শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে সাধারণ বেসামরিক মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি, হামলায় কমপক্ষে দুই শতাধিক নিহতের ঘটনায় উত্তপ্ত সারা দেশ। এ পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে দেশজুড়ে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে কারান্তরীণ সব শিক্ষার্থীকে মুক্তি দেওয়ার ও সব হত্যাকাণ্ডের বিচার করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ আন্দোলন থামিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাদের সঙ্গে বসতে চেয়ে গণভবনের দরজা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী সমন্বয়কদের জন্য গণভবনের দরজা খুলে দিয়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সেই আলোচনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তারা জানিয়েছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের। পরে বিকালে শহীদ মিনারে শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষণাপত্র করে আজ রোববার থেকে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।
এ সময় নাহিদ বলেন, যে গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছে, এতে সব জনতা যোগ দিন। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে সম্মিলিত মোর্চা গঠন করব। আমরা আমাদের দেশের রূপরেখা ঘোষণা করব।
গত শুক্রবার থেকেই রাজধানীর অবস্থা ছিল থমথমে। ছুটির দিন হলেও হঠাৎ করেই সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রদান হয়ে যায় সীমিত। ঢাকাসহ সারা দেশে সরকারের মাত্র তিনজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে কথা বলতে দেখা যায়। বিপরীতে রাজধানীসহ সারা দেশে ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষিত কর্মসূচিতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের পেশাজীবী ও অভিভাবকদের সরব উপস্থিতি। এ অবস্থায় গতকাল শনিবার সকালে গণভবনে একদল পেশাজীবীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখান থেকে শিক্ষকদের জন্য ঘোষিত ‘প্রত্যয়’ কর্মসূচি বাতিল, কারাগারে পাঠানো সব শিক্ষার্থীকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশসহ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলোচনার প্রস্তাব দেন তিনি। তবে তার বক্তব্যের পরপরই কোটা আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এদিকে, গতকালও শিক্ষার্থীদের ঘোষিত আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি যোগ দিয়েছেন অভিভাবক, শিক্ষক ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। এমন অবস্থায় বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ পরিণত হয় জনসমুদ্রে। দুপুর থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে এসেছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। এছাড়া রাজধানীর সাইন্স ল্যাব, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, আফতাবনগর, প্রগতি সরণি, রামপুরা, শান্তিনগর, শনির আখড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষার্থীদের সমর্থনে বিক্ষোভে য়োগ দিয়েছে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে মহানগরী ঢাকা। সারা দেশেও চলে একই কর্মসূচি।
দেখা গেছে, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মানুষের ঢল নেমেছে শহীদ মিনারে। এতে শহীদ মিনার এলাকা ছাপিয়ে চাঁনখারপুল মোড়, দোয়েল চত্বর, জগন্নাথ হল মোড় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ রাসেল টাওয়ার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। তারপরও এসেছে আন্দোলনকারীদের মিছিল।
শনিবার দুপুর দেড়টা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দলে দলে যোগ দিতে থাকেন রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রিকশাচালক, সিএনজি অটোরিকশাচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ আন্দোলনে গতকালও সুশীল সমাজের বিপুল উপস্থিতির পাশাপাশি সাহিত্যিক, সংগীতাঙ্গনের বিভিন্ন শিল্পী এবং অভিনেতা-নির্দেশ-কলাকুশলীদের দেখা গেছে।
এর আগে সকাল সাড়ে ১১টায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শান্তি সমাবেশ শুরু করে শান্তিকামী চিকিৎসক ও নার্স সমাজ। তারা দুপুর ১টা পর্যন্ত অবস্থান করেন সেখানে। বিকালে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছে শহীদ মিনার ও আশপাশের এলাকা। শহীদ মিনারের আশপাশের সড়ক, ভবন ও দেওয়ালে বিভিন্ন দাবির কথা লিখতে থাকেন তারা। অনেকের হাতে ছিল বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড। তাদের সঙ্গে রয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরাও। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও বিক্ষোভ-স্লোগানে অংশ নিয়েছেন। অনেককে দেখা গেছে সন্তান-পরিবার নিয়ে এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে। সময় যত গড়িয়েছে সঙ্গে সঙ্গে সমাবেশে বেড়েছে মানুষের উপস্থিতি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে এসে অবস্থান নেন তারা। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শহীদ মিনার এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
এর মধ্যে আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ডেকে ডেকে ফ্রিতে পেয়ারা ও আমড়া বিতরণ করছেন এক ফল বিক্রেতা। এ ছাড়া এক নারীকে পানি বিতরণ করতে দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে সব ধরণের মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অবস্থান নেন।
