সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
২০ মাঘ ১৪৩২

নামছে বন্যার পানি, ভেসে উঠছে ক্ষয়-ক্ষতির চিহ্ন

ছবি: সংগৃহীত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত
দৈনিক বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত : ২৬ আগস্ট, ২০২৪ ২১:৪৪

আক্রান্ত ১১ জেলা থেকে ধীরে ধীরে নামছে বন্যার পানি। তবে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। দুর্গম যেসব এলাকায় এত দিন যাওয়া সম্ভব হয়নি সরকারি-বেসরকারি ত্রাণকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের, এখন সেসব এলাকায় পৌঁছাচ্ছেন তারা। তবে ত্রাণের জন্য হাহাকার সবখানে। আশার কথা, নতুন বাংলাদেশে বন্যা মোকাবিলায় সব মানুষ দাঁড়িয়েছেন একসঙ্গে। তাই গত ৫ দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আহ্বানে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ সাড়া দিচ্ছেন, প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে তার ত্রাণ তহবিলেও মিলছে বিপুল সাড়া। তবে উপদ্রুত এলাকার মানুষ চাইছেন নগদ সহায়তা-ত্রাণের খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধের পাশাপাশি ঘরবাড়ি মেরামত এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও কৃষিতে সহায়তা। তবে সব মহলের একটা লক্ষ্য, যত দ্রুত সম্ভব পানিবন্দি মানুষের কাছে ত্রাণ হিসেবে খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া। এদিকে, জলমগ্ন এলাকাগুলোতে বারবার পানিতে নামতে বাধ্য হওয়ায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। উপদ্রুত জেলাগুলোতে ডায়রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকার হাসপাতালগুলোসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে একযোগে কাজ করছেন চিকিৎসক-নার্সদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরা।

এদিকে, বন্যার পানি নামতে শুরু করায় বোঝা যাচ্ছে ক্ষয়-ক্ষতির মাত্রা। ফেনী শহরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মো. সাখাওয়াত হোসেন দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘গত শুক্রবার আসরের নামাজের পরেও তার এলাকাতে বন্যার লেশমাত্র ছিল না। তবে কোথা থেকে হঠাৎ এত দ্রুত গতিতে ঢলের পানি আসা শুরু করে যে মাগরিবের নামাজের আগেই কোমরসমান পানিতে ভরে যায় চারপাশ। প্রাণে বাঁচতে তার চার তলা বাসায় মুহূর্তে প্রতিবেশীদের অনেকে ভিড় করেন। এ কয় দিন বাসার দোতলা থেকে চতুর্থ তলায় বাসিন্দারাসহ ৪০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। এমন প্রতিবেশীও প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ে ছিলেন যাদের তিনি আগে চিনতেনও না। পানি ছিল ভীষণ ঠাণ্ডা। এখন পানি মোটামুটি নেমে গেছে। তবে নিচতলার ভাড়াটিয়া কোনো কিছুই সরাতে পারেননি। তার সব সম্পদ পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এমন অবস্থা শহরের একতলা বা টিনশেডসহ সাধারণ ঘরে যারা ছিলেন তাদের সবার। এসব মানুষ সব হারিয়েছেন। তারা এখন কীভাবে বাঁচবেন তা আল্লাহ জানেন। এমন ঢল আমার জীবনে কখনো দেখিনি।’

বন্যায় ক্ষতির এমন চেহারা প্রায় সবখানে। পুকুরসহ মাছের ঘেরগুলো ভেসে গেছে, নষ্ট হয়েছে কৃষকের মাঠের ফসল, ব্যবসায়ীদের দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে সব মালপত্র, ঘরের কোনো আসবাবপত্র আর ব্যবহারযোগ্য নেই। এই পরিস্থিতি এখন ফেনী, নোয়াখালীসহ আশপাশের সবগুলো জেলায়।

এদিকে, চলমান বন্যায় ১১ জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বন্যায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জন। এছাড়া, ফেনী ও কুমিল্লা জেলার নিম্নাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। সব নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে।

আজ সোমবার বন্যা পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে এই তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল হাসান।

মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, বন্যা আক্রান্ত জেলার সংখ্যা ১১টি। এগুলো হচ্ছে ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। আক্রান্ত এসব জেলায় ৭৪টি উপজেলার মোট ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জন।

তিনি জানান, পানিবন্দি-ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের আশ্রয় প্রদানের জন্য মোট ৩ হাজার ৮৩৪ টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মোট ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৩ জন মানুষ এবং ২৮ হাজার ৯০৭ টি গবাদি পশুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ১১ জেলার ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা সেবা সেবায় মোট ৬৪৫টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে।

কামরুল হাসান বলেন, এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৩ জন। এর মধ্যে কুমিল্লায় ৬ জন, ফেনীতে একজন, চট্টগ্রামে ৫ জন, খাগড়াছড়িতে একজন, নোয়াখালীতে ৫ জন, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় একজন, লক্ষ্মীপুরে একজন ও কক্সবাজারে ৩ জন বন্যার কারণে মারা গেছেন ৷ এছাড়াও মৌলভীবাজারে ২ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সোমবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। উজানে নদ-নদীর পানি কমার ধারা অব্যাহত আছে। ফলে বর্তমানে ফেনী ও কুমিল্লা জেলার নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে।

একই সঙ্গে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। তবে এখনও কুশিয়ারা, গোমতি ও মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময়ে এ অঞ্চলের কুমিল্লা জেলার গোমতী নদীর পানি কমতে পারে এবং এ অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে। তবে কোনও কোনও স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আজ দেশের তিনটি নদীর তিন স্টেশনের পানি বিপৎসীমার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার ৪ নদীর ৬টি স্টেশনের পানি বিপদসীমার ওপরে ছিল। এরমধ্যে গোমতির নদীর কুমিল্লা স্টেশনের পানি ৭৮ থেকে নেমে আজ ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।

এছাড়া মুহুরী নদীর পরশুরাম স্টেশনের পানি আজ বিপৎসীমার ওপরে আছে। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানির উচ্চতা সম্পর্কে জানা যায়নি। এদিকে রোববার কুশিয়ারা নদীর পানি তিন স্টেশনে বিপৎসীমার ওপরে থাকলেও আজ তা নেমে শুধু অমলশীদ পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। রবিবার বিপৎসীমার ওপরে থাকা মনু নদীর মৌলভীবাজার স্টেশনের পানি আজ বিপৎসীমার নিচে নেমে গেছে।

আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদীর পানি আরও কমতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, তবে কোনও কোনও স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে।

আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উজানে মাঝারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে। এ সময় এ অঞ্চলের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরি, কর্ণফুলী, হালদা ও অন্যান্য প্রধান নদীগুলোর পানি সময় বিশেষে বাড়তে পারে।

এছাড়াও ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমছে, গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল আছে, উত্তরাঞ্চলের তিস্তা-ধরলা-দুধকুমার নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিরাজমান আছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

দেশে সোমবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে যশোরে ২২২ মিলিমিটার। এছাড়া বরগুনায় ১২০, বরিশালে ১০৪, টেকনাফে ১০১, পটুয়াখালী ৮৮, নোয়াখালী ৮৭, গোপালগঞ্জের হরিদাশপুরে ৮৫, কক্সবাজারে ৮২ এবং বান্দরবানের লামায় ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে উজানে আসামের তেজপুরে ১৯, ত্রিপুরায় ১২ এবং চেরাপুঞ্জিতে ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, আজ রাতে একসঙ্গে ফারাক্কা বাঁধের ১০৯টি জলকপাট খুলে দেওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জসহ আশেপাশের জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নতুন কোনও তথ্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায়নি।

বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সরকারি-বেসরকারিসহ সব পর্যায় থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে জানিয়ে মন্ত্রণালয় বলছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১১ জেলায় মোট ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ২০ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবার, ৩৫ লাখ টাকার শিশুখাদ্য এবং ৩৫ লাখ টাকার গো-খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের জিওসির তথ্যের বরাত দিয়ে ত্রাণ সচিব জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে কুমিল্লা জেলার সব উপজেলায় সড়ক পথে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া সেনাবাহিনীর ৪টি মেডিকেল টিম প্রয়োজনীয় ওষুধসহ কুমিল্লা জেলার ৪ উপজেলায় নিয়োজিত করা হয়েছে।

ফেনীতে স্বাস্থ্য সেবা দিতে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব বলেন, সেনাবাহিনী ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসকরা সেবা দিচ্ছন। পাশাপাশি স্থানীয় ক্লিনিক, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্যার্তদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকগণ নির্দেশনা দিয়েছেন।

কামরুল হাসান বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সচিব কামরুল হাসান বলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে সহায়তা (চেক/পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে) দিতে চান তারা প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছেও তা দিতে পারেন। সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই সহায়তা নেওয়া হবে।

যারা ত্রাণ তহবিলে সহায়তা (চেক/পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট এর মাধ্যমে) দিতে ইচ্ছুক তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব অঞ্জন চন্দ্র পাল (মোবাইল ০১৭১৮-০৬৬৭২৫) এবং সিনিয়র সহকারী সচিব শরিফুল ইসলামের (মোবাইল-০১৮১৯২৮১২০৮) সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন ত্রাণ সচিব।

নোয়াখালীতে আবারও বেড়েছে পানি

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত নোয়াখালীতে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে আবারও বাড়ছে পানি। আবহাওয়া কিছুটা ভালো থাকায় বৃহস্পতিবার থেকে গত শনিবার বিকেল পর্যন্ত পানি কিছুটা কমলেও সেদিন রাত ১০টার পর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে আবারও কোথাও কোথাও এক ফুট থেকে দুই ফুট পানি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। জেলা প্রশাসনের হিসাবে জেলায় ২০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি আছেন।

বন্যার কারণে জেলায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, সেনবাগ উপজেলার ইয়ারপুর গ্রামের জিলহাজুল ইসলাম (১০), কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট পশ্চিম পাড়ার দুই বছর বয়সী শিশু আবদুর রহমান এবং সদর উপজেলার কালাদরপ ইউনিয়নের পূর্ব শুল্লকিয়া গ্রামের আড়াই বছরের রিয়ান। এরমধ্যে শিশু রিয়ান বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। এছাড়াও বন্যার পানির কারণে ঘরের ভেতর বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যান সেনবাগ উপজেলার দক্ষিণ মোহাম্মদপুর গ্রামের কাকন কর্মকার (৩০) ও বেগমগঞ্জের চৌমুহনী পৌরসভার আলীপুর গ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৫০)।

এদিকে ফেনী থেকে বন্যার পানি ডাকাতিয়া নদী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে সেনবাগ, সোনাইমুড়ি, চাটখিল ও বেগমগঞ্জ উপজেলায় পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নোয়াখালী বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি ও জনদুর্ভোগ বাড়ার আশংকা রয়েছে।

বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। প্রতিটি বাড়িতে ৩ থেকে ৫ ফুট জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে ৬ থেকে ৭ ফুট। বসতঘরে পানি প্রবেশ করায় বুধবার রাত পর্যন্ত অনেকে খাটের ওপর অবস্থান করলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তারা নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্র, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান নিয়েছেন। বসত ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় খাবার সংকটে রয়েছে বেশির ভাগ মানুষ। জেলার প্রধান সড়কসহ প্রায় ৮০ ভাগ সড়ক কয়েক ফুট পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। সড়কগুলোতে যান চলাচল অনেকটাই কম।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আট উপজেলার ৮৭ ইউনিয়ন ও সাতটি পৌরসভার ২০ লাখ ৩৬ হাজার সাতশ মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। এরমধ্যে আটশ ২৬টি কেন্দ্রে একলক্ষ ৫৩ হাজার চারশ ৫৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দী মানুষের জন্য নগদ ৪৫ লক্ষ টাকা ও ১৮শ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় ৮৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।

ফেনীর তিন উপজেলায় বেড়েছে বন্যার পানি

ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলায়। বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে মুহুরি কহুয়া ও ছিলোনিয়া নদীর পানি ৷ তবে পানিবন্দি রয়েছেন এসব এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ ৷ ফেনী পৌর শহরের দু-তিনটি সড়ক ও বাসা বাড়িতে পানি কমলেও এখনো অনেক সড়ক ও বিভিন্ন ভবনের নিচতলা পানিতে সয়লাব।

ইতোমধ্যে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে ফেনী সদর, সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা উপজেলায়। বন্যা এখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে । এখানে এখনও পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ৷ বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার জন্য ফেনীর মুহুরী রেগুলেটরের ৪০টি স্লুইসগেট ও নোয়াখালীর মুছাপুরের ১৭ টি স্লুইসগেট খুলে দেয়া হয়েছে।

গত রবিবার থেকে ফেনী শহরের বিদ্যুতের ৯টি লাইন সচল হয়েছে, তবে দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত ৪দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকার পর রবিবার বিকেল থেকে যান চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। জেলার অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল রয়েছে।

