ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দালালচক্রের মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দিয়ে রোগী ভাগিয়ে চিকিৎসার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করানোর গল্প মোটামুটি সবারই জানা।
সম্প্রতি দৈনিক বাংলার অনুসন্ধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক) থেকে এভাবে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার পাঁচটি দালাল চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে তিনটি চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক চার ছাত্রনেতা।
জানা গেছে ঢামেক থেকে বেসরকারি হাসপাতালে কোনো রোগী ভর্তি করাতে পারলে প্রতি রোগীর বিপরীতে পাওয়া যায় একটা পার্সেন্টেজ। সেই রোগীর কত বিল হয় সেটির ওপর নির্ভর করে পার্সেন্টেজের পরিমাণ। ক্ষেত্রবিশেষে এই পার্সেন্টেজের পরিমাণ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ। কোথাও কোথাও রোগী যতদিন ভর্তি থাকবে সে হিসাবে দিনপ্রতিও কমিশন নেওয়ার সুযোগ আছে। দালালচক্রের সদস্যের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, কখনো কখনো রোগী যেতে রাজি না হলে তাদেরকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি তাদের মারধরও করা হয়ে থাকে।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আনসারের প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) মো. উজ্জ্বল বেপারী এবং ঢামেক পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বাচ্চু মিয়া চক্রগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিনিময়েও মাসোহারা পান। তবে তারা উভয়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা যেসব রোগীর এনআইসিউ বা আইসিউ প্রয়োজন হয় সেসব রোগীকে টার্গেট করেই এই পাঁচটি চক্র কাজ করে। এ ছাড়া মাঝেমাঝে সাধারণ রোগীরাও তাদের টার্গেটের শিকার হয়।
হাসপাতালের ভিতর বিভিন্ন দেয়ালে ‘দালাল দেখলে ধরিয়ে দিন’ শীর্ষক যেসব স্টিলের প্লেট লাগানো হয়েছে সেখানে থাকা যোগাযোগের নম্বরগুলোও কালো কালি দিয়ে মুছে ফেলা হয়েছে। এতে এসব চক্রের সদস্যরা অনেকটা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে।
পাঁচ চক্রের নেতৃত্বে যারা
জানা গেছে, পাঁচটি চক্রের মধ্যে তিনটি চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছে যারা, তারা একসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় শেখ স্বাধীন সাবিত এবং ইয়ামিন রহমান শুভ। এর মধ্যে শেখ স্বাধীন সাবিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি। আরেকটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় হেদায়েত উল্লাহ সরকার এবং কাজী রাশেদ। এর মধ্যে হেদায়েত শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি। আর রাশেদ একই হল শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক উপ-সম্পাদক। অন্য এক গ্রুপের নেতা ইমরান খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি।
বাকি দুই গ্রুপের নেতৃত্বে যারা আছে, তারা হলো হান্নান এবং কাশেম। এর মধ্যে কাশেম ট্যাক্সি কাশেম নামে হাসপাতাল এলাকায় পরিচিত।
এদের মধ্যে কোন গ্রুপ কোথায় কাজ করবে তা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। সাবিত-শুভ এবং হেদায়েত-রাশেদ গ্রুপটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হাসপাতালের ২১১ এবং ২১২ নম্বর ওয়ার্ডে। এই দুটি এনআইসিউ এবং গাইনি ওয়ার্ড। সার্বক্ষণিকই এই দুই ওয়ার্ডের সামনে চক্রের সদস্যদের অবস্থান থাকে। এই দুই ওয়ার্ডে বাকি তিন গ্রুপের কেউ কাজ করতে পারে না। এই দুটি গ্রুপসহ বাকি তিন গ্রুপ কাজ করে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে। তারা সবাই কাজ করে সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। দিনের বেলা তাদের কাজ বন্ধ থাকে।
যে গ্রুপ যেসব হাসপাতালে রোগী পাঠায়
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেখ স্বাধীন সাবিত এবং ইয়ামিন রহমান শুভর নেতৃত্বে থাকা গ্রুপটি মেডিফেয়ার জেনারেল হাসপাতাল, ইউনিহেলথ, আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল, প্রাইম এবং ঢাকা হেলথ কেয়ার হাসপাতালে রোগী পাঠায়। এই গ্রুপের ছয় সদস্যের নাম জানা গেছে। তারা হলেন জুয়েল, নিপু, মেহেদী, টুটুল, আল আমিন এবং এস এম খলীল। এই সদস্যরা মাসিক ১৫-২০ হাজার টাকা বেতনে সাবিত-শুভর হয়ে কাজ করে থাকে।
হেদায়েত এবং রাশেদ একটি গ্রুপ মেডিফেয়ার, সুপার স্পেশালিস্ট, প্রাইম এবং ঢাকা হেলথ কেয়ার হাসপাতালে রোগী পাঠায়। এই দুই গ্রুপের হয়ে কাজ করে আলমগীর, রিপন, নাদিম, মিরাজ এবং হানিফ।
ইমরান খানের গ্রুপটি হসপিটাল টোয়েন্টি সেভেন এবং বাংলাদেশ ক্রিটিক্যাল কেয়ারে রোগী পাঠায়। এই গ্রুপের সদস্যরা হলেন ইব্রাহিম, নয়ন, নাফিস। তবে ইমরান তাদের মাসিক ভিত্তিতে বেতন দেয় না। রোগী ভিত্তিক টাকা দেয়। আর মাস শেষে প্রত্যেকের টাকার পরিমাণ ২০-২২ হাজারে পৌঁছায়।
ট্যাক্সি কাশেমের গ্রুপটি আমার বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ক্রিটিক্যাল কেয়ার, প্রাইম এবং ক্রিসেন্ট হাসপাতালে রোগী পাঠায়। আর এই গ্রুপের অধীনে কাজ করে এরকম দুইজনের তথ্য পাওয়া গেছে। এরা হলো মনির এবং বিল্লাল।
হান্নানের গ্রুপটি বিএনকে, এ ওয়ান, প্রাইম এবং হেলথ কেয়ারে রোগী পাঠায়। এই গ্রুপে কাজ করা সদস্যরা হলেন শরিফ, ইসমাইল, তুষার এবং অপু।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হান্নানের গ্রুপটি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের আপ্যায়নবিষয়ক সম্পাদক শেখ মুহাম্মদ তুনানের নাম ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। অভিযোগ রয়েছে, এসব হাসপাতালে তুনানও রোগী পাঠায়। সেসব রোগীর বিলের একটা পার্সেন্টেজ তুনানের পকেটে যায়।
