খেজুর আমদানিতে শুল্ক ছিল ৫৩ শতাংশ, ৮ ফেব্রুয়ারি ১০ শতাংশ কমিয়ে করা হয়েছে ৪৩ শতাংশ। শুল্ক কমানোর পরও দাম কমেনি খেজুরের। উল্টো দাম বেড়েছে। যদিও বন্দর থেকে খেজুর খালাসের পরিমাণও বেড়েছে। গত কয়েক দিনে ৬০৫ কনটেইনার খেজুর খালাসের কার্যক্রম চলছে এবং প্রতিদিনই খালাস অব্যাহত রয়েছে।
জানা গেছে, আগামী ১২ মার্চ পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা রমজান মাসজুড়ে সিয়াম সাধনা করেন। দিনভর রোজা রাখার পর সন্ধ্যায় ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে খেজুর। খেজুর ছাড়া এখন আর ইফতারের কথা ভাবা যায় না। প্রায় সব রোজাদারই খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করেন। এ কারণে রমজান মাসে চাহিদা বেশি থাকা পণ্যগুলোর একটি খেজুর। পণ্যটির দাম নিয়ন্ত্রণে চলতি মাসে আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ কমিয়েছে সরকার। এর পাশাপাশি বাজারে তদারকি ও বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তা কোনো কাজেই আসছে না। গত বছরের তুলনায় বর্তমানে দেশের বাজারে খেজুরের দাম প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ বেড়েছে।
৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি আদেশে খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে আনার ঘোষণা দেয়। এর আগে খেজুর আমদানিতে সর্বমোট ৫৩ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে খেজুরের শুল্কায়ন মূল্য প্রতি টন ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৭৫০ ডলার। এর সঙ্গে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি ৩ শতাংশ ও ভ্যাট ১৫ শতাংশ। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম কর ৫ শতাংশ হারে দিতে হচ্ছে। এতে বর্তমানে সর্বমোট ৪৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গত রোজার আগে মানভেদে প্রতি কেজি খেজুরে শুল্ক দিতে হতো ৫ দশমিক ৪৫ থেকে ২১ দশমিক ৮৪ টাকা। তবে এবার খেজুরকে ‘বিলাসীপণ্যের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে খেজুরের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫৩ শতাংশ করা হয়। ফলে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বেড়ে গেছে। এবার শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৫৪ থেকে ২০৮ টাকা। মূলত শুল্কের প্রভাব পড়েছে খেজুরের দামে। গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজি খেজুরে জাতভেদে দাম বেড়েছে ১০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত। দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া খেজুরের মধ্যে রয়েছে দাবাস, জাহিদি, বরই ও গলা খেজুর।
চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি গলা বা বাংলা খেজুর বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা, জাহিদি খেজুর ২৪০-২৬০ ও মানভেদে দাবাস খেজুর ৪৫০-৫৫০ টাকায়। এ ছাড়া বরই খেজুর মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪৪০-৫৪০ টাকায়। গত বছর এসব খেজুরের দাম ছিল বর্তমান দরের অর্ধেকেরও কম।
এদিকে অভিজাত শ্রেণির কাছে পছন্দের খেজুরের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের মেডজুল, মাবরুম, আজওয়া ও মরিয়ম। গত এক মাসের ব্যবধানে এসব খেজুরের দাম কেজিতে ২০০-৩০০ টাকা বেড়েছে। জাম্বো মেডজুল মানভেদে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, সাধারণ মেডজুল ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০, মাবরুম খেজুর ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৫০০, আজওয়া খেজুর মানভেদে ৯০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো জাতের মরিয়ম বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায়। এ ছাড়া কালমি মরিয়ম ৮০০-৯০০ টাকা, সুফরি মরিয়ম ৭৫০-৮০০, আম্বার ও সাফাভি ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ ও সুক্কারি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৮০০-৯০০ টাকায়।
খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালে রোজার আগে জাহিদি জাতের খেজুরের দাম ছিল কার্টনপ্রতি (১০ কেজি) ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। শুল্ক আরোপের কারণে দাম বাড়ার পর গত বছরের শেষ সপ্তাহেও একই জাতের খেজুরের দাম ছিল কার্টনপ্রতি ১ হাজার ৮০০ টাকা। তবে এখন ১০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েও এই জাতের খেজুরের কার্টন হাঁকা হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা।
পাইকারি ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি ৫ কেজির এক কার্টন মেডজুল খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার টাকায়। গত বছর এ খেজুর বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। অন্যদিকে সাধারণ খোলা খেজুর প্রতি কেজি ফেব্রুয়ারির শুরুতে কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ছিল ১২৮-১৩০ টাকা। বর্তমানে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৫৫ টাকায়।
