কারিগরি ও অকারিগরি কারণে অনেক সময় ভুতুড়ে বিলের ঘটনা ঘটতে পারে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা বা কোম্পানির মোট গ্রাহক ৪ কোটি ৭১ লাখ। বিদ্যুৎ বিল যাতে যথাযথ হয়, সে বিষয়ে বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
কারিগরি ও অকারিগরি কারণে অনেক সময় ভুতুড়ে বিলের ঘটনা ঘটতে পারে। ভুতুড়ে বা অস্বাভাবিক বিল রোধকল্পে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রিপেইড বা স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে নোয়াখালী-৩ আসনের সরকারদলীয় এমপি মামুনুর রশীদ কিরণের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।
চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে সীমিত লোডশেডিং
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, দেশজুড়ে তীব্র তাপদাহের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে কিছু কিছু এলাকায় চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় সীমিত আকারে লোডশেডিং হয়েছে।
তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হলে সাধারণত লোডশেডিং হয়। দেশজুড়ে তীব্র দাবদাহের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে কিছু কিছু এলাকায় চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় সীমিত আকারে লোডশেডিং হয়েছে। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ কাজে প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য লোডশেডিং করা হয়। সরকার শহর ও গ্রাম নির্বিশেষে সমতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহে সচেষ্ট রয়েছে। সেচ মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে।
তিনি জানান, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বকেয়া পাওনা থাকলে নিয়মানুযায়ী বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ভুতুড়ে বিলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে যাচাইপূর্বক প্রতিকার প্রদান করা হয় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা
বাহাউদ্দিন নাছিমের প্রশ্নের জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাড়ে তিন হাজার, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০০ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ছয় হাজার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩১৫ কোটি ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির দরকার হবে বলে প্রতিমন্ত্রী জানান।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ক্রমাগত লোকসানের সম্মুখীন হয়। ওই সময় সরকারকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। তবে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমে যাওয়ার ফলে নভেম্বর ২০১৪ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারকে জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকি দিতে হয়নি। তবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপিসি ২ হাজার ৭০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা লোকসান দেয়।
সরকার বর্তমানে ডাইনামিক প্রাইসিং ফর্মুলায় জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করে জানিয়ে নসরুল হামিদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করায় এ খাতে কোনো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে না।
চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা উল্লেখ করে নসরুল হামিদ বলেন, ভর্তুকির অর্থের মধ্যে ৩১ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৭শ কোটি নগদ ও ২০ হাজার ১৩৩ কোটি বন্ডের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে।
নোয়াখালী-২ আসনের মোরশেদ আলমের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, অনুমোদনপ্রাপ্ত এলপিজি প্ল্যানের সংখ্যা ৭৮টি। এর মধ্যে প্রাথমিক অনুমোদনপ্রাপ্ত ৫২টি, চূড়ান্ত অনুমোদনপ্রাপ্ত ২৪টি ও বিপিসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ২টি।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. সোহরাব উদ্দিনের অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সালের জানুয়ারি হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ২৫ হাজার ৭৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। দেশে চাহিদার চেয়েও স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। তবে কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তীকালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে পরিপূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু স্থানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে। এ ছাড়া অত্যধিক গরম ও দেশের কোথাও কোথাও দাবদাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস হতে ১৩১২ দশমিক ৭৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে উল্লেখ করে আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, নবায়নযোগ্য উৎস হতে চলমান ও প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫৪৭ দশমিক ২২ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি বিভিন্ন ধরনের কূপ খননের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এর সফল বাস্তবায়নে গড়ে দৈনিক ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে ১১ টির খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সমাপ্ত হয়েছে। যার মাধ্যমে দৈনিক ১২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়েছে। দৈনিক ৩৩ মিলিয়ন ঘটফুট হারে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
