আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩২টি দল। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ৭৪৭ জন। সে হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যয়নপত্র নিয়ে নির্বাচনে উপস্থিত ১৯৬৬ জন প্রার্থী। আর স্বতন্ত্রদের মধ্যে অন্তত ৪০০ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নির্বাচনে আসা বড় দল আওয়ামী লীগের মূল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাইরে অন্যদলগুলোর বেশির ভাগ প্রার্থীই আসনগুলোর মানুষের কাছে অচেনা। প্রায় প্রতিটি আসনেই নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন এমন অনেক অচেনা মুখ যাদের প্রার্থিতা পেতে সমস্যা না হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরিচিত হতেই পার হয়ে যাবে প্রচারণার বেশির ভাগ সময়। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নির্বাচনে প্রার্থী আছে অনেক বেশি, কিন্তু, প্রতিদ্বন্দ্বী কম।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ৩০০ আসনের বিপরীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (নৌকা) ৩০৩ জন, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ৩০৪ জন, জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল) ২১৮ জন, তৃণমূল বিএনপি (সোনালী আঁশ) ১৫১ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি (আম) ১৪২ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) ১১৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (মশাল) ৯১ জন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) ৪৭ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ) ১৩ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি (হাতঘড়ি) ১৮ জন, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) ৩৯ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল) ১৩ জন, গণফ্রন্ট (মাছ) ২৫ জন, গণফোরাম (উদীয়মান সূর্য) ৯ জন, ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার) ৪৫ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি) ৩৭ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি (বাইসাইকেল) ২০ জন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা) ৩৪ জন, গণতন্ত্রী পার্টি (কবুতর) ১২ জন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ি) ৩৩ জন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (কুলা) ১৪ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা) ৮২ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (নোঙর) ৪৯ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট- বিএনএফ (টেলিভিশন) ৫৫ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (ছড়ি) ৭৪ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল (হাত-পাঞ্জা) ৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (কুঁড়েঘর) ৬ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মই) একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা) একজন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (খেজুর গাছ) একজন এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (হারিকেন) দুইজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
এদিকে মনোনয়ন জমার শেষ দিনেই ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে বিএনপিসহ যে দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে তাদের আর মত পাল্টে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসার দৃশ্যমান কোনো সুযোগ নেই। আন্দোলনরত দলগুলোও অবশ্য আগেই এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছে।
ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে যেসব প্রার্থী টিকে যাবেন তারাই থাকবেন নির্বাচনী দৌড়ে। তবে প্রতিটি আসনে ভোটের লড়াইয়ে যারা যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগেরই দলের নাম সাধারণ মানুষ জানে না। আর দল অচেনা বলে প্রার্থীরাও অচেনা। ফলে তাদের ধারণা নির্বাচনী লড়াইয়ে আসলে টিকে থাকবেন বড় দলের পরিচিত মুখগুলো। এর মধ্যে শাসক দলের মার্কা নিয়ে লড়াই করা প্রার্থীরা যেমন আলোচনায় থাকবেন, তেমনই অনেক আসনেই তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমাতে পারেন নির্বাচনে আসা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। কেননা, দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশির ভাগই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং তাদের মোটামুটি ভোট ব্যাংক অথবা এলাকাবাসীকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রয়েছে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ৪০০ জনই আওয়ামী লীগের।
যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত কয়েক দিনের মতো গতকালও বলেছেন, দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ঢালাওভাবে নির্বাচন করতে পারবেন না। এ ছাড়া ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সম্ভাবনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন জোটের এমন প্রার্থীরাই কেবল থাকবেন বিবেচনায়। আর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এর ফলে এটা স্পষ্ট যে, জোটের সঙ্গে সমঝোতা হলে কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাদেরও রণে ভঙ্গ দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এবার দলীয় মার্কার বাইরে দলীয় প্রার্থীদের স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়ায় নির্বাচনে আসা প্রার্থীদের কতজন আবার দল চাইলে নির্দেশ মেনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন সেটাও আছে দেখার বিষয়।
তবে এই আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ প্রার্থী যারা বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে এলেও জনগণের কাছে নিজের দল, দলীয় প্রতীক এবং নিজের পরিচয় প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন। তবে প্রতিটি আসনে স্থানীয় ভোটারদের কাছে তারা এখনো অচেনা এবং নতুন মুখ হিসেবে বিবেচিত।
যেমন দল হিসেবে এবারই প্রথম নির্বাচন করছে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। এসব দলের বেশির ভাগ প্রার্থী নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের কাছে নতুন পরিচয়ে উপস্থিত হবেন। অনেকে আবার খুব বেশি পরিচিত নন। একইভাবে তাদের নির্বাচনী প্রতীক যথাক্রমে সোনালী আঁশ, নোঙর ও একতারা চেনাতেও এবার তাদের বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনএমের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৬ জন এবং তৃণমূলের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৫ জন।
