শিল্প খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন নবনিযুক্ত শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। একই সঙ্গে গ্যাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, চামড়া ও সার কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
শনিবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
এসময় তিনি অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে থেকে গণ-আন্দোলনে ছাত্র-জনতার যে ম্যান্ডেট সেটা নিয়েই সাধ্যমতো কাজ করার পাশাপাাশি ‘সব কাজই চ্যালেঞ্জিং, দেখি কতটুকু করা যায়’ বলেও জানিয়েছেন।
আদিলুর রহমান খান বলেন, ‘অগ্রাধিকার হিসেবে আমাদের গ্যাসের সমস্যা রয়েছে, ক্ষুদ্র শিল্প নিয়ে কিছু পরিকল্পনা আছে। পরিবেশবান্ধব কাজ করার বিষয়ে চেষ্টা থাকবে। যেমন সাভারে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। জাহাজশিল্প নিয়েও আলোচনা করেছি। আমরা প্রতিদিনই বসব। কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা করা দরকার করব। এখানে একটি চমৎকার টিম রয়েছে তারা খুবই অ্যাক্টিভ। আমরা চেষ্টা করে যাব আপনারা সব সময় আমাদের সহযোগী হিসেবে পাবেন।’
শিল্পের কোন বিষয়ে জোর দেওয়া হবে এবং চামড়াশিল্পে যে সংকট সেটা কাটানোর জন্য কী উদ্যোগ নেবেন এমন প্রশ্নের জবাবে আদিলুর রহমান খান বলেন, ‘আজকে (গতকাল) আমার প্রথম দিন। আমি কৃতজ্ঞ ছুটির দিনেও আমার সহকর্মীরা এসেছেন। আমাদের যেসব খাতে সমস্যা বা চ্যালেঞ্জ আছে সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে আমাদের গ্যাসের সংকটের জন্য গত ছয় মাস আমাদের চারটি সারকারখানা বন্ধ ছিল। শুধু ঘোড়াশাল সারকারখানা উৎপাদনে আছে। চামড়া খাতকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গ্যাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, চামড়া ও সার কারখানাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে সব কাজই চ্যালেঞ্জিং, দেখি কতটুকু করা যায়।’
লোকসানের বিষয় কী পদক্ষেপ নেবেন, ‘গ্যাস সংকট সমাধানে কী পদক্ষেপ নেবেন জানতে চাইলে আদিলুর রহমান খান বলেন, ‘আমরা এসব বিষয় জানতে পেরেছি, আলোচনা করেছি, এ ব্যাপারে যতদূর সম্ভব কাজ করব। সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে সার আমদানিতে। যাতে কৃষকদের কোনো সমস্যা না হয়। গ্যাসের জন্য এ সমস্যাটা না হয়। এর ফলে শিল্পের যে লোকসান হয় সেটা কমে যাবে।’
দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে শিল্প উপদেষ্টা বলেন, ‘এত মানুষের রক্তের ওপর দিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা দায়িত্বে এসেছি। এখানে দুর্নীতির বিষয়ে আমাদের কঠোর হওয়া ছাড়া উপায় নেই। অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে থেকে গণ-আন্দোলনে ছাত্র-জনতার যে ম্যান্ডেট সেটা নিয়েই সাধ্যমতো কাজ করব। দুর্নীতির বিষয় তো প্রশ্নই আসে না। আমরা সবাই একটা টিম আপনারাও এর একটা অংশ। সবাই মিলে কাজ করলে আমরা সব কিছু ওভারকাম করতে পারব।’
‘আমাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স থাকবে। আমাদের টিম এ বিষয়ে সজাগ থাকবে। আমাদের কাছে যা অন্যায় অবিচারে অভিযোগগুলো এসেছে ভবিষ্যতে যাতে এ বিষয়ে ব্যতিক্রম হয় সেজন্যই আমাদের দায়িত্বে আসা’- যোগ করে বললেন শিল্প উপদেষ্টা।
দেশের দ্বিতীয় রপ্তানি খাত চামড়াশিল্পের বিদ্যমান সংকট কাটাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা জানতে চান এক সাংবাদিক। এ প্রসঙ্গে শিল্পসচিব জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাতে আমাদের যেসব চ্যালেঞ্জ আছে, সমস্যা আছে; সেগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করব।’ এ বিষয়ে উপদেষ্টা নির্দেশনা দিয়েছেন। আপনারা জানেন, গ্যাসের প্রাপ্যতা না থাকায় ছয় মাস ধরে আমাদের সারকারখানাগুলো বন্ধ। শুধু ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া প্রকল্প এখন উৎপাদনে আছে। এ ছাড়া চামড়া শিল্পনগরীর বিষয়গুলো আছে; এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ঠিক করে আগামীকাল থেকেই পুরোদমে কাজ শুরুর জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন উপদেষ্টা।’
সরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণ মানুষের আশার শেষ আশ্রয়স্থল। বিশেষ করে ঢাকার বড় বড় সরকারি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী আসেন জীবন বাঁচানোর প্রত্যাশায়। কিন্তু সেই হাসপাতালে পা রাখতেই তাদের মুখোমুখি হতে হয় এক অদৃশ্য দেয়ালের-যার নাম ‘দালালচক্র’। এটি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত, শক্তিশালী ও অশুভ সিন্ডিকেট, যা বছরের পর বছর ধরে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে ভেতর থেকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। সাধারণ রোগীর পকেট থেকে টাকা হাতানো থেকে শুরু করে ভুল চিকিৎসার ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়া-সবই এই চক্রের প্রতিদিনের রুটিন।
রাজধানীর শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেক), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল বা বক্ষব্যাধি হাসপাতাল-প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের আঙিনায় দালালদের বিচরণক্ষেত্র। ভোর ৬টা থেকেই এদের তৎপরতা শুরু হয়। এদের কাজের ধরন বেশ বৈচিত্র্যময়।
প্রথমত, তারা সহজ-সরল ও গ্রাম থেকে আসা রোগীদের টার্গেট করে। অনেক রোগী জানেন না কোন বিভাগে ডাক্তার দেখানো হয়, কোথায় ভর্তি হতে হয় বা পরীক্ষার প্রক্রিয়া কী। এই অজ্ঞতাকে পুঁজি করে দালালরা তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ভান করে। কিন্তু সাহায্য নয়, বরং এটি হয় শোষণের শুরু।
দ্বিতীয়ত, ‘বেড নেই’ কিংবা ‘ডাক্তার নেই’—এই ভীতি প্রদর্শন। জরুরি বিভাগে কোনো রোগী আসার পর তাকে বলা হয়, সরকারি হাসপাতালে সিট খালি নেই বা ডাক্তার এখন দেখবে না, ২-৩ দিন সময় লাগবে। এই ভীতি শুনে আতঙ্কিত স্বজনরা যখন দিশেহারা, তখন দালালরা তাদের প্রস্তাব দেয় পাশের কোনো বেসরকারি ক্লিনিকে দ্রুত ভর্তির। সেখানে দালালদের কমিশন নিশ্চিত।
তৃতীয়ত, রক্ত ও পরীক্ষার বাণিজ্য। হাসপাতালে বিনামূল্যে পরীক্ষার সুবিধা থাকলেও দালালরা রোগীদের বুঝিয়ে নিয়ে যায় বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে পরীক্ষার খরচ দ্বিগুণ বা তিনগুণ। রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হলে টাকার বিনিময়ে দালালরা রক্তদাতা সরবরাহ করে, যেখানে অনেক সময় রক্তদাতার শারীরিক অবস্থা বা রোগের ইতিহাস পরীক্ষা করার কোনো বালাই থাকে না।
সিন্ডিকেটের মূলে কারা’ দালালরা একা এই অপকর্ম করতে পারে না। তাদের পেছনে রয়েছে এক বিশাল নেটওয়ার্ক। হাসপাতালের ভেতরে অসাধু কর্মচারী, ওয়ার্ড বয়, এমনকি কিছু নিরাপত্তা কর্মী বা আনসার সদস্যের সঙ্গে তাদের সখ্যতা ওপেন সিক্রেট। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালের অনেক কর্মচারী মাসিক বেতনের বাইরে দালালদের কাছ থেকে বড় অংকের কমিশন পায়।
উদাহরণস্বরূপ, ঢামেক বা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া হুইলচেয়ার বা ট্রলি মেলে না। যেখানে সরকার প্রতিটি সেবার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা করেছে, সেখানে এই কর্মচারীরা ট্রলিকে নিজেদের সম্পদ বানিয়ে ফেলেছে। যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা ওয়ার্ড বয় হাসপাতালের সেবা দেওয়ার কথা, তারাই এখন রোগীর কাছ থেকে বখশিশ বা উৎকোচ আদায়ের প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেসরকারি হাসপাতালের দায় ও অশুভ আঁতাত: ঢাকার শ্যামলী, মহাখালী বা মিরপুরের মতো এলাকায় সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে শত শত বেসরকারি ক্লিনিক। এদের অনেকেরই নেই কোনো বৈধ অনুমোদন। এই ক্লিনিকগুলোর ব্যবসা টিকে আছে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার ওপর ভিত্তি করে।