এই সংসদ সদস্যের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাস ক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি উৎপাদনরত ৫টি পরিত্যক্ত এবং ৪টির উৎপাদন কার্যক্রম চলমান।
আওয়ামী লীগের সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা প্রায় দৈনিক ৩৮০০-৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি করে ৩০০০-৩১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে এবং বিদ্যুৎ ও সার খাতে অগ্রাধিকার বিবেচনায় গ্যাস সংযোগ চালু রয়েছে।
ভোলা-৩ আসনের নুরুন্নবী চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ/রুগ্ণ শিল্পের সংখ্যা ৩৯৭টি। এর মধ্যে বিসিকের নিয়ন্ত্রণাধীন রুগ্ণ/বন্ধ শিল্প ৩৮২টি, বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ কারখানা ৫টি, বিএসএসআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন স্থগিত চিনিকল ৬টি, বিএসইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ কারখানা ৪টি।
এমপি আব্দুল কাদের আজাদের এক প্রশ্নের জবাবে নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন জানান, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করাসহ বিনিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সময়কাল পর্যন্ত সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সাফল্যও এসেছে।
তিনি জানান, বিসিকের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাঁচটি শিল্পনগরী, তিনটি শিল্পপার্ক ও দুটি অন্যসহ মোট ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ৩ হাজার ৮১১টি শিল্প প্লটে সম্ভাব্য ৩ হাজার ৫৬৫টি শিল্প ইউনিট স্থাপিত হবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরএডিপিতে সবুজ পাতাভুক্ত ১১টি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলো অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হলে দেশে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মন্ত্রী জানান, বিনিয়োগে উৎসাহিতকরণের লক্ষ্যে বিসিক কর্তৃক ১২২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১৬৭টি শিল্প প্লট বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। বিসিক উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে হোসিয়ারি শিল্পনগরী, পঞ্চবটী, নারায়ণগঞ্জ; জামদানি শিল্পনগরী, তারাবো, নারায়ণগঞ্জ; চামড়া শিল্পনগরী, সাভার, ঢাকা; এপিআই শিল্পপার্ক, গজারিয়া, মুন্সীগঞ্জ এবং বিসিক বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরী, মুন্সিগঞ্জ শীর্ষক বিশেষায়িত শিল্পনগরী বা শিল্পপার্ক বাস্তবায়িত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পটি ১৯৯ দশমিক ৪০ একর জমিতে ঢাকার সাভারে বাস্তবায়িত হয়েছে। কমন ইনফ্লুয়েন্স প্ল্যান্ট (সিইটিপি) সুবিধাসহ পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরীতে হাজারীবাগ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ট্যানারি কারখানাসমূহকে স্থানান্তর করা হয়েছে। শিল্পনগরীর ২০৫টি শিল্পপ্লটে ১৬২টি ট্যানারি কারখানা স্থাপিত হয়েছে।
স্বতন্ত্র এমপি আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগারের প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, বিসিকের দেশব্যাপী বাস্তবায়িত ৮২টি শিল্পনগরীর মোট ১২ হাজার ৩৬০টি শিল্প প্লটের মধ্যে ১১ হাজার ২৬২টি শিল্প প্লটে বেসরকারি উদ্যোক্তাগণ কর্তৃক ৬ হাজার ১৯৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। এসব শিল্পনগরীর কারখানাসমূহে গত জুন, ২০২৩ পর্যন্ত বিনিয়োগের হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা প্রায়।
মহান মে দিবস পালন করতে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের আয়োজনে রাজধানীর নয়াপল্টনে আয়োজিত সমাবেশে যোগ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ শুক্রবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে তিনি সমাবেশস্থলে পৌঁছান এবং প্রধান অতিথি হিসেবে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনের আগেই সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন দলের মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এর আগে দুপুর আড়াইটায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে সমাবেশের মূল কার্যক্রম শুরু হয়। তবে অনুষ্ঠানের শুরুতে দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় বাড়াতে ও উজ্জীবিত করতে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে দুপুর ১টা থেকেই ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন ইউনিট থেকে শ্রমিক ও দলীয় নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন।
