খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছিল ৫৩ শতাংশ, ৮ ফেব্রুয়ারি ১০ শতাংশ কমিয়ে করা হয়েছে ৪৩ শতাংশ। শুল্ক কমানোর পরও দাম কমেনি খেজুরের। উল্টো দাম বেড়েছে। যদিও বন্দর থেকে খেজুর খালাসের পরিমাণও বেড়েছে। গত কয়েক দিনে ৬০৫ কনটেইনার খেজুর খালাসের কার্যক্রম চলছে এবং প্রতিদিনই খালাস অব্যাহত রয়েছে।
জানা গেছে, আগামী ১২ মার্চ পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রমজান মাসজুড়ে সিয়াম সাধনা করেন। দিনভর রোজা রাখার পর সন্ধ্যায় ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে খেজুর। খেজুর ছাড়া এখন আর ইফতারের কথা ভাবা যায় না। প্রায় সব রোজাদারই খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এ কারণে রমজান মাসে চাহিদা বেশি থাকা পণ্যগুলোর একটি খেজুর। পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে চলতি মাসে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি বাজারে তদারকি ও বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা কোনো কাজেই আসছে না। গত বছরের তুলনায় বর্তমানে দেশের বাজারে খেজুরের দাম প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি আদেশে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনার ঘোষণা দেয়। এর আগে খেজুর আমদানিতে সর্বমোট ৫৩ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য প্রতি টন ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৭৫০ ডলার। এর সঙ্গে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ ও ভ্যাট ১৫ শতাংশ। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম কর ৫ শতাংশ হারে দিতে হচ্ছে। এতে বর্তমানে সর্বমোট ৪৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত রোজার আগে মানভেদে প্রতি কেজি খেজুরে শুল্ক দিতে হতো ৫ দশমিক ৪৫ থেকে ২১ দশমিক ৮৪ টাকা। তবে এবার খেজুরকে ‘বিলাসীপণ্যের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে খেজুরের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫৩ শতাংশ করা হয়। ফলে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বেড়ে গেছে। এবার শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫৪ থেকে ২০৮ টাকা। মূলত শুল্কের প্রভাব পড়েছে খেজুরের দামে। গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজি খেজুরে জাতভেদে দাম বেড়েছে ১০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত। দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া খেজুরের মধ্যে রয়েছে দাবাস, জাহিদি, বরই ও গলা খেজুর।
চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি গলা বা বাংলা খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা, জাহিদি খেজুর ২৪০-২৬০ ও মানভেদে দাবাস খেজুর ৪৫০-৫৫০ টাকায়। এ ছাড়া বরই খেজুর মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪৪০-৫৪০ টাকায়। গত বছর এসব খেজুরের দাম ছিল বর্তমান দরের অর্ধেকেরও কম।
এদিকে অভিজাত শ্রেণির কাছে পছন্দের খেজুরের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের মেডজুল, মাবরুম, আজওয়া ও মরিয়ম। গত এক মাসের ব্যবধানে এসব খেজুরের দাম কেজিতে ২০০-৩০০ টাকা বেড়েছে। জাম্বো মেডজুল মানভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, সাধারণ মেডজুল ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০, মাবরুম খেজুর ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০, আজওয়া খেজুর মানভেদে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো জাতের মরিয়ম বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। এ ছাড়া কালমি মরিয়ম ৮০০-৯০০ টাকা, সুফরি মরিয়ম ৭৫০-৮০০, আম্বার ও সাফাভি ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ ও সুক্কারি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৮০০-৯০০ টাকায়।
খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালে রোজার আগে জাহিদি জাতের খেজুরের দাম ছিল কার্টনপ্রতি (১০ কেজি) ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। শুল্ক আরোপের কারণে দাম বাড়ার পর গত বছরের শেষ সপ্তাহেও একই জাতের খেজুরের দাম ছিল কার্টনপ্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকা। তবে এখন ১০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েও এই জাতের খেজুরের কার্টন হাঁকা হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
পাইকারি ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি ৫ কেজির এক কার্টন মেডজুল খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার টাকায়। গত বছর এ খেজুর বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। অন্যদিকে সাধারণ খোলা খেজুর প্রতি কেজি ফেব্রুয়ারির শুরুতে কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ছিল ১২৮-১৩০ টাকা। বর্তমানে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৫৫ টাকায়।
পাইকারি বাজার সূত্রে জানা গেছে, বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জাহিদি জাতের খেজুর। এক বছর আগে প্রতি কেজি খেজুর খুচরা পর্যায়ে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত। শুল্ক কমানোর পর বর্তমানে এ খেজুর খুচরায় বিক্রি করতে হবে ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য আমদানি করা খোলা (বস্তায় বিক্রি হওয়া ভেজা খেজুর) রোজা আসার আগেই কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ১৫৫ টাকায় উঠে গেছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে এ মানের খেজুর বিক্রি করতে হবে কমপক্ষে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায়। অবশ্য গতকাল বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল হক টিটু ঘোষণা দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে খেজুর পৌঁছে দিতে বস্তায় আসা জাহিদি খেজুরের দাম কমানো হবে। আজ রোববার (৩ মার্চ) এই খেজুরের দাম কমানোর ঘোষণা আসার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি খেজুর বন্দর থেকে খালাস নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগে বন্দর থেকে দিনে খেজুরভর্তি ছয় কনটেইনার খালাস হলেও এখন সেটা ৭০ কনটেইনারে গিয়ে টেকেছে। কিন্তু দাম কমছে না।
ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকার শুল্ক কমানোর পর ব্যবসায়ীরা খেজুর খালাসে তোড়জোড় শুরু করেছে। শুল্ক কমানোর পরও ভোক্তারা কম দামে খেজুর কিনতে পারছেন না। শুল্ক কমানোর পর পর্যাপ্ত আমদানি হলেও দাম কেন কমছে না বিষয়টি তদারকি করতে হবে। তদারকি না করলে রোজায় খেজুর কিনতে পারবে না ভোক্তারা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২২ হাজার ৬৬৩ টন খেজুর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস করেছেন আমদানিকারকরা। ১৪৫ দিনের মধ্যে গত ১৫ দিনেই বেশি খেজুরের চালান খালাস হয়েছে। ২৮ ধরনের খেজুর দেশের ৮২টি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, মিসর, আলজেরিয়া, নামিবিয়া, তিউনিশিয়া ও আফগানিস্তান থেকে আমদানি করেছে।
