কারিগরি ও অকারিগরি কারণে অনেক সময় ভুতুড়ে বিলের ঘটনা ঘটতে পারে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা বা কোম্পানির মোট গ্রাহক ৪ কোটি ৭১ লাখ। বিদ্যুৎ বিল যাতে যথাযথ হয়, সে বিষয়ে বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
কারিগরি ও অকারিগরি কারণে অনেক সময় ভুতুড়ে বিলের ঘটনা ঘটতে পারে। ভুতুড়ে বা অস্বাভাবিক বিল রোধকল্পে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রিপেইড বা স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে নোয়াখালী-৩ আসনের সরকারদলীয় এমপি মামুনুর রশীদ কিরণের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।
চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে সীমিত লোডশেডিং
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, দেশজুড়ে তীব্র তাপদাহের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে কিছু কিছু এলাকায় চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় সীমিত আকারে লোডশেডিং হয়েছে।
তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হলে সাধারণত লোডশেডিং হয়। দেশজুড়ে তীব্র দাবদাহের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে কিছু কিছু এলাকায় চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় সীমিত আকারে লোডশেডিং হয়েছে। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ কাজে প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য লোডশেডিং করা হয়। সরকার শহর ও গ্রাম নির্বিশেষে সমতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহে সচেষ্ট রয়েছে। সেচ মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে।
তিনি জানান, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বকেয়া পাওনা থাকলে নিয়মানুযায়ী বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ভুতুড়ে বিলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে যাচাইপূর্বক প্রতিকার প্রদান করা হয় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা
বাহাউদ্দিন নাছিমের প্রশ্নের জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাড়ে তিন হাজার, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০০ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ছয় হাজার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩১৫ কোটি ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির দরকার হবে বলে প্রতিমন্ত্রী জানান।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ক্রমাগত লোকসানের সম্মুখীন হয়। ওই সময় সরকারকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। তবে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমে যাওয়ার ফলে নভেম্বর ২০১৪ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারকে জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকি দিতে হয়নি। তবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপিসি ২ হাজার ৭০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা লোকসান দেয়।
সরকার বর্তমানে ডাইনামিক প্রাইসিং ফর্মুলায় জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করে জানিয়ে নসরুল হামিদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করায় এ খাতে কোনো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে না।
চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা উল্লেখ করে নসরুল হামিদ বলেন, ভর্তুকির অর্থের মধ্যে ৩১ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৭শ কোটি নগদ ও ২০ হাজার ১৩৩ কোটি বন্ডের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে।
নোয়াখালী-২ আসনের মোরশেদ আলমের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, অনুমোদনপ্রাপ্ত এলপিজি প্ল্যানের সংখ্যা ৭৮টি। এর মধ্যে প্রাথমিক অনুমোদনপ্রাপ্ত ৫২টি, চূড়ান্ত অনুমোদনপ্রাপ্ত ২৪টি ও বিপিসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ২টি।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. সোহরাব উদ্দিনের অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সালের জানুয়ারি হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ২৫ হাজার ৭৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। দেশে চাহিদার চেয়েও স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। তবে কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তীকালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে পরিপূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু স্থানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে। এ ছাড়া অত্যধিক গরম ও দেশের কোথাও কোথাও দাবদাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস হতে ১৩১২ দশমিক ৭৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে উল্লেখ করে আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, নবায়নযোগ্য উৎস হতে চলমান ও প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫৪৭ দশমিক ২২ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি বিভিন্ন ধরনের কূপ খননের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এর সফল বাস্তবায়নে গড়ে দৈনিক ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে ১১ টির খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সমাপ্ত হয়েছে। যার মাধ্যমে দৈনিক ১২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়েছে। দৈনিক ৩৩ মিলিয়ন ঘটফুট হারে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
