সারা দেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১ জুলাই পর্যন্ত সাপের কামড়ে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই পাঁচ মাসে সাপের দংশনের শিকার হয়েছেন ৬১০ জন।
গতকাল বুধবার রাজধানীর মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে রাসেলস ভাইপার নিয়ে জনসচেতনতা বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। এসব তথ্য উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন।
তিনি জানান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সাপের দংশনের শিকার হয়ে মোট ৪১৬ জন রোগী ভর্তি হন। এদের মধ্যে বিষধর ৯১টি। এর মধ্যে ১৮টি রাসেলস ভাইপার (চন্দ্রবোড়া)। এদের মধ্যে মোট ১১ জন রোগী মারা যান, যার মধ্যে চন্দ্রবোড়ার দংশনের কারণে মারা যান পাঁচজন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময়ে রাসেলস ভাইপার নিয়ে সারা দেশে বিভিন্ন তত্ত্ব, তথ্য, গুজব কিছুটা ভয় ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাংলাদেশে সর্প দংশন নীতিগতভাবে একটি স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। ২০২২ সালে পরিচালিত জাতীয় জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের চার লাখের বেশি মানুষ সাপের দংশনের শিকার হন। যার মধ্যে দুঃখজনকভাবে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। সাপ বিষয়ে অপর্যাপ্ত তথ্য থাকা সত্ত্বেও প্রধান বিষধর সাপের মধ্যে গোখরা, ক্রেইট (কালাচ্), চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার ও সবুজ সাপ অন্যতম। কিছু কিছু সামুদ্রিক সাপের দংশনের তথ্যও আছে।
চন্দ্রবোড়া ভাইপারিড গ্রুপের একটি বিষাক্ত সাপ। বাংলাদেশে চন্দ্রবোড়ায় অস্তিত্ব এবং এর দংশনে মৃত্যুর ইতিহাস ১৯২০ সালেই স্বীকৃত আছে। ২০১৩ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চন্দ্রবোড়া অথবা উলুবোড়া সাপের দংশনের প্রথম রিপোর্ট হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে। প্রাথমিকভাবে রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চলে এর প্রভাব বেশি দেখা গেলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে চন্দ্রবোড়ার বিস্তৃতি ২৭টি জেলায় ছড়িয়েছে।
ডা. রোবেদ আমিন জানান, বিষধর সর্প দংশনের স্বীকৃত চিকিৎসা হচ্ছে অ্যান্টিভেনম। দেশের প্রধান বিষধর সাপের বিষ সংগ্রহ করে তা ঘোড়ার শরীরে প্রয়োগ করা, ঘোড়ার রক্তের সিরাম থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা হয় না। ভারতে তৈরি (৪টি প্রধান বিষধর সাপের বিষয়ে বিরুদ্ধে প্রস্তুত) অ্যান্টিভেনম সংগ্রহ করে অসংক্রামক ব্যধি কর্মসূচি বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। অ্যান্টিভেনম ক্রয়, বিতরণ, সংরক্ষণ, ব্যবহার, ব্যবহার-পরবর্তী প্রভাব (নজরদারি) দেখার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কমসূচি না থাকা সত্ত্বেও অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের সুফল লক্ষণীয়।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে সর্প দংশনে কর্মকৌশল ও অর্থের ব্যবস্থাসহ সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা (২০২৩-২০২৮) তৈরি করা হয়েছে। সর্প দংশন প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০৩০ সাল নাগাদ শতকরা ৫০ ভাগ মৃত্যু এবং অক্ষমতা কমানোর লক্ষ্যে এই কর্মকৌশল সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রাখবে।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ স্লোগানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মাধ্যমে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিয়ে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম জাতীয় বাজেট দিল বিএনপি। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন তিনি। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানা ধাক্কার পর—১১ জুন ২০২৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করেছেন, তার মূল দর্শনই হলো ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতিকে টেনে তোলা।
বাজেটের ভেতরের তথ্য এবং অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, অর্থনীতির কোন কোন ‘গভীর ক্ষত’ সারানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং তা কীভাবে টেনে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব খাতের দুর্বলতা (সবচেয়ে গভীর ক্ষত): বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, রাজস্ব খাতের দুর্বলতা আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষত। বছরের পর বছর ধরে কর-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে আটকে আছে।
টেনে তোলার লক্ষ্য: এবারের বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা (এর মধ্যে এনবিআরকে তুলতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা)। করের জাল বাড়াতে সেন্ট্রাল ডাটা ইন্টিগ্রেশন এবং অনলাইনে কর রিটার্ন দাখিলের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ঋণের সুদের বোঝা: বিগত বছরগুলোর পুঞ্জীভূত ঋণের কারণে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই বাজেটের একটা বিশাল অংশ চলে যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুধু সুদের পেছনেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট পরিচালন ব্যয়ের ২১ শতাংশের বেশি। এটি অর্থনীতির রক্তক্ষরণের মতো একটি ক্ষত।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জনজীবন: মে ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছানোর ফলে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
টেনে তোলার লক্ষ্য: সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে।
বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন: আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬ শতাংশ)। এই ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা ব্যাংক খাতের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি করতে পারে।
ইতিবাচক আশার আলো: ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র স্বপ্ন: এত ক্ষত থাকার পরও বাজেটে উন্নয়নের সুড়ঙ্গ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থান: এবার মেগা অবকাঠামোর চেয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।
বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহজীকরণ: ‘বাংলাবিজ’ নামের সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর মাধ্যমে ব্যবসার অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রাপ্তি সহজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ে।
এক নজরে বাজেট: প্রথম বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এবার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত রাজস্ব খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের মধ্যে ঋণের সুদে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংক থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির ঝুঁকি মাথায় রেখে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার করতে তুলে ধরেছেন সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বিগত আমলের মতো ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ না সৃষ্টি করে বৈদেশিক উৎসে জোর দিয়েছে সরকার। মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস এবং ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা মেটানো হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা— যা বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ সচল রাখতেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমানো হয়েছে।
শিক্ষা খাতে সংস্কার: শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ একলাফে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট জিডিপির ২ শতাংশ। এই খাতের প্রধান চমকগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক একটি তৃতীয় ভাষা (যেমন: জাপানিজ, কোরিয়ান, চীনা, আরবি ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করা। এই ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষায় যেতে চাইলে সরকার ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেবে।
এছাড়া নারী শিক্ষার প্রসারে মেয়েদের জন্য স্নাতক (অনার্স) পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে। স্কুলগুলোয় প্রযুক্তিভিত্তিক ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং পুষ্টির জন্য মিড-ডে মিল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও চিকিৎসার খরচ কমাতে এবার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছাতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক এবং দেশব্যাপী ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী।
তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি ও ভ্যাটের কড়াকড়ি: রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। সিগারেটের সর্বনিম্ন স্তরের প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ৬২ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকোর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
পাশাপাশি ভ্যাটের আওতা বাড়াতে এখন থেকে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ‘মূসক বা ভ্যাট নিবন্ধন’ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হয়েছে। উচ্চ মূল্যের হিমায়িত মাছ এবং সুগন্ধি বৃক্ষ নির্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাবও করা হয়েছে। তবে মেট্রোরেল সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতার শেষ অংশে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বললেন, এই বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং দেশের মেহনতি মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি কল্যাণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার মজবুত ভিত্তি।
কোন খাতে বরাদ্দ কত: সামাজিক অবকাঠামো খাত : ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ)।
সাধারণ সেবা খাত : ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৬.১৩ শতাংশ)।
ভৌত অবকাঠামো খাত : ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ)।
শিক্ষা খাত : ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাত : ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
যোগাযোগ অবকাঠামো খাত : ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।
পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাত : ১০ হাজার ৫ শত ৩৩ কোটি টাকা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাত : ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
নারী ও শিশু উন্নয়ন খাত : ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেটে -ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর শুল্ককর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিগত বছরগুলোয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।
এই নিত্যপণ্যগুলোর ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ, ১ শতাংশ হতে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।
আমদানি করা শিশুখাদ্য প্রস্তুতিমূলক সামগ্রীর ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে (শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে)। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এতে বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমবে।
জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়া ইত্যাদি মসলায় ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দাম কমতে পারে।
আরও যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে-
স্বর্ণের গয়না: স্বর্ণ সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ভ্যাট ছিল আগে ৫ শতাংশ। ফলে আড়াই লাখ টাকার সোনায় ভ্যাট দাঁড়াত সাড়ে ১২ হাজার টাকা। এখন তা কমিয়ে ভরিপ্রতি আড়াই হাজার টাকা করা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি: বৈদ্যুতিক গাড়ি বা ইলেকট্রিক ভেহিকেলে (ইভি) নানা ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে এসব গাড়ির দাম অনেকটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ি চার্জ দেওয়ার স্টেশন বসাতে ব্যাটারি ও অন্যান্য সরঞ্জামে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে করভার ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ক্ষেত্রে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইলেকট্রিক ভেহিকেলের ক্ষেত্রে করছাড় দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষে (বিআরটিএ) নিবন্ধন বা রেজিস্ট্রেশন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির অগ্রিম আয়করের পরিমাণ কমানো হয়েছে।
