আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩২টি দল। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ৭৪৭ জন। সে হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যয়নপত্র নিয়ে নির্বাচনে উপস্থিত ১৯৬৬ জন প্রার্থী। আর স্বতন্ত্রদের মধ্যে অন্তত ৪০০ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নির্বাচনে আসা বড় দল আওয়ামী লীগের মূল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাইরে অন্যদলগুলোর বেশির ভাগ প্রার্থীই আসনগুলোর মানুষের কাছে অচেনা। প্রায় প্রতিটি আসনেই নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন এমন অনেক অচেনা মুখ যাদের প্রার্থিতা পেতে সমস্যা না হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরিচিত হতেই পার হয়ে যাবে প্রচারণার বেশির ভাগ সময়। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নির্বাচনে প্রার্থী আছে অনেক বেশি, কিন্তু, প্রতিদ্বন্দ্বী কম।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ৩০০ আসনের বিপরীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (নৌকা) ৩০৩ জন, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ৩০৪ জন, জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল) ২১৮ জন, তৃণমূল বিএনপি (সোনালী আঁশ) ১৫১ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি (আম) ১৪২ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) ১১৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (মশাল) ৯১ জন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) ৪৭ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ) ১৩ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি (হাতঘড়ি) ১৮ জন, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) ৩৯ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল) ১৩ জন, গণফ্রন্ট (মাছ) ২৫ জন, গণফোরাম (উদীয়মান সূর্য) ৯ জন, ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার) ৪৫ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি) ৩৭ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি (বাইসাইকেল) ২০ জন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা) ৩৪ জন, গণতন্ত্রী পার্টি (কবুতর) ১২ জন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ি) ৩৩ জন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (কুলা) ১৪ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা) ৮২ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (নোঙর) ৪৯ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট- বিএনএফ (টেলিভিশন) ৫৫ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (ছড়ি) ৭৪ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল (হাত-পাঞ্জা) ৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (কুঁড়েঘর) ৬ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মই) একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা) একজন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (খেজুর গাছ) একজন এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (হারিকেন) দুইজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
এদিকে মনোনয়ন জমার শেষ দিনেই ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে বিএনপিসহ যে দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে তাদের আর মত পাল্টে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসার দৃশ্যমান কোনো সুযোগ নেই। আন্দোলনরত দলগুলোও অবশ্য আগেই এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছে।
ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে যেসব প্রার্থী টিকে যাবেন তারাই থাকবেন নির্বাচনী দৌড়ে। তবে প্রতিটি আসনে ভোটের লড়াইয়ে যারা যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগেরই দলের নাম সাধারণ মানুষ জানে না। আর দল অচেনা বলে প্রার্থীরাও অচেনা। ফলে তাদের ধারণা নির্বাচনী লড়াইয়ে আসলে টিকে থাকবেন বড় দলের পরিচিত মুখগুলো। এর মধ্যে শাসক দলের মার্কা নিয়ে লড়াই করা প্রার্থীরা যেমন আলোচনায় থাকবেন, তেমনই অনেক আসনেই তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমাতে পারেন নির্বাচনে আসা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। কেননা, দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশির ভাগই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং তাদের মোটামুটি ভোট ব্যাংক অথবা এলাকাবাসীকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রয়েছে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ৪০০ জনই আওয়ামী লীগের।
যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত কয়েক দিনের মতো গতকালও বলেছেন, দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ঢালাওভাবে নির্বাচন করতে পারবেন না। এ ছাড়া ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সম্ভাবনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন জোটের এমন প্রার্থীরাই কেবল থাকবেন বিবেচনায়। আর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এর ফলে এটা স্পষ্ট যে, জোটের সঙ্গে সমঝোতা হলে কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাদেরও রণে ভঙ্গ দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এবার দলীয় মার্কার বাইরে দলীয় প্রার্থীদের স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়ায় নির্বাচনে আসা প্রার্থীদের কতজন আবার দল চাইলে নির্দেশ মেনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন সেটাও আছে দেখার বিষয়।
তবে এই আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ প্রার্থী যারা বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে এলেও জনগণের কাছে নিজের দল, দলীয় প্রতীক এবং নিজের পরিচয় প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন। তবে প্রতিটি আসনে স্থানীয় ভোটারদের কাছে তারা এখনো অচেনা এবং নতুন মুখ হিসেবে বিবেচিত।
যেমন দল হিসেবে এবারই প্রথম নির্বাচন করছে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। এসব দলের বেশির ভাগ প্রার্থী নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের কাছে নতুন পরিচয়ে উপস্থিত হবেন। অনেকে আবার খুব বেশি পরিচিত নন। একইভাবে তাদের নির্বাচনী প্রতীক যথাক্রমে সোনালী আঁশ, নোঙর ও একতারা চেনাতেও এবার তাদের বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনএমের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৬ জন এবং তৃণমূলের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৫ জন।