এই সংসদ সদস্যের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাস ক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি উৎপাদনরত ৫টি পরিত্যক্ত এবং ৪টির উৎপাদন কার্যক্রম চলমান।
আওয়ামী লীগের সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা প্রায় দৈনিক ৩৮০০-৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি করে ৩০০০-৩১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে এবং বিদ্যুৎ ও সার খাতে অগ্রাধিকার বিবেচনায় গ্যাস সংযোগ চালু রয়েছে।
ভোলা-৩ আসনের নুরুন্নবী চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ/রুগ্ণ শিল্পের সংখ্যা ৩৯৭টি। এর মধ্যে বিসিকের নিয়ন্ত্রণাধীন রুগ্ণ/বন্ধ শিল্প ৩৮২টি, বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ কারখানা ৫টি, বিএসএসআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন স্থগিত চিনিকল ৬টি, বিএসইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ কারখানা ৪টি।
এমপি আব্দুল কাদের আজাদের এক প্রশ্নের জবাবে নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন জানান, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করাসহ বিনিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সময়কাল পর্যন্ত সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সাফল্যও এসেছে।
তিনি জানান, বিসিকের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাঁচটি শিল্পনগরী, তিনটি শিল্পপার্ক ও দুটি অন্যসহ মোট ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ৩ হাজার ৮১১টি শিল্প প্লটে সম্ভাব্য ৩ হাজার ৫৬৫টি শিল্প ইউনিট স্থাপিত হবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরএডিপিতে সবুজ পাতাভুক্ত ১১টি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলো অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হলে দেশে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মন্ত্রী জানান, বিনিয়োগে উৎসাহিতকরণের লক্ষ্যে বিসিক কর্তৃক ১২২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১৬৭টি শিল্প প্লট বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। বিসিক উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে হোসিয়ারি শিল্পনগরী, পঞ্চবটী, নারায়ণগঞ্জ; জামদানি শিল্পনগরী, তারাবো, নারায়ণগঞ্জ; চামড়া শিল্পনগরী, সাভার, ঢাকা; এপিআই শিল্পপার্ক, গজারিয়া, মুন্সীগঞ্জ এবং বিসিক বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরী, মুন্সিগঞ্জ শীর্ষক বিশেষায়িত শিল্পনগরী বা শিল্পপার্ক বাস্তবায়িত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পটি ১৯৯ দশমিক ৪০ একর জমিতে ঢাকার সাভারে বাস্তবায়িত হয়েছে। কমন ইনফ্লুয়েন্স প্ল্যান্ট (সিইটিপি) সুবিধাসহ পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরীতে হাজারীবাগ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ট্যানারি কারখানাসমূহকে স্থানান্তর করা হয়েছে। শিল্পনগরীর ২০৫টি শিল্পপ্লটে ১৬২টি ট্যানারি কারখানা স্থাপিত হয়েছে।
স্বতন্ত্র এমপি আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগারের প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, বিসিকের দেশব্যাপী বাস্তবায়িত ৮২টি শিল্পনগরীর মোট ১২ হাজার ৩৬০টি শিল্প প্লটের মধ্যে ১১ হাজার ২৬২টি শিল্প প্লটে বেসরকারি উদ্যোক্তাগণ কর্তৃক ৬ হাজার ১৯৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। এসব শিল্পনগরীর কারখানাসমূহে গত জুন, ২০২৩ পর্যন্ত বিনিয়োগের হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা প্রায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দীর্ঘ দুই যুগ পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আগামীকাল মঙ্গলবার ঐতিহাসিক এক মুহূর্তের সাক্ষী হতে যাচ্ছে দেশ, যেখানে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এক হাজারেরও বেশি দেশি-বিদেশি আমন্ত্রিত অতিথির উপস্থিতিতে আয়োজিত এই মেগা ইভেন্টকে ঘিরে পুরো সংসদ এলাকা ও রাজধানীজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে নজিরবিহীন ৪ স্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়। কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট শঙ্কা না থাকলেও একটি অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর পরিবেশে নিরাপদ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নতুন সরকারের এই রাজকীয় শপথ অনুষ্ঠান সফল করতে মাঠ পর্যায়ে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বিজিবির প্রায় ১৫ হাজার প্রশিক্ষিত সদস্য। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও এর আশপাশের পুরো এলাকাকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে এই চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। ইতিমধ্যে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এবং ডগ স্কোয়াড (কে-নাইন) পুরো অনুষ্ঠানস্থল কয়েক দফা সুইপিং করে নিরাপদ ঘোষণা করেছে। সংসদ ভবনের প্রতিটি প্রবেশপথ এবং অভ্যন্তরীণ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে বিশেষ নজরদারি। পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়েছে সোয়াট (SWAT) ও বিশেষায়িত বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের মতো চৌকস দলগুলোকে।
নিরাপত্তার এই মহাযজ্ঞ কেবল সংসদ এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে পুরো রাজধানীতেই। বিভিন্ন পয়েন্টে এবং জনসমাগমস্থলে সাদা পোশাকে অবস্থান নিয়েছেন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য তাঁদের নিজ নিজ বাসভবন থেকেই বিশেষ প্রোটোকল ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সংসদ ভবনে আনা-নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে ৫০টি বিশেষ গাড়ি ও প্রয়োজনীয় এসকর্ট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বাসভবন থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত নির্ধারিত রুটগুলোতে ট্রাফিক পুলিশ ও টহল দলের বিশেষ মহড়া সম্পন্ন হয়েছে যাতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই অতিথিরা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছাতে পারেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শপথ অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্ন করতে সব ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে রুটকেন্দ্রিক এবং এলাকাভিত্তিক যে নিরাপত্তা ছক তৈরি করা হয়েছে, তা যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, এখন পর্যন্ত নিরাপত্তাজনিত কোনো নেতিবাচক গোয়েন্দা তথ্য বা থ্রেট নেই। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাদারিত্বের সাথে তাঁদের দায়িত্ব পালন করছে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উন্মুক্ত পরিবেশে আয়োজিত এই শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা হবে বলে আশা করছে সাধারণ মানুষ। সব মিলিয়ে, আগামীকাল বিকেল চারটার মাহেন্দ্রক্ষণকে ঘিরে পুরো ঢাকা এখন কঠোর নিরাপত্তা ও উৎসবের চাদরে ঢাকা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে আজ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বিদায়লগ্নে তিনি তাঁর দীর্ঘ ১৮ মাসের পথচলাকে বর্ণনা করেছেন চ্যালেঞ্জ ও অর্জনের এক সম্মিলিত যাত্রা হিসেবে। গত দেড় বছরে দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করতে তাঁকে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। দায়িত্ব পালনের এই সময়টুকুকে তিনি ‘ভালো এবং মন্দের মিশেল’ বলে অভিহিত করেন এবং জানান যে, জনস্বার্থে কাজ করতে গিয়ে তিনি তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করেছেন।
সোমবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আয়োজিত এক বিশেষ বিদায়ী বৈঠকে নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের এই অধ্যায় শেষ হওয়ায় তিনি পুনরায় তাঁর পূর্বের জীবনে ফিরে যাচ্ছেন। তবে পেশাদার জীবন থেকে অবসরে গেলেও তাঁর সৃজনশীল কার্যক্রম থেমে থাকবে না। তিনি সমসাময়িক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি অব্যাহত রাখবেন এবং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নিজের মতামত প্রদান বা কথা বলা অব্যাহত রাখবেন।
বিদায়ের এই আনুষ্ঠানিকতায় মন্ত্রণালয়ে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। উপদেষ্টা তাঁর শেষ কার্যদিবসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আসাদ আলম সিয়ামসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক সৌজন্য বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে তিনি তাঁর দায়িত্বকালীন সময়ে সহকর্মীদের নিরলস সহযোগিতার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের সঙ্গে গ্রুপ ছবিতে অংশ নেন এবং সবার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। আগামীকাল নতুন নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণের প্রাক্কালে তাঁর এই প্রস্থান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সফল পরিসমাপ্তি ঘটাল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের সিংহভাগই বিপুল সম্পদের মালিক এবং নির্বাচনী ব্যয় ও আচরণবিধিতে বড় ধরনের বিচ্যুতি দেখা গেছে। নির্বাচনে জয়ী ২৩৬ জন সংসদ সদস্য বা প্রায় ৭৯ শতাংশ প্রার্থীর কোটিপতি হওয়া এবং ১৩ জনের শতকোটিপতি থাকার তথ্য সম্বলিত এই পর্যবেক্ষণটি দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির এক নতুন চিত্র তুলে ধরেছে।
