আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৭১৩ জন প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে নিবন্ধিত ৪৪টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩২টি দল। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন ৭৪৭ জন। সে হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যয়নপত্র নিয়ে নির্বাচনে উপস্থিত ১৯৬৬ জন প্রার্থী। আর স্বতন্ত্রদের মধ্যে অন্তত ৪০০ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন। তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, নির্বাচনে আসা বড় দল আওয়ামী লীগের মূল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বাইরে অন্যদলগুলোর বেশির ভাগ প্রার্থীই আসনগুলোর মানুষের কাছে অচেনা। প্রায় প্রতিটি আসনেই নির্বাচনী লড়াইয়ে আছেন এমন অনেক অচেনা মুখ যাদের প্রার্থিতা পেতে সমস্যা না হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে পরিচিত হতেই পার হয়ে যাবে প্রচারণার বেশির ভাগ সময়। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নির্বাচনে প্রার্থী আছে অনেক বেশি, কিন্তু, প্রতিদ্বন্দ্বী কম।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ৩০০ আসনের বিপরীতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (নৌকা) ৩০৩ জন, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ৩০৪ জন, জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল) ২১৮ জন, তৃণমূল বিএনপি (সোনালী আঁশ) ১৫১ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি (আম) ১৪২ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) ১১৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ (মশাল) ৯১ জন, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) ৪৭ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (বটগাছ) ১৩ জন, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি (হাতঘড়ি) ১৮ জন, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ (চেয়ার) ৩৯ জন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (কাঁঠাল) ১৩ জন, গণফ্রন্ট (মাছ) ২৫ জন, গণফোরাম (উদীয়মান সূর্য) ৯ জন, ইসলামী ঐক্যজোট (মিনার) ৪৫ জন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (মোমবাতি) ৩৭ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি (বাইসাইকেল) ২০ জন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ (গামছা) ৩৪ জন, গণতন্ত্রী পার্টি (কবুতর) ১২ জন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ি) ৩৩ জন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (কুলা) ১৪ জন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (একতারা) ৮২ জন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (নোঙর) ৪৯ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট- বিএনএফ (টেলিভিশন) ৫৫ জন, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (ছড়ি) ৭৪ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ- বিএমএল (হাত-পাঞ্জা) ৫ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপ (কুঁড়েঘর) ৬ জন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মই) একজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (রিকশা) একজন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (খেজুর গাছ) একজন এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (হারিকেন) দুইজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।
এদিকে মনোনয়ন জমার শেষ দিনেই ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম জানিয়েছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিলের সময়সীমা বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। ফলে বিএনপিসহ যে দলগুলো নির্বাচন বর্জন করেছে তাদের আর মত পাল্টে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসার দৃশ্যমান কোনো সুযোগ নেই। আন্দোলনরত দলগুলোও অবশ্য আগেই এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছে।
ফলে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে যেসব প্রার্থী টিকে যাবেন তারাই থাকবেন নির্বাচনী দৌড়ে। তবে প্রতিটি আসনে ভোটের লড়াইয়ে যারা যাচ্ছেন তাদের বেশির ভাগেরই দলের নাম সাধারণ মানুষ জানে না। আর দল অচেনা বলে প্রার্থীরাও অচেনা। ফলে তাদের ধারণা নির্বাচনী লড়াইয়ে আসলে টিকে থাকবেন বড় দলের পরিচিত মুখগুলো। এর মধ্যে শাসক দলের মার্কা নিয়ে লড়াই করা প্রার্থীরা যেমন আলোচনায় থাকবেন, তেমনই অনেক আসনেই তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমাতে পারেন নির্বাচনে আসা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। কেননা, দলটির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশির ভাগই স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত এবং তাদের মোটামুটি ভোট ব্যাংক অথবা এলাকাবাসীকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা রয়েছে। নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া ৭৪৭ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ৪০০ জনই আওয়ামী লীগের।
যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত কয়েক দিনের মতো গতকালও বলেছেন, দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ঢালাওভাবে নির্বাচন করতে পারবেন না। এ ছাড়া ১৪-দলীয় জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির সম্ভাবনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন জোটের এমন প্রার্থীরাই কেবল থাকবেন বিবেচনায়। আর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
এর ফলে এটা স্পষ্ট যে, জোটের সঙ্গে সমঝোতা হলে কয়েকটি আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছে তাদেরও রণে ভঙ্গ দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
তবে আওয়ামী লীগ সভাপতি নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এবার দলীয় মার্কার বাইরে দলীয় প্রার্থীদের স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ দেয়ায় নির্বাচনে আসা প্রার্থীদের কতজন আবার দল চাইলে নির্দেশ মেনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করবেন সেটাও আছে দেখার বিষয়।
তবে এই আলোচনার বাইরে থেকে যাচ্ছে বেশির ভাগ প্রার্থী যারা বিভিন্ন দল থেকে নির্বাচনে এলেও জনগণের কাছে নিজের দল, দলীয় প্রতীক এবং নিজের পরিচয় প্রকাশ করার সুযোগ পাবেন। তবে প্রতিটি আসনে স্থানীয় ভোটারদের কাছে তারা এখনো অচেনা এবং নতুন মুখ হিসেবে বিবেচিত।
যেমন দল হিসেবে এবারই প্রথম নির্বাচন করছে তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। এসব দলের বেশির ভাগ প্রার্থী নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের কাছে নতুন পরিচয়ে উপস্থিত হবেন। অনেকে আবার খুব বেশি পরিচিত নন। একইভাবে তাদের নির্বাচনী প্রতীক যথাক্রমে সোনালী আঁশ, নোঙর ও একতারা চেনাতেও এবার তাদের বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনএমের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৬ জন এবং তৃণমূলের প্রার্থীদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আছেন ৫ জন।
