আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রতীক বরাদ্দও হয়ে গেছে। বাতিল হয়েছে নৌকার বেশকিছু প্রার্থীর মনোনয়ন। আবার আদালতের রায়ে তাদের কেউ কেউ বৈধতাও পেয়েছেন। সাজ সাজ রবে চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। ফলে সারা দেশে নির্বাচনী আমেজ সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিয়ে একে ‘আসন বণ্টনের নির্বাচন’ হিসেবে সমালোচনা করলেও আওয়ামী লীগ তথা মূল ধারার প্রতিটি দলের জন্য অপেক্ষা করছে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন। আর এ কারণেই ‘হেভিওয়েট’ অনেক প্রার্থীও তাদের জয়-পরাজয় নিয়ে আতঙ্কে আছেন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২৯৮ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে জনসমর্থন যাচাইয়ের নির্বাচন হিসেবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে দেখছে আওয়ামী লীগ। আর এ কারণেই দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, যে কেউ নির্বাচনে দাঁড়াতে পারেন। দলের পক্ষ থেকে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কোনো চাপ প্রয়োগ বা বহিষ্কার করা হবে না বলেও জানানো হয়। আর এই একটি সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে নির্বাচনের সব হিসাব-নিকাশ।
এবারের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বাইরে আরও ২৬টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে প্রায় ৩৪৭ জনের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরও ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে প্রায় ১৮৯৬ জন। আসনপ্রতি গড়ে প্রার্থী ৬ জনের বেশি। নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ ৩২ আসনে নৌকার প্রার্থী প্রত্যাহার করেছে। শরিকদের জন্য ৬ আসনে নৌকা প্রতীকে নির্বাচনের বিষয়টিও অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে নৌকা প্রতীক পাওয়া ৫ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষমতায় থাকা দলটি এবার লড়াই করছে প্রায় ২৬৪ আসনে; কিন্তু নৌকার প্রতীক পেয়েও নির্বাচনে বিজয় নিয়ে শঙ্কায় আছেন প্রার্থীরা। তার মূল কারণ স্বতন্ত্র প্রার্থী। চলতি নির্বাচনে অন্তত ১২৭টি আসনে এই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নিজ দলের নৌকার প্রার্থীদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বর্তমান ২৮ সংসদ সদস্য দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আছেন। জেলা ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার মেয়র পদ ছেড়ে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন এমন প্রার্থী ৩৫ জন। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী আরও বেশ কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। যেখানে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর সংখ্যা ২৬৪ জন; কিন্তু আওয়ামীপন্থি স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৬৯ জন। আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ে সারা দেশের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের বিশ্লেষণ বলছে, এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে কমপক্ষে ৮২ জনের বেশি জানুয়ারির ৭ তারিখের নির্বাচনে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে আনতে পারেন। এখানে অনেকেই ঈগল, ট্রাকসহ আরও বেশ কিছু প্রতীক পেয়ে নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু করে দিয়েছেন, যেখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের অনেকে সম্পৃক্ত হচ্ছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে এ বিষয়টি। যে কারণে ধারণা করা হচ্ছে, ভোটাররাও শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে আসবেন এবং ভোট প্রদানের সংখ্যাও হবে অনেক বেশি।
চলতি নির্বাচনে ১৭৭ স্বতন্ত্র প্রার্থী ‘ঈগল’ ও ‘ট্রাক’ প্রতীক পেয়েছেন। ট্রাক পাওয়া ৭৩ প্রার্থীর ৫৪ জন নৌকার মনোনয়ন বঞ্চিত। ঈগল পাওয়া ১০৪ প্রার্থীর ৬৮ জনই আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হয়েছেন। ফলে ‘ঈগল’ এবং ‘ট্রাক’ আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী প্রতীক’ হয়ে উঠেছে।
নৌকা প্রতীকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সবার উদ্দেশে জানান, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ নির্বাচনে জিতে আসতে পারবেন না। এ সময় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী সবার উদ্দেশে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বেশি করানোর লক্ষ্য প্রদান করেন তিনি। বাস্তবতা হলো, এবারের নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়ে কেউ ভোটার উপস্থিত করাতে ব্যর্থ হলেই হেরে যাবেন। কেননা ভোটার আনার জন্য সবচেয়ে বেশি দৌড়ঝাঁপ করছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নির্বাচনে বিজয়ের পাশাপাশি নিজেদের জনপ্রিয়তা প্রকাশের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন তারা বিষয়টিকে।
আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা যায়, এবারের সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনের মধ্যে ১২টিতে, রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে ২০টিতে, ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪ আসনের মধ্যে ১৩টিতে, ঢাকা বিভাগের ৭০ আসনের মধ্যে ২৭টিতে, বরিশাল বিভাগের ২১ আসনের মধ্যে ৭টিতে, চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৮ আসনের মধ্যে ২১টিতে, খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে ১৯টিতে এবং সিলেট বিভাগের ১৯ আসনের ৯টিতে নৌকার প্রার্থীদের সঙ্গে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেন। এদের অনেকের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। জেলা হিসেবে ময়মনসিংহ, নরসিংদী, গাজীপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্তি দেখাচ্ছেন বেশি, যা নৌকার প্রার্থীদের শঙ্কায় ফেলেছে।
ফরিদপুরের চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে শক্ত রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এর মধ্যে গত দুটি নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। দুবারই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহকে হারিয়েছেন। এবারও জাফর উল্যাহকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন নিক্সন।
