আক্রান্ত ১১ জেলা থেকে ধীরে ধীরে নামছে বন্যার পানি। তবে পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। দুর্গম যেসব এলাকায় এত দিন যাওয়া সম্ভব হয়নি সরকারি-বেসরকারি ত্রাণকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীদের, এখন সেসব এলাকায় পৌঁছাচ্ছেন তারা। তবে ত্রাণের জন্য হাহাকার সবখানে। আশার কথা, নতুন বাংলাদেশে বন্যা মোকাবিলায় সব মানুষ দাঁড়িয়েছেন একসঙ্গে। তাই গত ৫ দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আহ্বানে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ সাড়া দিচ্ছেন, প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে তার ত্রাণ তহবিলেও মিলছে বিপুল সাড়া। তবে উপদ্রুত এলাকার মানুষ চাইছেন নগদ সহায়তা-ত্রাণের খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধের পাশাপাশি ঘরবাড়ি মেরামত এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ও কৃষিতে সহায়তা। তবে সব মহলের একটা লক্ষ্য, যত দ্রুত সম্ভব পানিবন্দি মানুষের কাছে ত্রাণ হিসেবে খাবার ও পানি পৌঁছে দেওয়া। এদিকে, জলমগ্ন এলাকাগুলোতে বারবার পানিতে নামতে বাধ্য হওয়ায় অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। উপদ্রুত জেলাগুলোতে ডায়রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকার হাসপাতালগুলোসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে একযোগে কাজ করছেন চিকিৎসক-নার্সদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরা।
এদিকে, বন্যার পানি নামতে শুরু করায় বোঝা যাচ্ছে ক্ষয়-ক্ষতির মাত্রা। ফেনী শহরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব মো. সাখাওয়াত হোসেন দৈনিক বাংলাকে বলেন, ‘গত শুক্রবার আসরের নামাজের পরেও তার এলাকাতে বন্যার লেশমাত্র ছিল না। তবে কোথা থেকে হঠাৎ এত দ্রুত গতিতে ঢলের পানি আসা শুরু করে যে মাগরিবের নামাজের আগেই কোমরসমান পানিতে ভরে যায় চারপাশ। প্রাণে বাঁচতে তার চার তলা বাসায় মুহূর্তে প্রতিবেশীদের অনেকে ভিড় করেন। এ কয় দিন বাসার দোতলা থেকে চতুর্থ তলায় বাসিন্দারাসহ ৪০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। এমন প্রতিবেশীও প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়ে ছিলেন যাদের তিনি আগে চিনতেনও না। পানি ছিল ভীষণ ঠাণ্ডা। এখন পানি মোটামুটি নেমে গেছে। তবে নিচতলার ভাড়াটিয়া কোনো কিছুই সরাতে পারেননি। তার সব সম্পদ পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। এমন অবস্থা শহরের একতলা বা টিনশেডসহ সাধারণ ঘরে যারা ছিলেন তাদের সবার। এসব মানুষ সব হারিয়েছেন। তারা এখন কীভাবে বাঁচবেন তা আল্লাহ জানেন। এমন ঢল আমার জীবনে কখনো দেখিনি।’
বন্যায় ক্ষতির এমন চেহারা প্রায় সবখানে। পুকুরসহ মাছের ঘেরগুলো ভেসে গেছে, নষ্ট হয়েছে কৃষকের মাঠের ফসল, ব্যবসায়ীদের দোকানে পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে সব মালপত্র, ঘরের কোনো আসবাবপত্র আর ব্যবহারযোগ্য নেই। এই পরিস্থিতি এখন ফেনী, নোয়াখালীসহ আশপাশের সবগুলো জেলায়।
এদিকে, চলমান বন্যায় ১১ জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৩ জনে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বন্যায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জন। এছাড়া, ফেনী ও কুমিল্লা জেলার নিম্নাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। সব নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করেছে।
আজ সোমবার বন্যা পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরে এই তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুল হাসান।
মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, বন্যা আক্রান্ত জেলার সংখ্যা ১১টি। এগুলো হচ্ছে ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। আক্রান্ত এসব জেলায় ৭৪টি উপজেলার মোট ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৮টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত লোকসংখ্যা ৫৭ লাখ ১ হাজার ২০৪ জন।
তিনি জানান, পানিবন্দি-ক্ষতিগ্রস্ত লোকদের আশ্রয় প্রদানের জন্য মোট ৩ হাজার ৮৩৪ টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে মোট ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৩ জন মানুষ এবং ২৮ হাজার ৯০৭ টি গবাদি পশুকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। ১১ জেলার ক্ষতিগ্রস্তদের চিকিৎসা সেবা সেবায় মোট ৬৪৫টি মেডিকেল টিম চালু রয়েছে।
কামরুল হাসান বলেন, এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৩ জন। এর মধ্যে কুমিল্লায় ৬ জন, ফেনীতে একজন, চট্টগ্রামে ৫ জন, খাগড়াছড়িতে একজন, নোয়াখালীতে ৫ জন, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ায় একজন, লক্ষ্মীপুরে একজন ও কক্সবাজারে ৩ জন বন্যার কারণে মারা গেছেন ৷ এছাড়াও মৌলভীবাজারে ২ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সোমবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। উজানে নদ-নদীর পানি কমার ধারা অব্যাহত আছে। ফলে বর্তমানে ফেনী ও কুমিল্লা জেলার নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত রয়েছে।
