে ৫৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করবেন, তাদের অধিকাংশেরই রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিচিতি নেই। হঠাৎ করেই তারা কেন সংসদ নির্বাচনে আগ্রহী হলেন, এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তরও দেননি অধিকাংশ প্রার্থী।
খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের মনোনীত ৬ জন প্রার্থী, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র ২ জন এবং জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বাকি ৪৪ জন প্রার্থী কখনো রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় ছিলেন না।
খুলনা প্রতিনিধির বিশ্লেষণ অনুযায়ী খুলনা-১ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৬ জন। তারা হলেন, জাকের পার্টির মো. আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল, জাতীয় পার্টির কাজী হাসানুর রশিদ, তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় ও আবেদ আলী শেখ।
এদের মধ্যে ননী গোপাল মণ্ডল ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তার পরিচিতি রয়েছে। তবে বাকি চারজন রাজনীতিতে একেবারেই অপরিচিত। তারা প্রত্যেকেই এবার প্রথম সংসদ নির্বাচন করছেন। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সাবেক সচিব।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচন করছি। আমাকে ডামি প্রার্থীও বলা যাবে। এটা দলীয় নির্দেশেই হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, ‘দল আমাকে আবারও সুযোগ দিয়েছে। আমি দলের সম্মান রাখব বলে আশাবাদী।’
তবে বাকি চার প্রার্থীর তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। জাতীয় পার্টীর কাজী হাসানুর রশিদ ও তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিকের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
আর জাকের পার্টি মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলেছে, তাই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’
অন্যদিকে খুলনা-২ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৯ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, গণতন্ত্র পার্টির মো. মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার, জাকের পার্টির ফরিদা পারভিন, ইসলামী ঐক্যজোটের হিদায়েতুল্লাহ, জাতীয় পার্টির মো. গাউসুল আজম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের বাবু কুমার রায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাঈদুর রহমান।
এদের মধ্যে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তবে বাকিদের আগে কখনো রাজনৈতিক মাঠে দেখা যায়নি।
কেন প্রার্থী হয়েছেন- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার বলেন, ‘অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন জমা দেয়া হচ্ছে, তাই আমরাও দিচ্ছি।’
খুলনা-৩ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের এস এম কামাল হোসেন, জাকের পার্টির এস এম সাব্বির হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাইজার আহমেদ ও ফাতেমা জামান সাথী।
এদের মধ্যেও শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। তিনি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তিন বারের সংসদ সদস্য ও দুই বারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানকে সরিয়ে তাকেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে। তবে ওই আসনেরও বাকি চারজনের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই।
খুলনা-৪ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন ১৪ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী, জাকের পার্টির শেখ আনছার আলী, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম আজমল হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. ফরহাদ আহমেদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মোস্তাফিজুর রহমান, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনিরা সুলতানা, ইসলামী ঐক্যজোটের রিয়াজ উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জুয়েল রানা, এম ডি এহসানুল হক, মো. রেজভী আলম, এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারা, আতিকুর রহমান ও এইচ এম রওশান জমির।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী বর্তমান সংসদ সদস্য। ২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি জয়ী হয়েছিলেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। তিনি ওই আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার আপন ভাই।
তিনি বলেন, এলাকার মানুষের দোয়া নিয়ে মাঠে নেমেছি। জয়-পরাজয় এলাকার মানুষই নির্ধারণ করবেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই আসনে আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এলাকার ভোটাররা বলছেন, বাকি ১২ জন প্রার্থীদের নাম খুব একটা শোনেননি তারা। কেউ কেউ একেবারেই অপরিচিত।
খুলনা-৫ আসনের জন্য মনোনয় জমা দিয়েছেন ৭ জন। তারা হলেন- জাতীয় পার্টির মো. শহীদ আলম, জাকের পার্টির সামাদ সেখ, আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ সেলিম আকতার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের এস এম এ জলিল, ইসলামী ঐক্যজোটের তরিকুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন।
এদের মধ্যে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ একাধিক বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। এ ছাড়া আকরাম হোসেন ফুলতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এই আসনেও আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। বাকি যারা প্রার্থী হয়েছেন এলাকার রাজনীতিতে তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই বলে জানা গেছে।