বরিশালের তিনটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শক্তিশালী। এর মধ্যে উচ্চ আদালতে গিয়ে নিজের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন বরিশাল-৫ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। তিনি বরিশালের সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক; কিন্তু পরে আবারও তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয় চেম্বার জজ আদালতে। এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। এ আসনের আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাহ উদ্দিন রিপনও শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী।
বরিশাল-৪ আসনে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শাম্মী আহমেদের প্রার্থিতা বাতিল করে দেন হাইকোর্ট এবং পরে চেম্বার জজ আদালতও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। এরপর তিনি আবার আবেদন করেন; কিন্তু চেম্বার জজ আদালত কোনো আদেশ না দিয়ে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পাঠিয়ে দেন। এদিকে ফরিদপুর-৩ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী শামিম হকের প্রার্থিতা হাইকোর্ট বাতিল করে দেন। পরে চেম্বার জজ আদালতে তিনি তার প্রার্থিতা ফিরে পান। পরে তার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী এ কে আজাদ চেম্বার জজ আদালতের আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে একই আদালতে আবেদন করেন; কিন্তু চেম্বার জজ আদালত কোনো আদেশ না দিয়ে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পাঠিয়ে দেন। এ দুই প্রার্থীর বিষয়ে আপিল বিভাগ আগামী ২ জানুয়ারি শুনানি করবেন।
যশোর-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নৌকার প্রতীক পাওয়া এনামুল হকের প্রার্থিতা বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রার্থিতা ফেরত পান চেম্বার জজ আদালতের রায়ে; কিন্তু প্রার্থিতা ফিরে পেলেও এ আসনে তার বিজয়ে বড় বাধা বর্তমান সংসদ সদস্য রণজিৎ রায়, যিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।
জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ছাড় দেওয়া ২৬ আসনে নৌকার প্রার্থী সরলেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৩ আসনে চ্যালেঞ্জে ফেলেছেন লাঙ্গলকে। দুটি আসনে নিজ দলের এমপিরা স্বতন্ত্র হয়ে বিপদ বাড়িয়েছেন।
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী ও চসিক ১-২নং ওয়ার্ড) আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন নৌকা প্রতীক পেয়েছিলেন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালাম। জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগিতে আসনটিতে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। সালামের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয় দলটি। ২০০৮ সালেও সালাম নৌকা প্রতীক পেয়েছিলেন। সেবারও জাপাকে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। জোটের প্রার্থী হচ্ছেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা তিন জাতীয় নির্বাচনে জোটের শরিক জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছাড় দিয়ে আসছে আওয়ামী লীগ। এর আগেও বিএনপি ও জাতীয় পার্টির টিকিটে ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালের নির্বাচনসহ তিনবার জয়ী হয়েছিলেন আনিসুল ইসলাম। ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম এই আসন থেকে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু এবার তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মো. শাহজাহান চৌধুরী। কেটলি প্রতীক নিয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
১৪ দলীয় শরিকদের ছয়টি আসন ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। এসব আসনে নৌকা পেয়েও জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জেপির প্রার্থীরা স্বস্তিতে নেই। অন্তত চারটি আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। জাতীয় পার্টির মতো ১৪ দলের শরিকরাও ভোটের মাঠে দুর্বল হওয়ায় জয়ের নিশ্চয়তা নেই। পরাজয়ের শঙ্কায় বর্তমান এমপিসহ জাপার কয়েক জ্যেষ্ঠ নেতা ইতোমধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। দলটির ২৮৩ আসনে প্রার্থিতা বৈধ হলেও শেষ পর্যন্ত কতজন ভোটে সক্রিয়ভাবে থাকবেন তা নিশ্চিত নয়।
এ ছাড়া কুষ্টিয়া-২ আসনে ১৪ দলের শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু নৌকা পেলেও তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন কামরুল আরেফিন। এই আওয়ামী লীগ নেতা উপজেলা চেয়ারম্যান পদ ছেড়েছেন। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে জাসদের মোশারফ হোসেনের নৌকার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি মো. আবদুল্লাহ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির ফজলে হোসেন বাদশার নৌকার বিরুদ্ধে রাজশাহী-২ আসনে মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শফিকুর রহমান বাদশা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। পিরোজপুর-২ আসনে জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে হারাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মো. মহিউদ্দিন মহারাজ। আওয়ামী লীগের সমর্থন ছাড়া এই চার স্বতন্ত্রের বিরুদ্ধে শরিকদের জয় কঠিন।
বিধি অনুযায়ী, সংসদে সরকারি দলের বিরোধিতাকারী বৃহত্তম দল বা অধিসংঘ হবে প্রধান বিরোধী দল। দশম জাতীয় সংসদে ১৬ এমপি এক হয়ে পৃথক সংসদীয় দল গঠন করেছিলেন। আগামী সংসদে স্বতন্ত্র এমপিরা যদি সংখ্যায় জাপাকে ছাড়িয়ে যান এবং এক হয়ে সংসদীয় দল গঠন করেন, তবে বিরোধী দল হতে আইনে বাধা নেই।
তাই নির্বাচনে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে ও ভোটারদের আকৃষ্ট করতে রাজধানী ঢাকা মহানগরসহ এরই মধ্যে গ্রামে গ্রামে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন সব প্রার্থী। জামায়াত-বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন বানচালের ঘোষণা, হামলা ও বড় ধরনের সহিংসতার ঘোষণা থাকলেও নির্বাচনী তোড়জোড়ে বিষয়টি পাত্তা পাচ্ছে না। অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দলের পক্ষ থেকে কোনো বহিষ্কারের শঙ্কা বা ভয়ভীতি নেই আওয়ামী লীগপন্থি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। তাই নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে ভোটে উপস্থিত হতে চান তারা। ফলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