ল্যাপটপ ও কম্পিউটার: ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা: ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এর ফলে কিডনি রোগীর প্রতিবার ডায়ালাইসিস সেবায় ব্যয় প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমবে।
ওষুধ: ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে নানা ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ক্যানসারের ওষুধ তৈরির নতুন ৯টি কাঁচামাল আমদানিতে রেয়াতি–সুবিধা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
বাদ্যযন্ত্র: গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরো প্রত্যাহার করা হয়েছে।
সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এছাড়া শুল্ককর কমানো এবং শুল্কায়ন মূল্যে পরিবর্তনের কারণে বিদেশি মাংস, প্রাণিখাদ্য, পয়েন্ট অব সেলস বা পিওস যন্ত্র, সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম, লিপস্টিক, ফেসওয়াশসহ বিভিন্ন প্রসাধন এবং আরও নানা পণ্যের দাম কমতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এ টাকার উৎস নিয়ে যাতে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারেন সে বিধানও রাখা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) এ বিধান রেখে নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এদিন বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে এ প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
আগামী ৩০ জুন পাস হবে এ বাজেট। অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার এই বিধান অপরিবর্তিত থাকলে আগামী জুলাই থেকে পরবর্তী জুন মাসের মধ্যে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার ক্ষেত্রে মিলবে এ সুযোগ।
এর আগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখা হলেও সমালোচনার মুখে তা পরে বাদ দেওয়া হয়। তার আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ ছিল। তখনও এ টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন না তোলার বিধান ছিল।
এর আগে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রেখে অর্থবিলে আয়কর আইন ২০২৩ এর প্রথম তফসিলে সংশোধন এনেছে সরকার। এতে বলা হয়, ‘এই আইন বা বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক স্বপ্রণোদিতভাবে প্রদর্শিত নিম্নবর্ণিত বিনিয়োগ বা ক্রয় অথবা প্রাপ্তি এর উৎস এবং ইহার বিপরীতে পরিশোধিত করের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।’
এ বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- কোনো করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট ‘ক্রয়ের প্রকৃতমূল্য’ ‘দলিলমূল্য’ অপেক্ষা বেশি হলে, তিনি ওই ‘অপ্রদর্শিত’ অতিরিক্ত ক্রয়মূল্যের ওপর ব্যক্তিশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য ‘নিয়মিত করহারে’ আয়কর পরিশোধ করবেন। অর্থাৎ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য যেভাবে একটা ধাপ অনুযায়ী করমুক্ত আয়সীমা থাকে, তারপর বিভিন্ন ধাপে আয় হলে তার ওপর করহার পরিবর্তন হয়, এক্ষেত্রেও তাইই হবে।
একইভাবে যিনি বিক্রি করে অপ্রদর্শিত অর্থের মালিক হবেন এবং বৈধ করতে চাইবেন তার জন্যও বিধান রাখা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো করদাতার জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট ‘বিক্রয়ের প্রকৃতমূল্য’ ‘দলিলমূল্য’ অপেক্ষা ‘অধিক’ হলে, তিনি ‘অপ্রদর্শিত’ ওই অতিরিক্ত অঙ্কের ওপর ‘মূলধনী মুনাফা’র জন্য প্রযোজ্য হারে আয়কর পরিশোধ করবেন।
অর্থাৎ তিনি এই জমি যখন কিনেছেন তখন যে মূল্য ছিল এবং তিনি যে টাকায় বিক্রি করেছেন এর মধ্যে যে ব্যবধান থাকবে সেটিই তার মুনাফা। এবং এই আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে তাকে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি তার অপ্রদর্শিত অর্থ ‘স্বপ্রণোদিত’ বৈধ করার আগেই আয়কর আইনে তার বিরুদ্ধে কোনো অডিট বা কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, তাহলে তখনও তিনি এ অর্থ বৈধ করতে পারবেন। তার সেই অর্থের ওপর তখন যে কর ধার্য হওয়ার কথা, তার চেয়ে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত কর দিতে হবে তাকে।
অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার জন্য আয়কর বিবরণী বা রিটার্নের ‘জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিবরণী’তে ‘উৎসে কর্তিত’ বা ‘সংগৃহীত কর’ উল্লেখ করার বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমেই কর্মকর্তারা বুঝতে পারবেন এবং তাকে এ নিয়ে আর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা বা উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না।
তবে এই ‘স্বপ্রণোদিত’ ঘোষণার আগেই যদি দেশের কোনো আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা চলে বা অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়- তাহলে এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারবেন না তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে নাগরিক সেবা আরও জনবান্ধব করতে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইলেকট্রনিক্স শিল্প এবং তরুণদের উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে বিবেচনা করা হচ্ছে জাতীয় উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে। সরকার দেশের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে এআইকে।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর স্পষ্ট বার্তা, এআই ব্যবহার করে স্মার্ট সিটি বিনির্মাণ, নাগরিক সেবাকে আরও জনবান্ধব করা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এআই অন্তর্ভুক্ত করার। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের উপযোগী ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তরুণ প্রজন্মকে।
অর্থমন্ত্রী জানান, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন বাজেটে কর্মকৌশল নির্ধারণ করেছে সরকার। তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সিং, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং এআই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরি করাই লক্ষ্য সরকারের।
