খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছিল ৫৩ শতাংশ, ৮ ফেব্রুয়ারি ১০ শতাংশ কমিয়ে করা হয়েছে ৪৩ শতাংশ। শুল্ক কমানোর পরও দাম কমেনি খেজুরের। উল্টো দাম বেড়েছে। যদিও বন্দর থেকে খেজুর খালাসের পরিমাণও বেড়েছে। গত কয়েক দিনে ৬০৫ কনটেইনার খেজুর খালাসের কার্যক্রম চলছে এবং প্রতিদিনই খালাস অব্যাহত রয়েছে।
জানা গেছে, আগামী ১২ মার্চ পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রমজান মাসজুড়ে সিয়াম সাধনা করেন। দিনভর রোজা রাখার পর সন্ধ্যায় ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে খেজুর। খেজুর ছাড়া এখন আর ইফতারের কথা ভাবা যায় না। প্রায় সব রোজাদারই খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এ কারণে রমজান মাসে চাহিদা বেশি থাকা পণ্যগুলোর একটি খেজুর। পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে চলতি মাসে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি বাজারে তদারকি ও বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা কোনো কাজেই আসছে না। গত বছরের তুলনায় বর্তমানে দেশের বাজারে খেজুরের দাম প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি আদেশে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনার ঘোষণা দেয়। এর আগে খেজুর আমদানিতে সর্বমোট ৫৩ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য প্রতি টন ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৭৫০ ডলার। এর সঙ্গে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ ও ভ্যাট ১৫ শতাংশ। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম কর ৫ শতাংশ হারে দিতে হচ্ছে। এতে বর্তমানে সর্বমোট ৪৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত রোজার আগে মানভেদে প্রতি কেজি খেজুরে শুল্ক দিতে হতো ৫ দশমিক ৪৫ থেকে ২১ দশমিক ৮৪ টাকা। তবে এবার খেজুরকে ‘বিলাসীপণ্যের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে খেজুরের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫৩ শতাংশ করা হয়। ফলে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বেড়ে গেছে। এবার শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫৪ থেকে ২০৮ টাকা। মূলত শুল্কের প্রভাব পড়েছে খেজুরের দামে। গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজি খেজুরে জাতভেদে দাম বেড়েছে ১০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত। দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া খেজুরের মধ্যে রয়েছে দাবাস, জাহিদি, বরই ও গলা খেজুর।
চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি গলা বা বাংলা খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা, জাহিদি খেজুর ২৪০-২৬০ ও মানভেদে দাবাস খেজুর ৪৫০-৫৫০ টাকায়। এ ছাড়া বরই খেজুর মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪৪০-৫৪০ টাকায়। গত বছর এসব খেজুরের দাম ছিল বর্তমান দরের অর্ধেকেরও কম।
এদিকে অভিজাত শ্রেণির কাছে পছন্দের খেজুরের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের মেডজুল, মাবরুম, আজওয়া ও মরিয়ম। গত এক মাসের ব্যবধানে এসব খেজুরের দাম কেজিতে ২০০-৩০০ টাকা বেড়েছে। জাম্বো মেডজুল মানভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, সাধারণ মেডজুল ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০, মাবরুম খেজুর ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০, আজওয়া খেজুর মানভেদে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো জাতের মরিয়ম বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। এ ছাড়া কালমি মরিয়ম ৮০০-৯০০ টাকা, সুফরি মরিয়ম ৭৫০-৮০০, আম্বার ও সাফাভি ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ ও সুক্কারি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৮০০-৯০০ টাকায়।
খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালে রোজার আগে জাহিদি জাতের খেজুরের দাম ছিল কার্টনপ্রতি (১০ কেজি) ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। শুল্ক আরোপের কারণে দাম বাড়ার পর গত বছরের শেষ সপ্তাহেও একই জাতের খেজুরের দাম ছিল কার্টনপ্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকা। তবে এখন ১০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েও এই জাতের খেজুরের কার্টন হাঁকা হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
পাইকারি ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি ৫ কেজির এক কার্টন মেডজুল খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার টাকায়। গত বছর এ খেজুর বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। অন্যদিকে সাধারণ খোলা খেজুর প্রতি কেজি ফেব্রুয়ারির শুরুতে কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ছিল ১২৮-১৩০ টাকা। বর্তমানে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৫৫ টাকায়।
