চার দিনের সরকারি সফরে আজ সোমবার চীন সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সফরে প্রায় ২০ থেকে ২২টি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ থেকে ‘বিস্তৃত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’-এ উন্নীত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল লি শিয়াংয়ের আমন্ত্রণে ৮ থেকে ১১ জুলাই এ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী চীনের প্রেসিডেন্ট, প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল, সিপিপিসিসির জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
গতকাল রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর্দা উন্মোচন সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এ তথ্য জানান।
চীন থেকে বাজেট সহায়তা নেওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বাজেট সহায়তা নয় বরং চীনের সঙ্গে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক খাতে পাঁচ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সহযোগিতার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
চীনকে বাংলাদেশ অফশোর ব্যাংকিংয়ের প্রস্তাব দেবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, অফশোর ব্যাংকিং ইজ ওপেন ফর অল। যেকোনো দেশ যদি চায়, আমাদের সেন্ট্রাল ব্যাংকে চাইলে টাকা রাখতে পারে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ব্যাংকে অনেক দেশ টাকা রাখতে পারে। তবে অফশোর ব্যাংকিং কিছুটা ভিন্ন বিষয়।
মোংলা বন্দর উন্নয়নের বিষয়ে চীনের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছিল, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব চীনকে দেওয়া হবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মোংলা বন্দর উন্নয়নের বিষয়ে চীনের সঙ্গে আমরা আলাপ-আলোচনার মধ্যে আছি। এই সফরে আশা করছি বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হবে।
দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চীনের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি থেকে আমরা আমদানি করছি বেশি, রপ্তানি কম হয়। আমাদের পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সফরের বিস্তারিত জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার সকাল ১১টায় বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটযোগে বাংলাদেশ ত্যাগ করবেন এবং একই দিন চীনের স্থানীয় সময় বিকেল ৬টায় বেইজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনারসহ যথাযথ অভ্যর্থনা জানানো হবে।
অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, অন্যান্য সচিববৃন্দসহ উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন।
মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিন লিকুনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তিনি সাংগ্রিলা সার্কেলে অনুষ্ঠেয় ‘সামিট অন ট্রেড, বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অপরচুনিটিজ বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড চায়না’ শীর্ষক সম্মেলনে অংশ নেবেন। বাংলাদেশের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল সম্মেলনে যোগ দেবে।
সেদিন দুপুরে প্রধানমন্ত্রী চাইনিজ পিপল’স পলিটিক্যাল কনসাল্টেটিভ কনফারেন্সের (সিপিপিসিসি) ১৪তম জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াং হুনিং-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিকেলে ঐতিহ্যবাহী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করবেন। রাতে তিনি বেইজিংস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত নৈশভোজে অংশগ্রহণ করবেন।
১০ জুলাই সফরের তৃতীয় দিনে প্রধানমন্ত্রী গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ উপস্থিত হলে তার সম্মানে আয়োজিত অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান শেষে চীনের প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল লি শিয়াংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলসহ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এরপর দুই দেশের সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে প্রায় ২০ থেকে ২২টির মতো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং কয়েকটি প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণার কথা রয়েছে।
সমঝোতা স্মারক নিয়ে ড. হাছান জানান, অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, ডিজিটাল ইকোনমি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি খাতে সহায়তা, ষষ্ঠ ও ৯ম বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ নির্মাণ, বাংলাদেশ থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পিপল টু পিপল কানেকটিভিটি প্রভৃতি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে গ্রেট হলে আয়োজিত ব্যংকুয়েটে এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
বুধবার ১০ জুলাই বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর উপলক্ষে বাংলাদেশ ও চীন একটি যৌথ বিবৃতি দেবে।