খুলনা-৬ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১২ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মো. রশীদুজ্জামান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. আবু সুফিয়ান, জাকের পার্টির শেখ মর্তুজা আল মামুন, জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধু, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মির্জা গোলাম আজম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম নেওয়াজ মোরশেদ, তৃণমূল বিএনপির গাজী নাদীর উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম রাজু, গাজী মোস্তফা কামাল, জি এম মাহবুবুল আলম, মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর ও মো. অহিদুজ্জামান মোড়ল।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মো. রশীদুজ্জামানের কোনো দলীয় পদ নেই। তিনি একসময় পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জামানত হারিয়েছিলেন। তবে তাকেই মনোনয়ন দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে ক্ষমতাসীন দল। ওই আসনে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত রয়েছে জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধুর। তিনি আগেও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। বাকি প্রার্থীদের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। এলাকার সবার কাছে পরিচিত মুখও নন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ আসনেই ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের স্থানীয়রা তেমন একটা চেনেন না। তবে বিরোধীদের এক অংশ নির্বাচন বর্জন করায় রাজনীতির নতুন সমীকরণ মেলাতে ছোট দলগুলোই নির্বাচনে হতে যাচ্ছে বড় দলগুলোর সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনীযুদ্ধ পার হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।
জাসদের মাঠপর্যায়ের এক রাজনীতিবিদ জসিম মণ্ডল বলেন, ‘নির্বাচন একটা বড় খেলা। এখানে সবাই নামে নিজ নিজ সমীকরণ মেলানোর জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সমীকরণ হয় এক ধরনের, আবার প্রার্থীর সমীকরণ হয় আরেক ধরনের। সবাই নির্বাচনে জয়ী হতে যেমন অংশ নেয় না তেমনই কেউ কেউ নির্বাচনে যায় অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে। আবার অনেকের কাছে ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণই বড় কথা।’ জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয় এ সময় পোস্টারিং করে নিজের ছবি ও পরিচিতি পুরো এলাকার মানুষকে দেখানো যায়। এটাও বা কম কিসে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই আছে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার। তাই কটা টাকা খরচ করে অনেকেই পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ নেয়। এর ফল তো অসীম-সারাজীবন নানাভাবে এর সুফল মেলে। যারা রাজনীতিতে আছেন, কেবল তারাই বোঝেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারার গুরুত্ব।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে প্রত্যাশা করছে নির্বাচন কমিশন। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে দৃশ্যমান ব্যাপক উৎসাহের ওপর ভিত্তি করে এবার ভোটের হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, বর্তমানে দেশে ১৩ কোটিরও বেশি ভোটার রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটিই তরুণ ভোটার। এই বিশাল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করতে কমিশনের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তাদের সুবিধার্থে নিবন্ধনের সময়সীমা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। যুব সমাজের অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি বলেন, “তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভোট দেওয়ার স্পৃহা এবার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যদি এই ৪ কোটি তরুণের একটি বড় অংশ কেন্দ্রে উপস্থিত হয়, তবে ভোট কাস্টিংয়ের হারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।”
মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়ায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকেও অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে কমিশন। পূর্ববর্তী বিভিন্ন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার উল্লেখ করেন যে, প্রচার-প্রচারণা ও সশরীরে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের উদ্দীপনা সবসময়ই চোখে পড়ার মতো ছিল। এবার সেই আগ্রহের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। কমিশনারের মতে, অনুকূল পরিবেশ ও ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার যে প্রবল মানসিকতা তৈরি হয়েছে, তা সামগ্রিক শতাংশে বড় প্রভাব ফেলবে। যদিও ভোটের সঠিক সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন, তবে বর্তমান পরিস্থিতি ও উৎসবমুখর পরিবেশের আলোকে তিনি এই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে জানানো হয় যে, মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে বর্তমানে সারা দেশে ১,১৯১টি সশস্ত্র স্ট্রাইকিং টিম সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে। সারা দেশের মোট ৪২,৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে জরুরি মুহূর্তে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় এই সশস্ত্র টিমগুলো স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কেন্দ্রগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি উপজেলায় দুটি এবং প্রতিটি জেলায় একটি করে আনসার ব্যাটালিয়ন স্ট্রাইকিং টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এসব টিমের কার্যক্রম জেলা কার্যালয়, রেঞ্জ কার্যালয় এবং সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিকভাবে নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ‘নির্বাচনী সুরক্ষা অ্যাপ’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি টিমের একজন সদস্য ‘রেসপন্ডার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী দায়িত্বের তিনটি ধাপ—নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময় মিলিয়ে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই স্ট্রাইকিং টিমের সদস্যরা মাঠে সক্রিয় থাকবেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা, বিশৃঙ্খলা কিংবা নাশকতার অপচেষ্টা প্রতিহত করতে তারা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আনসার বাহিনী জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি এবং র্যাবের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। বাহিনীর এই সক্রিয় উপস্থিতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং একটি সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোটে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট উপলক্ষে দেশবাসীকে সাহস নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এই নির্বাচনকে কেবল প্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং গত ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসন ও নীরবতার বিরুদ্ধে জনগণের এক জোরালো জবাব হিসেবে অভিহিত করেন। প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছি-ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনওদিন হারাতে দেবে না।”
আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. ইউনূস দিনটিকে ‘নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ভোটারদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে তিনি বলেন, “আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন।” এই নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্র কোন পথে পরিচালিত হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণ নেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সারা দেশে প্রথমবারের মতো সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস জানান, প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ছাড়া সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে রাষ্ট্র সবাইকে নিয়ে এগোতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিশৃঙ্খলা বর্জন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, একটি ত্রুটিপূর্ণ বা সহিংস নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। যারা ইতিপূর্বে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে, তাদের কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন নিয়ে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো মহলের বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনে ‘নির্বাচনবন্ধু’ হটলাইন ৩৩৩-এ যোগাযোগ করতে হবে। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রসঙ্গে সকল প্রকার বিভ্রান্তি দূর করে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “এখন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে এই সরকার বিদায় নেবে। আমরা এই শুভ মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।”
জুলাই জাতীয় সনদকে গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণই এর চূড়ান্ত সংস্কার কাঠামোর বৈধতা দেবেন। ভাষণের শেষাংশে দেশবাসীকে দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “ভয় নয়– আশা নিয়ে; উদাসীনতা নয়– দায়িত্ববোধ নিয়ে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব। আপনার ভোটেই রচিত হবে গৌরবময় আগামীর বাংলাদেশের ইতিহাস।”
বিগত জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রসেনানী ও ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হাদির স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হাতে একটি সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের দলিল ও চাবি হস্তান্তর করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শহীদ হাদির আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ সম্মাননা ও সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হাদির পরিবারকে রাজধানীর অভিজাত এলাকা লালমাটিয়ায় অবস্থিত ‘সরকারি দোয়েল’ টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ২১৫ বর্গফুট আয়তনের এই ফ্ল্যাটটি আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত। ফ্ল্যাট হস্তান্তরের পাশাপাশি হাদির পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা ও জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও ১ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলিল হস্তান্তরকালে প্রধান উপদেষ্টা হাদির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাঁদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম। সরকারের এই পদক্ষেপ জুলাই বিপ্লবে জীবন উৎসর্গকারী বীরদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদির পরিবার এই সংকটময় সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রধান উপদেষ্টা ও সরকারের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রাক্কালে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। নিজের পেশাদারিত্ব ও সততার প্রমাণ হিসেবে তিনি তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত হিসাব ও বর্তমান আর্থিক অবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে তিনি তাঁর এই সম্পদের খতিয়ান তুলে ধরেন। শফিকুল আলম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর যে পরিমাণ সম্পদ ছিল, দায়িত্ব ছাড়ার সময়ও তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি; অর্থাৎ এই সময়ে তাঁর কোনো নতুন সম্পদ বাড়েনি।