পাইকারি বাজার সূত্রে জানা গেছে, বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় জাহিদি জাতের খেজুর। এক বছর আগে প্রতি কেজি খেজুর খুচরা পর্যায়ে ১৫০ টাকায় পাওয়া যেত। শুল্ক কমানোর পর বর্তমানে এ খেজুর খুচরায় বিক্রি করতে হবে ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্য আমদানি করা খোলা (বস্তায় বিক্রি হওয়া ভেজা খেজুর) রোজা আসার আগেই কেজিপ্রতি পাইকারি দাম ১৫৫ টাকায় উঠে গেছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে এ মানের খেজুর বিক্রি করতে হবে কমপক্ষে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায়। অবশ্য গতকাল বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল হক টিটু ঘোষণা দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের কাছে খেজুর পৌঁছে দিতে বস্তায় আসা জাহিদি খেজুরের দাম কমানো হবে। আজ রোববার (৩ মার্চ) এই খেজুরের দাম কমানোর ঘোষণা আসার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি খেজুর বন্দর থেকে খালাস নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। আগে বন্দর থেকে দিনে খেজুরভর্তি ছয় কনটেইনার খালাস হলেও এখন সেটা ৭০ কনটেইনারে গিয়ে টেকেছে। কিন্তু দাম কমছে না।
ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকার শুল্ক কমানোর পর ব্যবসায়ীরা খেজুর খালাসে তোড়জোড় শুরু করেছে। শুল্ক কমানোর পরও ভোক্তারা কম দামে খেজুর কিনতে পারছেন না। শুল্ক কমানোর পর পর্যাপ্ত আমদানি হলেও দাম কেন কমছে না বিষয়টি তদারকি করতে হবে। তদারকি না করলে রোজায় খেজুর কিনতে পারবে না ভোক্তারা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের ১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২২ হাজার ৬৬৩ টন খেজুর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস করেছেন আমদানিকারকরা। ১৪৫ দিনের মধ্যে গত ১৫ দিনেই বেশি খেজুরের চালান খালাস হয়েছে। ২৮ ধরনের খেজুর দেশের ৮২টি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান, মিসর, আলজেরিয়া, নামিবিয়া, তিউনিশিয়া ও আফগানিস্তান থেকে আমদানি করেছে।
জানা গেছে, চার মাস আগে খেজুর আমদানি করলেও শুল্ক কমবে এ আশায় ব্যবসায়ীরা পণ্যটি চট্টগ্রাম বন্দরে গুদাম করে রেখেছিলেন। ফলে বেসরকারি ১৯টি ডিপোতে ১ হাজার কনটেইনার (প্রতি কনটেইনারে ২২-২৪ হাজার কেজি খেজুর থাকে) খেজুর পড়ে ছিল। এখন খেজুরভর্তি ৬০৫টি কনটেইনার খালাস চলছে। এখনো খেজুরভর্তি ৩৯৫টি কনটেইনার খালাসের উদ্যোগ নেয়নি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কমিশনার কাজী ইরাজ ইশতিয়াক বলেন, প্রচুর পরিমাণে খেজুর খালাস হচ্ছে। প্রতিদিনই খালাস করছেন আমদানিকারকরা। তিনি বলেন, খেজুরের শুল্ক ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
তিনি জানান, খেজুরের চারটি ক্যাটাগরি রয়েছে। একেকটি ক্যাটাগরির একেক রকম শুল্কহার হয়। মিথ্যা ঘোষণায় আমদানির প্রবণতাও রয়েছে। অনেক সময় উচ্চ শুল্কহারে খেজুর এনে কম শুল্কহারে ঘোষণা দেওয়া হয়। এমন বেশ কিছু ঘটনাও ঘটেছে। এ জন্য আমরাও সতর্ক আছি, যেন সরকার রাজস্ব বঞ্চিত না হয়।
উচ্চ শুল্কহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা এনবিআর নির্ধারিত, এ ব্যাপারে আমাদের বলার বা করার কিছু নেই। আমরা নির্ধারিত শুল্ক নিয়ে খালাসের ব্যবস্থা করি। খেজুর বিলাসী পণ্য কি না, এ বিষয়েও তিনি কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
খাতুনগঞ্জের ডেটস অ্যান্ড ড্রাই ফ্রুটস আমদানিকারক মো. ওমর ফারুক বলেন, খেজুর আমদানিতে কাস্টমস ট্যাক্স ১০ শতাংশ কমালেও অন্যান্য শুল্ক ঠিক রেখেছে এনবিআর। ফলে উচ্চমাত্রায় ট্যাক্স দিয়েই আনতে হচ্ছে। ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সামান্য এ শুল্ক কমানোয় খেজুরের দামে প্রভাব পড়বে না।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার সুলতান আরেফিন বলেন, শুল্ক কমানোর পর থেকে আমদানিকারকরা খেজুর খালাস নিতে শুরু করেছেন। বর্তমানে খেজুর খালাসের পরিমাণও বেড়েছে। আগে প্রতিদিন গড়ে খেজুরভর্তি ছয় কনটেইনার খালাস হলে এখন সেটি ৭০ কনটেইনার খালাস হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রতি কেজি খেজুর ১১০ টাকায় কিনলে ১৪০-১৫০ টাকা শুল্ক দিতে হয়। ১২০ টাকায় কিনলে ২০৮ টাকা শুল্ক দিতে হয়। গত বছর ৯০ টাকায় ডলার কিনতে পারতাম। এ বছর ১২০-১২২ টাকা দিতে হচ্ছে। কাস্টমস থেকে অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ইচ্ছেমতো করা হচ্ছে। এলসি যে মূল্যে খুলছি সে অনুযায়ী শুল্ক নির্ধারণ করা হলে খেজুরের দাম অর্ধেকে নেমে আসে। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না।
বন্দর সচিব ওমর ফারুক বলেন, পণ্য বন্দরে আসার পর শুল্ক পরিশোধ করে খালাস করতে হয়। এসব কাস্টমসের বিষয়।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ ছগীর আহমেদ বলেন, ডলারের দাম বাড়াতে পণ্যের আমদানি খরচ বেড়ে যায়। এর পরও ব্যবসায়ীরা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও বক্তব্যের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার।