এদিকে, গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর কাদের বলেছেন, বিএনপির ১৫ কেন্দ্রীয় নেতাসহ সাবেক ৩০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো নেতাও আছেন। আবার আগে বিএনপিতে প্রভাব ছিল দলটির এমন সাবেক নেতারাও আছেন নির্বাচনে। এদের মধ্যে তৈমূর আলম, সমশের মবিন চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।
তবে এদের বাইরে নির্বাচনের মাঠে থাকা বেশির ভাগ প্রার্থীই অচেনা। এ বিষয়ে গাজীপুর-৪ আসনের একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার দল এলাকায় তেমন পরিচিত নয়। দলের প্রচার চালাতে ও এলাকার মানুষের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে এবার ভোট করতে আসা। আমিও জানি নির্বাচনে জয়লাভ করার অবস্থান এখনো আমার বা আমার দলের তৈরি হয়নি। তবে এক দিনে তো কিছুই হয় না। আমাদের দলের আদর্শ ও কর্মসূচি দেশের মানুষ ও এলাকার মানুষকে জানাতে আমরা নির্বাচনে এসেছি।’
অন্যদিকে লালমনিরহাট-৩ আসনে মনোনয়ন জমা দেয়া প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সদর আসনে ৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদ্য পদত্যাগকারী সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জাবেদ হোসেন বক্কর, জাতীয় পার্টি থেকে জাহিদ হাসান, তৃণমূল বিএনপি থেকে শামীম আহম্মেদ চৌধুরী, জাকের পার্টি থেকে সকিউজ্জামান মিয়া, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল থেকে আশরাফুল আলম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে আবু তৈয়ব মো. আজমুল হক পাটোয়ারী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) থেকে শ্রী হরিশ চন্দ্র রায় মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তবে এবার তিনি এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। ফলে এ আসনে নির্বাচনে অংশ নেয়া সব প্রার্থীই নতুন এবং নতুন একজন সংসদ সদস্য পাবে লালমনিরহাট সদরবাসী। তবে নতুন হলেও জেলা ও শহরের রাজনীতিতে পুরনো মুখ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। ছাত্ররাজনীতি করায় জাবেদ হোসেন বক্করও সেখানে পরিচিত মুখ। জাকের পার্টি ও জাসদের প্রার্থীকেও অনেকে চেনেন। তবে সাম্যবাদী দল, এনপিপির প্রার্থীর মতো জাতীয় পার্টির প্রার্থীও এলাকার সবার চেনা মুখ নন। ফলে যে আসন থেকে জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে সেখানে নতুন মুখ দেয়ায় মাঠের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন এলাকার অনেক বাসিন্দা।
বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ৬টি আসন বিশ্লেষণ করলে। দৈনিক বাংলার খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনার এই ৬টি আসনের জন্য সেখানে ৫৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করবেন, তাদের অধিকাংশেরই রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিচিতি নেই। হঠাৎ করেই তারা কেন সংসদ নির্বাচনে আগ্রহী হলেন, এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তরও দেননি অধিকাংশ প্রার্থী।
খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের মনোনীত ৬ জন প্রার্থী, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র ২ জন এবং জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বাকি ৪৪ জন প্রার্থী কখনো রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় ছিলেন না।
খুলনা প্রতিনিধির বিশ্লেষণ অনুযায়ী খুলনা-১ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৬ জন। তারা হলেন, জাকের পার্টির মো. আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল, জাতীয় পার্টির কাজী হাসানুর রশিদ, তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় ও আবেদ আলী শেখ।
এদের মধ্যে ননী গোপাল মণ্ডল ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তার পরিচিতি রয়েছে। তবে বাকি চারজন রাজনীতিতে একেবারেই অপরিচিত। তারা প্রত্যেকেই এবার প্রথম সংসদ নির্বাচন করছেন। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সাবেক সচিব।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচন করছি। আমাকে ডামি প্রার্থীও বলা যাবে। এটা দলীয় নির্দেশেই হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, ‘দল আমাকে আবারও সুযোগ দিয়েছে। আমি দলের সম্মান রাখব বলে আশাবাদী।’
তবে বাকি চার প্রার্থীর তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। জাতীয় পার্টীর কাজী হাসানুর রশিদ ও তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিকের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
আর জাকের পার্টি মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলেছে, তাই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’
অন্যদিকে খুলনা-২ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৯ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, গণতন্ত্র পার্টির মো. মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার, জাকের পার্টির ফরিদা পারভিন, ইসলামী ঐক্যজোটের হিদায়েতুল্লাহ, জাতীয় পার্টির মো. গাউসুল আজম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের বাবু কুমার রায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাঈদুর রহমান।
এদের মধ্যে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তবে বাকিদের আগে কখনো রাজনৈতিক মাঠে দেখা যায়নি।
কেন প্রার্থী হয়েছেন- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার বলেন, ‘অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন জমা দেয়া হচ্ছে, তাই আমরাও দিচ্ছি।’
খুলনা-৩ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের এস এম কামাল হোসেন, জাকের পার্টির এস এম সাব্বির হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাইজার আহমেদ ও ফাতেমা জামান সাথী।
এদের মধ্যেও শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। তিনি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তিন বারের সংসদ সদস্য ও দুই বারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানকে সরিয়ে তাকেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে। তবে ওই আসনেরও বাকি চারজনের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই।