সম্পদের বিবরণ দিতে গিয়ে প্রেস সচিব উল্লেখ করেন, বর্তমানে তাঁর মালিকানায় মোট তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মধ্যে একটি ঢাকার শাহীনবাগে এবং অন্যটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যাত্রাবাড়ীর দনিয়ায়। এ ছাড়া ময়মনসিংহে তাঁর নিজের নামে একটি এবং তাঁর স্ত্রীর নামে একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। গ্রামের বাড়ি মাগুরায় তাঁর মালিকানায় রয়েছে ৪০ শতাংশ কৃষিজমি। তিনি জানান, গত বছরের জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি যে সম্পদের ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ দায়িত্ব ছাড়ার দিনেও সেই অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকারি চাকরিতে থাকাকালীন তিনি বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য নতুন কোনো স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করেননি।
ব্যাংক হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শফিকুল আলম জানান, তাঁর শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় ওই অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা জমা ছিল, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকায়। এই বাড়তি ৯ লাখ টাকার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা তিনি আগে তাঁর শ্যালককে ধার দিয়েছিলেন এবং সম্প্রতি সেই অর্থ ফেরত পেয়েছেন। অবশিষ্ট অর্থ তাঁর বড় ভাই বিদেশ থেকে পাঠিয়েছেন, যা মূলত পবিত্র রমজান মাসে গ্রামের দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য দান হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।
শফিকুল আলম তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, তাঁর যাবতীয় আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং যেকোনো সময় যাচাইযোগ্য। যদি কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা তাঁর এই ঘোষিত সম্পদের বিষয়ে কোনো প্রকার অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে চান, তবে তিনি সেটিকে সাদরে স্বাগত জানাবেন। পরিশেষে তিনি কিছুটা রসিকতার ছলে তাঁর সেই আলোচিত ‘নকল বারবারি মাফলার’টির কথা উল্লেখ করে বলেন, সেটিও এখনো তাঁর কাছেই গচ্ছিত রয়েছে। ক্ষমতার চূড়ান্ত পটপরিবর্তনের ঠিক আগমুহূর্তে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার এমন স্বপ্রণোদিত হয়ে সম্পদের হিসাব প্রদান প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সারাদেশের আকাশসীমায় সাধারণভাবে সকল প্রকার ড্রোন উড্ডয়ন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য এই নির্দেশনা জারি করা হয়। জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে গৃহীত এই নিষেধাজ্ঞা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলে বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে।
তবে বিশেষ প্রয়োজনে সরকারি বা বেসরকারি ব্যক্তি ও সংস্থার পরিচালিত গবেষণা, জরিপ, কৃষিকার্য ও পরিবীক্ষণ কার্যক্রম এবং সরকারি বিভিন্ন ইভেন্টের সম্প্রচার কাজের জন্য ড্রোন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বেবিচক বরাবর আবেদন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার অনাপত্তি বা ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে উড্ডয়নের অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।
কর্তৃপক্ষের এই নির্দেশনা অমান্য করে কোনো ব্যক্তি যদি ড্রোন উড্ডয়ন করেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ড্রোন উড্ডয়ন করা হলে তা বেসামরিক বিমান চলাচল আইন ২০১৭ এর ২৪ ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কড়াকড়ি বলবৎ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে ঐতিহাসিক গণভোট উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আজ বিকেলে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, আজ সন্ধ্যা ৭টায় প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং বাংলাদেশ বেতারে একযোগে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাষণটি প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর এই ভাষণে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি জননিরাপত্তা এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা নতুন জাতীয় রূপরেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে বিশেষ দিকনির্দেশনা থাকবে।
উল্লেখ্য যে, আগামী বৃহস্পতিবার সারা দেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে প্রস্তাবিত জাতীয় সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের প্রচারণা আজ সকালেই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। এমন এক সন্ধিক্ষণে প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণ ভোটারদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যে নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং পুরো দেশ এখন ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ব্যালট বিপ্লবের অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে গতকাল ও আজ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের এই সমাপনী বার্তাটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জে বিজিবির নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) তিনি ফরিদপুর-৩ সংসদীয় আসনের ফরিদপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং মুন্সীগঞ্জ-১ সংসদীয় আসনের শ্রীনগর বেলতলী জি. জে. হাই স্কুলে স্থাপিত বিজিবির নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বেইজ ক্যাম্পে দায়িত্বরত বিজিবির সকল স্তরের কর্মকর্তা ও সদস্যদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