এদিকে, গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর কাদের বলেছেন, বিএনপির ১৫ কেন্দ্রীয় নেতাসহ সাবেক ৩০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এদের মধ্যে কাদের সিদ্দিকী, লতিফ সিদ্দিকী, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো নেতাও আছেন। আবার আগে বিএনপিতে প্রভাব ছিল দলটির এমন সাবেক নেতারাও আছেন নির্বাচনে। এদের মধ্যে তৈমূর আলম, সমশের মবিন চৌধুরীর নাম উল্লেখযোগ্য।
তবে এদের বাইরে নির্বাচনের মাঠে থাকা বেশির ভাগ প্রার্থীই অচেনা। এ বিষয়ে গাজীপুর-৪ আসনের একজন প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার দল এলাকায় তেমন পরিচিত নয়। দলের প্রচার চালাতে ও এলাকার মানুষের কাছে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে এবার ভোট করতে আসা। আমিও জানি নির্বাচনে জয়লাভ করার অবস্থান এখনো আমার বা আমার দলের তৈরি হয়নি। তবে এক দিনে তো কিছুই হয় না। আমাদের দলের আদর্শ ও কর্মসূচি দেশের মানুষ ও এলাকার মানুষকে জানাতে আমরা নির্বাচনে এসেছি।’
অন্যদিকে লালমনিরহাট-৩ আসনে মনোনয়ন জমা দেয়া প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই সদর আসনে ৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদ্য পদত্যাগকারী সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান জাবেদ হোসেন বক্কর, জাতীয় পার্টি থেকে জাহিদ হাসান, তৃণমূল বিএনপি থেকে শামীম আহম্মেদ চৌধুরী, জাকের পার্টি থেকে সকিউজ্জামান মিয়া, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল থেকে আশরাফুল আলম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) থেকে আবু তৈয়ব মো. আজমুল হক পাটোয়ারী, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) থেকে শ্রী হরিশ চন্দ্র রায় মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তবে এবার তিনি এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেননি। ফলে এ আসনে নির্বাচনে অংশ নেয়া সব প্রার্থীই নতুন এবং নতুন একজন সংসদ সদস্য পাবে লালমনিরহাট সদরবাসী। তবে নতুন হলেও জেলা ও শহরের রাজনীতিতে পুরনো মুখ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান। ছাত্ররাজনীতি করায় জাবেদ হোসেন বক্করও সেখানে পরিচিত মুখ। জাকের পার্টি ও জাসদের প্রার্থীকেও অনেকে চেনেন। তবে সাম্যবাদী দল, এনপিপির প্রার্থীর মতো জাতীয় পার্টির প্রার্থীও এলাকার সবার চেনা মুখ নন। ফলে যে আসন থেকে জাতীয় পার্টি বর্তমান সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছে সেখানে নতুন মুখ দেয়ায় মাঠের রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন এলাকার অনেক বাসিন্দা।
বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ৬টি আসন বিশ্লেষণ করলে। দৈনিক বাংলার খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনার এই ৬টি আসনের জন্য সেখানে ৫৩ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তবে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করবেন, তাদের অধিকাংশেরই রাজনীতিতে তেমন কোনো পরিচিতি নেই। হঠাৎ করেই তারা কেন সংসদ নির্বাচনে আগ্রহী হলেন, এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে উত্তরও দেননি অধিকাংশ প্রার্থী।
খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের মনোনীত ৬ জন প্রার্থী, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র ২ জন এবং জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বাকি ৪৪ জন প্রার্থী কখনো রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় ছিলেন না।
খুলনা প্রতিনিধির বিশ্লেষণ অনুযায়ী খুলনা-১ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৬ জন। তারা হলেন, জাকের পার্টির মো. আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল, জাতীয় পার্টির কাজী হাসানুর রশিদ, তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় ও আবেদ আলী শেখ।
এদের মধ্যে ননী গোপাল মণ্ডল ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তার পরিচিতি রয়েছে। তবে বাকি চারজন রাজনীতিতে একেবারেই অপরিচিত। তারা প্রত্যেকেই এবার প্রথম সংসদ নির্বাচন করছেন। এদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রশান্ত কুমার রায় পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সাবেক সচিব।
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমি নির্বাচন করছি। আমাকে ডামি প্রার্থীও বলা যাবে। এটা দলীয় নির্দেশেই হচ্ছে।’
আওয়ামী লীগের ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, ‘দল আমাকে আবারও সুযোগ দিয়েছে। আমি দলের সম্মান রাখব বলে আশাবাদী।’
তবে বাকি চার প্রার্থীর তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। জাতীয় পার্টীর কাজী হাসানুর রশিদ ও তৃণমূল বিএনপির গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিকের কাছে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেও কোনো উত্তর মেলেনি।
আর জাকের পার্টি মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলেছে, তাই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’
অন্যদিকে খুলনা-২ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৯ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, গণতন্ত্র পার্টির মো. মতিয়ার রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার, জাকের পার্টির ফরিদা পারভিন, ইসলামী ঐক্যজোটের হিদায়েতুল্লাহ, জাতীয় পার্টির মো. গাউসুল আজম, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের বাবু কুমার রায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সাঈদুর রহমান।
এদের মধ্যে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীর রাজনৈতিকভাবে পরিচিতি রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। তবে বাকিদের আগে কখনো রাজনৈতিক মাঠে দেখা যায়নি।
কেন প্রার্থী হয়েছেন- এমন প্রশ্নে বাংলাদেশ কংগ্রেসের দেবদাস সরকার বলেন, ‘অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন জমা দেয়া হচ্ছে, তাই আমরাও দিচ্ছি।’
খুলনা-৩ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৫ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের এস এম কামাল হোসেন, জাকের পার্টির এস এম সাব্বির হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্বতন্ত্র প্রার্থী কাইজার আহমেদ ও ফাতেমা জামান সাথী।
এদের মধ্যেও শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। তিনি দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক। তিন বারের সংসদ সদস্য ও দুই বারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ানকে সরিয়ে তাকেই আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে। তবে ওই আসনেরও বাকি চারজনের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই।
খুলনা-৪ আসন থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন ১৪ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী, জাকের পার্টির শেখ আনছার আলী, জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম আজমল হোসেন, জাতীয় পার্টির মো. ফরহাদ আহমেদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. মোস্তাফিজুর রহমান, তৃণমূল বিএনপির শেখ হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনিরা সুলতানা, ইসলামী ঐক্যজোটের রিয়াজ উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. জুয়েল রানা, এম ডি এহসানুল হক, মো. রেজভী আলম, এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারা, আতিকুর রহমান ও এইচ এম রওশান জমির।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের আব্দুস সালাম মূর্শেদী বর্তমান সংসদ সদস্য। ২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি জয়ী হয়েছিলেন।
এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম মোর্ত্তজা রশিদী দারার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। তিনি ওই আসনের তিন বারের সাবেক সংসদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুজার আপন ভাই।
তিনি বলেন, এলাকার মানুষের দোয়া নিয়ে মাঠে নেমেছি। জয়-পরাজয় এলাকার মানুষই নির্ধারণ করবেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই আসনে আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এলাকার ভোটাররা বলছেন, বাকি ১২ জন প্রার্থীদের নাম খুব একটা শোনেননি তারা। কেউ কেউ একেবারেই অপরিচিত।
খুলনা-৫ আসনের জন্য মনোনয় জমা দিয়েছেন ৭ জন। তারা হলেন- জাতীয় পার্টির মো. শহীদ আলম, জাকের পার্টির সামাদ সেখ, আওয়ামী লীগের নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, ওয়ার্কার্স পার্টির শেখ সেলিম আকতার, বাংলাদেশ কংগ্রেসের এস এম এ জলিল, ইসলামী ঐক্যজোটের তরিকুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন।
এদের মধ্যে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ একাধিক বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী। এ ছাড়া আকরাম হোসেন ফুলতলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এই আসনেও আওয়ামী লীগের এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডা-হাড্ডি লড়াই হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। বাকি যারা প্রার্থী হয়েছেন এলাকার রাজনীতিতে তাদের তেমন কোনো পরিচিতি নেই বলে জানা গেছে।
খুলনা-৬ আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ১২ জন। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের মো. রশীদুজ্জামান, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির মো. আবু সুফিয়ান, জাকের পার্টির শেখ মর্তুজা আল মামুন, জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধু, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মির্জা গোলাম আজম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এস এম নেওয়াজ মোরশেদ, তৃণমূল বিএনপির গাজী নাদীর উদ্দীন খান, স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম রাজু, গাজী মোস্তফা কামাল, জি এম মাহবুবুল আলম, মো. মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর ও মো. অহিদুজ্জামান মোড়ল।
এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীত মো. রশীদুজ্জামানের কোনো দলীয় পদ নেই। তিনি একসময় পাইকগাছা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যসচিব ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জামানত হারিয়েছিলেন। তবে তাকেই মনোনয়ন দিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে ক্ষমতাসীন দল। ওই আসনে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত রয়েছে জাতীয় পার্টির মো. শফিকুল ইসলাম মধুর। তিনি আগেও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। বাকি প্রার্থীদের তেমন কোনো রাজনৈতিক পরিচিতি নেই। এলাকার সবার কাছে পরিচিত মুখও নন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ আসনেই ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদের স্থানীয়রা তেমন একটা চেনেন না। তবে বিরোধীদের এক অংশ নির্বাচন বর্জন করায় রাজনীতির নতুন সমীকরণ মেলাতে ছোট দলগুলোই নির্বাচনে হতে যাচ্ছে বড় দলগুলোর সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনীযুদ্ধ পার হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী।
জাসদের মাঠপর্যায়ের এক রাজনীতিবিদ জসিম মণ্ডল বলেন, ‘নির্বাচন একটা বড় খেলা। এখানে সবাই নামে নিজ নিজ সমীকরণ মেলানোর জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোর সমীকরণ হয় এক ধরনের, আবার প্রার্থীর সমীকরণ হয় আরেক ধরনের। সবাই নির্বাচনে জয়ী হতে যেমন অংশ নেয় না তেমনই কেউ কেউ নির্বাচনে যায় অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে। আবার অনেকের কাছে ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণই বড় কথা।’ জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয় এ সময় পোস্টারিং করে নিজের ছবি ও পরিচিতি পুরো এলাকার মানুষকে দেখানো যায়। এটাও বা কম কিসে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই আছে নির্বাচনে দাঁড়ানোর অধিকার। তাই কটা টাকা খরচ করে অনেকেই পরিচিতি বাড়ানোর সুযোগ নেয়। এর ফল তো অসীম-সারাজীবন নানাভাবে এর সুফল মেলে। যারা রাজনীতিতে আছেন, কেবল তারাই বোঝেন নির্বাচনে অংশ নিতে পারার গুরুত্ব।
ইউনূস আমলের কিছু নীতিগত সিদ্ধান্তে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টানা টানাপড়েন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের এই পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকারের অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
সংকটের নেপথ্যে অন্তর্বর্তী আমলের নীতিগত সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ: অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অতীতের ঋণের দায়ই নয়, বরং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কিছু পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্তের অভাবও এই আর্থিক সংকটকে ত্বরান্বিত করেছে। যেমন- ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে অতি-আগ্রাসী নীতি ও তারল্য সংকটব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেয়। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই বিভিন্ন ব্যবসায়িক গ্রুপ ও শিল্পোদ্যোক্তাদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (Freeze) করা এবং ঢালাও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে বেসরকারি খাতে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ একপ্রকার স্থবির হয়ে পড়ে।
ব্যাংকগুলোর ওপর আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় মারাত্মক তারল্য সংকট তৈরি হয়। অনেক কারখানা জনবল কমাতে বা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়, যা সামগ্রিক কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও এডিপি বাস্তবায়নে স্থবিরতা: ইউনূস সরকারের ‘ফেক’ বা কাল্পনিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব সংশোধন করতে গিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি কমিয়ে দেয়। পাইপলাইনে কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক ঋণ আটকে থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাবে প্রকৃত অর্থছাড় ১০৩ কোটি ডলার কমে যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সচল হওয়ার গতি হারায়।
ভুল ব্যাংক একীভূতকরণ নীতি: দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ঢালাওভাবে একীভূত করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত ও পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি এবং পরিস্থিতির শিকার উদ্যোক্তাদের আলাদা করতে না পারায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। অতীতের মেগা প্রকল্পের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ সমাপ্তি ও আন্তর্জাতিক সুদের চাপ: যখন অভ্যন্তরীণ কারণে বিদেশি বিনিয়োগ কমছে, ঠিক তখনই অতীতের নেওয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হওয়ায় আসল ও সুদ একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ফ্লোটিং রেট (বাজারভিত্তিক সুদ) বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণ পরিশোধের দায় ৪০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।