খুলনা-৪ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন ১৪ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী, জাকের পার্টির শেখ আনছার আলী, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম আজমল হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. ফরহাদ আহমেদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মোস্তাফিজুর রহমান, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনিরা সুলতানা, ইসলামী ঐক্যজোটের রিয়াজ উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জুয়েল রানা, এম ডি এহসানুল হক, মো. রেজভী আলম, এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারা, আতিকুর রহমান ও এইচ এম রওশান জমির।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী বর্তমান সংসদ সদস্য। ২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি জয়ী হয়েছিলেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। তিনি ওই আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার আপন ভাই।
তিনি বলেন, এলাকার মানুষের দোয়া নিয়ে মাঠে নেমেছি। জয়-পরাজয় এলাকার মানুষই নির্ধারণ করবেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই আসনে আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এলাকার ভোটাররা বলছেন, বাকি ১২ জন প্রার্থীদের নাম খুব একটা শোনেননি তারা। কেউ কেউ একেবারেই অপরিচিত।
খুলনা-৫ আসনের জন্য মনোনয় জমা দিয়েছেন ৭ জন। তারা হলেন- জাতীয় পার্টির মো. শহীদ আলম, জাকের পার্টির সামাদ সেখ, আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ সেলিম আকতার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের এস এম এ জলিল, ইসলামী ঐক্যজোটের তরিকুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন।
এদের মধ্যে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ একাধিক বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। এ ছাড়া আকরাম হোসেন ফুলতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এই আসনেও আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। বাকি যারা প্রার্থী হয়েছেন এলাকার রাজনীতিতে তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই বলে জানা গেছে।
খুলনা-৬ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১২ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মো. রশীদুজ্জামান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. আবু সুফিয়ান, জাকের পার্টির শেখ মর্তুজা আল মামুন, জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধু, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মির্জা গোলাম আজম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম নেওয়াজ মোরশেদ, তৃণমূল বিএনপির গাজী নাদীর উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম রাজু, গাজী মোস্তফা কামাল, জি এম মাহবুবুল আলম, মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর ও মো. অহিদুজ্জামান মোড়ল।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মো. রশীদুজ্জামানের কোনো দলীয় পদ নেই। তিনি একসময় পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জামানত হারিয়েছিলেন। তবে তাকেই মনোনয়ন দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে ক্ষমতাসীন দল। ওই আসনে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত রয়েছে জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধুর। তিনি আগেও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। বাকি প্রার্থীদের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। এলাকার সবার কাছে পরিচিত মুখও নন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ আসনেই ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের স্থানীয়রা তেমন একটা চেনেন না। তবে বিরোধীদের এক অংশ নির্বাচন বর্জন করায় রাজনীতির নতুন সমীকরণ মেলাতে ছোট দলগুলোই নির্বাচনে হতে যাচ্ছে বড় দলগুলোর সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনীযুদ্ধ পার হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।
জাসদের মাঠপর্যায়ের এক রাজনীতিবিদ জসিম মণ্ডল বলেন, ‘নির্বাচন একটা বড় খেলা। এখানে সবাই নামে নিজ নিজ সমীকরণ মেলানোর জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সমীকরণ হয় এক ধরনের, আবার প্রার্থীর সমীকরণ হয় আরেক ধরনের। সবাই নির্বাচনে জয়ী হতে যেমন অংশ নেয় না তেমনই কেউ কেউ নির্বাচনে যায় অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে। আবার অনেকের কাছে ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণই বড় কথা।’ জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয় এ সময় পোস্টারিং করে নিজের ছবি ও পরিচিতি পুরো এলাকার মানুষকে দেখানো যায়। এটাও বা কম কিসে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই আছে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার। তাই কটা টাকা খরচ করে অনেকেই পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ নেয়। এর ফল তো অসীম-সারাজীবন নানাভাবে এর সুফল মেলে। যারা রাজনীতিতে আছেন, কেবল তারাই বোঝেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারার গুরুত্ব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ও ফ্যাসিবাদীদের সহায়তা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রদ্রোহের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজ রাজারবাগ বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে পুলিশ সপ্তাহ, ২০২৬-এর পদক প্রদান অনুষ্ঠান প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে সাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ ও সেবামূলক কাজের জন্য ৯২ জনকে বিপিএম ও পিপিএম পদক দেওয়া হয়।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র ও জনগণের শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে সরকার কঠোর হতে বাধ্য হবে। জনগণের শান্তি বিনষ্ট হয়, এমন কোনো কাজ সহ্য করা হবে না।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, দেশবাসী জনবান্ধব পুলিশ দেখতে চায়। পুলিশকে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পুলিশের শক্তি আগের চেয়ে বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং এটি অব্যাহত থাকবে। কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা বেশি।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চক্রান্ত করছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসরদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ বাহিনীকে আরও আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে পুলিশকে কঠোর হতে হবে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা জনগণের প্রত্যাশা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলে তার পরিণতি ভালো হবে না।
ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পুলিশের কেউ কেউ গোপনে সংবাদ দিয়ে বা অন্যভাবে সহযোগিতা করছে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, পুলিশের মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন না করা ও দায়িত্বে অবহেলা করার ঘটনাও আছে। ধীরে ধীরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং পুলিশ সদস্যদের সংশোধনের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা ১ মাসে ১৪০০ মানুষকে হত্যা করেছে, জনগণ তাদেরকে পুনরায় আর আহ্বান জানাবে না। এ ঘটনায় তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি।
সরকার তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গণতান্ত্রিক ভিত্তি, জন-আকাঙ্ক্ষা, ব্যাপক জনপ্রত্যাশা ও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর গঠিত বর্তমান সরকারের ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী।
তিনি বলেন, তৃণমূল পর্যায় থেকে আইজিপি পর্যন্ত সবার কাছে সরকারের একটাই বার্তা— সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং জনপ্রত্যাশা পূরণের জন্য পুলিশকে কঠোর হতে হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যারা ফ্যাসিবাদী শক্তি তারা অন্যান্য বাহিনীর মতো পুলিশ বাহিনীকেও অপব্যবহার করেছে, তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে, তাদের দিয়ে নির্যাতন করিয়েছে ও তাদেরকে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। অনেকে এই অবৈধ নির্দেশ পালন করতে বাধ্য হয়েছেন। এখন আমরা এটি চাই না।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। সূত্র: বাসস
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত ও সাম্যের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি।
তিনি বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম বাঙালি জাতির চেতনা, মানবতা, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িকতার অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস। এটি নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে।
আজ ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত ও সাম্যের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও প্রতিযোগীরা কবিতা আবৃত্তি, নজরুল সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, নৃত্যসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন।
পরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে পুরস্কার ও সনদপত্র তুলে দেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। এ সময় বিজয়ীরা পুরস্কার পেয়ে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাতের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল ইসলাম তারেক, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাইমা সুলতানা, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব এনামুল কাদির, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান লিটন, তথ্য প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী সাদ্দাম হোসেনসহ প্রমুখ।
এর আগে, এদিন বিকালে তথ্য প্রতিমন্ত্রী সুন্দাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন এবং রাজগাতী ইউপি উলহাটি বাজার সড়কের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। এতে উপজেলা প্রশাসনসহ স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: বাসস
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অনন্য সাহসিকতা, বীরত্বপূর্ণ অবদান, জনসেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন, চাঞ্চল্যকর মামলার রহস্য উদঘাটন এবং প্রশংসনীয় উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের ৯২ জন সদস্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদক প্রদান করা হয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে মনোনীত পুলিশ কর্মকর্তাদের হাতে এ পদক তুলে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
এর আগে গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-২ শাখা থেকে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে পদকপ্রাপ্তদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। নির্দেশনায় জানানো হয়, ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে সাহসিকতা ও সেবামূলক অনন্য অবদানের জন্য সংশ্লিষ্টদের এ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোট চারটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে মনোনীত কর্মকর্তাদের এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। ক্যাটাগরিগুলো হলো—‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)-সেবা’, ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’ এবং ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)-সেবা’। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখা পুলিশ সদস্যদের অনুপ্রেরণা জোগাতে প্রতি বছর এ পদক প্রদান করা হয়ে থাকে।
পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রশংসনীয় ও ভালো কাজের জন্য যেমন পুরস্কৃত করা হবে, তেমনি দায়িত্ব পালনে অবহেলা, শৃঙ্খলাভঙ্গ কিংবা যেকোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে বিভাগীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি ফৌজদারি আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬-এর ‘পদক প্রদান অনুষ্ঠানে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ মিললে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না; প্রচলিত আইনেই তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।
বাহিনীতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশে ‘পানিশমেন্ট-রিওয়ার্ড’ ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। অতীতে পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার ও অপব্যবহারের যে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে এসে বাহিনীর সদস্যদের সামনে এখন নিজেদের সংশোধন ও জনকল্যাণে নতুনভাবে কাজ করার সুযোগ এসেছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষ এখন কোনো রাজা-বাদশাহ দেখতে চায় না, তারা চায় সেবাধর্মী ‘জনগণের পুলিশ’। কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা যেন এমন কোনো আচরণ না করেন যা জনগণের চোখে অগণতান্ত্রিক মনে হয় এবং একই সঙ্গে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে এমন কোনো অপকর্মে অধস্তন সদস্যদের আশ্রয় দেওয়া যাবে না। তবে দায়িত্ব পালনকালে অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটির ক্ষেত্রে সংশোধনের সুযোগ থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে গণআকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে পুলিশ বাহিনীকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এ লক্ষ্যে বাহিনীর প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক সরঞ্জাম এবং লজিস্টিক সহায়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগামী সপ্তাহেই পুলিশের একটি আলাদা সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠন করা হবে। সদর দপ্তরের পাশাপাশি বিভাগ, জেলা ও মেট্রোপলিটন পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও ফরেনসিক ল্যাব সুবিধাসম্পন্ন এই ইউনিটের শাখা বিস্তৃত থাকবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব পুলিশের ওপর ন্যস্ত রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার পুলিশ বাহিনীকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করেছে। একই সাথে যারা দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে, তাদের কঠোরভাবে প্রতিহত করতে গোয়েন্দা সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
সাইবার মাধ্যমে সংঘটিত আধুনিক অপরাধ প্রতিরোধ এবং প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার করার লক্ষ্যে আগামী সপ্তাহেই পুলিশের একটি পৃথক ও বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে আয়োজিত এক পুলিশ পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এ গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানান। নতুন ইউনিটের সাংগঠনিক রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে একটা আলাদা সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠন করা হবে। নতুন এই ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ একজন অ্যাডিশনাল আইজিপি (অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। পুলিশ সদর দপ্তরে এই পদটি না থাকলে তা নতুন করে তৈরি করা হবে।’
অনুষ্ঠানে বাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রাজনৈতিক অপশক্তির সঙ্গে কোনো ধরনের গোপন আঁতাত বরদাশত করা হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশের কেউ কেউ এখনো ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত হয়ে যোগাযোগ রাখছে, নানা ধরনের সংবাদ দিচ্ছে- এমন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হলে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নতুন এই সাইবার ইউনিটের বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিস্তার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘সমস্ত মেট্রো, ডিভিশন ও ডিস্ট্রিক্ট পর্যায়ে তার শাখা থাকবে। থানা ও জেলাপর্যায়ে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটের আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকবে। বড় আকারের ফরেনসিক ল্যাব ও যে সাপোর্ট দরকার, সেগুলো হেডকোয়ার্টার ও ডিভিশন পর্যায়ে থাকবে।’ প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সেটা প্রকল্প প্রণয়নের জন্য আমি গত কয়েক সপ্তাহ আগে নির্দেশ দিয়েছি। যেগুলো জটিল হবে, সেগুলো কেন্দ্রে আসবে। যেগুলো থানা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে অ্যানালাইসিস করা সম্ভব, সেগুলো সেখানেই হবে।’
বিশ্বব্যাপী অপরাধের পরিবর্তিত ধরন ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক জালিয়াতির ঝুঁকি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেখেছি, সাইবার স্পেস ক্রিয়েট করে যেসব ক্রাইম হচ্ছে, সেটা আধুনিক ক্রাইম প্রবণতার একটা ক্যারেক্টার। কোনো কোনো রাষ্ট্রে ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত ক্রাইম হচ্ছে এই সাইবার বা স্ক্যামভিত্তিক। সে জন্য এটা আমাদের গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।’ ফলে দেশের নাগরিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ খাতকে সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
হাম ও ডেঙ্গুর মতো প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। শনিবার দেশব্যাপী ‘বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন ২০২৬’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে রাষ্ট্রকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর পরপর দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ২০২০ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তা সম্পূর্ণ স্থবির ছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ উপেক্ষা করে উন্মুক্ত দরপত্রের দীর্ঘসূত্রতায় জড়ানোর ফলেই এই চার বছরের টিকার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, যার খেসারত হিসেবে সংক্রামক রোগের প্রকোপে প্রায় এক হাজার নিষ্পাপ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সংকট উত্তরণে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, গত এপ্রিলের শুরু থেকেই ধাপে ধাপে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা হয় এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়। আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক জটিলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুষ্টিহীনতার কারণেই হাম আক্রান্ত শিশুরা দ্রুত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক শ্বাসকষ্টে পতিত হচ্ছিল। এমন সংকটাপন্ন মুহূর্তে আইসিডিডিআর,বির চিকিৎসক চিশতির মাত্র ১৫০ টাকা ব্যয়ে উদ্ভাবিত বোতলভিত্তিক কৃত্রিম ‘সিপ্যাপ’ অক্সিজেন সরবরাহ পদ্ধতি বহু শিশুর জীবন বাঁচাতে অসামান্য অবদান রেখেছে। এ সময় করোনা অতিমারিসহ যেকোনো স্বাস্থ্য সংকটে দেশের চিকিৎসকদের আন্তরিক ত্যাগ ও সেবার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল কর্মসূচির সাথে তুলনা করে দেখা যায় হামের মূল কার্যক্রম থেকে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়েছিল। পরবর্তীতে বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে আরও ১৪ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরও ঝুঁকি সম্পূর্ণ দূর করতে এবার ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী মোট ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্যমাত্রা করে দ্বিতীয় দফার বিশেষ ক্যাচআপ ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছে। এর