পেট্রোলের ঝাঁঝালো গন্ধ, সীসা-মিশ্রিত কালো ধোঁয়া আর ইঞ্জিনের কানফাটা গর্জন পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন ভোরের মুখোমুখি। ধুলোবালি আর যানজটের চাদরে ঢাকা এই বদ্বীপে নিঃশব্দে এক বিপ্লবের বীজ বোনা হচ্ছে, যার নাম ইলেকট্রিক মোবিলিটি বা ইভি (EV)। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শুল্কের লৌহকপাট ভেঙে সরকার যে অভূতপূর্ব কর ছাড় ও প্রণোদনার ডালি সাজিয়েছে, তা দেশের অটোমোবাইল ইতিহাসে এক স্মরণীয় জোয়ার এনেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলো কেবল আমদানির খোলস ছেড়ে বেরিয়ে নিজস্ব কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে।
তবে, স্বপ্নের এই সিল্ক রুটে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের চেয়েও বড় দুটি স্পিডব্রেকার দাঁড়িয়ে আছে—প্রথমটি হলো গ্রিডের অবিশ্বাস্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও দুর্বল কারিগরি মান, আর দ্বিতীয়টি হলো কোটি কোটি টাকার চার্জিং স্টেশনের দীর্ঘমেয়াদি লোকসান ও অনিশ্চিত লাভজনকতা (ROI)।
বাংলাদেশের ইভি সাম্রাজ্যের নতুন সারথী: বাংলাদেশি শিল্পোদ্যোক্তারা এবার আর দর্শক সারিতে নেই। তারা চীনের বিওয়াইডি (BYD) কিংবা মার্কিন টেসলার (Tesla) মতো বিশ্বসেরা মডেলের সমকক্ষ ইকোসিস্টেম দেশেই তৈরি করতে কোমর বেঁধে নেমেছেন। নিচে পাইপলাইনে থাকা প্রধান বিনিয়োগকারী ও তাদের যুদ্ধকৌশল বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড: চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশের বৃহত্তম সমন্বিত ইভি কারখানা গড়ছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
মূল লক্ষ্য: কেবল গাড়ি সংযোজন নয়, ব্যাটারি থেকে শুরু করে চ্যাসিস ও বডি—সবকিছুই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা।
প্রযুক্তির চমক: তাদের উৎপাদিত প্রথম সারির গাড়িগুলো একবার সম্পূর্ণ চার্জ দিলে ৪৫০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে পারবে। আর আল্ট্রা-ফাস্ট চার্জিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র ৩০ মিনিটে শূন্য থেকে ৮০ শতাংশ চার্জ করা সম্ভব হবে।
রানার অটোমোবাইলস ও বিওয়াইডি অংশীদারিত্ব: বিশ্বের এক নম্বর ইভি নির্মাতা BYD-এর সাথে হাত মিলিয়ে রানার ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের রাস্তায় ১,০০০-এর বেশি প্রিমিয়াম ইভি নামাতে সক্ষম হয়েছে।
মূল লক্ষ্য: রানার ধাপে ধাপে ২৬০ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে গাড়ি উৎপাদন ও এসেম্বলি লাইন তৈরি করছে।
অবকাঠামো: BYD গ্রাহকদের জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বগুড়া ও কক্সবাজারে নিজস্ব ব্র্যান্ডেড চার্জিং হাব তৈরি করেছে এবং দক্ষ মেকানিক গড়ে তুলতে ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন করেছে।
নাসির গ্রুপ ও আকিজ মোটরস : শিল্প খাতের দুই জায়ান্ট নাসির ও আকিজ গ্রুপ প্রত্যেকে ৫০০ কোটি টাকা করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা উন্মোচন করেছে। আকিজ মোটরস মূলত সাশ্রয়ী মূল্যের মিনি ইভি এবং পণ্য পরিবহনের উপযোগী লাইট কমার্শিয়াল ইভি বা ছোট ইলেকট্রিক ট্রাক তৈরির দিকে নজর দিচ্ছে, যা দেশের ই-কমার্স ডেলিভারি খাতে বিপ্লব ঘটাতে পারে।
ওয়ালটন ও প্রাণ-আরএফএল: দেশের ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট ওয়ালটন এবং ফুড অ্যান্ড প্লাস্টিক জায়ান্ট প্রাণ-আরএফএল মূলত টু-হুইলার তথা ই-বাইক, ইলেকট্রিক স্কুটার ও ই-থ্রি-হুইলারের বাজার ধরতে প্রত্যেকে ২০০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ করেছে। তাদের লক্ষ্য—মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করা।
অডি বাংলাদেশ ও ‘এখন চার্জ’ (ইকোসিস্টেম পার্টনার): লাক্সারি সেগমেন্টের নেতৃত্ব দেওয়া অডি বাংলাদেশ এবং দেশের বৃহত্তম চার্জিং নেটওয়ার্ক ‘এখন চার্জ’ দেশের প্রথম ও সর্ববৃহৎ ইভি সল্যুশন হিসেবে যৌথভাবে কাজ করছে। তারা ইতোমধ্যে ১৫০টির বেশি হোম চার্জিং ইউনিট স্থাপন করেছে এবং মহাসড়কগুলোতে ৫টি হাই-স্পিড বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন সচল রেখেছে।
গ্রিডের অগ্নিপরীক্ষা: ইভি খাতের উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হলো বিদ্যুতের গুণগত মান এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। রানার অটোমোবাইলসের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান এই কারিগরি জটটি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
