বাঙালির অধিকার আদায়ের রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ। ইতিহাসের পাতায় রক্ত পলাশ হয়ে ফোটা সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, সফিউরসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদের রক্তে রাঙানো এ দিনটি বাঙালি জাতির মননে অনন্য মহিমায় চিরভাস্বর হয়ে আছে।
মাতৃভাষা আন্দোলনের ৭২ বছর পূর্ণ হলো এ বছর। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতিসত্তা ও ভাষাভিত্তিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষাসহ সব সংগ্রাম ও আন্দোলনের উৎস ও প্রেরণা। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের উম্মেষ ঘটে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়।
মাথা নত না করার চির প্রেরণার অমর একুশের এ দিনে কোটি কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে একুশের অমর শোকসংগীত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি...।’
রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিভিন্ন স্থানে আলোচনা সভাসহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে একুশের মহান শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।
দিনের প্রথম প্রহরে অর্থাৎ রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে একুশের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
দিবসটি পালনে কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও শ্রদ্ধা জানানো হবে।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সংস্থা (ইউনেসকো) মহান একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার বিষয়ে প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন কানাডাপ্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম এবং কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক সংগঠন ‘মাতৃভাষা প্রেমিক গোষ্ঠী’। কিন্তু বাস্তবে এ সাফল্য এসেছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণের ফলে। তারই ত্বরিত প্রচেষ্টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারিত সময়ে ইউনেসকোয় এ প্রস্তাব প্রেরিত হলে তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
বাঙালি জাতির জন্য এই দিবসটি হচ্ছে চরম শোক ও বেদনার। অন্যদিকে মায়ের ভাষা বাংলার অধিকার আদায়ের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। যে কোনো জাতির জন্য সবচেয়ে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার হচ্ছে মৃত্যুর উত্তরাধিকার- মরতে জানা ও মরতে পারার উত্তরাধিকার। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদরা জাতিকে সে মহৎ ও দুর্লভ উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন।
১৯৫২ সালের এই দিনে ‘বাংলাকে’ রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র ও যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসক গোষ্ঠীর চোখ-রাঙানি ও প্রশাসনের ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দুর্বার গতি পাকিস্তানি শাসকদের শঙ্কিত করে তোলায় সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, জব্বার, শফিক, বরকত ও রফিক গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
মহান শহীদ দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
আজ সরকারি ছুটির দিন। অর্ধনমিত রাখা হবে জাতীয় পতাকা। একই সঙ্গে সর্বত্র ওড়ানো হবে শোকের কালো পতাকা। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও বেতারে ভাষা দিবসের বিশেষ ক্রোড়পত্র ও অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হচ্ছে। সংবাদপত্রসমূহে ক্রোড়পত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের বিষয়টি বিশেষভাবে উপস্থাপন করা হবে।
দিবসটি পালন উপলক্ষে জাতীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরআনখানির আয়োজনসহ দেশের সব উপাসনালয়ে ভাষাশহিদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ মিশনসমূহ শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাণী পাঠ, বঙ্গবন্ধু ও ভাষা আন্দোলন-বিষয়ক আলোচনা সভা, পুস্তক ও চিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করবে যেখানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক এবং বাঙালি অভিবাসীদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।
এ ছাড়া দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা শহরের বিভিন্ন সড়কদ্বীপ সমূহ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাজনক স্থানসমূহে বাংলাসহ অন্যান্য ভাষার বর্ণমালা-সংবলিত ফেস্টুন দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে। একুশের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার এবং ভাষাশহিদদের সঠিক নাম উচ্চারণ, শহিদ দিবসের ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা, শহিদ মিনারের মর্যাদা সমুন্নত রাখা, সুশৃঙ্খলভাবে শহিদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ইত্যাদি জনসচেতনতামূলক বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি গণমাধ্যমসমূহে প্রয়োজনীয় প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দুই দিনব্যাপী বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুস্পার্ঘ্য অর্পণ, সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারা দেশে সংগঠনের সব কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ এবং প্রভাতফেরি।