এ বিষয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত আওয়ামী লীগের সিনিয়র এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘এবারের মতো নির্বাচন এর আগে কখনো হয়নি। এটা জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের নির্বাচন। নৌকার মনোনয়ন পেয়ে অজনপ্রিয় প্রার্থী হলে তিনি হেরে যাবেন। একই কথা প্রযোজ্য শরিক দলগুলোর জন্যও। জনগণের ভোট ছাড়া নির্বাচিত হয়ে আসার কোনো সুযোগ নেই। তাই দলীয় প্রার্থীরা যতবারই কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে পরামর্শের জন্য এসেছেন, প্রত্যেকবারই তাদের ভোটার উপস্থিতি বাড়ানো এবং এলাকায় জনসংযোগের নির্দেশ প্রদান করেছি আমরা। আমি নিজেও আমার আসনে উৎসবমুখর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশা রাখছি। প্রত্যেককে জনপ্রিয় হয়েই সংসদ সদস্য হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।’
প্রখ্যাত চিত্রনায়ক সালমান শাহকে (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ঢাকার একটি আদালত। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দাখিল না করায়, বিচারক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এ দিন ধার্য করেন।
এর আগে, গত বছরের ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় মামলাটি দায়ের করেন সালমান শাহের মামা মোহাম্মদ আলমগীর। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন— সালমান শাহের স্ত্রী সামীরা হক, শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ (১৭)। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহের মৃত্যুর পর রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়। তবে গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের করা রিভিশন মঞ্জুর করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর সালমান শাহের মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।
জুলাই-আগস্টের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ৪৫৭ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশ করা হয়।
১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আসাদুজ্জামান খান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের পাশাপাশি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশের রায় দেন। রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে দণ্ডপ্রাপ্তদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাইয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আসামিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগের ভিত্তিতে দুটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে অপরাধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ-১ (উসকানি ও প্ররোচনা)—২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ বলে সম্বোধন করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে শেখ হাসিনার কথোপকথনে আন্দোলনকারীদের ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ ও প্ররোচনা প্রমাণিত হয়েছে, যার চূড়ান্ত ফল হিসেবে রংপুরে আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। এই অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অভিযোগ-২ (সরাসরি হত্যার নির্দেশ)—১৮ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস ও হাসানুল হক ইনুর কথোপকথনে ড্রোনের মাধ্যমে অবস্থান নির্ণয় করে হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর ফলে ৫ আগস্ট চানখারপুলে ছয়জন এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃসংস ঘটনা ঘটে। এই অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও কামালকে মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) প্রদান করা হয়।
রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, দণ্ডিতদের দেশে থাকা ব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করবে। এই অর্থ ও সম্পদ জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের ব্যক্তিগত ও বাসভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে গানম্যান ও পুলিশি সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি ২০২৬) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত সোমবার (১২ জানুয়ারি) পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক পত্র পাঠানো হয় এবং তার প্রেক্ষিতেই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডা. শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ঝুঁকি বা হুমকি বিদ্যমান রয়েছে। এই ঝুঁকি বিবেচনায় তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একজন গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তার বাসভবনের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য পোশাকধারী সশস্ত্র পুলিশ সদস্য মোতায়েনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নিরাপত্তা বলয় কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) জামায়াত আমিরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে তার ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি উঠে আসে এবং এসবি নিরাপত্তা জোরদার করার সুপারিশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠায়। মূলত সেই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সুপারিশ আমলে নিয়েই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডা. শফিকুর রহমানের জন্য এই বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনুমোদন দিয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর আগেও বেশ কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে অনুরূপ নিরাপত্তা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিম, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি এবং বিএনপি নেতা মাসুদ অরুণকেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান প্রদান করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার জামায়াতে ইসলামীর আমিরের নিরাপত্তাও জোরদার করা হলো।
ঢাকায় নিযুক্ত নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন আজ মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়। আগামী বৃহস্পতিবার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তাঁর আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র পেশ করার কথা রয়েছে। মূলত সেই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা ও প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি আজ মন্ত্রণালয়ে আসেন। গত সোমবার সন্ধ্যায় তিনি রাজধানী ঢাকায় পৌঁছান এবং বিমানবন্দরে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান মার্কিন দূতাবাস ও বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন চলতি সপ্তাহেই তাঁর ঢাকা মিশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করবেন। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির কাছে পরিচয়পত্র পেশ করার আগে তিনি আগামী দুই দিন পররাষ্ট্র সচিব এবং রাষ্ট্রাচার অনুবিভাগের প্রধান নূরুল ইসলামের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করবেন। এর আগে গত ৯ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি শপথ গ্রহণ করেন। দেশটির ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল জে রিগাস তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণের পরই ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এক বার্তার মাধ্যমে তাঁকে বাংলাদেশে স্বাগত জানায়।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সার্ভিসের একজন অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। বাংলাদেশের সাথে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা বেশ পুরোনো। তিনি ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক কাউন্সেলর হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। ফলে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তাঁর গভীর জানাশোনা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মনোনীত এই কূটনীতিক বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। তিনি বিদায়ী রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের স্থলাভিষিক্ত হবেন, যিনি ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশে পুনরায় ফিরে আসতে পেরে নিজের বিশেষ অনুভূতি প্রকাশ করে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন জানিয়েছেন যে, তিনি এ দেশের মাটি ও মানুষের সাথে পূর্বপরিচিত এবং এখানে ফিরতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। তিনি ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে আমেরিকান ও স্থানীয় কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী দলটিকে নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে চান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈশ্বিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করার পাশাপাশি একটি নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাই তাঁর আগামীর প্রধান লক্ষ্য হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর এই নিযুক্তি ও আগমনের ফলে ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে বলে আশা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংস্কারের নামে পুরোনো আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এবং এটি রাষ্ট্র সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সাম্প্রতিক অধ্যাদেশগুলোতে তার স্পষ্ট প্রতিফলন নেই বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব বিষয় জানান।
টিআইবি জানায়, শতাধিক অধ্যাদেশ জারি করে এক ধরনের রেকর্ড গড়া হলেও এসব আইনি কাঠামোর বড় অংশে জুলাই সনদের চেতনা উপেক্ষিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি ৮টি অধ্যাদেশের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
যেখানে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ও জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি বলে জানানো হয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামানের অভিযোগ, সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ও নিজস্ব বিবেচনায় একের পর এক অধ্যাদেশ জারি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মৌলিক সুপারিশ উপেক্ষা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সংস্কারের নামে এমন আইনি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা কার্যত দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করছে এবং পুরোনো ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়ায় সহায়ক ভূমিকা পালনের অংশ হিসেবে টিআইবি ধারাবাহিকভাবে আইনের খসড়া পর্যালোচনা ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিয়ে আসছে। কিছু ক্ষেত্রে সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হওয়ায় সরকার ও সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানালেও গুরুত্বপূর্ণ অনেক খাতে যৌক্তিক প্রস্তাব উপেক্ষিত থাকার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার অধ্যাদেশ বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘দুদক সংস্কারে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও দুর্নীতির মামলায় জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে সাজা মার্জনার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা তিনি ‘‘দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দেওয়ার ফাঁদ’’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।’
এ ছাড়া দুদক সংস্কার অধ্যাদেশে কমিশনার সংখ্যা বৃদ্ধি, নারী কমিশনার ও আইসিটি বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তি এবং সরাসরি এফআইআর করার ক্ষমতাকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করলেও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি রোধে প্রস্তাবিত ইন্টিগ্রিটি ইউনিট বাতিল এবং পূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুতর দুর্বলতা হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এই অধ্যাদেশ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে।’ সাবেক আমলা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাধান্য, ‘সদস্য সচিব’ পদ সৃষ্টি এবং প্রথম তিন বছরে অনির্দিষ্ট সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তাকে প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ দেওয়াকে তিনি সিভিল ও পুলিশি আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্ব বজায় রাখার কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংস্কার অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক খসড়াটি আন্তর্জাতিক মানের হলেও সংশোধিত সংস্করণে এসে সেই সম্ভাবনা খর্ব হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে কমিশনের আওতায় আনার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করায় কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সার্বিকভাবে টিআইবি মনে করে, সংস্কার কমিশনগুলোর বহু গুরুত্বপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উপেক্ষা করে যে অধ্যাদেশগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বদলে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করবে। জুলাই সনদের চেতনা অনুযায়ী যদি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রকৃত সংস্কার নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে এই উদ্যোগগুলো রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে বলে টিআইবির আশঙ্কা।
