কারিগরি ও অকারিগরি কারণে অনেক সময় ভুতুড়ে বিলের ঘটনা ঘটতে পারে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা বা কোম্পানির মোট গ্রাহক ৪ কোটি ৭১ লাখ। বিদ্যুৎ বিল যাতে যথাযথ হয়, সে বিষয়ে বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
কারিগরি ও অকারিগরি কারণে অনেক সময় ভুতুড়ে বিলের ঘটনা ঘটতে পারে। ভুতুড়ে বা অস্বাভাবিক বিল রোধকল্পে অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রিপেইড বা স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে নোয়াখালী-৩ আসনের সরকারদলীয় এমপি মামুনুর রশীদ কিরণের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।
চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে সীমিত লোডশেডিং
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, দেশজুড়ে তীব্র তাপদাহের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে কিছু কিছু এলাকায় চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় সীমিত আকারে লোডশেডিং হয়েছে।
তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হলে সাধারণত লোডশেডিং হয়। দেশজুড়ে তীব্র দাবদাহের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে কিছু কিছু এলাকায় চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি কম হওয়ায় সীমিত আকারে লোডশেডিং হয়েছে। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ কাজে প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য লোডশেডিং করা হয়। সরকার শহর ও গ্রাম নির্বিশেষে সমতার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহে সচেষ্ট রয়েছে। সেচ মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে।
তিনি জানান, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং বকেয়া পাওনা থাকলে নিয়মানুযায়ী বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ভুতুড়ে বিলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে যাচাইপূর্বক প্রতিকার প্রদান করা হয় এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা
বাহাউদ্দিন নাছিমের প্রশ্নের জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা, ২০১৯-২০ অর্থবছরে সাড়ে তিন হাজার, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২ হাজার ৪০০ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ছয় হাজার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ৩১৫ কোটি ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির দরকার হবে বলে প্রতিমন্ত্রী জানান।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ১৯৯৯-২০০০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ক্রমাগত লোকসানের সম্মুখীন হয়। ওই সময় সরকারকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হয়। তবে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমে যাওয়ার ফলে নভেম্বর ২০১৪ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারকে জ্বালানি তেলে কোনো ভর্তুকি দিতে হয়নি। তবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপিসি ২ হাজার ৭০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা লোকসান দেয়।
সরকার বর্তমানে ডাইনামিক প্রাইসিং ফর্মুলায় জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করে জানিয়ে নসরুল হামিদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করায় এ খাতে কোনো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে না।
চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা উল্লেখ করে নসরুল হামিদ বলেন, ভর্তুকির অর্থের মধ্যে ৩১ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ হাজার ৭শ কোটি নগদ ও ২০ হাজার ১৩৩ কোটি বন্ডের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়েছে।
নোয়াখালী-২ আসনের মোরশেদ আলমের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, অনুমোদনপ্রাপ্ত এলপিজি প্ল্যানের সংখ্যা ৭৮টি। এর মধ্যে প্রাথমিক অনুমোদনপ্রাপ্ত ৫২টি, চূড়ান্ত অনুমোদনপ্রাপ্ত ২৪টি ও বিপিসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ২টি।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মো. সোহরাব উদ্দিনের অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০০৯ সালের জানুয়ারি হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ২৫ হাজার ৭৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ফলে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। দেশে চাহিদার চেয়েও স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি। তবে কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তীকালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে পরিপূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু স্থানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে। এ ছাড়া অত্যধিক গরম ও দেশের কোথাও কোথাও দাবদাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস হতে ১৩১২ দশমিক ৭৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে উল্লেখ করে আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, নবায়নযোগ্য উৎস হতে চলমান ও প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পগুলোতে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ দাঁড়াবে ১২ হাজার ৫৪৭ দশমিক ২২ মেগাওয়াট। ২০৩০ সালের মধ্যে এগুলো জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি বিভিন্ন ধরনের কূপ খননের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এর সফল বাস্তবায়নে গড়ে দৈনিক ৬১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে ১১ টির খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সমাপ্ত হয়েছে। যার মাধ্যমে দৈনিক ১২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়েছে। দৈনিক ৩৩ মিলিয়ন ঘটফুট হারে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
এই সংসদ সদস্যের অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাস ক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি উৎপাদনরত ৫টি পরিত্যক্ত এবং ৪টির উৎপাদন কার্যক্রম চলমান।
আওয়ামী লীগের সদস্য এম আবদুল লতিফের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানান, বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা প্রায় দৈনিক ৩৮০০-৪০০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি আমদানি করে ৩০০০-৩১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে এবং বিদ্যুৎ ও সার খাতে অগ্রাধিকার বিবেচনায় গ্যাস সংযোগ চালু রয়েছে।