শহীদ মিনার চত্বরে শিক্ষার্থীরা ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে,’ ‘জাস্টিস জাস্টিস উই ওয়ান্ট জাস্টিস,’ ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দিবো রক্ত,’ ‘স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে,’ ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো,’ ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর,’ বলে স্লোগান দিয়েছেন।
পরে বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একই সঙ্গে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, তাদের কাছে কী বিচার চাইব? তারাই তো খুনি। আমাদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গেছে। আপনাদের আন্দোলনের কারণে আমরা ছাড়া পেয়েছি। আজকেও গুলি চলেছে। এই পরিস্থিতিতে এক দফা ঘোষণা করছি। এই যে খুন-হত্যা হয়েছে, এজন্য তাকে পদত্যাগ করতে হবে এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই সরকারের লুটপাট-দুর্নীতির বিচার করত হবে। শুধু শেখ হাসিনা নন, সব মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে।
যে অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে এতে সব জনতা যোগ দিন। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে সম্মিলিত মোর্চা গঠন করব। আমরা আমাদের দেশের রূপরেখা ঘোষণা করব। আগামীকাল (রোববার) থেকে সারা দেশে অসহযোগ আন্দোলন হবে।
এ সময় নাহিদ ইসলাম ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। ঘোষণাপত্রে তিনি বলেন, যেহেতু বর্তমান সরকারের নির্দেশে নির্বিচারে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। নারী-শিশু-ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক কেউ এই গণহত্যা থেকে রেহাই পাননি।
যেহেতু, সরকার এই হত্যাযজ্ঞের বিচার করার পরিবর্তে নির্বিচারে ছাত্র-জনতাকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করছে।
যেহেতু, সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাযজ্ঞ সংঘটন করেছে।
যেহেতু, ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক-মজুরসহ আপামর জনগণ মনে করছে এই সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ বিচার এবং তদন্ত সম্ভব নয়।
সেহেতু, আমরা বর্তমান স্বৈরাচারী সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করছি।
একই সঙ্গে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি গ্রহণযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠনের দাবি জানাচ্ছি।
এর আগে দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে অবস্থান নেয় বিক্ষোভকারীরা। পরে মিরপুর ১০ নম্বর থেকে পল্লবী, আগারগাঁও, মিরপুর ১ নম্বর ও ১৪ নম্বরগামী যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ১০ নম্বরে বন্ধ রয়েছে দোকান-পাট। প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা বিক্ষোভ প্রদর্শন শেষে সড়ক ছেড়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্রে করে সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করে 'আমার ভাই মরল কেন'সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। তাঁদের অনেকের মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা ছিল। কারও কারও হাতে ছিল জাতীয় পতাকা।
১০ নম্বর গোলচত্বরের আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে আসার আগেই সেখানে বিপুলসংখ্যক পুলিশ অবস্থান নেয়। তবে দলে দলে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকলে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা মিরপুর ২ নম্বরে শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে অবস্থান নেয়। শুরুতে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিলেও পরে তারা সরে যান।
এছাড়া সকাল থেকে মিরপুর বাংলা কলেজের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়। আশেপাশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা অবস্থান নিলেও তারা মিক্ষার্থীদের বাধা দেয়নি। বন্ধ হয়ে যায় টেকনিক্যাল থেকে মিরপুর ১ নম্বর পর্যন্ত যান চলাচল।
এদিক, বেলা ১২টা থেকে আন্দোলনের সমর্থনে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে জড় হয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। আন্দোলনে সংহতি জানাচ্ছেন পথচারী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার জনগণ। সরকারবিরোধী নানা স্লোগানে শিক্ষার্থী হত্যার বিচার চান তারা। পুরো সায়েন্স ল্যাব এলাকায় আন্দোলনকারীদের অবস্থানে বন্ধ হয়ে যায় নিউ মার্কেট-সায়েন্স ল্যাব ও মিরপুর সড়ক।
আন্দোলনকারীরা দুপুর আড়াইটার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে রওনা হন। আন্দোলনকারীরা জানান, তাঁরা সায়েন্স ল্যাব থেকে নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হয়ে শহীদ মিনারে যাবেন। আন্দোলনকারীদের শহীদ মিনারে যাওয়ার জন্য রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ায় পুলিশ সদস্যরা। তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ‘ভুয়া ভুয়া’ বলে স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।
সকাল থেকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য অবস্থান করলেও আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের কাউকে এ এলাকায় অবস্থান করতে দেখা যায়নি।
