আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা চালু হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি)। আজ শুক্রবার সংস্থাটির চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এখনো মোবাইল ইন্টারনেট চালুর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
তিনি বলেন, যেসব সঞ্চালন লাইন এবং ডেটা সেন্টার রিপেয়ার করা হয়েছে, ইমপ্যাক্টটা কেমন পড়ছে এবং মোবাইল ইন্টারনেটে প্রেশার যেহেতু আরেকটু বেশি পড়বে, সে জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে রবি-সোমবারে চালু করার পরিকল্পনা আছে।
এদিকে ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিন বিকেল ৩টার দিকে বিটিআরসির এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিরেক্টরেট বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা জানান, সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সচল করা হয়েছে। এখন ইন্টারনেটের গতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে একমত হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী ও বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সে নির্দেশনা আইআইজি অপারেটরদের জানিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি গুগলের ক্যাশ সার্ভার চালুর নির্দেশনাও দিয়েছে বিটিআরসি। ফলে এখন থেকে ইউটিউব ও গুগলে সার্ভিস পেতে আর কোনো সমস্যায় পড়তে হবে না ব্যবহারকারীদের।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে গত ১৮ জুলাই রাত থেকে দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ছিল। পাঁচ দিন পর ২৩ জুলাই রাতে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা চালু করে সরকার। গত বুধবার রাত থেকে সব জায়গায় ব্রডব্যান্ড চালু করা হয়। তবে ব্রডব্যান্ড চালু হলেও ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেটের স্বাভাবিক গতি পাচ্ছিলেন না। এরপর গুগলের ক্যাশ চালু ও ইন্টারনেটের গতি স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো আপাতত বন্ধই থাকছে। তবে ভিপিএন ব্যবহার করে বহু ব্যবহারকারী এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসী এবং দেশের অভ্যন্তরে নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পোস্টাল ভোটিংয়ের আওতায় এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
প্রযুক্তিভিত্তিক ‘আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং সিস্টেম’ সম্পূর্ণরূপে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে (‘মেড ইন বাংলাদেশ’)। বিশ্বের কাছে সম্পূর্ণ নতুন এই উদ্ভাবন সফলভাবে বাস্তবায়ন করে নজর কেড়েছে বাংলাদেশ। এবার এই প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ নেপাল ও শ্রীলঙ্কা।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, অন্য কোনো দেশ এ প্রযুক্তি গ্রহণ করলে কারিগরি নানা ত্রুটি-বিচ্যুতির টেকসই সমাধান সহজ হবে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।
ইসির ‘আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন’ (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান বাসস’কে বলেন, ‘পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে এক অনন্য উদ্ভাবন। পুরোপুরি বাংলাদেশে তৈরি এই ব্যবস্থার বৈশ্বিক গুরুত্ব অনেক। নেপালের প্রতিনিধিদল স্বউদ্যোগে এসেছে এবং তারা এ বিষয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক। শুধু নেপাল নয়, গত সেপ্টেম্বরে শ্রীলঙ্কা সফরকালেও আমরা তাদের আগ্রহ দেখেছি। দেশের তৈরি এমন একটি প্রযুক্তি বিদেশে সমাদৃত হওয়া প্রতিটি বাংলাদেশির জন্য গর্বের।’
সালীম আহমাদ খান আরও বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন ও উপ-নির্বাচনে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। এটি নির্বাচন কমিশনের একটি বড় সম্পদ, যা ভবিষ্যতে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।’
আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ভোটিং বিষয়ে বাংলাদেশে অভিজ্ঞতা নিতে আসা নেপালের নির্বাচন কমিশনার ড. রাজিব সুব্বা বলেন, ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই মডেল অত্যন্ত সফল। বাংলাদেশ ও নেপালের মতো দেশ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ থেকে কারিগরি সহায়তা পেলে আমরা সম্মানিত বোধ করব।
নেপালের আগামী প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রবাসীদের জন্য পোস্টাল ভোটিং চালু করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে ড. রাজিব সুব্বা বলেন, ‘বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক প্রবাসে থেকে রেমিট্যান্সের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখেন। নেপালের প্রেক্ষাপটও একই রকম। তাই দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের ভোটদান নিশ্চিত করতে আমরা ‘বাংলাদেশ মডেল’ গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করছি।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ আগে এই প্রযুক্তি পরীক্ষা করেছে বলে নেপাল ভুলগুলো এড়িয়ে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে পারবে।
উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত নেপালি শ্রমিকদের ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে ভোটার শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার কথা জানান তিনি। এছাড়া ডাকযোগে কাগজপত্র আদান-প্রদানে বিলম্বের ঝুঁকি, কাঠমান্ডুতে পৌঁছাতে সময়ের অনিশ্চয়তা এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টিও তাদের বিবেচনায় রয়েছে।
সফরের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড. রাজিব সুব্বা বলেন, ‘বাংলাদেশে আসার মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিভিত্তিক পোস্টাল ভোটিং প্রক্রিয়া সরাসরি দেখা ও জানা। বাংলাদেশ দলের সাথে এটি আমাদের তৃতীয় দফা আলোচনা। আমরা পরবর্তী দেড় বছরের মধ্যে যেকোনো একটি প্রাদেশিক নির্বাচনে এ ব্যবস্থা চালু করতে চাই।’
তবে বাংলাদেশের মডেলটি হুবহু গ্রহণ করা হবে কি না, তা গবেষণার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের মডেলটির প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে এটি সম্পূর্ণ অনলাইন ভোটিং ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে। সবচেয়ে বড় দিক হলো, এই প্রযুক্তির সফটওয়্যার, কোড ও নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নিজের হাতে থাকে। প্রযুক্তি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয় না, যা অন্যান্য ব্যবস্থার চেয়ে আলাদা।’