১১ জুলাই বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী চীন ত্যাগ করে দুপুর ২টায় ঢাকা অবতরণের কথা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল স্বাধীনতারও পূর্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৫২ সালে ঐতিহাসিক চীন সফরের মাধ্যমে। সে সময় চীনের তৎকালীন নেতা মাও সেতুংয়ের সঙ্গে জাতির পিতার সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বঙ্গবন্ধু ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটি রচনা করেন। চীন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে, যার ধারাবাহিকতায় দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে উন্নয়নের পথে অগ্রসরমান।
২০১৬ সালে শি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক কৌশলগত সহযোগিতার অংশীদারত্বে উন্নীত হয়। বিগত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনাকে চীনের পক্ষ হতে সরকারি সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। চীন বাংলাদেশের অবকাঠামোগত এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একজন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য, আর্থিক সহায়তা এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ চীনের সহায়তা কামনা করবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনের বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ চীনের প্রতি সমর্থন প্রদান করে যাবে। চীনে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন এ সফর সফল এবং ফলপ্রসূ হবে বলে আমরা আশাবাদী।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরে পুঞ্জীভূত পরিবেশগত সংকট ও অব্যবস্থাপনা মাত্র ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সম্পূর্ণ সমাধান করা অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেন যে, সমস্যার বিশাল পাহাড় রাতারাতি সরানো সম্ভব না হলেও বর্তমান সরকার একটি সুসংহত সমাধানের ভিত্তি তৈরি করছে। তাঁর মতে, "চীন যে সমস্যা ১০ বছরে শেষ করতে পারে না, তা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেড় বছরে প্রত্যাশা করা যুক্তিযুক্ত নয়।" তবে এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য সাত দফার একটি সুনির্দিষ্ট ‘পরিবেশ অ্যাজেন্ডা’ উপস্থাপন করেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতির আধিক্য থাকলেও বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পথরেখা না থাকায় হতাশা প্রকাশ করে উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক সস্তা জনপ্রিয়তার বাইরে এসে প্রকৃত দায়বদ্ধতা প্রদর্শন জরুরি। তিনি আগামী সরকারের জন্য বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানো, শব্দদূষণ রোধে পুলিশকে সরাসরি জরিমানার ক্ষমতা প্রদান, দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার এবং প্রাকৃতিক বনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। একইসাথে বন্যপ্রাণী কল্যাণ, অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে শিল্প দূষণ রোধ, তিস্তা ও পদ্মার মতো আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা এবং উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণের মাধ্যমে সার উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করেন। তাঁর মতে, ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট না হলে সাধারণ মানুষ তার সুফল পায় না।
অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান অর্জনগুলো তুলে ধরে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান যে, ইতিমধ্যে দেশে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ ‘যানবাহন স্ক্র্যাপ পলিসি’ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের জন্য ১০০টি ইলেকট্রিক বাস আমদানির প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এছাড়া বেজা ও প্রশাসনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ২০ হাজার একরের বেশি বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে এবং সাভারকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করে অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার তলদেশে জমে থাকা কয়েক মিটার পলিথিন স্তরের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি পলিথিনমুক্ত বাজার নিশ্চিতে জনগণের আচরণগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
পরিশেষে ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, "যদি পরিবেশবান্ধব কাজ করা হয়, আমরা সহযোগিতা করব। কিন্তু পরিবেশের বিরুদ্ধে গেলে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।" তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বর্তমান সরকার পরিবেশগত যে মজবুত ভিত্তি স্থাপন করছে, আগামী নির্বাচিত সরকার তা আরও সুদৃঢ় করবে। পরিবেশ রক্ষা কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের মূল অ্যাজেন্ডায় পরিণত হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। অন্তর্বর্তী সরকার কেবল সংস্কারের পথ দেখাচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ প্রশাসনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করতে অংশীজনদের ভূমিকা নিয়ে শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। উক্ত সম্মেলনে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার গুরুত্বারোপ করেন যে, নির্বাচন পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও একটি সার্থক নির্বাচনের জন্য সরকার, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম ও ভোটারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। অংশীজনদের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, "নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে বহু অংশীজন জড়িত। সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম ও ভোটার সবার সম্মিলিত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব।"