মধ্যে বিগত তিন মাসে ছয় মাস পূর্ণ করা ১০ লাখ নতুন শিশু এবং পূর্বে বাদ পড়া ২৪ লাখ শিশু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কর্মসূচির সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে তিনি জানান, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে কর্মজীবী মায়েদের সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে ছুটির দিনে এবং সন্ধ্যার পরেও টিকাদানের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যে ইউনিসেফের জরুরি সরবরাহসহ উপজেলাগুলোতে ৪৩ লাখ ডোজ টিকা পৌঁছানো হয়েছে এবং কর্মসূচি সমাপ্তির পরও যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের কাছে অতিরিক্ত ১০ লাখ ডোজ টিকা মজুত থাকবে। এই দেশব্যাপী স্বাস্থ্য কর্মসূচি সফল করতে তিনি গণমাধ্যমের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, এসব বৈঠক ও কর্মসূচিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মাহদী আমিন এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের সফরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি, জাতিসংঘের সাইডলাইনে চারটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান, ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এসব বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরেছেন এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার সকালে ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে জেপি মরগান চেজ আয়োজিত একটি প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।’
তিনি বলেন, ‘এরপর প্রধানমন্ত্রী ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসাকে স্বাগত জানানো হয় এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, সেখানে বাংলাদেশে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
মাহদী বলেন, ‘বৃহস্পতিবার মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। তিনি কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এই তিনটি বৈঠকেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।’
তিনি বলেন, তিন দেশই প্রধানমন্ত্রীকে নিজ নিজ দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা, আরও জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে চায় সরকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ককে আমরা নতুন পর্যায়ে নিতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের কর্মসূচির বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটিতে বক্তব্য দিয়েছেন। এর বাইরে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী গেটস ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউট এবং ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। উন্নয়ন অংশীদার ও স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গেও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
মাহদী বলেন, বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট এবং মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য ও মিডওয়াইফারি নিয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান হয়েছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও জাস্ট ট্রানজিশন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়েও প্রধানমন্ত্রী উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরে আটটি উচ্চপর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন এবং এর চারটিতে বক্তব্য দিয়েছেন।
মাহদী আমিন বলেন, এর মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্ল্যাটফর্ম অব উইমেন লিডার্স, ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগ এবং মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য ও মিডওয়াইফারি-সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান উল্লেখযোগ্য। এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ডা. জুবাইদার বক্তব্যের প্রশংসা করেছেন বলে তিনি জানান।
চার দিনে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রায় ৮০টি বিভিন্ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বলেও জানান মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ছোট একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রতিটি কর্মসূচিতে বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাহদী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন পর বিশ্বমঞ্চে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের পরিকল্পনা ও অগ্রাধিকারের পাশাপাশি বিশ্বশান্তি, মানবতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় উঠে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, গণতান্ত্রিক সরকারের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এবং সামনের দিনগুলোতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে আরও সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর দেশ হিসেবে এগিয়ে যাবে।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, শামা ওবায়েদ, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মর্তুজা, জাতিসংঘে বাংলাদেশের উপ-স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান, প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যরা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: বাসস
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি মালয়েশিয়ায় ব্যক্তিগত সফর শেষে দেশে ফিরেছেন।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্ত্রী ও পুত্রসহ মালয়েশিয়া থেকে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এমএইচ-১৩৬ ফ্লাইটযোগে শুক্রবার দিবাগত রাত ১২ টা ৫৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
উল্লেখ্য, চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি গত ২১ সেপ্টেম্বর ব্যক্তিগত সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। সূত্র: বাসস
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্ক সফররত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান বিন আবদুল্লাহ আল সৌদ বৈঠক করেছেন।
নিউইয়র্কের স্থায়ীয় সময় শুক্রবার দুপুরে জাতিসংঘ সদরদপ্তরের ইউএন বাইল্যাটেরাল বুথ (গ্যাল-৭)-এ অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেসসচিব একেএম নাজমুল হক একথা জানান।
