২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ওই বছরের ১১ অক্টোবর সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গোপনে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে দেশবিরোধী কিছু মৌলবাদী সংগঠন।
আর তাদের মতের সঙ্গে না মিললেই সাধারণ শিক্ষার্থীরা বুলিং-র্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি গত ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন হলে ইফতার বিতরণ করার কারণে কিছু শিক্ষার্থীর এমন পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে। শনিবার (৩০ মার্চ) বিকেলে বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা এমন উদ্বেগজনক অভিযোগের কথা জানালেন।
তারা বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেই বা পরিচয় থাকলে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়; পরিবার নিয়েও অশালীন মন্তব্য করা হয় অনলাইন ও অফলাইনে। বিষয়গুলো নিয়ে কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করতে চাইলে ‘ছাত্রলীগ’ ট্যাগ দিয়ে তাকে বুয়েট থেকে বহিষ্কারের দাবি জানানো হয়।
এমন পরিস্থিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের লাভের গুড় যাচ্ছে কার ঘরে? দেশের অন্যতম মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের এই বিদ্যাপীঠে রাজনীতি বন্ধের সুযোগে তবে কি মৌলবাদের আখড়ায় পরিণত হবে!
আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ার পর ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নসহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করে। তবে ক্যাম্পাসে গোপনে কার্যক্রম চালায় ইসলামী ছাত্রশিবির ও হিজবুত তাহরিরসহ মৌলবাদী ছাত্রসংগঠনগুলো। মসজিদ কিংবা বিভিন্ন আড্ডায় সাংগঠনিক সভায়ও মিলিত হন এসব সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
সুনামগঞ্জের হাওরে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও নাশকতার অভিযোগে বুয়েটের প্রাক্তন এবং বর্তমান ৩৪ জন শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তাররা সবাই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। শিবিরের বুয়েট শাখার বায়তুল মাল সম্পাদক আফিফ আনোয়ারও ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। বর্তমানে তারা সবাই জামিনে রয়েছেন। কিন্তু থেমে নেই তাদের তৎপরতা। হাতেনাতে ধরা পড়ায় এই ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও ভেতরে ভেতরে রাষ্ট্রবিরোধী মৌলবাদী, জঙ্গিবাদভাবাপন্ন সংগঠন বুয়েটে বহু কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
তাদের মৌলবাদী ছাত্র সংগঠনগুলোর অনুসারী ও নেতা-কর্মীরা মুখে মুখে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কথা বললেও আদতে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছেন সন্তর্পণে। তারা তাদের স্বার্থে আবরার হত্যার আবেগকে কাজে লাগাচ্ছে।
গত ২৭ মার্চ বুয়েট ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার চত্বরে আসেন ছাত্রলীগের সভাপতি ও দপ্তর সম্পাদকসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। এর দুই দিন পর শুক্রবার বিকেলে বুয়েটের শহীদ মিনারের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিদপ্তরের পরিচালকের (ডিএসডব্লিউ) কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা লঙ্ঘন করে পুরকৌশল বিভাগের ২১তম ব্যাচের ছাত্র ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ হোসেন রাহিম ছাত্রলীগ নেতাদের ক্যাম্পাসে নিয়ে আসেন। ওই দিন রাতেই হলের সিট বাতিল করা হয় ইমতিয়াজের। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। এর সঙ্গে নতুন করে তারা আরও চারটি দাবি যুক্ত করেন। মোট পাঁচ দফা দাবিতে তারা এখন আন্দোলন করছেন।
ক্রিয়াশীল ছাত্ররাজনীতির স্বর্ণালী ইতিহাস সবার জানা। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, রক্ষা ও বাস্তবায়নে ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা অপরিসীম। শুধু তাই নয়, দেশের সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িকতা, সমতার সমাজ গঠনে দেশকে বারবার পথ দেখিয়েছে এই ছাত্ররাজনীতি। বুয়েটের ভূমিকাও সেখানে উল্লেখযোগ্য। তবে বারবার বুয়েটে সেই পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশের অন্যতম মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিরাজনীতিকীকরণের নামে মৌলবাদ নিজেদের ঘাঁটি গড়েছে সেখানে। যার মধ্য দিয়ে ছাত্রশিবিরের মতো সহিংস সংগঠনের শীর্ষপর্যায়ে উঠে এসেছেন বুয়েটের ছাত্ররা। প্রশ্ন হলো- কীভাবে এটি সম্ভব হয়েছে? দেখা গেছে, বুয়েটে রাজনীতি বন্ধের পক্ষে যারা বারবার বক্তব্য রাখছেন তারাও কোনো না কোনোভাবে মৌলবাদী রাজনীতিরই ধারক-বাহক।
বুয়েটে বর্তমানে মৌলবাদী ছাত্র সংগঠনগুলো বাধার শিকার না হলেও বাধা পাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তিগুলো।
সাম্প্রতিক আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থী নামধারীরা ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিতে উচ্চকিত হলেও বুয়েটে শিবিরের তৎপরতার বিষয়ে তারা নিশ্চুপ। এমনকি এই বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলেও, তারা এটি দেখার দায় চাপিয়ে দিয়েছেন প্রশাসনের ওপর; কিন্তু সমালোচনার মুখে শেষপর্যন্ত তারা শিবির ও হিজবুতের নাম নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার দাবি জানালেও এই দুই সংগঠনের নেতা-কর্মী কারা সেটি তারা জানে না বলে জানায়।
বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এই আন্দোলনের পুরো ইন্ধন জোগাচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির ও হিজবুত তাহ্রীরসহ মৌলবাদী ছাত্র সংগঠনগুলো এবং এক শ্রেণির শিক্ষক।
কিন্তু ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়নসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলো যেকোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলেই তার বিরোধিতা করেছে এই গোষ্ঠী।
সাম্প্রতিক তথ্য না পাওয়া গেলেও ২০১৩ সালের সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছিল, বুয়েট নিয়ে মৌলবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতার তথ্য। ওই বছরের নভেম্বরে বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের ২২৩, ৩০২, ৩২৪, ৩৩০ ও ৪১০ নম্বর রুম এবং আহসানউল্লাহ হলসহ বিভিন্ন হল থেকে বিপুল পরিমাণ জেহাদি বই ও শিবিরের সাংগঠনিক কার্যক্রমের বিবরণ-সংবলিত বেশ কিছু গোপন নথি পাওয়া যায়। গোপন কাগজপত্র থেকে জানা যায়, বুয়েটে সেবা নামের একটি সংগঠনের আড়ালে শিবির তাদের কর্মকাণ্ড সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে প্রচার ও প্রসার করত। এ রকম ‘মেধাবীদের খোঁজে’ নামক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন নামে বেনামে সংগঠন দাঁড় করিয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের তাদের দলে ভেড়ায় তারা। ওই সময় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের অংশ হিসেবে রাজপথে পুলিশের ওপর অতর্কিতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে আলোচিত ছিল ছাত্রশিবির।
বুয়েট ছাত্রশিবিরের গোপন নথি থেকে জানা গিয়েছিল, বুয়েটে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে শিবির বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পেছনে। ২০১০ সালে বুয়েটে শিবির অর্থ ব্যয় করেছে ৮ লাখ ৭০ হাজার ৩১৪ টাকা এবং ২০১১ সালে খরচ করে ১৩ লাখ ২৩ হাজার ২০০ টাকা। এই তৎপরতা চলমান। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, ছাত্ররাজনীতিমুক্ত বুয়েট ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসীদের দমিয়ে রেখে অন্ধকার রাজনীতি শিক্ষার্থীদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বুয়েটে শিবিরের কার্যক্রম চলছে তা স্বীকার করে নিয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি ড. শফিকুল ইসলাম। এটি জানার পরও সব শেষ সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। উল্টো কোনো প্রমাণ ছাড়াই শিবিরের সাবেক সভাপতির বক্তব্য দেওয়ায় এর প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে এক শিক্ষার্থীকে। অর্থাৎ শিবিরের সাবেক সভাপতির বক্তব্যও তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না বা আমলে নিতে চাইছেন না।
সম্প্রতি বুয়েট শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক আউটলুক ই-মেইলে পাঠানো হয়েছে হিজবুত তাহরিরের ই-মেইল। প্রাথমিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইলে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হওয়ার বার্তা পাঠানো হলেও সর্বশেষ তথ্য অনুসারে সব শিক্ষার্থীর রোল নম্বর ধরে একাধারে প্রেরণ করা হয় এসব ই-মেইল। কিন্তু বর্তমান আন্দোলনকারীরা এর কোনো প্রতিবাদ করেননি।
এদিকে এক রিট আবেদনের ওপর শুনানি শেষে গত ১ এপ্রিল বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করে ২০১৯ সালে জারি করা ওই প্রজ্ঞাপন কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের আদেশের পর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘বুয়েটে এখন থেকে ছাত্ররাজনীতি করায় আর কোনো বাধা থাকল না।’
এদিকে বুয়েটের উপাচার্য ড. সত্যপ্রসাদ মজুমদার বলেছেন, ‘আদালত যা বলবেন, তা আমাদের মানতে হবে। আদালতের আদেশ শিরোধার্য।’ তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনকে পারস্পরিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে এবং এ জন্য আলোচনা জরুরি। জাতি এখন ইতিবাচক ফলাফল দেখার অপেক্ষায়।
স্বাধীনতার পর এক ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ গত সাড়ে পাঁচ দশকে এক অসামান্য অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে শিল্প-কারখানা ও অবকাঠামো ছিল বিধ্বস্ত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় শূন্য, সেখানে ৫৫ বছরের ব্যবধানে দেশটি এখন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। আজ ১১ জুন ২০২৬, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মেয়াদে এটি তাঁর প্রথম বাজেট এবং স্বাধীনতার পর থেকে বাজেট পেশকারী ব্যক্তিদের তালিকায় তিনি ১৫তম ব্যক্তি হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।
বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নের ইতিহাস শুরু হয়েছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই। ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই মুজিবনগর সরকার যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয় নির্বাহে তিন মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট অনুমোদন করেছিল। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, যার আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকা। সেই বাজেটটি ছিল মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং খাদ্যসংকট মোকাবিলা করে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তোলার রূপরেখা। এরপর ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সময়ে বাজেট পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে দেশ ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের হাত ধরে। ১৯৯১ সালে তিনি ঐতিহাসিক ‘মূল্য সংযোজন কর’ বা ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেন এবং বাজার অর্থনীতি ও বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করে দেন। এর পরবর্তী সময়ে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার হাত ধরে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে বয়স্ক ভাতা চালু হয়, যা আজ এক বিশাল আকার ধারণ করেছে। বাজেটের আকারের ক্রমবিকাশ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো বাজেট ১ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে এবং ২০২৬ সালে এসে তা ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে এক অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
অতীতের সাফল্যের পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোও এই বাজেটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার ফলে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১২টি করে বাজেট দেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই বাজেট বাস্তবায়নকে বড় এক কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের এই ৫৫ বছরের বাজেট ইতিহাস কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রামাণ্য দলিল। শুরুতে যে চ্যালেঞ্জগুলো যেমন—রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণের সমস্যা ছিল, সেগুলো আজও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তবুও ৭১৯ কোটি টাকা থেকে শুরু করে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বিত অর্জন। তাজউদ্দীন আহমদের সেই পুনর্গঠনের স্বপ্ন থেকে শুরু হয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রাই এখন বাংলাদেশের সামনে বড় স্বপ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার প্রত্যাশার মধ্যেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন এবং ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’ দর্শনকে সামনে রেখেই সাজানো হয়েছে এই বাজেট। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত এ বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ। থাকছে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিগত সরকারের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর নানা কর্মপরিকল্পনা। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর বার্তা দিতে চায় সরকার।
অর্থনীতিকে পুনরায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে এনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলাই হতে যাচ্ছে এ বাজেটের প্রধান লক্ষ্য।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। দেশের ৫৫তম এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই বাজেটকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে’ বাংলাদেশের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরছে সরকার।
এবারের বাজাটে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ হারে আরোপিত উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও ভোগ্যপণ্য এই সুবিধার আওতায় আসবে। এর মধ্যে রয়েছে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পণ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যচাপ কমানোর লক্ষ্যেই উৎসে কর কমানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের একটি অংশে বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার এই জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপণ্যের বাজারকে আরও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসাই এর উদ্দেশ্য।
ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর ভরসা: বিশাল অঙ্কের এই বাজেটের খরচ সামলাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রধান অংশ (৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা) আদায় করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আয়ের পরও বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকেই সোয়া লাখ কোটি টাকার (১ লাখ ১২ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা) বেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বাকি অর্থ বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে।
মানবসম্পদ ও সামাজিক সুরক্ষায় সর্বোচ্চ জোর: প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথাগত বড় অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে কার্ডভিত্তিক বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির সম্প্রসারণসহ ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর ঘোষণা আসতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে এই বাজেটে।
ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য মেগা ধামাকা: নতুন বাজেটে প্রযুক্তিবান্ধব ফ্রিল্যান্সার এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের সুখবর ও বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব থাকছে। তরুণ ও যুবসমাজকে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য থাকছে ২ হাজার কোটি টাকার বিশাল তহবিল।