ভোলা-৩ আসনের নুরুন্নবী চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন শিল্প মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ/রুগ্ণ শিল্পের সংখ্যা ৩৯৭টি। এর মধ্যে বিসিকের নিয়ন্ত্রণাধীন রুগ্ণ/বন্ধ শিল্প ৩৮২টি, বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ কারখানা ৫টি, বিএসএসআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন স্থগিত চিনিকল ৬টি, বিএসইসির নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ কারখানা ৪টি।
এমপি আব্দুল কাদের আজাদের এক প্রশ্নের জবাবে নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন জানান, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক কোম্পানিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করাসহ বিনিয়োগ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সময়কাল পর্যন্ত সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সাফল্যও এসেছে।
তিনি জানান, বিসিকের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পাঁচটি শিল্পনগরী, তিনটি শিল্পপার্ক ও দুটি অন্যসহ মোট ১০টি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ৩ হাজার ৮১১টি শিল্প প্লটে সম্ভাব্য ৩ হাজার ৫৬৫টি শিল্প ইউনিট স্থাপিত হবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আরএডিপিতে সবুজ পাতাভুক্ত ১১টি প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলো অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হলে দেশে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মন্ত্রী জানান, বিনিয়োগে উৎসাহিতকরণের লক্ষ্যে বিসিক কর্তৃক ১২২টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১৬৭টি শিল্প প্লট বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। বিসিক উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে হোসিয়ারি শিল্পনগরী, পঞ্চবটী, নারায়ণগঞ্জ; জামদানি শিল্পনগরী, তারাবো, নারায়ণগঞ্জ; চামড়া শিল্পনগরী, সাভার, ঢাকা; এপিআই শিল্পপার্ক, গজারিয়া, মুন্সীগঞ্জ এবং বিসিক বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরী, মুন্সিগঞ্জ শীর্ষক বিশেষায়িত শিল্পনগরী বা শিল্পপার্ক বাস্তবায়িত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পটি ১৯৯ দশমিক ৪০ একর জমিতে ঢাকার সাভারে বাস্তবায়িত হয়েছে। কমন ইনফ্লুয়েন্স প্ল্যান্ট (সিইটিপি) সুবিধাসহ পরিবেশবান্ধব চামড়া শিল্পনগরীতে হাজারীবাগ ও দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ট্যানারি কারখানাসমূহকে স্থানান্তর করা হয়েছে। শিল্পনগরীর ২০৫টি শিল্পপ্লটে ১৬২টি ট্যানারি কারখানা স্থাপিত হয়েছে।
স্বতন্ত্র এমপি আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগারের প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, বিসিকের দেশব্যাপী বাস্তবায়িত ৮২টি শিল্পনগরীর মোট ১২ হাজার ৩৬০টি শিল্প প্লটের মধ্যে ১১ হাজার ২৬২টি শিল্প প্লটে বেসরকারি উদ্যোক্তাগণ কর্তৃক ৬ হাজার ১৯৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়েছে। এসব শিল্পনগরীর কারখানাসমূহে গত জুন, ২০২৩ পর্যন্ত বিনিয়োগের হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা প্রায়।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট বা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিবির প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দীর্ঘ তদন্ত ও প্রাপ্ত তথ্যাদি বিচার-বিশ্লেষণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে বলেই এই চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। অভিযুক্ত ১৭ জনের মধ্যে ইতিমধ্যে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকি ৫ জন পলাতক রয়েছেন, যাদের খুঁজে বের করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে যে, ওসমান হাদিকে পরিকল্পিতভাবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়েই হত্যা করা হয়েছে। ডিবি প্রধান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ইতিপূর্বে বিভিন্ন মাধ্যমে ভিডিও বার্তা দিলেও তদন্তে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততার অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। ফলে আইনের হাত থেকে তাঁর রক্ষা পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শরিফ ওসমান হাদির মতো একজন মেধাবী ও সক্রিয় সংগঠকের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল, যার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে সরব ছিল বিভিন্ন মহল।
এই হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট স্মরণ করলে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ঠিক পরদিন ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স-কালভার্ট রোডে এই ন্যাক্কারজনক হামলা চালানো হয়। ওসমান হাদি যখন রিকশায় করে যাচ্ছিলেন, তখন একটি চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা তাঁর মাথায় গুলি করে পালিয়ে যায়। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরবর্তীতে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় ১৫ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। তবে সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৮ ডিসেম্বর সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই ঘটনার পরপরই ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করেছিলেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের। পরবর্তীতে ওসমান হাদির মৃত্যুর পর মামলাটি নিয়মিত হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই এই মামলার তদন্তে স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। আজকের চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায় এক নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হলো। সাধারণ জনগণ ও ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা এখন আদালতের মাধ্যমে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার বিশাল মৎস্যসম্পদ ও নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে গভীর সমুদ্রে নিবিড় গবেষণা ও বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আজ মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গবেষণা জাহাজ ‘আর. ভি. ড. ফ্রিদজফ ন্যানসেন’-এর মাধ্যমে পরিচালিত জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার সময় তিনি এই নির্দেশনা দেন। গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটটি দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে এই জরিপ পরিচালিত হয়, যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ। প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেসের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরীসহ পদস্থ কর্মকর্তারা।