সমাবেশস্থলে উপস্থিত হাজার হাজার নেতাকর্মীদের মাথায় ছিল লাল টুপি এবং পরনে লাল টি-শার্ট, যা পুরো এলাকায় এক বৈপ্লবিক পরিবেশের সৃষ্টি করে। ঢোল-তবলা ও স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজপথ। এই আয়োজনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মজীবী নারীর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। শ্রমিক দল নেতা আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মূল কর্মসূচির সূচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের নিরাপত্তায় গোটা এলাকা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও ডিবি সদস্যদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্য পুরো এলাকায় সতর্কাবস্থান নিয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের মতো যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেখানে ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাও মোতায়েন রাখা হয়েছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সমাবেশটি সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে অসুস্থ হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৮৫ জন রোগী। শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামের প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ জনে। অন্যদিকে, হাম হতে পারে এমন সন্দেহজনক লক্ষণে এখন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন মোট ২৩১ জন। প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ায় ধারাবাহিকতা উদ্বেগজনক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১১৫ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে। এই নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দেশে মোট ৫ হাজার ১৪৬ জন ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে হামে আক্রান্ত হলেন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চালিকাশক্তি রেমিট্যান্সের সূচনালগ্নের কৃতিত্ব শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে প্রদান করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, পরবর্তীকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য নেতৃত্বে সেই ধারাকে সুসংহত করা হয়েছিল। শুক্রবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত মে দিবসের এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আজ যে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি তার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই ধারা সমুন্নত রেখে শ্রমিকদের একাধিক সমাবেশে শ্রমিক সমাজের সঙ্গে একাত্ব ঘোষণা করেন।” তিনি আরও বলেন যে, “জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ত্রিপক্ষীয় শ্রম নীতি ও সংস্কার শ্রমকল্যাণের ভিত্তিতে ভিত্তিকেই শক্তিশালী করেছে। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মিনিস্ট্রি অব ম্যানপাওয়ার। এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যসহ ৩৩টি দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের নতুন যুগের সূচনা করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ‘শ্রম আইন ২০০৬’ প্রণয়ন ও শ্রম কল্যাণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠাসহ শ্রমিকের অধিকার কর্মসংস্থান ও কল্যাণের ভিতকে আরও বিস্তৃত করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার দেশের আপামর শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ ন্যায্য অধিকার রক্ষা শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য সুস্বাস্থ্য নিরাপদ ও নিরাপদ ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানাবিধি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।”
দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় মেহনতি মানুষের অনবদ্য ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শ্রমিকরাই উন্নয়নের প্রকৃত রূপকার। শিল্প-কারখানা থেকে শুরু করে কৃষি ও পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি খাতে তাদের অক্লান্ত শ্রম আমাদের সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তিকে সমৃদ্ধ করছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রবাসী ভাইদের পাঠানো অর্থ এবং পোশাক খাতের শ্রমিকদের ঘামঝরানো উপার্জনই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী রাখে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে সরকারের কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে আরও বলেন যে, “সরকার প্রতিশ্রুতি অনুসারে শ্রমিকদের কল্যাণে ঘোষিত কর্মপরিকল্পনার সবগুলোই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করছেন। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন বন্ধ বন্ধ চিনিকল রেশম পাট ও শিল্প কল কারখানা চালু করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়। চলতি বছরের ছয় মাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে ছয়টি পাঠকল চালু করার চিন্তাভাবনা রয়েছে।”
মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার সুসম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রপতি একটি টেকসই শিল্প উন্নয়নের জন্য পারস্পরিক আস্থার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “শ্রমিক ও মালিক পারস্পরিক আস্থা সম্পর্ক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ কর্মপরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকশই শিল্প উন্নয়ন ও সুরক্ষিত কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শ্রম খাতে শিল্প সম্পর্ক বজায় রাখা ও শ্রমিক মালিক এর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রমকে উৎসাহ দিতে এই সরকার সচেষ্ট।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার শ্রমবান্ধব নীতি ও কর্মসংস্থান প্রসারের মাধ্যমে মেহনতি মানুষের জীবনমান পরিবর্তনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে মহান মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রশাসন প্রতিটি শ্রমিকের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করার মাধ্যমে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সুনিশ্চিত করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শ্রমিকের গুরুত্ব তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “শ্রমজীবী মানুষই বিশ্বের যেকোনো দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি। শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি। সুতরাং তাদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা—এসবই যেকোনো গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল সরকারের অগ্রাধিকার।”
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সংসদীয় পরিবেশের প্রশংসা করে মাহদী আমিন জানান, জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতিফলন প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান হচ্ছে। তিনি বলেন, “সংসদের প্রথম অধিবেশনে যে প্রাণচাঞ্চল্য, জনগণের সমস্যা নিয়ে যে গভীর আলোচনা এবং মুক্ত বাকস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে সবার সম্মিলিত অবস্থান আমরা দেখেছি, সেটিই জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতীক। আগামী দিনগুলোতেও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এই ইতিবাচক ধারা ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ বর্তমান সরকার অব্যাহত রাখবে—এটিই আমাদের প্রতিশ্রুতি। এই ধারাবাহিকতায় সরকারের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে একদিকে যেমন নারীর ক্ষমতায়ন হবে, যুবকদের ক্ষমতায়ন হবে, তেমনি শ্রমিকদের ক্ষমতায়নেও সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত প্রাধান্য দেওয়া হবে।”
বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে পূর্ববর্তী সফল ধারার অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, “জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে, শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনকে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।” এসময় তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, “প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও বিশ্বাস করতেন, শ্রমিকের দুটি হাতই রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।”
দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক খাতের উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে মাহদী আমিন বলেন, “দেশের বৃহত্তম শ্রমঘন খাত পোশাক শিল্প—যার রপ্তানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি—আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা মূলত বিএনপি সরকারের নীতিমালার ফল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ধারাবাহিকতায় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে প্রচেষ্টা, তা বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অব্যাহত রয়েছে।”
মহান মে দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার সকাল থেকেই রাজধানী ঢাকার রাজপথ শ্রমজীবী মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে। তোপখানা রোডে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠন নিজেদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও বর্ণাঢ্য র্যালি করেছে। গানে, স্লোগানে আর মিছিলে তারা শ্রমিকের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।
শ্রমজীবীদের পক্ষ থেকে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা কমানো, মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা এবং কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশসহ নানা দাবি উত্থাপন করা হয়। রানা প্লাজা ও তাজরিন ট্র্যাজেডির মতো ঘটনার বিচারসহ নিয়োগপত্র প্রদান, অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এবং নিত্যপণ্যের দাম কমানোর মতো জীবনঘনিষ্ঠ দাবিগুলোও জোরালোভাবে উঠে আসে।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্টের শীর্ষ স্থানীয়রা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘‘নতুন সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া, বারবার যেন আমাদের দাবি নিয়ে পথে নামতে না হয়। তারা যেন শ্রমিকদের দাবিগুলো পূরণ করেন। আমাদের জন্য যেন গণতান্ত্রিক শ্রম আইন করা হয়। কারণ গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ছাড়া শ্রমিকদের মুক্তি নেই।’’
