আক্রান্ত ১১ জেলা থেকে ধীরে ধীরে নামছে বন্যার পানি। তবে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। দুর্গম যেসব এলাকায় এত দিন যাওয়া সম্ভব হয়নি সরকারি-বেসরকারি ত্রাণকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের, এখন সেসব এলাকায় পৌঁছাচ্ছেন তারা। তবে ত্রাণের জন্য হাহাকার সবখানে। আশার কথা, নতুন বাংলাদেশে বন্যা মোকাবিলায় সব মানুষ দাঁড়িয়েছেন একসঙ্গে। তাই গত ৫ দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আহ্বানে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ সাড়া দিচ্ছেন, প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে তার ত্রাণ তহবিলেও মিলছে বিপুল সাড়া। তবে উপদ্রুত এলাকার মানুষ চাইছেন নগদ সহায়তা-ত্রাণের খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধের পাশাপাশি ঘরবাড়ি মেরামত এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও কৃষিতে সহায়তা। তবে সব মহলের একটা লক্ষ্য, যত দ্রুত সম্ভব পানিবন্দি মানুষের কাছে ত্রাণ হিসেবে খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া। এদিকে, জলমগ্ন এলাকাগুলোতে বারবার পানিতে নামতে বাধ্য হওয়ায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। উপদ্রুত জেলাগুলোতে ডায়রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকার হাসপাতালগুলোসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে একযোগে কাজ করছেন চিকিৎসক-নার্সদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরা।
এদিকে, বন্যার পানি নামতে শুরু করায় বোঝা যাচ্ছে ক্ষয়-ক্ষতির মাত্রা। ফেনী শহরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মো. সাখাওয়াত হোসেন দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘গত শুক্রবার আসরের নামাজের পরেও তার এলাকাতে বন্যার লেশমাত্র ছিল না। তবে কোথা থেকে হঠাৎ এত দ্রুত গতিতে ঢলের পানি আসা শুরু করে যে মাগরিবের নামাজের আগেই কোমরসমান পানিতে ভরে যায় চারপাশ। প্রাণে বাঁচতে তার চার তলা বাসায় মুহূর্তে প্রতিবেশীদের অনেকে ভিড় করেন। এ কয় দিন বাসার দোতলা থেকে চতুর্থ তলায় বাসিন্দারাসহ ৪০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। এমন প্রতিবেশীও প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ে ছিলেন যাদের তিনি আগে চিনতেনও না। পানি ছিল ভীষণ ঠাণ্ডা। এখন পানি মোটামুটি নেমে গেছে। তবে নিচতলার ভাড়াটিয়া কোনো কিছুই সরাতে পারেননি। তার সব সম্পদ পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এমন অবস্থা শহরের একতলা বা টিনশেডসহ সাধারণ ঘরে যারা ছিলেন তাদের সবার। এসব মানুষ সব হারিয়েছেন। তারা এখন কীভাবে বাঁচবেন তা আল্লাহ জানেন। এমন ঢল আমার জীবনে কখনো দেখিনি।’
বন্যায় ক্ষতির এমন চেহারা প্রায় সবখানে। পুকুরসহ মাছের ঘেরগুলো ভেসে গেছে, নষ্ট হয়েছে কৃষকের মাঠের ফসল, ব্যবসায়ীদের দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে সব মালপত্র, ঘরের কোনো আসবাবপত্র আর ব্যবহারযোগ্য নেই। এই পরিস্থিতি এখন ফেনী, নোয়াখালীসহ আশপাশের সবগুলো জেলায়।
এদিকে, চলমান বন্যায় ১১ জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বন্যায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জন। এছাড়া, ফেনী ও কুমিল্লা জেলার নিম্নাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। সব নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে।
আজ সোমবার বন্যা পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে এই তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল হাসান।
মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, বন্যা আক্রান্ত জেলার সংখ্যা ১১টি। এগুলো হচ্ছে ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। আক্রান্ত এসব জেলায় ৭৪টি উপজেলার মোট ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জন।
তিনি জানান, পানিবন্দি-ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের আশ্রয় প্রদানের জন্য মোট ৩ হাজার ৮৩৪ টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মোট ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৩ জন মানুষ এবং ২৮ হাজার ৯০৭ টি গবাদি পশুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ১১ জেলার ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা সেবা সেবায় মোট ৬৪৫টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে।
কামরুল হাসান বলেন, এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৩ জন। এর মধ্যে কুমিল্লায় ৬ জন, ফেনীতে একজন, চট্টগ্রামে ৫ জন, খাগড়াছড়িতে একজন, নোয়াখালীতে ৫ জন, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় একজন, লক্ষ্মীপুরে একজন ও কক্সবাজারে ৩ জন বন্যার কারণে মারা গেছেন ৷ এছাড়াও মৌলভীবাজারে ২ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সোমবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। উজানে নদ-নদীর পানি কমার ধারা অব্যাহত আছে। ফলে বর্তমানে ফেনী ও কুমিল্লা জেলার নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে।
একই সঙ্গে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। তবে এখনও কুশিয়ারা, গোমতি ও মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময়ে এ অঞ্চলের কুমিল্লা জেলার গোমতী নদীর পানি কমতে পারে এবং এ অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে। তবে কোনও কোনও স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আজ দেশের তিনটি নদীর তিন স্টেশনের পানি বিপৎসীমার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার ৪ নদীর ৬টি স্টেশনের পানি বিপদসীমার ওপরে ছিল। এরমধ্যে গোমতির নদীর কুমিল্লা স্টেশনের পানি ৭৮ থেকে নেমে আজ ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।
এছাড়া মুহুরী নদীর পরশুরাম স্টেশনের পানি আজ বিপৎসীমার ওপরে আছে। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানির উচ্চতা সম্পর্কে জানা যায়নি। এদিকে রোববার কুশিয়ারা নদীর পানি তিন স্টেশনে বিপৎসীমার ওপরে থাকলেও আজ তা নেমে শুধু অমলশীদ পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। রবিবার বিপৎসীমার ওপরে থাকা মনু নদীর মৌলভীবাজার স্টেশনের পানি আজ বিপৎসীমার নিচে নেমে গেছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদীর পানি আরও কমতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, তবে কোনও কোনও স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উজানে মাঝারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে। এ সময় এ অঞ্চলের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরি, কর্ণফুলী, হালদা ও অন্যান্য প্রধান নদীগুলোর পানি সময় বিশেষে বাড়তে পারে।
এছাড়াও ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমছে, গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল আছে, উত্তরাঞ্চলের তিস্তা-ধরলা-দুধকুমার নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিরাজমান আছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