এ অবস্থায় সাধারণ রোগীরা বলেছেন, দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে শুধু নির্দেশনার কালি নয়, প্রয়োজন কঠোর হাতের প্রয়োগ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক হাসপাতালের করিডোরগুলোতে, আর দালালের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হোক মানুষের জীবন।
পরীক্ষা ও রক্তের বাণিজ্য: হাসপাতালে বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও দালালদের মাধ্যমে রোগীদের নিয়ে যাওয়া হয় বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে, যেখানে পরীক্ষার খরচ কয়েক গুণ বেশি। এমনকি রক্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তারা গড়ে তুলেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অসাধু চিকিৎসক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সিন্ডিকেট কমিশনের লোভে রোগীদের অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে থাকে, যা চিকিৎসা ব্যয় আকাশচুম্বী করে দেয়।
‘অ্যাম্বুলেন্স চক্র’ : অ্যাম্বুলেন্স সেবাx দালাল, হাসপাতাল সিন্ডিকেট এবং অনিয়ন্ত্রিত ভাড়ার চক্রে বন্দি। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘অ্যাম্বুলেন্স চক্র’ বা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে রোগী ও তাদের স্বজনরা মারাত্মকভাবে জিম্মি। এই সিন্ডিকেটের আওতাভুক্ত না হলে কোনো চালক রোগী আনা-নেওয়া করতে পারে না। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে জরুরি ভিত্তিতে রোগী বহনকারী অনেক অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে রোগী আনতে পারলেও নিয়ে যেতে পারে না। এতে চরম বিপদে পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। সিন্ডিকেটের কারণে রোগীকে বাড়তি টাকাও গুনতে হয়।
দেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মুমূর্ষু এক রোগীকে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে ঢাকায় আসেন স্বজনরা। উদ্দেশ্য রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান-পঙ্গু হাসপাতাল। অ্যাম্বুলেন্স থামল। চালক রোগীকে জরুরি বিভাগে নামিয়ে দেন। পরে তিনি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষমাণ রোগীর খোঁজ করছিলেন। রোগীর স্বজনদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে দরকষাকষিও করছিলেন। হঠাৎ কয়েকজন তরুণ ‘হাসপাতাল আঙিনা থেকে কোনো রোগী নিতে পারবেন না’ বলে তাকে বাধা দেন। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করতেও চাপ দিতে থাকেন তারা। চালক যেতে দেরি করলে উত্তেজিত তরুণরা তার সঙ্গে মারমুখী আচরণ করতে থাকেন। দ্রুত চলে না গেলে অক্ষত অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যেতে পারবে না বলে শাসান।
জানতে চাইলে ঢাকার বাইরে থেকে আসা চালক অভিযোগ করেন, প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূর থেকে তুলনামূলক কম ভাড়ায় একজন গরিব রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি। ইচ্ছা ছিল ফিরতি ট্রিপে কোনো রোগী পেলে গন্তব্যে পৌঁছে দেবেন। তাতে আগের কম ভাড়াও সমন্বয় হবে। কিন্তু এখানকার (হাসপাতাল আঙিনা) অ্যাম্বুলেন্স মালিক-চালক সিন্ডিকেটের বাধায় সম্ভব হচ্ছে না। এখন আমাকে খালি অ্যাম্বুলেন্স নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে। রাস্তায় তো আর রোগী দাঁড়িয়ে থাকে না যে তাকে তুলে নেব।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু পঙ্গু হাসপাতালই নয়, রাজধানীতে নামিদামি সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কেন্দ্র করেই এমন সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। বাইরে থেকে আসা কোনো অ্যাম্বুলেন্স ফিরতি ট্রিপে হাসপাতালের রোগী নিতে দেন না ঢাকার চালকরা। এমনকি হাসপাতাল আঙিনায় দাঁড়াতেও দেন না। নিজেদের অ্যাম্বুলেন্সে যেতে রোগীদের বাধ্য করেন। ইচ্ছামতো ভাড়া নেন। বাইরে থেকে আসা কোনো অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিতে চাইলে অন্য পরিবহনে হাসপাতাল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে লুকিয়ে উঠতে হয়। ঢাকা মেডিকেল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল, মিটফোর্ড, মুগদা মেডিকেলসহ একাধিক হাসপাতাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
চালক-মালিকদের কথা:
রাজধানীকেন্দ্রিক অ্যাম্বুলেন্সচালকরা বলছেন আবার ভিন্নকথা। তারা জানান, বর্তমানে এক লিটার অকটেন ১২৫, প্রতি লিটার ডিজেল ১২০, সিএনজি ৪৩, এলপিজি ৬৫ এবং ৫ লিটার মবিল ২৪০০ থেকে ৩৪০০ টাকা। এক জোড়া নতুন চাকার দাম ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। চাকা মেরামত, এয়ার, মোবিল, এসি, অক্সিজেন ফিল্টারসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ মাসে ২০ হাজার। এর বাইরে চালক-সহকারীর থাকাখাওয়া, মাসিক বেতন ও ওভারটাইম দিতে হয়। ফলে বাইরের অ্যাম্বুলেন্সকে হাসপাতালের রোগী নিতে দেওয়া না।
অন্যদিকে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্সচালকরা অভিযোগ করেন, ঢাকায় রোগী নিয়ে এলেও খালি হাতে ফিরতে হয়। অ্যাম্বুলেন্সে রোগী না থাকলেও সড়ক-মহাসড়ক, সেতু, ফ্লাইওভার, টানেল ও এক্সপ্রেসওয়েতে টোল (পথশুল্ক) দিতে হয়। ফলে তারা চাইলেও ভাড়ার অঙ্ক কমাতে পারেন না। দিনশেষে রোগীদের পকেট থেকেই এই টাকা যায়। বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিআরটিএ-এর নিবন্ধনভুক্ত অ্যাম্বুলেন্স ৮ হাজারের মতো। এর মধ্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে আছে প্রায় ২ হাজার। ঢাকা মহানগরীতে আছে আড়াই হাজার।
অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস খসড়া নীতিমালা-২০২৩ অনুযায়ী কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত অ্যাম্বুলেন্সে মহানগরীর মধ্যে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া সর্বোচ্চ ৬০০ টাকার কথা উল্লেখ আছে। মহানগরীর বাইরে প্রথম দুই কিলোমিটারে ভাড়া সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটার ৬০ টাকা। কিন্তু এই খসরা নীতিমালার কথা কেউ মানছে না।
ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, বাইরের অ্যাম্বুলেন্স যেমন ঢাকার হাসপাতালে রোগী আনবে, তেমনিভাবে হাসপাতাল থেকে রোগী পরিবহনেরও অধিকার রাখে। কিন্তু একটি সিন্ডিকেটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া উচিত। দেশে প্রয়োজনের দশভাগের একভাগ অ্যাম্বুলেন্স আছে জানিয়ে তিনি বলেন, যেগুলো আছে সেগুলোর অর্ধেকই অকেজো বা অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে। সিন্ডিকেট যার সুযোগ নিচ্ছে। তাই রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত ও আইসিইউ সংবলিত অ্যাম্বুলেন্স বাড়ানো দরকার। অ্যাম্বুলেন্সে টোল ফ্রি করা, বিএআরটিএ কর্তৃক আট সিট অনুমোদন এবং অকটেন, সিএনজির দাম কমানো জরুরি। তাতে ভাড়ার অঙ্ক কমবে।
ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমবায় সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. লিটন মিয়া বলেন, ঢাকার অ্যাম্বুলেন্স জেলা-উপজেলায় গেলে স্থানীয় চালকদের বাধায় ফিরতি ট্রিপে রোগী আনতে পারে না। ফলে ঢাকার চালকদের একটি অংশ বাইরের চালকদের বাধা দেয়। আমাদের কমিটির মেয়াদে অনেকবার বিষয়টা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। এর আগে অ্যাম্বুলেন্স মালিকরা ধর্মঘটে যায়। ওই সময় বিআরটিএ, ঢাকা মেট্রোপলিটন (ট্রাফিক), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিসসংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নীতিমালা-২০২৩ খসড়া তৈরি হলেও গেজেট হয়নি। খসড়ায় নির্ধারিত ভাড়ায় রোগী পরিবহণ নিশ্চিতের কথা বলা আছে।
