সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর আন্দোলন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। আজ মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) দুপুরে প্রেসক্লাবে প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরামের আলোচনা শেষে এ কথা বলেন তিনি।
এ সময় কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি নিয়ে আদালতে যেতে পারতেন। তাদের সব ধরনের আলোচনার সুযোগ ছিল।
তিনি বলেন, আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকারের অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার থাকে না। সর্বোচ্চ আদালতকে পাশ কাটিয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলেও জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে শেখ হাসিনার সরকার আদর্শচ্যুত হবে না। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ অসম্মান করলে মেনে নেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
ঘৃণ্য ইনডেমনিটি আইন এবং জননেত্রীর কারাবন্দি দিবস উপলক্ষে ‘বিচারহীনতায় বাংলাদেশ: বেআইনি আইন ইনডেমনিটি ও কারারুদ্ধ জননেত্রী’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তারানা হালিম, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড বিশ্বজিৎ চন্দ।
বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস। সেমিনারে বক্তব্য রাখেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. রাশিদ আসকারী, বঙ্গবন্ধু গবেষক মো. আফিজুর রহমান ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি মানিক লাল ঘোষ।
সেমিনার সঞ্চালনা করেন তাবিয়া রহমান তাসনিয়া।
নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুদিন আগে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছেন, বিজয় যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি পরাজয়ও গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য সত্য। নির্বাচনের পর সবাই মিলে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করুন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট বিষয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না, এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে— এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনোদিন হারাতে দেবে না।
তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা লক্ষ্য করছি—একটি চিহ্নিত মহল পরিকল্পিতভাবে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে নাগরিকদের মনে সন্দেহ, ভয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করা, জনগণের আস্থাকে দুর্বল করা।
জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি আপনাদের অনুরোধ করছি—সতর্ক থাকুন, দায়িত্বশীল থাকুন। যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করবেন না। গুজবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা ও সত্য। নির্বাচন নিয়ে যারা বিগত মাসগুলিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, তারা সম্পূর্ণভাবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে তারা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আপনারা সকল প্রকার অপপ্রচার থেকে নিজেদের মুক্ত রাখুন। তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখুন। নির্বাচনবন্ধু হটলাইন—৩৩৩-এতে ফোন করে সঠিক খবর জেনে নিন। এখন নতুন করে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নাকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও পরিকল্পিত অপপ্রচার, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার দায়িত্ব সমাপ্ত করবে।
শেষ মুহূর্তে এসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ চুক্তির পর বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে দেশটির আরোপিত পাল্টা শুল্কহার ১ শতাংশ কমানো হয়েছে। তাতে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কহার ২০ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে। তবে এই চুক্তির আওতায় দেড় হাজারের বেশি মার্কিন পণ্য বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে শুল্কমুক্ত সুবিধায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার এবং বাংলাদেশের বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’তে স্বাক্ষর করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) ফলে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার ‘সুযোগ’ দেখছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তবে চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে তা গোপন থাকায় এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে করা মোটেই উচিত হয়নি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
জানা যায়- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য, আর আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের অনুকূলে থাকলেও তা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বাজারে টুকতে এ চুক্তি করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর বাজারে প্রবেশ করতে যুক্তরাষ্ট্র এ চুক্তিতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে।