জানা গেছে, চার মাস আগে খেজুর আমদানি করলেও শুল্ক কমবে এ আশায় ব্যবসায়ীরা পণ্যটি চট্টগ্রাম বন্দরে গুদাম করে রেখেছিলেন। ফলে বেসরকারি ১৯টি ডিপোতে ১ হাজার কনটেইনার (প্রতি কনটেইনারে ২২-২৪ হাজার কেজি খেজুর থাকে) খেজুর পড়ে ছিল। এখন খেজুরভর্তি ৬০৫টি কনটেইনার খালাস চলছে। এখনো খেজুরভর্তি ৩৯৫টি কনটেইনার খালাসের উদ্যোগ নেয়নি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার কাজী ইরাজ ইশতিয়াক বলেন, প্রচুর পরিমাণে খেজুর খালাস হচ্ছে। প্রতিদিনই খালাস করছেন আমদানিকারকরা। তিনি বলেন, খেজুরের শুল্ক ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
তিনি জানান, খেজুরের চারটি ক্যাটাগরি রয়েছে। একেকটি ক্যাটাগরির একেক রকম শুল্কহার হয়। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির প্রবণতাও রয়েছে। অনেক সময় উচ্চ শুল্কহারে খেজুর এনে কম শুল্কহারে ঘোষণা দেওয়া হয়। এমন বেশ কিছু ঘটনাও ঘটেছে। এ জন্য আমরাও সতর্ক আছি, যেন সরকার রাজস্ব বঞ্চিত না হয়।
উচ্চ শুল্কহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা এনবিআর নির্ধারিত, এ ব্যাপারে আমাদের বলার বা করার কিছু নেই। আমরা নির্ধারিত শুল্ক নিয়ে খালাসের ব্যবস্থা করি। খেজুর বিলাসী পণ্য কি না, এ বিষয়েও তিনি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
খাতুনগঞ্জের ডেটস অ্যান্ড ড্রাই ফ্রুটস আমদানিকারক মো. ওমর ফারুক বলেন, খেজুর আমদানিতে কাস্টমস ট্যাক্স ১০ শতাংশ কমালেও অন্যান্য শুল্ক ঠিক রেখেছে এনবিআর। ফলে উচ্চমাত্রায় ট্যাক্স দিয়েই আনতে হচ্ছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সামান্য এ শুল্ক কমানোয় খেজুরের দামে প্রভাব পড়বে না।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার সুলতান আরেফিন বলেন, শুল্ক কমানোর পর থেকে আমদানিকারকরা খেজুর খালাস নিতে শুরু করেছেন। বর্তমানে খেজুর খালাসের পরিমাণও বেড়েছে। আগে প্রতিদিন গড়ে খেজুরভর্তি ছয় কনটেইনার খালাস হলে এখন সেটি ৭০ কনটেইনার খালাস হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রতি কেজি খেজুর ১১০ টাকায় কিনলে ১৪০-১৫০ টাকা শুল্ক দিতে হয়। ১২০ টাকায় কিনলে ২০৮ টাকা শুল্ক দিতে হয়। গত বছর ৯০ টাকায় ডলার কিনতে পারতাম। এ বছর ১২০-১২২ টাকা দিতে হচ্ছে। কাস্টমস থেকে অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ইচ্ছেমতো করা হচ্ছে। এলসি যে মূল্যে খুলছি সে অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণ করা হলে খেজুরের দাম অর্ধেকে নেমে আসে। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না।
বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, পণ্য বন্দরে আসার পর শুল্ক পরিশোধ করে খালাস করতে হয়। এসব কাস্টমসের বিষয়।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ বলেন, ডলারের দাম বাড়াতে পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যায়। এর পরও ব্যবসায়ীরা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ পুলিশের ছয়জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আজ বুধবার (১২ আগস্ট) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত পৃথক ছয়টি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই আদেশ কার্যকর করা হয়। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থে তাদের বরখাস্ত করা হয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকায় বিপ্লব কুমার সরকার ছাড়াও রয়েছেন ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী বিভাগের সাবেক উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইকবাল হোসাইন, উত্তরা বিভাগের সাবেক ডিসি কাজী আশরাফুল আজীম, কক্সবাজার এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস এবং ডিএমপির সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. গোলাম রুহানী। উল্লেখ্য, বরখাস্ত হওয়ার আগে বিপ্লব কুমার সরকার ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তী সাময়িকভাবে বরখাস্ত অবস্থায় বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন।
একইভাবে মো. ইকবাল হোসাইন খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে এবং কাজী আশরাফুল আজীম চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। অন্যদিকে, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজন কুমার দাস এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. গোলাম রুহানী সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর থেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত এবং পলাতক রয়েছেন। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে বিপ্লব কুমার সরকার ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তী দীর্ঘদিন ধরে ডিএমপির অত্যন্ত প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন।
পুলিশ বাহিনীর সাবেক এই প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের নেওয়া এই কঠোর পদক্ষেপকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার একটি বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্দিষ্ট মেয়াদে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও সরকারি বিধিমালু লঙ্ঘনের কারণেই এই চূড়ান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে এই কর্মকর্তারা আইনের দৃষ্টিতে পলাতক বা বরখাস্ত হিসেবে গণ্য হবেন।
ওমানের শ্রমবাজার খোলা নিয়ে একটি চক্র বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছে জানিয়ে মাস্কাটের বাংলাদেশ দূতাবাস এক সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে একটি চক্রের বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় বিশ্বাস করে কোনো ব্যক্তি, সুবিধাভোগী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করেছে মাস্কাটের বাংলাদেশ দূতাবাস।
বুধবার (১২ আগস্ট) মাস্কাটের বাংলাদেশ দূতাবাস ভিসাসংক্রান্ত এক সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তিতে এ অনুরোধ করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ওমানি অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের একটি বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ওমানের শ্রমবাজার খুলে গেছে’, ‘ব্যাপক ভিসা চালু হয়েছে’ বা ‘ফ্রি ভিসা দেওয়া হচ্ছে’— এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সবার অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, উক্ত বিজ্ঞপ্তিটি ওমান সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার ঘোষণা নয়।
উক্ত বিজ্ঞপ্তির উদ্দেশ্য হলো— আল ধাহিরাহ অঞ্চলের কৃষি শ্রমিকের চাহিদা নিরূপণপূর্বক প্রয়োজন হলে কেবলমাত্র দাহিরাহ এলাকার কৃষি কাজের জন্য সীমিত পরিসরে ভিসার অনুমোদন দেওয়া। এ পর্যায়ে কর্মী নিয়োগ, ভিসা ইস্যু বা শ্রমবাজার উন্মুক্ত এ রকম কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
দূতাবাস জানিয়েছে, বর্তমানে ওমান সরকার শ্রমবাজার পুনর্বিন্যাস ও ওমানাইজেশন নীতির আওতায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধি-নিষেধ কার্যকর রেখেছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘ওমানের শ্রমবাজার খুলে গেছে’, ‘ব্যাপক ভিসা চালু হয়েছে’ বা ‘ফ্রি ভিসা দেওয়া হচ্ছে’— এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় বিশ্বাস করে কোনো ব্যক্তি, সুবিধাভোগী বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।