অপরদিকে, আফতাবনগরে আন্দোলনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ইউআইটিএস ও সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অংশ নিয়েছেন। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রাজধানীর বাড্ডা রামপুরা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। বনশ্রী বি ব্লকের সামনে আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগন দিতে থাকেন। এ সময় অর্ধশতাধিক পুলিশ রাস্তা থেকে সরে যায়।
এছাড়া বেলা সাড়ে ১২ টার দিকে প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জড়ো হয় শিক্ষার্থীরা। বসুন্ধরা গেটের পাশে বিপুল পুলিশ অবস্থান নেয়।
শিক্ষার্থীরা বলেন, সারাদেশে ছাত্র-নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে খুনের প্রতিবাদ ও ৯ দফা দাবিতে সারাদেশে আমরা বিক্ষোভ মিছিল করবো। এরই অংশ হিসেবে আমরা একত্রিত হচ্ছি।
গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর প্রগতি সরণি, যমুনা ফিউচার পার্ক, বসুন্ধরা গেট এলাকায় পুলিশ সদস্যদের সর্তক অবস্থান নিতে দেখা যায়।
এদিকে, ঢাকার খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে রাজপথ ছেড়ে দিয়েছেন। ফিরে গেছেন সম্মান আর শ্রদ্ধা নিয়ে। আন্দোলনকারীরা জানান, আমরা ছাত্ররা প্রতিশোধপরায়ণ নই, আমরা অধিকারের দাবিতেই আজ রাজপথে, কেউই আমাদের শত্রু নন, সবাই আমরা এক দেশের নাগরিক। বরং দেশের স্বার্থে আমাদের যে আন্দোলন, তাতে যেই মিলে যাবে, তাকেই আমরা সাদরে বরণ করব, স্যালুট জানাব। পুলিশ সদস্যদের জানাচ্ছি, আপনারা অস্ত্র ছেড়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, জাতি আপনাদের আরও বেশি সম্মান করবে।
ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকটে ব্যাহত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার ও ওষুধের কাঁচামাল আমদানি নিয়ে বাংলাদেশ অনেকটা অস্বস্তিতে রয়েছে। এরই মধ্যে বিকল্প উৎসের সন্ধান খোঁজ করা শুরু করেছে। বিকল্প উৎসের সন্ধান না বের করতে পারলে কৃষি খাত ও ওষুধশিল্পে নেচিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এ যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) একলাখ টন করে মোট দুই লাখ টনের দুটি দরপত্র আহ্বান করেও তা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।
বিসিআইসি সূত্র জানায়, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে প্রথমে সব সার কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে শুধু শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি চালু করা হয়েছে। বাকি চারটি ইউরিয়া কারখানা এবং একটি করে ডিএপি ও টিএসপি উৎপাদনকারী কারখানা বন্ধ রয়েছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যে ইউরিয়া সারের দাম টনপ্রতি প্রায় ৩০০ ডলার বেড়ে এখন ৭০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ডিএপি ও টিএসপির দামও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। সম্প্রতি ৭০০ ডলার থেকে বেড়ে ডিএপির দাম ৮৫০ ডলার এবং ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে টিএসপির দাম ৬৫০ ডলারে উঠেছে। চীন রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে ইউরিয়া ও ডিএপির দাম বাড়ছে।
জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৬ লাখ টন ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বিসিআইসির নিজস্ব কারখানাগুলো থেকে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন উৎপাদনের চেষ্টা করা হয়। বাকি অংশ আমদানি করতে হয়। তবে গ্যাস সংকটের কারণে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেও পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া মিলিয়ে দেশে প্রতিবছর ৬০ লাখ টনের বেশি সারের চাহিদা রয়েছে, যার বেশিরভাগই ব্যবহৃত হয় বোরো ও আমন মৌসুমে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকল্প উৎসগুলোতেও সংকট রয়েছে। চীন আপাতত সার রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। তারা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিজেদের ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেবে, এরপর সুযোগ থাকলে রপ্তানি করবে। অন্যদিকে রাশিয়া থেকে সার আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাংলাদেশ সরাসরি সেখান থেকেও আমদানি করতে পারছে না।
বিসিআইসি সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটি ইউরিয়া আমদানির জন্য নিবন্ধিত ১৭ জন সরবরাহকারীকে সুযোগ দিয়ে থাকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এসব সরবরাহকারী নির্ধারিত সময়ে সার সরবরাহ করতে পারবে কিনা—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ কারণে আগের দরপত্র বাতিল করে এখন উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যাতে বিশ্বের যেকোনো দেশের সরবরাহকারী এতে অংশ নিতে পারে।
বাংলাদেশ মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সার আমদানি করে। কাতার ও আমিরাত থেকে ইউরিয়া এবং সৌদি আরব থেকে ইউরিয়া ও ডিএপি আমদানি করা হয়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনে জটিলতা তৈরি হওয়ায় সরকার বিকল্প উৎস থেকে বেশি পরিমাণ সার আমদানির কথা ভাবছে। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে চীন, মিসর ও রাশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ বিবেচনায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মধ্যে রাশিয়া বৈশ্বিক বড় সরবরাহকারীদের অন্যতম হিসেবে উঠে এসেছে।
বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আমাদের নির্ধারিত সরবরাহকারীদের সক্ষমতা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তাই আগের টেন্ডার বাতিল করে নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে, যাতে বিকল্প উৎসের সরবরাহকারীরা অংশ নিতে পারে।
তিনি বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে সারের সংকট হবে না। তবে জুনে শুরু হওয়া আমন মৌসুমের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে ইউরিয়া আমদানি নিশ্চিত না হলে কৃষিতে প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের নিজস্ব সার কারখানাগুলোর মধ্যে বর্তমানে শুধু শাহজালাল ফার্টিলাইজার চালু রয়েছে। অন্যগুলো উৎপাদনে নেই। তাই এখনই সারের মজুত বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে এবং সে অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য সব বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করা যায় কিনা—তা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি যোগ করেন, আমরা একটি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছি, যাতে যেকোনো সরবরাহকারী অংশ নিতে পারে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক অনেক প্রতিষ্ঠান সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে—তাদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, সারের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া কারখানার জন্য গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা আবেদন করেছি। আশা করছি আগামী সপ্তাহের মধ্যে কারখানাটি চালু করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সরকারের জিটুজি চুক্তি রয়েছে। তারা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশকে তিন লাখ টন সার সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য জাহাজ চলাচলের অনুমতিসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া বাংলাদেশকেই সম্পন্ন করতে হবে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে বিকল্প উৎস খোঁজার নির্দেশ :
মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান যুদ্ধাবস্থা ও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে দেশে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাঁচামাল আমদানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে ওষুধ শিল্প সমিতিকে আমদানির ক্ষেত্রে একক কোনো অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বৈশ্বিক এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশের ওষুধ উৎপাদন যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ওষুধ তৈরির প্রধান উপাদান ‘অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট’ (এপিআই) আমদানিতে চীন ও ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য সম্ভাব্য দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে ওষুধ শিল্প সমিতিকে অনুরোধ করেছে সরকার।
গত ২৪ মার্চ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার ফলে সম্ভাব্য স্বাস্থ্য ঝুঁকির আগাম প্রস্তুতি’ বিষয়ক এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
সভায় গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব দেশের ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দ্রুত এপিআই আমদানির বিকল্প উৎস বা দেশ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষের অবসান ঘটিয়ে বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারের মাসিক ভাড়া (মিটার চার্জ) প্রত্যাহার করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রোববার (২৯ মার্চ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
খুব দ্রুতই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ নিয়ে গ্রাহকদের মাঝে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরণের অস্বস্তি ও অসন্তোষ বিরাজ করছিল। বিষয়টি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। একটি গ্রাহকবান্ধব বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য, আর সেই লক্ষ্যেই আমরা এই মিটার চার্জ পদ্ধতিটি পুরোপুরি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
বর্তমানে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী প্রত্যেক গ্রাহককে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ‘মিটার ভাড়া’ হিসেবে গুনতে হয়। গ্রাহকদের মূল অভিযোগ ছিল— মিটারের নির্ধারিত দাম পরিশোধ হয়ে যাওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে এই চার্জ কেন নেওয়া হচ্ছে। এই চার্জ বাতিলের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন ও দাবি জানিয়ে আসছিল। সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে গ্রাহকদের মাসিক বিদ্যুৎ খরচ কিছুটা হলেও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতার মধ্যেও দেশে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে নতুন ইতিহাস গড়েছে। চলতি মার্চের প্রথম ২৮ দিনে দেশে প্রবাসীরা ৩৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলার বা ৩.৩৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা দেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ।