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) নেতৃবৃন্দ নূন্যতম মজুরি বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘শ্রমিকদের নূন্যতম মজুরি ৩০ হাজার করতে হবে। নাহলে আমাদের যে দাস প্রথা, সেটি সমাজ থেকে যাবে না।’’ তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, ‘‘আমরা মনে করি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রথমে শ্রম আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে সেটার বাস্তব প্রয়োগ করতে হবে।’’
শ্রমিকদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর চেষ্টার সমালোচনা করে বক্তারা মালিকপক্ষের ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁরা বলেন, ‘‘শ্রমিকরা যেন একত্রিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি সেজন্য মালিকপক্ষ দালাল তৈরি করে রাখে। শ্রমিকদের বিভক্ত করে রাখে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। আমাদের শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নিজেদের জন্য লড়াই করে, সংগ্রাম করে বেচে থাকতে হবে।’’
বিড়ি শ্রমিকরা আগামী বাজেটে শুল্ক না বাড়ানো ও রেশন সুবিধা চালুর দাবি করেন। পাশাপাশি ট্যাক্সি ও অটোরিকশা চালক ইউনিয়ন অবিলম্বে মজুরি বোর্ড গঠন করে নূন্যতম বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন (টাফ) জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত বিভিন্ন চুক্তি বাতিল এবং বিদেশের মাটিতে সামরিক হামলার নিন্দাসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক ও কৌশলগত দাবি উপস্থাপন করে।
এই মেগা জমায়েতে কর্মজীবী নারী, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, আওয়াজ ফাউন্ডেশন, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন এবং সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টসহ আরও বহু সংগঠন সংহতি প্রকাশ করে অংশ নিয়েছে।
সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালনের আড়ালে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানার দুই উপ-পরিদর্শক (এসআই) এবং এক সহকারী উপ-পরিদর্শককে (এএসআই) প্রশাসনিক কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ডিএমপি সদর দপ্তরের উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) আমীর খসরু স্বাক্ষরিত এক আদেশে এই বদলি নিশ্চিত করা হয়।
প্রত্যাহার হওয়া কর্মকর্তারা হলেন মোহাম্মদপুর থানার সিভিল টিমের ইনচার্জ এসআই সাধন মণ্ডল, এসআই রেজাউল করিম রেজা এবং এএসআই সোহেল রানা। অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশনা সম্বলিত এই আদেশে জানানো হয় যে, তাঁদের বর্তমান কর্মস্থল থেকে সরিয়ে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
প্রশাসনিক প্রয়োজনে গৃহীত এই বদলি আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, ঢাকার তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর থানায় কর্মরত নিম্নলিখিত পুলিশ সদস্যদের প্রশাসনিক কারণে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হলো।” অভিযুক্ত এই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক উপায়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠলে প্রাথমিক তদন্ত ও প্রশাসনিক বিবেচনায় এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আজ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এক বিশাল সমাবেশ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিশেষ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ভাষণ দেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর মে দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কোনো প্রকাশ্য শ্রমিক সমাবেশে রাজধানীতে এটিই তাঁর প্রথম সশরীরে অংশগ্রহণ ও বক্তব্য হতে যাচ্ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই সমাবেশের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা পেশ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান। তিনি জানান, ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলো থেকে অগণিত শ্রমজীবী মানুষ এবং দলীয় নেতাকর্মীরা এই সমাবেশে যোগ দেবেন বলে দলটি প্রত্যাশা করছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের দাবি অনুযায়ী, এই জমায়েত শেষ পর্যন্ত জনসমুদ্রে পরিণত হবে এবং লাখো মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত হবে।
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেবেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। সংবাদ সম্মেলনে নজরুল ইসলাম খান বর্তমান প্রেক্ষাপট তুলে ধরে উল্লেখ করেন যে, শ্রমজীবী মানুষ বর্তমানে নানাবিধ সংকটের মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। তাঁর মতে, উপযুক্ত জাতীয় বেতন স্কেলের অভাব, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া বৃদ্ধি এবং শ্রমবাজারের সংকুচিত অবস্থার কারণে শিক্ষিত বেকারত্ব মহামারি আকার ধারণ করেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বিগত সময়ে বিভিন্ন সরকারি পদ বিলুপ্ত করে আউটসোর্সিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর ফলে সাধারণ শ্রমিকের কর্মের সুযোগ কমেছে। এর ফলে পাট খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং স্থানীয় পণ্যের পরিবর্তে বিদেশি মালামালের ওপর দেশের নির্ভরতা বহুগুণ বেড়েছে। আজকের এই সমাবেশ থেকে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শোভন কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রেশনিং সুবিধা চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো পুনরায় জোরালোভাবে উত্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বায়ুদূষণের প্রকোপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রাজধানী ঢাকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন জনবহুল শহরে। এমনকি বৃষ্টির মধ্যেও আজ ঢাকার বাতাসের মান মাঝারি থেকে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। শুক্রবার বেলা ১১টায় আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার-এর তথ্যানুযায়ী, ১০৭ স্কোর নিয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ৫ম অবস্থানে উঠে এসেছে ঢাকা।
একই সময়ে ১৩৩ স্কোর নিয়ে বায়ুদূষণের শীর্ষে অবস্থান করছে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ, যেখানকার আবহাওয়া সংবেদনশীল মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর, যার স্কোরও ১৩৩। এছাড়া ১৩২ স্কোর নিয়ে ভারতের দিল্লি তৃতীয় এবং ১২৯ স্কোর নিয়ে কলকাতা চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে, যা ওইসব অঞ্চলের সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বায়ুমান সূচকের মানদণ্ড অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৫০ স্কোরকে ভালো এবং ৫১ থেকে ১০০ স্কোরকে মাঝারি ধরা হয়। তবে স্কোর ১০১ থেকে ১৫০ হলে তা সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে গণ্য হয়। সূচক ১৫১ থেকে ২০০ এর মধ্যে থাকলে তাকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ এবং ২০১ থেকে ৩০০ স্কোরকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘরের বাইরে চলাচল সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ প্রদান করা হয়। এছাড়া ৩০১ থেকে ৪০০ স্কোরকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ধরা হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি স্বরূপ।
সাধারণত বাতাসে বিদ্যমান বিভিন্ন বস্তুকণা ও গ্যাসীয় উপাদানের ওপর ভিত্তি করে এই দূষণের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বিশেষ করে পিএম২.৫, পিএম১০, নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড ও ওজোনের মতো উপাদানের আধিক্য জনস্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতি করে। বায়ুদূষণ সব বয়সীদের জন্য ক্ষতিকর হলেও শিশু, প্রবীণ এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বাংলাদেশ নিয়ে বিতর্কিত ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ান বঢ়েকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁকে মন্ত্রণালয়ে ডেকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র হস্তান্তর করা হয়।
কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগ) ইশরাত জাহানের দপ্তরে বিকেল ৫টার দিকে ভারতীয় দূতকে উপস্থিত হতে বলা হয়। সেখানে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়।
চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবিপি-র লাইভ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ও কথিত অনুপ্রবেশকারী নিয়ে বিতর্কিত দাবি করেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। বিশেষ করে ‘পুশব্যাক’ বা অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়া সংক্রান্ত তাঁর বক্তব্যকে ঢাকা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। অনিবন্ধিত সন্দেহভাজন বাংলাদেশিদের হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, “ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা করা কঠিন। তাই তারা রাত নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন এবং যখন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনো সদস্য উপস্থিত থাকেন না, তখন অন্ধকারের আড়ালে তাদের সীমান্ত পেরিয়ে ঠেলে দেন।”
এই মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় দূতকে স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, কোনো প্রকার তথ্যপ্রমাণ ছাড়া এ ধরনের স্পর্শকাতর দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে দায়িত্বহীন মন্তব্য করা দুই প্রতিবেশী দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য মোটেই সহায়ক নয়। যেকোনো অমীমাংসিত সমস্যা বা দ্বিপক্ষীয় সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অনুসরণ করা বাঞ্ছনীয় বলে ঢাকা জোর দেয়। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে দুই দেশের বিদ্যমান সুসম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে—এমন বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকতে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পরম পবিত্র ও সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা আজ শুক্রবার যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। প্রায় আড়াই সহস্রাব্দ আগে এই পুণ্য তিথিতেই জগতের আলোর দিশারি মহামতি গৌতম বুদ্ধ ধরাধামে এসেছিলেন। তাঁর জন্মলগ্নে আবির্ভাব, বোধিজ্ঞান লাভ এবং মহাপরিনির্বাণ—এই তিন স্মৃতিবিজড়িত বৈশাখী পূর্ণিমাই বিশ্বজুড়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কাছে বুদ্ধপূর্ণিমা হিসেবে চিরস্মরণীয়।