দেশে সোমবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে যশোরে ২২২ মিলিমিটার। এছাড়া বরগুনায় ১২০, বরিশালে ১০৪, টেকনাফে ১০১, পটুয়াখালী ৮৮, নোয়াখালী ৮৭, গোপালগঞ্জের হরিদাশপুরে ৮৫, কক্সবাজারে ৮২ এবং বান্দরবানের লামায় ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে উজানে আসামের তেজপুরে ১৯, ত্রিপুরায় ১২ এবং চেরাপুঞ্জিতে ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, আজ রাতে একসঙ্গে ফারাক্কা বাঁধের ১০৯টি জলকপাট খুলে দেওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জসহ আশেপাশের জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নতুন কোনও তথ্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায়নি।
বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সরকারি-বেসরকারিসহ সব পর্যায় থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে জানিয়ে মন্ত্রণালয় বলছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১১ জেলায় মোট ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ২০ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবার, ৩৫ লাখ টাকার শিশুখাদ্য এবং ৩৫ লাখ টাকার গো-খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের জিওসির তথ্যের বরাত দিয়ে ত্রাণ সচিব জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে কুমিল্লা জেলার সব উপজেলায় সড়ক পথে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া সেনাবাহিনীর ৪টি মেডিকেল টিম প্রয়োজনীয় ওষুধসহ কুমিল্লা জেলার ৪ উপজেলায় নিয়োজিত করা হয়েছে।
ফেনীতে স্বাস্থ্য সেবা দিতে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব বলেন, সেনাবাহিনী ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসকরা সেবা দিচ্ছন। পাশাপাশি স্থানীয় ক্লিনিক, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্যার্তদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকগণ নির্দেশনা দিয়েছেন।
কামরুল হাসান বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সচিব কামরুল হাসান বলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে সহায়তা (চেক/পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে) দিতে চান তারা প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছেও তা দিতে পারেন। সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই সহায়তা নেওয়া হবে।
যারা ত্রাণ তহবিলে সহায়তা (চেক/পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট এর মাধ্যমে) দিতে ইচ্ছুক তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব অঞ্জন চন্দ্র পাল (মোবাইল ০১৭১৮-০৬৬৭২৫) এবং সিনিয়র সহকারী সচিব শরিফুল ইসলামের (মোবাইল-০১৮১৯২৮১২০৮) সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন ত্রাণ সচিব।
নোয়াখালীতে আবারও বেড়েছে পানি
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত নোয়াখালীতে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে আবারও বাড়ছে পানি। আবহাওয়া কিছুটা ভালো থাকায় বৃহস্পতিবার থেকে গত শনিবার বিকেল পর্যন্ত পানি কিছুটা কমলেও সেদিন রাত ১০টার পর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে আবারও কোথাও কোথাও এক ফুট থেকে দুই ফুট পানি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। জেলা প্রশাসনের হিসাবে জেলায় ২০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি আছেন।
বন্যার কারণে জেলায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, সেনবাগ উপজেলার ইয়ারপুর গ্রামের জিলহাজুল ইসলাম (১০), কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট পশ্চিম পাড়ার দুই বছর বয়সী শিশু আবদুর রহমান এবং সদর উপজেলার কালাদরপ ইউনিয়নের পূর্ব শুল্লকিয়া গ্রামের আড়াই বছরের রিয়ান। এরমধ্যে শিশু রিয়ান বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। এছাড়াও বন্যার পানির কারণে ঘরের ভেতর বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যান সেনবাগ উপজেলার দক্ষিণ মোহাম্মদপুর গ্রামের কাকন কর্মকার (৩০) ও বেগমগঞ্জের চৌমুহনী পৌরসভার আলীপুর গ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৫০)।
এদিকে ফেনী থেকে বন্যার পানি ডাকাতিয়া নদী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে সেনবাগ, সোনাইমুড়ি, চাটখিল ও বেগমগঞ্জ উপজেলায় পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নোয়াখালী বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি ও জনদুর্ভোগ বাড়ার আশংকা রয়েছে।
বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। প্রতিটি বাড়িতে ৩ থেকে ৫ ফুট জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে ৬ থেকে ৭ ফুট। বসতঘরে পানি প্রবেশ করায় বুধবার রাত পর্যন্ত অনেকে খাটের ওপর অবস্থান করলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তারা নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্র, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান নিয়েছেন। বসত ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় খাবার সংকটে রয়েছে বেশির ভাগ মানুষ। জেলার প্রধান সড়কসহ প্রায় ৮০ ভাগ সড়ক কয়েক ফুট পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। সড়কগুলোতে যান চলাচল অনেকটাই কম।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আট উপজেলার ৮৭ ইউনিয়ন ও সাতটি পৌরসভার ২০ লাখ ৩৬ হাজার সাতশ মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। এরমধ্যে আটশ ২৬টি কেন্দ্রে একলক্ষ ৫৩ হাজার চারশ ৫৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দী মানুষের জন্য নগদ ৪৫ লক্ষ টাকা ও ১৮শ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় ৮৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
ফেনীর তিন উপজেলায় বেড়েছে বন্যার পানি
ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলায়। বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে মুহুরি কহুয়া ও ছিলোনিয়া নদীর পানি ৷ তবে পানিবন্দি রয়েছেন এসব এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ ৷ ফেনী পৌর শহরের দু-তিনটি সড়ক ও বাসা বাড়িতে পানি কমলেও এখনো অনেক সড়ক ও বিভিন্ন ভবনের নিচতলা পানিতে সয়লাব।
ইতোমধ্যে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে ফেনী সদর, সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা উপজেলায়। বন্যা এখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে । এখানে এখনও পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ৷ বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার জন্য ফেনীর মুহুরী রেগুলেটরের ৪০টি স্লুইসগেট ও নোয়াখালীর মুছাপুরের ১৭ টি স্লুইসগেট খুলে দেয়া হয়েছে।
গত রবিবার থেকে ফেনী শহরের বিদ্যুতের ৯টি লাইন সচল হয়েছে, তবে দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত ৪দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকার পর রবিবার বিকেল থেকে যান চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। জেলার অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল রয়েছে।