সংবাদ সম্মেলনে সুজনের পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রতি শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার দাবি জানানো হয়। একইসাথে নির্বাচন কমিশনকে কালোটাকা ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত হয়ে কঠোরভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয় এবং অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে প্রয়োজনে ভোট স্থগিত বা ফলাফল বাতিলের ক্ষমতা প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়। গণমাধ্যমকে অনুসন্ধানী ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের এবং পর্যবেক্ষকদের নিরপেক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে ভোটারদের প্রতি সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের বর্জনের আহ্বান জানিয়ে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলিপ কুমার সরকার বলেন, "জনগণ যেন কোনও দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মানবতাবিরোধী, নারী বিদ্বেষী ও নির্যাতনকারী, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারী, ঋণখেলাপী, বিলখেলাপী, সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি, ভূমিদস্যু, পরিবেশ ধ্বংসকারী, কালোটাকার মালিক অর্থাৎ কোনও অসৎ, অযোগ্য ও গণবিরোধী ব্যক্তিকে ভোটদানে বিরত থাকেন।"
নির্বাচনী সংস্কার প্রসঙ্গে বদিউল আলম মজুমদার কিছু অপ্রাপ্তি ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া এবং তৃণমূল পর্যায়ে প্রার্থী মনোনয়নের বিধান বাস্তবায়িত না হওয়ার বিষয়টিকে তিনি নেতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি মন্তব্য করেন যে, "নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো কার্যকর করা হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নির্বাচন আরও গ্রহণযোগ্য হতো।" পরিশেষে, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে ভোটারদের নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয় এবং সকল অংশীজন নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে সরাসরি সংলাপ ও সংবেদনশীল প্রশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন যে, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখেই কেবল নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বৈষম্য দূর করা সম্ভব। ড. আবরারের মতে, শিক্ষা কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি নাগরিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরির একটি প্রধান ক্ষেত্র। তরুণদের সৃজনশীলতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "আমরা টোকেনিজম চাই না, চাই অ্যাকটিভ পার্টিসিপেশন ও এনগেজমেন্ট।"
নতুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তরুণদের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি আরও বলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালিত হয় জনগণের অর্থে, যার একটি বিশাল অংশ হলো তরুণ সমাজ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, একসময় নাগরিক অধিকার হরণের শঙ্কা থাকলেও তরুণরাই পরিবর্তনের পথ উন্মোচন করেছে। শিক্ষা উপদেষ্টার মতে, শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহায়ক পরিবেশ ও রিসোর্স মোবিলাইজেশনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, যেখানে ক্লাব ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থীদের সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। বর্তমান সময়ে সমাজে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন যে, সংস্কৃতি, গান, নাচ কিংবা পরিচয়ের কারণে কাউকে হেয় করা উচিত নয়। এ ধরনের সংকীর্ণ ও একমাত্রিক চিন্তাভাবনার বিরুদ্ধে তরুণদেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে, আসন্ন নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রসঙ্গে ড. রফিকুল আবরার প্রতিষ্ঠানগত পরিবর্তনে তরুণদের সম্পৃক্ত হওয়ার ওপর জোর দেন। তিনি মনে করেন, শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, বরং জাতীয় সংসদসহ রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোতে তরুণদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিক যেহেতু জনগণই, তাই সব স্তরে স্বচ্ছতা ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ ইউনেস্কো কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল সারভীনা মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় শিক্ষা সচিব রেহানা পারভীন এবং ইউনেস্কোর প্রতিনিধি সুজান ভাইজসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে এবারই প্রথম পোস্টাল ব্যালটে ভোটগ্রহণ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শনিবার ইসি থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, "নির্বাচনের দিন (১২ ফেব্রুয়ারি) বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যে যে পোস্টাল ভোটগুলো আসবে, শুধু সেগুলোই গণনা করা হবে"।