হোম চার্জিং বনাম আল্ট্রা-ফাস্ট হাইওয়ে চার্জিং: প্রতিটি গাড়ির সাথে দেওয়া হোম চার্জার দিয়ে সাধারণ গৃহস্থালি লাইন (220V) থেকে চার্জ করা যায়। এতে সময় লাগে ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা। এটি সাধারণ গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না।
বাণিজ্যিক চার্জিং (ডিসি আল্ট্রা-ফাস্ট চার্জার): হাইওয়েতে বা জরুরি প্রয়োজনে একজন চালক সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে চাইবেন। এই ফাস্ট-চার্জিংয়ের জন্য ১০০ কিলোওয়াট থেকে ৩৫০ কিলোওয়াট বা তার চেয়েও বেশি ক্ষমতার সরাসরি বিদ্যুৎ (DC) সংযোগ প্রয়োজন।
গ্রিডের দুর্বলতা ও সাবস্টেশনের রাজকীয় খরচ: বাংলাদেশের বর্তমান গ্রিড লাইনে যে পরিমাণ ভোল্টেজ ফ্ল্যাকচুয়েশন বা লোডশেডিং হয়, তাতে এই আল্ট্রা-ফাস্ট চার্জারগুলো টিকিয়ে রাখা কঠিন। একটি হাই-স্পিড চার্জিং স্টেশন স্থাপন করতে কেবল চার্জিং মেশিন কিনলেই হয় না, তার জন্য দরকার নিজস্ব ডেডিকেটেড সাবস্টেশন ও বড় ট্রান্সফরমার।
একটি সাধারণ লেভেল-২ স্টেশনের খরচ যেখানে প্রায় ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা, সেখানে সাবস্টেশনসহ একটি হাই-স্পিড আল্ট্রা-ফাস্ট চার্জিং স্টেশনের পেছনে বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়ে যায় ৩ থেকে ৫ কোটি টাকা!
সৌর-ভিত্তিক চার্জিং: গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে স্রেডা এখন সৌরশক্তি চালিত (Solar-powered) ইভি চার্জিং হাব তৈরির দিকে জোর দিচ্ছে।
ইভি বিপ্লব সফল করার ৩টি চাবিকাঠি: বাংলাদেশের ইভি রূপান্তরের পরবর্তী ধাপ কেবল ‘বিনিয়োগের ঘোষণা’ বা খবরের কাগজের হেডলাইনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (DCCI)-এর সাবেক সভাপতি তাসকীন আহমেদ এবং বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেনের মতে, এই বিপ্লব সফল করতে নিচের তিনটি মহৌষধ প্রয়োজন:
সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজারের শুভসূচনা: বাজার যখন প্রাথমিক ধাপে থাকে, তখন কেবল বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়ে চার্জিং স্টেশন বসাতে বাধ্য করা অন্যায়। সরকারকে শুরুতে এগিয়ে আসতে হবে। হাইওয়ের সরকারি ফিলিং স্টেশন বা বিআরটিসি ডিপোগুলোতে নিজস্ব খরচে চার্জিং নেটওয়ার্ক বসিয়ে বাজারকে চাঙ্গা করতে হবে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক যানকে মূলধারায় আনা ও সঠিক ডেটাবেজ: বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার (অটোরিকশা বা ইজি বাইক) চলছে। এগুলো সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক গ্রিড থেকে বা চোরাই লাইনে চার্জ হচ্ছে। এই ৬০ লাখ যানবাহনকে যদি আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে দক্ষ থ্রি-ফেইজ চার্জিংয়ের আওতায় আনা যায়, তবে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং সরকারের রাজস্ব কোটি কোটি টাকা বাড়বে।
গ্রিন গ্রিড ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বয়: বিদ্যুতের ঘাটতি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বহাল রেখে যদি আমরা হাজার হাজার ইভি রাস্তায় নামাই, তবে তা পরিবেশবান্ধব হবে না। গাড়ি চলবে কয়লার বিদ্যুতে, যা প্রকারান্তরে পরিবেশের ক্ষতিই করবে। তাই ইভি চার্জিংকে অবশ্যই নবায়নযোগ্য শক্তি (সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ)-এর সাথে ট্যাগ করতে হবে।
প্রতি কিলোমিটারে ৭০শতাংশ সাশ্রয়ই কি তুরুপের তাস: অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইভির কোনো বিকল্প নেই। মহাসড়কে একবার ফুল চার্জ দিতে খরচ হয় মাত্র ৩০৮ থেকে ৭৫৯ টাকা। যেখানে একটি পেট্রোল বা অকটেন চালিত গাড়ির প্রতি কিলোমিটারের ব্যয়ের তুলনায় ইভি চালানো প্রায় ৭০ শতাংশ সাশ্রয়ী।
বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত এই বিপুল সাশ্রয়ের অংকটি বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু এই ৪,০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ সফল করতে হলে এবং গ্রাহকের মনের ভয় দূর করতে হলে সরকারকে অতি দ্রুত মহাসড়কগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন, ডেডিকেটেড গ্রিড লাইন এবং কারিগরি স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন (যেমন সব গাড়ির জন্য একই চার্জিং পোর্ট বা প্লাগ) নিশ্চিত করতে হবে। তবেই বাংলাদেশের সড়কগুলোতে রচিত হবে দূষণমুক্ত, শব্দহীন এক নতুন গতিময় ইতিহাস।