চক্রের দৌরাত্ম্য: সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের সামনে সক্রিয় দালালরা নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স নিতে বাধ্য করে। তারা বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালের সাথে কমিশন বাণিজ্যে জড়িত।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়: নির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা না থাকায় চালকরা মনগড়া ভাড়া আদায় করে। বিশেষ করে আইসিইউ বা লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া রোগীদের নাগালের বাইরে থাকে।
নিম্নমানের সেবা: অনেক অ্যাম্বুলেন্সে জীবন রক্ষাকারী পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত কর্মী থাকে না।
কৃত্রিম সংকট তৈরি: প্রায়ই রোগীকে সময়মতো অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় দেরি করিয়ে দিয়ে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এই চক্রের মূল কারসাজি: নির্ধারিত ভাড়ার হারের তোয়াক্কা না করে মনগড়া ও কয়েকগুণ বেশি ভাড়া আদায় করা হয়। অনেক সময় চিকিৎসার খরচের বড় একটি অংশই চলে যায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়ায়।
বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে নিষেধাজ্ঞা: হাসপাতাল চত্বরে অন্য কোনো জেলার বা বাইরের সাশ্রয়ী অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে দেওয়া হয় না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে কোনো অ্যাম্বুলেন্স আনলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা রোগী ও চালককে লাঞ্ছিত বা মারধর পর্যন্ত করে।
কর্মচারী ও দালালদের যোগসাজশ: হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মচারী ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশে এই চক্রটি পরিচালিত হয়। এমনকি মর্গ থেকে মরদেহ ছাড়ানোর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি: অনেক সময় সাধারণ মাইক্রোবাস বা পুরোনো গাড়ি মেরামত করে ‘অ্যাম্বুলেন্স’ স্টিকার লাগিয়ে রাস্তায় নামানো হয়, যা যাত্রাপথে প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে।
কমিশন বাণিজ্য: প্রতিটি অপারেশন বা রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে দালালরা খরচ বাবদ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পায়।
অশুভ আঁতাত: নেপথ্যে কারা: অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। দালালরা একা এই অপকর্ম করতে পারে না। তাদের পেছনে রয়েছে এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। হাসপাতালের ভেতরেই অসাধু কর্মচারী, ওয়ার্ড বয়, এমনকি কিছু নিরাপত্তা কর্মী বা আনসার সদস্যের সঙ্গে তাদের সখ্যতা ওপেন সিক্রেট। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ট্রলি বা হুইলচেয়ারকে নিজেদের সম্পদ বানিয়ে এই চক্রটি রোগীকে সেবা দেওয়ার নামে উৎকোচ আদায় করে। ঢাকার শ্যামলী, মহাখালী বা মিরপুরের মতো এলাকাগুলো যেন এই দালালদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান অ্যাম্বুলেন্স। যেটি সরকারি এবং বেসরকারিভাবে রয়েছে। দুঃখজনক হলো, সরকারি-বেসরকারি চালক ও মালিকদের মধ্যে সমন্বয় নেই। সরকারের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল ও জায়গায় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা রাখা। যাতে রোগীরা সহজে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল বা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে। এছাড়া বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সুষ্ঠু নীতিমাল করতে হবে। দেশের মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য কী পরিমাণ অ্যাম্বুলেন্স দরকার, তার বেজলাইন সার্ভে করতে হবে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। না হলে রোগীদের সরকারি-বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের কাছে জিম্মি থাকতে হবে।
অভিযানের সীমাবদ্ধতা ও আইনের ফাঁকফোকর: র্যাব ও পুলিশের নিয়মিত অভিযানে নিয়মিত দালাল আটক হলেও, অবস্থার তেমন পরিবর্তন হচ্ছে না। ভ্রাম্যমাণ আদালতের স্বল্পমেয়াদি দণ্ড বা জরিমানা কোনোভাবেই যেন তাদের নিবৃত্ত করতে পারছে না। জেল থেকে বের হয়েই তারা পুনরায় একই পেশায় ফিরে আসছে। আইনের এই সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দালালদের মনে ভয়ের পরিবর্তে তৈরি হয়েছে এক ধরণের স্পর্ধা।
রাজধানীর ৩ হাসপাতালে র্যাবের অভিযান, দালাল চক্রের ১১ সদস্য আটক: রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে দালালদের তৎপরতা বন্ধ, রোগীদের হয়রানি রোধ এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে অভিযান চালিয়েছে র্যাব-২। গত ২৯ জুন এই তিন হাসপাতালে অভিযানে দালাল চক্রের ১১ সদস্যকে আটক করা হয়। এর আগে ঢাকা মেডিকেল ও বক্ষব্যাধি হাসপাতালে সাঁড়াশি অভিযানে একসাথে ৪৯ দালাল আটক হয়।
র্যাব বলছে, গ্রাম থেকে চিকিৎসা নিতে আসা সহজ-সরল রোগী ও তাদের স্বজনদের দীর্ঘদিন ধরে টার্গেট করে আসছিল দালাল চক্র। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিলো সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল।
র্যাব-২ উপঅধিনায়ক নিফাজ রহমান জানান, এই তিন প্রতিষ্ঠান থেকে রোগী ভাগিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশনভিত্তিক বাণিজ্য করে আসছিল চক্রটি। শুধু তাই নয়, রোগী ও তাদের স্বজনদের বিভ্রান্ত করে হাতিয়ে নিতো মোটা অঙ্কের অর্থ।
শুধু দালাল চক্র নয়, রোগীদের ভাগিয়ে যেসব ভুঁইফোড় ক্লিনিক ও হাসপাতালে পাঠানো হয়, সেগুলোর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়েছেন অভিযান পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী তামজীদ আহমদ।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দদুলাল সাহা জানান, হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হবে আইনানুগ ব্যবস্থা।
সমাধানের পথরেখা: নির্দেশনার বাইরেও যা প্রয়োজন: স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ গত ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে দালাল নির্মূলে ৭ দফা নির্দেশনা জারি করেছে। এর মধ্যে হুইলচেয়ার ও ট্রলি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ইউনিফর্মধারী কর্মী ছাড়া অন্যদের হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু নির্দেশনার কালিতেই কি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সমস্যার মূল উৎপাটনে প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য মূলত ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট এবং সুশাসনের অভাবের লক্ষণ।
তাদের মতে, দালাল চক্র নির্মূল করতে কেবল অভিযান বা ধরপাকড় যথেষ্ট নয়; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ এবং রোগীদের কাউন্সেলিংয়ের ওপর জোর দিতে হবে। সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, পুলিশ প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই অভিশাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। এটি কেবল একজন মন্ত্রী বা একজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনের দাবি রাখে। দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল হোক দালালমুক্ত, প্রতিটি দরিদ্র রোগী পাক তার প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা—এটিই আমাদের আগামীর বাংলাদেশের প্রত্যাশা।
একটি শিশু জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার নামে তৈরি হবে একটি ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডি’ নম্বর। ওই একটি মাত্র আইডির আওতায় জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন নাগরিকের সব ধরনের সরকারি তথ্য ও সেবা থাকবে। ফলে আলাদা আলাদা আইডি ব্যবহার বা বিভিন্ন দপ্তরে বারবার তথ্য দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের চিন্তার ফসল ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগের আওতায় এটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা।