তিনি জানান, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সৌদি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকা-রিয়াদ সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে সৌদি আরবের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন।
বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও মতবিনিময় হয়। সূত্র: বাসস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফর শেষে দেশে ফেরার উদ্দেশে নিউইয়র্ক ত্যাগ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী এমিরেটসের একটি ফ্লাইট স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৩০ মিনিটে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও সফরসঙ্গীরা রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী এ তথ্য জানিয়েছেন।
ফ্লাইটটি ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় দুবাই পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সেখান থেকে রাত ২টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বাংলায় ভাষণ দেন। এতে তিনি বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।
২৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। সংঘাত নিরসনে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে জনগণের ক্ষমতায়ন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ লক্ষ্যে সরকারের ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ বা থ্রি-আর কৌশলের কথাও তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই দীর্ঘস্থায়ী এ সংকটের একমাত্র সমাধান। স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো সহযোগিতা কামনা করেন।
সফরকালে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
প্রধানমন্ত্রী তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ-তুরস্ক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানের বিষয়ে আলোচনা করেন। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ লতিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার এবং দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা জোরদার এবং অংশীদারিত্বের নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়।
হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলস-এমের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে দেওয়া স্বাগত প্রাতরাশে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী অংশ নেন। পরে তাঁরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণকারী নেতাদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগ দেন।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে মানবিক চ্যালেঞ্জ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বিষয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।
এ সময় গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক সুজম্যানের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুসেবা, টিকাদান, সাশ্রয়ী মূল্যের টিকা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা হয়।
‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন। আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সম্মিলিত বৈশ্বিক পদক্ষেপ, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমানো এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় জলবায়ু অর্থায়নের আহ্বান জানান তিনি।
ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা ও প্রযুক্তি এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে দেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণ ও নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়।
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের হুমকি নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমানো, পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অভিযোজন অর্থায়ন, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশ-সুইডেন-ইউএনএফপিএ আয়োজিত ধাত্রীবিদ্যা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ‘সুস্থ বাংলাদেশ’ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে রাখার কথা জানান তিনি।
তিনি জানান, সরকার আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে ৮০ হাজার নারী এবং ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ বা ধাত্রী থাকবেন। পাশাপাশি একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকা এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জলবায়ু সহনশীলতা ও বহুপক্ষীয় কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকারও প্রশংসা করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
প্রধানমন্ত্রী থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও বৈঠক করেন। পরে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেন তিনি।
নিউইয়র্ক সফরের শেষ দিনে আজ প্রধানমন্ত্রী ম্যানহাটনে জেপিমরগানের সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির আয়োজিত ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন। পরে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি।
পাঁচ দিনের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সূত্র: বাসস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ।
বিশ্বশান্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মারণাস্ত্র নয়; বরং যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা হবে পরিবর্তনের হাতিয়ার। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
দলমত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া তার প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়েই উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে।
দেশ মেরামতে থ্রি-আর কৌশল: প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো সমস্যার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।
দেশ পুনর্গঠনে সরকার রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—অর্থাৎ থ্রি-আর কৌশল অনুসরণ করছে বলেও জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে জোর: প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।
দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনাবেতনে শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিভিন্ন খাতের এসব কার্ড সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশের পরোক্ষ মিল রয়েছে।
প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান: প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।