গত সোমরার রাতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশ থেকে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকীও অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
চুক্তি সই অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি দল ওয়াশিংটন গেছে। অন্য চারজনের মধ্যে রয়েছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুই যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কমিশনার রইছ উদ্দিন খান। পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সশরীর উপস্থিতিতে এই চুক্তি হয়।
মার্কিন কৃষিপণ্যসহ যেসব পণ্য ঢুকছে বাংলাদেশে :
এই চুক্তির আওতায় থাকা বিভিন্ন শ্রেণির পণ্যের তালিকা প্রকাশ করেছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)। প্রায় দেড় হাজারের বেশি মার্কিন পণ্য বাংলাদেশের বাজারে ঢুকবে শুল্কমুক্ত সুবিধায়।
এর মধ্যে আছে গবাদি পশু, মাংস, মাছ, রাসায়নিক দ্রব্য, টেক্সটাইল, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য শিল্পজাত পণ্য। চুক্তি কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকেই এসব পণ্য শুল্কমুক্ত হিসেবে গণ্য হবে।
ইউএসটিআর -এর প্রকাশিত তফসিল-১-এ ইআইএফ শ্রেণিবদ্ধ পণ্য আছে ১ হাজার ৫৫৫টি। এর মধ্যে জীবন্ত প্রাণীর মধ্যে আছে- উন্নত জাতের পশু (ঘোড়া, গাধা, শুকর ইত্যাদি), জীবন্ত ভেড়া, ছাগল, বিভিন্ন ধরনের হাঁস-মুরগি (মুরগির বাচ্চা, হাঁস, রাজহাঁস), স্তন্যপায়ী প্রাণী (তিমি, ডলফিন), সরীসৃপ ও পতঙ্গ।
মাংস, মাছ ও ভোজ্য উপজাত পণ্যের মধ্যে আছে- শুকর, ভেড়া, ছাগল ও ঘোড়ার টাটকা বা হিমায়িত মাংস এবং বিভিন্ন ধরনের পোল্ট্রি (মুরগি, টার্কি, হাঁস)। এছাড়া লবণজাত পণ্য যেমন- শুকানো মাংস ও ভোজ্য চর্বি বা নাড়িভুঁড়ি। অ্যাকোয়ারিয়ামের শোভাবর্ধক মাছ, বিভিন্ন ধরনের টাটকা বা হিমায়িত মাছ (ট্রাউট, স্যামন, হ্যালিবাট, টুনা, হেরিং, সার্ডিন, ম্যাকেরেল, কড ইত্যাদি) এবং কাঁকড়া, চিংড়িও ইআইএফ শ্রেণিভুক্ত।
দুগ্ধ ও প্রাণিজ পণ্যের মধ্যে আছে- দই, ঘোল, বিভিন্ন ধরনের পনির, নিষিক্ত ও সাধারণ ডিম, পশুর লোম, হাড় এবং ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু প্রাণিজ উপাদান। শাকসবজি ও ফলমূলের মধ্যে আছে- নির্দিষ্ট জাতের আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন, মাশরুম, মটরশুঁটি এবং অন্যান্য ডালজাতীয় শস্য।
এছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাদাম (চেস্টনাট, পাইন নাট) এবং ফল (শুকনো খেজুর, ডুমুর, আনারস, অ্যাভোকাডো, পেয়ারা, আম, লেবুজাতীয় ফল, তরমুজ, নাশপাতি, চেরি, পিচ ও স্ট্রবেরি) ইআইএফ শ্রেণিভুক্ত। এসব কৃষিপণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি।
কৃষিপণ্যের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে- আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি। পাশাপাশি এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি বিলিয়ন ডলার বা ২৬ লাখ মেট্রিক টন (যেটি কম) মূল্যের সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য।
এছাড়াও রাসায়নিক এবং ওষুধ পণ্যের মধ্যে আছে- শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাস (হাইড্রোজেন, আর্গন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন), অ্যাসিড, অক্সাইড, ক্লোরাইড, সালফেট এবং বিভিন্ন ধরনের ওষুধ।
টেক্সটাইল ও পোশাক খাতের পণ্যের মধ্যে আছে- রেশম, পশম এবং তুলাজাত পণ্য; যার মধ্যে সুতা, বোনা কাপড় এবং নির্দিষ্ট কিছু পোশাক যেমন ট্র্যাকসুট ও সাঁতারের পোশাক অন্তর্ভুক্ত।
যন্ত্রপাতি ও শিল্প সরঞ্জামের মধ্যে আছে- বয়লার, ইঞ্জিন, পাম্প, ফ্যান, শিল্প কারখানার চুল্লি, প্রিন্টিং মেশিনারি, টেক্সটাইল মেশিন, মেশিন টুলস এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম।
কেনা হবে ১৪টি বোয়িং ও ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি :
এ বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন উড়োজাহাজ, জ্বালানি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির তৈরি ১৪টি বেসামরিক উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত উড়োজাহাজ ক্রয়ের বিকল্পও রাখা হয়েছে। এছাড়া উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ ও সংশ্লিষ্ট সেবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সংগ্রহের বিষয়েও সহযোগিতা বাড়ানোর কথা চুক্তিতে বলা হয়েছে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য দীর্ঘমেয়াদে আমদানির উদ্যোগ নেবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিসহ ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর বিষয়ে প্রচেষ্টা চালাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিমাণ সীমিত রাখার কথাও চুক্তিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা :
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন ভারত। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
তথ্য মতে, ভারত ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশে ১৪৭ কোটি ডলারের তুলার সুতা রপ্তানি করেছে, যা তাদের মোট সুতা রপ্তানি সিংহভাগ ছিল। গত বছর বাংলাদেশে ১২ থেকে ১৪ লাখ বেল তুলা রপ্তানি করেছে ভারত। বাংলাদেশ যে পরিমাণ পোশাক রপ্তানি করে তার ২০ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। অপরদিকে ভারতীয় তুলা দিয়ে তৈরি ২৬ শতাংশ পণ্য ঢুকে মার্কিন বাজারে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রির সেক্রেটারি জেনারেল চন্দ্রিমা চ্যাটার্জি বলেছেন, আমার ভয় তাৎক্ষণিক (নেতিবাচক) প্রভাব পড়বে ভারতের তুলার সুতার ওপর। কারণ বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা কিনতে পারবে এবং টেক্সটাইল মিলে সেগুলো থেকে তুলা উৎপাদন করতে পারবে।
ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স ন্যাশনাল কমিটি অন টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান সঞ্জয় কে জৈন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি পোশাক (নিট এবং ওভেন উভয়ই) আমদানি করবে। এর ফলে ভারত তার প্রতিযোগিতার ক্ষমতা হারাবে।
তবে কিছু কিছু ভারতীয় ব্যবসায়ী আবার আশা হারাতে চান না। তারা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের তুলা এনে সেখান থেকে সুতা তৈরি করে পোশাক বানিয়ে সেটি রপ্তানি করতে বাংলাদেশকে লজিস্টিকগত সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। যা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।
ভারতের কটন টেক্সটাইল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সিদ্ধার্থ রাজগোপাল বলেন, মার্কিন তুলা পেতে সময় এবং পরিবহন ও সংরক্ষণের খরচ বিবেচনা করা উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম বাণিজ্য চুক্তি:
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে এই পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম। এটি বাজার উন্মুক্ত করা, বাণিজ্য বাধা দূর করা এবং মার্কিন রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে অর্থবহ পদক্ষেপ।
বড় লাভের সুযোগ দেখছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা :
পরবর্তী সরকার চাইলে এ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে, সেই সুযোগ রাখা হয়েছে জানিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, আমাদের ৮৫ বা ৮৬ শতাংশ রপ্তানির উপরে শুল্কশূন্য হবে, কারণ আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫-৮৬ শতাংশই তৈরি পোশাক। অন্যদিকে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ রপ্তানির উপরে ১৯ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক হবে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকালে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তিনি। এই চুক্তির মধ্যে আমাদের এই শর্ত যুক্ত আছে যে, যদি প্রয়োজন হয়, আমরা একটা অ্যাপ্রোপ্রিয়েট নোটিস দিয়ে এই চুক্তি থেকে বের হয়ে আসতে পারব। আমরা এক্সিট ক্লজ চুক্তিতে সন্নিবেশ করেছি। এই মোটা দাগে আমাদের অর্জন।
চুক্তির বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা আমরা জানি না। আমি মনে করি, এই ধরনের চুক্তি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে করা মোটেই উচিত হয়নি। আমরা কিছু নতুন সুবিধা পেয়েছি, সেটিকে আমরা অর্জন হিসেবে মনে করতে পারি। কিন্তু তার বদলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে বা বাংলাদেশকে কী কী করতে হবে, তা আমরা জানি না। ফলে এই চুক্তিতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হলো, তা এক কথায় বলা মুশকিল। আমি মনে করি, চুক্তির লাভ-লোকসানের হিসাব কষতে হবে চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা সার্বিকভাবে পর্যালোচনার ভিত্তিতে।
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে পাচার হওয়া অর্থ চিহ্নিত করা গেলেও তা ফেরত আনা সহজ নয় বলে জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দক্ষ লোকদের দিয়ে অর্থ পাচার করা হয়েছে, তাই ফেরত আনার বিষয়টি জটিল। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে এ কথা বলেছেন তিনি।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘কত টাকা পাচার হয়েছে সুনির্দিষ্ট করা যায়নি। পরবর্তী সরকার এ বিষয়ে যদি তৎপর হয় তাহলে অর্থ ফেরত আনা সম্ভব।’
এসময় তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেসব কাজ করা হয়েছে সেটি পরবর্তী সরকার যেন চালিয়ে নিয়ে যায় সেই পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে তিনি তার সম্পদের হিসাব দিয়ে দিয়েছেন।
পরবর্তী সরকারের সময় মামলা বা আইনি জটিলতার সম্মুখীন হবেন না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। এসময় তিনি নিজের কর্মকাল মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে ১০০-তে ৭০ নম্বর দেবো। অনেক কাজ করার ছিল, কিন্তু সব করতে পারিনি।’
উপদেষ্টাদের সম্পদের বিবরণী দুয়েক দিনের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রকাশ করতে পারে জানিয়ে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসে বাংলাদেশকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে আসা হয়েছে। যেখান থেকে দেশ আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে।
