খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছিল ৫৩ শতাংশ, ৮ ফেব্রুয়ারি ১০ শতাংশ কমিয়ে করা হয়েছে ৪৩ শতাংশ। শুল্ক কমানোর পরও দাম কমেনি খেজুরের। উল্টো দাম বেড়েছে। যদিও বন্দর থেকে খেজুর খালাসের পরিমাণও বেড়েছে। গত কয়েক দিনে ৬০৫ কনটেইনার খেজুর খালাসের কার্যক্রম চলছে এবং প্রতিদিনই খালাস অব্যাহত রয়েছে।
জানা গেছে, আগামী ১২ মার্চ পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রমজান মাসজুড়ে সিয়াম সাধনা করেন। দিনভর রোজা রাখার পর সন্ধ্যায় ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে খেজুর। খেজুর ছাড়া এখন আর ইফতারের কথা ভাবা যায় না। প্রায় সব রোজাদারই খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এ কারণে রমজান মাসে চাহিদা বেশি থাকা পণ্যগুলোর একটি খেজুর। পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে চলতি মাসে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি বাজারে তদারকি ও বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা কোনো কাজেই আসছে না। গত বছরের তুলনায় বর্তমানে দেশের বাজারে খেজুরের দাম প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি আদেশে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনার ঘোষণা দেয়। এর আগে খেজুর আমদানিতে সর্বমোট ৫৩ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য প্রতি টন ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৭৫০ ডলার। এর সঙ্গে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ ও ভ্যাট ১৫ শতাংশ। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম কর ৫ শতাংশ হারে দিতে হচ্ছে। এতে বর্তমানে সর্বমোট ৪৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত রোজার আগে মানভেদে প্রতি কেজি খেজুরে শুল্ক দিতে হতো ৫ দশমিক ৪৫ থেকে ২১ দশমিক ৮৪ টাকা। তবে এবার খেজুরকে ‘বিলাসীপণ্যের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে খেজুরের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫৩ শতাংশ করা হয়। ফলে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বেড়ে গেছে। এবার শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫৪ থেকে ২০৮ টাকা। মূলত শুল্কের প্রভাব পড়েছে খেজুরের দামে। গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজি খেজুরে জাতভেদে দাম বেড়েছে ১০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত। দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া খেজুরের মধ্যে রয়েছে দাবাস, জাহিদি, বরই ও গলা খেজুর।
চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি গলা বা বাংলা খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা, জাহিদি খেজুর ২৪০-২৬০ ও মানভেদে দাবাস খেজুর ৪৫০-৫৫০ টাকায়। এ ছাড়া বরই খেজুর মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪৪০-৫৪০ টাকায়। গত বছর এসব খেজুরের দাম ছিল বর্তমান দরের অর্ধেকেরও কম।
এদিকে অভিজাত শ্রেণির কাছে পছন্দের খেজুরের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের মেডজুল, মাবরুম, আজওয়া ও মরিয়ম। গত এক মাসের ব্যবধানে এসব খেজুরের দাম কেজিতে ২০০-৩০০ টাকা বেড়েছে। জাম্বো মেডজুল মানভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, সাধারণ মেডজুল ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০, মাবরুম খেজুর ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০, আজওয়া খেজুর মানভেদে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো জাতের মরিয়ম বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। এ ছাড়া কালমি মরিয়ম ৮০০-৯০০ টাকা, সুফরি মরিয়ম ৭৫০-৮০০, আম্বার ও সাফাভি ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ ও সুক্কারি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৮০০-৯০০ টাকায়।
খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালে রোজার আগে জাহিদি জাতের খেজুরের দাম ছিল কার্টনপ্রতি (১০ কেজি) ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। শুল্ক আরোপের কারণে দাম বাড়ার পর গত বছরের শেষ সপ্তাহেও একই জাতের খেজুরের দাম ছিল কার্টনপ্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকা। তবে এখন ১০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েও এই জাতের খেজুরের কার্টন হাঁকা হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
পাইকারি ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি ৫ কেজির এক কার্টন মেডজুল খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার টাকায়। গত বছর এ খেজুর বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। অন্যদিকে সাধারণ খোলা খেজুর প্রতি কেজি ফেব্রুয়ারির শুরুতে কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ছিল ১২৮-১৩০ টাকা। বর্তমানে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৫৫ টাকায়।
পাইকারি বাজার সূত্রে জানা গেছে, বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জাহিদি জাতের খেজুর। এক বছর আগে প্রতি কেজি খেজুর খুচরা পর্যায়ে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত। শুল্ক কমানোর পর বর্তমানে এ খেজুর খুচরায় বিক্রি করতে হবে ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য আমদানি করা খোলা (বস্তায় বিক্রি হওয়া ভেজা খেজুর) রোজা আসার আগেই কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ১৫৫ টাকায় উঠে গেছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে এ মানের খেজুর বিক্রি করতে হবে কমপক্ষে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায়। অবশ্য গতকাল বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল হক টিটু ঘোষণা দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে খেজুর পৌঁছে দিতে বস্তায় আসা জাহিদি খেজুরের দাম কমানো হবে। আজ রোববার (৩ মার্চ) এই খেজুরের দাম কমানোর ঘোষণা আসার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি খেজুর বন্দর থেকে খালাস নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগে বন্দর থেকে দিনে খেজুরভর্তি ছয় কনটেইনার খালাস হলেও এখন সেটা ৭০ কনটেইনারে গিয়ে টেকেছে। কিন্তু দাম কমছে না।
ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকার শুল্ক কমানোর পর ব্যবসায়ীরা খেজুর খালাসে তোড়জোড় শুরু করেছে। শুল্ক কমানোর পরও ভোক্তারা কম দামে খেজুর কিনতে পারছেন না। শুল্ক কমানোর পর পর্যাপ্ত আমদানি হলেও দাম কেন কমছে না বিষয়টি তদারকি করতে হবে। তদারকি না করলে রোজায় খেজুর কিনতে পারবে না ভোক্তারা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২২ হাজার ৬৬৩ টন খেজুর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস করেছেন আমদানিকারকরা। ১৪৫ দিনের মধ্যে গত ১৫ দিনেই বেশি খেজুরের চালান খালাস হয়েছে। ২৮ ধরনের খেজুর দেশের ৮২টি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, মিসর, আলজেরিয়া, নামিবিয়া, তিউনিশিয়া ও আফগানিস্তান থেকে আমদানি করেছে।