প্রশাসনিক শিথিলতা ও আর্থিক খাতের নতুন সিন্ডিকেট : অন্তর্বর্তী আমলের বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। পূর্ববর্তী আমলের দুর্নীতি দমনের নামে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ যেভাবে ভেঙে পুনর্গঠন করা হয়েছে, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব ও নতুন এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণির (সিন্ডিকেট) উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া ব্যাংক দখল বা পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়ায় পর্দার আড়ালে বড় ধরনের আর্থিক অনৈতিক সুবিধা ও তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
উন্নয়ন প্রকল্প ও ক্রয়ে স্বচ্ছতার অভাব : বিগত মেগা প্রকল্পগুলোর দুর্নীতি তদন্তের ধুয়া তুলে অনেক চলমান জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ স্থবির করে রাখা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জরুরি সংস্কার বা জরুরি ক্রয়ের দোহাই দিয়ে টেন্ডার বা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই কিছু বিশেষ সংস্থাকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে, যা অন্তর্বর্তী প্রশাসনের স্বচ্ছতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সুইস ব্যাংকে অর্থ বৃদ্ধি ও তদারকির ব্যর্থতা : ২০২৫ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত ৪১শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে শুধু বৈধ প্রবাসী আয় বা ব্যাংকিং লেনদেন ছিল না; বরং ওই সময়ে দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে কতিপয় মহল দেশ থেকে নতুন করে বিপুল অর্থ পাচার করেছে। দুর্নীতি ও অর্থ পাচার রোধের জোরালো আশ্বাসের পরও মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারির অভাবে ওই সময়ে পুঁজি পাচার ঠেকানো সম্ভব হয়নি। যা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও পরোক্ষ যোগসাজশকে নির্দেশ করে।
এদিকে, এক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে( ইউনূসের আমল) সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দেশটির ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্রাঁ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।
এর আগে ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৯ কোটি সুইস ফ্রাঁ। প্রতি সুইস ফ্রাঁ ১৫২ টাকা ধরলে সুইস ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে সুইস ব্যাংকে ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশিদের অর্থ জমার পরিমাণ ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ জমা ছিল ২০২৫ সালে।
এদিকে, মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিদেশি ঋণের মোট অর্থছাড় কমেছে ১০০ কোটি ডলারের (১ বিলিয়ন) বেশি।
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ সময়ে দেশের মোট ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।
ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ঋণের মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২৩ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে এই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৫৪৯ কোটি ডলার; অর্থাৎ ঋণের প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তিতে বড় ধরনের পতন হয়েছে।
প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিদেশি ঋণের প্রকৃত অর্থছাড়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
রেকর্ড স্পর্শ করেছে ঋণ পরিশোধের দায়: যখন বিদেশি মুদ্রার আগমন বা সহায়তার উৎসগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে, ঠিক তখনই মরার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো চেপে বসেছে অতীতের নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায়।
ইআরডির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের আলোচিত ১১ মাসে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে।
বিগত বছরগুলোতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল বা পদ্মা সেতুর রেল সংযোগের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য যে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অনেকেরই ‘গ্রেস পিরিয়ড’ (ঋণ পরিশোধ শুরু করার আগের সময়কাল) শেষ হয়ে এসেছে। ফলে এখন থেকে আসল ও সুদ—উভয়ই একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় (বিশেষ করে ফ্লোটিং রেট বা বাজারভিত্তিক সুদের ক্ষেত্রে) ঋণ পরিশোধের খরচের খাতা দিন দিন ভারি হচ্ছে।
ইআরডির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ঋণের মোট প্রতিশ্রুতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২৩ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের (২০২৪-২৫) একই সময়ে এই প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৫৪৯ কোটি ডলার; অর্থাৎ ঋণের প্রতিশ্রুতি প্রাপ্তিতে বড় ধরনের পতন হয়েছে।
ইআরডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই সময়ে মোট বিদেশি সহায়তার অর্থছাড় কমে ৪৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫৬১ কোটি ডলার। অর্থাৎ সামগ্রিক সম্পদ প্রবাহে ১০০ কোটি ডলারের বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।’
এর আগে গত ২৪ মে প্রকাশিত ইআরডির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে উন্নয়ন সহযোগীরা ৪২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের অর্থছাড় করেছিল।
ঋণ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ: দেশের অর্থনীতিতে যখন বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ কমছে, ঠিক তখনই ঋণ পরিশোধের দায় ক্রমাগত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই দেশের মোট ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৪০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশকে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে কূটনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা জোরদার করতে হবে। পাইপলাইনে আটকে থাকা কোটি কোটি ডলারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত অর্থছাড়ের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে নতুন কোনো ঋণের চুক্তিতে যাওয়ার আগে তার সুদের হার, শর্ত এবং পরিশোধের সময়সীমা অত্যন্ত কঠোরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। সর্বাগ্রে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিটি ডলারের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে এই সংকট থেকে বাঁচার প্রধান উপায়।
প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে থাকার পর মঙ্গলবার (২৩ জুন) ভোরে সফলভাবে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসসি) জানিয়েছে, ‘বাংলার জয়যাত্রা’ মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টায় হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে।