এর আগে গত বছরের মার্চে একক মাসে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ২৮ মার্চ পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ৩৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি। গত বছরের এই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এছাড়া চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৫৭৮ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের এই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ১৬৯ কোটি ডলার।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য আমাদের প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস। যুদ্ধের কারণে এসব দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আতঙ্কে রয়েছেন। ফলে কেউ কেউ জমানো অর্থ দেশে পাঠিয়ে থাকতে পারেন। আবার প্রবাসীরা রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে পরিবারের খরচ মেটাতে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে থাকেন। এসব কারণেই প্রবাসী আয় বাড়ছে। রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, অর্থ পাচার ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আবার ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ ঠেকাতে বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান রয়েছে। এতে হুন্ডি প্রবণতা কমে যাওয়ায় বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়ছে।
এদিকে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির ওপর ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার দিন শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪.৯৯ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ২৯.২৯ বিলিয়ন ডলার। গত ১৬ মার্চ শেষে রিজার্ভ ছিল ৩৪.২২ বিলিয়ন ডলার। বিপিএম-৬ পদ্ধতি অনুযায়ী ছিল ২৯.৫২ বিলিয়ন ডলার।
গ্যাস সংকট, বন্ধ কারখানা এবং আর্থিক চাপ-এই তিন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে এক সময় স্থবির হয়ে পড়েছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নেতৃত্ব, সুপরিকল্পিত উদ্যোগ এবং ধারাবাহিক সংস্কারের ফলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর পথে এগোচ্ছে। নতুন শিল্পপ্রকল্প স্থাপন, বন্ধ কারখানা চালু, প্রশাসনিক সংস্কার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে বিসিআইসিকে একটি আধুনিক ও লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে।
১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং-২৭ এর আওতায় প্রতিষ্ঠিত বিসিআইসি দীর্ঘদিন ধরে ইউরিয়া সার উৎপাদন, সার আমদানি ও বিপণনের মাধ্যমে দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। তবে দীর্ঘদিন গ্যাস সংকটের কারণে বিসিআইসির বেশ কয়েকটি ইউরিয়া সার কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, ফলে উৎপাদন হ্রাসের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক চাপের মুখে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ১৮ মে মো. ফজলুর রহমান বিসিআইসির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে একাধিক উদ্যোগ নেয়া হয়। তার উদ্যোগে এবং শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমানের সার্বিক সহযোগিতায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে পুনরায় গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এর ফলে ২০২৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পর্যায়ক্রমে এসব কারখানা পুনরায় উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করে।
একই সঙ্গে বিসিআইসির বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্থলে নতুন শিল্পপ্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন কারখানার খালি জায়গা ও অব্যবহৃত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে সার, কেমিক্যাল, গ্লাস, ফাইবার ও ও ফার্মাসিউটিক্যাল উপকরণসহ বিভিন্ন ধরনের ১১টি শিল্পপ্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিসিআইসির অব্যবহৃত জমি ও সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন, আবাসিক ভবন, গুদাম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে ‘বিসিআইসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা-২০২৫’ প্রণয়ন ও গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর গত নয় মাসে বিসিআইসির ৩০৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা কর্মীদের মধ্যে নতুন কর্মউদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।
