এবারও কোরবানির ঈদ ঘিরে চামড়াশিল্প নিয়ে পুরনো সংকটের পুনরাবৃত্তি দেখল দেশবাসী। লবণযুক্ত চামড়ার দাম এ বছর প্রতি বর্গফুট দুই টাকা বাড়ানো হলেও মাঠপর্যায়ে সেই দাম পাননি মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এ কারণে চরম লোকসানের মুখে দেশের কোথাও কোথাও ব্যবসায়ীরা চামড়া সড়কে ফেলে দিয়েছেন। কেউ ফেলেছেন নদীতে। কেউ আবার রাগে-ক্ষোভে ময়লার ভাগাড়ে ফেলেছেন। অথচ একই সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ছে, ট্যানারিগুলো লাখ লাখ চামড়া সংগ্রহ করছে। এরপরও কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস। ফলে পুরো চামড়া শিল্প সিন্ডিকেটে জিম্মি হয়ে পড়েছে।
এদিকে, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে স্থাপিত কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নির্মিত না হওয়ায় ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক সনদ পেতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে একের পর এক হারাচ্ছে বৈশ্বিক বাজার। বিদেশি ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি চামড়ার দামও নেমে এসেছে তলানিতে।
পবিত্র ঈদুল আজহা বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় মৌসুম। সারা বছরের কাঁচামালের প্রায় অর্ধেক আসে এই ঈদে। অথচ প্রতি বছরই দেখা যায় একই চিত্র। সরকারি দাম ঘোষণা, মাঠপর্যায়ে দাম না পাওয়া, সিন্ডিকেট, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় হতাশা এবং কোথাও কোথাও চামড়া নষ্ট হওয়ার ঘটনা। এবারের কোরবানির ঈদেও এর কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। এবার দেশে প্রায় ৯০ লাখ গবাদি পশু কোরবানি হয়েছে। সরকারি হিসাবে গত বছরের তুলনায় প্রায় এক লাখ কম। তবে বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ লাখ কম হবে। অন্যদিকে ট্যানারি মালিকরা শুরু থেকেই ৭৫ থেকে ৮০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় কোরবানির সংখ্যা কমতে পারে।
এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়. যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। এই হিসাবে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৮৫০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে কোরবানির দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সেই চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। ছোট আকারের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। জামিয়া কারীমিয়া আরাবিয়া (রামপুরা) মাদ্রাসার চামড়া সংগ্রহকারী ও সুলতান ভূঁইয়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা নাসিরুদ্দিন বলেন, এ বছর কোরবানি কম হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত হারে চামড়া পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে ট্যানারি মালিক ও পোস্তার আড়ত ব্যবসায়ীরাও কারসাজি করে পানির দরে চামড়া কিনেছেন। ঢাকার কোথাও সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর হয়নি। ফলে মুষ্টিমেয় কিছু ট্যানারি ও আড়ত ব্যবসায়ী মুনাফা পেলেও বাকি সবাইকে লোকসান গুনতে হবে। তিনি জানান, চামড়ার দাম না পাওয়ায় মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় হতাশা বিরাজ করছে। কারণ চামড়া বিক্রিত অর্থে এসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্য, বস্ত্র ও বেতনভাতা হয়ে থাকে।
খিলগাঁও গোড়ান বাজারের মৌসুমি ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন জানান, গত বছর যে মানের চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, এবার সেখানে ৬৫০ টাকার বেশি দাম পাননি। পুরান ঢাকা ওয়ারীর ব্যবসায়ী সালাম মিয়ার ক্ষোভ আরও তীব্র। তিনি ২৫০টি চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু পোস্তার ক্রেতারা এমন দাম প্রস্তাব করেন, যা থেকে পরিবহন খরচও ওঠে না। শেষ পর্যন্ত লোকসানে চামড়া বিক্রি করে এক বুক হতাশা নিয়ে বাসায় ফেরেন এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
লালবাগের পোস্তার কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি টিপু সুলতান বলেন, ভালোমানের চামড়া সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের মধ্যেই বেচাকেনা হয়েছে। তবে ত্রুটিযুক্ত চামড়ায় কাঙ্ক্ষিত দাম দেওয়া হয়নি। সেক্ষেত্রে দাম কমে যেতে পারে।
কারা লাভবান হলো : বাজারে প্রতিযোগিতা সীমিত ছিল। অনেক ছোট ব্যবসায়ী ও আড়তদার ঋণ না পাওয়ায় ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে ট্যানারিগুলোর দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছে। সাভারের চামড়াশিল্প নগরীতে ঈদের তৃতীয় দিন রাত পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ ৩০ হাজার পিছ কাঁচা চামড়া প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৫টি গরু ও মহিষের চামড়া। ১ হাজার ৭২৫টি ট্রাকে এসব চামড়া শিল্পনগরীতে এসেছে। এ থেকে বোঝা যায়, বাজারে কাঁচামালের ঘাটতি ছিল না। বরং সংগ্রহ কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলেছে। তবে দাম নিয়ে প্রতি বছরের মতো এবারও সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঈদের দিন বিকাল পর্যন্ত এক ধরনের দাম থাকলেও সন্ধ্যার পর যোগসাজশ করে আড়তদাররা একযোগে দাম কমিয়ে দেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, পুরান ঢাকার পোস্তা আড়ত মালিক ও সাভারের ট্যানারি মালিকদের কারসাজির কারণেই চামড়ার বাজারে পতন হয়েছে বলে মনে করা হয়। এছাড়া এবার চামড়া কেনার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো মাত্র ১৬০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। অনেক ট্যানারি পুরনো ঋণে খেলাপি হওয়ায় নতুন করে ঋণ পায়নি। ফলে অনেক আড়তদার ও মাঝারি ব্যবসায়ী বাজারে সক্রিয় হতে পারেননি। এতে প্রতিযোগিতা কমেছে এবং দামও নেমে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে প্রায় ৯৯ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ বেশি। কিন্তু কাঁচা চামড়ার দাম বাড়ছে না।