ফেনীতে বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ডুবুরি দলসহ বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী টিম পরশুরাম ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা এলাকায় নৌকা, স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ তৎপরতা চলমান রেখেছে ৷ এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও স্থানীয়ভাবে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা হতে আগত সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক সংগঠন, মানবিক সংগঠন তথা বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন জনগণের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।

জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় জেলার ১টি এবং ছয়টি উপজেলায় ছয়টি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি ৬টি হাসপাতালে মেডিকেল ক্যাম্প চালু রয়েছে। জেলা শহরে এসব বেসরকারি হাসপাতালসমূহ হল: কনসেপ্ট হাসপাতাল, মেডিনোভা হাসপাতাল মেডিল্যাব, আল আকসা হাসপাতাল, জেড ইউ মডেল হাসপাতাল, মিশন হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্যাকবলিত মানুষজনদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খিচুড়ি ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত জেলায় ৮ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত। এপর্যন্ত ১ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে উদ্ধার করে বিভিন্ন আস্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট লোকজন উঁচু ভবনে বা ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন।

একই সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে ৬০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ৩৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মুছাম্মত শাহীনা আক্তার বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে কন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণের সহযোগিতা ও উদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজ ও আপামর জনগণের সহযোগিতা পেলে সুন্দরভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

এই দুর্যোগময় মুহূর্তে ব্যবসায়ীদের প্রতি মানবিক হতে আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বন্যাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আপনার দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়াবেন না।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। এই মুহূর্তে ফেনীতে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় এখনও অপ্রতুল। স্থানীয়রা জানান, এসব বিষয় জরুরিভাবে ব্যবস্থা না হলে এখানে গুরুতর মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের ২০ আগস্ট থেকে অতি ভারী বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে ফেনী জেলায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এ অঞ্চলের মুহুরী কহুয়া সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে অন্তত ৩০ স্থান ভেঙে পানি ঢুকে বন্যার সৃষ্টি হয়। গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রথম দফা এবং চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের দ্বিতীয় দফা এবং ২০ আগস্ট থেকে তৃতীয় দফা বন্যাকবলিত হয় এসব উপজেলার মানুষজন।

বিষয়:

নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে ডিএমপির হটলাইন চালু

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো ধরণের অনিয়ম রোধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) ডিএমপির পক্ষ থেকে তিনটি বিশেষ হটলাইন নম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে। এই নম্বরগুলোর মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর সাধারণ নাগরিকরা নির্বাচন সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ, তথ্য কিংবা জরুরি পরিস্থিতি সরাসরি পুলিশকে অবহিত করার সুযোগ পাবেন।

ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এই নতুন পদক্ষেপের বিস্তারিত তুলে ধরে জানান যে, নির্বাচনী আচরণবিধি অমান্য করা কিংবা কোনোভাবে ভোটারদের প্রভাবিত করার মতো ঘটনা ঘটলে নগরবাসী তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের সহায়তা নিতে পারবেন। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে কিংবা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কোনো পরিকল্পনা করে, তবে সে বিষয়ে পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপ নিশ্চিত করতেই এই হটলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী মাঠে সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, এই উদ্যোগ তারই একটি অংশ।

ডিএমপি ঘোষিত বিশেষ হটলাইন নম্বরগুলো হলো— ০১৩২০০৩৭৩৫৮, ০১৩২০০৩৭৩৫৯ এবং ০১৩২০০৩৭৩৬০। নগরবাসীকে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কিংবা নির্বাচনী এলাকায় কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ নজরে এলে দ্রুত এই নম্বরগুলোতে যোগাযোগ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। এসব নম্বরে প্রাপ্ত তথ্য বা অভিযোগের ভিত্তিতে ডিএমপির সংশ্লিষ্ট থানা বা বিশেষ টিম দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন উপহার দিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ সার্বক্ষণিক তৎপর রয়েছে। তবে কেবল পুলিশের প্রচেষ্টায় নয়, বরং সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সক্রিয় সহযোগিতা পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও বেশি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে। ডিএমপির পক্ষ থেকে সম্মানিত নগরবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে এবং ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সবাই যেন এই তথ্যসেবা গ্রহণ করেন। মূলত জনগণের আস্থা অর্জন এবং নির্বাচনের দিন যেকোনো ধরণের নাশকতা প্রতিরোধ করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।


টানা তৃতীয় দিনেও অচল চট্টগ্রাম বন্দর: চরম সংকটে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বন্দরের অতি গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর হাতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দেশর প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে অচলাবস্থা আরও ঘনীভূত হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারী ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির ডাকা টানা তৃতীয় দিনের কর্মবিরতির ফলে আজ সোমবারও (২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে দেশের এই অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ডের অপারেশনাল ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গত শনিবার ও রবিবার একই সময়সূচীতে সফল কর্মবিরতি পালনের পর আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি আদায়ে আজ আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা কর্মবিরতির প্রভাবে জেটিতে অবস্থানরত জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস এবং নতুন করে কনটেইনার লোডিং করার কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। বন্দর ইয়ার্ড থেকে কোনো ট্রাক বা কভার্ড ভ্যানে পণ্য ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে বন্দর সংলগ্ন সড়কগুলো ছিল নজিরবিহীনভাবে যানবাহনমুক্ত। চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জাহাজে কাজের জন্য শ্রমিক বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কোনো শ্রমিক কাজে যোগ দিচ্ছেন না। কেবল মাঠ পর্যায়ের শ্রমিকরাই নন, বন্দরের দাপ্তরিক কর্মচারীরাও ‘কলম বিরতি’ পালন করায় প্রশাসনিক ফাইল আদান-প্রদান ও অনুমোদনের কাজও থমকে গেছে।

আন্দোলনের মূল কারণ হিসেবে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের এককভাবে ৪০ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা অত্যন্ত লাভজনক এনসিটি টার্মিনালটি বিদেশি অপারেটরের কাছে লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শ্রমিক নেতাদের দাবি, ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাতে সূচিত এবং ২০০৭ সালে নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন হওয়া এই টার্মিনালে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল রয়েছে। তাই এখানে নতুন করে কোনো বিদেশি বিনিয়োগ বা পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা নেই। বরং এটি বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দিলে জাতীয় নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রশাসনিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত দুই দিনে আন্দোলনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত ১৬ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে ঢাকার আইসিডি ও নারায়ণগঞ্জের পানগাঁও টার্মিনালে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। তবে এই বদলির আদেশ পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) এই বদলির প্রতিবাদে এবং এনসিটি লিজ বাতিলের দাবিতে আজ বন্দর অভিমুখে কালো পতাকা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এবং অবৈধ বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে, বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সচল রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) ইতিমধ্যে এক গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় এক মাসের জন্য সকল ধরণের সভা-সমাবেশ, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। জননিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হলেও আন্দোলনকারীরা কাজ বন্ধ রেখে ঘরে বসে প্রতিবাদ জানানোর কৌশল নিয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থার ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকার ও শ্রমিক পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন।


অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর ডাক দিয়ে শুরু ‘জাতীয় কবিতা উৎসব’

আপডেটেড ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২২:৩৩
নিজস্ব প্রতিবেদক 

মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিনে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর ডাক দিয়ে শুরু হলো ৩৮তম জাতীয় কবিতা উৎসব। ‘সংস্কৃতিবিরোধী আস্ফালন রুখে দিবে কবিতা’ স্লোগান নিয়ে দুই দিনব্যাপী এই উৎসবের আয়োজন করেছে জাতীয় কবিতা পরিষদ। এবারই প্রথম উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতীয় কবিতা উৎসবের সূচনা করা হয়।

সমাধি চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করে কবিরা টিএসসি ঘুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে যান। আবহমানকালের বাঙালি সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র, মাজার, বাউলদের আখড়া ও গণমাধ্যমের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে কবিরা মুখে লাল কাপড় বেঁধে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও লালন সাঁইয়ের রক্তাক্ত প্রতিকৃতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কারারুদ্ধ প্রতীকী ছবি–সংবলিত প্ল্যাকার্ড। তারা সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে অন্ধকারের শক্তির বিরুদ্ধে আলোর ডাক দেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত ও পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর ভাষার গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ এবং এবারের উৎসব সংগীত ‘এ সংগীত নৃত্য কবিতা/এ সম্প্রীতি সাম্যের বারতা’ পরিবেশন করেন।

উৎসবের উদ্বোধন করেন জুলাই গণ-আন্দোলনে শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর বাবা মীর মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কবিরা কবিতায় মানুষের মনের কথা বলেন। মানবতার দাবিই সবচেয়ে বড়। এই দাবিকে সামনে রেখে মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। সবাই মিলে একটি মানবিক দেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধের মতো আর কাউকে প্রাণ দিতে না হয়।

মীর মুস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, শহীদেরা দেশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে সবাইকে আত্মনিয়োগ করতে হবে। কবিরা এই কাজে লেখনীর মাধ্যমে জনগণকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অতীত থেকে শিক্ষা না নিলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ পাওয়া যায় না।

সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক চেতনা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা। সে কারণে তারা সব মত, আদর্শ, জাতি, গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসর সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।

ভবিষ্যতে যে সরকারই আসুক তারা সংকীর্ণ বিভাজন ত্যাগ করে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতি চর্চার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেন বলে আশা প্রকাশ করেন সংস্কৃতি উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বহুদূর যেতে হবে, এ কারণে সহনশীলতা ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা–সম্মান থাকা প্রয়োজনীয়।

কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, জাতি যখনই কোনো সংকটের সামনে পড়েছে, তখন কবিরা সোচ্চার হয়েছেন। জাতীয় কবিতা পরিষদ কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়, কিন্তু সংকটে সংগ্রামে কবিতা পরিষদ জাতির মুক্তির জন্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সামনে একটি জাতীয় নির্বাচন আসছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কবিরা জনগণকে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত সমাজ গঠনের শক্তির পক্ষে রায় দিতে আহ্বান জানাচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি মোহন রায়হান বলেন, ১৯৮৭ সালে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের সড়ক মোহনায়, রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় কবিতা পরিষদ ও জাতীয় কবিতা উৎসবের। পরবর্তী সময়ে এই উৎসব স্থানান্তরিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন হাকিম চত্বরে। সেখানে দীর্ঘদিনের সেই আয়োজনে এবার অনুমতি মেলেনি। কারণ সময় বদলেছে। আর সেই বদলে যাওয়া সময়কে আজ নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে অন্ধকারের অশুভ শক্তি। যারা আলোর সাম্পানে ভাসমান হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতিকে মেনে নিতে পারে না, আজ তাদেরই আস্ফালন চারদিকে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কবি এ বি এম সোহেল রশিদ, শোক প্রস্তাব পাঠ করেন কবি শ্যামল জাকারিয়া, ঘোষণাপত্র পাঠ করেন কবি মানব সুরত ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কবি নূরুন্নবী সোহেল।


বিশ্ব হিজাব দিবস: ঢাবিতে প্রথমবারের মতো হিজাব র‍্যালি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
ঢাবি প্রতিবেদক 

বিশ্ব হিজাব দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) প্রথমবারের মতো হিজাব র‍্যালি হয়েছে। ‘প্রটেস্ট অ্যাগেইনস্ট হিজাবোফোবিয়া-ঢাকা ইউনিভার্সিটি’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম র‍্যালিটির আয়োজন করে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে ভিসি চত্বর থেকে র‍্যালিটি শুরু হয়। সেখান থেকে টিএসসি হয়ে রাসেল টাওয়ার ঘুরে আবার রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়। এরপর সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়।

সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিবসটির গুরুত্ব বর্ণনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিশকাতুল জান্নাত বলেন, হিজাব পরিধান করার ফলে বাংলাদেশের নারীরা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হয়। সেই বৈষম্যের বিপক্ষে আওয়াজ তোলার জন্য এই দিবসটি গুরুত্বপূর্ণ। হিজাব দিবস পালনের মাধ্যমে সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মানবোধ তৈরি হয়। মুসলিম নারীদের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরার সুযোগ সামনে আসে। দিবসটি হিজাবের পক্ষে বৈশ্বিকভাবে সংহতি ও বোঝাপড়ার উন্নতিতে ভূমিকা রাখছে।

মিশকাতুল জান্নাত আরও বলেন, বিগত চার বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ বিশ্ব হিজাব দিবস ঘিরে কিছু কিছু ইভেন্ট করেছে। তবে সার্বিকভাবে এটা এখনও বাংলাদেশে জনপ্রিয় না।

র‍্যালিটির অন্যতম আয়োজক স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রসংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দিন খালেদ বলেন, যারা ফ্যাসিবাদের আমলে হিজাব-নিকাব পরিধান করেছে, তারা বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছে। শুধু হিজাব-নিকাবই নয়, যারা দাঁড়ি-টুপি পরতো তারাও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। পশ্চিমারা এগুলোকে এক ধরনের জঙ্গিবাদের চিহ্ন হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার জন্যই মূলত আমাদের প্রচেষ্টা।