শান্তি ও মানবিক বিশ্বের পক্ষে বাংলাদেশ: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে।
বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান।
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চান: প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত’ উল্লেখ করে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকে সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
সংকটের চূড়ান্ত সমাধানে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।
জলবায়ু ন্যায়বিচারে জোর: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এর পরিণতি বহন করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ।
আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বন্যা ও খরার ঝুঁকি মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদারের পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ‘ওয়াটার কনভেনশন’ স্বাক্ষর করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষা: নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’: প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণরা যাতে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়—এমন একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ কাজ করছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট রিটার্ন দেওয়ার সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন দিতে হতো ব্যবসায়ীদের। বাজেটে তা পরিবর্তন করা হয়েছে। তিন মাস পরপর রিটার্ন দেওয়ার বিধান করা হয়। কারণ, ছোট ব্যবসায়ীদের প্রতি মাসে কাগজপত্র জোগাড় করে হিসাব–নিকাশ করে ভ্যাট রিটার্ন দেওয়া কঠিন হয়।
বাজেট ঘোষণার পর ব্যবসায়ী মহলের কাছে উদ্যোগটি প্রশংসিত হয়। কারণ, এতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ‘ক্যাশ ফ্লো’ বাড়ে। প্রতিমাসে রিটার্ন দেওয়ার ঝামেলা থাকে না।
কিন্তু বিপত্তি বাধে অন্য জায়গায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রতি মাসের ভ্যাট আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়। প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন দিলে এনবিআরের হিসাবে রাজস্ব জমা পড়ে। তিন মাস পরপর রিটার্ন দেওয়ার বিধান করায় চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস শেষ না হওয়ায় এখনো ভ্যাট রিটার্ন থেকে ভ্যাট জমার পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা পড়েনি। ফলে এনবিআরের ভ্যাট আদায় কমেছে বলে ভ্যাট বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
সার্বিকভাবে নতুন নিয়মে মাসিক ভ্যাট আদায় কমে এসেছে। এতে সরকারের রাজস্বের জোগানে টান পড়েছে। তাই নতুন নিয়মের বদলে আবার পুরোনো মাসিক রিটার্নে ফিরতে যাচ্ছে এনবিআর। প্রতি মাসেই রিটার্ন দেওয়ার পুরো নিয়ম বহাল রাখতে শিগগিরই আদেশ জারি করবে এনবিআর।
জ্বালানিসহ নানা ধরনের বাড়তি খরচ মেটাতে হচ্ছে সরকারকে। কিন্তু সরকারের বিদ্যমান রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি দিয়ে সেই বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই এখন তড়িঘড়ি নিয়ম বদলাতে যাচ্ছে সংস্থাটি। প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্নের পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে সংসদে সংশোধনী পাস করা হবে নাকি অধ্যাদেশ জারি হবে—তা নিয়ে যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। কোনো কোনো ভ্যাট কর্মকর্তা মত দিয়েছেন যে তিন মাস না গেলে নতুন নিয়ম বদলানো যাবে না।
এনবিআরের ভ্যাট বিভাগের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেন, অর্থমন্ত্রী এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ইতিবাচক সংকেত পাওয়া গছে। তাই আগামী মাসে অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে আগের মাসিক নিয়মে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে।
ভ্যাট আদায় কমেছে: এনবিআর চলতি অর্থবছরের কোনো মাসের রাজস্ব আদায়ের চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ করেনি। তবে এনবিআরের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমার নতুন নিয়মের কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই–আগস্ট) ভ্যাট আদায় গত অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। ওই দুই মাসে ভ্যাট আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ২২ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় ভ্যাট আদায় কমেছে ৪ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা।
তবে তৃতীয় মাস শেষে ব্যবসায়ীরা যখন ভ্যাট রিটার্ন দেবেন, তখন এই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হয়ে যাবে বলে মনে করছেন ভ্যাট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, তিন মাস না গেলে আদায় কমেছে বলা যাবে না। কারণ, তিন মাস গেলে আদায় আগের বছরের তুলনায় বেড়ে যাবে বলে আশা করছেন তারা।
এদিকে ভ্যাট আদায় বাড়াতে নতুন করে নিম্নস্তরের সিগারেটের দামও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। প্রতি ১০ শলাকা প্যাকেটের দাম ৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা করা হয়। এ ছাড়া আদায় বাড়াতে ভ্যাট ফাঁকির বিরুদ্ধে অভিযান কার্যক্রমও বাড়িয়েছে এনবিআর।
ব্যবসায়ীরা কী বলছেন: এদিকে ছয় মাস অপেক্ষা না করে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের সমালোচনা করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, কমপক্ষে ছয় মাস দেখার দরকার ছিল। কেন ভ্যাট আদায় কমছে, তা সমীক্ষা করে দেখা দরকার। জ্বালানিসহ নানা সংকটে ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি ও কেনাবেচা কমছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্যাট আদায় কমাটা স্বাভাবিক।
তাই ঠিক কী কারণে ভ্যাট কমছে, সেটা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান এই ব্যবসায়ী নেতা। আর ভ্যাটের আওতা বাড়াতে হলেও নতুন ব্যবসায়ীদের আস্থায় আনার কথা বলেন তিনি। নয়তো নতুনেরাও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে না বলে মনে করেন আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী।
এনবিআরকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিশ্চিত করতে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন দুই নেতা।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করা এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়।