ফেনীতে বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ডুবুরি দলসহ বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী টিম পরশুরাম ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা এলাকায় নৌকা, স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ তৎপরতা চলমান রেখেছে ৷ এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও স্থানীয়ভাবে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা হতে আগত সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক সংগঠন, মানবিক সংগঠন তথা বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন জনগণের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় জেলার ১টি এবং ছয়টি উপজেলায় ছয়টি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি ৬টি হাসপাতালে মেডিকেল ক্যাম্প চালু রয়েছে। জেলা শহরে এসব বেসরকারি হাসপাতালসমূহ হল: কনসেপ্ট হাসপাতাল, মেডিনোভা হাসপাতাল মেডিল্যাব, আল আকসা হাসপাতাল, জেড ইউ মডেল হাসপাতাল, মিশন হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্যাকবলিত মানুষজনদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খিচুড়ি ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত জেলায় ৮ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত। এপর্যন্ত ১ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে উদ্ধার করে বিভিন্ন আস্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট লোকজন উঁচু ভবনে বা ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন।
একই সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে ৬০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ৩৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মুছাম্মত শাহীনা আক্তার বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে কন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণের সহযোগিতা ও উদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজ ও আপামর জনগণের সহযোগিতা পেলে সুন্দরভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এই দুর্যোগময় মুহূর্তে ব্যবসায়ীদের প্রতি মানবিক হতে আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বন্যাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আপনার দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়াবেন না।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। এই মুহূর্তে ফেনীতে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় এখনও অপ্রতুল। স্থানীয়রা জানান, এসব বিষয় জরুরিভাবে ব্যবস্থা না হলে এখানে গুরুতর মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের ২০ আগস্ট থেকে অতি ভারী বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে ফেনী জেলায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এ অঞ্চলের মুহুরী কহুয়া সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে অন্তত ৩০ স্থান ভেঙে পানি ঢুকে বন্যার সৃষ্টি হয়। গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রথম দফা এবং চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের দ্বিতীয় দফা এবং ২০ আগস্ট থেকে তৃতীয় দফা বন্যাকবলিত হয় এসব উপজেলার মানুষজন।
বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করেছে দুবাই পুলিশ।
পুলিশ সদরদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রোববার (১৪ জুন) দুপুরে এই গ্রেপ্তারের খবরটি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, দুদকের মামলায় ইন্টারপোলের সহায়তায় তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। গত ১২ জুন ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পুলিশকে একটি চিঠির মাধ্যমে এই গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়েছে।
এর আগে, ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন সাবেক এই আইজিপিকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ‘রেড নোটিশ’ জারির আদেশ দিয়েছিলেন। অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে দুদক।
দুদকের দায়ের করা মামলাগুলোতে বেনজীর আহমেদের পরিবারের বিরুদ্ধে মোট ৭৪ কোটি ১৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর অবশেষে আন্তর্জাতিক পুলিশি সংস্থার সহযোগিতায় তিনি আইনের আওতায় এলেন।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ইতিহাস যখন সঠিকভাবে কথা বলে, তখন ইতিহাস বিকৃতকারীরা হেলিকপ্টারে পালাতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার গতিপ্রবাহ নির্ধারিত হয় এ দেশের জনগণের বয়ানে; কোনো পরগাছা, ধার করা বা কৃত্রিম বয়ানে নয়। জনগণের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, ইতিহাস ও আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে। জনগণের তৈরি করা বয়ানই সব কৃত্রিম বয়ানকে ভেঙে দেবে এবং গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য ও রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করবে।
শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ‘আমরা বাংলাদেশি’ আয়োজিত ‘দেশ পুনর্গঠনে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, ‘অতীতে ফ্যাসিবাদী শক্তি নিজেদের রাজনৈতিক প্রয়োজনেই বাংলাদেশের রাজনীতিকে কৃত্রিমভাবে বিভক্ত ও মেরুকরণ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু জনগণের শক্তি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং সত্য ইতিহাসের প্রবাহ সেই কৃত্রিম বয়ানকে প্রত্যাখ্যান করেছে।’
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ইতিহাসের বাস্তবতা যখন স্পষ্টভাবে সামনে আসে, তখন ইতিহাস বিকৃতকারীরা টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস যেখানে সঠিকভাবে কথা বলে, সেখানে বিকৃতকারীরা হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা গড়ে তুলেছে। এ দেশের মানুষকে তাদের পরিচয়ের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য সীমান্তের ওপারে গিয়ে কারও কাছ থেকে সনদ নিতে হয় না। বাংলাদেশের স্বকীয়তা এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এ দেশের ইতিহাস ও বাস্তবতার মধ্যেই প্রোথিত।’
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের স্বতন্ত্র পরিচয়কে রাজনৈতিক দর্শনে রূপ দিয়েছিলেন। ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জাতীয়তাবাদ আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম ভিত্তি।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থই হতে হবে সব নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সার্ক এবং বৈশ্বিক পরিসরে জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ তার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারে। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ২২০ কোটিরও বেশি মানুষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সার্ককে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিএনপি নেতা সৈয়দ এহসানুল হুদার সভাপতিত্বে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ও বিএনপি নেতা রাশেদ খান।
উপস্থিত বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বাংলাদেশকে একটি শিল্পসমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে বর্তমান সরকার সবকিছুই করতে প্রস্তুত।