২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের উদ্যোগের অংশ হিসেবে শ্যামপুরে নির্মিত আধুনিক কেমিক্যাল গুদাম ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন প্রশাসনিক কাঠামো গঠন এবং জনবল সৃজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দীর্ঘদিন ধীরগতিতে চলা ৩৪টি বাফার সার গুদাম নির্মাণ প্রকল্পেও চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে নতুন গতি এসেছে। ইতোমধ্যে অধিকাংশ গুদামের জন্য জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে এবং কয়েকটি গুদামের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এতে সার সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে বিসিআইসি চিকিৎসা কেন্দ্র আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জরুরি চিকিৎসা সেবার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়, ফিজিওথেরাপিস্ট ও প্যাথলজিস্ট নিয়োগ এবং শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্ৰ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আইসিটি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে বিসিআইসি মসজিদের সংস্কার (রিনোভেশন) কাজও সম্পন্ন করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান জানান, বিসিআইসি ভবিষ্যতে একটি আধুনিক, দক্ষ ও লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের শিল্পখাতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আরও ৫০ হাজার টন ডিজেল আমদানির জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতকে প্রস্তাব দিয়েছে বিপিসি। এরই অংশ হিসেবে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও ৭ হাজার টন ডিজেল আসছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান। গত শনিবার (২৮ মার্চ) গণমাধ্যমকে তিনি এ কথা জানান।
বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘ভারতের নুমালীগড়ে পাইপে প্রেস করা শুরু হয়েছে। ২৯ মার্চ ভারত থেকে ৭ হাজার টন ডিজেল আসছে পাইপলাইনে।’
এর আগে গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালে বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন দিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে পৌঁছায় ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল। গত ২৪ মার্চ ভারতের আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি কেন্দ্র থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে রেলহেড ওয়েল ডিপোতে ৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ শুরু হয়। প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের রিসিপ্ট টার্মিনালে ডিজেল পৌঁছায়। এই জ্বালানি তেল পাইপলাইন থেকে পৌঁছানোর পর পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানিতে সরবরাহ করা হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানায়, ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর ভারতের সঙ্গে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর আট জেলায় চাষাবাদের সেচ এবং যানবাহনের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার জন্য পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
চলতি বছরের জন্য ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আগামী চার মাসের মধ্যে ওই পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত আরও ৫০ হাজার টন ডিজেল আমদানির জন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতকে প্রস্তাব দিয়েছে বিপিসি।
সম্প্রতি হামে আক্রান্ত হয়ে ১০০ শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দুই মন্ত্রীকে সারাদেশ ঘুরে পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
তিনি বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রীকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, সংসদীয় কমিটির বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ব্রিফ করেছে। সেখানে হামে আক্রান্ত হয়ে ১০০ শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। দুজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন সারাদেশ ঘুরে পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিতে।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর খবর আসছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই (রামেক) হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত তিন মাসে ৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বিদ্যমান করহার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে একটি সমন্বিত কৌশল নির্ধারণ করেছে সরকার।
রোববার রাজধানীর আগারগাঁও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। এ অর্থ ব্যয় করা হবে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী শাসনামলের রেখে যাওয়া ‘ধ্বংসপ্রাপ্ত’ অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ কর-জিডিপি অনুপাতের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল দেশের অন্যতম।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারের লক্ষ্য বর্তমান মেয়াদে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে পৌঁছানো। সরকার কথার বদলে পরিসংখ্যান দিয়ে সাফল্য প্রমাণ করতে চায় বলেও জানান তিনি।
চলতি চতুর্থ প্রান্তিকে রাজস্ব আহরণ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, ‘এ অর্জনের মাধ্যমে সরকার অতিরিক্ত দেশীয় বা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্ষম—এ নিয়ে জনমনে যে সংশয় রয়েছে, তা দূর হবে।’
সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম মূল উপাদান হিসেবে করহার না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদের পরিমাণ বাড়ানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এ ক্ষেত্রে কর ফাঁকি প্রতিরোধ, এসআরও সংস্কৃতি বিলুপ্ত করা, ডিজিটালাইজেশন, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং টাস্কফোর্স গঠনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাড়তি রাজস্ব ব্যবহার করে সরকার ফ্যামিলি কার্ডসহ যুগান্তকারী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি ইমাম, মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের জন্য সহায়তা কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তা উদ্যোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।