বিটিভি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী, ঐতিহ্যের ধারক-বাহক: তথ্য উপদেষ্টা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, ‘বিটিভিকে ১৮ কোটি মানুষের চ্যানেল হয়ে উঠতে হবে। বিটিভির কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। জনপ্রত্যাশা ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বিটিভির সকল কর্মসূচির পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।, বিটিভি শুধু একটি টিভি চ্যানেল না, এটি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী; ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। বিটিভি আমাদের সম্পদ। এটাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) পরিদর্শনে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন উপদেষ্টা। এ সময় বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসিনসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উপদেষ্টা বলেন, বিটিভি শুধু একটি টিভি চ্যানেল না, এটি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী; ঐতিহ্যের ধারক-বাহক। বিটিভি আমাদের সম্পদ। এটাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।

বিটিভিকে আরো জনবান্ধব ও সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে বেশকিছু অনুশাসনের উল্লেখ করেন তথ্য উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বিটিভিকে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকতে হবে। কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব করা যাবে না।

তিনি আরো বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে টিকে থাকার জন্য এর আধুনিকায়ন দরকার। মানুষের পরিবর্তিত চাহিদার কথা মাথায় রেখে অনুষ্ঠান ও সংবাদ পরিবশনায় আরো সৃজনশীল হতে হবে। চ্যানেলের গতিশীলতা বাড়াতে চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে শূন্য পদগুলো পূরণের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাজেটের সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে ও বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিটিভির সকল স্তরের কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষম করে গড়ে তোলার আহ্বান জানান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বিটিভি কর্তৃপক্ষকে পরবর্তী সরকারের বাস্তবায়নের জন্য একটি স্মার্ট চার্টার অব ডিমান্ড তৈরি করে রাখার পরামর্শ দেন।

বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী বিটিভির একটি সোশ্যাল মিডিয়া উইং খোলা প্রয়োজন। এই উইংয়ে সময়োপযোগী কনটেন্ট নির্মাণের জন্য নিয়মিত জনবলের সাথে চুক্তিভিত্তিতে তরুণদের যুক্ত করার সুযোগ রাখা প্রয়োজন।

পরে উপদেষ্টা বিটিভির নিউজরুম, স্টুডিও, কন্ট্রোল প্যানেল, লাইব্রেরি ইত্যাদি ঘুরে দেখেন।


ব্যক্তিতান্ত্রিক শাসনের অবসানের জন্যই জুলাই সনদ: আলী রীয়াজ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
সিলেট প্রতিনিধি

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদ মর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরাচারের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত জাতি ১৬ বছর মুক্তির প্রহর গুনছিল; ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থান তাদের ফ্যাসিবাদের কবল থেকে আপাত মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানে স্বৈরাচার সৃষ্টির পথ রয়েছে। তাই আর কোনো স্বৈরাচার যাতে জনগণের ওপর চেপে বসতে না পারে সে জন্যই জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে। এবং জুলাই সনদ কার্যকরের জন্যই আসন্ন গণভোটে হ্যাঁ-কে জয়যুক্ত করতে হবে।

অনেকেই জিনিস করেন, ‘হ্যাঁ’ এর প্রার্থী কে? আমি বলি-হ্যাঁ এর প্রার্থী আপনি, আমি,আমরা সবাই। কারণ হ্যাঁ আমাদের সবার জন্য একটি মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ খুলে দেবে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকালে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে আসন্ন গণভোট ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে আয়োজিত মতবিনিময় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।

তবে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে রয়েছে জানিয়ে আলী রীয়াজ বলেন, সে কারণেই দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি প্রয়োজন, আর সে উদ্দেশে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি গণভোটে অংশ নিয়ে হ্যাঁ-তে রায় দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।

‘হ্যাঁ’- ভোটের অর্থ ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ এ সহকারী বলেন, এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধীদল একসাথে কাজ করবে। ক্ষমতাসীনরা ইচ্ছেমতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না; গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি নিতে হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, যার ফলে বিচারের বাণী আর নিরবে নিভৃতে কাঁদবে না। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে ফ্যাসিবাদের পথ বন্ধ হয়ে যাবে; যে পথ আমাদের সংবিধানের দুর্বলতায় তৈরি হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন সিলেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এম সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরী, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. আলিমুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে লর ভিসি প্রফেসর ড. মো. নিজাম উদ্দিন, হবিগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. সায়েম উদ্দিন আহম্মদ প্রমুখ।


ময়মনসিংহে হচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার অলিম্পিক কমপ্লেক্স

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের স্বপ্ন এখন বাস্তবায়নের পথে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে আজ এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রস্তাবিত 'বাংলাদেশ অলিম্পিক কমপ্লেক্স'-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) সভাপতি ও সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ঢাকা থেকে ৮৬ কিলোমিটার এবং ময়মনসিংহ শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিশাল কমপ্লেক্সটি নির্মিত হলে দেশের অ্যাথলেটরা একই ছাদের নিচে আন্তর্জাতিক মানের ইনডোর ও আউটডোর প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন, যা এতদিন কেবল স্বপ্ন হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিল।

প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, দীর্ঘদিনের জায়গা সংক্রান্ত জটিলতা কাটিয়ে সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় ত্রিশালে সেনাবাহিনীর মালিকানাধীন ১৭৩.২ একর জমিতে এই কমপ্লেক্স নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া যাতায়াত ব্যবস্থা সুগম করতে সেনাবাহিনী নিজস্ব অর্থায়নে আরও ৯ একর জমি ক্রয় করেছে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রকল্প পরিচালক কর্নেল মো. কুতুবউদ্দিন খাম একটি সমৃদ্ধ মাস্টারপ্ল্যান প্রদর্শন করেন। এই পরিকল্পনায় তিনটি বিশাল ইনডোর স্টেডিয়াম ছাড়াও ফুটবল, হকি, টেনিস, অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাক, শুটিং রেঞ্জ এবং আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও সেখানে থাকবে অত্যাধুনিক মিডিয়া সেন্টার এবং বিশাল পার্কিং সুবিধা।