বাজেট বক্তৃতায় তিনি নিশ্চিত করেন, সরকারি পরিকল্পনা ও সেবা প্রদানে এআই-ড্রিভেন ডাটা সেন্টার ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করা হবে। পাশাপাশি উদ্যোগ নেওয়া হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়িয়ে নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশকে একটি উদ্ভাবননির্ভর, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্রে রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা বিবেচনায় এ খাতে নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা।
তিনি জানান, এই অর্থ ব্যবহার করা হবে ‘স্টার্টআপ তহবিল’ হিসেবে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারী উন্নয়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতেও ব্যয় করা হবে এ তহবিলের অর্থ।
ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বেড়েছে। এই করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করা হয়েছে। বর্তমানে এই সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সেখানে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু আগামী অর্থবছরে নয়; ২০২৭–২৮ অর্থবছরেও করমুক্ত আয়সীমা পৌনে চার লাখ টাকা অব্যাহত থাকবে।
অবশ্য গত বছর বাজেটেই করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর ঘোষনা দিয়েছিলেন তৎকালীন অন্তবর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার তা অব্যাহত রাখল। এতে সীমিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বস্তির আসবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরেরা।
অন্যবারের মতো এবারও কিছু বিশেষ শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমায় বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। সাধারণ করদাতাদের পাশাপাশি নারী করদাতা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সি করদাতার জন্য সোয়া চার লাখ টাকা; তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য পাঁচ লাখ টাকা; গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা করদাতা ও গেজেটভুক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর আহত জুলাই যোদ্ধা করদাতাদের জন্য সোয়া ৫ লাখ টাকা করমুক্ত আয়সীমাও বাড়বে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মাতা-পিতা বা আইনানুগ অভিভাবকের প্রত্যেক সন্তান বা পোষ্যের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে ৫০ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ১ কোটি ২৮ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রতি বছর ৪০ থেকে ৪২ লাখ করদাতা রিটার্ন দেন। এসব করদাতাকে রিটার্ন দাখিলের সময় করমুক্ত আয়সীমা হিসাব করে কর দিতে হয়।
থাকছে না ৫শতাংশ কর হার: এবার আয়করের কর হার পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। যেমন– এবার করমুক্ত আয়সীমার পরের প্রথম এক লাখ টাকার জন্য যে ৫ শতাংশ কর আছে, তা বাদ দেওয়া হেয়েছে। যাদের বার্ষিক আয় পৌনে চার লাখ টাকার বেশি তাদের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা পরবর্তী প্রথম ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ লাখ টাকার জন্য ২০ শতাংশ, পরবর্তী ২০ লাখ টাকার জন্য ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের জন্য ৩০ শতাংশ হারে করারোপ করা হয়েছে। এতে করদাতাদের ওপর করের চাপ কিছুটা বাড়তে পারে।
সারা বছর আয়কর রিটার্ন দেওয়া যাবে: আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছর রিটার্ন দেওয়া যাবে। আগে দিলে বেশি করছাড় পাবেন করদাতারা। বাজেট প্রস্তাব অনুসারে, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকা, যা কম তাই ছাড় পাবেন। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রিটার্ন যা কর তাই দিলেই হবে। কোনো প্রণোদনা পাওয়া যাবে না।
আর জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা, যেটি বেশি সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে। এপ্রিল-জুন মাসে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ই-হেলথ কার্ড দেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময়ে এমনটি জানান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের আওতায় আধুনিক ই-হেলথ কার্ড দেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সহজলভ্য ও সুশৃঙ্খল করার লক্ষ্যে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল এবং সংশ্লিষ্ট সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
তিনি জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে। সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে; করোনারি কেয়ার, কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট, ইত্যাদি ব্যবস্থা থাকবে।
তিনি আরও জানান, রোগী পরিবহনের দুর্দশা লাঘবের জন্য জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক গঠন করা হবে।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ স্লোগানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর মাধ্যমে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটিয়ে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম জাতীয় বাজেট দিল বিএনপি। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করেন তিনি। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর প্রথম বাজেট উপস্থাপন।
বিগত সরকারের আমলের অর্থনৈতিক বিপর্যয়, দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের ধ্বংসস্তূপ থেকে সামষ্টিক অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন নতুন এই অর্থমন্ত্রী।
এক নজরে বাজেট: প্রথম বাজেটের মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এবার রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর ব্যতীত রাজস্ব খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যয়ের মধ্যে ঋণের সুদে ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংক থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির ঝুঁকি মাথায় রেখে অর্থমন্ত্রী আগামী অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান। এছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরেছেন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ১ ট্রিলিয়ন ডলার করতে তুলে ধরেছেন সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ।
অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ।