জানা গেছে, চার মাস আগে খেজুর আমদানি করলেও শুল্ক কমবে এ আশায় ব্যবসায়ীরা পণ্যটি চট্টগ্রাম বন্দরে গুদাম করে রেখেছিলেন। ফলে বেসরকারি ১৯টি ডিপোতে ১ হাজার কনটেইনার (প্রতি কনটেইনারে ২২-২৪ হাজার কেজি খেজুর থাকে) খেজুর পড়ে ছিল। এখন খেজুরভর্তি ৬০৫টি কনটেইনার খালাস চলছে। এখনো খেজুরভর্তি ৩৯৫টি কনটেইনার খালাসের উদ্যোগ নেয়নি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার কাজী ইরাজ ইশতিয়াক বলেন, প্রচুর পরিমাণে খেজুর খালাস হচ্ছে। প্রতিদিনই খালাস করছেন আমদানিকারকরা। তিনি বলেন, খেজুরের শুল্ক ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
তিনি জানান, খেজুরের চারটি ক্যাটাগরি রয়েছে। একেকটি ক্যাটাগরির একেক রকম শুল্কহার হয়। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির প্রবণতাও রয়েছে। অনেক সময় উচ্চ শুল্কহারে খেজুর এনে কম শুল্কহারে ঘোষণা দেওয়া হয়। এমন বেশ কিছু ঘটনাও ঘটেছে। এ জন্য আমরাও সতর্ক আছি, যেন সরকার রাজস্ব বঞ্চিত না হয়।
উচ্চ শুল্কহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা এনবিআর নির্ধারিত, এ ব্যাপারে আমাদের বলার বা করার কিছু নেই। আমরা নির্ধারিত শুল্ক নিয়ে খালাসের ব্যবস্থা করি। খেজুর বিলাসী পণ্য কি না, এ বিষয়েও তিনি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
খাতুনগঞ্জের ডেটস অ্যান্ড ড্রাই ফ্রুটস আমদানিকারক মো. ওমর ফারুক বলেন, খেজুর আমদানিতে কাস্টমস ট্যাক্স ১০ শতাংশ কমালেও অন্যান্য শুল্ক ঠিক রেখেছে এনবিআর। ফলে উচ্চমাত্রায় ট্যাক্স দিয়েই আনতে হচ্ছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সামান্য এ শুল্ক কমানোয় খেজুরের দামে প্রভাব পড়বে না।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার সুলতান আরেফিন বলেন, শুল্ক কমানোর পর থেকে আমদানিকারকরা খেজুর খালাস নিতে শুরু করেছেন। বর্তমানে খেজুর খালাসের পরিমাণও বেড়েছে। আগে প্রতিদিন গড়ে খেজুরভর্তি ছয় কনটেইনার খালাস হলে এখন সেটি ৭০ কনটেইনার খালাস হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রতি কেজি খেজুর ১১০ টাকায় কিনলে ১৪০-১৫০ টাকা শুল্ক দিতে হয়। ১২০ টাকায় কিনলে ২০৮ টাকা শুল্ক দিতে হয়। গত বছর ৯০ টাকায় ডলার কিনতে পারতাম। এ বছর ১২০-১২২ টাকা দিতে হচ্ছে। কাস্টমস থেকে অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ইচ্ছেমতো করা হচ্ছে। এলসি যে মূল্যে খুলছি সে অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণ করা হলে খেজুরের দাম অর্ধেকে নেমে আসে। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না।
বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, পণ্য বন্দরে আসার পর শুল্ক পরিশোধ করে খালাস করতে হয়। এসব কাস্টমসের বিষয়।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ বলেন, ডলারের দাম বাড়াতে পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যায়। এর পরও ব্যবসায়ীরা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় বাংলাদেশ মান বা বিডিএস অনুযায়ী নির্ধারিত গুণগত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় বম্বে সুইটসের বিভিন্ন ধরনের মসলা ও বাঘাবাড়ী ঘিসহ মোট ১০টি পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। বুধবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পণ্যের মান প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণকারী এই সংস্থাটি জানায়, মানহীন প্রমাণিত হওয়ায় এসব পণ্যের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিএসটিআইয়ের পক্ষ থেকে সাধারণ ভোক্তাদের এই নিম্নমানের পণ্যগুলো কেনা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিএসটিআইয়ের নিয়মিত বাজার তদারকির অংশ হিসেবে সংগৃহীত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ঘি, বাটার অয়েল ও মসলা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হলে এই ত্রুটিগুলো ধরা পড়ে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, বাঘাবাড়ী ব্র্যান্ডের ‘ঘি’তে আসলে কোনো মিল্ক ফ্যাট বা দুগ্ধ চর্বির অস্তিত্ব নেই; বরং পাম অলিন ও বনস্পতি ব্যবহার করে তা ঘি নামে বাজারজাত করা হচ্ছিল। পাশাপাশি বম্বে সুইটসের উৎপাদিত বিভিন্ন মসলাও জাতীয় মানদণ্ডের বেশ কিছু প্যারামিটারে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এই বিষয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, “জাতীয় মান অনুসারে পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা প্রতিটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের আইনগত এবং নৈতিক দায়িত্ব। কোনো প্রতিষ্ঠান এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বিএসটিআই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর।”
বিএসটিআইয়ের পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, বম্বে সুইটস অ্যান্ড কোং লিমিটেডের হাঁসের মাংসের মসলা, তেহারি মসলা, কালাভুনা মসলা, গরুর মাংসের মসলা ও মাছের মসলা মান পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হয়েছে। এছাড়া নিম্নমানের তালিকায় রয়েছে বাঘাবাড়ী প্রিমিয়াম ঘি কোম্পানির ‘বাঘাবাড়ী’ ব্র্যান্ডের ঘি, কিশোরগঞ্জ ফুড প্রোডাক্টসের ‘অরুন বাঘাবাড়ী’ ঘি, মেসার্স মামুন ফুড প্রোডাক্টের ‘নিউ রাঁধুনী’ ও ‘সিটি’ ব্র্যান্ডের ঘি এবং এলডার্স ফুড প্রোডাক্টস অ্যান্ড প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজের ‘এলডার্স’ ব্র্যান্ডের বাটার অয়েল। বিএসটিআই প্রধান জানান, পণ্যের মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি নকল ও ভেজাল প্রতিরোধে তাদের কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। তিনি ক্রেতাসাধারণকে পণ্যের উপাদান, উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ এবং বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন যাচাই করে কেনাকাটার আহ্বান জানান এবং যেকোনো অনিয়মের অভিযোগ ১৬১১৯ নম্বরে বা ইমেইলে জানাতে অনুরোধ করেছেন।
দেশের প্রতিটি নাগরিকের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং আর্থিক সংকটের কারণে কেউ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে না বলে জানিয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। বুধবার (২৬ আগস্ট) দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার বোয়ালদার ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত এক কর্মী সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন। ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, “দেশের কোনো নাগরিক অর্থের অভাবে চিকিৎসা নিতে পারবে না—সরকার কখনই এটা হতে দেবে না। প্রত্যেক নাগরিকের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি ভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়ে নাগরিকের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে।”
জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়ায় স্থানীয়দের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আপনারা ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিয়ে আমাকে জয়যুক্ত করে এমপি বানিয়ে মন্ত্রিত্ব হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমি আজ আপনাদের সব কথা শোনার জন্য আপনাদের কাছে এসেছি।” তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, “দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা, দেশের তৃণমূল পর্যায়ে পাড়া-মহল্লা ও প্রত্যেকটি ওয়ার্ডে বিএনপির কর্মী সংখ্যা বাড়াতে হবে। যোগ্য লোকদের বিএনপির কর্মী হিসেবে দলে যুক্ত করতে হবে। বিএনপি একা চলার দল নয়। দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে বিএনপির পতাকাতলে নিয়ে আসার নাম হচ্ছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া দল বিএনপি।”
দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়ে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, “গ্রাম-গঞ্জের যেসব দরিদ্র পরিবারের শিশুরা অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না বা স্কুলে যাচ্ছে না, আপনারা তাদের চিহ্নিত করুন এবং তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। সরকার তাদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে পড়াশোনা করিয়ে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহযোগিতা করবে।” তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, “অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসাসেবার জন্য সহযোগিতা করবে সরকার।” হাকিমপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফিরদৌস রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সম্মেলনে জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশে যাতে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে এবং কেউ যেন নতুন করে ফ্যাসিস্ট হয়ে না ওঠে, সেজন্য একটি কার্যকর রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, শুধুমাত্র বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে দেশ গড়ার কাজে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আজ বুধবার বনানীর হোটেল শেরাটনে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের এক প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইনস্টিটিউট অব হযরত মোহাম্মদ (সা.) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই বিপ্লবের সময় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যাদের চোখের আলো আছে, তাদের অনেকেই এই চরম অবিচার ও হত্যাকাণ্ড দেখেও না দেখার ভান করছেন। তিনি এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, "আপনারা আল্লাহ প্রদত্ত চোখ খুলুন, আর তা না পারলে অন্তরের চোখ খুলুন। অন্ধকে আলো দেওয়ার মতো মহৎ কাজের চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না।"
অনুষ্ঠানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের প্রতি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মনোযোগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, "যাঁদের চোখের আলো নিভে গেছে, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব আরও বাড়ানো প্রয়োজন। আমরা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাঁদের প্রতিভা বিকাশে আরও কী কী করা যায়, সে বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর সাথে কথা বলব।" তিনি এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়ায় আয়োজক প্রতিষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে আসাদুজ্জামান বলেন, ক্রসফায়ারের নামে রাতের অন্ধকারে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, অনেকের স্বজন আজও নিখোঁজ। অথচ একদল মানুষ এখনও বলছেন কিছুই হয়নি। এই মানসিকতাকে তিনি আত্মকেন্দ্রিকতা ও নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, "সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা ভুল করলে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিন।"
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জননী ও জন্মভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আমাদের এমন এক পথে হাঁটতে হবে যেখানে ফ্যাসিবাদের কোনো স্থান থাকবে না। অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এম নুরউদ্দিন খানসহ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কূটনীতিক ও ব্যাংক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিযোগিতায় কোরআন তেলাওয়াত, হামদ-নাত ও রচনা প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন মন্ত্রী।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ পর্যায়ের তিন কর্মকর্তাকে বদলি ও অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সংস্থাটির প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হাসানের সই করা এক কার্যালয় আদেশে এ তথ্য জানা গেছে।
আদেশে মহাপরিচালক মো. মোজাম্মেল হককে মহাপরিচালক (মানিলন্ডারিং) থেকে প্রতিরোধ বিভাগের মহাপরিচালক পদে বদলি করা হয়েছে।
অন্যদিকে মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীকে মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) দায়িত্বপালনের পাশাপাশি তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মানিলন্ডারিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পরিচালক দাউদ হোসেন চৌধুরীকে পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) পদ থেকে পরিবর্তন করে তাকে পরিচালক দৈনিক ও সাম্প্রতিক অভিযোগ সেলে বদলি করা হয়েছে।
জনস্বার্থে এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীকে একটি জনবান্ধব ও সেবামূলক সংস্থায় রূপান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি মন্তব্য করেন যে, কোনো বড় পরিবর্তনই রাতারাতি সম্ভব নয়; দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট ও জঞ্জাল পরিষ্কার করে নতুন গতি আনতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। আজ বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এক মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের যেকোনো প্রান্তেই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, সেখানেই প্রশাসন দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি রংপুরের সাম্প্রতিক একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা উল্লেখ করে জানান, খবর পাওয়া মাত্রই পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেখানে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
