সারা দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে কোটাবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই বেশ বড় আকার ধারণ করছে। গত কয়েক দিন ধরে কোটা সংস্কার তথা কোটাবিরোধী আন্দোলনের টানা কর্মসূচিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা অচল হয়ে পড়ে। গত বুধবার শিক্ষার্থীদের ‘বাংলা ব্লকেড’- এর কারণে রাজধানী ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ মানুষ। এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি অবস্থান দেখা গেছে।
অন্যদিকে কোটাবিরোধী চলমান এই আন্দোলন নিয়ে সরকার হার্ডলাইনে রয়েছে বলে লক্ষ্য করা গেছে। সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন বক্তব্যে তা বোঝা গেছে।
দৈনিক বাংলার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যমতে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্করের দাবিতে হাইকোর্টের দেওয়া চার সপ্তাহের স্থিতাদেশ অমান্য করে গতকাল আবারও রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করতে নামেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এতে এ অঞ্চলে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একটি মুখোমুখি অবস্থার তৈরি হয়।
বিকেল ৫টার আগ থেকেই সেখানে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তবে শুরুতেই তাদের জমায়েতে পুলিশ কোনো বাধা না দিলেও একসময় তা একটি রোষানলে রূপ নেয়। পুলিশ এ সময় শাহবাগ হয়ে কারওয়ানবাজার সড়কে সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল।
শাহবাগে সতর্ক অবস্থানে থাকা পুলিশ চেয়েছে শিক্ষার্থীরা যেন শাহবাগ ছাড়া অন্য কোনো মোড় দখল নিতে না পারে। তাই তারা ব্যারিকেডও বসিয়ে রাখে। তবে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একসময় ধাক্কাধাক্কি হয়। জানা যায়, পুলিশের সাঁজোয়া যানে উঠে কয়েকজন শিক্ষার্থী ভুয়া ভুয়া স্লোগানও দেন। পরে শিক্ষার্থীরা সমস্বরে ‘গো ব্যাক গো ব্যাক’ স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর থেকে আস্তে আস্তে পিছু হটে পুলিশের সাঁজোয়া যান।
অন্যদিকে নতুন করে কর্মসূচি দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। আজ শুক্রবার বিকেল ৪টায় সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে গতকাল রাত নয়টায় আন্দোলনকারীরা শাহবাগ মোড় ছাড়েন। এরপর শাহবাগ মোড়ের যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। পরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে তাদের কর্মসূচি শেষ করেন। কর্মসূচি ঘোষণা করে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ হাসান বলেন, আমাদের এক দাবিসহ গতকাল সারা দেশে আন্দোলনে যে হামলা এবং বাধা দেওয়া হয়েছে আর যারা এটি করেছে তাদের বিচারের দাবিতে দেশের সব ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, সংসদের জরুরি অধিবেশন ডেকে আইন পাস করতে হবে। তার আগ পর্যন্ত আমরা রাজপথে থাকব।
শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়। সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ কৃষি, কুমিল্লা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কোটাবিরোধী আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে বলেছেন, ‘আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ফাঁদে ফেলে নতুন আন্দোলন করার পাঁয়তারা করছে বিএনপি। কোটা আন্দোলনকে ঘিরে সরকারবিরোধী আন্দোলনের খায়েশ পূর্ণ হতে দেব না।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে পুলিশ বসে থাকবে না।’
জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেছেন, সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি এখন আদালতের বিষয়। তাই আদালতেই এর সমাধান হোক।
যে বিষয়টি আদালতের, সেখানে না গিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড, ভোগান্তি সৃষ্টি করা অযৌক্তিক কাজ বলে মনে করেন তিনি।
এ ছাড়া তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেছেন, ‘বুধবার সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া আদেশে সরকারের ২০১৮ সালের পরিপত্র আবার বলবৎ হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী কোটা বিষয়ে হাইকোর্টের রায় আর কার্যকর থাকছে না। সুতরাং জনদুর্ভোগ তৈরি হয় এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকুন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের এই কার্যক্রম পুরোপুরি সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সরকারও এ বিষয়ে কোনো কিছুই করতে পারবে না। এ বিষয়ে কোনো ঘোষণাও দিতে পারবে না।’
অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেছেন, কোটা নিয়ে বুধবার (১০ জুলাই) আদালত একটি নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই আর কোটা নিয়ে আন্দোলনের কোনো অবকাশ নেই। আমরা অনুরোধ করব, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা নতুন করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির মতো কর্মসূচি দেবেন না; অন্তত এই চার সপ্তাহ। এরপরও যদি আন্দোলনের নামে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে পুলিশ।
এ ছাড়া কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে চলমান কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে নিজেদের অবস্থান জানায় ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন আদালতের পর্যবেক্ষণ বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘শুধু নির্বাহী বিভাগ থেকে আদেশ চাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে।’ কোটা পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে ছাত্রলীগ সভাপতি বলেন, ‘কোটা ব্যবস্থা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো যা অংশগ্রহণ এবং লিঙ্গ ভারসাম্য নিশ্চিত করে। সরকার ও হাইকোর্ট এ সমস্যা সমাধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরতে হবে।’
কুবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, আহত ৫০ : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় অন্তত ৫০ জন শিক্ষার্থী, ২ জন ক্যাম্পাস সাংবাদিক ও ৪ জন পুলিশ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনের সামনের সড়কে এ ঘটনা ঘটে। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উদ্দেশে শিক্ষার্থীরা রওনা দিলে আনসার ক্যাম্পসংলগ্ন রাস্তায় পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় দুই পক্ষে উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। পুলিশের বাধার মুখে শিক্ষার্থীরা ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই’, ‘একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পুলিশ ফাঁকা গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
জাবি শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধ :
জাবি প্রতিনিধি জানান, পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে এক দফা আদায়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে একটি মিছিল নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও পুলিশ বাধা দিলেও তা উপেক্ষা করে মহাসড়কে অবস্থান নেন তারা। শিক্ষার্থীরা জানান, পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিকেল ৩টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবরোধ পালন করার কথা। মহাসড়কে শতাধিক পুলিশের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে প্রথমদিকে মারমুখী থাকলেও শিক্ষার্থীদের অবস্থান নেওয়ার পর তাদের সতর্ক অবস্থানে দেখা যায়। ঢাকা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অপস অ্যান্ড ট্রাফিক) আব্দুলাহিল কাফি গণমাধ্যমকে বলেন, এ মহাসড়ক অবরোধ করলে অসুস্থ মানুষ, রোগী ছাড়াও উত্তরবঙ্গগামী মানুষের ব্যাপক ভোগান্তি হয়। এসব ভোগন্তি এড়াতে মহাসড়ক অবরোধ না করার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ। কারণ আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতে চাই না আমরা।