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, "মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনকারী ভোটারদেরকে ব্যালট প্রাপ্তির পর যত দ্রুত সম্ভব ভোটদান সম্পন্ন করে নিকটস্থ পোস্ট অফিস কিংবা ডাক বাক্সে হলুদ খাম জমা দিতে হবে"। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, "রিটার্নিং কর্মকর্তার নিকট ১২ ফেব্রুয়ারি বিকাল সাড়ে ৪টার মধ্যে ব্যালট পৌঁছালে ভোট গণনায় সম্পৃক্ত হবে"।
উল্লেখ্য, দেশ ও দেশের বাইরে থেকে ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ভোটার এই প্রক্রিয়ায় ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন, যাদের অর্ধেকের বেশি প্রবাসী। সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে যা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত এবং "ভোটগ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত" অনুষ্ঠিত হবে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বিরকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও গোয়েন্দা প্রধান শফিকুল ইসলাম।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) সকালে মিন্টু রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, গত ৭ জানুয়ারি কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের পাশের একটি গলিতে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা উত্তর সিটি ইউনিটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুছাব্বিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে ডিবি প্রধান বলেন, কারওয়ান বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে ও গোপনে চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িত আট থেকে নয়টি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে এবং চাঁদার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরে দিলীপ ওরফে বিনাশের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ঘটনার পরদিন নিহতের স্ত্রী তেজগাঁও থানায় মামলা করার পর গোয়েন্দা পুলিশ এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের মধ্যে জিন্নাত, আবদুল কাদির, মো. রিয়াজ ও বিলালের পর সর্বশেষ গতকাল নরসিংদী থেকে কথিত শুটার রহিমকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় সম্পর্কে শফিকুল ইসলাম বলেন, “তাদের চাঁদাবাজ হিসেবেই চিহ্নিত করা উচিত। চাঁদাবাজদের কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই। চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যানারের আশ্রয় নেয়।” বর্তমানে এসব অপরাধী চক্র নির্মূলে গোয়েন্দা পুলিশ সক্রিয় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “এসব সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে ডিবি কাজ করছে এবং শিগগিরই অভিযান শুরু করা হবে।”
ইউনেসকোর হেড অব অফিস ও বাংলাদেশে রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ মন্তব্য করেছেন যে, তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে ঢাকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় সম্মানীয় অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
সম্মানীয় অতিথির বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, “শিক্ষা ব্যবস্থার তরুণদের অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে। তাদের শুধু নির্দেশনা দেওয়া নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ বানানোই সময়ের দাবি।” বর্তমানে বাংলাদেশ যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে তরুণদের আবেগ ও দায়বদ্ধতা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে উল্লেখ করে তিনি জানান যে, ইউনেসকো তরুণদের কেবল উপদেশগ্রহীতা নয় বরং মাঠপর্যায়ের উদ্ভাবনী অংশীদার হিসেবে দেখে। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের মূল্যায়নে অষ্টম শ্রেণির ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর বাংলায় প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকা এবং গণিতে আরও পিছিয়ে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আগামী কয়েক বছরে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে শিক্ষার্থীদের বাস্তবসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ এবং শিক্ষকদের কেবল জ্ঞানদাতা নয় বরং মেন্টর ও মানসিক বিকাশের সহযাত্রী হিসেবে গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
এছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে ইউনেসকো ও ইউনিসেফ আগামী চার বছর শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে নিবিড়ভাবে কাজ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেসকো কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল সারভীনা মনীরের সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন।