চলতি অর্থবছরের জন্য সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। গতকাল সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় মূল এডিপির তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বরাদ্দ কমিয়ে মোট ২ লাখ কোটি টাকার সংশোধিত এডিপি চূড়ান্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং মন্ত্রণালয়গুলোর চাহিদার তুলনায় সক্ষমতা কম থাকাই এই বড় ধরণের অর্থ সাশ্রয় বা কাটছাঁটের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশোধিত এই উন্নয়ন বাজেটে সরকারের নিজস্ব তহবিল এবং বৈদেশিক ঋণ—উভয় খাতেই বরাদ্দের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সরকারি অর্থায়নের অংশ থেকে প্রায় ১১ শতাংশ বা ১৬ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা। একইভাবে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশেরও বেশি বা ১৪ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করে ৭২ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও সংশোধনের সময় মন্ত্রণালয়গুলো থেকে মাত্র ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার চাহিদা জানানো হয়েছিল, তবে সরকার সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ২ লাখ কোটি টাকার একটি কাঠামো তৈরি করেছে। এতে করে সরকারি কোষাগারের ওপর চাপের ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ।
খাতভিত্তিক বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিবহন ও যোগাযোগ খাত বরাদ্দের দিক থেকে সবার ওপরে থাকলেও এখানেও ৩৫ শতাংশ অর্থ কমানো হয়েছে। এই খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৮ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। এর পরেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৬ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মূল বরাদ্দের চেয়ে ১৯ শতাংশ কম। তবে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে স্বাস্থ্য খাতে; বাস্তবায়ন সক্ষমতার অভাবে এই খাতের বরাদ্দ অবিশ্বাস্যভাবে ৭৪ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ৪ হাজার ৭১৮ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষা খাতেও প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ২১ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে। তবে এই নেতিবাচক ধারার বিপরীতে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ খাতে বরাদ্দ প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা বর্তমান সরকারের পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের অঙ্গীকারকে ফুটিয়ে তোলে।
মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। সড়ক পরিবহন ও বিদ্যুৎ বিভাগও তালিকায় প্রথম দিকে রয়েছে। মোট ১ হাজার ৩৩০টি প্রকল্পের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে বিনিয়োগ প্রকল্প। পরিকল্পনা কমিশন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে যে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই অন্তত ২৮৬টি প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ করা হবে। এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও করপোরেশনগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন যুক্ত করলে সংশোধিত এডিপির মোট আকার দাঁড়াবে ২ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার উপরে। সামগ্রিকভাবে, এই সংশোধিত উন্নয়ন বাজেট দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় অবস্থিত দেশের অন্যতম মেগা প্রকল্প মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডে লাগা ভয়াবহ আগুন দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিটের সম্মিলিত চেষ্টার পর আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হয়। এর আগে সোমবার রাত ৯টার দিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রের অভ্যন্তরে অবস্থিত পরিত্যক্ত যন্ত্রাংশ ও মালামাল রাখার স্থানে (স্ক্র্যাপ ইয়ার্ড) এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঘটে। আগুনের খবর পাওয়ার পরপরই মহেশখালী ও চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ৪টি এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিজস্ব ২ টিসহ মোট ৬টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলা এই আগুনের লেলিহান শিখা এলাকায় এক ধরণের আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও বড় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
মহেশখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান মাহমুদ ডালিম এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছেন যে, এই অগ্নিকাণ্ডে কেন্দ্রের মূল উৎপাদন ইউনিট বা বয়লারের কোনো ধরণের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডটি মূল বিদ্যুৎ উৎপাদন এলাকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে একটি পুকুর সদৃশ কাঠামোর ভেতরে অবস্থিত ছিল, যেখানে মূলত অব্যবহৃত ও পুরনো লোহার যন্ত্রাংশ রাখা হতো। এই দূরত্বের কারণেই আগুন মূল প্ল্যান্টে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম ছিল। তবুও অত্যন্ত সংবেদনশীল স্থাপনা হওয়ায় ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদারকি করেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া না গেলেও মহেশখালী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন কাদের জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ওই এলাকায় পথশিশুদের অবাধ যাতায়াত বা দৌরাত্ম্য রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের মাধ্যমেই কোনোভাবে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে এটি কেবলই প্রাথমিক ধারণা, প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরই আগুনের প্রকৃত উৎস এবং এর পেছনে কোনো নাশকতা বা অবহেলা ছিল কি না, তা স্পষ্টভাবে জানা যাবে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য জানান, রাতের আঁধারে ঘন কুয়াশা ও বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দমকল কর্মীদের বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ভোর হওয়ার আগেই আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়া রোধ করা সম্ভব হওয়ায় বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেছে। বর্তমানে ওই এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ থেকে ধোঁয়া বের হওয়া বন্ধ করতে কুলিং বা শীতলীকরণের কাজ চলছে। মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো জাতীয় সম্পদের সুরক্ষায় এই ঘটনাটি বড় ধরণের সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা নিয়মিত তদারকি ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আরও আধুনিক করার ওপর জোর দিয়েছেন।
