তীব্র দাবদাহে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত প্রায়। গরমে মানুষ হাপিত্যেশ অবস্থায় আছেন। মৌসুমের বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় সর্বত্রে ভ্যাপসা গরম বিরাজ করছে। এতে করে মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও খুব ঘামতে দেখা যাচ্ছে। রোদের তীব্রতা বেশি হওয়ায় খুব অল্পতেই মানুষ হয়রান হয়ে যাচ্ছে। ফলে শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। তাদের আয়-রোজগার বন্ধের উপক্রম। কাজের জন্য ঘরের বাইরে যেতে পারছেন না। আর একান্তই যাদের বাইরে বের হতে হচ্ছে তারা বেশিক্ষণ কাজ করতে পারছেন না। রাজধানীতেও গত কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি ছুই ছুই করছে।
বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদের মাধ্যমে জানা যায়, রাজশাহী, পাবনা, বাগেরহাট, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তীব্র দাবদাহ। এ ছাড়া মৌলভীবাজার জেলাসহ রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের অবশিষ্টাংশ এবং ঢাকা, রংপুর ও বরিশাল বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা আজ এবং আগামীকাল রোববারও অব্যাহত থাকতে পারে বলে আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে। আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক স্বাক্ষরিত সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, ‘দেশের ওপর দিয়ে চলমান দাবদাহ আজ ও আগামীকালও অব্যাহত থাকতে পারে এবং তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি বৃদ্ধি পেতে পারে।’
এদিকে দৈনিক বাংলার চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায় ৪১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। টানা তিন দিন থেকে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে সেই জেলায়। টানা দাবদাহে অতিষ্ঠ সেখানকার জনপদ। অসহ্য গরমে ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে প্রাণিকূল। জেলার হাসপাতালে বেড়েছে গরমজনিত রোগীর সংখ্যা। তীব্র তাপে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন-আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। প্রয়োজনের তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়ে কাজও করতে পারছেন না তারা। তীব্র দাবদাহে জনসাধারণকে সচেতন করতে ‘হিট এলার্ট’ জারি করেছে জেলা প্রশাসন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে পথচারী ও এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয়। খুব প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে বের হতে নিষেধ করা হয় সেই ঘোষণায়। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে বাড়িত সতর্কতা অবলম্বন করতে অনুরোধও করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান বলেন, ‘আরও কয়েকদিন এমন দাবদাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এখনই এই এলাকায় বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই।’
অন্যদিকে পাবনার ঈশ্বরদীতে লাগাতার তাপপ্রবাহে চরম দুর্ভোগে রয়েছে সেখানকার মানুষজন। ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। এ অবস্থায় বেড়েছে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা। খুব প্রয়োজন না হলে বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তাররা। ঘরে-বাইরে অসহ্য গরম। প্রকৃতিতে গরম বাতাসে বইছে। ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিসের সহকারী পর্যবেক্ষক নাজমুল হক রঞ্জন জানান, গতকাল শুক্রবার বিকাল ৩টায় ঈশ্বরদীতে ৪১ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২৩ সালে এই দিনে ঈশ্বরদীর তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি রেকর্ড হয়েছিল। এর আগে জেলায় সর্বোচ্চ বুধবার ৪০ দশমিক ৫ ও বৃহস্পতিবার ৩৯ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুবীর কুমার দাশ গণমাধ্যমকে বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ঈশ্বরদীর ওপর দিয়ে তীব্র ও মাঝারি দাবদাহ প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লোকজন যেন এই রোদে ঘর থেকে বের না হয় এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পান করে ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
প্রখর রোদে ঘাম ঝরানো তাপমাত্রার কারণে শ্রমজীবী মানুষ পড়েছেন চরম বিপাকে। শিশুদের গরমের তীব্রতায় দীর্ঘসময় ধরে পুকুরে নেমে ঝাপাঝাপি করতে দেখা গেছে। তীব্র খরায় ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। ফলে উপজেলাজুড়ে তীব্র পানি সংকটও দেখা দিয়েছে।
রাজশাহীতে দাবদাহে হাসপাতালে রোগীর চাপ
রাজশাহী অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি ও তীব্র দাবদাহ। ফলে রোদ-গরমে নাভিশ্বাস উঠেছে জনজীবনে। যার প্রভাব পড়েছে জনস্বাস্থ্যের ওপরও। এতে করে জেলায় বাড়ছে জ্বর, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া। চিকিৎসকরা জানান, গরমের কারণে ডায়রিয়ার সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা এই রোগে বেশি ভুক্তভোগী হয়। রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামীম আহাম্মদ বলেন, আবহওয়াজনিত কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা রাখা হয়েছে।
রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. আবু সাঈদ মোহাম্মদ ফারুক বলেন, উপজেলা পর্যায়েও ডায়রিয়া রোগী আসছে। তবে মহামারি আকার ধারণ করেনি। আসলে মানুষ অস্বাস্থ্যকর খাবার বেশি খাচ্ছে। রাস্তার ধারের অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার প্রতি মানুষের সচেতনতা না বাড়লে ডায়রিয়া মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যাবে। আমরা চিকিৎসার পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালাচ্ছি।
হিট অ্যালার্ট: সচেতন থাকতে হবে
দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দাবদাহে গরম আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কায় ‘হিট অ্যালার্ট’ দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। তীব্র গরমে খেটে খাওয়া মানুষেরা পড়েছেন চরম ভোগান্তি ও ঝুঁকিতে। কর্মজীবীদের দুর্ভোগ বেড়েছে অন্য সবার চেয়ে বেশি। গরমে যেসব রোগ দেখা দেয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো- ডায়রিয়া, পেটের পীড়া, জ্বর-কাশি, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোক ইত্যাদি। এ পরিস্থিতিতে একটু অসতর্কতায় ঘটতে পারে বিপদ। দাবদাহে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে অসুস্থ, বয়স্ক ও শিশুরা। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি ও তরল খাবার গ্রহণের পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