সোমবার ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে 'ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামা ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ' শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। টিআইবির গবেষণায় উঠে এসেছে যে ৪০ ভাগ কেন্দ্রে একাধিক অনিয়মের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে জাল ভোটের একটি বড় অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। প্রার্থীরা নির্ধারিত গড় ব্যয়সীমার চেয়ে গড়ে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা বেশি ব্যয় করেছেন এবং ৯৯ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করেছেন।
গবেষণার বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপনকালে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ইফতেখারুজ্জামান জানান, “এবারের সংসদ নির্বাচন মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ৭৫ শতাংশ জাল ভোটের অপচেষ্টা ঠেকানো গেছে।” প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকরা শতভাগ নির্বাচন বয়কট করেনি বরং অনেকে বিএনপির হয়ে বিভিন্ন ভাবে নির্বাচনে সক্রিয় ছিলো। বর্তমানে এই পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণটি নির্বাচন পরবর্তী সংস্কার এবং প্রার্থীদের হলফনামার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে একটি প্রধান দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার যাত্রা শুরু হবে। শপথের এই মাহেন্দ্রক্ষণকে ঘিরে পুরো ঢাকা শহর ও জাতীয় সংসদ এলাকা এখন উৎসবমুখর। আজ সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি আগামীকালকের শপথ অনুষ্ঠানের বিস্তারিত সময়সূচি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, মঙ্গলবার দিনভর কয়েক দফায় শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। দিনের প্রথম ভাগে অর্থাৎ সকালে দুই ধাপে শপথ অনুষ্ঠিত হবে। প্রথমেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করবেন। এরপর সংবিধান সংস্কার পরিষদের জন্য মনোনীত সদস্যদের শপথ পাঠ করানো হবে। দিনের দ্বিতীয় ভাগে অর্থাৎ বিকেলের দিকে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
নতুন মন্ত্রিসভার দায়িত্ব গ্রহণকে সামনে রেখে সচিবালয় ও গণপূর্ত বিভাগ প্রয়োজনীয় সব লজিস্টিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ড. নাসিমুল গনি নিশ্চিত করেছেন যে, নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের জন্য গাড়ি, দেহরক্ষী ও বাসস্থানের ব্যবস্থা ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের দপ্তরগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে যাতে নতুন মন্ত্রীরা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কাজ শুরু করতে পারেন। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে আগেই জানানো হয়েছে যে, মন্ত্রীদের থাকার জন্য মিন্টু রোড ও হেয়ার রোড এলাকায় ৩৭টি বাড়ি প্রস্তুত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র সচিব থেকে সদ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ড. নাসিমুল গনি তাঁর নতুন দায়িত্ব নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, দেশের এই বিশেষ যুগসন্ধিক্ষণে তাঁর কাঁধে যে বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, তা তিনি সাধ্যমতো নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করবেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এর আগেও তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং নতুন সরকারের অধীনেও সেই ধারা বজায় রাখবেন। প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই ক্রান্তিকালে শৃঙ্খলা বজায় রাখাই হবে তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্যদের শপথের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে, নতুন সরকার গঠন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন শুরু হতে যাচ্ছে। বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের অবসান ঘটবে এবং বাংলাদেশে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হবে। দেশি-বিদেশি অতিথিদের অংশগ্রহণে এই অনুষ্ঠানটি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক রাজকীয় আবহ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১ শতাংশ জাল ভোট পড়ার যে পরিসংখ্যানটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয় বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মূলত ভুল ব্যাখ্যার কারণে এই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে বলে সংস্থাটি তাদের গবেষণার প্রেক্ষিতে স্পষ্ট করেছে।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংস্থাটির নিজস্ব কার্যালয়ে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে জানানো হয় যে, দৈবচয়ন বা র্যান্ডম স্যাম্পলিংয়ের ভিত্তিতে ৭০টি আসনের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে যে পর্যবেক্ষণ করা আসনগুলোর মধ্যে ২১.