শনিবার (১৩ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘রোড ফর ট্রেড, গ্রোথ অ্যান্ড ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসি ২০২৬–নেভিগেটিং রিস্কস: লিভারেজিং রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেছেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের পথ চলায় সাহসিকতা ও সঠিক নির্দেশনার প্রতিফলন ঘটায়।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের বাণিজ্য, প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির যে রূপরেখা আমরা তৈরি করছি, তাতে ঝুঁকি মোকাবিলা ও সক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টি আগামীর যাত্রার মূল চেতনাকে ধারণ করে। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, নতুন বাংলাদেশের জন্য বর্তমান সরকার সবকিছু করতে প্রস্তুত।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার ১০০ দিন পার করেছে। এই সরকারের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ, স্থিতিস্থাপক ও শিল্পসমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা, যেখানে নাগরিকরা সমৃদ্ধি ও মর্যাদার ন্যায্য অংশীদার হবে।
মির্জা ফখরুল যোগ করেন, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো কৃষক, শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
সাবেক শাসনামলে দেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলে দাবি করে তিনি তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে শাসন কাঠামো পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য হলো সকল নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে অংশীদারদের জন্য একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে চায়, যা একটি প্রতিযোগিতামূলক, স্থিতিশীল, নৈতিক ও জনমুখী অর্থনীতি উপহার দেবে।
সবশেষে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমাদের এই রূপকল্পে বিনিয়োগ করার জন্য আমি আপনাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বিশ্বাস করুন, আপনারা হতাশ হবেন না।
নারী ও শিশুবিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় অনেক ভালো আইন থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার মাদক ও সহিংসতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করলেও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এখনও দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।
শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেছেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, আইন, নীতিমালা এবং নানা ধরনের এডভোকেসি কর্মসূচি থাকার পরও মামলা দায়ের, তদন্ত এবং ডাক্তারি পরীক্ষায় বিলম্ব, অপর্যাপ্ত প্রমাণ এবং সাক্ষীর অভাবে লিঙ্গভিত্তিক যৌন সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। প্রচলিত আইন কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ক্রমবর্ধমান সামাজিক অস্থিতিশীলতা, সামাজিক অন্যায়-অবিচার, সংঘবদ্ধ সহিংসতার অপসংস্কৃতির ফলে সামগ্রিকভাবে মানবাধিকার এবং মানবিক মর্যাদার ক্রমঅবনতি ঘটছে। সামগ্রিকভাবে সমাজে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার বিদ্যমান আইনের ব্যাপক প্রচার ও যথাযথ বাস্তবায়ন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসময় তিনি নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং জনগণকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
মন্ত্রী, নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনার অবসানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এবং তরুণ প্রজন্মের সমন্বিত কর্ম উদ্যোগে মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, সংবিধানে নারীদের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও কিছু বিধান বাস্তবে সেই অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে।
তিনি নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ মোকাবিলায় বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, মানবিক শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু হয় এজন্য পরিবার থেকে নৈতিকতা শিক্ষা দিতে হবে।
তিনি সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, কনটেন্ট নির্মাতা ও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধিকতর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় নেতা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, রামিসা হত্যার মতো ঘটনাগুলো সমাজের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলোকে উন্মোচিত করেছে।
তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সরকার ও সমাজের মধ্যে আরও শক্তিশালী সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) লিজা বেগম সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান, কার্যকর আইন প্রয়োগ, মামলার সঠিক তদন্ত এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পুলিশিংয়ের ওপর জোর দেন। তিনি প্রতি জেলায় ভুক্তভোগী সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন এবং সাইবার সহিংসতা প্রতিরোধে জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
নারীর ক্ষমতায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী নতুন এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাহিনীর নারী সদস্যদের জন্য জাপানিজ ভাষাশিক্ষা প্রশিক্ষণ (N-5) কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারী সদস্যদের ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদেশে কর্মসংস্থানের উপযোগিতা অর্জন এবং আত্মনির্ভরশীলতা নিশ্চিত করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উদ্যোগে আগামী ৫ জুলাই ২০২৬ থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৯০ (নব্বই) দিনব্যাপী জাপানিজ ভাষাশিক্ষা প্রশিক্ষণ (N-5) পরিচালিত হবে। দেশের মোট ১৩টি কেন্দ্রে এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো হলো—আনসার-ভিডিপি একাডেমি, গাজীপুর; ভিটিসি, নবাবগঞ্জ, ঢাকা; এবং ১১টি জেলা কমান্ড্যান্ট কার্যালয়: ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, ফেনী, নওগাঁ, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর ও কক্সবাজার।
প্রতিটি কেন্দ্রে ৪০ জন করে মোট ৫২০ জন প্রশিক্ষণার্থী এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। আগ্রহী প্রার্থীদের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণসাপেক্ষে AVMIS অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনপূর্বক আবেদন করতে হবে। আবেদনকারীদের বয়স ১৮ থেকে ২৭ বছরের মধ্যে হতে হবে এবং ন্যূনতম এসএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
এ উদ্যোগ দেশের নারী সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়ন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। একই সঙ্গে এটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অগ্রণী ভূমিকার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
জাতীয়তাবাদী যুবদলের নবঘোষিত কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ত্যাগী ও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি- এ অভিযোগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন পদবঞ্চিত নেতারা।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক নেতা এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