রাজধানীর রায়েরবাজারের ক্যান্সার গলি ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় কিশোর গ্যাং এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দমনে সেনাবাহিনীর এক বিশেষ অভিযানে ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
শনিবার সকালে ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান যে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টা থেকে মধ্যরাত ১টা পর্যন্ত বসিলা সেনা ক্যাম্পের একটি বিশেষ দল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে শাহরিয়ার, লিংকু, ইয়াসিন (২০), ইয়াসিন (২১), জসিম, স্বাধীন, রিয়াজ, নিজাম, মাহাবুব, হৃদয়, আকাশ, নিদ্রয়, সানি, করিম, রুজন, সাকিব, ফয়সাল ও উজ্জ্বল নামে ১৮ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটককৃতদের কাছ থেকে ১২টি ধারালো তলোয়ার, ২টি চাপাতি, একটি চাইনিজ কুঠার, ২টি ধারালো সামুরাই, ১৩টি স্মার্টফোন, মাদক বিক্রির নগদ ৪০ হাজার ২০০ টাকা ও ১২৫ পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃতরা নিয়মিত মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক অভিযোগ ও মামলা থাকায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে তাদের মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হবে।
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমার যে বক্তব্য দিয়েছে, তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এই প্রতিবাদ জানানো হয়।
বাংলাদেশ বলছে, রোহিঙ্গাদের আদি পরিচয় মুছে ফেলে তাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে প্রমাণের এই চেষ্টা মূলত গণহত্যার দায় এড়ানোর একটি অপকৌশল।
বিবৃতিতে বলা হয়, মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় অস্বীকার করছে। তাদের ‘বাঙালি’ আখ্যা দিয়ে ২০১৬-১৭ সালে চালানো ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ বা নৃশংসতাকে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে দেশটি। অথচ ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, রোহিঙ্গারা আরাকানের একটি স্বতন্ত্র নৃগোষ্ঠী, যারা ১৭৮৫ সালে বার্মিজদের দখলের অনেক আগে থেকেই সেখানে বসবাস করে আসছে।
পরিকল্পিতভাবে প্রান্তিকীকরণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাজনীতি, সমাজ ও সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। এমনকি ২০১৫ সাল পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার ছিল। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে এই জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রহীন করতে এবং নির্মূল করতে তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয় এবং দেশ থেকে বিতাড়ন করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রায় ৫ লাখ মানুষ রাখাইনে আশ্রয় নিয়েছিল–মিয়ানমারের এমন দাবিকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘যুক্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ।
সরকার বলছে, মিয়ানমার এর সপক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেনি। তৎকালীন রাখাইনের জনসংখ্যার তুলনায় ৩০ শতাংশ মানুষের অনুপ্রবেশের মতো ঘটনা ঘটলে তা অবশ্যই বিশ্ববাসীর নজরে আসত এবং আর্থ-সামাজিক সংকটের সৃষ্টি হতো। কোনো যৌক্তিক কারণেই মানুষ যুদ্ধ এড়িয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া রাখাইনে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য যাবে না।
বাংলাদেশ জানায়, রোহিঙ্গাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার কিছু মিল থাকলেও তা সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতি রয়েছে। তাদের ‘বাঙালি’ ডাকা কেবল একটি পরিচয় বির্তক নয়, বরং এটি তাদের মানবাধিকার ও নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার একটি হাতিয়ার।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, গত আট বছরেও রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুসারে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বদলে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। এই অনীহা তাদের রোহিঙ্গা নির্মূলের অশুভ ইচ্ছারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং রাখাইনের বর্তমান নিয়ন্ত্রকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা রোহিঙ্গাদের নিজস্ব সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে তাদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করে।
জুলাই অভ্যুত্থানের আগে ও পরের বাংলাদেশে জননিরাপত্তা একটি বড় হুমকি হয়েই রয়েছে বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহানের পর্যবেক্ষণ। তার মতে, আগে ছিল ভয়ের পরিবেশ। গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরে এখন ভয়ের সঙ্গে অসহিষ্ণু পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর এফডিসিতে এক বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন রওনক জাহান। ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটেছিল। তারপরের বাংলাদেশে ‘মব’ হয়ে ওঠে আলোচনার নতুন উপাদান।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, আগে ভয়ের পরিবেশ শুধু রাষ্ট্রের কাছ থেকে আসত। এখন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোষ্ঠীর দিক থেকে ভয় আসছে। অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারছে না, ভয়টা ঠিক কোথা থেকে আসছে।
