আক্রান্ত ১১ জেলা থেকে ধীরে ধীরে নামছে বন্যার পানি। তবে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। দুর্গম যেসব এলাকায় এত দিন যাওয়া সম্ভব হয়নি সরকারি-বেসরকারি ত্রাণকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের, এখন সেসব এলাকায় পৌঁছাচ্ছেন তারা। তবে ত্রাণের জন্য হাহাকার সবখানে। আশার কথা, নতুন বাংলাদেশে বন্যা মোকাবিলায় সব মানুষ দাঁড়িয়েছেন একসঙ্গে। তাই গত ৫ দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আহ্বানে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ সাড়া দিচ্ছেন, প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে তার ত্রাণ তহবিলেও মিলছে বিপুল সাড়া। তবে উপদ্রুত এলাকার মানুষ চাইছেন নগদ সহায়তা-ত্রাণের খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধের পাশাপাশি ঘরবাড়ি মেরামত এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও কৃষিতে সহায়তা। তবে সব মহলের একটা লক্ষ্য, যত দ্রুত সম্ভব পানিবন্দি মানুষের কাছে ত্রাণ হিসেবে খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া। এদিকে, জলমগ্ন এলাকাগুলোতে বারবার পানিতে নামতে বাধ্য হওয়ায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। উপদ্রুত জেলাগুলোতে ডায়রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকার হাসপাতালগুলোসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে একযোগে কাজ করছেন চিকিৎসক-নার্সদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরা।
এদিকে, বন্যার পানি নামতে শুরু করায় বোঝা যাচ্ছে ক্ষয়-ক্ষতির মাত্রা। ফেনী শহরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মো. সাখাওয়াত হোসেন দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘গত শুক্রবার আসরের নামাজের পরেও তার এলাকাতে বন্যার লেশমাত্র ছিল না। তবে কোথা থেকে হঠাৎ এত দ্রুত গতিতে ঢলের পানি আসা শুরু করে যে মাগরিবের নামাজের আগেই কোমরসমান পানিতে ভরে যায় চারপাশ। প্রাণে বাঁচতে তার চার তলা বাসায় মুহূর্তে প্রতিবেশীদের অনেকে ভিড় করেন। এ কয় দিন বাসার দোতলা থেকে চতুর্থ তলায় বাসিন্দারাসহ ৪০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। এমন প্রতিবেশীও প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ে ছিলেন যাদের তিনি আগে চিনতেনও না। পানি ছিল ভীষণ ঠাণ্ডা। এখন পানি মোটামুটি নেমে গেছে। তবে নিচতলার ভাড়াটিয়া কোনো কিছুই সরাতে পারেননি। তার সব সম্পদ পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এমন অবস্থা শহরের একতলা বা টিনশেডসহ সাধারণ ঘরে যারা ছিলেন তাদের সবার। এসব মানুষ সব হারিয়েছেন। তারা এখন কীভাবে বাঁচবেন তা আল্লাহ জানেন। এমন ঢল আমার জীবনে কখনো দেখিনি।’
বন্যায় ক্ষতির এমন চেহারা প্রায় সবখানে। পুকুরসহ মাছের ঘেরগুলো ভেসে গেছে, নষ্ট হয়েছে কৃষকের মাঠের ফসল, ব্যবসায়ীদের দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে সব মালপত্র, ঘরের কোনো আসবাবপত্র আর ব্যবহারযোগ্য নেই। এই পরিস্থিতি এখন ফেনী, নোয়াখালীসহ আশপাশের সবগুলো জেলায়।
এদিকে, চলমান বন্যায় ১১ জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বন্যায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জন। এছাড়া, ফেনী ও কুমিল্লা জেলার নিম্নাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। সব নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে।
আজ সোমবার বন্যা পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে এই তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল হাসান।
মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, বন্যা আক্রান্ত জেলার সংখ্যা ১১টি। এগুলো হচ্ছে ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। আক্রান্ত এসব জেলায় ৭৪টি উপজেলার মোট ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জন।
তিনি জানান, পানিবন্দি-ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের আশ্রয় প্রদানের জন্য মোট ৩ হাজার ৮৩৪ টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মোট ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৩ জন মানুষ এবং ২৮ হাজার ৯০৭ টি গবাদি পশুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ১১ জেলার ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা সেবা সেবায় মোট ৬৪৫টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে।
কামরুল হাসান বলেন, এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৩ জন। এর মধ্যে কুমিল্লায় ৬ জন, ফেনীতে একজন, চট্টগ্রামে ৫ জন, খাগড়াছড়িতে একজন, নোয়াখালীতে ৫ জন, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় একজন, লক্ষ্মীপুরে একজন ও কক্সবাজারে ৩ জন বন্যার কারণে মারা গেছেন ৷ এছাড়াও মৌলভীবাজারে ২ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সোমবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। উজানে নদ-নদীর পানি কমার ধারা অব্যাহত আছে। ফলে বর্তমানে ফেনী ও কুমিল্লা জেলার নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে।
একই সঙ্গে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। তবে এখনও কুশিয়ারা, গোমতি ও মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময়ে এ অঞ্চলের কুমিল্লা জেলার গোমতী নদীর পানি কমতে পারে এবং এ অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে। তবে কোনও কোনও স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আজ দেশের তিনটি নদীর তিন স্টেশনের পানি বিপৎসীমার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার ৪ নদীর ৬টি স্টেশনের পানি বিপদসীমার ওপরে ছিল। এরমধ্যে গোমতির নদীর কুমিল্লা স্টেশনের পানি ৭৮ থেকে নেমে আজ ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।