বিতর্কিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত অনিয়ম ও বিতর্কিত তিনটি (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত) জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে। এই অভিনব পরিকল্পনা হয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে। আর তা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়।
গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
পরে যমুনার সামনে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ ও সুপারিশগুলো তুলে ধরেন পাঁচ সদস্যের কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, সাবেক গ্রেড-১ কর্মকর্তা শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম। এ সময় আরও বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
অবশ্য তিনটি নির্বাচনের নির্বাচনী অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত থাকায় এবং তদন্ত কমিশনের বরাদ্দ করা সময় অপ্রতুল হওয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে তাদের নাম ও কার কী ভূমিকা ছিল, তা বের করা সম্ভব হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কমিটি ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে ওই নির্বাচন নিয়েও তদন্ত করার সুপারিশ করেছে কমিশন।
তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবিশষ্ট ১৪৭টিতে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
প্রতিবেদন গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে সিস্টেমকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে নিজেদের মনের মতো একটা কাগজে রায় লিখে দিয়েছে এগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। পুরো রেকর্ড থাকা দরকার।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘দেশের টাকা খরচ করে, মানুষের টাকায় নির্বাচন আয়োজন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ দেশের মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল। কিছু করতে পারেনি। এ দেশের জনগণ যেন কিছুটা হলেও স্বস্তি পায় সে জন্য যারা যারা জড়িত ছিল তাদের চেহারাগুলো সামনে নিয়ে আসতে হবে। কারা করল, কীভাবে করল সেটা জানতে হবে। নির্বাচন ডাকাতি আর কখনো না ঘটতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।’
তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৮০% কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০% এর বেশি হয়ে যায়। ২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না দেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয় যা নির্বাচন সেল নামে পরিচিত লাভ করে।
২০১৪-২৪ পর্যন্ত সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।
উল্লেখ্য, গত জুন মাসে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এই কমিশন গঠনের কথা জানানো হয়েছিল। কমিশনকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। পরে অবশ্য সময় বাড়ানো হয়। কমিশন গঠনের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই তিনটি নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। এসব নির্বাচনে নানা কৌশলে জনগণের ভোট দেওয়ার অধিকার ভুলুণ্ঠিত করে সাজানো প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করার জোরালো অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগও এসব নির্বাচন পরিচালনাকারীর বিরুদ্ধে রয়েছে। এতে দেশে আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মৌলিক মানবাধিকার বিপন্ন হয়েছে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৮তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের লক্ষে আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকায় পৌঁছেছেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। কাতার এয়ারওয়েজের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা। রাষ্ট্রদূতের এই আগমনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ কয়েক মাস পর ঢাকার মার্কিন মিশনে একজন পূর্ণাঙ্গ প্রধানের পদায়ন সম্পন্ন হলো। তাঁর এই সফর ও দায়িত্বভার গ্রহণ বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ও নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন চলতি সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কূটনৈতিক কার্যক্রম শুরু করবেন। এই লক্ষে আগামী দুই দিন তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং রাষ্ট্রাচার অনুবিভাগের প্রধান নূরুল ইসলামের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হবেন। এরপর আগামী বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তাঁর আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র বা ক্রেডেনশিয়াল পেশ করবেন। পরিচয়পত্র পেশের পরই তিনি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূতের ক্ষমতা ও মর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার আইনগত ভিত্তি লাভ করবেন।
এর আগে গত ৯ জানুয়ারি ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে নবনিযুক্ত এই রাষ্ট্রদূতের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল জে. রিগাস তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণ শেষে ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এক বার্তার মাধ্যমে তাঁকে বাংলাদেশে স্বাগত জানায়। উল্লেখ্য যে, ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এর আগে ১৭তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী পিটার হাসের স্থলাভিষিক্ত হলেন। বাংলাদেশে ইতিপূর্বেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকায় ক্রিস্টেনসেনের জন্য এটি একটি পরিচিত কর্মস্থল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে পুনরায় ফিরে আসার বিষয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন জানিয়েছেন যে, তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও পরিবেশের সঙ্গে আগে থেকেই খুব ভালোভাবে পরিচিত। সেই চেনা জনপদে আবারও ফিরে আসতে পেরে তিনি নিজেকে অত্যন্ত আনন্দিত মনে করছেন। তিনি আরও জানান যে, ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের আমেরিকান এবং স্থানীয় কর্মীদের একটি দক্ষ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করতে চান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ বিশ্ব গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সাথে অংশীদারিত্ব জোরদার করাই হবে তাঁর প্রধান দায়িত্ব। বর্তমানে তাঁর এই নিযুক্তি ঘিরে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ ও ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে আগামী শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) এক বিশাল নাগরিক শোকসভার আয়োজন করা হয়েছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে বিএনপির মিডিয়া সেলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই শোকসভাটি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। আগামী শুক্রবার দুপুর আড়াইটায় সভাটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বিএনপির উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানটি মূলত একটি বিশেষ ‘নাগরিক কমিটি’র ব্যানারে পরিচালিত হবে, যেখানে দলীয় গণ্ডি পেরিয়ে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, এই নাগরিক শোকসভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট নাগরিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিনিধিরাও এই শোকসভায় অংশগ্রহণ করবেন বলে জানানো হয়েছে। প্রিয় নেত্রীকে হারানোর শোকে মুহ্যমান সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীরা এই সভার মাধ্যমে পুনরায় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আপসহীন নেতৃত্বের কথা স্মরণ করবেন। সংসদের দক্ষিণ প্লাজার মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ স্থানে এই আয়োজন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বকেই পুনরায় ফুটিয়ে তুলছে।
উল্লেখ্য যে, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৯ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর প্রয়াণে সারা দেশে এক শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তাঁর দল বিএনপি তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সাত দিনের শোক পালন করেছিল। একই সাথে সরকারের পক্ষ থেকে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছিল, যার মধ্যে একদিন ছিল সাধারণ ছুটি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর এটিই হতে যাচ্ছে তাঁর স্মরণে সবচেয়ে বড় কোনো নাগরিক জমায়েত। বর্তমানে এই শোকসভাকে সফল করতে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও প্রস্তুতির কাজ জোরদার করা হয়েছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ১৮তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে চূড়ান্ত দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে আজ সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকায় পৌঁছাচ্ছেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁর অবতরণ করার কথা রয়েছে। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর মার্কিন দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাবেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চলতি সপ্তাহেই তিনি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তাঁর পরিচয়পত্র (ক্রেডেনশিয়াল) পেশ করবেন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ কয়েক মাস পর ঢাকা পেল একজন পূর্ণাঙ্গ মার্কিন রাষ্ট্রদূত।
ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন মার্কিন ফরেন সার্ভিসের একজন জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ সদস্য। বাংলাদেশে আসার আগে গত ৯ জানুয়ারি শুক্রবার ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। দেশটির ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল জে. রিগাস তাঁকে শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণ শেষে ক্রিস্টেনসেন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ও বন্ধুত্বপূর্ণ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ইতিপূর্বেও ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলর হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের চলমান সংস্কার কার্যক্রম এবং আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্বে তাঁর এই নিয়োগ ও অবস্থানকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী ক্রিস্টেনসেন ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের বৈদেশিক নীতি উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। এছাড়াও ম্যানিলা, সান সালভাদর, রিয়াদ ও হো চি মিন সিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে তিনি মার্কিন মিশনের বিভিন্ন শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। উল্লেখ্য যে, ঢাকায় সর্বশেষ মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার হাস দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যিনি ২০২৪ সালের এপ্রিলে বিদায় নেওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রদূতের পদটি শূন্য ছিল। গত কয়েক মাস ধরে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন রুটিন দায়িত্ব সামলালেও এখন থেকে ক্রিস্টেনসেনের হাত ধরে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। গত সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে মনোনীত করার পর ডিসেম্বরে মার্কিন সিনেট তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। বর্তমানে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতূহল বিরাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ভেনেজুয়েলার ‘ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে ঘোষণা করে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন। গত রবিবার তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি ছবি পোস্ট করে তিনি এই দাবি করেন। ছবির নিচের ক্যাপশনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তিনি ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের পদে আসীন হয়েছেন। এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো যখন ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে চরম উত্তেজনা ও সংশয় বিরাজ করছে।
এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে গত ৩ জানুয়ারির সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, যখন মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ দল রাজধানী কারাকাসে এক আকস্মিক ও শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালায়। ওই অভিযানে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাঁদের সরকারি বাসভবন থেকে অনেকটা নাটকীয়ভাবে আটক করে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটিতে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তাঁরা দুজনেই মাদক পাচারের অভিযোগে নিউ ইয়র্কের একটি ফেডারেল কারাগারে বন্দি রয়েছেন এবং সেখানে তাঁদের বিচারের জোর প্রস্তুতি চলছে। উল্লেখ্য যে, মাদুরোকে অপসারণের এই রক্তক্ষয়ী অভিযানে ভেনেজুয়েলায় অন্তত ১০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মাদুরোর পতনের পরপরই ভেনেজুয়েলার বিশাল জ্বালানি তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা প্রকাশ করে হোয়াইট হাউজ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আগেই জানিয়েছিলেন যে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদের তদারকি এখন থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র করবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই অবস্থানকে আরও জোরালো করে সম্প্রতি জানিয়েছেন যে, অনির্দিষ্টকালের জন্য এই অমূল্য সম্পদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের হাতে থাকবে এবং তাঁরা ভেনেজুয়েলার সরকার সংস্কারেও সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হলে এবং ‘উপযুক্ত সময়’ এলে তেলের মালিকানা পুনরায় স্থানীয় সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
তবে ট্রাম্পের এই সাম্প্রতিক দাবির সাথে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক ধরণের বড় সংঘাত পরিলক্ষিত হচ্ছে। মাদুরো আটক হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে আইনত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এমনকি দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনীও দেলসি-র প্রতি তাঁদের পূর্ণ আনুগত্য ও সমর্থন ব্যক্ত করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর দেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার ইতিবাচক ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রেক্ষাপটকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে ট্রাম্পের নিজেকে সরাসরি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধান দাবি করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ধরণের সরাসরি ও আক্রমণাত্মক হস্তক্ষেপ ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে আরও জটিল ও সংঘাতপূর্ণ করে তুলবে। একদিকে স্থানীয়ভাবে দেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্ব এবং অন্যদিকে ট্রাম্পের একচ্ছত্র আধিপত্যের দাবি—এই দুইয়ের মাঝে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে। মূলত বৈশ্বিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং দক্ষিণ আমেরিকায় মার্কিন প্রভাবকে একচেটিয়া করতেই ট্রাম্প প্রশাসন এমন সাহসী অথচ বিতর্কিত নীতি গ্রহণ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বর্তমান এই পরিস্থিতিতে ল্যাটিন আমেরিকা অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোও গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে পরিস্থিতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক আকস্মিক ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর পড়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘের ৩১টি সংস্থাসহ মোট ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সংস্থাগুলোর তালিকায় এমন সব প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা মূলত বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, মানবাধিকার রক্ষা, গণতন্ত্র সুসংহতকরণ এবং নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করে। বুধবার একটি প্রেসিডেন্সিয়াল স্মারকের মাধ্যমে প্রকাশিত এই তালিকায় জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) এবং ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ বা আইপিসিসি-র মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নাম রয়েছে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন ইউনেস্কো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এসব বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থদাতা হওয়ায় তাদের প্রস্থান পুরো ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ফেলবে। এর ফলে বাণিজ্য, মানবিক সহায়তা, শিক্ষা ও বিশেষ করে জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশ যে ধরণের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও আর্থিক অনুদান পেয়ে আসছিল, তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সবচাইতে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর একটি, তাই আইপিসিসি-র মতো নির্ভরযোগ্য গবেষণা সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়া মানে হলো এ সংক্রান্ত বৈশ্বিক লড়াইয়ে বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়া। হোয়াইট হাউজ তাদের এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়েছে যে, এসব সংস্থা আমেরিকানদের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা বৈরি এজেন্ডা অনুসরণ করছে। তবে এই যুক্তির বিপরীতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন সহায়তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় এক বিশাল অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা পেয়ে আসছিল। এই বিশাল অংকের অর্থ মূলত খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ রক্ষা এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ব্যয় করা হয়েছে। ইতিমধেই ইউএসএইড (USAID)-এর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর রোহিঙ্গা সহায়তা ছাড়া প্রায় সব খাতেই মার্কিন সরাসরি অর্থায়ন সংকুচিত হয়েছে। এমতাবস্থায় ৬৬টি সংস্থা থেকে ওয়াশিংটনের বিচ্ছেদ বাংলাদেশের চলমান ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে বাণিজ্য ও মানবিক ইস্যুতে বাংলাদেশের যে দরকষাকষির ক্ষমতা থাকে, তা ঝুঁকিতে পড়বে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন যে এই সিদ্ধান্তের একটি সুদূরপ্রসারী প্রতীকী মূল্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়, তখন অন্যান্য ধনী দেশগুলোর মধ্যেও সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে সামগ্রিক বৈশ্বিক সহযোগিতা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বিভাজন আরও গভীর হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের মতো সংস্থাগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য নতুন কোনো সংকট বয়ে আনে কি না, সেটিই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এখন বিকল্প উৎসের সন্ধান এবং এই সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় নতুন কূটনৈতিক কৌশল প্রণয়নের কথা ভাবছেন। মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক বিশ্বব্যবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্থান উন্নয়নশীল দেশগুলোর অগ্রযাত্রায় এক বিশাল অন্তরায় হিসেবে দেখা দিচ্ছে।