একই সঙ্গে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। তবে এখনও কুশিয়ারা, গোমতি ও মুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময়ে এ অঞ্চলের কুমিল্লা জেলার গোমতী নদীর পানি কমতে পারে এবং এ অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হতে পারে। তবে কোনও কোনও স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আজ দেশের তিনটি নদীর তিন স্টেশনের পানি বিপৎসীমার ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার ৪ নদীর ৬টি স্টেশনের পানি বিপদসীমার ওপরে ছিল। এরমধ্যে গোমতির নদীর কুমিল্লা স্টেশনের পানি ৭৮ থেকে নেমে আজ ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।
এছাড়া মুহুরী নদীর পরশুরাম স্টেশনের পানি আজ বিপৎসীমার ওপরে আছে। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পানির উচ্চতা সম্পর্কে জানা যায়নি। এদিকে রোববার কুশিয়ারা নদীর পানি তিন স্টেশনে বিপৎসীমার ওপরে থাকলেও আজ তা নেমে শুধু অমলশীদ পয়েন্টের পানি বিপৎসীমার ৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। রবিবার বিপৎসীমার ওপরে থাকা মনু নদীর মৌলভীবাজার স্টেশনের পানি আজ বিপৎসীমার নিচে নেমে গেছে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই, ধলাই নদীর পানি আরও কমতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনী জেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, তবে কোনও কোনও স্থানে স্থিতিশীল থাকতে পারে।
আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উজানে মাঝারি বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে। এ সময় এ অঞ্চলের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরি, কর্ণফুলী, হালদা ও অন্যান্য প্রধান নদীগুলোর পানি সময় বিশেষে বাড়তে পারে।
এছাড়াও ব্রহ্মপুত্র-যমুনা এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমছে, গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল আছে, উত্তরাঞ্চলের তিস্তা-ধরলা-দুধকুমার নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিরাজমান আছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
দেশে সোমবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে যশোরে ২২২ মিলিমিটার। এছাড়া বরগুনায় ১২০, বরিশালে ১০৪, টেকনাফে ১০১, পটুয়াখালী ৮৮, নোয়াখালী ৮৭, গোপালগঞ্জের হরিদাশপুরে ৮৫, কক্সবাজারে ৮২ এবং বান্দরবানের লামায় ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে উজানে আসামের তেজপুরে ১৯, ত্রিপুরায় ১২ এবং চেরাপুঞ্জিতে ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, আজ রাতে একসঙ্গে ফারাক্কা বাঁধের ১০৯টি জলকপাট খুলে দেওয়ায় দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাই নবাবগঞ্জসহ আশেপাশের জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে নতুন কোনও তথ্য বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায়নি।
বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সরকারি-বেসরকারিসহ সব পর্যায় থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে জানিয়ে মন্ত্রণালয় বলছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১১ জেলায় মোট ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ২০ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল, ১৫ হাজার প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবার, ৩৫ লাখ টাকার শিশুখাদ্য এবং ৩৫ লাখ টাকার গো-খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে।
কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের জিওসির তথ্যের বরাত দিয়ে ত্রাণ সচিব জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে কুমিল্লা জেলার সব উপজেলায় সড়ক পথে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া সেনাবাহিনীর ৪টি মেডিকেল টিম প্রয়োজনীয় ওষুধসহ কুমিল্লা জেলার ৪ উপজেলায় নিয়োজিত করা হয়েছে।
ফেনীতে স্বাস্থ্য সেবা দিতে ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত করা হয়েছে জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব বলেন, সেনাবাহিনী ও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসকরা সেবা দিচ্ছন। পাশাপাশি স্থানীয় ক্লিনিক, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্যার্তদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকগণ নির্দেশনা দিয়েছেন।
কামরুল হাসান বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সচিব কামরুল হাসান বলেন, যারা ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে সহায়তা (চেক/পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে) দিতে চান তারা প্রধান উপদেষ্টার পক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছেও তা দিতে পারেন। সরকারি ছুটি ছাড়া প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই সহায়তা নেওয়া হবে।
যারা ত্রাণ তহবিলে সহায়তা (চেক/পে-অর্ডার/ব্যাংক ড্রাফট এর মাধ্যমে) দিতে ইচ্ছুক তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব অঞ্জন চন্দ্র পাল (মোবাইল ০১৭১৮-০৬৬৭২৫) এবং সিনিয়র সহকারী সচিব শরিফুল ইসলামের (মোবাইল-০১৮১৯২৮১২০৮) সঙ্গে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন ত্রাণ সচিব।
নোয়াখালীতে আবারও বেড়েছে পানি
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত নোয়াখালীতে থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের কারণে আবারও বাড়ছে পানি। আবহাওয়া কিছুটা ভালো থাকায় বৃহস্পতিবার থেকে গত শনিবার বিকেল পর্যন্ত পানি কিছুটা কমলেও সেদিন রাত ১০টার পর থেকে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে আবারও কোথাও কোথাও এক ফুট থেকে দুই ফুট পানি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা। জেলা প্রশাসনের হিসাবে জেলায় ২০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি আছেন।