এছাড়া মুহুরী নদীর পরশুরাম স্টেশনের পানি আজ বিপৎসীমার ওপরে আছে। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানির উচ্চতা সম্পর্কে জানা যায়নি। এদিকে রোববার কুশিয়ারা নদীর পানি তিন স্টেশনে বিপৎসীমার ওপরে থাকলেও আজ তা নেমে শুধু অমলশীদ পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। রবিবার বিপৎসীমার ওপরে থাকা মনু নদীর মৌলভীবাজার স্টেশনের পানি আজ বিপৎসীমার নিচে নেমে গেছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদীর পানি আরও কমতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, তবে কোনও কোনও স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উজানে মাঝারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে। এ সময় এ অঞ্চলের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরি, কর্ণফুলী, হালদা ও অন্যান্য প্রধান নদীগুলোর পানি সময় বিশেষে বাড়তে পারে।
এছাড়াও ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমছে, গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল আছে, উত্তরাঞ্চলের তিস্তা-ধরলা-দুধকুমার নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিরাজমান আছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
দেশে সোমবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে যশোরে ২২২ মিলিমিটার। এছাড়া বরগুনায় ১২০, বরিশালে ১০৪, টেকনাফে ১০১, পটুয়াখালী ৮৮, নোয়াখালী ৮৭, গোপালগঞ্জের হরিদাশপুরে ৮৫, কক্সবাজারে ৮২ এবং বান্দরবানের লামায় ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে উজানে আসামের তেজপুরে ১৯, ত্রিপুরায় ১২ এবং চেরাপুঞ্জিতে ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, আজ রাতে একসঙ্গে ফারাক্কা বাঁধের ১০৯টি জলকপাট খুলে দেওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জসহ আশেপাশের জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নতুন কোনও তথ্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায়নি।
বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সরকারি-বেসরকারিসহ সব পর্যায় থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে জানিয়ে মন্ত্রণালয় বলছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১১ জেলায় মোট ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ২০ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবার, ৩৫ লাখ টাকার শিশুখাদ্য এবং ৩৫ লাখ টাকার গো-খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের জিওসির তথ্যের বরাত দিয়ে ত্রাণ সচিব জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে কুমিল্লা জেলার সব উপজেলায় সড়ক পথে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া সেনাবাহিনীর ৪টি মেডিকেল টিম প্রয়োজনীয় ওষুধসহ কুমিল্লা জেলার ৪ উপজেলায় নিয়োজিত করা হয়েছে।
ফেনীতে স্বাস্থ্য সেবা দিতে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব বলেন, সেনাবাহিনী ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসকরা সেবা দিচ্ছন। পাশাপাশি স্থানীয় ক্লিনিক, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্যার্তদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকগণ নির্দেশনা দিয়েছেন।
কামরুল হাসান বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সচিব কামরুল হাসান বলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে সহায়তা (চেক/পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে) দিতে চান তারা প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছেও তা দিতে পারেন। সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই সহায়তা নেওয়া হবে।
যারা ত্রাণ তহবিলে সহায়তা (চেক/পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট এর মাধ্যমে) দিতে ইচ্ছুক তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব অঞ্জন চন্দ্র পাল (মোবাইল ০১৭১৮-০৬৬৭২৫) এবং সিনিয়র সহকারী সচিব শরিফুল ইসলামের (মোবাইল-০১৮১৯২৮১২০৮) সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন ত্রাণ সচিব।
নোয়াখালীতে আবারও বেড়েছে পানি
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত নোয়াখালীতে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে আবারও বাড়ছে পানি। আবহাওয়া কিছুটা ভালো থাকায় বৃহস্পতিবার থেকে গত শনিবার বিকেল পর্যন্ত পানি কিছুটা কমলেও সেদিন রাত ১০টার পর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে আবারও কোথাও কোথাও এক ফুট থেকে দুই ফুট পানি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। জেলা প্রশাসনের হিসাবে জেলায় ২০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি আছেন।
বন্যার কারণে জেলায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, সেনবাগ উপজেলার ইয়ারপুর গ্রামের জিলহাজুল ইসলাম (১০), কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট পশ্চিম পাড়ার দুই বছর বয়সী শিশু আবদুর রহমান এবং সদর উপজেলার কালাদরপ ইউনিয়নের পূর্ব শুল্লকিয়া গ্রামের আড়াই বছরের রিয়ান। এরমধ্যে শিশু রিয়ান বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। এছাড়াও বন্যার পানির কারণে ঘরের ভেতর বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যান সেনবাগ উপজেলার দক্ষিণ মোহাম্মদপুর গ্রামের কাকন কর্মকার (৩০) ও বেগমগঞ্জের চৌমুহনী পৌরসভার আলীপুর গ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৫০)।
এদিকে ফেনী থেকে বন্যার পানি ডাকাতিয়া নদী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে সেনবাগ, সোনাইমুড়ি, চাটখিল ও বেগমগঞ্জ উপজেলায় পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নোয়াখালী বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি ও জনদুর্ভোগ বাড়ার আশংকা রয়েছে।
বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। প্রতিটি বাড়িতে ৩ থেকে ৫ ফুট জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে ৬ থেকে ৭ ফুট। বসতঘরে পানি প্রবেশ করায় বুধবার রাত পর্যন্ত অনেকে খাটের ওপর অবস্থান করলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তারা নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্র, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান নিয়েছেন। বসত ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় খাবার সংকটে রয়েছে বেশির ভাগ মানুষ। জেলার প্রধান সড়কসহ প্রায় ৮০ ভাগ সড়ক কয়েক ফুট পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। সড়কগুলোতে যান চলাচল অনেকটাই কম।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আট উপজেলার ৮৭ ইউনিয়ন ও সাতটি পৌরসভার ২০ লাখ ৩৬ হাজার সাতশ মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। এরমধ্যে আটশ ২৬টি কেন্দ্রে একলক্ষ ৫৩ হাজার চারশ ৫৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দী মানুষের জন্য নগদ ৪৫ লক্ষ টাকা ও ১৮শ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় ৮৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
ফেনীর তিন উপজেলায় বেড়েছে বন্যার পানি
ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলায়। বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে মুহুরি কহুয়া ও ছিলোনিয়া নদীর পানি ৷ তবে পানিবন্দি রয়েছেন এসব এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ ৷ ফেনী পৌর শহরের দু-তিনটি সড়ক ও বাসা বাড়িতে পানি কমলেও এখনো অনেক সড়ক ও বিভিন্ন ভবনের নিচতলা পানিতে সয়লাব।
ইতোমধ্যে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে ফেনী সদর, সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা উপজেলায়। বন্যা এখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে । এখানে এখনও পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ৷ বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার জন্য ফেনীর মুহুরী রেগুলেটরের ৪০টি স্লুইসগেট ও নোয়াখালীর মুছাপুরের ১৭ টি স্লুইসগেট খুলে দেয়া হয়েছে।
গত রবিবার থেকে ফেনী শহরের বিদ্যুতের ৯টি লাইন সচল হয়েছে, তবে দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত ৪দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকার পর রবিবার বিকেল থেকে যান চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। জেলার অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল রয়েছে।
ফেনীতে বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ডুবুরি দলসহ বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী টিম পরশুরাম ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা এলাকায় নৌকা, স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ তৎপরতা চলমান রেখেছে ৷ এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও স্থানীয়ভাবে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা হতে আগত সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক সংগঠন, মানবিক সংগঠন তথা বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন জনগণের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় জেলার ১টি এবং ছয়টি উপজেলায় ছয়টি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি ৬টি হাসপাতালে মেডিকেল ক্যাম্প চালু রয়েছে। জেলা শহরে এসব বেসরকারি হাসপাতালসমূহ হল: কনসেপ্ট হাসপাতাল, মেডিনোভা হাসপাতাল মেডিল্যাব, আল আকসা হাসপাতাল, জেড ইউ মডেল হাসপাতাল, মিশন হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্যাকবলিত মানুষজনদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খিচুড়ি ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত জেলায় ৮ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত। এপর্যন্ত ১ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে উদ্ধার করে বিভিন্ন আস্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট লোকজন উঁচু ভবনে বা ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন।
একই সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে ৬০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ৩৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মুছাম্মত শাহীনা আক্তার বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে কন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণের সহযোগিতা ও উদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজ ও আপামর জনগণের সহযোগিতা পেলে সুন্দরভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এই দুর্যোগময় মুহূর্তে ব্যবসায়ীদের প্রতি মানবিক হতে আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বন্যাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আপনার দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়াবেন না।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। এই মুহূর্তে ফেনীতে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় এখনও অপ্রতুল। স্থানীয়রা জানান, এসব বিষয় জরুরিভাবে ব্যবস্থা না হলে এখানে গুরুতর মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের ২০ আগস্ট থেকে অতি ভারী বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে ফেনী জেলায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এ অঞ্চলের মুহুরী কহুয়া সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে অন্তত ৩০ স্থান ভেঙে পানি ঢুকে বন্যার সৃষ্টি হয়। গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রথম দফা এবং চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের দ্বিতীয় দফা এবং ২০ আগস্ট থেকে তৃতীয় দফা বন্যাকবলিত হয় এসব উপজেলার মানুষজন।