কর কাঠামো ও শুল্কে বড় পরিবর্তনের আভাস: সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলের উৎসে কর কমানোসহ বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব আসতে পারে। তবে, ধনিক শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা বা সারচার্জ বাড়তে পারে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ‘নবম পে-স্কেল’ বা নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ: চলতি বছরের মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে; সেখানে আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এই বিশাল অঙ্কের বাজেট বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কঠোর বাজার মনিটরিং এবং সঠিক মুদ্রানীতির সুষম সমন্বয় ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে শতভাগ সামঞ্জস্য রেখে এই কল্যাণমুখী বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দেওয়া শোকজের জবাবে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় প্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বেশি রয়েছে। বুধবার (১০ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল যে জবাব দিয়েছে, সেটি আমি পড়েছি। প্রয়োজনীয় তথ্যের বাইরে অনেক গল্প-কাহিনি তারা লিখেছে, যা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ব্যাখ্যা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তারা চার থেকে পাঁচ পৃষ্ঠার জবাব দিয়েছে, কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বেশি। এটি অনেকটা ভেগ (অস্পষ্ট) রিপ্লাই। আমি এতে সন্তুষ্ট নই। বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’
দেশের অর্থনীতি প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা (৪৫৬ বিলিয়ন ডলার)। বুধবার (১০ জুন) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সাময়িক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক হারের বিপরীতে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে নিম্নমুখী প্রবণতা।
কৃষি খাতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা আগের বছরের ২ দশমিক ৪২ শতাংশের তুলনায় দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। তবে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। সাময়িক হিসাবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ তুলনায় এবার দশমিক ৮৫ শতাংশ কম।
সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে জিডিপির সঙ্গে বিনিয়োগের অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। একইভাবে দেশজ সঞ্চয় কমে ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় কমে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে তাদের অনুদান দেবে নির্বাচন কমিশন ইসি।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
ইসি জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জারি করা এই নীতিমালার আওতায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে দুর্বৃত্তদের হামলা বা দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারালে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং আকস্মিক অসুস্থতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনে ও ভোটার তালিকা প্রণয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ, গুরুতর অসুস্থ, আহত, গুরুতর আহত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও মৃত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা অনুদান প্রদান নীতিমালায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে নিয়োজিত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আর্থিক সুবিধার সুবিধাভোগী হবেন।
এই নীতিমালার অধীনে অনুদানের হারকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দুর্বৃত্তদের হামলা অথবা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। একই কারণে কেউ গুরুতর আহত বা স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা, গুরুতর আহত বা সাময়িকভাবে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা এবং সাধারণ আহতের ক্ষেত্রে আঘাতের ধরন বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব পালনকালে কেউ যদি আকস্মিকভাবে অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবার সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা অনুদান পাবেন। এ ছাড়া আকস্মিক গুরুতর অসুস্থতা বা স্থায়ী অক্ষমতার জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা, সাময়িক অসুস্থতার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা, হাসপাতালে ভর্তির পর ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা এবং সাধারণ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, নীতিমালায় অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পরিবারের উত্তরাধিকার নির্ধারণের জন্য অর্থ বিভাগের সর্বশেষ সরকারি কর্মচারী পেনশন সহজীকরণ আদেশ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকে তবে অনুদানের টাকা তাদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে স্ত্রীদের যৌথভাবে আবেদন করতে হবে। তবে অনুদান পাওয়ার আগে স্বামী বা স্ত্রী পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে এই সুবিধা পাবেন না। মৃত ব্যক্তির কোনো স্বামী বা স্ত্রী জীবিত না থাকলে তার অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সি ছেলে বা অবিবাহিত মেয়ে এবং সন্তান না থাকলে বাবা-মা এই অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নাবালক সন্তান থাকলে অভিভাবক নির্ধারণের ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫ প্রযোজ্য হবে। এ ছাড়া অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে বাবা-মা বা ভাই-বোন এবং কোনো সন্তান না থাকলে স্বামী বা স্ত্রী অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক বাবা-মা বা অবিবাহিত ভাই-বোন সমহারে পাবেন। কোনো উপযুক্ত উত্তরাধিকারী না থাকলে বিবাহিত মেয়েরাও প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ আবেদন করতে পারবেন।