তীব্র গরমের এমন অবস্থায় কীভাবে সুস্থ থাকা যায় জানতে চাইলে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘এই গরমে আমাদের বেশ সাবধানতায় চলাফেরা করতে হবে। বিশেষ করে বাসার বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং কোনো রোগী থাকলে তাদের দিকে আলাদা যত্ন নিতে হবে। এই সময়ে অবশ্যই প্রচুর পানি খেতে হবে। যাদের হৃদরোগসহ জটিল রোগ আছে তারা একেবারেই প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হওয়ার প্রয়োজন নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই সময়ে বেশি রোদে কাজ করা যাবে না। গরমে শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে বেশি লবণ বেরিয়ে যায়, তাই লেবুর শরবত এবং হালকা লবণ দিয়ে পানি কিংবা স্যালাইন অল্প পরিমাণে খাওয়া যাবে। গরমে কারও শরীর বেশি খারাপ লাগলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।’
এই সময়ে ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং রোদে বের হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে জোর দিয়েছেন চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে ঘরে যেন পর্যাপ্ত বাতাস প্রবেশ করে, সে জন্য দরজা জানালা খোলা রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আজ ও কালকের আবহাওয়ার পূর্বাভাস
আবহাওয়া অধিদপ্তর শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে সিনপটিক অবস্থা নিয়ে বলেছে, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে রয়েছে। দাবদাহের বিষয়ে বলা হয়, বাগেরহাট, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে তীব্র দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে দিনাজপুর, রাঙ্গামাটি, চাঁদপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা এবং ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকতে পারে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলা বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া দেশের অন্যত্র অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে।
বাগেরহাট, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলা সমূহের উপর দিয়ে তীব্র দাবদাহ এবং দিনাজপুর, রাঙামাটি, চাঁদপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলাসহ ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে।
সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা বাড়তে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে অস্বস্তি বাড়তে পারে।
একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইতোমধ্যে তাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে নওগাঁ-৬ আসনের সরকারি দলের সদস্য শেখ মো. রেজাউল ইসলামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সংসদকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন তিনি। সংসদে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে তিনি বলেন, সরকার একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী আরও জানান যে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সকল কারিগরি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কমিশন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি সংসদকে অবহিত করেন।
এদিকে, ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত গাইবান্ধা-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল করিমের এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কোনো সক্রিয় পরিকল্পনা সরকারের নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মহলে যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, মন্ত্রীর এই বক্তব্যের মাধ্যমে তার একটি আনুষ্ঠানিক বার্তা পাওয়া গেল। আজ সকালের অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এই প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশালাকার বাজেট পাস করা হয়েছে। নতুন এই বাজেট বুধবার (১ জুলাই) থেকে সারা দেশে কার্যকর হতে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে এই বাজেট অনুমোদিত হয়। এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের করের বোঝা কমানোসহ বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ রদবদল আনা হয়েছে।
এর আগে সোমবার (২৯ জুন) প্রয়োজনীয় কয়েকটি সংশোধনীর মাধ্যমে অর্থবিল পাস করে জাতীয় সংসদ। সংশোধিত এই বিলে সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি দিতে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিষয় আবাসন খাতে বিনা প্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগটি এবার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজের ওপর আরোপিত করপোরেট কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থবিল পাসের মাধ্যমেই কর ও শুল্ক সংক্রান্ত এসব গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন চূড়ান্ত করা হলো।
গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বাজেট পাসের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সোমবার সংসদ অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। বুধবার থেকে নতুন এই অর্থবছরের সকল কার্যক্রম ও আর্থিক পরিকল্পনা কার্যকর হবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের সুদৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে জনস্বার্থ ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেই এই প্রকল্প সম্পন্ন করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জনগণ এবং নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এতে অন্য কোনো দেশের ‘কনসার্ন’ থাকার সুযোগ নেই।’
তথ্য উপদেষ্টা উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর তিস্তা নদীর প্রভাব তুলে ধরে বলেন, বর্ষাকালে নদীভাঙন এবং গ্রীষ্মে পানির তীব্র সংকট এই অঞ্চলের মানুষের জন্য এক মানবিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। এই সংকট নিরসনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় নদী শাসন, ড্রেজিং এবং পানি সংরক্ষণের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের কাজে চীনের বিশেষ দক্ষতা ও পর্যাপ্ত তহবিল রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই কাজ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
প্রকল্পটি নিয়ে উদ্ভূত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ হিসেবে জণগণ ও তার নিজস্ব স্বার্থে পদক্ষেপ নেবে। এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রকাশের অধিকার রাষ্ট্রের রয়েছে। আমাদের এই উন্নয়নমূলক পদক্ষেপে অন্য কোনো দেশের কনসার্ন হওয়ার কারণ দেখি না। ভারত বা অন্য যেকোনো দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই এনগেজ করবে। যদি কারো কোনো সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা কনসার্ন থাকেও, বাংলাদেশ তা মাথায় রাখবে। এসব সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো আপস না করেই কাজ করবে।’ তিনি আরও বলেন, বিগত সরকারগুলোর সময় জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বৈদেশিক সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করা হলেও বর্তমান প্রশাসন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং যেকোনো দেশের সঙ্গে এখন পারস্পরিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই কাজ করা হবে।