৪ শতাংশ ‘আসনে’ জাল ভোট পড়েছে। এর অর্থ হলো মোট ১৫টি (গাণিতিক হিসেবে ১৪.৯৮%) আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যা কোনোভাবেই মোট প্রদত্ত ভোটের শতাংশ নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুলভাবে ২১ শতাংশ ‘ভোট’ হিসেবে প্রচার হওয়ার প্রেক্ষাপটে টিআইবি সংশ্লিষ্ট সকলকে তথ্যের সঠিকতা যাচাই করে প্রচার করার আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আজ সোমবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছেন। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। এই সময় তাঁরা পারস্পরিক কুশল বিনিময় করেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও প্রশাসনিক বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এক ব্রিফিংয়ে এই বিদায়ী সাক্ষাতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ১৮ মাসের দায়িত্ব পালনকালে, বিশেষ করে গত কয়েক মাসের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর বলিষ্ঠ ও পেশাদার ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে যে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে, তার জন্য সেনাপ্রধানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সকল সদস্যের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে সেনাবাহিনীর এই দায়িত্বশীল অবস্থান নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক বিশেষ মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন নির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে এই বিদায়ী সাক্ষাৎটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও প্রধান উপদেষ্টার গতিশীল নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে পালন করতে পারায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য যে, সেনাপ্রধান গতকালই ঘোষণা করেছিলেন যে, নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেই সেনাবাহিনী পর্যায়ক্রমে ব্যারাকে ফিরে যাবে। আজ প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এই সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক ও তদারকিমূলক সম্পর্কের একটি সফল আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটল।
নবনির্বাচিত সরকারের শপথ গ্রহণকে কেন্দ্র করে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের আবাসন প্রস্তুতির কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। আজ সোমবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তিনি জানান, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মিলিয়ে এখন পর্যন্ত নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য ৩৭টি বাড়ি পুরোপুরি প্রস্তুত করা হয়েছে। মিন্টু রোড, হেয়ার রোড, ধানমন্ডি এবং গুলশান এলাকায় এই বাসভবনগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। উপদেষ্টা আরও জানান, প্রয়োজনে আরও কয়েকটি বাড়ি প্রস্তুত করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং শপথ অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত সময়ের মধ্যেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে।
নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বিষয়ে উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিএনপি যেভাবে চাইবে, সেই অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ১৮ মাস ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের স্বার্থে নিরলস কাজ করার চেষ্টা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিগত দীর্ঘ সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে দেশকে বের করে একটি নতুন গতিশীল ধারায় নিয়ে আসাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। নিজেদের কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকে তাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক দুর্নীতি সংক্রান্ত রিপোর্টের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আদিলুর রহমান খান বলেন, এই রিপোর্টের বিষয়ে টিআইবি-কে প্রশ্ন করা উচিত। তবে তিনি মনে করেন, জনগণের সাধারণ আলোচনা এবং টিআইবির রিপোর্টের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় এক নয়। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে যাঁরা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বললে কাজের একটি ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠবে। তিনি বিশ্বাস করেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকতে পারে।