এ ছাড়া আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করবেন।
আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদারে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকায় ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৩৭টি ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে থাকবে বডি ক্যামেরা।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত ‘নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে ডিএমপি কর্তৃক গৃহীত নিরাপত্তা পরিকল্পনা সংক্রান্ত’ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সেসময় তিনি বলেন, ডিএমপিতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ১৬১৪টি। এই কেন্দ্রগুলোতে ৪ জন করে পুলিশ সদস্য থাকবে। ৫১৭টি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে তিনজন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে।
শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপির সকল ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং ১৮ কোটি মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম বৃহৎ অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী তাদের সর্বাত্মক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মাঝে পেশাদারিত্ব ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়েছে আধুনিক ডিজিটাল তদারকি ব্যবস্থা। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ২০২৬ তারিখে রাজধানী ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশাল প্রস্তুতিমূলক সমাবেশে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
ঢাকা মহানগর আনসারের এই সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। ঢাকা মহানগরের ২,১৩১টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্ধারিত মোট ২৭,৭০৩ জন আনসার সদস্য এই বিশেষ সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার গুরুত্ব তুলে ধরে মহাপরিচালক তাঁর বক্তব্যে ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “ঐতিহ্যগত সেকেলে প্রক্রিয়া ভেঙে আমরা এখন সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় পদার্পণ করেছি। সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন থেকে শুরু করে খাবার ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ এখন স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। এর ফলে বাহিনীর সদস্যরা যেকোনো অনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে নিজ বিবেক ও কমান্ড অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।”
জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষায় সদস্যদের আপসহীন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে মহাপরিচালক আরও বলেন, “আপনারা কেবল একটি বাহিনীর সদস্য নন—আপনারা জাতীয় পতাকার মর্যাদার রক্ষক এবং সাধারণ ভোটারের প্রতিনিধি। আপনারা কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের নন; দেশের মাটি ও মানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই আপনাদের একমাত্র পরিচয়।” নির্বাচনী নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, “এবারই প্রথম ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা এবং সরাসরি মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃত ডিজিটাল মনিটরিং চ্যানেলের মাধ্যমে প্রতিটি মুহূর্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা বা বিভ্রান্তি রুখতে বাহিনী আগের চেয়ে অনেক বেশি সজাগ ও সক্ষম। ভোট কেন্দ্রে নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা বা শৃঙ্খলা বিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে কঠোর আইনি পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।”
নির্বাচনে ‘নির্বাচনী সুরক্ষা অ্যাপস’ ও সমন্বিত সিকিউরিটি রেসপন্স সিস্টেমের কার্যকর ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে সদস্যদের আরও আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পন্ন হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার্থে ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র বা দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রচার থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বিশ্বাস করে যে, সদস্যদের এই সজাগ ও নিরপেক্ষ অবস্থান জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করবে। উপপরিচালক ও গণসংযোগ কর্মকর্তা মো: আশিকউজ্জামান স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপনের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে।
সারাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাদের মাঠ পর্যায়ের সক্ষমতা ও আন্তঃবাহিনী সমন্বয় বৃদ্ধি করছে। ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ২০২৬ তারিখে সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা জেলা সফরের মধ্য দিয়ে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছেন।