গবেষণায় উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্যের বিষয়ে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান জানান যে, এই জরিপের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের গভীরে নতুন ৬৫ প্রজাতির জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে গবেষণায় কিছু নেতিবাচক দিকও ফুটে উঠেছে, যা সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের সংখ্যা অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে গেছে, যা মূলত ‘ওভারফিশিং’ বা অতিরিক্ত মাছ শিকারের ফলে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অভাবকে নির্দেশ করে। এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার মিটার গভীরতায়ও প্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা সামুদ্রিক পরিবেশের ভয়াবহ দূষণ চিত্র তুলে ধরেছে। ২০১৮ সালের এক গবেষণার সাথে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে বড় মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে এবং স্বল্প গভীর পানিতে মাছের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়েও বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বর্তমানে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণে নিয়োজিত ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ট্রলারের মধ্যে অন্তত ৭০টি ট্রলার ‘সোনার’ (Sonar) প্রযুক্তির মাধ্যমে অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতিতে মাছ শিকার করছে। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মাছ লক্ষ্য করে জাল ফেলার কারণে গভীর সমুদ্রের মজুদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি উপকূলীয় ও স্বল্প গভীর পানিতে মাছ শিকার করা সাধারণ জেলেরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। মৎস্য উপদেষ্টা ফরিদা আখতার সতর্ক করে বলেন যে, এমন পরিকল্পিত ও আগ্রাসী মাছ শিকার অব্যাহত থাকলে বঙ্গোপসাগর খুব দ্রুতই মাছশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। এমতাবস্থায় সরকার ‘সোনার ফিশিং’ বন্ধের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
অবশ্য গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশের জন্য কিছু আশার আলোও নিয়ে এসেছে। দেশের সমুদ্রসীমায় প্রচুর পরিমাণে টুনা মাছের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। এছাড়া সুন্দরবনের নিচে একটি প্রাকৃতিক ফিশিং নার্সারির সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সংরক্ষণের জন্য সরকার ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করেছে। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের স্থলভাগের প্রায় সমপরিমাণ এলাকা জলভাগে থাকলেও আমরা এই বিশাল সম্পদকে যথাযথভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। সামুদ্রিক সম্পদের সঠিক পরিমাণ ও সম্ভাবনা জানতে পর্যাপ্ত গবেষণা এবং শক্তিশালী পলিসি সাপোর্টের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।
সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈঠকে আরও জানানো হয় যে, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির বহুমুখী ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল ‘এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ’ বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা সমুদ্রের তলদেশের তথ্য সংগ্রহে সহায়ক হবে। প্রধান উপদেষ্টা জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর সাথে যৌথ গবেষণা ও তথ্য আদান-প্রদানের ওপর জোর দেন। তিনি বিশ্বাস করেন, বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ ও সমস্যা সমাধানের মাধ্যমেই নীল অর্থনীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সমুদ্র সম্পদ রক্ষা ও উন্নয়নের এই উদ্যোগ জাতীয় সমৃদ্ধির পথে এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।
শরীয়তপুরের অকুতোভয় বীরাঙ্গনা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগমায়া মালো আর নেই। বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতা এবং দুরারোগ্য ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে গত সোমবার দুপুরে সদর উপজেলার মধ্যপাড়া এলাকার নিজ বাসভবনে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। এই বীর নারীর প্রয়াণে স্থানীয় এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিকেলে তাঁর অন্তিমযাত্রার আগে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বরূপ ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়। শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইলোরা ইয়াসমিন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই সম্মান প্রদর্শন করেন এবং মরহুমার বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শোক জ্ঞাপন করেন।
যোগমায়া মালোর জীবন ছিল একাত্তরের দুঃসহ স্মৃতি ও অসীম ত্যাগের এক অনন্য উপাখ্যান। ১৯৭১ সালের ২২ মে শরীয়তপুর সদরের মনোহর বাজারের দক্ষিণ মধ্যপাড়া এলাকায় যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হিন্দু অধ্যুষিত জনপদে তাণ্ডব চালায়, তখন মাত্র ১৫ বছরের কিশোরী গৃহবধূ ছিলেন যোগমায়া মালো। সেই দিন তাঁকে ঘর থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং মাদারীপুরের এআর হাওলাদার জুট মিলে অন্তত ১০০ জন নারী-পুরুষের সঙ্গে বন্দি করা হয়। সেখানে পুরুষদের নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হলেও নারীদের ওপর চালানো হয়েছিল তিন দিনব্যাপী অমানবিক পাশবিক নির্যাতন। সেই ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেও যোগমায়া মালো কেবল জীবনের টানেই ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছর পর ২০১৮ সালে তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরাঙ্গনা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করেন।
মরহুমার জামাতা সুভাষ দাড়িয়া জানান যে, তাঁর শাশুড়ি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন এবং শেষ সময়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সসম্মানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ায় তাঁরা পরিবারের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন এই বীর নারীর অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন যে, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনা যোগমায়া মালোর জন্য কিছুদিন আগেই সরকারের পক্ষ থেকে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে তিনি জীবনের শেষ সময়টুকু স্বস্তিতে কাটাতে পেরেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই আত্মত্যাগ এবং দেশপ্রেমের ইতিহাস শরীয়তপুরবাসী ও নতুন প্রজন্ম চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখবে। প্রশাসনিক সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে পারিবারিক উদ্যোগে তাঁকে সসম্মানে বিদায় জানানো হয়।
সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ১৪ জন সাবেক শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাসহ মোট ১৫ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেছেন আদালত। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে করা এক বিশেষ আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজের আদালত এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেন। আদালতের সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যাতে তদন্ত চলাকালীন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্যই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক খোরশেদ আলম এই নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদনটি দাখিল করেছিলেন।
দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও রয়েছেন একঝাঁক সাবেক ক্ষমতাধর সচিব। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—সেতু বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মো. নজরুল ইসলাম, জননিরাপত্তা বিভাগের মোস্তাফা কামাল উদ্দীন, বিদ্যুৎ বিভাগের আহমদ কায়কাউস, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মো. আবদুল জলিল এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জাফর আহমেদ খান। তালিকায় আরও নাম রয়েছে—সাবেক অর্থ ও সিএএজি সচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের মোহাম্মদ শহিদুল হক, এসডিজি–বিষয়ক সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক মিজ জুয়েনা আজিজ, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের মো. মোফাজ্জেল হোসেন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কাজী শফিকুল আযম, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আখতার হোসেন ভূঁইয়া এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম।
দুদকের আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট মূল্যবান জমিতে ব্যক্তিস্বার্থে ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রকল্প অনুমোদন করেছেন এবং নীতিবহির্ভূতভাবে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। এমনকি অনুমোদিত নীতিমালাগুলো আইন অনুযায়ী গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ না করার অভিযোগও তাঁদের বিরুদ্ধে রয়েছে। বর্তমানে এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করছে দুদক। তদন্তকালে সংস্থাটি জানতে পেরেছে যে, অভিযুক্তরা সপরিবারে দেশত্যাগ করে বিদেশের মাটিতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। আসামিরা যদি একবার বিদেশে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, তবে চলমান এই মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত বা দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের সম্পদ রক্ষা ও সুষ্ঠু বিচারের স্বার্থে তাঁদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া অপরিহার্য ছিল বলে মনে করেছেন আদালত।
সারাদেশে জেঁকে বসা শীতের প্রকোপের মধ্যে আজ দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় কাঁপছে রাজশাহী। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকাল ৬টায় উত্তরের এই জনপদে তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মাত্র ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মৌসুমের এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন। আকাশে ঘন কুয়াশার দাপট খুব বেশি না থাকলেও ভোর থেকে বয়ে যাওয়া হাড়কাঁপানো হিমেল হাওয়ায় জনজীবন অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে আসায় এবং বাতাসের আর্দ্রতা ১০০ শতাংশ থাকায় শীতের অনুভূতি অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অনুভূত হচ্ছে।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে রাজশাহীর শহর ও গ্রাম—উভয় অঞ্চলেই মানুষের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হচ্ছে। আজ ভোর ৬টা ৪৭ মিনিটে সূর্যোদয় হওয়ার কথা থাকলেও সকাল ১০টা পর্যন্ত কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘলা আকাশের কারণে সূর্যের দেখা মেলেনি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যের উষ্ণতা না পাওয়ায় শীতের দাপট আরও বেড়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষের উপস্থিতি অন্যান্য দিনের তুলনায় বেশ কম লক্ষ্য করা গেছে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। বিশেষ করে বয়স্ক ও শিশুদের জন্য এই আবহাওয়া চরম অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শীতের এই তীব্রতায় সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। সকালে পেটের তাগিদে বাইরে বের হওয়া রিকশাচালক ও কুলি-মজুরদের ঠান্ডায় কাহিল হতে দেখা গেছে। স্থানীয় রিকশাচালক আব্দুল কুদ্দুস তাঁর কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন যে, ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাওয়ার মতো অবস্থা হলেও জীবিকার তাগিদে তাঁদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। মাঘ মাস আসার আগেই এমন অস্বাভাবিক শীতের দাপট এবং কনকনে বাতাসে সড়কের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক লতিফা হেলেন জানিয়েছেন, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকায় এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় তীব্র শীত অনুভূত হচ্ছে। আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রার এই নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলেও আভাস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীতার্ত ও দুস্থ মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও চাহিদার তুলনায় তা সামান্য বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বর্তমান পরিস্থিতিতে খড়কুটা জ্বালিয়ে অনেককে শীত নিবারণের চেষ্টা করতে দেখা গেছে। সামগ্রিকভাবে, তীব্র শীতের গ্রাসে রাজশাহী অঞ্চলের স্বাভাবিক ছন্দ এখন অনেকটাই থমকে গেছে।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবারও পিছিয়ে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আদালত। এ নিয়ে এ পর্যন্ত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১২৩ বার পেছানো হলো। সোমবার (৫ জানুয়ারি) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত এই দিন ধার্য করেন। এদিন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের অতিরিক্ত এসপি মো. আজিজুল হক আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি। তাই আদালত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন এ তারিখ ধার্য করেন।