জবি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত : জবি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের তালা ভেঙে মিছিল বের করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। এ সময় বেশ কয়েকবার পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত লাইব্রেরির সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এ সময় কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে বাধা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের তালা ভেঙে বিক্ষোভ মিছিলটি বের করেন। মিছিলে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজার থেকে রায়সাহেব বাজার মোড়ে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। তবে ব্যারিকেড এবং বাধা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পরবর্তীতে মিছিলটি জিরো পয়েন্ট পেরিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেয়।
চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা : চবি প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর দ্বিমুখী হামলা চালিয়েছেন পুলিশ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় দুইজন নারী শিক্ষার্থীসহ মোট ১০ জন আহত হয়েছেন। শিক্ষার্থীরা দাবি করেন পুলিশি পাহারায় তাদের ওপর হামলা চালান ছাত্রলীগ কর্মীরা। বৃহস্পতিবার সরকারি চাকরির সকল গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে কোটাপদ্ধতি সংস্কার করার এক দফা দাবিতে চট্টগ্রাম নগরীর টাইগারপাস এলাকায় অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর আড়াইটা থেকে তাদের কর্মসূচি শুরু হলে বিকেল চারটায় শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথম হামলা করে পুলিশ। এ সময় দুইজন নারী শিক্ষার্থীসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। আহতদের চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের বাধার মুখে শিক্ষার্থীরা টাইগার পাস থেকে লং মার্চ করে দুই নম্বর গেট এলাকায় আসার সময় নগরীর ওয়াসা মোড়ে ফের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী। পরে শিক্ষার্থীরা পুনরায় তাদের লং মার্চ নিয়ে নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকায় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিছিলের পেছন থেকে অতর্কিতভাবে লাঠিপেটা করে পুলিশ। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হন ও আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পরে শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে নগরী দুই নম্বর গেটে অবস্থান নেন ও আন্দোলন চালিয়ে যান।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ : শেকৃবি প্রতিনিধি জানান, সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের প্রতিবাদে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। এতে আহত হয়েছে অন্তত ১০ জন সাধারণ শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড গেটের সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। কিছুক্ষণ পর সংঘর্ষে রূপ নেয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা পুলিশের বাধা উপেক্ষা আগারগাঁও সড়ক দখলে নেয়।
ইবিতে কুষ্টিয়া খুলনা মহাসড়ক অবরোধ : ইবি প্রতিনিধি জানান, কোটা সংস্কারের দাবিতে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে তিনটা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে পদযাত্রা শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় ফটক খুলে পুলিশি বাধা অতিক্রম করেন আন্দোলনকারীরা মহাসড়কে অবস্থান করে। শান্তিপূর্ণভাবে প্রায় ঘণ্টাখানেক সড়ক অবরোধের পর পুনরায় মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব ম্যুরালে অবস্থান করে কোটাবিরোধীরা।
গাজীপুরের টঙ্গীর একটি অভিজাত রিসোর্টের চার তলার একটি বিলাসবহুল কক্ষ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কয়েকজন তরুণ হয়তো ছুটি কাটাতে এসেছেন। কিন্তু সেই কক্ষের ভেতরে নিস্তব্ধতার আড়ালে চলছিল এক ভিন্ন কর্মযজ্ঞ। টেবিলজুড়ে সাজানো সত্তরটিরও বেশি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ আর থরে থরে সাজানো হাজার হাজার সিম কার্ড। কোনো প্রথাগত জুয়ার আসরের মতো এখানে তাসের বোর্ডে টাকা উড়ছিল না, কিংবা ছিল না কোনো ক্যাসিনো চিপস। অথচ, প্রতি মুহূর্তে এই ঘরের ভেতরে থাকা কয়েকটি ডিভাইসের মাধ্যমে হাতবদল হচ্ছিল কোটি কোটি টাকা। গাজীপুর ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ছয়জন সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর এ তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপির) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এ সময় মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত ৬ হাজার ৬০০টি সিম কার্ডও জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, এই চক্রটি প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত। পরে সেই অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হতো।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, টঙ্গীর একটি রিসোর্ট এবং কুমিল্লার একটি হোটেলে আলাদা অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করা হয়।
তারা হলেন আরিফুল ইসলাম রিফাত (২৩), আরমান হোসেন জিহাদ (২৩), মাসুদ হোসেন (২২), আবদুল রাব্বী (২৩), কৌশিক আহমেদ শুভ (২৩) ও মশিউর রহমান তারেক (২০)।
যেভাবে শুরু হলো ‘অপারেশন টঙ্গী টু কুমিল্লা’: গত কয়েক মাস ধরেই ডিবির সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড নজরদারি ইউনিটের রাডারে আসছিল কিছু সন্দেহজনক আইপি অ্যাড্রেস এবং অস্বাভাবিক মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য। সাধারণ গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট থেকে লাখ লাখ টাকা এমন কিছু নম্বরে যাচ্ছিল, যেগুলোর কোনো বৈধ ব্যবসায়িক ভিত্তি নেই।
সাইবার নজরদারি জোরদার করতেই গোয়েন্দারা দেখতে পান, বাংলাদেশে বসে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট এবং মোবাইল অ্যাপ পরিচালনা করা হচ্ছে। এই জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোতে টাকা জমা দেওয়ার (ডিপোজিট) এবং তোলার (উইথড্র) জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল দেশীয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট ইত্যাদি) অ্যাকাউন্ট।
গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ডিবির দল প্রথমে হানা দেয় টঙ্গীর একটি রিসোর্টে। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আরিফুল ইসলাম রিফাতসহ তিনজনকে। তাদের ল্যাপটপ এবং মোবাইল স্ক্রিন তখনো সচল ছিল এবং লাইভ ট্রানজেকশন চলছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে আরেকটি দল রওনা দেয় কুমিল্লার একটি হোটেলের উদ্দেশ্যে। সেখানে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় আরও তিনজনকে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, হোতা রিফাত অত্যন্ত চতুর। তার বিরুদ্ধে আগে থেকেই বিভিন্ন থানায় চারটি সাইবার ও জালিয়াতির মামলা রয়েছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে তিনি ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করতেন এবং বিলাসবহুল রিসোর্টে একাধিক রুম ভাড়া নিয়ে সাময়িকভাবে তার ‘কন্ট্রোল রুম’ স্থাপন করতেন।