এদিকে, গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর কাদের বলেছেন, বিএনপির ১৫ কেন্দ্রীয় নেতাসহ সাবেক ৩০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো নেতাও আছেন। আবার আগে বিএনপিতে প্রভাব ছিল দলটির এমন সাবেক নেতারাও আছেন নির্বাচনে। এদের মধ্যে তৈমূর আলম, সমশের মবিন চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।
তবে এদের বাইরে নির্বাচনের মাঠে থাকা বেশির ভাগ প্রার্থীই অচেনা। এ বিষয়ে গাজীপুর-৪ আসনের একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার দল এলাকায় তেমন পরিচিত নয়। দলের প্রচার চালাতে ও এলাকার মানুষের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে এবার ভোট করতে আসা। আমিও জানি নির্বাচনে জয়লাভ করার অবস্থান এখনো আমার বা আমার দলের তৈরি হয়নি। তবে এক দিনে তো কিছুই হয় না। আমাদের দলের আদর্শ ও কর্মসূচি দেশের মানুষ ও এলাকার মানুষকে জানাতে আমরা নির্বাচনে এসেছি।’
অন্যদিকে লালমনিরহাট-৩ আসনে মনোনয়ন জমা দেয়া প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সদর আসনে ৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদ্য পদত্যাগকারী সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জাবেদ হোসেন বক্কর, জাতীয় পার্টি থেকে জাহিদ হাসান, তৃণমূল বিএনপি থেকে শামীম আহম্মেদ চৌধুরী, জাকের পার্টি থেকে সকিউজ্জামান মিয়া, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল থেকে আশরাফুল আলম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে আবু তৈয়ব মো. আজমুল হক পাটোয়ারী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) থেকে শ্রী হরিশ চন্দ্র রায় মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তবে এবার তিনি এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। ফলে এ আসনে নির্বাচনে অংশ নেয়া সব প্রার্থীই নতুন এবং নতুন একজন সংসদ সদস্য পাবে লালমনিরহাট সদরবাসী। তবে নতুন হলেও জেলা ও শহরের রাজনীতিতে পুরনো মুখ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। ছাত্ররাজনীতি করায় জাবেদ হোসেন বক্করও সেখানে পরিচিত মুখ। জাকের পার্টি ও জাসদের প্রার্থীকেও অনেকে চেনেন। তবে সাম্যবাদী দল, এনপিপির প্রার্থীর মতো জাতীয় পার্টির প্রার্থীও এলাকার সবার চেনা মুখ নন। ফলে যে আসন থেকে জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে সেখানে নতুন মুখ দেয়ায় মাঠের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন এলাকার অনেক বাসিন্দা।
বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ৬টি আসন বিশ্লেষণ করলে। দৈনিক বাংলার খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনার এই ৬টি আসনের জন্য সেখানে ৫৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করবেন, তাদের অধিকাংশেরই রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিচিতি নেই। হঠাৎ করেই তারা কেন সংসদ নির্বাচনে আগ্রহী হলেন, এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তরও দেননি অধিকাংশ প্রার্থী।
খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের মনোনীত ৬ জন প্রার্থী, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র ২ জন এবং জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বাকি ৪৪ জন প্রার্থী কখনো রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় ছিলেন না।
খুলনা প্রতিনিধির বিশ্লেষণ অনুযায়ী খুলনা-১ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৬ জন। তারা হলেন, জাকের পার্টির মো. আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল, জাতীয় পার্টির কাজী হাসানুর রশিদ, তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় ও আবেদ আলী শেখ।
এদের মধ্যে ননী গোপাল মণ্ডল ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তার পরিচিতি রয়েছে। তবে বাকি চারজন রাজনীতিতে একেবারেই অপরিচিত। তারা প্রত্যেকেই এবার প্রথম সংসদ নির্বাচন করছেন। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সাবেক সচিব।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচন করছি। আমাকে ডামি প্রার্থীও বলা যাবে। এটা দলীয় নির্দেশেই হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, ‘দল আমাকে আবারও সুযোগ দিয়েছে। আমি দলের সম্মান রাখব বলে আশাবাদী।’
তবে বাকি চার প্রার্থীর তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। জাতীয় পার্টীর কাজী হাসানুর রশিদ ও তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিকের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
আর জাকের পার্টি মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলেছে, তাই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’
অন্যদিকে খুলনা-২ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৯ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, গণতন্ত্র পার্টির মো. মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার, জাকের পার্টির ফরিদা পারভিন, ইসলামী ঐক্যজোটের হিদায়েতুল্লাহ, জাতীয় পার্টির মো. গাউসুল আজম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের বাবু কুমার রায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাঈদুর রহমান।
এদের মধ্যে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তবে বাকিদের আগে কখনো রাজনৈতিক মাঠে দেখা যায়নি।
কেন প্রার্থী হয়েছেন- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার বলেন, ‘অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন জমা দেয়া হচ্ছে, তাই আমরাও দিচ্ছি।’
খুলনা-৩ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের এস এম কামাল হোসেন, জাকের পার্টির এস এম সাব্বির হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাইজার আহমেদ ও ফাতেমা জামান সাথী।
এদের মধ্যেও শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। তিনি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তিন বারের সংসদ সদস্য ও দুই বারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানকে সরিয়ে তাকেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে। তবে ওই আসনেরও বাকি চারজনের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই।