অভিন্ন নদীর পানির হিস্যার বিষয়ে উপদেষ্টা নিশ্চিত করে বলেন যে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ কোনোভাবেই ন্যায্য অধিকার ছেড়ে দেওয়া নয়। তাঁর ভাষায়, ‘এই প্রকল্প বা ব্যারাজ নির্মাণের অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি করা ছেড়ে দিচ্ছে। আমরা তিস্তা ও গঙ্গাসহ অভিন্ন ৫৩টি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। তবে নদী শাসন ও সুরক্ষায় অভ্যন্তরীণ ডাউনস্ট্রিম ব্যারাজ প্রকল্পের কাজ নিজেদের স্বার্থেই দ্রুত করতে হবে।’
এ ছাড়া ব্রিফিংকালে তথ্য উপদেষ্টা আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীনতা এবং নতুন তথ্য কমিশন গঠনের অগ্রগতির বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি এই জানাজায় যোগ দিতে তেহরান সফরে যাচ্ছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। ৪ জুলাই থেকে শুরু হতে যাওয়া খামেনির দীর্ঘ শোক ও বিদায় কর্মসূচিতে স্পিকার সশরীরে উপস্থিত থাকবেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর এক যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ খামেনি তার পরিবারের সদস্যসহ নিহত হন। মৃত্যুর আগে তিনি টানা ৩৬ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার মৃত্যুতে দেশটিতে কয়েক দিনব্যাপী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সূচি অনুযায়ী, আগামী ৪ জুলাই খামেনির প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ৭ জুলাই কোম শহরে দ্বিতীয় জানাজা শেষে ৯ জুলাই মাশহাদে তাকে সমাহিত করার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার পর বাংলাদেশের স্পিকারের এই সফর নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি সেখানে মরহুমের জানাজায় অংশগ্রহণ করবেন এবং শোকসন্তপ্ত ইরানি জনগণের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করবেন। আন্তর্জাতিক এই শোকযাত্রায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের অভিশাপ জলাবদ্ধতা সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সমন্বিতভাবে একাধিক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এবং খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সরকার বর্তমানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
সংসদকে অবহিত করে মন্ত্রী বলেন, “রাজধানীর জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ১০৮টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করে সেগুলোর স্থায়ী সমাধানে কাজ করছে। একই সঙ্গে ১০টি অঞ্চলে ২১টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) গঠন করা হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এসব দল নিয়মিত পিট, ক্যাচপিট, ড্রেনেজ লাইন ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো পরিষ্কার করছে, যার ফলে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা দ্রুত কমে এসেছে।” অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, গত অর্থবছর ডিএনসিসি ১১০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা ও নর্দমা নির্মাণ করেছে এবং আগামী অর্থবছরে আরও বিস্তৃত পরিসরে এই উন্নয়ন কাজ পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ দখল রোধে খালের সীমানা নির্ধারণে এক হাজার ১৮১টি পিলার স্থাপন করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল—এই তিনটি আউটলেটের মাধ্যমে ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করা হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।” এই সংকট নিরসনে দ্রুত আরও দুটি নতুন আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সদরঘাট পর্যন্ত একটি বৃহৎ নর্দমা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, নিউমার্কেট, গ্রিন রোড ও শান্তিনগরসহ ৩৩টি প্রধান জলাবদ্ধ এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে নিয়মিত নর্দমা পরিষ্কার ও পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থায়নে কালুনগর, শ্যামপুর, জিরানী ও মান্ডা খালের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
একই অধিবেশনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী জানান, প্রবাসীদের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে আইটি-নির্ভর বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) প্রথমবারের মতো আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার আওতায় ভোটার নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) পদ্ধতি চালু করেছে।” আসন্ন জাতীয় নির্বাচনেও এই সুবিধা অব্যাহত থাকবে এবং সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রবাসীকে এর আওতায় আনতে নির্বাচন কমিশন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে আজ সকাল ১১টা ৪ মিনিটে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে এই সংসদ অধিবেশন শুরু হয়।
হিমালয়ের বরফগলা জলধারা থেকে উৎপত্তি হয়ে যে নদীটি সিকিম আর পশ্চিমবঙ্গ ছুঁয়ে বাংলাদেশের উত্তর জনপদে প্রবেশ করেছে, তার নাম তিস্তা। এককালে এই নদীকে বলা হতো ‘উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা’। কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে তিস্তা রূপ নিয়েছে দুঃখ, বঞ্চনা আর কান্নার অপর নাম। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ধূ ধূ মরুভূমি, আর বর্ষায় উজানের ঢলে সর্বগ্রাসী বন্যা—এই দুই চরম সংকটের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা। এই মরণফাঁদ থেকে উত্তরবঙ্গকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ সরকার হাতে নিয়েছে এক যুগান্তকারী ও চোখধাঁধানো রূপরেখা—‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বা ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’।
সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এই প্রকল্পকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, ‘নদী, খাল ও সেচ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তারেক রহমান বলেন, ‘বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয় পানি। সংসদ সদস্যরা নিয়মিত পদ্মা ও তিস্তা নদী নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। আমরা এসব সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি।’
