আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩২টি দল। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ৭৪৭ জন। সে হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যয়নপত্র নিয়ে নির্বাচনে উপস্থিত ১৯৬৬ জন প্রার্থী। আর স্বতন্ত্রদের মধ্যে অন্তত ৪০০ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নির্বাচনে আসা বড় দল আওয়ামী লীগের মূল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাইরে অন্যদলগুলোর বেশির ভাগ প্রার্থীই আসনগুলোর মানুষের কাছে অচেনা। প্রায় প্রতিটি আসনেই নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন এমন অনেক অচেনা মুখ যাদের প্রার্থিতা পেতে সমস্যা না হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরিচিত হতেই পার হয়ে যাবে প্রচারণার বেশির ভাগ সময়। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নির্বাচনে প্রার্থী আছে অনেক বেশি, কিন্তু, প্রতিদ্বন্দ্বী কম।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ৩০০ আসনের বিপরীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (নৌকা) ৩০৩ জন, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ৩০৪ জন, জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল) ২১৮ জন, তৃণমূল বিএনপি (সোনালী আঁশ) ১৫১ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি (আম) ১৪২ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) ১১৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (মশাল) ৯১ জন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) ৪৭ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ) ১৩ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি (হাতঘড়ি) ১৮ জন, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) ৩৯ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল) ১৩ জন, গণফ্রন্ট (মাছ) ২৫ জন, গণফোরাম (উদীয়মান সূর্য) ৯ জন, ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার) ৪৫ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি) ৩৭ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি (বাইসাইকেল) ২০ জন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা) ৩৪ জন, গণতন্ত্রী পার্টি (কবুতর) ১২ জন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ি) ৩৩ জন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (কুলা) ১৪ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা) ৮২ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (নোঙর) ৪৯ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট- বিএনএফ (টেলিভিশন) ৫৫ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (ছড়ি) ৭৪ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল (হাত-পাঞ্জা) ৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (কুঁড়েঘর) ৬ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মই) একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা) একজন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (খেজুর গাছ) একজন এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (হারিকেন) দুইজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
এদিকে মনোনয়ন জমার শেষ দিনেই ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে বিএনপিসহ যে দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে তাদের আর মত পাল্টে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসার দৃশ্যমান কোনো সুযোগ নেই। আন্দোলনরত দলগুলোও অবশ্য আগেই এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছে।
ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে যেসব প্রার্থী টিকে যাবেন তারাই থাকবেন নির্বাচনী দৌড়ে। তবে প্রতিটি আসনে ভোটের লড়াইয়ে যারা যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগেরই দলের নাম সাধারণ মানুষ জানে না। আর দল অচেনা বলে প্রার্থীরাও অচেনা। ফলে তাদের ধারণা নির্বাচনী লড়াইয়ে আসলে টিকে থাকবেন বড় দলের পরিচিত মুখগুলো। এর মধ্যে শাসক দলের মার্কা নিয়ে লড়াই করা প্রার্থীরা যেমন আলোচনায় থাকবেন, তেমনই অনেক আসনেই তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমাতে পারেন নির্বাচনে আসা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। কেননা, দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশির ভাগই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং তাদের মোটামুটি ভোট ব্যাংক অথবা এলাকাবাসীকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রয়েছে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ৪০০ জনই আওয়ামী লীগের।
যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত কয়েক দিনের মতো গতকালও বলেছেন, দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ঢালাওভাবে নির্বাচন করতে পারবেন না। এ ছাড়া ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সম্ভাবনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন জোটের এমন প্রার্থীরাই কেবল থাকবেন বিবেচনায়। আর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এর ফলে এটা স্পষ্ট যে, জোটের সঙ্গে সমঝোতা হলে কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাদেরও রণে ভঙ্গ দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এবার দলীয় মার্কার বাইরে দলীয় প্রার্থীদের স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়ায় নির্বাচনে আসা প্রার্থীদের কতজন আবার দল চাইলে নির্দেশ মেনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন সেটাও আছে দেখার বিষয়।
তবে এই আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ প্রার্থী যারা বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে এলেও জনগণের কাছে নিজের দল, দলীয় প্রতীক এবং নিজের পরিচয় প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন। তবে প্রতিটি আসনে স্থানীয় ভোটারদের কাছে তারা এখনো অচেনা এবং নতুন মুখ হিসেবে বিবেচিত।