৬৬০০ সিমের সমান্তরাল ব্যাংকিং সাম্রাজ্য: এই অভিযানের সবচেয়ে চোখ কপালে তোলার মতো আবিষ্কার ছিল বিপুল পরিমাণ সিম কার্ড। একজন সাধারণ নাগরিকের নামে যেখানে সর্বোচ্চ ১৫টি সিম কার্ড তোলার নিয়ম, সেখানে এই চক্রের কাছে পাওয়া গেছে ৬,৬০০টি সচল সিম কার্ড, যেগুলো সচল এমএফএস অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত ছিল। এছাড়া আরও ৬৭টি অতিরিক্ত সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে।
এত সিম তারা পেল কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করত: তদন্তে জানা যায়, এই চক্রটি মূলত গ্রাম ও শহরের নিম্নবিত্ত বা অসচেতন মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ব্যবহার করে কিংবা কিছু অসাধু সিম বিক্রেতার সহায়তায় ভুয়া বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের মাধ্যমে এই সিমগুলো সংগ্রহ করেছিল।
সিম ব্যবহারের কৌশল ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল: ৬৬০০টি সিমকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছিল। কিছু সিম ব্যবহার করা হতো শুধুমাত্র জুয়াড়িদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার জন্য (ক্যাশ-ইন), কিছু সিম ব্যবহার করা হতো টাকা এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের জন্য, আর কিছু সিম নির্দিষ্ট রাখা হতো চূড়ান্ত ক্যাশ-আউটের জন্য।
হাতে লেখা খাতার রহস্য: প্রযুক্তির চরম শিখরে থেকেও এই চক্রটি তাদের দৈনিক হিসাবের খাতা রাখত অ্যানালগ পদ্ধতিতে। জব্দ করা নথির মধ্যে পাওয়া গেছে বড় বড় রেজিস্টার খাতা। সেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রতিদিনের হাজার হাজার এমএফএস অ্যাকাউন্টের নম্বর এবং লেনদেনের পরিমাণ লিখে রাখা হতো। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা ট্রেইল এড়াতেই তারা এই সনাতন পদ্ধতি ব্যবহার করত।
কোটি কোটি টাকা পাচারের রুট: ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, জব্দ ডিভাইসগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গেছে—এই চক্রটি দৈনিক প্রায় ৫ কোটি টাকার লেনদেন করত। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকা! কিন্তু এই বিশাল অঙ্কের টাকা বাংলাদেশে থাকত না। স্থানীয় মুদ্রা বা টাকাকে তারা অভিনব উপায়ে পাচার করে দিত। জুয়াড়িরা মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে টাকা জমা দেয়। এই টাকা ৬৬০০টি এমএফএস সিমের মাধ্যমে ছড়িয়ে ছিটিয়ে জমা হয়। মাঠ পর্যায়ের এজেন্টরা এই টাকা ক্যাশ-আউট করে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করে। সেই টাকা দিয়ে দেশের অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি মার্কেট বা পিটুপি (P2P) প্ল্যাটফর্ম থেকে USDT বা অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনা হয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে এই অর্থ চলে যায় আন্তর্জাতিক অ্যাকাউন্টে।
ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন ট্র্যাক করা অত্যন্ত কঠিন হওয়ায়, খুব সহজেই দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছিল এবং দেশের রিজার্ভে বড় ধরনের ধাক্কা লাগছিল।
নেপথ্যের মাস্টারমাইন্ড: এই অভিযানের সবচেয়ে বড় উন্মোচন হলো এর আন্তর্জাতিক সংযোগ। ডিবির তদন্তে উঠে এসেছে যে, এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি আসলে এ দেশের কেউ নয়।
বাংলাদেশে যে সমস্ত অনলাইন জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ (যেমন ১এক্সবেট, মেলবেট ইত্যাদি) সক্রিয় রয়েছে, সেগুলোর পেছনে রয়েছে বড় বড় আন্তর্জাতিক চক্র। এই পেমেন্ট গেটওয়ে ও মূল সার্ভারগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন চীনা নাগরিকেরা।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই চক্রের মূল হোতা ‘নাতান’ নামের এক চীনা নাগরিক। সে মূলত নেপথ্যে থেকে পুরো নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করত। এই দেশীয় এজেন্টদেরকে সে নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ বা কমিশনের লোভ দেখিয়ে কাজে লাগাত। আমরা নাতানকে গ্রেপ্তারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন সংস্থার সহযোগিতার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছি। চীনা চক্রটি মূলত বাংলাদেশিদের সরলতা এবং সহজ উপায়ে ধনী হওয়ার লোভকে পুঁজি করে এই জাল বিস্তার করেছে। তারা দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে স্থানীয় এমএফএস অ্যাকাউন্ট ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংগ্রহ করত, যাতে জুয়াড়িদের মনে কোনো সন্দেহ না জাগে।
তারুণ্যের অবক্ষয় ও সামাজিক ঝুঁকি: এই চক্রের সদস্যদের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—গ্রেপ্তারদের বয়স ২০ থেকে ২৩ বছরের মধ্যে। এই বয়সে যখন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার বা ক্যারিয়ার গড়ার কথা, তখন তারা জড়িয়ে পড়েছেন আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার ও জুয়া সিন্ডিকেটের সাথে।
সহজে বড়লোক হওয়ার নেশা, বিলাসবহুল জীবনযাপনের লোভ এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এই তরুণদের অপরাধের চোরাবালিতে টেনে নামিয়েছে। শুধু এই তরুণরাই নয়, এই অ্যাপগুলোর মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ নিঃস্ব হচ্ছে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই বা পারিবারিক সহিংসতার মতো অপরাধে।
নীতিগত দুর্বলতা ও করণীয়: এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত, টেলিকম সেক্টর এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে কয়েকটি বড় প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।
সিম কার্ডের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কি ব্যর্থ? একজন ব্যক্তির নামে যেখানে ১৫টি সিমের সীমা রয়েছে, সেখানে একটি চক্রের কাছে ৬৬০০টি সচল সিম থাকা প্রমাণ করে যে বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় মারাত্মক ফাঁকফোকর রয়েছে। রিটেইলার বা সিম বিক্রেতাদের কঠোর নজরদারির আওতায় না আনলে এই জালিয়াতি বন্ধ করা অসম্ভব।
এমএফএস নজরদারির অভাব: একসাথে এতগুলো সিম থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা লেনদেন হওয়া সত্ত্বেও স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদমের মাধ্যমে কেন এগুলো আগে ব্লক করা গেল না? মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্রানজেকশন মনিটরিং সিস্টেমকে আরও আধুনিক ও কঠোর করতে হবে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ন্ত্রণ: বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি অবৈধ হলেও অনলাইনের মাধ্যমে এর বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। পিটুপি (P2P) ট্রেডিং বা ক্রিপ্টো কেনাবেচার প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্লক বা কঠোর নজরদারিতে না রাখলে টাকা পাচার রোধ করা কঠিন হবে।
টঙ্গী ও কুমিল্লার এই অভিযানটি কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ডিবির এই সফলতা প্রশংসনীয় হলেও, এটি আমাদের সতর্ক করে দিচ্ছে যে অপরাধের ধরন এখন আর অ্যানালগ নেই। অপরাধীরা এখন প্রযুক্তির ঢাল ব্যবহার করে ঘরে বসেই দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
যতক্ষণ না পর্যন্ত অবৈধ সিম বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে, এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে—ততক্ষণ পর্যন্ত এই অদৃশ্য ক্যাসিনোর থাবা থেকে দেশের তরুণ সমাজ ও অর্থনীতিকে পুরোপুরি মুক্ত করা কঠিন হবে। নাতানের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং তাদের দেশীয় দোসরদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই এখন সময়ের বড় দাবি।