সারা বছর কৃষির জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিসহ অন্যান্য খাতে তা ব্যবহার করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা হবে। যেন পুরো শুষ্ক মৌসুম এবং বছরের অন্যান্য সময় কৃষি ও প্রয়োজনীয় খাতে সেই পানি সরবরাহ করা যায়।’
কী আছে এই মহাপরিকল্পনায় : তিস্তা মহাপরিকল্পনা হলো মূলত প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রজেক্ট, যা চীনের ‘হোয়াংহো’ নদীর সফল ব্যবস্থাপনার আদলে তৈরি করা হয়েছে। ২০১৬ সালের একটি স্মারক চুক্তির মাধ্যমে এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। এই মহাপরিকল্পনায় নদী শাসনের প্রথম ধাপ হিসেবে তিস্তা নদীর প্রায় ১০২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ড্রেজিং করা হবে। নদীর গভীরতা ১০ মিটার পর্যন্ত বাড়ানো হবে, যাতে বর্ষার অতিরিক্ত পানি নদী নিজের বুকেই ধরে রাখতে পারে। নদীর দুই তীরে ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও শক্তিশালী গাইড বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এর ফলে প্রতি বছরের চিরচেনা নদীভাঙন চিরতরে বন্ধ হবে। নদীকে একটি নির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত সীমানার মধ্যে এনে প্রায় ১৭১ বর্গকিলোমিটার চরভূমি (যা আগে নদীগর্ভে বিলীন ছিল) উদ্ধার করা হবে। উদ্ধার হওয়া এই বিশাল জমিতে গড়ে উঠবে অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট শহর, পাঁচতারকা হোটেল, রিসোর্ট, বিনোদন কেন্দ্র এবং মেরিন ড্রাইভ। এছাড়া থাকবে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট এবং অসংখ্য কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা।
কেন এই মহাপরিকল্পনা : বাংলাদেশে তিস্তার গতিপথ ১১৫ কিলোমিটার, যার মধ্যে ৪৫ কিলোমিটার তীরভূমি চরম ক্ষয়প্রবণ।ক) শুষ্ক মৌসুমের মরুভূমি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকটশুষ্ক মৌসুমে ভারতের গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে একতরফাভাবে পানি আটকে রাখার ফলে তিস্তা বাংলাদেশ অংশে কঙ্কালসার হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (IFPRI) মতে, পানির অভাবে এই অঞ্চলে বার্ষিক প্রায় ১৫ লাখ টন ধান উৎপাদন ব্যাহত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ায় তীব্র পানির সংকট তৈরি হয়। খ) বর্ষার উন্মত্ততা ও অর্থনৈতিক ক্ষতিআবার বর্ষাকালে যখন ভারতে পানির চাপ বাড়ে, তখন গজলডোবা বাঁধের সবগুলো গেট একসাথে খুলে দেওয়া হয়। আকস্মিক বন্যায় তলিয়ে যায় লাখো মানুষের ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষেত। প্রতি বছর এই বন্যার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৮৩ সালের অন্তর্বর্তী চুক্তি কিংবা ২০১১ সালের সমান ভাগের খসড়া চুক্তি—কোনোটিই পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে আলোর মুখ দেখেনি। এই স্থায়ী অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার জন্ম।
চীনের আগ্রহ ও ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI): চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ কোম্পানি প্রায় ৩ বছর ধরে তিস্তা অববাহিকায় ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সমীক্ষা চালিয়েছে। চীন এই প্রকল্পের সিংহভাগ (প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা) ঋণ দিতে এবং কারিগরি সহায়তা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। এর মাধ্যমে চীন মূলত তাদের বৈশ্বিক ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোরে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চায়।
ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ: ‘চিকেনস নেক’ আতঙ্কচীন যখনই টাকা নিয়ে প্রস্তুত, তখনই তীব্র আপত্তি তোলে নয়াদিল্লি। কারণ, তিস্তা প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছে। মাত্র ২১ থেকে ২৫ কিলোমিটার চওড়া এই করিডোরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে (সেভেন সিস্টার্স) যুক্ত করেছে। ভারত ভয় পাচ্ছে, চীন যদি তিস্তা প্রজেক্টের উসিলায় উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে এসে বছরের পর বছর অবস্থান করে এবং ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করে, তবে যুদ্ধ বা যেকোনো সংকটের সময়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা চরম ঝুঁকিতে পড়বে। তাই চীনকে হঠাতে ২০২৪ সালে ভারত পাল্টা প্রস্তাব দেয়—‘চীনের দরকার নেই, তিস্তা প্রকল্পের টাকা এবং কাজ আমরাই করব।
পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি সংসদে জানিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরে তিস্তা এবং সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে এবং চীন ফিজিবিলিটি স্টাডি ও কারিগরি সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরেই ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বা অন্য যেকোনো নামেই হোক, এর দৃশ্যমান কাজ শুরু করতে বদ্ধপরিকর। সরকারের লক্ষ্য—আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন করা, যার একটি বড় অংশজুড়ে থাকবে তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প।
বাস্তবায়িত হলে মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আসবে: যদি এই মহাপরিকল্পনা সফলভাবে আলোর মুখ দেখে, তবে উত্তরবঙ্গের মানচিত্র চিরতরে বদলে যাবে। সেচব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে একাধিক ফসল ফলানো সম্ভব হবে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সচলতা তৈরি হবে। শিল্প ও কর্মসংস্থান নদীর দুই তীরে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অর্থনৈতিক অঞ্চলে লজিস্টিক সেন্টার ও প্রসেসিং জোন গড়ে উঠবে। এতে প্রায় ৭ থেকে ১০ লাখ যুবকের কর্মসংস্থান হবে, কাজের জন্য আর ঢাকা বা অন্য শহরে ছুটতে হবে না। পর্যটন ও বিনোদনইকো-পার্ক, নদীকেন্দ্রিক রিসোর্ট, পাঁচতারকা হোটেল এবং মেরিন ড্রাইভের কারণে উত্তরবঙ্গ পরিণত হবে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মূল আকর্ষণীয় কেন্দ্রে।
মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তা: প্রায় ১ লক্ষ ১৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ পারিবারিক সম্পদ নদীভাঙন থেকে রক্ষা পাবে। তিস্তাপাড়ের ২ কোটি মানুষ ফিরে পাবে মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠাঁই।