বন্যার কারণে জেলায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন, সেনবাগ উপজেলার ইয়ারপুর গ্রামের জিলহাজুল ইসলাম (১০), কেশারপাড় ইউনিয়নের বীরকোট পশ্চিম পাড়ার দুই বছর বয়সী শিশু আবদুর রহমান এবং সদর উপজেলার কালাদরপ ইউনিয়নের পূর্ব শুল্লকিয়া গ্রামের আড়াই বছরের রিয়ান। এরমধ্যে শিশু রিয়ান বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছে। এছাড়াও বন্যার পানির কারণে ঘরের ভেতর বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা যান সেনবাগ উপজেলার দক্ষিণ মোহাম্মদপুর গ্রামের কাকন কর্মকার (৩০) ও বেগমগঞ্জের চৌমুহনী পৌরসভার আলীপুর গ্রামের আবুল কালাম আজাদ (৫০)।
এদিকে ফেনী থেকে বন্যার পানি ডাকাতিয়া নদী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার কারণে সেনবাগ, সোনাইমুড়ি, চাটখিল ও বেগমগঞ্জ উপজেলায় পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নোয়াখালী বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি ও জনদুর্ভোগ বাড়ার আশংকা রয়েছে।
বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলার প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। প্রতিটি বাড়িতে ৩ থেকে ৫ ফুট জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে ৬ থেকে ৭ ফুট। বসতঘরে পানি প্রবেশ করায় বুধবার রাত পর্যন্ত অনেকে খাটের ওপর অবস্থান করলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তারা নিকটস্থ আশ্রয় কেন্দ্র, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে অবস্থান নিয়েছেন। বসত ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়ায় খাবার সংকটে রয়েছে বেশির ভাগ মানুষ। জেলার প্রধান সড়কসহ প্রায় ৮০ ভাগ সড়ক কয়েক ফুট পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। সড়কগুলোতে যান চলাচল অনেকটাই কম।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার আট উপজেলার ৮৭ ইউনিয়ন ও সাতটি পৌরসভার ২০ লাখ ৩৬ হাজার সাতশ মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। এরমধ্যে আটশ ২৬টি কেন্দ্রে একলক্ষ ৫৩ হাজার চারশ ৫৬ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পানিবন্দী মানুষের জন্য নগদ ৪৫ লক্ষ টাকা ও ১৮শ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় ৮৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
ফেনীর তিন উপজেলায় বেড়েছে বন্যার পানি
ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলায়। বিপৎসীমার নিচে প্রবাহিত হচ্ছে মুহুরি কহুয়া ও ছিলোনিয়া নদীর পানি ৷ তবে পানিবন্দি রয়েছেন এসব এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষ ৷ ফেনী পৌর শহরের দু-তিনটি সড়ক ও বাসা বাড়িতে পানি কমলেও এখনো অনেক সড়ক ও বিভিন্ন ভবনের নিচতলা পানিতে সয়লাব।
ইতোমধ্যে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে ফেনী সদর, সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা উপজেলায়। বন্যা এখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে । এখানে এখনও পানিবন্দি কয়েক লাখ মানুষ৷ বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার জন্য ফেনীর মুহুরী রেগুলেটরের ৪০টি স্লুইসগেট ও নোয়াখালীর মুছাপুরের ১৭ টি স্লুইসগেট খুলে দেয়া হয়েছে।
গত রবিবার থেকে ফেনী শহরের বিদ্যুতের ৯টি লাইন সচল হয়েছে, তবে দুই-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গত ৪দিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকার পর রবিবার বিকেল থেকে যান চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। জেলার অধিকাংশ এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল রয়েছে।
ফেনীতে বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ডুবুরি দলসহ বেশ কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী টিম পরশুরাম ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী এবং দাগনভূঞা এলাকায় নৌকা, স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার কাজ ও ত্রাণ তৎপরতা চলমান রেখেছে ৷ এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও স্থানীয়ভাবে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা হতে আগত সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক সংগঠন, মানবিক সংগঠন তথা বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন জনগণের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় জেলার ১টি এবং ছয়টি উপজেলায় ছয়টি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও বেসরকারি ৬টি হাসপাতালে মেডিকেল ক্যাম্প চালু রয়েছে। জেলা শহরে এসব বেসরকারি হাসপাতালসমূহ হল: কনসেপ্ট হাসপাতাল, মেডিনোভা হাসপাতাল মেডিল্যাব, আল আকসা হাসপাতাল, জেড ইউ মডেল হাসপাতাল, মিশন হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রতিটি উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্যাকবলিত মানুষজনদের আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খিচুড়ি ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত জেলায় ৮ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত। এপর্যন্ত ১ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে উদ্ধার করে বিভিন্ন আস্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট লোকজন উঁচু ভবনে বা ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন।