এ ছাড়া জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সরকার পরিচালন ব্যয়ের পরিবর্তে মূলধনী ব্যয়ে (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি—এডিপি) অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর আওতায় জ্বালানি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিম্ন ও নিন্ম মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার দুটি প্রধান পথে এগোচ্ছে—কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত সংস্কার।
জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো খাতে করের অর্থ ব্যয় নিশ্চিত করা হবে, যাতে নাগরিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে উৎসাহিত হন—বলেন তিনি।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ১৮০ দিন, এক বছর ও পাঁচ বছরের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। অন্তর্বর্তীকাল থেকে নির্বাচিত সরকারের দিকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলাই লক্ষ্য, যা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে মো. আব্দুর রশীদ মিয়ার নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। নিয়োগ দেওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায় গত শনিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তার নিয়োগ আদেশ বাতিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গত রোববার বিষয়টি জানা গেছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২৪ মার্চের প্রজ্ঞাপনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে মো. আব্দুর রশীদ মিয়ার নিয়োগের আদেশটি বাতিল করা হলো। এলজিইডির সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ মিয়ার অবসরোত্তর ছুটি স্থগিতের শর্তে এক বছরের চুক্তিতে তাকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দিয়েছিল সরকার।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন আব্দুর রশীদএলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন আব্দুর রশীদ
কেন আব্দুর রশীদের নিয়োগ আদেশ বাতিল করা হয়েছে সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে কিছু বলা হয়নি। তবে এই কর্মকর্তাকে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে এ নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনা হয়। তিনি ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও সুবিধাভোগী ছিলেন বলে কেউ কেউ অভিযোগ করেন।
রাজধানীর শ্যামপুরে ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা সংঘর্ষে শেখ ফরিদ (৫০) নামে একজন নিহত হয়েছেন। রোববার বেলা দেড়টার দিকে শ্যামপুর বাজার ইকোপার্কের পাশের রাস্তায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। মুমূর্ষু অবস্থায় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসক বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ফরিদের বাড়ি লক্ষ্মীপুর চন্দ্রগঞ্জ থানার বালাশপুর গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত ওবায়দুল্লাহ। বর্তমানে থাকতেন রাজধানীর কদমতলী পলাশপুর এলাকায়। ভ্যানে করে ট্রাউজার বিক্রি করতেন তিনি।
হাসপাতালে মৃত শেখ ফরিদের মামা সোয়াইব মোর্শেদ জানান, মালামাল কিনতে কদমতলী থেকে সিএনজি অটোরিকশা করে কেরানীগঞ্জ যাচ্ছিলেন তিনি। পথে শ্যামপুর বাজারে একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন ফরিদ। তখন পথচারীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসক মৃত বলে জানান।
কদমতলী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুসাহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, দুপুরে শ্যামপুর বাজার ইকোপার্কের পাশে ট্রাক-সিএনজি সংঘর্ষ হয়। এতে অটোরিকশার এক যাত্রী ঢাকা মেডিকেলে মারা গেছেন। আহত সিএনজিচালক একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এই ঘটনায় ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। তবে চালক পালিয়ে গেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিনকে ডিএমপি গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র করা হয়েছে। গত শনিবার ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার এক আদেশে নাসিরুদ্দিনকে ডিএমপির পরিবহন বিভাগ থেকে বদলি করে মুখপাত্র করেন।
একই আদেশে ডিএমপির উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়াকে ডিএমপির পরিবহন বিভাগের উপকমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিএমপির পি অ্যান্ড আর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ওয়াহিউল ইসলামকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগে বদলি করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সংসদে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণে নিরপেক্ষতা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সংসদ কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের কেন্দ্র।