এদিকে একই সময়ে যুবদলের নবগঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা তাদের প্রথম কর্মসূচি হিসেবে রাজধানীর জিয়া উদ্যানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে মামলা-হামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েও যারা যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তাদের অনেকেই নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। বরং সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠদের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান দেওয়া হয়েছে।
তাদের দাবি, ত্যাগ ও সাংগঠনিক অবদানের মূল্যায়ন না করে ‘নিজস্ব বলয়ের’ লোকদের প্রাধান্য দেওয়ায় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। অবিলম্বে পদবঞ্চিত নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা না হলে সংগঠন সাংগঠনিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তারা সতর্ক করেন।
পদবঞ্চিত নেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছি। আগের যুবদলের কমিটিতেও দায়িত্ব পালন করেছি। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থেকেও আজ আমরা পরিচয়হীন হয়ে গেছি। আমরা আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও মূল্যায়ন চাই।’
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি হুমায়ন কবির বলেন, ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা রাজপথে সক্রিয় ছিলাম। অন্যদের তুলনায় আমাদের ত্যাগ কোনো অংশে কম নয়। অথচ নতুন কমিটিতে আমাদের স্থান দেওয়া হয়নি। আমরা দলের হাইকমান্ডের কাছে সুবিচার চাই।’
প্রসঙ্গত, গত ৪ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি অনুমোদনের কথা জানানো হয়। কমিটিতে আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা থাকলেও প্রায় দুই বছর পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার পিরোজপুর-রাওথা সীমান্ত দিয়ে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ২৩ জনকে বাংলাদেশে পুশ ইন করার চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কঠোর অবস্থান ও সীমান্তে বাড়তি নজরদারির কারণে সেই চেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।
শনিবার (১৩ জুন) ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক দফায় এই পুশ ইনের চেষ্টা চালানো হয়। পদ্মা নদীর ভারতীয় অংশ থেকে দুটি নৌকায় করে এসব মানুষকে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হলেও সীমান্তে বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে নৌকাগুলো বাংলাদেশ অভিমুখে মোটেও অগ্রসর হতে পারেনি।
স্থানীয় জেলে ও সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট সীমান্তের বিপরীতে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার কাগমারি চর এলাকায় প্রায় ১৫০ জন নারী, পুরুষ ও শিশুকে জড়ো করে রাখা হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে প্রথম দফায় ২৩ জনকে কাগমারি ও খালিশপুর বিএসএফ ক্যাম্পের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিজিবি সদস্যরা তাদের নিয়মিত টহল ও নজরদারি ব্যাপক জোরদার করেছেন। সীমান্ত এলাকায় মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে, পাশাপাশি বিএসএফের সম্ভাব্য পুশ ইন প্রতিহত করতে স্থানীয়দের সহযোগিতাও কামনা করছে বিজিবি।
দেশের সুরক্ষায় এ সময় স্থানীয় অনেক বাসিন্দাকেই বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অবস্থান নিতে দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, ভোর থেকেই বিএসএফ কর্তৃক কিছু মানুষকে বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টা করার খবর তারা জানতে পারেন। বিজিবি তাদের সহযোগিতা চাওয়ায় দেশের স্বার্থে তাঁরাও জওয়ানদের পাশে এসে অবস্থান নিয়েছেন।
বিজিবির চারঘাট বিকল্প বিওপির কমান্ডার সুবেদার দেলোয়ার হোসেন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা আগে থেকেই সীমান্তে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।
বিজিবির এই কঠোর নজরদারির কারণেই পুশ ইনের ভারতীয় প্রচেষ্টাটি ব্যর্থ হয়েছে। এলাকাবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতায় সীমান্তে এখন আরও নিটোল নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং কোনোভাবেই অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
কক্সবাজারে পাতালী খাল পুনঃখনন প্রকল্পের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা এবং কৃষকদের কল্যাণে কাজ করাই বিএনপির রাজনীতির মূল দর্শন। শনিবার সকালে প্রকল্পের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত এক পথসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন।
নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, কৃষক ভাইদের বীজ ও কীটনাশক ওষুধ কেনার জন্য এককালীন আড়াই হাজার টাকার একটি সুবিধা দিতে চাই এবং সেটি দেব কৃষক কার্ডের মাধ্যমে, ইনশাআল্লাহ।’
দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষই শ্রমজীবী। মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারীশক্তিকে বাদ দিয়ে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া নারী শিক্ষার যে ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন, তার ধারাবাহিকতায় নারীদের স্বাবলম্বী করতে স্নাতক ও ডিগ্রি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি মেধাবী ছাত্রীদের উৎসাহিত করতে উপবৃত্তি প্রদানের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।
এর আগে সকাল ১০টায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এই সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে কক্সবাজার জেলা জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জনসভা এবং অন্যান্য সরকারি কর্মসূচিগুলো সফল করতে স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় নেতা-কর্মীরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ইতিমধ্যে কক্সবাজারে অবস্থান করে সফরের আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সমন্বয় করছেন।
কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নে ‘পাতলী খাল’ পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে শনিবার (১৩ জুন) সকাল ৯টা ৪৮ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। খালের খননকাজ উদ্বোধনের পরপরই মাছুমঘাট সংরক্ষিত বন এলাকায় চারা রোপণের মাধ্যমে দেশজুড়ে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ অভিযানের শুভ সূচনা করবেন তিনি।
সফরের পরবর্তী অংশে প্রধানমন্ত্রী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ হারানো শহিদ ওয়াসীমের কবর জিয়ারত করতে যাবেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলবেন। এছাড়া তিনি পেকুয়া পৌরসভা ও নতুন গঠিত মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও উদ্বোধন করবেন।
বিকেলে চকরিয়া পৌর বাস টার্মিনাল চত্বরে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে তিনি কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ও মেরিন ড্রাইভ এলাকা ঘুরে দেখবেন এবং একটি সুধী সমাবেশে বিভিন্ন পেশাজীবী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাতেই আকাশপথে ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