এ ছাড়া আর্থিক সহায়তার জন্য যেকোনো দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা অফিস প্রধানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিব বরাবর আবেদনপত্র পাঠাতে হবে। আবেদনের সঙ্গে নির্ধারিত আবেদন ফরম, আবেদনকারীর সত্যায়িত ছবি, উত্তরাধিকার সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং সিভিল সার্জন বা সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রদত্ত চিকিৎসাজনিত বা মৃত্যুর সনদ সংযুক্ত করতে হবে।
এই আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-১ উইংয়ের যুগ্ম সচিবকে সভাপতি এবং বাজেট ও অর্থ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিবকে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই ও সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটি প্রতি অর্থবছরে অন্তত দুইবার প্রাপ্ত আবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণপূর্বক সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। পরে এই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনসাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে এককালীন এই অনুদানের অর্থ সরাসরি দেওয়া হবে। প্রতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নিজস্ব বাজেট থেকে এই কল্যাণমূলক অনুদানের অর্থ সংস্থান করা হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, বর্তমান খসড়ার ভিত্তিতে কমিশন গঠিত হলে তা একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বুধবার (১০ জুন) এক বিবৃতিতে নিজেদের উদ্বেগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় সংস্থাটি।
টিআইবির মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে নতুন খসড়া আইনে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে, যা একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের জন-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘প্যারিস নীতিমালা’র মানদণ্ডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২০২৫ সালের অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে এবং এটি সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনে থাকবে না। তবে নতুন খসড়া আইন থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। টিআইবির আশঙ্কা, এর ফলে কমিশনের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রত্যক্ষ প্রভাব বৃদ্ধি পাবে এবং এটি স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা হারাবে।’
কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত বাছাই কমিটির কাঠামো নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। খসড়া আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী গঠিত এই বাছাই কমিটিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার, দুজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
টিআইবি বলছে, ‘এই কাঠামোর কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণভাবে সরকারি দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে কমিশনের নিরপেক্ষতা যেমন ক্ষুণ্ণ হবে, তেমনি স্বার্থের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে।’ এর বদলে বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরপেক্ষ করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
কমিশনের কার্যপরিধি ও ক্ষমতার বিষয়ে টিআইবি জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সম্ভাব্য আটককেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত অনুসন্ধান ও পরিদর্শনের অবাধ ক্ষমতা কমিশনকে দিতে হবে। গুম, নির্যাতন ও বেআইনি আটকের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত করার বিধান আইনে স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের ক্ষেত্রে সরকারের আগাম অনুমতির যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা বাতিল করে আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশনের অনুমতিকেই যথেষ্ট হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে টিআইবি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, কমিশনে অন্তত একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং কমপক্ষে দুজন নারী কমিশনার রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে; কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি নিয়ে কমিশনার হওয়ার সুযোগ বাতিল করে দলনিরপেক্ষতা, সততা ও মানবাধিকার বিষয়ে সুস্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে; সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের সীমা বিদ্যমান ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে; কমিশনের বাজেট যাতে সম্পূর্ণরূপে সরকারি নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল না থাকে, সে জন্য আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আইনি বিধান থাকতে হবে।
একটি কার্যকর ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের গুরুত্ব তুলে ধরে টিআইবি সতর্ক করেছে, কমিশন যদি তার স্বাধীনতা হারায় তবে তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপরই পড়বে না, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংকটে ফেলবে। এর ভুক্তভোগী ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষই হতে পারে।
সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুরক্ষায় টিআইবিসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে খসড়া আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্বে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে আরও আধুনিক, দূরদর্শী ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্ব পালনের জন্য সরকার সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নে পর্যায়ক্রমিকভাবে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বুধবার (১০ জুন) ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কথা জানান।
এদিন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় সুদানে শাহাদাতবরণকারী ছয় সেনাসদস্যের স্ত্রীদের হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বিশ্বশান্তি রক্ষায় অসামান্য অবদান রাখা এবং কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গকারী বীর শান্তিরক্ষীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেওয়া সদস্যদের সঙ্গে ভার্চুয়াল কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রতি বছর ২৯ মে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হয়। কিন্তু এবার বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি থাকায় গতকাল বুধবার দিবসটি পালন করা হয়।
বাংলাদেশ ১৯৮৮ সালে থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশি ১৭৫ জন শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের শুরুতে বিশ্বে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে শহীদ সৈন্যদের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের এই আত্মত্যাগ প্রমাণ করে, শুধু মাতৃভূমির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বই নয়; জাতিসংঘের পতাকাতলে শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যেকোনো মূল্যে শান্তিরক্ষায় বদ্ধপরিকর।’
বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা শত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে যে গৌরব ও কৃতিত্ব অর্জন করেছেন, তা–ও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের অবকাঠামো বদলে দিতে বিগত সরকারের আমলে নেওয়া হয়েছিল একের পর এক মেগা প্রকল্প। ওইসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সময় ও ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সামনে এসেছে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ। ফলে প্রকল্পগুলোর ঋণ, সুদ ও আর্থিক দায় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি সরকার। ফলে পুরোনোতে বাড়ছে চাপ, নতুন প্রকল্প নিতে রয়েছে ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ।
উন্নয়নের গল্প লিখতে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই উন্নয়নের গল্পে যুক্ত হয়েছে আরেকটি অধ্যায়- অস্বাভাবিক ব্যয়, কালক্ষেপণ ও অনিয়মের অভিযোগ। যে কারণে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের অন্যতম বড় খাত হয়ে উঠেছে ঋণের বিশাল অঙ্ক। দ্রুত বাস্তবায়নের নামে বিশেষ সুবিধা দিয়ে ফাস্ট-ট্র্যাকে আনা হয় ১০টি মেগা প্রকল্প। লক্ষ্য ছিল দ্রুত উন্নয়ন। সেই তাড়াহুড়োর সুযোগেই তৈরি হয়েছে জবাবদিহিতার বড় শূন্যতা।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ফাস্ট-ট্র্যাক প্রকল্প না বলে এটাকে ফাস্ট-ট্র্যাক দুর্নীতির সুযোগ হিসেবে বলা যেতে পারে। আমরা মনে করি, বাস্তবে সেটাই ঘটেছে। এ ধরনের ফাস্ট-ট্র্যাক দুর্নীতি যেন আর না হয়, তা নিশ্চিত করাটা সরকারের দায়িত্ব।’
এই যখন আগের মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবতা, তখন গুরুত্বপূর্ণ হলেও নতুন করে মেগা প্রকল্প হাতে নিতে পেছন ফিরে তাকাতে হচ্ছে বিএনপি সরকারকে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নে ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তারা। প্রথমত, পূর্ববর্তী মেগা প্রকল্পগুলোর বিপুল ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কঠোর শর্ত, বাড়তি নজরদারি এবং উচ্চ সুদের হার। তৃতীয়ত, নতুন অর্থায়নে উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান।
বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় সহযোগী জাইকার ঋণের সুদের হার এরই মধ্যে ২.৩৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.০৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা গত ১৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছে। পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, ‘একটি বিশাল ভূমিকম্পের পর এই সরকার এসেছে। সুতরাং আগে কী কী ঘটেছিল এবং বাংলাদেশে কী ধরনের ব্যাপক দুর্নীতি হলে সরকারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেগুলো বর্তমান সরকারের স্মৃতিতে খুবই উজ্জ্বলভাবে রয়েছে। এ অভিজ্ঞতাই তাদেরকে পথ দেখাবে।
শুধু মেগা প্রকল্পই নয়, নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে একনেক সভায় পুরোনো ও সংশোধিত প্রকল্পগুলোই বেশি অনুমোদন পেয়েছে। নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। একদিকে পুরোনো প্রকল্পের ঋণের চাপ, অন্যদিকে অনিয়মের দায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থায়নের অনিশ্চয়তা। ফলে নতুন মেগা প্রকল্পের পথে সরকারের সামনে শুধু আর্থিক সংকটই নয়, আস্থা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনার বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে।’
