সিলেট গ্যাসক্ষেত্রের ১০ নম্বর কূপে (অনুসন্ধান কূপ) গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এখান থেকে দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ ব্যারেল হারে তেল পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। এ সময় বিজয়ের মাসে এটা সবার জন্য ‘বিরাট সুখবর’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আজ রোববার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এ ঘোষণা দেন।
সিলেট তামাবিল-জাফলং মহাসড়কের পাশে গোয়াইনঘাট উপজেলার আলীরগাঁও ইউনিয়নের বাঘের সড়ক এলাকায় অবস্থিত এই অনুসন্ধান কূপে দুই মাস আগে খনন কাজ শুরু করে সরকারি প্রতিষ্ঠান সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড কোম্পানি। গত ১৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কূপটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী জানান, সিলেট-১০ নম্বর গ্যাসকূপে ২ হাজার ৫৭৬ মিটার গভীরতায় খনন সম্পন্ন হয়েছে। কূপটিতে তিনটি স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরমধ্যে সবচেয়ে নিচের স্তরটি ২ হাজার ৫৪০ থেকে ২ হাজার ৫৫০ মিটার পর্যন্ত পরীক্ষা করে ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রবাহ পাওয়া গেছে; যার ফ্লোয়িং প্রেসার ৩ হাজার ২৫০ পিএসআই। গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ৪৩ থেকে ১০০ বিলিয়ন ঘনফুট।
এ ছাড়া ২ হাজার ৪৬০ থেকে ২ হাজার ৪৭৫ মিটার গভীরে আরও একটি ভালো গ্যাস স্তর পাওয়া গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে পরীক্ষা করলে ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি। আর ২ হাজার ২৯০ থেকে ২ হাজার ৩১০ মিটার গভীরেও গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
গ্যাস ছাড়াও ওপরের দিকে ১ হাজার ৩৯৭ থেকে ১ হাজার ৪৪৫ মিটার গভীরতায় আরও একটি জোন পাওয়া গেছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, যেখানে শুক্রবার (৮ ডিসেম্বর) পরীক্ষা করে তেলের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যার প্রাথমিকভাবে এপিআই গ্রাভিটি ২৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি। সেলফ প্রেসারে প্রতি ঘণ্টায় ৩৫ ব্যারেল তেলের প্রবাহ পাওয়া যাচ্ছে। পরীক্ষা সম্পন্ন হলে মোট তেলের মজুত জানা যাবে।
একযোগে উৎপাদন করা হলে এই কূপটি প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর সাসটেইন করবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘গড় ভারিত মূল্য হিসেবে এর মূল্য প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যদি ২০ মিলিয়ন ঘনফুট হারে উৎপাদন করা হয়, তাহলে কূপটি ১৫ বছরেরও বেশি সময় সাসটেইন করবে।’
এর আগে ১৯৮৬ সালে হরিপুরে তেলের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সেই কূপটির স্থায়িত্ব ছিল পাঁচ বছর। সেখানে গ্রাভিটি পাওয়া গিয়েছিল এপিআই গ্রাভিটি ২৭ ডিগ্রি। এবার যে তেলের মজুত পাওয়া যাচ্ছে। সেই তেল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। এর এপিআই গ্রাভিটি ২৯ দশমিক ৭ ডিগ্রি।’
প্রথম দিনে দুই ঘণ্টায় ৭০ ব্যারেলের মতো তেল উত্তোলন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তেল উত্তোলন আমরা আপাতত বন্ধ রেখেছি। এটা আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে, মোট মজুতের পরিমাণটা আমরা জানতে পারব। পুরো বিষয়টির বিস্তারিত জানতে আরও চার থেকে পাঁচ মাস সময় লাগবে।’
এ কূপে গ্যাস ও তেলের স্তর ভিন্ন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে একটি ভালো দিক হলো গ্যাস ও তেলের স্তর ভিন্ন। আগে আমাদের গ্যাসের সঙ্গে কিছুটা তেল আসত। যেটা আমরা কনডেসার হিসেবে ব্যবহার করতাম। এখন তেলটা ভিন্ন স্তর হওয়ায় সেটা আরও ভালো হবে।’
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রাখতে কৌশলগত নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা অবশ্যই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে পরিচালিত হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণ সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সুবিধার ভিত্তিতে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।’
আজ বঙ্গভবনে ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬ এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬-এ অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য প্রদানকালে রাষ্ট্রপতি এ গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে মানসম্মত নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় স্বার্থ অর্জনে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
তিনি এসময় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের অসামান্য অবদান ও স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করে তিনি তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
এসময় তিনি ১৯৭৭ সালে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পেশাদার সামরিক শিক্ষা বিস্তারে জিয়াউর রহমানের অবদানের কথাও স্মরণ করেন।
রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ও গত ১৭ বছরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে আত্মোৎসর্গকারীদের স্মরণ করেন এবং জনগণের মর্যাদা সমুন্নত রাখা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দেওয়ার জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, প্রচলিত নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন, সাইবার হুমকি, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, মহামারি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সামরিক প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও জড়িত।
পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গোপসাগর ও বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে সতর্কতা ও দূরদর্শিতার গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তি যুদ্ধ ও নিরাপত্তার ধরন পরিবর্তন করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে ভুল তথ্য, অপতথ্য এবং সাইবার হুমকি জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