আগামীতে নির্বাচিত সরকার চাইলে বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে পারবে বলেও জানান তিনি।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে প্রত্যাশা করছে নির্বাচন কমিশন। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে দৃশ্যমান ব্যাপক উৎসাহের ওপর ভিত্তি করে এবার ভোটের হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, বর্তমানে দেশে ১৩ কোটিরও বেশি ভোটার রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৪ কোটিই তরুণ ভোটার। এই বিশাল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করতে কমিশনের পক্ষ থেকে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তাদের সুবিধার্থে নিবন্ধনের সময়সীমা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। যুব সমাজের অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি বলেন, “তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভোট দেওয়ার স্পৃহা এবার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যদি এই ৪ কোটি তরুণের একটি বড় অংশ কেন্দ্রে উপস্থিত হয়, তবে ভোট কাস্টিংয়ের হারে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।”
মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক নারী হওয়ায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকেও অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে কমিশন। পূর্ববর্তী বিভিন্ন নির্বাচনের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার উল্লেখ করেন যে, প্রচার-প্রচারণা ও সশরীরে কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের উদ্দীপনা সবসময়ই চোখে পড়ার মতো ছিল। এবার সেই আগ্রহের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন। কমিশনারের মতে, অনুকূল পরিবেশ ও ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার যে প্রবল মানসিকতা তৈরি হয়েছে, তা সামগ্রিক শতাংশে বড় প্রভাব ফেলবে। যদিও ভোটের সঠিক সংখ্যা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন, তবে বর্তমান পরিস্থিতি ও উৎসবমুখর পরিবেশের আলোকে তিনি এই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন।
গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে জানানো হয় যে, মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে বর্তমানে সারা দেশে ১,১৯১টি সশস্ত্র স্ট্রাইকিং টিম সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে। সারা দেশের মোট ৪২,৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে জরুরি মুহূর্তে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় এই সশস্ত্র টিমগুলো স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কেন্দ্রগুলোকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিটি উপজেলায় দুটি এবং প্রতিটি জেলায় একটি করে আনসার ব্যাটালিয়ন স্ট্রাইকিং টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এসব টিমের কার্যক্রম জেলা কার্যালয়, রেঞ্জ কার্যালয় এবং সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে সার্বক্ষণিকভাবে নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ‘নির্বাচনী সুরক্ষা অ্যাপ’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি টিমের একজন সদস্য ‘রেসপন্ডার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর মাধ্যমে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী দায়িত্বের তিনটি ধাপ—নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময় মিলিয়ে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই স্ট্রাইকিং টিমের সদস্যরা মাঠে সক্রিয় থাকবেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা, বিশৃঙ্খলা কিংবা নাশকতার অপচেষ্টা প্রতিহত করতে তারা সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে। সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আনসার বাহিনী জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি এবং র্যাবের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে। বাহিনীর এই সক্রিয় উপস্থিতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং একটি সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোটে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট উপলক্ষে দেশবাসীকে সাহস নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এই নির্বাচনকে কেবল প্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং গত ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসন ও নীরবতার বিরুদ্ধে জনগণের এক জোরালো জবাব হিসেবে অভিহিত করেন। প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, “আমি আপনাদের কাছে অনুরোধ নয়, দাবি জানাচ্ছি-ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ ও নারী এবং সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনওদিন হারাতে দেবে না।”
আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. ইউনূস দিনটিকে ‘নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ভোটারদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে তিনি বলেন, “আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন।” এই নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমেই রাষ্ট্র কোন পথে পরিচালিত হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণ নেবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে অন্তর্বর্তী সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা জানান, এবার রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সারা দেশে প্রথমবারের মতো সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং নজরদারিতে ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নির্বাচনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ঐতিহাসিক পদক্ষেপের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস জানান, প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এ ছাড়া সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং আইনি হেফাজতে বা কারাগারে থাকা যোগ্য নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে রাষ্ট্র সবাইকে নিয়ে এগোতে চায়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিশৃঙ্খলা বর্জন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, একটি ত্রুটিপূর্ণ বা সহিংস নির্বাচন শেষ পর্যন্ত কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনে না। যারা ইতিপূর্বে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে, তাদের কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন নিয়ে অপপ্রচার ও গুজব ছড়ানো মহলের বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনে ‘নির্বাচনবন্ধু’ হটলাইন ৩৩৩-এ যোগাযোগ করতে হবে। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রসঙ্গে সকল প্রকার বিভ্রান্তি দূর করে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “এখন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে না। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করে এই সরকার বিদায় নেবে। আমরা এই শুভ মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।”
জুলাই জাতীয় সনদকে গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকনির্দেশনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সনদ প্রস্তুত করা হয়েছে এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণই এর চূড়ান্ত সংস্কার কাঠামোর বৈধতা দেবেন। ভাষণের শেষাংশে দেশবাসীকে দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “ভয় নয়– আশা নিয়ে; উদাসীনতা নয়– দায়িত্ববোধ নিয়ে আমরা ভোটকেন্দ্রে যাব। আপনার ভোটেই রচিত হবে গৌরবময় আগামীর বাংলাদেশের ইতিহাস।”
বিগত জুলাই বিপ্লবের অন্যতম অগ্রসেনানী ও ইনকিলাব মঞ্চের সাবেক আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় আয়োজিত এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হাদির স্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হাতে একটি সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের দলিল ও চাবি হস্তান্তর করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শহীদ হাদির আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ সম্মাননা ও সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হাদির পরিবারকে রাজধানীর অভিজাত এলাকা লালমাটিয়ায় অবস্থিত ‘সরকারি দোয়েল’ টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার ২১৫ বর্গফুট আয়তনের এই ফ্ল্যাটটি আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত। ফ্ল্যাট হস্তান্তরের পাশাপাশি হাদির পরিবারের দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা ও জীবনযাপনের ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও ১ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দলিল হস্তান্তরকালে প্রধান উপদেষ্টা হাদির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং তাঁদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
অনুষ্ঠানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক উপদেষ্টা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— গৃহায়ণ ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ফেরদৌসী বেগম। সরকারের এই পদক্ষেপ জুলাই বিপ্লবে জীবন উৎসর্গকারী বীরদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদির পরিবার এই সংকটময় সময়ে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রধান উপদেষ্টা ও সরকারের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রাক্কালে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। নিজের পেশাদারিত্ব ও সততার প্রমাণ হিসেবে তিনি তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত হিসাব ও বর্তমান আর্থিক অবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক দীর্ঘ পোস্টের মাধ্যমে তিনি তাঁর এই সম্পদের খতিয়ান তুলে ধরেন। শফিকুল আলম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দায়িত্ব নেওয়ার সময় তাঁর যে পরিমাণ সম্পদ ছিল, দায়িত্ব ছাড়ার সময়ও তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি; অর্থাৎ এই সময়ে তাঁর কোনো নতুন সম্পদ বাড়েনি।
সম্পদের বিবরণ দিতে গিয়ে প্রেস সচিব উল্লেখ করেন, বর্তমানে তাঁর মালিকানায় মোট তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মধ্যে একটি ঢাকার শাহীনবাগে এবং অন্যটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যাত্রাবাড়ীর দনিয়ায়। এ ছাড়া ময়মনসিংহে তাঁর নিজের নামে একটি এবং তাঁর স্ত্রীর নামে একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে। গ্রামের বাড়ি মাগুরায় তাঁর মালিকানায় রয়েছে ৪০ শতাংশ কৃষিজমি। তিনি জানান, গত বছরের জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি যে সম্পদের ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ দায়িত্ব ছাড়ার দিনেও সেই অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সরকারি চাকরিতে থাকাকালীন তিনি বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য নতুন কোনো স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করেননি।