বিএসসির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার ফলে এই সাফল্য এসেছে। এই অনিশ্চিত সময়ে সরকারের এই সমর্থন জাহাজের ক্রু সদস্যদের মনোবল ধরে রাখতে বিশেষ সহায়তা করেছে।
করপোরেশনটি এ ঘটনাকে বাংলাদেশের সামুদ্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, বড় ধরনের পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রচেষ্টার ইতিবাচক ফলাফলই এ অর্জন।
বর্তমানে জাহাজটি জ্বালানি সংগ্রহ এবং তলার অংশ পরিষ্কার করার (বটম-ক্লিনিং) জন্য ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিএসসি।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের নিকট আজ মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক প্রতিবেদন প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা গোলাম কিবরিয়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চূড়ান্ত বার্ষিক প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কার্যালয়ে এ হস্তান্তর কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় অন্যদের মধ্যে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (প্রশাসন) এ.কে.এ.এম ফজলুল হক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) মিজানুল হক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (আরপিঅ্যান্ডডি) মো. আজিজুল হক, প্রধান প্রকৌশলী আলমগীর হাছিন আহমেদ ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সালেকুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রেসিডেন্ট ও সিইও আলোইস জভিংগি। মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় চীনের দালিয়ান আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাৎকালে আলোইস জভিংগি সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের মতো অন্যান্য ডেল্টা রাষ্ট্র এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সহায়তায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে ২৫০ মিলিয়ন বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি তিনি প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার, বন্যার ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
তিনি আরও জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে উৎসাহ প্রদানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর-সুবিধা প্রদান করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
আলোইস জভিংগি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগকে বৈশ্বিক পরিসরে কাজে লাগানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
আলোইস জভিংগি বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সৃষ্টি করবে।
তিনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।
আলোইস জভিংগি প্রধানমন্ত্রীকে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান।
এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন।
নবম জাতীয় পে-স্কেলের নানা বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সভা ডেকেছে পে-স্কেল নিয়ে গঠিত সচিব কমিটি। এই সভায় চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি, গেজেট প্রকাশ, কয় ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, সচিব কমিটির প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুযায়ী তিন ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হলেও এটি দুই ধাপে করা যায় কিনা সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমন আলোচনা এসেছে। দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে আগামী ১ জুলাই থেকে শতভাগ বেসিক বৃদ্ধি পাবে।
সূত্রের তথ্য বলছে, শুধু বেসিকের বিষয়টিই নয়; সচিব কমিটির সভায় পে-কমিশনের সুপারিশের কতটুকু কার্যকর করা হবে অর্থা পে-কমিশন বেতন বৃদ্ধির যে সুপারিশ করেছিল তার কতটুকু বাস্তবায়ন করা হবে সে বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা কত টাকা বৃদ্ধি করা হবে সেটিও আলোচনা করা হবে।
এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, সচিব কমিটির সভা রয়েছে। সভায় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে। তবে বেসিকের ৫০ শতাংশ নাকি শতভাগ বৃদ্ধি পাবে সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জুলাই থেকে পে-স্কেল কার্যকর হলেও টাকা পেতে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। সচিব কমিটির সভায় অনেক কিছুই চূড়ান্ত হবে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।’
বাংলাদেশের ওপর বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই (জুলাই-মে) বিদেশি ঋণদাতাদের অতীতের ঋণের সুদ ও আসল বাবদ ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলারের বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। এর বড় অংশই গেছে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপানের কাছে। অন্যদিকে প্রতিবেদন সূত্রে দেখো গেছে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমেছে। মঙ্গলবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জুলাই-মে মাসের বিদেশি ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ওই ১১ মাসে আগের নেয়া ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন ঋণ দাতাসংস্থা ও দেশকে ৪১৩ কোটি ২৩ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে, যা বিদেশি ঋণ শোধে নতুন রেকর্ড। এ ছাড়া টাকার হিসাবে ওই সময়ে ৫০ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা অর্থাৎ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি শোধ করতে হয়েছে। জুলাই-মে সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে প্রায় ৪৫৮ কোটি ডলার।
গত কয়েক বছর ধরে বিদেশি ঋণ পরিশোধে চাপ বেড়েছে। গত অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চার বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। গত অর্থবছরের বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে ৪০৯ কোটি ডলার শোধ করেছে বাংলাদেশ। এবার ১১ মাসেই এর চেয়ে বেশি শোধ করল বাংলাদেশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ঋণ শোধের পরিমাণ ছিল ৩৩৭ কোটি ডলার।
ইআরডির প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) বিদেশি ঋণের আসল ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ডলার ও সুদ ১৪৫ কোটি ডলার শোধ করেছে সরকার। অন্যদিকে ৪১৪ কোটি ডলার ঋণ হিসেবে এবং ৪৩ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ৪২২ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে সাড়ে ৫০০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছিল।
গত ১১ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক দিয়েছে প্রায় ৯৬ কোটি ডলার। এরপর আছে রাশিয়া। রাশিয়া ৯৩ কোটি ডলার। আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে ৭৮ কোটি ডলার। চীন ও ভারত ছাড় করেছে যথাক্রমে ৫৩ কোটি ডলার ও ২৫ কোটি ডলার। জাপান দিয়েছে ৪৩ কোটি ডলার।
সরকার বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান নেয়। এ ছাড়া বাজেট সহায়তা হিসেবেও অর্থ নেয়। এ ছাড়া বেসরকারি খাতকেও উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণ দেয়।