একই সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে ৬০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ৩৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মুছাম্মত শাহীনা আক্তার বলেন, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ বাহিনী, বিজিবি, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে কন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণের সহযোগিতা ও উদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সুশীল সমাজ ও আপামর জনগণের সহযোগিতা পেলে সুন্দরভাবে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এই দুর্যোগময় মুহূর্তে ব্যবসায়ীদের প্রতি মানবিক হতে আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বন্যাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আপনার দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়াবেন না।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন পানিবাহিত রোগে। এই মুহূর্তে ফেনীতে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও ওষুধ সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় এখনও অপ্রতুল। স্থানীয়রা জানান, এসব বিষয় জরুরিভাবে ব্যবস্থা না হলে এখানে গুরুতর মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, চলতি মাসের ২০ আগস্ট থেকে অতি ভারী বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে ফেনী জেলায় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এ অঞ্চলের মুহুরী কহুয়া সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে অন্তত ৩০ স্থান ভেঙে পানি ঢুকে বন্যার সৃষ্টি হয়। গত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহের প্রথম দফা এবং চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের দ্বিতীয় দফা এবং ২০ আগস্ট থেকে তৃতীয় দফা বন্যাকবলিত হয় এসব উপজেলার মানুষজন।
একাত্তরের ২৫ মার্চের ভয়াল গণহত্যার স্মরণে আগামী বুধবার সারা দেশে এক মিনিটের প্রতীকী ‘ব্ল্যাকআউট’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৩ মার্চ) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণহত্যা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের অংশ হিসেবে ২৫ মার্চ রাত ১০টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত দেশব্যাপী এ কর্মসূচি চলবে। তবে কেপিআইভুক্ত এলাকা, জরুরি স্থাপনা এবং বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি মিশনগুলো এ কর্মসূচির বাইরে থাকবে।
মন্ত্রণালয় আরও জানায়, দিবসটির পবিত্রতা ও গাম্ভীর্য অক্ষুণ্ন রাখতে ২৫ মার্চ রাতে দেশের কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত কিংবা বেসরকারি ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা যাবে না।
এর আগে ৮ মার্চ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এবার ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসেও দেশব্যাপী আলোকসজ্জা করা হবে না।
২৫ মার্চের এই প্রতীকী অন্ধকার একাত্তরের কালরাতে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পালন করা হবে।
‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২৬’ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকার গাবতলী থেকে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত সড়কে সব ধরনের তোরণ, পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানো থেকে বিরত থাকার জন্য সর্বসাধারণকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আজ সোমবার (২৩ মার্চ) এক তথ্যবিবরণীতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এছাড়া পৃথক এক বার্তায় ‘মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস’ উপলক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণকালে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সাধারণ মানুষকে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণের পুষ্পকানন বা ফুলের বাগানের কোনো প্রকার ক্ষতিসাধন না করার জন্যও বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একটা সময় মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে অনুষ্ঠিত হতো বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ, তবে দীর্ঘ দেড়যুগ বন্ধ ছিল এই কুচকাওয়াজ। দেশের শাসনক্ষমতার পালাবদলের পর আবারও স্বাধীনতা দিবসে ফিরছে ঐতিহ্যবাহী কুচকাওয়াজ। রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর অংশগ্রহণে স্থল ও আকাশপথে তুলে ধরা হবে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার চিত্র।
স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা ইতোমধ্যে কয়েক দফা মহড়ার মাধ্যমে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন।
অনুষ্ঠানে সালাম গ্রহণ করবেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এবং উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনের মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাহিনীগুলোর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা তুলে ধরা হবে। প্যারেড কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আসাদুল হক।