পাইকারি বাজার সূত্রে জানা গেছে, বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জাহিদি জাতের খেজুর। এক বছর আগে প্রতি কেজি খেজুর খুচরা পর্যায়ে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত। শুল্ক কমানোর পর বর্তমানে এ খেজুর খুচরায় বিক্রি করতে হবে ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য আমদানি করা খোলা (বস্তায় বিক্রি হওয়া ভেজা খেজুর) রোজা আসার আগেই কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ১৫৫ টাকায় উঠে গেছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে এ মানের খেজুর বিক্রি করতে হবে কমপক্ষে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায়। অবশ্য গতকাল বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল হক টিটু ঘোষণা দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে খেজুর পৌঁছে দিতে বস্তায় আসা জাহিদি খেজুরের দাম কমানো হবে। আজ রোববার (৩ মার্চ) এই খেজুরের দাম কমানোর ঘোষণা আসার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি খেজুর বন্দর থেকে খালাস নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগে বন্দর থেকে দিনে খেজুরভর্তি ছয় কনটেইনার খালাস হলেও এখন সেটা ৭০ কনটেইনারে গিয়ে টেকেছে। কিন্তু দাম কমছে না।
ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকার শুল্ক কমানোর পর ব্যবসায়ীরা খেজুর খালাসে তোড়জোড় শুরু করেছে। শুল্ক কমানোর পরও ভোক্তারা কম দামে খেজুর কিনতে পারছেন না। শুল্ক কমানোর পর পর্যাপ্ত আমদানি হলেও দাম কেন কমছে না বিষয়টি তদারকি করতে হবে। তদারকি না করলে রোজায় খেজুর কিনতে পারবে না ভোক্তারা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২২ হাজার ৬৬৩ টন খেজুর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস করেছেন আমদানিকারকরা। ১৪৫ দিনের মধ্যে গত ১৫ দিনেই বেশি খেজুরের চালান খালাস হয়েছে। ২৮ ধরনের খেজুর দেশের ৮২টি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, মিসর, আলজেরিয়া, নামিবিয়া, তিউনিশিয়া ও আফগানিস্তান থেকে আমদানি করেছে।
জানা গেছে, চার মাস আগে খেজুর আমদানি করলেও শুল্ক কমবে এ আশায় ব্যবসায়ীরা পণ্যটি চট্টগ্রাম বন্দরে গুদাম করে রেখেছিলেন। ফলে বেসরকারি ১৯টি ডিপোতে ১ হাজার কনটেইনার (প্রতি কনটেইনারে ২২-২৪ হাজার কেজি খেজুর থাকে) খেজুর পড়ে ছিল। এখন খেজুরভর্তি ৬০৫টি কনটেইনার খালাস চলছে। এখনো খেজুরভর্তি ৩৯৫টি কনটেইনার খালাসের উদ্যোগ নেয়নি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার কাজী ইরাজ ইশতিয়াক বলেন, প্রচুর পরিমাণে খেজুর খালাস হচ্ছে। প্রতিদিনই খালাস করছেন আমদানিকারকরা। তিনি বলেন, খেজুরের শুল্ক ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
তিনি জানান, খেজুরের চারটি ক্যাটাগরি রয়েছে। একেকটি ক্যাটাগরির একেক রকম শুল্কহার হয়। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির প্রবণতাও রয়েছে। অনেক সময় উচ্চ শুল্কহারে খেজুর এনে কম শুল্কহারে ঘোষণা দেওয়া হয়। এমন বেশ কিছু ঘটনাও ঘটেছে। এ জন্য আমরাও সতর্ক আছি, যেন সরকার রাজস্ব বঞ্চিত না হয়।
উচ্চ শুল্কহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা এনবিআর নির্ধারিত, এ ব্যাপারে আমাদের বলার বা করার কিছু নেই। আমরা নির্ধারিত শুল্ক নিয়ে খালাসের ব্যবস্থা করি। খেজুর বিলাসী পণ্য কি না, এ বিষয়েও তিনি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
খাতুনগঞ্জের ডেটস অ্যান্ড ড্রাই ফ্রুটস আমদানিকারক মো. ওমর ফারুক বলেন, খেজুর আমদানিতে কাস্টমস ট্যাক্স ১০ শতাংশ কমালেও অন্যান্য শুল্ক ঠিক রেখেছে এনবিআর। ফলে উচ্চমাত্রায় ট্যাক্স দিয়েই আনতে হচ্ছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সামান্য এ শুল্ক কমানোয় খেজুরের দামে প্রভাব পড়বে না।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার সুলতান আরেফিন বলেন, শুল্ক কমানোর পর থেকে আমদানিকারকরা খেজুর খালাস নিতে শুরু করেছেন। বর্তমানে খেজুর খালাসের পরিমাণও বেড়েছে। আগে প্রতিদিন গড়ে খেজুরভর্তি ছয় কনটেইনার খালাস হলে এখন সেটি ৭০ কনটেইনার খালাস হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রতি কেজি খেজুর ১১০ টাকায় কিনলে ১৪০-১৫০ টাকা শুল্ক দিতে হয়। ১২০ টাকায় কিনলে ২০৮ টাকা শুল্ক দিতে হয়। গত বছর ৯০ টাকায় ডলার কিনতে পারতাম। এ বছর ১২০-১২২ টাকা দিতে হচ্ছে। কাস্টমস থেকে অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ইচ্ছেমতো করা হচ্ছে। এলসি যে মূল্যে খুলছি সে অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণ করা হলে খেজুরের দাম অর্ধেকে নেমে আসে। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না।
বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, পণ্য বন্দরে আসার পর শুল্ক পরিশোধ করে খালাস করতে হয়। এসব কাস্টমসের বিষয়।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ বলেন, ডলারের দাম বাড়াতে পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যায়। এর পরও ব্যবসায়ীরা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