পানিহীন নদীতে মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ কী? তিস্তা আজ শুধু একটি নদী উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌম কূটনীতি ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার এক এসিড টেস্ট। তবে নদী বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মৌলিক সত্যকে এড়িয়ে এই মহাপরিকল্পনা সফল করা অসম্ভব—সেটি হলো পানির ন্যায্য হিস্যা। নদীতে যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানিই না থাকে, তবে নদীর বুকে চোখধাঁধানো স্যাটেলাইট শহর বা বিশাল ব্যারাজ তৈরি করে লাভ কী? তাই বেইজিং বা নয়াদিল্লির ঋণের অঙ্কের চেয়েও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী ভারতের কাছ থেকে শুষ্ক মৌসুমের পানির হিস্যা আদায় করা। তবে বিষয়টি এখন শুধু বাংলাদেশের ন্যায্য পানির চাওয়ার মধ্যে আটকে নেই। কারণ, তিস্তার ওপারে ভারত। তিস্তার উজানের অংশ আবার চীনের নিয়ন্ত্রণে। সেখানেও চীনের একটি প্রকল্প পরিকল্পনা আছে। মনে করা হয়, তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহের বড় কারণ ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প। যার মাধ্যমে চীন এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশকে একীভূত করতে চায়। তাই তিস্তা প্রকল্প ঘিরে ভূরাজনৈতিক নানা হিসাবনিকাশের বিষয় রয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান এ বিষয়ে বলেছেন, তিস্তা নদীর সঙ্গে ভারত, চীনসহ আরও বেশ কয়েকটি দেশের নদীপ্রবাহ জড়িত। আমরা কতটুকু পানি পাব, তা নিশ্চিত হওয়া না গেলে প্রকল্প জটিল হয়ে যাবে। তাই ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি হতে হবে। নদীর উজানে চীনের নিয়ন্ত্রণ। তাই ভারতও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। সবচেয়ে ভালো হয় যদি এ বিষয়ে বহুপাক্ষিকভাবে আলোচনা করা যায়।
তবে আশার কথা হলো, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিস্তা পানি চুক্তি নিয়ে এক নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। ঢাকার দক্ষ কূটনীতি যদি বেইজিংয়ের কারিগরি সক্ষমতা এবং নয়াদিল্লির নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তবেই তিস্তার প্রতিটি ঢেউয়ে বয়ে চলবে উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের স্বপ্ন। উত্তরের আকাশে তখন সত্যিই উদিত হবে এক নতুন আশার সূর্য।
কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল এবং ঋণনির্ভর থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে যাত্রার প্রত্যাশা করে একাধিক সংশোধনী এনে জাতীয় সংসদে অর্থবিল-২০২৬ পাস হয়েছে। সোমবার (২৯ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের আহ্বানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিলটি চূড়ান্ত পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
পাস হওয়া অর্থবিল-২০২৬ এ কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের পাশাপাশি ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়াও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে লাগবে না টিআইএন নম্বর।
এর আগে, বিলটির ওপর সংসদ সদস্যদের আনা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব এবং বিলের সাধারণ নীতি নিয়ে দীর্ঘ ও প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
অধিবেশনের শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের আর্থিক প্রস্তাবগুলো কার্যকরকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধন করতে ‘অর্থ বিল, ২০২৬’ সংসদে অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণের প্রস্তাব তোলেন।
বিলটি টেবিলে ওঠার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাসহ বেশ কয়েকজন সদস্য বিশাল ঘাটতি বাজেট, কর ও ভ্যাটের বোঝা, ব্যাংকিং খাতের নজিরবিহীন দুর্নীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা এবং প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর থেকে ঋণের আশ্বাসের বাস্তবতার মতো নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলে বিলটি অধিকতর যাচাইয়ের জন্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেন। সংসদ সদস্যদের এসব সমালোচনা ও প্রস্তাবের ওপর দীর্ঘ আলোচনা শেষে অর্থ বিলটি একাধিক সংশোধনীসহ চূড়ান্তভাবে পাস হয়।
বিল পাসের পর বাজেটের ওপর দেওয়া সমাপনী বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার একটি চরম দুর্বল অর্থনীতি ও ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো উত্তরাধিকার হিসেবে পেলেও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সম্পূর্ণ আশাবাদী। চ্যালেঞ্জ যত বড়ই হোক না কেন, কার্যকর নেতৃত্ব, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ জনপ্রশাসন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সব ধরনের বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।
তিনি বলেন, সরকার এখন থেকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে বেসরকারি উদ্যোগ, নতুন উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানই হবে দেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান ভিত্তি। সরকার এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায় যেখানে উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে এবং মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হবে।
বাজেট নিয়ে দীর্ঘ ও গঠনমূলক আলোচনার জন্য সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের মতামত জনগণের প্রত্যাশারই প্রতিফলন। একই সঙ্গে তিনি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট কেবল একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি নির্ভরযোগ্য রূপরেখা।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, লাগামহীন দুর্নীতি, অর্থপাচার, বিনিময় হার নিয়ে কারসাজি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বর্তমান সরকার একটি বিপর্যস্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন। তবে কৃষি, শিল্প, সেবা ও প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবণতা এবং সরকারের শক্ত নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার করের হার বাড়াবে না, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ করবে। স্বচ্ছতা বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসনকে সম্পূর্ণ পৃথক করা হচ্ছে এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রস্তাবিত একক হারের ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে ঐতিহ্যবাহী বাজার ও ছোট মুদি দোকানগুলোকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা হবে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সময়োপযোগী উদ্যোগের ফলে চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায় ৪ লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে। আগামী অর্থবছরে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হবে, যা চলতি অর্থবছরে ছিল মাত্র ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে পরিচালন ব্যয় বর্তমানের ৭২ দশমিক ৭৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।