বিজিবি মহাপরিচালক সকালে সাতক্ষীরার শ্যামনগর সরকারি মহসীন ডিগ্রি কলেজ এবং দুপুরে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদায় আব্দুল ওদুদ শাহ ডিগ্রি কলেজে স্থাপিত বিজিবির নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি স্থানীয় সিভিল প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব এবং জেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভায় মিলিত হন। সভায় তিনি বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ একটি পেশাদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে অর্পিত সকল দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে।” তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, প্রশাসন ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
বিজিবির বিশাল কর্মযজ্ঞের তথ্য তুলে ধরে জানানো হয় যে, দেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ রাখার পাশাপাশি সারা দেশের ৪৮৯টি উপজেলায় ৩৭ হাজারেরও অধিক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গাসহ সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে এবং ৩০০টি সংসদীয় আসনে মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত থাকবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবির হেলিকপ্টারসহ কুইক রেসপন্স ফোর্স (QRF), র্যাপিড অ্যাকশন টিম (RAT), বিশেষায়িত K-9 ডগ স্কোয়াড, ড্রোন এবং বডি-অন ক্যামেরা ব্যবহারের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
নির্বাচনের আর মাত্র দুই দিন বাকি থাকায় মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে মহাপরিচালক বলেন, “ভোটারগণ যেন নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে বিজিবি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করবে।” তিনি বিজিবির প্রতিটি সদস্যকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান এবং কোনো দুষ্কৃতিকারী যাতে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য শক্ত ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন। যশোর রিজিউন, খুলনা ও কুষ্টিয়া সেক্টরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই সমন্বয় সভা ও পরিদর্শন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সদর দপ্তর বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভোটারদের নিরাপত্তার বিষয়ে বিজিবির দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং ভোটারদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে এবং বাহিনীর সদস্যদের মাঠ পর্যায়ের সক্ষমতা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণে বিশেষ তৎপরতা চালাচ্ছে বিজিবি সদর দপ্তর। এই নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী চট্টগ্রামের বিভিন্ন আসনে স্থাপিত নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্পসমূহ পরিদর্শন করেছেন।
বিজিবি মহাপরিচালক গত রোববার চট্টগ্রাম-৬ আসনের রাউজান সালামত উল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম-২ আসনের ফটিকছড়ি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে স্থাপিত বিজিবির নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি সেখানে দায়িত্বরত বিজিবি সদস্যদের সাথে সরাসরি মতবিনিময় করেন এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। এছাড়া তিনি চট্টগ্রামের স্থানীয় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথেও সমন্বয় সভা করেন।
উক্ত মতবিনিময় সভায় বিজিবি মহাপরিচালক তাঁর বাহিনীর অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, “বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ একটি পেশাদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে অর্পিত সকল দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।” তিনি সাধারণ ভোটারদের আশ্বস্ত করে আরও বলেন যে, “ভোটারগণ যেন নিরাপদ, শান্তি পূর্ণ ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন সে লক্ষ্যে বিজিবি অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করবে।”
মহাপরিচালকের এই পরিদর্শন কার্যক্রমে বিজিবি সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিজিবির চট্টগ্রাম রিজিয়ন কমান্ডারসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের মাঠে বিজিবির উপস্থিতি যেন সাধারণ মানুষের মাঝে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে এবং কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা ছাড়াই ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়, সেই লক্ষ্যেই এই বিশেষ সফরের আয়োজন করা হয়েছে। বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোঃ শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাহিনীর কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থানের বিষয়টি পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং এর ফলে সৃষ্ট অমানবিক পরিস্থিতি নিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষ করে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে একজন সাবেক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তার সাক্ষ্য নতুন এক ঐতিহাসিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে এই সাক্ষ্য এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ২০২৬ তারিখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া ডিজিএফআইয়ের হাতে গুম-খুনের ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই বিলুপ্ত করার দাবি জানান। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনালের সামনে তিনি নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, “আমি মনে করি, র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার। সেটি সম্ভব না হলে র্যাব থেকে সেনাসদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফেরত আনা হোক।” একই সাথে তিনি সংস্থা দুটির অপকর্মের দায়ভার উল্লেখ করে আরও বলেন, “আমি আরও চাই, ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ এই সংগঠনটি হত্যার মতো অপসংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার পর ঠিক থাকার বৈধতা হারিয়েছে।”