কুচকাওয়াজে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর পাশাপাশি বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণ থাকবে। ঘোড়ায় আরোহন করে প্যারেড কমান্ডারের প্রবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হবে মূল আয়োজন।
এবারের কুচকাওয়াজে সাজোয়া, আর্টিলারি, সিগনালস, ইস্ট বেঙ্গল, এয়ার ডিফেন্স, সার্ভিসেস, প্যারা কমান্ডো, নৌবাহিনী এবং আধুনিকায়িত ইনফ্যান্ট্রি কন্টিনজেন্ট অংশ নেবে।
আকাশপথে প্যারাট্রুপাররা জাতীয় পতাকা বহন করে অবতরণ করবেন এবং বিমান বাহিনী প্রদর্শন করবে তাদের কৌশলগত সক্ষমতা। সবশেষে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানিয়ে কুচকাওয়াজের সমাপ্তি ঘোষণা করবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর ফিরে আসা এই কুচকাওয়াজ স্বাধীনতা দিবসের আয়োজনকে আরও বর্ণিল ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলবে।
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে উল্লেখ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জনগণকে আতঙ্কিত না হয়ে কেবল প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সংগ্রহের আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুরে নিজ বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিশ্চিত করেন, সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি দিয়ে তেল আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে এবং সবাই পর্যায়ক্রমে তেল পাবেন।
তিনি আরও জানান, ঈদের ছুটির কারণে গত দুই দিন সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় জনমনে কিছুটা চাপের সৃষ্টি হয়েছে, তবে গত বছরের তুলনায় এবার ২৫ শতাংশ বেশি তেল আমদানি করা হচ্ছে।
একই দিনে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, তেলের সংকটকে কেন্দ্র করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানোর যে পাঁয়তারা চলছিল, সরকার তা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রীর মতে, ঈদের আগে এক ধরনের শঙ্কা থাকলেও সরকারের বিশেষ উদ্যোগের ফলে ঈদযাত্রায় এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি এবং চাহিদামাফিক সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। পাম্পগুলোতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঈদের আগের মতো বর্তমানেও বজায় রাখা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
তবে সরকারি ভাষ্যের বিপরীতে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস ও বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল।
তিনি জানান, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এই অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণেই মূলত অনেক পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। তবে সংকট সাময়িক হলেও স্থায়ীভাবে কোনো পাম্প বন্ধ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে স্বেচ্ছাসেবীদের মানবিক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে কলমাকান্দা উপজেলা পরিষদ হলরুমে 'কলমাকান্দা যুব রক্তদান ফাউন্ডেশন' আয়োজিত এক স্বেচ্ছাসেবী মিলনমেলা ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করে এবং বিশেষ করে রক্তদানের মতো মহৎ উদ্যোগগুলো মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচাতে অনন্য সাধারণ অবদান রাখছে। বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত হওয়ার জন্য তিনি বিশেষ পরামর্শ প্রদান করেন।
সোহেল রানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ সভায় ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হাসান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জহিরুল ইসলাম মামুন।
সভায় অন্যান্যদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ শিক্ষক ফরিদ জাম্বিল, উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা আবুল হাসেম, কলমাকান্দা প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি মুহাম্মদ এনামুল হক তালুকদার এবং উপজেলা এনসিপির সমন্বয়ক আবু কাওসার। বক্তারা তাদের আলোচনায় সমাজে স্বেচ্ছায় রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা এবং এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের স্বেচ্ছাসেবী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থেকে সংহতি প্রকাশ করেন।
সড়ক পথে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। উৎসবের আনন্দ ছাপিয়ে একের পর এক যোগ হচ্ছে লাশের সারি। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার এক ব্যবসায়ী। বন্ধুদের সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে বান্দরবান ভ্রমণে যাওয়ার পথে কুমিল্লার কোটবাড়িতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন মো. আক্তার হোসেন (৪০) নামে এক ব্যক্তি। এই অকাল মৃত্যুতে নিহতের পরিবার ও এলাকায় শোকের মাতম চলছে।