পুলিশের চলমান সংস্কার প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও বলেন, “পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে আরও জনবান্ধব বাহিনীতে পরিণত হবে। তারা বর্তমানে জনগণের সেবায় আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে এই আমূল পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন দেখতে হলে দেশবাসীর ধৈর্য ও আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।” সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশ বাহিনীকে সব ধরনের লজিস্টিক ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বিএনপি আয়োজিত এই মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে দলটির শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে দেশ ও জাতির শান্তি-সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। সরকারের এই মেয়াদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের গত ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বড় ধরনের তথ্য বিভ্রাট ধরা পড়েছে। গত সোমবার (২৪ আগস্ট) আয়োজিত এক মিডিয়া সংলাপে সিপিডি দাবি করেছিল যে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং এতে ৬২ হাজার মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, এই তথ্যটি আসলে বর্তমান সময়ের নয়, বরং এক বছর আগের।
সিপিডির প্রকাশিত প্রতিবেদনের ১১ নম্বর স্লাইডে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলে এই কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে। সংস্থাটি এই তথ্যের উৎস হিসেবে গত ২২ আগস্ট একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকে উদ্ধৃত করেছিল। কিন্তু অধিকতর যাচাইয়ে দেখা গেছে, উক্ত সংবাদটি প্রকৃতপক্ষে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ অন্য একটি জাতীয় দৈনিকের প্রকাশিত সংবাদের হুবহু অনুকরণ, যা বর্তমান সরকারের আমলের চিত্র নয়।
এই ভুলের বিষয়টি নজরে আসার পর গতকাল রাতে সিপিডি একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করে। বিবৃতিতে সংস্থাটি স্বীকার করেছে যে, প্রতিবেদন তৈরির সময় তথ্যের মূল উৎস সঠিকভাবে যাচাই না করায় এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। সিপিডি এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও অসাবধানতাবশত ভুলের জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে।
বিবৃতিতে সিপিডি আরও জানায়, “অসাবধানতাবশত বিভ্রান্তি সৃষ্টির ফলে আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি।” পাশাপাশি সংস্থাটির গবেষণা দল ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এক বছর আগের তথ্যকে বর্তমান সরকারের আমলের বলে চালিয়ে দেওয়ায় জনমনে এবং গণমাধ্যম কর্মীদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, তা নিরসনে এই স্পষ্টীকরণ প্রদান করা হয়েছে। মূলত স্বচ্ছতা বজায় রাখতেই সংস্থাটি দ্রুত তাদের ভুল স্বীকার করল।
মানবজাতির মুক্তির দিশারি, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আজ সারা দেশে যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হচ্ছে। ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই রবিউল আউয়াল মহানবী (সা.) মক্কার কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ ৬৩ বছরের কর্মময় জীবন শেষে একই তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন।
আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকারের যুগে আলোর মশাল হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতার মূর্ত প্রতীক। নবুয়ত লাভের পর দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি ইসলামের শান্তির বাণী প্রচার করেন এবং মদিনায় ইনসাফ ও সাম্যের ভিত্তিতে একটি আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ক্ষমা, ধৈর্য এবং মানবিক গুণাবলি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হিসেবে আজও বিশ্ববাসীর কাছে স্বীকৃত।
পবিত্র এই দিনটি উপলক্ষে বাংলাদেশে সরকারি ছুটি পালিত হচ্ছে। সারা বিশ্বের মুসলমানদের ন্যায় দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, কোরআনখানি এবং আলোচনা সভার মাধ্যমে প্রিয় নবীর প্রতি গভীর মহব্বত ও শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন। অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ নফল নামাজ ও রোজা আদায়ের মাধ্যমেও দিবসটি অতিবাহিত করছেন। রাজধানীর প্রধান সড়ক ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কালেমাখচিত পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছে।
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসীসহ বিশ্ব মুসলিম উম্মাহকে মোবারকবাদ জানিয়েছেন। বাণীতে তাঁরা মহানবী (সা.)-এর শান্তি, সাম্য ও সহনশীলতার আদর্শ অনুসরণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিময় সমাজ গড়ার আহ্বান জানান।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই পক্ষকালব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ও আলোচনার উদ্বোধন করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন দিনটি পালনে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। প্রিয় নবীর আদর্শকে ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত করার মধ্যেই মানবতার প্রকৃত মুক্তি নিহিত বলে মনে করছেন ধর্মপ্রাণ মুমিনরা।
ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগে ওয়াংচুক-কে আজ বুধবার ভোরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সিঙ্গাপুর থেকে ভুটান ফেরার পথে রাজার বহনকারী বিশেষ বিমানটি ঢাকায় সাময়িক যাত্রাবিরতি করলে রাষ্ট্রপতি বিমানবন্দরে উপস্থিত হয়ে তাঁকে স্বাগত জানান।
প্রায় এক ঘণ্টার এই সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির সময় বিমানবন্দরের ভিভিআইপি লাউঞ্জে দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষাতে ভুটানের রাজা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভকামনা জানান। রাষ্ট্রপতিও বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে রাজাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা প্রদান করেন।
আলোচনাকালে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে ভুটানের প্রথম স্বীকৃতির ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, “ভুটান সবসময় আমাদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে আছে।” এ সময় তিনি ভুটানের বর্তমান রাজার পিতার বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ মমত্ববোধের কথাও গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। পারস্পরিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ভুটানের রাজা।
ভুটানের রাজা তাঁর উচ্চাভিলাষী ও দূরদর্শী প্রকল্প ‘গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি’ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন এবং এই উদ্যোগে বাংলাদেশের সক্রিয় সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ কামনা করেন। রাষ্ট্রপতি এই প্রকল্পের প্রশংসা করে জানান যে, টেকসই উন্নয়ন ও আঞ্চলিক সমৃদ্ধি অর্জনে রূপান্তরমূলক যেকোনো উদ্যোগে বাংলাদেশ ভুটানের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে সদাপ্রস্তুত।