সাম্য, মৈত্রী ও অহিংসার পথে চলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া মহামতি বুদ্ধের দর্শনের মূল ভিত্তি। অহিংসবাদের এই মহান প্রচারকের অমর দর্শন অনুযায়ী— “বৈরিতা দিয়ে বৈরিতা কিংবা হিংসা দিয়ে হিংসা কখনো প্রশমিত হয় না; বরং অহিংসা দিয়ে হিংসাকে এবং অবৈরিতা দিয়ে বৈরিতাকে প্রশমিত করতে হয়।” এই শাশ্বত দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে আজ সারা দেশে বৌদ্ধ উপাসকগণ বুদ্ধপূজা, শীল গ্রহণ, পিণ্ডদান ও ভিক্ষু সংঘের প্রাতরাশসহ নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি অতিবাহিত করছেন।
এই পবিত্র দিবস উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সৌজন্য ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন যে, “দল-মত ও ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দেশের প্রত্যেক মানুষ যাতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।”
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অভিনন্দন জানিয়ে সরকারপ্রধান আরও উল্লেখ করেন, “প্রতিটি ধর্মই মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগুরু মহামতি গৌতম বুদ্ধ তার অনুসারীদের জন্য পঞ্চশীল নীতি দিয়েছিলেন। এই পঞ্চশীল নীতি হলো– প্রাণী হত্যা না করা, চুরি না করা, ব্যভিচার না করা, মিথ্যা না বলা এবং মাদক থেকে বিরত থাকা। প্রেম, অহিংসা এবং সর্বজীবে দয়াও বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা।”
উৎসবকে ঘিরে রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহারে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন। আজ সকালে বিহারে বুদ্ধপূজা ও শীল গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। এছাড়া সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যা ছয়টায় বুদ্ধপূর্ণিমার মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, দিনটি উদযাপনে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।
আজ পহেলা মে, বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে মহান মে দিবস পালিত হচ্ছে। এ বছর বাংলাদেশে মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস উদযাপিত হচ্ছে ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত; আসবে এবার নব প্রভাত’ এই বিশেষ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে।
দিবসটি পালন করতে সরকারিভাবে নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনও সমাবেশ, শোভাযাত্রা এবং আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এরই অংশ হিসেবে আজ শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল এক সমাবেশের ডাক দিয়েছে, যেখানে উপস্থিত থাকবেন দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ঐতিহাসিক এই দিবসের প্রেক্ষাপট মূলত ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ঘটনা। সে সময় ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশি হামলায় বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান। সেই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মাধ্যমেই শ্রমিকের অধিকার নিয়ে বিশ্বব্যাপী জোরালো দাবি ওঠে এবং পরবর্তীতে শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়। শিকাগোর শ্রমিকদের সেই সংগ্রামকে স্মরণ করেই আন্তর্জাতিকভাবে এ দিনটিকে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে গণ্য করা হয়।
মে দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী প্রদান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকল শ্রমজীবী মানুষকে অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেন, “শ্রমিকের অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তার গুরুত্ব বিবেচনায় এ বছরের মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক গৌরবোজ্জ্বল দিন।”
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় যে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, বর্তমান সরকার সেই পথ অনুসরণ করে শ্রম আইন সংস্কার, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার এবং বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর মাধ্যমে শ্রমিক সমাজের ভাগ্যোন্নয়নে নানাবিধ কর্মসূচি ও নীতি বাস্তবায়ন করছে।
মে দিবসের বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও সমৃদ্ধ অর্থনীতি। সুতরাং তাদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানতম অঙ্গীকার।”
তিনি আরও দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যক্ত করেন যে, “শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিশ্চিত করা সম্ভব।”