প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বিগত আমলের মতো ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ না সৃষ্টি করে বৈদেশিক উৎসে জোর দিয়েছে সরকার। মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস এবং ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা মেটানো হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা— যা বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ৬ হাজার কোটি টাকা কম। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ সচল রাখতেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমানো হয়েছে।
শিক্ষা খাতে সংস্কার: শিক্ষা খাত পুনর্গঠনে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ একলাফে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট জিডিপির ২ শতাংশ। এই খাতের প্রধান চমকগুলোর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলক একটি তৃতীয় ভাষা (যেমন: জাপানিজ, কোরিয়ান, চীনা, আরবি ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করা। এই ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষায় যেতে চাইলে সরকার ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা দেবে।
এছাড়া নারী শিক্ষার প্রসারে মেয়েদের জন্য স্নাতক (অনার্স) পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে। স্কুলগুলোয় প্রযুক্তিভিত্তিক ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এবং পুষ্টির জন্য মিড-ডে মিল চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন ও চিকিৎসার খরচ কমাতে এবার বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছাতে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হবে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে একটি করে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়া হবে। এছাড়া স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের শূন্যপদ পূরণে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক এবং দেশব্যাপী ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই থাকবেন নারী।
তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি ও ভ্যাটের কড়াকড়ি: রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক ও সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। সিগারেটের সর্বনিম্ন স্তরের প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ৬২ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের মূল্য ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নিকোটিন পাউচের ওপর ৪০ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকোর ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
পাশাপাশি ভ্যাটের আওতা বাড়াতে এখন থেকে যেকোনো ধরনের ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে ‘মূসক বা ভ্যাট নিবন্ধন’ গ্রহণ বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হয়েছে। উচ্চ মূল্যের হিমায়িত মাছ এবং সুগন্ধি বৃক্ষ নির্যাসের আমদানি পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূসক আরোপের প্রস্তাবও করা হয়েছে। তবে মেট্রোরেল সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতার শেষ অংশে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করে বললেন, এই বাজেট কেবল সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং দেশের মেহনতি মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি কল্যাণমুখী, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার মজবুত ভিত্তি।
কোন খাতে বরাদ্দ কত: সামাজিক অবকাঠামো খাত : ২ লাখ ৭৯ হাজার ১ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৯.৭৪ শতাংশ)।
সাধারণ সেবা খাত : ২ লাখ ৪৫ হাজার ১১৭ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ২৬.১৩ শতাংশ)।
ভৌত অবকাঠামো খাত : ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা (মোট বরাদ্দের ১৮.৬৬ শতাংশ)।
শিক্ষা খাত : ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাত : ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
যোগাযোগ অবকাঠামো খাত : ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা।
পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা খাত : ১০ হাজার ৫ শত ৩৩ কোটি টাকা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ খাত : ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা।
নারী ও শিশু উন্নয়ন খাত : ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা।
স্বাধীনতার পর এক ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ গত সাড়ে পাঁচ দশকে এক অসামান্য অর্থনৈতিক রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেছে। ১৯৭১ সালে যেখানে শিল্প-কারখানা ও অবকাঠামো ছিল বিধ্বস্ত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় শূন্য, সেখানে ৫৫ বছরের ব্যবধানে দেশটি এখন ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। আজ ১১ জুন ২০২৬, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ৫৫তম বাজেট উপস্থাপন করছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের মেয়াদে এটি তাঁর প্রথম বাজেট এবং স্বাধীনতার পর থেকে বাজেট পেশকারী ব্যক্তিদের তালিকায় তিনি ১৫তম ব্যক্তি হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।
বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নের ইতিহাস শুরু হয়েছিল মূলত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই। ১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই মুজিবনগর সরকার যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয় নির্বাহে তিন মাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট অনুমোদন করেছিল। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, যার আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকা। সেই বাজেটটি ছিল মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, পুনর্বাসন এবং খাদ্যসংকট মোকাবিলা করে একটি আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়ে তোলার রূপরেখা। এরপর ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের সময়ে বাজেট পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি থেকে দেশ ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের হাত ধরে। ১৯৯১ সালে তিনি ঐতিহাসিক ‘মূল্য সংযোজন কর’ বা ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করেন এবং বাজার অর্থনীতি ও বাণিজ্য উদারীকরণের মাধ্যমে অর্থনীতিকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করে দেন। এর পরবর্তী সময়ে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার হাত ধরে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রথম সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে বয়স্ক ভাতা চালু হয়, যা আজ এক বিশাল আকার ধারণ করেছে। বাজেটের আকারের ক্রমবিকাশ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ২০০৯ সালে প্রথমবারের মতো বাজেট ১ লাখ কোটি টাকার ঘর অতিক্রম করে এবং ২০২৬ সালে এসে তা ৯ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে এক অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করেছে।