নির্বাচনী ডিউটি পালন প্রসঙ্গে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ভোটারগণ যেন নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তিনি বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কোনো দুষ্কৃতিকারী বা কুচক্রীমহল যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া প্রতিটি সদস্যকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
পরিদর্শন কর্মসূচির আগে বিজিবি মহাপরিচালক ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার উপস্থিতিতে আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, দেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টিতে ৩৭ হাজারেরও অধিক বিজিবি সদস্য বর্তমানে মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে এবং দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ঝুঁকি বিবেচনায় তারা মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত থাকবে। নির্বাচনকালীন যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় হেলিকপ্টারসহ কুইক রেসপন্স ফোর্স (QRF), র্যাপিড অ্যাকশন টিম (RAT), বিশেষায়িত K-9 ডগ স্কোয়াড ইউনিট, ড্রোন এবং বডি-অন ক্যামেরা ব্যবহারের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিজিবি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নির্বাচনের পর নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের ব্যবহারের জন্য এরই মধ্যে ৫০টি গাড়ি সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে রেখেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দ্রুততম সময়ে মন্ত্রিসভা গঠনের লক্ষ্যে এই আগাম লজিস্টিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে আগামী ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারিকে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই তারিখ আরও এগিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন মন্ত্রীরা যাতে শপথ নেওয়ার পরপরই তাদের দাপ্তরিক যাতায়াত ও কার্যক্রম শুরু করতে পারেন, সেজন্যই পরিবহন পুলের মাধ্যমে এই গাড়িগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সাধারণত নতুন সরকার গঠনের সময় মন্ত্রিসভার আকার অনুযায়ী পরিবহন সহায়তার প্রয়োজন হয়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও আগাম প্রস্তুতি সম্পন্ন করল প্রশাসন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর পরেই শুরু হবে নতুন জনপ্রতিনিধিদের শপথ এবং সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। নির্বাচনের পর কত দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। মূলত সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন যাত্রা শুরু করতে প্রশাসনের সকল স্তরে এখন সাজ সাজ রব বিরাজ করছে।
পরবর্তী সরকারের শাসনামলে কোনো প্রকার মামলা বা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে নিজের কর্মকাণ্ডের প্রতি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান যে, তিনি ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নিজের সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। নিজের দায়িত্ব পালন ও স্বচ্ছতা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, “আশা করি এমন কিছু করিনি যাতে সরকার থেকে চলে গেলে পরবর্তী সরকারের সময় মামলা, মোকদ্দোমা বা আইনি জটিলতার সম্মুখীন হবো।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিজের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি নিজেকে ৭০ শতাংশের বেশি নম্বর প্রদান করেন। যদিও সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, তবুও গৃহীত উদ্যোগগুলো জনকল্যাণেই ছিল বলে তিনি দাবি করেন। নিজের কাজের নম্বর প্রদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে ৭০ বা প্লাস মার্কস দিয়ে যাবে। অনেক কিছু করে দিতে পারিনি। যা শুরু করেছি তা সবই জনগণের জন্য করেছি।”
অর্থনৈতিক সংস্কার ও চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন যে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থানীয় শিল্পের ভিত্তি মজবুত করা এবং রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, পাচারকৃত অর্থের গন্তব্য ও জড়িতদের চিহ্নিত করা গেলেও প্রকৃত পরিমাণ এখনো সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, “কতো টাকা পাচার হয়েছে সুনির্দিষ্ট করা যায়নি। পরবর্তী সরকার সিরিয়াস হলে টাকা ফেরত আনতে পারবে।” তিনি আরও জানান যে, পাচারকারীরা অত্যন্ত দক্ষ লোক নিয়োগ করে অর্থ সরিয়ে নিয়েছে, যা উদ্ধারের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদী করেছে।
পরিশেষে পরবর্তী সরকারের প্রতি বর্তমান প্রশাসনের উন্নয়নমূলক কাজগুলো অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “পরবর্তী সরকারকে বলব, আমরা যে কাজ করেছি সেটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় জরুরি।” জ্বালানি সংকটকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে অধিকতর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও নতুন সরকার গঠনের অব্যবহিত পরেই ঢাকা সফরে আসছেন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। নবগঠিত ট্রাম্প প্রশাসনের এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সফরটি আগামী মার্চের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে নির্বাচনের পর বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি এবং সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নির্ধারণ করাই হবে এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