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিষ্টার ফারজানা শারমীন বলেছেন, নারী ও শিশুর সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে নীতিনির্ধারক, সুশীল সমাজ ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্র: নারীর নিরাপদ শিক্ষা ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিতে জাতীয় কাঠামো প্রণয়ন’ শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
বিশ্বব্যাংকের আমব্রেলা ফ্যাসিলিটি ফর জেন্ডার ইকুয়ালিটি, ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের থিংকিং, ইনোভেশন অ্যান্ড জেন্ডার ল্যাবের যৌথ উদ্যোগে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
ফারজানা শারমীন বলেন, ‘নারী ও শিশুর সুরক্ষায় কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার প্রদান করতে হবে। আমরা সবসময় নির্যাতনের পরে আইনগত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে তৎপর হই। কিন্তু অপরাধের পেছনের মূল কারণগুলো অনুসন্ধান করি না এবং অপরাধ নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করি না। অপরাধীরা এই সুযোগ ব্যবহার করছে। আমাদেরকে এখন শেকড়ে হাত দিতে হবে। আইন ও নীতির কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় মনোযোগ দেওয়া।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ক্যাথরিন ব্রিন কামকং, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন এবং বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সাবাহ মইন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের থিংকিং, ইনোভেশন অ্যান্ড জেন্ডার ল্যাবের প্রধান ড. সায়েদ শায়েখ ইমতিয়াজ। স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন ড. সোমা দে।
২০২৭ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির জন্য শিল্প ও সংস্কৃতি পাঠ্যবইয়ে ৪টি অধ্যায়ে চারু ও কারুকলা, সংগীত, নৃত্যকলা এবং নাট্যকলা অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলামে এই বিষয়গুলো পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হবে। বুধবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। সভায় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা ও চারুকলা বিভাগের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত, নৃত্যকলা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার সম্প্রসারণ, নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন এবং দক্ষ শিক্ষক তৈরির লক্ষ্যে এই সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত, নৃত্যকলা ও ক্রীড়াভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণের ফলে ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক বিশেষায়িত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হবে। এতে সংগীত, নৃত্যকলা, চারুকলা, নাট্যকলা ও ক্রীড়া বিষয়ে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং এসব বিষয়ে একটি টেকসই ক্যারিয়ার পাথওয়ে গড়ে উঠবে। আগামী ৫ বছরে এ খাতে প্রায় ৫০-৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতা কামনা করে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আমরা চাই আপনাদের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। সে লক্ষ্যে কীভাবে তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষকতা-সম্পর্কিত প্রস্তুতি যুক্ত করা যায় এবং কীভাবে যৌথভাবে দক্ষ শিক্ষক তৈরি করা যায়—সেসব বিষয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই সংগীত, নাট্যকলা ও নৃত্যকলাকে শুধু সহশিক্ষা কার্যক্রম হিসেবে নয়; বরং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। এ জন্য কারিকুলাম উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক তৈরির বিষয়ে এখন থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।’
সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব, দেশের ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মহাপরিচালক মি. গিলবার্ট হুংবোর সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বুধবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।
বৈঠকে মন্ত্রী শোভন কাজ, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইএলওর নেতৃত্ব ও অবদানের প্রশংসা করেন। তিনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
মন্ত্রী সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য আইএলওর বৈশ্বিক জোট গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আইএলওর সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
বৈঠকে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৩৯টি আইএলও কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে এবং এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে সকল মৌলিক আইএলও কনভেনশন অনুসমর্থনের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তিনি শ্রম খাত সংস্কার ও জাতীয় ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদ গঠনের অগ্রগতি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আইএলওতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার ইতিবাচক নিষ্পত্তির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
মন্ত্রী আইএলও মহাপরিচালককে বাংলাদেশ সফর করে বাংলাদেশের চলমান শ্রম খাত সংস্কার কার্যক্রম এবং শ্রমিক কল্যাণে গৃহীত উদ্যোগগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের আহ্বান জানান।