দেশের ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে আরও ২১ কোটি ৮৫ লাখ (২১৮.৫০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) কেনা এসব ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। ডলার কেনার ক্ষেত্রে কাট-অফ হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
এ নিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ২ ফেব্রুয়ারির পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ডলার কেনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪১৫ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার, যা ৪.১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার পাঁচ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ৫ কোটি ৫০ লাখ (৫৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরও আগে গত ২০ জানুয়ারি দুই বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ১২ জানুয়ারি ১০ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার, ৬ জানুয়ারি ১৪ ব্যাংক থেকে ২২ কোটি ৩৫ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১২২.৩০ টাকা কাট-অফ রেটে মোট ২১ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার কেনা হয়েছে।
নবম জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন দ্রুত কার্যকর করার দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ। দাবি বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হলে আরও কঠোর আন্দোলনে যাওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। সমন্বয় পরিষদ জানায়, আগামী ৩ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা তিন দিন সারা দেশের সব সরকারি দপ্তরে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল ও কর্মচারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
এর পাশাপাশি চলমান গণকর্মবিরতি কর্মসূচিও অব্যাহত থাকবে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করা হবে।
নেতারা জানান, সরকার দাবি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আন্দোলনের পরিসর আরও বাড়ানো হবে।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, গত সাত বছর ধরে সরকারি কর্মচারীরা বেতন কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর লক্ষাধিক কর্মচারীর অংশগ্রহণে বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলেও ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে গেজেট প্রকাশের যে প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ২১ জানুয়ারি কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও গেজেট প্রকাশ না করে নতুন কমিটি গঠনের কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। এতে কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
এছাড়া জ্বালানি উপদেষ্টার এক সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়েও সমাবেশে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
বক্তারা দাবি করেন, ওই মন্তব্যে বলা হয়েছিল বর্তমান সরকার পে-স্কেল বাস্তবায়ন করবে না এবং আন্দোলন ঠেকাতেই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এমন বক্তব্য প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্যে গভীর হতাশা সৃষ্টি করেছে।
সমন্বয় পরিষদের নেতারা বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার ৩৬ দিনে দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।
টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনী পরিবেশে সহিংসতা, রাজনৈতিক হয়রানি, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে আক্রমণের ঘটনা বড় ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালে সারাদেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১০২ জন। একই সময়ে এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ হয়েছে। ডিপফেক ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি এবং সংখ্যালঘুদের ওপর ৫০টির বেশি হামলার ঘটনাও নির্বাচনী পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নতুন করে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা জনবলের মধ্যে মাত্র ৯–১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য থাকায় সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ঘাটতি রয়েছে।
মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি, বিশেষ করে আগের তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া, উপদেষ্টাদের দলীয়করণ এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ তুলেছে।
এদিকে ৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে উপযুক্ত নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসি প্রাথমিকভাবে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য যে ৭৩টি সংস্থাকে বাছাই করেছে, সেগুলোর অনেকগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি।
প্রার্থীদের মনোনয়ন যাচাই, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের ভিত্তিতে প্রার্থিতা বাতিল- এসব ক্ষেত্রে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ রয়েছে। হলফনামায় দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতাতেও সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে, প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কঠোর প্রয়োগের ঘাটতি থাকায় অনিয়ম পুরোপুরি ঠেকানো যায়নি।