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, ধামরাইয়ের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী যশোমাধব রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক। এ ধরনের আয়োজন দেশের সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে এবং জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) বিকেলে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার কায়েতপাড়াস্থ ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী যশোমাধব মন্দিরের মাধব অঙ্গনে আয়োজিত ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী যশোমাধব রথযাত্রা-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পরে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে পায়রা উড়িয়ে রথযাত্রা ও রথমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ দেশের জনগণ জুলাইয়ে একটি নতুন সূর্যের উদয় প্রত্যক্ষ করেছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় থেকেই জুলাই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। তিনি বলেন, বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
চীফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, বাংলাদেশে কোনো সংখ্যালঘু নেই; এ দেশের হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষ সমান অধিকার, সমান মর্যাদা ও সমান সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রাপ্ত নাগরিক। তিনি বলেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগ ও অবদানের মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই রাষ্ট্রে ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন, বৈষম্য কিংবা বিদ্বেষের স্থান নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বৈষম্যহীন নীতি অনুসরণ করছে। কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ডসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হয় না। রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সমান সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী।
চিফ হুইপ বলেন, অতীতে সংখ্যালঘু ইস্যুকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হতো। দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়ে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপচেষ্টা চালানো হতো। বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের অপতৎপরতার কোনো স্থান নেই। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, বিএনপিতে উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা ধর্মীয় বিদ্বেষের কোনো স্থান নেই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য মো. তমিজ উদ্দিন এবং সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ। মেজর জেনারেল জীবন কানাই দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক ইয়াসিন ফেরদৌস মোরাদ এবং ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল মামুন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আমন্ত্রিত অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সনাতন ধর্মাবলম্বী নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিপুলসংখ্যক ভক্ত-অনুরাগী অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানের শেষে চিফ হুইপ ঐতিহাসিক শ্রী শ্রী যশোমাধব রথযাত্রা ও রথমেলার সার্বিক সাফল্য কামনা করেন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি, শান্তি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় রেখে দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি এগিয়ে নেওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ঢাকা সেনানিবাসে নির্ঝর আবাসিক এলাকায় গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬ এর উদ্বোধন করেছেন।
একই সাথে দেশের অন্যান্য সেনানিবাস, ডিওএইচএস এবং জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প এলাকাগুলোতেও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬ সকল সেনানিবাস, ডিওএইচএস এবং জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প এলাকার উপযুক্ত স্থানে ফলজ, বনজ ও ঔষধি প্রজাতির বৃক্ষসহ সৌন্দর্যবর্ধক গাছের চারা রোপণ করা হবে। এ কর্মসূচি আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত চলমান থাকবে।
দেশের বনজ সম্পদ বৃদ্ধি ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে সকলকে স্বপ্রণোদিত হয়ে বৃক্ষরোপণে উৎসাহিত করাই এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানে সেনাসদর ও ঢাকা অঞ্চলের ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা, বিভিন্ন পর্যায়ের সামরিক ও অসামরিক সদস্য এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং জুলাই শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহদী আমিন বলেছেন, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় আসা বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও নির্বাচনি ইশতেহারের মূল অঙ্গীকারগুলো ধরে-ধরে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত ‘ফল উৎসব-২০২৬’ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ঐতিহাসিক ১৬ জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি স্মরণ করে অনুষ্ঠানের শুরুতেই তিনি শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম আকরামসহ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আত্মদানকারী সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচিত সরকারের বয়স প্রায় পাঁচ মাস হতে চললো। এই স্বল্প সময়েই প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে নির্বাচনি ইশতেহারের প্রধান-প্রধান বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য সবাই কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক মত, পথ বা আদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশপ্রেম ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের একসাথে কাজ করে যেতে হবে। এই নতুন বাংলাদেশে সরকারের মূলনীতিই হচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। আমরা এমন এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চাই, যার ভিত্তি হবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার।’
মাহদী আমিন আরও বলেন, ‘গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন সবচাইতে বেশি গুম, খুন, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছে। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে জনগণের পাশে থাকা এই দলটির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গঠিত বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সর্বোচ্চ আন্তরিক।’
সাংবাদিকদের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকরা হচ্ছেন জাতির দর্পণ। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যেভাবে আপনারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও সত্য, সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত বিষয়গুলো জাতির সামনে উপস্থাপন করতে হবে।’
বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময় দেশে সবচেয়ে বেশি গণমাধ্যমের পথচলা শুরু হয় এবং কোনো বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়নি।’
ডিআরইউর সভাপতি আবু সালেহ আকনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্যদের প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের স্থায়ী সমাধানে সংগঠনটির নতুন ভবনের জন্য দ্রুত জায়গা বরাদ্দের দাবি জানিয়েছেন ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন।