অতীতের সাফল্যের পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোও এই বাজেটে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে সরকার ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার ফলে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হবে। বাংলাদেশের বাজেট ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১২টি করে বাজেট দেওয়ার রেকর্ড গড়েছেন এম সাইফুর রহমান ও আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির চাপে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এই বাজেট বাস্তবায়নকে বড় এক কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের এই ৫৫ বছরের বাজেট ইতিহাস কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রামাণ্য দলিল। শুরুতে যে চ্যালেঞ্জগুলো যেমন—রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং খেলাপি ঋণের সমস্যা ছিল, সেগুলো আজও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। তবুও ৭১৯ কোটি টাকা থেকে শুরু করে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছানো বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বিত অর্জন। তাজউদ্দীন আহমদের সেই পুনর্গঠনের স্বপ্ন থেকে শুরু হয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্যমাত্রাই এখন বাংলাদেশের সামনে বড় স্বপ্ন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার প্রত্যাশার মধ্যেই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন এবং ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’ দর্শনকে সামনে রেখেই সাজানো হয়েছে এই বাজেট। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত এ বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ। থাকছে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পাশাপাশি বিগত সরকারের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে গতিশীল করতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহায়তা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর নানা কর্মপরিকল্পনা। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড়, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর করের চাপ কমানোর উদ্যোগের মাধ্যমে জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোর বার্তা দিতে চায় সরকার।
অর্থনীতিকে পুনরায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে এনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের আলোকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলাই হতে যাচ্ছে এ বাজেটের প্রধান লক্ষ্য।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের এটিই প্রথম বাজেট। দেশের ৫৫তম এই বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়ন, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই বাজেটকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে’ বাংলাদেশের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরছে সরকার।
এবারের বাজাটে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ ও ১ শতাংশ হারে আরোপিত উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও ভোগ্যপণ্য এই সুবিধার আওতায় আসবে। এর মধ্যে রয়েছে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পণ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা এবং ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যচাপ কমানোর লক্ষ্যেই উৎসে কর কমানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের একটি অংশে বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার এই জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপণ্যের বাজারকে আরও সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসাই এর উদ্দেশ্য।
ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর ভরসা: বিশাল অঙ্কের এই বাজেটের খরচ সামলাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রধান অংশ (৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা) আদায় করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আয়ের পরও বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকেই সোয়া লাখ কোটি টাকার (১ লাখ ১২ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা) বেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বাকি অর্থ বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে।
মানবসম্পদ ও সামাজিক সুরক্ষায় সর্বোচ্চ জোর: প্রস্তাবিত বাজেটে প্রথাগত বড় অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে কার্ডভিত্তিক বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির সম্প্রসারণসহ ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর ঘোষণা আসতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে এই বাজেটে।
ফ্রিল্যান্সার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য মেগা ধামাকা: নতুন বাজেটে প্রযুক্তিবান্ধব ফ্রিল্যান্সার এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় ধরনের সুখবর ও বিশেষ প্রণোদনার প্রস্তাব থাকছে। তরুণ ও যুবসমাজকে সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দিতে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য থাকছে ২ হাজার কোটি টাকার বিশাল তহবিল।