উল্লেখ্য যে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালনকারী ইকবাল করিম ভূঁইয়া জবানবন্দিতে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরে হেফাজত ইসলামের সমাবেশের ঘটনা সম্পর্কে একটি ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, “আমি বিভিন্ন সূত্রে শুনেছি, ওই সময় র্যাব যাদেরকে হত্যা করতো তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত।” তিনি জানান যে, তৎকালীন সময়ে র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে তিনি সেনাবাহিনীর অফিসারদের এমন পথ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করতেন এবং সামরিক কর্মকর্তাদের অতীতের সাজা প্রাপ্তির ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দিতেন। একপর্যায়ে তিনি র্যাব ও ডিজিএফআই-তে সেনা কর্মকর্তাদের পোস্টিং বন্ধ করে দিলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ডেকে পাঠিয়ে পুনরায় অফিসার দিতে বলেন। তবে তিনি সেনাস্বল্পতার কারণ দেখিয়ে সেই চাপ উপেক্ষা করেছিলেন।
সাক্ষ্য প্রদানকালে তিনি নিজের দায়িত্বকালীন যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে বলেন, “র্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে আমার দায়িত্বকালীন সময়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু না করার বেদনা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আজ সুযোগ এসেছে সেই করতে না পারার কাজটি সম্পন্ন করার।” তিনি মনে করেন, এটি সেনাবাহিনীর জন্য একটি আত্মশুদ্ধির সুযোগ এবং দোষী ব্যক্তিদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া উচিত নয়। তাঁর মতে, “অনেকেই ভাবছেন, আমি সেনাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। আমার এই ব্যাপারে ব্যাখ্যা হলো- আমাদের উচিত হবে না আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে কোনো অবস্থাতেই তা হেলায় না হারানো। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুন্ন হবে না বরং সেনাবাহিনী আরও গৌরবের শিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে সেনাবাহিনী কখনও দোষী ব্যক্তিদের ছাড় দেয় না। সেনাবাহিনীর গৌরব ও সম্মান সাইনবোর্ডের আড়ালে সেসব অফিসারের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার মানসিকতা দূর হবে। আমি চাই, অবিলম্বে র্যাব বিলুপ্ত করা দরকার। সেটা সম্ভব না হলে তাদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি আরও চাই, ডিজিএফআই বিলুপ্ত করা হোক। কারণ এই সংগঠনটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পর টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।” জবানবন্দি শেষে তাঁর জেরা শুরু হয়েছে এবং পরবর্তী জেরার জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার লক্ষে নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন তদারকিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের সংবাদ সংগ্রহের কাজে যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সে বিষয়ে কমিশন থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিধিনিষেধ নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তি নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবন চত্বরে সংবাদকর্মীদের জন্য নির্ধারিত বুথ পরিদর্শনকালে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি স্পষ্ট করেন যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের মোবাইল ফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে কোনো বাধা নেই। মূলত সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থেই এই সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে গত রোববার নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ নির্দেশনা সকল রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছিল, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার সৃষ্টি হয়। কমিশনের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহিদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছিল যে, সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার, পুলিশ ইনচার্জ এবং ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ ব্যবহারকারী দুজন আনসার সদস্য ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজ ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবেন না।
উক্ত নির্দেশনায় আরও জানানো হয়েছিল যে, ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ বজায় রাখতে এই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে নতুন এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে কমিশন নিশ্চিত করেছে যে, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রে এই সাধারণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। ফলে নির্বাচনের দিন তারা তাদের প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রযুক্তি সরঞ্জামসহ কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবেন, যা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। কমিশনের এই সিদ্ধান্তের ফলে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত সংবাদকর্মীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে সম্ভবত শেষ আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এই ব্রিফিংয়ে প্রেসসচিব শফিকুল আলম গত ১৮ মাসের কাজের অভিজ্ঞতা ও তথ্য প্রবাহের সার্বিক দিক গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ঘটনার সংবাদ যথাসম্ভব দ্রুততম সময়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরলস চেষ্টা করেছে প্রেস উইং।
সরকারের ডিজিটাল প্রচারণার সাফল্য তুলে ধরে শফিকুল আলম জানান, গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজটি জনগণের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে এবং অন্তত ২০ কোটি বার ভিউ হয়েছে। সরকারের প্রতিটি আপডেট ও সংবাদ সেখানে নিয়মিত শেয়ার করা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য পেতে পারে। তিনি আরও বলেন, নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংগুলোতে সাংবাদিকদের সকল প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে এবং সবসময় স্বচ্ছতা বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে।
ব্রিফিংয়ে প্রেস উইংয়ের অন্যান্য সদস্যরাও তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। সদস্য আজাদ মজুমদার সাংবাদিকদের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে আগামী সপ্তাহে তাঁরা হয়তো আবারও সাংবাদিক হিসেবে গণমাধ্যমের সারিতেই ফিরে যাবেন। তিনি বর্তমান দায়িত্ব পালনকালে সংবাদকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া আন্তরিকতার প্রশংসা করেন।
আরেক সদস্য ফয়েজ আহমদ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, দেশ একটি অসাধারণ ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছে বিধায় কাজের ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। দায়িত্ব পালনকালে কোনো আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রাক্কালে এই ব্রিফিংটি বর্তমান প্রশাসনের প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক সমাপনী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সব বাধা কাটিয়ে গত ১৮ মাসের এই তথ্য আদান-প্রদানের যাত্রাটি সফল হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার। তাঁর পরিবর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আক্তার জাহানকে ডিএনসিসির নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মাহবুবা আইরিন স্বাক্ষরিত এই আদেশে জানানো হয়, জনস্বার্থে এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।
মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর ধারা ২৫ক-এর উপধারা (১) অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সুরাইয়া আক্তার জাহানকে এই দায়িত্ব প্রদান করা হলো। তিনি বর্তমানে স্থানীয় সরকার বিভাগে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন। নতুন দায়িত্ব অনুযায়ী, তিনি ডিএনসিসি মেয়রের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি তাঁর বর্তমান পদের পাশাপাশি এই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রচলিত বিধি মোতাবেক কেবল ‘দায়িত্ব ভাতা’ প্রাপ্য হবেন। তবে অন্য কোনো বাড়তি আর্থিক বা আনুষঙ্গিক সুবিধা তিনি পাবেন না।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজকে ডিএনসিসির প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি আদালত তাঁর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। আইনি জটিলতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তাঁকে সরিয়ে প্রশাসনের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থলাভিষিক্ত করা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের বিশেষজ্ঞরা। সব বাধা কাটিয়ে রাজধানীর উত্তর অংশের নাগরিক সেবা ও প্রশাসনিক গতিশীলতা বজায় রাখাই এখন নতুন প্রশাসকের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।
ট্রাফিক জ্যামের কারণে ডেইলি স্টার ও দৈনিক প্রথম আলোতে হামলার সময় পুলিশ যেতে পারেনি বলে দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে ত্রায়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপদ পরিকল্পনা সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ দাবি করেন।
তিনি বলেন, ডেইলি স্টার ও দৈনিক প্রথম আলোতে যে আক্রমণ হলো রাত ১১টার সময় ট্রাফিক জ্যামের কারণে আমার অফিসারদের সময় মতো সেখানে পাঠাতে পারেনি। যমুনাতে সরকার প্রধানের বাসভবন ঘেরাও করে ঢোকার চেষ্টা করলে সে অবস্থায় ডিএমপি কমিশনারের বসে থাকার সুযোগ আছে? আমি শুধু নিজেও যাইনি, আইজিপিকে ফোন করেছি, ‘ভাই আমি একা পারতেছি না, ইউ শুড কাম অ্যান্ড হেল্প মি’। যতক্ষণে উনি এসেছে আমরা ততক্ষণে আন্দোলকারীদের সরিয়ে দিয়েছি।
সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি নাইমা হায়দার তাঁর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তার বরাতে এই পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। বিচারপতি নাইমা হায়দার গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্রটি জমা দেন, যা ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রেরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় এই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
গত জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হিসেবে কাজ করা এবং বিভিন্ন বিচারিক অনিয়মের অভিযোগে বিচারপতি নাইমা হায়দারসহ মোট ১২ জন বিচারপতিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগে শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়। এই তদন্ত চলাকালীন সময়েই তিনি স্বেচ্ছায় বিচারকের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
গত আগস্টে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিচার বিভাগে ব্যাপক সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত ছুটিতে পাঠানো ১৩ জন বিচারপতির মধ্যে ৯ জনই তাঁদের দায়িত্ব থেকে অপসারিত হয়েছেন অথবা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। বিচারপতি নাইমা হায়দারের পদত্যাগের আগে হাইকোর্ট বিভাগের আরেক বিচারপতি মামনুন রহমানও তাঁর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদন্তের ভিত্তিতে এর আগে রাষ্ট্রপতি হাইকোর্ট বিভাগের তিনজন বিচারপতিকে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করেছেন। বর্তমানে ছুটিতে থাকা বাকি বিচারকদের বিষয়েও আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বিচারপতি নাইমা হায়দারের পারিবারিক ও শিক্ষাগত পটভূমি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর কন্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বেশ কিছু খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে জেলা আদালতে আইন পেশায় যোগদানের মাধ্যমে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয়। এরপর ২০০৯ সালে তিনি হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং ২০১১ সালে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। দীর্ঘ বিচারিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে তাঁর এই পদত্যাগ বিচারিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগে আজ সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের শেষ নিয়মিত বৈঠক। প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বৈঠকটি বর্তমান সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই বৈঠকের পর কেবল বিশেষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আর কোনো আনুষ্ঠানিক সভা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নির্বাচিত সরকারের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে এই সভায় বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে বলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জানা গেছে।
উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শুরুর আগে প্রধান উপদেষ্টা সকল মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে একটি বিশেষ মতবিনিময় সভায় মিলিত হবেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আজকের এই সভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হতে পারে। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির খসড়া। সবকিছু ঠিক থাকলে বাংলাদেশের স্থানীয় সময় আজ রাত ১১টায় ওয়াশিংটনে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে বড় কোনো দেশের সঙ্গে এই ধরনের চুক্তি দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক খাতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশের প্রশাসনিক সংস্কার ও আইনি কাঠামো পুনর্গঠনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরেরও বেশি সময়ে এই সরকার মোট ১১৬টি অধ্যাদেশ জারি করেছে এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এ সময়ে অনুষ্ঠিত মোট ৬৮টি নিয়মিত বৈঠকে ৫২৬টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় ৮৩ শতাংশ বা ৪৩৯টি সিদ্ধান্ত এরই মধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। আজকের শেষ বৈঠকে এসব অর্জনের ওপর একটি সমাপনী পর্যালোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচনের পর নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সীমা নিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করা হবে। প্রশাসনিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে যাতে ফল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শেষ করা যায়। সেই হিসেবে আগামী ১৫ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই নতুন প্রধানমন্ত্রী শপথ নিতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের এই চূড়ান্ত ধাপে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আজকের এই শেষ বৈঠকটি তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পবিত্র রমজান মাসে পণ্য খালাস ও সরবরাহ ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে চট্টগ্রাম বন্দরে ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ গত রবিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার পর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। ঘোষণা অনুযায়ী, আজ সোমবার সকাল ৮টা থেকে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত থাকবে। মূলত জনস্বার্থ এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই ছাড় দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা, যার ফলে অচল হয়ে পড়া বন্দরে পুনরায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহীম খোকন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে তারা কর্মসূচি শিথিল করেছেন। তবে এই স্থগিতাদেশ স্থায়ী নয়, বরং সরকারের পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত রবিবার সকাল থেকে বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা না দেওয়ার প্রধান দাবিতে এই ধর্মঘট শুরু করেছিলেন কর্মচারীরা। তবে বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর পক্ষ থেকে আসা ইতিবাচক আশ্বাস পরিস্থিতি শান্ত করতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। বিডা চেয়ারম্যান নিশ্চিত করেছেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে এই টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
সরকারের এমন আশ্বাসে আন্দোলনকারীদের একটি প্রধান দাবি পূরণ হলেও কর্মচারীদের ওপর নেওয়া বিভিন্ন শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে অসন্তোষ রয়ে গেছে। আন্দোলনরত কর্মচারীদের গ্রেফতার করা, হয়রানিমূলক বদলি এবং সাময়িক বরখাস্তের মতো বিষয়গুলো নিয়ে গতকাল রাত পর্যন্ত অনড় অবস্থানে ছিল সংগ্রাম পরিষদ। পরবর্তীতে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর নির্বাচন ও রমজানের গুরুত্ব বিবেচনা করে তারা ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, এই সময়ের মধ্যে গ্রেফতার হওয়া কর্মচারীদের মুক্তি এবং সকল হয়রানিমূলক আদেশ প্রত্যাহারসহ তাদের পাঁচ দফা দাবি পুরোপুরি পূরণ না হলে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে আবারও কঠোর আন্দোলনে ফিরবেন তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর সচল হওয়ায় ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে এবং রমজান মাসের ভোগ্যপণ্য আমদানির এই সময়ে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকলে দেশের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল। বর্তমানে স্থগিতাদেশের ফলে পণ্য খালাস কার্যক্রম স্বাভাবিক হচ্ছে। এখন আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকার কী ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে ১৬ ফেব্রুয়ারির পরবর্তী পরিস্থিতি। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ জানিয়েছে, তারা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে থাকলেও কর্মচারীদের ওপর কোনো ধরনের নিপীড়ন মেনে নেবে না।
বর্তমান বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘অমর একুশে বইমেলা-২০২৬’ শুরুর সরকারি সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের ৩২১ জন সৃজনশীল প্রকাশক। এই সিদ্ধান্তকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ ও ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশকরা বলছেন, পবিত্র রমজান ও নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে ফেব্রুয়ারিতে মেলা অনুষ্ঠিত হলে তারা তাতে অংশগ্রহণ করবেন না। বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্তকে তারা প্রকাশনা শিল্পকে প্রবল অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার শামিল বলেও মনে করছেন।
গত শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো যৌথ বিবৃতিতে প্রকাশকরা এই অঙ্গীকারের কথা জানান।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বইমেলা কোনও সরকারি রুটিন ওয়ার্ক বা কেবল আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের মিলনমেলা। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পরপরই রোজার মধ্যে মেলা আয়োজনের যে হঠকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাতে মেলার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
বিবৃতিতে প্রকাশকরা তিনটি প্রধান সংকট তুলে ধরেছেন- এক. পাঠকশূন্যতার আশঙ্কা: ২০ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু হলে মাত্র কয়েকদিন পরেই পবিত্র মাহে রমজান শুরু হবে। রোজার দিনে তীব্র গরম ও যানজট ঠেলে পাঠকরা মেলায় আসবেন না। পাঠকহীন মেলা প্রকাশক ও আয়োজক উভয়ের জন্যই বিব্রতকর।
দুই. মানবিক বিপর্যয়: মেলার স্টলগুলোতে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কাজ করে। সারাদিন রোজা রেখে, ইফতার ও তারাবিহ নামাজের পর এই শিক্ষার্থীদের দিয়ে কাজ করানো অমানবিক। আমরা আমাদের কর্মীদের এই কষ্টের মধ্যে ফেলতে চাই না।
তিন. অর্থনৈতিক ঝুঁকি: গত দেড় বছরে প্রকাশনা শিল্প চরম মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আরও একটি অসফল মেলায় অংশ নিয়ে অবশিষ্ট পুঁজি হারানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
বাংলা একাডেমি এপ্রিলের ঝড়-বৃষ্টির অজুহাত দেখালেও প্রকাশকরা বলছেন, ঈদের পর মেলা হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিতে তারা প্রস্তুত, কিন্তু জেনেশুনে রোজার মধ্যে ‘নিশ্চিত ব্যবসায়িক মৃত্যুর ঝুঁকি নেবেন না।
বিবৃতিতে ৩২১ জন প্রকাশক বলেন, ফেব্রুয়ারিতে মেলা আয়োজিত হলে মানবিক ও ব্যবসায়িক কারণে আমাদের পক্ষে অংশগ্রহণ করা সম্ভব নয়। তবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর মেলা আয়োজিত হলে আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করবো এবং মেলা সফল করতে কর্তৃপক্ষকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবো।
উৎসবের আমেজে বই কেনাবেচার পরিবেশ তৈরি করতে ঈদের পর মেলা আয়োজনের জন্য তারা বাংলা একাডেমি ও সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।