বুধবার (৫ আগস্ট) এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, যা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি চরম অসম্মান।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হলে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর তার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে বাংলাদেশকে আগেই সতর্ক করে ভারতকে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ভারতীয় ভূখণ্ডে এই প্রকাশ্য কর্মসূচির সুযোগ দেওয়ায় ঢাকা গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনকে ওই বক্তব্যে অস্বীকার করা হয়েছে বলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ তোলে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জোর দিয়ে বলেছে, পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে ভারতের সাথে একটি গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে বাংলাদেশ আগ্রহী।
২০১৩ সালের দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য বারবার অনুরোধ করা হলেও ভারতের দিক থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক সাড়া মেলেনি। শেখ হাসিনাকে এভাবে প্রচারমাধ্যমের সুযোগ দেওয়া দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও জনমানের পারস্পরিক আস্থায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে ঢাকা।
সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদবিরোধী বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাইকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘বর্ষা বিপ্লবের গান’ শীর্ষক এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন।
এ সময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে যারা শহীদ ও যুদ্ধাহত হয়েছেন, তাঁদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি তরুণদের স্বপ্নের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, বিপ্লবের আসল লক্ষ্য থেকে কোনোভাবেই বিচ্যুত হওয়া যাবে না এবং এই অর্জনকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান তাঁর বক্তব্যে যেকোনো জাতীয় সংকটে সবাইকে একতাবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো স্বৈরাচারী শাসনের উত্থান ঘটতে না পারে।
এছাড়া বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জুলাই শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল এদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ফসল এবং এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনর্জীবিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সেই স্বাধীনতাকে সুসংহত করার এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।
বুধবার (৫ আগস্ট) জাতীয় সংসদ সচিবালয় আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও আলোচনা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে তিনি প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া।
চিফ হুইপ তাঁর বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবের সকল শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিগত ‘মাফিয়া’ সরকার এদেশ থেকে ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার করেছে, মানুষের বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার ধ্বংস করেছে এবং ‘আয়নাঘর’ ও জেল-জুলুমের মাধ্যমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সশস্ত্র বাহিনীর শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকার কথাও তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন।
চিফ হুইপ বলেন, বর্তমান সংসদের গত পাঁচটি মাসে আমরা দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন (রাষ্ট্রপতির ভাষণ ও বাজেট অধিবেশন) অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করেছি। তিনি একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বলেন, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাননীয় সংসদ সদস্যগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে তারা কোনো ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি বা সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না।
এছাড়াও, তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সংকট সমাধানে সংসদ ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছে এবং সুফল পেয়েছে।
নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার যাই বলি না কেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গঠন করা।’
তিনি ভারতের সংবিধানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ৭৬ বছরে তারা ১০৬ বার সংশোধন করেছে; তাই প্রয়োজন অনুযায়ী আমাদের সংবিধানেও সব কিছু অন্তর্ভুক্ত করা হবে যেন নতুন প্রজন্ম একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম সুখী-সমৃদ্ধ দেশ পায়।
সরকারি ও বিরোধী দলের সকল সদস্যের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আসুন, আমরা আমাদের সকল সমস্যা নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা করি। পার্লামেন্টই হবে সকল সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু।’