ইসি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের কারিগরি সহায়তা ও অভিজ্ঞতা নিতে নেপাল নির্বাচন কমিশনের ৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে অন্য চারজন নির্বাচন কমিশনার ও ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় করেন।
বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনের নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ-এর নেতৃত্বে ইসির ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নেপালের প্রতিনিধিদল পোস্টাল ভোটিংয়ের অপারেশনাল ও টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর ওপর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন- নেপালের নির্বাচন কমিশনার ড. জানকী কুমারী তুলাধর, সচিব কৃষ্ণ প্রসাদ কাপরী, সিনিয়র কম্পিউটার অফিসার অনুপ নৌপানে, ডেপুটি অ্যাটর্নি কমলা কাফলে এবং ইউএনডিপির প্রতিনিধি প্রভাত কুমার।
ইসির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনকারী ১৫ লাখ ২৮ হাজার ১৩১ জন অনুমোদিত ভোটারের মধ্যে ১২ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন ভোট দিয়েছেন (৮০.১১ শতাংশ)। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে ১১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৯২টি ভোট (৭৬.২৮ শতাংশ), যার মধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৯৭টি (৭০.২৫ শতাংশ)।
এর মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৬টি ব্যালটের মধ্যে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ২০৫টি রিটার্নিং কর্মকর্তা গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে (আইসিপিভি) অবস্থানরত ভোটারদের কাছ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তা ৬ লাখ ৬৭ হাজার ৩৮৮টি ভোট গ্রহণ করেন। সূত্র: বাসস
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে ডিমের ভূমিকা, পুষ্টিগুণ এবং সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ডিম দিবস। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার আন্তর্জাতিকভাবে দিবসটি উদযাপিত হয়ে থাকে। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রোটিন দ্যাট পাওয়ার্স অ্যান্ড প্রোটেক্টস’ অর্থাৎ ‘যে প্রোটিন শক্তি জোগায় ও সুরক্ষা দেয়’। ১৯৯৬ সালে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় প্রথম এই দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার ধারাবাহিকতায় এবার বিশ্ব ডিম দিবসের ৩০ বছর পূর্তি উদযাপিত হচ্ছে।
সুলভ ও সহজলভ্য পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ডিমের গুরুত্ব অপরিসীম। মানবদেহের পেশি গঠন, সার্বিক বৃদ্ধি, কোষের ক্ষয়পূরণ এবং মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে ডিমে বিদ্যমান উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি এবং কোলিন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে বাড়ন্ত শিশু-কিশোর ও প্রবীণদের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে ডিম একটি আদর্শ খাদ্য উপাদান। তবে সুষম খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত করতে ডিমের পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল, ডাল ও মাছসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা আবশ্যক। একই সঙ্গে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি এড়াতে ডিমের পরিচ্ছন্ন সংরক্ষণ ও সঠিকভাবে রান্না করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যগত সুবিধার বাইরেও ডিমের উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়া দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পোলট্রি খামারি, পশুখাদ্য প্রস্তুতকারক, পরিবহনকর্মী ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জীবন-জীবিকা এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পোলট্রি খাদ্যের মূল্য, রোগের প্রাদুর্ভাব ও বাজারব্যবস্থার প্রভাব সরাসরি ডিমের সরবরাহ ও দামের ওপর পড়ে। সাধারণ মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করতে ডিমের মূল্য সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা যেমন জরুরি, তেমনি খামারিদের সুরক্ষা ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ডিমের বহুমুখী পুষ্টির ব্যাপারে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং উৎপাদন সংশ্লিষ্টদের অবদানের স্বীকৃতি দিতেই দিবসটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
সরকারি নদী-নালা, খাল ও জলাশয় পুনঃখননের পর সেগুলোকে কেবল পানি নিষ্কাশনের কাজে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবেশ রক্ষা, সামাজিক বনায়ন, দুর্যোগ-সহনশীল জীবিকায়ন এবং অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে পরিণত করার এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
‘শুধু খাল খনন নয়; খননকৃত খালের বহুমুখী ব্যবহার’— এই ধারণাকে সামনে রেখে দেশের ৮টি বিভাগে ২০টি নির্বাচিত সরকারি খালকে পরীক্ষামূলক ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এতে উপকারভোগী হিসেবে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র পরিবারকে যুক্ত করার প্রাথমিক হিসাব করা হয়েছে।
আগামী ১৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লালমনিরহাটে নতুন এই কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত ধারণাপত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু নিজ দপ্তরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সারাদেশে খাল খননের বিপ্লব শুরু করলেও বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে অবহেলা ও অবৈধ দখলে অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে যায়। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকারের ৪টি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে বর্তমানে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে, যার মধ্যে ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৭ হাজার কিলোমিটার খনন কাজ করবে। গত অর্থবছরে আমাদের লক্ষ্যমাত্রার ১২০০ কিলোমিটার কাজ শেষ হয়েছে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘শুধু পানি নিষ্কাশন নয়— খালপাড়ে বৃক্ষরোপণ, পানিতে হাঁস ও মৎস্য চাষ এবং কুটির শিল্পের সুযোগ তৈরি করে এসব খালের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই। এজন্য আমরা ‘মডেল খাল’ কর্মসূচির ধারণা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
কেন এই ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি?
ধারণাপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, নদী-নালা ও খাল পুনঃখননের চলমান কর্মসূচির পাশাপাশি দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি এসব জলসম্পদকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
খালের পানি ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক পানি প্রবাহ অক্ষুণ্ন রেখে খালপাড়ে সামাজিক বনায়ন, হাঁস ও মাছ পালন, মৌসুমি সবজি চাষ এবং জনসাধারণের বৈধ ব্যবহার নিশ্চিত, নৌচলাচল, অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও কর্মসংস্থান তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তাকে কেবল সাহায্য বা ভাতা-নির্ভর না রেখে উৎপাদনশীল জীবিকার মাধ্যমে মানুষকে ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং দুর্যোগ-সহনশীল অর্থনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত করতেই এ কৌশল নেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইনগত, প্রশাসনিক ও কারিগরি এখতিয়ার অক্ষুণ্ন রেখেই পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালার আলোকে এ কর্মসূচি পরিচালিত হবে।
সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, দেশের কৃষিজমিতে সেচসুবিধা বৃদ্ধি, পানিসম্পদ সংরক্ষণ এবং কৃষি উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-নালা, খাল, জলাধার খনন, পুনঃখনন কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’র অনুসরণ করে জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে দেশের হারিয়ে যাওয়া নদী, খাল ও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, সরকারি খাল পুনঃখনন শেষ হওয়ার পর সেগুলোর নিয়মিত তদারকি ও সমন্বিত সামাজিক ব্যবহারের অভাবে যেন খালগুলো পুনরায় অবৈধ দখল, আবর্জনা ফেলা বা পলি জমে ভরাট না হয়— সেজন্যই এই পুনঃখননকৃত খালের ওপর ভিত্তি করে ‘মডেল খাল’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বাসসকে বলেন, ‘খালপাড়ের উপকারভোগী দরিদ্র জনগোষ্ঠী যখন নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, তখন দরদ দিয়ে তারা নিজেরা খাল পাহারা দেবেন ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন কর্মচঞ্চলতা সৃষ্টি করবে।’
প্রকল্পের আওতা ও উপকারভোগী নির্বাচন হবে যেভাবে
প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে দেশের ৮টি বিভাগের ২০টি নির্বাচিত খালকে মডেল হিসেবে নিয়ে পাইলটিং করা হবে। এর মধ্যে— ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে ৩টি করে এবং রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে ২ টি করে খাল নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রতি খালের গড় দৈর্ঘ্য ৩ কিলোমিটার ধরে আনুমানিক মোট ৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের খালের বহুমুখী ব্যবহারকে পাইলটিংয়ের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে, ইতোমধ্যে পুনঃখনন হয়েছে— এমন খালকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মডেল খাল হিসেবে নির্বাচন করা হবে না। প্রতিটি জেলার প্রাপ্ত প্রস্তাবনার মধ্য থেকে জিপিএস স্থানাঙ্ক, জমির খতিয়ান, দখল পরিস্থিতি, পানি প্রবাহ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চাষাবাদের উপযোগিতা যাচাই করে চূড়ান্ত ২০টি খাল নির্বাচন করা হবে।
রূপরেখায় আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় অতিদরিদ্র কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি), নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রতিবন্ধী সদস্যসম্পন্ন দরিদ্র পরিবার থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে।
মডেল খালের বহুমুখী ব্যবহার ও ‘জোন’ বিন্যাস
ধারণাপত্রে খালের পরিবেশ ও স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি অক্ষুণ্ন রেখে এলাকাভিত্তিক ‘জোন’ বিন্যাসের মাধ্যমে এর বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, খালের নির্দিষ্ট অংশ স্থানীয় জনসাধারণ ও গবাদিপশুর গোসল, গৃহস্থালি কাজে পানি সংগ্রহের জন্য ‘পাবলিক জোন’ হিসেবে উন্মুক্ত থাকবে। খালের গভীর ও উপযোগী অংশে দেশীয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শে নিয়ন্ত্রিত হাঁস পালনে ‘প্রোডাকশন জোন’ এবং নৌযান চলাচলের সুযোগ থাকা খালে স্বাচ্ছন্দ্য চলাচলের জন্য ‘ন্যাভিগেশন চ্যানেল’ রাখা হবে।
এছাড়া খালের দুই পাড়ের মাটি ধস রোধে জলসহিষ্ণু ও ফলজ গাছের ‘সোশ্যাল ফরেস্ট্রি’ এবং পাড়ের ঢালু অংশে মাচা পদ্ধতিতে মৌসুমি সবজি চাষের সুযোগ রাখা হবে।
কর্মসংস্থান, স্থায়ী জীবিকা ও সমবায় পদ্ধতি
প্রস্তাবনায় ২০টি মডেল খালে প্রায় ২ হাজার ৪০০ অতিদরিদ্র উপকারভোগী পরিবারকে সম্পৃক্ত করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায়ে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা হবে, যেখানে অন্তত ৫০ শতাংশ নারী সদস্যের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
তবে কোনো উপকারভোগী বা সমবায়কে খাল বা খালের পাড়ের জমি কিংবা সরকারি অবকাঠামোর ওপর স্থায়ী স্বত্ব দেওয়া হবে না; কেবল শর্তসাপেক্ষ ও অ-হস্তান্তরযোগ্য ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে।
অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন হবে যেভাবে
ধারণাপত্র অনুযায়ী, কোনো পৃথক বৃহৎ প্রকল্প ছাড়াই বিদ্যমান সরকারি কাঠামোর আওতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় এটি বাস্তবায়িত হবে।
প্রাথমিক বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা কোনো স্থায়ী অনুদান বা দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি নয়, বরং একটি ঘূর্ণায়মান তহবিল হিসেবে পরিচালিত হবে। সরকারের প্রাথমিক সহায়তায় উৎপাদন শুরুর পর অর্জিত আয় থেকে স্থানীয় সমবায়গুলো নিজস্ব পরিচালনায় ব্যয় বহন করবে, যা সরকারি আর্থিক নির্ভরতা অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি থাকবে। কর্মসূচি পাইলট পর্যায়ে ১২ মাস পরিচালনার পর একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে এই মডেল সারাদেশে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সেখ ফরিদ আহমেদ বাসসকে বলেন, ‘মডেল খালের মূল ভিত্তি হলো স্থানীয় নিবন্ধিত হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে সুসংগঠিত করে সমবায় সমিতি গঠন করা। কর্মসূচির শুরুর প্রথম দুই বছর সরকার প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ, উৎপাদন উপকরণ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেবে। পরীক্ষামূলক পর্ব শেষে এসব খালের উৎপাদন, আর্থিক আয় ও তৈরি হওয়া সম্পদের ওপর সমবায়ের স্থানীয়দের সরাসরি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যা তাদেরকে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে।’ সূত্র: বাসস
বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা অভিবাসীরা যেন সম্মানের সঙ্গে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা ও সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ যৌথভাবে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। ৩০ মাসের এই কর্মসূচিতে জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থা কাজ করবে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নারী ও শিশু এবং সংকটের কারণে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া অভিবাসীদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এই কর্মসূচির চুক্তিতে সই করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং আইওএম বাংলাদেশের চিফ অব মিশন ড. লরা টম বন্দ।
অনুষ্ঠানে আইওএম বাংলাদেশের চিফ অব মিশন ড. লরা টম বন্দ বলেন, ‘অভিবাসন কোনো একমুখী প্রক্রিয়া নয়। তাই দেশে ফেরা অভিবাসীরা যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুরক্ষা পেয়ে আবার দাঁড়াতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।’