গত রোববার ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। সেই আলোচনাগুলোতে পল কাপুরের সম্ভাব্য সফরের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, আগামী ৬ থেকে ৯ মার্চের মধ্যে পল কাপুর ঢাকা সফর করতে পারেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর এই সফরকে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত করার একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতীয় বংশোদ্ভূত পল কাপুরকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। এরপর গত অক্টোবর মাসে তাঁর এই নিয়োগ চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। দক্ষ এই কূটনীতিকের ঢাকা সফর মূলত বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অংশীদারিত্বের বিষয়ে আলোকপাত করবে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ে এই পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার সফর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বকেই প্রতিফলিত করে। সব মিলিয়ে পল কাপুরের এই সফরটি ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের একটি শৌচাগার থেকে দৈনিক দিনকালের সাংবাদিক এবং বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আলী মামুদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে প্রেসক্লাবের একটি শৌচাগারের দরজা ভেঙে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘক্ষণ তাঁর কোনো খোঁজ না পেয়ে এবং শৌচাগারটি ভেতর থেকে দীর্ঘসময় তালাবদ্ধ থাকায় বিষয়টি জানাজানি হয়।
পুলিশ ও প্রেসক্লাব সূত্রে জানা গেছে, আলী মামুদের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের একটি শৌচাগার ভেতর থেকে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সেখানে কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। খবর পেয়ে শাহবাগ থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং পরিবারের উপস্থিতিতে শৌচাগারের তালা ভেঙে তাঁকে নিথর অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। উদ্ধার পরবর্তী প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ শেষে পুলিশের ধারণা, শৌচাগারে থাকা অবস্থায় আকস্মিক হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) তাঁর মৃত্যু হতে পারে।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, মরদেহ উদ্ধারের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সুরতহাল প্রতিবেদন সম্পন্ন করার পর মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হবে। আইনি সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রয়াত আলী মামুদ পেশাগত জীবনে দীর্ঘ দিন ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি জাতীয় দৈনিক দিনকালে কর্মরত থাকার পাশাপাশি বিএনপির মিডিয়া সেলের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুর সংবাদে জাতীয় প্রেসক্লাবসহ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং অন্য কোনো দিক রয়েছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখছে।
বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণের তালিকায় আবারও শীর্ষ অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল প্রথম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজুয়ালের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) থেকে এই উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। আজ সকাল ৮টা ২০ মিনিটের দিকে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, ২৮৩ স্কোর নিয়ে দূষণের তালিকায় ঢাকা এক নম্বরে অবস্থান করছে। বাতাসের এই মান নগরবাসীর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং স্বাস্থ্য হানিকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ঢাকার ঠিক পরেই ২৫৬ স্কোর নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। দূষণের মাত্রায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটি। শীর্ষ দূষিত শহরের এই তালিকায় পরবর্তী পর্যায়গুলোতে যথাক্রমে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর, মিশরের কায়রো এবং মঙ্গোলিয়ার উলানবাতর। এর বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে নির্মল ও স্বাস্থ্যকর বাতাসের শহর হিসেবে শীর্ষে স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল, যার বায়ুর মান ছিল মাত্র ছয়। পরিষ্কার বাতাসের অন্যান্য শহরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ড, চিলির স্যান্টিয়াগো, গ্রিসের এথেন্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন।
বায়ুমান ইনডেক্সের মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ স্কোর পর্যন্ত বাতাসকে 'ভালো' হিসেবে ধরা হয় এবং ৫১ থেকে ১০০ স্কোরকে 'মধ্যম মানের' হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর হলে তা 'সতর্কতামূলক' এবং ১৫১ থেকে ২০০ স্কোর হলে 'অস্বাস্থ্যকর' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঢাকার আজকের স্কোর ২৮৩ হওয়ার অর্থ হলো এখানকার বাতাস 'খুবই অস্বাস্থ্যকর' পর্যায়ে পৌঁছেছে। উল্লেখ্য যে, স্কোর ৩০১ অতিক্রম করলে তাকে 'চরম অস্বাস্থ্যকর' বা বিপজ্জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। শীতকালীন শুষ্ক আবহাওয়ায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ধুলোবালি এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়ার কারণে ঢাকার বায়ুর মান এমন বিপজ্জনক স্তরে নেমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এমন দূষিত পরিবেশে বসবাস করলে নগরবাসীর ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের জটিল রোগসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরির প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান ও এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত নানা জটিলতায় প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। ঢাকার বাতাসের এই বিপজ্জনক অবস্থা নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন পরিবেশবাদীরা, যাতে জনস্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হয়।