সরকারের পরিকল্পনায় থাকা এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে নাগরিকদের জন্য একটি সিঙ্গেল ইউনিফায়েড আইডি চালু করা, যার মাধ্যমে ডিজিটাল ও ফিজিক্যাল উভয় ধরনের সরকারি সেবা সহজে ও ভোগান্তিহীনভাবে গ্রহণ করা যাবে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার এমন একটি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে একজন মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব তথ্য একটি নির্দিষ্ট ডিজিটাল আইডির অধীনে থাকবে, যা দিয়ে সব ধরনের সরকারি সুবিধা ভোগ করা যাবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি বর্তমানে ড্রাফট বা ধারণাপত্র (কনসেপ্ট পেপার) পর্যায়ে রয়েছে। ধারণাপত্র অনুমোদনের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রকল্পের ধারণাপত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিটির প্রধান ও আইসিটি বিভাগের যুগ্মসচিব মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ উদ্যোগটি এখন প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। একটি কনসেপ্ট পেপার তৈরি হয়েছে এবং এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
তিনি বলেন, জন্ম নিবন্ধন, এনআইডি, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য তথ্যসহ সবকিছুকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একজন নাগরিক একটিমাত্র আইডির মাধ্যমেই সব ধরনের সরকারি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
আইসিটি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগের জন্য তৈরি কনসেপ্ট পেপার অনুমোদন হলে, সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন শুরু হবে। বর্তমানে এটি ড্রাফট স্টেজে রয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই থেকে প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগ ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই বাস্তবায়নের মূল কাজ শুরু হবে।
তার ভাষ্য, কনসেপ্ট পেপারে আড়াই থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পটির রোলআউট শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটি আরও দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
জন্মের পরই তৈরি হবে ডিজিটাল আইডি: পরিকল্পনা অনুযায়ী, হাসপাতালে কোনো শিশুর জন্ম হলে তার তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্ম নিবন্ধন ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে নবজাতকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল আইডি তৈরি হবে। আর যদি কোনো শিশু বাসায় জন্ম নেয় তার জন্য আইডি তৈরির আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। পরে ওই একটিমাত্র আইডিই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্টসহ সব ধরনের সরকারি সেবার জন্য ব্যবহৃত হবে।
এক প্ল্যাটফর্মে সব তথ্য: প্রকল্পের আওতায় জন্ম নিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য তথ্য, শিক্ষা, ভূমি সেবা, বিআরটিএসহ বিভিন্ন সরকারি ডাটাবেজকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, নির্বাচন কমিশন, বিটিআরসি এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
কনসেন্ট ছাড়া তথ্য শেয়ার হবে না: প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে থাকলেও নাগরিকের অনুমতি (কনসেন্ট) ছাড়া কোনো তথ্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেয়ার করা হবে না। এটি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (পার্সোনাল ডেটা প্রটেকশন অ্যাক্ট) এবং জাতীয় ডেটা গভর্নেন্স আইনের নীতিমালা অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করা হবে। উদাহরণ হিসেবে তারা বলেন, কোথাও শুধু বয়স যাচাই প্রয়োজন হলে পুরো ব্যক্তিগত তথ্য নয়, নাগরিকের সম্মতির ভিত্তিতে শুধু বয়স সংক্রান্ত তথ্যই শেয়ার করা যাবে।
থাকবে ডিজিটাল আইডি ওয়ালেট: পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি স্মার্টফোনভিত্তিক ডিজিটাল ওয়ালেট থাকবে। এই ওয়ালেটে ব্যক্তির পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ক্রেডেনশিয়াল ও সরকারি ডকুমেন্ট সংরক্ষিত থাকবে। সরকারি বিভিন্ন ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনে লগইন, পরিচয় যাচাই কিংবা প্রয়োজন হলে ফিজিক্যাল আইডির বিকল্প হিসেবেও এটি ব্যবহার করা যাবে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি আপাতত পেমেন্ট ওয়ালেট নয়, বরং আইডি ও ডকুমেন্ট ওয়ালেট হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হবে।
এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুরের মডেল অনুসরণ: সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটির নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও কাজ চলছে। এস্তোনিয়া ও সিঙ্গাপুরের ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেন্টিটি মডেল পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
ডি-স্টার প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন: সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উদ্যোগটি আপাতত ‘ডি-স্টার’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাক্সেস অ্যান্ড রিজিলিয়ান্স (ডি-স্টার, D-STAR) বিশ্বব্যাংক সমর্থিত একটি প্রকল্প, যার আওতায় দেশের সরকারি ডিজিটাল সেবাগুলো আধুনিকায়নের কাজ চলছে।
তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন নাগরিকের সব সরকারি পরিচয়, সনদ ও ডিজিটাল সেবাকে একটি একক ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনা সম্ভব হবে। ফলে সরকারি সেবা গ্রহণ হবে আরও সহজ, দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত।
প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে সংযোগ (কানেক্টিভিটি), ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই), ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ইলেকট্রনিকস উৎপাদন শিল্প– এই চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি বলেছেন, আগামী মাস থেকেই দেশের প্রথম ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হবে। এর আওতায় ‘এক নাগরিক, এক ডিজিটাল আইডি, এক ডিজিটাল ওয়ালেট’ কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রত্যেক নাগরিক একটি ডিজিটাল পরিচয় পাবেন এবং ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে সরাসরি ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ভোটার হওয়ার সময়সীমা বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগে নতুন ভোটার হওয়ার শেষ সময় ছিল ৩০ জুন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ সময়সীমা বাড়িয়ে আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত করা হয়েছে। চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন—স্থানীয় সরকারের এই চার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনের জন্য আলাদা চারটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে নির্বাচন কমিশন।
চলতি জুলাই মাসের মধ্যেই এসব রোডম্যাপ চূড়ান্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
নির্বাচন কমিশনার জানান, ইসির কর্মকর্তারা একটি সুনির্দিষ্ট চার্ট বা রোডম্যাপ প্রস্তুত করেছেন। সেখানে কোন কাজ কখন সম্পন্ন করতে হবে, তা উল্লেখ রয়েছে। কোন সময় পর্যন্ত ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করা যাবে, সেটিও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩১ জুলাই পর্যন্ত যারা নতুন ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন, তাদের সবাইকে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যুক্ত করা হবে। এর ফলে তারা আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, নতুন ভোটার হওয়ার সময়সীমা আগে ৩০ জুন পর্যন্ত ছিল। সেটি বাড়িয়ে ৩১ জুলাই পর্যন্ত করা হয়েছে। যদি অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়, তাহলে সময়সীমা কিছুটা বাড়াতে কোনো অসুবিধা নেই। বর্ধিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে প্রয়োজন হলে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যাও বাড়াতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছে ঢাকার ফ্রান্স দূতাবাস। শুক্রবার (৩ জুলাই) দূতাবাসের এক বার্তায় উল্লেখ করা হয়, এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