কর কাঠামো ও শুল্কে বড় পরিবর্তনের আভাস: সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। এ ছাড়া জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলের উৎসে কর কমানোসহ বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব আসতে পারে। তবে, ধনিক শ্রেণির ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা বা সারচার্জ বাড়তে পারে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করতে ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত ‘নবম পে-স্কেল’ বা নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই বড় চ্যালেঞ্জ: চলতি বছরের মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছেছে; সেখানে আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এই বিশাল অঙ্কের বাজেট বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই কঠোর বাজার মনিটরিং এবং সঠিক মুদ্রানীতির সুষম সমন্বয় ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন হবে।
তবে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনৈতিক বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে শতভাগ সামঞ্জস্য রেখে এই কল্যাণমুখী বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে টেনে তুলতে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের দেওয়া শোকজের জবাবে সন্তুষ্ট নন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় প্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বেশি রয়েছে। বুধবার (১০ জুন) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতাল যে জবাব দিয়েছে, সেটি আমি পড়েছি। প্রয়োজনীয় তথ্যের বাইরে অনেক গল্প-কাহিনি তারা লিখেছে, যা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ব্যাখ্যা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘তারা চার থেকে পাঁচ পৃষ্ঠার জবাব দিয়েছে, কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বেশি। এটি অনেকটা ভেগ (অস্পষ্ট) রিপ্লাই। আমি এতে সন্তুষ্ট নই। বিষয়টি পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।’
দেশের অর্থনীতি প্রথমবারের মতো ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা (৪৫৬ বিলিয়ন ডলার)। বুধবার (১০ জুন) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সাময়িক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩.৪৯ শতাংশের তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক হারের বিপরীতে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে নিম্নমুখী প্রবণতা।
কৃষি খাতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা আগের বছরের ২ দশমিক ৪২ শতাংশের তুলনায় দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। তবে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। সাময়িক হিসাবে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ তুলনায় এবার দশমিক ৮৫ শতাংশ কম।
সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে জিডিপির সঙ্গে বিনিয়োগের অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা আগের বছর ছিল ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। একইভাবে দেশজ সঞ্চয় কমে ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং জাতীয় সঞ্চয় কমে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে তাদের অনুদান দেবে নির্বাচন কমিশন ইসি।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
ইসি জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে জারি করা এই নীতিমালার আওতায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে দুর্বৃত্তদের হামলা বা দুর্ঘটনায় কেউ প্রাণ হারালে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা এবং আকস্মিক অসুস্থতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনে ও ভোটার তালিকা প্রণয়নসংক্রান্ত কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ, গুরুতর অসুস্থ, আহত, গুরুতর আহত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও মৃত ব্যক্তির পরিবারকে আর্থিক সহায়তা অনুদান প্রদান নীতিমালায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে নিয়োজিত সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আর্থিক সুবিধার সুবিধাভোগী হবেন।
এই নীতিমালার অধীনে অনুদানের হারকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দুর্বৃত্তদের হামলা অথবা কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবারকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা আর্থিক অনুদান দেওয়া হবে। একই কারণে কেউ গুরুতর আহত বা স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ৪ লাখ টাকা, গুরুতর আহত বা সাময়িকভাবে অক্ষম হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা এবং সাধারণ আহতের ক্ষেত্রে আঘাতের ধরন বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হবে।
দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব পালনকালে কেউ যদি আকস্মিকভাবে অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার পরিবার সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা অনুদান পাবেন। এ ছাড়া আকস্মিক গুরুতর অসুস্থতা বা স্থায়ী অক্ষমতার জন্য সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা, সাময়িক অসুস্থতার জন্য সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা, হাসপাতালে ভর্তির পর ব্যয়বহুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা এবং সাধারণ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, নীতিমালায় অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পরিবারের উত্তরাধিকার নির্ধারণের জন্য অর্থ বিভাগের সর্বশেষ সরকারি কর্মচারী পেনশন সহজীকরণ আদেশ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী থাকে তবে অনুদানের টাকা তাদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে স্ত্রীদের যৌথভাবে আবেদন করতে হবে। তবে অনুদান পাওয়ার আগে স্বামী বা স্ত্রী পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে এই সুবিধা পাবেন না। মৃত ব্যক্তির কোনো স্বামী বা স্ত্রী জীবিত না থাকলে তার অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সি ছেলে বা অবিবাহিত মেয়ে এবং সন্তান না থাকলে বাবা-মা এই অনুদানের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নাবালক সন্তান থাকলে অভিভাবক নির্ধারণের ক্ষেত্রে পারিবারিক আদালত অর্ডিন্যান্স ১৯৮৫ প্রযোজ্য হবে। এ ছাড়া অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে বাবা-মা বা ভাই-বোন এবং কোনো সন্তান না থাকলে স্বামী বা স্ত্রী অর্ধেক এবং বাকি অর্ধেক বাবা-মা বা অবিবাহিত ভাই-বোন সমহারে পাবেন। কোনো উপযুক্ত উত্তরাধিকারী না থাকলে বিবাহিত মেয়েরাও প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ আবেদন করতে পারবেন।