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পরমতসহিষ্ণুতার ওপর জোর দিয়ে রওনক জাহান বলেন, ‘আমাদের সে জন্য একটু সহিষ্ণু হতে হবে। সঠিক পথে না চললে প্রশ্ন তুলতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন তোলার অর্থ এই নয় যে ভাঙচুর করতে হবে কিংবা কাউকে গিয়ে পেটাতে হবে।’
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই মানুষ ভয় পাচ্ছে বলে সহিংসতা রোধে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান রওনক জাহান। তিনি বলেন, গণতন্ত্রে প্রতিযোগিতার অর্থ হলো নির্বাচনে একটি দল হারবে, অপর একটি দল জিতবে। দেশে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হারার মানসিকতা তৈরি হয়নি। অতীতে দেখা গেছে, যারা নির্বাচনে হেরে যান, তারা নির্বাচনকে বিভিন্নভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেন।
আগে ভয়ের পরিবেশ শুধু রাষ্ট্রের কাছ থেকে আসত। এখন বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গোষ্ঠীর দিক থেকে ভয় আসছে। অনেক সময় মানুষ বুঝতে পারছে না, ভয়টা ঠিক কোথা থেকে আসছে।
ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে জনগণের সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেন, আগামী নির্বাচনে মানুষ দল ও মার্কার চেয়ে ব্যক্তিকে বাছাই করে ভোট দেবেন। তবে জটিল এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের বেশি সচেতন থাকতে হবে।
গণতান্ত্রিক কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সার্বক্ষণিক জবাবদিহির মধ্যে রাখতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রওনক জাহান বলেন, ‘নাগরিকেরা এটা যদি না করে, তাহলে তারা তাদের অধিকারকে রক্ষা করতে পারবে না। গণতন্ত্রের জন্য এটা সবচেয়ে জরুরি।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হচ্ছে, সেটা দেশি–বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতামতের ওপরও নির্ভর করবে বলে মনে করেন রওনক জাহান। তিনি বলেন, ‘সুষ্ঠু শব্দের নানা রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে ও বিদেশে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হচ্ছে কি না, সেটা গুরুত্বপূর্ণ।’
একেবারে ‘পারফেক্ট’ না হলেও নির্বাচন যাতে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য হয়, সেই চেষ্টা সবাইকে করতে হবে বলে মন্তব্য করেন রওনক জাহান।
‘আসন্ন গণভোট ও সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই গণতন্ত্র সুরক্ষিত হবে’ শীর্ষক এই বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিষয়বস্তুর পক্ষে অবস্থান নেন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু হলেই আগামী দিনে দেশের গণতন্ত্র সুরক্ষিত থাকবে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে এর বিকল্প নেই।
বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থীরা বলেন, শুধু গণভোট আয়োজনের মতো আনুষ্ঠানিকতাই গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করবে না; বরং দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সংস্কার না করলে যেকোনো সংস্কার বিফলে যাবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ। আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকূলে রাখতে হবে। অনেকে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে কালোটাকা, পেশিশক্তি ও প্রভাব বিস্তারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
ফাঁস হওয়া প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি ৭ কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ফাইনাল পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা তদেন্ত ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাজধানীর ৭ কলেজে একযোগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নের মূলনীতি (কোর্স নম্বর-২০৮) বিষয়ের ফাইনাল পরীক্ষা হয়।
পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে। পরে পরীক্ষার হলে একই প্রশ্ন আসায় প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি পরীক্ষার অন্তত দুদিন আগে একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এ অবস্থায় দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন ও পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানানো হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সাত কলেজের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
এর আগেও সাত কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অনার্স থেকে মাস্টার্স পর্যায় পর্যন্ত প্রশ্নপত্র অর্থের বিনিময়ে ফাঁসের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কখনো এ ধরনের অনিয়মকে সমর্থন করে না। বিষয়টি সামনে আসায় সাত কলেজ প্রশাসককে অবগত করা হয়েছে। প্রয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা করবে।