জুলাই আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের হুমকি দেওয়াসহ নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় উপস্থিত থাকা একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া শিক্ষকরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দীন, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজমল হোসেন ভূঁইয়া। এ ছাড়া একই অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা লাভলু মোল্লা শিশিরকেও (মুহাম্মদ লাভলু মোল্লা) সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক চৌধুরী মো. তাশরিক-ই-হাবিবকে বিভাগের একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ অনুয়ায়ী একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গান গেয়ে ব্যাপক পরিমাণ ভাইরাল হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি- এমপি বলেছেন, আধুনিক সভ্যতায় বিদ্যুৎ ছাড়া উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি কল্পনা করা যায় না। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারাদেশে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বিভিন্ন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
আজ (মঙ্গলবার) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত “Solar Revolution : Lessons for Bangladesh from National Budget Perspective” শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, বর্তমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। সরকার সৌরবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে মালয়েশিয়া ও চীন সফরে রয়েছেন। এ সফর দু’টি বাংলাদেশের জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে নতুন বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ইতিবাচক অগ্রগতির বিষয়ে দেশবাসী শিগগিরই সুখবর পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মোঃ নূরুল ইসলাম মনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক। সাধারণত চার বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের অর্থ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে এসব প্রকল্প থেকে আর্থিক ও পরিবেশগত সুফল পাওয়া যায়।
তিনি দেশের জ্বালানি খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে নবায়নযোগ্য জ্বালানী বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ, সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ গণসমাধ্যমকর্মীগণ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চীফ হুইপ মোঃ নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, দেশের বিদ্যমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার একটি মানবিক, জনকল্যাণমুখী ও সাশ্রয়ী বাজেট প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
আজ (মঙ্গলবার) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এমবিএ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমএবি) আয়োজিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটবিষয়ক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যাংকিং খাতের অনিশ্চয়তা ও আমানতকারীদের নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে চীফ হুইপ বলেন, বিগত সরকারের সময় এমন একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল, যার ফলে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলে আমানতকারী তাঁর জমার পরিমাণ যাই হোক না কেন, সর্বোচ্চ এক লাখ টাকাই ফেরত পেতেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, “কেন এ ধরনের আইন করা হয়েছিল এবং কেন জনগণকে তা মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছিল?” তাঁর মতে, তৎকালীন সরকার ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তিনি বলেন, “ব্যাংকিং খাতকে কার্যত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।” এ খাতের টেকসই সংস্কারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর আলোচনা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অর্থ পাচার ও মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে চীফ হুইপ তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থের চাপ সামাল দিতে ডলারের মূল্য ৮২ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকায় উন্নীত করা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, একদিনেই ডলারের দাম ৭ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এর ফলে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতির বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে বহন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও গণতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরে চীফ হুইপ অতীতের বাকশাল শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “বাকশালের মাধ্যমে দেশের মৌলিক অধিকার ও বিচারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।” একই সঙ্গে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, “জিয়াউর রহমান অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে নিয়েছিলেন এবং কৃষি উৎপাদনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।” তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান।
বাজেটকে কেবল সংখ্যার হিসাব হিসেবে না দেখে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে চীফ হুইপ বলেন, “বাজেট নিয়ে আমরা অনেক তাত্ত্বিক আলোচনা করি; কিন্তু সাধারণ মানুষের কান্না থামানো এবং তাদের জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই বাজেট প্রণয়ন করেছে। এ সময় তিনি সমাজের অবহেলিত ও বঞ্চিত মানুষের কষ্ট লাঘব এবং লুণ্ঠিত সম্পদ পুনরুদ্ধারে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
দেশের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করতে গঠনমূলক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুযোগ উন্মুক্ত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে চীফ হুইপ দেশের স্বার্থে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
এমএবির সভাপতি সৈয়দ আলমগীরের সভাপতিত্বে এবং ড. মোঃ শামসুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. এ. কে. এম. ওয়ারেছুল করিম। অনুষ্ঠানে সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, জুবায়ের আহমেদ বাবুসহ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখেন।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং তাদের কৃতকর্মের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (২৩ জুন) তথ্য অধিদফতরে আয়োজিত এক সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
ডা. জাহেদ উর রহমান দলটির আইনি অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “আওয়ামী লীগ দলটা নিষিদ্ধ হবে কি হবে না—সেটা নির্ধারিত হবে আদালতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। তারা মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিল কি ছিল না, সেটা বিচারের পর নির্ধারিত হবে।” তবে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, বর্তমান আইন অনুযায়ী তাদের সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে নিষিদ্ধ থাকবে। যদি এই দল মাঠে কোনো কর্মসূচি পালন করার চেষ্টা করে, তবে সেটি আইন ভঙ্গ হিসেবে গণ্য হবে এবং সরকার কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে।