এ মামলার আসামিরা হলেন- রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুন, আবু সাঈদ, সাগর-রুনির বাড়ির দুই নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল ও এনায়েত আহমেদ এবং তাদের ‘বন্ধু’ তানভীর রহমান খান। এদের মধ্যে তানভীর ও পলাশ জামিনে রয়েছেন। বাকিরা কারাগারে আটক রয়েছেন।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে হত্যা করা হয়। এরপর নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
প্রথমে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার এক উপপরিদর্শক (এসআই)। চার দিন পর চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার তদন্তভার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুই মাসেরও বেশি সময় তদন্ত করে রহস্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয় ডিবি। পরে হাইকোর্টের নির্দেশে একই বছরের ১৮ এপ্রিল হত্যা মামলার তদন্তভার র্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সাগর ও রুনি হত্যার ঘটনায় করা মামলার তদন্তে বিভিন্ন বাহিনীর অভিজ্ঞ তদন্ত কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তাদের ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত থেকে র্যাবকে সরিয়ে দেওয়ারও আদেশ দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৬ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়। পরে ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন নিরাপত্তা বিভাগ থেকে টাস্কফোর্স গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে পিবিআই প্রধানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়।
বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্তকরণসহ ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারি। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সামরিক বাহিনীর প্রত্যাহার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা মৌলিক সংশোধন, সামরিকীকৃত সন্ত্রাসবিরোধী নীতি পরিত্যাগ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইন, ২০০৯-এর ১৩ ধারা বাতিল এবং সব বাহিনীকে কঠোর আইনগত জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কমিশনের সুপারিশে আরও রয়েছে বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ, ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক ন্যায়বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিতকরণ এবং সত্য, স্মৃতি ও জবাবদিহির প্রতীক হিসেবে ‘আয়নাঘর’গুলোকে জাদুঘরে রূপান্তর।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) গুলশান এভিনিউয়ের কমিশন কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট, ১৯৫৬-এর ধারা ৩ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমিশনটি গঠিত হয়। কমিশনের ম্যান্ডেট ছিল ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাসমূহ অনুসন্ধান, গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধান ও শনাক্তকরণ এবং এসব ঘটনা সংঘটনের প্রেক্ষাপট নির্ধারণ।
ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে কমিশন বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নথি ও তথ্য পর্যালোচনা, পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই কার্যক্রম গ্রহণ করে। এ প্রক্রিয়ায় ডিজিএফআই ও র্যাব পরিচালিত জেআইসি ও টিএফআইসি, র্যাব সদর দপ্তর ও ব্যাটালিয়ন, এনএসআই, ডিবি, সিটিটিসি, পুলিশ লাইন্সসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। অনুসন্ধান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন জেলায় গোপন বন্দিশালার সন্ধান পাওয়া গেলে কমিশন সেগুলো পরিদর্শন করে স্থানগুলো অপরিবর্তিত রাখার নির্দেশনা দেয়।
কমিশন গঠনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ডিজিএফআইয়ের জেলখানা (আয়নাঘর) এবং র্যাব সদর দপ্তরের ডিটেনশন পরিদর্শন করে আটক রাখার প্রক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট বিভাগের উপস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্য এই দুটি সহ মোট তিনটি গোপন বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
কমিশনে দাখিল হওয়া ৯ হাজার ১৯১টি অভিযোগের মধ্যে একাধিকবার দাখিলকৃত ২ হাজার ৩১৩টি এবং প্রাথমিক যাচাইয়ে গুমের সংজ্ঞার বাইরে বিবেচনায় ১ হাজার ৩১০টি অভিযোগ বাতিল করা হয়। ফলে ৫ হাজার ৫৬৮টি অভিযোগ কমিশনের সক্রিয় বিবেচনায় আসে। এসব অভিযোগের মধ্যে ২৫১ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন এবং ৩৬ জনের ক্ষেত্রে গুমের পর লাশ উদ্ধার হয়েছে।
নিখোঁজদের অবস্থান নির্ধারণে কমিশন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি, গুমভুক্ত পরিবারের সদস্য ও বেসামরিক সাক্ষীসহ মোট ১১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পাশাপাশি ৭৬৫ জন গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
সীমান্তবর্তী জেলার পুলিশ সুপার ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সেক্টর কমান্ডারদের কাছ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকারী ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা হলেও সেখানে গুমের শিকার কোনো ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়নি। তবে ২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের বালিশার বাসিন্দা, গুমের শিকার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ চাপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর সীমান্ত দিয়ে প্রত্যাবর্তনের একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসে।
এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে আটক প্রথম দফায় ১ হাজার ৫২ জন এবং দ্বিতীয় দফায় ৩ হাজার ২৮৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকের তালিকা কমিশন পেলেও যাচাই শেষে গুমের শিকার কারও নাম পাওয়া যায়নি। তালিকার কিছু তথ্য অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও হালনাগাদ তথ্য চেয়ে পত্র পাঠানো হয়েছে এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে বিষয়টি অবহিত করতে বলা হয়েছে।
বলপূর্বক গুম সংক্রান্ত অভিযোগে গণমাধ্যমে জবানবন্দি গ্রহণ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ পাওয়া গেলেও ভিকটিম ও তাদের পরিবারের জীবন, নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং অনুসন্ধানের স্বার্থে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনায় কমিশন গোপনীয়ভাবে জবানবন্দি গ্রহণকেই অধিকতর সমীচীন বলে মনে করে।
কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২৫ শতাংশ গুমের ঘটনায় র্যাব জড়িত, ২৩ শতাংশ ঘটনায় পুলিশ, এবং বাকিগুলোতে ডিজিএফআই, সিটিটিসি, ডিবি, ডিটেনশন ও অন্যান্য ব্যাটালিয়ন সংশ্লিষ্ট। বহু ক্ষেত্রে র্যাবকে সমন্বয়কারী বা পরিকল্পনাকারী হিসেবে পাওয়া গেছে। অভিযোগের ধরন বিশ্লেষণে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত চর্চা হিসেবে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় সমর্থিত কার্যক্রমের ইঙ্গিত দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কমিশন অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট-এর ধারা ১৩ অনুযায়ী, সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া গুমের অভিযোগগুলোর তদন্ত ও নিষ্পত্তির লক্ষ্যে চার ধাপে কিছু অভিযোগ বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে সেই অগ্রগতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নিখোঁজদের ভাগ্য নির্ধারণে কমিশন দেশের বিভিন্ন জেলায় সন্দেহভাজন ক্রাইম সিন, পিক-আপ ভ্যান, আয়নাঘর ও ডাম্পিং গ্রাউন্ড পরিদর্শন করে। ময়মনসিংহে একটি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কবরস্থানের সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে গুমের শিকার ব্যক্তিদের দাফন করা হয়েছে বলে প্রত্যাশা করা হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে দেখা যায়, দাফনকৃত লাশগুলোর মাথায় গুলির চিহ্ন এবং দুই হাত পেছনে বাঁধা ছিল। এছাড়া বরিশালের বলেশ্বর নদী ও বরগুনার পাথরঘাটায় ডাম্পিং জোনের সন্ধান মেলে।
বরিশালে দুটি দেহ উদ্ধার ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে কমিশন শনাক্তকরণ কার্যক্রমের সূচনা করে। অজ্ঞাত মরদেহের ছবি ব্যবহার করে অনুসন্ধান কার্যক্রম মিউনিসিপ্যাল ইমার্জেন্সি রেকর্ড ও অন্যান্য সূত্রের সঙ্গে সমন্বয়ে এগিয়ে নেওয়া হয়। কমিশন অজ্ঞাত ও বেওয়ারিশ মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি ব্যাপক ডিএনএ ডাটাবেস গঠনের সুপারিশ করেছে।
কমিশন গুমের ভিকটিম ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রতিটি বিভাগে পরামর্শ সভা, ৩০০ জনের বেশি ভিকটিম ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য চারটি কর্মশালা এবং একাধিক প্রেস ব্রিফিং আয়োজন করে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মাধ্যমে গুম বিষয়ক একটি তথ্যচিত্রও প্রকাশ করা হয়। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে কমিশন কাজ করেছে। এসব সংস্থা গুমের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কমিশনের কাজের প্রশংসা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের তাগিদ দেয়।
কমিশন ইতোমধ্যে দুটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যেখানে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। পুনরাবৃত্তি রোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স প্রিভেনশন অ্যান্ড রিড্রেস অ্যাক্ট, ২০২৫ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়নে সহায়তা করে।
চলতি ২০২৬ সালে সরস্বতী পূজা, ২১ ফেব্রুয়ারি, মে দিবস, বুদ্ধপূর্ণিমা, পবিত্র আশুরা, শুভ জন্মাষ্টমী, মধু পূর্ণিমা ও শুভ মহালয়ার ছুটি বাতিল করা হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ও ভারতের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসত্য তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়। প্রেস উইং ফ্যাক্টস এক পোস্টে বলেছে, ‘প্রকৃতপক্ষে, এসব দিবস সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়ায় আলাদাভাবে ছুটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।’
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব সাবিনা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত এ বছরের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপনটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৭ জানুয়ারি (শনিবার) শবে মিরাজ, ২৩ জানুয়ারি (শুক্রবার) শ্রী শ্রী সরস্বতী পূজা, ২১ ফেব্রুয়ারি (শনিবার) শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ১ মে (শুক্রবার) মে দিবস ও বুদ্ধ পূর্ণিমা (বৈশাখী পূর্ণিমা), ২৬ জুন (শুক্রবার) পবিত্র আশুরা (মহররম), ৪ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) শুভ জন্মাষ্টমী, ২৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) মধু পূর্ণিমা এবং ১০ অক্টোবর (শুক্রবার) শুভ মহালয়া- এই দিবসগুলোর বিপরীতে ছুটির দিন সংখ্যা ‘শূন্য’ উল্লেখ রয়েছে।
ফ্যাক্টচেক অনুসন্ধান টিম জানায়, ‘যেসব সরকারি ছুটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন (শুক্রবার ও শনিবার)-এর সঙ্গে মিলেছে, সেগুলো নতুন করে অতিরিক্ত ছুটি হিসেবে গণনা করা হয়নি। গত দুই বছরের সরকারি ছুটির প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণ করেও একই চিত্র পাওয়া যায়। গত দুই বছরেও যেসব সরকারি ছুটি সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সঙ্গে মিলেছে, সেগুলো নতুন করে অতিরিক্ত ছুটি হিসেবে গণনা করা হয়নি।’
ছুটি বাতিলের দাবি সত্য নয়, বরং সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় নতুন করে অতিরিক্ত ছুটি হিসেবে দেখানো হয়নি বলে জানায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনাল বা থার্ড টার্মিনাল বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন। সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। উপদেষ্টা জানান যে, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এই টার্মিনালটি সচল করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হয়েছিল এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে জাপানের ভাইস মিনিস্টারের সঙ্গে বৈঠকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে দর কষাকষি করেছেন। তবে অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও এই মেয়াদে এটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে সরকার টার্মিনালটি সচল করার জন্য প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক ও পদ্ধতিগত কাজগুলো গুছিয়ে রাখছে এবং এটি চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকার গ্রহণ করবে।
২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এই বিশাল মেগা প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার প্রদান করেছে এবং বাকি অর্থ জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকা (JICA) থেকে ঋণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর এই টার্মিনালের আংশিক বা প্রাথমিক উদ্বোধন করা হয়েছিল এবং তৎকালীন সরকার ২০২৪ সালের শেষের দিকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। তবে বারবার নেতৃত্বের পরিবর্তন, বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতে বিলম্ব এবং ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা কারণে এই প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা বারবার পিছিয়ে গেছে।