এ ছাড়া আর্থিক সহায়তার জন্য যেকোনো দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার সর্বোচ্চ ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্ধারিত ছকে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা অফিস প্রধানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব বা সচিব বরাবর আবেদনপত্র পাঠাতে হবে। আবেদনের সঙ্গে নির্ধারিত আবেদন ফরম, আবেদনকারীর সত্যায়িত ছবি, উত্তরাধিকার সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এবং সিভিল সার্জন বা সরকারি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রদত্ত চিকিৎসাজনিত বা মৃত্যুর সনদ সংযুক্ত করতে হবে।
এই আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের জন্য নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা-১ উইংয়ের যুগ্ম সচিবকে সভাপতি এবং বাজেট ও অর্থ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিবকে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যের একটি যাচাই-বাছাই ও সুপারিশ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটি প্রতি অর্থবছরে অন্তত দুইবার প্রাপ্ত আবেদনগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে অনুদানের পরিমাণ নির্ধারণপূর্বক সচিবের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। পরে এই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত অনুমোদনসাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাবে এককালীন এই অনুদানের অর্থ সরাসরি দেওয়া হবে। প্রতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নিজস্ব বাজেট থেকে এই কল্যাণমূলক অনুদানের অর্থ সংস্থান করা হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, বর্তমান খসড়ার ভিত্তিতে কমিশন গঠিত হলে তা একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বুধবার (১০ জুন) এক বিবৃতিতে নিজেদের উদ্বেগের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় সংস্থাটি।
টিআইবির মতে, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে নতুন খসড়া আইনে এমন কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে, যা একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের জন-আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘প্যারিস নীতিমালা’র মানদণ্ডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘২০২৫ সালের অধ্যাদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে এবং এটি সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অধীনে থাকবে না। তবে নতুন খসড়া আইন থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। টিআইবির আশঙ্কা, এর ফলে কমিশনের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রত্যক্ষ প্রভাব বৃদ্ধি পাবে এবং এটি স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা হারাবে।’
কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রস্তাবিত বাছাই কমিটির কাঠামো নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। খসড়া আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী গঠিত এই বাছাই কমিটিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার, দুজন মন্ত্রী, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
টিআইবি বলছে, ‘এই কাঠামোর কারণে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণভাবে সরকারি দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে কমিশনের নিরপেক্ষতা যেমন ক্ষুণ্ণ হবে, তেমনি স্বার্থের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে।’ এর বদলে বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও নিরপেক্ষ করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
কমিশনের কার্যপরিধি ও ক্ষমতার বিষয়ে টিআইবি জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সম্ভাব্য আটককেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত অনুসন্ধান ও পরিদর্শনের অবাধ ক্ষমতা কমিশনকে দিতে হবে। গুম, নির্যাতন ও বেআইনি আটকের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্ত করার বিধান আইনে স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযুক্ত সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে এ ধরনের ক্ষেত্রে সরকারের আগাম অনুমতির যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা বাতিল করে আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কমিশনের অনুমতিকেই যথেষ্ট হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে টিআইবি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, কমিশনে অন্তত একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং কমপক্ষে দুজন নারী কমিশনার রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে; কর্মরত সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি নিয়ে কমিশনার হওয়ার সুযোগ বাতিল করে দলনিরপেক্ষতা, সততা ও মানবাধিকার বিষয়ে সুস্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে; সরকারি কর্মকর্তাদের প্রেষণে নিয়োগের সীমা বিদ্যমান ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে; কমিশনের বাজেট যাতে সম্পূর্ণরূপে সরকারি নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল না থাকে, সে জন্য আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আইনি বিধান থাকতে হবে।
একটি কার্যকর ও স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের গুরুত্ব তুলে ধরে টিআইবি সতর্ক করেছে, কমিশন যদি তার স্বাধীনতা হারায় তবে তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপরই পড়বে না, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংকটে ফেলবে। এর ভুক্তভোগী ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষই হতে পারে।
সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সুরক্ষায় টিআইবিসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে খসড়া আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।