সাক্ষাৎ শেষে রাষ্ট্রপতি ভুটানের রাজা ও রাজপরিবারের সদস্যদের সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফরের আমন্ত্রণ জানান। জবাবে রাজাও রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে ভুটান সফরের আমন্ত্রণ জানান। এই সৌজন্য সাক্ষাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানসহ দুই দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বিশেষ বিমানটি ভুটানের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করে।
দেশের জ্বালানি সংকট এখন আর শুধু গ্যাস বা বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, গৃহস্থালির ব্যয় এবং এলপিজি বাজারে। একদিকে গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন কমছে ও বন্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে বাসাবাড়িতে বাড়ছে বিকল্প জ্বালানির খরচ। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেক পরিবার বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করলেও বাড়তি বিদ্যুৎ বিল ও বিদ্যুৎ সংকটে সেই ভরসার বৈদ্যুতিক চুলাতেও তৈরি হচ্ছে নতুন চাপ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ঘাটতি, কেন্দ্রের কারিগরি সমস্যা ও গ্রিড সীমাবদ্ধতায় লোডশেডিংও বেড়েছে। একই সময়ে বাড়তি আমদানির পরও এলপিজি বাজারে তৈরি হয়েছে সরবরাহ সংকট।
দেশের শিল্প খাত দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের চাপ, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রয়াদেশের অনিশ্চয়তায় গভীর সংকটে পড়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ মাসে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর তিন শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। তবে সাময়িকভাবে বন্ধ ও অর্ধেক সক্ষমতায় চলা কারখানা ধরলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বন্ধ কারখানার তুলনায় কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। স্থায়ীভাবে বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, সার্ভিস বেনিফিট ও ক্ষতিপূরণ নিয়েও সংকট তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানান, আগামী দুই বছর গ্যাস ও বিদ্যুতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই—এমন ধারণা থেকেই তিনি তার মালিকানাধীন একটি পার্টিকেল বোর্ড মিল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর আগে জ্বালানি সংকটে তার পাঁচটি স্পিনিং মিলও বন্ধ হয়েছে।
আগস্ট ২০২৪ থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিজিএমইএ’র ৪৯৯টি, বিকেএমইএ’র ২৩৫টি, বিটিএমএ’র ১৬৬টি এবং বেপজার ৫৯টি সদস্য কারখানা বন্ধ হয়েছে। অর্থাৎ এসব সংগঠনের সদস্য কারখানার মধ্যেই বন্ধের সংখ্যা ৯৫৯টি। অন্যান্য শিল্প খাতেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এক হাজারের বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো জানিয়েছে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহ ও কার্গো গ্রহণের জটিলতায় গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেল বোর্ড ও সিরামিক শিল্প। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে।
উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার ভাড়া, শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণের সুদসহ স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। আবার কম সক্ষমতায় কারখানা চালালেও প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি ব্যয় ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় উদ্যোক্তারা লোকসানে উৎপাদন চালাবেন, নাকি কারখানা বন্ধ রাখবেন—সেই কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন।
কারখানা বন্ধ হলে নগদ অর্থপ্রবাহ কমে যায়, কিন্তু ব্যাংকের কিস্তি ও সুদের দায় থেকে যায়। শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধ হলেও ব্যাংকের দায় পরিশোধের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে অবশিষ্ট সম্পদ বিক্রি করেও পাওনা পরিশোধ করতে হতে পারে।
সিপিডির পর্যালোচনায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। অর্থাৎ পুরোনো কারখানা যেমন বন্ধ হচ্ছে, তেমনি নতুন শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির গতিও কমছে।
একটি কারখানা বন্ধ হলে শুধু শ্রমিক নয়—পরিবহন শ্রমিক, কাঁচামাল সরবরাহকারী, স্থানীয় ব্যবসায়ী, খাবারের দোকান ও ভাড়াবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শিল্পাঞ্চলে সংকটের প্রভাব দ্রুত স্থানীয় অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক দশমিক ২৮ শতাংশে নেমেছে।
জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি ওষুধ শিল্পেও তৈরি হয়েছে বড় সংকট। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় থাকা ১১৭টির মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে ওষুধের দাম সে অনুযায়ী সমন্বয় না হওয়ায় উৎপাদকরা লোকসানের মুখে পড়েছেন।
বাপির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে এসব ওষুধের অনেকগুলোর উৎপাদন খরচ বিক্রয়মূল্য থেকে উঠে আসে না। মূল্য সমন্বয় না হওয়ায় প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।’
বাপির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, ‘ওষুধ শিল্পকে শুধু মূল্য নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ তার মতে, বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে এবং দাম নির্ধারণে স্বচ্ছ, বাস্তবসম্মত ও নিয়মিত সমন্বয়যোগ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনীয় ওষুধ সুলভ মূল্যে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। সরকার চাইলে ভর্তুকি বা সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে কম দামে এসব ওষুধ সরবরাহ করতে পারে। তবে ভর্তুকি ছাড়া বেসরকারি উৎপাদনকারীদের দীর্ঘদিন কম দামে ওষুধ উৎপাদনের প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।’
শিল্পের পাশাপাশি গ্যাস সংকটে ভোগান্তি বেড়েছে সাধারণ মানুষের। রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আজমল হোসাইন জানান, আড়াই মাস ধরে তার বাসায় গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে তিনি সাত হাজার টাকা দিয়ে বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছেন। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করলেও বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের কারণে তার সংসারের খরচ বেড়েছে। তার ভাষায়, আগে বিদ্যুৎ বিল ১ হাজার ৫০০ টাকা এলেও এখন তা বেড়ে ২ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট থেকে বাঁচতে যে বৈদ্যুতিক চুলার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে, বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের কারণে সেই বিকল্পও সাধারণ মানুষের জন্য নতুন ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস না থাকায় নিরাপদ পানি নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন তিনি। পানি ফুটিয়ে খেতে না পারায় তার দুই সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছিল বলে জানান আজমল।