প্রতিবেদনটি বলছে, নির্বাচন ও গণভোট ব্যবস্থায় প্রযুক্তি, আইন ও প্রক্রিয়াগত বড় ধরনের সংস্কার জরুরি। এআই ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নানা অস্থিরতা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও নির্বাচনী পরিবেশ এখনো আংশিক সক্রিয় রয়েছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে ঢাকা মহানগরের প্রতিটি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
সোমবার ডিএমপি হেডকোয়ার্টার্সের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ উপলক্ষে ডিএমপি প্রণীত নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক সমন্বয় সভায় ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন।
সভাপতির বক্তব্যে ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ভোটকেন্দ্রে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। থানা এলাকা থেকে দূরবর্তী কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। থানা এলাকায় পুলিশি টহল আরো জোরদার করতে হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, এবারের নির্বাচন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে হচ্ছে। এই বিষয় মাথায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন থাকবে এবং আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
সমন্বয় সভায় যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অপারেশনস) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, পিপিএম পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে সার্বিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় বিভিন্ন মতামত প্রদান করেন এবং কমিশনার বিভিন্ন নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিপুল পরিমাণ অপতথ্য মোকাবিলায় করতে হচ্ছে বলে জানিয়ে এর উপর আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত এক সংলাপে অংশগ্রহণ করে তিনি বলেন, "পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনের কঠোর প্রয়োগ হওয়া দরকার।" প্রেস সচিবের মতে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে মিথ্যা সংবাদ প্রচারের ফলে যদি কেউ ব্যক্তিগত বা সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে তার জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার যথাযথ সুযোগ থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এ সময় তিনি অপতথ্য রুখতে সরকারের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে বলেন যে, নানামুখী অপতথ্য মোকাবিলায় সরকারের সক্ষমতা সীমিত হলেও অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। শফিকুল আলম অভিযোগ করেন যে, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো নিয়মিতভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তি নামে-বেনামে ইউটিউব চ্যানেল খুলে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে যা বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মূলত স্বচ্ছ ও নির্ভুল তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করতেই তিনি এই আইনি কঠোরতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার প্রাচীন লোকজ উৎসব—মেলা। আগের মতো সেই জমজমাট আয়োজন, লোকসংস্কৃতির প্রাণচাঞ্চল্য আর মানুষের ঢল এখন আর চোখে পড়ে না। তবুও ঐতিহ্যের আলো নিভে যায়নি পুরোপুরি। তারই উজ্জ্বল উদাহরণ বোয়ালখালীর প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী সূর্যব্রত মেলা, যা স্থানীয়দের কাছে ‘সূর্যখোলা’ নামে পরিচিত।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাচীন এই মেলা চলবে তিন দিনব্যাপী। প্রতি বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শেষ গত রোববার সূর্যদেবের পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ আয়োজন। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বোয়ালখালীর জ্যৈষ্ঠ্যপুরা কানুরদিঘীর পাড়ে সূর্যমন্দির সংলগ্ন মাঠ সাজানো হয়েছে নান্দনিক সাজে।
মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে বসেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের দোকান। শীতের শেষে বসন্তের আগমনের প্রাক্কালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষ ভিড় জমিয়েছেন এ মেলায়। সরেজমিনে দেখা যায়, গৃহস্থালী সামগ্রী থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নানা পণ্য নিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। ফুলের ঝাড়ু, পোড়া আলু, বাঁশ-বেতের আসবাব, শীতল পাটি, তালপাতার হাতপাখা, মাটির তৈজসপত্র—সব মিলিয়ে এক অনন্য গ্রামীণ আবহ। ছোটদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নাগরদোলা। বেচাকেনা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বিক্রেতারাও।