চক্রের সদস্যদের হাসপাতালগুলোর মধ্যে মেডিফেয়ার অবস্থিত মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে, ইউনিহেলথ পান্থপথ সিগন্যালে, আহমেদ স্পেশালাইজড চানখাঁরপুলে, প্রাইম এবং ঢাকা হেলথ কেয়ার অবস্থিত শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিপরীত পাশের মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের দুই এবং তিন তলায়। সুপার স্পেশালিস্ট, হসপিটাল টুয়েন্টি সেভেন এবং বাংলাদেশে ক্রিটিক্যাল কেয়ার অবস্থিত ধানমন্ডি ২৭-এ। বিএনকে হাসপাতাল রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের পাশে। আমার বাংলাদেশ হাসপাতাল অবস্থিত শ্যামলী বাসস্ট্যান্ডের পাশে।
এই প্রতিনিধি ছদ্মবেশে দালালচক্রের সদস্য সেজে হাসপাতালগুলোর সঙ্গে কথা বললে তারাও জানায়, চক্রের নেতাদের নামে তাদের হাসপাতালে কোড আছে। এসব কোডের অধীনে তারা সেখানে রোগী পাঠায় এবং রোগীভেদে তারা প্যাকেজ বা রোগী হাসপাতালে যতদিন থাকবে এর প্রতিদিন হিসাবে টাকা পায়।
দালালের ছদ্মবেশে এওয়ান হাসপাতালের পরিচালক সাইয়েদ ইসলাম সাইফের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, কোনো আইসিইউ রোগী এনে দিতে পারলে রোগী ভর্তি হওয়ার পরপরই আপনি ১৮ হাজার টাকা পেয়ে যাবেন। এটা হলো প্যাকেজ সিস্টেম। আর পার ডে হিসাবে নিলে দৈনিক পাবেন ৫ হাজার টাকা।
পরিচয় গোপন রেখে চক্রের কয়েকজন নেতাকে ফোন দিলে তারাও এই প্রতিবেদককে রোগী যতদিন ভর্তি থাকবে সে হিসাবে দিনপ্রতি ৪ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
দালাল চক্রের সদস্যরা যেভাবে কাজ করে
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চক্রের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে যখনই কোনো রোগী আসে, চক্রের সদস্যরা তাদের অনুসরণ করে রোগীর স্বজন, হাসপাতালের ট্রলিম্যান বা যে অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগীকে আনা হয়েছে সেই অ্যাম্বুলেন্সের চালকের সঙ্গে কথা বলে রোগীর রোগের ধরন জানার চেষ্টা করে। কথা বলে রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হতে পারে এরকম কোনো সম্ভাবনা বুঝতে পারলে তারা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে থেকে তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর তারা রোগীর সঙ্গে ডাক্তারের রুম পর্যন্ত যায়। ডাক্তার যদি বলে রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন তখন থেকেই তাদের বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। এটিকে তাদের ভাষায় বলা হয় মার্কেটিং। তবে রোগীর অবস্থা যদি গুরুতর হয়, তখন ডাক্তারের রুম পর্যন্ত তারা রোগীকে নিতে দিতে চায় না। এর আগেই তারা রোগীর অবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন নেতিবাচক কথা বলে তারা তাদের কার্যক্রম শুরু করে দেয়। যখনই কোনো রোগী তাদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে সম্মত হয়, তখনই চক্রের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে ফোন দিয়ে রোগীর নাম এবং রোগীর পিতা বা মায়ের নাম জানিয়ে সেই রোগীকে তাদের চক্র প্রধানের নামে থাকা কোডে বুকিং দিতে বলা হয়। অনেক সময় এক রোগীর জন্য কয়েকটি চক্রের সদস্যরা একসঙ্গে ফোন দেয়। তখন যে চক্রের সদস্যরা আগে ফোন দেয় সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পক্ষ থেকে তাদের জানানো হয় ‘কল ক্লিয়ার’ আর যারা পরে ফোন দেয় তাদের বলা হয় ‘কল বুকড’।
আর যে দুটি চক্র মেডিকেলের ২১১ এবং ২১২ নম্বর ওয়ার্ডে কাজ করে তাদের সদস্যরা এসব ওয়ার্ডের সামনে প্রায় সময় অবস্থান করে। সেখানে থেকে তারা ফলো করে কোন রোগীর এনআইসিউ বা আইসিইউ প্রয়োজন হচ্ছে। আইসিইউ বা এনআইসিইউ প্রয়োজন রোগীদের টার্গেট করে। অনেক সময় তারা যেসব রোগীর এসবের প্রয়োজন নেই, তাদেরও টার্গেট করে। তাদের বাচ্চার জন্য এনআইসিউ প্রয়োজন বা এনআইসিউতে না নিলে তাদের বাচ্চার সমস্যা হয়ে যাবে, এমন সব কথা বলে তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। এবং বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
চক্রের সদস্যরা রোগীদের তাদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে বিভিন্ন প্রতারণা বিশেষ করে কম খরচে রোগীর চিকিৎসা করানো হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। আর চিকিৎসা শেষে বিলের কাগজ দেখে কপালে হাত দিতে হয় রোগীর স্বজনদের।
প্রতিবাদ করলে রোগীর স্বজনদেরও করা হয় মারধর
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিট নেই এবং রোগীর জরুরি ভিত্তিতে এনআইসিউ প্রয়োজন দাবি করে দালাল চক্রের সদস্যরা এক রোগীকে বাইরে নিয়ে যেতে চাইলে এই ঘটনার প্রতিবাদ করায় সেই রোগীর স্বজনদেরও মারধর করে সাবিত-শুভরা।
ঘটনার ভুক্তভোগী মোহাম্মদ রাসেল শান্ত বলেন, গত ২৬ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে আমার ভাতিজার জন্ম হয়। কিছুক্ষণ পর এক লোক এসে নিজেকে হাসপাতালের লোক দাবি করে বলেন, ‘আমাদের এখানে সিট নেই। আপনারা এখানে ভর্তি হতে পারবেন না। বাচ্চাকে সুস্থ রাখতে চাইলে এখান থেকে দ্রুত নিয়ে যান। পাশেই মেডিফেয়ার নামে একটা হাসপাতাল আছে। সেখানে সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জিজ্ঞেস করি, মেডিফেয়ারে নেওয়ার বিষয়টা ডাক্তার বলেছে কি না। তখন তিনি বলেন, হ্যাঁ। এরপর আমরা তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে চাইলে সে ডাক্তারের কাছে যেতে গড়িমসি করছিল। তখন আমরা বুঝতে পারি সে দালাল। এরপর ওই লোকটাকে আমরা ঢাকা মেডিকেলের পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে আসি। এ সময় সেখানে সাবিত ভাইও (স্বাধীন সাবিত) হাজির হয়। ছাত্রলীগ করার কারণে আমি উনাকে চিনি। এরপর ফাঁড়ির ইনচার্জ বাচ্চু ভাই বিষয়টা ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে সমাধান করে দিয়েছে। সমাধান করার পর যখন আমরা ফাঁড়ি থেকে বের হই, তখন সাবিত ভাই তার লোকজনকে নিয়ে এসে আমাকে মারতে শুরু করে।