ওমানে কর্মসংস্থান ও ভিসা-সংক্রান্ত যেকোনো তথ্য শুধুমাত্র বাংলাদেশ দূতাবাস, মাস্কাট, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি এবং ওমান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সূত্র থেকে যাচাই করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এ বিষয়ে যে কোনো অগ্রগতি দূতাবাসের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে যথাসময়ে জানানো হবে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে তরুণ সমাজকে নতুন সভ্যতার মূল ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। আজ বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বারোপ করেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘২০২৬- ডিফরেন্ট কনটেক্সটস, কমন অ্যাসপিরেশনস’।
প্রযুক্তির বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আবির্ভাবসহ চলমান নতুন ইকোসিস্টেমে প্রতিদিন যে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে, পুরোনো দিনের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় তা মোকাবিলা করা কঠিন। তাই তরুণদের হাতে সঠিক জ্ঞান ও দক্ষতা তুলে দেওয়া প্রতিটি রাষ্ট্রের কর্তব্য।” তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ যেমন মানবজাতির জন্য আশীর্বাদ, তেমনি তা নতুন সব জটিলতাও বয়ে এনেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন মানব সভ্যতার জন্য যেমন এক বড় আশীর্বাদ, তেমনি এটি নিয়ে এসেছে সম্পূর্ণ নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি ও জ্ঞানের বিবর্তন এত দ্রুত ঘটছে যে আগামীকালের পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে তা আগে থেকে ধারণা করা মুশকিল।”
তথ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জ্ঞানের পরিবর্তনশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে জ্ঞান কোনো স্থির বিষয় নয়। তিনি মনে করেন, নতুন ইকোসিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সহজাত ক্ষমতা তরুণ প্রজন্মের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি বিদ্যমান। কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চিরাচরিত সমস্যার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষ করে জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় মূল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে প্রমাণ করেছেন যে তিনি তরুণ সমাজের সক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন।” তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তরুণদের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ক্রীড়া, সৃজনশীলতা এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নানাবিধ ইতিবাচক ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ফরেন সার্ভিস একাডেমির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, তরুণ উদ্যোক্তা এবং শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা ও যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধিতে ভারতের কাপুরথালায় অবস্থিত রেল কোচ ফ্যাক্টরি (আরসিএফ) ১৯টি এলএইচবি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচের সমন্বয়ে গঠিত প্রথম রেক তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছে। আজ বুধবার (১২ আগস্ট) এই বিশেষ রেকটি আনুষ্ঠানিকভাবে রোল আউট বা কারখানা থেকে বের করার কথা রয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম পিআইবি-এর একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রথম দফার এই রেকে তিনটি এসি স্লিপার কোচ, তিনটি এসি চেয়ার কোচ, ১১টি নন-এসি চেয়ার কোচ এবং দুটি পাওয়ার কার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রী চাহিদা ও কারিগরি প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই এসব কোচের নকশা ও অভ্যন্তরীণ সুবিধাগুলো সাজানো হয়েছে। যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে এতে উন্নতমানের রিক্লাইনিং চেয়ার এবং স্টেইনলেস স্টিলের বিশেষ আর্মরেস্ট ও ফুটরেস্ট যুক্ত করা হয়েছে। নিরাপত্তা ও আধুনিক সুবিধার অংশ হিসেবে এসি কোচগুলোতে সিসিটিভি নজরদারি, যাত্রী অ্যালার্ম সিস্টেম, আংশিক খোলা যায় এমন জানালা এবং শিশুদের পরিচর্যা কক্ষের পাশাপাশি বিশেষ নামাজের কক্ষের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের বিশেষ ভৌগোলিক ও পরিচালন পরিস্থিতি মাথায় রেখে কোচের ছাদকেও বিশেষভাবে শক্তিশালী করা হয়েছে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে এই কোচগুলোতে ইউরোপীয় সুরক্ষা মানদণ্ড ইএন ১৫২২৭ অনুসরণ করা হয়েছে, যা কোনো ধরনের সংঘর্ষের সময় যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। এ লক্ষ্যে কোচের মূল কাঠামোর নকশায় আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। কারিগরি দিক থেকেও এতে বিশেষত্ব রয়েছে; ভারতীয় রেলের প্রথাগত ৭৫০ ভোল্টের পরিবর্তে বাংলাদেশ রেলওয়ের চাহিদা অনুযায়ী এসব কোচে ৪১৫ ভোল্টের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য যে, এর আগেও ২০১৫-১৬ সালে আরসিএফ বাংলাদেশ রেলওয়েকে ১২০টি এলএইচবি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়ে মোট ২০০টি ব্রডগেজ কোচ তৈরির জন্য নতুন করে কার্যাদেশ প্রদান করে। বর্তমানের এই ১৯টি কোচের চালানটি সেই বিশাল অর্ডারেরই প্রথম কিস্তি। এই নতুন কোচগুলো রেল বহরে যুক্ত হলে বাংলাদেশের যাত্রী পরিবহনে এক নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে জ্বালানি খাতের তীব্র সংকট। জুন মাসেই পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। তবে দাম বাড়ানোর পর দুই মাস পার হতে চললেও বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্র এতটুকু বদলায়নি; বরং প্রতিদিন নতুন নতুন রেকর্ড ভাঙছে লোডশেডিং। জ্বালানির মারাত্মক ঘাটতি, আমদানিনির্ভর এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পাহাড়সম বকেয়া বিল জমে থাকা—সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ খাত আজ এক জটিল ও ত্রিমুখী সংকটে এসে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যমান এই মহাবিপর্যয় একদিনে তৈরি হয়নি। একাধিক অবকাঠামোগত, অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি সরবরাহজনিত কারণে পুরো ব্যবস্থাটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে সংকটটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা রয়েছে ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অথচ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে যেখানে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট, সেখানে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হয়েছে মাত্র সাড় ১২ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি অভাবে কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও জরুরি রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে বর্তমানে দেশের ৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। যেগুলো চালু আছে, সেগুলোর অধিকাংশও পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় চালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। গত রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল ৩টায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট, যা রাত ১টায় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। ১০ ঘণ্টার ব্যবধানে এটি ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের রেকর্ড। এর আগে ৩ আগস্ট লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট এবং ২০২৩ সালের ২৭ জুন ছিল ৩ হাজার ৪১৯ মেগাওয়াট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা হয়নি। উৎপাদন না করলেও কেন্দ্রগুলোকে বিপুল পরিমাণ ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্র ভাড়া দিতে হয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি ও বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির দেনা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
প্রাথমিক জ্বালানি খাতের প্রতিটি উৎস একযোগে সংকটে পড়ায় মূল অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রতিদিনের গ্যাসের চাহিদা ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা দিতে পারছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। ফলে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াট থেকে কমে ৩,৫০০-৪,০০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ২১ জুলাই মহেশখালী ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরবরাহ ৬০ কোটি ঘনফুট কমে যায়। পরবর্তীতে মেরামত শেষে ২৫ কোটি ঘনফুট যোগ হলেও বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি কার্গো ভিড়তে না পারায় সরবরাহ ফের ২৫ কোটি ঘনফুট কমে মোট সরবরাহ ২২০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে।
৭,৯৪৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে কয়লা থেকে উৎপাদিত হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি পাওনা নিয়ে ধুঁকতে থাকা পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছিল। আদানির ১,৬০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রে বন্যায় কয়লা ভিজে যাওয়া এবং পটুয়াখালী উপকূলে বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজ থেকে কয়লা খালাস না হওয়ায় সরবরাহ কমে ৮০০-১,০০০০ মেগাওয়াটে নেমেছে। রামপাল ও বড়পুকুরিয়াতেও উৎপাদন কমেছে; বড়পুকুরিয়ার তিনটি ইউনিটের দুটিই কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ।
এছাড়া ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলো সারা দিন চালানো অসম্ভব ব্যয়বহুল। তাই কেবল সন্ধ্যার পর ‘পিক আওয়ারে’ লোডশেডিং সহনীয় রাখতে সীমিত সময়ের জন্য তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালু রাখা হচ্ছে।
জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে নগর ও গ্রামের চরম অসম চিত্র ফুটে উঠেছে। ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা (ডেসকো ও ডিপিডিসি) জানিয়েছে তাদের বড় ঘাটতি নেই, ফলে রাজধানীতে সরবরাহ প্রায় নিরবচ্ছিন্ন। কিন্তু বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) আওতাধীন গ্রামীণ জনপদে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০-১২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না।
প্রচণ্ড উত্তাপ আর বিদ্যুৎহীনতার ডাবল-চাপে গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
নেত্রকোনার পূর্বধলার বাঘবেড় গ্রামের আক্কাস আলী জানান, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না।
কেরানীগঞ্জের গৃহবধূ রোকেয়া বেগম ও নীলফামারীর টুপামারীর সাদ্দাম আলী জানান, তীব্র গরমে দিন-রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন কাজ ও স্বাভাবিক জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান না করে আমদানিনির্ভর এলএনজির দিকে ঝোঁকার খেসারত দিচ্ছে পুরো দেশ। সাগরে সামান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা আন্তর্জাতিক বাজারের সামান্য দোলাচলেই দেশের পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের জোড়া সংকটে রপ্তানিমুখী খাত, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং কৃষিতে ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বস্ত্র, পোশাক ও ভারী শিল্পকারখানায় ব্যাকআপ জেনারেটর চালাতে গিয়ে ডিজেল ও গ্যাসের পেছনে বিপুল বাড়তি খরচ হচ্ছে, ফলে লাফিয়ে বাড়ছে উৎপাদন খরচ।
নারায়ণগঞ্জ, রূপগঞ্জ ও ফেনীর শিল্পমালিকরা জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে কারখানার বিশাল উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায় এবং তা পুনরায় চালু করতে দীর্ঘ সময় নষ্ট হয়। ফেনীর স্টারলাইন ফুড প্রডাক্টসের পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন জানান, প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং হওয়ায় উৎপাদন খরচ অহেতুক বেড়ে যাচ্ছে। চুনারুঘাটের দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় জানান, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে সংগৃহীত চা-পাতা পচে নষ্ট হয়ে বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে সেচ পাম্প চালানো বিঘ্নিত হওয়ায় মৌসুমী ফসল উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, সন্ধ্যার পর লোডশেডিং সহনীয় রাখতে অতিরিক্ত উৎপাদন করা হলেও মধ্যরাতের পর আবার তা কমাতে হচ্ছে। পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম এবং পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব আশা প্রকাশ করে জানান, এলএনজি টার্মিনাল মেরামত শেষ হলে এবং কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে সরবরাহে কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
অন্যদিকে নেত্রকোনা, ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪ এবং ডোমার নেসকোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, চাহিদার বিপরীতে অর্ধেকেরও কম সরবরাহ পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিং দেওয়া ছাড়া তাদের বিকল্প কোনো পথ নেই।
সংকট সমাধানে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দেশের মোট গ্যাসের ৫৮ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যায়, অথচ ৮ শতাংশই নষ্ট হয় সিস্টেম লসে—যা গ্রহণযোগ্য নয়। শিল্প খাতে গ্যাস দিলে উৎপাদন বাড়ে ও ডলার আসে, সেখানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, সাময়িক এলএনজি আমদানির পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে এবং অপচয় ও অন্যায্য ব্যয় বন্ধ করতে হবে। একই সাথে সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ মো. মজিবুল হক জানান, দেশের জ্বালানি মজুতের স্টোরেজ ক্ষমতা বাড়াতে হবে ও ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল শক্তিশালী করতে হবে, তা না হলে কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাত বড় হুমকির মুখে পড়বে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আগামী ২০ আগস্ট হবে। মনোনয়নপত্র দাখিল ও বাছাই শেষে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট রাত। সরকারি দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মনোনয়ন দেবেন এবং মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।