ব্যাংক হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে শফিকুল আলম জানান, তাঁর শুধুমাত্র একটি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় ওই অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা জমা ছিল, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকায়। এই বাড়তি ৯ লাখ টাকার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা তিনি আগে তাঁর শ্যালককে ধার দিয়েছিলেন এবং সম্প্রতি সেই অর্থ ফেরত পেয়েছেন। অবশিষ্ট অর্থ তাঁর বড় ভাই বিদেশ থেকে পাঠিয়েছেন, যা মূলত পবিত্র রমজান মাসে গ্রামের দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণের জন্য দান হিসেবে পাঠানো হয়েছিল।
শফিকুল আলম তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, তাঁর যাবতীয় আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং যেকোনো সময় যাচাইযোগ্য। যদি কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা তাঁর এই ঘোষিত সম্পদের বিষয়ে কোনো প্রকার অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে চান, তবে তিনি সেটিকে সাদরে স্বাগত জানাবেন। পরিশেষে তিনি কিছুটা রসিকতার ছলে তাঁর সেই আলোচিত ‘নকল বারবারি মাফলার’টির কথা উল্লেখ করে বলেন, সেটিও এখনো তাঁর কাছেই গচ্ছিত রয়েছে। ক্ষমতার চূড়ান্ত পটপরিবর্তনের ঠিক আগমুহূর্তে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার এমন স্বপ্রণোদিত হয়ে সম্পদের হিসাব প্রদান প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সারাদেশের আকাশসীমায় সাধারণভাবে সকল প্রকার ড্রোন উড্ডয়ন নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সর্বসাধারণের অবগতির জন্য এই নির্দেশনা জারি করা হয়। জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে গৃহীত এই নিষেধাজ্ঞা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না বলে বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে।
তবে বিশেষ প্রয়োজনে সরকারি বা বেসরকারি ব্যক্তি ও সংস্থার পরিচালিত গবেষণা, জরিপ, কৃষিকার্য ও পরিবীক্ষণ কার্যক্রম এবং সরকারি বিভিন্ন ইভেন্টের সম্প্রচার কাজের জন্য ড্রোন ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বেবিচক বরাবর আবেদন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার অনাপত্তি বা ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে উড্ডয়নের অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।
কর্তৃপক্ষের এই নির্দেশনা অমান্য করে কোনো ব্যক্তি যদি ড্রোন উড্ডয়ন করেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে ড্রোন উড্ডয়ন করা হলে তা বেসামরিক বিমান চলাচল আইন ২০১৭ এর ২৪ ধারার অধীনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কড়াকড়ি বলবৎ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে ঐতিহাসিক গণভোট উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আজ বিকেলে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, আজ সন্ধ্যা ৭টায় প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং বাংলাদেশ বেতারে একযোগে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাষণটি প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁর এই ভাষণে আসন্ন সাধারণ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি জননিরাপত্তা এবং ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা নতুন জাতীয় রূপরেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেশবাসীর উদ্দেশে বিশেষ দিকনির্দেশনা থাকবে।
উল্লেখ্য যে, আগামী বৃহস্পতিবার সারা দেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে প্রস্তাবিত জাতীয় সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের প্রচারণা আজ সকালেই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। এমন এক সন্ধিক্ষণে প্রধান উপদেষ্টার এই ভাষণ ভোটারদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি এবং জাতীয় ঐক্যের বার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের বিশেষজ্ঞরা। ইতিমধ্যে নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশজুড়ে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং পুরো দেশ এখন ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ব্যালট বিপ্লবের অপেক্ষায় রয়েছে। এর আগে গতকাল ও আজ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের এই সমাপনী বার্তাটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জে বিজিবির নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) তিনি ফরিদপুর-৩ সংসদীয় আসনের ফরিদপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট এবং মুন্সীগঞ্জ-১ সংসদীয় আসনের শ্রীনগর বেলতলী জি. জে. হাই স্কুলে স্থাপিত বিজিবির নির্বাচনী বেইজ ক্যাম্পগুলো পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বেইজ ক্যাম্পে দায়িত্বরত বিজিবির সকল স্তরের কর্মকর্তা ও সদস্যদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