উদীয়মান এই বাস্তবতা মোকাবিলায় কৌশলগত দূরদর্শিতা, সঠিক বিচার-বিশ্লেষণ, বুদ্ধিবৃত্তিক উদারতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দেশের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতাসম্পন্ন নেতৃত্ব প্রয়োজন বলে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন।
ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি সশস্ত্র বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে মতবিনিময় ও সমসাময়িক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে অভিন্ন উপলব্ধি গড়ে তোলার একটি অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
রাষ্ট্রপতি ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স-২০২৬ এবং আর্মড ফোর্সেস ওয়ার কোর্স-২০২৬-এর অংশগ্রহণকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে স্থান দিতে হবে। একই সঙ্গে পেশাদারিত্ব, সততা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি বজায় রেখে কাজ করতে হবে।
কোর্সে অন্য দেশের অংশগ্রহণকারীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে তাঁদের এই অভিজ্ঞতা তাদের নিজে নিজ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা জোরদারে সহায়ক হবে।
রাষ্ট্রপতি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, জাতিসমূহের মধ্যে বন্ধুত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা, মতবিরোধের পরিবর্তে সংলাপ এবং সংঘর্ষের পরিবর্তে শান্তির আহ্বান জানান।
পাশাপাশি সক্ষম ও দূরদর্শী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার জন্য ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো: ফয়জুর রহমান।
এ সময়ে উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের ফ্যাকাল্টির সদস্য, এনডিসি কোর্স সম্পন্নকারী সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, এএফডব্লিউসি কোর্স সম্পন্নকারী সেনাবাহিনীর অফিসার, এনডিসি কোর্সে অংশগ্রহণকারী বিদেশি কোর্স সদস্য, আর্মি স্টাফ অফিসারবৃন্দ ও জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার (জেসিও)গণ এবং বঙ্গভবনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
উল্লেখ্য, ন্যাশনাল ডিফেন্স কোর্স ২০২৬-এ বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী থেকে ৫৪ জন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস থেকে ১৮ জন এবং বন্ধুপ্রতিম ১৭টি দেশ থেকে ৩১ জনসহ মোট ১০৩ জন সদস্য অংশ নেন। সূত্র: বাসস
শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও মজুরির দাবিকে হাতিয়ার বানিয়ে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কোনো চক্রান্তই সফল হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের পথ উন্মুক্ত থাকলেও শিল্প খাতে কোনো ধরনের তাণ্ডব, ভাঙচুর কিংবা নাশকতার সুযোগ দেওয়া হবে না।
সোমবার (২ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক পোস্টে তিনি এসব অভিমত ব্যক্ত করেন।
পোশাক খাতের পটভূমি তুলে ধরে মাহদী আমিন উল্লেখ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উদ্যোগেই বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের ঐতিহাসিক সূচনা ঘটেছিল, যার মাধ্যমে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থানের দিগন্ত উন্মোচিত হয়। পরবর্তী সময়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেও এ শিল্পের বিস্তার এবং শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা হয়েছিল।
তিনি জানান, সেই ধারা বজায় রেখে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শ্রমবান্ধব প্রশাসন মেহনতি মানুষের ন্যায্য মজুরি, আত্মমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর অতি দ্রুততার সঙ্গে বিগত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় শ্রমিকদের সমুদয় বেতন ও বোনাস যথাসময়ে পরিশোধের বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করেছে।
পোশাক শিল্পের সঙ্গে লাখ লাখ শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ও সামগ্রিক অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই উপদেষ্টা জানান, শ্রমিকদের উপযুক্ত মজুরি নিশ্চিতের পাশাপাশি কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয়, সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতার দিকগুলোকেও গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে। এ কারণেই মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে পোশাক খাতের মজুরি পুনর্নির্ধারণে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। সবার ইতিবাচক আলোচনার মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক ন্যূনতম মজুরি চূড়ান্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে মজুরি নির্ধারণ প্রক্রিয়ার মধ্যেও একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করতে অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন মাহদী আমিন। তিনি লেখেন, ‘পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের উসকানি ও নাশকতার মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। কারখানায় আক্রমণ, আগুন দেওয়া ও পুলিশের ওপর হামলা শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থি।’
শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা বন্ধ হয়ে পড়লে খোদ শ্রমিকরাই সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে কর্মহীনতা বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয় কমার পাশাপাশি সার্বিক অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ে পড়বে; তাই কোনো ধরনের সহিংসতা কিংবা শিল্প ধ্বংসের অপতৎপরতাকে বরদাশত করা হবে না।
সাধারণ শ্রমিকদের উসকানি ও গুজবের ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ‘সাধারণ শ্রমিক ভাই-বোনদের প্রতি আমাদের আহ্বান, কোনো ধরনের গুজব বা উসকানিতে পা দেবেন না। যেকোনো যৌক্তিক ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় শ্রমবান্ধব সরকার সবসময় আপনাদের পাশে থাকবে।’
ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ এবং জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আজ বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও করণীয় বিষয়ে এক সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ কথা জানান।
সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলোতে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো ভবন শনাক্ত, ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস এবং অন্যান্য জরুরি সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা, উদ্ধার সরঞ্জামের পর্যাপ্ততা, উদ্ধারকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভূমিকম্পবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।
সভায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলাম রিজুসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। সূত্র: বাসস
সাধারণ ও নিরীহ পোশাক শ্রমিকদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজপথে নাশকতা, সড়ক অবরোধ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে দেশে চরম অস্থিরতা তৈরির নেপথ্যে কিছু কারখানা মালিকের সরাসরি জড়িত থাকার অডিও ও ভিডিও প্রমাণ সরকারের হাতে এসেছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সোমবার সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে তৈরি পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতা নিরসনে গার্মেন্টস মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিগত কিছুদিন ধরে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শক্তির মদদপুষ্ট কিছু পক্ষ শ্রমিক অসন্তোষের আড়ালে রাজপথ উত্তপ্ত করে দেশকে অস্থিতিশীল করার সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। অথচ প্রকৃত উৎপাদনমুখী শ্রমিক কিংবা তাঁদের ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা কখনই নিজেদের রুটি-রুজির কর্মসংস্থান ধ্বংস অথবা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি প্রত্যাশা করেন না। অডিও ও ভিডিওর মতো সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এ সংঘাতের পেছনে থাকা মূল ইন্ধনদাতা এবং চিহ্নিত কিছু শিল্পমালিককে ইতিমধ্যে আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
পোশাক খাতের সংকট নিরসনে আয়োজিত এই বিশেষ বৈঠকে সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, শ্রমিক নেতা ও সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার। এ ছাড়া বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম ও নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানসহ পুলিশ এবং বিভিন্ন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা এতে অংশ নেন।
শিল্পের নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীলতা নিশ্চিতের প্রত্যয় ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের কোনো কারখানা যেন এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ না হয় এবং একজন শ্রমিকও যাতে চাকরি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে লক্ষ্যে প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতায় সোমবার বিকেলেই সকল শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক আরেকটি সমন্বিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং উভয় পক্ষের বাস্তবসম্মত মতামতের ভিত্তিতেই পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে বলে জানান তিনি।
মোটরসাইকেলের সামনের অংশে রেজিস্ট্রেশন নম্বরপ্লেট প্রদর্শনের প্রচলিত নীতিমালায় সংশোধনী এনেছে সরকার। নতুন বিধানের আওতায় দ্বিচক্রযানের কাঠামোগত নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামনের অংশে নিবন্ধন নম্বর এক লাইনে লেখার অনুমতি দিতে পারবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। একই সঙ্গে বিভিন্ন মাপের বিপরীতমুখী রেট্রো-রিফ্লেক্টিভ প্লেট ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ারও দেওয়া হয়েছে সংস্থাটিকে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা এ-সংক্রান্ত সংশোধিত প্রজ্ঞাপনটি রবিবার বাংলাদেশ গেজেটে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে গত ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে প্রজ্ঞাপনটিতে স্বাক্ষর করেন উপসচিব আল-আমীন মো. নুরুল ইসলাম। আদেশে জানানো হয়, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১২২ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর ৩৬ বিধিতে এই সময়োপযোগী পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, পূর্বে নির্ধারিত পদ্ধতির পাশাপাশি বিআরটিএর বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে সামনের নম্বরপ্লেটে এক সারিতেই রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রদর্শন করা যাবে। সে ক্ষেত্রে জেলা বা অঞ্চলের নাম এবং যানের শ্রেণি নির্দেশক অক্ষরের পর নির্দিষ্ট মাপের হাইফেন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সামনের নম্বরপ্লেটের অক্ষরের উচ্চতা, জেলা বা অঞ্চলের নামের মাত্রা, যানবাহনের শ্রেণি নির্দেশক হরফের অনুপাত, প্লেটের উপরিভাগের ফাঁকা অংশ এবং সংখ্যানুক্রমের মধ্যবর্তী দূরত্ব নির্ধারণের প্রশাসনিক কর্তৃত্বও বিআরটিএকে দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, সড়ক পরিবহন বিধিমালার ৩৬ বিধির উপবিধি (১০) থেকে ‘মোটরসাইকেল এবং’ শব্দ দুটি প্রত্যাহার করে বিলুপ্ত করা হয়েছে। নতুন এই সংশোধিত বিধিমালা অবিলম্বে কার্যকর বলে গণ্য হবে।
শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপতৎপরতা সরকার অত্যন্ত কঠোর হাতে প্রতিহত করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করেন, শ্রমিক আন্দোলনের নামে অনেকেই ভিন্ন অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে সীমান্তের ওপারের ইশারায় দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন। সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে তৈরি পোশাক কারখানার মালিক নেতাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাজপথে আন্দোলনের নামে আইনবহির্ভূত তৎপরতা ও জনজীবনে দুর্ভোগ তৈরির চেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। যারা শ্রমিক আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে নাশকতায় জড়াবে কিংবা আইন অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শিল্পাঞ্চলে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে, তার সঙ্গে প্রকৃত সাধারণ পোশাকশ্রমিকেরা জড়িত ছিলেন না; বরং ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তির দোসররাই ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এসব সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মহলে আলোচিত ‘ডিসেম্বর’ ইস্যু নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ডিসেম্বর হলো জাতির মহান বিজয়ের মাস এবং এ মাসে রাষ্ট্রীয় নানাবিধ গৌরবময় কর্মসূচি থাকবে। কোনো পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি যদি দেশে ফিরতে চায়, তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা না করে তাদের এখনই ফিরে আসা উচিত। দেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁদের প্রচলিত আইন অনুসারেই বিচার ও আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদেশে আত্মগোপনে থাকা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক নিয়মে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। মূলত নিজেদের হতাশ ও পলাতক নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতেই একটি মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে ডিসেম্বরের কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
বর্তমান সরকারের মাস্টার প্রকল্প পদ্মা ব্যারাজ জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি বাস্তবায়িত হলে পরিকল্পিতভাবে পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এতে একদিকে যেমন শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট দূর হবে, আবার অন্যদিকে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও নদী ভাঙন রোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইভাবে পানি ও মাটি থেকে অতিরিক্ত লবণাক্ততা কমিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক রাখবে।
তাই এটি বাংলাদেশের পানি, কৃষি, অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য অবশম্ভাবী একটি প্রকল্প।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
আর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দাবি, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নে বছরে মাছের উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন বৃদ্ধিসহ সব মিলিয়ে বছরে ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে।
এক সময় প্রাণবন্ত ছিল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ-নদীগুলো। ১৯৭০-এর দশকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি সরিয়ে নেয়ার কারণে বাংলাদেশে পদ্মা নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল মরুকরণ হয় শুষ্ক মৌসুমে। এখন মৃতপ্রায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতি ও বড়াল নদী।
নদীগুলোতে পলি মাটির স্তর পড়েও লবণাক্ততার সৃষ্টি হয়। আবার বর্ষাকালে পানি বাড়লে সেই পানি ধারণের অবস্থাও থাকে না। তখন বন্যার কবলে পড়ে এসব অঞ্চলের জনপদ।
পরিবেশের এ বিরূপ আচরণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, আবহাওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ অর্থনীতি, সেচ, কৃষি, মাছ উৎপাদন ও নৌ চলাচল দারুণভাবে ব্যাহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো জীববৈচিত্র্য। এর প্রভাবে দেশের কয়েক কোটি মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েন।
পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক এ সংকট দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী-খালগুলোতে লবণাক্ততার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলের মানুষ খাওয়ার পানি পর্যন্ত পায় না শুষ্ক মৌসুমে। কৃষি জমিতে কৃষকরা সেচের পানি না পেয়ে মেশিন দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে জমিতে দেয়। এতে পানির স্তুর নিচে নেমে যাচ্ছে, বাড়ছে আর্সনিক।
এছাড়া মৃতপ্রায় নদীতে মাছের উৎপাদন কমছে শুষ্ক মৌসুমে। বেকার হয়ে পড়েছেন অনেক জেলে। পানি না থাকায় নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যহত হচ্ছে। সুন্দরবনের জীববৈচিত্রের ওপরও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এরই মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার (পদ্মা) পানি বণ্টন চুক্তরে মেয়াদও আগামী ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে।
এ পরিস্থিতিতে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান সরকারের প্রথম মেগা প্রকল্প পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সর্বশেষ আপডেট জানিয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বাসসকে বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে কাজ অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। পানি ভবনে পদ্মা ব্যারাজ সংশ্লিষ্ট একটি অফিস আলাদা করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর পাংশার হাবাসপুরে প্রকল্পের সাইট পরিদর্শন করেছি আমরা। গত ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগর উপজেলার সাতবাড়িয়া কাঞ্চনপার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছি। ব্যারাজের কাজের অগ্রগতি আরও গতিশীল হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা ব্যারাজের দৃশ্যমান কাজের উদ্বোধন করবেন।
পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের সুবিধার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের চার বিভাগের ১৯টি জেলার ১২০টি উপজেলার প্রায় ৭ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। কৃষি ও অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, পানিতে লবণাক্ততার কারণে আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছর পর ওই অঞ্চলে মানুষ আর বসবাস করতে পারবে না। সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে। মাছসহ অন্য প্রাণী ক্ষতিগ্রস্থ হবে। কিন্তু পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ স্বর্ণযুগে প্রবেশ করবে। কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