পূর্ববর্তী সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে যত্রতত্র ঋণের কারণে বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি নিম্ন পর্যায় থেকে মধ্যম পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১১ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সরকারকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এই বিশাল ঋণের আসল ও চড়া সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা বর্তমান সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর একটি বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই ঋণ নির্ভরতা কমাতে আগামী অর্থবছরে ব্যাংকঋণ ৬ হাজার কোটি টাকা কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা এবং বন্ড ও ইকুইটি ফাইনান্সিং সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশ-বিদেশে মোট ৭২ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে।
তিনি জানান, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স (এমএলএ) অনুরোধ পাঠানো হয়েছে এবং মালয়েশিয়া ও হংকংয়ের সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে।
এছাড়া ছয়টি বড় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ১৫টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৬০টির বেশি গোপনীয়তা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আহসান হাবিব। বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের স্থলাভিষিক্ত হবেন তিনি। সোমবার (২৯ জুন) এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এর আগে এনবিআরের সদস্য এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আহসান হাবিব।
১৫তম বিসিএস (ট্যাক্সেশন) ক্যাডারের কর্মকর্তা আহসান হাবিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। এ ছাড়া বিসিএস পরীক্ষায় তিনি তার ব্যাচে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
কর্মজীবনে কর অঞ্চল-১৫-এর কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন আহসান হাবিব। সিআইসির মহাপরিচালক থাকাকালে কর ফাঁকি ও আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি আলোচিত অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি।
অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম ‘উল্কাগেমস’ থেকে বকেয়া কর আদায়ের উদ্যোগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আহসান হাবিব। বর্তমানে বিসিএস ট্যাক্সেশন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত রোববারের (২৮ জুন) তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা স্বস্তিদায়ক এবং সরকার ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী সংসদে দেওয়া বক্তব্যে উল্লেখ করেন, কারিগরি ত্রুটি ও কয়লা সংকটের কারণে গত দুই দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে, যেখানে চাহিদার পরিমাণ ১৪ হাজার ৮৩৯ মেগাওয়াট। ফলে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ৩৩৯ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন,পরিস্থিতি বেশ খারাপ ছিল, তবে আল্লাহর রহমতে আজ আমরা সেখান থেকে উত্তরণ করতে পেরেছি। আমরা চেষ্টা করছি ৩৩৯ মেগাওয়াটের এই ঘাটতিও কমিয়ে আনার জন্য। পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষ্যে সরকার অত্যন্ত সচেষ্ট রয়েছে।
তবে পরিস্থিতির উন্নতি সত্ত্বেও কিছু কিছু জায়গায় লোডশেডিং থাকবে বলে তিনি সতর্ক করেন। এর আগে রোববার সংসদে দেওয়া বিবৃতিতে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের টিউবে ছিদ্র (লিকেজ) হওয়া এবং বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাস ব্যাহত হওয়ায় প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। সেই সংকট কাটিয়ে ওঠার বিষয়টিই সোমবার তিনি সংসদে পুনরায় নিশ্চিত করেন।
এদিকে, লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে রোববার (২৮ জুন) দেশের অন্তত সাতটি জেলায় গ্রাহক বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। মন্ত্রী এ ধরনের জাতীয় সংকট ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করার জন্য সংসদ সদস্য ও দেশবাসীর প্রতি ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যান্য মাসের তুলনায় চলতি জুন মাসে গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার বিষয়টি বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাওয়ার পর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। অতিরিক্ত বিলের এই অভিযোগগুলো যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণপূর্বক দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দেশের সবকটি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিসমূহকে ইতোমধ্যে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কোনো গ্রাহক অতিরিক্ত বা ভুতুড়ে বিলের সম্মুখীন হলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার অফিসে অথবা বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে আগে ঘোষিত হটলাইন ও কল সেন্টারগুলোতে যোগাযোগ করতে পারবেন। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় সেবা নম্বর ১৬৯৯৯ সহ বিপিডিবি (১৬২০০), আরইবি (১৬৮৯৯), ডিপিডিসি (১৬১১৬), ডেসকো (১৬১২০), নেসকো (১৬৬০৩) এবং ওজোপাডিকোর (১৬১১৭) কল সেন্টারগুলো সার্বক্ষণিক সক্রিয় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য গত মাসে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে স্বাভাবিক নিয়মেই এবার প্রায় ২০ শতাংশ বেশি বিল হওয়ার কথা, তবে এর বাইরেও প্রতিবছর জুনে ঘাটতি সমন্বয় করতে গ্রাহকদের অজান্তে কয়েক ইউনিট বাড়িয়ে বাড়তি বিল ধরিয়ে দেওয়ার মতো কারসাজির পুরোনো অভিযোগও রয়েছে।
অতিরিক্ত বিলের এই বিড়ম্বনা ও প্রিপেইড মিটার রিচার্জের ঝামেলার মধ্যেই দেশজুড়ে তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং, যা গ্রাহকদের ক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে। সাধারণত সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে (শুক্রবার ও শনিবার) কলকারখানা বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে এবং লোডশেডিংও কমে আসে, কিন্তু এবার সেই চেনা নিয়ম খাটছে না। গত ২৬ ও ২৭ জুনের সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও দেশের শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই রাতভর ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। অতীতে সেচ মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে রাত ১২টার পর লোডশেডিং কমে আসলেও, চলতি তীব্র গরমে মধ্যরাতেও স্বস্তি মিলছে না নগরবাসীর।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির আনুষ্ঠানিক উৎপাদন বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ২৭ জুন রাত ৯টায় দেশজুড়ে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৮৭৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে। ওই সময়ে সারাদেশে বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা ছিল ১৮ হাজার ৩০১ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার ২৯৮ মেগাওয়াট। ওই দিন সকাল ৯টায় সবচেয়ে কম চাহিদা থাকার সময়েও ৬৪৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়।