মিরপুরের আয়েশা সিদ্দিকা জানান, চার মাস ধরে গ্যাসের সমস্যা চলছে। তিনি সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন। আগে তার বিদ্যুৎ বিল প্রায় ১ হাজার টাকা হলেও এখন ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা আসে। তার বক্তব্য, গ্যাসের বিল দেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির জন্যও বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করেও সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি মিলছে না।
পূর্ব শেওড়াপাড়ার শান্তা রানী জানান, গ্যাস না থাকায় মাটির চুলা বানিয়ে রান্না করছেন। ভেজা লাকড়ি জ্বলে না। বেলা দুইটার দিকে সামান্য গ্যাস এলে রান্না শুরু করেন। তার ভাষায়, সকালে রান্না না হওয়ায় দুপুরের খাবার খেতেও অনেক সময় বিকাল হয়ে যায়।
কালশীর বাসিন্দা শিল্পী খাতুন জানান, কয়েকটি পরিবার মিলে একটি টিনশেড বাসায় থাকায় পালা করে রান্না করতে হয়। বাড়িওয়ালা বৈদ্যুতিক ও লাকড়ির চুলা ব্যবহার করতে দেন না। তার স্বামী রিকশা চালান এবং অনেক সময় দৈনিক আয়ের বড় অংশ খাবার কিনতেই চলে যায়। শিল্পীর ভাষায়, রান্না না হইলে বাইরে খাইতে হয়। তখন দুই আড়াইশ টাকা চইলা যায়।
মিরপুর-১২ এর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান শিহাব জানান, দেড় মাস ধরে চুলায় গ্যাস নেই। রান্না করতে না পারলেও মাসিক বিল দিতে হচ্ছে এবং বাইরে থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। এতে তার খরচ বেড়েছে এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যাও বেড়েছে। কাজীপাড়ার আরেক শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান জানান, সিলিন্ডার ব্যবহারে তাদের চারজনের বাসায় জনপ্রতি প্রায় ৭০০-৮০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে।
দেশে প্রায় নয় বছর ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমছে। ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। গত ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে সরবরাহ বাড়লেও নতুন এলএনজি কার্গোর সংকটে গত বুধবার এক্সিলারেটের সরবরাহ আবার বন্ধ হয়ে যায়। পরে নতুন কার্গো আসায় সরবরাহ শুরু হলেও সংকট পুরোপুরি কাটতে সময় লাগবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের মতে, জ্বালানি ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণ, সঞ্চালন ও গ্রিডের সীমাবদ্ধতা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুতের চাহিদার সম্মিলিত প্রভাবেই বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি এবং বিভিন্ন কেন্দ্রে কারিগরি ও রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে উৎপাদন কমছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডিপিডিসি ও ডেসকোর এলাকায় লোডশেডিং সমন্বয় করে সাশ্রয় হওয়া বিদ্যুৎ গ্রামাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকায় পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, এতে ঢাকার বাইরে শিল্প-কারখানাসহ গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহকদের সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে এবং গ্রামাঞ্চলেও দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের চাপ কমানো সম্ভব হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে ] মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকাল ৩টার দিকে ১৬ হাজার ১৭৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৯১৭ মেগাওয়াট; লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ২৫৯ মেগাওয়াট।
জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা এবং গ্রিডের সীমাবদ্ধতা দূর হলে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
পাইপলাইনে গ্যাসের ঘাটতির কারণে ভোক্তাপর্যায়ে সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালে এলপিজি আমদানি ২৫ শতাংশের বেশি বাড়লেও বাজারে সংকট কাটেনি। ভারত মহাসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানি করা এলপিজির চালান বিলম্বিত হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘এলপিজি ব্যবসার উদ্যোক্তারা চরম বিপাকে পড়েছেন।’ তার মতে, ফ্র্যাঞ্চাইজিরা বড় আমদানিকারকদের কাছ থেকে এলপিজি নিয়ে বোতলজাত করে বাজারজাত করেন। আগে ওমান, দুবাই ও কাতার থেকে এলপিজি এলেও বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে গেছে।
সান গ্যাস লিমিটেডের এরিয়া হেড একরামুল হক জুয়েল বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়ার কারণে জাহাজ আসতে না পারায় সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না।’ তার দাবি, মূল আমদানিকারক বা বোটলাররা দাম না বাড়ালেও সরবরাহ কম থাকার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটর অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। তিনি জানান, সরকার নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৯৮ টাকা হলেও কিছু ডিলার তা ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকায় বিক্রি করছেন।
বিইআরসি গত ২ আগস্ট ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করে, যা আগের মাসের তুলনায় ৭০ টাকা বেশি। অন্যদিকে সরকারি এলপিজিএলের সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রয়েছে। এলপিজির মূল্য নির্ধারণে সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের চুক্তিমূল্য বা সৌদি সিপি বিবেচনা করা হয়।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ আগস্ট পর্যন্ত ৮ লাখ ৩৫ হাজার ২৫৬ টন এলপিজি উপাদান আমদানি হলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে আমদানি হয়েছে ১১ লাখ ৪১ হাজার ৭৮৪ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৩ লাখ ৬ হাজার ৫২৮ টন।
বিএম এনার্জির নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান বলেন, ‘এখনো সংকট নেই’, তবে ভারত মহাসাগরের সাইক্লোন পরিস্থিতির কারণে তাদের একটি জাহাজ নির্ধারিত ২০ আগস্টের পরিবর্তে ২৫ আগস্ট (গতকাল মঙ্গলবার) আসবে। তার মতে, আপাতত সরবরাহে ঘাটতি নেই। অন্যদিকে যমুনা স্পেসটেক জয়েন্ট ভেঞ্চারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, বাজারে কিছুটা সমস্যা রয়েছে এবং একটি জাহাজ এলে পরিস্থিতির কিছুটা লাঘব হতে পারে।
শিল্প উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সাময়িকভাবে গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলা, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
উদ্যোক্তারা গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত ও নির্ভরযোগ্য রোডম্যাপ চান—কোথায় কতদিন সংকট থাকবে, কোন শিল্পাঞ্চলে কতটুকু সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের পরিকল্পনা কী, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