তিনি বলেন, ‘ডিআরইউর পক্ষ থেকে নতুন একটি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তবে এখনও চূড়ান্ত জায়গা বরাদ্দ না পাওয়ায় পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য এই প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।’ এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, ‘গণমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ বলা হলেও সংবিধানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। অন্যান্য পেশাজীবীদের মতো সাংবাদিকদের কল্যাণে রাষ্ট্র কখনো দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করেনি।’
ঐতিহ্যবাহী ফল উৎসবের উদ্দেশ্য তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই প্রতি বছর ডিআরইউ এই আয়োজন করে, যার মূল লক্ষ্য নতুন প্রজন্মের কাছে দেশীয় ফলগুলোকে পরিচিত করানো।’
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ডিআরইউর কার্যনির্বাহী কমিটির নেতা এবং সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সাধারণ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন খাতে এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে। দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণ এবং আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা দূর করতে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগ সেবায় নিয়োজিত দেশের শীর্ষ তিন জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান—বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব কর্তৃপক্ষ (পিপিপি)-কে বিলুপ্ত করে একটি একক ও শক্তিশালী মেগা সংস্থা গঠন করা হচ্ছে। নতুন এই সমন্বিত ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হচ্ছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’।
এতদিন ভিন্ন ভিন্ন আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পরিচালিত এই তিন সংস্থাকে এক ছাতার নিচে আনার মূল উদ্দেশ্য হলো—বিনিয়োগকারীদের জন্য সত্যিকারের একটি ‘ওয়ান-স্টপ হাব’ তৈরি করা। এই মহাপরিকল্পনার ফলে ফাইল চালাচালির চিরাচরিত লাল ফিতার দৌরাত্ম্য যেমন কমবে, তেমনই গতি আসবে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ব্র্যান্ডিং করতে এবং বৈশ্বিক পুঁজি আকর্ষণে এই একীভূতকরণ দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হতে যাচ্ছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে বহুল আলোচিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার মাধ্যমে দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ খাতে এই নতুন যুগের সূচনা হলো। নতুন এই আইনি কাঠামোর মূল লক্ষ্য—একক জানালার (Single Window) মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসকে শতভাগ কার্যকর করা এবং বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
একক ছাতার নিচে তিন শক্তির সমন্বয়: নতুন আইনের মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রীকরণ ও সমন্বয়হীনতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিশেষ শিল্পাঞ্চল (ইকোনমিক জোন) প্রতিষ্ঠা এবং পিপিপি (PPP) প্রকল্পের যাবতীয় কার্যক্রম আলাদা আলাদা সংস্থার পরিবর্তে একক এই কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হবে। এর ফলে পূর্বের ২০১০, ২০১৫, ২০১৬ এবং ২০১৮ সালের সংশ্লিষ্ট আইনগুলো রহিত করা হয়েছে।
শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের গভর্নিং বোর্ড: ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ একটি সংবিধিবদ্ধ শক্তিশালী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে, যার দৈনন্দিন চালিকাশক্তি হবেন একজন চেয়ারম্যান ও সাতজন সদস্য। তবে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য গঠিত গভর্নিং বোর্ডের কাঠামোতে রয়েছে আধুনিকতার ছোঁয়া:
নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী: গভর্নিং বোর্ডের সভাপতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বা তার মনোনীত ব্যক্তি।
মন্ত্রিসভার অংশগ্রহণ: অর্থ, বিদ্যুৎ, পররাষ্ট্র, ভূমি, শিল্প, বাণিজ্য ও আইন মন্ত্রীরা থাকছেন এই বোর্ডে।
নারীর ক্ষমতায়ন ও বেসরকারি খাত: বেসরকারি খাত থেকে ৪ জন প্রতিনিধি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত হবেন, যার মধ্যে ২ জন নারী প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
‘সিঙ্গেল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’: বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সুখবর হলো—সব ধরনের লাইসেন্স, অনুমোদন, ভিসা সুপারিশ, কাজের অনুমতি ও ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য একটি বাধ্যতামূলক ‘সিঙ্গেল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম’ তৈরি করা হচ্ছে।
বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তি: বর্তমানে চালু থাকা সব ওয়ান স্টপ সার্ভিস বা পৃথক পোর্টাল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই নতুন প্ল্যাটফর্মে একীভূত করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো সংস্থা আর নিজস্ব পোর্টাল ব্যবহার করতে পারবে না। কোনো দপ্তর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দেরি করলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এই কর্তৃপক্ষকে।
শিল্পাঞ্চল ও পরিবেশবান্ধব ‘ব্লু ইকোনমি’: নতুন আইনে শিল্পাঞ্চল স্থাপনের ধারণায় আধুনিক বৈশ্বিক এজেন্ডাকে যুক্ত করা হয়েছে। রপ্তানি ও বাণিজ্যিক এলাকার পাশাপাশি এখন থেকে পৃথক জোন করা যাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ শিল্প, জলবায়ু সহনশীলতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ ও খাদ্য নিরাপত্তা. ব্লু ইকোনমি (নীল অর্থনীতি) ও উপকূলীয় শিল্প।
প্রকল্পের প্রয়োজনে যেকোনো ভূমি অধিগ্রহণকে ‘জনস্বার্থে’ বিবেচনা করে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত বা অব্যবহৃত জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া যাবে।
জাতীয় অগ্রাধিকার ও পিপিপি প্রকল্প: আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন বা জরুরি জাতীয় প্রয়োজনে মন্ত্রিসভার অনুমোদন সাপেক্ষে যেকোনো প্রকল্পকে ‘জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প’ ঘোষণা করা যাবে। পিপিপি প্রকল্পের দরপত্র ও দরকষাকষির নথিগুলোর গোপনীয়তা রক্ষা করার কঠোর বিধান রাখা হয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। যেকোনো চুক্তিভিত্তিক বিরোধের ক্ষেত্রে ঢাকাতেই সালিশের মাধ্যমে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহার ও শ্রমিক অধিকার: সরকারের বন্ধ বা লোকসানি শিল্প প্রতিষ্ঠান, অব্যবহৃত জমি ও শেয়ার এখন থেকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হস্তান্তর বা কৌশলগত বিক্রয় (Strategic Sale) করা যাবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় আধুনিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা হয়েছে—বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে সর্বাগ্রে শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করতে হবে।
সমৃদ্ধির নতুন মহাসড়ক: ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ গঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিল—বিশ্বায়নের এই যুগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পেছনে ফেলে স্মার্ট ইকোনমি গড়ে তুলতে দেশ প্রস্তুত। বিলুপ্ত তিন সংস্থার সমস্ত সম্পদ ও জনবল নতুন কর্তৃপক্ষের অধীনে স্থানান্তরিত হচ্ছে, ফলে কাজের ধারাবাহিকতাও ব্যাহত হবে না। একটি সমন্বিত, ডিজিটাল এবং নারীবান্ধব নীতিনির্ধারণী কাঠামোর মাধ্যমে এই নতুন আইনটি ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গেম-চেঞ্জার হতে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিক্ষকদের প্রতি শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিশুদের মানুষ করার কারিগর আপনারা। তাই খেয়াল রাখতে হবে কোনো শিশু যেন নির্দয় হয়ে বেড়ে না ওঠে। সেটি প্রাণী হোক বা পশু-পাখির প্রতি হোক। কারও প্রতি যেন তারা নির্দয় না হয়। তাই শিশুদের মানবিকভাবে গড়ে তুলবেন আপনারা।
বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত, গীতা ও ত্রিপিটক এবং বাইবেল থেকে কিছু অংশ পাঠ করা হয়।
এ সময় প্রাথমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও শিক্ষার উন্নয়নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার অবদান নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করা হয়।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে প্রাথমিক শিক্ষা পদক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ এই অনুষ্ঠানে এসে মনে হচ্ছে আমি একটি কারখানায় ঢুকে পড়েছি। যেখানে সবাই মানুষ গড়ার কারিগর।’
সারাদেশ থেকে আসা প্রাথমিক শিক্ষকদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘শিশুদের মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গড়তে আপনাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আপনারাই পারেন শিশুদের মধ্যে পারিবারিক, সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে।’
তিনি বলেন, ‘জানি, আপনাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, কিছু সংকট আছে। সেগুলো আমরা সমাধানের চেষ্ট করব। তবে আপনাদের জন্য ভালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আমরা করব। যেন আপনারা অর্জিত সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যেও সঠিকভাবে ছড়িয়েছে দিতে পারেন।’
শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার উপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া তাদের প্রতি বছর একটি করে গাছ রোপণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘তোমরা প্রতি বছর বর্ষাকালে একটি করে গাছ লাগাবে। গাছটাও বড় হবে, সঙ্গে তোমরাও বড় হবে। গাছই হবে তোমাদের বন্ধু। গাছের নিচে বসে ক্লান্তি দূর হবে, শান্তি পাবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
সূচনা বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাখাওয়াৎ হোসেন।
সারাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য শিশু শিক্ষার্থী অনুষ্ঠানে অংশ নেয়।
এ সময় দেশজুড়ে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে নির্বাচিত সেরা শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখা শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে পদক দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের মাঝেই খুদে শিক্ষার্থীদের দুটি গ্রুপের মধ্যে ‘মোবাইল শিক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক’ এর পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শুরু হয় শিশুদের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। একের পর এক চলতে থাকে গান, কবিতা আবৃত্তি, নাচ ও নাটক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতিথি সারিতে বসে এসব আয়োজন উপভোগ করেন।
বাংলাদেশের পরিবহন, লজিস্টিকস ও সামুদ্রিক (মেরিটাইম) খাতের উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে বড় ধরনের আগ্রহ দেখিয়েছে সৌদি আরব। বিশেষ করে কোল্ড স্টোরেজ থেকে শুরু করে বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং লজিস্টিকস সাপ্লাই চেইনের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোয় ঢাকা ও রিয়াদের মধ্যে অংশীদারত্বের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে রাজধানীর বিনিয়োগ ভবনে সফররত সৌদি আরবের পরিবহন ও লজিস্টিকস উপমন্ত্রী ড. রুমাইহ মোহাম্মদ আল-রুমাইহ-এর সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগের সার্বিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। এছাড়া পিপিপিএ, বিডা ও বেজার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনাকালে সৌদি উপমন্ত্রী বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ এবং বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার সরকারি উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের এই নীতিগত অবস্থান সৌদি আরবের নিজস্ব অর্থনৈতিক রূপকল্পের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায়।
ড. রুমাইহ মোহাম্মদ আল-রুমাইহ বলেছেন, ‘সৌদি আরব নিজেকে একটি বৈশ্বিক লজিস্টিকস হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করছে এবং আমাদের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক বিনিয়োগে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশে সৌদি কোম্পানিগুলোর ব্যবসার পরিধি আরও বাড়াতে চাই। একই সঙ্গে সৌদি আরবে ব্যবসা করতে আগ্রহী বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাব।’
সৌদি বিনিয়োগের সফল উদাহরণ হিসেবে উপমন্ত্রী চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে ‘রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল’ (আরএসজিটি)-এর কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এই টার্মিনালের ৯৮ শতাংশের বেশি কর্মীই বাংলাদেশি। এই সফলতার সূত্র ধরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক লজিস্টিকস খাতের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে আরএসজিটি আরও বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে।
বৈঠক শেষে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেছেন, ‘লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্কের মতো কিছু নির্দিষ্ট খাতে সৌদি আরবের গভীর আগ্রহ রয়েছে, যা আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গেও মিলে যায়। এ ছাড়া আমরা আর্থিক সেবা খাতেও সৌদি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত।’
আশিক চৌধুরী আরও জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ও সুযোগগুলো বোঝাতে এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি সৌদি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ শুরু হয়েছে, যাতে আলোচনাগুলোকে দ্রুত বাস্তব রূপ দেওয়া যায়।
দুই দেশের প্রতিনিধিরাই মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক গতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক লাভজনক প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব, যা আগামী দিনে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৩৫৫ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা) মানবিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। এই সহায়তার আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫৫ হাজারের বেশি মানুষকে নগদ অর্থ সহায়তা, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। বুধবার (১৫ জুলাই) ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা স্টার্ট নেটওয়ার্কের ব্যবস্থাপনায় এবং স্থানীয় ও জাতীয় বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ছয়টি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলায়– কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও মৌলভীবাজারে এ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসে সিলেট অঞ্চলের বন্যাকবলিত মানুষের জন্য যুক্তরাজ্য সরকার ২ লাখ ৪৫ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা) জরুরি সহায়তা দিয়েছিল। নতুন সহায়তা মিলিয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের মোট সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি (প্রায় ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা)।
এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া জরুরি তহবিলের (ডিআরইএফ) মাধ্যমে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১০টি জেলার মানুষের জন্য আরও ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৩৪৮ পাউন্ড (প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা) সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য-বাংলাদেশ হাইড্রো-মেট পার্টনারশিপের আওতায় যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের জাতীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের তথ্য ব্যবহারে সহায়তা করছে।
এর ফলে বন্যার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও উন্নত হয়েছে এবং সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যার আগে দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বলেন, ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের মানুষের পাশে যুক্তরাজ্য রয়েছে। এই মানবিক সহায়তা দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৫৫ হাজারের বেশি মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সহায়তা করবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সাংবাদিক ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুর বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে পাঁচটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যম অধিকারবিষয়ক সংস্থা। একই সঙ্গে ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুসহ বিচারপূর্ব আটকাবস্থায় (প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন) থাকা চার সাংবাদিককে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, আর্টিকেল ১৯, সিভিকাস, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক যৌথ বিবৃতিতে এই আহ্বান জানায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০১৩ সালের ৫-৬ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে পরিচালিত নিরাপত্তা অভিযানের সংবাদ কভারেজের জেরে রূপা ও বাবুর বিরুদ্ধে আইসিটিতে তদন্ত চলছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, তারা নিহতের সংখ্যা নিয়ে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ ছড়িয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে ভূমিকা রেখেছেন। এই মামলায় গত ১৪ মে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগপত্র বা প্রমাণ হাজির করা হয়নি।
সংস্থাগুলো বলছে, কোনো রাজনৈতিক বা বিতর্কিত ঘটনার সংবাদ প্রচার বা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার করা আইনগতভাবে ভুল। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী। তাদের দাবি গণমাধ্যমের ওপর ভীতিকর প্রভাব তৈরি হয়।
সংস্থাগুলোর মতে, রূপা এবং বাবুর বিরুদ্ধে আইসিটিতে নেওয়া এই পদক্ষেপ নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তির (ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস) ১৫ এবং ১৯ অনুচ্ছেদের অধীনে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতার পরিপন্থি।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাংবাদিক ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু, শাকিল আহমেদ ও শ্যামল দত্তকে ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর থেকে বিচারপূর্ব আটকাবস্থায় রাখা হয়েছে। এসব মামলার কোনোটিতেই এখন পর্যন্ত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি এবং সংবাদ প্রচারের কারণে কীভাবে হত্যার অভিযোগ আনা যায়, তার কোনো ব্যাখ্যাও নেই।
এ বছরের ১১ মে হাইকোর্ট রূপা ও শাকিল আহমেদকে অধিকাংশ মামলায় জামিন দিলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তা স্থগিত করেন। সংস্থাগুলোর মতে, হত্যা মামলাগুলোর জামিনের সিদ্ধান্ত যা-ই হোক না কেন, আইসিটির এই মামলাটি সাংবাদিকদের অব্যাহতভাবে আটকে রাখার একটি পৃথক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সংস্থাগুলো আহ্বান জানিয়েছে, কেবল সাংবাদিকতার কারণে ফারজানা রূপা ও মোজাম্মেল বাবুকে যেন আনুষ্ঠানিক আসামি করা না হয়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইসিটির মামলাগুলো পর্যালোচনায় একটি স্বাধীন ব্যবস্থা গঠনেরও দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু এবং শ্যামল দত্তের বিরুদ্ধে আনা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ অভিযোগ প্রত্যাহার করে তাদের মুক্তি এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে মামলা ও গণ এফআইআর দায়ের বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সংস্থাগুলো উল্লেখ করেছে, সাংবাদিকদের ওপর নিপীড়ন বন্ধ করার এই পদক্ষেপগুলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তাই উল্লিখিত মামলাগুলো প্রত্যাহারের মাধ্যমেই সরকার এই প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপান্তরিত করবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছে।
তৃণমূলের ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নের মাধ্যমেই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, ‘বিপর্যস্ত ও লুণ্ঠিত শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে, যেখানে শিক্ষার্থীরাই হবে আগামী দিনের মূল কারিগর।’
বুধবার (১৫ জুলাই) ঢাকায় আয়োজিত ‘প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬’ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, ‘গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, তার অন্যতম ভিত্তি হলো তৃণমূলের ক্ষমতায়ন।’
দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীর লক্ষ্য ও এগিয়ে যাওয়ার অভিযাত্রাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর সেই দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন ঘটছে এ আয়োজনে।
এবারের আয়োজনের বিশেষত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র বলেন, ‘দেশের ৬৪টি জেলার সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই উৎসবে অংশ নিয়েছে। যার মধ্যে বন্যাকবলিত ৭টি জেলার প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির খুদে শিক্ষার্থীরাও রয়েছে।’
তারা প্রবল বন্যা ও নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নিজ নিজ জেলার স্বাতন্ত্র্য, সাফল্য ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে আজ এখানে উপস্থিত হয়েছে। প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এই অদম্য মানসিকতাই প্রমাণ করে, আগামীর বাংলাদেশের কান্ডারি এরাই।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদান অনন্য। তার হাত ধরেই দেশজুড়ে ‘‘গণশিক্ষার’’ আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে ‘‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়’’ পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়।’
আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বারবার তৃণমূলে ছুটে গিয়ে ভালো শিক্ষক, ভালো শিক্ষার্থী এবং যুগোপযোগী কারিকুলাম নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। বর্তমান সরকার সেই ধারা বজায় রেখে শিক্ষাক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করে মাহদী আমিন জানান, শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবেশ ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে আজ দেশের প্রায় ৬৫ হাজার স্কুলে একযোগে ২ লাখ বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীরা নিজেরাই পরিচর্যা করবে।