তিনি দেশে একটি টেকসই ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজপথের পরিবর্তে সংসদকে কার্যকর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের হুইপবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিববৃন্দ, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: বাসস
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার বিভাজনের রাজনীতি না করে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।
এসময় মন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্তির পর জুলাইকে নিয়ে রাজনৈতিক ভাগাভাগি শুরু করলে এই ঐতিহাসিক অর্জন কারোরই থাকবে না, তাই এমন বিভক্তি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী আনা হবে, যা হবে এই শতাব্দীর একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন আগামী সংসদে উত্থাপন করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চব্বিশের এই মুক্তি ৩৬ দিনের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ, গুম ও নির্যাতনের চরম পরিণতি।
রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারে সরকার আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসরণে আইন সংশোধন করা হয়েছে যাতে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনেরও বিচার সুগম হয় এবং আদালতই ঠিক করবে এদের পরিণতি কী হবে।
ফ্যাসিবাদী আচরণের বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ সংরক্ষিত থাকবে উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ আরও জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হাজারো তর্ক-বিতর্ক থাকলেও ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধে পুরো জাতিকে সর্বদা ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধে জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছিল বিএনপির নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সেই সময় থেকে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক পরিচয় ভুলে, সব ভেদাভেদ ছাপিয়ে গণতন্ত্রকামী প্রতিটি শক্তির একমাত্র পরিচয় হয়ে উঠেছিল–তারা বাংলাদেশের পক্ষে।
বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সৃষ্টি হয়েছিল ‘ফ্যাসিবাদ বনাম বাংলাদেশ’ এক নতুন মেরুকরণ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বুধবার (৫ আগস্ট) রাতে ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আজ দুই বছর পূর্তিতে সেই ঐক্যের মাঝে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব দৃশ্যমান। আমাদের নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে, ইতিবাচক সমালোচনা হতে পারে; তবে কোনো ধরনের অশালীন আচরণ না করেও একে অপরকে প্রশ্ন করা যায়, প্রজ্ঞা ও ইতিবাচকতার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়। ভিন্নমতকে ধারণ করেই পলাতক ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান যেন না ঘটে, সেই লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্য দৃঢ় করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে, আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে ২০২৪ সালের এই দিনে ছাত্র-জনতার বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণে সংঘটিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনবদ্য অধ্যায়ের সূচনা করে।
তিনি বলেন, গণমানুষের জোয়ারের মুখে ফ্যাসিস্ট সরকার পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় এবং বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় এগিয়ে যায়। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই দিন জাতীয়ভাবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে।
ঐতিহ্যগতভাবেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিএনপির দীর্ঘ সংগ্রাম ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের গৌরবময় পটভূমি রচনা করেছে। এই লড়াইয়ে আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার দৃঢ় নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা আন্দোলনকে শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত শক্তি ছিল সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ। নারীদের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, কৃষক এবং পোশাকশ্রমিকসহ দল-মত-পেশার ঊর্ধ্বে উঠে সবাই এতে অংশ নেন। এটি ছিল মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বাকস্বাধীনতা হরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ভোটাধিকার লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে অদম্য প্রত্যয়ের সমন্বিত প্রকাশ।
সরকার মানুষের এই স্রোত দমাতে নির্মমভাবে গুলি চালিয়েছে, যার মধ্যে শহীদ আবু সাঈদ ও ছাত্রদল নেতা শহীদ ওয়াসিম আকরামের বীরত্ব জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে।