চিফ হুইপ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আজকের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সংসদ সদস্যরা তাদের আসন ও বিভক্তি নম্বর অনুযায়ী ভোট দেবেন।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা ও স্পিকারের ভোট দেওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমকে সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ দেওয়া হবে। ভোটগ্রহণ শেষে ব্যালট গণনা ও ফলাফল প্রস্তুতের কার্যক্রমও ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে।
তিনি বলেন, সংসদে মোট ৩৪৯ জন ভোটার রয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই ভোটগ্রহণ শেষ হলে গণনা শেষে দ্রুত ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে কোনো ভোট বাকি থাকলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে এরপর ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
চিফ হুইপ জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচনী কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করবেন এবং সংসদ সচিবালয় তাদের প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা দেবে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যেহেতু সংশোধন হয়নি, সুতরাং এটা কার্যকর থাকবে।’
নিজ দলের পছন্দের প্রার্থীর বাইরে কোনো সংসদ সদস্য ভোট দিতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নূরুল ইসলাম মণি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল হবে।
এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় ৩৫ বছর ধরে দেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়নি। গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রয়োজন বলেই বিরোধী দল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে।
তিনি বলেন, বিরোধী দল নির্বাচনটি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হতে দিতে চায়নি। সে কারণেই প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আজকের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, জুলাই সনদে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে চারটি ক্ষেত্রে ঐকমত্য রয়েছে এবং এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও রয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক যাত্রা অব্যাহত রাখা এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। যাতে দেশের মানুষ ভবিষ্যতে নির্বাচনমুখী হয় এবং নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে, সে লক্ষ্যেই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, এ ধরনের পরিষদ গঠনের প্রয়োজন নেই। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশেও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে।
ভারতের সংবিধানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ১৯৫০ সালে ভারতের সংবিধান গ্রহণের পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১০৬ বার সংশোধন করা হয়েছে। প্রতিবারই সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনা হয়েছে, নতুন করে সংবিধান রচনা বা সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠন করা হয়নি।
তিনি বলেন, জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি দাঁড়ি, কমা ও সেমিকোলন যেভাবে আছে, সেভাবেই আমরা বাস্তবায়ন করবো। সবাই মিলে যে সনদে স্বাক্ষর করেছি, সেটিই বাস্তবায়ন করা আমাদের কমিটমেন্ট।
চিফ হুইপ জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী সংসদ অধিবেশনেই একটি নতুন বিল আনা হবে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম সরকার করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান ও শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর ঢাকা-দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এক গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। একদিকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আবেগ, বিচারিক মর্যাদা ও ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা; অন্যদিকে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন আস্থার সংকট। জমাট বাঁধা এই বরফ গলাতে কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পরদিনই দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
ঢাকা ও নয়াদিল্লির বর্তমান টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছেন ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার।
গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লির এফসিসি সাউথ এশিয়ার অনলাইনে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। যদিও ভারত সরকার দাবি করেছে—এই আয়োজনের সাথে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, তবুও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই দায় এড়ানোর অবস্থান ঢাকার ক্ষোভ কমাতে পারেনি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি স্পষ্ট: দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দ্রুত প্রত্যর্পণ ও আস্থার ঘাটতি পূরণ না করে কূটনৈতিক সম্পর্কের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ভারত যদি তাদের পুরোনো মিত্রকে বারবার রাজনৈতিক স্পেস ও সুরক্ষার বার্তা দেয়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সঙ্গে নয়াদিল্লির সুসম্পর্ককে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
উত্তেজনা প্রশমন ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অংশ হিসেবে ঢাকার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ সৃষ্টি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে প্রত্যর্পণ না করা পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় অগ্রগতি থমকে থাকবে। তবে বৈঠক শেষে ভারতীয় হাইকমিশনার জানান, নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের শীর্ষ বৈঠক হলে বহু সমস্যার সমাধান সম্ভব।
এদিন, দুপুরে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ভারতীয় দূত। এর আগে, রোববার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন দীনেশ ত্রিবেদী।
একই ধারাবাহিকতায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ (RAW)-এর প্রধান পরাগ জৈনের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি ঢাকা সফর করেন। তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামসুল ইসলাম ও ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, ‘র’ প্রধানের এই সফর চীন থেকে ঢাকায় আসার নিয়মিত একটি কার্যক্রমের অংশ, এটি নিয়ে নতুন করে জল্পনা-কল্পনার কিছু নেই।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের একদিন পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করেছেন ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাজধানী নয়াদিল্লিতে তিনি মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে সাক্ষাতে তারা কী নিয়ে আলোচনা করেছে সেটি জানা যায়নি।
একইদিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফর ও ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
গত এপ্রিলে ভারত সরকার তাদের ১৬তম হাইকমিশনার হিসেবে ঢাকায় নিয়োগ দিয়েছে সাবেক রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে। দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ইতিহাসে ভারত এই প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে হাইকমিশনার করে পাঠিয়েছে। নতুন দায়িত্বে যোগ দিতে দীনেশ ত্রিবেদী ৫ জুন পশ্চিমবঙ্গ থেকে স্থলসীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছান।
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা কোনো বাহ্যিক শক্তির দান ছিল না, বরং তা ছিল বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম ও ত্যাগের ফসল। তবে কৌশলগত কারণে ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করেছিল, যাতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত ও ‘চিকেন নেক’ (শিলিগুড়ি করিডর)-এর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হয় এবং দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের আড়াই-ফ্রন্ট সামরিক চ্যালেঞ্জ কমে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দীর্ঘ ১৫ বছর পর বর্তমানে এসে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল ও বাংলাদেশের ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বড় রূপান্তর এনেছে। বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু তা হতে হবে কোনো আধিপত্যবাদী বা একপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, পারস্পরিক স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সমমর্যাদার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক বর্তমানে এক ঐতিহাসিক পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে। একদিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জনগণের গণআকাঙ্ক্ষা ও বিচার বিভাগীয় মর্যাদা রক্ষা করা বর্তমান সরকারের নৈতিক দায়িত্ব; অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন অক্ষুণ্ন রাখা ভারতের জন্য জরুরি। ভারত সরকার নিজেদের পুরোনো রাজনৈতিক মিত্রের মোহ কাটিয়ে গণআকাঙ্ক্ষাকে কতটুকু মর্যাদা দেবে—তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের আসল রূপ।
আগামী সেপ্টেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন হতে যাচ্ছে। বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই সফরটি দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে বরফ সম্পূর্ণ গলাতে এবং সরাসরি আলোচনায় বসার একটি মোক্ষম সুযোগ হতে পারে।
তবে এই সফর এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করছে এর আগে ভারত সরকার ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’ এবং দণ্ডিত আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে কতটা দৃশ্যমান ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের একটি সতর্কবার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন— ভারত যদি বারবার তাদের পুরোনো মিত্রকে রাজনৈতিক স্পেস ও সুরক্ষার বার্তা দিতে থাকে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সাথে নয়াদিল্লির আস্থাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
তবে দেশের বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সাবেক কূটনীতিক ফয়েজ আহমদ মনে করেন, সরকারের উচিত অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সামনে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া।
তবে হুমায়ুন কবিরের মতে, সরকারের বর্তমান অবস্থান দেশের সাধারণ মানুষের গণআকাঙ্ক্ষা ও আবেগেরই সঠিক প্রতিফলন ঘটিয়েছে। তবে ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে জনগণের আবেগ, বিচারিক মর্যাদা এবং ভূরাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই দুই দেশের কূটনীতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যাপ্ত সক্ষমতা আছে, কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। মূলত অর্থের জোগানের অভাবেই জ্বালানি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর ঢাকা ক্লাবে ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ (এফইআরবি) আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন তিনি।
বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণ ব্যাখ্যা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছি না। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য তো অর্থের জোগান থাকতে হবে। সেই জোগানের জায়গাটি আসলে আমাদের হাতে নেই।
তিনি আরও বলেন, আমাদের যেসব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, সেগুলো যদি পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারতাম, তাহলে আজ বিদ্যুৎ সংকটে মানুষকে এই কষ্ট করতে হতো না।
গ্যাসের চাহিদার ঘাটতি তুলে ধরে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে দেশে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদায় প্রায় ১ হাজার ২০০ এমএমসিএফডির (মিলিয়ন ঘনফুট) ঘাটতি রয়ে গেছে। কারণ, আমাদের দেশীয় কূপগুলো থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা নিয়ে তিনি বলেন, আপনার কাছে যদি টাকা থাকেও, তবু আপনি রাতারাতি এলএনজি আমদানি বাড়াতে পারবেন না। কারণ আপনার সেই অবকাঠামো নেই। আমাদের দেশে এলএনজির কোনো ল্যান্ড বেইজড টার্মিনাল নেই। আমাদের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) আছে মাত্র দুটি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৩০ থেকে ৩৬ মাসের আগে নতুন এফএসআরইউ কার্যকর করা আসলেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এটি বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি। দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে এটি কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, এটি জনগণের সরকার। এসব কাজ করতে গিয়ে আমরা কোনো জায়গায় দেশের স্বার্থের সঙ্গে আপস করব না। সরকারের ক্রয় নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হবে।
তিনি আরও জানান, তৃতীয় ও চতুর্থ এফএসআরইউ স্থাপন নিয়ে কথা হচ্ছে। গ্যাস পাইপলাইনের বিষয়টি মাথায় রেখেই এসব নিয়ে কাজ চলছে। পাশাপাশি বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। শুধু যন্ত্রপাতি দিয়ে নয়, বরং তাদের কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত একটি এফএসআরইউতে সমস্যার কারণে গ্যাস সরবরাহে সম্প্রতি সংকট দেখা দেয়। এ বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের ছিল না। দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের এনে আংশিকভাবে এটির কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