মহান মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস উপলক্ষে দেশ-বিদেশে কর্মরত সব শ্রমজীবী মানুষের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বছর মে দিবসের প্রতিপাদ্য—‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’—উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শ্রমজীবী মানুষই দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের শ্রমেই গড়ে ওঠে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো ও অর্থনীতির ভিত।’ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) দেওয়া এক বাণীতে তিনি ১৮৮৬ সালের হে মার্কেট আন্দোলনে শ্রমিকদের আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।’ শ্রমবান্ধব নীতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং কল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘শ্রমিক কল্যাণ ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণে তার নেওয়া উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে।’ বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমবাজার সৃষ্টিতে তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘শ্রম আইন সংস্কার, মজুরি নির্ধারণ, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে শ্রমিকদের উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে।’ পোশাক খাতের শ্রমিকদের কল্যাণেও নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বাণীতে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর ৩৯টি কনভেনশন ও একটি প্রোটোকল অনুসমর্থন করেছে এবং সংস্থাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকদের সময়মতো বেতন-ভাতা প্রদান, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, নারী-পুরুষ সমান মজুরি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
শেষে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, শ্রমিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিতের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাশাপাশি মে দিবসের সকল কর্মসূচির সফলতা কামনা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষ যাতে শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে শুভ বৌদ্ধ পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
সকাল ১০টায় সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জনপ্রশাসন সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতারা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকার ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে চায় না। ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে আমরা ব্যবহার করতে চাই না, অতীতেও আমরা তা করিনি। আমাদের সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি-অবাঙালি বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবাই সকল ক্ষেত্রে সমানভাবে অধিকার ভোগ করবে, এটাই বর্তমান সরকারের নীতি।’
নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষাতেই মুক্তিযোদ্ধারা এ দেশ স্বাধীন করেছিলেন মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী প্রতিটি মানুষের জন্যই একটি নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা নিয়েই মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছিলেন। মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই মিলে লাখো প্রাণের বিনিময়ে এই দেশটা আমরা স্বাধীন করেছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় কে কোন ধর্মের অনুসারী, কে বিশ্বাসী কিংবা অবিশ্বাসী—এটি কারও জিজ্ঞাসা ছিল না। তাই এই স্বাধীন বাংলাদেশ আপনার-আমার, আমাদের সকলের।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের একটি রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। বাংলাদেশে এটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে, একমাত্র বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনই দেশের সকল বর্ণ, ধর্মীয় সম্প্রদায় ও নৃগোষ্ঠীর নিবিড় সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারে। সুতরাং, আপনারা কেউ নিজেদের কখনোই সংখ্যালঘু ভাববেন না। রাষ্ট্র আমার-আপনার-আমাদের সবার পরিচয়। আমরা প্রত্যেকে, প্রত্যেক নাগরিক, সকলে ‘আমরা বাংলাদেশি’।’
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মগুরু মহামতি গৌতম বুদ্ধ তার অনুসারীদের জন্য পঞ্চশীল নীতি দিয়েছিলেন। এই পঞ্চশীল নীতি হলো প্রাণী হত্যা না করা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা এবং মাদক থেকে বিরত থাকা। প্রেম, অহিংস এবং সর্বজীবে দয়াও বৌদ্ধধর্মের শিক্ষা।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নাগরিক প্রত্যেকেই যে যার ধর্মীয় রীতি-নীতি ও অধিকার বিনা বাধায়—স্বাধীনভাবে অনুসরণ-অনুকরণ ও ভোগ করতে পারে—এমন একটি রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব ও অঙ্গীকার। দলমত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যাতে শান্তি এবং নিরাপত্তার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, তেমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।’
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দিপেন দেওয়ান, প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও নৃগোষ্ঠীবিষয়ক বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার, পার্বত্য বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী, পার্বত্য অঞ্চলের বিএনপি মনোনীত সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য প্রার্থী মাধবী মারমা এবং ড. সুকোমল বড়ুয়া। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর হাতে বৌদ্ধদের পক্ষ থেকে একটি শুভেচ্ছা ক্রেস্ট এবং বুদ্ধমূর্তির প্রতিবিম্ব তুলে দেওয়া হয়।