টেকসইভাবে তাদের নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ দিতে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ—সব পর্যায়ে সহায়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এই যৌথ কর্মসূচির মাধ্যমে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো তাদের সম্মিলিত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সরকারকে সমন্বিত ও অভিবাসীবান্ধব একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।’
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, ‘দেশে ফিরে আসা অভিবাসী ও তাদের পরিবারের এমন সেবা, সুযোগ এবং সহায়তা প্রয়োজন, যা তাদের নতুন করে জীবন গড়ে তুলতে এবং নিজ নিজ সমাজে অবদান রাখতে সহায়তা করবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সহায়তা আরও শক্তিশালী করতে এই অংশীদারত্ব সহায়তা করবে।’
৩০ মাসের কর্মসূচিতে নানা ধরনের সহায়তা কর্মসূচির আওতায় বিদেশ থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশি অভিবাসীদের দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা দেওয়া হবে। সামাজিক নিরাপত্তা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহায়তা জোরদার করা হবে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজের জন্য বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ লাখের বেশি নারী। দেশে ফিরে অনেকেই চাকরি বা আয় করার সুযোগ, প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া এবং বিদেশে থাকার সময়ের নানা মানসিক চাপ মোকাবিলায় সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে হঠাৎ বা কোনো সংকটের কারণে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের এসব সমস্যা বেশি হয়।
কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জেন্ডার-সংবেদনশীল নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা বিদেশ ফেরত অভিবাসীদের চিহ্নিত করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে যুক্ত করতে সহায়তা দেওয়া হবে। প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা পরিকল্পনা তৈরি, সেবা প্রদানকারীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং শ্রমবাজারে কাজের সুযোগ তৈরির মতো উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক সহায়তা, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম, বৈষম্যমূলক সামাজিক রীতিনীতি মোকাবিলা এবং জেলাপর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর মতো উদ্যোগও পরীক্ষামূলকভাবে নেওয়া হবে।
এই কর্মসূচি বিদেশ থেকে ফিরে আসা অভিবাসীদের নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত অভিবাসনের জন্য বৈশ্বিক চুক্তির ২১ নম্বর উদ্দেশ্য—মর্যাদাপূর্ণভাবে দেশে ফেরানো এবং টেকসইভাবে নতুন জীবন শুরু করার সুযোগ তৈরিতে অবদান রাখবে।
কর্মসূচিটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০-এর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে জেন্ডার সমতা অর্জন ও নারী-শিশুর ক্ষমতায়ন, উৎপাদনশীল কাজ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে কর্মসূচিটি ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও জাতিসংঘ উইংয়ের প্রধান এ. কে. এম. সোহেল, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী, জাতিসংঘ উইংয়ের যুগ্ম সচিব ড. কাজী শাহজাহান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, আইওএম, আইএলও, ইউএনএফপিএ, ইউনিসেফ, ইউএন ওমেন ও সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
পানি নিয়ে ক্রমেই জটিল এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। একদিকে নিরাপদ ও সুপেয় পানির চাহিদা বাড়ছে, নদী-খাল দূষিত হচ্ছে, উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে; অন্যদিকে শিল্পায়ন ও নগরায়ণের সঙ্গে বাড়ছে পানির ব্যবহার। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বদলে দিচ্ছে পানি প্রাপ্যতার স্বাভাবিক চিত্র। দেশের অভ্যন্তরীণ এই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের দীর্ঘদিনের প্রশ্ন।
এর মধ্যেই আগামী ১২ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে ভারতের সঙ্গে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছর মেয়াদ। নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের মতো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ নিয়েও এগোচ্ছে সরকার। সব মিলিয়ে দেশের পানি ব্যবস্থাপনা এখন অভ্যন্তরীণ সংকট, বড় অবকাঠামো প্রকল্প এবং পানি কূটনীতির এক যৌথ সমীকরণে দাঁড়িয়েছে।
নিরাপদ পানি নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ: ভবিষ্যতে পানি বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তার মতে, পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা এখনই নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি ক্ষেত্রে পানির গুরুত্ব বিবেচনায় রাখার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে ইউনিসেফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। বৈঠকে নিরাপদ ও সুপেয় পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং উপকূলীয় এলাকায় বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে পানির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বিশেষ করে বস্ত্র ও পোশাকশিল্পে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে শিল্পকারখানার বর্জ্যে দেশের অনেক নদী ও খালের পানি দূষিত হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকাতেও পানিসংক্রান্ত নানা সমস্যা রয়েছে।
তার বক্তব্যে উঠে আসে উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্যের বিষয়টিও। উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে হবে, তবে সেই উন্নয়ন যেন মানুষের জীবন ও পরিবেশের ক্ষতি না করে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। শুধু আবাসন বা অবকাঠামো নয়, মানুষের জন্য নিরাপদ পানি ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করাকেও উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
বৈঠকে জানানো হয়, ইউনিসেফের সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ওয়াসা ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রকল্প চলমান রয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানিতে বাড়ছে চাপ: পানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক পরিচালক ড. আনোয়ার জাহিদ মনে করেন, বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। সাম্প্রতিক এক আলোচনায় তিনি জানান, দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে।
তার দেওয়া হিসাবে, প্রতি বছর ভূগর্ভে নতুন করে পানি যোগ হয় প্রায় ২১ বিলিয়ন ঘনমিটার; বিপরীতে উত্তোলন হচ্ছে প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ঘনমিটার। শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহৃত পানির প্রায় ৮০ শতাংশই ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে।
এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। শহরাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, শিল্পকারখানা ও কৃষিতে সেচের চাহিদা বাড়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ আরও বাড়ছে। ফলে শুধু নতুন পানি সংগ্রহ নয়, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়ানো এবং নদী-খাল-জলাশয় রক্ষা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
ভূগর্ভস্থ পানি ও দূষণ নিয়ে কাজ করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান খানও গবেষণায় ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনা, নদী-ভূগর্ভস্থ পানির আন্তঃসম্পর্ক ও দূষণকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার গবেষণার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবস্থাপনা ও আর্সেনিক দূষণ রয়েছে।