যেমন দল হিসেবে এবারই প্রথম নির্বাচন করছে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। এসব দলের বেশির ভাগ প্রার্থী নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের কাছে নতুন পরিচয়ে উপস্থিত হবেন। অনেকে আবার খুব বেশি পরিচিত নন। একইভাবে তাদের নির্বাচনী প্রতীক যথাক্রমে সোনালী আঁশ, নোঙর ও একতারা চেনাতেও এবার তাদের বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনএমের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৬ জন এবং তৃণমূলের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৫ জন।
এদিকে, গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর কাদের বলেছেন, বিএনপির ১৫ কেন্দ্রীয় নেতাসহ সাবেক ৩০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো নেতাও আছেন। আবার আগে বিএনপিতে প্রভাব ছিল দলটির এমন সাবেক নেতারাও আছেন নির্বাচনে। এদের মধ্যে তৈমূর আলম, সমশের মবিন চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।
তবে এদের বাইরে নির্বাচনের মাঠে থাকা বেশির ভাগ প্রার্থীই অচেনা। এ বিষয়ে গাজীপুর-৪ আসনের একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার দল এলাকায় তেমন পরিচিত নয়। দলের প্রচার চালাতে ও এলাকার মানুষের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে এবার ভোট করতে আসা। আমিও জানি নির্বাচনে জয়লাভ করার অবস্থান এখনো আমার বা আমার দলের তৈরি হয়নি। তবে এক দিনে তো কিছুই হয় না। আমাদের দলের আদর্শ ও কর্মসূচি দেশের মানুষ ও এলাকার মানুষকে জানাতে আমরা নির্বাচনে এসেছি।’
অন্যদিকে লালমনিরহাট-৩ আসনে মনোনয়ন জমা দেয়া প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সদর আসনে ৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদ্য পদত্যাগকারী সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জাবেদ হোসেন বক্কর, জাতীয় পার্টি থেকে জাহিদ হাসান, তৃণমূল বিএনপি থেকে শামীম আহম্মেদ চৌধুরী, জাকের পার্টি থেকে সকিউজ্জামান মিয়া, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল থেকে আশরাফুল আলম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে আবু তৈয়ব মো. আজমুল হক পাটোয়ারী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) থেকে শ্রী হরিশ চন্দ্র রায় মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তবে এবার তিনি এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। ফলে এ আসনে নির্বাচনে অংশ নেয়া সব প্রার্থীই নতুন এবং নতুন একজন সংসদ সদস্য পাবে লালমনিরহাট সদরবাসী। তবে নতুন হলেও জেলা ও শহরের রাজনীতিতে পুরনো মুখ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। ছাত্ররাজনীতি করায় জাবেদ হোসেন বক্করও সেখানে পরিচিত মুখ। জাকের পার্টি ও জাসদের প্রার্থীকেও অনেকে চেনেন। তবে সাম্যবাদী দল, এনপিপির প্রার্থীর মতো জাতীয় পার্টির প্রার্থীও এলাকার সবার চেনা মুখ নন। ফলে যে আসন থেকে জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে সেখানে নতুন মুখ দেয়ায় মাঠের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন এলাকার অনেক বাসিন্দা।
বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ৬টি আসন বিশ্লেষণ করলে। দৈনিক বাংলার খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনার এই ৬টি আসনের জন্য সেখানে ৫৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করবেন, তাদের অধিকাংশেরই রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিচিতি নেই। হঠাৎ করেই তারা কেন সংসদ নির্বাচনে আগ্রহী হলেন, এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তরও দেননি অধিকাংশ প্রার্থী।
খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের মনোনীত ৬ জন প্রার্থী, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র ২ জন এবং জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বাকি ৪৪ জন প্রার্থী কখনো রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় ছিলেন না।
খুলনা প্রতিনিধির বিশ্লেষণ অনুযায়ী খুলনা-১ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৬ জন। তারা হলেন, জাকের পার্টির মো. আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল, জাতীয় পার্টির কাজী হাসানুর রশিদ, তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় ও আবেদ আলী শেখ।
এদের মধ্যে ননী গোপাল মণ্ডল ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তার পরিচিতি রয়েছে। তবে বাকি চারজন রাজনীতিতে একেবারেই অপরিচিত। তারা প্রত্যেকেই এবার প্রথম সংসদ নির্বাচন করছেন। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সাবেক সচিব।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচন করছি। আমাকে ডামি প্রার্থীও বলা যাবে। এটা দলীয় নির্দেশেই হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, ‘দল আমাকে আবারও সুযোগ দিয়েছে। আমি দলের সম্মান রাখব বলে আশাবাদী।’
তবে বাকি চার প্রার্থীর তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। জাতীয় পার্টীর কাজী হাসানুর রশিদ ও তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিকের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
আর জাকের পার্টি মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলেছে, তাই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’
অন্যদিকে খুলনা-২ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৯ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, গণতন্ত্র পার্টির মো. মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার, জাকের পার্টির ফরিদা পারভিন, ইসলামী ঐক্যজোটের হিদায়েতুল্লাহ, জাতীয় পার্টির মো. গাউসুল আজম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের বাবু কুমার রায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাঈদুর রহমান।
এদের মধ্যে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তবে বাকিদের আগে কখনো রাজনৈতিক মাঠে দেখা যায়নি।
কেন প্রার্থী হয়েছেন- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার বলেন, ‘অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন জমা দেয়া হচ্ছে, তাই আমরাও দিচ্ছি।’
খুলনা-৩ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের এস এম কামাল হোসেন, জাকের পার্টির এস এম সাব্বির হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাইজার আহমেদ ও ফাতেমা জামান সাথী।