আইএলও মহাপরিচালক বাংলাদেশের শ্রম খাতে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আইএলওর দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ জানান এবং সম্ভাব্য সফরের বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সমন্বয় অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উদযাপিত হয়েছে। সরকারি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ২৯ মে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি থাকায় শুধু এ বছরের জন্য বুধবার (১০ জুন) দিবসটি উদযাপিত হয়েছে।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বিশ্বের সব দেশের শান্তিরক্ষীদের অসামান্য অবদানকে এই দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বুধবার এ কথা বলা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, পুলিশের মহাপরিদর্শক, জাতিসংঘের মহাসচিব এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী পৃথক পৃথক বাণী প্রদান করেছেন, যা ক্রোড়পত্র আকারে দেশের বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে।
এ বছর আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসে প্রতিপাদ্য হলো Invest in Peace। আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবসের কর্মসূচীর অংশ হিসেবে গতকাল বুধবার সকালে সেনাকুঞ্জ, ঢাকা সেনানিবাসের শাহাদাতবরণকারী শান্তিরক্ষীদের পরিবার এবং আহত শান্তিরক্ষীদের বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
সেনাকুঞ্জে পবিত্র কোরআন তেলওয়াতের মাধ্যমে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরুর পর শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দায়িত্বপালনকালীন শাহাদাতবরণকারীদের জন্য দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ওপর বিশেষ উপস্থাপনার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী ‘ক্যারল ফ্লোর-স্মেরেঝনিয়াক’ জ্যেষ্ঠতম শান্তিরক্ষী হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বক্তব্য প্রদান করেন। এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
সবশেষে, প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সব শান্তিরক্ষীদের প্রতি শুভেচ্ছা ও গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘সংঘাত, সহিংসতা এবং মানবিক সংকটে আক্রান্ত অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে শান্তিরক্ষীরা অসীম সাহস, ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। পরিবার-পরিজন থেকে বহুদূরে অবস্থান করে শত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা ও কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে তাদের এই মানবিক দায়িত্ব পালন করতে হয়।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেসব সাহসী শান্তিরক্ষী জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ একই সঙ্গে তিনি শাহাদাতবরণকারী শান্তিরক্ষীদের পরিবার ও আহত শান্তিরক্ষী সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শাহাদাতবরণকারী বীর সদস্যদের পরিবার ও আহত শান্তিরক্ষীদের হাতে বিশেষ সম্মাননা স্মারক তুলে দেন। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে কর্তব্য পালনকালে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর বাংলাদেশের ছয়জন বীর শান্তিরক্ষীকে মরণোত্তর ‘দাগ হ্যামারশোল্ড’ পদকে ভূষিত করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে, প্রধানমন্ত্রী ভিডিও টেলিকনফারেন্স (ভিটিসি)-এর মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োজিত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যর মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনৈতিক, তিন বাহিনী প্রধান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, পুলিশের মহাপরিদর্শক (রুটিন দায়িত্ব), বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরার লক্ষ্যে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ টকশো প্রচারিত হয়েছে। এ ছাড়া International Day of United Nations Peacekeepers Journal-এর ১২তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আজ (বুধবার) বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৪৯(১)(ঘ)(আ) অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আশ্রাফুল আলমকে ইসলামী ব্যাংকের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মো. আশ্রাফুল আলম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অংশ নেবেন। পাশাপাশি ব্যাংকের কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য, মতামত ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগের এ উদ্যোগ ব্যাংকটির কার্যক্রমে আস্থা ও শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটির বিভিন্ন শাখায় অস্থিরতা দেখা দেয়। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেক গ্রাহক। এ সময় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমানতও তুলে নেওয়া হয়। এতে ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি ও স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ব্যাংক খাতে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরাও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের যেকোনো অস্থিরতা পুরো ব্যাংক খাতেই প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। তারই ধারাবাহিকতায় ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত এলো।