সাত কলেজের অন্তর্বর্তী প্রশাসক অধ্যাপক একেএম ইলিয়াস গণমাধ্যমকে জানান, পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তাদের। তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৭ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। এরপর বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান তিনি।
জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার উৎখাত এবং পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে থেমে নেই ভারতের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা। আসন্ন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তিন সপ্তাহও বাকি নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে দিল্লিভিত্তিক ‘থিংক ট্যাংক’।
কয়েকদিনে দিল্লিতে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের সংবাদ সম্মেলন, বাংলাদেশে কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিকদের দিল্লিতে ফিরিয়ে নেওয়া, বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদের কল্পিত উত্থান নিয়ে দিল্লিতে সেমিনারের আয়োজনসহ নানা ধরনের বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা শুরু হয়েছে। এ তৎপরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশের নির্বাচন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মোদি সরকারের নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির ওপর পুরোপুরি আস্থা না রাখার পাশাপাশি ইসলামী দলগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে রীতিমতো উদ্বিগ্ন দিল্লি। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দিল্লি সর্বাত্মক বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতায় নেমেছে।
বিশ্লেষকরা আরও বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে আমরা একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছি। এ সময় দিল্লির বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা বৃদ্ধি গভীর উদ্বেগের বিষয়। গত ১৭ জানুয়ারি দিল্লি প্রেসক্লাবে ভারতের ডিপস্টেট তথা গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পনা ও সহযোগিতায় প্রথমবারের মতো সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। ওই সংবাদ সম্মেলনে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বাংলাদেশ সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। কোনোভাবেই দেশে স্থিতিশীলতা আসবে না।’
তারা আরও বলেন, ‘আমরা শিগগিরই শেখ হাসিনাকে নিয়ে দেশে ফিরব এবং ক্ষমতায় যাব।’
ওই সংবাদ সম্মেলনের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লির কাছে আপত্তি জানালেও তা উপেক্ষা করছে মোদি সরকার। ওই সংবাদ সম্মেলনের মাত্র দুদিন পর গত বুধবার দিল্লিতে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ‘সিডস অব হেট: বাংলাদেশ এক্সিমিস্ট সার্জ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ অ্যান্ড আদার র্যাডিক্যাল অর্গানাইজেশনস’ শীর্ষক বইয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির ও ভারতীয় সাংবাদিক দীপাঞ্জন রায় চৌধুরীর যৌথভাবে সম্পাদিত এ বইয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানে বিজেপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী এমজে আকবর, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পংকজ সরণ, ড. অনির্বাণ গাঙ্গুলী, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, শ্রুতি পাট্টানায়েক প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন। আলোচকরা বাংলাদেশে ইসলামপন্থিদের মৌলবাদী আখ্যা দিয়ে তাদের উত্থানকে ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের দাবিÑকথিত এ মৌলবাদী শক্তির উত্থানের ফলে বাংলাদেশের রাজনীতির চিত্র পাল্টে যাচ্ছে, যা দেশটির জন্য অস্তিত্ব সংকট তৈরি করবে।
পঙ্কজ সরণ তার বক্তৃতায় বলেন, ‘বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশ তার অতীত থেকে বেরিয়ে এসে নতুনভাবে শুরু করতে পারবে কি না।’
এমজে আকবর বাংলাদেশ সম্পর্কে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে এখন যারা সরকারে আছে, তাদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক নয়। এ পরিবর্তন যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে হতো, তাহলে আজ এই বইয়ের প্রকাশনা বা এটা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন পড়ত না।’
অন্য বক্তারা বাংলাদেশে কথিত মৌলবাদের উত্থানকে ভারতের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে উল্লেখ করেন।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লিতে এমন একটি সময়ে বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চোখে পড়ছে, যখন বাংলাদেশ আগামী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে অগ্রসর হচ্ছে। ভারত যা করছে তা অপ্রত্যাশিত নয়, তারা বাংলাদেশ নিয়ে এ ধরনের অপতৎপরতা চালিয়েই আসছে।’