কমপ্লেক্সটিতে অন্তত ৩৩টি ভিন্ন ভিন্ন খেলার আয়োজন করার সক্ষমতা থাকবে। যদিও প্রাথমিক পরিকল্পনায় ক্রিকেট, গলফ ও রোয়িংয়ের মতো কিছু খেলা বাদ রাখা হয়েছিল, তবে জাতীয় জনপ্রিয়তা বিবেচনায় সেনাপ্রধান কমপ্লেক্সটিতে ক্রিকেটের সুবিধাদি যুক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এর ফলে মূল নকশায় কিছুটা পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণকাজ তদারকি করছে সেনাবাহিনীর ২৪ ব্রিগেড। দেশীয় প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান 'ভিত্তি'-র পাশাপাশি এই প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে যুক্ত হয়েছে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান 'ডিএলএ', যাদের বিশ্বজুড়ে বড় বড় স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া স্থাপনা নির্মাণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে বিশাল অঙ্কের অর্থায়ন। স্থপতি ইকবাল হাবিবের দেওয়া তথ্যমতে, প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে জমি উন্নয়ন ও একটি ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, যা সম্পন্ন করতে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগতে পারে। তবে পুরো মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হলে সব মিলিয়ে ৩৪ থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, অর্থ সংস্থান নিশ্চিত হওয়া মাত্রই কাজের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তিনি গালফ রাষ্ট্রসমূহ এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) কাছ থেকে সহায়তা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব উল আলম এই প্রকল্পের জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরণের প্রশাসনিক ও আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেছেন।

সেনাবাহিনীর জায়গায় নির্মিত হলেও এটি মূলত ব্যবহার করবে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন। এজন্য শীঘ্রই সেনাবাহিনী ও বিওএ-র মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অন্যান্য সময়ে সেনাবাহিনী এখানে নিয়মিত অনুশীলন করার সুযোগ পাবে। সেনাপ্রধান মনে করেন, দেশের তরুণ সমাজ খেলাধুলার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী হলেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে তারা নিজেদের বিকশিত করতে পারছে না। যাতায়াত আরও সহজ করতে ভবিষ্যতে এখানে শাটল ট্রেনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ঐতিহাসিক এই উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে এবং সংশ্লিষ্টদের ওপর গঠনমূলক চাপ বজায় রাখতে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান। পরবর্তী সরকার প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দিলে আগামী ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যেই দৃশ্যমান হবে স্বপ্নের এই অলিম্পিক কমপ্লেক্স।


১৮ কোটি লোকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা ডিফিকাল্ট কাজ: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ১৮ কোটি জনসংখ্যার এই বিশাল দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা একটি অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং কাজ। আজ রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নিরাপত্তা প্রস্তুতি পর্যালোচনার জন্য এই সভার আয়োজন করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, নাগরিকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু একটি ছোট ঘরে মাত্র কয়েকজন সাংবাদিকের কোলাহল নিয়ন্ত্রণ করতেও যেখানে বেগ পেতে হয়, সেখানে দেশের ১৮ কোটি মানুষের শৃঙ্খলা বজায় রাখা কতটা শ্রমসাধ্য ও জটিল তা অনুমেয়। তবে এই প্রতিকূলতার মাঝেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালনে বদ্ধপরিকর বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট হবে সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর প্রস্তুতি বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে রয়েছে এবং নির্বাচন ঘিরে বড় কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির আশঙ্কা নেই। প্রার্থীদের আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দু-একটি আসনে ছোটখাটো লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতার ধরণ ব্যাখ্যা করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে, তার সিংহভাগই বিভিন্ন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা গ্রুপিংয়ের কারণে ঘটছে। অনেক সময় দেখা যায় কোনো অনুষ্ঠানে একজনের আমন্ত্রণ থাকলে সেখানে একাধিক গ্রুপ চলে আসে এবং মতের অমিল হলেই সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। এই ধরণের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

নির্বাচনের দিন ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ হওয়ার গুজব প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ভোটগ্রহণের সময় ইন্টারনেট পুরোপুরি সচল থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে এমন কোনো পরিকল্পনা নেই এবং কেউ যদি নিজ উদ্যোগে সংযোগ বন্ধ করে তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সাথে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো থেকে বিরত থাকার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকার গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। অতীতে সাংবাদিকরা যেভাবে চাপের মুখে থাকতেন বা প্রশ্ন করতে ভয় পেতেন, এখন সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। তবে স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও দায়িত্বশীল হয়ে সত্য সংবাদ পরিবেশনের অনুরোধ জানান তিনি। নারী ভোটারদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাধারণ নাগরিকরা যেভাবে জনসমক্ষে নিজেদের নিরাপদ মনে করেন, নারী ভোটাররাও ভোটকেন্দ্রে ঠিক একই রকম নিরাপদ পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।

সভার শেষ অংশে তিনি চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে জানান, এ ঘটনায় জড়িত অনেককে ইতিমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। চট্টগ্রামে নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং যেকোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা কঠোর হাতে দমনে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


দেশে ভূমিকম্প অনুভূত, উৎপত্তিস্থল কোথায়?

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) ভোরের দিকে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি হালকা মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার অব সিসমোলজি (এনসিএস) এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ২ মিনিটে এই ভূ-কম্পনটি আঘাত হানে। ভূমিকম্পের তীব্রতা কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় কোনো আতঙ্ক সৃষ্টি হয়নি এবং এখন পর্যন্ত দেশের কোথাও কোনো ধরণের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। মূলত গভীর রাতে এই কম্পনটি হওয়ায় অধিকাংশ মানুষই তা টের পাননি।

আগ্নেয়গিরি ও ভূমিকম্প বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ভলকানো ডিসকভারি’ জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল সিলেট বিভাগের সিলেট শহর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) গভীরে। ভূতাত্ত্বিক ভাষায় একে অগভীর ভূমিকম্প হিসেবে অভিহিত করা হয়। এনসিএস-এর তথ্যমতে, ভূমিকম্পটির অবস্থান ছিল ২৪.৮৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২.০৭ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। কম্পনটি হালকা হলেও এটি পুনরায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক ঝুঁকি ও ভূতাত্ত্বিক অবস্থানকে সামনে নিয়ে এসেছে।

ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটি মূলত ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা—এই তিনটি অত্যন্ত সক্রিয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ভারতীয় প্লেটটি প্রতি বছর প্রায় ৬ সেন্টিমিটার গতিতে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছে, অন্যদিকে ইউরেশীয় প্লেটটি উত্তর দিকে বছরে ২ সেন্টিমিটার করে সরে যাচ্ছে। এই প্লেটগুলোর ক্রমাগত নড়াচড়া এবং একে অপরের ওপর চাপের ফলেই এই অঞ্চলে নিয়মিত বিরতিতে ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরে ও আশেপাশে বগুড়া ফল্ট, ত্রিপুরা ফল্ট, শিলং মালভূমি, ডাউকি ফল্ট এবং আসাম ফল্টের মতো একাধিক সক্রিয় ও শক্তিশালী চ্যুতি রেখা রয়েছে। এসব চ্যুতির সক্রিয়তার ভিত্তিতে দেশটিকে মোট ১৩টি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং সিলেট অঞ্চলের জৈন্তাপুর এলাকাকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আজকের এই কম্পনটি সিলেটের যে এলাকায় আঘাত হেনেছে, তা মূলত ডাউকি ফল্টের কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের বিশেষ নজর কেড়েছে।

অন্যদিকে, রাজধানীর প্রেক্ষাপটে এই ধরণের মৃদু কম্পনগুলোও বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঢাকা বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর এবং জনঘনত্বের কারণে একে বিশ্বের ২০টি সবচেয়ে ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকায় রাখা হয়েছে। একটি পরিসংখ্যান বলছে, রাজধানীর প্রায় ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবনের মধ্যে ৯৫ শতাংশই অনুমোদিত নকশার বাইরে নির্মিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই জাতীয় ভবন নির্মাণ কোড (বিএনবিসি) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। ফলে মৃদু কম্পন বড় ক্ষতির কারণ না হলেও ভবিষ্যতে শক্তিশালী কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানলে তা নজিরবিহীন বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন ভূতাত্ত্বিকরা। আজকের এই ঘটনায় কোনো ক্ষতি না হলেও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভবন নির্মাণে সতর্কতা ও নিয়মিত সচেতনতামূলক মহড়ার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা বিতরণ নিয়ে শঙ্কা

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের স্বজনদের মাসিক সম্মানী ভাতা বিতরণে সৃষ্ট সাময়িক জটিলতা নিরসন করেছে সরকার। প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে নির্ধারিত সময়ে অর্থ ব্যাংক হিসাবে না পৌঁছানোয় সুবিধাভোগীদের মধ্যে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার সমাধান হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আজ নিশ্চিত করেছে যে, আগামীকাল সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) থেকে সকল সুবিধাভোগী তাঁদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাব থেকে ভাতার অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।

সাধারণত সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসের শেষ বৃহস্পতিবার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার অর্থ জিটুপি (G2P) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগীদের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় গত ২৯ জানুয়ারি এই অর্থ জমা হওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত দিনে টাকা না আসায় এবং এর পরপরই শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় সুবিধাভোগীদের মধ্যে এক ধরণের শঙ্কা ও দুশ্চিন্তার সৃষ্টি হয়। আজ রবিবার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ব্যাংক খোলার পরও দীর্ঘ সময় অ্যাকাউন্টে টাকা না আসায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মুক্তিযোদ্ধারা ভোগান্তির কথা জানান।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মূলত অনলাইনে অর্থ স্থানান্তরের কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়ায় সামান্য প্রযুক্তিগত বিভ্রাট দেখা দিয়েছিল। এই কারিগরি সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে ভাতার অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়নি। মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশরাত চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, সমস্যাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে দ্রুততার সাথে সমাধান করা হয়েছে। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, সোমবার সকাল থেকেই ভাতার টাকা সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে এবং তাঁরা কোনো বাধা ছাড়াই তা সংগ্রহ করতে পারবেন।

ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও ভোগান্তি এড়াতে মন্ত্রণালয় আরও আধুনিক ও শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও তাঁদের কল্যাণে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরাসরি ভাতা প্রদান প্রক্রিয়াকে আরও নিশ্ছিদ্র করতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সংস্কারও চলমান রয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সৃষ্ট এই সাময়িক বিলম্বের জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে এবং সকল সুবিধাভোগীকে বিচলিত না হওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আগামীকাল দুপুরের মধ্যেই অধিকাংশ ব্যাংকে এই টাকা লেনদেনের জন্য প্রস্তুত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।


ইইউ’র সঙ্গে দ্রুত এফটিএ আলোচনা শুরুর আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান শুল্কমুক্ত সুবিধার মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে, তাই দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজারে বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। আজ রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম)-এর চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন।

বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার এবং সরকারের এসডিজি সমন্বয়ক ও জ্যেষ্ঠ সচিব লামিয়া মোরশেদ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনাকালে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নির্বিঘ্ন বাণিজ্য সম্পর্ক নিশ্চিতকরণ এবং দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) উদাহরণ টেনে বলেন, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি জাপানের বাজারে এখন বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩০০-এর বেশি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে। এই সাফল্যকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশ এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও অনুরূপ আলোচনা করতে চায়, যাতে বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য প্রধান রপ্তানি পণ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখা সম্ভব হয়।

ইউরোচ্যাম চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ প্রধান উপদেষ্টার এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের পর ইইউ বাজারে বিদ্যমান সুবিধাগুলো হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে এফটিএ আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, একটি শক্তিশালী বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশে আরও বেশি ইউরোপীয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। লোপেজ উল্লেখ করেন যে, ভারত ইতোমধ্যে ইইউর সঙ্গে চুক্তির পথে রয়েছে এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে এ ধরনের একটি চুক্তি কার্যকর থাকায় তারা বর্তমানে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। তিনি আশ্বাস দেন যে, ইউরোচ্যাম ইউরোপের বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে কাজ করে যাবে।

ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বৈঠকে জানান যে, এলডিসি উত্তরণের পর ২০২৯ সালের আগে বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্কের ধরনে কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না। তবে প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার এই বিশাল বাজারকে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছে ইইউ। তিনি ২০২৬ সালে একটি ‘ইইউ-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম’ আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানান। রাষ্ট্রদূত জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে আসার আগে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা চায়, যাতে তারা এখানে সমান সুযোগ ও সুরক্ষার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারে। জবাবে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি দক্ষ শ্রমশক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ের ভাণ্ডার। সরকার দেশজুড়ে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তুলছে এবং লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে বিশ্ব বাণিজ্যের একটি অন্যতম উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করা।


নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকারি কর্মচারীদের দেশব্যাপী কর্মবিরতি

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করার দাবিতে সারা দেশে একযোগে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন সরকারি কর্মচারীরা। বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের ডাকে আজ রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এই দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের ফলে সকালের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সারা দেশের দাপ্তরিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে, যার ফলে সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন।