আগামী ৩-৪ দিনের মধ্যে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই তথ্য নিশ্চিত করেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করাবেন এবং এই রাজকীয় অনুষ্ঠানে প্রায় এক হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের গেজেট প্রকাশের পর জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রথমে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের আয়োজন করবে। সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পরই নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সংসদীয় দলনেতা নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি তাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাবেন এবং দলনেতার দেওয়া নামের তালিকা অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্টদের শপথের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে। সচিব সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান নিশ্চিতভাবেই সম্পন্ন হবে।
উল্লেখ্য যে, গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এর পরদিন শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) ২৯৭টি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকায় চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসনের ফলাফল সম্বলিত গেজেট বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে। সংসদীয় বিধিমালা ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় এখন দেশ নতুন সরকার গঠনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ায় তারেক রহমান ও তার দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন কমনওয়েলথ মহাসচিব শার্লি বোচওয়ে।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক বার্তার মাধ্যমে তিনি এই অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন।
শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে শার্লি বোচওয়ে বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং গণভোটে অবদান রাখা সব নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানকে আমি প্রশংসা করি এবং বাংলাদেশ ও এর গণতন্ত্রকে সমর্থন করার জন্য কমনওয়েলথের অঙ্গীকার পুনর্নিশ্চিত করছি।’
উল্লেখ্য যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৭টি আসনের মধ্যে বিএনপি এককভাবে ২০৯টিতে জয়লাভ করেছে। এছাড়া ফল ঘোষণা স্থগিত থাকা আরও দুটি আসনেও দলটির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন এবং তাদের শরিকেরা পেয়েছে তিনটি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের অন্যান্য শরিকেরা লাভ করেছে ৯টি আসন। প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির এমন ফলাফলের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণ স্পষ্ট হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আমেজ কাটিয়ে আবারও চিরচেনা কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। নির্বাচনের বিশেষ ছুটি শেষে আগামীকাল রোববার থেকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি অফিস-আদালত খুলে যাচ্ছে। ফলে নাড়ির টানে গ্রামে যাওয়া মানুষ আজ শনিবার ছুটির শেষ দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় পরিসরে রাজধানীতে ফিরতে শুরু করেছেন। আজ সকাল থেকেই রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে ঢাকামুখী মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে রেলপথ ও সড়কপথে যাত্রীদের চাপ ছিল সবচেয়ে বেশি।
রাজধানীর প্রধান রেলওয়ে স্টেশন কমলাপুরে আজ ভোর থেকেই দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল থেকে আসা প্রতিটি ট্রেনই ছিল যাত্রীতে ঠাসা। স্টেশন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সূচি মেনে অধিকাংশ ট্রেন ঢাকায় পৌঁছালেও প্রতিটি কোচে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী দেখা গেছে। কমলাপুর রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ফিরতে পারেন সেজন্য রেলওয়ে বিভাগ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দুপুরের পর থেকে যাত্রীদের এই ভিড় আরও বেড়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে এই প্রবাহ আগামীকাল রোববার সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
সড়কপথের প্রধান টার্মিনাল গাবতলী, সায়েদাবাদ ও মহাখালীতেও সকাল থেকে ঢাকামুখী বাসের চাপ বেড়েছে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে আসা বাসগুলোতে সিট না পেয়ে অনেককে বিকল্প উপায়ে ফিরতে দেখা গেছে। বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তঃজেলা রুটের বাসের অধিকাংশ টিকিট আগেই বিক্রি হয়ে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তে যারা ফিরছেন তাদের কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের ছুটিতে যাওয়ার সময় যাত্রীরা দীর্ঘ যানজটের সম্মুখীন হলেও ফেরার পথে এখন পর্যন্ত বড় কোনো ভোগান্তির খবর পাওয়া যায়নি। তবে আজ রাতের দিকে মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একই চিত্র দেখা গেছে নৌপথেও। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে আজ সকাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বড় বড় লঞ্চগুলো যাত্রীদের নিয়ে ভিড়তে শুরু করেছে। লঞ্চের ডেক থেকে শুরু করে কেবিন—সবখানেই ছিল মানুষের সরব উপস্থিতি। কর্মস্থলে ফেরার তাগিদে মানুষ ভিড় ঠেলে লঞ্চে করে ঢাকায় আসছেন। অন্যদিকে, আজ শনিবার ছুটির দিন হওয়ায় রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রাস্তাগুলোতে যানজট ও মানুষের চলাচল তুলনামূলক কম থাকলেও শহরের প্রবেশপথগুলোতে ছিল ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোট উপলক্ষে যানবাহনের ওপর যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তা আজ থেকে পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন রাজপথে বাস, মিনিবাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে। এমনকি মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাও আজ থেকে আর কার্যকর নেই। এর ফলে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও সহজতর হয়েছে। আগামীকাল রোববার অফিস খুললে ঢাকা শহর আবারও তার নিয়মিত ব্যস্ততা ও যানজটের চিরচেনা রূপে ফিরবে বলে মনে করা হচ্ছে। মানুষের এই ফিরে আসার মধ্য দিয়ে প্রাণহীন ঢাকা আবারও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব সফলভাবে পালন শেষে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পুনরায় তাঁর আগের পেশায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আজ শনিবার বেলা ১১টায় রাজধানীর বেইলি রোডে অবস্থিত ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি জানান যে, দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের পথ সুগম হওয়ার পর ড. ইউনূস তাঁর শিক্ষকতা, গবেষণা ও সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত পূর্বের কর্মকাণ্ডে মনোনিবেশ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে আলী রীয়াজ সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলেন, গণভোটের এই ঐতিহাসিক রায় থেকে এটি স্পষ্ট যে, দেশের সাধারণ মানুষ আর কোনোভাবেই পুরোনো শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে ফিরে যেতে চায় না। সাধারণ নির্বাচনের চেয়েও গণভোটে ভোটারদের অংশগ্রহণের হার বেশি হওয়াকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ। জনগণের এই স্পষ্ট রায়কে ধারণ করে রাজনৈতিক দলগুলো আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে যেসব অঙ্গীকার করেছে, তারা তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকবে বলেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বাস করে। বিশেষ করে বিএনপির প্রশংসা করে তিনি বলেন, দলটি অতীতেও দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে বিশেষ বিশেষ সংস্কার কার্যক্রমে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই পথটি বেশ কঠিন হলেও যদি সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে ঐকমত্য থাকে, তবে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব হবে। তিনি দলগুলোর প্রতি জনগণের রায়কে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করারও আহ্বান জানান।
একই সাথে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে আলী রীয়াজ সংস্কার কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপগুলো নিয়েও আলোকপাত করেন। তিনি জানান, দেশের শাসনব্যবস্থাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক করতে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা তথা সংসদের উচ্চ কক্ষ প্রবর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় যাবতীয় আইনি ও প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। মূলত একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের শেষ মুহূর্তের কাজগুলো গুছিয়ে আনছে বলে তিনি সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন। প্রধান উপদেষ্টার এই প্রস্থানের ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন উদাহরণ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের সময়সূচি নিয়ে বড় তথ্য জানিয়েছে সরকার। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিজয়ী সকল প্রার্থীর শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেন। নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বিজয়ীদের নামের গেজেট প্রকাশের পর এখন রাষ্ট্র পরিচালনার পরবর্তী ধাপ হিসেবে এই শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম ব্রিফিংয়ে বলেন, সরকার এবং নির্বাচন কমিশন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে চাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী ১৬ অথবা ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। কোনোভাবেই এটি এর চেয়ে বেশি দেরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মূলত গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে শপথ নেওয়ার সাংবিধানিক ও প্রথাগত রীতির কথা মাথায় রেখেই প্রশাসন ও জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। এই শপথ গ্রহণের মাধ্যমেই নতুন সংসদ সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আইনি বৈধতা ও দায়িত্ব বুঝে নেবেন।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গতকাল শুক্রবার রাতেই নির্বাচন কমিশন ২৯৭টি আসনের বিজয়ীদের নামের গেজেট প্রকাশ করেছে। প্রেস সচিবের এই ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই নতুন সংসদ সদস্যরা রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে স্পিকারের কাছে শপথ নেবেন। শপথ গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন এবং মন্ত্রিসভা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা দেশে দীর্ঘ দেড় বছর পর একটি নির্বাচিত সরকারের পথ চলা নিশ্চিত করবে।
ব্রিফিংয়ে প্রেস সচিব আরও ইঙ্গিত দেন যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশ পুনর্গঠনের কাজে দ্রুত গতি আনতে সরকার এই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে চায় না। নির্বাচনের পর থেকে দেশে বিরাজমান স্থিতিশীল পরিবেশ ও উৎসবমুখর আবহে এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হবে। ফরেন সার্ভিস একাডেমির এই ব্রিফিংয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন এবং নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর এই সময়সূচিকে রাজনৈতিক অঙ্গনের বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জয়লাভ করায় দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে পাঠানো এক বিশেষ অভিনন্দন বার্তায় তিনি এই শুভকামনা জানান। প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বার্তায় এই বিজয়কে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন এবং আগামী দিনে একটি সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অভিনন্দন বার্তায় প্রফেসর ইউনূস উল্লেখ করেন যে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির এই বিপুল বিজয় দেশের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে জনগণের এক সুস্পষ্ট রায়। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারেক রহমান তাঁর প্রজ্ঞা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনকল্যাণমুখী চেতনার প্রতিফলন ঘটাবেন। প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন এই নেতৃত্বের হাত ধরে বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও উন্নয়নমুখী পথে এগিয়ে যাবে, যেখানে আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা বিশেষভাবে স্মরণ করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও রাষ্ট্রদর্শন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব ও গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকারের কথা। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাবা-মায়ের এই মহান আদর্শ তারেক রহমানের আগামী দিনের পথচলাকে আরও আলোকিত ও সুদৃঢ় করবে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, অর্থনৈতিক রূপান্তর, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান মজবুত করতে সুসমন্বিত মেধা ও প্রজ্ঞার প্রয়োগ অপরিহার্য হবে।
এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালনকালে তারেক রহমানের গঠনমূলক ভূমিকা ও মূল্যবান সহযোগিতার জন্য প্রফেসর ইউনূস আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, দেশের এই পরিবর্তনের সংবেদনশীল সময়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তারেক রহমান যে সহনশীলতা প্রদর্শন করেছেন, তা জাতীয় স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরিশেষে, দেশের মানুষের কল্যাণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন সরকারের সব উদ্যোগের সফলতা কামনা করে প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের প্রজ্ঞা ও ধৈর্য কামনা করেন। তারেক রহমানের এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশে জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে বলে তিনি বার্তার শেষে উল্লেখ করেন।
‘বাতাসে বহিছে প্রেম, নয়নে লাগিল নেশা কারা যে ডাকিল পিছে! বসন্ত এসে গেছে...’—কবির এই পঙক্তিমালাকে সত্য প্রমাণ করে প্রকৃতিতে আজ নতুনের আবাহন। আজ পয়লা ফাল্গুন, ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিন। বাংলা সনের একাদশ মাসের এই আগমনী বার্তায় শীতের রুক্ষতা বিদায় নিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে নতুন প্রাণের স্পন্দন। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের হাত ধরে যে বসন্ত উৎসবের সূচনা হয়েছিল, আজ তা ছড়িয়ে পড়েছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। কাকতালীয়ভাবে আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হওয়ায় বসন্তের বাসন্তী রঙের সাথে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ও ভালোবাসার আবেশ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
বসন্ত মানেই প্রকৃতির এক অনন্য রূপান্তর। কচি পাতায় ভরে ওঠা গাছ, আম্রমুকুলের ম ম গন্ধ আর পাখির কলকাকলিতে মুখরিত চারিদিক। শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার লাল আভা যেন প্রকৃতির কপালে এক নতুন টিপ পরিয়ে দিয়েছে। বসন্তের এই মোহনীয় দিনে তরুণ-তরুণীরা বাসন্তী ও হলুদ রঙের পোশাকে সেজে উৎসবে মেতে উঠেছে। নারীদের মাথায় ফুলের টায়রা আর খোঁপায় গোঁজা গাঁদা ও গোলাপ ফুল বসন্তের রঙকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তে বসন্ত বরণ উৎসবের বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে সংগীত ও নৃত্যের ছন্দে ঋতুরাজকে স্বাগত জানানো হচ্ছে।
ঐতিহাসিকভাবে ফাল্গুন মাসের নামকরণ হয়েছে ‘ফাল্গুনী’ নক্ষত্র থেকে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকেও এই মাসের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তবে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পয়লা ফাল্গুন উদযাপনের শেকড় রয়েছে গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। তৎকালীন পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাঙালির স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে রবীন্দ্রসংগীতের সুর আর দেশীয় ঢঙে বসন্ত পালন ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিবাদ। বাংলা সাহিত্যে বসন্ত নিয়ে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী কবিতায় বলেছিলেন, ‘ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত’। একইভাবে বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ‘বসন্ত বাতাসে’ গানটি আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বসন্তের আবহ তৈরি করে।
তবে বাঙালির কাছে ফাল্গুন মাস কেবল আনন্দ বা প্রেমের ঋতু নয়, এটি দ্রোহ এবং ত্যাগের রক্তিম ইতিহাস বহন করে। বায়ান্নর এই ফাগুনেই রফিক, সালাম, বরকত আর জব্বাররা রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে রক্ষা করেছিলেন মায়ের ভাষার মর্যাদা। শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙ আজও আমাদের বায়ান্নর সেই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের কথা মনে করিয়ে দেয়। ভাষা আন্দোলনের সেই লড়াই থেকেই মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত হয়েছিল। তাই ফাগুন আমাদের কাছে যেমন মিলনের মাস, তেমনি এটি বাঙালির দ্রোহ ও অধিকার আদায়ের মাসও বটে। ঋতুরাজের এই নতুন যাত্রায় প্রতিটি মানুষের মনে জরাজীর্ণতা মুছে গিয়ে নতুন সম্ভাবনা জাগুক—এমনই প্রত্যাশা আজ সবার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশের জনগণকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল দেশ গড়ার লক্ষ্যে নতুন বাংলাদেশের পথচলায় পূর্ণ সমর্থন ও সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিশ্বসংস্থাটি। শুক্রবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে আয়োজিত নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের পক্ষে এই প্রতিক্রিয়া জানান তাঁর মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন করায় তিনি বাংলাদেশের জনগণের সাহসিকতা ও অংশগ্রহণের প্রশংসা করেন।
ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচন ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়ে গণভোট আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ যে রায় দিয়েছে, তাকে জাতিসংঘ স্বাগত জানায়। তিনি স্পষ্ট করেন যে, একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের প্রচেষ্টায় জাতিসংঘ সবসময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে। মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে উদ্ধৃত করে তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক জাতীয় সংহতি জোরদার করা এবং বিভেদ ভুলে দেশ গঠনে একাত্ম হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে নতুন সরকারের কাছে মানবাধিকার রক্ষা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে। স্টিফান ডুজারিক বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা অপরিহার্য। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশে যেসব টেকসই সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা যেন স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছে বিশ্বসংস্থাটি। মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বজায় রাখার মাধ্যমেই বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাতে পারবে বলে মনে করেন মহাসচিব।
অন্যদিকে, প্রেস ব্রিফিংয়ের এক পর্যায়ে আসন্ন পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে বিশ্ববাসীর উদ্দেশে বিশেষ বার্তা প্রদান করেন আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বর্তমান বিশ্বের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইয়েমেন ও সুদানের মতো দেশগুলোতে মানুষ চরম ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। রমজানের ত্যাগের মহিমা ও শান্তির তাৎপর্য মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আর্তমানবতার সেবা এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় বিশ্বনেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতিসংঘের এই ইতিবাচক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষিকা শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও আদর্শিক অবস্থান নিয়ে এক দীর্ঘ ও স্পষ্ট পোস্ট দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। শুক্রবার এক ফেসবুক বার্তার মাধ্যমে তিনি নিজেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে দাবি করেন। একই সাথে তাকে নিয়ে প্রচলিত নানা রাজনৈতিক তকমা বা বিশেষণের বিষয়েও নিজের খোলামেলা মতামত ব্যক্ত করেছেন তিনি। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ১১ দলীয় জোটের পক্ষে সক্রিয় সমর্থক হিসেবে কাজ করেছেন বলে ওই পোস্টে উল্লেখ করেন।
শেহরীন আমিন মোনামী তার পোস্টে জানান, সমাজের একটি বড় অংশ তাকে ‘জামায়াত-শিবির ম্যাডাম’ হিসেবে সম্বোধন করে থাকে। তবে এই বিশেষণে তিনি মোটেও বিচলিত বা ক্ষুব্ধ নন; বরং তিনি এই পরিচয়ে বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। তিনি বলেন, কখনো কখনো তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথেই এই নামগুলো নিজের করে নেন। তার মতে, কে তাকে কী নামে ডাকল তার চেয়ে তার আদর্শিক বিশ্বাসটি তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের রাজনৈতিক দর্শনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই শিক্ষিকা উল্লেখ করেন যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে একজন মধ্যপন্থী মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাকে প্রায়ই ডানপন্থী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি তাকে ডানপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করলে সাধারণ মানুষের বুঝতে সুবিধা হয়, তবে তারা সেটিই বিশ্বাস করতে পারেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি অবিচল থাকার কথা জানান এবং স্পষ্টভাবে বলেন যে, তিনি কোনোভাবেই ইসলামবিদ্বেষী নন। প্রচলিত একটি ধারণা যে ‘ইসলাম নারী-বিরোধী’, এই বিশ্বাসের সাথেও তিনি সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষণ করেন।
পোস্টের শেষ অংশে তিনি তার ফ্রেন্ড লিস্ট এবং অনুসারীদের উদ্দেশ্যে একটি কড়া বার্তা দেন। তিনি বলেন, যারা তার রাজনৈতিক অবস্থান বা আদর্শ নিয়ে অস্বস্তিতে আছেন, তারা যেন তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানো থেকে বিরত থাকেন। নিজেকে একজন উদারপন্থী দাবি করে তিনি জানান, ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় পছন্দ-অপছন্দ নির্বিশেষে তিনি সবার অধিকারের পক্ষে কথা বলেন। তিনি তার অপছন্দের মানুষদের নিজের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার অনুরোধ জানিয়ে বলেন যে, সবার কাছে প্রিয় হওয়া তার লক্ষ্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষিকার এমন সাহসী ও স্পষ্টবাদী বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নিরঙ্কুশ ও অভাবনীয় জয়ে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) তারেক রহমানকে ফোন করার বিষয়টি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিশ্চিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় নরেন্দ্র মোদি এই ফোনালাপের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, "তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে আনন্দিত। বাংলাদেশের নির্বাচনে অসাধারণ বিজয়ের জন্য আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছি। বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্খা পূরণে তার প্রচেষ্টায় আমি আমার শুভেচ্ছা ও সমর্থন জানাই।"
দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ও নিবিড় সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, "গভীর শিকড়ে আবদ্ধ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কযুক্ত দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে আমি আমাদের উভয় দেশের শান্তি, অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধির প্রতি ভারতের অব্যাহত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছি।" মূলত বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রতিবেশী দেশ ভারতের পক্ষ থেকে শীর্ষ পর্যায়ের এই শুভেচ্ছা ও সমর্থন নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি নরেন্দ্র মোদির এই বিশেষ অভিনন্দন বার্তাটি দুই দেশের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার অঙ্গীকার হিসেবেই প্রকাশ পেয়েছে।
নতুন বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত ঐতিহাসিক গণভোটে সংস্কারপন্থী ‘হ্যাঁ’ পক্ষ বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করেছে। নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই গণভোটের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, এই গণভোটে মোট ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যেখানে সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং বিপক্ষে ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। জনগণের এই বলিষ্ঠ রায়ের মাধ্যমে ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখাটি চূড়ান্তভাবে জনসমর্থিত হিসেবে গৃহীত হলো বলে কমিশন নিশ্চিত করেছে।
একই সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২৯৭টি আসনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল ঘোষণা করা হয়, যেখানে ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো। এর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এককভাবে ২০৯টি আসন লাভ করে সরকার গঠনের পথ সুগম করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ৭৭টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে জয়লাভ করেছে। মূলত শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়া এই নির্বাচনে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দলগত ফলাফলের বিস্তারিত বিশ্লেষণে ইসি সচিব জানান যে, জামায়াতে ইসলামী একক দল হিসেবে ৬৮টি আসন পেয়েছে। এ ছাড়া জোটভুক্ত অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদ প্রত্যেকে ১টি করে আসন লাভ করেছে। তবে আইনি ও মামলা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে এবং প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে শেরপুর-৩ আসনের ভোটগ্রহণ আগেই স্থগিত করা হয়েছিল। ইসি সচিব আখতার আহমেদ তার সমাপনী বক্তব্যে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই ফলাফলগুলোর সরকারি গেজেট প্রকাশের প্রত্যয় ব্যক্ত করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার জন্য সকল পক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু।
আজ শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বিশেষ বার্তার মাধ্যমে তিনি এই অভিনন্দন জানান। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট বলেন, "আমি আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা জানাই এবং মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতাকে আরও অগ্রসর ও গভীর করতে একসঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার জন্য উন্মুখ। আমি আত্মবিশ্বাসী যে, আমাদের অংশীদারিত্ব সামনের বছরগুলোতে আরও সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তিশালী করবে।"
মূলত নবনির্বাচিত এই নেতৃত্বের অধীনে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং সামনের বছরগুলোতে দুই দেশের অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী হবে বলেই মনে করছেন মালদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধান। এছাড়া এই জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে বলে আন্তর্জাতিক মহলে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজ শুক্রবার দেশের ২৯৭টি সংসদীয় আসনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টার দিকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান যে, গতকাল অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।
কমিশনের দাবি অনুযায়ী, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতিরেকে দেশজুড়ে ভোটগ্রহণ ছিল সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ। ব্রিফিংকালে আখতার আহমেদ বলেন, "সারা দেশে মোট ২৯৯টি সংসদীয় আসনে সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিক গণনা শেষে কমিশন নিশ্চিত হয়েছে, এবারের নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের হার ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।"
সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র সচিব আরও জানান যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের সকল স্তরের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটারদের স্বাভাবিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। কিছু জায়গায় অনাকাঙ্ক্ষিত খবর পাওয়া গেলেও বড় ধরনের কোনো সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ২৯৯টি আসনের মধ্যে প্রস্তুতকৃত ২৯৭টির ফলাফল আজই গেজেটভুক্ত করা হচ্ছে এবং বাকি দুটি আসনের কারিগরি বা আইনি প্রক্রিয়া শেষে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে জয়ী প্রার্থীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির কার্যক্রম শেষ হবে এবং এর পরই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে। মূলত স্বচ্ছতা বজায় রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার লক্ষ্যেই আজ এই গেজেট জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।