সাময়িক আর্থিক সংকটে থাকা সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যাংক ঋণ পুনর্বিন্যাস, কার্যকর মূলধন সহায়তা ও ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রয়োজন রয়েছে। কারণ কারখানা একবার স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে দক্ষ শ্রমিক, সরবরাহকারী ও ক্রেতার নেটওয়ার্ক হারিয়ে যায় এবং পুনরায় চালু করা কঠিন হয়ে পড়ে।
দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটকে আর শুধু গ্যাস-বিদ্যুতের সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ঘাটতি, এলপিজির সরবরাহ জটিলতা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের চাপ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সংকট। গত দুই বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ সুদ, ডলার সংকট ও আমদানি জটিলতার ওপর নতুন করে যোগ হয়েছে জ্বালানি সংকট।
ফলে একজন উদ্যোক্তার কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত এখন আর কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যাংকের ঋণ, নতুন বিনিয়োগ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং দেশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতা।
বিশেষজ্ঞ ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মতামত অনুযায়ী, নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের রোডম্যাপ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ, শিল্পে অগ্রাধিকারভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ, সম্ভাবনাময় শিল্পে ঋণ পুনর্বিন্যাস ও কার্যকর মূলধন সহায়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ কারখানা বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় চালুর চেয়ে বন্ধ হওয়ার আগেই তাকে টিকিয়ে রাখা অনেক বেশি কার্যকর।
চীনের তৈরি জে-১০সিই বহুমুখী যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে আলোচনার জন্য খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহিদ উর রহমান এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বাংলাদেশে আলোচনা চলছে। সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে এই যুদ্ধবিমান ব্যবহারের বিষয়টিও বাংলাদেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। আমরা সম্ভবত এমন আলোচনা দেখেছি যে বাংলাদেশ জে-১০ যুদ্ধবিমান কিনতে পারে।’
তিনি জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে সাম্প্রতিক ব্যবহারের অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এই বিমান নিয়ে বাংলাদেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় চীনের তৈরি জে-১০ যুদ্ধবিমান ভারতীয় রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল এবং বিষয়টি এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘রাফাল বিশ্বের অন্যতম আধুনিক সাড়ে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত। এর বিপরীতে জে-১০ যুদ্ধক্ষেত্রে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।’ তাই বাংলাদেশ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং এ বিষয়ে সরকার সামনে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জাহিদ উর রহমান আরও বলেন, ‘একই মানের ইউরোপীয় যুদ্ধবিমান, যেমন রাফাল বা ইউরোফাইটার টাইফুনের তুলনায় চীনা যুদ্ধবিমান তুলনামূলকভাবে অনেক কম দামে পাওয়া যায়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকার জনগণের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
এদিকে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার পাশাপাশি চীনের তৈরি অ্যাটাক হেলিকপ্টার নিয়েও আলোচনার জন্য একটি কমিটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করেছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা।
বাংলাদেশের ‘নতুন স্বাধীনতা’ প্রসঙ্গে জাহিদ উর রহমান বলেন, ‘সরকার এটিকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে দেখে না এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সঙ্গে ২০২৪ সালের ঘটনাকে তুলনা করার কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ ২০২৪ ও ১৯৭১ সালকে একই পাল্লায় রেখে ২০২৪ সালকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলার চেষ্টা করেছেন, যা ‘‘সম্পূর্ণ বোকামি’’।’
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘নতুন স্বাধীনতা’ বলতে মূলত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাকে বোঝানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। এখন নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ৫ আগস্টের আগে জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার মতো বিষয়ে আলোচনা করাও সম্ভব হতো না।
বাংলাদেশের আইনি ও বিচারিক সংস্কার এবং সংবিধান সংশোধনসহ সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় ইউএনডিপি পূর্ণ সহযোগিতা করতে চায় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার অফিসকক্ষে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসেন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর আবাসিক প্রতিনিধি স্টিফেন রড্রিগেজ। এ সময় তিনি সহযোগিতার কথা জানান।
বৈঠকে সাংবিধানিক সংস্কার, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা, পুলিশের সামর্থ্য বৃদ্ধি, গুজব ও অপতথ্য রোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, ‘আমরা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে চাই।’
তিনি মন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আপনি সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি মনোনীত হয়েছেন জেনে আমরা আনন্দিত। আপনি চাইলে আমরা এ প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে আগ্রহী।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইউএনডিপির ধারাবাহিক সহায়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি করার আহ্বান জানান। বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের (রোহিঙ্গা) জন্য ইউএনডিপির সহায়তার কথা উল্লেখ করে আবাসিক প্রতিনিধি জানান, ক্যাম্প এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা (যেমন-পাহাড়ধস প্রতিরোধ) এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ইউএনডিপি কাজ করে যাচ্ছে।
এ সময় মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান অবকাঠামোর যথোপযুক্ত উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন চাই, তবে বৃহত্তর স্বার্থে সেখানে নতুন করে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করতে চাই না।’