স্থানীয়রা বলছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লোকজ উৎসবের জৌলুশ কমছে, নতুন প্রজন্মের আগ্রহও কমে যাচ্ছে। তবুও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনই এ মেলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
জ্যৈষ্ঠ্যপুরা সূর্যমন্দির মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বসুতোষ দাশ বলেন, “২২০ বছরের পুরোনো এই মেলা আমাদের বাপ-দাদার আমলের। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীসহ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই এখানে আসে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
মেলা কমিটির উপদেষ্টা দয়াল হরি দে জানান, “রবি, সোম ও মঙ্গলবার তিন দিনব্যাপী এ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন। সঠিকভাবে কেউ জানেন না, কবে থেকে এ মেলার সূচনা। তবে ১৮০৫ সাল থেকে এটি চলমান বলে জানা যায়।”
ইতিহাস বলছে, প্রায় দুইশ বছর আগে কোনো এক মাঘ মাসের তীব্র শীতে গ্রামবাসী যখন দুর্ভোগে পড়েন, তখন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সূর্যদেবের আরাধনা করেন। উপবাস ও নানা উপাচারের মধ্য দিয়ে মনোবাসনা পূরণের সেই আয়োজন থেকেই ‘সূর্যখোলা’ নামের উৎপত্তি। কালক্রমে ধর্মীয় আচার উৎসবে রূপ নেয়, আর জন্ম হয় সূর্যব্রত মেলার।
মেলায় আসা দর্শনার্থী রতন ভট্টাচার্য বলেন, “৪০ বছর পর মেলায় এলাম। আগের মতো সেই জৌলুশ আর নেই। একসময় কাপ্তাই হিলটেক্স থেকে বড় বড় চিতল, রুই, কাতলা, কালিগাইন্না, কোরাল মাছ আসত। পোড়া আলুও অনেক থাকত। এখন তেমন নেই। তবে পরিবার নিয়ে এসে ভালো লাগছে।”
পোড়া আলু বিক্রেতা মৃদুল বলেন, “সূর্যব্রত মেলার পোড়া আলু এই মেলার ঐতিহ্য। এ বছর ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বিক্রি করতে আসতাম, এখন নিজেই প্রায় ১২ বছর ধরে বিক্রি করছি।”
সূর্যব্রত মেলা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়—এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক। এই ঐতিহ্য যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু গল্প হয়ে না থাকে, সে জন্য প্রয়োজন সচেতন উদ্যোগ ও সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
ফেব্রুয়ারি মাসেই বসন্ত, আছে ভালোবাসা দিবস, আর্ন্তজাতিক মার্তৃভাষা দিবস। এবার এর সাথে যোগ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারিতে ফুলের চাহিদা ব্যাপক। কোটি টাকার ফুল বেচাকিনি হওয়ার আশা করছেন ব্যবসায়িরা। দোকানগুলোতেও দেখা যায় উপচেপড়া ভিড়।
উপজেলার আনাচে কানাচে ভ্রাম্যমাণ ফুলের দোকানগুলোতে দেখা যায় আগের তুলনায় ফুলের দাম বেশ বেড়েছে। প্রতি পিস গোলাপ ফুল ১০-২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৪০-১০০ টাকার মধ্যে এবং হলুদ, সাদা ও হালকা গোলাপি রঙের গোলাপ বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা দরে।
জারবেলা ফুলের প্রতি স্টিক বিক্রি হচ্ছে ৩০টাকায়। তাছাড়া গ্লাডিওলাস ৩০ টাকা ও সূর্যমুখী বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা করে। অর্কিড প্রতি পিছ বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়, গ্রিন হাউস ফুল প্রতি পিছ বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায় ও চায়না জিপস প্রতি স্টিক বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়।
তাছাড়া গাঁদা ফুলের মালা ও রজনীগন্ধা ফুলের মালা বিক্রি হচ্ছে ৮০ ও ১০০ টাকা দরে, মাম ফুলের মালা ৩০০-৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের গোলাপ দিয়ে তৈরি তোড়া বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ টাকায়, মাঝারি আকারের গোলাপের তোড়া ৮০০ টাকায় এবং ছোট আকারের গোলাপের তোড়া ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া বড় আকারের বিভিন্ন ফুল দিয়ে তৈরি তোড়া বিক্রি হচ্ছে ১২০০-১৫০০ টাকার মধ্যে। মাঝারি এবং ছোট ফুলের তোড়া বিক্রি হচ্ছে ৮০০ ও ৫০০ টাকা দরে।
ভুলতা বাজারের একজন ফুল বিক্রেতা সুমন মিয়া বলেন, এই সময়ে ফুলের চাহিদা
বেশি থাকায় আগের তুলনায় দাম বেড়েছে কিছুটা। প্রতি পিছ গোলাপ বিক্রি করছি ৪০-৫০ টাকায়। জারবেলা ফুলের প্রতি স্টিক বিক্রি করছি ৩০ টাকা দরে।
তাছাড়া এখানে ফুলের তোড়া বিক্রি করছি ১০০০-১৫০০ টাকায়। বলা যায় এই বছর আগের তুলনায় বিক্রির হার মোটামুটি বেড়েছে।
জহিরুল নামের আরেক জন ফুল বিক্রেতা গোলাপ ফুলের একটি তোড়া তৈরি করতে করতে বলেন, এই সময়টা আমাদের জন্য ফুল ব্যবসায়ীদের অন্যতম সময়। এই সময়টাতে আমাদের নির্দিষ্ট কিছু টার্গেট থাকে। সরেজমিনে দেখা যায় তার দোকানে হরেক রকমের ফুলের সমারোহ। তার মধ্যে রয়েছে গোলাপ, জারবেলা, গ্লাডিওলাস, গাঁদা, রজনীগন্ধা এবং চায়না জিবস, তাছাড়া বেশ কিছু কৃত্রিম ফুলও দোকানটিতে রয়েছে।
জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মো. সাফিকুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শাহরিয়ার আলী গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ড. সাফিকুর রহমান বর্তমানে উত্তরা পশ্চিম থানায় পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। তবে ঠিক কোন মামলায় বা কী অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি। উপ-কমিশনার শাহরিয়ার আলী জানান, গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার প্রক্রিয়া চলছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের এই কর্মকর্তার হঠাৎ গ্রেপ্তারের ঘটনায় প্রশাসনিক ও সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। উত্তরা পশ্চিম থানা সূত্র জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে থাকা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং দ্রুতই এ ব্যাপারে গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানানো হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিমানে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
দেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে সারা দেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে সরকার। এই নিরাপত্তা বলয়ে এবার নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর বা বিএনসিসি সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সোমবার বিকেলে বরিশাল শিল্পকলা অ্যাকাডেমি মিলনায়তনে নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আয়োজিত এক আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময়সভা শেষে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, নির্বাচন যেন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ হয়, সেই লক্ষ্যে সব বাহিনীকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকালীন বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, এবার উপকূলীয় এলাকার নিরাপত্তার দিকে বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে। এজন্য কোস্ট গার্ড ও নৌবাহিনীর সদস্যসংখ্যা আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে। একই সাথে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জন্য বডি ক্যামেরা ব্যবহারের পাশাপাশি স্পর্শকাতর এলাকায় সিসি ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতেই এই আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশাল এক বাহিনী মোতায়েনের বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের সময় সারা দেশে প্রায় এক লাখ সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া দেড় লাখ পুলিশ, ৩৭ হাজার বিজিবি, ১০ হাজার র্যাব এবং প্রায় ছয় লাখ আনসার সদস্য মোতায়েন করা হবে। পাশাপাশি পাঁচ হাজার নৌবাহিনী ও প্রায় পাঁচ হাজার কোস্ট গার্ড সদস্য মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব সামলাবেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, দায়িত্ব পালনে কোনো প্রকার শৈথিল্য বা অবহেলা প্রদর্শন করা হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, প্রত্যেকের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা বাধ্যতামূলক। স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সুষ্ঠু ও সফল নির্বাচন উপহার দিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বাত্মক সজাগ থাকবে বলে সভায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বা অপতৎপরতা রুখে দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত বা প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হলে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। সোমবার দুপুরে বরিশাল জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে বরিশাল বিভাগীয় প্রশাসন আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশ দেন।
সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে ফ্যাসিস্টের দোসর, সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে হবে। নির্বাচনের আগে এবং পরে যাতে কোনো অরাজকতা সৃষ্টি না হয়, সেজন্য নির্বাচনের পূর্ববর্তী চার দিন নিবিড় টহল পরিচালনা করতে হবে। বিশেষ করে চরাঞ্চল ও দুর্গম এলাকাগুলোতে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন তিনি।
নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সতর্ক করে উপদেষ্টা বলেন, এই নির্বাচন নিয়ে দেশবাসী ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাশা অনেক। আগামী নির্বাচন যাতে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, সে লক্ষ্যে সবাইকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কর্মকর্তাদের সামান্যতম ভুল বা বিচ্যুতি নির্বাচনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে, তাই সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সরকার কোনো আপস করবে না জানিয়ে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আরও বলেন, জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব। ভোটাররা যাতে উৎসবমুখর পরিবেশে ও নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো ধরণের অনিয়ম রোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ডিএমপির পক্ষ থেকে তিনটি বিশেষ হটলাইন নম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। এই নম্বরগুলোর মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর সাধারণ নাগরিকরা নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ, তথ্য কিংবা জরুরি পরিস্থিতি সরাসরি পুলিশকে অবহিত করার সুযোগ পাবেন।
ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এই নতুন পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরে জানান যে, নির্বাচনী আচরণবিধি অমান্য করা কিংবা কোনোভাবে ভোটারদের প্রভাবিত করার মতো ঘটনা ঘটলে নগরবাসী তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সহায়তা নিতে পারবেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে কিংবা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কোনো পরিকল্পনা করে, তবে সে বিষয়ে পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতেই এই হটলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী মাঠে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, এই উদ্যোগ তারই একটি অংশ।
ডিএমপি ঘোষিত বিশেষ হটলাইন নম্বরগুলো হলো— ০১৩২০০৩৭৩৫৮, ০১৩২০০৩৭৩৫৯ এবং ০১৩২০০৩৭৩৬০। নগরবাসীকে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কিংবা নির্বাচনী এলাকায় কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ নজরে এলে দ্রুত এই নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। এসব নম্বরে প্রাপ্ত তথ্য বা অভিযোগের ভিত্তিতে ডিএমপির সংশ্লিষ্ট থানা বা বিশেষ টিম দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন উপহার দিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে। তবে কেবল পুলিশের প্রচেষ্টায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সক্রিয় সহযোগিতা পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও বেশি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে। ডিএমপির পক্ষ থেকে সম্মানিত নগরবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে এবং ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সবাই যেন এই তথ্যসেবা গ্রহণ করেন। মূলত জনগণের আস্থা অর্জন এবং নির্বাচনের দিন যেকোনো ধরণের নাশকতা প্রতিরোধ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
চট্টগ্রাম বন্দরের অতি গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর হাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশর প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে অচলাবস্থা আরও ঘনীভূত হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারী ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির ডাকা টানা তৃতীয় দিনের কর্মবিরতির ফলে আজ সোমবারও (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে দেশের এই অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ডের অপারেশনাল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গত শনিবার ও রবিবার একই সময়সূচীতে সফল কর্মবিরতি পালনের পর আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি আদায়ে আজ আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা কর্মবিরতির প্রভাবে জেটিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস এবং নতুন করে কনটেইনার লোডিং করার কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বন্দর ইয়ার্ড থেকে কোনো ট্রাক বা কভার্ড ভ্যানে পণ্য ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে বন্দর সংলগ্ন সড়কগুলো ছিল নজিরবিহীনভাবে যানবাহনমুক্ত। চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জাহাজে কাজের জন্য শ্রমিক বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কোনো শ্রমিক কাজে যোগ দিচ্ছেন না। কেবল মাঠ পর্যায়ের শ্রমিকরাই নন, বন্দরের দাপ্তরিক কর্মচারীরাও ‘কলম বিরতি’ পালন করায় প্রশাসনিক ফাইল আদান-প্রদান ও অনুমোদনের কাজও থমকে গেছে।
আন্দোলনের মূল কারণ হিসেবে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের এককভাবে ৪০ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা অত্যন্ত লাভজনক এনসিটি টার্মিনালটি বিদেশি অপারেটরের কাছে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শ্রমিক নেতাদের দাবি, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতে সূচিত এবং ২০০৭ সালে নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন হওয়া এই টার্মিনালে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল রয়েছে। তাই এখানে নতুন করে কোনো বিদেশি বিনিয়োগ বা পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং এটি বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিলে জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রশাসনিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত দুই দিনে আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত ১৬ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে ঢাকার আইসিডি ও নারায়ণগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনালে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। তবে এই বদলির আদেশ পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এই বদলির প্রতিবাদে এবং