১২ ডিসেম্বরের আগে গঙ্গা চুক্তি, তিস্তা-পদ্মায় বড় পরিকল্পনা: দেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি নিয়েও বড় সিদ্ধান্তের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আগামী ১২ ডিসেম্বরের আগেই ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিআইআইএসএসের আয়োজিত সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নতুন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো ‘‘গ্যারান্টি ক্লজ’’ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বিষয়েও আলোচনা চলছে।’
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি সই হয়েছিল। চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের আগে নতুন চুক্তি সম্পন্ন করা এখন দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এ্যানি জানান, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে কারিগরি পর্যায়ে কাজ চলছে। কারিগরি কাজ শেষ হলে মন্ত্রীপর্যায়ে বাকি আলোচনা হবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই নতুন চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
১৯৭৭ সালে তৎকালীন চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল। তবে ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে সেটি রাখা হয়নি। এবার নতুন চুক্তিতে ওই ধরনের নিশ্চয়তা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
গঙ্গার পাশাপাশি তিস্তা নিয়েও বড় পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে সমীক্ষা শেষ করে একই বছর মূল কাজ শুরুর লক্ষ্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়েও এগোচ্ছে সরকার। প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চের মধ্যে প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমানভাবে শুরু করার আশা করছে সরকার।
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বড় প্রকল্প। এসব প্রকল্পের সুফল দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলের সাত কোটি মানুষ পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
গঙ্গা চুক্তিতে পরিবেশগত প্রবাহের প্রশ্ন: পানি বিশেষজ্ঞ মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী, জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান, মনে করেন শুধু পানির পরিমাণ ভাগাভাগির হিসাব দিয়ে ভবিষ্যতের চুক্তি করা যথেষ্ট হবে না। তার মতে, বিদ্যমান গঙ্গা চুক্তিতে পরিবেশগত প্রবাহ বা ‘ইকোলজিক্যাল ফ্লো’ যথেষ্টভাবে বিবেচিত হয়নি। পুরো নদী অববাহিকাকে বিবেচনায় নিয়ে পানি ব্যবস্থাপনার হিসাব করা দরকার।
তিনি মনে করেন, প্রয়োজনে বর্তমান চুক্তি স্বল্প মেয়াদে নবায়ন করে এই সময়ের মধ্যে গবেষণা ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নতুন চুক্তির দিকে যাওয়া যেতে পারে। কারণ কোনো চুক্তি না থাকার পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
একইভাবে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত গঙ্গার মতো অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, শুধু কতটুকু পানি পাওয়া গেল, তা নয়—কখন, কী পরিমাণ পানি প্রয়োজন এবং নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজন কী, সেসবও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তিস্তা নিয়েও ড. আইনুন নিশাত টেকসই ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
৫৪ অভিন্ন নদী, সমাধান কূটনীতিতে: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী। ফলে গঙ্গা চুক্তির নবায়ন শুধু একটি নদীর পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভবিষ্যতের সব আন্তঃসীমান্ত নদীর ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, পানি সমস্যার সমাধান হতে হবে সংলাপ, আলোচনা, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের সংশ্লিষ্ট নীতির ভিত্তিতে। দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে যৌথ নদী কমিশনই প্রধান দ্বিপক্ষীয় কাঠামো।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিআইআইএসএসের ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে পুনর্বিবেচনা: যুব নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনারে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।’
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘দুই দেশের নেতৃত্ব, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং পানি আলোচনায় যুক্ত প্রতিনিধিদের মধ্যে আন্তরিকতা থাকলে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।’
পানি এখন জাতীয় নিরাপত্তারও প্রশ্ন: বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পানিসংকটের কারণ একক নয়। কোথাও ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলন, কোথাও নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া, কোথাও শিল্পদূষণ, আবার উপকূলে লবণাক্ততা—সবগুলো সমস্যা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরন ও নদীর প্রবাহেও পরিবর্তন আসছে। তাই পানির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে—দেশের ভেতরে পানির অপচয় ও দূষণ কমানো, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে পুনর্ভরণ বাড়ানো এবং অভিন্ন নদীগুলোর ন্যায্য ও পরিবেশসম্মত প্রবাহ নিশ্চিত করা।
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন চুক্তির উদ্যোগ, তিস্তা ও পদ্মায় বড় প্রকল্প এবং দেশের অভ্যন্তরে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করার কর্মসূচি—সবগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। পানি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে নদী, কৃষি, শিল্প, নগরায়ণ, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
কারণ পানির সংকট শুধু পানির সংকট নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত খাদ্য উৎপাদন, শিল্পায়ন, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকা। সেই কারণে পানি ব্যবস্থাপনায় আগামী দিনের সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিপথেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
পানি বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সমস্যাটি শুধু ‘কত পানি আছে’—এতটা সরল নয়। প্রশ্ন হলো, কোথায় পানি আছে, কখন আছে, পানি কতটা নিরাপদ এবং ভবিষ্যতের জন্য সেই পানি কীভাবে ধরে রাখা যাবে। এই চার প্রশ্নের সমন্বিত উত্তরই বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও ভোক্তাদের জন্য যৌক্তিক মূল্য নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। আমদানি ব্যয় কমাতে ফল ও খেজুরের শুল্ক যৌক্তিকীকরণ, ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ঋণের সুদহার কমানো এবং পণ্য পরিবহন ও খালাসের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজারে নিয়মিত নজরদারি থাকবে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের কনফারেন্স রুমে দ্য চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) আয়োজিত ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
রমজানের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘ভোজ্যতেল, চিনি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ পাইপলাইনে রয়েছে। এসব পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলার কার্যক্রমও স্বাভাবিক রয়েছে। রমজানসহ সারা বছর সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে।’
নিত্যপণ্যের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে আমদানি ব্যয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘ফলের প্রকৃত শুল্কহার ১২১ শতাংশ থেকে কমিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে। খেজুরের শুল্ক কমানোর বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যাংকঋণের সুদহার কমানোর বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
ফলের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘শুল্ক পরিশোধের পরও মাল্টা ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও প্রশাসনের অভিযানের পর দাম কমেছে। রমজানকে কেন্দ্র করে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা বরদাশত করা হবে না।’
সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় কমাতে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো ও পরিবহন প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশের লজিস্টিকস ব্যয় ১৬ শতাংশ থেকে কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। আমদানি, পণ্য খালাস ও পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
সভায় ব্যবসায়ী নেতারা রমজানে চাল, ডাল, ছোলা, গম, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ প্রধান ভোগ্যপণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। সিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘বাজারে কোনো কৃত্রিম সংকট হতে দেওয়া হবে না। পণ্য খালাস নির্বিঘ্ন রাখতে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।’
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালামও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রমজানে পণ্য আমদানি ও খালাসে সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাস্টমস, বন্দর ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রাপ্য প্লট দ্রুত নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। একই সঙ্গে অতীতে প্লট বরাদ্দে সংঘটিত অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে নতুন ভূমিনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের মাধ্যমে আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির চতুর্থ বৈঠকে এসব সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। বৈঠকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সার্বিক কার্যক্রম, চলমান আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে রাজধানীতে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ এবং আবাসিক এলাকায় অনুমোদন বহির্ভূত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়। রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের মাধ্যমে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে রাজউককে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়ণের লক্ষ্যে সমন্বিত ইউটিলিটি ব্যবস্থা ও ভূগর্ভস্থ ক্যাবল ব্যবস্থা, নতুন বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও নামাজের স্থান নিশ্চিতকরণ এবং ঢাকার লেক সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি ঢাকা শহরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করে কমিটি। এদিকে নিরীক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন ও অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয় বৈঠকে।
কমিটির সভাপতি নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, মোছা. তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন অংশ নেন। এ ছাড়া বৈঠকে হিসাব নিয়ন্ত্রক, রাজউক চেয়ারম্যান, সিএজি কার্যালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রয়াত শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আবরারের পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ আশ্বাস দেন। আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ, মা রোকেয়া খাতুন, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ, এক মামা ও এক চাচা এদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন। এসময় কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ, বুয়েটে আবরারের নামে হল নির্মাণ এবং নতুন প্রজন্মকে তার সম্পর্কে জানাতে পাঠ্যবইয়ে তার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানান আবরারের পরিবারের সদস্যরা। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব সুজন মাহমুদ এ তথ্য জানান।
সুজন মাহমুদ বলেন, ‘সাক্ষাতে আবরারের বাবা তার ছেলের হত্যা মামলার বিচারিকপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে রায় কার্যকরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চান।’
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। আদালত স্বাধীনভাবে বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন করবেন।’ তবে পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
আবরারের বাবা কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবিও জানান। তিনি বলেন, ‘ওই এলাকার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ সাঁকো দিয়ে নদী পারাপার করেন।’ প্রধানমন্ত্রী সেতু নির্মাণের বিষয়ে আশ্বাস দেন এবং সেটি আবরার ফাহাদের নামে করার প্রতিশ্রুতি দেন।
এ ছাড়া আবরারের কবর পাকাকরণ এবং পাশের মসজিদের নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য সহযোগিতা চান তার বাবা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মসজিদটির নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনা দেন।
সাক্ষাতে আবরার হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের বিষয়টিও তুলে ধরেন তার বাবা। তিনি জানান, মামলার একজন আসামি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর বিষয়টি পরিবারকে জানানো হয়েছিল। কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
আবরারের মা রোকেয়া খাতুন ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক ক্যাম্পাসের ছেলেমেয়েই আমার মতো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। আমি চাই, কোনো ক্যাম্পাসেই যেন আর আগের মতো পরিবেশ ফিরে না আসে। আমার মতো কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’
আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ প্রধানমন্ত্রীকে বুয়েট ক্যাম্পাসে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। তিনি বুয়েটে আবরার ফাহাদের নামে একটি হল নির্মাণ এবং পাঠ্যবইয়ে তার ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। নতুন প্রজন্মকে আবরারের মতো বিভিন্ন সময়ে নিহত ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানাতে তাদের একটি তালিকা তৈরিরও দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং এ নিয়ে কাজ চলছে।
সাক্ষাতের সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির উপস্থিত ছিলেন।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর আগের দিন ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে স্বাক্ষরিত কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতার সমালোচনা করেছিলেন তিনি। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ, ফেনী নদীর পানি ও গ্যাস রপ্তানি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন আবরার।
ওই পোস্টের জের ধরে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা তাকে হলে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং একপর্যায়ে মারধর করেন। পরে অচেতন অবস্থায় তাকে হলের সিঁড়িতে ফেলে রাখা হয়। পরে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। ৭ অক্টোবর আবরারের বাবা চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
তদন্ত শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলার রায়ে ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট ওই রায় বহাল রাখেন। পরে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা নয় আসামি আপিল বিভাগে আপিল করেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত একজন আসামিও লিভ টু আপিল করেন। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন।
কোরআন শিক্ষা ও ধর্মীয় চর্চার প্রসার, গণতন্ত্রে মতপার্থক্য ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরিবেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে তরুণদের মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বঙ্গভবনে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাতে কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হাফেজ, হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) প্রতিনিধিদল এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ আহ্বান জানানা রাষ্ট্রপতি।