দেশের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের অগ্রগতি সম্পর্কে গণপূর্ত উপদেষ্টা জানান, অনেক জায়গায় ইতোমধ্যে সংস্কারের বড় বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, আবার কিছু জায়গায় প্রক্রিয়া এখনো চলমান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অসমাপ্ত সংস্কার কাজগুলো খুব শীঘ্রই পূর্ণতা পাবে। আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশে একটি নির্বাচিত শাসনব্যবস্থা শুরু হতে যাচ্ছে, যার ফলে আবাসন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির এই বিষয়গুলো এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সব মিলিয়ে নতুন মন্ত্রিসভার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দিতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পুরোপুরি প্রস্তুত বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
দেশের প্রশাসনিক শীর্ষ পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনি। আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে এই পরিবর্তনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মামুন শিবলীর সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ড. নাসিমুল গনিকে চুক্তিভিত্তিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। জনস্বার্থে জারি করা এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ড. নাসিমুল গনি বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
সাধারণত মন্ত্রিপরিষদ সচিব হলেন প্রশাসনের প্রধান এবং মন্ত্রিসভার বৈঠক পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেন। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের ঠিক আগের দিন এই নিয়োগের ঘোষণা আসায় প্রশাসনিক কাজকর্মে আরও গতিশীলতা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ড. নাসিমুল গনি এখন থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং আসন্ন নির্বাচিত সরকারের মধ্যে প্রশাসনিক সেতুবন্ধন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি নতুন পদে যোগদান করবেন এবং নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের প্রস্তুতিসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজ শুরু করবেন। এই নিয়োগের ফলে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে এক ধরনের স্থিতিশীলতা আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দীর্ঘ দুই যুগ পর পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদে আরোহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল চারটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শপথ নিতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা। দেশের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। অনুষ্ঠানটি সফল করতে ইতোমধ্যে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী হতে দেশি-বিদেশি প্রায় ১ হাজার ২০০ জন উচ্চপদস্থ অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯টি আসনে এককভাবে এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি। নতুন এই সরকারের অভিষেক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যেমন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও শুরু হয়েছে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা। আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল সরাসরি এই অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। এছাড়াও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, মালদ্বীপের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ খলিল এবং শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নালিন্দা জয়াতিসাও ঢাকার এই রাজকীয় আয়োজনে অংশ নেবেন। কূটনৈতিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু শেষ মুহূর্তে সরাসরি এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন। পশ্চিমা বিশ্বের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাজ্যের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি সীমা মালহোত্রার উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে বাড়তি গুরুত্ব প্রদান করছে।
মঙ্গলবার দিনটি শুরু হবে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের তথ্যমতে, এদিন সকাল ১০টায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিজয়ীদের শপথ পাঠ করাবেন। এরপর বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে বিএনপি তাদের সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করবে, যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এই আনন্দঘন মুহূর্তের প্রাক্কালে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায়ী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিগত দেড় বছরের কর্মকাল এবং নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
শপথ অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার উন্মুক্ত স্থানটি বিএনপির পক্ষ থেকেই পছন্দ করা হয়েছে, যা অনুষ্ঠানটিতে এক বিশেষ আবহ তৈরি করবে। প্রথা অনুযায়ী এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, দেশের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট আইনজীবী, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলেও পূর্বনির্ধারিত ‘ইন্ডিয়া-এআই ইমপ্যাক্ট সামিট’-এ ব্যস্ততার কারণে তিনি আসতে পারছেন না। তাঁর পরিবর্তে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি দিল্লির প্রতিনিধিত্ব করবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক যাত্রার নবসূচনা হতে যাচ্ছে। নবনির্বাচিত সরকারের ওপর জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যেই আগামীকাল থেকে শুরু হবে এক নতুন অধ্যায়।
তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মত প্রকাশের জন্য কোন সাংবাদিককে জেলে যেতে হয়নি। সাংবাদিক আনিস আলমগীর ও মঞ্জুরুল আলম পান্নাকে মত প্রকাশের জন্য জেলে যেতে হয়নি। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে নিশ্চয়ই ভিন্ন কোনো তথ্য ছিল। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীতে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নিয়ে তিনি বলেন, ১৮ মাসে সফলতা বা ব্যর্থতা– বলার কিছু নাই। আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। জনগণ মূল্যায়ন করবে।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের দেশত্যাগ নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ফয়েজ তৈয়ব বিদেশে থাকতেন, রাষ্ট্রীয় কাজ শেষ করে ফিরে গেছেন। তিনি দেড় বছর পরিবারের বাইরে ছিলেন। তার পরিবার নেদারল্যান্ডসেই ছিল, তিনি পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন। এটি ভিন্নখাতে প্রবাহের সুযোগ নেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়ে বিশ বছর পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। দলীয় প্রধান তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। এখন দলীয় অন্দরমহল ও রাজনৈতিক মহলে মূল আলোচনা নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে। সম্ভাব্য মন্ত্রীদের তালিকায় কাদের নাম থাকছে, তা নিয়ে চলছে জল্পনাকল্পনা। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা এখন ব্যস্ত তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতিতে। তবে এবারের মন্ত্রিসভা ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের তুলনায় অনেকটা ছোট হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যাও কমিয়ে ত্রিশের নিচে নামিয়ে আনা হতে পারে। খবর বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রের।
এদিকে, নতুন সংসদ, নতুন সরকার—এখন পুরো দেশ তাকিয়ে আছে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের দিকে। এখন সবার নজর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভার দিকে।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, এবার মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনার ফলে একদিকে সরকারের ‘কাজ যেমন সহজ হবে’, তেমনি ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি’ ও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করে দলটি।
বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হচ্ছে নবীন ও প্রবীণের মিশেলে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথ পড়ানোর কথা রয়েছে। নিজ দলের বাইরে ভোটে জয় পাওয়া সমমনা অন্য দলগুলোর নেতাদের মধ্যেও অনেকে নতুন মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে যাচ্ছেন। এছাড়া নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
আলোচনায় যারা: এবারের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি মেধাবী তরুণদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে অতীতে সফলভাবে মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন- এমন অভিজ্ঞ নেতারা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতা নেই, কিন্তু মেধাবী- এ রকম তরুণ নেতারা পাচ্ছেন উপমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব।
দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ, মির্জা আব্বাস, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, নূরুল ইসলাম মনি ও আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ আরও বেশ কয়েক জনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
নারীদের মধ্যে স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদের নামও আলোচনায় রয়েছে। এর মধ্যে শামা ওবায়েদ এবারের নির্বাচনে ফরিদপুর-২ আসন থেকে জয় পেয়েছেন।
এছাড়া তরুণ নেতাদের মধ্যে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী হিসেবে যারা মন্ত্রিসভায় জায়গা পেতে পারেন, তাদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন: লক্ষ্মীপুর সদর আসন থেকে বিজয়ী বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, টাঙ্গাইল-৫ থেকে নির্বাচিত সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং ঢাকা-৬ আসনে জয়লাভ করা ইশরাক হোসেন।
এবারের নির্বাচনে মিত্র দলের সাতজন নেতা নিজ দল ছেড়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন। তাদের মধ্যে ঢাকা-১৩ আসন থেকে ববি হাজ্জাজ এবং লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে শাহাদাত হোসেন সেলিম জয় পেয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী হিসেবে তাদের নামও আলোচনায় আছে।