সেখানে তখন শাহবাগ থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক খালেকও উপস্থিত ছিলেন। তিনি দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘ভুক্তভোগী যদি এই ঘটনায় মামলা করে, তাহলে আমরা অবশ্যই অপরাধীদের গ্রেপ্তার করব।’
দালাল চক্রের খপ্পরে পড়া ভুক্তভোগীদের ভাষ্য
গত ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাত আড়াইটার সময় দেখা যায়, একজন যুবক এক বাচ্চাকে হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে ছিল সাবিত-শুভ গ্রুপের সদস্য টুটুল। তাদের পিছু পিছু যাওয়ার পর দেখা যায়, তারা জরুরি বিভাগের গেট থেকে একটি অটোরিকশা নিয়ে সেই বাচ্চাকে চানখাঁরপুলের আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করায়। পরে জানা যায়, সেই যুবকটির নাম হৃদয়। তিনি বাচ্চাটির বাবা। গত ১৫ জানুয়ারি তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘ঐ হাসপাতালে একদিন থাকার পর আমি বুঝেছি আমি দালালের খপ্পরে পড়েছি।’
২৬ ডিসেম্বর মধ্যরাতেই আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতালেই দেখা মেলে আরেক রোগীর স্বজনের। সে সময় তিনি নেবুলাইজার লাগানো তার ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে বের করে হেঁটে ঢাকা মেডিকেলের দিকে যাচ্ছেন। এ সময় তার গতিরোধ করে তার সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় সাবিত-শুভ চক্রের সদস্য টুটুলকে।
এই রোগীর বাবা দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘টুটুল নামের এই লোকটি এই হাসপাতলে ভালো ব্যবস্থা আছে বলে আমাদেরকে এখানে নিয়ে আসে। তার কথায় প্রভাবিত হয়ে আমরা চলে আসি। কিন্তু এসে দেখি, হাসপাতালের পর্যায়েও পড়ে না এটা। তাই আবার ঢাকা মেডিকেলেই চলে যাচ্ছি।’
যা বলছেন অভিযুক্তরা
সাবিত-শুভ গ্রুপের সদস্য টুটুলকে ফোন করলে তিনি সাবিতের সাথে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে ফোন কেটে দেন।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে শেখ স্বাধীন সাবিত বলেন, ‘আমরা কোনো হাসপাতালের মার্কেটিং (দালালি) করি না। আমি মেডিফেয়ার হাসপাতালের মালিক। আমার এখানে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রোগী আসে। আর ঢাকা মেডিকেলে আমরা যাই না। সেখানে আমাদের হয়ে কাজ করে এরকম কোন সদস্যও নেই।’
রোগীর স্বজন এবং অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারকে মারধরের ঘটনার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আপনার কাছে তথ্য থাকলে আপনি যা ইচ্ছা করেন। এটা নিয়ে আমার অত বেশি মাথাব্যথা নেই।’
এই গ্রুপের আরেক সদস্য ইয়ামিন শুভও অভিযোগ অস্বীকার করেন।
অন্য গ্রুপের নেতা হেদায়েত সরকার বলেন, প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে আমাদের প্রতিনিধি আছে। তারা বেতনভুক্ত। তারা সেসব হাসপাতালে আমাদের হয়ে মার্কেটিং করবে। তবে হাসপাতালের কোনো কর্মচারী বা অন্য কেউ রোগী পাঠালে তাদেরকে আমরা কমিশন দেই না। এসব কাজ করে মেডিফেয়ার বা আহমেদ স্পেশালাইজডের মতো হাসপাতালগুলো।
তবে এই গ্রুপের অন্য নেতা কাজী রাশেদ বলেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় বা অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারদের সাথে যোগাযোগ রাখি এটা সত্য। এদের মাধ্যমে যদি আমাদের হাসপাতালে কোনো রোগী আসে তাদেরকে আমরা পার-ডে ভিত্তিতে বা এককালীন একটা পার্সেন্টেজ দেই। এই টাকাটা পপুলার বা ল্যাবএইডের মতো হাসপাতালও দেয়। এখন এদের যদি আমরা টাকা না দেই তারা ত আমাদের রোগী দিবে না। তাই এই টাকাটা দিতে হয়। তবে আমরা নিজেদের কোন লোক হাসপাতালের ভিতরে রাখি না।’
তাহলে এই গ্রুপের সদস্য হানিফ, মিরাজ বা আলমগীর এরা কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এরা আমাদের হাসপাতালের কর্মচারী। তাহলে তারা ঢাকা মেডিকেলে কী করে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।’
আরেকটি গ্রুপের নেতা ইমরান খান বলেন, ‘এই অভিযোগগুলো হাস্যকর। তবে এসব বিষয়ে সরাসরি কথা বলাই ভালো।’
অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারকে মারধর বা রোগীদের কনভিন্স করতে তাদের অ্যাম্বুলেন্সের সামনে উঠার চেষ্টার বিষয়ে তিনি বলেন, এগুলো কোনো কিছুই হয় না।
অন্য গ্রুপের নেতা হান্নান বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে এমনিতেই রোগী আসে। মার্কেটিংয়ের জন্য কেউ নেই। আর রোগী নিয়ে আসলে কাউকে টাকা দেওয়া হয় না।’
এই গ্রুপের শেখ তুনান রোগী পাঠিয়ে রোগীপ্রতি পার্সেন্টেজ পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিএনকে ছাড়া বাকি হাসপাতালগুলোর নামও আমি শুনিনি। আমার পেটে কোন হারাম টাকা নেই। আমার অনুরোধ আরেকটু ক্রচ-চেক করবেন।’
এরপর ছদ্মবেশে বিএনকে, প্রাইম এবং এ ওয়ান হাসপাতালে কথা বললে তারাও জানিয়েছেন, শেখ তুনানের নামে এখানে রোগী আসে এবং কোডও আছে। বিল নেওয়ার জন্য তিনি মাঝেমধ্যে সেসব হাসপাতালে যান। প্রাইম হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা ছবি দেখে তুনানকে শনাক্তও করেছেন।
অন্য গ্রুপের অভিযুক্ত নেতা ট্যাক্সি কাশেমের ফোন নম্বর সংগ্রহ করতে না পারায় তার বক্তব্য জানা যায়নি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘দালালচক্রের ব্যাপারে আমরা অবহিত। আমরা তাদের উৎখাত করার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে তাদের দুইজন সদস্যকে আমরা গ্রেপ্তারও করেছি। এই চক্রের নেতারা যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সেটাও আমরা অবহিত। এটি নিয়ে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রক্টর মহোদয়ের সঙ্গে দেখা করার চিন্তা করছি। স্যারদের আমরা অবহিত করেই এরপর এদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী এসব কাজে জড়িত থাকা লজ্জার বিষয়।’