এ প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী গড়ে তুলেছে এবং বাংলাদেশের শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
এ উপলক্ষে ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সফরকালে ফরাসি লেখক এবং ফ্রান্সের প্রথম সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আন্দ্রে মালরোর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফরের কথাও স্মরণ করা হচ্ছে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের একজন দৃঢ় আন্তর্জাতিক সমর্থক হিসেবে মালরোর সেই সফর আজও ফ্রান্স ও বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সহযোগিতাকে ফ্রান্স অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং দুই দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছে।
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষ বিদায়ে অংশ নিতে তেহরান সফররত জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ গভীর শোক ও সংহতি প্রকাশ করেছেন। শুক্রবার (৩ জুলাই) তেহরানে ইরানের পার্লামেন্ট বা ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে তিনি এই বার্তা প্রদান করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন খামেনির মৃত্যুকে ‘নৃশংস হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা জানান এবং এই কঠিন সময়ে ইরান সরকার ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের অটুট বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেন।
বৈঠকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, ইরান ও বাংলাদেশের মধ্যে শতাব্দী প্রাচীন এক নিবিড় সাংস্কৃতিক ও আত্মিক সম্পর্ক বিদ্যমান। তিনি জাতীয় শোকের এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে ভ্রাতৃপ্রতিম ইরানিদের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এছাড়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক শান্তি সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে স্পিকার গালিবাফের যে গঠনমূলক ভূমিকা ছিল, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং বাংলাদেশ এই শান্তি প্রক্রিয়ায় সবসময় সমর্থন দিয়ে যাবে।
ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ বাংলাদেশের স্পিকার ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং খামেনির শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বৈঠকে হাফিজ উদ্দিন আহমদ ইরানের স্পিকারকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। এর আগে তেহরান বিমানবন্দরে পৌঁছালে বাংলাদেশের এই প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান ইরানের ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজী বাবাই।
উল্লেখ্য যে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক ভয়াবহ সামরিক হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে। খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের এই উচ্চপর্যায়ের অংশগ্রহণ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতাকেই প্রকাশ করছে। স্পিকারের এই সফর ইরানের বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জোরালো নৈতিক সমর্থনেরই এক বহিঃপ্রকাশ।
বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ১৫০ জন অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত (চাকরিচ্যুত) অফিসারকে পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত বুধবার (১ জুলাই) প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর চাকরিতে বঞ্চনা, অবিচার ও প্রতিহিংসার শিকার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত, অপসারণকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও বরখাস্তকৃত অফিসারদের আবেদন পর্যালোচনাপূর্বক সুপারিশ পেশের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি এবং বাহিনীর সদর দপ্তরগুলোর পর্ষদ্গুলোর প্রস্তাব ও সুপারিশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে’ এ আদেশ জারি করা হয়েছে।
আদেশের আওতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ২১ জন এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ১৪ জন অফিসারকে তাদের যোগ্যতানুযায়ী স্বাভাবিক অবসর, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতিসহ স্বাভাবিক অবসর, অকালীন (বাধ্যতামূলক) অবসর বা পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিধি অনুযায়ী তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা, আর্থিক সুবিধা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনাও দেওয়া হবে।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, বাংলাদেশের মাটি প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হোক, সেটা আমরা চাই না। একইসঙ্গে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিবেশীরা নাক গলাক, সেটাও চাই না। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
চিফ হুইপ বলেন, ভারতে যে হারে মসজিদ ভাঙা হয়। বাংলাদেশে কি সে হারে মন্দির ভাঙা হয়? প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর ভারত কীভাবে নিয়েছে, সেটা তাদের কর্মকাণ্ডে নজর দিলেই সবাই বুঝতে পারবে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে দেশ বাঁচানোর প্রকল্প আখ্যা দিয়ে চিফ হুইপ বলেন, উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ যাতে কৃষিকাজে প্রয়োজনীয় পানি পায় সেজন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বাজেট নিয়ে তিনি বলেন, সরকারের দেয়া বাজেটকে বিরোধীদলও গ্রহণ করেছে। তাই এ বাজেট বাস্তবায়নে দলমত নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা চাই।
চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, বর্তমান সরকারের প্রণীত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তনের এক অনন্য দলিল। স্বাধীনতার পর এমন জনকল্যাণমুখী ও জীবন ঘনিষ্ঠ বাজেট আর কখনও প্রণীত হয়নি।
চিফ হুইপ বলেন, এ বাজেট জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে এটা মানুষের বাজেট, জনবান্ধব বাজেট এবং জনগণের কল্যাণ ও তাদের বাঁচিয়ে রাখার বাজেট।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। একদিনে ডলারের দাম ৭ টাকা বেড়েছে, কয়েকটি ব্যাংক মারাত্মক সংকটে পড়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে হাজার হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতের অনিয়ম, আর্থিক বিশৃঙ্খলা ও মেগা প্রকল্পের নামে দুর্নীতির প্রভাব এখনো অর্থনীতিতে রয়ে গেছে। এ কারণেই সরকার কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনপ্রিয় মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে জীবনমুখী পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প গ্রহণ করেছেন। পদ্মা ব্যারেজ ও তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে কৃষিতে পানির নিশ্চয়তা এবং দেশের পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। এগুলো শুধু প্রদর্শনমূলক প্রকল্প নয়, মানুষের প্রয়োজন পূরণের প্রকল্প।