এদের মধ্যেও শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। তিনি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তিন বারের সংসদ সদস্য ও দুই বারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানকে সরিয়ে তাকেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে। তবে ওই আসনেরও বাকি চারজনের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই।
খুলনা-৪ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন ১৪ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী, জাকের পার্টির শেখ আনছার আলী, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম আজমল হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. ফরহাদ আহমেদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মোস্তাফিজুর রহমান, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনিরা সুলতানা, ইসলামী ঐক্যজোটের রিয়াজ উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জুয়েল রানা, এম ডি এহসানুল হক, মো. রেজভী আলম, এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারা, আতিকুর রহমান ও এইচ এম রওশান জমির।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী বর্তমান সংসদ সদস্য। ২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি জয়ী হয়েছিলেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। তিনি ওই আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার আপন ভাই।
তিনি বলেন, এলাকার মানুষের দোয়া নিয়ে মাঠে নেমেছি। জয়-পরাজয় এলাকার মানুষই নির্ধারণ করবেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই আসনে আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এলাকার ভোটাররা বলছেন, বাকি ১২ জন প্রার্থীদের নাম খুব একটা শোনেননি তারা। কেউ কেউ একেবারেই অপরিচিত।
খুলনা-৫ আসনের জন্য মনোনয় জমা দিয়েছেন ৭ জন। তারা হলেন- জাতীয় পার্টির মো. শহীদ আলম, জাকের পার্টির সামাদ সেখ, আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ সেলিম আকতার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের এস এম এ জলিল, ইসলামী ঐক্যজোটের তরিকুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন।
এদের মধ্যে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ একাধিক বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। এ ছাড়া আকরাম হোসেন ফুলতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এই আসনেও আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। বাকি যারা প্রার্থী হয়েছেন এলাকার রাজনীতিতে তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই বলে জানা গেছে।
খুলনা-৬ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১২ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মো. রশীদুজ্জামান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. আবু সুফিয়ান, জাকের পার্টির শেখ মর্তুজা আল মামুন, জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধু, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মির্জা গোলাম আজম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম নেওয়াজ মোরশেদ, তৃণমূল বিএনপির গাজী নাদীর উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম রাজু, গাজী মোস্তফা কামাল, জি এম মাহবুবুল আলম, মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর ও মো. অহিদুজ্জামান মোড়ল।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মো. রশীদুজ্জামানের কোনো দলীয় পদ নেই। তিনি একসময় পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জামানত হারিয়েছিলেন। তবে তাকেই মনোনয়ন দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে ক্ষমতাসীন দল। ওই আসনে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত রয়েছে জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধুর। তিনি আগেও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। বাকি প্রার্থীদের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। এলাকার সবার কাছে পরিচিত মুখও নন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ আসনেই ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের স্থানীয়রা তেমন একটা চেনেন না। তবে বিরোধীদের এক অংশ নির্বাচন বর্জন করায় রাজনীতির নতুন সমীকরণ মেলাতে ছোট দলগুলোই নির্বাচনে হতে যাচ্ছে বড় দলগুলোর সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনীযুদ্ধ পার হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।
জাসদের মাঠপর্যায়ের এক রাজনীতিবিদ জসিম মণ্ডল বলেন, ‘নির্বাচন একটা বড় খেলা। এখানে সবাই নামে নিজ নিজ সমীকরণ মেলানোর জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সমীকরণ হয় এক ধরনের, আবার প্রার্থীর সমীকরণ হয় আরেক ধরনের। সবাই নির্বাচনে জয়ী হতে যেমন অংশ নেয় না তেমনই কেউ কেউ নির্বাচনে যায় অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে। আবার অনেকের কাছে ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণই বড় কথা।’ জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয় এ সময় পোস্টারিং করে নিজের ছবি ও পরিচিতি পুরো এলাকার মানুষকে দেখানো যায়। এটাও বা কম কিসে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই আছে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার। তাই কটা টাকা খরচ করে অনেকেই পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ নেয়। এর ফল তো অসীম-সারাজীবন নানাভাবে এর সুফল মেলে। যারা রাজনীতিতে আছেন, কেবল তারাই বোঝেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারার গুরুত্ব।
জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে বিশ্বখ্যাত জাপানি স্থপতি তাদাও আন্দোর অনন্য স্থাপত্যশৈলীতে একটি আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন শিশু গ্রন্থাগার বা বাংলাদেশ চিলড্রেন লাইব্রেরি তৈরি হচ্ছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সাথে তার সচিবালয়স্থ অফিস কক্ষে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি এক সৌজন্য সাক্ষাৎকারে মিলিত হন। এ সময় বৈঠকে শিশু গ্রন্থাগার বিষয়ে আলোচনা করেন।