এরপর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংয়ের মাত্রা হু হু করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়; যেমন দুপুর ১২টায় ১ হাজার ৫৮ মেগাওয়াট এবং বেলা ৩টায় তা ২ হাজার ৬৯ মেগাওয়াটে গিয়ে পৌঁছায়। দুপুরের পর থেকে শুরু করে পরদিন ভোর পর্যন্ত বিদ্যুতের এই ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ের পরিমাণ টানা ২ হাজার মেগাওয়াটের ওপরেই বজায় ছিল, যা বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের চরম চিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, যে কোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি তিস্তা ব্যারাজ মাস্টারপ্ল্যানকে জাতীয় অগ্রাধিকার উল্লেখ করে বলেন, ‘দেশের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষিকে সহায়তা দেওয়া এবং উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে যে কোনো মূল্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।'
আজ দুপুরে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘নদী, খাল ও সেচ অবকাঠামোয় বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের দীর্ঘদিনের পানি ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধানে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তারেক রহমান বলেন, 'বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয় পানি। সংসদ সদস্যরা নিয়মিত পদ্মা ও তিস্তা নদী নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। আমরা এসব সমস্যা সমাধানে সর্বাত্মক কাজ করে যাচ্ছি। '
সারা বছর কৃষির জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিসহ অন্যান্য খাতে তা ব্যবহার করা হবে।'
তিনি আরো বলেন, 'পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা হবে। যেন পুরো শুষ্ক মৌসুম এবং বছরের অন্যান্য সময় কৃষি ও প্রয়োজনীয় খাতে সেই পানি সরবরাহ করা যায়।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তঃনদী সংযোগের অভাবে বাংলাদেশ ভুগছে। এর ফলে অনেক নদীর নাব্যতা হারিয়ে গেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় সেচ ও পানির সংকট তৈরি হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'আমি এমন এলাকা পরিদর্শন করেছি, যেখানে বর্ষায় চারদিকে পানি থাকলেও অল্প দূরের কৃষকরা পানির অভাবে জমিতে সেচ দিতে পারেন না।তবে এই সমস্যা সমাধানে দেশব্যাপী নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'পানি প্রবাহ, সেচব্যবস্থা এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা যাতে উন্নত করা যায় এ লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি চলছে। গত তিন মাসে প্রায় ৯শ’ কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখনন করা হয়েছে।'
কৃষকদের জন্য সরকারের সহায়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের অন্যতম প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ এবং তার সুদ মওকুফ করা। এতে প্রায় ১৩ লাখ কৃষক উপকৃত হয়েছেন।'
তিনি বলেন, 'কৃষকদের সরাসরি সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকার বিশেষ কৃষক কার্ড চালু করেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৩ লাখ কৃষক এই কার্ডের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা এবং অন্তত ১০টি অতিরিক্ত সেবা পাবেন। আমরা কৃষকদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছি। '
যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, 'দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানো এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সেবার পরিধি বাড়াতে সরকার কাজ করছে।'
এর অংশ হিসেবে প্রবাসীদের বিভিন্ন সেবা সহজলভ্য করতে এবং বিদেশে তাঁদের ভোগান্তি কমাতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি অভিযোগ করেন, 'দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দুর্বল পরিকল্পনা ও অবহেলার কারণে দেশের জ্বালানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে অবহেলা করে বিদেশি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান সরকার এখন জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, যাতে আমদানি নির্ভরতা কমানো যায়।'
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এ পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করেছে যে আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।'
তিনি বলেন, 'সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য হলো এমন একটি শক্তিশালী ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।'
শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষিত ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন জনগোষ্ঠীই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তবে আগের শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করা হয়েছিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তুলতে শিক্ষা খাতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। বাজেট এ অধিবেশনে প্রথমে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান এবং পরে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখেন।
সূত্র : বাসস
বাংলাদেশের শিল্পকলা, টেলিভিশন মাধ্যম ও পুতুলনাট্যের (পাপেট্রি) কিংবদন্তি রূপকার, বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) সকালে ফুসফুসের মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতা নিয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে এই কালজয়ী গুণী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ফুসফুসে ব্যাকটেরিয়ার তীব্র সংক্রমণ নিয়ে গত ১৪ জুন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারকে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটায়, বিশেষ করে রক্তচাপ ও অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে আজ সকালে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কবি গোলাম মোস্তফা এবং জমিলা খাতুনের সন্তান। শৈশবে নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে সফলভাবে ম্যাট্রিক পাসের পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। তবে শিল্পকলার প্রতি গভীর টান থাকায় পরবর্তীতে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হন এবং ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টস (চারুকলা) বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদকসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