শাহজালাল বিমানবন্দরের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে এই থার্ড টার্মিনাল একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এই টার্মিনালে যাত্রীসেবার জন্য ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার, ৬৬টি ডিপার্চার ইমিগ্রেশন ডেস্ক, ৫৯টি অ্যারাইভাল ইমিগ্রেশন এবং তিনটি বিশেষ ভিআইপি ইমিগ্রেশন ডেস্ক নির্মাণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, টার্মিনালটি সম্পূর্ণরূপে চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক কার্গো হ্যান্ডলিং ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে ১০ লাখ টনে পৌঁছাবে এবং যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা বর্তমানের চেয়ে তিনগুণ বেড়ে বছরে ২ কোটি ৪০ লাখে দাঁড়াবে। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পদ্ধতিগত দীর্ঘসূত্রতার কারণে আপাতত এই বিশাল সুযোগের জন্য দেশবাসীকে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের আগমনের অপেক্ষায় থাকতে হবে।
সারা দেশজুড়ে বয়ে যাওয়া তীব্র শৈত্যপ্রবাহে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যখন চরমভাবে বিপর্যস্ত, তখন বিদ্যুৎ সেবার পাশাপাশি মানবিক দায়িত্ব পালনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বাপবিবোর্ড)। এই মহতী উদ্যোগে বাপবিবোর্ডের সাথে সরাসরি একাত্ম হয়ে কাজ করছে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ‘ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও কল্যাণ পরিষদ’ (ক্রীসকপ)। শীতের প্রকোপ থেকে অসহায় ও সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে তারা যৌথভাবে দেশব্যাপী একটি সমন্বিত ‘কম্বল বিতরণ কর্মসূচি’ গ্রহণ করেছে। গত কয়েকদিন ধরে চলমান এই হাড়কাঁপানো শীতে প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলের মানুষের কষ্ট লাঘবে বাপবিবোর্ড এবং পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর এই নিরলস প্রচেষ্টা ইতিমধ্যে সর্বস্তরে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
বাপবিবোর্ড প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, তাদের এই কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো কেবল নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করাই নয় বরং যেকোনো দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করা। প্রতিটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এই কম্বল বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তীব্র শীতের এই কঠিন সময়ে এই ধরণের সরাসরি মানবিক সহায়তা সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় স্বস্তি ও আশ্রয়ের স্থল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, সরকারি সেবার বাইরে গিয়ে এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ জনসেবার সংজ্ঞাকে আরও মহিমান্বিত করেছে।
পরিশেষে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে দেশবাসীর সুস্থতা ও নিরাপত্তা কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা জানানো হয়েছে। তারা দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে যে, বর্তমান সংকটের পাশাপাশি ভবিষ্যতেও যেকোনো ধরনের জাতীয় দুর্যোগ বা জনকল্যাণমূলক কাজে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এবং দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। জনগণের সার্বিক কল্যাণে বিদ্যুৎ খাতের এই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের পেশাদারিত্বের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলিরও উজ্জ্বল সাক্ষর রেখে চলেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে অব্যাহত থাকবে। মূলত মানুষের দুয়ারে কেবল আলো নয়, উষ্ণতা পৌঁছে দিতেই বাপবিবোর্ডের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ গ্রাম প্রতিরক্ষা দল (ভিডিপি)-এর ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ ৫ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে গাজীপুরের সফিপুরে আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে তাৎপর্যপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হয়েছে ‘ভিডিপি দিবস’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উদ্বোধনী বক্তব্য প্রদান করেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
উপস্থিত সকলের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে মহাপরিচালক তাঁর বক্তব্যে ভিডিপি’র গৌরবময় ইতিহাস, বর্তমান অবদান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন। মহাপরিচালক বলেন,
“গ্রাম ও নগরের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের মহান লক্ষ্য নিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে প্রায় ৬০ লক্ষ সদস্যের এক বিশাল স্বেচ্ছাসেবী পরিবারে। এই ঐতিহাসিক দিনে আমি ভিডিপি’র সকল সদস্য-সদস্যা, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।”
ভিডিপি’কে গণপ্রতিরক্ষার একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন,
“স্বেচ্ছাসেবী ভিডিপি সদস্যরা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নিরাপত্তা কাঠামোর প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে। আইন প্রয়োগে সহায়তা, সামাজিক অপরাধ দমন, বাল্যবিবাহ ও মাদক প্রতিরোধ, নারীর ক্ষমতায়ন, জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন, পূজামণ্ডপ ও ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও উদ্ধারকাজ এবং জরুরি মানবিক সহায়তাসহ নানাবিধ সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রমে তারা নিষ্ঠা ও সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।”
ভিডিপি প্রতিষ্ঠার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাহিনীর সদস্যদের সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন মহাপরিচালক। তিনি বলেন,
“আধুনিক কর্মমুখী প্রশিক্ষণ এবং আনসার–ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের সহজ ঋণ ব্যবস্থাপনায় ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্পের আওতায় ভিডিপি সদস্যরা কৃষি, মৎস্য ও কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত স্বাবলম্বিতা অর্জনের পাশাপাশি তৃণমূল অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