তিনি বলেন, হাসপাতালের আনসার, পুলিশ এবং ওয়ার্ড মাস্টারদের ইতোমধ্যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, বিভিন্ন ল্যাবরেটরি বা বেসরকারি হাসপাতালের কোনো লোক যদি আমাদের হাসপাতালে আসে তাদের ধরে যেন পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।
পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এবং আনসার প্লাটুনের কমান্ডারের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের বিষয়ে ঢামেকের এই পরিচালক বলেন, ‘এই বিষয়টাও শুনেছি।’ যেহেতু তারা সরকারি কর্মকর্তা তাই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কিছুটা কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হাসপাতালের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো ‘দালাল দেখলে ধরিয়ে দিন’ শীর্ষক প্লেটে থাকা নম্বর মুছে ফেলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সবেমাত্র দুই সপ্তাহ হয়েছে আমি দায়িত্ব নিয়েছি। তাই বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত নই। আমি দেখব এটি।’
প্রথম দেখায় যে কারওরই মনে হতে পারে এটি একটি কলম। কিন্তু না, হাতে নিয়ে দেখলে জানা যাবে সাধারণ এই কলমটি কাগজে লেখা জন্য নয়, বরং এটি মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র। কলমের ইংরেজি প্রতিশব্দের সঙ্গে মিলিয়ে হয়েছে এর নামকরণ— ‘পেনগান’। সম্প্রতি পুরান ঢাকার নয়াবাজারে যুবদল নেতা রাসেলকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় এই নতুন ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বিগ্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তে জানা গেছে, দেখতে সাধারণ কলমের মতো হলেও ‘পেনগান’ আসলে একটি মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র, যা সহজে বহন ও গোপন রাখা যায়। এর ভেতরে গুলি করার মতো ইস্প্রিন্টার রয়েছে। এমনকি ব্যবহারের পর অস্ত্রটি একটি সিগারেটের প্যাকেটে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
এই ঘটনায় জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- সায়মন এবং সোহেল ওরফে কাল্লু। তাদের কাছ থেকেই কেরানীগঞ্জ এলাকা থেকে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, প্রায় ৮০ হাজার টাকায় এই অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়েছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্ত্রটির কোনো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম বা চিহ্ন না থাকায় এর সঠিক উৎস নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি ভারত বা পাকিস্তান থেকে দেশে এসেছে। অতীতে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থিদের কাছে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের তথ্যও রয়েছে। এমন কি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এক সংসদ সদস্য হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামির কাছেও এমন অস্ত্রের তথ্য পাওয়া গেছে পাওয়া যায়। যদিও সেই সময়ে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয় নি।
ডিবি সূত্রে জানা যায়, ৩ এপ্রিল বিকেলে মোবাইল ফোনে ডেকে রাসেলকে সায়মনের বাসায় নেওয়া হয়। সেখানে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। তবে গুলির পর মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় গুলির ঘটনায় জড়িত সায়মন ও রিপন দাস তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরার আশঙ্কায় রোগী নিয়ে সটকে পড়েন তারা৷ পরে সায়েন্সল্যাব এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেও আসামিরা রাসেলে পাশে হাসপাতালে উপস্থিত ছিল। পরে স্বজনরা আসায় তারা সটকে পড়েন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার (দক্ষিণ) মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অস্ত্র অতীতে রাজধানীতে ব্যবহারের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। পেনগানটি কীভাবে দেশে এলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত—এসব বিষয় গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, অস্ত্র সরবরাহকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পাশাপাশি এ ধরনের অস্ত্র দেশের অন্য কোথাও ব্যবহৃত হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আহত রাসেল কোতয়ালী থানা যুবদলের সদস্য। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় চারজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা চেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার পেছনের বিরোধ ও উদ্দেশ্য উদঘাটনেও কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ করে কোতোয়ালি থানায় হত্যা চেষ্টা মামলা হয়েছে।
ডিবির লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নূরে আলম বলেন, অস্ত্রটি কীভাবে দেশে এসেছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত তা তদন্ত করা হচ্ছে। অস্ত্র সরবরাহকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযানও চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের অন্য কোথাও এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, ‘পেনগান’ মূলত একটি ছদ্মবেশী আগ্নেয়াস্ত্র। অস্ত্রটির ভেতরে থাকে ছোট আকারের ফায়ারিং মেকানিজম। স্বল্প দূরত্বে গুলি ছুড়তে ব্যবহৃত হয় ‘পেনগান’।