খুলনা-৪ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন ১৪ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী, জাকের পার্টির শেখ আনছার আলী, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম আজমল হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. ফরহাদ আহমেদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মোস্তাফিজুর রহমান, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনিরা সুলতানা, ইসলামী ঐক্যজোটের রিয়াজ উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জুয়েল রানা, এম ডি এহসানুল হক, মো. রেজভী আলম, এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারা, আতিকুর রহমান ও এইচ এম রওশান জমির।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী বর্তমান সংসদ সদস্য। ২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি জয়ী হয়েছিলেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। তিনি ওই আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার আপন ভাই।
তিনি বলেন, এলাকার মানুষের দোয়া নিয়ে মাঠে নেমেছি। জয়-পরাজয় এলাকার মানুষই নির্ধারণ করবেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই আসনে আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এলাকার ভোটাররা বলছেন, বাকি ১২ জন প্রার্থীদের নাম খুব একটা শোনেননি তারা। কেউ কেউ একেবারেই অপরিচিত।
খুলনা-৫ আসনের জন্য মনোনয় জমা দিয়েছেন ৭ জন। তারা হলেন- জাতীয় পার্টির মো. শহীদ আলম, জাকের পার্টির সামাদ সেখ, আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ সেলিম আকতার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের এস এম এ জলিল, ইসলামী ঐক্যজোটের তরিকুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন।
এদের মধ্যে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ একাধিক বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। এ ছাড়া আকরাম হোসেন ফুলতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এই আসনেও আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। বাকি যারা প্রার্থী হয়েছেন এলাকার রাজনীতিতে তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই বলে জানা গেছে।
খুলনা-৬ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১২ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মো. রশীদুজ্জামান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. আবু সুফিয়ান, জাকের পার্টির শেখ মর্তুজা আল মামুন, জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধু, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মির্জা গোলাম আজম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম নেওয়াজ মোরশেদ, তৃণমূল বিএনপির গাজী নাদীর উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম রাজু, গাজী মোস্তফা কামাল, জি এম মাহবুবুল আলম, মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর ও মো. অহিদুজ্জামান মোড়ল।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মো. রশীদুজ্জামানের কোনো দলীয় পদ নেই। তিনি একসময় পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জামানত হারিয়েছিলেন। তবে তাকেই মনোনয়ন দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে ক্ষমতাসীন দল। ওই আসনে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত রয়েছে জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধুর। তিনি আগেও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। বাকি প্রার্থীদের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। এলাকার সবার কাছে পরিচিত মুখও নন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ আসনেই ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের স্থানীয়রা তেমন একটা চেনেন না। তবে বিরোধীদের এক অংশ নির্বাচন বর্জন করায় রাজনীতির নতুন সমীকরণ মেলাতে ছোট দলগুলোই নির্বাচনে হতে যাচ্ছে বড় দলগুলোর সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনীযুদ্ধ পার হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।
জাসদের মাঠপর্যায়ের এক রাজনীতিবিদ জসিম মণ্ডল বলেন, ‘নির্বাচন একটা বড় খেলা। এখানে সবাই নামে নিজ নিজ সমীকরণ মেলানোর জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সমীকরণ হয় এক ধরনের, আবার প্রার্থীর সমীকরণ হয় আরেক ধরনের। সবাই নির্বাচনে জয়ী হতে যেমন অংশ নেয় না তেমনই কেউ কেউ নির্বাচনে যায় অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে। আবার অনেকের কাছে ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণই বড় কথা।’ জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয় এ সময় পোস্টারিং করে নিজের ছবি ও পরিচিতি পুরো এলাকার মানুষকে দেখানো যায়। এটাও বা কম কিসে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই আছে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার। তাই কটা টাকা খরচ করে অনেকেই পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ নেয়। এর ফল তো অসীম-সারাজীবন নানাভাবে এর সুফল মেলে। যারা রাজনীতিতে আছেন, কেবল তারাই বোঝেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারার গুরুত্ব।
সরকারের বেঁধে দেওয়া হার্টের (হৃদরোগ) ২৯ ধরনের রিংয়ের (স্টেন্ট) দাম বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ)। হৃদরোগের চিকিৎসা দেওয়া হাসপাতালগুলোকে নতুন দামে রিং বিক্রির বিষয়ে চিঠি দিয়েছে নিয়ন্ত্রণক সংস্থাটি।
মঙ্গলবার ডিজিডিএ’র মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত হওয়া নতুন দামে এক হাজার থেকে শুরু করে ৪৮ হাজার টাকা পর্যন্ত কমেছে স্টেন্টের (রিং) দাম।
চিঠিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বিশেষজ্ঞ কমিটির পঞ্চম ও ষষ্ঠ সভায় সুপারিশের আলোকে স্টেন্টের (রিং) দাম পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর গত ১৩ মে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় কিছু প্রতিষ্ঠানের মূল্য পুনর্বিবেচনার আবেদন পর্যালোচনা করে নতুন দাম চূড়ান্ত করা হয়।
নির্দেশনা বলা হয়েছে, স্টেন্টসমূহের (রিং) হালনাগাদ মূল্য তালিকা সর্বসাধারণের অবগতির জন্য সংশ্লিষ্ট সকল হাসপাতালের নোটিশ বোর্ডে উম্মুক্ত স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য অনুসরণ করে ক্রয় ও বিক্রয় করতে হবে। তবে কোনোভাবেই চিকিৎসা প্যাকেজের মধ্যে এই মূল্য অন্তভু©ক্ত করা যাবে না।
পাশাপাশি স্টেন্টের (রিং) নাম, সর্বোচ্চ মূল্য ও উৎপাদনকারীর নাম উল্লেখসহ পৃথক ক্যাশমেমো প্রদান করতে হবে। এছাড়াও ব্যবহৃত স্টেন্টের প্যাকেটটি রোগীকে সরবরাহের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং ধারাবাহিক উচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদারের ব্যাপারে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত বোরিস ভ্যান বোমেল-এর সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