আন্তর্জাতিক সাফল্যে কোরআন শিক্ষায় উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ: ৪৬তম কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক পবিত্র কোরআন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী বাংলাদেশি প্রতিযোগীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিশ্বের ১৩৩টি দেশের প্রতিযোগীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশি হাফেজদের সাফল্য দেশের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও আনন্দের বিষয়।’ তিনি বিজয়ী প্রতিযোগীদের পাশাপাশি তাদের শিক্ষক-উস্তাদ, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে অভিনন্দন জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কৃত কোরআনের হাফেজ ও শিক্ষার্থীদের সম্মানিত করার পাশাপাশি কোরআন শিক্ষা ও চর্চাকে আরও উৎসাহিত করতে সরকার কাজ করবে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়ন এবং হাফেজ-আলেমদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতেও সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।’
কোরআন শিক্ষা মিশন, বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাওলানা মো. বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন ১৫ পারা হিফজ, তাজবিদ ও সুন্দর তেলাওয়াত বিভাগে প্রথম স্থান অর্জনকারী আর রায়হান ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়া, তৃতীয় স্থান অর্জনকারী তানযীমুল উম্মাহ গার্লস হিফয মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হাফেজা রাবেতা বিনতে রমজান, ৩০ পারা হিফজ, তাজবিদ ও সুন্দর তেলাওয়াত বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী মারকাযুল মদীনা মাদ্রাসার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হাফেজ শেখ মো. মাহমুদুল হাসান (আশরাফী) এবং সাউদা বিনতে জামআ’হ রা. আন্তর্জাতিক বালিকা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হাফেজা মুসফিরা বিনতে মাহমুদ।
বিজয়ীদের অভিভাবক ও উস্তাদরা মাদ্রাসা-মক্তবসহ ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী শিক্ষার্থী, হাফেজ ও আলেমদের সম্মানিত করার জন্য সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান। তাদের মতে, এ ধরনের স্বীকৃতি কোরআন চর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষায় আরও উৎসাহ তৈরি করবে।
সাক্ষাৎ শেষে রাষ্ট্রপতি বিজয়ী হাফেজদের হাতে রাষ্ট্রপতির ক্রেস্ট এবং তাদের পরিবারের সদস্য ও উস্তাদদের সৌজন্য উপহার তুলে দেন। এ সময় রাষ্ট্রপতির সচিবরা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মতপার্থক্য ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য: হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এনামুল্লাহর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। এ সময় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘রাজনীতিতে মতপার্থক্য, গঠনমূলক সমালোচনা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ থাকবেই। এটিই গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিহিংসার রাজনীতি গণতন্ত্রের বিকাশকে ব্যাহত করে।’
একই সাক্ষাতে তরুণ প্রজন্ম এবং সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
সাক্ষাৎকালে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এনামুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক একাডেমিক কার্যক্রম সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৬০০ কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ, ছাত্রীদের আবাসন সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা কামনা করেন উপাচার্য।
রাষ্ট্রপতি এসব সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা দেশের উত্তরাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার প্রসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান। আসন্ন সমাবর্তনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণও গ্রহণ করেন তিনি।
সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব ও প্রেস সচিব এবং হাবিপ্রবির উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার ও রেজিস্ট্রার উপস্থিত ছিলেন।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিশ্চিতের আহ্বান: বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা নঈম জাহাঙ্গীরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে। এ সময় রাষ্ট্রপতি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ স্বীকৃতি ও মর্যাদা নিশ্চিত এবং মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য ও গৌরব সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘দেশের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ ও অবদান জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।’ তাদের সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ তালিকা প্রণয়ন ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সবাইকে দায়িত্বশীল ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করা উচিত নয়।’ জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দাবি ও কল্যাণসংক্রান্ত বিষয় রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরা হয়। তারা বিগত সময়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরির অভিযোগসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, আদর্শ ও চেতনা বিকৃত করার অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের নিজস্ব উদ্যোগে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আয়োজনের কথাও জানান।
প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক মেজর সৈয়দ মুনিবুর রহমান (অব.), সদস্য-সচিব সাদেক আহমেদ খান, সদস্য-সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ আবুল বাশার, সদস্য-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সিরাজুল হক, সদস্য-অর্থ সম্পাদক আলহাজ মো. মনসুর আলী সরকার, সদস্য-কল্যাণ ও সেবা সম্পাদক অনিল বরণ রায়, সদস্য-ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আলহাজ মো. নুরুল ইসলাম, সদস্য-ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির, সদস্য-দপ্তর সম্পাদক প্রকৌশলী জাকারিয়া আহমদ, ঢাকা মহানগর ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক মো. নুরুল বাসার এবং সদস্য-সচিব মিজানুর রহমান খান (বীর প্রতীক)।
এ সময় রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব ও প্রেস সচিব উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি তাদের বক্তব্য শোনেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ও মর্যাদা রক্ষায় উত্থাপিত বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা কারিগরি জটিলতা পেরিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমতি মিলেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করার পথ খুলে গেল। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, নির্ধারিত পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ হলে আগামী ডিসেম্বরের শেষ দিকে প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা) প্রথম ইউনিটের প্রথম নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার অনুমোদন দেয়।
বায়রা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযুক্ত করার আগে আরও দুটি অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটের স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ব্যবস্থার সেফটি ভালভ—প্রেসার অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি)—নিয়ে জটিলতার কারণে এতদিন অনুমোদন আটকে ছিল। রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল এসে কারিগরি সমস্যার সমাধানে কাজ করে। এরপর বিভিন্ন ধাপে ভালভটির পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