তথ্য উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন যে, আওয়ামী লীগের রাজপথে নামার মতো কোনো নৈতিক সাহস অবশিষ্ট নেই। তাঁর মতে, কোনো বড় রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হলে যে ধরনের নৈতিক শক্তির প্রয়োজন হয়, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে দলটির নেই। তিনি রসিকতা করে বলেন, “আমরা বলি না ‘চোরের মায়ের বড় গলা’, সবার ডিমেনশিয়া হবে, মানে সবাই সবকিছু ভুলে যাবে আর কি! তারপর আওয়ামী লীগ বড় গলায় কথা বলতে পারবে, এর আগে আমার মনে হয় না।” রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে থাকলেও সরকারই প্রশাসনিকভাবে এই নিষিদ্ধ সংগঠনের অপতৎপরতা রুখে দেবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যেকোনো ধরনের নাশকতা, বিশৃঙ্খলা ও অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবিলায় পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকাল থেকেই রাজধানীর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।
নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর মহানগরসহ নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর অধীনে সেনাসদস্যরা মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যেখানে নিষিদ্ধ দলটির ‘অপতৎপরতা’ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে, সেখানেই বিশেষ এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে ডিএমপির প্রায় ১৮ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং নগরজুড়ে ২০০টির বেশি চেকপোস্ট ও পিকেট বসানো হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী জানান, গুলিস্তান, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, মতিঝিল, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরসহ যেসব এলাকায় জনসমাগমের সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে বাড়তি পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা পরিদর্শনে এসে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং পবিত্র মহরম মাসকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নাশকতা যাতে না ঘটে, সেজন্য পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।” ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কঠোর তল্লাশি কার্যক্রম চলছে এবং সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা হচ্ছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১৫টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ডিএমপি জানিয়েছে, রাজধানীর চারটি প্রধান কন্ট্রোলরুমে পর্যাপ্ত রিজার্ভ ফোর্স রাখা হয়েছে যাতে তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। জননিরাপত্তা ও জানমালের সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই বিশেষ তৎপরতা পুরো মাসজুড়েই অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রায় চার মাস ধরে চলা গভীর অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ কাটিয়ে অবশেষে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৩টার দিকে জাহাজটি সফলভাবে এই নৌপথ পাড়ি দিতে সক্ষম হয়। বিএসসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জাহাজটি বর্তমানে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাহাজে অবস্থানরত ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রু সদস্য সবাই সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সুস্থ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
‘বাংলার জয়যাত্রা’র এই সংকটময় পরিস্থিতির সূত্রপাত হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে জাহাজটি। এরপর কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল নিয়ে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করলে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে জাহাজটির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এটি কার্যত পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে জাহাজটির পূর্বনির্ধারিত কুয়েত সফরের পরিকল্পনা বাতিল করে বিএসসি কর্তৃপক্ষ। সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে জাহাজটিকে সরিয়ে নিতে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজটি দীর্ঘ সময় সৌদি আরবের বন্দরেই অবস্থান করতে বাধ্য হয়। অবশেষে নৌপথটি উন্মুক্ত হওয়ায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশি এই জাহাজটি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফর দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক সোনালী অধ্যায়ের সূচনা হলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এই সফর মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ভাগ্যদ্বার উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সোমবার (২২ জুন) কুয়ালালামপুরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর মহাপরিকল্পনা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সোমবার (২২ জুন) স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় পুত্রজায়ায় দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। বৈঠক শেষে দুই দেশের সরকারপ্রধান এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় তিনি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং তার এই দায়িত্ব গ্রহণকে বাংলাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পথে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে অভিহিত করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিস্তারিত বিষয়বস্তু তুলে ধরে বক্তব্য দেন।
শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার আহ্বান: যৌথ সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করেছি। পাশাপাশি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটকে পড়া বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও উত্থাপন করেছি।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা একমত হয়েছি যে শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী; যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা দূর হয় এবং শ্রমিকদের অভিবাসন ব্যয় হ্রাস পায়।’
শুভেচ্ছা ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের স্মরণ: সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রথম যে শুভেচ্ছাবার্তা পেয়েছিলাম, তা ছিল প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের। তিনি আমাকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আন্তরিক আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বিদেশ সফরে সহধর্মিণীকে সঙ্গে নিয়ে মালয়েশিয়ায় আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত।
এ সময় তিনি তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক মালয়েশিয়া সফরের কথা স্মরণ করে বলেন, সেই সফর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শ্রমবিষয়ক সহযোগিতার মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেছিল। একই সঙ্গে তিনি তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯৩ সালের মালয়েশিয়া সফরের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই সফর দুই দেশের বন্ধুত্বকে আরও গভীর এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করেছিল।
মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক আস্থা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং জনগণের মধ্যকার দৃঢ় সম্পর্কের ভিত্তিতে এই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। মালয়েশিয়ায় উষ্ণ অভ্যর্থনা ও চমৎকার আতিথেয়তার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, দেশটির সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, আমরা মধুর স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরছি।
দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর জোরদার ও ২০২৭ সালের মধ্যে এফটিএ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটিকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আখ্যা দিয়ে বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার ব্যাপক ও অর্থপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আমরা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মতবিনিময় করেছি। আজ আমরা বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছি। যৌথ কমিশন বৈঠক এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় পরামর্শপ্রক্রিয়াসহ বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়েছি এবং বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে একটি ‘পারস্পরিক কল্যাণকর, ব্যাপক ও দূরদর্শী’ চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে ২০২৭ সালের মধ্যে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে দুই দেশ। উভয় নেতাই স্বীকার করেন যে, দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হলো বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের আহ্বান: বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জনগণের কাছ থেকে শক্তিশালী জনসমর্থন ও বিপুল ম্যান্ডেট পেয়েছে। জনগণের এই বিপুল সমর্থনের ভিত্তিতে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। আমরা একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলছি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছি। তিনি দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য তিনি আন্তরিক আমন্ত্রণ জানান।
বহুমুখী খাতে কৌশলগত অংশীদারিত্ব: দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ দিতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। আলোচনার প্রধান ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ছিল-উচ্চ মূল্য সংযোজন ও প্রযুক্তি খাত: তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (ICT), ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার।
অবকাঠামো ও লজিস্টিকস: সড়ক, সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দর এবং লজিস্টিকস খাত।
শিল্প ও কৃষি: হালাল শিল্প এবং কৃষিভিত্তিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ।
উভয় নেতা সরকারি সংস্থা, বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন; যার মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনবল উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলে অংশগ্রহণ জোরদার করা সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যে ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল (JBC)’ প্রতিষ্ঠার অগ্রগতিকে দুই প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানান, যা বেসরকারি খাতের সহযোগিতার প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি: জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহ, এলএনজি অবকাঠামো এবং পেট্রোলিয়াম পণ্যবিষয়ক বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সম্মত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরসহ অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
শিক্ষা, পর্যটন ও সংস্কৃতি: মালয়েশিয়ায় বর্তমানে অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অবদান উল্লেখ করে দুই প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ (TVET) খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে একমত হন। একই সঙ্গে যোগ্যতার/সনদের পারস্পরিক recognition (স্বীকৃতি), যৌথ ডিগ্রি কর্মসূচি এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাক্রমের সামঞ্জস্য জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এছাড়া, মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিকেল ট্যুরিজম ২০২৬’ কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে দুই দেশ পর্যটন প্রচার ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিক, শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও উদ্যোক্তারা দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছেন বলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেন।
প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা: দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষা সম্পর্কের প্রশংসা করে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারক (MoU) পুরোপুরি কার্যকর করার অঙ্গীকার করা হয়। সামরিক বিজ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদারিত্বে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি কাঠামোগত রূপরেখা তৈরির জন্য 'প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক যৌথ কমিটি (JCDC)’ বৈঠক আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। এছাড়া, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যৌথ প্রশিক্ষণ, কৌশলগত মহড়া ও জ্ঞান বিনিময় অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রবাদ, মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় crime (অপরাধ) মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
রোহিঙ্গা সংকট ও বৈশ্বিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক সমর্থনের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়াও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে সংহতি পুনর্ব্যক্ত করে।
বৈশ্বিক ইস্যুতে দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন এবং সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেস্থার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ন্যায়সম্মত ও স্থায়ী শান্তির পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অন্যান্য প্রচলিত ও অপ্রচলিত নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘ ও ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের অঙ্গীকার করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করায় মালয়েশিয়াকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ও আমন্ত্রণ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তার সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের উদাত্ত আমন্ত্রণ জানান।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। এই সফরে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, শিক্ষা ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম।