রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনটিতে আগুন লাগার ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দায়িত্বে গাফিলতির দিকেও আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের আরও বেশি সজাগ হওয়া উচিত ছিল।’
বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ নামের ভবনটিতে গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে আগুন লাগে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ৪৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। জীবিত উদ্ধার হয়েছে ৭৫ জন।
এতে আহত হয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ১০ জন ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুজন ভর্তি আছেন।
এমন প্রাণহানির ঘটনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, ‘এর চেয়ে মর্মান্তিক আর কিছু হতে পারে না। এর (অনিয়মের) বিরুদ্ধে অভিযান চলা উচিত।’
আজ শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন আয়োজিত ২৩তম আন্তর্জাতিক সায়েন্টিফিক সেমিনারে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
আগুনের ভয়াবহতা ও অনেকের মৃত্যুর পর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন গতকাল শুক্রবার বেইলি রোডে ভবনটি পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভবনটিতে কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’
অন্যদিকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানিয়েছে, ভবনটিতে রেস্তোরাঁ বা পণ্য বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কোনো অনুমোদন ছিল না।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালে অভিযান চালানো প্রসঙ্গে বলেন, ‘অতীতে কী হয়েছে, সেগুলো মনে রাখা যাবে না। ইচ্ছা করলেই অনিয়ম করে আর হাসপাতাল খোলা যাবে না। অভিযান চলবে। হাসপাতাল থাকবে, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালও থাকবে। কিন্তু হাসপাতালগুলোকে নিয়ম মেনে চলতে হবে।’
এসময় অবৈধ বা যন্ত্রপাতিহীন হাসপাতাল বন্ধে অভিযান চলবে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালও থাকবে। কিন্তু সেসব হাসপাতালগুলোকে নিয়ম মেনে, যা যা ক্রাইটেরিয়া দরকার সেগুলো মেনে যদি হাসপাতাল চলে কোন আপত্তি নেই। আমরা একটা সুন্দর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছি, যেন সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসা সেবা পাই।
তিনি বলেন, যেখানে সেখানে আইসিইউ খোলা যায় না। আইসিইউ খুলতে গেলে হার্টের রোগী রাখতে হলে সাপোর্টিং জিনিস লাগে। আমরা মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করি। জীবন একটাই। আমরা যে অভিযান চালাচ্ছি তা চলবে, বন্ধ হবে না। প্রয়োজনে আমিও যাবো।
বার্ন হাসপাতালে আহতদের জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে প্রধান করে বোর্ড
এদিকে, বেইলি রোডের আগুনে দগ্ধ হয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন ৫ জনের চিকিৎসায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেনকে প্রধান করে ১৭ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
আজ শনিবার দগ্ধ রোগীদের দেখতে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, এখানে ভর্তি হওয়া ৬ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি পাঁচজন এখনও শঙ্কামুক্ত নন। তাদের চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেনকে প্রধান করে ১৭ সদস্যের ওই মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা বৈধ করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি, বরং সম্পত্তি লেনদেনে প্রকৃত মূল্য ঘোষণার মাধ্যমে কর-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের প্রস্তাব করা হয়েছে বলে স্পষ্ট করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জনমনে একটি ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে।
এই বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, অতীতে জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির সময় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম দামে নিবন্ধন করার কারণে ক্রেতা-বিক্রেতারা পরে অতিরিক্ত কর ও জরিমানার মুখোমুখি হতেন। এই পরিস্থিতি এড়াতে কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রকৃত মূল্য ঘোষণা করলে, নিয়মিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২০ শতাংশ কর পরিশোধের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল।
তবে এই বিধান নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে সরকার তা পুনর্বিবেচনা করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে নতুন সরকারের জন্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রথম বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি মনে করে, টেকসই কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে এই বাজেট বাস্তবায়ন করা গেলে সংকটে থাকা অর্থনীতি পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
সংবাদ সম্মেলনে ফাহমিদা খাতুন বলেন, “নতুন সরকারের এই প্রথম বাজেটটি এমন এক সময় পেশ করা হয়েছে, যখন দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানহীনতা এবং ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই ক্রিটিক্যাল সময়ে বাজেটকে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার যে দর্শন নেওয়া হয়েছে, তা ইতিবাচক।”
সিপিডির মতে, প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অনেক মিল রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বাজেটের সাফল্য এর বিশাল আকারের ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
ফাহমিদা খাতুন আরও উল্লেখ করেন, বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থাকলেও যদি বাস্তবায়ন দুর্বল হয়, তবে সাধারণ মানুষ এর সুফল পাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাতে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও বৈদেশিক ঋণের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা বাড়তে পারে, যা অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সিপিডির পর্যালোচনায় আরও উঠে আসে যে, আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার যে লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তা অর্জন করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে সরকার যদি কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ১ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে সংশোধিত বাজেট ছিল ৪০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় এ সংক্রান্ত ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায় আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী।
এবার প্রতিরক্ষা বাজেটে প্রতিরক্ষা সার্ভিসের পরিচালন ব্যয় বাবদ ৩৮ হাজার ৭২১ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য এক হাজার ৬১১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেটে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্য সার্ভিসের জন্য পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পরিচালন ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে নারী, শিশু, প্রবীণসহ বহু মানুষকে জোরপূর্বক পুশ-ইনের (ঠেলে পাঠানো) ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংগঠনটি দুই দেশের প্রতি বিষয়টির মানবাধিকারসম্মত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই আহ্বান জানায় আসক। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রবীণ ব্যক্তিদের এ ধরনের ঘটনার শিকার হওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আসক বলেছে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে বহু মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জাতীয়তা ও পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। আইনসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তাদের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আসক বলেছে, কোনো ব্যক্তিকে অন্য দেশের নাগরিক বলে সন্দেহ করা হলেও তার সঙ্গে অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ করা গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার তার জাতীয়তা, ধর্ম, ভাষা বা অভিবাসন অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। প্রত্যেক মানুষ মানবিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রাখে।
সংগঠনটি বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী কাউকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা যাবে না, যেখানে তার জীবন, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য বা মর্যাদা ঝুঁকির মুখে পড়ে। সীমান্তে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় ও আইনি অবস্থান যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিষয়গুলোর সমাধান হওয়া উচিত।
আসক আরও বলেছে, সাম্প্রতিক ঘটনায় অনেক মানুষকে দিনের পর দিন শূন্যরেখায় অবস্থান করতে হয়েছে। সেখানে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের মতো মৌলিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। অনেক ক্ষেত্রে এটি নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
সংগঠনটি মনে করে, কোনো ব্যক্তি কোন দেশের নাগরিক—এ প্রশ্নের সমাধান স্বচ্ছ, আইনসম্মত ও পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। এ জন্য দুই দেশের মধ্যে তথ্যবিনিময়, পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আসক বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে। একই সঙ্গে সীমান্তে অবস্থানরত মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
চলতি অর্থবছরে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার সময় এ তথ্য জানান তিনি।
তিনি বলেন, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করা, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী করা এবং জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধার করাই সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য। এজন্য ব্যবস্থাপনা সংস্কার এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
এছাড়া ব্যাংক খাতে অনাদায়ী ঋণ কমানো, ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিল প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার লুট হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টাও চালাচ্ছে এবং ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অনিয়ম বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নতুন নীতিমালার আওতায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স নিশ্চিত করা হবে, যেন দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকগুলো স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে, বলেন তিনি।
এছাড়া নারী, তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক সেবা প্রাপ্তি বাড়িয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ স্লোগানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মাধ্যমে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিয়ে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম জাতীয় বাজেট দিল বিএনপি। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন তিনি। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানা ধাক্কার পর—১১ জুন ২০২৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করেছেন, তার মূল দর্শনই হলো ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতিকে টেনে তোলা।
বাজেটের ভেতরের তথ্য এবং অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, অর্থনীতির কোন কোন ‘গভীর ক্ষত’ সারানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং তা কীভাবে টেনে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব খাতের দুর্বলতা (সবচেয়ে গভীর ক্ষত): বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষত। বছরের পর বছর ধরে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে আটকে আছে।
টেনে তোলার লক্ষ্য: এবারের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা (এর মধ্যে এনবিআরকে তুলতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা)। করের জাল বাড়াতে সেন্ট্রাল ডাটা ইন্টিগ্রেশন এবং অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিলের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ঋণের সুদের বোঝা: বিগত বছরগুলোর পুঞ্জীভূত ঋণের কারণে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই বাজেটের একটা বিশাল অংশ চলে যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুধু সুদের পেছনেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের ২১ শতাংশের বেশি। এটি অর্থনীতির রক্তক্ষরণের মতো একটি ক্ষত।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জনজীবন: মে ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছানোর ফলে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
টেনে তোলার লক্ষ্য: সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে।
বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন: আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬ শতাংশ)। এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা ব্যাংক খাতের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে।
ইতিবাচক আশার আলো: ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র স্বপ্ন: এত ক্ষত থাকার পরও বাজেটে উন্নয়নের সুড়ঙ্গ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থান: এবার মেগা অবকাঠামোর চেয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।
বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজীকরণ: ‘বাংলাবিজ’ নামের সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে ব্যবসার অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে।
এক নজরে বাজেট: প্রথম বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এবার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত রাজস্ব খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের মধ্যে ঋণের সুদে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংক থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির ঝুঁকি মাথায় রেখে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার করতে তুলে ধরেছেন সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বিগত আমলের মতো ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ না সৃষ্টি করে বৈদেশিক উৎসে জোর দিয়েছে সরকার। মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস এবং ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা মেটানো হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা— যা বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ সচল রাখতেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমানো হয়েছে।
শিক্ষা খাতে সংস্কার: শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ একলাফে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট জিডিপির ২ শতাংশ। এই খাতের প্রধান চমকগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক একটি তৃতীয় ভাষা (যেমন: জাপানিজ, কোরিয়ান, চীনা, আরবি ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করা। এই ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষায় যেতে চাইলে সরকার ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেবে।
এছাড়া নারী শিক্ষার প্রসারে মেয়েদের জন্য স্নাতক (অনার্স) পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে। স্কুলগুলোয় প্রযুক্তিভিত্তিক ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং পুষ্টির জন্য মিড-ডে মিল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও চিকিৎসার খরচ কমাতে এবার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছাতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক এবং দেশব্যাপী ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী।
তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি ও ভ্যাটের কড়াকড়ি: রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। সিগারেটের সর্বনিম্ন স্তরের প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ৬২ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকোর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
পাশাপাশি ভ্যাটের আওতা বাড়াতে এখন থেকে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ‘মূসক বা ভ্যাট নিবন্ধন’ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হয়েছে। উচ্চ মূল্যের হিমায়িত মাছ এবং সুগন্ধি বৃক্ষ নির্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাবও করা হয়েছে। তবে মেট্রোরেল সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতার শেষ অংশে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বললেন, এই বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং দেশের মেহনতি মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি কল্যাণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার মজবুত ভিত্তি।
কোন খাতে বরাদ্দ কত: সামাজিক অবকাঠামো খাত : ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ)।
সাধারণ সেবা খাত : ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৬.১৩ শতাংশ)।
ভৌত অবকাঠামো খাত : ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ)।
শিক্ষা খাত : ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাত : ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
যোগাযোগ অবকাঠামো খাত : ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।
পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাত : ১০ হাজার ৫ শত ৩৩ কোটি টাকা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাত : ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
নারী ও শিশু উন্নয়ন খাত : ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেটে -ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর শুল্ককর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিগত বছরগুলোয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।
এই নিত্যপণ্যগুলোর ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হতে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
আমদানি করা শিশুখাদ্য প্রস্তুতিমূলক সামগ্রীর ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে (শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে)। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এতে বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমবে।
জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়া ইত্যাদি মসলায় ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দাম কমতে পারে।
আরও যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে-
স্বর্ণের গয়না: স্বর্ণ সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ভ্যাট ছিল আগে ৫ শতাংশ। ফলে আড়াই লাখ টাকার সোনায় ভ্যাট দাঁড়াত সাড়ে ১২ হাজার টাকা। এখন তা কমিয়ে ভরিপ্রতি আড়াই হাজার টাকা করা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি: বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকেলে (ইভি) নানা ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে এসব গাড়ির দাম অনেকটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়ার স্টেশন বসাতে ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ক্ষেত্রে করছাড় দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষে (বিআরটিএ) নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির অগ্রিম আয়করের পরিমাণ কমানো হয়েছে।
ল্যাপটপ ও কম্পিউটার: ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা: ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এর ফলে কিডনি রোগীর প্রতিবার ডায়ালাইসিস সেবায় ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমবে।
ওষুধ: ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে নানা ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি–সুবিধা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
বাদ্যযন্ত্র: গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরো প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এছাড়া শুল্ককর কমানো এবং শুল্কায়ন মূল্যে পরিবর্তনের কারণে বিদেশি মাংস, প্রাণিখাদ্য, পয়েন্ট অব সেলস বা পিওস যন্ত্র, সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম, লিপস্টিক, ফেসওয়াশসহ বিভিন্ন প্রসাধন এবং আরও নানা পণ্যের দাম কমতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এ টাকার উৎস নিয়ে যাতে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারেন সে বিধানও রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এ বিধান রেখে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এদিন বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে এ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আগামী ৩০ জুন পাস হবে এ বাজেট। অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার এই বিধান অপরিবর্তিত থাকলে আগামী জুলাই থেকে পরবর্তী জুন মাসের মধ্যে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার ক্ষেত্রে মিলবে এ সুযোগ।
এর আগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখা হলেও সমালোচনার মুখে তা পরে বাদ দেওয়া হয়। তার আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ ছিল। তখনও এ টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন না তোলার বিধান ছিল।
এর আগে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রেখে অর্থবিলে আয়কর আইন ২০২৩ এর প্রথম তফসিলে সংশোধন এনেছে সরকার। এতে বলা হয়, ‘এই আইন বা বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক স্বপ্রণোদিতভাবে প্রদর্শিত নিম্নবর্ণিত বিনিয়োগ বা ক্রয় অথবা প্রাপ্তি এর উৎস এবং ইহার বিপরীতে পরিশোধিত করের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।’
এ বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- কোনো করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট ‘ক্রয়ের প্রকৃতমূল্য’ ‘দলিলমূল্য’ অপেক্ষা বেশি হলে, তিনি ওই ‘অপ্রদর্শিত’ অতিরিক্ত ক্রয়মূল্যের ওপর ব্যক্তিশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য ‘নিয়মিত করহারে’ আয়কর পরিশোধ করবেন। অর্থাৎ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য যেভাবে একটা ধাপ অনুযায়ী করমুক্ত আয়সীমা থাকে, তারপর বিভিন্ন ধাপে আয় হলে তার ওপর করহার পরিবর্তন হয়, এক্ষেত্রেও তাইই হবে।
একইভাবে যিনি বিক্রি করে অপ্রদর্শিত অর্থের মালিক হবেন এবং বৈধ করতে চাইবেন তার জন্যও বিধান রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট ‘বিক্রয়ের প্রকৃতমূল্য’ ‘দলিলমূল্য’ অপেক্ষা ‘অধিক’ হলে, তিনি ‘অপ্রদর্শিত’ ওই অতিরিক্ত অঙ্কের ওপর ‘মূলধনী মুনাফা’র জন্য প্রযোজ্য হারে আয়কর পরিশোধ করবেন।
অর্থাৎ তিনি এই জমি যখন কিনেছেন তখন যে মূল্য ছিল এবং তিনি যে টাকায় বিক্রি করেছেন এর মধ্যে যে ব্যবধান থাকবে সেটিই তার মুনাফা। এবং এই আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে তাকে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি তার অপ্রদর্শিত অর্থ ‘স্বপ্রণোদিত’ বৈধ করার আগেই আয়কর আইনে তার বিরুদ্ধে কোনো অডিট বা কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, তাহলে তখনও তিনি এ অর্থ বৈধ করতে পারবেন। তার সেই অর্থের ওপর তখন যে কর ধার্য হওয়ার কথা, তার চেয়ে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত কর দিতে হবে তাকে।
অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার জন্য আয়কর বিবরণী বা রিটার্নের ‘জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিবরণী’তে ‘উৎসে কর্তিত’ বা ‘সংগৃহীত কর’ উল্লেখ করার বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমেই কর্মকর্তারা বুঝতে পারবেন এবং তাকে এ নিয়ে আর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না।
তবে এই ‘স্বপ্রণোদিত’ ঘোষণার আগেই যদি দেশের কোনো আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা চলে বা অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়- তাহলে এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন না তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নাগরিক সেবা আরও জনবান্ধব করতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইলেকট্রনিক্স শিল্প এবং তরুণদের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে বিবেচনা করা হচ্ছে জাতীয় উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে। সরকার দেশের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে এআইকে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর স্পষ্ট বার্তা, এআই ব্যবহার করে স্মার্ট সিটি বিনির্মাণ, নাগরিক সেবাকে আরও জনবান্ধব করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এআই অন্তর্ভুক্ত করার। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তরুণ প্রজন্মকে।
অর্থমন্ত্রী জানান, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন বাজেটে কর্মকৌশল নির্ধারণ করেছে সরকার। তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং এআই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরি করাই লক্ষ্য সরকারের।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি নিশ্চিত করেন, সরকারি পরিকল্পনা ও সেবা প্রদানে এআই-ড্রিভেন ডাটা সেন্টার ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করা হবে। পাশাপাশি উদ্যোগ নেওয়া হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়িয়ে নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশকে একটি উদ্ভাবননির্ভর, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রে রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় এ খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা।
তিনি জানান, এই অর্থ ব্যবহার করা হবে ‘স্টার্টআপ তহবিল’ হিসেবে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারী উন্নয়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতেও ব্যয় করা হবে এ তহবিলের অর্থ।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বেড়েছে। এই করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। বর্তমানে এই সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু আগামী অর্থবছরে নয়; ২০২৭–২৮ অর্থবছরেও করমুক্ত আয়সীমা পৌনে চার লাখ টাকা অব্যাহত থাকবে।
অবশ্য গত বছর বাজেটেই করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ঘোষনা দিয়েছিলেন তৎকালীন অন্তবর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তা অব্যাহত রাখল। এতে সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বস্তির আসবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরেরা।
অন্যবারের মতো এবারও কিছু বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমায় বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সাধারণ করদাতাদের পাশাপাশি নারী করদাতা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সি করদাতার জন্য সোয়া চার লাখ টাকা; তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য পাঁচ লাখ টাকা; গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা করদাতা ও গেজেটভুক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর আহত জুলাই যোদ্ধা করদাতাদের জন্য সোয়া ৫ লাখ টাকা করমুক্ত আয়সীমাও বাড়বে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাতা-পিতা বা আইনানুগ অভিভাবকের প্রত্যেক সন্তান বা পোষ্যের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে ৫০ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রতি বছর ৪০ থেকে ৪২ লাখ করদাতা রিটার্ন দেন। এসব করদাতাকে রিটার্ন দাখিলের সময় করমুক্ত আয়সীমা হিসাব করে কর দিতে হয়।
থাকছে না ৫শতাংশ কর হার: এবার আয়করের কর হার পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। যেমন– এবার করমুক্ত আয়সীমার পরের প্রথম এক লাখ টাকার জন্য যে ৫ শতাংশ কর আছে, তা বাদ দেওয়া হেয়েছে। যাদের বার্ষিক আয় পৌনে চার লাখ টাকার বেশি তাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা পরবর্তী প্রথম ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার জন্য ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের জন্য ৩০ শতাংশ হারে করারোপ করা হয়েছে। এতে করদাতাদের ওপর করের চাপ কিছুটা বাড়তে পারে।
সারা বছর আয়কর রিটার্ন দেওয়া যাবে: আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছর রিটার্ন দেওয়া যাবে। আগে দিলে বেশি করছাড় পাবেন করদাতারা। বাজেট প্রস্তাব অনুসারে, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকা, যা কম তাই ছাড় পাবেন। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রিটার্ন যা কর তাই দিলেই হবে। কোনো প্রণোদনা পাওয়া যাবে না।
আর জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা, যেটি বেশি সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে। এপ্রিল-জুন মাসে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ই-হেলথ কার্ড দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময়ে এমনটি জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ই-হেলথ কার্ড দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে। সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে; করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, ইত্যাদি ব্যবস্থা থাকবে।
তিনি আরও জানান, রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবের জন্য জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক গঠন করা হবে।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ স্লোগানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মাধ্যমে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিয়ে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম জাতীয় বাজেট দিল বিএনপি। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন তিনি। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
বিগত সরকারের আমলের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ধ্বংসস্তূপ থেকে সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন নতুন এই অর্থমন্ত্রী।
এক নজরে বাজেট: প্রথম বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এবার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত রাজস্ব খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের মধ্যে ঋণের সুদে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংক থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির ঝুঁকি মাথায় রেখে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার করতে তুলে ধরেছেন সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বিগত আমলের মতো ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ না সৃষ্টি করে বৈদেশিক উৎসে জোর দিয়েছে সরকার। মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস এবং ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা মেটানো হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা— যা বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ সচল রাখতেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমানো হয়েছে।