মাহদী আমিন জানান, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার মানুষ। এই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে গণতন্ত্রকামী শক্তির ঐক্য বজায় রাখা আজ সময়ের দাবি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তির নয়, এর আসল নায়ক দেশের জনগণ। ১৯৭১ সালের মতো ২০২৪-এর শহীদদেরও জাতি কখনো ভুলবে না। বিগত ১৫ বছর ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার বিএনপি এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার ও সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রধান দায়িত্ব।
তিনি বলেন, আমাদের এই জাতীয় সংসদের এবং বর্তমান সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জুলাইতে যারা জীবন দিয়েছে এবং জুলাইতে যাদের অঙ্গহানি হয়েছে তাদের প্রতি যেন আমরা সুবিচার করতে পারি। যে জন্য জুলাই শহীদরা তাদের জীবন দিয়েছে জুলাই যোদ্ধারা আহত হয়েছে তাদের সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা এই সংসদের প্রধান দায়িত্ব।
বুধবার (৫ আগস্ট) বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আজকের দিন আমাদের বিজয়ের দিন। আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাদের স্মরণ করছি যারা বুকের রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে এনেছে, বাংলাদেশকে মানুষের বাসযোগ্য একটি বাসভূমিতে পরিণত করেছে ‘ এ সময় তিনি সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করে স্বৈরশাসনকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছেন। এটি একটি গৌরবময় ইতিহাস, যা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে গর্ব করবে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যেন জুলাইকে হারিয়ে না ফেলি। জুলাইকে যেন ধারণ করতে পারি। আমরা যেন জনগণের চেতনাকে, জনগণের আশাকে বাস্তবায়ন করতে পারি এটি হওয়া উচিত আমাদের আজকের সংকল্প।’
তিনি বলেন, ‘আসুন আমরা অঙ্গীকার করি, জুলাইয়ের আত্মত্যাগকে জাতীয় জীবনের প্রেরণায় রূপ দেব। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুদৃঢ় করব। জাতীয় সংসদের মর্যাদা এবং কার্যকারিতা সমুন্নত রাখবো এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন একটি বাংলাদেশ রেখে যাব, যেখানে ক্ষমতার নয়, জনগণের স্বার্থই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ মানদণ্ড।
এ সময় তিনি সব গণতান্ত্রিক শক্তির প্রতি ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলার আহ্বান জানান।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বর্তমান সংসদকে গণ-অভ্যুত্থানের ফসল বলে আখ্যায়িত করে বলেন, দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুদৃঢ় করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এই সংসদকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান জাতীয় সংসদ একটি ব্যতিক্রমধর্মী সংসদ এবং এটি গণ-অভ্যুত্থানের ফসল। নতুন বাংলাদেশ গঠনে এ সংসদের ওপর অনেক দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি বলেন, সংসদের নারী সদস্যদের মধ্যে ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যারিস্টারসহ বিভিন্ন পেশার উচ্চশিক্ষিত প্রতিনিধি রয়েছেন। একইভাবে সরাসরি নির্বাচিত সদস্যরাও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তারা প্রকৃত জনপ্রতিনিধি।
এসময় তিনি সবাই মিলে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করতে সক্ষম হবে বলে আশা ব্যক্ত করেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ যেমন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ ছিল, তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘটিত হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানকে একদিন বা দুদিনের ঘটনা নয়, দীর্ঘ ১৬ বছরের অক্লান্ত সংগ্রামের ফল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বক্তব্যের শেষে তিনি মহান আল্লাহর কাছে বাংলাদেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও গণতন্ত্রের সুদৃঢ় ভিত্তি কামনা করেন। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং জনগণের কল্যাণে সততা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের তৌফিক প্রার্থনা করেন।
জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি, বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভুঁইয়া।
এর আগে তিনি প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন। বিকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
সূত্র: বাসস
ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের পরিবারকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন যে, আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করা হবে। সরকারপ্রধান উল্লেখ করেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিটি অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি ঘোষণা দেন, বিগত ১৭ বছরের দুঃশাসন এবং জুলাই অভ্যুত্থানে যারা শহীদ কিংবা গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে নিজ নিজ এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হবে।
রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন শেষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আশা করে এই জাদুঘর কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়। এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানের মেলবন্ধন টেনে তিনি মন্তব্য করেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের। আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের মানুষ যেমন ভুলে যায়নি, একইভাবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরকেও জনগণ কখনোই ভুলবে না।’
দেশের চলমান পরিস্থিতিতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কৃত্রিম ইস্যু তৈরি করে কেউ যেন স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম না করে, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে। দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামলের অবর্ণনীয় নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আজকের এই দিনটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছিলেন। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, হামলা ও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর ঘরবাড়ি ছাড়া হয়েছিলেন। শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেই শহীদ হয়েছেন হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেও গণতন্ত্রকামী জনগণকে হত্যা করেছিল। পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের এমন নৃশংসতা, এমন বর্বরতা সভ্য জগতে বিরল। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম-খুন ও অপহরণকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই নৃশংসতা শুধু স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গেই তুলনা চলে।’
জাদুঘরটির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, এটি শুধু অতীতের স্মৃতিস্তম্ভ নয়, বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সাহসিকতার দলিল হয়ে থাকবে। ইতিহাসের সত্যতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না; বরং ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে এবং ভবিষ্যৎ বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং, প্রতিটি বিষয়ে যথাসম্ভব সত্যতা থাকা প্রয়োজন। একইসঙ্গে জাদুঘরে রাখা বিষয়াবলি সম্পর্কে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায়ও উপস্থাপিত হলে বিশ্বের ভিন্নভাষী মানুষও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে সুবিধা হবে।’
অতীতের রাজনৈতিক পটভূমি স্মরণ করে তিনি উল্লেখ করেন, ‘তাদের পূর্বসূরিরা ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে দেশে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল। পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এসব ইতিহাস জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অবশ্যই উপকৃত হবে।’
আহতদের চিকিৎসা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, জুলাই যোদ্ধাদের জন্য সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে অর্ধশত যোদ্ধা দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং ১৩ হাজারের বেশি যোদ্ধাকে নিয়মিত সম্মানী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ৩১ দফা ও জুলাই সনদের ভিত্তিতে একটি স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু হয়েছে। সবশেষে সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি ঘোষণা দেন, ‘বাংলাদেশ আর কখনো কোনো তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।’
অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সরকারের শীর্ষপর্যায় ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে দেশাত্মবোধক গান ও আবৃত্তির মাধ্যমে অভ্যুত্থানের চেতনা ফুটিয়ে তোলা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধা মিতুর খোঁজ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
আহত যোদ্ধা মিতু হাসপাতালের শয্যা থেকে আজ সরাসরি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’- এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আজ রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে কাছে ডেকে আন্তরিকভাবে কথা বলেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী মিতুর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। চিকিৎসার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চান এবং তাঁর সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানান।
এরআগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক এসব কথা জানান।
তিনি বলেন, আজ আমন্ত্রিত অতিথিদের একজন ছিলেন মিতু, যিনি চব্বিশের জুলাই যুদ্ধে আহত হয়ে এখনও চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল থেকে সরাসরি অনুষ্ঠানে যোগ দেন মিতু।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর এই আন্তরিক সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে।
প্রধানমন্ত্রীর পাশে তাঁর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও এ সময় ছিলেন।