এ সময় বাংলাদেশে সফররত ডাচ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও ওশেনিয়াবিষয়ক পরিচালক ডমিনিক কুলিং উপস্থিত ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায়, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক উত্তরণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিল্প খাতের টেকসই উন্নয়ন, কৃষি এবং পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার প্রশংসা করেন।
উভয় পক্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ, প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অভিবাসন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং শিক্ষা, ক্রীড়া ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
এ ছাড়াও, তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বহুপক্ষীয় বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন। উভয় পক্ষই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় ফোরামে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার অংশীদারিত্বকে আরও জোরদার করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি নেদারল্যান্ডসের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
এর আগে, সফররত ডাচ প্রতিনিধিদল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মু. নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের যে ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই এখন সেই অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে নতুন মাত্রায় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যু প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান বলেন, ভারত বাংলাদেশকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে তিনি মনে করেন না। তার মতে, বিষয়টি মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রভাবও এর পেছনে থাকতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ও ভুয়া প্রচারণা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অনেক সময় কোনো ব্যক্তির নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করা হয়, এমনকি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ডও ছড়ানো হয়। এসব অপতৎপরতা মোকাবিলায় সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে এবং এ লক্ষ্যে আইনজীবীদের একটি প্যানেল গঠনের কাজ চলছে।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি দলীয় নয়, নির্দলীয় নির্বাচন হওয়ায় ব্যক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের কেউ অংশ নিলে সরকারের কোনো আপত্তি নেই। কারণ নির্বাচনে দলীয় পরিচয় বা পদ-পদবি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।
শিক্ষা খাতে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ অনার্স পর্যায় থেকে তুলে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিকেও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এসব বিভাগ অনার্স পর্যায়ে বহাল থাকবে। তবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একইভাবে চালু রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে। এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং বড় কলেজগুলোতে পর্যায়ক্রমে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
আসন্ন ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এবার অত্যন্ত নামমাত্র খরচে এই বৈশ্বিক টুর্নামেন্টটি সাধারণ মানুষের জন্য প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। সরকারের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে দেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এখন নির্বিঘ্নে বড় পর্দায় খেলা উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচারের আর্থিক দিকটি বিশ্লেষণ করে তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় ফিফার সাথে ৩ দশমিক ৮৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ভ্যাট ও আয়করসহ এর মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। তবে জনগণের জন্য স্বস্তির খবর হলো, এই বিশাল অংকের টাকা বিটিভিকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে দিতে হবে না। সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন টেলিকম অপারেটর, স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাছে বিজ্ঞাপন ও উপ-স্বত্ব বিক্রির মাধ্যমে প্রায় সব অর্থ তুলে আনতে সক্ষম হয়েছে। ফলে সরকারি খরচের বোঝা কমিয়ে নামমাত্র ব্যয়ে এই বিশ্ব আসর প্রচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী পূর্বের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে বলেন, অতীতে ফুটবল বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্ব নিয়ে নানাবিধ গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়েছিল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে বিটিভি প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল, যা নিয়ে স্বচ্ছতার বড় প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি এবারও একটি মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠান ফিফার কাছ থেকে স্বত্ব কিনে নিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা দাবি করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশে জনগণের অর্থের অপচয় রোধে সরকার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে তথ্য মন্ত্রণালয় সরাসরি ফিফার সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়ালকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে সফলভাবে চুক্তিটি সম্পন্ন করে।
সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ফিফার কাছ থেকে এই স্বত্ব কেনার প্রস্তাবটি গত রোববার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে অনুমোদিত হয়। তথ্য প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, এই ম্যারাথন মিটিং ও দীর্ঘ দরকষাকষির মূল উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ করা এবং জনগণের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কুচক্রী মহলের প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে বিটিভি এখন এককভাবে এই সম্প্রচার অধিকার অর্জন করেছে, যা দেশের সরকারি প্রচারমাধ্যমের সক্ষমতার একটি বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আগামী ১১ জুন থেকে উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর ১৬টি শহরে শুরু হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর। ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলা এই ফুটবল মহাযজ্ঞে অংশ নেবে বিশ্বের সেরা সব ফুটবল দল। দীর্ঘ ৩৯ দিনের এই আসরটি বিশ্বজুড়ে ফুটবল উন্মাদনা ছড়িয়ে দেবে। দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের দোরগোড়ায় এই আনন্দ পৌঁছে দিতে বিটিভি এখন কারিগরি ও প্রশাসনিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত। ১১ জুন উদ্বোধনী ম্যাচ থেকেই সরাসরি সম্প্রচার শুরু হবে বলে তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে তৈরি হওয়া সব ধূম্রজাল ও সংশয় কেটে গেছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি এবং স্বত্বাধিকারী অন্যান্য মাধ্যমে দেশের ফুটবলপ্রেমী মানুষ এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে দর্শকদের সুবিধার্থে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্পটে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ সম্প্রচার বিষয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।
ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা ও পাগলামি সর্বজনবিদিত। বেশ কিছুদিন ধরে খেলা সম্প্রচার নিয়ে একটি ধূম্রজাল তৈরি হয়েছিল, যা আজ পুরোপুরি নিরসন করা হলো। বিটিভির মাধ্যমে এবং যারা স্বত্ব নিয়েছে, তাদের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষ বিশ্বকাপ ফুটবল দেখতে পারবেন।’
বিশ্বকাপের খেলাগুলোর সময়সূচি মধ্যরাত কিংবা ভোরে হওয়ার কারণে দর্শকদের জন্য বড় পর্দায় খেলা দেখানোর বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘বেশ কিছু বেসরকারি কোম্পানি ইতোমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। খেলা দেখানোর টাইমটা এবার মধ্যরাতে কিংবা ভোরে হয়ে গেছে। তাই প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে আমরা উৎসাহিত করেছি, পাশাপাশি আমাদের সার্বিক সহযোগিতা থাকবে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্পটে তারা বড় বড় মনিটর ও ডিজিটাল বিলবোর্ড দিয়ে খেলাগুলো সরাসরি দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করবে।’
সম্প্রচার প্রক্রিয়ার অভাবনীয় স্বচ্ছতা ও সরকারের সাশ্রয়ী নীতির কথা উল্লেখ করে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের আমলে যেখানে ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্ব কেনা হয়েছিল, সেখানে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে মাত্র ৪৭ কোটি টাকায় এই স্বত্ব কিনেছে।
আমিনুল হক বলেন, এই ৪৭ কোটি টাকাও আবার বিভিন্ন বিজ্ঞাপন স্বত্ব (এডভারটাইজমেন্ট রাইটস) বিক্রির মাধ্যমে উঠে আসবে, যার ফলে সরকারি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অবস্থান বজায় রেখে এই সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
দেশের সব ফুটবলপ্রেমীকে এই আনন্দের অংশীদার করতে এবং সরকারের এই যুগান্তকারী ও স্বচ্ছ উদ্যোগটি জনগণের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন প্রতিমন্ত্রী।
জাতীয় নারী ফুটবল দলের অন্যতম খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমার জন্য নতুন গৃহ নির্মাণের লক্ষ্যে বিশেষ আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের কার্যালয়ে বাজেট অধিবেশনের বিরতির সময় এই ফুটবলারের হাতে অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন সরকারপ্রধান। এই অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দীন, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য যে, ঋতুপর্ণা চাকমা ও তাঁর পরিবারের কঠিন সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পূর্বেই পাশে দাঁড়িয়েছিল। ২০২৫ সালে ঋতুপর্ণার ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের সুচিকিৎসার জন্য তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সহায়তার উদ্যোগ নেয়। সে সময় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এবং ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ঋতুপর্ণার বাসগৃহে গিয়ে তাঁর মায়ের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদান প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত এই সভায় নতুন ও সংশোধিত মিলিয়ে মোট ১২টি প্রকল্প উপস্থাপিত হয়েছিল। বর্তমান সরকারের এটি চতুর্থ একনেক সভা এবং চলতি অর্থবছরের ১২তম বৈঠক। সভার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা বজায় রাখতে প্রকল্পগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জনকল্যাণমূলক কাজে গতি আনার নির্দেশ দেন।
অনুমোদিত ১০টি প্রকল্পের জন্য মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮৯০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের মধ্যে ৩ হাজার ৮১০ কোটি ৬২ লাখ টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে এবং বাকি ৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকা প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন থেকে আসবে। গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৫টি সম্পূর্ণ নতুন, ৩টি সংশোধিত এবং ২টির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
ভৌত অবকাঠামো এবং জনকল্যাণমূলক কাজের মধ্যে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরিশাল সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের জন্য একটি আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প একনেকের অনুমোদন পেয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজও এই সভায় সবুজ সংকেত পেয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার সিএমএইচ-এ একটি অত্যাধুনিক ক্যান্সার সেন্টার নির্মাণের সংশোধিত প্রস্তাবটিও সভায় গৃহীত হয়েছে।
শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতের আধুনিকায়নেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে আজকের সভায়। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের লক্ষ্যে এমইএমআইএস সাপোর্ট প্রকল্প এবং দেশের ৬৫৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের সংশোধিত প্রকল্প দুটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে বিদ্যমান গ্রিড উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইনের ক্ষমতা বর্ধনের একটি প্রকল্পও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও দেশের ৩৩টি জেলার সার্কিট হাউজ এবং ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আধুনিক লিফট সংযোজনের মাধ্যমে নাগরিক সেবা সহজ করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প পাস হয়েছে।
সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্য ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিমন্ত্রীগণ উপস্থিত ছিলেন। মূল ১০টি প্রকল্পের পাশাপাশি পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক ইতোমধ্যেই অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় সম্বলিত আরও ৬টি প্রকল্প সম্পর্কে সভাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন পৌরসভায় পানি সরবরাহ, ঢাকার যানজট নিরসন এবং ডাকসেবার আধুনিকায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে সভাটি সমাপ্ত হয়।
বাংলাদেশ ইনসিওরেন্স একাডেমিতে গতকাল (৮-১০ জুন ২০২৬) থেকে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মানব সম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় “Insurance & Insurance Practices in Contract Management” বিষয়ক ৩ দিনব্যাপী এক শর্ট কোর্স শুরু হয়েছে। আগামী ১০ জুন ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত এই বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
আজ সকালে আয়োজিত উক্ত প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক জনাব মোহাম্মদ আবদুর রউফ। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ও অতিরিক্ত সচিব জনাব আলতাফ হোসেন সেখ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইনসিওরেন্স একাডেমির পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) জনাব মো: জাকির হোসেন চৌধুরী।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেতু সচিব জনাব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, দেশের বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নে চুক্তি ব্যবস্থাপনা (Contract Management) এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিমা ঝুঁকি ও তার প্রায়োগিক দিকগুলো সঠিকভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাগণ আধুনিক চুক্তি ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষ ও সক্ষম হয়ে উঠবেন, যা টেকসই অবকাঠামো বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ও অতিরিক্ত সচিব জনাব আলতাফ হোসেন সেখ কর্মকর্তাদের এই প্রশিক্ষণের লব্ধ জ্ঞানকে কর্মক্ষেত্রে যথাযথভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে জনাব মো: জাকির হোসেন চৌধুরী প্রশিক্ষণার্থীদের স্বাগত জানান এবং চুক্তি ব্যবস্থাপনায় বিমার আইনি ও প্রায়োগিক দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
৩ দিনব্যাপী আয়োজিত এই শর্ট কোর্সে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ অংশগ্রহণ করছেন। প্রশিক্ষণে চুক্তি ব্যবস্থাপনায় বিমার প্রয়োজনীয়তা, বিভিন্ন ধরনের বিমা পলিসি, দাবি উত্থাপন ও নিষ্পত্তি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সমসাময়িক বৈশ্বিক ও দেশীয় অনুশীলনসমূহ নিয়ে বিস্তারিত সেশন পরিচালিত হবে।
মস্কোতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ বৈঠকে জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিক্ষা খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। সোমবার মস্কোয় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সম্পন্ন হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই ড. খলিলুর রহমানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তিন দিনের সরকারি সফরে তিনি বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন।
বৈঠকে সের্গেই লাভরভ ড. খলিলুর রহমানকে ইউএনজিএ সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “আমরা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের বাস্তবমুখী ফলাফলের অপেক্ষায় আছি।” তিনি জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করতে এবং বৈশ্বিক বিষয়াদিতে এর কেন্দ্রীয় ভূমিকা সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টায় রাশিয়ার পূর্ণ সমর্থনের আশ্বাস দেন। লাভরভ আরও উল্লেখ করেন যে, “উভয় দেশই দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সুসম্পর্ক বজায় রেখে আসছে” এবং আগামী জানুয়ারিতে দুই দেশের সম্পর্কের ৫৫তম বার্ষিকী বাণিজ্য, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে উদযাপিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই দেশের স্থিতিশীল সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমাদের দু’দেশের মধ্যে স্থিতিশীলভাবে রাজনৈতিক সংলাপ বিকশিত হচ্ছে।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেন। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন, বিশেষ করে স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম বন্দর মাইনমুক্ত করতে সোভিয়েত নৌবাহিনীর অবদানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “বাণিজ্য, শিক্ষা, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাতে আমাদের সম্পর্কের সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে এবং আমরা এই ক্ষেত্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে চাই।” রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে দুই দেশের বর্ধমান অংশীদারিত্বের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে অভিহিত করে তিনি প্রকল্পটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। মস্কো এই সফরের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন। এক দশক ধরে দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি ও কারিগরি খাতে যে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে বলে উভয় পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