প্রথমে ১৬ মেগাপাসকেল চাপের পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়। পরে সর্বশেষ ১৮ মেগাপাসকেল চাপের নিরাপত্তা পরীক্ষাতেও সন্তোষজনক ফল পাওয়া যায়। এসব পরীক্ষার ফলাফল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনার পর ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
শুরু হবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া: ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে ধীরে ধীরে শক্তিস্তর বাড়িয়ে একটি স্থিতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করা হয়। তবে এটি সরাসরি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; বরং রিঅ্যাক্টরের বিভিন্ন ব্যবস্থা নিরাপদ ও নির্ধারিতভাবে কাজ করছে কি না, তা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির আগে ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে তার পূর্ণ নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করা হবে। এ সময় রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট সিস্টেমের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ দিন সময় লাগতে পারে। পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।
ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ শেষ হলে কেন্দ্রটি প্রবেশ করবে ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে। এ ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধীরে ধীরে বাড়ানোর পাশাপাশি টারবাইনকে জেনারেটরের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
এ জন্য কেন্দ্র পরিচালনাকারী সংস্থাকে বায়রার কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে। গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগে রিঅ্যাক্টর, টারবাইন, জেনারেটর ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সমন্বিত কার্যকারিতাও যাচাই করা হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন শুরুর পর প্রথমে কম ক্ষমতায় কেন্দ্রটি পরিচালনা করা হবে। পর্যায়ক্রমে উৎপাদন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ সক্ষমতায় নেওয়া হলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে। এরপরও কেন্দ্রটির বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখা হবে। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার পর কয়েক মাস পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলতে পারে।
দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানিও পৌঁছেছে: এদিকে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান গত শনিবার প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। ফলে প্রথম ইউনিটের পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের প্রস্তুতিও এগিয়ে যাচ্ছে।
রূপপুর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। দুটি ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতেও নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।
প্রথম ইউনিটের ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটির অনুমোদন তাই শুধু রূপপুর প্রকল্পের জন্য নয়, দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখন সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো পরবর্তী পরীক্ষাগুলো নিরাপদে সম্পন্ন করে নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করা।
বাংলাদেশে ফ্রি ট্রেড জোন ও রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) স্থাপনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসার জন্য আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের বন্দর অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার আধুনিকায়নে প্রতিষ্ঠানটির সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সচিবালয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান এসা কাজিমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক এ তথ্য জানান।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তি নিয়েও আলোচনা হয়।
চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এবং এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। এ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে টার্মিনালটির আধুনিকায়ন, পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দেশের বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ফ্রি ট্রেড জোন ও রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো স্থাপনসহ নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিদলের আগ্রহের কথা জানতে চান। জবাবে প্রতিনিধিদল এসব খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগের বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথা জানায়।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে ডিপি ওয়ার্ল্ডসহ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান। বৈঠকে বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, দক্ষ ও কার্যকর করার বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় হয়।
বিগত সময়ে বিদেশি সহায়তার সঠিক ব্যবহার হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তিনি বলেছেন, ধনী দেশগুলোও এখন তাদের আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে ইউনিসেফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ মন্তব্য করেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘গত ১৭ বছরের অনিয়ম-দুর্নীতি বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এসে বন্ধ করেছে। এ সরকার দুর্নীতি বন্ধ করে জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।’
সাক্ষাৎ শেষে ইউনিসেফ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জানান, বাংলাদেশের সব মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবেন তারা।
এ সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘সুপেয় পানি সরবরাহ করা তার মন্ত্রণালয়ের অন্যতম কাজ। কিন্তু উজানে পানি আটকে দেওয়ার কারণে নদীর পানি কমে যাচ্ছে, লবণাক্ততা বাড়ছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে সুপেয় পানির সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির ৪র্থ বৈঠক কমিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, মোছা. তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর সার্বিক কার্যক্রম, চলমান আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রাপ্য প্লট দ্রুত নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি অতীতে প্লট বরাদ্দে সংঘটিত অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। নতুন ভূমিনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের মাধ্যমে আবাসন সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।
রাজধানীতে অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ এবং আবাসিক এলাকায় অনুমোদনবহির্ভূত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের সুপারিশ করা হয়। রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের মাধ্যমে গ্রাহক হয়রানি বন্ধে নিয়মিত নজরদারি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে রাজউককে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরিকল্পিত ও টেকসই নগরায়নের লক্ষ্যে সমন্বিত ইউটিলিটি ব্যবস্থা ও ভূগর্ভস্থ ক্যাবল ব্যবস্থা, নতুন বাণিজ্যিক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও নামাজের স্থান নিশ্চিতকরণ এবং ঢাকার লেক সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি ঢাকা শহরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়।
বৈঠকে নিরীক্ষা কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন ও অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়।
বৈঠকে হিসাব মহা নিয়ন্ত্রক, রাজউক চেয়ারম্যান, সিএজি কার্যালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।