তিনি জানান, একটি বয়লার মেরামতের কাজ চলছে, তবে অপর বয়লারটি এখনো চালু হয়নি। এটি চালু করতে গেলে সাময়িকভাবে প্রথম বয়লারের কার্যক্রম অন্তত ৭২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখতে হবে, যা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোন সময়টাতে মানুষের কষ্ট সবচেয়ে কম হবে এবং আমরা এই এফএসআরইউ পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারব, সে বিষয়ে আমরা আলোচনা করছি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর না করে পানি, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পরিকল্পনা ও যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘শুধু ওষুধ বা স্যালাইন দিয়ে এসডিজি গোল অর্জন সম্ভব নয়; এর মূল ভিত্তি হতে হবে রোগ প্রতিরোধ, যার ওপর প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন।’
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এসডিজি বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনাবিষয়ক জাতীয় সম্মেলনে তিনি এ বিষয় কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা ও জেন্ডার বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি এসডিজি-৩ অর্জনের জন্য স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে পানি, শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের মত খাতগুলোকে একত্র করতে হবে।
গ্রামাঞ্চলের স্যানিটেশন ব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে ও রোগ প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করতে হবে। বাজারঘাট বা সব জায়গায় ময়লা হাত দিয়ে ধরার পর সেই হাত ও টাকা দিয়েই আবার লেনদেন করা হচ্ছে। আমাদের এই অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস ও জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে হবে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট ও লবণাক্ততার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে মানুষ হলুদ পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে। গত মাসে প্যারিস কনফারেন্সে আমি বিষয়টি তুলে ধরেছি, যেখানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আশ্বাস মিলেছে।
একই সঙ্গে শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল বা স্ক্রিনে আসক্তি এবং জাঙ্ক ফুডের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষায় অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পরিকল্পনা কমিশনের উদ্দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর একা দায়িত্ব চাপালে এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়। পানি, স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ ও স্থানীয় সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। অন্তত প্রতি দুই মাসে একবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বৈঠকে বসে যৌথভাবে তা বাস্তবায়ন করলেই কেবল কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
তিনি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, মায়েদের সচেতনতা, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর গুরুত্ব এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে শাকসবজি ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
মন্ত্রী বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো উদ্যোগ নয়, সব মন্ত্রণালয়ের যৌথ কর্মপদ্ধতি ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এসডিজি লক্ষ্য অর্জন করতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বক্তব্য দেন।
এছাড়া স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসনীমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের একটিই পরিচয়-আমরা সবাই ‘বাংলাদেশি’ এখানে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই।
আমরা সবাই বাংলাদেশের 'অধিবাসী'। সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সমানভাবে সুরক্ষিত।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ মঙ্গলবার এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আজ সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে চিটাগাং হিল ট্র্যাকটস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচটিআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য ‘আদিবাসী’ পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
সিএইচটিআরএফ চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় বসবাসরত সব নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এ দেশের সব রাজনৈতিক দল ও অংশীজন সর্বসম্মতিক্রমে সম্মত হয়েছেন যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সর্বস্তরের মানুষের পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’। এই জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার মূল ভিত্তি।
অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, উপজাতি ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা, বিকাশ ও সংরক্ষণে পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, জাতীয় মূলধারার সঙ্গে সমতা আনার লক্ষ্যে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, নারী ও শিশুদের কল্যাণে রাষ্ট্র বিশেষ সুবিধা ও কোটা ব্যবস্থা বজায় রেখেছে, যা সংবিধানেও স্বীকৃত।
পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন বহুভাষী ও বহুজাতিক রাষ্ট্রের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানে শত শত ভাষা প্রচলিত থাকা সত্ত্বেও পৃথক ‘আদিবাসী’ সত্তার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, বরং অনগ্রসরদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে মূলধারায় যুক্ত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গৃহীত জাতিসংঘের ‘ইউনাইটেড নেশনস ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজিনাস পিপলস’ (ইউএনডিআরআইপি) সনদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুরু থেকেই স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছিল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ উক্ত ভোটাভুটিতে ভোটদানে বিরত ছিল এবং বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্রও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
তিনি আরও বলেন, এ আন্তর্জাতিক ডিক্লারেশন বা আইএলও কনভেনশন ১৬৯ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয় এবং বাংলাদেশ এর অংশীদার নয়।
গোলটেবিল আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক এমরান সালেহ প্রিন্স, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খান, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, এনসিপির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী, মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান, মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব প্রমুখ।
ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য ‘আদিবাসী’ শব্দটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, অভিবাসী চিন্তাধারার মনোজগৎ বা দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বাংলাদেশের জনমিতি বা নৃবিজ্ঞানকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে চিটাগাং হিল ট্র্যাকটস রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিএইচটিআরএফ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তথ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বিশ্বের যেসব দেশে বহিরাগত অভিবাসীরা এসে স্থানীয় ও মূল অধিবাসীদের তাড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করেছে, সেখানে আদিবাসীদের একটি ঐতিহাসিক ক্ষোভ থাকা স্বাভাবিক। সেই ঐতিহাসিক পাপ মোচনেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সেখানে কাজ করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যেখানে বহিরাগত কেউ এসে মূল বাসিন্দাদের তাড়িয়ে জমি দখল করেছে। বাংলাদেশের জনমিতি ও জাতিসত্তা হাজার বছরের নৃবিজ্ঞানের প্রাকৃতিক বিবর্তনের ধারায় গঠিত হয়েছে, তাই এখানে বহিরাগত অভিবাসী বনাম আদিবাসী—এমন কোনো বিরোধের সুযোগ নেই।
দেশের জাতীয় পরিচয় এবং জনমিতি নিয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক সৃষ্টি করাকে এক ধরনের অপকৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করে সবাইকে সতর্ক করেছেন তথ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর যে ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন, তা জাতির পরিচয়গত সংকট নিরসন করতে সক্ষম হয়েছে। এই সংহত পরিচয়কে ভবিষ্যতেও অক্ষুণ্ন রাখতে ভুল বয়ানের বিপরীতে সঠিক ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরার ওপর তিনি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন।
একইসঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনোজগৎ দিয়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সমস্যাগুলোও সঠিকভাবে বোঝা যাবে না। সিএইচটিআরএফ-এর চেয়ারম্যান ও সাংবাদিক মো. মেহেদী হাসান পলাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। এছাড়া অনুষ্ঠানে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, বিভিন্ন সংসদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ইতিহাসবিদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের হাত ধরেই আগামীর জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার তাদের জন্যই দায়িত্ব নিয়েছে এবং তাদের কল্যাণের জন্যই কাজ করছে। তাই কোনো দাবি থাকলে তা নিয়ে বুঝেশুনে আন্দোলন করার পরামর্শ দেন তিনি। প্রয়োজনে আন্দোলনের আগে তার সাথে সরাসরি কথা বলে বা বিতর্ক করে যৌক্তিক উত্তর জেনে নেওয়ার আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী। মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে ‘সমৃদ্ধ অর্থনীতির বিনির্মাণে শিক্ষা: দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক গতিশীলতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
বিনা কারণে হৈচৈ করে দেশে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এমন অস্থিতিশীলতা তৈরি করে একটি রাষ্ট্রকে কখনোই সামনের দিকে এগোতে দেওয়া যায় না। বর্তমানে দেশে অতি মাত্রায় রাজনীতি শুরু হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, একটি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ না হতেই যারা মিথ্যা অজুহাত দিয়ে রাজনীতি করছে, তারা মূলত দেশের উন্নতি নয়, বরং অধঃপতন চায়। এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্তদের নেতৃত্ব দেশের জনগণ কখনোই মেনে নেবে না বলে তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।
সেমিনারে সাম্প্রতিক এসএসসির ফলাফল নিয়েও কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার একেবারে শূন্য, তাদের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন। একইসঙ্গে, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো কেন আশানুরূপ ভালো ফলাফল করতে পারছে না, সেই বিষয়টি সরকার গভীরভাবে খতিয়ে দেখবে বলেও তিনি জানান।
উক্ত অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ চলছে। এছাড়া, সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং এর মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য অন্তত ৫ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৫ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। এই তালিকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর ছোট ভাই ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক সহকারী কমিশনার মো. গোলাম রুহানী এবং ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারের মতো আলোচিত নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সরকারের এই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের বিষয়টি ইতিমধ্যে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং শিগগিরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
বরখাস্ত হতে যাওয়া অন্য তিন পুলিশ কর্মকর্তা হলেন— সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রাজন কুমার দাস এবং মো. ইকবাল হোসাইন। সূত্র অনুযায়ী, এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে বিনা অনুমতিতে দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকা এবং দায়িত্ব থেকে পলায়নের মতো গুরুতর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। সেই মামলার তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেই তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার মতো গুরুদণ্ড দেওয়ার সব দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, যা এখন কেবল প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে চাকরিচ্যুত হতে যাওয়া এসব পুলিশ কর্মকর্তার বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, পাঁচ কর্মকর্তার মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন এবং তাকে বরিশালে রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। একইভাবে সুদীপ কুমার চক্রবর্তীকেও সাময়িক বরখাস্ত করে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া আরেক কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইনকে সাময়িক বরখাস্ত করে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই তালিকায় থাকা বাকি দুই কর্মকর্তার বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট দাপ্তরিক অবস্থান নেই এবং তারা আত্মগোপনে রয়েছেন। নথির তথ্য অনুযায়ী, ডিএমপির সাবেক সহকারী কমিশনার মো. গোলাম রুহানীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। একই রকমভাবে অপর পুলিশ কর্মকর্তা রাজন কুমার দাসও সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে পলাতক অবস্থায় রয়েছেন। আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হয়েও এমন চরম দায়িত্বহীন আচরণ এবং কর্মস্থল থেকে পলায়নের কারণেই মূলত তাদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।