এনসিটি লিজ বাতিলের দাবিতে আজ বন্দর অভিমুখে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এবং অবৈধ বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে, বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সচল রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ইতিমধ্যে এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় এক মাসের জন্য সকল ধরণের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হলেও আন্দোলনকারীরা কাজ বন্ধ রেখে ঘরে বসে প্রতিবাদ জানানোর কৌশল নিয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থার ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার ও শ্রমিক পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিনে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর ডাক দিয়ে শুরু হলো ৩৮তম জাতীয় কবিতা উৎসব। ‘সংস্কৃতিবিরোধী আস্ফালন রুখে দিবে কবিতা’ স্লোগান নিয়ে দুই দিনব্যাপী এই উৎসবের আয়োজন করেছে জাতীয় কবিতা পরিষদ। এবারই প্রথম উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতীয় কবিতা উৎসবের সূচনা করা হয়।
সমাধি চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করে কবিরা টিএসসি ঘুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান। আবহমানকালের বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র, মাজার, বাউলদের আখড়া ও গণমাধ্যমের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে কবিরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁইয়ের রক্তাক্ত প্রতিকৃতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কারারুদ্ধ প্রতীকী ছবি–সংবলিত প্ল্যাকার্ড। তারা সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে আলোর ডাক দেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ও পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ভাষার গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এবং এবারের উৎসব সংগীত ‘এ সংগীত নৃত্য কবিতা/এ সম্প্রীতি সাম্যের বারতা’ পরিবেশন করেন।
উৎসবের উদ্বোধন করেন জুলাই গণ-আন্দোলনে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কবিরা কবিতায় মানুষের মনের কথা বলেন। মানবতার দাবিই সবচেয়ে বড়। এই দাবিকে সামনে রেখে মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সবাই মিলে একটি মানবিক দেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধের মতো আর কাউকে প্রাণ দিতে না হয়।
মীর মুস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, শহীদেরা দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে সবাইকে আত্মনিয়োগ করতে হবে। কবিরা এই কাজে লেখনীর মাধ্যমে জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অতীত থেকে শিক্ষা না নিলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ পাওয়া যায় না।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চেতনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা। সে কারণে তারা সব মত, আদর্শ, জাতি, গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসর সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক তারা সংকীর্ণ বিভাজন ত্যাগ করে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি চর্চার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বহুদূর যেতে হবে, এ কারণে সহনশীলতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা–সম্মান থাকা প্রয়োজনীয়।
কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, জাতি যখনই কোনো সংকটের সামনে পড়েছে, তখন কবিরা সোচ্চার হয়েছেন। জাতীয় কবিতা পরিষদ কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়, কিন্তু সংকটে সংগ্রামে কবিতা পরিষদ জাতির মুক্তির জন্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সামনে একটি জাতীয় নির্বাচন আসছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কবিরা জনগণকে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত সমাজ গঠনের শক্তির পক্ষে রায় দিতে আহ্বান জানাচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ১৯৮৭ সালে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের সড়ক মোহনায়, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় কবিতা পরিষদ ও জাতীয় কবিতা উৎসবের। পরবর্তী সময়ে এই উৎসব স্থানান্তরিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন হাকিম চত্বরে। সেখানে দীর্ঘদিনের সেই আয়োজনে এবার অনুমতি মেলেনি। কারণ সময় বদলেছে। আর সেই বদলে যাওয়া সময়কে আজ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে অন্ধকারের অশুভ শক্তি। যারা আলোর সাম্পানে ভাসমান হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারে না, আজ তাদেরই আস্ফালন চারদিকে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কবি এ বি এম সোহেল রশিদ, শোক প্রস্তাব পাঠ করেন কবি শ্যামল জাকারিয়া, ঘোষণাপত্র পাঠ করেন কবি মানব সুরত ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কবি নূরুন্নবী সোহেল।