এ ছাড়া অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে একটি ফুটবল প্রতিযোগিতার সফল আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। আগামীতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতায় ‘প্রাইম-মিনিস্টার্স ফুটবল গোল্ড কাপ’ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে বছরজুড়ে দেশব্যাপী মেধা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু রাখার নতুন রূপকল্পও ঘোষণা করেন তিনি।
খুদে শিক্ষার্থীদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর আবেগ ও উচ্ছ্বাসের কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, ‘এটিই প্রমাণ করে একজন জনগণের নেতা রাষ্ট্র পরিচালনায় এলে কীভাবে দেশের ভাগ্য বদলে যায়।’
তিনি দেশের বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় একটি পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বুধবার (১৫ জুলাই) ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মিলনায়তনে ‘নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আমার আপনার সকলের দায়িত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ আমিনুল হক।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা দীর্ঘদিনের। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় রাজধানীতে মানুষের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে নগর ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে শুধু সিটি কর্পোরেশন বা সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, এর জন্য প্রয়োজন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও দায়িত্বশীল আচরণ। সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করলেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব।
মন্ত্রী আরও বলেন, ঢাকায় নগর ও গ্রামীণ সংস্কৃতির মিশ্র প্রভাব রয়েছে। নাগরিক শৃঙ্খলা ও সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে একটি আধুনিক নগর সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এআই নির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মানুষ চাইলে নিয়ম মেনে চলতে পারে। কার্যকর তদারকি ও সচেতনতার মাধ্যমে যেমন ট্রাফিক নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়ছে, তেমনি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, কার্যকর ও জনবান্ধব করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এসব উদ্যোগ সফল করতে সরকার, সিটি করপোরেশন এবং নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মীর শাহে আলম বলেন, নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও সমন্বয়হীনতার সংকট দূরীকরণে সিটি কর্পোরেশনগুলোকে স্বাবলম্বী ও পূর্ণাঙ্গ কার্যকর সংস্থায় পরিণত করা সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ, ট্রাফিক পুলিশসহ নগর উন্নয়নে নিয়োজিত সকল সংস্থাকে একটি একক সমন্বিত আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। তিনি উল্লেখ করেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এ বিষয়ে সদিচ্ছা রয়েছে এবং তিনি সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে সাথে নিয়ে একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি আরো বলেন, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে ঢাকার আমিনবাজার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মাতুয়াইলে দুটি ‘বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ’ (Waste-to-Energy) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি জানান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা ও উন্নত নাগরিক বোধ তৈরির লক্ষ্যে আগামী বছরের প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে নৈতিকতা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মোঃ আমিনুল হক বলেন, নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল সরকারের একক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়, বরং আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায় থেকে ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এটিকে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোঃ শফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে অন্যান্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মোঃ রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ আমিনুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও প্রযুক্তির অপব্যবহারকারী সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রকে রুখতে এবং মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান দমনে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। বুধবার সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এই আইনের জাতীয় অবহিতকরণ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, অপরাধীদের প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত কৌশলের সাথে সংগতি রেখে বাংলাদেশের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে এখন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়েছে।
বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সদ্য প্রণীত ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ এসব গুরুতর আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।” তিনি আরও জানান, এই আইনের মাধ্যমে তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা জোরদার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিধি বিস্তারের বিধান রাখা হয়েছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসরণ করে ভুক্তভোগীদের অন্যায্য শাস্তি না দেওয়ার বিষয়টিও আইনত নিশ্চিত করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, “নতুন আইনটির কার্যকর বাস্তবায়নে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, উন্নয়ন সহযোগী এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা অপরিহার্য।” স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন এবং পুলিশ, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালকসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কাতারের আধুনিক রূপকার এবং বাংলাদেশের অকৃত্রিম সুহৃদ শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুতে আজ বুধবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হচ্ছে। গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই শোক পালনের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে আজ দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সকল কূটনৈতিক মিশনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
মরহুম আমিরের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “আধুনিক কাতারের অন্যতম স্থপতি, বাংলাদেশ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের একজন অকৃত্রিম বন্ধু এবং দেশটির সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি এ বছরের ১২ জুলাই ইন্তেকাল করেন।” রাষ্ট্রীয় শোকের অংশ হিসেবে আজ সারা দেশের মসজিদগুলোতে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ অন্যান্য সকল ধর্মীয় উপাসনালয়েও তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি ও মাগফিরাত কামনায় বিশেষ প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
আধুনিক কাতার বিনির্মাণে অসামান্য ভূমিকা রাখা এই বিশ্বনেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। আজ রাজধানীসহ সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি সকল ভবনে জাতীয় শোকের চিহ্ন হিসেবে পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ কার্যকর রয়েছে।