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। দিল্লি বাংলাদেশে কর্মরত তার কূটনীতিকদের পরিবার-পরিজনকে দেশে ফিরিয়ে নিয়েছে। এটা বড় ধরনের একটি বার্তা দেয়। ভারত আসলে বাংলাদেশ নিয়ে বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। সরকার, রাজনৈতিক দল এবং সর্বোপরি দেশের সাধারণ মানুষকে দিল্লির তৎপরতার বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। কোনো ধরনের উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না।’
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে ইউনূস সরকারকে আরও বেশি চাপে ফেলতে চাচ্ছে দিল্লি। মোদি সরকার কোনোভাবেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ইউনূস সরকারকে মেনে নেয়নি। নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন জরিপে জামায়াত নেতৃত্বের ইসলামী দলগুলোর জোটের ভালো ফল করার আভাস মিলছে। বিষয়টিকে সামনে এনে ভারতের নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশকে মৌলবাদী ট্যাগ দিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে চাচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য- বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের এ তৎপরতার বিরুদ্ধে তেমন কেউ কিছু বলছেন না। একটি মৌলবাদী শক্তি এখন ভারত শাসন করছে। অথচ তারাই আবার কল্পিত মৌলবাদের ইস্যু সামনে এনে বাংলাদেশের দিকে আঙুল তুলছে।’
ফ্যাসিবাদের সহযোগীরাই ‘না’ ভোট চাচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার-পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং গৃহায়ন ও গণপুর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্যেই সরকার গণভোটে হ্যাঁ ভোট চাচ্ছেন। তবে যারা পরাজিত শক্তি, যারা ফ্যাসিবাদের সহযোগী, গণমানুষের প্রতিপক্ষ একমাত্র তারাই ‘না’ভোট চাচ্ছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় গণঅভুত্থ্যানে রংপুর জেলা শহীদদের স্মরণে স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভে পুস্পস্তবক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, ছাত্র-জনতার অনেক রক্ত ও ত্যাগের মধ্যদিয়ে গণঅভুত্থ্যানে ফ্যাসিস্ট সরকার পরাজিত হয়েছে। সেই গণঅভুত্থ্যানের মাধ্যমে এই সরকার, যারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের আয়োজন করেছেন। এদেশের মানুষ হ্যাঁ ভোটের পক্ষে। যারা ফ্যাসিবাদের সহযোগি, গণমানুষের প্রতিপক্ষ তারাই অন্য কিছু চিন্তা করবে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ, জনতার কাফেলা, জনতার জোয়ার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর হওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, গণভোটের পক্ষে বাংলাদেশের জনসাধারণ জুলাই সনদের পক্ষে শহীদদের আত্মত্যাগকে সামনে রেখে হ্যাঁ ভোটে সম্মতি দেবেন।
তিনি বাংলাদেশের মানুষকে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে রায় দেওয়ার আহ্বান জানান।
এসময় উপদেষ্টার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ‘ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দেওয়া এক বাণীতে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঐতিহাসিক ছয় দফা, পরবর্তীকালে ১১ দফা এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতি অর্জন করেছে মহান স্বাধীনতা।’
তিনি বলেন, তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসজুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ২৪ জানুয়ারি সে আন্দোলন রূপ নেয় এক ব্যাপক গণবিস্ফোরণে।’
প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, দমন-পীড়নের প্রতিবাদে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে সংগ্রামী জনতা মিছিল বের করলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিক। এ সময় গুলিতে শহিদ হন মকবুল, আনোয়ার, রুস্তম, মিলন, আলমগীরসহ আরও অনেকে।
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে শহীদদের আত্মত্যাগ দেশের তরুণ সমাজকে জুগিয়েছে অফুরন্ত সাহস ও অনুপ্রেরণা।’
স্মৃতিবিজড়িত এই দিনে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সকল শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আসুন, এই গণঅভ্যুত্থানের মূল্যবোধ ধারণ করে সবাই মিলে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলি।’ তিনি দেশের মুক্তিসংগ্রামের সকল শহীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।
এদিকে ‘সরস্বতী পূজা’ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা হিন্দু সম্প্রদায়ের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হাজার বছর ধরে এ দেশে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন।’
তিনি বলেন, ‘হিন্দু ধর্মমতে, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানের প্রতীক। তিনি বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী। তিনি আমাদের অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যান। সরস্বতী পূজার এই পবিত্র উৎসব উপলক্ষে আমি প্রত্যাশা করি, আমাদের শিক্ষা যেন কেবল নিজের উন্নতির জন্য না হয়, বরং সমাজের উন্নতির জন্য হয়। আমরা যেন আমাদের জ্ঞান দিয়ে অন্যকে সাহায্য করি, দুর্বলদের পাশে দাঁড়াই এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি।’
প্রধান উপদেষ্টা হিন্দু ধর্মাবলম্বীসহ বাংলাদেশের সব নাগরিকের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।