চিফ হুইপ বলেন, এছাড়া ২৫ কোটি গাছ রোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, কৃষক কার্ড, পরিবার কার্ড, নারীদের জন্য বিশেষ কার্ড, প্রবাসী সেবা এবং স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো—কোনো মানুষ যেন না খেয়ে না থাকে, মানুষের জীবনমান উন্নত হয় এবং তারা স্বাবলম্বী হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এই প্রথম বিরোধী দল বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আগাম অংশগ্রহণ করেছে। বিরোধী দলকে মোট ২৬ শতাংশ সময় বরাদ্দ দেওয়া হলেও আমরা সময় বাড়িয়ে দিয়েছি এবং তারা প্রায় ৩১ শতাংশ সময় বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছে।
চিফ হুইপ বলেন, বিরোধী দলীয় নেতার অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে সাইকেলের ওপর প্রস্তাবিত কর প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন, যা সরকার ও বিরোধী দলের সম্মিলিতভাবে দেশ গড়ার আন্তরিক মানসিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে নূরুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের ৬৩টি আইটেমে কোনো কর বৃদ্ধি করা হয়নি। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় প্রায় ৫০ লাখ ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মায়েদের আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, সংবিধান সংশোধনের কোনো বিকল্প নেই। যে কোনো ধরনের সংস্কার আনতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। আশা করি আমরা সবাই মিলে এই সংশোধনী আনতে পারব।
তিনি দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে রিজার্ভ কমতে কমতে ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছিল। আর সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দেয়। তবে বর্তমান সরকারের আমলে টাকা পাচার বন্ধ থাকায় এবং প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় থাকায় টানা ৪৫ মাস পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফের ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রিজার্ভ রেখে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলারে আনা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। এর ফলে ফিরবে টেকসই অর্থনীতি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ।
মধ্যপ্রাচ্যের বড় সংকটের মধ্যেও দেশে প্রবাসী আয় আসায় নতুন রেকর্ড হয়েছে। গত ১২ মাসে প্রবাসীরা প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় পাঠিয়েছেন। প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেরও উন্নতি হয়েছে। এখন ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ আছে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বৈধ উপায়ে দেশে পাঠানোকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনা ২.৫ শতাংশ করেছে সরকার। জনমানুষের সার্বিক জীবনমান উন্নয়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক আয় বৈধ উপায়ে দেশে আনার লক্ষ্যেই এই প্রণোদনা দেওয়া হয়।
সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুসারে- মোট (গ্রস) রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৪৮০ বিলিয়ন (৩২,৪৭৯.৮৮ মিলিয়ন) ডলার।
চলতি মাসের শুরুতে, ১ জুন মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী ছিল ৩০ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক মাসেই মোট রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২০২২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সবেশেষ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ছিল। তবে আমদানি ব্যয় পরিশোধের চাপের কারণে পরদিনই রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়।
২০২২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছিল ৩৬ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে। ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি বিল পরিশোধে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডলার বিক্রি করায় রিজার্ভে এই পতন ঘটে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় মোট রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী তখন রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডলারের বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক করা হয়। পাশাপাশি প্রবাসী আয় বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং আমদানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধও পর্যায়ক্রমে শিথিল করা হয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়তে শুরু করে।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী তা ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। এরপর ধারাবাহিকভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা ফেরার ফলে রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ফিরেছে।
দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল ২০২১ সালের আগস্টে। তবে অনিয়ন্ত্রিত অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন কারণে রিজার্ভ ক্রমশ কমে গিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় তা নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।
সূত্র জানিয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বলা চলে তলানিতে নেমে গিয়েছিল। আমদানির আড়ালে প্রতি মাসেই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হতো। রেমিট্যান্স কমে গিয়েছিল হুন্ডি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায়। ফলে প্রতি মাসেই যে পরিমাণ রপ্তানি ও রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন উৎস থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ আহরণ করত, আমদানিসহ বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় হতো তার চেয়ে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে প্রতি মাসেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এক বিলিয়ন ডলার করে ক্ষয় হয়ে যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, হুন্ডি প্রতিরোধ ও টাকা পাচার বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরো বাড়বে। এতে স্থিতিশীল থাকবে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী গণমাধ্যমকে বলেন, প্রবাসী আয় বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হুন্ডিতে অর্থ আসা কমে যাওয়া। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হতো। এছাড়া বৈধ ও অবৈধ পথে ডলারের দামের পার্থক্য কমে এসেছে। পাশাপাশি বৈধ পথে আয় পাঠানো ও গ্রহণ সহজ হয়েছে। ফলে প্রবাসী আয় আসা বেড়েছে। প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক ধারা দেশের রিজার্ভে পড়েছে। এর ফলে টেকসই অর্থনীতি ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ফেরাতে এ রিজার্ভ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও একমত পোষণ করে বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহের বৃদ্ধি রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ডলার সংকটের সময় ব্যাংকগুলোর এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল, তা এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতি সচল হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার এমন এক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ এবং এমনকি প্রতিটি প্রাণীও নিরাপদে থাকবে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কক্ষে আয়োজিত এক সভায় (জুম প্ল্যাটফর্ম) বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কালকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর পাশাপাশি কবির স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালকে ‘নজরুল সিটি’ ঘোষণার সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার কাছে মনে হয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলেন ‘বাংলাদেশের মন’। তিনি আজীবন সাম্যের গান গেয়েছেন, যেখানে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টানের কোনো ভেদাভেদ নেই। বর্তমান সরকারও এমন এক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করছে, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ এবং এমনকি প্রতিটি প্রাণীও নিরাপদে থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল অতীত ইতিহাস নন, তিনি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস। তিনি আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ।