তিনি আরও জানান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বিটাক ও সহজ ডটকমের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ভিডিপি ও টিডিপি সদস্যদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
মহাপরিচালক উল্লেখ করেন, বহুল প্রতীক্ষিত ‘সঞ্জীবন’ প্রকল্প ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে দেশের ১২টি জেলার ১২টি উপজেলায় চালু হয়েছে। পরিকল্পিত ও টেকসই অর্থনৈতিক সুরক্ষা কাঠামো হিসেবে এই প্রকল্প দেশব্যাপী ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ সুগম করবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ভিডিপি সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে গৃহীত সংস্কার কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সকল ভিডিপি সদস্যকে আধুনিক ডিজিটাল ডাটাবেজ AVMIS-এর আওতায় আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও যোগ্য সদস্যদেরই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত করা সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ মডিউলের মাধ্যমে শারীরিকভাবে সক্ষম, শিক্ষিত ও দেশপ্রেমিক তরুণ-তরুণীদের নিয়ে ভিডিপির সাংগঠনিক কাঠামো আরও সুদৃঢ় করা হয়েছে।”
ভিডিপি প্রতিষ্ঠার এই ঐতিহাসিক দিনে উপস্থিত সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বাহিনী প্রধান বলেন,
“অদম্য সাহস, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম বুকে ধারণ করে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে ভিডিপিকে আরও সুশৃঙ্খল, প্রশিক্ষিত ও সমৃদ্ধশালী বাহিনীতে পরিণত করা যায়। তাতেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি গড়ে উঠবে।”
শান্তির প্রতীক পায়রা উড়ানো, কেক কাটা ও বর্ণাঢ্য র্যালির মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপিত হয়। উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালের এই দিনে গ্রাম ও নগর পর্যায়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারের মহান লক্ষ্য নিয়ে ভিডিপি’র গৌরবময় যাত্রা শুরু হয়।
উৎসবমুখর এই অনুষ্ঠানে বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক, উপমহাপরিচালকবৃন্দসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং বিপুলসংখ্যক ভিডিপি সদস্য-সদস্যা উপস্থিত ছিলেন।
সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ এবং ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে আলোচিত তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইল, মামলা-বাণিজ্য ও প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনায় মুখ খুলেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল। সোমবার দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বার্তার মাধ্যমে তিনি জানান যে, সুরভীর পুরো বিষয়টির ওপর তিনি ব্যক্তিগতভাবে নজর রাখছেন। আসিফ নজরুল তাঁর পোস্টে অত্যন্ত ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়ে লিখেছেন যে, তিনি ইতিমধ্যে সুরভীর বিষয়ে প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নিয়েছেন এবং ইনশাআল্লাহ তিনি খুব দ্রুতই এই পরিস্থিতির প্রতিকার পাবেন। উপদেষ্টার এই বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং সুরভীর সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের আশার সঞ্চার করেছে।
অন্যদিকে, আজ সোমবারই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সুরভীকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণার মতো গুরুতর সব অভিযোগ তুলে মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। সুরভীকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। তাঁর অনুসারীদের একটি বড় অংশ দাবি করছেন যে, সুরভীকে কোনো একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। আন্দোলন পরবর্তী সময়ে তাঁর মতো একজন সক্রিয় কর্মীকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অনেকেই সহজে মেনে নিতে পারছেন না।
আইন উপদেষ্টার এই সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও মামলার আইনি প্রক্রিয়া এবং রিমান্ড কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে, তবে আসিফ নজরুলের ‘প্রতিকার’ পাওয়ার আশ্বাস একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ধারণা করা হচ্ছে, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে সুরভীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং তাকে ফাঁসানোর যে গুঞ্জন রয়েছে, তা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করা হবে। বর্তমানে এই ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক ও ছাত্র মহলে বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এবং সকলে এই আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর সমবেদনা জানিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পাঠানো আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা গ্রহণ করেছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেল ৩টার দিকে রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই শোকবার্তাটি আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে পাঠানো এই বার্তাটি গ্রহণের বিষয়টি বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান এবং সংশ্লিষ্ট দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
শোকবার্তাটি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সশরীরে গুলশানে আসেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের একান্ত সচিব–২ এস এম খাইরুল ইসলাম (সজীব)। তিনি কার্যালয়ে পৌঁছালে বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। পরবর্তীতে এক সংক্ষিপ্ত ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে তারেক রহমান সেই শোকবার্তাটি নিজ হাতে গ্রহণ করেন। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে শোক প্রকাশ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়েছে। এর আগে রাষ্ট্রীয়ভাবে তিন দিনের শোক পালন এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন করার মাধ্যমে সরকার যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেছে। আজ প্রধান উপদেষ্টার এই আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা প্রেরণের বিষয়টি রাজনৈতিক শিষ্টাচারের একটি ইতিবাচক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারেক রহমান এই শোকবার্তাটি গ্রহণ করার সময় শোকসন্তপ্ত পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বর্তমানে বিএনপি কার্যালয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত শোকবার্তা ও শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।