আলোচনাকালে, দু’দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, দ্বিপক্ষীয় সাংস্কৃতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) বিষয়টি স্মরণ করে মন্ত্রী এই মহতী উদ্যোগের জন্য স্থপতি তাদাও আন্দো এবং জাপান সরকারকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
এই বিশেষ শিশু গ্রন্থাগারটি বাংলাদেশ ও জাপানের গভীর বন্ধুত্বের এক চিরস্থায়ী প্রতীক হিসেবে আমাদের শিশুদের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখবে বলে মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং এর দ্রুত বাস্তবায়ন সম্পন্ন করতে দূতাবাসের সহযোগিতা কামনা করেন।
জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প এবং চারুকলার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি বাংলাদেশ আয়োজিত আন্তর্জাতিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে (এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল) জাপানের নিয়মিত ও গৌরবোজ্জ্বল অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
সেই সাথে সাংস্কৃতিক সম্পদ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, জাদুঘরের আধুনিকায়ন, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল ও শিল্পী বিনিময় এবং গ্রন্থাগার ও আর্কাইভস খাতের প্রযুক্তিগত উন্নয়নে জাপানের সর্বাত্মক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও জানান।
সাক্ষাৎকারের শুরুতে সংস্কৃতিমন্ত্রী জাপানের নতুন রাষ্ট্রদূতকে অভ্যর্থনা জানান এবং বাংলাদেশে তার সফল কর্মকাল প্রত্যাশা করেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান আমাদের এক বিশ্বস্ত, পরীক্ষিত এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী বন্ধু। বিগত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দু’দেশের এই অমূল্য পারস্পরিক বিশ্বাস ও সৌহার্দ্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।’
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন যাত্রায় জাপানের অবিচল ও দৃঢ় সমর্থনের জন্য তিনি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে দু’দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদারকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বর্তমান সরকারের কার্যপরিধি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিটি যুগোপযোগী ও নবায়ন করার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেলে যৌথভাবে কাজ করার প্রস্তাব দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী।
এ সময় সংস্কৃতিবিষয়ক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ঢাকাস্থ জাপানি দূতাবাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে শিক্ষা, বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারা কুকের সৌজন্য সাক্ষাতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতে ব্রিটিশ হাইকমিশনার বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষা খাতে সাম্প্রতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে যুক্তরাজ্য আগ্রহী। একই সঙ্গে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। এ সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন কাজ করে যাচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সবসময় যুক্তরাজ্যকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করে। তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে গণতন্ত্র আরও সুসংহত হবে বলে তিনি আশা করেন। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
বৈঠকে ব্রিটিশ হাইকমিশনার বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান।
এদিকে, একইদিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে United Nations Office for Project Services (UNOPS)-এর বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার Sudhir Muralidharan-এর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
সাক্ষাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় UNOPS প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন কার্যক্রমে ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সাক্ষাৎকালে পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোঃ মাহমুদুল হাসান, এনডিসি এবং মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়া সশরীরে পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকালে তিনি মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের প্রশিক্ষণ এলাকায় উপস্থিত হয়ে মাঠপর্যায়ের সেনাসদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন।
পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী বিস্তীর্ণ প্রশিক্ষণ এলাকা পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখেন এবং সেনাবাহিনীর ‘রেইড’ (Raid) মহড়া প্রত্যক্ষ করেন। তিনি সরাসরি সেনা বাঙ্কারে নেমে অফিসার ও সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে রণকৌশল নিয়ে মতবিনিময় করেন। এমনকি গাছের আড়ালে ছদ্মবেশে থাকা সেনাদের কাছে গিয়েও তাদের খোঁজখবর নেন। একপর্যায়ে তিনি সেনাসদস্যদের জন্য তৈরি করা সাধারণ খাবার ও চা গ্রহণ করেন, যা উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে।
সেনাসদস্যদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণ সেনাবাহিনীর ওপর গভীর আস্থা রাখে। তিনি জাতীয় সংকট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
এ সময় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আগামী অক্টোবর মাস থেকে দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হবে এবং আগামী বছরের অক্টোবরের মধ্যেই এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও সমসাময়ীক বিষয় নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে এই নির্বাচনগুলোকে সামনে রেখে একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোড ম্যাপ’ বা কর্মপরিকল্পনা তৈরির কাজ শুরু করেছে।