বিগত সময় বিএনপির সঙ্গে যারা যুগপৎ আন্দোলনে ছিলেন, সেই মিত্র দলগুলো থেকে মাত্র তিনজন জয় পেয়েছেন। তারা হলেন: বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি এবং গণঅধিকার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নুর। তারা তিনজনই নতুন মন্ত্রিসভায় ডাক পেতে পারেন বলে জানিয়েছেন বিএনপির নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।
অন্যদিকে, সিনিয়র নেতাদের মধ্যে যারা এবারের মন্ত্রিসভায় থাকছেন না, তাদের মধ্যে কেউ কেউ জায়গা পেতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদে। তাদের মধ্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হতে পারে।
কিন্তু আলোচনায় যাদের নামই থাকুক না কেন, মন্ত্রিসভায় শেষ পর্যন্ত কাদের জায়গা হচ্ছে এবং কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাচ্ছেন, আগামীকাল শপথ অনুষ্ঠানের পরই সেটি পরিষ্কার হয়ে যাবে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম তার পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে থাকা পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, এই পদত্যাগের আগে তিনি পুলিশ সদরদপ্তরে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও নিয়মিত সভায় সভাপতিত্ব করেন। ওই বৈঠকেই তিনি আকস্মিকভাবে উপস্থিত কর্মকর্তাদের কাছে নিজের পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা ব্যক্ত করেন।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আইজিপিকে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানালেও শেষ পর্যন্ত দুপুরে তিনি মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র পাঠান। এই ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে যেমন বিস্ময় তৈরি হয়েছে, তেমনি বাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যেও খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। পদত্যাগের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তিনি আগেই নিজের সরকারি পাসপোর্ট জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছিলেন।
আইজিপি বাহারুল আলমের নিয়োগের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২১ নভেম্বর তাকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে ২০২০ সালে তিনি নিয়মিত চাকরির মেয়াদ শেষে অবসরে গিয়েছিলেন। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের ২১ নভেম্বর তার মেয়াদের পূর্ণতা পাওয়ার কথা ছিল। তবে সেই নির্দিষ্ট সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই তিনি স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে দেশবাসীসহ সারাবিশ্বের মুসলিম উম্মাহকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। আজ রবিবার বিকেলে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিশেষ বাণীতে তিনি এই শুভেচ্ছা জানান। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বার্তায় রমজানের সুমহান শিক্ষাকে ধারণ করে ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সংযম, ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মহান শিক্ষা নিয়ে পবিত্র রমজান আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছে। এই মাসটি মানবজাতির জন্য শান্তি, কল্যাণ ও উচ্চতর নৈতিকতার বার্তা বহন করে আনে। সিয়াম সাধনা, দান-সদকা ও গভীর ইবাদতের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভের এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয় এই মহিমান্বিত মাসে। তিনি আত্মশুদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
ড. ইউনূসের বাণীতে উঠে এসেছে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের সামাজিক গুরুত্ব। তিনি উল্লেখ করেন যে, পবিত্র রমজান আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে সব ধরনের অন্যায়, দুর্নীতি ও অবিচার পরিহার করে একটি ন্যায় ও কল্যাণভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা জোগায়। এই মাসটি কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি মানুষের মধ্যে সত্যনিষ্ঠা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার সময়। বিশেষ করে সমাজের দরিদ্র, বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং মমত্ববোধ প্রদর্শনের মাধ্যমেই রমজানের প্রকৃত তাৎপর্য ফুটে ওঠে।
প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা রমজানের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ও ভোগ-বিলাস পরিহার করি। তিনি পবিত্রতা রক্ষা করে বেশি বেশি সৎকর্ম, কোরআন তেলাওয়াত ও প্রার্থনায় মনোনিবেশ করার পরামর্শ দেন। সবশেষে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন যেন তিনি দেশ ও জাতিকে শান্তি ও সমৃদ্ধি দান করেন এবং সকলের ইবাদত ও নেক আমল কবুল করেন। প্রধান উপদেষ্টার এই সময়োপযোগী বার্তা দেশবাসীর মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক সংহতির নতুন প্রেরণা জোগাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।