নিহত আক্তার হোসেন রূপগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা মৃত মোমেন সরকারের ছেলে। তিনি রূপগঞ্জ এলাকায় আরএফএল কোম্পানির সামনে একটি চায়ের স্টল পরিচালনা করতেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল ফিতরের ছুটিতে আরএফএল কোম্পানি বন্ধ থাকায় এবং আশপাশের লোকজন বাড়িতে চলে যাওয়ায় ব্যবসায়িক ব্যস্ততা কম ছিল আক্তার হোসেনের। তাই অবসর সময় কাটাতে বন্ধুদের সঙ্গে বান্দরবান ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঈদের দ্বিতীয় দিন রাত ১০টার দিকে আক্তার হোসেনসহ চার বন্ধু চারটি পৃথক মোটরসাইকেলে করে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে তারা কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে পেছন থেকে একটি দ্রুতগামী ট্রাক আক্তার হোসেনের মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের ওপর ছিটকে পড়েন। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আসা আরেকটি অজ্ঞাত দ্রুতগামী যানবাহন তার শরীরের ওপর দিয়ে চলে গেলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার পর কুমিল্লা কোটবাড়ি সড়কে দায়িত্বরত সার্জেন্ট বিষয়টি রূপগঞ্জ থানাকে অবহিত করেন এবং দুর্ঘটনাস্থলের ছবি প্রেরণ করেন। খবর পেয়ে রূপগঞ্জ থানার এসআই জাহাঙ্গীর তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের নিজ বাড়ি সরকারপাড়া এলাকায় গিয়ে স্বজনদের এই দুঃসংবাদ জানান।
এদিকে, ঈদের আনন্দের মধ্যে এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে আক্তার হোসেনের পরিবারে কান্নার রোল পড়েছে। নিহতের প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর মাঝেও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। ময়নাতদন্ত ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের টানা ছুটি শেষ হচ্ছে সোমবার (২৩ মার্চ)। সাত দিনের বিরতির পর মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) থেকে আবারও খুলছে অফিস-আদালত, ব্যাংক-বিমা ও শেয়ারবাজার।
গত শনিবার (২১ মার্চ) দেশজুড়ে উদযাপিত হয়েছে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। এ উপলক্ষে ১৭ মার্চ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মোট সাত দিনের সরকারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এই দীর্ঘ ছুটি শেষে কর্মজীবী মানুষ আবার কর্মস্থলে ফিরতে প্রস্তুত।
মঙ্গলবার থেকে সরকারি-বেসরকারি অফিসের পাশাপাশি ব্যাংক-বিমা, শেয়ারবাজারসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানও স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করবে। তবে ঈদের পরপরই আবার ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ছুটি থাকায় অনেক কর্মজীবী ২৪ ও ২৫ মার্চ ঐচ্ছিক ছুটি নিয়েছেন। এর সঙ্গে ২৭ ও ২৮ মার্চের সাপ্তাহিক ছুটি যোগ হওয়ায় অনেকের ছুটি টানা ১৭ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়েছে।
এ কারণে অফিস-আদালতের কার্যক্রম পুরোপুরি গতিশীল হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি সপ্তাহজুড়ে ধীরগতিতে কার্যক্রম চলবে এবং আগামী সপ্তাহ থেকে রাজধানী স্বাভাবিক কর্মচাঞ্চল্যে ফিরবে।
প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের পর প্রথম কর্মদিবসে অফিসপাড়ায় তেমন ব্যস্ততা নাও দেখা যেতে পারে। সহকর্মীদের মধ্যে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ই থাকে মূল ব্যস্ততা। একই চিত্র দেখা যায় ব্যাংকপাড়ায়ও, যেখানে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া লেনদেন তুলনামূলক কম থাকে।
এদিকে নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ঈদ উপলক্ষে ১৯ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা করেছিল। ফলে সংবাদপত্রে কর্মরত সাংবাদিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটিও আজ শেষ হচ্ছে।
জ্বালানি ঘাটতি ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে দেশের সব পেট্রোল পাম্প যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। রবিবার (২২ মার্চ) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি এ দাবি জানায়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সারাদেশের পেট্রোল পাম্পগুলোর পরিস্থিতি বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক। কোম্পানির সরবরাহ করা দৈনিক জ্বালানি দিয়ে ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তেল নিতে এসে মোটরসাইকেল চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বিরামহীন কাজের চাপে পাম্পে কর্মরতরা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থায় পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকলে যেকোনো সময় পাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এর আগে সংগঠনটি পেট্রোল পাম্পে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু তাদের অভিযোগ, সরকার ও জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে না। তেল বিক্রির সময় কার্যকর নিরাপত্তা না থাকায় পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।
সংগঠনটি জানায়, ঈদের আগের দিন একটি পাম্পে সাড়ে ১০ হাজার লিটার পেট্রোল ও একই পরিমাণ অকটেন মজুত ছিল। অন্য একটি পাম্পে প্রায় আট হাজার লিটার জ্বালানি ছিল। স্বাভাবিকভাবে এসব মজুত কয়েকদিন চলার কথা থাকলেও অতিরিক্ত চাপ ও বিশৃঙ্খলার কারণে খুব অল্প সময়েই তা শেষ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিকে তারা লুটতরাজের সঙ্গে তুলনা করেছে।
আরও অভিযোগ করা হয়, অনেক মোটরসাইকেল চালক দিনে একাধিকবার তেল নিচ্ছেন। প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে পাম্পগুলো তেল বিক্রি করলেও কিছু চালক দিনে প্রায় ১০ বার পর্যন্ত তেল নিয়ে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছেন। আবার অনেকেই আংশিক ভর্তি ট্যাংক নিয়েও বারবার তেল নিতে আসছেন। এতে প্রকৃত প্রয়োজনীয় গ্রাহকরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং পাম্পে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