গত ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক কমটির সভায় পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি বাস্তবায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা অনুমোদন দিয়েছে সরকার। প্রকল্পের পুরো অর্থায়ন হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে।
তবে দ্বিতীয় ধাপে ব্যয় আরও বাড়বে। ব্যারাজটি চলতি বছরের জুলাই মাসে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন জানায়, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ প্রকল্প বিএনপি সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতি রক্ষায় এবং শুষ্ক মৌসুমে পানিসঙ্কট দূর করতে এ ব্যারাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। মূলত বর্ষার পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রিত পানি সরবরাহের জন্য বাঁধটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় মূল অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এর সঙ্গে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট (স্পিলওয়ে), ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ (আন্ডারস্লুইস), দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ।
ব্যারাজটিতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেইসঙ্গে থাকবে ১১৩ মেগাওয়াট জল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার। প্রতিবছর বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের কারণে গত দুই দশকে পদ্মা নদী বিধৌত বিভিন্ন এলাকায় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি নদীভাঙনের কবলে পড়েছে।
পদ্মা নদীর তীরবর্তী জেলাগুলোতে প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবার প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের আওতায় নদীর নাব্যতা রক্ষায় নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম, তীর সংরক্ষণ বাঁধ নির্মাণ ও নদীর প্রবাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে নদীভাঙনের হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন বাসসকে বলেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বেশি লবণাক্ততার কারণে খাওয়ার পানির সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এ পানির সংকটের পাশাপাশি সুন্দরবন ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা আরও বাড়বে। এছাড়া বাড়বে পলি জমার কারণে জলাবদ্ধতা। এ জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে ওই অঞ্চলগুলোতে ফ্রেশ পানির সর্বচ্চ সরবরাহ ও প্রবাহ। এ ক্ষেত্রে পদ্মা ব্যারাজ বড় ভূমিকা রাখবে।
মাশফিকুস সালেহীন বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হবে, পানি ও মাটিতে থাকা লবণাক্ততা হ্রাস পাবে। নিঃসন্দেহে প্রকল্পটি ওই অঞ্চলের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করবে, তবে নির্মাণের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি জমা, নদীভাঙন, উজানে নদী ক্ষয় ও পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সরকার নিশ্চয় সেগুলো বিবেচনা করেই এগোচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যারেজের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী ও পদ্মা ব্যারাজ-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বাসসকে বলেন, পদ্মা ব্যারাজ জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফারাক্কা বাঁধের কারণে আমাদের এক তৃতীয়াংশ ভূমি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়া নৌ-চলাচল, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা ও সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষি, অর্থনীতি ও প্রানীজ সম্পদসহ নানাভাবে মানুষ ক্ষতির মুখে পড়ছে। এসব থেকে মুক্তি পেতে পদ্মা ব্যারাজের বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ প্রথমে নেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এরপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২০০৪ সালের দিকে পুনরায় উদ্যোগ নেন। কিন্তু সেটি তখন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে বিষয়টি আমরা সামনে এনেছি, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নে আন্দোলন করেছি।
সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে। আশা করছি অদূর ভবিষ্যতে পদ্মা ব্যারাজ দৃশ্যমান হবে। জাতি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সার্বিকভাবে উপকৃত হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে।
চলমান গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্প ও প্রস্তাবিত উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পে সহায়তা দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সেচ সুবিধা বাড়ানো হবে।
খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা, ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ, রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলায় প্রকল্পটি প্রথমে বাস্তবায়িত হবে।
হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ প্রধান নদী ব্যবস্থার প্রবাহ ও নাব্যতা পুনরুদ্ধার এছাড়াও প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা কমানো।
এছাড়া সুন্দরবনের জন্য মিঠাপানির সরবরাহ নিশ্চিত করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতা নিরসন, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভূ-গর্ভস্থ জল পুনঃসঞ্চয়ন ও আর্সেনিক দূষণ কমানোও এই প্রকল্পের লক্ষ্য। সূত্র: বাসস
দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তি বাড়িয়ে প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত অক্টোবর মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৮৭ কোটি (২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। গত বছরের একই মাসের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ। একই সঙ্গে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেও প্রবাসী আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এ সময়ে দেশে মোট ১ হাজার ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২৫৬ কোটি (২ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন) ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের অক্টোবরে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ৩১ কোটি ডলার। শতকরা হিসাবে এ প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ১৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে দেশে মোট ১ হাজার ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ (১১ দশমিক ৪৬৫ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় ১৩ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ মাসভিত্তিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থবছরেও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে।
রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। এর মাধ্যমে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সহায়তা পাওয়া যায়।
বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের বাজারে চাপ এবং আমদানি ব্যয় ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়া অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। প্রবাসী আয় বাড়লে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের সরবরাহও বাড়ে। এতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়। এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও রেমিট্যান্সের প্রভাব ব্যাপক। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে লাখ লাখ পরিবার দৈনন্দিন ব্যয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটায়। গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা সৃষ্টিতেও এ অর্থ ভূমিকা রাখে। তবে রেমিট্যান্সের এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর সুযোগ আরও সহজ করা প্রয়োজন। প্রবাসীদের জন্য দ্রুত ও নিরাপদ ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করা, লেনদেনের খরচ কমানো এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, অক্টোবর মাসে ২৮৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এবং অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের এই ধারাবাহিক প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
২০২৬ সালের হজ মৌসুমে বাংলাদেশি ৩৪০ জন হজযাত্রীর চিকিৎসা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে আটকে রাখা প্রায় ১০ কোটি ২৩ লাখ টাকা ফেরত দিয়েছে সৌদি আরব। সৌদি সরকারের কাছ থেকে ৩০ লাখ ৯১ হাজার ২৪৩ রিয়াল ফেরত পেয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে সংশ্লিষ্ট হজযাত্রীদের আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এ তথ্য জানান। হজযাত্রীদের ইন্স্যুরেন্সের আওতাভুক্ত নয়—এমন চিকিৎসা ব্যয়ের বিপরীতে আটকে রাখা অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তুলে ধরেন।
ধর্মমন্ত্রী জানান, ফেরত পাওয়া অর্থ সংশ্লিষ্ট হজ এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে হজযাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। অর্থাৎ যেসব হজযাত্রীর চিকিৎসা ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে অর্থ আটকে রাখা হয়েছিল, তারা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, হজযাত্রীদের আর্থিক স্বার্থ রক্ষা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে এটি একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য। অতীতের হজ মৌসুমগুলোতে এ ধরনের অর্থ ফেরত পাওয়ার নজির ছিল না বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সৌদি আরব থেকে এ অর্থ ফেরত পাওয়া হজ ব্যবস্থাপনায় আর্থিক স্বচ্ছতা ও হজযাত্রীদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হজযাত্রীদের চিকিৎসা ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় আরও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির মরদেহ কোথায় রাখা হয়েছে, তা এখনো জানেন না তাদের পরিবারের সদস্যরা। এ বিষয়ে তথ্য চেয়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অনুরোধের জবাব এখনো দেয়নি সৌদি কর্তৃপক্ষ।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিস্তারিত জানতে চেয়ে পাঠানো কূটনৈতিক নোটের জবাবে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাংলাদেশ এখনো কোনো উত্তর পায়নি বলে রোববার জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র।
গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
নজরুলের পরিবার জানায়, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান তাদের কাছ থেকে কিছু নথি সংগ্রহ করেছিলেন। তবে নজরুলের মরদেহ কোথায় রয়েছে কিংবা দেশে ফিরিয়ে আনা হবে কি না, সে বিষয়ে তারা কিছুই জানতে পারেননি।
সুইটির বাবা তার মেয়ের মরদেহ কিংবা অন্তত দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল জানায়, সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে তাদের কিছুই জানায়নি। সৌদি প্রেস এজেন্সিতে প্রকাশিত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি থেকে মিশন এ বিষয়ে জানতে পারে।
পরবর্তীতে অভিযোগ, আদালতের রায়, আইনি প্রতিনিধিত্ব ও মরদেহের পরিণতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে বাংলাদেশ একটি কূটনৈতিক নোট পাঠায়।
কনস্যুলেটের আগের চিঠিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ওই দুই বাংলাদেশি আটক ছিলেন। তবে, ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটের পাওয়া বাংলাদেশি বন্দিদের তালিকায় ওই দুজনের শাস্তি সম্পর্কে তথ্য ছিল না।
নজরুল ও সুইটির পরিবারের সদস্যরা এর আগে জানিয়েছিলেন, ওই দুজনের যে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে সে বিষয়ে তারা কিছুই জানতেন না।
কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হলে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য কর্তৃপক্ষের কাছে থাকলে, বিলম্ব না করে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে তা জানাতে হয়।
এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় মামলা দুটি নিয়ে বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকায়ও প্রশ্ন উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত এবং বাংলাদেশ মিশনের ভূমিকা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে ওই দুই বাংলাদেশি পর্যাপ্ত আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছে।
ওই দুই বাংলাদেশির আটক, বিচার, সাজা ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশ এবং বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ তাদের কী ধরনের কনস্যুলার সহায়তা দিয়েছিল, তার বিস্তারিত জানাতে ২৮ অক্টোবর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়।
তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে কারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে সরকারের এ উদ্যোগকে শিল্পের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রোববার রাতে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, জীবনমান উন্নয়ন এবং আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। মজুরি বোর্ডকে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি শ্রম মন্ত্রণালয়কে শ্রমিকদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলেছেন।
তিনি বলেন, সরকার দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা, উন্নয়ন ও অগ্রগতি চায়। তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে শ্রমিক ও মালিক—উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় কাজ করতে চায় সরকার।
আগেই গঠন করা হলো মজুরি বোর্ড: পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। রোববার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মজুরি বোর্ড শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।
গেজেটে বিজিএমইএর পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিনকে সংশ্লিষ্ট শিল্পের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতারকে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদকে নিরপেক্ষ সদস্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুবকে মালিকদের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রচলিত বিধান অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনের নিয়ম রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে সময় থাকলেও সরকার আগেই উদ্যোগ নিয়েছে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম পাওয়া গেলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিধি মনোনয়নে কিছুটা সময় লেগেছে। রোববার রাতে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম পাওয়ার পর পরদিন সকালে বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবার নিয়ে সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা এবং আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করবেন।
সহিংসতা নয়, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ ও অন্যান্য দাবি নিয়ে আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সহিংস আন্দোলনের প্রয়োজন নেই। আন্দোলনের নামে পুলিশের গাড়িতে আগুন, বিভিন্ন স্থানে হামলা, যানবাহন ভাঙচুর এবং কারখানায় অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, যারা সহিংসতা, নাশকতা কিংবা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় মুখোশধারীদের অনুপ্রবেশ ও উসকানির বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারের কাছে থাকা তথ্য বিশ্লেষণে শ্রমিকদের ব্যবহার করে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট, রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাহত এবং পোশাকশিল্পের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে বলে সরকার মনে করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
কারখানা চালু ও রপ্তানি অব্যাহত রাখার আহ্বান: আন্দোলনের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো চালুর বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালিকদের উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো কারণে কারখানা বন্ধ থাকলে তা যেন সাময়িক হয়। শ্রমিক ও মালিকদের পারস্পরিক আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে হবে।
তিনি বলেন, রপ্তানির জন্য পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এ খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
সরকারের সামনে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা। নতুন মজুরি বোর্ডের আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণ এবং মালিকদের সঙ্গে কার্যকর সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলে পোশাকশিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালোটাকা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বা দলীয় অবস্থান একটি ‘ক্ষমতা-কেন্দ্রিক বিজনেস মডেলে’ পরিণত হচ্ছে। রোববার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ইফতেখারুজ্জামান এ কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতার রাজনীতির চর্চার অবসান ঘটবে। সেখানে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ক্ষমতার রাজনীতির কারণে দলীয় কোন্দল, অন্তর্দ্বন্দ্ব, এমনকি মানুষের প্রাণ দিতে হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সেটি আরও বেশি বিকশিত হচ্ছে। এটা উদ্বেগজনক।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে সুশাসনের ঘাটতির কথা তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকা এবং জবাবদিহির ঘাটতির ফলে বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার দেখা যায়। এর ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা এক ধরনের স্বাভাবিকতায় পরিণত হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন নিয়েও কথা বলেন ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলগুলোর কার্যক্রম পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। এ অর্থের ব্যবস্থাপনা অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হয়, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তিনির্ভর। ফলে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকে। দলগুলোর আনুষ্ঠানিক আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গেও বাস্তবতার বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বা প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। আইন ও বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা এবং রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শক্তিশালী আইনি কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া দেশের আইনি কাঠামোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর চর্চারও অসামঞ্জস্য রয়েছে।