এ বছর এখন পর্যন্ত সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত বিসিক চামড়া শিল্প নগরীতে প্রায় ৫ লাখ ৩৩ হাজার পিস এসে পৌঁছেছে। ট্যানারি মালিকদের ভাষ্যমতে, এসব চামড়া তারা সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা পিস দরে কিনেছেন। তবে বাস্তবতা ভিন্ন অনেক ক্ষেত্রে। একটি গরুর চামড়া মাত্র ২০০ টাকায়ও বিক্রি করতে হয়েছে বলে অভিযোগ মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিবেশ দূষণ রোধ ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ২০১৭ সালে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ১৬০টি ট্যানারি সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে স্থানান্তর করা হয়। পরিকল্পনা ছিল, সব ট্যানারির কঠিন ও তরল বর্জ্য পাইপলাইনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারে গিয়ে পরিশোধিত হবে। এর মাধ্যমে ট্যানারিগুলো সহজেই আন্তর্জাতিক মানের ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জন করতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, সিইটিপি নির্মাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত চীনা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে শিল্পনগরীর বর্জ্য যথাযথভাবে পরিশোধন না হওয়ায় পরিবেশ দূষণ বেড়েছে এবং পাশের ধলেশ্বরী নদীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এর প্রভাব পড়েছে রপ্তানি বাজারে। বর্তমানে শিল্প নগরীর শতাধিক ট্যানারির মধ্যে মাত্র একটি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়া কেনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে প্রধানত চীনই বাংলাদেশের চামড়ার অন্যতম ক্রেতা হিসেবে রয়েছে।
ট্যানারি মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। একটি চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ, রাসায়নিক ব্যবহার, শ্রমিকের মজুরি ও প্রক্রিয়া জাতকরণসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বর্গফুট চামড়া সর্বোচ্চ ৭০ সেন্ট দরে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচই উঠে আসছে না, লাভ তো দূরের কথা।
আজমির লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদ উল্লাহ বলেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ট্যানারি পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা না থাকায় চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সিইটিপির সমস্যার সমাধান না হলে এই সংকট কাটবে না।
চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার নতুন করে আধুনিক সিইটিপি নির্মাণের উদ্যোগের পাশাপাশি ট্যানারি মালিকদের নিজস্ব উদ্যোগে ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপনের পরামর্শ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ছয়টি ট্যানারিকে ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে সদর ট্যানারি ও বে ট্যানারি নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করেছে। তবে বাকি চারটি ট্যানারি এখনো তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
তবে ট্যানারি মালিকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, কেন্দ্রীয় সিইটিপির সমস্যা সমাধান ছাড়া পৃথক ইটিপি স্থাপন খুব বেশি সুফল বয়ে আনবে না। কারণ ইটিপিতে শুধু তরল বর্জ্য (ওয়াটার ওয়েস্ট) শোধন হয় কিন্তু কঠিন বর্জ্য (সলিড ওয়েস্ট) শোধনের জন্য সিইটিপিতেই পাঠাতে হবে। এছাড়া একটি ইটিপি স্থাপনে শত কোটি টাকার বেশি ব্যয় প্রয়োজন হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান এ উদ্যোগ নিতে পারছে না।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, চামড়াশিল্পকে রক্ষা করতে হলে সবার আগে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সিইটিপি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় রপ্তানি বাজার পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচা চামড়ার মান কমে যাওয়াও দরপতনের অন্যতম কারণ। ইদানীং পশুর শরীরে লাম্পি স্কিন ডিজিজ (স্থানীয় ভাষায় করোনা) এর কারণে সংগৃহীত চামড়ার প্রায় ২৫ শতাংশই রপ্তানি অনুপযোগী। এছাড়া পশুর চামড়া ছাড়ানোর সময় অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলা হয়। এতে চামড়ার পুরুত্ব ও মান নষ্ট হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমিয়ে দেয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাভার চামড়া শিল্প নগরীর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়িয়েছে সিইটিপি প্রকল্প। এখন নতুন সিইটিপি নির্মাণ এবং পৃথক ইটিপি স্থাপনের মাধ্যমে চামড়া শিল্পে কতটা সুদিন ফিরে আসে, সেটিই দেখার অপেক্ষা।