আবাসিক প্রতিনিধি জানান, ইউএনডিপি বাংলাদেশ পুলিশের পেশাগত দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধিতে নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ, সংঘাত ও বিরোধ নিষ্পত্তিসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। মন্ত্রীও এ সময় পুলিশের দক্ষতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধিতে ইউএনডিপির সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার প্রতিরোধ প্রসঙ্গে আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, ‘বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন গুজব, অপতথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলো কার্যকরভাবে রোধে আমরা তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছি। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিতে চাই, যাতে কোনো লঙ্ঘন ঘটলে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়।’
মন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, ‘সাইবার সুরক্ষা আইন ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। আপনারা এ আইনের সফল বাস্তবায়নে লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করতে পারেন।’
প্রস্তাবিত মানবাধিকার কমিশন আইন সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে এবং জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনে এটি পাস হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আইনটি প্রণয়নে ইউএনডিপি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিদেশি মিশন, উন্নয়ন অংশীদার, পত্রিকার সম্পাদক ও আইনজীবীসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও ধর্মীয় অনুভূতিকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। আশা করা যায়, এটি একটি যুগোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য আইন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
বৈঠকে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশে কোনো গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি।’ এ সময় নিজের গুম হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’’-এর খসড়াও মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন লাভ করেছে।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সঠিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সব সময় বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে না। বাংলাদেশ একটি উদার ও ধর্মীয় সহনশীল দেশ এবং ইউএনডিপি এ ইতিবাচক ভাবমূর্তি বাস্তবায়নেও কাজ করতে আগ্রহী।’
সাক্ষাৎকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, রাজনৈতিক-১ অধিশাখার যুগ্ম সচিব রেবেকা খান এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড পার্টনারশিপ সাপোর্ট স্পেশালিস্ট সাইফ ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
দেশের চিকিৎসক সংকট দূর করতে আয়োজিত ৪৮তম বিসিএস (বিশেষ) থেকে আরও ১৮৪ জন চিকিৎসককে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নবনিয়োগ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সুপারিশের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষে এই সম্পূরক গেজেট প্রকাশ করল সরকার।
নতুন নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের মধ্যে সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে ১৯ জন এবং সহকারী সার্জন পদে ১৬৫ জন রয়েছেন। জাতীয় বেতনকাঠামো ২০১৫ অনুযায়ী তাদের ২২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৬০ টাকা বেতনক্রমে পদায়ন করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নবনিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের আগামী ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত তারিখে যোগদান না করলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নিয়োগ বাতিল বলে গণ্য হবে।
চাকরিতে যোগদানের পর চিকিৎসকদের দুই বছর শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের বনিয়াদি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে। শিক্ষানবিশকাল শেষে তিন বছরের মধ্যে চাকরি ছাড়লে প্রশিক্ষণের সমুদয় খরচ ফেরত দিতে হবে। এর জন্য যোগদানের সময়ই ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে বন্ড জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া যোগদানের সময় সম্পত্তির হিসাব বিবরণী এবং যৌতুক না নেওয়ার অঙ্গীকারনামা দাখিল করতে হবে।
সারা দেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে ২০২৫ সালে ৩ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের উদ্দেশ্যে এই বিশেষ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। পরীক্ষা ও মৌখিক সাক্ষাৎকার শেষে পিএসসি প্রয়োজনীয়সংখ্যক প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে।
সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রথম গেজেট প্রকাশ করেছিল। প্রথম গেজেটে ৩ হাজার ২৬৩ চিকিৎসককে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা গত ১ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরিতে যোগদান করেন।
৯ বছরেও রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার।
তিনি বলেন, ‘৯ বছরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন না হওয়া সত্যিই উদ্বেগজনক। ইউরোপ চায় তাদের প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছায়, শান্তি ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে হোক। আর আপনারা জানেন, ২০২৫ সালে ৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা দিয়েছে ইউরোপ। চলতি বছরেও তা অব্যাহত থাকবে।’
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর অনুষ্ঠানে ইইউ-বাংলাদেশ সম্পর্কের নানা বিষয়ে কথা বলেন রাষ্ট্রদূত। এ সময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ব্যাপারে ইউরোপের ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন মিলার।
তার ভাষায়, বিশাল জনসংখ্যার কারণেই বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য স্বর্গভূমি। কিন্তু সেটা কাজে লাগানোর জন্য বিশ্বের কাছে ইতিবাচকভাবে বাংলাদেশকে পরিচিত করতে হবে। বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর তিন বছর পর্যন্ত কর সুবিধা পাবে। এরপরেও যেন পথচলা মসৃণ হয়, সেই চেষ্টা আমরা করব। এ ব্যাপারে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।
পরে প্রশ্নোত্তর পর্বে মিলার বলেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র সঠিক পথে আছে।’ ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘সারাবিশ্বে গণতন্ত্রের যে চর্চা সেটাতেই আছে বাংলাদেশ। প্রত্যেকের মতপ্রকাশ করতে পারছে। এই সবুজ সংকেতগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে হবে। তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজানোর এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।’
এ ছাড়া ইউরোপে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে দালাল, প্রতারক, মানবপাচারকারীদের এই চক্রকে ভাঙতে সরকারকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান রাষ্ট্রদূত।