জনগণের বিভিন্ন ভোগান্তি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তথ্য উপদেষ্টা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, গত জুনে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল আসার ব্যাপারে গ্রাহকদের যেসব অভিযোগ রয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে এবং এর প্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া সাভারে এনসিপির জনসভায় ককটেল বিস্ফোরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িতদের দ্রুততম সময়ে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে এবং বিষয়টি নিয়ে গভীর তদন্ত চলছে।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়ে উপদেষ্টা কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, চাষাবাদ ও সংরক্ষণ পর্যায়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এটি ঠেকাতে দেশের সকল খাদ্য ব্যবসায়ীদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্য ভান্ডার বা ডাটাবেজ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের সচেতন করার পাশাপাশি অনিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
সবশেষে জুলাই আন্দোলনের শহীদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের বিষয়ে তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক জুলাই আন্দোলন নিয়ে কটূক্তি করা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক। যদিও বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী এটি সরাসরি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না, তবুও এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকে ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ বা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় কি না, তা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে। সরকারের এই বহুমুখী পদক্ষেপগুলো দেশের স্থিতিশীলতা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমে নির্বাচনের বিস্তারিত তফসিল ঘোষণা করবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রশাসনিক ও আভিযানিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের ছয়জন কর্মকর্তাকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সোমবার (৬ জুলাই) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) পদমর্যাদার এই কর্মকর্তাদের নতুন কর্মস্থলে পদায়ন করা হয়। এই রদবদল অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগে কর্মরত মো. আমীর খসরুকে ট্রাফিক-মতিঝিল বিভাগে বদলি করা হয়েছে। তাঁর জায়গায় ট্রাফিক-মতিঝিল বিভাগ থেকে দেওয়ান জালাল উদ্দিন চৌধুরীকে সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগের মো. শাহজাহান হোসেনকে ট্রাফিক-উত্তরা বিভাগের ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বদলির তালিকায় আরও রয়েছেন ট্রাফিক-উত্তরা বিভাগের মো. আনোয়ার সাঈদ, যাঁকে ট্রাফিক-গুলশান বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, গোয়েন্দা-গুলশান বিভাগের মো. শাহরিয়ার আলীকে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগে এবং মো. রবিউল হাসানকে ডিএমপির লজিস্টিকস বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতেই এই রদবদল করা হয়েছে। বদলিকৃত কর্মকর্তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাঁদের নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএমপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলায় এই পরিবর্তনগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাজের সমন্বয় বাড়াতে কমিশনারের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জনস্বার্থে জননিরাপত্তা বিধান করাই এই বদলির মূল লক্ষ্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই রদবদল কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে তাঁর দপ্তরে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। আজ সোমবারের এই বৈঠকে মূলত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান চীনা রাষ্ট্রদূত।
বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে গভীর মতবিনিময় হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে উভয় পক্ষ আশা প্রকাশ করেছে। বৈঠকে চীনা রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের উন্নয়নে বেইজিংয়ের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতার আশ্বাসও পুনর্ব্যক্ত করেন।
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত দেশের সকল সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি ‘এনএসআই’ (NS1) পরীক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব কাজী শরিফ উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এই নতুন সরকারি সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে কোনো খরচ ছাড়াই পরীক্ষা করানোর সুযোগ পাবেন।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই সংক্রান্ত নির্দেশনা দেশের সকল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক, সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকল স্বাস্থ্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য কোনো ফি গ্রহণ করা যাবে না। মূলত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং অকাল মৃত্যু রোধ করতেই সরকার এই ব্যয়বহুল পরীক্ষার ফি মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে এনএসআই পরীক্ষাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রক্তে ভাইরাসের উপস্থিতি দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এই সরকারি পদক্ষেপের ফলে রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন, যা ডেঙ্গুজনিত জটিলতা কমাতে সহায়ক হবে। স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং মনে করছেন এর ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ও মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই সেবাটি যাতে দেশের প্রতিটি প্রান্তের সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের এই নির্দেশনাটি অবিলম্বে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সোমবার এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং জাতিসংঘের ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনাল সাপোর্ট (ডিওএস)-এর আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে। অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ কন্টিনজেন্টগুলোর