কলকাতা থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফেরার পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দূরদর্শী পরামর্শে চারুকলা ইনস্টিটিউটে (তৎকালীন আর্ট কলেজ) শিক্ষক হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতায় সফলতার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের (এনআইএমসি) মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন।
মুস্তাফা মনোয়ার কেবল ক্যানভাসেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বাংলাদেশে আধুনিক পাপেট বা পুতুলনাট্যের বিকাশ ও প্রসারের পেছনে একমাত্র তাঁর হাত ধরেই এক নতুন বিপ্লব ঘটেছিল, যার কারণে তাঁকে দেশের ‘পাপটেম্যান’ বা পুতুলনাটের জনক বলা হয়। চিত্রকলার পাশাপাশি টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ, শিশুতোষ বিনোদন, পাপেট থিয়েটার এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বিকাশে অসামান্য, যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়া সুদীর্ঘ কর্মজীবনে দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা, একাডেমি পুরস্কার ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন এই মহান প্রচারবিমুখ সাধক। তাঁর এই প্রস্থান দেশের সাংস্কৃতিক জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ হয়তো আপাতত শেষ হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনো তীব্র জ্বালানিসংকটে ভুগছে। বিশেষ করে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
দেশের স্পিনিং, নিটিং ও ডায়িং কারখানাগুলো বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবহার করে। আর বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। জ্বালানির বাড়তি দাম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে। গত ৬ জুন, বড় পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপ ঢাকায় তাদের নিটওয়্যার ও ডেনিম কারখানা থেকে প্রায় এক হাজার ৯০০ শ্রমিক ছাঁটাই করে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে ৪০ লাখের বেশি মানুষ কাজ করেন, যাদের বেশির ভাগই নারী। তারা জারা এবং এইচঅ্যান্ডএমের মতো পশ্চিমা ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করেন। প্রায় চার কোটি মানুষ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। গত বছর বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশই এসেছে পোশাক খাত থেকে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৩ শতাংশ। চীনের পর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ।
তবে এই খাত আগে থেকেই সংকটে আছে। ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় ধাক্কা লাগে। বলে মন্তব্য করেন শিল্প বিশ্লেষক মেহেদী মাহবুব।
সেই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, পাঁচটি কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের কারাবন্দি বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতারও পোশাক কারখানা ছিল। গত তিন বছরে ৪০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে।
গত মে মাসে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় গড়ে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকত। চট্টগ্রামের কোথাও কোথাও দিনে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। উৎপাদন চালিয়ে যেতে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে।
এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভের আবিল বিন আমিন বলেন, এই শিল্প দক্ষতানির্ভর, সেখানে জেনারেটর চালু করতেই যদি ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগে, তা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফেব্রুয়ারি থেকে মে—এই সময়ের মধ্যে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
উৎপাদনে বিলম্ব, জাহাজীকরণে বিঘ্ন ও পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রেতাদের কম চাহিদার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছে। এক জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর তার কারখানার ক্রয়াদেশ প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; বছরওয়ারি হিসাবে তা কমেছে ৮ শতাংশ।
তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কাঁচামালের খরচও বেড়েছে। পোশাক তৈরির মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ যায় কৃত্রিম তন্তু, রং, ফিনিশিং কেমিক্যাল, প্লাস্টিক বোতাম ও চেইনে, যেগুলোর বেশির ভাগই পেট্রোকেমিক্যালনির্ভর।
বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ পোশাক পলিয়েস্টার ফাইবার ও সুতা দিয়ে তৈরি হয়, যার মূল উপাদান ন্যাফথা। যুদ্ধ শুরুর পর ন্যাফথার দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। এ ছাড়া উৎপাদনব্যবস্থাও খণ্ডিত। কিছু সমন্বিত টেক্সটাইল মিল থাকলেও বেশির ভাগ কারখানায় উৎপাদনের একটি অংশ সম্পন্ন হয়। আবদুল্লাহ হিল নকিবের হিসাবে, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৩০ শতাংশ।
সংকটগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা দিতে মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর বড় অংশই বরাদ্দ দেওয়া হয় পোশাক খাতের জন্য। তবে এই ঋণের সুদহার প্রায় ৭ শতাংশ। উদ্যোক্তারা এমনিতে চাপে আছেন, তাদের জন্য এটা কঠিন।
এদিকে কোভিড মহামারির সময় উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বড় ব্র্যান্ডগুলো পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি হয়নি। এবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে যে শ্রম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, এবার তার চেয়েও বেশি হবে—এমন শঙ্কা আছে।
উৎপাদনে বিলম্ব, পরিবহন বিঘ্ন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ভোক্তাদের কম পোশাক কেনার প্রবণতার কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোও কম অর্ডার দিচ্ছে।
ঢাকার একটি জ্যাকেট কারখানার মালিক আবদুল্লাহ হিল নকিব জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তার কারখানার অর্ডার প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে টানা দশম মাসের মতো পোশাক রপ্তানি কমেছে; আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
মে মাসে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকটে থাকা ব্যবসাগুলোর জন্য ৬০০ বিলিয়ন টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যার সবচেয়ে বড় অংশ বরাদ্দ দেওয়া হয় পোশাক শিল্পের জন্য। তবে এসব ঋণের সুদের হার প্রায় ৭ শতাংশ, যা এরই মধ্যে আর্থিক চাপে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বহন করা কঠিন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৮০টি কারখানায় অন্তত ৯ হাজার ৫০০ শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের মতো নতুন করে শ্রমিক অসন্তোষ ও অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।