নির্বাচনী ডিউটি পালন প্রসঙ্গে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ভোটারগণ যেন নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও শঙ্কামুক্ত পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তিনি বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন, কোনো দুষ্কৃতিকারী বা কুচক্রীমহল যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া প্রতিটি সদস্যকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
পরিদর্শন কর্মসূচির আগে বিজিবি মহাপরিচালক ফরিদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার উপস্থিতিতে আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, দেশের ৪,৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টিতে ৩৭ হাজারেরও অধিক বিজিবি সদস্য বর্তমানে মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে এবং দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে ঝুঁকি বিবেচনায় তারা মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে নিয়োজিত থাকবে। নির্বাচনকালীন যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় হেলিকপ্টারসহ কুইক রেসপন্স ফোর্স (QRF), র্যাপিড অ্যাকশন টিম (RAT), বিশেষায়িত K-9 ডগ স্কোয়াড ইউনিট, ড্রোন এবং বডি-অন ক্যামেরা ব্যবহারের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিজিবি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নির্বাচনের পর নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের ব্যবহারের জন্য এরই মধ্যে ৫০টি গাড়ি সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে রেখেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দ্রুততম সময়ে মন্ত্রিসভা গঠনের লক্ষ্যে এই আগাম লজিস্টিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে আগামী ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারিকে প্রাথমিকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই তারিখ আরও এগিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। নতুন মন্ত্রীরা যাতে শপথ নেওয়ার পরপরই তাদের দাপ্তরিক যাতায়াত ও কার্যক্রম শুরু করতে পারেন, সেজন্যই পরিবহন পুলের মাধ্যমে এই গাড়িগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সাধারণত নতুন সরকার গঠনের সময় মন্ত্রিসভার আকার অনুযায়ী পরিবহন সহায়তার প্রয়োজন হয়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এবারও আগাম প্রস্তুতি সম্পন্ন করল প্রশাসন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে একযোগে সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর পরেই শুরু হবে নতুন জনপ্রতিনিধিদের শপথ এবং সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। নির্বাচনের পর কত দ্রুত দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়। মূলত সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন যাত্রা শুরু করতে প্রশাসনের সকল স্তরে এখন সাজ সাজ রব বিরাজ করছে।
পরবর্তী সরকারের শাসনামলে কোনো প্রকার মামলা বা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে নিজের কর্মকাণ্ডের প্রতি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান যে, তিনি ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নিজের সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। নিজের দায়িত্ব পালন ও স্বচ্ছতা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, “আশা করি এমন কিছু করিনি যাতে সরকার থেকে চলে গেলে পরবর্তী সরকারের সময় মামলা, মোকদ্দোমা বা আইনি জটিলতার সম্মুখীন হবো।”
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিজের কাজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি নিজেকে ৭০ শতাংশের বেশি নম্বর প্রদান করেন। যদিও সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, তবুও গৃহীত উদ্যোগগুলো জনকল্যাণেই ছিল বলে তিনি দাবি করেন। নিজের কাজের নম্বর প্রদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে ৭০ বা প্লাস মার্কস দিয়ে যাবে। অনেক কিছু করে দিতে পারিনি। যা শুরু করেছি তা সবই জনগণের জন্য করেছি।”
অর্থনৈতিক সংস্কার ও চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন যে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থানীয় শিল্পের ভিত্তি মজবুত করা এবং রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, পাচারকৃত অর্থের গন্তব্য ও জড়িতদের চিহ্নিত করা গেলেও প্রকৃত পরিমাণ এখনো সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি। এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, “কতো টাকা পাচার হয়েছে সুনির্দিষ্ট করা যায়নি। পরবর্তী সরকার সিরিয়াস হলে টাকা ফেরত আনতে পারবে।” তিনি আরও জানান যে, পাচারকারীরা অত্যন্ত দক্ষ লোক নিয়োগ করে অর্থ সরিয়ে নিয়েছে, যা উদ্ধারের প্রক্রিয়াকে দীর্ঘমেয়াদী করেছে।
পরিশেষে পরবর্তী সরকারের প্রতি বর্তমান প্রশাসনের উন্নয়নমূলক কাজগুলো অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “পরবর্তী সরকারকে বলব, আমরা যে কাজ করেছি সেটা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় জরুরি।” জ্বালানি সংকটকে বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে অধিকতর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।