স্থবিরতা কাটিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গতি ফেরাতে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ করতে করতে আগামী বাজেটে একগুচ্ছ কর্মকৌশল ও পরিকল্পনা থাকছে। যেসব ব্যবসায় লাইসেন্স ও পারমিশন লাগে, সেগুলো খুব সহজে এবং অল্প সময়ে পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে– কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস বা ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমাতে ডি-রেগুলেশনের অংশ হিসেবে এ ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার। এছাড়া বিদ্যমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইভি ও ইভির চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও বড় ধরনের ছাড়। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে বড় ধরনের কর সুবিধা দেওয়া হতে পারে আগামী বাজেটে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, নতুন লাইসেন্স বা ব্যবসা সম্প্রসারণের অনুমোদন চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদন জমা দেওয়ার সাত দিনের মধ্যে সাময়িক বা অন্তর্বর্তীকালীন অনুমতি (প্রভিশনাল পারমিশন) পেয়ে যাবে। আর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত লাইসেন্স দিতে ব্যর্থ হলে—ওই ব্যবসায়ীকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলে গণ্য হবে। যা প্রচলিত নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি ও অনুশীলনে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন। এছাড়া, বছর বছর বিভিন্ন লাইসেন্স ও পারমিশন নবায়ন করার ঝামেলা থেকে ব্যবসায়ীদের রেহাই দিতে সব ধরনের লাইসেন্স ও অনুমতির মেয়াদ ৫ বছর করার ঘোষণা থাকছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে।
বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিরেগুলেশন, সংস্কারের পদ্ধতি প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও কর ছাড় দেওয়ার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশি ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীদের জন্য অযথা বিলম্ব কমানো, নথিপত্রের পুনরাবৃত্তি দূর করা এবং সামগ্রিক অনুমোদন প্রক্রিয়াকে সহজ ও গতিশীল করার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপগুলোর নকশা করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং এর মাঠ পর্যায়ের কার্যালয়গুলোর পূর্ণাঙ্গ অটোমেশনসহ কর প্রশাসনের আধুনিকায়নে ধারাবাহিক কিছু সংস্কার এই বাজেটে অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে কর রেয়াত বা ট্যাক্স রিফান্ডের টাকা সরাসরি করদাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা (ক্রেডিট) হবে এবং ব্যাপকভিত্তিক এই অটোমেশনের ফলে কর ব্যবস্থার প্রশাসনিক বিলম্ব ও হয়রানি হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি এক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমলাতান্ত্রিক জটিলতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে যত রকমের বাধা সৃষ্টি করা যায়, সরকারি কর্মকর্তারা এখন তাই করছেন।
আগামী অর্থবছর থেকেই এই সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার কাজ শুরু উল্লেখ করে তিনি জানান, কোম্পানিগুলোকে প্রয়োজনীয় সব পারমিটের জন্য আবেদন করতে হলেও, এখন থেকে তারা একটি মাত্র ওয়ান-স্টপ বা সিঙ্গেল এন্ট্রি পয়েন্টের মাধ্যমে তা করতে পারবে। একইসঙ্গে প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে একটি কঠোর সময়সীমার মধ্যে তা দিতে বাধ্য করা হবে। আসন্ন বাজেটে এই সময়সীমাগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিশেষ বা স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা খর্ব করা হবে বলে জানান আমির খসরু।
তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য যেসব উদ্যোগ : ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত হতে পারে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এই সীমা ৭০ লাখ টাকা হতে পারে। স্টার্টআপ, ইনোভেশন ভেঞ্চার ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসার ক্ষেত্রে ৯ বছরের জন্য কর অব্যাহতি আসতে পারে।
কর প্রদানে হয়রানি কমাতে উদ্যোগ: ডিরেগুলেশনের অংশ হিসেবে কর দেওয়ার সময় ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমাতে—অনলাইনে করপোরেট ট্যাক্স রিটার্ন ফাইলিং চালু করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। একইসঙ্গে ই-রিটার্ন দাখিল সুবিধা চালু করতে মোবাইল এপ্লিকেশন চালু করবে এনবিআর।
ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের জন্য বছরজুড়েই রিটার্ন দাখিলের সুযোগ থাকবে—যারা আগে রিটার্ন জমা দেবেন তারা প্রণোদনার যোগ্য বিবচিত হবেন। পক্ষান্তরে, যারা রিটার্ন জমা দিতে দেরি করবেন তাদের অতিরিক্ত কর দায়ের মুখে পড়তে হবে।
আসন্ন বাজেটে স্পট অ্যাসেসমেন্ট-এর সময় এনবিআর করযোগ্য ব্যবসায়িক আয়ের চারগুণ পর্যন্ত প্রাথমিক মূলধন (অ্যালাউন্স) প্রদানের সুযোগ দিতে পারে এনবিআর। এর ফলে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে এবং ব্যবসার আনুষ্ঠানিকীকরণ বাড়বে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে কর প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি যত ধরনের বাধা আছে প্রায় সবই দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে আগামী বাজেটে।
বিদ্যমান জ্বালানি সংকট ও অনিশ্চয়তায় ইভি ও ইভির চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হতে পারে। এছাড়া ইভি রেজিস্ট্রেশন ফি বর্তমানে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আছে, যা কমিয়ে অর্ধেক করা হতে পারে।
অন্যদিকে শোধনাগারের জ্বালানি সরবরাহের ওপর উৎসে কর ১.৫ শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশ, মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশ ও প্যাকেজিং উপাদানের ওপর কর ৫ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশ হতে পারে। একইভাবে পরিবহন, পণ্য বহন ও ভেহিক্যাল রেন্টাল সার্ভিসে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে।
শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। এক্ষেত্রে বিদ্যমান অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সরবরাএর ক্ষেত্রেও একই হারে কমতে পারে। অনাবাসীদের (নন-রেসিড্যান্টদের) সরবরাহ করা যন্ত্রপাতির ওপর বিদ্যমান উৎসে কর ১৫ শতাংশ থেকে কইএ অর্ধেক করা হতে পারে। অনাবাসীদের পরিশোধ করা বিমা প্রিমিয়ামের উৎসে করও অর্ধেক করা হতে পারে।
একইভাবে অফশোর উৎস থেকে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে উৎসে কর ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে। বর্তমানে এ কর ২০ শতাংশ থাকলেও বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এনবিআর অব্যাহতি দিয়ে রেখেছে।
এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগে বড় ধরনের কর সুবিধা দেওয়া হতে পারে আগামী বাজেটে। এ খাতে বিনিয়োগকারীদের আয় ৩৫ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ কর অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে। সৌবিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্যও কর রেয়াত থাকতে পারে।