আন্দোলনরত কর্মচারীরা জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইতিপূর্বেই একটি কমিশন গঠন করেছিল এবং সেই কমিশনের সুপারিশ সম্বলিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে যে, প্রতিবেদন জমা পড়ার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার তা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে গড়িমসি করছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা কর্তৃক এই কমিশনের সুপারিশ বর্তমান সরকারের মেয়াদে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে দেওয়া বক্তব্যে কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

আজকের এই দুই ঘণ্টার কর্মসূচিতে রাজধানী ঢাকাসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রায় প্রতিটি সরকারি দফতরে কর্মচারীরা কাজ ফেলে অফিসের সামনে অবস্থান নেন। তারা সাত দফা দাবির পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং দ্রুত দাবি মানার আহ্বান জানান। সকালের ব্যস্ত সময়ে সেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের ভূমি অফিস, পাসপোর্ট অফিস, নির্বাচন অফিসসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে আসা সাধারণ মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। জরুরি প্রয়োজনে আসা অনেক নাগরিককে সেবা না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, গত ৩০ জানুয়ারি এক বিশেষ সভার মাধ্যমে ১ থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা তিন দিন এই দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেই ঘোষণা অনুযায়ী, আগামীকাল সোমবার এবং আগামী মঙ্গলবারও একই সময়ে অর্থাৎ সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সারা দেশে এই বিক্ষোভ ও কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন থেকে পিছু হটবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে কাজে ফেরার আহ্বান জানানো হলেও কর্মচারীরা তাদের দাবির প্রশ্নে অনড় অবস্থানে রয়েছেন, যা আগামী দিনগুলোতে সরকারি দাপ্তরিক কাজে আরও বড় ধরণের স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।


মব–গণপিটুনিতে জানুয়ারিতে নিহত বেড়ে দ্বিগুণ, বেড়েছে অজ্ঞাত লাশ

আপডেটেড ১ জানুয়ারি, ১৯৭০ ০৬:০০
নিজস্ব প্রতিবেদক

গত বছরের ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) বলেছে, গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে জানুয়ারিতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে অজ্ঞাত লাশের সংখ্যাও।

শনিবার এমএসএফের দেওয়া জানুয়ারি মাসের মানবাধিকার প্রতিবেদন এমন চিত্র উঠে এসেছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং নিজেদের অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে মানবাধিকার প্রতিবেদন তৈরি করে এমএসএফ।

মব সন্ত্রাসে মানুষ হত্যার ঘটনা এ সরকারের আমলে বেড়েছে উল্লেখ করে এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মব বা গণপিটুনির ২৮টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১ জন। গত ডিসেম্বরে এ ধরনের ২৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১০ জন।

এমএসএফ বলেছে, ‘গণপিটুনির ঘটনায় জানুয়ারিতে নিহত ও আহতের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে।’ মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করে, আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা অবশ্যই ফৌজদারি অপরাধ, যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই গণ্য করা হয়ে থাকে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি জানুয়ারি মাসে ৫৭টি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হয়েছে। ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৪৮। এমএসএফ বলেছে, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া সমাজে সহিংসতা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা জোরদার করে। এ ছাড়া গত ডিসেম্বরে কারা হেফাজতে ৯ জন মারা গেলেও এ মাসে সেই সংখ্যা বেড়ে হেয়েছে ১৫।

বেড়েছে মামলায় আসামির সংখ্যা

এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সংক্রান্ত মামলায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে অর্ধেকে নেমে এলেও (১৬ থেকে ৮), সরকার পতনের পর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় শেখ হাসিনা–সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষ করে, জানুয়ারিতে নাম উল্লেখ করা আসামির সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১২০ এবং অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ৩২০ হয়েছে। এমএসএফ বলছে, ‘এ অবস্থা আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও গণমামলার প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।’

রাজনৈতিক নির্বাচনী সহিংসতা

রাজনৈতিক সহিংসতায় জানুয়ারি মাসে আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে আহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এমএসএফ বলছে, ‘দুষ্কৃতকারীদের হামলায় নিহত ও আহতের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাজনৈতিক সহিংসতার নৃশংসতা বৃদ্ধির দিকটি নির্দেশ করে। নির্বাচনী সহিংসতা ছিল জানুয়ারি মাসের অন্যতম সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট।’

জানুয়ারি মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ থেকে ৪ হয়েছে। এ অবস্থা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নির্দেশ করে বলে মনে করে এমএসএফ। মানবাধিকার সংগঠনটি আরও বলেছে, ‘এটি প্রমাণ করে যে নির্বাচনী প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে যাচ্ছে।’

সংখ্যালঘু নির্যাতন

জানুয়ারি মাসে বেড়েছে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাও। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে প্রতিমা ভাঙচুর, বাড়িঘর ভাঙচুর, মামলাসহ সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১৫টি। অথচ ডিসেম্বরে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল ৪টি।

এমএসএফ বলছে, ‘সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রতিমা ভাঙচুর, অগ্নিকাণ্ড ও হামলার ঘটনা জানুয়ারি মাসে স্পষ্টভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পুনরুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন।’

এ ছাড়া চলতি জানুয়ারি মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দুটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া এসব বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে একজন নিহত হয়েছেন। এমএসএফ বলেছে, ‘নির্যাতনে মৃত্যুর সংখ্যা ডিসেম্বরের তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় স্পষ্ট হয় যে হেফাজতে নির্যাতন এখনো একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান।’

সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক

তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে এমএসএফ বলেছে, জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও জটিল, সহিংস ও উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। প্রায় সব প্রধান মানবাধিকার সূচকেই জানুয়ারি মাসে ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করে, মানবাধিকারের এ চিত্র রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির ধারাবাহিক প্রভাবকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।

এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘মানবাধিকারের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবনতি দেখছি আমরা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, জানমালের নিরাপত্তা ও অপরাধ কমানো—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। কিন্তু আমরা দেখেছি জানুয়ারি মানে এসব দায়িত্ব পালন বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলায় আসামির সংখ্যা বাড়ানো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মূল কাজ হয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে এসে এই চর্চা তারা দেখাচ্ছে।’

এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘সেই সঙ্গে বাড়ছে অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা, মব সন্ত্রাস। কিন্তু এসব প্রতিরোধে কোনো চেষ্টা তো নেই-ই, বরং সরকারের কোনো কোনো মহল থেকেই মব সন্ত্রাসের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো হচ্ছে।’


banner close