হাম নিয়ন্ত্রণে সরকার ১৪ দিন এগিয়ে এনে আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে একযোগে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দেশব্যাপী হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ উত্থাপন করেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দেশে হামের টিকার মজুত স্থিতিশীল আছে। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে হামের টিকা দেওয়া শুরু হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা ব্যবস্থাপনায় অবহেলার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। সেই সংকট কাটিয়ে উঠছে সরকার। হামের টিকা নিয়ে কোনো সংকট নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশের শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা গত ৯ মাস যাবৎ বেতন পাচ্ছেন না, তাদের বেতন পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা শুরু হয়েছে। অন্য সমস্যাগুলোও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদে জানান, ‘২ কোটি ১৯ লাখ হামের টিকা পাওয়া গেছে। মজুতও আরও রয়েছে। দুর্নীতি ও বিলম্ব এড়াতে এবার টেন্ডার প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সরাসরি ইউনিসেফ থেকে টিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলাগুলোতে টিকা কার্যক্রম চালানোর জন্য ৩৪ লাখ ৮৩ ডোজ টিকা বিতরণ করা হয়েছে। এক ভায়ালে ১০ ডোজ টিকা দেওয়া যায়। হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইনের জন্য সরকার সর্বমোট ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা সংগ্রহ করেছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ টিকা আমাদের আছে এবং কোল্ড চেন রক্ষা করা হচ্ছে।
হাম নিয়ে অযথা আতঙ্ক না ছড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।’
‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বিলসহ অন্তর্বর্তী সরকারের পাঁচটি অদ্যাদেশের বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১১তম দিন বুধবার (৮ এপ্রিল) কণ্ঠভোটে বিলগুলো পাস হয়। বিলগুলোর বিশেষ কমিটির কোনও প্রস্তাব না থাকায় সরাসরি পাস হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং মন্ত্রীর পক্ষে প্রতিমন্ত্রীরা বিলগুলো উত্থাপন করেন।
পাস হওয়া বিলগুলো হলো— ‘সরকারি হিসাব নিরীক্ষা আইন, ২০২৬’, ‘প্রোটেকশন অ্যান্ড কনসারভেশন অব ফিস (এমেনমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’, ‘শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি জামালপুর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ বিল সংসদে পাস করা হয়। বিলটিতে শেখ হাসিনার নাম বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়।
পাস হওয়া অপর বিলগুলো হচ্ছে— ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাষণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ এবং ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’।
‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপনের বিলটি পরে পাসের প্রক্রিয়ায় গেলে বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান সংসদের দাঁড়িয়ে বিলটি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেন। শফিকুর রহমান বলেন, বিলটি দুই তিন মিনিট আগে পেলাম। বিলটি দেখতে পারিনি। বিলটি দেখার জন্য সময় পেলে আলোচনা করা যেতো।
এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রুলিং দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতাকে বলেন, বিলের এই স্টেজে আপত্তি করার সুযোগ নেই। আপত্তি করার নিয়ম আছে আপনি সেই সময় করেননি। আপনি যদি আগে প্রস্তাব দিতেন তাহলে আলোচনার সুযোগ পেতেন।
এরপর স্পিকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করার কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওই সময় বলেন, বিরোধী দলীয় নেতার অবশ্যই স্মরণে থাকার কথা, তারা এবং এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে আন্দোলন করেছিলেন। ওই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মোটামোটি বাংলাদেশে একটি জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এবং অ্যাকর্ডিংলি নির্বাচন কমিশন তাদের (আওয়ামী লীগের) রেজিস্ট্রশনটাও সাসপেন্ডেড হয়ে আছে এই আইনের বলে। সংগঠনের বিচারের জন্য আইসিটি অ্যক্টাও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন যদি আপনারা এর ওপর আলোচনা করতে চান, আমার মনে হয়, সংশোধনের সেকেন্ড লিডিংয়ের স্টেজে যদি সংশোধনী দিতেন তাহলে আলোচনা থাকতো অথবা ফার্স্ট লিডিয়ের পর যদি সংশোধনী দিনে তাহলে আলোচনা থাকতো।
এ সময় স্পিকার বলেন, আমি রুলিং দিয়েছি, আপনি পাস করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এরপর বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করা হলে কণ্ঠভোটে পাস হয়।
দেশের নারী শিক্ষার প্রসার ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা সদরে একটি করে মহিলা কলেজ সরকারিকরণের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, সরকার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে এবং পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা হবে।
বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে নওগাঁ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপুর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এর সভাপতিত্বে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর টেবিলে এটি উপস্থাপিত হয়। সাংসদ ইকরামুল বারী টিপু তার প্রশ্নে নওগাঁর মান্দা উপজেলাধীন ‘মান্দা থানা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ’ সহ দেশের সব উপজেলা সদরের একটি করে মহিলা কলেজ সরকারিকরণের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না এবং থাকলে তা কতদিনের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে— তা জানতে চান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার নারী শিক্ষার প্রসার এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে দেশের সব উপজেলা সদরে একটি করে মহিলা কলেজ সরকারিকরণের বিষয়টি সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করে বলেন, মান্দা একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হওয়ায় সেখানে নারী শিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, মান্দা থানা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজসহ দেশের অন্যান্য উপজেলার উপযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারিকরণের বিষয়টি বর্তমান নীতিমালা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী নারী শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং জানান যে, সরকারের এই পদক্ষেপ তৃণমূল পর্যায়ে নারী শিক্ষার হারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) ২০২৬ বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। আজ বুধবার দুপুরের অধিবেশনে এই বিল পাস হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সন্ত্রাসবিরোধী বিল ২০২৬ সংসদে উত্থাপন করেন। পরে বিলটি ‘হ্যাঁ’ ভোটে জয়যুক্ত হয়।
এতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আগে থেকেই দেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইন থাকলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ও জনমতের প্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে। সেই অধ্যাদেশে গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান রাখা হয়, যার আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।’
এর আগে বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের বৈঠক পুনরায় শুরু হয়।
দেশের ৪ কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দর্শন হলো ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’।
বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এ. এম. মাহবুব উদ্দিনের খোকনের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সংসদের কার্যক্রম শুরু হয় সকাল ১১টায়। অধিবেশনের ১১তম দিন সকালের সেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন উত্তর টেবিলে উত্থাপিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’ এ দর্শনে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে গত ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে দেশের ১০টি জেলা এবং ৩টি সিটি কর্পোরেশনের ৩৭ হাজার ৮১৪টি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, আগামীতে দেশের প্রায় ৪ কোটি প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে পর্যায়ক্রমে এ কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
নোয়াখালী-১ (চাটখিল ও সোনাইমুড়ী) নির্বাচনী এলাকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আশা করছি সংসদ সদস্যের নির্বাচনি এলাকার দরিদ্র পরিবারের নারী সদস্যদের ক্ষমতায়ন ও স্বাবলম্বী করার লক্ষে শিগগিরই তাদের ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’’
সারাদেশে দুই হাজার ৮৪৭টি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। বুধবার (৮ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে লিখিত প্রশ্নোত্তরে তিনি এ তথ্য জানান।
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১১তম দিনে সকালের সেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন লিখিত প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। সারাদেশে বিদ্যালয়বিহীন গ্রামের সংখ্যা- ঢাকা বিভাগে ৭১৭টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৮১৮টি, রাজশাহী বিভাগে ৩৫৫টি, রংপুর বিভাগে ৩৭টি, খুলনা বিভাগে ৩৪৯টি, বরিশাল বিভাগে ৪৫টি, সিলেট বিভাগে ২৬০টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৬৬টি। সর্বমোট ২৮৪৭টি।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ভবিষ্যতে এসব গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব এলে প্রয়োজনীয়তা সংক্রান্ত শর্তাদি বিবেচনা সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বুধবার (৮ এপ্রিল) দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে বৈঠকে বসছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
ভারতের স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় এ বৈঠক শুরুর কথা। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহ থাকবেন।
বৈঠকে দু’দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হবে। এক্ষেত্রে আলোচনার টেবিলে থাকবে ব্যাবসা-বাণিজ্য, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুনরায় চালু, জ্বালানি নিরাপত্তা, গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ভারতীয় ভিসা চালু করা, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকারীদের দেশে প্রত্যর্পণ, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশটিতে পলাতক মানবতাবিরোধী অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের নেতাদের দেশে ফেরানো, শীর্ষ নেতাদের সফর বিনিময়সহ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে বাংলাদেশের প্রার্থিতায় ভারতের সমর্থন।
এ ছাড়া, আঞ্চলিক ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সংকট নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
এদিন, বিকেলে ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল এবং পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসবিষয়ক মন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।
মূলত, ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে মরিশাস যাওয়ার পথে মঙ্গলবার দিল্লি গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশ সরকার তার এই সফরকে শুভেচ্ছা সফর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রী দিল্লি সফরে গেলেন।