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অন্য দেশের চর্চার সঙ্গে বাংলাদেশের চিত্র সামঞ্জস্যহীন উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই এই চর্চা অতি নিয়ন্ত্রণমূলক। অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের কার্যকর পদ্ধতির অনুপস্থিতির কারণে আইনি শর্তভিত্তিক ব্যবস্থা অঙ্কুরেই অর্থনির্ভর প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি করে।
দলীয় নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র ও অভিজাততন্ত্রের প্রাধান্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন ইফতেখারুজ্জামান। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তৃণমূল, বিভিন্ন বৈচিত্র্যের মানুষ ও নারীদের অংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে নেতৃত্ব বিকাশে পরিবারতন্ত্র বা অভিজাততন্ত্র প্রাধান্য পাচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্য সাধারণ মানুষ সুযোগবঞ্চিত হচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য কখনো ইতিবাচক হতে পারে না। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।
রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাবলিতে সুশাসন নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য।
সংস্কারের দায়দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং দলগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের পূর্বশর্ত হিসেবে নেতাদের নিজেদের আয়নার সামনে দাঁড় করাতে হবে। সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কাওছার আহমেদ ও কাজী আমিনুল হাসান।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনায় সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির আকাশপথে যোগাযোগে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ১৫৯টি ফ্লাইটে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রায় ২৩ হাজার যাত্রী। প্রভাবিত ফ্লাইটগুলোর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ৮২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৭৭টি। ফলে সৌদি আরবগামী ও সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরতে ইচ্ছুক যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার সাকিব চৌধুরী রোববার এ তথ্য জানান। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৯১৭ জন যাত্রী এই পরিস্থিতির কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে। একই সঙ্গে তৃতীয় দেশের বিমানবন্দর হয়ে যাতায়াত করা ট্রানজিট যাত্রীরাও সমস্যায় পড়েছেন।
সরাসরি ফ্লাইটে বেশি প্রভাব: প্রভাবিত ৮২টি সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৩৭টি, সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের ২০টি, রিয়াদ এয়ারের ১৬টি এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি ফ্লাইট রয়েছে। এসব ফ্লাইটের যাত্রীদের যাত্রা ও ফেরার সূচিতে বিঘ্ন ঘটেছে।
সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রীদের একটি বড় অংশ এ পরিস্থিতির প্রভাবের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্স ও রিয়াদ এয়ারের ফ্লাইটেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে।
ট্রানজিট ফ্লাইটেও ভোগান্তি: সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট পরিচালনার প্রভাব শুধু সরাসরি যাত্রায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। ট্রানজিট ফ্লাইটেও তৈরি হয়েছে জটিলতা। এ ধরনের ৭৭টি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে।
এর মধ্যে ভারতের ইন্ডিগোর ৩০টি ফ্লাইট সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে। এ ছাড়া এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৯টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৮টি, এয়ার ইন্ডিয়ার ৮টি, সালাম এয়ারের ৭টি এবং ইজিপ্টের একটি ফ্লাইট প্রভাবিত হয়েছে।
ট্রানজিট ফ্লাইটে বিঘ্ন ঘটায় একাধিক দেশের বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরব যাতায়াতকারী যাত্রীদেরও ভ্রমণসূচি ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে যাদের একাধিক ফ্লাইটের সংযোগ রয়েছে, তাদের পরবর্তী যাত্রা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যাত্রীদের বাড়তি চাপ: বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রী নিয়মিত যাতায়াত করেন। একইভাবে ছুটি কাটিয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীদেরও প্রতিদিন বিভিন্ন ফ্লাইটে আসতে হয়। ফলে বিমান চলাচলে এমন বিঘ্নের প্রভাব পড়ে দুই দেশের যাতায়াত ব্যবস্থায়।
ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন বা পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা থাকলে যাত্রীদের বিমানবন্দরে অপেক্ষা, সংযোগ ফ্লাইট মিস করা এবং নতুন করে ভ্রমণ পরিকল্পনা সাজানোর মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে কর্মস্থলে যোগদানের নির্ধারিত সময় থাকা প্রবাসী কর্মীদের জন্য এ ধরনের অনিশ্চয়তা বাড়তি চাপ তৈরি করে।
এদিকে, পরিস্থিতির কারণে প্রভাবিত যাত্রীদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, ১৫৯টি ফ্লাইট এবং ২২ হাজার ৯১৭ জন যাত্রী এ পরিস্থিতির আওতায় এসেছেন। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনার সীমাবদ্ধতা কত দিন থাকবে, তা স্পষ্ট না হওয়ায় দুই দেশের আকাশপথে স্বাভাবিক যোগাযোগ পুরোপুরি ফিরতে আরও সময় লাগতে পারে।