গতানুগতিক ধারার বাইরে এবারের সংসদকে ‘মজলুমদের সংসদ’ ও ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি সংবিধান ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী সংসদ পরিচালনার ঘোষণা দেন। আজ রোববার (২৯ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি বৈঠক শুরু হয়। এ বৈঠকে প্রথমবারের মতো সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বক্তব্যের শুরুতে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নির্বাচনী এলাকা কলমাকান্দা-দুর্গাপুরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ডেপুটি স্পিকার। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং আজ তিনি ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে স্বীকৃত।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানকে গণতন্ত্রের নতুন দ্বার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম আকরাম ও মীর মুগ্ধসহ সকল শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে জনগণের শক্তিই গণতন্ত্রের প্রকৃত ভিত্তি। আজকের এই সংসদ অসংখ্য পঙ্গুত্ব বরণকারী এবং নির্যাতিত মানুষের ত্যাগের ফসল।
সংসদ পরিচালনায় পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে ডেপুটি স্পিকার ঘোষণা করেন, আমি ইতোমধ্যে সরকার এবং দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছি। স্পিকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমি প্রতিটি সদস্যের অধিকার, মর্যাদা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিতে কাজ করব।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর আদর্শের কথা উল্লেখ করে তিনি সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, আমি সঠিক থাকলে আপনারা সাহায্য করবেন, আর ভুল করলে শুধরে দেবেন। কারণ এই সংসদে আমার চেয়ে অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান অনেকে আছেন।
এবারের সংসদের বিশেষত্ব তুলে ধরে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, এই সংসদ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। এখানে কেউ এসেছেন ফাঁসির মঞ্চের কন্ডেম সেল থেকে, কেউ এসেছেন আয়নাঘর থেকে, কেউ দীর্ঘ নির্বাসন থেকে, আর কেউ এসেছেন গুম-নির্যাতনের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে। আমরা সবাই এখানে মজলুম হিসেবে সমবেত হয়েছি।
বিখ্যাত আইনবিদ এভি ডাইসির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। সরকার বা জনগণ—সবাইকে আইনের অধীনে থাকতে হবে। যুক্তরাজ্যে পড়াশোনার সুবাদে আমি ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলের গণতন্ত্র সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছি এবং সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করব।
বক্তব্যের শেষে তিনি জাতীয় স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গঠনমূলক সমালোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ হবে জাতির দর্পণ এবং আমাদের লক্ষ্য হবে জনগণের কল্যাণ ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে মাসিক ভাড়া বা মিটার চার্জ প্রত্যাহার করা হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
রোববার (২৯ মার্চ) সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, প্রিপেইড মিটারে চার্জ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ ছিল। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছি। গ্রাহকবান্ধব বিদ্যুৎ সেবা নিশ্চিত করতে আমরা দ্রুতই এই মিটার চার্জ পদ্ধতি তুলে দিচ্ছি।
বর্তমানে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকদের প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা মিটার ভাড়া হিসেবে দিতে হয়। অনেক গ্রাহক অভিযোগ করে আসছিলেন, মিটারের দাম উঠে যাওয়ার পরও বছরের পর বছর এই ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও এই চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছিল।
বর্তমানে প্রিপেইড মিটারে প্রতি কিলোওয়াটে মাসিক ডিমান্ড চার্জ ৪২ টাকা এবং সিঙ্গেল ফেজে মিটার ভাড়া ৪০ টাকা। এই চার্জের সঙ্গে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হয়।
দেশের ১১ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি বর্তমানে দায়িত্বরত ১১ জেলা প্রশাসককে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
রোববার (২৯ মার্চ) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসকরা হলেন, রাজশাহীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কাজী শহিদুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লুৎফুন নাহার, খুলনায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের হুরে জান্নাত, মাদারীপুরে অর্থ বিভাগের উপসচিব মর্জিনা আক্তার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরকারি প্রিন্টিং প্রেসের উপপরিচালক আবু সাঈদ, চাঁদপুরে জ্বালানি ও খানিজ সম্পদ বিভাগের আহেমদ জিয়াউর রহমান, হবিগঞ্জে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জি এম সরফরাজ, নরসিংদীতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ইসরাত জাহান কেয়া, মেহেরপুরে সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের শিল্পী রানী রায়, লালমনিরহাটে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বিভাগের রাশেদুল হক প্রধান, বান্দরবানে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের সানিউল ফেরদৌস।