দিল্লিতে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আগামী ৯ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) দিল্লি থেকে মরিশাসগামী একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে একই সঙ্গে যাত্রা করার কথা। ওইদিন সকাল ৮টার এয়ার মরিশাসের সেই ফ্লাইটে সাত থেকে আট ঘণ্টার এই দীর্ঘ যাত্রাকে একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে দুই দেশের মন্ত্রী একান্ত পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করার সুযোগ পাবেন। এ কারণে দিল্লির আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে মরিশাসেও দুই দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, তাদের মধ্যে এটি ছিল সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎ।
কয়লার অভাবে পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের আরেক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র মাতারবাড়ি কয়লা সংকটে পড়েছে। গত কয়েক দিন ধরেই দেখা যাচ্ছে মাতারবাড়ি আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল পাওয়ারপ্ল্যান্ট পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
প্রসঙ্গত, সরকার জ্বালানি সংকট কাটাতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর জোর দিচ্ছে। এ অবস্থায় রামপাল, পায়রাসহ অন্য কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি ভালো হলেও এই দুই বড় কেন্দ্র উৎপাদন করতে না পারায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কক্সবাজারের এই সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এক হাজার ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও আজকে দেখা গেছে তারা ৩১৫ মেগাওয়াটে উৎপাদন সীমিত রেখেছে। গত কয়েক দিন ধরে তারা উৎপাদন সীমিত করেছে।
অপরদিকে পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি অনেক দিন ধরেই বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক কে. এম. নঈম খান বলেন, “কয়লার সংকটের কারণেই তাদের প্ল্যান্ট বন্ধ রয়েছে। তবে কত দিন ধরে বন্ধ রয়েছে তা তিনি নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি।”
আরএনপিএল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল হালিম গণমাধ্যমকে জানান, কয়লার দরপত্র সংক্রান্ত জটিলতার কারণে গত নভেম্বর থেকে তাদের প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যায়। তবে জটিলতা কেটেছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে কেন্দ্রটি ফের চালু হতে পারে।”
প্রসঙ্গত, নভেম্বরে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকলেও গ্রীষ্ম আসায় তা বেড়েছে। তখন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় কোনও জটিলতা সৃষ্টি না হলেও এখন কেন্দ্রটি চালু হলে গ্রাহক স্বস্তি পেতো।
তবে এই দুই ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দক্ষতার অভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, একই সময়ে একই দেশের কোনও কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি একই উৎস থেকে কয়লা আমদানি করে চলতে পারে, তাহলে তারা কেন পারছে না—এ বিষয়ে সরকারের নজর দেওয়া উচিত।
সাধারণত বাংলাদেশে বেশিরভাগ কয়লা আমদানি হয় ইন্দোনেশিয়া থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বেই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এতে কয়লারও বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। অপরদিকে ইন্দোনেশিয়া তাদের কয়লা রফতানি না বন্ধ করলেও সীমিত করেছে। দেশটি আগে নিজেদের চাহিদা পূরণের পর বাইরে বিক্রি করছে এবং স্পট মার্কেটে বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে যাদের কয়লা আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নেই, তারা বিপাকে পড়েছে। এতে পটুয়াখালীর তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটিও জটিলতায় পড়েছে। যেহেতু স্পট মার্কেট থেকে কয়লা কেনা বন্ধ এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিও নেই, তাই তারা প্ল্যান্ট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, এই পরিস্থিতি তৈরি হবে—এটা আগাম ধারণা করা হয়েছিল। যারা পরিস্থিতি অনুধাবন করে অগ্রিম ব্যবস্থা নিয়েছে, তারা সংকটে পড়েনি। আমরা সংকটে পড়েছি মানেই আমাদের কোনও না কোনও ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের আরেকজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, তারা কয়লার সংকটে রয়েছেন। প্রতিদিন কেন্দ্রটি চালাতে কমপক্ষে সাড়ে ১১ হাজার টন কয়লা প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাদের কাছে ফুল লোডে কেন্দ্র পরিচালনার মতো কয়লার সংকট রয়েছে। কেন্দ্রটি গত ৫ এপ্রিলও সর্বোচ্চ ৪৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে।
এদিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের আরেক বিদ্যুৎকেন্দ্র এসএস পাওয়ার পুরোদমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ব্যতিক্রম নেই দেশের অন্য বড় কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রেও—রামপাল ১৩২০ মেগাওয়াট, পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট, পটুয়াখালী ৩৪০ মেগাওয়াট।
যদিও ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে আদানি উৎপাদন অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। তারা একটি ইউনিটের কারিগরি ত্রুটির কথা জানিয়েছে। অন্য ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটে সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। ঢাকা ছাড়া সব জায়গা থেকে লোডশেডিংয়ের খবর আসছে। তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে লোডশেডিং আরও বাড়বে। বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের জটিলতা নিরসন সম্ভব না হলে ভুগতে হবে গ্রাহককে।
মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন। বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে শুরু হওয়া মন্ত্রী পর্যায়ের এ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অভিবাসন বিশ্লেষক ও জনশক্তি রপ্তানিকারকরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা মালয়েশিয়ার সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার দ্রুত চালু করাই এবারের সফরের মূল লক্ষ্য। শ্রমবাজার কবে, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় পুনরায় চালু হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পর।
কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রীর আমন্ত্রণে মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছে। তারা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন, যেখানে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি প্রধান আলোচ্যসূচি হিসেবে গুরুত্ব পাবে।
এর আগে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বারনামা জানায়, বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসন বিভাগের জারি করা সরকারি আদেশের মাধ্যমে এ সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন জানিয়েছেন, প্রতিনিধি দলটি মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেবে। এসব বৈঠকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজার পুনরায় চালু, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দ্বিপক্ষীয় শ্রম সহযোগিতা জোরদারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা বিশেষ করে অবৈধ অবস্থানে থাকা কর্মীদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আলোচনা করা হবে।
মাহাদী আমিন বলেন, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের জন্য মানবিক ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এ লক্ষে কূটনৈতিক পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে অনিয়মিত অভিবাসন রোধ এবং বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সফর বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
উল্লেখ্য, প্রায় দুই বছর ধরে মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ রেখেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এই স্থবিরতার অন্যতম কারণ হিসেবে দাতো আমিন নুরের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ উঠে, যারা কর্মী ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের জিম্মি করে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের কয়েকগুণ বেশি অর্থ আদায় করেছিল।
যদিও মালয়েশিয়া সরকার ১৪টি সোর্স দেশ থেকে কোনো সিন্ডিকেট ছাড়াই শ্রমিক নিয়োগ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক নিয়োগও সম্পন্ন করেছে।
জনশক্তি রফতানিকারকদের আশঙ্কা, নতুন করে শ্রমবাজার চালু হলে পুরোনো চক্রটি আবারও সক্রিয় হয়ে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে পারে। এমনকি এ ক্ষেত্রে আরও প্রায় ৪০০ নতুন এজেন্সিকে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনাও থাকতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলেছেন, যে প্রক্রিয়াতেই শ্রমবাজার খোলা হোক না কেন, সরকারের কঠোর মনিটরিং না থাকলে একজন কর্মীর বিদেশযাত্রায় ব্যয় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এ ব্যয় পুনরুদ্ধার করতে একজন শ্রমিকের আড়াই থেকে তিন বছর সময় লেগে যেতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেনায় গাফিলতির কারণেই শিশুদের মৃত্যু বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী। তিনি বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনার যে গাফিলতিটি হয়, সেই গাফিলতির কারণেই ওই সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা আজ মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েছে। অর্থাৎ এটি হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ করে যিনি নির্বাহী স্বাস্থ্য উপদেষ্টা তার অদূরদর্শিতা, অবহেলা অথবা অক্ষমতা।
ডা. লেলিন চৌধুরী আরো বলেন, ‘প্রতি বছর আমাদের দেশে কমবেশি ৩০ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে। জন্মের পরে-আগে এদের প্রায় ৯৮ শতাংশকে টিকার আওতায় আনা হতো। কিন্তু তিনি আরো বলেন, পুরো বিষয়টির একটা নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার এবং কেন এটি ঘটল সেই দায়ী ব্যক্তি অথবা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা দরকার।
আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানিয়েছেন।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান লিখিত প্রশ্নে জানতে চান, পবিত্র হজ পালনে খরচ কমাতে সরকার কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না। জবাবে ধর্মমন্ত্রী বলেন, ২০২৬ সালের হজ প্যাকেজ ঘোষণার মাধ্যমে হজের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্যাকেজ অনুযায়ী সৌদি আরব ও বাংলাদেশ পর্বের বিভিন্ন খরচ ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। সৌদি সময়সূচি অনুযায়ী ভিসাসহ সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ১৮ এপ্রিল থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হবে। এছাড়া ২০২৭ সালের হজ প্যাকেজ প্রণয়ন ও ঘোষণার সময় হজযাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা ও চাহিদার ভিত্তিতে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।