পরিচালনাগত সহযোগিতা বৃদ্ধি, আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া দ্রুততর করা এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। এছাড়া 'নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা' (ডব্লিউপিএস) এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং হাইতিতে বাংলাদেশের বিশেষায়িত পুলিশ কন্টিনজেন্ট মোতায়েনের প্রস্তুতি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তিরক্ষা মিশনের প্রতিপূরণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো সহজতর করার জন্য ডিপার্টমেন্ট অব অপারেশনাল সাপোর্টের কার্যকর সহায়তার প্রশংসা করেন। পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোর কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা পরিবেশগত ক্ষতি হ্রাস করতে গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতিসংঘ মিশনে সৌর প্যানেল স্থাপন করেছে এবং ভবিষ্যতে এই সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে জাতিসংঘের সাথে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
নারীদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান যে, বাংলাদেশ 'উইমেন, পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি' (ডব্লিউপিএস) এজেন্ডা বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি মিশন এলাকাগুলোতে নারী শান্তিরক্ষীদের জন্য নিরাপদ ও নারী-বান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে জাতিসংঘের বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শান্তিরক্ষীদের দক্ষতা বাড়াতে উন্নত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। হাইতির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি বিশেষায়িত ফর্মড পুলিশ ইউনিট (এফপিইউ) মোতায়েনের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, এই ইউনিটগুলো সোয়াত, সাইবার ক্রাইম তদন্ত এবং মাদকবিরোধী অভিযানে বিশেষভাবে পারদর্শী।
হাইতিতে এই বিশেষায়িত সক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহারের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন এবং আগামী ১৫-১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ পুলিশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এমওইউ আলোচনার জন্য জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অবস্থান করবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের পেশাদারিত্ব এবং জাতিসংঘের লজিস্টিক সাপোর্টের সমন্বয়ে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য আরও ত্বরান্বিত হবে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল অতুল খারে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাহস ও শৃঙ্খলার ভূয়সী প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আশ্বাস দেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এই বৈঠকের মাধ্যমে বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব আরও সুদৃঢ় হবে।
টানা ভারি বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি আগামী কয়েক দিনে দ্রুত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এতে চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তত ১৪ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে সাময়িকভাবে বন্যা ও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোমবার সকাল ৯টার তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এ পূর্বাভাস প্রকাশ করে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের সব প্রধান নদ-নদী বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে আগামী পাঁচ দিনে সিলেট, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগ এবং সংলগ্ন ভারতের ত্রিপুরা ও মেঘালয় এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া, হালদা, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি আগামী তিন দিনে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব নদীর পানি বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে এসব জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর কিছু নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
এদিকে সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের মনু, ধলাই, খোয়াই, কংস, সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা ও জাদুকাটা অববাহিকার নদীগুলোর পানি আগামী কয়েক দিনে দ্রুত বাড়তে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার কয়েকটি স্থানে নদীর পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও সাময়িক জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি স্থিতিশীল থাকলেও যমুনার পানি কিছুটা বেড়েছে। আগামী দুই দিন পানি কমে পরবর্তী তিন দিন আবার বাড়তে পারে। তবে নদীটি বিপৎসীমার নিচেই থাকবে। একই সময়ে গঙ্গা-পদ্মার পানিও স্থিতিশীল থাকার পর পরবর্তী দুই দিনে কিছুটা বাড়তে পারে, তবে সেখানেও আপাতত বিপদসীমা অতিক্রমের আশঙ্কা নেই।
রংপুর অঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় কমেছে। আগামী এক দিন এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে, এরপর আবার পানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে কক্সবাজারে। এছাড়া বান্দরবানের লামায় ২০৬ মিলিমিটার, কক্সবাজারের টেকনাফে ১৬২ মিলিমিটার এবং চট্টগ্রামে ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে ভারতের মেঘালয়ের আর কে এম সোহরায় ৭৭ মিলিমিটার, মাওসিনরামে ৬৯ মিলিমিটার, চেরাপুঞ্জিতে ৫৭ মিলিমিটার এবং মাওফ্ল্যাংয়ে ৫২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত দেশের কোনো নদীই বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল না বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তবে সংস্থাটি পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান বলেছেন, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার সেন্টার) শুধু শিশুদের নিরাপদে রাখার স্থান নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। মানসম্মত দিবাযত্ন কেন্দ্রের অভাবে কর্মজীবী মা ও তাদের সন্তানদের নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