তিনি বলেন, প্রতিটি রাষ্ট্র এবং সমাজে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ জন্ম নেন, যারা আমাদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক জীবন কিংবা আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক দর্শন ও আমাদের মনোজগতে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। কবি নজরুল তেমনই একজন ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব। কৈশোর থেকে পরিণত বয়স, আমাদের জীবনের সব পর্যায়েই তার প্রভাব অপরিসীম।
কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করে তারেক রহমান বলেন, বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, বিরহের কবি, তারুণ্যের কবি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয়, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তার আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো।
তিনি বলেন, পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার, তথা যা কিছু অন্যায়, অবিচার ও অসুন্দর, তার বিরুদ্ধে কবির কলম ছিল শাণিত অস্ত্র। বিপ্লব, বিদ্রোহ কিংবা রণ-সংগীত, ইসলামী তাহজিব তমদ্দুন কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের গান অথবা ভজন-কীর্তন কিংবা শ্যামা সংগীত, প্রেম, প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ, কৈশোরের আনন্দ কিংবা যৌবনের উন্মাদনা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল প্রকাশ ছিল শুদ্ধ।
মাতৃভূমিকে ভালোবাসার ক্ষেত্রেও কাজী নজরুল ইসলাম অন্যতম প্রধান দিশারি এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের জীবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য তার রচনার মধ্যে মহিমাময় হিসেবে উচ্চারিত হয়েছে। কবি নজরুলের সৃষ্টিশীলতার মধ্যে আতিথ্য রয়েছে সব কালের, সব মানুষের।
তিনি বলেন, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা। তার প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজন ফুরানোর নয়।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার কবিতা ও গান যেমন ছিল অনুপ্রেরণার প্রবল উৎস, তেমনি আমাদের সব আন্দোলন-সংগ্রামে তার সৃষ্টিশীলতাই হয়ে ওঠে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মূল ভাষা।
তিনি বলেন, শুধু অতীত ইতিহাস নয়, বর্তমান প্রজন্মের জন্য, এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নজরুল আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক। এ কারণেই আমাদের জাতীয় কবির জীবন ও কর্মের সঙ্গে, গণমানুষ বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক আরও গভীর ও নিবিড় করার লক্ষ্যে নানা আয়োজনে নজরুল বর্ষ শুরু হয়েছে।
তিনি নজরুল বর্ষ উদযাপনে উপস্থিত সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, আজকের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, নজরুল গবেষক এবং নজরুল সংগীত শিল্পী যারা উপস্থিত রয়েছেন, সবাইকে অভিনন্দন।
তিনি অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে নজরুল গবেষক ও নজরুলপ্রেমীদের প্রাধান্য দেওয়ার ইঙ্গিত করে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের অনুষ্ঠানে যেমন নজরুল গবেষকদের উপস্থিতি মানায় না, তেমনি নজরুল বর্ষের অনুষ্ঠানেও আমলাদের চেয়ে নজরুল অনুরাগীদের অংশগ্রহণই বেশি কাম্য।
নতুন প্রজন্মের ওপর তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান জটিল বাস্তবতায় আমাদের উদীয়মান প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাতে নজরুলের ‘আমি হবো সকাল বেলার পাখি’ কিংবা ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে’র মতো নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন কবিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তিনি বলেন, নজরুল আমাদের যাপিত জীবনের অনিবার্য অংশ। নজরুল কেবল অতীত ইতিহাস নন, তিনি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও প্রেরণার উৎস।
এ সময় সারাদেশে নজরুল বিশেষজ্ঞ ও নজরুলপ্রেমীদের নিয়ে গঠিত নজরুল বর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটির মাধ্যমে বছরব্যাপী সাহিত্য সম্মেলন, গবেষণা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক উৎসব, নজরুল সংগীতের আসর, নাট্যোৎসব এবং চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন সফল করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
একইসঙ্গে বর্তমান জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় নতুন প্রজন্মকে বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে কবির নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যকে আলোকবর্তিকা হিসেবে ব্যবহারের তাগিদ দেন তিনি।
পরিশেষে, জাতীয় কবির জীবন, কর্ম, সাহিত্য ও মানবিক চেতনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬-২০২৭’ এর বছরব্যাপী কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভার্চ্যুয়ালি আয়োজিত এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরকারি কর্মকর্তা, নজরুল গবেষক এবং নজরুল সংগীত শিল্পী যুক্ত হন। অনুষ্ঠানে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট ও লোগো উন্মোচন করা হয়।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ (সালেহ শিবলী)।
তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা প্রকল্পে বাংলাদেশের প্রতি নিজেদের সমর্থনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতইয়াও ওয়েন।
ইয়াও ওয়েন বলেন, এ প্রকল্পটি নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং বাংলাদেশ যেভাবে চাইবে সেভাবেই চীন এই প্রকল্পে সহায়তা করবে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে রাজধানীর বারিধারায় চীনা দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, আমি আগেও বলেছি, তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের প্রকল্প। এটি আপনাদের প্রকল্প। দ্বিতীয়ত, চীনের এই সহযোগিতা মূলত বাংলাদেশ পক্ষের অনুরোধেই। আমরা এটিকে পারস্পরিকভাবে লাভজনক মনে করি। এটি একটি জীবনযাত্রা উন্নয়নমূলক সহযোগিতা, যার সাথে নদীর তীরে বসবাসকারী বহু মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। উত্তরবঙ্গের মানুষের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে চীন এখানে তার সহযোগিতার হাত বাড়াতে চায়।
তিস্তা প্রকল্পে ভারতের উদ্বেগ নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত সরাসরি বলেন, এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশ যেভাবে চাইবে চীন সেভাবেই অগ্রসর হবে। তিনি বলেন, তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশের এবং এটি আপনাদেরই। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধেই কেবল চীন এতে অংশগ্রহণ করছে। আমাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