খাল খনন ও বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নিতে একদিনের সফরে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (১৩ জুন) সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন গণমাধ্যমকে জানান, শনিবার সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনি কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
সকাল থেকেই মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজার জেলাজুড়ে বেশ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তবে এই প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করেই প্রধানমন্ত্রী তার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
সফরসূচি অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নের পাতলী এলাকায় যাবেন। সকাল সাড়ে ১০টায় সেখানে তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খনন করা ঐতিহাসিক 'পাতলীখাল' পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী সেখানে আয়োজিত একটি পথসভায় স্থানীয় জনগণের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খাল পুনঃখনন ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বৃক্ষরোপণ অভিযানসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।
সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালন শেষে মোট ৫৪ হাজার ৩২৩ জন বাংলাদেশি হাজি দেশে ফিরেছেন।
শনিবার হজ বুলেটিন থেকে জানা যায়, তিনটি নির্ধারিত বিমান সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ সময় ১৩ জুন রাত ২টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মোট ১২৭টি ফিরতি ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ৫৮টি, সৌদিয়া এয়ারলাইন্স ৪৮টি এবং ফ্লাইনাস এয়ারলাইন্স ২১টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।
হজ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১২৭টি ফ্লাইটের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ৩১৩ জন এবং বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবস্থাপনায় ৫০ হাজার ১০ জন হাজি দেশে ফিরেছেন।
এবার হজ পালন করতে গিয়ে ৩৩ জন পুরুষ ও ১৭ জন নারীসহ মোট ৫০ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে মক্কায় ৩৫ জন, মদিনায় ১৪ জন এবং জেদ্দায় একজন মারা গেছেন।
হজ বুলেটিন অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ৪১০ জন বাংলাদেশি হাজি চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ১৮ জন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
সৌদি আরবের মেডিকেল সেন্টারগুলো ৬২ হাজার ৮৩৭ জনকে এবং আইটি হেল্প ডেস্ক মক্কা ও মদিনায় ২৭ হাজার ৬৬৫ জন হাজিকে সেবা প্রদান করেছে।
এর আগে, গত ১৭ এপ্রিল রাত ১১টা ৫৭ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৪১৮ জন হজযাত্রী নিয়ে প্রথম হজ ফ্লাইট (বিজি৩০০১) জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ২১ মে প্রাক হজ ফ্লাইট সম্পন্ন হয়।
চলতি বছরের ২৬ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হয়। হজ শেষে ৩০ মে থেকে ফিরতি ফ্লাইট শুরু হয়, যা আগামী ১ জুলাই পর্যন্ত চলবে।
দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো পর্যটন সমৃদ্ধ জেলা কক্সবাজারে সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ শনিবার (১৩ জুন) সকাল ১০টায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে সপরিবারে তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঘিরে জেলাজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মাঝে বিরাজ করছে আকাশসম প্রত্যাশা। কক্সবাজারবাসী মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর জেলার উন্নয়ন ও সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে।
জেলা বিএনপির সভাপতি ও কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কক্সবাজার সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে- কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করা, কক্সবাজার সদর হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা, কক্সবাজার-মহেশখালী সেতু নির্মাণ, পিএমখালীর পাতলী খালকে শহীদ জিয়া স্মৃতি খাল নামকরণ এবং কক্সবাজার স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক মো. ইউসুফ বদরী বলেন, ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতকে বিশ্ব পর্যটনের জন্য আরও উন্মুক্ত ও আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা, মহেশখালী-কক্সবাজার সহজ যোগাযোগের জন্য সেতু নির্মাণ, বাঁকখালী নদীতে ড্রেজিং, সোনাদিয়া দ্বীপকে বিদেশি পর্যটকদের জন্য এক্সক্লুসিভ জোন হিসেবে গড়ে তোলা এবং মহেশখালী-মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।
গতকাল শুক্রবার (১২ জুন) কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, কক্সবাজার কেন্দ্রিক জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা হবে।
দাবির মধ্যে রয়েছে- লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা এবং কক্সবাজারে ব্লু ইকোনমি ও মেরিন সায়েন্সভিত্তিক একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
প্রসঙ্গত কক্সবাজার নেমে সড়কপথে চকরিয়ায় পিএমখালীতে পাতলী খাল পুনঃখনন, মালুমঘাট সংরক্ষিত বনে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী পেকুয়া পৌরসভা ও মাতামুহুরী উপজেলার ভিত্তি প্রস্তরস্থাপন অনুষ্ঠান এবং বিকেলে চকরিয়া বাস টার্মিনালে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত জনসভা, সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরে সুধী সমাবেশে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমুদ্রের সৌন্দর্য অবলোকনে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ঘুরে দেখবেন এবং রাতের ফ্লাইটেই তিনি ঢাকায় ফিরবেন।
গুরুত্বপূর্ণ এই সফরকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে জেলা প্রশাসন, নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় ৩ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা পুলিশের ৫০০ সদস্যের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও ২ হাজার ৫০০ পুলিশ সদস্য আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
কারাগারের চার দেয়ালের অন্ধকার থেকে আলোতে ফিরেই ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা’ মেতে উঠেছে পুরনো রক্তাক্ত খেলায়। কেউ মেলাচ্ছে পুরনো শত্রুতার হিসাব, কেউবা মরিয়া হয়ে উঠেছে নিজের হারানো সাম্রাজ্য ও আধিপত্য ফিরে পেতে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামিনে মুক্ত হওয়া ৯০-এর দশকের এসব সন্ত্রাসীদের অস্তিত্বের জানানে অস্থির হয়ে উঠেছে অপরাধ জগৎ, বাড়ছে খুনোখুনি।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল শুক্রবার দেশের দুই বিভাগীয় শহর ঢাকা ও খুলনায় ভরদুপুরে প্রকাশ্যে দুজনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে খুলনায় এক রাজনৈতিক নেতা নিহত হয়েছেন এবং ঢাকার রামপুরায় এক শীর্ষ সন্ত্রাসী মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রাজধানীতে এটি দ্বিতীয় কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর ওপর হামলার ঘটনা।
যেভাবে চালানো হয় হামলা: প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কাইল্লা পলাশ পশ্চিম রামপুরার খান টাওয়ারের সপ্তম তলায় বসবাস করতেন। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বাসার পাশের মক্কি জামে মসজিদে আয়োজিত একটি মিলাদ মাহফিলে অংশ নেন তিনি। মিলাদ শেষে বাসার সামনে এসে রয়েল মিষ্টির দোকানের কাছে পরিচিত কয়েকজনের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। ঠিক এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল ওত পেতে থাকা ঘাতকেরা।
হেলমেট ও মাস্ক পরা দুই যুবক হঠাৎ পায়ে হেঁটে অত্যন্ত কাছ থেকে পলাশকে লক্ষ্য করে পরপর দুটি গুলি ছোড়ে। দুটি গুলিই সরাসরি তার মাথা ভেদ করে যায়। রক্তাত্ব অবস্থায় পলাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হামলাকারীরা সামান্য দূরে স্টার্ট দিয়ে রাখা একটি মোটরসাইকেলের দিকে ছুটে যায়।
পলাশের বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী ইব্রাহিম মিয়া ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, দুই যুবক খুব কাছ থেকে পলাশ ভাইয়ের মাথায় গুলি করে। তারা যখন পালিয়ে যাচ্ছিল, তখন এলাকার লোকজন তাদের ধাওয়া দেয়। ধাওয়া খেয়ে হামলাকারীরা আতঙ্ক তৈরি করতে শূন্যে আরও দুটি গুলি ছুড়তে ছুড়তে হাতিরঝিলের দিকে মোটরসাইকেল চালিয়ে পালিয়ে যায়।
সংকটাপন্ন অবস্থা: গুলিবিদ্ধ পলাশকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সন্ধ্যায় নিউরোসার্জারি বিভাগে তার একটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। হাসপাতালের রেসিডেন্ট ট্রেইনি চিকিৎসক তারিকুল ইসলাম জানান, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পলাশের মাথার ভেতর থেকে একটি গুলি বের করা হয়েছে। অন্য গুলিটি মাথা ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। গুলির তীব্র আঘাতে তার মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে তাকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে এবং তার অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
উল্লেখ্য, ২০০২ সালের ২৯ মে রামপুরায় যুবদল নেতা মিজানুর রহমান মিজানকে গুলি করে হত্যা করা মামলার প্রধান দণ্ডিত আসামি ছিলেন এই কাইল্লা পলাশ। বিচারিক আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। দীর্ঘ সাজা ভোগের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুবাদে এক মাস আগে তিনি বাইরে আসেন।
খুলনায় বিশেষ অভিযানের মাঝেই বিএনপি নেতা ‘ঢাকাইয়া রফিক’ খুন: ঢাকার ঘটনার মাত্র সোয়া এক ঘণ্টা আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানার মাথাভাঙা এলাকার কাজীপাড়া বাজারে ঘটে আরেকটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ যখন নগরীতে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক দমনে বিশেষ যৌথ অভিযান চালাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয় রফিকুল ইসলাম (৩৫) নামের এক বিএনপি নেতাকে। তিনি অপরাধ জগতে ও রাজনৈতিক মহলে ‘ঢাকাইয়া রফিক’ নামে পরিচিত ছিলেন।
তলপেটে গুলি, স্পট ডেড: পুলিশ জানায়, নিহত রফিকুল ইসলাম বটিয়াঘাটা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি কাজীপাড়া বাজারের একটি দোকানে বসে ছিলেন। হঠাৎ একটি মোটরসাইকেলে করে হেলমেট পরা এক দুর্বৃত্ত এসে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রফিকুলের তলপেট লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং মুহূর্তে মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ বিভাগ) রেজাউর রহমান বলেন, নিহত রফিকুল ইসলাম বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকতেন, মাঝেমধ্যে এলাকায় আসতেন। তিনি পাথরের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভ্যন্তরীণ কোনো কোন্দল বা ব্যবসায়িক শত্রুতার জেরে এই হত্যাকাণ্ড কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান চলছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ১৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা অঞ্চলে সংঘটিত ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সাথে বিভিন্ন আন্ডারওয়ার্ল্ড সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সরাসরি সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ।
রায়েরবাজারে টিটন হত্যাকাণ্ড, আধিপত্যের প্রথম বলি: গতকাল কাইল্লা পলাশের ওপর হামলার ঘটনাটি একক কোনো ঘটনা নয়। এর ঠিক এক মাস আগে ঢাকার নিউমার্কেট ও হাজারীবাগ এলাকার একচ্ছত্র ডন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর একজন—খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে (৫২) একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।
২০০১ সালে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার দেশের যে ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, টিটন ছিলেন তাদের অন্যতম। ২০ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটানোর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি কারামুক্ত হন। মুক্তি পেয়েই তিনি রায়েরবাজার ও হাজারীবাগ এলাকায় তার পুরনো সাম্রাজ্য ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু প্রতিপক্ষ গ্রুপ তাকে সেই সুযোগ দেয়নি। জুনের মাঝামাঝি সময়ে রায়েরবাজার এলাকায় তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশের দাবি, এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ের প্রথম বলি ছিলেন টিটন।
কারামুক্তির হিড়িক, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে কার কোন এলাকা: ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডে বড় ধরনের ধস নেমেছিল। র্যাবের প্রতিষ্ঠা এবং বিশেষ অভিযানের কারণে ক্রসফায়ার ও গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল (যেমন: জিসান, বিকাশ, প্রকাশ বা টোকাই সাগর)। আবার অনেকে এনকাউন্টারের ভয়ে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কারাগারকেই নিরাপদ আশ্রয় মনে করে বছরের পর বছর জেল খেটেছেন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেলে কারাগার থেকে একে একে জামিনে মুক্ত হতে শুরু করেন ৯০-এর দশকের ত্রাস সৃষ্টি করা শীর্ষ অপরাধীরা।
২০০১ সালে ঘোষিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসী’র তালিকার মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীদের অনেকেই এখন জেলের বাইরে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ দেড় থেকে দুই দশক কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়েছেন ৯০-এর দশকের ত্রাস সৃষ্টিকারী এসব আন্ডারওয়ার্ল্ড গডফাদার।
ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, কে সক্রিয় আর কে দেশ ছেড়ে পালালেন—
শেখ আসলাম ওরফে ‘সুইডেন আসলাম’ (তেজগাঁও-মহাখালী)
৯০-এর দশকে রাজধানীর তেজগাঁও, ফার্মগেট ও মহাখালী এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক ছিলেন সুইডেন আসলাম। যুবলীগ নেতা গালিব হত্যাসহ একাধিক হত্যা মামলার আসামি তিনি। তার নামের আগে ‘সুইডেন’ যুক্ত হওয়া নিয়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডে নানা গল্প রয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ কারাবাস ও বয়সের ভারে আসলাম বর্তমানে অপরাধ জগতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। বর্তমানে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরদারিতে রয়েছেন এবং নিজেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করছেন।