সোমবার রাজধানীর পানি ভবনের মাল্টিপারপাস হলে নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘শিশুর প্রাথমিক পরিচর্যা ও বিকাশ’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ. জেড. এম. জাহিদ হোসেন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন।
এর আগে ডা. জুবাইদা রহমান সকাল সাড়ে ১০টায় তেজগাঁও সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা), বেলা ১১টায় ভূমি ভবনের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং সাড়ে ১১টায় পানি ভবনের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৫৮ শতাংশ নারী এবং ২৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ মানুষের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।
কর্মজীবী মায়েদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি নিজের স্কুলজীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন এবং শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো অনেক কর্মজীবী মা সন্তান লালন-পালন নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। বর্তমানে ১২৩টি শিশু বিকাশ কেন্দ্রে ৭ হাজার ৩৬০ জন শিশুকে সেবা দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের মোট শিশুর মাত্র শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশের চাহিদা পূরণ করছে।’
তিনি বলেন, এর ফলে অনেক শিশু প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম, সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধুলা এবং সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, মানসম্মত ও সর্বজনীন প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং শৈশবকালীন বিকাশ শিশুদের জ্ঞানীয় ও সামাজিক বিকাশের শক্ত ভিত্তি তৈরি করবে।
তিনি বলেন, শৈশবই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়েই সততা, নিষ্ঠা, শান্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা, সহনশীলতা, শৃঙ্খলা, কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
তিনি আরো বলেন, দিবাযত্ন কেন্দ্রের পরিচর্যাকারীরা একদিকে যেমন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রাখছেন, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগও সৃষ্টি করছেন।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এমপির সঙ্গে সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে ড. বদিউল আলম মজুমদার-এর নেতৃত্বে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের আট সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
সাক্ষাৎকালে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় গণসচেতনতা সৃষ্টি, ৩০ সেপ্টেম্বরকে ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা ও দেশব্যাপী উদযাপন, নারী উন্নয়ন নীতি ও জাতীয় শিশুনীতি-২০১১-এ কন্যাশিশুবিষয়ক পৃথক ধারা-উপধারা সংযোজন, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ও বিধিমালার সংশোধন, পার্লামেন্টারি শিশু অধিকার ককাস গঠন এবং নারী ও কন্যাশিশুদের চলার পথে, গণপরিবহনে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানিসহ বিভিন্ন সমস্যার বিষয় তুলে ধরেন।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রতিনিধিদলের বক্তব্য মনোযোগ ও ধৈর্যের সঙ্গে শোনেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার পরিবারেই কন্যাসন্তান রয়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকেও তাদের প্রতি শোভন আচরণ করা উচিত। গ্রাম কিংবা শহর-সব জায়গাতেই ছেলে সন্তানের প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, যা কাম্য নয়। দেশের অধিকাংশ নারী অপুষ্টিতে ভোগেন। তারা সবার শেষে খাবার খান, সবার পরে ঘুমাতে যান এবং সবার আগে ঘুম থেকে ওঠেন। পরিবারের জন্য তারা নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করে নিরলসভাবে কাজ করেন। তাই তাদের প্রতি কোনো ধরনের অশোভন আচরণ অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ক্ষেত্রে কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের নারীরা সামাজিকভাবে অনেক এগিয়ে আছেন।’
তিনি আরও বলেন, পার্লামেন্টারি শিশু অধিকার ককাস গঠনের ক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞ সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাই তাদের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজন হলে আইন ও বিধিমালার সংশোধনের বিষয়গুলো ককাসের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে। আমরা সবাই মিলে এ বিষয়ে কাজ করব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কন্যাসন্তানের জনক। কন্যাশিশুর উন্নয়ন, সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন নীতিগত ও আইনগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের কার্যকর বাস্তবায়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ এবং সামাজিক সংগঠনসমূহকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার মাধ্যমে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা প্রতিরোধে সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সাক্ষাৎকালে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষা, তাদের জন্য নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কন্যাশিশুবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের গুরুত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। এ সময় সংসদ, সরকার ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগে নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষমতায়ন এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
প্রতিনিধিদলের সদস্যরা তাদের বক্তব্য মনোযোগসহকারে শোনার জন্য ডেপুটি স্পিকারের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানে তার অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করেন। এ সময় উভয় পক্ষ নারী ও কন্যাশিশুর সার্বিক কল্যাণ, অধিকার সংরক্ষণ এবং তাদের জন্য নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