রাষ্ট্রদূত আরও যোগ করেন, নদীর গতিপ্রকৃতি ও সংশ্লিষ্ট জটিল পরিস্থিতির কারণে এই প্রকল্প শুরু করার আগে একটি অত্যন্ত সুদৃঢ় ও বিজ্ঞানসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রয়োজন। এটিই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। অন্যান্য যে সকল উপাদানের কথা আপনারা বলছেন, তা আমাদের বিবেচনায় নেই। বাংলাদেশের ইচ্ছা অনুযায়ীই চীন পদক্ষেপ নেবে—এটাই আমাদের অবস্থান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে উল্লেখ করে ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘এই প্রকল্পটি একটি মাইলফলক হতে পারে এবং আমি জানি বাংলাদেশের মানুষের এটি নিয়ে অনেক উচ্চাশা রয়েছে। এটি সরাসরি ১ কোটিরও বেশি মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সংশ্লিষ্ট। চীন এ কাজে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করতে প্রস্তুত। আমাদের মধ্যে এ নিয়ে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে।
সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের গুরুত্বারোপ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের একটি নিখুঁত বিজ্ঞানসম্মত কারিগরি সমীক্ষা দরকার। আমরা যা-ই করি না কেন, তা যেন একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। চীন এই লক্ষ্যে বাংলাদেশে তাদের শীর্ষ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের পাঠাতে অঙ্গীকারবদ্ধ। খুব শিগগিরই এই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আপনারা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পাবেন।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, চীন বাংলাদেশের সক্ষমতা অনুযায়ী সহায়তা অব্যাহত রাখবে এবং প্রকল্পের বাইরের কোনো বিষয় বেইজিংয়ের বিবেচ্য নয়। একটি বিজ্ঞানসম্মত এবং কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতেই দুই দেশ এই প্রকল্পে এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
দেশে বিদেশে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার লক্ষ্যে ভিসানীতি-২০২৬ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ নীতিমালার অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বৈঠক শেষে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। তিনি জানান, নীতিমালাটি আরও সমৃদ্ধ ও কার্যকর করতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আগে হিসেব ছিল পারস্পরিক পাওনার ওপর ভিত্তি করে। তোমরা আমাদের যত দিনের ভিসা দিবা আমরাও তোমাদের অতটুকু ভিসা দেব, এতদিন, মাসের কিংবা বছরের জন্য ভিসা দেব। ওরা যা দেবে আমরাও তাই করব বা দেব। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের কিছু জায়গায় তো দরকার বেশি। একজন ব্যবসায়ী যদি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসে তা আমাদের জন্য সুবিধা। সে এ দেশে ইনভেস্ট করতে পারবে। তো এ নিরীখে এই বোধটা আমাদের হয়েছে। সেই কারণে আমরা বর্তমান সরকার চাচ্ছে একটা ইকোনমিক থ্রাস্ট হোক।
তিনি বলেন, ভিসা পলিসিটা সহজ হোক। সে কারণে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তা মোটামুটি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু শেষে অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটা মন্ত্রিসভা কমিটি করা হয়েছে।
কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিকিউরিটি ইস্যুগুলো দেখবে, পর্যটন মন্ত্রণালয় রয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রয়েছে। তাদের যদি আরও কোনো ইন্টারেস্ট থাকে যেটা এই পলিসিটাকে সমৃদ্ধ করবে, সেটুকু করে ভিসা নীতি চূড়ান্ত করা হবে।
নতুন নীতিমালার মাধ্যমে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে যাতে বিদেশিরা দ্রুত আসতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, কারণ আমরা দেশে তো অত পুঁজি নেই। এই পুঁজিটা যত বাইরে থেকে ইনভেস্ট হবে ততই ভালো। তো অন্য জায়গার সারপ্লাসগুলো আমরা টানার চেষ্টা করছি। নতুন নীতিমালায় ভিসার কোন ক্যাটাগরি করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে নাসিমুল গনি বলেন, ক্যাটাগরি ৩৪ টাইপের করা হয়েছে।
পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিদেশিদের বাংলাদেশে আগমন ও প্রস্থান আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করা, বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা ও দক্ষ মানবসম্পদ আকৃষ্ট করা, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাত উৎসাহিত করা, প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর নিশ্চিত করা, জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পারস্পরিকতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা জোরদার করার লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ভিসা নীতিমালা সংশোধন করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এর খসড়া পরিমার্জনের জন্য অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি মন্ত্রিসভা-কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৩৪ জন কর্মকর্তাকে সহকারী সচিব (ক্যাডার বহির্ভূত) পদে পদোন্নতি দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় শাখা থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন সিনিয়র সহকারী সচিব শিফা নুসরাত।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সচিবালয়ের ১ জুলাই ২০২৬ তারিখের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচিত কর্মকর্তাদের জাতীয় বেতনস্কেল-২০১৫ অনুযায়ী ৯ম গ্রেডের (২২,০০০–৫৩,০৬০ টাকা) সহকারী সচিব (ক্যাডার বহির্ভূত) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা রয়েছেন।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ পদোন্নতির আদেশ জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, বর্তমান খসড়া অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা হলে কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬: হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি) ও টিআইবির পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক পরামর্শ সভায় এসব কথা বলেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, খসড়ার কিছু বিধান বহাল থাকলে কমিশনের স্বাধীনভাবে তদন্ত পরিচালনা ও কার্যকর ভূমিকা পালনের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে গুমের অভিযোগ তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে কমিশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, নতুন খসড়ায় তা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, খসড়া আইনের ১৩ নম্বর ধারায় কমিশনের তদন্ত, পরিদর্শন ও তদারকির ক্ষমতার আওতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা ও নজরদারির বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে গোপন বা অবৈধ আটকের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এছাড়া খসড়ার ২০ নম্বর ধারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত রাখার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে টিআইবি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বর্তমান খসড়া অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন সম্ভব হবে না।
তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত শতাধিক অধ্যাদেশের মধ্যে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশটি বর্তমান সংসদে পাস হয়নি। এর পরিবর্তে সরকার নতুন করে আইনটির খসড়া প্রণয়ন করেছে। তবে টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নতুন খসড়ায় কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য পূর্বে প্রস্তাবিত অনেক ক্ষমতাই খর্ব করা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পূর্বানুমতির বিধান পুনর্বহাল না করে তা বাতিল রাখা উচিত। পাশাপাশি কমিশনের বাজেট ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক ধারাগুলো সংশোধনের সুপারিশ করেছে টিআইবি।
এছাড়া মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণেরও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।