সূত্র: বাসস
নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তার জবাবে কড়া চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “তারা বলে ডিসেম্বরে দেশে আসবে। আমরা অপেক্ষা করছি। দেশে আসুন, ইনশাল্লাহ রাজপথে দেখা হবে।” জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও অকুতোভয় যোদ্ধাদের সংবর্ধনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি দেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের কড়া সমালোচনা করে বলেন যে গুম, খুন, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও দলটির মধ্যে কোনো অনুশোচনা বা দায়বদ্ধতা নেই। নিজের দেশপ্রেমের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “২৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এখন ৮২ বছর বয়সে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন হলে আবারও লড়াই করব।” তিনি জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের পরিবারের পুনর্বাসন ও আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন—উভয় সংগ্রামের মূল লক্ষ্যই ছিল দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তিনি মনে করেন, সুষ্ঠু নির্বাচনই হলো গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি এবং দেশাত্মবোধের প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত একটি প্রামাণ্যচিত্রে জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছবি না থাকাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলাকে তিনি ‘অনভিপ্রেত’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন যে, ভুলবশত এটি ঘটেছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এরপরও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিদেশি অতিথিদের সামনে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে হট্টগোল করা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে বলে তিনি ব্যথিত ও দুঃখিত হয়েছেন। অনুসারীদের শৃঙ্খলার সাথে আচরণ করার এবং নেতার নির্দেশ পালনের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরকে দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত জাদুঘর উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে তিনি সুদৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন যে, “কোনো ত্যাগ, কোনো সংগ্রাম কোনোদিন বৃথা যায় না। ইতিহাস কখনো মিথ্যা হয় না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান তারই উজ্জ্বল প্রমাণ।” মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দীর্ঘ প্রায় বিশ বছরের স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের চূড়ান্ত সার্থকতা ছিল এই জুলাই গণঅভ্যুত্থান।
এই আন্দোলনে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের সেই অসামান্য অবদান জাতীয় ইতিহাসে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। মন্ত্রী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গভীরতা ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, কীভাবে গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে দিয়ে একটি রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে সাধারণ জনগণের ওপর নৃশংস নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারে। তিনি জানান, সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের তরে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের লক্ষ্যেই এই বিশেষ জাদুঘরটি স্থাপন করা হয়েছে।
নিতাই রায় চৌধুরী আরও তথ্য প্রদান করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই এই স্মৃতি জাদুঘরের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে এটি আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। তিনি বলেন, এই জাদুঘরটি কেবল একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়, বরং এটি একটি নিয়মিত গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হবে। নতুন প্রজন্ম যেন এই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা, সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা এবং একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করতে পারে, সেখানে সেই পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অভূতপূর্ব সাফল্যের কথা স্মরণ করে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, এই আন্দোলন বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে জনরোষের মুখে মাত্র ২০ দিনের মাথায় একটি সুসংগঠিত ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। তাঁর মতে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট—এই সংক্ষিপ্ত সময়েই তাসের ঘরের মতো ধসে পড়েছিল স্বৈরাচারী শক্তির দীর্ঘদিনের সাজানো সাম্রাজ্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থান মূলত সেই অদম্য ইতিহাসেরই এক অবিনাশী নাম বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন। মূলত জুলাই আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দেওয়াই এই জাদুঘরের মূল অভীষ্ট।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্তব্য করেছেন যে, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ কেবল জুলাই অভ্যুত্থানের চিহ্ন নয়, বরং বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অনন্য প্রতিফলন। তিনি বিশ্বাস করেন, “এই জাদুঘর পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।”
বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সরকারপ্রধান বলেন, “জুলাই স্মৃতি জাদুঘর আগামী প্রজন্মের সামনে বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের মুখোশ উন্মোচ করবে।” জাতীয় স্মৃতিতে এদেশের মানুষের লড়াই, আত্মবিসর্জন ও বীরত্বকে ধরে রাখতে এটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই জাদুঘর আমাদের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ আর সাহসকে জাতীয় স্মৃতিতে ধারণ করার এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ।”
এ সময় আজকের দিনটিকে দেশের ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আজকের এই দিনটি দেশের জন্য যুগান্তকারী মাইলফলক। সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।”
বিগত শাসনের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, “ফ্যাসিবাদের আমলে গুম-খুনকে স্বাভাবিক করে ফেলা হয়েছিল।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “ইতিহাস স্বাক্ষী, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদ চক্র দেশে গণতান্ত্রিক শাসন মেনে নিতে পারেনি।”
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নবপ্রতিষ্ঠিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের পর এর বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী কক্ষগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পরিদর্শন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনার পর তিনি সেখানে সংরক্ষিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক নিদর্শন, অসামান্য আত্মত্যাগ এবং সংগ্রামের দালিলিক চিত্রগুলো অবলোকন করেন। সকাল ৯টায় ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক জাদুঘরের যাত্রা শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে নিয়ে জাদুঘরের প্রতিটি গ্যালারি ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে তিনি আন্দোলনের কালানুক্রমিক ঘটনাপ্রবাহ, দুর্লভ আলোকচিত্র এবং বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের বিভিন্ন স্মারক অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। জাদুঘরের সাজসজ্জা ও প্রদর্শনীতে গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন পর্যায় এবং মুক্তিকামী মানুষের বীরত্বগাথাকে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
অনুষ্ঠানে সরকারের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রীগণ, সামরিক ও বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহীদদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও আত্মত্যাগের সঠিক ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হৃদয়ে অমলিন রাখাই এই জাদুঘর স্থাপনের প্রধান লক্ষ্য। উল্লেখ্য যে, উদ্বোধনের দিনটি শুধুমাত্র বিশেষ অতিথি ও শহীদ পরিবারের জন্য সংরক্ষিত থাকলেও আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। মূলত আন্দোলনের চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই এই বিশেষ স্থাপত্যটি নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের লক্ষ্যে আজ সকালে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর শুভ উদ্বোধন করেছেন। বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী রক্তঝরা আন্দোলনের স্মৃতি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই বিশেষ জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আজ বুধবার সকাল ৯টায় প্রধানমন্ত্রী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এই জাদুঘরের দাপ্তরিক উদ্বোধন সম্পন্ন করেন।
এর আগে, গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাদুঘর উদ্বোধনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী কক্ষ ঘুরে দেখেন। তিনি সেখানে সংরক্ষিত দালিলিক প্রমাণ, দুর্লভ আলোকচিত্র এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন স্মারক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আন্দোলনের পরিক্রমা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী জানিয়েছেন যে, উদ্বোধনের দিনটি শুধুমাত্র আমন্ত্রিত বিশেষ অতিথি এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। তবে সাধারণ দর্শকদের জন্য ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ আগামী ৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার থেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। মূলত আন্দোলনের চেতনাকে জাগ্রত রাখা এবং জাতীয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে দৃশ্যমান করাই এই জাদুঘর স্থাপনের প্রধান লক্ষ্য।