শিক্ষা খাতে সংস্কার: শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ একলাফে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট জিডিপির ২ শতাংশ। এই খাতের প্রধান চমকগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক একটি তৃতীয় ভাষা (যেমন: জাপানিজ, কোরিয়ান, চীনা, আরবি ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করা। এই ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষায় যেতে চাইলে সরকার ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেবে।
এছাড়া নারী শিক্ষার প্রসারে মেয়েদের জন্য স্নাতক (অনার্স) পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে। স্কুলগুলোয় প্রযুক্তিভিত্তিক ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং পুষ্টির জন্য মিড-ডে মিল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ও চিকিৎসার খরচ কমাতে এবার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছাতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক এবং দেশব্যাপী ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী।
তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি ও ভ্যাটের কড়াকড়ি: রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। সিগারেটের সর্বনিম্ন স্তরের প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ৬২ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকোর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
পাশাপাশি ভ্যাটের আওতা বাড়াতে এখন থেকে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ‘মূসক বা ভ্যাট নিবন্ধন’ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হয়েছে। উচ্চ মূল্যের হিমায়িত মাছ এবং সুগন্ধি বৃক্ষ নির্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাবও করা হয়েছে। তবে মেট্রোরেল সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতার শেষ অংশে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বললেন, এই বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং দেশের মেহনতি মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি কল্যাণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার মজবুত ভিত্তি।
কোন খাতে বরাদ্দ কত: সামাজিক অবকাঠামো খাত : ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ)।
সাধারণ সেবা খাত : ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৬.১৩ শতাংশ)।
ভৌত অবকাঠামো খাত : ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ)।
শিক্ষা খাত : ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাত : ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
যোগাযোগ অবকাঠামো খাত : ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।
পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাত : ১০ হাজার ৫ শত ৩৩ কোটি টাকা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাত : ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
নারী ও শিশু উন্নয়ন খাত : ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা।
স্বাধীনতার পর এক ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ গত সাড়ে পাঁচ দশকে এক অসামান্য অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে শিল্প-কারখানা ও অবকাঠামো ছিল বিধ্বস্ত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় শূন্য, সেখানে ৫৫ বছরের ব্যবধানে দেশটি এখন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। আজ ১১ জুন ২০২৬, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মেয়াদে এটি তাঁর প্রথম বাজেট এবং স্বাধীনতার পর থেকে বাজেট পেশকারী ব্যক্তিদের তালিকায় তিনি ১৫তম ব্যক্তি হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।
বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নের ইতিহাস শুরু হয়েছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই। ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই মুজিবনগর সরকার যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয় নির্বাহে তিন মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট অনুমোদন করেছিল। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, যার আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকা। সেই বাজেটটি ছিল মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং খাদ্যসংকট মোকাবিলা করে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তোলার রূপরেখা। এরপর ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সময়ে বাজেট পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে দেশ ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের হাত ধরে। ১৯৯১ সালে তিনি ঐতিহাসিক ‘মূল্য সংযোজন কর’ বা ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেন এবং বাজার অর্থনীতি ও বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করে দেন। এর পরবর্তী সময়ে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার হাত ধরে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে বয়স্ক ভাতা চালু হয়, যা আজ এক বিশাল আকার ধারণ করেছে। বাজেটের আকারের ক্রমবিকাশ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো বাজেট ১ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে এবং ২০২৬ সালে এসে তা ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে এক অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
অতীতের সাফল্যের পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোও এই বাজেটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার ফলে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১২টি করে বাজেট দেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই বাজেট বাস্তবায়নকে বড় এক কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের এই ৫৫ বছরের বাজেট ইতিহাস কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রামাণ্য দলিল। শুরুতে যে চ্যালেঞ্জগুলো যেমন—রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণের সমস্যা ছিল, সেগুলো আজও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তবুও ৭১৯ কোটি টাকা থেকে শুরু করে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বিত অর্জন। তাজউদ্দীন আহমদের সেই পুনর্গঠনের স্বপ্ন থেকে শুরু হয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রাই এখন বাংলাদেশের সামনে বড় স্বপ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।