সংগঠনটি আরও জানায়, গভীর রাতে সংঘবদ্ধভাবে পাম্পে এসে জোর করে তেল নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ঠাকুরগাঁওয়ের একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলা হয়, সেখানে জ্বালানি সরবরাহের সময় লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে সব তেল নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এমন ঘটনা অন্যান্য জায়গাতেও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, জ্বালানি ঘাটতির পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ডিপো থেকে তেল পরিবহনের সময়ও ঝুঁকি বাড়ছে এবং ট্যাংকার লুট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না বলেও তারা সতর্ক করেছে।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দঘন ছুটির মধ্যে সারা দেশে সড়ক ও রেলপথে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনায় অন্তত ২৭ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। রোববার (২২ মার্চ) ঈদের ছুটির এই সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এসব দুর্ঘটনা ঘটে, যা উৎসবের আমেজকে বিষাদে রূপান্তর করেছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায়, যেখানে একটি যাত্রীবাহী বাসে ট্রেনের ধাক্কায় একই পরিবারের মা ও দুই শিশুসহ ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভোরে পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে একটি বাস রেললাইনে উঠে পড়লে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা মেইল’ ট্রেন সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
একই দিনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের মাধবপুর এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে মা-ছেলেসহ একই পরিবারের ৪ জন নিহত হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষের তীব্রতায় পিকআপটি রাস্তার পাশের খাদে পড়ে গেলে এই প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর এলাকায় বাস, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের ত্রিমুখী সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়েছেন। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে বেপরোয়া গতির পিকআপ ভ্যানের চাপায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জে ঈদের ছুটিতে নতুন মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুই বন্ধুর মৃত্যু হয়েছে এবং নাটোর, নওগাঁ, কুষ্টিয়া ও বগুড়ায় পৃথক দুর্ঘটনায় আরও ৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ঈদের এই সময়ে ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের অসতর্কতা এবং রেলক্রসিংয়ে সিগন্যাল অমান্য করার প্রবণতাই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।
এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলোতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। আহতদের দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তিনি স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এখন পুরোপুরি প্রস্তুত পর্যটকদের বরণে। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটবে বলে আশা করছেন বনবিভাগ।
পর্যটকদের জন্য সুন্দরবনের করমজল, হাড়বাড়িয়া, আন্দারমানিক, আলিবান্ধা, কটকা, কচিখালী ও আলোরকোলসহ জনপ্রিয় স্পটগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বনরক্ষীদের টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
শরণখোলা স্টেশন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, “পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে আমাদের টিম, র্যাব, কোস্টগার্ড সার্বক্ষণিক কাজ করছে।"
এদিকে নদীপথে যাতায়াতে লঞ্চ ও ট্রলারগুলোতে নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। প্রতিটি নৌযানে পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট রাখা এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
শরণখোলার ট্যুর অপারেটর মো. রাজ্জাক হাওলাদার বলেন, “ঈদকে ঘিরে বুকিং বাড়ছে। আমরা পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত।"
স্থানীয় পর্যটকরাও সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তবে বন বিভাগের পক্ষ থেকে পরিবেশ সুরক্ষায় নেওয়া হয়েছে কঠোর পদক্ষেপ। বনের ভেতরে উচ্চশব্দে মাইক বাজানো এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটে—এমন কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের টানে এবারের ঈদেও সুন্দরবন হয়ে উঠতে পারে পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় গন্তব্য।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান যুক্তরাজ্যের লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। রোববার (২২ মার্চ) সকালে বাংলাদেশ বিমানের বিজি-২০১ নম্বর ফ্লাইটে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রা করেন। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, ডা. জুবাইদা রহমান সকালে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন।
লন্ডন যাত্রার আগের দিন শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করেন ডা. জুবাইদা রহমান। ঈদ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতে প্রধানমন্ত্রী যখন সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, তখন সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসও উপস্থিত ছিলেন।
পারিবারিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার স্ত্রী, সন্তান এবং ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর পরিবারসহ স্বজনদের নিয়ে শেরে বাংলা নগরে বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন। এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেই ডা. জুবাইদা রহমান ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়লেন।
কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক ভয়াবহ ট্রেন ও সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে শনিবার (২১ মার্চ) রাতে কুমিল্লার রেল ক্রসিংয়ে বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ এবং এর আগে বগুড়ায় ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি এই শোক জানান। রোববার (২২ মার্চ) এক বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, পবিত্র ঈদের এই আনন্দঘন সময়ে এ ধরনের দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং প্রতিটি জীবনের অকাল মৃত্যু দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রধানমন্ত্রী নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী এসব দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ দ্রুত খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, জনগণের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে কোনো ধরনের শৈথিল্য বরদাশত করা হবে না।
রেলক্রসিং ব্যবস্থাপনা, সেতুর নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক পরিবহন খাতের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। দুর্ঘটনার পর থেকেই তিনি মন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে কাজ করছেন।
ইতোমধ্যেই কুমিল্লার দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে ইতোমধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া ফেনী, হবিগঞ্জ ও জামালপুরসহ দেশের অন্যান্য স্থানে দুর্ঘটনায় হতাহতদের প্রতিও প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা জানিয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ভয়াবহ ট্রেন-বাস সংঘর্ষের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব। রোববার (২২ মার্চ) দুপুরে বিশ্বরোড এলাকায় গিয়ে তিনি দুর্ঘটনার কারণ ও ভবিষ্যৎ প্রতিরোধে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের দুটি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, এর একটি হচ্ছে যেখানে যেখানে রেলের লেভেল ক্রসিং রয়েছে সেখানে আন্ডারপাস ও ওভারপাস করা হবে। আরেকটি হচ্ছে অটোমেটিক সিস্টেম, মানে রেলে ক্রসিং এর কাছাকাছি রেল আসার সঙ্গে সঙ্গে অটোমেটিক সিস্টেমে গেট পড়ে যাবে, এসব ক্রসিং এ গার্ডও দায়িত্ব পালন করবে।”
এর আগে শনিবার (২১ মার্চ) রাত ৩টার দিকে পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে নোয়াখালীগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের পর ট্রেনটি বাসটিকে প্রায় এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
দুর্ঘটনাস্থলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “রেল ক্রসিংয়ের দুজন গার্ড ও স্টেশন মাস্টারের অবহেলার কারণে এই ঘটনাটি ঘটেছে, ইতিমধ্যে তাদেরকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রেলের পক্ষ থেকে একটি বিভাগীয় ও একটি জোনাল আওতায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, সুতরাং এই ব্যাপারে কোনো রকম গাফিলতি সহ্য করা হবে না।”
নিহতদের সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি জানান, “যারা নিহত হয়েছে ইতিমধ্যে প্রতিটি পরিবারকে কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে প্রতি জনের জন্য ১ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে।”
আহতদের চিকিৎসা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমি ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রির সঙ্গে কথা বলেছি, যারা দ্রুত রাখতে হয়েছে তাদের মধ্যে যদি কাউকে ঢাকায় নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন হয় আমরা সেই ব্যবস্থাও করব। এছাড়াও যারা আহত হয়েছেন তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী খোঁজখবর রাখছেন।”
এদিকে রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, “এই ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে, এই ঘটনায় আরো যদি কেউ জড়িত থাকে তাদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই রেল ক্রসিং এলাকায় ওভারব্রিজ থাকার পরও কিন্তু বাসচালকরা ওভার দিয়ে না গিয়ে নিচের রেল ক্রসিং ব্যবহার করেছেন, এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। হাইওয়ে সড়কগুলোতে এভাবে রেল ক্রসিং রাখা নিরাপদ নয়, স্থানীয় গাড়িগুলোর জন্য আমরা আন্ডারপাস ব্যবস্থা করব।”
তিনি আরও বলেন, “অধিকাংশ এলাকায় রেলের অনুমোদন ছাড়াই রেল ক্রসিং করা হয়েছে সেটার বিষয়েও আমরা পদক্ষেপ নেবো। যেগুলো হয়ে গেছে সেগুলোতে আমরা গেটম্যান নিয়োগ দেব।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন, কুমিল্লা জেলা প্রশাসক রেজা হাসান, জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপুসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।