গত জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগ ও অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি, মিটার ভাড়া এবং প্রিপেইড মিটারের বিভিন্ন দিক নিয়ে তৈরি বিভ্রান্তি দূর করতে এবং প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে সোমবার এই বক্তব্য দেওয়া হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জুন মাসের বিদ্যুৎ বিল নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গ্রাহকদের অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানে বিতরণ সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তিনি নিজে এটি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জুন ২০২৬ থেকে নতুন ট্যারিফ কার্যকর করেছে। তবে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায় লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে আগের হার বহাল রাখা হয়েছে। মূল্য সমন্বয়ের ফলে একই পরিমাণ অর্থ রিচার্জের বিপরীতে আগের চেয়ে কম ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, যা অনেক গ্রাহকের কাছে অস্বাভাবিক অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হতে পারে।
বিবৃতিতে বলা হয়, যেসব গ্রাহক দাবি করছেন অতীতে একই ব্যবহারে কম বিল আসত, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন যে—এই মিটারগুলো পূর্ববর্তী মাসগুলোতেও একই গাণিতিক ও প্রযুক্তিগত পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ব্যবহার পরিমাপ করেছে। মিটারে কোনো কারিগরি ত্রুটি থাকলে তা নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই হঠাৎ শুরু হওয়ার সুযোগ নেই। অতএব, বিল বৃদ্ধির মূল কারণ মিটারের ত্রুটি নয়, বরং নতুন ট্যারিফ হারের প্রভাব।
এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বৃষ্টিপাত কম হওয়া, ঈদুল আযহা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, চলমান ফুটবল বিশ্বকাপ এবং এসএসসি পরীক্ষার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ও ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাসাবাড়িতে এসি, ফ্যান, ফ্রিজের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও রাইস কুকার, ব্লেন্ডার ও ইলেকট্রিক কেটলির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক গ্রাহক সর্বোচ্চ ট্যারিফ স্ল্যাবে (৬০০ ইউনিটের ঊর্ধ্বে) পৌঁছে গেছেন, যা বিল বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে, কিছু ক্ষেত্রে কিছু দাপ্তরিক ভুল পাওয়া যাচ্ছে এবং সেগুলোর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ প্রতিকার দেয়া হচ্ছে।
মিটার ভাড়া নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিতরণ সংস্থাগুলো এককালীন মূল্য পরিশোধ বা কিস্তিতে মিটার সরবরাহ করে। যারা এককালীন মূল্য পরিশোধ করেছেন, তাদের থেকে কোনো কিস্তি নেওয়া হয় না। শুধুমাত্র কিস্তিতে মিটার নেওয়া গ্রাহকদের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ফেজ মিটারের জন্য মাসে ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের জন্য ২৫০ টাকা কিস্তি নেওয়া হয়। চারটি সংস্থা গ্রাহকদের বাজার থেকে অনুমোদিত প্রিপেইড মিটার কেনার সুযোগও দিচ্ছে। তবে গ্রাহকদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মিটার ভাড়ার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে এবং দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
বিলম্বে বিল পরিশোধের জরিমানা প্রসঙ্গে জানানো হয়, পূর্বে ২ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বিলম্ব মাশুল ধরা হলেও বিইআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে মোট বিলের ওপর ৫ শতাংশ হারে এককালীন একবারই বিলম্ব মাশুল নেওয়া হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ আশ্বস্ত করেছে, অধিকাংশ অভিযোগ ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। গ্রাহক হয়রানি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো গ্রাহকের বিল নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বক্তব্যে আরও বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগ পুনরায় আশ্বস্ত করতে চায়, জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও আর্থিকভাবে সক্ষম করে তোলার লক্ষ্যে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শুধুমাত্র গ্রাহকের মন্তব্যের উপর নির্ভর না করে সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটরগণ বিদ্যুৎ বিল, মিটার ভাড়া ইত্যাদি সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধি-বিধান পর্যালোচনা ও বিল যাচাই করে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারলে তা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একটি স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও আস্থার পরিবেশ সৃষ্টিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
পরিশেষে, গুজব বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি না করার জন্য নাগরিকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে। আবেগের বশবর্তী হয়ে বিদ্যুৎ স্থাপনার ক্ষতি করলে তা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাবে এবং জনদুর্ভোগ বাড়াবে বলে সতর্ক করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
গত জুন মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। একইসঙ্গে অস্বস্তি কমেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতেও। সোমবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ তথ্য জানিয়েছে।
বিবিএসের সবশেষ তথ্য বলছে, জুন মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ হয়েছে, গত মে মাসে যেটি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।
অস্বস্তি কমেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও। জুন মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে। মে মাসে যেটি ছিল ৯ দশমিক ০৬ শতাংশ।
এদিকে মে মাসে সার্বিক খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ থাকলেও জুন মাসে সেটি কমে ৯ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কমেছে শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ।
এছাড়া জুন মাসে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
জুন মাসে শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ২৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।