‘কিলার আব্বাস’ (মিরপুর-কাফরুল): মিরপুর ও কাফরুল এলাকার একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন কিলার আব্বাস। ২০০১ সালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। ইন্টারপোলের রেড নোটিশধারী এই অপরাধীর মূল শক্তি ছিল ফুটপাত, ডিশ ব্যবসা ও পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি।
২০২৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে কারামুক্ত হন। মুক্তির পর কাফরুল ও মিরপুর এলাকায় তার অনুসারীরা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসেন তিনি। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, কড়া নজরদারি এড়াতে এবং বয়সের কারণে কিলার আব্বাস সম্প্রতি কৌশলে দেশ ছেড়ে দুবাইতে পাড়ি জমিয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে তার নাম ব্যবহার করে স্থানীয় অনুসারীদের চাঁদাবাজি এখনো থামেনি।
ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে ‘পিচ্চি হেলাল’ : মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার এক সময়ের ত্রাস পিচ্চি হেলাল। হত্যা ও চাঁদাবাজির ডজনখানেক মামলার আসামি হয়ে দীর্ঘ দুই দশক কারাবন্দি ছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্টে কারামুক্তির পর পিচ্চি হেলালের নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকায় চাঁদাবাজি এবং ব্যবসায়ী শোরুম দখলের নেপথ্যে তার নাম উঠে এসেছে। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, পুলিশি গ্রেফতার এড়াতে পিচ্চি হেলাল বর্তমানে মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার জন্য জোর তদবির ও ভিসা পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
সানজিদুল ইসলাম ওরফে ‘ইমন’ : ৯০-এর দশকের শেষের দিকে ধানমন্ডি, হাজারীবাগ ও মোহাম্মদপুর কাঁপানো কুখ্যাত ‘ইমন-মামুন’ বাহিনীর প্রধান ছিলেন ইমন। অভিনেতা সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলাসহ একাধিক চাঞ্চল্যকর খুনের মামলার প্রধান আসামি তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারামুক্ত হয়েই ইমন আন্ডারওয়ার্ল্ডে কোনো সাড়াশব্দ না দিয়ে অত্যন্ত গোপনে দেশ ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি বিদেশে (সম্ভবত দুবাই বা কানাডায়) অবস্থান করে প্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকার ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকার অপরাধ সিন্ডিকেট ও ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন বলে তথ্য রয়েছে।
খোরশেদ আলম রাসু ওরফে ‘ফ্রিডম রাসু’ : ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকার আতঙ্ক এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। ফ্রিডম পার্টির রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডে তিনি ‘ফ্রিডম রাসু’ নামে পরিচিতি পান।
দীর্ঘ কারাবাস শেষে জামিনে মুক্ত হয়ে বর্তমানে রাসু ঢাকায় অবস্থান করছেন। এলাকায় পুনরায় আধিপত্য বিস্তার এবং পুরনো সিন্ডিকেটগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছেন তিনি। তার গতিবিধির ওপর গোয়েন্দাদের কড়া নজর রয়েছে।
তোফায়েল আহমেদ জোসেফ : ঢাকার অপরাধ জগতের এক সময়ের একচ্ছত্র ডন। মোহাম্মদপুর এলাকার জোসেফ-হারিস-আনিস ভ্রাতৃদ্বয়ের নাম আন্ডারওয়ার্ল্ডে সুপরিচিত ছিল। ফ্রিডম বাবলু হত্যা মামলায় তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল।
অন্যদের অনেক আগেই তিনি বিশেষ বিবেচনায় কারামুক্ত হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি সরাসরি প্রকাশ্যে না এলেও মোহাম্মদপুর ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় তার পুরনো নেটওয়ার্ক নেপথ্য থেকে অপরাধ জগৎ ও ল্যান্ড ক্রাইম নিয়ন্ত্রণ করছে বলে গুঞ্জন রয়েছে।
নিহত ও পলাতক যারা: খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন (হাজারীবাগ): ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারামুক্ত হয়ে হাজারীবাগে আধিপত্য পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপের গুলিতে গত মাসে নিহত হন।
সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ: দীর্ঘদিন ভারতে গ্রেপ্তার থাকার পর সম্প্রতি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে দেশে ফিরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাল ধরার চেষ্টা করেছিলেন। তবে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযানে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ ইতিমধ্যে পুনরায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারামুক্ত এই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অধিকাংশেরই বয়স এখন ৫০ থেকে ৬০ বছরের কোঠায়। এদের অনেকেই সশরীরে অপরাধে না জড়ালেও আড়ালে থেকে নতুন প্রজন্মের শুটার ও গ্যাংদের ‘গডফাদার’ হিসেবে গাইড করছেন। আমরা এই নতুন ও পুরনো অপরাধীদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে একটি সমন্বিত ডাটাবেজ তৈরি করছি এবং যারাই জামিনের শর্ত ভেঙে অপরাধে জড়াবে, তাদের পুনরায় আইনের আওতায় আনা হবে।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের গভীর উদ্বেগ: কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের এই প্রকাশ্য খুনোখুনি এবং অস্ত্রবাজি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এখনই যদি এদের কঠোর হস্তে দমন করা না হয়, তবে ঢাকা ও খুলনার মতো বড় শহরগুলো আবারও নব্বইয়ের দশকের মতো অস্ত্রের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কতটা ভয়ঙ্কর, তা তাদের অতীত রেকর্ড দেখলেই বোঝা যায়। তারা যখন দীর্ঘ এক বা দেড় দশক কারাগারে ছিল, তখনও কিন্তু কারাগারের ভেতর থেকেই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বাইরের অপরাধ জগত ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত। এখন তারা জামিনে সরাসরি মুক্ত হয়ে বাইরে চলে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই তারা তাদের পুরনো রাজত্ব উদ্ধার করতে চাইবে এবং এর ফলে প্রতিপক্ষ গ্রুপের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভঙ্গুর অবস্থার সুযোগ নিয়ে তারা যদি একবার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, তবে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলার চরম বিপর্যয় ঘটবে।
তিনি আরো বলেন, রামপুরায় কাইল্লা পলাশের ওপর হামলা কিংবা খুলনায় ঢাকাইয়া রফিকের হত্যাকাণ্ড কেবল দুটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এটি দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুনরুত্থানের স্পষ্ট খতিয়ান। পুলিশ ও যৌথ বাহিনী বর্তমানে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘাতকদের ধরার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান এতে হবে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনতিবিলম্বে কারামুক্ত সমস্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীর একটি বিশেষ তালিকা প্রস্তুত করতে হবে, তাদের প্রতিদিনের কর্মকাণ্ড কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে এবং জামিনের শর্ত ভঙ্গ করার সামান্যতম প্রমাণ পেলেই পুনরায় তাদের গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের সমস্ত প্রচেষ্টা এই আন্ডারওয়ার্ল্ডের অস্ত্রের ঝনঝনানি আর রক্তের হোলিখেলা রুদ্ধ দরজার আড়ালে ঢাকা পড়ে যাবে।