জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল, অথচ গভীরভাবে বেদনাবিধুর অধ্যায়। এই আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ এবং যারা আহত হয়ে আজও জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সম্মানজনক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মূল লক্ষ্য। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দেড় বছর অতিক্রম করলেও আন্দোলনে আহতদের সহায়তা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি। আহতদের অনেকেই বারবার আবেদন করেও পাচ্ছেন না সহায়তা। দীর্ঘসূত্রতা, অর্থ সংকট এবং প্রশাসনিক ধীরগতিতে হতাশা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবার। গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এসময় উপস্থিত ছিলেন, লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর (প্রধান নির্বাহী)
সোহেল মিয়া ( জেনারেল ম্যানেজার)
মো জাহিদ হোসাইন ( গণসংযোগ ও মিডিয়া প্রধান), আমানুল্লাহ সাকিব (ভেরিফিকেশন প্রধান), সাকিব হাসান (আইটি প্রধান) ও মাহফুজ (কল সেন্টার প্রধান)।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের সামনে একাধিক সংকট একযোগে উপস্থিত হয়। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, স্থায়ী ও অস্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা, মানসিক আঘাত, কর্মসংস্থান সংকট এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা - এই বহুমাত্রিক সংকটগুলো মোকাবিলার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি, সমন্বিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর সভাপতিত্বে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের যাত্রা শুরু হয়।
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে ফাউন্ডেশন মানবিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থেকে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ফাউন্ডেশন চারটি মূল ম্যান্ডেটকে কেন্দ্র করে তহবিল সংগ্রহ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান, স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক ও আইনি সহায়তা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চাকরি, স্বনির্ভর কর্মসংস্থান ও আবাসনের মাধ্যমে টেকসই পুনর্বাসন, গবেষণা, নথিভুক্তকরণ ও স্মৃতি সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো স্বচ্ছ যাচাই ও নীতিমালাভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান। এ পর্যন্ত ফাউন্ডেশন ১১৯ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।
যাচাই-বাছাই ও তথ্য যাচাই শেষে এর মধ্যে ১১৬ দশমিক ২১ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
এই সহায়তার আওতায় ৮২৯টি জুলাই শহীদ পরিবার পেয়েছে ৪১ দশমিক ২৭ কোটি টাকা, ৬,৪৭১ জন আহত জুলাই যোদ্ধা পেয়েছেন ৭৪ দশমিক ২১ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ৭,৩০০ জন শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধা মোট ১১৬ দশমিক ২১ কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন।
তবে আমাদের দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। এখনো ৭,৭৬৯ জন আহত জুলাই যোদ্ধা আর্থিক সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত তহবিলের পরিমাণ প্রায় ২৩৮ কোটি টাকা। এই লক্ষ্য পূরণে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ধারাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
ফাউন্ডেশন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং সম্মানজনক ও টেকসই পুনর্বাসনই আহত জুলাই যোদ্ধাদের দীর্ঘমেয়াদি মুক্তির পথ।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে এ পর্যন্ত ৭,০৮২ জন আহত জুলাই যোদ্ধা পুনর্বাসনের জন্য ফাউন্ডেশনে আবেদন করেছেন। আবেদনকারীদের আগ্রহ বিশ্লেষণে দেখা যায় প্রায় ২৫ শতাংশ দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ গ্রহণে আগ্রহী, ২০ শতাংশ চাকরিতে যুক্ত হতে আগ্রহী, এবং ৫৪ শতাংশ স্বনির্ভর কর্মসংস্থানের মাধ্যমে জীবিকা গড়ে তুলতে আগ্রহী।
এই পরিসংখ্যান আমাদের পুনর্বাসন পরিকল্পনাকে আরও বাস্তবভিত্তিক, প্রয়োজননির্ভর ও কার্যকর করে তুলেছে।
এ পর্যন্ত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ৮২ জন আহত জুলাই যোদ্ধার টেকসই পুনর্বাসন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এই পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় তাদের জন্য স্বনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, পেশাভিত্তিক পুনঃসংযুক্তি এবং ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী সহায়ক সরঞ্জাম প্রদান নিশ্চিত করা হয়েছে যাতে তারা সম্মানজনক ও স্থায়ী জীবনে ফিরে যেতে পারেন।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে ২৩ জন আহত জুলাই যোদ্ধার পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে, যেখানে মোট ৪২ লাখ টাকা সরাসরি পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে ব্যয় করা হয়েছে। এই উদ্যোগ ফাউন্ডেশনের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের একটি বাস্তব উদাহরণ।
এছাড়া এসএমই-এর মাধ্যমে জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য চারু ও কারু প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিকেএসপির মাধ্যমে আহত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য প্যারালিম্পিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে আর্চারি, শুটিং ও টেবিল টেনিস বিভাগে।
এছাড়া বিটিসিআই-এর মাধ্যমে মৌলিক চলচ্চিত্র নির্মাণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে বেসিক ফিল্ম মেকিং, ফিল্ম এডিটিং, স্ক্রিপ্ট রাইটিং, সেট ডিজাইন ও ডকুমেন্টারি মেকিং। এর পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কল সেন্টারের জন্য ১৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এই কর্মসূচির একটি গর্বিত ও অনুপ্রেরণাদায়ক অর্জন হলো আহত জুলাই যোদ্ধা আমাউল্লাহ, যিনি ১০ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্যারালিম্পিকে স্বর্ণপদক অর্জন করেছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণ ফাউন্ডেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব। এ পর্যন্ত ৮০৪ জন জুলাই শহীদের ঘটনা, ছবি, পরিবারিক তথ্য ও বক্তব্য সংরক্ষণ করা হয়েছে, ৩০০টির বেশি শহীদের ভিডিও ডকুমেন্টারি, ৪০টির বেশি আহত যোদ্ধার ভিডিও ডকুমেন্টারি, আন্দোলনকালীন দুর্লভ ভিডিও ফুটেজ, এবং সেই সময়কার সব প্রিন্ট মিডিয়া রিপোর্ট ও কাটিং সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই আর্কাইভ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি প্রামাণ্য, নির্ভরযোগ্য ও ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করবে।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের সম্মানজনক, নিরাপদ ও স্বাবলম্বী জীবন নিশ্চিত করতে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।
গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা, সমাজের সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় সমন্বয় এই তিনের সমন্বয়েই আমাদের এই জাতীয় দায়িত্ব আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হবে।