রাজস্বসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হতে পারে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকে সহজ ও দ্রুত করতে শর্ত সহজ করা হতে পারে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, অগ্রিম আয়কর ও উৎসে কর কমানো এবং অন্যান্য ব্যবসার বাধা অপসারণের যেসব কথা শোনা যাচ্ছে, তা যদি সঠিকভাবে বাজেটে প্রতিফিলতি হয় এবং মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে ব্যবসা ও বিনিয়োগের বড় সহায়ক হবে। তবে এনবিআর কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম যদি সরকারের নীতিগত নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে এসব উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও পাওয়া যেতে পারে।
আজকের প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার জন্য উদ্ভাবনী ও টেকসই উৎপাদন পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমানে ভোক্তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা শুধু পণ্যের গুণগত মানই নয়, বরং উৎপাদনের নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং পরিবেশের ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নেন। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের উদ্ভাবনী ও টেকসই উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরি।
সোমবার (৮ জুন) ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘বিশ্ব অ্যাক্রেডিটেশন দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে এ কথা বলেছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে লিখেন, বিশ্ব অ্যাক্রেডিটেশন দিবস প্রতি বছর আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পণ্য ও সেবার নিরাপত্তা, গুণগত মান এবং আস্থার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাক্রেডিটেশন ফোরাম (আইএএফ) এবং ইন্টারন্যাশনাল ল্যাবরেটরি অ্যাক্রেডিটেশন কো-অপারেশন (আইএলএসি) প্রতি বছর ৯ জুন বিশ্ব অ্যাক্রেডিটেশন দিবস হিসেবে পালন করে। তিনি লিখেন, দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘Innovation, Trust and Sustainability: The Power of Accreditation’, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। বর্তমান বিশ্বে উদ্ভাবন, আস্থা এবং টেকসই উন্নয়ন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। এ প্রেক্ষাপটে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) কর্তৃক বিশ্ব অ্যাক্রেডিটেশন দিবস ২০২৬ উদযাপনের উদ্যোগ সময়োপযোগী।
তিনি আরও লিখেন, অ্যাক্রেডিটেশন একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা, যা নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে পণ্য ও সেবার গুণগত মান যাচাই করে। অ্যাক্রেডিটেশন কেবল একটি সনদ বা স্বীকৃতি নয়, এটি দেশের শিল্প খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে বিএবি বাংলাদেশের পণ্য ও সেবাকে বিশ্ববাজারে আরও গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। এ পর্যন্ত বিএবি দেশে ১৬৮টি সরকারি, বেসরকারি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে অ্যাক্রেডিটেশন সনদ প্রদান করেছে। বর্তমানে পাঁচটি ক্ষেত্রভিত্তিক স্কিমের মাধ্যমে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী লিখেন, আমি আশা করি, ‘বিশ্ব অ্যাক্রেডিটেশন দিবস ২০২৬’ দেশের মান অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে এবং উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে আরও ত্বরান্বিত করবে। আমি ‘বিশ্ব অ্যাক্রেডিটেশন দিবস ২০২৬’-এর সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের ওষুধশিল্প বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্থানীয়ভাবে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করা গেলে দেশের ওষুধ রপ্তানির পরিসর আরও বিস্তৃত হবে।
তিনি জানান, অতীত সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম ও টিকা উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অগ্রগতি হয়নি। এমনকি ভেন্টিলেটর ও সিরিঞ্জের মতো জরুরি চিকিৎসা উপকরণেরও ঘাটতি ছিল। তবে পরবর্তীতে বেসরকারি খাতের সহযোগিতায় স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রী বলেন, রোগীদের চিকিৎসা সহায়তায় বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতি এক লাখ ইউনিট শিরাপথে প্রয়োগযোগ্য স্যালাইন অনুদান দিয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় মজুতাগারে এক লাখ স্যালাইন সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়েও ২০ থেকে ২৫ হাজার ইউনিট স্যালাইন মজুত আছে। প্রয়োজন হলে আরও সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি রয়েছে।
আদ-দ্বীন হাসপাতালে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিতে আরও দুই দিন সময় দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জবাব না পেলে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, ডেঙ্গুর মৌসুম সামনে রেখে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আক্রান্তের হার কমাতে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি জানান, ডেঙ্গুরোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিতে স্বাস্থ্য খাত সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণসহ স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, ভারতের পুশইন বিজিবি শক্তভাবে প্রতিহত করছে এবং পুশইন বন্ধে ভারত সরকারকে ১২ থেকে ১৩টি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। সোমবার (৮ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘যারা অবৈধ, তাদের ফেরত দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া আছে। সেই প্রক্রিয়া মেনেই ভারতকে কাজ করতে হবে।’ পুশইন দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে প্রভাব ফেলবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সম্প্রতি ভারত থেকে অবৈধভাবে বাংলা ভাষাভাষী লোকজনকে বাংলাদেশে পুশইন করার ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কর্তৃক নারী, শিশুসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানো ঠেকাতে বাংলাদেশের ২৬টি জেলার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। রাত-দিন বিজিবি সদস্যরা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। স্থানীয় জনগণও তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।
এদিকে গতকাল সোমবার থেকে আগামী ১১ জুন পর্যন্ত ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলন শুরু হয়েছে।
বিজিবি জানিয়েছে, সম্মেলনে অবৈধ পুশইন, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পাবে।